ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেম বর্ণহীন

২৩তম পর্ব

লেখক: তোনিমা খান

#প্রেম_বর্ণহীন

#তোনিমা_খান

#অন্তিম_পর্ব

নিজেকে আজ আরেকবার কোন অভাগী মনে হয় ইন্দুবালার। যার ভাগ্যে সুখ কখনো স্থায়ী হয় না। তার মতো কি তার সন্তানটির কপালেও সুখ জুটবে না? ভীষণ যন্ত্রণাদ্বায়ক ভাবনায় ইন্দুবালার চোখের কার্নিশ ফের ভিজে ওঠে।

ভালোবাসা, সম্মানের জন্য তৃষ্ণার্ত অন্তঃস্থল পেয়েও সবটা হারিয়ে ফেলার ভয়ে গুমড়ে মরছে। একটাসময় মস্তিষ্কের অসহনীয় প্রদাহ আর দমবন্ধকর অনুভূতির তাড়নায় ইন্দুবালা খোলা জানালা দিয়ে মাথা বের করে দেয়। সমীরণের শীতল ঝাপটায় বুকভরা শ্বাস নিয়ে নেত্রদ্বয় বন্ধ করে নেয়। পেটে আলতো হাত বুলাতে বুলাতে ফিসফিসিয়ে বলে,

–“প্লিজ, মোত্তাকিন সুস্থ সবল ফিরে আয়।”

অনু ম্লান চোখে দেখে চলছে ইন্দুবালাকে। মেয়েটির অন্তঃস্থলে যে অচিরেই গড়ে উঠেছে হারিয়ে ফেলার ক্লেশ আর ভয়ের এক বিশাল পাহাড়! যেই দুঃখের পাহাড় ঠিক মেঘের মতো মিলিয়ে যাবে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে মোত্তাকিনের মুখ দেখবে!

অনু ইন্দুবালার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে শাশুড়ির দিকে দৃষ্টি রাখে। মায়ানকে বুকে জড়িয়ে তন্দ্রায় বিভোর হয়ে আছে। সে টলটলে নেত্রে ছেলের মুখটি দেখে বিড়বিড় করে,

–“আপনি ছাড়া এই পৃথিবীতে আমার কেউ নেই, মিরসাদ! আমায় মতো আমার ছেলেটাকে এতিম করে দেবেন না।”

তূর্য যত দ্রুত পারছে গাড়ি চালাচ্ছে। পাশেই তার দলের আরেকটা ছেলে বসে আছে। কিন্তু তার মনে হলো দুটো গাড়ি তাকে বহুক্ষণ যাবৎ অনুসরণ করছে। সে মিরর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ব্যপারটাকে ক্ষতিয়ে দেখার চেষ্টা করল। সে পথ ঘুরিয়ে অন্য পথে ঢুকলো। তার সন্দেহ সঠিক হয়। গাড়ি দু'টো ও তাকে অনুসরণ করে ঠিক ঐ পথেই ঢোকে। ঘেমে ওঠে তূর্য! ইন্দুবালার দিকে এক পলক তাকিয়ে সতর্ক কণ্ঠে বলল,

–“ভাবিজান, জানালা থেকে মাথা ঢুকিয়ে বসুন। আর জানালাটা তুলে দিন।”

–“আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে, তূর্য। জানালা বন্ধ করে দিলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়ে যাবে।”

তূর্য কথা বাড়ায় না। সে গাড়ির গতি আরো বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

–“তবে মাথা ঢুকিয়ে বসেন ভাবিজান। আর সাবধানে বসুন আমি গাড়ির স্পিড বাড়াচ্ছি।”

অনু ফিরে তাকায় তূর্যর দিকে। সন্দিগ্ধ কণ্ঠে শুধায়,

–“কিন্তু তুমি এমন বলছ কেন?”

–“আমার মনে হচ্ছে কেউ আমাদের অনুসরণ করছে বড় ভাবিজান। আমার যেকোন মূল্যে আপনাদের সহিসালামত কোন নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।”, তূর্য যতোই স্পিড বাড়ায় না কেন ঐ লোকগুলো থেকে পিছু ছোটাতে পারে না। ভয় পেয়ে যায় তূর্য! তারা দু'জন এত মানুষের সাথে মোকাবেলা করে পেরে উঠবে না। অনু ভয়ার্ত দৃষ্টি ফেলে ইন্দুবালাকে আগলে নেয় নিজের সাথে। ইন্দুবালা ফিরে তাকায় তূর্যর দিকে। চিন্তিত কণ্ঠে শুধায়,

–“কিন্তু কেউ কেন আমাদের অনুসরণ করবে তূর্য? আর করলেও কারা তারা?”

–“আমি কিছু জানি না ভাবিজান। ভাই শুধু বলছে আমাদের একটু সাবধান থাকতে হবে কিছু মানুষের থেকে।”

–“সেই মানুষ গুলো কারা তূর্য?”

–“আমি সত্যিই জানি না ভাবিজান।”

–“তুমি মিথ্যা বলছ তূর্য!”, ইন্দুবালার দৃঢ় কণ্ঠে তূর্য মুখ লুকিয়ে ড্রাইভিং এ মনোযোগ দেয়। চলতে চলতেই পুলিশের গাড়ির সাইরেন শুনতে পেল সে। তাদের পাশ ঘেঁষে একটা পুলিশের গাড়ি চলতে দেখে তূর্য ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল। অন্তত শহর থেকে বের হওয়া পর্যন্ত দূর্গম পথটুকু পাড়ি দিতে পারলে সে নিশ্চিন্ত হবে।

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থির হয়ে পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ক্ষতি পূরণের চেষ্টা করা হবে বলে আশ্বাস দিলেও সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ। জনমনে ক্ষোভ ও হতাশা।

--"যারা আমাদের শহর চালায়, তারাই যদি চোর হয়, তাহলে আমরা কাকে বিশ্বাস করব?"

সরকারপন্থী কিছু চ্যানেলগুলো একের পর এক একটাই খবর হাইলাইট করে যাচ্ছে।

--"দুর্নীতির কেলেঙ্কারির মধ্যে সিটি মেয়র মুহিত ইরতেজা আর তার পরিবার পালিয়ে গেছেন। এতে পরিষ্কার মুহিত ইরতেজা দুর্নীতিবাজ নেতা।"

বিল্ডারের উপর আর কোনপ্রকার আইনি চাপ থাকে না। প্রতিটা সংবাদ মাধ্যম এটাই আশ্বাস দিচ্ছে পুলিশ মুহিত ইরতেজা আর তার পরিবারকে তারা যেকোন মূল্যে খুঁজে বের করবে। জনসাধারণের এত টাকা তারা যেভাবেই হোক উদ্বার করবে।

ধূলোজমা দেয়ালে এঁটে থাকা টিভির স্ক্রিনের দিকে এক দৃষ্টিতে রইল মুহিত ইরতেজা। চেয়ারে বেঁধে রাখা হাত পা এতক্ষণ মুক্তির জন্য জোর খাটালেও দেহ আর সায় দেয় না। বাঁধা হাত পা নিয়ে বলহীন পড়ে থাকে চেয়ারে। পাশের চেয়ারেই বেঁধে রাখা মিরসাদের নত শির এর কপাল বেয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে বিন্দু বিন্দু রক্ত মেঝে ছুঁয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে ঝাঁপসা অনুভব হতেই মিরসাদ ব্যর্থ প্রচেষ্টা করা ছেড়ে দেয়।

ডেস্কের দুই প্রান্তে গম্ভীর মুখে বসে থাকা বশির আর উত্তরের মেয়র সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে বাঁকা চোখে তাকায় বাপ ছেলেকে হাল ছেড়ে দিতে দেখে‌। বশির তাচ্ছিল্য হাসল। বিদ্রুপ করে বলল,

--"জোর কাজ করছে না? কাজ করবে না তো মুহিত ভাই, আপনার জোর তো ভেঙেছে আপনার আপন ছেলে।"

বলেই খিক খিক করে হেসে উঠল বশির। পুনরায় ভীষণ উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,

--"জানেন এই পাঁচ বছর হয়ে যাচ্ছে আপনার ছেলে মোত্তাকিন আপনাকে মারার জন্য আমার সঙ্গ দিচ্ছে। আপনার ছেলেকে লোক দিয়ে মারানো আর নিজে হিরো সেজে বাঁচানো ও ওর পরিকল্পনা ছিল। যেন আপনাদের সহানুভূতি পেতে পারে। দেখুন পেয়েও গিয়েছিল। নয়তো কোন যাচাই বাছাই ছাড়া কেউ এতবড় সরকারি টেন্ডার আমার হাতে ছেড়ে দেয়? যেখানে বিগত চার বছরে আমি আপনার থেকে একটা টেন্ডার নিতে পারিনি। বলতে হবে আপনি আপনার ছেলেকে ভীষণ ভালোবাসেন। আর এই ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে আপনাকে তো কিছু দেয়া উচিৎ বলুন? তাই আমি ঠিক করেছি আপনাকে আপনার ছেলের হাতেই মারাবো! ভীষণ মজা হবে বলুন? ছেলের হাতে মরলে কষ্ট মনে হয় একটু কম লাগবে।"

ফের অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বশির আর উত্তরের মেয়র। মিরসাদ দূর্বল আঁখি খুলে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে ধূলোময় মেঝেতে। শত্রুর থেকে দশটা আঘাত যতটা না ব্যথা দেয়, আপন মানুষের একটা আঘাত তার থেকে দ্বিগুণ যন্ত্রনা দেয়। প্রথমদিন থেকে এই পর্যন্ত সবটা নাটক, ঘৃণা ছিল ভাবতেই মিরসাদ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে তো এক মুহুর্ত পূর্বেও ভাইয়ের প্রতি বিশ্বাস ধরে রেখেছিল। মুহিত ইরতেজার হস্তদ্বয় খানিক কেঁপে উঠল। কর্নকুহরে নিদারুণ প্রদাহ সৃষ্টি করে বশিরের এক একটা কথা। অবিলম্বে

বয়সের ছাপে কুঁচকে যাওয়া নেত্রের কার্নিশ বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। বিগত আটাশ বছরের সকল অনুভূতি কেমন ফিকে পড়তে লাগল। সে জীবনের সব পর্যায়ে মা-ছেলের কাছে একটু ক্ষমা আর ভালোবাসা চেয়েছে; অথচ সে ভাবতেই পারেনি তার সন্তান তাকে এতটা ঘৃণা করে—যে তাকে মারার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি।

--"আপনি কি কাঁদছেন মুহিত ভাই?"

উত্তরের মেয়র ধীরস্থির হেঁটে মুহিত ইরতেজার কাছে আসে। চেয়ারের দুই হাতলে হাত রেখে মুখের উপর নুইয়ে যায়। প্রসন্ন কণ্ঠে বলল,

--"কাঁদা উচিৎ! শুনেছি আপনি না-কি কট্টর রাজনীতিবিদের মতো একজন কট্টর প্রেমিক ও। মোত্তাকিনের মাকে পছন্দ হয়েছিল বলে ছল করে বিয়ে করেছেন‌। আপনাদের ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে বহু কেলেঙ্কারির শুনেছি। যেই ভালোবাসার জন্য এত ছল, এত বিশ্বাস সেই ভালোবাসাই আজ আটাশ বছর ধরে আপনাকে কষ্ট দিচ্ছে। আজ তো আপনার নিজের সন্তান আপনাকেই নিঃস্ব করে দিয়েছে। একের পর এক টেন্ডার যখন ছিনিয়ে নিতেন তখন আমার নিজেকে কোন অথর্ব মনে হতো! ঠিক এমনি একটা করুণ পরিণতি চেয়েছিলাম আমি। কিন্তু বুঝতে পারিনি সেটা এভাবে পেয়ে যাব! যেদিন জেনেছি মোত্তাকিন আপনার ছেলে বিশ্বাস করুন আমার থেকে খুশি কেউ হয় নি। আপনাকে আপনার ছেলের হাতে মরতে দেখার জন্য আমি তৃষ্ণার্ত! এরপর এই পদ আমার ভাইয়ের হবে। আমরা দুই ভাই হবো দক্ষিণ আর উত্তরের সিটি মেয়র।"

নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কল্পনা করেই উল্লাসে ফেটে পড়ে উত্তরের মেয়র।। মুহিত ইরতেজা ঘাড় কাত করে মিরসাদের আঘাতপ্রাপ্ত রক্তাক্ত অবস্থা দেখে টলটলে নেত্রে বশির আর উত্তরের মেয়রের দিকে তাকায়। অনুনয় করে বলে,

--"তোমাদের শত্রুতা আমার সাথে। আমায় মেরে ফেলো কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমার ছেলেটাকে ছেড়ে দাও। ও আমার কোন কাজের সাথে কখনো জড়িত ছিল না আর না আছে।"

--"আমি আপনার ছেলেকে ছেড়ে দিলেও আপনার ছেলে আমায় ছেড়ে দেবে না, মুহিত ভাই। রিল্যাক্স! জীবনে পিছুটান একদম গোড়া থেকে উপড়ে ফেলতে হয়। শুধু আপনি আর আপনার ছেলে না, আপনাদের গোটা পরিবারকে নিঃশেষ করে দেব আমি। ইরতেজা পরিবারের কোন অস্তিত্বই থাকবে না। সবাই ভাববে মুহিত ইরতেজা আর তার পরিবার পালিয়ে গিয়েছে শাস্তির ভয়ে।"

উত্তরের মেয়রের কথায় বশির ফের খিক খিক করে হেসে উঠল। অতি উত্তেজনায় চেঁচিয়ে বলে,

--"এই মোত্তাকিন আর তার পরিবারকে এখনো আনছে না কেন? পারভেজ? কোথায় তুই?"

মুহিত ইরতেজা আর মিরসাদ চমকায় পরিবারের কথা শুনে। মিরসাদ ছটফট করে ওঠে মধুমিতা মা, অনু, মায়ান আর গর্ভবতী ইন্দুবালা এরা তো নির্দোষ! সে ছটফট করতে করতে অস্থির চিত্তে অনুনয় করে বলে,

--"এই ভাই, আমি তোমার কাছে হাত জোড় করছি ওদের কিছু করো না। তোমরা আমাদের মেরে ফেলো, আমি তোমায় কথা দিচ্ছি ওরা কেউ টু শব্দ করবে না। ওরা দূরে কোথাও চলে যাবে, প্লিজ।"

মিরসাদ কথা শেষ করার সাথে সাথেই প্রকাণ্ড মুষ্ঠিঘাতে ফের নুইয়ে পড়ে তার দেহ। বশির তার চোয়াল চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে,

--"তোদের একটাকেও ছাড়ব না। তুই আর তোর বাপ তো যা করার করেছিস! কিন্তু তোর ঐ সৎ ভাই! ও আমায় পাঁচটা বছর নাকে দড়ি বেঁধে ঘুরিয়েছে। ও না-কি মুহিত ইরতেজার কিছু হয় না! শালা নিমোকহারাম! ওটাকে আরো বিশ্রী মৃত্যু দেব।"

গোডাউনের বাহিরে পায়চারী করতে থাকা পারভেজ ত্রস্ত পায়ে ঢোকে গোডাউনের ভেতরে। মিরসাদ আর মুহিত ইরতেজার দিকে বাঁকা দৃষ্টি ফেলে বিনম্র কণ্ঠে বলল,

--"ভাই, পথেই আছে। দশ মিনিটের মধ্যে চলে আসবে।"

--"তোকে এত চুপচাপ লাগছে কেন পারভেজ?", বশির সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে এগিয়ে আসে‌। পারভেজ ফাঁকা ঢোক গিলে জোরপূর্বক হেসে বলে,

--"না না ভাই তেমন কিছু না। এমনিতেই আজ একটু জ্বর জ্বর!"

বশির কুটিল হাসল। পারভেজের কাঁধ চাপড়ে বলল,

--"আমি জানি পারভেজ তোর বুক পুড়ছে বন্ধুর জন্য। সমস্যা নেই তোর বুক পোড়া কমাতে আমি আছি তো।"

পারভেজ ঘেমে উঠল। কৃত্রিম হেসে দ্রুত বেরিয়ে যায় গোডাউন থেকে। মাথা ঘুরছে তার! মোত্তাকিন এতদিন যাবৎ কেন এত শান্ত, নিশ্চিন্ত ছিল সে জানে না। তবে মোত্তাকিনের যদি কোন পরিকল্পনা না থাকে সেও বাজেভাবে মারা পড়বে। রাগে মাথার চুল টেনে ধরে পারভেজ!

--"মোত্তাকিন মোত্তাকিন! শালা তুই কি করলি? কেন নিজের সাথে আমায় ও এত বাজেভাবে জড়ালি?"

গোডাউনের সামনে দ্রুতগতির একটি গাড়ি থামতেই পারভেজ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যায় সেদিকে। মোত্তাকিন আঁটসাঁট চোয়ালে বেরিয়ে আসে দরজা খুলে। পারভেজ তার বাহু চেপে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

--"সবটা শেষ মোত্তাকিন! এখন কিছু করার নেই। এই যে দুয়ার দেখছিস এটা দিয়ে ঢুকলে লাশ ছাড়া আর কিছু বের হতে পারবে না।"

মোত্তাকিন প্রত্যুত্তর করে না শুধু শান্ত দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে থাকে। পারভেজ রাগে দুঃখে ফেটে পড়ে বলে,

--"তোর জন্য আজ সবটা শেষ! সারাদিন ঘারামি! আমিও আজ প্রাণ হাতে নিয়ে বের হতে পারব না, বশির ভাই আমাকেও ঘাতকের তালিকায় উঠিয়ে দিয়েছে। আর না তোর পরিবারকে ছাড়বে।"

মোত্তাকিন তার উদ্বিগ্নতার প্রেক্ষিতে বড্ডো শান্ত স্বরে বলল,

--"শেষ থেকেই শুরু হবে এক নতুন সমাপ্তির!"

পারভেজ কপাল কুঁচকে নেয়। শালা মৃত্যুর দুয়ারে বসে জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করছে। সে দাঁত খিচে বলল,

--"নিজেকে ফিনিক্স ভাবিস যে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে আবার জন্ম নেয়।"

মোত্তাকিন দৃষ্টি চকচক করে উঠল। ধিমি কণ্ঠে বলল,

--"বাঁচতে হলে ফিনিক্স পাখির মতো বাঁচতে হবে। যেখানে শেষ সেখান থেকেই সবটা আবার শুরু। একটা নতুন প্রারাম্ভ!"

তন্মধ্যেই প্রবেশদ্বারে থাকা দু'জন লোক মোত্তাকিনের কাছে এগিয়ে আসে। পারভেজ উদ্বিগ্নতা সামলে একটু দূরে সরে যায়। তারা মোত্তাকিনের আপাদমস্তক চেক করে। হঠাৎ করেই একজন গার্ডের হাত থেমে যায় মোত্তাকিনের কোমড়ের কাছে। গার্ডটি শান্ত তবে ক্রুর দৃষ্টি ফেলল তার দিকে। মোত্তাকিন পারভেজের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তার দিকে শান্ত চোখে তাকায়। লোকটি এক ঝটকায় কালো অস্ত্রটি বের করে নিয়ে চাপা আক্রোশে ফেটে পড়ে বলে,

--"ভেতরে ছাব্বিশটা পি"স্ত"ল রয়েছে, চারটা রা"ম"দা রয়েছে। তোর এই একটা পিস্তল সেগুলোর সামনে দেখতে বেজায় হাস্যকর লাগবে।"

--"তবে এটা রেখে দে তুই! এমনিতেও এটা আমার লাগছে না।", মোত্তাকিন গটগট করে ভেতরে চলে যায়। পারভেজ সে পথে চেয়ে অতি দুঃখে গা দুলিয়ে হেসে উঠল। পিস্তলটির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে,

--"শালার মাদারবোর্ড! এটা বুঝি ওর পরিকল্পনা?একটা পিস্তল নিয়ে এসেছে নিজের বাপ ভাইকে বাঁচাতে।"

--"তোর পিস্তল তোকে দিতে এনেছি। তোকে কে বলেছে আমি আমার বাপ ভাইকে বাঁচাতে একটা পিস্তল নিয়ে এসেছি?"

