ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম বর্ণহীন

১০ম পর্ব

লেখক: তোনিমা খান

#প্রেম_বর্ণহীন

#তোনিমা_খান

#পর্বঃ১০

ইদানিং সর্বদা চোখে ক্রুরতার আভাস বাউন্ডুলে ছেলেটির। চাপা দ্বন্দ্বে বাহ্যিক দশা বেহাল! কিন্তু কেউ আঁচ করতে পারে না কিসের এত দ্বন্দ্ব! লম্বা লম্বা পায়ে ক্লাবের সকলের জন্য উন্মুক্ত জায়গা পেরিয়ে অফিস কক্ষের দিকে পা বাড়ায় মোত্তাকিন। সোফায় গা এলিয়ে বসা তখন দলের ছেলেপুলেরা। সাদা ব্যন্ডেজে আবৃত বিকৃত মুখশ্রী তুলে তপন হিংস্র নেত্র তুলে তাকায় ছেলেটির পানে। মোত্তাকিনের বাঁকা দৃষ্টি ঠিক তার-ই উপর নিবদ্ধ! তবে দৃষ্টিতে সাবধানি বার্তা!

পারভেজ দু'জনের নীরব দ্বন্দ্বে চিন্তিত হয়। মোত্তাকিন ছেলেটা শান্ত মস্তিষ্কের এক উন্মাদ! আর তপন উগ্র মেজাজের এক উন্মাদ! দু'জনের দ্বন্দ্ব ভালো কিছু বয়ে আনবে না। অফিস রুমে ঢুকতেই বশির প্রফুল্ল চিত্তে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে মোত্তাকিনকে। উল্লাসে মেতে উঠে বলে,

--"টেন্ডারটা আমাদের দায়িত্বে এসে গিয়েছে। মুহিত ইরতেজার এ বছরের সবচেয়ে বড় টেন্ডার আমাদের হাতে মোত্তাকিন। ওটাকে এখন গদি থেকে কিভাবে মুখ কালি মেখে টেনে নামাতে হয় সেটার ব্যবস্থা আমি করব। একবার জনগনের অসন্তুষ্টি আসুক তার উপর, তার পক্ষে কোন টেন্ডার আর আসবে না। আস্তে আস্তে মুহিত ইরতেজাকে এতটা দূর্বল করব যে একদিন ওটাকে কেউ মেরে দিলেও জনগনের আক্ষেপ হবে না।"

বলেই সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। মোত্তাকিন নিরুদ্বেগ চেয়ার টেনে বসতে বসতে অভিনন্দন জানিয়ে বলে,

--"দোয়া করি আপনার কাজে সফলতা পান, বশির ভাই। তা সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠিয়ে এখানে ডাকলেন কেন!"

--"এই টেন্ডার তো তোর কারণেই পেয়েছি। তোকে ডাকব না? মুহিত ইরতেজার ম্যানেজার জানে মিরসাদ ইরতেজাকে আমাদের দলের লোকেরা বাঁচিয়েছে। এটাই ছিল আমাদের টেন্ডার দেয়ার মূল কারণ! তারা আমাদের উপর খুশি! আমি এতক্ষণে তোর পরিকল্পনা বুঝতে পেরেছি। আমার ভুল হয়ে গিয়েছে রে ছোটভাই! রাগের মাথায় তোর সাথে খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি, এই নে তোর বকশিশ। আর ভাইয়ের উপর কোন ক্ষোভ রাখিস না।"

বশির টেবিলের ড্রয়ার থেকে তিন বান্ডিল টাকা মোত্তাকিনের সামনে রাখে। মোত্তাকিন সেদিকে এক পলক দৃষ্টি ফেলে বলল,

--"আচ্ছা, তবে এখন উঠি।"

--"এত তাড়া কেন?"

--"এমনিই ভাই!"

--"তোকে ইদানিং ক্লাবে কম দেখা যায়, কারণ কি? এরপর থেকে আমার তোকে প্রয়োজন, মোত্তাকিন। মুহিত ইরতেজাকে চিরতরে সরাতে তুই আমার একমাত্র ভরসা।"

মোত্তাকিন তীক্ষ্ণ নজর ফেলে। ভারী কণ্ঠে বলে,

--"খু"নাখু"নিতে আমি নেই ভাই। আপনার সাথে কথা ছিল আমি আপনার পথ ক্লিয়ার করব, ব্যস! আর কিছু না।"

--"মুহিত ইরতেজাকে না মারলে সেই পথ ক্লিয়ার হবে না, মোত্তাকিন। আর এটা তোকেই করতে হবে। তোর মতো স্মুথলি সবটা কেউ হ্যান্ডেল করতে পারবে না।, বশিরের কণ্ঠে হিংস্রতা। দাঁড়িতে হাত চুলকে মোত্তাকিন অস্থির দৃষ্টি ফেলল। চাপা অস্থিরতার সাথেই বলল,

--"আমি খু"নাখু"নিতে নেই ভাই, জোর কইরেন না। যদি খু"নাখু"নি করতেই হয় তবে কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যাবে। একটা খু"নে, খু"নের নেশা মিটবে না। আমি চাই না এই পরিস্থিতি!"

বশিরের চোখ ছোট হয়ে গেল। সূচালো কণ্ঠে শুধায়,

--"আমাদের শত্রু মুহিত ইরতেজা ব্যতীত আর কেউ নেই, মোত্তাকিন। তুই আর কাকে মারবি? আমাদের কাজ স্বল্প আর ছোট! তুই এত মাথা ঘামাস না শুধু সময়মত আমার কাটা উপড়ে ফেলতে সাহায্য করিস, তাতেই হবে।"

মোত্তাকিন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। রুক্ষ কণ্ঠে বলে,

--"বললাম না ভাই, আমার দ্বারা এটা হবে না! হাত নোংরা করতে হলে বড়সড় ঝামেলা হয়ে যাবে। তার থেকে আপনি আপনার কাজ করেন।"

--"সেটা সময় বলে দেবে। তুই ওয়াদা করেছিস আমার হয়ে কাজ করবি শেষ পর্যন্ত!", বশির ফিচলে হেসে বলল। মোত্তাকিন জবাব দেয় না। অসন্তোষ আর অস্থির দৃষ্টি ফেলে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। মোত্তাকিন বের হতেই পারভেজ ওর পিছু পিছু হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে আসে। ছুটে গিয়ে পেছন থেকে ওর গলা জড়িয়ে ধরে। মোত্তাকিন ঘাড় কত করে তাকায়। পারভেজ গাল ভরে হেসে ওর পকেট থেকে একটা বান্ডিল নিয়ে নিজের পকেট ঢুকাতে ঢুকাতে বলল,

--"আজ আরেকটা দে! তিনটা পেয়েছিস!"

--"নিউমার্কেটের সামনে গিয়ে থালা নিয়ে বস, এক বান্ডিল না তিন বান্ডিল পেয়ে যাবি।", মোত্তাকিনের গা ছাড়া কণ্ঠে পারভেজ মুখ ছোট করে নেয়। নিজের আড্ডার পৌঁছাতেই তূর্য হামলে পড়ল তার উপর। সে আর পারভেজ টং এর দোকানে বসে। মোত্তাকিন পকেট থেকে বাকি টাকার বান্ডিল দু'টো তূর্যর হাতে দিয়ে দেয়। তূর্য প্রফুল্ল হেসে বলল,

--"ভাই, একটা আমার আর বাকিগুলো ছেলেপুলেদের ভাগ করে দেব?"

মোত্তাকিন সিগারেট ধরাতে ধরাতে মাথা নাড়লো। পারভেজ একটা ঠান্ডা ক্যান হাতে তুলে নেয়। কিছুটা কৌতুহলী গলায় শুধায়,

--"তুই আজ পর্যন্ত যত টাকা পেয়েছিস তাতে তোর শহরের আরেক ধনী ব্যক্তি হওয়ার কথা। কিন্তু আজ পর্যন্ত এক টাকাও নিজের জন্য খরচ করিসনি কেন? আন্টির সব কষ্ট তো কমিয়ে দিতে পারিস এই টাকা দিয়ে। রোজ রোজ জুতার বাড়ি তো খেতে হয় না।"

বরাবরের ন্যায় বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে আছে মোত্তাকিনের। সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে গম্ভীর গলায় বলল,

--"যেদিন হালাল পথে গায়ে খেটে ইনকাম করতে পারব, সেদিন মামনির কষ্ট দূর করব। এই হারাম টাকা দিয়ে তার কষ্ট কমানোর বদলে, বাড়িয়ে দেয়া হবে।"

পারভেজ আর তূর্য মুখ বিকৃত করে নেয় এহেন কথায়। এগুলো তাদের কাছে ভিত্তিহীন যুক্তি লাগে। মায়ের কষ্টের সামনে হালাল হারাম আছে না-কি?

মোত্তাকিন পথে দৃষ্টি রেখে সিগারেটে সুখটান দিতে দিতেই সদ্য ব্যস্ততায় জমে ওঠা রাস্তার দিকে দৃষ্টি রাখে। রাস্তার ঠিক ওপারে একজন বাইক রেখে ফুলের দোকানে ঢুকছে তখন। মোত্তাকিন ঘাড় কাত করে তাকায় মালবাহী ট্রাক ড্রাইভার বিলালের দিকে। তূর্যর হাতের বান্ডিল থেকে কয়টা নোট বের করে ডাকলো।

--"বিলাল, একটা কাজ করে দে।"

বিলাল চা শেষ করে কাপ রাখলো। শুধায়,

--"ভাই কি কাজ?"

মোত্তাকিন তার হাতে দশটা নোট এমনভাবে ধরিয়ে দিল যেন মূল্যহীন কোন কাগজ। রাস্তার ওপারে রাখা বাইকটাকে নির্দেশ করে বলল,

--"বেশি কিছু না। সকাল সকাল রাস্তা ফাঁকা আছে। ঐ বাইকটাকে হালকা পাশ ঘেঁষে উড়িয়ে দিয়ে চলে যাবি।"

বিলালের কোন ঝামেলা করার ইচ্ছা নেই এই সকাল বেলা। কিন্তু দশ হাজার টাকা এভাবে হাত থেকে খসে যেতে দেয়াও কষ্টকর ব্যপার! টাকা হাতে আসলে তা ফেরত দিতে ইচ্ছে করে? সে রাজি হয়ে গেল। মোত্তাকিন সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে সম্মুখের বাইকটি ছুঁয়ে যাওয়া ট্রাকের সেই দৃশ্য দেখলো। অপরপ্রান্তে বাইকের মালিক হতভম্ব হয়ে গেল। সে লাগাতার গালিগালাজ করে হুমকি ধমকি দিয়ে যাচ্ছে।

সমিরের মুখে একদিকে ক্ষোভের ঝড়, অন্যদিকে প্রিয় জিনিস হারাবার ব্যথা মিশে বিবর্ণ হয়ে আছে। চোখদুটো ক্রোধের অনলে জ্বলছে। ট্রাকটি হালকা ছুঁয়ে গেলেও এই বাইক দিয়ে আর কোন কাজ হবে বলে মনে হয় না। সে তাকায় ট্রাক ছুটে যাওয়া রাস্তার দিকে। গালের পেশী টনটন করে ওঠে, মনে হয় যেন অদৃশ্য কোনো শত্রুর গলায় হাত বসিয়ে দেবে। গাড়ির নাম্বার ও দেখেনি।

মোত্তাকিন ফিচলে হাসল সমিরের উতরে যাওয়া মুখ দেখে। পারভেজ সেদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বলে,

--"এটা করলি কেন?"

--"ওটা ইন্দুবালার হবু বর। শালার মাদারবোর্ড, ফুল কিনছে।", মোত্তাকিন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে। দৃষ্টিতে হিংসের সবুজ শিখা আর অপ্রকাশিত ক্ষোভের গাঢ় ছায়া। ঠোঁটদুটো শক্ত হয়ে এক বিন্দুতে আঁটসাঁট, যেন জেদে ও ব্যথায় জমাট বেঁধে আছে। চোয়ালের হাড় স্পষ্ট হয়ে উঠল, মনে হয় প্রতি নিশ্বাসে ক্রোধকে দমিয়ে রাখছে। পারভেজ আরো কৌতুহলী হয়।

--"তাই বলে এত বড় ক্ষতি করবি?"

মোত্তাকিন জবাব দেয় না। চুপ করে সিগারেটে মনোনিবেশ করে কেননা সিগারেট শেষ! আরেকটা কেনার টাকা তার কাছে নেই। মেজাজটা অচিরেই খারাপ হয়ে গেল। তন্মধ্যেই তার ফোন বেজে উঠল। পকেট থেকে ফোনটা বের করতেই তার চোখদুটি জ্বলে ওঠে লণ্ঠনের কাচের ভেতর দাউদাউ আগুনের মতো। ঠোঁটদুটি শক্ত হয়ে যায়, যেন রাগে কামড়ে ধরা ধনুকের তার। পারভেজের দিকে তাকিয়ে রাগে গজগজ করে বলল,

--"মামনির কষ্টের টাকার কেনা দামী ফোন না হলে এটাকে এতক্ষণে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলতাম। একটা মানুষ এতো নাছোড়বান্দা হয় কি করে?"

ইনসিয়ার ফোন! সে ফোনটা রিসিভ করতেই ভেসে আসে ক্রুব্ধ কণ্ঠ।

--"তুমি এমন করছ কেন মোত্তাকিন? আমার ফোন ধরছো না কেন? তুমি কি আমায় ভালোবাসো না?"

মোত্তাকিন দাঁত খিচে বলল,

--"তোর থেকে তো ইন্দু শতগুণ ভালো রে, ইনসিয়া! মুখের উপর দুটো গালি দিয়ে দেয় তবুও তোর মত ছ্যাঁচড়ামো করে না। ফোন রাখ! তোকে কোনদিন বলেছি যে আমি তোকে ভালোবাসি?"

--"তবে এতদিন অতো মিষ্টি মিষ্টি কথা বললে কেন? আমার সাথে দেখা করতে কেন?"

--"তখন আমার মধ্যে মিষ্টতা বেশি ছিল তাই মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেছি , এখন তিতা বেশি তাই তেতো কথা বলছি। আর দুদিন দেখা করেছি বলেই কি আমি তোকে ভালোবাসি? মেজাজ খারাপ করিস না ইনসিয়া। তোর বড় বোন যে যাকে তাকে বিয়ে করার জন্য রাজী হয়ে গিয়েছে সেই দিকে খেয়াল আছে?", মোত্তাকিন খেকিয়ে উঠল।

ইনসিয়া ক্ষেপে গেল। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,

--"ইন্দু মরুক গিয়ে, তুমি আমার সাথে ঠিক করে কথা বলো, মোত্তাকিন। আমি তোমায় ভালোবাসি, বিয়ে করতে চাই।"

সহসা মোত্তাকিনের রাগ এবার মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। সে তেতে উঠে বলে,

--"তুই মর গিয়ে, কুচক্রীনি! আমাকে কি পাগল মনে হয় যে তোর মত আপদকে গলায় ঝুলাবো? ন্যাকা, ছ্যাঁচড়া মেয়ে—একটু নরম ভাষায় কথা বললেই গলায় ঝুলে বসে। বড় বোনের থেকে কিছু শেখ! কথায় কথায় গালি দেবে অন্তত কারোর গলায় জোরপূর্বক ঝুলে বসে না।"

--"তুমি কথায় কথায় ইন্দুবালার কথা বলো কেন?"

--"সেই কৈফিয়ত তোকে কেন দেব কুচক্রীনি? কানের নিচে দু'টো খেতে না চাইলে আর একবারো ফোন দিবি না।", মোত্তাকিন ফোন কেটেও ফোঁস ফোঁস করছে।

ইনসিয়া ডিসকানেক্টেড ফোনটি নিয়ে থম মেরে বসে রইল। তহমিনা পাংশুটে মুখটি খুলে বলল,

--"চিন্তা করিস না, আমি ভাবির সাথে কথা বলব। নরম মনের মানুষ, তার ছেলের কীর্তি যদি একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জানানো যায় ঠিক বাগে আনা যাবে এই ছেলেকে।"

--"তুমি চেনো না মোত্তাকিনকে আম্মা। ও আস্ত এক ঘাড় ত্যাড়া! যা করবে তো করবে, যা করবে না তো করবে না। আমার মেজাজ খারাপ হয়!"

--"মেজাজ খারাপ করলে চলবে না ইনসু! মুহিত ইরতেজার বাড়ির বউ হতে হবে। একবার ভাব তো তুই সিটি মেয়রের পুত্রবধূ! বিয়ে হলে ঐ ছেলে জাহান্নামে যাক তুই তোর মতো আয়েশ আরাম করে জীবনযাপন করবি।"

ইনসিয়া মুখ গোমড়া করে নিল। এগুলো তার কাম্য নয় সে একজন ভালোবাসার মানুষ চায়। যে সুপুরুষ, তেজি হিরোর মতো হবে। মোত্তাকিনের মতোই কিন্তু সে এমন দূর্ব্যাবহার করতে পারবে না তার সাথে।

*****

সেদিন সরকারি ছুটি উপলক্ষ্যে ইন্দুবালা আর সিদ্দিকী সাহেব উভয়েই বাড়িতে। সমীরের সাথে দীর্ঘ আলাপন শেষে সিদ্দিকী সাহেব মেয়ের ঘরে আসলেন। পিছু পিছু তহমিনাও আসলো। ইন্দুবালা তখন ছাত্রদের জন্য সাজেশন তৈরি করতে ব্যস্ত ছিল।

এই সাজেশনটুকু গুছিয়ে দিলে ছাত্র ছাত্রীদের জন্য ফিজিক্স খানিক সহজ হয়ে উঠবে। বাবাকে পাশে বসতে দেখে সে মৃদু হাসল।

--"কিছু বলবে, আব্বু?"

সিদ্দিকী সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,

--"সমির মাত্র গিয়েছে। ওর সাথে সব কথা শেষ। এখন তোর সাথে কিছু কথা বলার আছে।"

ইন্দুবালা মাথা নাড়লো। সিদ্দিকী সাহেব বললেন,

--"আমি ওর ব্যপারে খোঁজ খবর নিয়েছে। যেই এলাকায় থাকে সেই এলাকায় নতুন এলেও সবাই ভালো বলেই জানে। আর ও যে অফিসে চাকরি করে তার দারোয়ানের সাথেও আমার কথা হয়েছে। সেও আশানুরূপ ইতিবাচক কথাই বলেছে। তাই আমার মনে হচ্ছে সমীর নিশ্চিন্তে আমার পছন্দসই পাত্র। এখন তুই কি রাজি এই বিয়েতে?"

--"এত ঘটা করে জিজ্ঞেস করার কি আছে ইনসিয়ার আব্বু? রাজি না হলে যাবে কোথায়? এর থেকে ভালো সম্বন্ধ তুমি আর কখনো পাবে না। তোমাদের এত খোঁজ খবর নেয়ার-ই কোন প্রয়োজন ছিল না। সব অতিরিক্ত! অমন চাঁদের মতো সুন্দর ছেলে আগ্রহ নিয়ে তোমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছে এটা সাত কপালের ভাগ্য! সাথে সাথেই দিয়ে দেয়া উচিত ছিল।", তহমিনার ব্যগ্র কণ্ঠে সিদ্দিকী সাহেব সহসা মেজাজ হারালেন। সে গর্জে উঠল,

--"এখান থেকে যাও, তহমিনা। আমি কি করব না করব তা তুমি বলে দেবে না। আমার মেয়ে যদি এখনো বলে যে ও বিয়ে করতে চায় না ঐ ছেলেকে, তবে আমি এই সম্বন্ধ ও নাকোচ করতে দুবার ভাববো না।"

তহমিনা চোয়াল শক্ত করে নেয়। তেজি কণ্ঠে বলে,

--"তোমাদের এই অহংকারের জন্য-ই তোমরা একদিন গলায় দড়ি দিয়ে মরবে। আমার কথা মিলিয়ে নিও। আজ আমি ছিলাম বলেই তোমরা এত ভালো সম্বন্ধ পেয়েছ।"

সে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ইন্দুবালা শ্রান্ত চোখে তাকায় বাবার ক্রুব্ধ মুখপানে। বলে,

--"এই চিৎকার চেঁচামেচি টুকু না করলে কি হতো না, আব্বু?"

সিদ্দিকী সাহেব নিজেকে সামলে নেয়। ফের নরম কণ্ঠে শুধায়,

--"আমার কথার উত্তর দাও ইন্দু। সমির তাড়াহুড়ো করছে। ওর পরিবার পরিজন নেই, চাইছে ছোট পরিসরে দুদিনের মধ্যে তোমায় তুলে নিতে।"

অন্তঃস্থলে চলা অমিমাংসিত দ্বন্দ্ব উপেক্ষা করল ইন্দুবালা। তার বিয়েই যে সকল সমস্যার সমাধান। সে খাতার দিকে দৃষ্টি রেখে বলল,

--"আমার সমস্যা নেই, আব্বু।"

সিদ্দিকী সাহেব চোখ তুলে তাকায়।

--"তুই রাজি?"

--"হু।"

--"মন থেকে নাকি মায়ের কথার জন্য?"

--"মা তো ঠিক বলে আব্বু, সমিরের মতো মানুষ আমার মতো কালো মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছে এটাই সাত কপালের ভাগ্য। তুমি চিন্তা করো না আমি খুশি।"

সিদ্দিকী সাহেব নীরব রইলেন কিয়ৎকাল। অতঃপর বললেন,

--"তবে কাল সকালে তৈরি থেকো, সমির তোমায় নিতে আসবে কেনাকাটা করতে যাওয়ার জন্য।"

--"আমার যাওয়ার কেন প্রয়োজন? সে নিজে যা পছন্দ করে কিনবে তাতেই হবে। আমার সমস্যা নেই আব্বু।"

--"ইনসিয়ার আব্বু, তোমার মেয়েকে বলো সব জায়গায় প্যাঁচ না খাটাতে। ছেলেটা বারবার করে বলে দিয়েছে ওকে নিয়েই শপিং করতে যাবে।", পুনশ্চঃ তহমিনা ফোড়ন কাটলো দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। সিদ্দিকী সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন এখনো তহমিনাকে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। সে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,

--"ওর তো কেউ নেই। ও একা বুঝে উঠতে পারবে না। এখন তো ওর পরিবার, স্ত্রী সবটা তুই। ওর সাথে গিয়ে বুঝে বুঝে কিনলে দু'জনে সময় কাটানো হবে, একে অপরকে একটু জানাও হবে যেহেতু এরপর থেকে সারাজীবন তার সাথেই কাটাতে হবে।"

ইন্দুবালা আর দ্বিমত করলো না, রাজি হয়ে যায়।

পরদিন সকাল দশটা নাগাদ সমির অপেক্ষা করে ইন্দুবালাদের বাড়ির সামনে। ইন্দুবালা তৈরি হয়ে বের হতেই সে মৃদু হেসে হাতে করে আনা গোলাপ ফুল দুটো এগিয়ে দেয়। ইন্দুবালা স্মিত হাসল, যেদিন থেকে দেখা হয়েছে সেদিন থেকেই এমন একটা ফুল তার জন্য বরাদ্দ থাকে। সে ফুলটি নিয়ে শুধায়,

--"কোথায় যাবেন এখন?"

সমির মৃদু হেসে বলল,

--"আপাতত কোন এক নিরিবিলি জায়গায় আপনার সাথে দশ মিনিট বসব, সময় কাটাব, আপনাকে চোখ ভরে দেখব তারপর শপিং এ যাব।"

তহমিনা ছুটে আসল তাদের কাছে। বলল,

--"দেখেশুনে ভালো করে কেনাকাটা করো, তাড়াহুড়ো নেই কোন।"

--"দুপুরের আগে আমায় বাড়ি ফিরতে হবে, মা। কাল ওদের সাজেশন দিতে হবে সময় নেই।"

তহমিনা ক্ষেপে গেল। কনুই টেনে আড়ালে নিয়ে এসে চাপা স্বরে বলল,

--"এত সাধনার পর বিয়ে হতে যাচ্ছে মোটেও ত্যাড়ামো করবি না। যা বলছি শোন, দামী দামী জিনিস কিনবি সব। আমার , মায়ের, ইনসিয়া আর ইমনের জন্য আড়ং থেকে জামাকাপড় কিনবি বুঝলি! আমার জন্য একটা ফিরোজা কালারের জামদানী কিনিস, আমার এই রঙের শাড়ি নেই। যা যা! সমীর বাবা কেনাকাটা করে আমাদের বাসায় খাবে কিন্তু।"

সমীর জবাব দিল না শুধু প্রেক্ষিতে একটু হাসল।

ইন্দুবালা যাওয়ার আগে সমিরকে বলল,

--"আপনি এখানে একটু দাঁড়ান, আমি মধুকে একটু বলে আসি।"

সে ছুটে গেল মধুমিতার বাসায়। যেকোন শুভ কাজে যাওয়ার আগে তার মধুমিতার দোয়ার প্রয়োজন পড়ে। সে কলিং বেল চাপলে দরজা খুলে গেল। খুলতেই সুবিশাল পেটানো এক অর্ধনগ্ন দেহ ভেসে উঠল। ইন্দুবালা চোখমুখ কুঁচকে বিরক্তিতে 'চ' বর্গীয় শব্দ করল। বিকৃত কণ্ঠে বলল,

--"ভাবখানা এমন—যেন জমিদারের নাতি। সেই তো মায়ের জুতোর বাড়ি খেয়ে সিগারেটের পয়সা জোগাড় করতে হয়।"

উদাম দেহে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মোত্তাকিনের হাতদুটো শর্টসের পকেটে। স্থির দৃষ্টি মেয়েটির খোঁপায় এঁটে থাকা সাদা গোলাপটির দিকে রেখে, থমথমে ভারী কণ্ঠে আক্ষেপ নিয়ে বলল,

--"ইচ্ছে করে তোকে মেরে গুম করে দেই, ইন্দু!"

ইন্দুবালা দাঁত খিচে বলল,

--"আমার ইচ্ছে করে তোর হাত পা ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখি।"

--"সেবা তুই করবি এসে? করলে দিতে পারিস হাত পা ভেঙে আমার কোন আপত্তি নেই।", মোত্তাকিন ভ্রু নাচিয়ে বলল। ইন্দুবালা তার বাহুতে ধাক্কা দিয়ে ঘরে ঢুকে যায়।

--"মধু কোথায়?"

--"মৌচাকে।", মোত্তাকিন পিছু ফিরে মেয়েটির খোঁপা থেকে টান দিয়ে গোলাপটা ছিনিয়ে নিয়ে বলল। ইন্দুবালা তেতে উঠল।

--"ফুল দে, মোত্তাকিন!"

--"যাচ্ছিস কোথায়?"

--"শপিং এ।"

--"কিসের?"

--"বিয়ের।"

--"বাহ্! শুনে খুশি হলাম।", মোত্তাকিন দাঁত কেলিয়ে বলল।

--"কিরে ইন্দু, তুই এখানে?", মধুমিতা তৈরি হয়ে বের হয়। স্কুলে যাচ্ছে। মোত্তাকিন ততক্ষণে গোলাপ ফুলটা ছিঁড়ে ফেলল! ইন্দুবালা সেদিকে আহত দৃষ্টি ফেলে মধুর কাছে এগিয়ে যায়। জড়িয়ে ধরে বিনা অনুমতিতে। নম্র সুরে বলে,

--"মধু, বিয়ের কেনাকাটা করতে যাচ্ছি, দোয়া করো!"

মধুমিতার ওষ্ঠকোনে স্নেহের হাসি ফুটে উঠল। সে মেয়েটিকে আদর আর দোয়া করে দিল। ইন্দুবালা বের হতে হতে আবার ফিরে তাকায়, দরজার কাছে মোত্তাকিন দাঁড়িয়ে আছে। মনে চলা অদ্ভুত খচখচানি দূর করতে শুধায়,

--"সেদিন রাতে কি নেশা করেছিলি?"

--"কোনদিন?", মোত্তাকিন ভ্রু নাচায়।

--"যেদিন আমার বারান্দায় গিয়ে ছ্যাঁকা খাওয়া প্রেমিকের মত উল্টাপাল্টা কথা বলছিলি।", ইন্দুবালা ব্যঙ্গ করে বলল। মোত্তাকিন থমথমে মুখে বলল,

--"আমায় ছ্যাঁকা দিতে পারবে এমন মেয়ে দুনিয়াতে জন্মায়নি। আমার কোন জিনিস পছন্দ হলে তা আমি আমার করেই ছাড়ি।"

--"তবে সেদিন নেশা করেছিলি?", ইন্দুবালা মিহি স্বরে শুধায়। মোত্তাকিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

--"হুঁ।"

ইন্দুবালা আর দাঁড়ায় না। দ্রুতপায়ে চলে আসে সেখান থেকে। সমির আর ইন্দুবালা নিরিবিলি পরিবেশের খোঁজে রমনা পার্কে এসে ঠাঁই নিলো। ইন্দুবালা হাঁটতে হাঁটতে সিমেন্টের বেঞ্চিতে গিয়ে বসল। সমির ও তার পাশে বসে ঘাড় কাত করে তাকায়। নরম সুরে শুধায়,

--"কষ্ট হয়ে গিয়েছে? কিছু খাবেন?"

ইন্দুবালা নাকোচ করে বলল,

--"একটু পানির পিপাসা পেয়েছে।"

--"আমি পানি আনছি।", সমির দুই পা এগিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসল। অনুরোধ করে বলল,

--"ইন্দুবালা আপনার কাছে ফোন হবে? আবার ফোনের ব্যালেন্স শেষ একজনকে ফোন করাটা জরুরি।"

ইন্দুবালা এক বৃদ্ধ যুগলকে দেখতে দেখতে মাথা নেড়ে সায় জানায়। সে নিজের পার্স থেকে স্মার্ট ফোনটা এগিয়ে দিতেই সমির মৃদু হেসে বলল,

--"ফোন তো এখনি আপনার লাগছে না, আমি পানি নিয়ে আসি আর একটা ফোন করে আসি।"

ইন্দুবালা মাথা নেড়ে সায় জানায়। তখন পার্কে খুব কম মানুষের যাতায়াত। ওয়ার্কিং আওয়ারের শুরু যে! আজ সে ছুটি নিয়েছে। সমির গিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে পানি আর একটা আইসক্রিম নিয়ে আসল। সেটি ইন্দুবালার দিকে এগিয়ে দিতেই ইন্দুবালা শুধায়,

--"আইসক্রিম কেন?"

--"আপনার গরম লাগছিল , আমি দেখেছি আপনি ঘেমে উঠেছেন। খেয়ে নিন ইন্দুবালা, তারপর আমরা একটু পরে শপিং এর উদ্দেশ্যে যাব। আপনাকে বউ সাজে দেখার জন্য আমি তৃষ্ণার্ত!", শেষের কথাটা বেশ গভীর শোনালো। ইন্দুবালা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সমিরের পানে। এই সুদর্শন হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রীতে সে ভরসা খুঁজতে চায়। জানতে চায় এই কথাগুলো কি আসলেই সত্যি? এগুলো শুনতে কেন তার অস্বস্তি লাগে? পড়শী ছেলেটা তো বাউন্ডুলে, স্বভাবগত ভিন্ন। তাই তার মুখের ভিন্নধর্মী সৌন্দর্যের বর্ণনা শুনতে অদ্ভুত লাগে না। কিন্তু সমীর? সমিরের মুখে এমন কথা তার শুনতে একটুও ভালো লাগে না।

--"কি হলো খান!"

ইন্দুবালা হতচকিত মাথা নেড়ে সায় জানায়। খেতে খেতে বলল,

--"আপনি খাবেন না?"

--"আমার এগুলো খাওয়ার অভ্যাস নেই, ইন্দুবালা।"

ইন্দুবালা আর কথা বাড়ালো না। পানি পান করে নীরবে আইসক্রিম খেতে লাগলো। এর মধ্যে তার মস্তিষ্কে এটা আসলো না যে তার ফোনটা এখনো দেয়নি সমির। সমির পা দোলাতে দোলাতে প্রকৃতি দেখছিল একটাসময় অনুভব করল তার কাঁধের উপর কারোর নিস্তেজ অস্তিত্ব। সমীর ঘাড় কাত করে তাকায় কাঁধে নিস্তেজ শুয়ে পড়া ইন্দুবালার দিকে। আইসক্রিমটা বলহীন হাত থেকে খসে নিচে পড়ে গেল। সমিরের ওষ্ঠকোনা অলস গতিতে বেঁকে যায়। সে এক পলক আশেপাশের মানবশূন্য পরিবেশের দিকে তাকিয়ে ইন্দুবালাকে কোলে তুলে নেয়‌। গেট থেকে বের হতে গেলে দারোয়ান পথ আঁটকে দাঁড়ালো। শুধায়,

--"কি হয়েছে ওনার?"

সমির মৃদু উদ্বিগ্নতার সাথে বলল,

--"আমার স্ত্রী, অসুস্থ হয়ে পড়েছে। দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। একটু সাহায্য করুণ ভাই!"

দারোয়ান ও মানবতার স্বার্থে সমিরকে সাহায্য করল ইন্দুবালাকে গাড়িতে তুলতে।

~চলবে~

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন