#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '৫২'
#জেরিন_আক্তার_নিপা
গোলাপ জান ছেলের বউদের নিয়ে বসে ঠিক করছেন কে কে ইরিনের বিয়েতে যাবে। তিন ছেলে, ছেলের বউ সবাইকে যেতে বলছেন। সানজিদা জিজ্ঞেস করল,
-আপনি যাবেন না আম্মা?
-ওই বাজারের বেটি লেগে আমি যামু না।
শায়লা এসময় এখানে এসে উপস্থিত হলো। সানজিদার পাশে বসতে বসতে বলল,
-তাহলে আপনি বাড়িতে থাকুন। বাড়ি পাহারা দিন। কারণ বাজারের বেটিও যাবে।
সানজিদা মুখ বাঁকিয়ে শায়লার পাশ থেকে উঠে গেল। গোলাপ জান কড়া গলায় বললেন,
-আমার নাতনির বিয়েতে তোরে কেউ যাইতে কইছে বেলাজা মা**?
শায়লা হাই তুলল। গোলাপ জানের কোন কথাই যেন তার গায়ে লাগছে না। সে বলল,
-আপনার ছেলেকে বললেই তো আমাকে বলা হয়।
গোলাপ জান রেগে গিয়ে তিক্ত মুখে বললেন,
-তোর কি লজ্জা শরম কিছুই নাই? তুই মরস না কেন হ্যাঁ!
-মরার বয়স আপনার হয়েছে। অথচ আমাকে মরতে বলছেন।
সানজিদার হাত অটোমেটিক মুখে চলে গেল। চোখ জোড়া হাসের ডিমের মতো বড়ো হয়ে গেছে। আম্মাকে মরার কথা বলে! কলিজায় ডর ভয় কিছুই কি নেই?
গোলাপ জান বিলাপ পারতে লাগলেন,
-পল্লব রে এইটা কোন ডাইনীরে তুই আমার বাড়িতে আনলি রে! এই খান** মা** আমার মরণ কামনা করে। এই দিন দেখার জন্য কি আমি তোরে পেটে ধরছিলাম রে পুত!
গোলাপ জানের হা-হুতাশ শুনে শায়লা হাই তুললো।
-আমার ছেলে খালি ফিরুক। এই মা*** বেটিরে যদি চুলে ধইরা বাড়ি থেকে বাইর না করাইছি তাইলে আমার নামও গোলাপ জান না।
নাজমা শাশুড়িকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই কোন কাজ হচ্ছে না। তটিনী ঘরে ছিল। বাইরে হৈচৈ শুনে বেরিয়ে এলো।
-বুড়ীটা আবার কোন নাটক শুরু করেছে। এবাড়িতে একটা দিন নাটক দেখা ছাড়া থাকা যায় না।
***
পেখম ব্যাগ গোছাচ্ছে। তার নিজের জামাকাপড় দিয়েই এক সুটকেস ভরে গেছে। তবুও আরও কতকিছু নেওয়া বাকি! তাওয়াফ ঘরে এসে পেখমকে চিন্তিত মুখে সুটকেসের উপর বসে থাকতে দেখে বলল,
-নিজেও সুটকেসের ভেতর এডজাস্ট হয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিস নাকি?
-উঁহু।
-তাহলে সুটকেসের উপরে বসে আছিস কেন?
-অনেক বেশি কাপড়চোপড় নেওয়া হয়ে গেছে। তাই চেইন লাগাতে পারছি না।
তাওয়াফ ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে বলল,
-শরীরে এক কেজি মাংস হবে না। গায়ে জোর থাকলে তো চেইন লাগাতে পারবি।
মুখে বলল,
-সর তুই। আমি দেখছি।
পেখম সুটকেসের উপর থেকে নেমে বসল। তাওয়াফ এগিয়ে এলো। পেখম যে কাজ বিশ মিনিট ধরে চেষ্টা করেও পারছিল না। তাওয়াফ তা চোখের পলকেই করে দিল। পেখম গাল ফুলিয়ে বলল,
-আপনি কত সহজে পারলেন। আমি লাগাচ্ছিলাম সময় বদ চেইনটা লাগতে চায়নি।
-এখন থেকে খাওয়াদাওয়া করিস তাহলে পরের বার তুই লাগাতে পারবি।
-আমি কি কম খাওয়াদাওয়া করি নাকি?
-খাস তো। পাখিরা যতটুকু খায় ঠিক ততটুকু।
পেখম মুখ মোচড় দিল। নিজে জিম করে করে শক্তি বানিয়ে এখন তাকে খাওয়া নিয়ে কথা শোনায়।
-তোর প্যাকিং শেষ?
-হুম।
-সবকিছু নিয়েছিস? ওখানে গিয়ে আবার বলিস না এটা আনিনি ওটা আনিনি।
-বলব না। আপনার তো এখনও প্যাকিং হয়নি। আপনি কী কী নেবেন। আমাকে বলে দিলে আমি ব্যাগে গুছিয়ে রাখব।
-তোকে এত কাজ করতে হবে না।
তাওয়াফ কথাটা স্বাভাবিক ভাবে বললেও পেখম মনে করল একটু আগে ব্যাগের চেইন লাগাতে পারেনি বলে তাওয়াফ ভাই তাকে খোঁটা দিয়ে কথাটা বলেছে।
-আপনি কি ভাবছেন আমি পারব না? আমার নিজের জামাকাপড় কত সুন্দর করে গুছিয়ে নিয়েছি দেখেন। আপনার গুলোও নিতে পারব। একটা শার্টেরও ভাঁজ নষ্ট করব না।
শার্টের ভাঁজ নষ্ট হওয়ার ভয়ে তাওয়াফ বারণ করেনি। কিন্তু এই মেয়ে সবসময় তার কথার ভুল মানেই বের করে।
-ঠিক আছে। আলমারি থেকে তোর যেটা যেটা পছন্দ নিয়ে নে।
-আপনার কাপড়?
-হুম।
-আপনি দেখিয়ে দিন না। আমি কীভাবে বুঝবো আপনি কোনটা পরবেন?
-তুই যা নিবি তা-ই পরব।
পেখম একটা সুযোগ পেয়ে গেল। তাওয়াফ ভাই নিজেই বলেছে তার পছন্দ মতো কাপড় নিতে। পেখম খুশি মনে বেছে বেছে তার জামার সাথে ম্যাচিং করে সবগুলো শার্ট নিচ্ছে।
দৃষ্টি নিজের গোছগাছ শেষ করে পেখমের কতদূর হলো দেখতে যাচ্ছিল। পথে ইলহামের সাথে দেখা হয়ে গেল। ইলহাম দৃষ্টিকে দাঁড় করিয়ে বলল,
-তোর ফোন কই রে?
-ঘরে। কেন?
-জরুরি একটা কল করতে হবে। আমার ফোন ডিস্টার্ব করছে।
-ফোন ঘরেই। বিছানার উপর। নয়তো পড়ার টেবিলের উপর। তুমি গিয়ে নিয়ে আসো। আমি এনে দিতে পারব না।
দৃষ্টি যাওয়া ধরলে ইলহাম ডেকে জিজ্ঞেস করল,
-লক কী বলে যা।
-চারটা এক।
প্রিয়া ইলহামের নম্বর ব্লক করে দিয়েছে। ইলহাম নতুন সিম নিয়ে প্রিয়াকে কল করেছে। প্রথমবার না চিনে তুলে ফেলে যখন বুঝেছে এটা ইলহাম তখন নতুন নম্বরও ব্লক করেছে। তাই ইলহাম এখন দৃষ্টির ফোন দিয়ে কল করবে। দৃষ্টির নম্বরও নিশ্চয় ব্লক করবে না।
***
ছেলে বাড়ি ফেরা মাত্র গোলাপ জান কেঁদেকেটে দুপুরের ঘটনা বলতে লাগলেন। সাথে বানিয়ে বানিয়ে আরও এমন কিছু বললেন, যা শুনে পল্লব মির্জার পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেল। তার মাকে গালিগালাজ করা? তার মাকে গলায় দড়ি দিয়ে মরার কথা বলা!
-আমি বাজারের বেটিরে কিছুই কইছি না। হে-ই আমারে কয় এরকম সন্তান পেটে ধরছেন আপনার তো গলায় দড়ি দেওয়া উচিত। আমি নাকি তোরে অমানুষ বানাইছি।
পল্লব মির্জা ভয়ংকর রুপ ধারণ করে শায়লার খোঁজে নিজের ঘরে যাচ্ছেন। গোলাপ জান চোখের পানি মুখে আনন্দিত গলায় বললেন,
-এইবার মজা বুঝবি মা** বেটি। আমার সহজসরল বউটার কপালে দুঃখ দিয়া তুই সুখে থাকতে পারবি? তোরে আমি সুখে থাকতে দিমু?
পল্লব মির্জা ঘরে এসে কোনধরনের কথাবার্তা ছাড়াই শায়লাকে মারতে শুরু করল। প্রথম দুই চড় খেয়ে শায়লা মেঝেতে পড়ে গেছে। ঠোঁট কেটে গলগল করে রক্ত পড়ছে। পল্লব মির্জা শায়লার চুলের মুঠি ধরে টেনে তুললেন।
-তুই আমার মাকে কী বলেছিস বে** মা**। কিছু না বলতে বলতে তোর সাহস বেড়ে গেছে!
একজন পুরুষ মানুষের শক্তির সাথে শায়লা পেরে উঠবে না। কিন্তু সে চুপচাপ মার খাওয়ার মেয়ে না। শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে শায়লা পল্লব মির্জাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। হাতের কাছে যা পেলো তা-ই পল্লব মির্জার উপর ছুড়তে লাগল।
-জানোয়ারের বাচ্চা তুই আমাকে মারবি! আমি তোর ওই বউয়ের মতো মুখ বুজে তোর অত্যাচার সহ্য করব? কুত্তার বাচ্চা, তুই দশটা মারলে আমি তোকে একটা হলেও মারব। দরকার পড়লে তোকে খুন করে আমি সারাজীবন জেলের ভাত খাবো।
দু'জনের হাতাহাতি লেগে গেছে। শায়লা পল্লব মির্জার সাথে পারছে না। শেষে বাধ্য হয়ে সে কামড়াতে শুরু করেছে।
গোলাপ জান ঝগড়ার শব্দ শুনে উপরে না এলেও নাজমা ছুটে এলো। দরজার সামনে থেকে এই দৃশ্য দেখে হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইল। কী হচ্ছে এসব! নাজমার চিৎকার শুনে তার স্বামী এলেন। এরকম দৃশ্য তিনিও আশা করেননি। সানজিদা তার স্বামীর সাথে এসেছে।
-হায় আল্লাহ!
কতক্ষণের মধ্যে তটিনীও চলে এলো। মুখ ফসকে তটিনী বলে ফেলল,
-ইন্না-লিল্লাহ!
হারিশ মির্জা হুংকার ছেড়ে বললেন,
-এসব কী হচ্ছে? পেয়েছিস কী তোরা? বাড়িটাকে তোরা কী বানিয়ে রেখেছিস? এটা কোন ভদ্র লোকের বাড়ির দৃশ্য?
পল্লব মির্জাকে এতদিন ভাইয়েরা কিছুই বলেনি। কিন্তু আজকের ঘটনা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছে। হারিশ মির্জা রাগ সামলাতে না পেরে ছোট ভাইকে একটা চড় মেরে বসলেন। পল্লব মির্জা চড় খেয়েও কিছু বলল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। গোলাপ জান এখনও শায়লাকেই দোষে যাচ্ছে।
-কতবড় মাগী হইলে জামাইয়ের গায়ে হাত তুলে!
হারিশ মির্জা মাকে কঠিন ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিলেন।
-আহ মা! চুপ করো তুমি। আমি কারোর একটা কথাও শুনতে চাই না।
হারিশ মির্জা এমনিতে সহজসরল মানুষ। সহজে রাগে না। কিন্তু একবার রেগে গেলে ভয়ংকর হয়ে উঠেন। গোলাপ জান চুপ করে গেলেন।
-এই বাড়িতে হয় তোরা থাক। নাহয় আমাদের শান্তিতে থাকতে দে।
বড়ো ভাইয়ের সম্মানে এতদিন এসব দেখেও না দেখার মতো থাকলেও আজ ইখতিয়ার মির্জা বললেন,
-আমার ছোট ছোট দুইটা মেয়ে আছে। এসব দেখে ওরা কী শিখবে? এরকম অসুস্থ পরিবেশে আমি আমার বউ বাচ্চা নিয়ে থাকতে পারব না মা।
নাজমা বলল,
-তোমরা এসব দেখার জন্য কতক্ষণই বা বাড়িতে থাকো। দেখতে তো হয় আমাদের। আমার দ্বারাও আর সম্ভব হচ্ছে না ভাই। একটা মেয়ে কতদিন ধরে ওবাড়িতে পড়ে আছে। মেয়েটার নাকি বিয়েও হয়ে গেছে। অথচ এবাড়ির প্রথম মেয়ের বিয়ে নিজের চোখে দেখার ভাগ্য হলো না। সামনে আরেকটা মেয়ের বিয়ে। আজ রাতে রওনা দেওয়ার কথা। অথচ বাড়িতে এসব নাটক হচ্ছে। পল্লব আর তার বউ যদি ইরিনের বিয়েতে যায় তাহলে আমি যাব না। এরা ওখানে গিয়েও মারামারি কাটাকাটি শুরু করবে না এই নিশ্চয়তা কে দিবে?
নাজমা একটা কথাও ভুল বলেনি। হারিশ মির্জা জানালেন, পল্লব গেলে তিনিও যাবেন না। এমনকি ওখান থেকে এসে পল্লব আর তার বউকে বাড়িতে পেলে তিনি স্ত্রী ছেলে নিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে উঠবেন।
***
তাদের বাড়ির মানুষ কেন এখনও যায়নি এই নিয়ে ইভা রাগ করে বসে আছে। বিয়ের আর দুই দিন আছে। তার মেয়ের বিয়েতে কাউকে যেতে হবে না। গোলাপ জান বাড়ির ঝগড়াঝাটি একপাশে রেখে বৌমাদের ব্যাগপত্র গোছাতে বললেন। নাজমা জানাল,
-আমি যাব না আম্মা।
-কেন? পল্লব আর ওই মা** বেটি তো যাইব না।
-না। যাক। আমি পল্লবের জন্য যেতে না করছি না। আজান বাড়িতে একা থাকবে। আমাকে ওর প্রয়োজন হবে।
গোলাপ জান বিরক্ত মুখে বললেন,
-আজান বাড়িতে থাকব কেন?
-আপনার নাতি যাবে না। জিজ্ঞেস করেছিলাম।
-এইজন্য তোমার ছেলেরে আমি দেখতে পারি না। দুনিয়ার সবাই এক দিকে গেলেও সে যাবে উল্টা দিকে।
আজান যাবে না শুনে তটিনীর ভালো লাগল না। সবাই যাচ্ছে। এমনকি বাইরের মানুষ হয়ে তাকেও যেতে হচ্ছে। কিন্তু এই লোক নিজের আপন ফুপাতো বোনের বিয়েতে কেন যাবে না? তটিণী তখনই আজানের ঘরে এলো। সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
-আপনি কেন যাবেন না?
আজান তটিনীর দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
-আমার যাওয়া না যাওয়া দিয়ে আপনার কি কোন কাজ আছে?
-অবশ্যই আছে। যেখানে বাড়ির সবাই যাচ্ছে। আপনার জন্য আপনার মা যেতে চাচ্ছে না। আমি আপনার কথা না ভাবলেও আপনার মায়ের কথা ভাবছি। কারণ অল্প সময়ে ওই মানুষটার থেকে আমি অনেক ভালোবাসা পেয়েছি। আপনার মায়ের জন্য হলেও আপনার যাওয়া উচিত। আর যদি আপনার যেতে একেবারেই ইচ্ছে না করে তাহলে জোর করে হলেও আন্টিকে সবার সাথে পাঠানো উচিত।
***
আকৃতি পেখম আর দৃষ্টিকে ডেকে ডেকে বিরক্ত হয়ে নিজে এসে গাড়িতে বসে পড়ল। এরা দেরি করে আসুক। সবাই তাড়াহুড়ো করে বের হচ্ছে। দৃষ্টি পেখমকে ডাকছে। পেখম যাবার আগে তাওয়াফকে জিজ্ঞেস করল,
-আপনি কোন গাড়ি চালাবেন তাওয়াফ ভাই?
তাওয়াফ পেখমের দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসল। পাগল মেয়ে তার সাথে যাওয়ার জন্য কতটা উৎসুক।
-আমার গাড়ি।
-ঠিক আছে।
পেখম জেনে নিয়েছে কারণ সে তাওয়াফ ভাইয়ের গাড়িতে যাবে। দৃষ্টিকে নিয়ে পেখম এসে এই গাড়িতেই বসল। ওরা দেরি করার জন্য আকৃতি বকছে। ঠিক হয়েছে এক গাড়িতে ছোট সদস্যরা যাবে। বড়রা অন্য গাড়িতে। কারণ ছেলেমেয়ে এরা সারারাত জেগে গল্প করবে। বড়দের তখন ডিস্টার্ব হবে।
তাওয়াফ প্রিয়ার সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে বাসা থেকে বের হচ্ছে। সামনে ইলহামকে পেলে জিজ্ঞেস করল,
-সবাই কি গাড়িতে বসে গেছে?
-হুম।
ইলহামের পরনের ট্রাউজার আর টিশার্ট দেখে বলল,
-তুই কি এভাবেই যাবি!
-গাড়িতেই তো থাকব।
ইলহামের কন্ঠ শুনে প্রিয়া কিছু না বলেই কল কেটে দিয়েছে। কল কেটে গেছে বুঝতে পেরে তাওয়াফ ফোন পকেটে রাখল। ইলহাম নিজের গাড়ির চাবি তাওয়াফের দিকে দিয়ে বলল,
-বাবা মা-রা আমার গাড়িতে বসেছে। তুমি এটা ড্রাইভ করো। সিনিয়র সিটিজেনদের সাথে গেলে ড্রাইভ করতে করতেই আমি ঘুমিয়ে পড়ব। কাওয়ালী পার্টির সাথে গেলে পুরো পথ এরা কিচিরমিচির করবে এতে আমারও ঘুম আসবে না।
তাওয়াফ পেখমের কথা ভাবছে। এই মেয়ে তার সাথে যাবার জন্য আগেই জিজ্ঞেস করে নিয়েছে। কিন্তু এখন ইলহাম ঝামেলা বাঁধিয়ে দিয়েছে। ইচ্ছে থাকলেও পেখমের সাথে যাওয়া হবে না। তাওয়াফ ইলহামকে গাড়ির চাবি দিয়ে দিল।
পেখম তাওয়াফ ভাই আসার অপেক্ষা করছে। এখনও আসছে না কেন? এত দেরি কেন করছে? ইলহামকে এ গাড়িতে উঠতে দেখে জিজ্ঞেস করল,
-তুমিও কি আমাদের সাথে যাবে ইলহাম ভাই?
-হুম।
-তাহলে ওই গাড়ি কে ড্রাইভ করবে?
-তাওয়াফ ভাই।
তাওয়াফ ভাই ওই গাড়িতে গেছে! অথচ সে জিজ্ঞেস করেছে সময় বলেছে এই গাড়িতে যাবে। তাওয়াফ ভাই তার সাথে এমন মিথ্যাটা কেন বলল! পেখমের জার্নির মজাটাই বরবাদ হয়ে গেল। সবাই হৈচৈ করলেও সে একদম চুপচাপ বসে আছে। দৃষ্টির হঠাৎ মনে পড়লে বলল,
-ইলহাম ভাই, আমার ফোন কিন্তু তোমার কাছে।
-হুম।
-জরুরি কল করেছ?
-হুম।
ইলহাম একহাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে পেছনে দৃষ্টিকে ফোন দিল। এসময় আকৃতি বলল,
-প্রিয়া যে কেন এলো না! ও থাকলে আরও মজা হতো।
দৃষ্টি বলল,
-প্রিয়া আপুকে ভিডিও কল দেই?
-দে।
দৃষ্টি কল দিলেও প্রিয়া কল তুলছে না। অনেকবার কল করার পরও প্রিয়া যখন তুলছে না তা দেখে আকৃতি চিন্তিত মুখে বলল,
-কল তুলছে না?
-না।
-কী হলো মেয়েটার?
-ফোন রেখে কোথাও গেছে নাকি?
ইলহাম ওদের কথোপকথন শুনতে পাচ্ছে। ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল সে। তখন দৃষ্টির ফোন দিয়ে কল দিলে প্রিয়া কল তুলেছিল। কিন্তু ইলহামের কন্ঠ শুনে কথা না বলেই কল কেটে দিয়েছে। তারপর আরও অনেকবার কল দিয়েছে। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। ইলহাম ভেবে নিয়েছে ইরিনের বিয়ে থেকে এসে সরাসরি মিস প্রতিবাদীর মুখোমুখি দাঁড়াবে।
তাওয়াফ একহাতে ড্রাইভ করছে। অন্য হাতে মেসেজ টাইপ করছে। পেখমের ফোনে টুং করে নোটিফিকেশন আসার শব্দ হলে স্ক্রিনের উপর দেখতে পেলো তাওয়াফ ভাইয়ের মেসেজ। তাকে মিথ্যা বলে এখন মেসেজ করা হচ্ছে! পেখম রাগ করে মেসেজ সিন করল না। তাওয়াফ পেখমের রিপ্লাইয়ের অপেক্ষা করছে। রিপ্লাই তো দূর এই মেয়ে মেসেজ সিনই করেনি।
-আমার উপর রাগ করে নিশ্চয় গাল ফুলিয়ে বসে আছে।
নূর জাহান জিজ্ঞেস করলেন,
-কিছু বলেছিস?
-না। তোমাদের ঘুম পেলে ঘুমাতে পারো। জ্যাম না থাকলেও পৌঁছতে পৌঁছতে ফজর হবে।
ইলহাম গাড়িতে মিউজিক চালিয়ে দিয়েছে। দৃষ্টি পেখমকে চুপ মেরে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল,
-তোর আবার কী হলো?
-কিছুই হয়নি। ঘুম পেয়েছে।
দৃষ্টি চোখ ছোট ছোট করে বলল,
-ঘুম পেয়েছে! তুই না বলেছিলি আজ সারারাত সজাগ থাকবি। পুরো পথ হৈচৈ করে যাবি।
-বলেছিলাম। কিন্তু এখন ঘুম পাচ্ছে।
একথা বলে পেখম সত্যি সত্যিই চোখ বন্ধ করে সিটে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল। দৃষ্টি মুখ বাঁকাল। এই নাটকের যে থেকে থেকে কী হয়! পেখম মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, ওখানে গিয়েও সে তাওয়াফ ভাইয়ের সাথে কথা বলবে না। যা কিছুই হয়ে যাক তাওয়াফ ভাইয়ের থেকে দশ হাত দূরত্বে থাকবে।
চলবে
ঈদ মোবারক পাঠক ❤️