গুরুগম্ভীর কণ্ঠে পারভেজ কপাল কুঁচকে পিছু ফিরে তাকায়। পকেটে হাত গুঁজে মোত্তাকিন সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে রুক্ষ কণ্ঠে খেকিয়ে উঠে বলল,

--"কি এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? নাকি মরতে আমায় ছাড়া যাবি না। চিন্তা করিস না আমায় এমনিতেও বশির ভাই জীবিত ছাড়বে না।"

প্রেক্ষিতে মোত্তাকিন কোনরূপ বাক্য বিনিময় করে না হাত বাড়িয়ে পারভেজের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে। একটা ফিল্টার বের করে তাতে আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে ভেতরে ঢুকে যায়। লম্বা পথ! দারুণ জায়গা বেছে নিয়েছে বশির ভাই! আন্ডার গ্রাউন্ডের ভেতর থাকা একটা গোডাউন। যেতে যেতে লম্বা লম্বা টানে তার সিগারেট শেষ হয়ে গেল। সিগারেট খাওয়া ত্যাগ করেছে কিন্তু ভুলে যায়নি। আজো সেই দারুণ অনুভূতি কাজ করে সিগারেট হাতে নিলে। প্রথম প্রেম বলে কথা!

মোত্তাকিনের নিরুদ্বেগ শান্ত মুখশ্রীতে সরব ক্ষিপ্র লহরীর ন্যায় আঁছড়ে পড়ল বিশ্বাসঘাতকতার করুণ চাহনি। মোত্তাকিন দৃষ্টিতে দৃষ্টি স্থির রাখতে পারে না। দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। উত্তরের মেয়রের চোখেমুখে হিংস্রতা ফুটে উঠল তাকে দেখেই। বশির তাকে দেখেই হড়বড়িয়ে এগিয়ে আসে। কাঁধ চাপড়ে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধায়,

--"কোথায় কোথায় তোর পরিবার কোথায়? মিরসাদ ইরতেজার বউ বাচ্চাকেও তোদের বাড়িতে পাঠিয়েছে তাই না? কোথায় তারা?"

মোত্তাকিনের পিছু পিছু আসা একজন লোক ব্যর্থতার সুরে বলল,

--"ভাই, ঘরে ও ব্যতীত কেউ ছিল না। কিন্তু আপনি চিন্তা করবেন না..."

লোকটি বাক্যটি পূরণ করতে পারে না তার আগেই বশির তাকে সপাটে এক লাথি মেরে দূরে ছিটকে ফেলে। রাগে ফেটে পড়ে বলে,

--"মশকরা করিস আমার সাথে? কোন কাজের না! আমাদের হাতে সময় কম। এই কটাকে মেরে দাফন করতে হবে তাড়াতাড়ি।"

সে পুনরায় ছুটে আসে মোত্তাকিনের কাছে। এক হাতে কাঁধ আঁকড়ে তাড়া দিয়ে বলল,

--"মোত্তাকিন, ভাই সত্যি করে বলতো কোথায় লুকিয়েছিস পরিবারকে? তাড়াতাড়ি বল, ভাইয়ের হাতে সময় কম। তুই তো তোর ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য এতদিন নিরলস কাজ করে গিয়েছিস। আজ আরেকবার কর! তাড়াতাড়ি বল! বলতে বলেছি কু"ত্তা"র বাচ্চা!"

শেষের হিংস্র হুঙ্কারে কেঁপে উঠল গোডাউনের নিস্তব্ধ গুমোট পরিবেশ। মোত্তাকিন ফাঁকা ঢোক গিলে শুধু শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ভীষণ ঠান্ডা গলায় বলে,

--"পরিবার নিয়ে কথা বলবেন ভাই। তাদের কোন সম্পৃক্ততা ছিল না এসব কিছুর সাথে। তবে কেন আমার পরিবারকে টানছেন?"

বশির হিংস্র হস্তে তার কলার চেপে ধরে কিছু বলার জন্য উদ্বত হলে উত্তরের মেয়র তার কাঁধ আঁকড়ে ধরে থামিয়ে দেয়। ইশারায় শান্ত হতে বলে নিজের ফোনটা তুলে ধরে তার চোখের সামনে। সহসা বশির শান্ত হয়ে গেল। মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দেয় মোত্তাকিনকে। হাস্যোজ্জ্বল মুখে মোত্তাকিনের চেপে ধরা কুঁচকানো শার্ট ঠিক করে দিতে দিতে বলল,

--"আচ্ছা, টানছি না। যা এবার হাতের কাজটা সেরে ফেল তাড়াতাড়ি। দেরি করিস না। এখান থেকে একটা কিছু তুলে নে। কোনটা দিয়ে তোর মারতে সুবিধা হবে?"

বশির টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখা একাধিকবার অস্ত্র দেখিয়ে বলল। মোত্তাকিন সেদিক থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে এনে বলল,

--"তাদের মারছেন কেন ভাই? আপনার টেন্ডার চাই আপনি সেটা যেকোন উপায়ে পেয়েছেন! টেন্ডার বাবদ পঞ্চাশ কোটি টাকাও আপনি পেয়েছেন তবে আর কি?"

বশির রাগে ফেটে পড়ে ফের তার কলার চেপে হিসহিসিয়ে বলল,

--"শুধু পঞ্চাশ কোটি টাকা নেয়া আমার লক্ষ্য কোনদিন ছিল না, এটা তুই ভালো করে জানিস। আমার সিটি মেয়রের পদ চাই! এটাকে না সরিয়ে সেটা কোনদিন সম্ভব হবে না। তাই আগে ওকে আর ওর পরিবারকে নিঃশেষ করব তারপর আমি আমার লক্ষ্য পূরণ করব।"

--"এতগুলো খু"ন করার পর আইন আপনাকে ছেড়ে দেবে?"

--"আইন?", বশির খিক খিক করে হেসে উঠল।

--"আইন এমনিতেই আমাদের দিকে আছে। আর তুই কি ভাবিস আমার ভাইয়ের কোন ক্ষমতা নেই? এমন আইন উপর মহলের নেতারা হাতের ইশারায় ওঠে আর বসে।"

--"কোন উপর মহলের নেতা ভাই?"

সর্বদা কম বলা ভীষণ চতুর ছেলেটির অযৌক্তিক অযৌক্তিক কথায় উত্তরের মেয়ের ভ্রু কুঁচকে গেল। এই ছেলেটিকে তার কোনকালেই সিদেসাধা মনে হয়নি। দাম্ভিকতায় হুঁশ হারা বশির নাম বলতে যাবে তার আগেই উত্তরের মেয়র হুঙ্কার ছাড়ল।

--"এসব কথা বলার সময় নেই, বশির। ওকে সোজাসাপ্টা যা করতে বলছি তা করতে বল। নয়তো আমি অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করব। হাতে সময় কম।"

বশিরের হুঁশ ফিরে। সে তড়িঘড়ি করে মাথা নেড়ে বলল,

--"হ্যাঁ, হ্যাঁ এই মোত্তাকিন নে, কোনটা দিয়ে মারবি? এটা নে গ্লক নাইন্টিন! ছোট হলেও মাজল ভেলোসিটি দূর্দান্ত! ট্রিগার প্রেস করতে দেরি আছে সম্মুখের মানুষটার বুক চিরে বের হতে দেরি নেই। এত দ্রুতগামী। পনেরোটা বুলেট দিয়ে বাপ ছেলে কেন পুরো পরিবার কুপোকাত হয়ে যাবে।"

মিরসাদ আর মুহিত ইরতেজা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভবঘুরে ছেলেটির দিকে। একবারের জন্যও তাদের চোখে চোখ না রাখা ছেলেটিকে এখন মনে হচ্ছে ভীষণ অচেনা, অজানা ভয়ঙ্কর কেউ! কেমন মনোযোগ সহকারে অস্ত্রটাকে ছুঁয়ে দেখছে। নিজের ছেলের হাতে খুন হতে হবে? এই পর্যায়ে এসে মুহিত ইরতেজার ভেতরটা তীব্র প্রদাহ অনুভব করে। ব্যথায় ক্রমশই দেহ খিচে নেয়। স্ত্রী সন্তান ভালোবাসা নাই বা দিল কিন্তু প্রেক্ষিতে এত ঘৃণ্য অনুভূতি কেন দিল?

--"কি হলো কি দেখছিস? নিশানা ঠিক কর মোত্তাকিন।", বশির তাড়া দেয়। মোত্তাকিন শুকনো ঢোক গিলে চোখ তুলে তাকায়। সুদৃঢ় কণ্ঠে বলে,

--"আমি গান চালাতে পারি না, ভাই।"

বশির ক্রুর হাসল। বিদ্রুপ করে বলল,

--"গান চালাতে পারিস না অথচ পকেটে করে গান নিয়ে এসেছিলি। মশকরা করিস না মোত্তাকিন। আমার হাতে সময় কম। সেট ইয়োর এইম এন্ড জাস্ট শ্যুট!"

মোত্তাকিন তবুও অনঢ় কণ্ঠে বলল,

--"আমি শুধু আপনার দলে কাজ করতাম ভাই, কিন্তু কখনো খু"ন খারাপি করিনি। আমি এটা কোনদিন করব না, ভাই।"

--"তুই করবি, মোত্তাকিন। নয়তো তোর পরিবার আর তুই কেউ রেহাই পাবি না আমার থেকে।", বশির হিসহিসিয়ে বলল।

পরপরই দ্বিগুণ উত্তেজনা নিয়ে বলল,

--"মুহিত ইরতেজা আমার কিছু হয় না, মুহিত ইরতেজা আমার কিছু হয় না—এটা শুনতে শুনতে আমার কান জ্বালা করছে, মোত্তাকিন। তাই এটা তোর শাস্তি স্বরূপ! তোর যখন কেউ হয় না তখন তোর হাত কাঁপছে কেন তার দিকে গান তাক করতে? আমায় রাগাস না, মোত্তাকিন। তোর বউ গর্ভবতী! কয় মাস চলছে যেন? বাচ্চা নড়ছে? বাপ, দাদার কর্মফলের কারণে তোর অনাগত সন্তানটিকে মারতে আমার সত্যি হাত কাঁপবে! তাই বলছি তাড়াতাড়ি শ্যুট কর।"

নিজের অনাগত সন্তানকে দ্বিতীয়বার কারোর মুখে মারার কথায় মোত্তাকিনের শান্ত নেত্রদ্বয় ধপ করে অগ্নিশিখার ন্যায় জ্বলে ওঠে ক্রোধের অনলে। গান আঁকড়ে ধরা নড়বড়ে হাতটি অবচেতনেই শক্ত করে আঁকড়ে ধরে গানটি। বশিরের হিংস্র নেত্রে নেত্র স্থির রেখে সতর্কতার সাথে বলে,

--"হুঁশ ভাই হুঁশ! আমার বাবুর কথা আপনার এই মুখে নেবেন না। ও আল্লাহর পাঠানো সবচেয়ে পবিত্র সত্তা আমার জন্য। ওকে কোন নোংরা কিছু আমি কোনদিন ছুঁতে দেব না, সেখানে আঘাত দেয়া তো বিলাসীতা! আমায় রাগাবেন না, ভাই। আমার স্ত্রী সন্তানের জিকির আমি কারোর মুখে শুনতে পারি না। অথচ আপনারা তাই বারবার করেন। ভাগ্যিস আল্লাহ ওটা আমার বাচ্চা হিসেবে পাঠাচ্ছেন! তার মায়ের গর্ভ থেকে শুরু করে পৃথিবীর প্রতিটা স্থানে তাকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য আমি দুনিয়া উল্টে দিতে পারি।"

পারভেজ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল মৃত্যুর দুয়ারে থেকে ফাপড় নেয়া বন্ধুর দিকে। ভয়, আতঙ্ক ভুলে যায় সে!

রাত গভীর হচ্ছে ক্রমেই! উত্তরের মেয়রের এবার ধৈর্য্য বাঁধ ভাঙা হয় সম্মুখের বাক বিতণ্ডা দেখে। সে ডেস্ক ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। পকেটের ফোনটা বের করে স্ক্রিনটা মোত্তাকিনের দিকে তুলে ধরে ডাকে,

--"মোত্তাকিন।"

মোত্তাকিন দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকায়। দৃষ্টি শকুনের ন্যায় তীক্ষ্ণ শানিত হয়ে যায় ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা চলন্ত গাড়ির জানালা থেকে মাথা বের করে উদাসীন চিত্তে বসে থাকা ইন্দুবালাকে দেখে। ডান হাতে চেপে ধরা গানটি শক্ত হয়ে এঁটে যায় মুষ্টির মাঝে। মস্তিষ্ক ক্রমেই নিজের ভারসাম্য হারায় অতিরিক্ত রাগ চেপে রাখতে রাখতে। স্ক্রিনে ভেসে থাকা কালচে অতি প্রিয় মুখপানে স্থির দৃষ্টি রেখেই সে বাম হাতে শার্টের চতুর্থ বোতামটা ছিড়তে লাগল মন্থর গতিতে।

উত্তরের মেয়র সোজাসাপ্টা স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,

--"তুই মারবি, অবশ্যই মারবি, তোকে মারতেই হবে। নয়তো তোর এই অতিপ্রিয় স্ত্রী সন্তানের-ই কোন অস্তিত্ব থাকবে না, মোত্তাকিন। এটা কে দেখ তো! তোর বউ সহ পরিবার আমাদের হাতের নাগালে। এটা তোর বউ না-কি? অন্ধকারে তো দেখা যাচ্ছে না...কাকের মতো কা..."

আচমকাই উত্তরের মেয়রের হুমকিস্বরূপ অসম্পূর্ণ বাক্য গগনবিদারী আর্তচিৎকারে পরিণত হয়, হাত থেকে ছিটকে পড়ে যায় ফোনটা। ঘটনার আকস্মিকতায় বশির সহ উপস্থিত সকলে চমকে তাকালো মোত্তাকিনের দিকে। শকুনী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ছেলেটির হাতের তাক করা গানটি থেকে তখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে। মোত্তাকিন উগ্র হাতে গায়ের শার্টটা টেনে খুলে ফেলল। পাগলা ঘোড়ার ন্যায় তেড়ে যায় বাহু চিরে রক্তের ফোয়ারা ঠিকরে বের হওয়া হাত চেপে ধরে চিৎকার করতে থাকা উত্তরের মেয়রের দিকে। উগ্র হাতে কলার চেপে ধরে হাতের গানটা দিয়ে ক্ষিপ্র গতিতে তার মাথায় একের পর এক আঘাত করতে করতে হিসহিসিয়ে বলে,

--"কু"ত্তা"র বা"চ্চা! তোদের কতবার বারণ করেছি আমার বউ বাচ্চা নিয়ে কথা বলবি না? তোর সাহস কি করে হয় আমার বউকে কাক বলার? আজ জনমের জন্য তোদের মুখ বন্ধ করব।"

গানের উল্টোপাশ দিয়ে অনবরত আঘাতে থেঁতলে দেয়া বড় ভাইয়ের বিবর্ণ মুখশ্রী দেখে বশির দ্রুত গান হাতে তুলে নিয়ে সপাটে এক আঘাত বসায় মোত্তাকিনের মাথা বরাবর। মোত্তাকিনের উন্মাদনায় মৃদু বিঘ্ন ঘটলেও কিন্তু তাকে অচল করতে পারেনি। মোত্তাকিন ফের তেড়ে উঠতেই বশির ঠিক তার কপাল বরাবর গানের নল ঠেকায়। সাবধানি কণ্ঠে বলে,

--"একটু নড়লেই পুরো পনেরোটা রাউন্ড তোর মাথায় শেষ করব, মোত্তাকিন। একদম সাবধান!"

মোত্তাকিন স্তম্ভের ন্যায় স্থবির হয়ে গেল। কপাল বেয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়া রক্তের ফোয়ারা গাল বেয়ে নামছে মন্থর গতিতে। দৃষ্টি ঝাঁপসা হয়ে আসলেও একটুও প্রশ্রয় দেয় না দূর্বলতাকে। দূর্বল হলে চলবে না! বশিরকে অবাক করে দিয়ে সে পাল্টা গান তাক করে ঠিক তার বুকের হৃদযন্ত্র বরাবর। তা দেখে বশির অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বলল,

--"একটু নিজের চারপাশে তাকা তো, মোত্তাকিন। এখানে মোট আঠারো জন আছে। প্রত্যেকের হাতে একটা করে গানে যদি পনেরোটা করে রাউন্ড থাকে তবে মোট কয়টা রাউন্ড হয়? একটা গানের রাউন্ড ও লাগবে না তোকে শেষ করতে।"

--"আপনার দুইশো সত্তরটা রাউন্ড আমার চৌদ্দটা রাউন্ডের কাছে ভীষণ ঠুনকো পড়বে, ভাই।", মোত্তাকিনের সুদৃঢ় কণ্ঠে বশির অবাক হওয়ার ভান করে। অবাক কণ্ঠেই বলে,

--"তাই না-কি? এই ও কি বলল শুনলি তোরা? আঠারোটা গানের মধ্য থেকে ও নাকি আমায় গুলি করবে। আচ্ছা , ঠিক আছে তুই পারলে আমার গায়ে একটা গুলি করে দেখা।"

বশির উৎসুক নয়নে তাকিয়ে বলতে দেরি আছে মোত্তাকিনের শ্যুট করতে দেরি হলো না। বশিরের বাম বাহু চিরে একটা রাউন্ড বিদ্যুৎ এর গতিতে বেরিয়ে গেলে মুহিত, মিরসাদ সহ পারভেজ অবিশ্বাস্য নয়নে তাকায়। এমনকি অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকায় বাহু আঁকড়ে ধরে চিৎকার করতে থাকা বশির নিজেও। কিন্তু তাদের একজনের অবিশ্বাস্য দৃষ্টি মোত্তাকিন কিংবা বশিরের দিকে নয় বরং গোডাউন ঘরে চারিপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আঠারো জন গার্ডের দিকে। যারা কিনা গান হাতে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। পারভেজ আকস্মিকতায় বোকা বনে যায়। সে নিজের পাশে থাকা গার্ডটির পেটে কনুই দিয়ে গুঁতা দিয়ে তাড়া দিয়ে বলল,

--"এই শালা মারিস না কেন মোত্তাকিনকে? ও দেখি তোদের বসকে গুলি করেছে।"

গার্ডটি শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় পারভেজের দিকে। শান্ত কণ্ঠেই বলে,

--"আমাদের বস ঠিকই আছে, পারভেজ ভাই।"

--"মানে?", পারভেজের অবুঝ কণ্ঠ।

বশির ব্যথা ভুলে হতভম্ব চিত্তে চেঁচিয়ে উঠল,

--"এই তোরা থাকতে ও আমায় গুলি করল কিভাবে? তোরা ওর খুলি উড়িয়ে দিবি না?"

আঠারো জন গার্ড একদম নিশ্চুপ, নীরব। বশির দিকদিশা হারিয়ে মোত্তাকিনের দিকে তাকায়। মোত্তাকিন নিরুদ্বেগ মাথার রক্ত মুছছে। বশির বুঝে নেয় তার বিপদ অতি সন্নিকটে। সে তড়িৎ গতিতে পাশে পড়ে থাকা গানটা ডান হাতে নেয়। শক্ত হাতে মোত্তাকিনের দিকে তাক করে ট্রিগার প্রেস করে।

এমন পর্যায়ে উপস্থিত সকলে আরেকদফা অবাক হয়। কেননা এবার বশিরের গার্ডদের প্রধাণ গুলি ছুড়েছে বশিরের ডান বাহু বরাবর।

পারভেজের মাথার উপর দিয়ে যায় সব। মুহিত ইরতেজা, মিরসাদ ও কিছু বুঝে উঠতে পারে না। পারভেজ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে তাদের দড়ি খুলে দেয়।

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তাদের এই গার্ড দলের প্রধানের দিকে। কিছু বলতে যাওয়ার জন্য উদ্বত হলে গোডাউনের বাহির থেকে কিছু গার্ড ছুটে আসে। এবং বশিরের গার্ডরাই তাদের পথরোধ করে দাঁড়ায়।

দুই বাহুতে দু'টো গুলি খেয়ে বশির অচল হয়ে পড়ে। তার থেকেও অচল হয়ে পড়ে তার মস্তিষ্ক! মোত্তাকিন ঝাঁপসা নেত্রে ধীরস্থির এগিয়ে আসে তার কাছে। মেঝেতে বসে ঝুকে যায় বশিরের মুখের দিকে। ওষ্ঠকোনে ক্রুর হাসি!

বশির অতি ক্ষীণ স্বরে উচ্চারণ করে,

--"তুই আমার সাথে কোন খেলা খেললি?"

মোত্তাকিন ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলল,

--"দাবার একটা জনপ্রিয় কৌশল আছে ভাই, জানেন? “এক্সচেঞ্জ স্যাক্রিফাইস” মাঝে মধ্যে ছোট ছোট স্যাক্রিফাইস বড় কোন কিছু অর্জনের মাধ্যম হয়। আপনি ঠিক এই লোভে পড়েই ভুলটা করেছেন। আমি আপনাকে পঞ্চাশ কোটি টাকার জোগান দিয়েছি, বিনিময়ে আপনাদের দুই ভাইয়ের গোটা সম্রাজ্য এখন আমার হাতে!"

বশির আক্রোশে ফেটে পড়ে। তার মানে শুরু থেকেই সে মোত্তাকিনের গড়া ষড়যন্ত্রের স্বীকার ছিল! সে হিসহিসিয়ে বলল,

--"তুই কি ভাবিস তুই এখান থেকে জীবিত বের হতে পারবি? বাইরে আমার এখন পাঞ্চাশ জন গার্ড আছে। আমাদের মেরে তোরা এখান থেকে কিভাবে বের হবি তা আমিও দেখে নেব।"

মোত্তাকিন খিক খিক করে হেসে উঠল। উদাসীন দেহে বশিরের পাশে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। উদাসীন কণ্ঠেই বলল,

--"আমি বের হচ্ছি না কোথাও, ভাই। একটা জিনিস দেখবেন? চলুন আপনাকে আপনার গোটা জীবন বৃত্তান্তের সমাপ্তি দেখাই। এই পারভেজ তোর ফোনটা দে তো!"

হতবিহ্বল পারভেজ নির্বাক ফোনটা এগিয়ে দিলো। মোত্তাকিন সদ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া হট নিউজটা বশিরের অচেতনপ্রায় মুখের সামনে তুলে ধরে। যেখানে মোত্তাকিন গুলি করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সকল ঘটনা টেলিকাস্ট হচ্ছে। মুহুর্তেই আঁছড়ে পড়া আতঙ্কে বশির চেঁচিয়ে উঠল,

--"এটা হতে পারে না! এটা কি করে সম্ভব?"

মোত্তাকিন স্মিত হেসে বলল,

--"চোরের দশ দিন, গৃহস্থের একদিন—লোকমুখে শোনা কথাটি আপনার মনে আছে? আমার না ভীষণ রাগ হচ্ছে, আপনি আমায় এত নির্বোধ ভাবেন—যে আমি এত বছর যাবৎ আপনার সাথে কাজ করেও আপনার গতিবিধি বুঝতে পারব না? পুলিশ আপনার গোডাউন এতক্ষণে ঘিরে নিয়েছে। শুভকামনা ভাই! মেয়র না হতে পারলেও বোকামিতে আপনি সেরা উপাধি পাবেন।"

পতনের একদম শেষ পর্যায়ে আর চেতনা ধরে রাখতে পারল না বশির। সে পুরোপুরি অচেতন হয়ে পড়ে।

*****

বড় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা পুলিশ সদস্য সহ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এর লোকগুলো চাপা উদ্বিগ্নতা নীরব হয়ে গেল সম্মুখের বৃহৎ স্ক্রিনটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতেই। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,

--"কি হলো স্ক্রিন বন্ধ হয়ে গেল কেন? মোত্তাকিন কি ক্যামেরা বন্ধ করে দিয়েছে? না-কি ওরা মোত্তাকিনের উপর হামলা করেছে?"

পুলিশের প্রধান কর্মকর্তা আবুবকর সিদ্দিক মাথা চুলকাচ্ছে। সে নিশ্চিত, হামলাটা মোত্তাকিন করেছে। ঐ ছোকরা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কোন চর্চা কারোর মুখে শুনতেই পারে না।

--"সিদ্দিক সাহেব, আপনি কিছু বলছেন না কেন? ক্যামেরা নষ্ট হওয়ার তো কোন সুযোগ নেই। তবে কানেকশন হারিয়ে ফেললাম কেন?"

আবুবকর সিদ্দিক কথা ঘুরাতে চায়। সে কপাল কুঁচকে পাল্টা রুক্ষ স্বরে বললেন,

--"আপনি এটা বাদ দিন। আমাদের যতটুকু প্রমাণ প্রয়োজন ছিল তা আমরা পেয়ে গিয়েছি। কিন্তু কি হলো এখন আপনাদের মাঝে এত উদ্বিগ্নতা কেন? কিছুক্ষণ আগেও তো আপনারা আমায় বিশ্বাস করছিলেন না। আমি না-কি বিরোধীদলীয়! মুহিত ইরতেজার আত্মীয়! তা এখন দেখলেন আপনাদের উত্তরের মেয়র আর তার ভাইয়ের ষড়যন্ত্র? এটা কতটুকু সাজানো গোছানো ষড়যন্ত্র ছিল তা নিশ্চয়ই আর বলে বোঝাতে হবে না।"

মহা পরিচালক থতমত খেয়ে মিইয়ে গেলেও গলার স্বর পরিবর্তন হলো না। গুরুগম্ভীর গলায় বললেন,

--"আপনি জানেন আমরা প্রমাণ ব্যতীত কোন তথ্যে বিশ্বাস করি না। আপনি আমাদের মোত্তাকিনের সত্যতা বিশ্বাস করার জন্য কোন প্রমাণ দেখাননি। আমি কি করে বিশ্বাস করব মোত্তাকিন যেটা বলছে সেটা সত্য!"

--"আমি আইনের লোক, স্যার! গাঁজা খেয়ে কোন কথা বলি না। কোন কথা যদি বলি তবে তার পেছনে কোন শক্তপোক্ত কারণ ছিল!”

মহা পরিচালক নত দৃষ্টি রেখে মাথা নেড়ে সায় জানালো। গম্ভীর গলায় বলল,

–“আমাদের এখন ওখানে উপস্থিত হওয়া প্রয়োজন। মোত্তাকিন আর তার পরিবারকে যথাযথ নিরাপত্তা দেয়া উচিৎ। নয়তো উত্তরের মেয়র আর বশিরের আরো হিংস্র হয়ে পড়বে।”

–“মোত্তাকিনের উপর আপনি বিশ্বাস না করলেও আমি বহু আগেই করেছিলাম। তাই ওর আর ওর পরিবারের নিরাপত্তা আমি সবার আগে নিশ্চিত করেছি।”, আবুবকর সিদ্দিক গুরুগম্ভীর গলায় বললেন। অধিদপ্তরের মহা পরিচালক কৌতুহলী হলেন। কৌতুহলী গলায় শুধালেন,

–“কিন্তু আপনি হুট করে অচেনা একটা ছেলের কথা বিশ্বাস করে নিলেন কি করে?”

আবুবকর সিদ্দিক স্মিত হাসলেন। বললেন,

–“হুট করে নয়। আমি মোত্তাকিনকে অনেক আগে থেকে চিনি। আর ওর প্রতি আমার বিশ্বাস ভালোবাসা সম্মান অনেক আগে থেকেই। আপনার মনে পড়ে পুরো সংবাদ মাধ্যম আমায় একবার প্রশংসায় ভাসিয়ে দিয়েছিল নারী পাচারকারীর একটা বিশাল দলকে আইনের আওতায় আনার জন্য?”

–“হ্যা, মনে আছে। নিঃসন্দেহে সেটা প্রশংসনীয় কাজ ছিল।”, মহা পরিচালকের কথায় আবুবকর সিদ্দিক বলেন,

–“জি প্রশংসনীয় ছিল বটে! কিন্তু ঐ প্রশংসা আমার ছিল না বরং মোত্তাকিনের ছিল। আমাকে ঐ নারী পাচারকারী চক্রের সন্ধান আর আটক করার যাবতীয় সহায়তা ও করেছিল। কিন্তু নাম আমার দিয়েছে, কারণ ও জনসম্মুখে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়নি শুধুমাত্র ওর একটা পরিবার রয়েছে বলে। আমিও চাইনি ওর ওপর কোন বিপদ আসুক। তাই লুকিয়ে গিয়েছি। তাই সেই কৃতজ্ঞতা আমি আজো ভুলিনি। প্রমাণ ব্যতীত ওর সব কথা বিশ্বাস করি‌। আর ও প্রত্যেকবার আমায় গর্বিত করে।”

আবুবকর সিদ্দিকির কণ্ঠে গৌরবের ছোঁয়া! মহা পরিচালক স্মিত হেসে বললেন,

–“কিন্তু এবার তো তাকে সামনে আসতেই হবে আর এবার এটাও প্রকাশ হয়ে গিয়েছে যে মুহিত ইরতেজার দ্বিতীয় একটি সংসার রয়েছে, সন্তান রয়েছে।”

আবুবকর সিদ্দিক মাথা নেড়ে বললেন,

–“আমি নিশ্চিত এই বিষয় নিয়ে মুহিত ইরতেজা কিংবা মোত্তাকিনের কোন সংশয় নেই।”

রাত একটা! সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, পুলিশ, সাংবাদিক সহ বহু মানুষ ঘিরে নিয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা গোডাউনটি। মুহিত ইরতেজা আর মিরসাদ দূর্বল নিস্তেজ দেহে তখনো দাঁড়িয়ে আছে মোত্তাকিনের সামনে। মোত্তাকিন আবুবকর সিদ্দিক এর সাথে কথা বলায় ব্যস্ত।

আবুবকর সিদ্দিক মোত্তাকিনের মাথায় রুমাল চেপে ধরে চাপা সতর্ক কণ্ঠে বলল,

–“তোকে বারণ করেছিলাম না কোনভাবেই আক্রমণাত্মক কিছু করবি না? তুই গুলি করলি কেন?”

মোত্তাকিন বাঁকা চোখে তাকায়। থমথমে মুখে বলল,

–“প্রমাণ আছে আমি গুলি করেছি?”

আবুবকর সিদ্দিক হো হো করে হেসে উঠলেন। দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,

–“ল্যাটেন্ট ফিঙ্গারপ্রিন্ট ডেভেলপমেন্ট এর কাছে এই বন্দুক পাঠালে তোর সব ভেলকিবাজি বেরিয়ে যাবে। আমার সাথে ফাজলামি করিস না।”

–“কোন ফাজলামি করছি না। আমার পরিবার নিয়ে কথা বলেছে আমি গুলি করেছি ব্যাস! আমায় বাঁচানোর দায়িত্ব আপনার!”, মোত্তাকিনের গা ছাড়া কণ্ঠে আবুবকর সিদ্দিক তেতে উঠলেন,

–“আমার ঠ্যাকা পড়েছে?”

মোত্তাকিন কপাল কুঁচকে নেয়। প্রসঙ্গ বদলে শুধায়,

–“আমার পরিবার ঠিকভাবে গ্রামে পৌঁছে দিয়েছেন? পথে কোন সমস্যা হয়েছিল?”

–“বশিরের লোকগুলো প্রায় ধরে ফেলেছিল। আমার বাহিনীর সদস্যরা দেরি করে ফেললেও সঠিক সময়ে পৌছে গিয়েছে। এবং সবকটা এখন আমার হেফাজতে আছে। আর তোর পরিবার এতক্ষণে পৌঁছে গিয়েছে বোধহয়।”, আবুবকর সিদ্দিক গম্ভীর গলায় বললেন। মোত্তাকিন নিশ্চিন্তের নিঃশ্বাস ফেলে তার থেকে রুমালটা নিয়ে বলল,

–“আমি তবে যাই এখন।”

আবুবকর সিদ্দিক কপাল কুঁচকে বিরোধী কণ্ঠে বললেন,

–“সবকিছু কি হাতের ময়লা মনে হয়? এখানে সবচেয়ে বেশি এখন তোর প্রয়োজন। অনেক স্টেটমেন্ট দিতে হবে আরোকিছু ফর্মালিটিজ আছে সেগুলো পূরণ করেই যেতে পারবি।”

–“মাফ চাই স্যার! যা ফর্মালিটিজ আর স্টেটমেন্ট আছে তা আমি পড়ে এসে দেব। আপাতত আমায় রেহাই দিন। ওদিকে একটা বেয়াদব চিন্তা করতে করতে আমার বাচ্চার দশা খারাপ করে দেবে। এমনিতেই ওর হাই প্রেশার, আমায় না দেখা অব্দি ও নিজের কোন যত্ন নেবে না। বোঝার চেষ্টা করুন।”

আবুবকর সিদ্দিকির গম্ভীর মুখে আলতো হাসি ফুটে উঠল ছেলেটির রুক্ষ কণ্ঠে ভালোবাসার ছোঁয়ায়। সতর্ক কণ্ঠে বললেন,

–“একটা‌ ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি?”

মোত্তাকিন বাঁকা সরু নেত্রে তাকায়। চোখেমুখে বেশ বিরোধ! তবুও বলল,

–“জবাব হাসিমুখে দিতে পারব এমন প্রশ্ন করবেন। মেজাজ বিগড়ে না যায়!”

–“পুলিশের সামনে মেজাজ দেখাচ্ছিস?”

–“যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন, মিঞা! গ্রামে যেতেও চার ঘন্টা লাগবে।”

–“ঐ যে মেয়েটাকে নারী পাচারকারীরা কিডন্যাপ করেছিল ঐ মেয়েটাই তোর বউ, তাই না?”

–“হু।”

–“বেশ ভালো মেয়ে।”, আবুবকর সিদ্দিক প্রসন্ন মনে বললেন। সে জানে সাধারণত এই ধরণের মেয়েগুলো সমাজের দারুণভাবে উপেক্ষিত হয়। সেখানে সে বুঝতে পারছে মোত্তাকিন মেয়েটিকে খুব ভালোবাসে। স্ত্রী গর্ভবতী! সবদিক ভেবে সে মোত্তাকিনের কাঁধ চাপড়ে বললেন,

–“যা, এদিকটা আমি সামলে নেব।”

মোত্তাকিন এক মুহুর্ত সময় নষ্ট করে না লম্বা লম্বা পা ফেলে বের হতে গেলে মুহিত ইরতেজা ছুটে এসে তার হাত টেনে ধরল। মোত্তাকিন ফিরে তাকায় বয়স্ক লোকটির মুখপানে। গুরুগম্ভীর শান্ত স্বরে বলল,

–“এখন আর কোন সমস্যায় পড়তে হবে না আপনাদের। বাড়ি ফিরে যান। আর সাময়িক ভোগান্তির জন্য দুঃখিত!”

সৌজন্য কথায় মুহিত ইরতেজার অন্তঃস্থলে অনুতাপ অনুভব হয়। নম্র স্বরে বলেন,

–“তোমায় ভুল বোঝার জন্য আমি দুঃখিত মোত্তাকিন। বাবাকে আর ফিরিয়ে দিও না। এবার অন্তত একটু বুকে জড়িয়ে নিতে দাও।”

মোত্তাকিন নির্নিমেষ চেয়ে বলল,

–“আপনার প্রতি আমি কোনদিন কোন বিশেষ অনুভূতি অনুভব করিনি, করতে পারিনি আর না করতে পারব। আমার থেকে এর অধিক কিছু আশা করবেন না। আসি! মায়ান আর অনু ভাবি ঠিক আছে। আমার গ্রামের বাড়িতে আছে।”

শেষের কথাগুলো সে মিরসাদের দিকে তাকিয়ে বলেই হাত ছাড়িয়ে চলে যায়। মিরসাদ কিছু বলেনা, ম্লান দেহে বুকভরা অনুতাপে নিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে দূর্বোধ্য ছেলেটির পানে।

পারভেজ ছুটে বের হয় মোত্তাকিনের পিছু পিছু।

–“এই তুই কি করলি, কিভাবে করলি? আমার তো সব মাথার উপর দিয়ে গিয়েছে। বশিরের ঐ আঠারো জন লোক তোর উপর কোন হামলা করল না কেন?”

মোত্তাকিন সদর দরজা পর্যন্ত এসে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। শান্ত স্বরে বলে,

–“টেন্ডার বাবদ বশির ভাইয়ের থেকে নেয়া পাঁচ কোটি টাকা আমি কি করেছি?”

–“ঐ শালা মাদারবোর্ড! তা আমি জানব কি করে?”

বলতে গিয়েও পারভেজ থামল। পরপরই চমকে তাকায় মোত্তাকিনের দিকে। হড়বড়িয়ে শুধায়,

–“তারমানে তুই তাদের কিনে নিয়েছিলি?”

–“কালো টাকা সৎ পথে ব্যয় করে সাদা টাকা বানানো অপরাধ তো নয়!”, মোত্তাকিন ফিচলে হেসে বলেই বেরিয়ে যায় গেট থেকে। কিন্তু পারভেজ বের হতে পারে না, তাকে পুলিশ আঁটকে দেয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।

অতঃপর যতটুকু সম্মান খুইয়েছিল মুহিত ইরতেজা ঠিক তার থেকে দ্বিগুণ সম্মান আর ভালোবাসা ফিরে পায়। দীর্ঘ একটা দুঃসহনীয় দিন কাটিয়ে মুহিত ইরতেজা আর মিরসাদ স্মিত হেসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। বাবাকে জড়িয়ে ধরে মিরসাদ অনুতাপের সুরে বলে,

–“তুমি ঐ চমৎকার মানুষ দুটোর সাথে অনেক অন্যায় করেছ পাপা। তারা সুখের হকদার! প্লিজ তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে ফিরিয়ে আনো। আমি খুব করে চাই বাকি জীবনটা ঐ চমৎকার মানুষ দুটোর সান্নিধ্যে কাটাতে।”

*****

রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে আলো ফুটে উঠল মন্থর গতিতে। ঠিক যেমনটা মন্থর গতিতে মোত্তাকিনের অন্ধকার জীবনে আলো ফুটেছে। যেভাবে মুহিত ইরতেজার রাজনৈতিক জীবনের কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে একটা নতুন প্রারাম্ভ ঘটে। সকল অশুভ শক্তির পরাজয়ের পরের মুহুর্তটা বরং অবর্ণনীয়-ই থাকুক।

টানা চার ঘন্টা হাই স্পিডে বাইক চালিয়ে মুন্সিগঞ্জে ঢুকতে ভোরের আলো ফুটে যায়। বিশাল কাঠের ঘরের প্রথম দুয়ার খুলে ঘরের ভেতর প্রথম কদম রাখতেই মোত্তাকিনের দৃষ্টি গিয়ে আটকায় সোফায় মধুমিতার বুকের মাঝে গুটিয়ে শুয়ে থাকা মায়ানের নিষ্পাপ আদল। সে স্মিত হেসে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে মায়ের সামনে। হাত বাড়িয়ে মায়ানকে কোলে তুলে নিতেই মধুমিতা হকচকিয়ে উঠে চোখ খুলে তাকায়। রাতভর কামনীয় মুখটি ভেসে উঠতেই সে টলটলে নেত্রে ডেকে বলে,

–“বাবু, এসেছিস? তুই ঠিক আছিস?”

মোত্তাকিন মায়ের হাতের উপর হাত রেখে বলল,

–“ঠিক আছি, মামনি।”

–“আর দাদুভাইয়ের বাবা আর দাদু?”, মধুমিতার সতর্ক‌ কণ্ঠে মোত্তাকিন মায়ানকে আদর করতে করতে বলল,

–“তারাও ঠিক আছে। এসে পড়বে হাতের কাজগুলো শেষ করে। ইন্দু কোথায়?”

–“সারারাত কান্নাকাটি করেছে। আমি জোড়করে উপরের ঘরে শুইয়ে দিয়ে এসেছি আধা ঘন্টা আগে। যা তুই, গিয়ে শান্ত কর।”

মোত্তাকিন মাথা নেড়ে মায়ানকে রেখে উপরে চলে যায়। পাটাতনের ঘরের কাঠোর মেঝেতে পেতে রাখা গদিতে প্রভাতের কুয়াশামাখা আবছা আলোয় স্ফিত সুস্বাস্থ্য দেহটিকে এক কাতে শুয়ে থাকতে দেখতেই মোত্তাকিন স্মিত হাসল। অলস, শ্রান্ত দেহে ধীরপায়ে গিয়ে মেয়েটির পাশে শুয়ে পড়ল। এবং বহু মাসের অভ্যাস অনুযায়ী মেয়েটির গালের উপর নিজের গাল রেখে শুয়ে পড়ে।

মসৃণ নরম গালে রুক্ষ দাঁড়িযুক্ত স্পর্শ অনুভব হতেই ইন্দুবালা চোখ খুলে তাকায়। এক মিনিট দু মিনিট নীরবতার সাথে কাটলেও ঠিক তিন মিনিটের মাথায় ইন্দুবালা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে ঘুরে একপ্রকার আঁছড়ে পড়ে প্রশস্ত বক্ষমাঝে। মোত্তাকিন চেঁচিয়ে উঠল সতর্কতার সাথে ভারী দেহটিকে আগলে ধরে।

–“ওয়ে বেকুব, তুই এমনভাবে ঝাঁপ দিলি কোন সাহসে? তুই কি ভুলে গিয়েছিস তুই একা না! এখন যদি কিছু হয়ে যেত?”

ইন্দুবালা জবাব দেয়ার পরিস্থিতিতে থাকে না। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর অস্থিরচিত্তে ছুঁয়ে দিচ্ছে ছেলেটিকে। চোখমুখ ভরিয়ে দিচ্ছে অস্থির স্পর্শে। অনুনয় করে বলে,

–“প্লিজ মোত্তাকিন আমায় কথা দে। আর কোনদিন এভাবে আমায় কারোর ভরসায় একা ফেলে কোথাও যাবি না। আমি তোকে হারাতে ভীষণ ভয় পাই। যদি হারাতে হয় আমায় মেরে তারপর হারিয়ে যাস কিন্তু আমার চোখের সামনে হারিয়ে যাস না প্লিজ!”

মোত্তাকিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

–“আর কখনো তোকে রেখে কোথাও যাব না। এবার আমরা একটু সুন্দর, শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করব। যেখানে আমাদের একটা সুন্দর ঘর থাকবে, একটা সুখের সংসার থাকবে আর সেই ঘর এবং সংসারের ছোট একটা মালিক থাকবে। যাকে আমরা দুজন একসাথে বড় করব পৃথিবীর সব সুখ লুটিয়ে দেব তার পায়ে। তার জীবনের প্রতিটা বিশেষ দিনে আমি আর তুই তার সাথে থাকব, ঠিক আছে?”

–“একদম ঠিক আছে।”, ইন্দুবালা উপচেপড়া কান্না আঁটকে জবাব দিলো। মোত্তাকিন হেসে তার কপালে শব্দ করে একটা চুমু দিয়ে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিলো।

ভোর হলো, বেলা গড়ালো ইন্দুবালার মতো অনাথ অনুর পৃথিবীও সুস্থসবল ফিরে আসে তার কাছে। অনু ছেলেকে নিয়ে আঁছড়ে পড়ে মিরসাদের বুকে। মধুমিতা যখন টলটলে নেত্রে সেই দৃশ্য দেখতে মগ্ন ঠিক তখনি কেউ এগিয়ে এসে তার পায়ে কাছে কেউ হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে। হকচকালো মধুমিতা। শাড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরে পিছিয়ে যেতে নিলে মুহিত ইরতেজা তার দু'হাত ধরে আঁটকে দেয়। অশ্রুসিক্ত নয়নে তুলে অনুনয় করে বলে,

–“তোমার পায়ে পড়ছি মধু, ক্ষমা করে দাও। আমি তোমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতি ছলের মাধ্যমে ছিনিয়ে নিয়েছি আমায় ক্ষমা করে দাও। কিন্তু দয়াকরে আমায় ফিরিয়ে দিও না। আমি নয়তো মরেও শান্তি পাব না মধু।”

মধুমিতা টলটলে নেত্রে দৃষ্টি অন্যত্র রেখে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিচ্ছুটি বলে না। ইন্দুবালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকায় মোত্তাকিনের দিকে। যে কি-না ইশারায় পাত্তা দিতে বারণ করছে। বুড়ো বুড়ি যা করে বেড়াক তা দিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই।

পরিশিষ্টঃ

প্রভাতের কিরন ফুটেছে বহুক্ষণ। মিঠা রোদ অচিরেই নিজের শীতলতা খুইয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে মন্থর গতিতে। অথচ মোত্তাকিন তখনো বিছানায় ঝিমাচ্ছে। একটু নড়তেই কোমড় ব্যথায় মড়মড় করে উঠল। সে ব্যথায় দাঁতে দাঁত চেপে বুকের উপর তাকিয়ে বলল,

–“ওরে রাজাকারের দল ওঠ বলছি! সকাল আটটা বাজে। স্কুলে যেতে হবে না? আমার পিঠ কোমড় ব্যথায় চিরবির করছে। সারাদিন উড়ে বেড়ায় আমায় চেনে না, আর রাতে হলে আমার বুকে ঘাপটি মারে।”

লাগাতার তিরস্কারে বুকের বাম পাশে বেঘোরে ঘুমানো ইন্দুবালার ঘুমে বেজায় বিঘ্ন ঘটে। সে বিরক্তি মিশ্রিত শব্দ করে এক গড়াগড়ি দিয়ে বুক থেকে নেমে যায়। মোত্তাকিন সেদিকে বাঁকা চোখে চেয়ে বলে,

–“স্কুলে যাবি না?”

–“আজ শুক্রবার!”, ইন্দুবালার অলস কণ্ঠ।

দেহের উপর একটু ভর কমতেই মোত্তাকিন নড়েচড়ে উঠল। মাথা নুইয়ে দৃষ্টি রাখে ঠিক নিজের বক্ষের ডানপাশে গাল দাবিয়ে শুয়ে থাকা ফর্সা ধবধবে লালচে আভা যুক্ত ছোট্ট আদলের পানে। সে তিরস্কারের সুরে বিদ্রুপ করে বলল,

–“এই ইন্দু'র বাচ্চা ছোট ইঁদুর ওঠ, সকাল হয়েছে। সারাদিন ম্যা ম্যা করে রাতে বাপের বুকে ঘাপটি মেরে ঘুমাও লজ্জা করে না?”

বেশ উচ্চস্বরে বলা কথাটিতে ছোট্ট আদলটি নড়চড়ে উঠল। মোত্তাকিন এবার খেকিয়ে উঠল,

–“কি হলো মশাই, উঠছেন না কেন?”

সহসা ভেসে আসল অস্ফুট বাচ্চা বাচ্চা চিকন বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠ।

–“ওহ্ পাপা! ইত'স ভেলি ব্যাড। ডুন্ট ডিসটাব!”

আড়াই বছরের ছোট্ট ছেলের বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে মোত্তাকিন দাঁত খিচে বলল,

–“ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া আপদ! এই পাপা ডাক তোকে শিখিয়েছে কোন বেকুব? এর জন্যই তোর বাপের প্রতি টান কম। তুই হলি পিওর বাঙ্গালী জাতি। আব্বা ডাকবি, আব্বা! আর যেন না শুনি এই সব পাপা। বল আব্বা!”

বাবার লাগাতার বিরক্তিকর উৎপীড়নে অবশেষে মিশালের না ভাঙতে চাওয়া ঘুম ভাঙতেই হয়। বাবার বুকে গাল দাবিয়ে সে পিটপিট করে তাকায় বাবার মুখপানে। জড়নো কণ্ঠে ডেকে ওঠে,

–“পাপা!”

মোত্তাকিনের অর্ধেক তেজ কমে যায় সেই মিষ্টি ডাকে। তবুও হার না মানা পথিকের ন্যায় গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

–“কোন পাপা টাপা চলবে না। বল আব্বা!”

বাবা কি ত্যাড়া তার থেকে দ্বিগুণ ত্যাড়া মিশাল একই রকম গম্ভীর গলায় বলল,

–“পাপা।”

মোত্তাকিন দাঁত কিড়মিড় করে তাকায় সদ্য বিছানা থেকে নামা ইন্দুবালার দিকে। হ্যাঁ, দীর্ঘ অপেক্ষা, বাচ্চা ও কালো হবে এমন অজস্র কটুক্তি উপেক্ষা করে তার কোলজুড়ে এমন স্বর্গীয় সৌন্দর্য নিয়ে একটা ছেলে সন্তান আসে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সৌন্দর্যে মোড়ানো বাচ্চা ছেলেটি মা বলতে উন্মাদ। তবে রাতটুকু তার বাবার বুকে কাটাতে হয় এটা সেই জন্মের পর থেকেই অভ্যাস। এই অভ্যাসে কখনো বিঘ্ন ঘটতে পারে না। যদি ঘটে তবে বাড়ির সকলকে সেই রাতের ঘুম বিসর্জন দিতে হবে। তাই এই ঝুঁকি মোত্তাকিন কখনো নেয় না। ছেলের জেদের কাছে হার মেনে রোজ রাতে তাকে বুকে জড়িয়ে ঘুম পাড়াতে হয় এবং বুকেই ঘুমাতে দিতে হয়।

–“এই ত্যাড়া ব্রিটিশের বাচ্চা আসল কোত্থেকে? না আছে বাপের প্রতি টান আর না আছে জাতির প্রতি।”

মোত্তাকিনের কথায় ইন্দুবালা হাত খোপা করতে করতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। থমথমে মুখে বলল,

–“নিজের বাচ্চাকে এইসব উদ্ভট নামে ডাকিস লজ্জা করে না তোর?”

–“হাহ্! আমার বাচ্চা? কে বলবে এটা আমার বাচ্চা? সারাদিন মায়ের আঁচল ধরে ম্যা ম্যা করে বেড়ানো ইন্দু'র বাচ্চা এটা। যত ভালোবাসা, দরদ সব মায়ের জন্য। সারাদিনে তো বাপকে একবার মনেও পড়ে না। দিনের আলো ফোঁটা পর্যন্ত বাপ আপন এরপর আর বাপকে চেনে না। ও কি জানে ওকে আনতে আমার অবদান কতো?”, মোত্তাকিনের ক্ষোভে ভরা কণ্ঠ। আসলেই ছেলেটার তার প্রতি আগ্রহ কম। তার যত আগ্রহ, কৌতুহল, গল্প সব মা‌ জুড়ে। সে ছেলের আদর পায় ঐ রাতের কিছু প্রহরে। এই ক্ষোভ নিয়েই মা ছেলের পেছনে সর্বদা লেগে থাকে সে।

তবে আজ এই নিয়মে খানিক বিঘ্ন ঘটল। ঘুম থেকে উঠেই মিশাল বাবার বুক থেকে নেমে যায় না বরং ঘাড়ে মাথা গুঁজে শুয়ে থাকে। মোত্তাকিন তাকে বুকে জড়িয়েই বিছানা ছেড়ে নামে।

–“কি হলো জনাব? মায়ের কাছে যাবেন না?”

–“নো পাপা!”

–“আব্বা বল।”

–“ইউ আল ছো নটি, পাপা।”, মিশাল ঘাড় থেকে মাথা তুলে তাকায় বাবার কুঁচকানো মুখপানে। মুখ ধুতে যাবে মোত্তাকিন।

–“বাথরুমে যাব এখন কি সেখানেও নিয়ে যাব?”

–“উখে।”, মিশাল বাধ্যগত ছেলের ন্যায় সায় জানায়। মোত্তাকিন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। ছেলে এত বাধ্যগত হলো কি করে? এ তো আস্ত এক ত্যাড়া!

ইন্দুবালা মৃদু হেসে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। অগত্যা মোত্তাকিন ছেলেকে নিয়ে ওয়াশরুমে যায়। নিজেও ফ্রেশ হয় ছেলেকেও ফ্রেশ করায়।

বাথরুম থেকে বের হয়ে ছেলেকে মুছিয়ে পোশাক বদলে দেয় মোত্তাকিন। মিশাল হাসিমুখে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। মোত্তাকিন ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,

–“কি হলো জনাব, হাসছেন কেন?”

–“আই লাভ ইউ পাপা।”

অনাকাঙ্ক্ষিত স্বীকারোক্তিতে মোত্তাকিনের কুঁচকানো মুখশ্রী মসৃণ হয়। প্যান্ট পড়াতে পড়াতে মৃদু হেসে বলে,

–“ভালোবাসেন? তো বাবাকে একটু আদর করে দিন তো!”

মোত্তাকিন গাল এগিয়ে দিলো। মিশাল হাসিমুখে বাবার গালে তৎক্ষণাৎ ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। তাতে অবাক মোত্তাকিন ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে শুধায়,

–“কি হলো আব্বা, হঠাৎ এত ভালোবাসা কেন দেখাচ্ছেন?”

মিশাল জবাব দেয় না দু'হাতে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বসে থাকে। বিশালাকৃতির অট্টালিকার বিশাল কক্ষ থেকে মোত্তাকিন লম্বা লম্বা পা ফেলে বের হতে হতে মোত্তাকিন হাঁক ছেড়ে ডাকল,

–“এই ইন্দু কোথায় তুই?”

–“আমাল মামনিকে পচা কতা বলবে না।”, মিশাল চেঁচিয়ে উঠল রাগে।

মিশাল তুই তোকারি পছন্দ করে না অথচ মোত্তাকিন সেটাই বেশি করে। তবে মিশাল বড় হওয়ায় মোত্তাকিন আর ইন্দুবালা দু'জন ই চেষ্টা করছে একে অপরকে তুমি করে বলার।

মোত্তাকিন জিভে কামড় দিয়ে দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,

–“ওগো শুনছো, কোথায় তুমি।”

–“হ্যা, গো শুনছি বলুন।”

ঘরের বাইরে থেকে আওয়াজ শোনাযায়। মোত্তাকিন লম্বা লম্বা কদমে কক্ষ থেকে বের হতেই দৃষ্টি শীতল হয়ে আসল। পা দুটো গতি হারায় কড়িডরে বিশালাকৃতির একটা কেক সমেত দাঁড়িয়ে থাকা নিজের ভরা পরিবার দেখে।

এক ভিন্ন প্ররাম্ভের কারণ বুঝে সে ছেলের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। মিশাল গাল ভরে হেসে বলল,

–“হ্যাপি বাদদে, পাপা।”

মোত্তকিন স্মিত হেসে ছেলের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,

–“ধন্যবাদ, আব্বা। তা আপনি কি এর জন্যই আজ বাবাকে এত ভালোবাসছেন?”

মিশাল মাথা নেড়ে সায় জানায়। ফলস্বরূপ মোত্তাকিন ক্ষেপে যায়। সম্মুখে পরিবার রূপে দাঁড়িয়ে থাকা মা, বাবা, ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী-সন্তান আর নিজের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে অভিযোগের সুরে বলল,

–“দেখেছো? কত বড় রাজাকার? আমার খেয়ে পড়ে আমার বুকে ঘুমিয়ে সে মায়ের একনিষ্ঠ ভক্ত।”

মুহিত ইরতেজা আর মিরসাদ হো হো করে হেসে উঠল। সাড়ে চার বছরের মায়ান সেই অনাচার অনুভব করে বলল,

–“চাচু, আমি তোমাকে ভালোবাসি তো।”

–“তুই-ই আমার আসল ভালোবাসা, বাপ! আয় বুকে আয়। আর এই নে ইন্দু, তোর আপদ তুই নে।”, মোত্তাকিন রেগে গিয়ে বলল।

মিশাল এখন মোটেই যাবে না মায়ের কোলে। তাই সে দাঁত খিটমিট করে শক্ত করে বাবার কোলে চেপে বসে। মোত্তাকিন ছাড়ে না ছেলেকে। বুকে জড়িয়েই এগিয়ে যায়। কপাল কুঁচকে বলল,

–“এসব কি বাচ্চাদের মতো কেক এনেছ তোমরা?”

–“কতদিন হলো কোন বিশেষ দিন উদযাপন করি না? এসো কেক কাটো!”, মিরসাদ ছুড়ি এগিয়ে দিয়ে বলল। মোত্তাকিন স্মিত হেসে ছেলের হাতে ছুড়ি ধরিয়ে কেক কাটতে নিলে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রীর হাসিমাখা মুখের দিকে তাকায়। ইশারা করে বলে,

–“এখানে আয়।”

সরব মধুমিতা ছেলের মাথায় চাটি মেরে বলল,

–“আয় কি? বল আসো।”

মোত্তাকিন চাটি খেয়ে দাঁত কিড়মিড় করে চাপা স্বরে ব্যঙ্গ করে বলল,

–“ওগো, এদিকে এসো। দয়াকরে কেকটা আমার সাথে কাটো।”

অনু ফিক করে হেসে উঠল সেই ব্যঙ্গ শুনে। ইন্দুবালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে যায়। স্বামী সন্তানের সাথে মিলে কেক কাকে। অতঃপর ভরা পরিবার মিলে একটা সুন্দর, হাসিমাখা প্রভাত উপভোগ করে। ভরা পরিবার! যেই পরিবারে এখন মোত্তাকিনের বাবা মা, ভাই, তার স্ত্রী সন্তান থেকে শুরু করে নিজের ছোট্ট পরিবারটাও রয়েছে। ফেলে আসা সেই বিদঘুটে দিনগুলোর পরে তারা সবাই একে অপরকে ক্ষমা করতে শিখেছে, কম্প্রোমাইজ করতে শিখেছে, ভালোবাসতে শিখেছে, রাজনীতি ছেড়ে তিন বাপ ছেলে মিলে নিজেদেরকে পরিশ্রম দ্বারা সফলতার এক অন্য শিখরে দাঁড় করিয়েছে। যেখানে নেই কোন পিছুটান, শত্রু, দূর্নীতির ছোঁয়া, নেই কোন দৈহিক বর্ণের তারতম্য!সেদিন মুহিত ইরতেজাকে আর ফিরিয়ে দেয়নি মধুমিতা। শেষ বয়সে এসে তারা সকলে মিলে একটা পরিপূর্ণ সুখী পরিবার গড়েছে। শেষটা এমনি ছিল—একটু প্রেমময়, একটু বর্ণহীন।

______________________সমাপ্ত___________________

#প্রেম_বর্ণহীন

#তোনিমা_খান

#সারপ্রাইজ_পর্ব

​সেই রাতটি ছিল মোত্তাকিনের জীবনে চিরস্থায়ী দাগ কেটে যাওয়া এক দীর্ঘ ভয়ঙ্কর রাত। উদাসীনতার মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছেলেটি প্রথমবার টের পেল—তার অন্তরজুড়ে ছড়িয়ে আছে কাউকে হারানোর গভীর, অব্যক্ত ভয়।

​রাত দুইটা আটাশ। মৃদু গুঞ্জনে আন্দোলিত হাসপাতাল জুড়ে হঠাৎই প্রতিধ্বনিত হলো এক ক্ষিপ্র হুঙ্কার।

—“তোদের হাসপাতালের এই নিয়ম বানিয়েছে কোন হা"রা"মি? বউ আমার, বাচ্চা আমার—লেবার রুমে থাকবে দু’তিনটা ওয়ার্ড বয়, অথচ হাজব্যান্ড থাকতে পারবে না? আমি কি বলদ নাকি?”

​রিসেপশনিস্টের কলার চেপে ধরে হিসহিসিয়ে উঠল মোত্তাকিন। চোখে আগুন, গলায় জমাট রাগ। পুনরায় বলল,

—“একজন ওয়ার্ড বয়ও যদি ওই লেবার রুমে ঢোকে, তোদের এই হাসপাতাল ব্যান করিয়ে ছাড়ব। আমায় এখুনি ঢুকতে দিতে বলবি।”

​নাইট ডিউটিতে থাকা ডাক্তার আর নার্সরা রাগান্বিত স্বরে বলল,

—“আপনি হাসপাতালে দাঁড়িয়ে এভাবে চিৎকার–চেঁচামেচি করতে পারেন না। এখানে অনেক মুমূর্ষু রোগী রয়েছে।”

​মোত্তাকিন ফিরে তাকাল। রাগ, অসহায়ত্ব আর দুঃখে চোখ দু’টো টলমল করছে। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে গলা শক্ত করে বলল,

—“আমাকে আমার স্ত্রীর কাছে যেতে দিন। নইলে এখানে শুধু চিৎকার–চেঁচামেচি না, রক্তারক্তিও হবে।”

​—“এটা সম্পূর্ণ রুলসের বাইরে। আমরা আপনাকে এই অনুমতি দিতে পারি না।”—একজন নিউরো স্পেশালিস্ট কঠোর স্বরে বললেন।

​সহসা ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল মোত্তাকিনের। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

—“তোদের অনুমতি কে চেয়েছে? আমি লেবার রুমে ঢুকবই। কে আটকায়, আমিও দেখে নেব!”

​বলেই সে ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে চলল দোতলার দিকে। তবে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করল—কেউ তাকে আটকাচ্ছে না। মোত্তাকিন থেমে পিছু ফিরে তাকাল। মুহিত ইরতেজা শান্ত, গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মোত্তাকিন উদগ্রীব হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে শুধায়,

—“রক্ত পাওয়া গেছে?”

​মুহিত ইরতেজা মিহি স্বরে বললেন,

—“মিরসাদ রক্ত জোগাড় করেছে। তুমি যাও, ইন্দুবালার কাছে।”

​আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না মোত্তাকিন। দোতলায় পৌঁছে লেবার রুমের কাছাকাছি যেতেই চিরচেনা নারী কণ্ঠের যন্ত্রণাক্লিষ্ট আর্তনাদে তার সারা শরীর ঘামে ভিজে উঠল। ঢুকতে উদ্যত হতেই প্রতিবারের মতোই দু’জন ওয়ার্ড বয় পথ আটকাল।

​এইবার আর বাকযুদ্ধে গেল না মোত্তাকিন। মুহূর্তের মধ্যে কলার চেপে ধরা ওয়ার্ড বয়টির মুখে সপাটে দু’টো ঘুষি বসাল। প্রকাণ্ড আঘাতে ছিটকে পড়ল লোকটি। ঠিক তখনই মোত্তাকিনের চোয়াল ছুঁয়ে গেল আরেকটি অপ্রত্যাশিত ঘা। মোত্তাকিন ঘুরে তাকাল দ্বিতীয় ওয়ার্ড বয়ের দিকে। পরের মুহূর্তেই শান্ত হাসপাতাল চত্বর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল অস্থিতিশীলতা। দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে প্রসব বেদনায় ছটফট করতে থাকা স্ত্রীর কথা, তাকে হারানোর ভয় আর জমে থাকা রাগ—সব মিলিয়ে মোত্তাকিন যেন বিস্ফোরিত হলো।

​মারামারির শব্দে নিচতলা থেকে ছুটে এলো কর্তৃপক্ষ। তন্মধ্যে একজন আদেশের সুরে বলল,

—“ওনাকে ওনার স্ত্রীর কাছে যেতে দাও।”

​রক্তাক্ত, আঘাতপ্রাপ্ত দুই ওয়ার্ড বয় তখন মেঝেতে কাতরাচ্ছে। সেদিকে এক ঝলক হিংস্র দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে মোত্তাকিন ছুটে ঢুকে পড়ল লেবার রুমে। মা, ভাবি আর নার্সদের আশ্চর্য দৃষ্টি উপেক্ষা করে সে সোজা ঢুকে গেল সেই আর্তনাদে ভরা কক্ষে। ভেতরে পুরুষ ডাক্তার, নারী ডাক্তার, নার্স আর ওয়ার্ড বয়—সবাই আছে, কিন্তু পরিবারের লোকের প্রবেশ নিষেধ। ফের রাগে দপদপ করে উঠল মস্তিষ্কের শিরা-উপশিরা।

​স্ফীত উদর আঁকড়ে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকা কৃষ্ণবর্ণা নারীটিকে একবার দেখেই মোত্তাকিন ঘুরে দাঁড়াল। ক্রুব্ধ চোখে চেয়ে গর্জে উঠে বলল,

—“এখানে কোনো ওয়ার্ড বয়ের প্রয়োজন নেই, সবাই বের হন, আমি আছি।”

​ডাক্তাররা কিছু বলল না। তারা ইতিমধ্যেই অবগত, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা সাবেক সিটি মেয়র মুহিত ইরতেজার গুন্ডা ছেলে।

প্রসব বেদনায় ছটফট করতে থাকা দিকদিশাহীন ইন্দুবালা তখন ব্যথায় হুঁশ হারাবার পথে। তার হুঁশহারা নিঃসঙ্গ বেদনাদায়ক দেহ হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল কেউ সবেগে তাকে শক্ত করে জাপ্টে ধরতেই। ভেসে আসে অস্থির কণ্ঠ,

—“এই ইন্দু, খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না? আর হবে না, ডাক্তাররা দ্রুত তোকে সুস্থ করে দেবে।”

​বলেই মোত্তাকিন টলটলে নেত্রে ফিরে তাকায় ডাক্তার দু'জনের দিকে। চোখেমুখে উপচেপড়া অস্থিরতা নিয়ে চেঁচিয়ে বলে,

—“ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি আমার মুখ দেখছেন, হ্যাঁ? বাচ্চা বের করছেন না কেন? এতক্ষণ লাগে কেন? দুই ঘণ্টা যাবৎ একটা মানুষ যন্ত্রণায় ছটফট করছে আর আপনারা ডাক্তার হয়ে তা নির্বিকার দেখছেন?”

​ডাক্তার গুরুগম্ভীর গলায় বললেন,

—“বিহেভ ইয়োর সেল্ফ! রোগীর ডেলিভারির এখনো সময় আছে। নরমাল ডেলিভারির জন্য এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণে সার্ভিক্স খোলেনি।”

​—“তো লাগবে না নরমাল ডেলিভারি, আপনারা সি-সেকশন করুন। কিন্তু তবুও ওর ব্যথা কমান।”

​ডাক্তার নাকোচ করে বললেন,

—“এখন আর সেটা পসিবল না।”

​মোত্তাকিনের অধৈর্যতা এবার অসহায়ত্বে পরিণত হলো। টলটল আঁখিদ্বয় থেকে কখন অশ্রু গড়ালো সে টের পেল না। সে রাগ ভুলে অনুনয় করে বলে,

—“এই ডাক্তার! ও এতক্ষণ ব্যথা সহ্য করতে পারবে না। ও অনেক শক্ত মেয়ে! কিন্তু আজ যখন এত ছটফট করছে, তখন ও ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে। কিছু করুন, নয়তো বিপদ হয়ে যাবে।”

​ডাক্তার নিজেও অসহায়ত্ব ভরা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,

—“বিপদ হবে না, আমরা আছি না? তার শারীরিক কন্ডিশন একদম ফিট। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সার্ভিক্স আট সেন্টিমিটার খুলছে, ততক্ষণে বেবি ডেলিভারি হবে না।”

​মোত্তাকিন ফিরে তাকায় ঘামে জবুথবু দুর্বল মেয়েটির পানে। অস্থির চিত্তে চোখেমুখে অজস্র আদর দিয়ে বলে,

—“এই ইন্দু, এমন করছিস কেন? একটু সহ্য করে নে, কিন্তু আমায় ছেড়ে কোথাও যাস না।”

​মোত্তাকিন ফের শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মেয়েটিকে। পুরো পৃথিবীর তিরস্কারকে তুচ্ছ করে অপয়া মেয়েটিকে আগলে নেয়া এই একটা মানুষ কখনো বলেনি ভালোবাসি। কিন্তু প্রতি মুহূর্তে কাজেকর্মে বোঝায়, তার মতো বিদঘুটে সৌন্দর্যের মেয়েটিকে ছাড়া ওর বাঁচা সম্ভব নয়। ব্যথাতুর চাহনিতে ইন্দুবালা স্মিত হাসল। ব্যথাগুলোও যেন ফিকে লাগছে শক্তিশালী সেই বক্ষবন্ধনীর উষ্ণতায়। ইন্দুবালা ভর ছেড়ে দেয় ছেলেটির দেহে। ক্ষীণ কণ্ঠে বলে,

—“এই কালো মেয়েটির দুনিয়া তুই। যেই দুনিয়ায় কেউ তাকে ঘৃণা করতে পারে না, অসম্মান করতে পারে না, দুঃখ দিতে পারে না। এই দুনিয়া ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না মোত্তাকিন। আমি আরেকটু বাঁচতে চাই এই সুন্দর, পবিত্র, স্নিগ্ধ দুনিয়ায়।”

​—“বাঁচবি, তুই অবশ্যই বাঁচবি। আমরা একসাথে বাঁচবো। যেই বাঁদর আসছে তাকে নিয়ে আমরা বাঁচবো। কেউ তোকে কোনোদিন কটু কথা বলতে পারবে না।”

​ইন্দুবালা স্মিত হেসে মাথা এলিয়ে দেয় বক্ষমাঝে। লেবার পেইন-এর সেই দুঃসহ ব্যথা সহ্য করার জন্য মোত্তাকিন নামক ওই মানুষটার একটু সঙ্গই যথেষ্ট ছিল। দেড় ঘণ্টার মাঝে সৃষ্টিকর্তা কালো মেয়েটির দুনিয়াটাতে চাঁদের ন্যায় আলো ছড়িয়ে দিয়ে একটা ফুটফুটে সন্তান দান করেন।

​রক্তমাখা দেহটি যখন বিকট চিৎকার করে কেঁদে ওঠে, মোত্তাকিন তখন বিশ্বজয়ের ন্যায় চিৎকার করে ওঠে বলে,

—“বাবু এসেছে ইন্দু, বাবু এসেছে। এই যে, এই যে আমার হাতে। আমার বাচ্চাটা সুস্থ-সবলভাবে এসেছে, ইন্দু।”

​কক্ষজুড়ে দীর্ঘ পাঁচ মিনিট যাবৎ বোকাসোকা আনন্দমুখর চিৎকার প্রতিধ্বনিত হলো। ইন্দুবালা বাচ্চার চিৎকার শোনার সাথে সাথে জ্ঞান হারিয়েছে। বাচ্চাকে সুস্থ-সবল হাতে পেয়েও মুহূর্তটিকে বিশ্বাস করে উঠতে না পারা মোত্তাকিন সরব হকচকিয়ে গেল ইন্দুবালার অচেতন হওয়ায়। সে বাচ্চা ভুলে চেঁচিয়ে উঠল,

—“আমার ইন্দু! এই ডাক্তার, আমার ইন্দুর কি হলো? ও চোখ বন্ধ করে নিলো কেন? এই ইন্দু চোখ খোল, চোখ খোল! আমরা জিতে গিয়েছি তো দেখ। বাবু এসে গিয়েছে, সব ব্যথা সেরে যাবে এখন, ওঠ।”

​ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে শান্ত করে বললেন, সে ঠিক আছে শুধু অচেতন আছে। একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে। আশ্বস্ত মোত্তাকিন ঘাড় নুইয়ে টলমলে দুই হাতের তালুতে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলে,

—“ছোট্ট একটু ইঁদুর ছানা! এতটুকু দেহ নিয়ে পৃথিবীতে আসতে মাকে এত কষ্ট দিলি কেন? দেখেছিস কি অবস্থা করেছিস আমার বউটার? এইসব মনে থাকে যেন, বড় হলে মাকে অনেক অনেক ভালোবাসতে হবে। সারাজীবন যত কষ্ট পেয়েছে তা সব পূরণ করে দিতে হবে ভালোবেসে।”

​ছোট্ট বাচ্চা ছেলেটি ভদ্র ছেলের মতোই বাবার কথা মাথা পেতে নিয়েছিল। সে মাকে ভালোবাসা দিয়েছে, যতটুকু ভালোবাসা দিলে মায়ের পৃথিবী থেকে সকল অভিশপ্ত কটূক্তিগুলো মুছে যায়। আজ ইন্দুবালার সত্যিই কোনো আক্ষেপ নেই জীবন নিয়ে, বরং নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয়।

​স্মৃতিচারণ থেকে বেরিয়ে আসে ইন্দুবালা। দোতলার পোর্চ থেকে তাকায় বাগানের গাছের আড়ালে লুকিয়ে আরামসে সিগারেট ফুঁকতে থাকা ছেলেটির দিকে। অতঃপর মৃদু হেসে হাতের এক বালতি পানি সর্বোচ্চ শক্তিতে ছুঁড়ে মারলো। নিজ কর্মে নিমগ্ন মোত্তাকিন হঠাৎ হকচকিয়ে গেল নিজেকে আপাদমস্তক কাকভেজা দেখে। সে চকিতে এদিক-ওদিক তাকায়। কঠোর দৃষ্টি এঁটে যায় দোতলার পোর্চে বালতি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে।

রাগে খেকিয়ে উঠে বলে,

—“বেয়াদব মেয়ে! থাপড়ে দাঁত ফেলে দেবো। এটা কি করলি? আমি অফিসে যাবো... মেজাজটা খারাপ হয় না? ইচ্ছে করছে তোর হাত-পা ভেঙে দিতে অসভ্য মেয়ে! আহ্লাদ দিতে দিতে কি মাথায় উঠে গিয়েছিস, হ্যাঁ? তুই কোন আক্কেলে এই কাজ করলি?”

​মোত্তাকিন রাগে একাধারে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। ইন্দুবালা নির্বিকার তাকিয়ে বলল,

—“আসিস হাত-পা ভাঙতে আর দাঁত ভাঙতে—তোর মাথা ফাটিয়ে দেবো বেয়াদব, মাওয়ালী! তুই সিগারেট খাচ্ছিস কোন সাহসে? সেদিন কথা দিয়েছিলি না আর সিগারেট ছুবি না?”

​—“তোর কথার নিকুচি করি! সবসময় কি খাই? মাসে একটা দুইটা খাই।”

​—“যেই পুরুষের নিজের স্ত্রী-সন্তানের প্রতি ভালোবাসা থাকে, সেই পুরুষ কোনোদিন সিগারেট মুখে তুলতে পারে না।”

​মোত্তাকিন শার্ট খুলতে খুলতে খেকিয়ে উঠে বলল,

—“তো আমি কখন বলেছি যে তোদের মা-ছেলেকে আমি ভালোবাসি? কখনো বলেছি?”

​ইন্দুবালা জবাব দিলো না কিংবা জবাব দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব হলো না। দরজার আড়াল থেকে ছোট্ট একটা স্নিগ্ধ মুখ বেরিয়ে আসতেই রাগে ক্ষোভে গজগজ করতে থাকা মোত্তাকিন ফোঁস ফোঁস করে থেমে গেল। আড়চোখে দেখে ছেলের কঠোর দৃষ্টি। মিশাল থমথমে মুখে বাবার পানে তাকায়। গম্ভীর গলায় শুধায়,

—“থ...থুমি কি আমাল মাম্মাকে বকা দিয়েছো? টুই বলেচো? কেন বলেচো? কোন ছাহছে বলেচো? স্যলি বলো।”

​উদাম দেহে মোত্তাকিন কোমরে হাত দিয়ে তাকায় ইন্দুবালার হাসি হাসি মুখের পানে। তেরছা চোখে চেয়ে বলে,

—“ভালোই তো! ছেলেটাকে পুরো নিজের নেওটা বানিয়ে নিয়েছিস দেখছি। এখন সে বাপকে ধমকায়! বাহ্ বাহ্! আমার আহ্লাদ আমার উপরেই ভারী পড়ছে।”

​ইন্দুবালা মুখ বিকৃত করে বলল,

—“আপনার আহ্লাদ কেউ চেয়েছে জনাব?”

​—“কি হলো, মাম্মাকে স্যলি বলো?”—কথার মাঝেই ছেলের পুনরায় চিৎকারে মোত্তাকিন খেকিয়ে উঠে বলল,

—“না বললে কি করবি?”

​মিশাল ঠোঁট চেপে চঞ্চল দৃষ্টি ফেললো। কি করবে তা তো খুঁজে পাচ্ছে না। তাই সে হন্তদন্ত হয়ে রেগে বলল,

—“আমি কান্না কলব। জোলে জোলে কান্না কলব।”

​—“কর, তাড়াতাড়ি কর।”—মোত্তাকিন মুখ বিকৃত করে বলেই গটগট করে ঘরে ঢুকে গেল। দোতলায় উঠতে উঠতে খুন্তি হাতে মা ছুটে নামছে নিচে।

​মধুমিতা ছেলের এহেন রূপ দেখে শুধায়,

—“কিরে, তোর এই অবস্থা কেন?”

​—“তোমার আদরের বউমা করেছে। আদরে আদরে বাঁদর বানিয়েছো না? এখন বাঁদরামি করে আমার সাথে। অসহ্য!”—সে ক্ষেপতে ক্ষেপতে ঘরে চলে যায়।

​ইন্দুবালা পোর্চ থেকে কাপড়চোপড় নিয়ে ফিরে তাকাতেই দেখলো ছেলেটা আঁচল ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ওদিকে মায়ানের অজস্র ডাক শোনা যাচ্ছে। এমনি সবার ডাক উপেক্ষা করে সবসময় সে মায়ের আঁচল ধরে ঘুরে বেড়ায়। ইন্দুবালা মৃদু হেসে কোলে তুলে নিলো। আদুরে গলায় বলে,

—“ভাইজান ডাকছে যাবে না?”

​মিশাল ততক্ষণে কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়েছে। অলস কণ্ঠে বলে,

—“মা থাকি।”

​—“মা থাকবে?”

​—“হুঁ।”

​—“কেন, খেলবে না?”

​—“না, মা থাকি।”

​—“আচ্ছা, থাকো। কিছু খাবে?”

​ছেলেটি মুখ তুলে তাকালো। উৎসুক নয়নে চেয়ে বলল,

—“কোকু?”

​সহসা ইন্দুবালা মুখশ্রী গম্ভীর করে নিলো। কঠিন গলায় বলল,

—“নো বেভারেজ। কোনো কোক নয়, জুস খেতে চাইলে বলতে পারো।”

​বাচ্চা ছেলেটি মুখ ভার করে নিলো। ইন্দুবালা চলতে চলতে বলল,

—“চলো জুস খাবে।”

​ছেলেটি দ্বিমত করলো না। মা তার কিছু সংখ্যক আবদার পূরণ করে না সে ইতিমধ্যেই বুঝে গিয়েছে। সে ঘরে কাপড়চোপড় রেখে বের হতে গেলেই কারোর হাঁক কানে আসে।

​—“এই ইন্দু, এদিকে আয়।”

​ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে তাকায় ওয়াশরুমের বদ্ধ দরজার দিকে। শুধায়,

—“কি সমস্যা?”

​—“এদিকে আয়।”

​—“কেন?”

​—“আসতে বলেছি আসবি, কেন কি?”

​—“বাবু কোলে। কি লাগবে বল।”

​ছেলেটির কথার সুর পাল্টালো।

—“ওকে রেখে এসো।”

​ইন্দুবালা বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিচে গেল। মধুমিতা আর অনু রান্নার তোড়জোড় করছে। সে মধুমিতাকে বলল,

—“মা, ওকে একটু জুস খাওয়াবে?”

​মধুমিতা হাসিমুখে বলল,

—“হ্যাঁ হ্যাঁ দে। এসো দাদুভাই।”

​—“আমি একটু পর আসছি।”

​—“যা যা, রান্নাঘরে কোনো কাজ নেই তোর।”

​—“কেন?”

​—“রান্নাঘরে তিনজনের কি কাজ? আমি একাই পারি।”

​—“বয়স হয়েছে তোমার, এখন আমি আর ভাবিই তো রান্না করতে পারি।”

​—“ইন্দু ঠিক বলেছে মামনি। আগে তো আমি একাই সবার রান্না করতাম, আমি সব পারি।”—অনু হাসিমুখে বলল।

​—“শাশুড়ি যতদিন আছে ততদিন শান্তি করে নাও। আমি না থাকলে সব তোমাদেরই করতে হবে।”

​মধুমিতার কথায় ইন্দুবালা আর অনুর মুখে বিষণ্ণতা ছেয়ে গেল। যেখানে সকলের কাছে শাশুড়ি এক বিতর্কিত সত্ত্বা, সেখানে তাদের কাছে তাদের শাশুড়ি সকল সুখের মূল। ইন্দুবালা রাগান্বিত দৃষ্টি ফেলে বিনা বাক্যব্যয়ে গটগট করে চলে গেল।

​উপরে আসতে আসতে কান পাকিয়ে দিলো মোত্তাকিনের ষাঁড়গরুর মতো চিৎকার। সে নিজের ঘরে এসে বিক্ষিপ্ত কণ্ঠে শুধায়,

—“কি চাই?”

​ওয়াশরুমের দরজাটি খুলে গেল অলসগতিতে। ভেসে ওঠে এক মিচকে শয়তানের চেহারা। দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো অর্ধনগ্ন সুবিশাল দেহটি দেখে ইন্দুবালা চোখমুখ কুঁচকে বলল,

—“এতক্ষণ ভেজা শরীরে কি ফ্যাশন করছিস?”

​মোত্তাকিন হাতে সাবান ঘষতে ঘষতে আড়চোখে চেয়ে আদেশের সুরে বলল,

—“কাপড়চোপড় আন।”

​—“এইটুকুর জন্য এতক্ষণ যাবৎ এমন করছিলি?”

​—“মেয়েমানুষ কত কথা বলে! তোকে যেটা বলছি সেটা কর না ভাই!”

​—“আমি ভাই?”

​—“ওরে ইন্দুরে, হাতে সময় নেই তাড়াতাড়ি আন।”

​—“কেন, এটা আগে নিয়ে নিতে পারলি না?”—ইন্দুবালা বলতে বলতে কাপড়চোপড় বের করে এনে দেয়। মোত্তাকিন দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলল,

—“ওখানে ঝুলিয়ে রাখ, আমার হাতে সাবান।”

​ইন্দুবালা নির্বিকার কাপড় ঝুলিয়ে রেখে বের হতে নিলে বুঝলো তার মাথা ইদানিং কম কাজ করছে। বাথরুমের দরজাটি স্বশব্দে বন্ধ হয়ে যেতেই ইন্দুবালা দাঁতে দাঁত চাপলো। সে কেন এতক্ষণ বুঝতে পারলো না এই ধুরন্ধর ছেলে তাকে শাস্তি না দিয়ে বাড়ি থেকে বের হবে না। সে ঘাড় ঘুরিয়ে করুণ চোখে তাকায়। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ছেলেটি গা দুলিয়ে হাসছে। সে রাগান্বিত স্বরে বলল,

—“দেখ আমায় এখন রান্না করতে হবে, বাবুকে গোসল করাতে হবে, অনেক কাজ আছে।”

​—“সেটা আমার সাথে লাগতে আসার আগে মনে করা উচিত ছিল।”—মোত্তাকিন সাবান ঘষতে ঘষতে এগিয়ে আসে। ইন্দুবালা কাঁদো কাঁদো চোখে রাগ ঝেড়ে বলল,

—“আমি কি ইচ্ছে করে করেছি? তুই সিগারেট কেন খেলি? তাই তো আমার রাগ হয়েছিল। যেতে দে।”

​ততক্ষণে নৈকট্য সীমান্ত অতিক্রম করে নেয়। মেয়েটির পিঠ ঠেকে দেয়ালে, দৃষ্টি আরো করুণ হয়। রাগে টলটলে সেই আঁখিদ্বয়ে চোখ রেখে মোত্তাকিনের মনে হলো যা হয় ভালোর জন্যই হয়। সে চোখে হেসে শুধায়,

—“এখন রাগের মাশুল দে। মাসে দু'টো সিগারেট খেলে কি হয়?”

​—“মাসে দু'টো, আমার চোখের আড়ালে চারটা। একমাসে মোট ছয়টা। বারো মাসে বাহাত্তরটা সিগারেট যথেষ্ট আমাদের সুখ ছিনিয়ে নেয়ার জন্য।”—মেয়েটির চোখে নিজেকে হারিয়ে ফেলার অদ্ভুত ভয়। মোত্তাকিন স্মিত হেসে সাবানযুক্ত হাতটি রাখে মেয়েটির গালে। ক্ষীণ স্বরে বলে,

—“সিগারেট খেতে ভালোলাগে। দারুণ মাইন্ড ফ্রেশ করে।”

​—“এটা ব্যতীত অন্যকিছু তো খাওয়া যায় যাতে মাইন্ড ফ্রেশ হয়।”

​—“যায়, কিন্তু তা কি সবসময় পাওয়া যায়?”

​—“কি সেটা? কেন পাওয়া যায় না?”

​অবুঝ প্রশ্নে অলস গতিতে মেয়েটির ললাটে ললাট ঠেকলো। ভেজা চুল বেয়ে টুপটাপ গড়িয়ে পড়া পানির ফোঁটাগুলো অনাদরে ছুঁয়ে যাচ্ছে কালচে মুখটি। শাড়ি ছাপিয়ে পিচ্ছিল এক হাত অলসতার সাথে ছুঁয়ে যাচ্ছে উন্মুক্ত উদর। অন্যহাতটি মেয়েটির ওষ্ঠাদ্বয়ে আলতো ছুঁয়ে যাচ্ছে। প্রশ্নের জবাব পেতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটি চোখ বন্ধ করে নেয়। ক্ষীণ স্বরে বলে,

—“আমার অনেক কাজ আছে। বাবুকে গোসল করাতে গেলে আবার ভিজিয়ে দেবে।”

​—“রাজাকার এসেছে পর থেকে তুই আমায় যাচ্ছেতাইভাবে উপেক্ষা করছিস ইন্দু, দিস ইজ নট ফেয়ার। ওটাকে আমিই এনেছি, অথচ ওটা আমার বিরুদ্ধেই সারাদিন পরিশ্রমী সৈনিকের মতো কাজ করে যাচ্ছে।”

​সরব একটা ব্যথাহীন আঘাত ছুঁয়ে গেল কাঠের ন্যায় পুরুষালী শক্ত উদর। ইন্দুবালা রেগে বলল,

—“ওটা ওটা করবি না, তোর ওটা আমার জলজ্যান্ত সোনা বাচ্চা।”

​মোত্তাকিন হেসে ওঠে। একটুও ইচ্ছা হলো না এই মুহূর্তে ছেলেকে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে দিতে। তর্ক-বিতর্কগুলো সেখানেই থমকালো। ওষ্ঠদ্বয়ে হঠাৎ ছুঁয়ে যাওয়া গভীর স্পর্শগুলো কিয়ৎকালের জন্য একে অপরকে তীব্রভাবে সন্নিকটে টেনে নিলো। পুরুষালী সুগন্ধিগুলো ততক্ষণে নারীদেহ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো। মেয়েটিকে বাধ্য হয়ে ভুলতে হয় সকল বিরক্তি, সকল কাজের চাপ। থাকুক না কিছু অবহেলিত সময় সকল দায়িত্ব-কাজ ছাপিয়ে।

​অবহেলিত সময়গুলো একটু বেশিই দীর্ঘায়িত হলো। দীর্ঘ ত্রিশ মিনিট বাদ মোত্তাকিন হেলেদুলে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। এক মিনিট বাদ পুনশ্চ গিয়ে দাঁড়ায় ওয়াশরুমের দরজার সামনে। ফিচলে হেসে কাকভেজা রাগান্বিত মেয়েটির দিকে শাড়ি আর প্রয়োজনীয় সবকিছু ছুঁড়ে মেরে বলল,

—“তোর ছেলে ম্যা ম্যা করছে, তাড়াতাড়ি বের হ নয়তো একটু পরেই কেঁদে ভাসাবে। বান্দা মাকে ছাড়া দশ মিনিট খেলে না—অথচ ঘরভর্তি খেলনা। আর যদি খেলনা কিনেছি তবে আমার নাম মোত্তাকিন না।”

​সিক্ত বদনে ইন্দুবালা উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলো। মোত্তাকিন হেসে পোশাক পরিবর্তন করে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়। বের হতেই ছুটন্ত ছোট্ট ছেলেটির পথ আটকে দাঁড়ালো। চোখ টলটল করছে। সে হাঁটু গেড়ে বসে চোখে পানি দেখে হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিলো। আফসোসে জর্জরিত কণ্ঠে বলতে লাগলো,

—“মায়ের থেকে দুই মিনিট দূরে থাকলে চোখে পানি এসে যায়। আর আমি এক সপ্তাহ বাড়িতে না থাকলেও একটু জিজ্ঞাসা করা হয় না বাপ কোথায়? বাহ্ রাজাকার! তোকে নিজের হাতে দুনিয়ায় এনেছি আর তুই কি রূপটাই না দেখাচ্ছিস। তোর মাকে খেয়ে ফেলেছি।”

​—“এগুলো না বলে, একটু সুন্দর করে বোঝাতেও তো পারতি যে মা আসছে।”—ইন্দুবালা মাথায় কাপড় টেনে করিডর পেরিয়ে এগিয়ে আসে। মোত্তাকিন কপাল কুঁচকে তাকায় তার পানে। বলে,

—“তোদের মা-ছেলেকে আহ্লাদ না দিলে একটাও ভালো ব্যবহার করিস না। তোরা দুটোই সুবিধাবাদী লোক! সারাক্ষণ মুখে মধু নিয়ে ঘুরতে হবে নাকি?”

​ইন্দুবালা হতাশার দৃষ্টি ফেলে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিলো। অসন্তোষের সাথে বলল,

—“একটু জেন্টেলম্যান হ।”

​—“তুই বিয়ে করেছিস একটা গুন্ডাকে আর আশা করিস একজন জেন্টেলম্যান-এর মতো ব্যবহার? বেকুব নারী!”—পরপরই ছেলের কুচকানো মুখটির দিকে গাল এগিয়ে দিয়ে বলল,

—“এই ইঁদুর ছানা, একটা চুমু দে।”

​মিশাল দিলো না বরং থমথমে মুখে মায়ের কাছে বিচার দিয়ে বলল,

—“বাবা পঁচা কতা বলে।”

​ইন্দুবালা তৎক্ষণাৎ নাকোচ করে বলল,

—“না বাবা এমনি, বাবা পঁচা কথা বলে না। দাও বাবাকে আদর করে দাও।”

​মোত্তাকিন দাঁত খিচে বলল,

—“কি ছেলে! মা না বললে বাপকে আদর দেয় না। আমার রক্তে নিশ্চিত কোনো ভেজাল আছে, ইন্দু।”

​—“তোর রক্তে না, তুই পুরোটাই ভেজালযুক্ত।”—ইন্দুবালা চাপা স্বরে বলল। মোত্তাকিন রেগে দিলো এক চাটি তার মাথায়। পরপরই ছেলেকে বলে,

—“সোজাসুজি আদর দে বলছি, তাহলে একটা বউ এনে দেবো।”

​মিশাল পিটপিট করে চাইলো। সাগ্রহে শুধালো,

—“বউ কি?”

​—“এই যে আমার বউ, যা নিয়ে তুই টানাটানি করিস। বেতমিজ! অন্যের বউ নিয়া টানাটানি করতে লজ্জা করে না? ওকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেবো ইন্দু, তবে আর তোর আমার মাঝে আসবে না।”

​মিশাল অবুঝ নয়নে মায়ের পানে তাকায়। ইন্দুবালা অতিষ্ঠ হয়ে ডানে-বামে মাথা নাড়লো। ছেলেকে বুঝিয়ে বলল,

—“বাবা বাইরে যাচ্ছে, বাবাকে আদর করে দাও।”

​মোত্তাকিন গাল বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

—“তাড়াতাড়ি দে, একটা সুন্দর বউ এনে দেবো।”

​মিশাল মায়ের কথামতো চুমু দিলেও মোত্তাকিন হৈ হৈ করে বলল,

—“দেখলি? বউয়ের কথা বলেছি পর চুমু দিয়েছে। ছেলেকে এত ভালোবাসিস না ইন্দু। তোর ছেলে একদিন তোর সাথেও গাদ্দারি করবে দেখিস, তাও আবার পরের মেয়ের জন্য।”

​মধুমিতা তখন উপরেই উঠছিল। পথিমধ্যে ছেলের এমন কথা শুনে পা থামিয়ে বললেন,

—“গাদ্দারি করাটা তো অস্বাভাবিক না আব্বা, রক্ত কথা বলে। ওর বাপও তো একটা পরের মেয়ের জন্যই একরাতের মধ্যে চাকরি জোগাড় করে এনেছিল, শপিং করে এনেছিল—বিয়ে করার জন্য। অথচ মাকে সারাজীবনেও একটা লাল সুতাও কিনে দেয়নি, বরং তার টাকা নিয়ে বিলাসিতা করে বেরিয়েছে।”

​মায়ের খোঁচায় মোত্তাকিন ত্যাক্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

—“বিরোধী দলে আরেকজন যুক্ত হয়েছে। হয়েছে হয়েছে আমিই দোষী, খুশি?”—বলেই সে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। ইন্দুবালা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে। মেকি বিষণ্ণ মুখে শুধালো,

—“মধু, তুমি কি আমার সাথে রেগে আছো নাকি?”

​মধুমিতা কোমরে হাত দিয়ে বললেন,

—“আরে তোর জামাইকে একটু শায়েস্তা করলাম। তোর সাথে রেগে থাকব কেন? তোর সুখ দেখলে এই মধু ছাড়া আর কারো চোখ জুড়ায় না, এটা মনে রাখিস।”

​—“আমি জানি তো!”—ইন্দুবালা গাল ভরে হেসে বলল।

​তখন প্রায় দুপুর বারোটা। মোত্তাকিন অফিসে ঢুকতেই সকলে এক পলক ফিরে তাকায়। বাপের অফিসে জমিদারি স্বাভাবিক হলেও ভাইয়ের অফিসে জমিদারি কিছুটা আশ্চর্য লাগে তাদের কাছে। তন্মধ্যে যদি সম্পর্কটা হয় সৎ ভাইয়ের। মোত্তাকিন নিজের রুমে ঢুকতেই মিরসাদের তলব আসে। সে অলস কদমে ভাইয়ের কক্ষে গিয়ে হাজির হলো।

—“আসতে পারি?”

​—“আরে আসুন স্যার! অনুমতি নেয়ার কি প্রয়োজন?”—মিরসাদ দাঁতে দাঁত চেপে বলল। মোত্তাকিন ভ্রু নাচালো। ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে কক্ষে ঢুকতেই শানিত দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলে যায়।

​—“ঘুম ভেঙেছে স্যার? এত তাড়াতাড়ি ভাঙলো কি করে?”

​মোত্তাকিন পা দোলাতে দোলাতে আড়চোখে তাকালো। মিনমিনে স্বরে সাফাই দিয়ে বলল,

—“একটু ঝামেলা হয়ে গিয়েছিল তাই আসতে দেরি হয়ে গিয়েছে।”

​—“সেটা নয়টার সময় মিটিং সেট করার আগে ভাবা উচিত ছিল না—যে আপনার ঝামেলা হতে পারে? নয়টার সময় আমায় ছুটতে ছুটতে আসতে হয়েছে আর আপনার মিটিং অ্যাটেন্ড করতে হয়েছে। যার কোথায় কি, আগামাথা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।”

​মোত্তাকিন এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফেললো। মিরসাদ রেগে গেল,

—“সোজা হও আর এদিকে তাকাও! এরপর থেকে ভেবেচিন্তে মিটিং সেট করবে যখন নিজে সময় দিতে পারবে।”

​—“আচ্ছা আচ্ছা।”

​মুহিত ইরতেজা ছেলের কক্ষে ঢুকতেই পথিমধ্যে ছোট ছেলের পাণ্ডুর মুখটি দৃষ্টি কাড়লো। সে পথ আটকে দাঁড়ায়, হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরে ছেলের হাত।

—“শরীর ঠিক আছে? মুখ এমন করে রেখেছো কেন?”

​—“কিছু হয়নি, ঠিক আছি।”—মোত্তাকিন অনাগ্রহে বলেই হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। মুহিত ইরতেজা ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেললেন। এত বছরের দূরত্বগুলো আড়াই বছরে না মিটলেও কিছুটা মসৃণ হয়েছে। সে জানে না, মৃত্যুর আগে তাদের মধ্যে বাবা-ছেলের সেই মধুর অন্তরঙ্গ, জড়তাহীন সম্পর্কটা হবে কি না!

​তারা তিন বাপ-ছেলেই এখন ইরতেজা কোম্পানির পেছনে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে আরো দৃঢ়ভাবে দাঁড় করাচ্ছে। এই কোম্পানির পেছনে বড় ছেলের সর্বোচ্চ এফোর্টস থাকলেও এর পেছনের অর্থের মূল জোগানদাতা মুহিত ইরতেজা নিজেই। চেয়েছিলেন, রাজনীতি ব্যতীত তাদের নিজস্ব একটা পরিচয় থাকুক। আজ সেটাই তাদের একমাত্র সম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

*****

​কৃষ্ণবর্ণা ইন্দুবালার ছোট্ট দুনিয়াটা এমনি গোছালো, প্রেমময়, খুনসুটিতে ভরপুর। যেই দুনিয়ায় কোনো প্রকার ক্লেশ ছুঁতে দেয় না মোত্তাকিন আর মিশাল। আগলে রাখার মতো এমন স্বামী আর সন্তান তার মতো প্রত্যেক ইন্দুবালার জীবনে আসুক।

​সন্ধ্যা নাগাদ সিদ্দিকী সাহেব নাতিকে নিয়ে হাজির হন। প্রতি অপরাহ্নে নানাভাইয়ের সাথে ঘোরাঘুরি করা মিশালের অভ্যাস। ইন্দুবালা মৃদু হেসে এগিয়ে যায় বাবার কাছে। আলতো স্বরে ডেকে ওঠে,

—“বাবা, ভেতরে এসো।”

​সিদ্দিকী সাহেব মৃদু হেসে বললেন,

—“আজ কাজ আছে রে মা। ওকে নে, খিদে পেয়েছে মনে হয়। যাই দিচ্ছিলাম খেয়ে নিচ্ছিল।”

​—“দুপুরে দু’টো খেয়েছে বাবা। বাপের মতো জমিদার হয়েছে, বাইরের খাবার বেশি পছন্দ।”

​—“এমন কথা বলে না আম্মা।”

​—“বলবো না তো কি বলবো বলো? ছেলেটাকে এইগুলোতে অভ্যস্ত করে তুলছে তোমার জামাই।”

​—“ছোট মানুষ তাই এগুলো খেতে পছন্দ করছে, বড় হলে ভালো-মন্দ যখন বুঝবে তখন ঠিক হয়ে যাবে।”

​—“ঘেমে আছো, একটু শরবত খেয়ে যাও অন্তত।”

​—“বললাম না তাড়া আছে? আজ আসি।”—বলেই সিদ্দিকী সাহেব পা বাড়ান, তবে তার পথ আটকে দিলো অনুর চঞ্চল কণ্ঠ।

—“কোনো আসি নেই আঙ্কেল। নাতিকে নিয়ে ঘুরেছেন কষ্ট হয়ে গিয়েছে না? একটু শরবত না খেয়ে যেতে পারবেন না। আসুন ভেতরে।”

​—“এই যে সিদ্দিকী সাহেব, আপনি আমার বেয়াই হওয়ার আগে আমার প্রতিবেশী। আমার বিপদ-আপদের সঙ্গী ছিলেন। তাই কখনো এখানে এসে না বসে যেতে পারবেন না। তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকুন।”—মধুমিতার গুরুগম্ভীর কণ্ঠে সিদ্দিকী সাহেব মৃদু হাসলেন। অগত্যা তাকে ঢুকতেই হলো। মিশাল দাদুকে ঢুকতে দেখে হাসিমুখে বলল,

—“নানুভাই যাবে না।”

​—“না, নানুভাই তোমার কাছে থাকবে।”—ইন্দুবালা মৃদু হেসে বলল।

​মোত্তাকিনের ফিরতে প্রতিদিনের মতো রাত বারোটা বেজে গেল। ঘরে ঢুকতেই বরাবরের মতো পিনপতন নীরবতায় কারোর মন খারাপের সুর কর্ণকুহরে আন্দোলিত হয়। মোত্তাকিন পায়ের গতি বাড়ায়। কিছুটা হাওয়ার গতিতে নিজের ঘরে পৌঁছালে অপেক্ষারত কেউ ঝাঁপিয়ে পড়লো তার বুকে। ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে গেল ছেলে হেঁচকি তুলে কেঁদে উঠতেই।

—“দেলি দেলি কলেচো কেন? কেন বাইলে যাও?”

​ইন্দুবালা ডানে-বামে মাথা নেড়ে বিছানা করতে নিলো। মোত্তাকিন মৃদু হেসে কান্নারত মুখশ্রী মুছতে মুছতে বলল,

—“রাত হলে বাপের প্রতি আপনার এত ভালোবাসা আসে কোত্থেকে আমি বুঝিনা বাপ! নাকি ঘুমে মাথা এলোমেলো হয়ে যায়?”

​মিশালের জবাব আসে না। সে ইতিমধ্যেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁধ-মাথা এলিয়ে দিয়েছে। রাতটুকুতে এই ছেলেটাকে কেউ সামলাতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত না নাসারন্ধ্রে বাবার গন্ধ প্রবেশ করে। দিনশেষে এই বুকটিই যে মা-ছেলের সবচেয়ে সুরক্ষিত জায়গা। মোত্তাকিন সব ছেড়ে ঘরের আলো নিভিয়ে ঘরময় হাঁটতে লাগলো।

​ক্লান্ত ইন্দুবালা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। বিগত দুই বছর যাবৎ ফরমাল শার্ট আর ইন করা প্যান্ট পরা এই ফরমাল বেশভূষার ছেলেটিকে দেখে চক্ষু শীতল হয় তার। শুধায়,

—“খাবার নিয়ে আসি এখানে?”

​মোত্তাকিন নাকোচ করে বলল,

—“উহু, খেয়ে এসেছি।”

​ইন্দুবালার স্বস্তি হলো। সে ধপ করে শুয়ে পড়লো। তা দেখে মোত্তাকিন কপাল কুঁচকে নিলো কিন্তু কিছু বলল না। মোত্তাকিনের মতো তার ছেলেও ভীষণ দুরন্ত ও জেদি, তাকে সামলাতে মাঝেমধ্যেই বেগ পেতে হয় ইন্দুবালাকে। আজ ও তেমনি একটা দিন ছিল। ভীষণ ক্লান্ত থাকায় ইন্দুবালা বিছানায় পড়ার সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু তার ক্ষণিকের ঘুমে যারপরনাই বিরক্তি সৃষ্টি করে কেউ বিকৃত কণ্ঠে ডেকে উঠল।

—“এই ইন্দুর বাচ্চা ওঠ! তোর রাজাকার ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে, চল একটা বাইক রাইড দিয়ে আসি।”

​রাত দেড়টার সময় এহেন প্রস্তাবে তন্দ্রাচ্ছন্ন ইন্দুবালা হরহামেশা খুশি হলেও আজ খুশি হলো না। বরং তেতে ওঠে ছেলেটার উপর। সারাদিন এসব বিকৃত কথা শুনতে কার ভালো লাগে! সে সরব চোখ খুলে ক্ষিপ্ত হস্তে ছেলেটির কলার চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলে,

—“সবসময় আমার ছেলেকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলবি না মোত্তাকিন। আমার অতটুকু ছেলেকে নিয়ে তুই সবসময় এমন করিস কেন?”

​মোত্তাকিন কপাল কুঁচকে আধশোয়া মেয়েটির উপর থেকে খানিক সরে আসে। আঁধারে রাগান্বিত মুখটির চোয়াল চেপে ধরে গনগনে কণ্ঠে বলল,

—“তোর ওই তিন ফুটের লিলিপুট ছেলে আমার বউকে আমার থেকে বেশি ভালোবাসে ইন্দু। মেজাজটা ঠিক এখান থেকেই খারাপ হয়! আমার বউকে আমার থেকে বেশি ও ভালোবাসবে কেন? আমি আছি কি করতে?”

​ক্রুদ্ধ ইন্দুবালা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ছেলেটির দিকে। বউটাও ওর, বাচ্চাটাও ওর, অথচ চোখেমুখে কি বিদ্বেষ! সে চোখমুখ কুঁচকে বলল,

—“পাগল তুই? তোর লজ্জা করে না নিজের ছেলেকে হিংসা করতে?”

​—“ওটা আমার ছেলে? আমার ছেলে হলে তো বাপের প্রতি একটু টান থাকতো। সারাদিন করে ম্যা ম্যা!”—মোত্তাকিন রাগ ঝেড়ে বলল। ইন্দুবালা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে কলার ছেড়ে দিয়ে বলল,

—“তোর যেখানে ইচ্ছে হয় তুই যা। আমি যাব না কোথাও, আমার ক্লান্ত লাগছে।”

​—“চুপচাপ আসবি না-কি তুলে নিয়ে যাব? দুই মিনিট সময় তোর কাছে। এমনিতেই ওই রাজাকারের জন্য তোকে ভাগে পাই না। এখন যদি ঢং করিস মা-ছেলের খবর আছে!”

​ইন্দুবালা বদ্ধ নেত্রে হেসে উঠল দামড়া ছেলেটার হিংসায় ভরপুর কণ্ঠে। তবুও পড়ে রইলো বিছানায়। অধৈর্য মোত্তাকিন এবার ঝট করে মেয়েটিকে কোলে তুলে নিলো। ঘর থেকে বের হয়ে মায়ের ঘরের সামনে গিয়ে হাঁক ছেড়ে বলল,

—“মামনি, আমি আর ইন্দু একটু ঘুরে আসি, তোমার নাতিকে দেখো। ঘরে একা!”

​সদ্য তন্দ্রাচ্ছন্ন মধুমিতা ধড়ফড়িয়ে উঠলেন তার চিৎকারে। নাতি একা সেই চিন্তায় ছুটে বের হন ঘর থেকে। সদ্য হাত-মুখ ধুয়ে বের হওয়া মুহিত ইরতেজা মৃদু হাসলেন আজও মধুমিতাকে চঞ্চল-প্রাণবন্ত দেখে। ঠিক এমনি এক সত্তার কারণেই নিষিদ্ধ সত্ত্বেও সে এই নারীটির প্রেমে পড়েছিল। সে জানে সে অপরাধী, সবটা ভুল, শাস্তিযোগ্য, শাস্তিও পেয়েছে—তবুও শেষ সময়টাতে চঞ্চল রমণীটি তার। গোটা জীবন নিয়ে তার আর কোনো আক্ষেপ নেই।

​মধুমিতা ঘুমন্ত নাতিকে নিয়ে নিজের ঘরে চলে আসেন। নাতিকে বুকে জড়িয়ে বিছানার এক কিনারায় শুতেই রোজকার মতো বিরক্তি সৃষ্টি করে তাকেও দু'টো হাত জড়িয়ে নিলো। দুই বছরে এই এতটুকু বিরক্তি গলধঃকরণ করতে করতে তার রাত কেটে যায়। কখনো শান্তির ঘুম ঘুমাতে পারেনি, আজও অপরাধবোধ ও ঘৃণা তাকে তাড়া করে বেড়ায়। সে কারো ঘর ভেঙেছে, কাউকে কষ্ট দিয়েছে। এই এক কথা তার মস্তিষ্ক দাপিয়ে বেড়ায়। আজও ঘুমাতে পারে না মধুমিতা, ছটফট করে। একটা সময় অনুনয় করে বলে,

—“দয়া করে আমার গা থেকে নিজের হাত সরান, আমার শরীরটা খারাপ লাগছে ঘুমাবো।”

​মুহিত ইরতেজা ম্লান হেসে বললেন,

—“আমি কি ঘুমাতে বারণ করেছি?”

​—“আপনার ঘৃণ্য ছোঁয়া যথেষ্ট আমার আরামের ঘুম কেড়ে নেয়ার জন্য।”

​—“মধু, আজও এত ঘৃণা?”

​মধুমিতা টলটলে নেত্রে চেয়ে বলল,

—“নারী হলে বুঝতেন, সমাজের জাঁতাকলে আমাদের অনুভূতিগুলো আজ কতটা বিতর্কিত। আর এই বিতর্কিত অনুভূতিগুলো কীভাবে আমাদের ঘুম কেড়ে নিতে পারে। দুনিয়ার মানুষগুলো শুধু যা ইচ্ছা তাই চাপিয়ে দিতে জানে, সইতে যে কত কষ্ট হয় তা কেউ বোঝে না। আমি শুধু ছেলে-মেয়েগুলোর সুখের জন্য একসাথে আছি এর বেশি কিছু না। আপনার সাথে সংসার করার ইচ্ছা আমি ত্রিশ বছর আগেই ত্যাগ করেছি। এ জীবনে আর সেই ইচ্ছা জোগাতে পারব না।”

​মুহিত ইরতেজার হাত দুটো ঢিলা হয়ে গেল। আর শক্তি হলো না নারীটিকে আঁকড়ে ধরে একটু শান্তির ঘুম ঘুমানোর। হাজার মাইল দূরত্ব সহিত যদি পাশে থাকে তবে থাকুক। অন্তত শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময় প্রিয় নারী পাশে থাকবে। হয়তো কখনো আফসোস হবে, কিন্তু তা দেখার জন্য বোধহয় সে থাকবে না। কিংবা ঘৃণাগুলো আফসোসের থেকে তীব্রতর!

​পুরো রাইডটাতে মোত্তাকিনের পিঠে গাল দাবিয়ে শুয়ে থাকা ইন্দুবালার তন্দ্রাচ্ছেদ ঘটলো যখন বাইকটা থামলো।

—“নাম।”

​ইন্দুবালা ঝাপসা চোখে চারিপাশে তাকালে ঘুম ছুটে গেল। হাইওয়ের পাশে বিশাল খালি মাঠের মাঝে একটা টং-এর দোকান দেখে। তার চেয়েও বেশি অবাক হলো মাঠের মাঝে একটা ক্যান্ডেল লাইট ডিনারের ন্যায় টেবিল সাজিয়ে রাখা দেখে। সে কপাল কুঁচকে তাকায় ছেলেটির পানে।

—“এখানে কেন এনেছিস?”

​—“চা খেতে।”

​—“ওখানে অমন করে ফুল, গিফট দিয়ে সাজানো কেন?”

​—“তোর জন্য অন্তত অত সুন্দর জিনিসপত্র না। আয় চুপচাপ।”—মোত্তাকিন নির্বিকার এগিয়ে যায়। টং-এর দোকানে বসে রেডিওতে গান শুনতে থাকা বয়স্ক লোকটি মৃদু হেসে বললেন,

—“মোত্তাকিন আব্বা, আসছো?”

​—“জি চাচা, দু’টো কড়া লিকারের চা দেবেন। একটা দুধ চা।”

​মোত্তাকিন গিয়ে সাজিয়ে রাখা টেবিলের একটা চেয়ারেই বসে পড়লো। ইন্দুবালা তড়িঘড়ি করে বলল,

—“এই ছেলে ওঠ ওখান থেকে! কারোর বিশেষ মানুষের জন্য সাজিয়ে রেখেছে হয়তো। ওঠ ওঠ, দেখলে কি ভাববে?”

​—“সেটাই, কারোর বিশেষ মানুষের জন্যই! এখন চুপচাপ বসে পড়।”

​ইন্দুবালা সতর্ক দৃষ্টি ফেলে বলল,

—“আমরা এখানে কেন বসবো? দেখেছিস তাজা ফুল, গিফট, কেক রাখা—কেউ এখুনি এসে পড়বে।”

​মোত্তাকিন এবার হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে সম্মুখের মেয়েটির দিকে তাকায়। আফসোসের সুরে বলে ওঠে,

—“তোর কি নিজেকে কখনো কারো বিশেষ মানুষ মনে হয় না? মনে হয় না কেউ তোকে তার জীবনের সবচেয়ে স্নিগ্ধ উপহার হিসেবে গণ্য করে?”

​ইন্দুবালা ঠোঁট উল্টে নির্বিকার বলল,

—“নাহ।”

​সহসা মোত্তাকিনের রাগ মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। সে সপাটে এক চড় বসায় মেয়েটির গাল বরাবর। রাগে গজগজ করতে করতে বলল,

—“তা মনে হবে কেন বেয়াদব? মাথায় তো ঘোরে মানুষের সব খারাপ কথাগুলো। ভালো কথা তো ঘোরে না। আমি এত ভালোবাসি, বিশেষ অনুভব করানোর জন্য এতকিছু করি তা চোখে বাঁধে না, তাই না? কেক দেখেছিস কিন্তু কেকের উপর কার নাম সেটা দেখিসনি, আন্ধা? মুডটাই নষ্ট করে দেয়।”

​ইন্দুবালা হতবাক হয়ে গেল হঠাৎ আঘাতে। কিন্তু ব্যথা অনুভব করতে ভুলে গেল যখন কেকের উপর নিজের নাম দেখলো।

“হ্যাপি অ্যানিভার্সারি ইন্দু”

​ইন্দুবালা অবাক হলো আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী মনে করে। তাজা গোলাপের তোড়া, গিফট, কেক—সে কত বিশেষ আর নিখুঁত আয়োজন! ইন্দুবালা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সবকিছুর দিকে। মোত্তাকিন রাগ দমিয়ে বলল,

—“কেক কাট।”

​ইন্দুবালা টলটলে নেত্রে চেয়ে বলল,

—“তা এভাবে বলছিস কেন? সুন্দর করে বলা যায় না? হ্যাপি অ্যানিভার্সারিও বলিস নি।”

​—“তুই মিষ্টি ভাষার যোগ্য না। আর ওখানে লিখে দিয়েছি না হ্যাপি অ্যানিভার্সারি? আবার বলা লাগবে কেন?”

​—“বলা আর লেখা কি এক কথা?”

​—“বলতে পারব না দেখেই লিখে দিয়েছি।”

​—“এসব করলি তো আমার ছেলেটাকে রেখে আসলি কেন? ও কেক কত পছন্দ করে!”

​মোত্তাকিন এবার কাঁদো কাঁদো চোখে তাকায়।

—“ওরে ইন্দু থাম! একটু সুন্দর করে কেকটা কাট। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ওই রাজাকারকে এনে কি করব? বলদ তুই? ঘরে কেক পড়ে আছে, দরকার পড়লে ওকে কাল কেক কিনে দেবো। তুই এখন একটু ভদ্র মেয়ের মতো সময়টাকে উপভোগ কর।”

​ইন্দুবালা মৃদু হেসে ভদ্র মেয়ের মতো মাথা নেড়ে কেক কাটতে নিলো।

—“হাত ধর, অ্যানিভার্সারি কি আমার একার?”

​মোত্তাকিন হাত ধরে। ইন্দুবালা কেক কেটে ছেলেটির মুখের সামনে ধরতেই সে নাক-মুখ কুঁচকে বলল,

—“এসব আমি খাই না।”

​—“তাহলে আনলি কেন?”

​—“তোর জন্য।”

​ইন্দুবালা স্মিত হেসে বলল,

—“তবে তুই তোর পছন্দের জিনিস খা।”

​মোত্তাকিন ফিরে তাকায় মেয়েটির পানে। ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,

—“কি খাবো?”

​ইন্দুবালা সতর্ক দৃষ্টি ফেললো চা বানাতে ব্যস্ত চা-ওয়ালার দিকে। অতঃপর ঝট করে মাথা নুইয়ে ছেলেটির ওষ্ঠদ্বয়ে শব্দ করে চুমু দিয়ে সরে আসে। মোত্তাকিন হতচকিত বড় বড় নেত্রে তাকায়। মেয়েটি লাজ লুকাতে দ্রুত হাতে গিফট খুলছে।

মোত্তাকিন সরব হেসে উঠল। ​ইন্দুবালা গিফট বক্স খুলতেই এক ঝাঁক বাহারি রঙের শাড়ি দেখে মৃদু হাসলো। সাথে ছোট্ট একটা চিরকুট।

“আর কি করে তোকে বোঝাবো তুই আমার সবচেয়ে বিশেষ, আমার প্রিয় মানুষ?”

​মোত্তাকিন চা আনতে গিয়েছে। ইন্দুবালা মুগ্ধ চিত্তে তাকিয়ে রইল সে পথে।

চায়ের আড্ডাটুকু নীরব আড্ডা হয়ে রয়ে গেল। কিন্তু মোত্তাকিন মোটেই লাজে জর্জরিত নারীটির অনুভূতিতে কোনো প্রকার বিঘ্ন ঘটালো না। বরং লাজটুকুই ছিল নতুন আরেক বছরের সূচনার রাতটুকু সবচেয়ে সুন্দর করে তোলার একমাত্র মাধ্যম।

​অনুভুতি আর কণ্ঠরা দলাপাকালো ঠিক শয়নকক্ষের প্রিয় জায়গাটিতে। আলসেমাখা নিশিথে দুটি দেহ-মন অনুভূতিতে গা ভাসালো। ভীষণ আলসে স্পর্শে ললাট ঠেকলো। অনুভূতির তীব্রতায় মেয়েটি আঁকড়ে ধরে গলদেশ। ক্ষীণ স্বরে বলে,

—“ভালোবাসি। ইদানিং কারো কটূ কথা গায়ে লাগে না, বরং নিজেকে আরো আত্মবিশ্বাসী লাগে কারো বিশেষ মানুষ যে!”

​পুরুষালী নাসারন্ধ্র থেকে দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসলো। ক্ষীণ স্বরে বলল,

—“অবশেষে!”

​ইন্দুবালা স্মিত হাসলো। কালচে মুখে অদ্ভুত এক সৌন্দর্য ভর করে যখন মেয়েটি হাসে। মোত্তাকিন চোখ মুদে নিলো সৌন্দর্যটুকু। আরো দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে, এই সৌন্দর্যটুকু লুফে নেয়ার জন্য হলেও তাকে সর্বদা এই মুখে হাসি ধরে রাখতে হবে। আজ প্রথমবারের মতো রগত্যাড়া ছেলেটিও স্বীকার করে নিলো অনুভূতিগুলোকে। অনুভূতির নাম দিলো ওই চিরচেনা বহুল প্রচলিত ‘ভালোবাসি’ শব্দটিকে।

—“ভালোবাসি।”

​ইন্দুবালা চমকে চোখ মেলে তাকায়। ইচ্ছে করছে শৈশবের ন্যায় সবাইকে ছুটে ছুটে বলতে,

—“দেখো দেখো, কাকের মতো কালো মেয়েটিকে কেউ কত ভালোবাসে!”

______________________সমাপ্ত___________________

রিচেক ছাড়া পর্ব। পরে রিচেক করব।

দুপুরে স্কুল থেকে ফেরার পর থেকেই ইন্দুবালা অস্বাভাবিক ভাবে মিইয়ে আছে। হাসিখুশি প্রাণবন্ত মেয়েটি দখিনা হাওয়ার সাথে মিলিয়ে গিয়েছে যেন।

বাবা ভাইয়ের উপর নিজের দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে মোত্তাকিন ফিরল রাত আটটা নাগাদ। হেলেদুলে ঘরে ঢুকতেই দেখল অনু আর মধু সোফায় বসে বসে ভীষণ মনোযোগ সহকারে স্টার জলসার সিরিয়াল দেখছে। অনু অবশ্য এই বাজে অভ্যাস রপ্ত করেছে শাশুড়ির থেকে।

ছেলেকে দেখতেই মধুমিতা হন্তদন্ত হয়ে বললেন,

- এই বাবু, শোন। ইন্দুবালার কী হয়েছে দেখ তো একটু। স্কুল থেকে আসার পর থেকে একদম চুপচাপ হয়ে গিয়েছে। চোখমুখ ও ফোলা ফোলা ছিল। কেঁদেছে মনে হয়। কিন্তু আমায় কিছু বলেনি।

মোত্তাকিন ভ্রু কুঁচকে নিয়ে বলল,

-ইন্দু কোথায়?

- ঘরে, সন্ধ্যা থেকে ঘুমাচ্ছে। আমার তো ভালো লাগছে না।

- আর বাবু?

- বেয়াইয়ের সাথে হাঁটতে বের হয়েছে।

মোত্তাকিন নির্বাক হয়ে নিজের ঘরে গেল। তবে গতিতে ব্যস্ততা। বিয়ের পর থেকে ওই দুঃখী মেয়েটিকে কোনো দুঃখ ছুঁতে দেয়নি। তবে আজ কেন সে দুঃখী?

সে কোট টাই খুলে সোফায় ছুঁড়ে মেরে বিছানায় শায়িত মেয়েটির মাথার কাছে হাঁটু গেড়ে বসল। গালে চাপড় মেরে ডাকল,

- ইন্দু? এই ইন্দু? ওঠ। কী হয়েছে?

লাগাতার ডাকাডাকিতে ইন্দুবালা ঘুম জড়ানো চোখ খুলে তাকালো। অচল মস্তিষ্কে মোত্তাকিনকে দেখতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল,

- তুই এসে পড়েছিস? কয়টা বাজে? আমি কতক্ষণ ঘুমালাম?

মোত্তাকিন তার একটি প্রশ্নের জবাব ও দিল না। ভূমিকাহীন জিজ্ঞেস করল,

- মন খারাপ কেন? কী হয়েছে? কোনো সমস্যা হয়েছে?

তার উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ইন্দুবালার মনে পড়েগেল দুপুরের তীক্ত কিছু ঘটনার কথা। বিচলন মিলিয়ে গেল। কালো কুচকুচে মুখটিতে মলিনতার আধিপত্যে বিশ্রী এক সৌন্দর্য ফুটে উঠল। ঠিক এই কারণেই মোত্তাকিন কখনো ইন্দুবালার মলিনতা সহ্য করতে পারে না। কেননা এই মেয়েটির সৌন্দর্য তার গায়ের রঙ নয় বরং তার মুখের হাসি।

সে আদুরে স্পর্শে গালে হাত রাখে। নম্র স্বরে পুনরায় জিজ্ঞেস করে,

- কী হলো এমন মুখ মলিন করে রেখেছিস কেন? কিছু হয়েছে?

ইন্দুবালা বুকভরা একটা নিঃশ্বাস ফেলে তার হাত সরিয়ে দিল। বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল,

- নাহ কিছু হয়নি। ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়, খাবার দিচ্ছি।

ইন্দুবালা এক প্রকার দুঃখ থেকে পালিয়ে যাওয়ার মতো করে বেরিয়ে গেল কামরা থেকে। মোত্তাকিনের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল কথা লুকিয়ে যাওয়ায়। এই মেয়েটা সবসময় সেই কাজ করবে যা তার পছন্দ নয়। ঘাড়ত্যাড়া!

সে রাগে গজগজ করতে করতে কাউকে ফোন লাগালো। অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসল রিনরিনে নারী কণ্ঠ।

- আরে মোত্তাকিন যে, কী মনে করে ফোন দিলে?

মোত্তাকিন ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলল,

- সাবরিনা ম্যাম, কেমন আছেন?

- আলহামদুলিল্লাহ কিন্তু তুমি হঠাৎ ফোন দিলে কেন?

তার কণ্ঠ শঙ্কিত ছিল। কিন্তু আগ্রহীও ছিল। যেন রমরমা কোনো খবরের আশায় উৎসুক হয়ে আছেন। মোত্তাকিন সোজাসাপ্টা বলল,

- আজ কী স্কুলে কিছু হয়েছে ম্যাম?

- কেন ইন্দুবালা তোমায় কিছু বলেনি?

- বললে তো আর আপনার কাছে ফোন দিতাম না।

মিসেস সাবরিনা যেন চমৎকার টপিক পেয়ে গেলেন গসিপের। তিনি ভীষণ উৎসাহের সাথে বলতে লাগলেন,

- আজ তো স্কুলে বেশ ঝামেলা হয়েছে ইন্দুবালাকে নিয়ে। আমাদের স্কুলে তো দু'জন ফিজিক্স টিচার। একজন ইন্দুবালা আর একজন মিরাজ স্যার। তো আজকে চারটা স্কুল মিলিয়ে একটা প্রতিযোগিতা ছিল ফিজিক্সের উপর। হেড টিচার ইন্দুবালাকে আমাদের স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের তত্বাবধায়ক বানিয়েছিলেন। সেই আজকে নির্বাচিত স্টুডেন্টদের সরকারি স্কুলে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত আমাদের স্টুডেন্টরা জিততে পারেনি। এর জন্য মিরাজ স্যার অনেক রেগে গিয়েছিলেন। আর দুর্ব্যবহার করেছেন ইন্দুবালার সাথে। কথা শোনানোর এক পর্যায়ে এটাও বলেছেন যে, ওর গায়ের রঙের মতোই ওর মেধাও কুৎসিত। সমাজে চলার পথে অভিশাপ। এতে ওর কী দোষ বলোতো? মিরাজ স্যার অনর্থক ভাষা খারাপ করেছেন। আমার খুব খারাপ লেগেছে ইন্দুবালার জন্য। রুম ভরতি শিক্ষকদের মাঝে বসে ওকে অপমান করেছেন।

মোত্তাকিন নীরবে শুনল শুধু। মিসেস সাবরিনা ওর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ডাকলেন ,

- মোত্তাকিন শুনছ?

- জি ম্যাম। ধন্যবাদ, রাখছি। ভালো থাকবেন।

- আচ্ছা। তুমি ইন্দুবালাকে বলো ও যেন মন খারাপ করে না থাকে। ওর কোনো দোষ নেই।

মোত্তাকিন কোনো জবাব দিল না ফোন কেটে দিয়ে শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে লম্বা লম্বা কদমে ঘর থেকে বের হলো। আঁটসাঁট চোয়ালে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

- কোন মাদারবোর্ড আমার বউয়ের মন খারাপ করার দুঃসাহস দেখিয়েছে তা আমি দেখে নিচ্ছি।

উগ্রগতিতে কেউ দরজা ধাক্কাধাক্কি করতেই মিরাজ স্যার রেগেমেগে দরজা খুললেন।

- এই কে? কে এমন বেয়াদবের মতো দরজা ধাক্কাচ্ছে? এটা একটা ভদ্র লোকের ঘর।

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই ক্ষিপ্র গতিতে একটা‌ ঘুষি চোয়াল নাড়িয়ে দিল। মোত্তাকিন হিসহিসিয়ে বলল,

- তুই ভদ্র ঘরের অভদ্র একটা মাদারবোর্ড। ভদ্র ঘরের পুরুষরা অন্যের বউকে কুৎসিত বলে তাই না? আমার বউ কুৎসিত?

বলেই মোত্তাকিন এগিয়ে গিয়ে মেঝেতে আঁছড়ে পড়া দেহটি চেপে ধরে বেধড়ক ঘুষি মারতে লাগল।

- আমার বউয়ের ভুল থাকলে তুই ভুল ধরিয়ে দিবি। তুই ওর গায়ের রঙ নিয়ে কথা বললি কেন?

মুহুর্তেই মিরাজ স্যার রক্তাক্ত হয়ে উঠলেন। পরিবারের লোকজন এসে আর্তনাদ করতেই মোত্তাকিন ফুঁসতে ফুঁসতে তাকে ছেড়ে দিল। আঙুল তাক করে হুমকির সুরে বলল,

- এরপর থেকে আমার বউয়ের সাথে কোনোরকম উল্টাপাল্টা করলে তোর ঘাড় থেকে মাথা নামিয়ে দেব। ওকে সম্মান দিয়ে চলবি। আমি গুন্ডামি ছেড়ে দিয়েছি, ভুলে যাইনি মাইন্ড ইট!

মোত্তাকিন নিজের উগ্রতা মেজাজকে দমাতে না পারার কারণেই ঘটে গেল আরেক লঙ্কাকাণ্ড! পরদিন সকাল দশটার সময় হেড টিচারের ক্রুদ্ধ তলবে ইন্দুবালা মোত্তাকিন সমেত উপস্থিত হয় স্কুলে। স্কুলে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল মিরাজ স্যারের করুণ পরিণতি দেখে।

ইন্দুবালা ক্ষুব্ধ দৃষ্টি ফেলল মোত্তাকিনের দিকে। ঠিক এই করণেই সে জানাতে চায়নি। কিন্তু মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত! সে জেনেই যায় তার খুঁটিনাটি নাড়ি নক্ষত্র।

মিটিং রুমে আয়োজিত শালিস বৈঠকে হেড টিচার রাগান্বিত স্বরে বললেন,

- একজন শিক্ষকের গায়ে হাত তোলার অপরাধে তোমার হাজব্যান্ডকে আমি জেলে দিতে পারি, ইন্দুবালা। কিন্তু এটা তোমার জন্য মোটেও ভালো হবে না। তুমি চাইলে আমরা এই বৈঠকেই বিষয়টা সমাধান করতে পারি।

- জি স্যার।

ইন্ধুবালা আনত মুখে বলল। মোত্তাকিন দাঁতে দাঁত চেপে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ইন্দুবালার নত মুখপানে। সে এই মাথা নত করা দেখতে পারে না। তাও আবার এমন জায়গায় যেখানে তার কোনো অপরাধ ই নেই।

হেড টিচার বললেন,

- তোমার হাজব্যান্ডকে বলো মিরাজ স্যারের কাছে ক্ষমা চাইতে।

- দুঃখিত পারব না।

হেড টিচারের কথা শেষ হতে না হতেই মোত্তাকিন দারাজ কণ্ঠে বলে উঠল। হেড টিচার সহ মিরাজ স্যার ক্রুদ্ধ চোখে তাকালেন তার দিকে।

মোত্তাকিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

- আমি এখানে কোনো ভুল করিনি যে ওই অভদ্র শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চাইব, যার শিক্ষক হওয়ার কোনো যোগ্যতাই নেই। ও শিক্ষক হলে একটা মেয়ের গায়ের রং নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কোন জ্ঞানে? ওকে তো আমি আরো কয়টা দেব এখন। তুই শালিস বৈঠক বসিয়েছিস কোন সাহসে?

মোত্তাকিন আবারো তেড়ে যেতেই নিলো অমনি ইন্দুবালা তার হাত চেপে ধরে কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। হেড টিচার গর্জে উঠে বলল,

- ইন্দুবালা, তোমার হাজব্যান্ডের কত দুঃসাহস সে আমার সামনে আমার স্কুলের টিচারকে তুই তোকারি করছে, মারার হুমকি দিচ্ছে! আমি তোমায় চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে পারি।

মোত্তাকিন পাল্টা গর্জে উঠে বলল,

- এইসব চাকরির হুমকি আমায় দেবেন না স্যার। আমার স্ত্রীকে রানীর মতো রাখার সামর্থ্য আমার আছে। ও চাকরি করে শখে। ওর বসে থাকতে ভালো লাগে না তাই ও চাকরি করে। একটা গেলে আরো চারটা চাকরি জোগাড় করে‌ দেয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু ওকে আমি এমন জায়গায় চাকরি করতে দেব না যেখানে ওকে গায়ের রং নিয়ে অপমান করা হয়। আমি নিজে ওর হয়ে এই চাকরি থেকে ইস্তফা নিচ্ছি। ও আর এখানে চাকরি করবে না।

পরপরই মিরাজ স্যারের দিকে আঙুল তাক করে বলল,

- আর তুই, কাজটা ঠিক করিসনি। দোষ তোর ছিল আবার উল্টো ফাপড় ও তুই নিয়েছিস। ইন ফিউচার আমার সামনে পড়লে আমি তোর অর্ধেক হায়াত কমিয়ে দেব।

বলেই মোত্তাকিন ইন্দুবালার হাত চেপে ধরে টানতে টানতে বেরিয়ে এলো টিচার্স রুম থেকে।

নিজের ঘরে ঢুকতেই ইন্দুবালা ক্রোধিত দৃষ্টি ফেলল রাগে লাল হয়ে যাওয়া অতি ফর্সা মুখের উগ্র পুরুষটির দিকে। রাগত কণ্ঠে বলল,

- এটা কী করলি তুই? সামান্য বিষয়ের জন্য তুই একজন শিক্ষককে কী করে মেরে রক্তাক্ত করতে পারিস?

- ঘুষি মেরে রক্তাক্ত করেছি।

মোত্তাকিনের ত্যাড়া কণ্ঠে বলতে বলতেই এগিয়ে আসল। বিক্ষিপ্ত মেজাজে বলল,

- এখন মেজাজ খারাপ। উল্টাপাল্টা কথা বলবি না। একটা চুমু দে তো।

মোত্তাকিন ঠোঁট এগিয়ে দিয়ে বলল। সহসা ইন্দুবালা ফুঁসে উঠে বলল,

- দূরে সর এখান থেকে। ফাজলামো করছিস? তোর কারণে আমার চাকরিটা হাতছাড়া হয়ে গেল মোত্তাকিন। আমি এই চাকরিটা করতে পছন্দ করি।

নিদারুণ প্রত্যাখ্যানে মোত্তাকিনের মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেল। তবুও সংবরণ করে ঘড়ি খুলতে খুলতে গনগনে স্বরে বলল,

- নতুন চাকরি খুঁজে দেব।

- কিন্তু আমি শিক্ষাগতা করতে পছন্দ করি।

- হ্যাঁ হ্যাঁ শিক্ষকই হবি। তারই ব্যবস্থা করে দেব।

- এই স্কুলের সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

- যেখানে সম্মান নেই সেখানে এক মুহুর্ত ও থাকতে পারবি না। ওসব স্মৃতি ভুলে যা। ওই মাদারবোর্ডের সাহস কী করে হয় আমার বউকে কুৎসিত বলার? ওটাকে জানে মারিনি সেটাই ওর সাত কপাল‌।

রাগ করতে গিয়েও ইন্দুবালা রাগ করতে পারে না বরং ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে রাগান্বিত মুখপানে। এই ছেলেটি অদ্ভুত উগ্র। তার স্ত্রীকে কেউ কটু কথা বলতে পারবে না। ইন্দুবালা রাগ ভুলে ছলছল নেত্রে তাকায়। মাঝেমধ্যে মনে হয় সে এত ভালোবাসা সম্মান নিতে পারছে না।

মোত্তাকিন তখনো ফুঁসে যাচ্ছে আর নিজ মনে বিড়বিড় করে যাচ্ছে কিছু। ইন্দুবালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গিয়ে ওর সামনে দাঁড়ায়।

মোত্তাকিন রক্তিম চোখে চেয়ে খেকিয়ে উঠে বলল,

- কী চাই? বলেছি না নতুন চাকরি খুঁজে দেব? তোর স্বামী তো ল্যাংড়া, অন্ধ তোকে কামাই করে খাওয়াতে পারে না। তাই তোর মানুষের অপমান সহ্য করেও চাকরি করতে হবে তাই না? আসলে ওই মিরাজ মাদারবোর্ড না, তুই মাদারবোর্ড।

তার রাগান্বিত কথার প্রেক্ষিতে ইন্দুবালা এবার আর একটুও রাগ দেখালো না বরং হুট করেই লেপ্টে গেল পুরুষালী বক্ষে। দু'হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল পুরুষালী পৃষ্ঠদেশ। মোত্তাকিন আবারো খেকিয়ে উঠল,

- দূরে সর আমার থেকে।

ইন্দুবালা দূরে সরে না আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরল তাকে। অনুযোগ ভরা কণ্ঠে বলল,

- তুই এমন কেন?

- আমি এমনি খারাপ, গুন্ডা।

ইন্দুবালা বিতৃষ্ণা ভরা চাহনিতে মুখ তুলল। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাগ সংবরণ করা পুরুষটির চোখে চোখ পড়তেই সে মুখ বাড়িয়ে একটা চুমু দিতে গেল। কিন্তু মোত্তাকিন তাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল। ফুঁসতে ফুঁসতে গিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো। বের হলো দীর্ঘ পনেরো মিনিট বাদ। শীতল পানির ছোঁয়ায় ততক্ষণে রাগের প্রকোপ নিস্তেজ। মন বেশ ফুরফুরে।

তোয়ালে পেঁচিয়ে বের হতেই দেখল ইন্দুবালা সেই এক কাপড়েই বিছানায় পা গুটিয়ে বসে আছে। সে হেলেদুলে এগিয়ে গেল। ঝিমিয়ে বসে থাকা মেয়েটির মুখের উপর ঝুঁকে গিয়ে ভেজা চুলের পানির ঝাপটা দিয়ে বলল,

- কী হলো ঝিমাচ্ছিস কেন? চুমু খেতে চাইছিলি না? নে খা।

ইন্দুবালা কপাল কুঁচকে বিরক্তির সাথে বলল

- যখন খেতে চেয়েছলিম তখন নিতে চাসনি। এখন আমার দিতে ইচ্ছে করছে না।

- তুই দিবি তোর বাপ দেবে।

বলেই মেয়েটিকে এক ধাক্কায় বিছানায় ফেলে দিল মোত্তাকিন। ইন্দুবালা তৎক্ষণাৎ তেড়েফুঁড়ে উঠতে উঠতে বলল,

- আমার বাপের কাছে গিয়ে চুমু খা বেয়াদ...

মুখের কথা মুখেই থেকে গেল। এক গভীর উষ্ণ চুম্বনের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে মেমোরি ফোমের নরম গদিতে দেবে গেল ইন্দুবালার ভারী দেহটি। ইন্দুবালার সকল তেজ নিস্তেজ হয়ে পড়ল একটু একটু করে। গভীর স্পর্শে ভুলতে লাগল জাগতিক সব মোহ।

সময়টা যখন ওই একটা চুম্বনেই থমকে গিয়েছিল ঠিক তখুনি দরজায় ধুপধাপ লাথির শব্দ আলোড়ন তুলল নিস্তব্ধ ঘরটিতে। দরজার ওপারে থাকা মিশাল চেঁচিয়ে ডাকল বাবা মাকে,

- মাম্মা? পাপা? দরজা খোলো। আমি এসেছি।

একের পর এক বিকট শব্দের ধাক্কাধাক্কিতে প্রেমময় আবেশ কেটে গেল। না না কাটতে বাধ্য হলো। মোহগ্রস্ত দুই অবয়ব জাগতিক মোহে ফিরতেই অনুধাবন করল তারা একটা ছোট্ট প্রাণের বাবা মা।

মোত্তাকিন রাগে গজগজ করতে করতে সরে আসে ইন্দুবালার থেকে। খেঁকিয়ে উঠে বলল,

- হ্যাঁ হ্যাঁ দরজাটা ভেঙে ফেল রাজাকারের বাচ্চা। যেদিন থেকে বাপ হয়েছি সেদিন থেকে চুমু আমার জন্য হারাম হয়ে গিয়েছে। শালা!

সহসা মোত্তাকিনের মাথা বরাবর একটা কুশন ছুঁড়ে মারল ইন্দুবালা। শাসিয়ে বলল,

- মুখ সামলে কথা বলবি মোত্তাকিন।

বিক্ষিপ্ত মেজাজে দরজা খুলতেই মোত্তাকিনের রাগকে ধূলোয় মিশিয়ে দিয়ে মিশাল দু'হাত বাড়িয়ে দিল। গাল ভরে হেসে বলল,

- পাপা কোনে।

মোত্তাকিন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

- ইন্দুর বাচ্চার উপর একটু রাগ দেখাব তার উপায় আছে? কেমন আহ্লাদ করে কথা বলে দেখ!

বলতে বলতেই ছেলেকে কোলে তুলে নিলো মোত্তাকিন। পুনরায় খেঁকিয়ে উঠে বলল,

- এই ছাগল ছানা আল্লাহ তোকে দুটো পা দিয়েছে কেন? বাপের কোলে চড়ে বেড়ানোর জন্য?

মিশাল বাবার মুখপানে চেয়ে গম্ভীর মুখে বলল,

- আমি ছাগন ছানা না।

- তবে কী?

- আমি তোমাল আল মাম্মাল ছানা।

সহসা মোত্তাকিন খিল খিল করে হেসে উঠল। ছেলের গালে শব্দ করে একটা চুমু দিয়ে বলল,

- আপনি বড় শেয়ানা হচ্ছেন, আব্বা। এই ইন্দু দেখ, তোর ছেলে কী বলে! সে নাকি তোর আর আমার ছানা। এসব শিখেছে কোত্থেকে?

ইন্দুবালা ভ্রু কুঁচকে বলল,

- যার তোর মতো বাপ আছে তার এসব শেখার কোনো বাড়তি জায়গা লাগে না।

- হুম যত দোষ, মোত্তাকিন ঘোষ!

মোত্তাকিন ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বলল। মিশাল বাবার‌ বুকে মিশে রইল। ছেলেকে বাবার সাথে খাতির জমাতে দেখে ইন্দুবালা এগিয়ে আসল। হাত বাড়িয়ে বাবা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলল,

- আব্বা, আপনি পাপার বুকে শুয়েছেন?

মিশাল গাল ভরে হেসে মাথা নাড়ল। বাবার বুকে হাত চাপড়ে আদুরে গলায় বলল,

- এথানে অনেক আলাম।

সহসা মোত্তাকিন আর ইন্দুবালা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। ইন্দুবালা বিমুগ্ধ চিত্তে বলল,

- আসলেই আব্বা। এখানে পৃথিবীর সব আরাম লুকিয়ে রেখেছেন আল্লাহ। আপনার মায়ের ও খুব প্রিয় জায়গা।

মোত্তাকিন বাঁকা চোখে চাইল। ভ্রু নাচিয়ে বলল,

- তাই না কি? কখনো বলিস নি তো।

- বললে যদি অহংকার বেড়ে যায়, তাই বলিনি।

- ওরে অসভ্য! রাতে আসিস এখানে ঘুমাতে তখন দেখাব।

ইন্দুবালা মুখ বাঁকিয়ে বলল,

- একশবার আসব। যা দেখানোর দেখাস।

- যা দেখার তা তুই আগেই দেখে ফেলেছিস। আর কিছু দেখার বাকি নেই।

মোত্তাকিন ফিচলে হেসে বলল। সহসা লাজে লাল হয়ে ওঠা ইন্দুবালা পায়ের কাছে পড়ে থাকা কুশনটা উঠিয়ে ঝপাং ঝপাং দুটো বারি দিল তার মাথা বরাবর। ব্যথাহীন সেই আঘাতে মোত্তাকিন হেসে উঠল খিক খিক করে।

~একটুখানি লেখা ছিল~

#প্রেম_বর্ণহীন

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন