#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_37 ✦ প্রথমাংশ ✦
বারে ব্ল্যাক সুট পরিহিত একজন মানব বসে আছে। হাতে অ্যালকোহলের বোতল। হয়তো কারো অপেক্ষায়। আজ আর গ্লাসে করে ছোট ছোট পেগ মারছেনা সে। আজ পুরো তিন চারটা বোতল সামনে নিয়ে বসেছে। সুঠাম দেহের অধিকারী মানবটি। মানবটির হেয়ারস্টাইল ‘কুইফ’ কাটের আধুনিক রূপ। সামনের দিকের চুলগুলো উঁচু করে পিছনের দিকে ব্রাশ করে রাখা। ঘন চুলগুলোতে ভলিউম এবং লেয়ারিং দেওয়া। সামনের কিছু চুলে হালকা প্ল্যাটিনাম ব্লন্ড হাইলাইট করা, সাইডের চুলগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও পুরোপুরি ফেইড করা না। তবুও কিছু চুল এলোমেলো হয়ে চোখের ওপর পড়ে আছে। তার চোখ দুটি গাঢ় বাদামী, আকৃতিতে তুলনামূলকভাবে ছোট, এবং সামান্য নিচের দিকে টানা। ভ্রু’গুলো ঘন এবং ছিমছাম। ছোট, উজ্জ্বল, টানা চোখগুলো সবসময় নেশালো আর হিংস্র দেখতে লাগে। বাজ পাখির চোখের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার। এই চোখের চাহনিতে যেকোনো মেয়ে বশীভূত হতে বাধ্য। নাক সোজা এবং মাঝারী আকৃতির। ঠোঁটজোড়া পাতলা, যার ওপরের প্রান্তে একটি সূক্ষ্ম বাঁক রয়েছে। সিগারেট ছোঁয়া পাতলা ঠোঁট জোড়া ক্রীমের দ্বারা এখনো গোলাপি বর্ণ ধারণ করে আছে। চোয়াল শার্প এবং ডিফাইনড। হালকা গোঁফ ও দাড়ির আছে– সব মিলিয়ে ক্লাসিক হ্যান্ডসাম লুক। তার স্কিন টোন ফর্সা এবং একেবারে পরিষ্কার। কোনো দাগছোপ নেই। নিঃসন্দেহে, তাকে এক কথায় সুদর্শন বলা চলে। মানবটি উজ্জ্বল তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া বারের দরজার দিকে আটকে আছে। হয়তো কোনো শিকারীর অপেক্ষায় বা কোনো বন্ধুর।
বারের ভেতরে ঢুকে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত মানব। মুখে তার মাস্ক। গিয়ে বসলো কর্নারের একটি টেবিলে। একজন ওয়েটারকে ডাক দিয়ে কিছু একটা বলে দিল। ওয়েটারটি সম্মতি জানিয়ে চলে গেলে সেই ওয়াইনের বোতল হাতে নিয়ে বসে থাকা মানবটির কাছে। ওয়েটারটি আঙুল দিয়ে দূরে কর্নারে বসে থাকা মানবটিকে দেখাল। ওয়াইন হাতে নিয়ে বসে থাকা মানবটি তাকাল সেদিকে। এগিয়ে গেল কাঙ্ক্ষিত টেবিলটির কাছে। চেয়ার টেনে নিজের আসনে বসল। নিজের সামনে বসে থাকা মাস্ক পরিহিত মানবটিকে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। কিছুক্ষণ মানবটিকে পরখ করে গা দুলিয়ে হেসে ফেলল। মাস্ক পরিহিত মানবটি বিরক্তসূচক শব্দ করল। মানবটি কোনমতে হাসি থামিয়ে মাস্কটি টেনে খুলে ফেলল। আরিয়ানের নাকের অবস্থা দেখে দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
“এই কি অবস্থা তোর, অরিয়ান? নাকের এই অবস্থা কেনো?”
“একটা মেয়ের জন্য।”
“হোয়াট? মেয়ের জন্য মানে?”
“হুম! তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। তোর থেকে কিছু লুকানোর নেই। একটা মেয়ে আমাকে বড্ড ডিস্টার্ব করে দিয়েছে।”
রায়য়ান আবারও হেসে বলল,
“তোকে ডিস্টার্ব করেছে? তবুও কোনো মেয়ে? তা, কে সেই দূর্সাহসী গার্ল?”
আরিয়ান চুপ করে রইল। একজন ওয়েটার এসে ড্রিঙ্কস সার্ভ করে দিয়ে গেল। কিছুক্ষণ ভেবে তারপর বলল,
“মিসেস শেরাজ খান। খান ম্যানশনের মেজো বউ। আমাদের নতুন খান সাহেবা।”
“ওহ হ্যাঁ! শুনলাম এস.কে নাকি বিয়ে করেছে। কিন্তু ভাই, মেয়েটার মধ্যে এমন কি আছে বলতো? যে এস.কের মতো ছেলে বিয়ে করে ফেলল আর তোর মতো মেয়েবাজ ছেলে ডিস্টার্ব হয়ে গেল?”
“জানিনা। তবে কিছুতো একটা আছে। আর তার থেকেও বড় কথা, ও এস.কের ওয়াইফ। এস.কে নাকি মেয়েটাকে অসম্ভব ভালোবাসে। আর তুই তো জানিস, এস.কের সব জিনিসের প্রতি আমার পবিত্র নজর আছে।”
“তোর নজর পবিত্র?”
“অবশ্যই! বিশ্বাস কর ভাই। কাল ওই মেয়েকে দেখার পর এখন পযর্ন্ত আমি আমার কোনো গার্লফ্রেন্ডের সাথে কন্ট্রাক্ট করিনি। কোনো মেয়ের সাথে বেড শেয়ার করিনি। ভালো করে দেখ রায়য়ান। আজ আমার পাশে কোনো মেয়ে নেই।”
“হুম! খুবই অবিশ্বাসযোগ্য একটা ব্যাপার এইটা। তবুও বিশ্বাস করলাম। তাহলে তোর নাকের এই অবস্থা দেখানোর জন্য এই সন্ধ্যায় আমার সব কাজ বাদ দিয়ে আমাকে এখানে আসতে বললি? তো বল আমাকে ভাবিজির সাথে কবে মিট করাবি? আমি ও দেখতে চাই, কে সেই অসাধ্য সাধনকারী রমণী, যার জন্য এক মেয়েবাজ, আরেক মেয়ে হেটার্স এতটা ডিস্টার্ব হয়ে গেল যে, এক জন্য অলরেডি বিয়ে করে ফেলেছে, আর অন্যজন মেয়েবাজি ছেড়ে দিতে চাইছে।”
“তুই কি মজা নিচ্ছিস, রায়য়ান?”
“অবশ্যই না! শুধু সেই রমণীর সাথে মিট করতে চাইছি। কবে করাবি বল?”
“ড্যাড ওদের জন্য পার্টি থ্রো করবে বলেছে। সেদিন দেখে নিস সেই মেয়েকে।”
“কিন্তু, এতটা ডিস্টার্ব হয়ে কি লাভ? ওই মেয়ে এস.কের আন্ডারে আছে। তুই তো চোখ তুলে তাকাতে পযর্ন্ত পারবি না ওই মেয়ের দিকে। আর সেখানে বেড পার্টনার বানাতে চাইছিস। বিষয়টা ভীষণ হাস্যকর।”
মুহুর্তেই আরিয়ান রেগে গেল। হাতের মধ্যে থাকা ওয়াইনের বোতলটাকে ছুঁড়ে মারল। বারে ড্যান্স করতে থাকা সকলে দাঁড়িয়ে পড়ল। মিউজিক অফ হয়ে গেল। সকলে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। আরিয়ান উঠে দাঁড়াল। সে রাগি লুক নিয়ে তাকাতেই আবারও মিউজিক অন করা হলো। সকলে আবারও ড্যান্সের দিকে মন দিল। আরিয়ান চাপাস্বরে হালকা গর্জন করে বলল,
“বেড পার্টনার নয়। লাইফ পার্টনার বানাতে চাই। ওই জিনিস আমার পার্মানেন্টলি লাগবে।”
রায়য়ান তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বোতলে চুমুক দিল। কিছুটা ওয়াইন পান করে বোতলটা শব্দ করে টেবিলের ওপর রেখে বলল,
“এস.কের থেকে কীভাবে কেড়ে নিবি? এস.কে তোকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। তুই খুব ভালো করে জানিস, ও কি জিনিস। আমাদের মার্ডার করার পদ্ধতি আর এস.কের মার্ডার করার পদ্ধতি এক না। ও কাউকে মার্ডার করলে তার একটা চুল পযর্ন্ত অক্ষত ছাড়েনা।”
আরিয়ান হাসল। রায়য়ানের কাছে গিয়ে তার কাঁধের ওপর হাত রেখে বলল,
“আমি মনে হয় একটু বেশি মজা করি। আর তাই কেউ আমাকে সিরিয়াস নেয়না।”
“কি করতে চাস তুই?”
“ঠান্ডা মাথায় খেলতে চাই।”
“মানে?”
“মানে, কেড়ে নিব।”
কথাগুলো বলে চলে গেল আরিয়ান। রায়য়ান বাঁকা হেসে তাকিয়ে রইল আরিয়ানের যাওয়ার দিকে। চেয়ারের সাথে গা হেলিয়ে দিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“শত্রুর শত্রু বন্ধু। আপাতত তুই আমার বন্ধু, আরিয়ান। ওই মেয়ে যদি এস.কের সত্যি ভালোবাসা হয়, তাহলে আমি নিজে তোকে হেল্প করব এস,কের থেকে ওই মেয়েকে কেড়ে নিতে।
•
শাহরুখ ড্রয়িংরুমে বসে টেলিভিশনে খবর দেখছে। ফারিয়া আর ফারিন এলো নাজমিনদের কাছে। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই ফারিয়া দাঁড়িয়ে পড়ল। ফারিনকে সামিয়ার রুমে যেতে বলে নিজের এগিয়ে গেল শাহরুখের কাছে। শাহরুখের পেছন দিয়ে গিয়ে দুহাত দিয়ে শাহরুখের চোখ আটকে ধরল। নিউজ দেখায় বাধা হওয়াতে রেগে গেলো শাহরুখ। চট করে উঠে দাঁড়াল সে। পেছন ফিরে ফারিয়াকে দেখে রাগ বেড়ে গেল তার। ফারিয়ার কান টেনে ধরে সামনে এনে দাঁড় করাল। ব্যথায় ফারিয়া “আহ” করে শব্দ করল। শাহরুখ চোখ রাঙিয়ে বলল,
“এইসব কি ধরনের অসভ্যতা? পড়াশোনা নেই তোর? আর তোকে না বলেছি আমার সামনে আসবি না। তুলে এক আছাড় মারব।”
“আহ! ছাইয়া ছাড়ো।”
শাহরুখ ভ্রু কুঁচকালো।
“কি বললি?”
“কই? কিছুনা তো।”
“কিছুনা তাইনা? ওই ছাইয়া কি, হ্যাঁ? ভাইয়া হই তোর।”
“আরে, ভুল করে বলে ফেলেছি।”
“তাই? তাহলে, আমি তোকে এখন ভুল করে একটা আছাড় মারি।”
ফারিয়া কেঁদে ফেলল। জোরে চিৎকার করে মামি বলে ডাক দিল। শাহরুখ ছেড়ে দিল ফারিয়ার কান। ফারিয়া দৌড়ে সিঁড়ির ওপর গিয়ে দাঁড়িয়ে মুখ ভেঙিয়ে বলল,
“ছাইয়া, ছাইয়া, ছাইয়া। তুমি আমার ভাইয়া না ছাইয়া, বুঝছ? তোমাকে ভাইয়া থেকে ছাইয়া বানানোর গল্পটা খুব সুন্দর হবে, দেখে নিও।”
শাহরুখ এগিয়ে আসতেই ফারিয়া দৌড়ে সামিয়াদের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। শাহরুখ মুচকি হেসে আবারও নিউজ দেখাতে মন দিল।
•
সুমু বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ তার সমুদ্রের অশান্ত পানির দিকে। শেরাজের আজকে বাসায় ফিরতে একটু লেট হবে বলে গেছে। সুমুর হাজার ভাবনায় বিভোর। তার ভাবনার মাঝে হঠাৎ দরজায় নক পড়ার শব্দ কানে এলো। সে বেলকনি থেকে রুমে এল। দরজার ওপারে মুখে এক টুকরো মিষ্টি হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইশিতা। সুমু ইশিতাকে ভেতরে আসতে বলে বেডের ওপর পা ঝুলিয়ে বসল। ইশিতা এসে সুমুর পাশে বসল। সুমু আলতো হেসে বলল,
“এতোক্ষণে আসার সময় হলো তোমার?”
ইশিতা অপরাধীরন্যায় বলল,
“সরি সুমু! একটু কাজ ছিল।”
“হুম বুঝলাম। তা তোমার আর আরবাজ…”
রুমের মধ্যে ঢুকে এলো রোজা। পরনে হট প্যান্ট আর লেডিস টি-শার্ট । রিবন্ডিং করা ব্রাউন কালারের কাঁধ পযর্ন্ত চুলগুলো খোলা রাখা। মুখে স্পষ্ট রাগ আর ঘৃণা। মডেলদের মতো করে হেঁটে এগিয়ে এলো সুমুদের দিকে। সুমুর দিকে চোখ রেখে ইশিতার উদ্দেশ্যে বলল,
“তুমি একটু রুম থেকে যাও”
ইশিতা মাথা নিচু করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। ইশিতা রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই রোজা বলল,
“আমার এস.কে’কে কীভাবে ফাঁসিয়েছো তুমি?”
সুমু উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না। বেড সাইড টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে ব্যস্ত হলো সে। কিন্তু রোজা কেড়ে নিল সুমুর ফোনটা। বেডের ওপর ফোনটা ছুঁড়ে মেরে সুমুর দিকে আঙুল তুলে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“তোমার সাহস কি হয় আমাকে ইগনোর করার? আমি তোমাকে কিছু জিঙ্গাসা করেছি, আর তুমি মুড নিচ্ছ। বড্ড বেশি সাহস তোমার তাইনা?”
সুমু প্রচন্ড বিরক্ত হলো। এই নির্লজ্জ ধরনের মেয়ের সাথে কথা বলার মতো কোনো ইচ্ছে জাগছেনা তার মধ্যে। বিরক্ত হয়ে উঠে বেলকনির দিকে চলে যেতে নিল সে, কিন্তু রোজা এসে সুমুর সামনে দাঁড়িয়ে পথ আঁটকাল।
ভ্রু কুঁচকালো সুমু।
“কি চাই?”
“কি চাই মানে? তোমাকে আমি কিছু জিঙ্গাসা করেছি? উত্তর দিচ্ছ না কেনো?”
“প্রয়োজন মনে করছিনা।”
রোজা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“সামান্য একটা ভিলেজ গার্লের এতো অ্যাটিটিউড, যে সে রোজা চৌধুরীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনা? ইন্টারেস্টিং, এই মেয়ে তুমি জানো আমি কে? আমার কতো পাওয়ার আছে, সেই বিষয়ে তোমার কোনো আইডিয়া আছে?”
“নাহ! আমি জানিনা আপনি কে। আমার কোনো আইডিয়া ও নেই আপনার পাওয়ার সম্পর্কে। আর জানতে চাইওনা আপনি কে। আর না আপনার পাওয়ার সম্পর্কে কোনো আইডিয়া রাখতে চাই। আপনি এইবার আসতে পারেন।”
“তোমার এতো বড় সাহস? তুমি আমাকে এই রুম থেকে বেরিয়ে যেতে বলছ?”
“হুম বলছি! তার কারণ, আপনি একটা নিউ ম্যারিড কাপালের বেডরুমে বিনা পারমিশনে ঢুকে এসেছেন।”
রোজা এসে সুমুর ডানহাতটা মুচড়ে ধরল। তার হাতের প্রতিটা নখ সুমুর হাত ক্ষত বিক্ষত করে রক্ত বের করে আনলো। রোজা কটমট করে বলল,
“ইাউ ডেয়ার ইউ, তোমার মতো একটা ভিলেজ গার্লের এতো বড় সাহস কি করে হয়? আমাকে এস.কের রুম থেকে বেরিয়ে যেতে বলো তুমি? তুমি কি ভাবছো, এস.কে’কে আমার থেকে কেড়ে নিয়ে তুমি শান্তিতে সংসার করতে পারবে? কখনোই না। খুন করে ফেলব তোমাকে। তোমার থেকে এস.কে’কে কেড়ে নিব আমি। এইটা আমার ফুফুমনির বাসা। আর এই রুমটা আমার এস…”
কথাটা শেষ করতে পারল না রোজা। নিজের হাত ছাড়িয়ে বেড সাইড টেবিলের ওপর রাখা ফলের ঝুড়ি থেকে ধারাল ছুরিটা হাতে তুলে নিল সুমু। রোজাকে টান দিয়ে বেডের ওপর ফেলে একটু ঝুঁকে রোজার গলায় ছুরি চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“এক কথা একবার বললে কানে যায় না আপনার? আমার খান সাহেবের দিকে নজর দেওয়া, তার দিকে হাত বাড়ানো, তাকে নিজের বলে দাবী করা– এইসব ভুলগুলো আমার সামনে অন্তত করবেন না। আমি ওতোটা ভালো মেয়ে নই। আমাকে টিভি সিরিয়াল বা সিনেমার মতো অত্যাচারিত, অসহায় মেয়ে হিসাবে ভাবলে ভুল করবেন। আমি অসহায় মেয়ে নই। কালকে সকালে আপনার ভাইয়ের সাথে হওয়া ঘটনার কথা আপনি হয়তো ভুলে গেছেন। এখন আমাকে দেখে আরও একবার কালকের ঘটনা স্মরণ করে নিন। আমার খান সাহেবের ফিমেল ভার্সন আমি। আমার খান সাহেবের দিকে চোখ তুলে তাকালে, সেই চোখ তুলে কোরোসিন দিয়ে পুড়িয়ে ছাঁইটুকু পযর্ন্ত নর্দমায় ফেলে দিয়ে আসব। আমাকে ওতোটা সহজভাবে নিবেন না। বলেছিলাম না, আমার শক্ত হাতের শক্ত মিষ্টি আপনার নরম শরীরে সহ্য হবেনা।”
ছুরি জোরে চেপে ধরার কারণে রোজার গলার চামড়া হালকা কেটে রক্ত বেরিয়ে এসেছে। ভয়ে চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে রেখেছে মেয়েটা। সুমু ছুরিটা সরিয়ে সরে আনলো। ছুরিটা জায়গা মতো রেখে দরজার দিকে আঙুল তাক করে বলল,
“আউট!”
গলায় হাত রেখে উঠে বসল রোজা। হাত চোখের সামনে এনে হাতের ওপর রক্ত দেখে চোখ কপালে উঠল তার। সুমু দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে বলল,
“তোমার এই কর্মের মাশুল খুব তোমাকে খুব বাজেভাবে চোকাতে হবে। জাস্ট ওয়েট এন্ড সি। দেখতে থাকো সুমু, আমি এইবার কি কি করি।”
কথাগুলো বলে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে। সুমু দুহাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে বেডে গিয়ে বসল। সে খুব ভালো করে বুঝতে পারছে, এই ঘটনা নিয়ে আজ এই বাড়িতে কোনো একটা বাজে ঝামেলা হবে, এবং এইটাও বুঝল, এই বাড়িতে তার সংসার জীবনের জার্নি খুব একটা সহজ হবেনা। এমন সময় নিচ থেকে অনন্যা খাতুনের চিৎকারের আওয়াজ আর রোজার কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো সুমুর কানে। ইশিতা, ফিরোজা আর রিয়াজ দৌড়ে এলো সুমুর কাছে।
ইশিতা সুমুর কাছে এসে বলল,
“কিছু কি হয়েছে, সুমু? বড়মামনি তো অনেক রেগে গেছে। রোজা আপু কাঁদছে। কি হয়েছে এই রুমে?”
সুমু মাথা থেকে হাত নামিয়ে ইশিতার দিকে তাকাল। ইশিতার নজরে এলো সুমুর হাত। ইশিতা বিচলিত হয়ে সুমুর হাত ধরে বলল,
“এই কি হয়েছে তোমার হাতে? আমাকে বলো সুমু। রোজা আপু কিছু করেছে?”
ইশিতার কথাগুলো বলতে বলতে রিয়াজ রুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে শেরাজকে কল করল। ফিরোজা তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে। ইশিতা আবারও প্রশ্ন করতেই নিচ থেকে সুমুর ডাক পড়ল। সুমু আর বসে রইল না। উঠে দাঁড়িয়ে ড্রয়িংরুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।
•
ড্রয়িংরুমের মাঝে দাঁড়িয়ে অনন্যা খাতুন চিৎকার করছেন। রোজা, অনন্যা খাতুনের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। সাহাবাজ সাহেব দুহাত পেছনে বেঁধে অনন্যা বেগমের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। শেহেজাদ সাহেব আর আফিয়া খাতুন সোফার ওপর বসে আছেন। আরিয়ান সাহেবী ভঙ্গিমায় সোফার ওপর একহাত ছড়িয়ে দিয়ে বসে আছে।
সুমু সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। তার একপাশে রিয়াজ অন্যপাশে ফিরোজা। দুজনেই সুমুর দু'হাত ধরে রেখেছে। ইশিতা সুমুর পেছন পেছন নামছে। সুমুকে নামতে দেখে সকলে তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। আরিয়ান একটু নড়েচড়ে ঘাড় কাত করে সুমুর দিকে তাকিয়ে রইল। অনন্যা খাতুন সুমুকে দেখে বললেন,
“কি বউ এনেছে আমার ছেলে। এইটা বউ নাকি লেডি মাফিয়া। দিনে দুপুরে মানুষ মার্ডার করে ফেলবে এই মেয়ে। আজ রোজাকে মারতে গিয়েছিল, কাল আমাকে মারতে যাবে।”
সুমু সিঁড়ি থেকে দু’পা সামনে এগিয়ে এসে দাঁড়াল। অনন্যা খাতুন রাগিলুক নিয়ে এগিয়ে এলো সুমুর কাছে। সুমুর দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“তুমি রোজার গায়ে হাত দিয়েছ কোন সাহসে? তোমরা হাজব্যান্ড আর ওয়াইফ পেয়েছটাকি? তোমার হাজব্যান্ড আমার ভাইয়ের ছেলেকে মারছে। তুমি আমার ভাইয়ের মেয়েকে মারছ। আমার ছেলের কথা না হয়, বাদ দিলাম। কিন্তু তুমি? তুমি এতো বড় সাহস পেলে কোথায়?”
সুমু চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। পাশ থেকে রিয়াজ বলল,
“মম! তুমি শুধু ভাবিজিকে বকছ কেনো? রোজা আপুওতো…”
“একদম চুপ বেয়াদব ছেলে। বড়দের মুখে মুখে শুধু কথা বলো। কে শেখাচ্ছে তোমাকে এইসব বেয়াদবি? এই মেয়েটা? শেখাবেইতো। এই মেয়ে তো এসেছে আমার সাজানো পরিবারটাকে ভেঙে দিতে। দল করে বেড়াচ্ছে। নিজের দলে সবাইকে টেনে নিয়েছে অলরেডি। আমার ছেলেটাকে ব্ল্যাক ম্যাজিক করেছে। এই বাড়ির সবাইকে বশ করে নিয়েছে। গ্রাম থেকে উঠে এসেছে তো। অনেক রকমের বশীকরণ করতে জানে এরা।”
সাহাবাজ সাহেব বিরক্তি হয়ে বললেন,
“আহ বেগম! মেয়েটাকে এইভাবে বলছ কেনো? আগে সবটা জেনে নাও।”
অনন্যা খাতুন স্বামীর দিকে তাকালেন।
“কি জানব আর? রোজা আমাকে সবটা বলেছে। আর কিছু জানার নেই আমার। তোমাকে এখনো বলছি, তোমার ছেলেকে বুঝিয়ে এই মেয়েকে আমার বাড়ি থেকে দূর করো।”
“তুমি বারবার ভুলে যাচ্ছ অনন্যা, সুমু মামনি তোমার ছেলের বউ। ওকে এইভাবে বাহিরের লোকের সামনে অপমান করোনা।”
“বাহিরের লোক? কে বাহিরের লোক? আমার ভাইয়ের ছেলেমেয়ে বাহিরের লোক?”
“শুধু ওরা নয়। বাড়ি ভর্তি অনেক সার্ভেন্টরা আছে। তুমি তো এই বাড়ির মধ্যে কতো রুলস তৈরি করেছ। তাহলে আজ কেনো ভুলে যাচ্ছ, সুমু তোমার ছেলের বউ। আর এই বাড়ির কোনো বউকে ছোট করে বা অপমান করে কথা বলা যায় না।”
“আমি ভুলিনি আমার তৈরি করা নিয়ম। তুমি যেই নিয়মগুলোর কথা বলছ, সেগুলো শুধু এই বাড়ির বউদের জন্য। আর এই মেয়েটাকে আমি আমার ছেলে বউ তো অনেক দূরে থাক, এই বাড়ির সাধারণ একজন সার্ভেন্ট হিসাবেও মেনে নিব না।”
গর্জে উঠলেন সাহাবাজ সাহেব। অনন্যা খাতুনকে ধমকে মেরে বললেন,
“তুমি কিন্তু এইবার বাড়াবাড়ি করছ?”
“আমি কোনো বাড়াবাড়ি করছিনা। বাড়াবাড়ি তো আজ এই মেয়েটা করেছে। দু'দিন আসতে না আসতেই একেরপর এক ঝামেলা লেগেই চলেছে এই মেয়েটার জন্য। ইশিতাও তো এই বাড়ির বউ হয়ে এসেছে। কই ওর জন্য তো এখন পযর্ন্ত এমন কিছুই হয়নি।”
কথাগুলো বলে অনন্যা খাতুন রোজাকে নিজের কাছে ডাকলেন। রোজা এসে দাঁড়াল অনন্যা খাতুনের পাশে। সুমুর দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকা করে হাসল সে। অনন্যা খাতুন রাগিসুরে সুমুর উদ্দেশ্যে বলল,
“এই মেয়ে, সে সরি!”
“শেরাজ খানের বউ কাউকে সরি বলেনা মম। শেরাজ খানের বউ সরি বলায়।”
চলবে..?
#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_37 ✦ বর্ধিতাংশ ✦
সকলে তাকাল সদর দরজার দিকে। শেরাজ ডান হাত দিয়ে কোট কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে বা'হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখে রাগ স্পষ্ট। ফিরোজা “ভাইয়া” বলে দৌড়ে গিয়ে শেরাজের সামনে দাঁড়াল। শেরাজ কোলে তুলে নিল ফিরোজাকে। ফিরোজা অভিমানীসূরে বলল,
“ভাইয়া! আমাল নিউ ফ্রেন্ডের হাতে কততো ব্যতা, তবুও ফুফুমনি আমাল নিউ ফ্রেন্ডকে বতছে। তুমি এততু বতে দাও তো ফুফুমনিকে।”
ফিরোজার কথাশুনে আরিয়ান রাগি চোখে রোজার দিকে তাকাল। শেরাজ ছোট্ট করে ফিরোজার গালে ঠোঁট ছোঁয়াল। ফিরোজাকে কোলে নিয়ে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। রিয়াজকে ডাক দিয়ে ফিরোজাকে রিয়াজের কাছে দিয়ে বলল,
“ওকে নিয়ে রুমে যা।”
ফিরোজা যেতে নারাজ। সে তার নিউ ফ্রেন্ডকে ছাড়া যাবেনা, তাই সে ডানে বামে মাথা ঘুরিয়ে না করল। শেরাজ আলতো হেসে আবারও ফিরোজার গালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“তুমি যাও, লাভ। তোমার নিউ ফ্রেন্ড দশমিনিট পরে যাবে।”
শেরাজ অনেক বুঝিয়ে ফিরোজাকে রিয়াজের কোলে দিলো। রিয়াজ ফিরোজাকে নিয়ে ওপরে চলে গেল।
শেরাজ এসে দাঁড়াল সুমুর পাশে। সুমুর হাত ধরে ওপরে তুলল। ভালো করে সুমুর হাতটা চেক করে কিছুটা উচ্চস্বরে বলল,
“শাহরুখ! তোর ভাবিজির জন্য ফাস্ট এইডের বক্স নিয়ে আয়, কুইক। আর ডাক্তারকে কল করে বাসায় আসতে বল। আমার বউয়ের হাতে ইনফেকশন হয়ে যাবার আগে ট্রিটমেন্ট করতে হবে।”
শাহরুখ দৌড়ে গেল ফাস্ট এইডের বক্স আনতে। শেরাজের শান্ত মেজাজ দেখে সারবাজ ভয়ে আরবাজের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। অনন্যা খাতুন ভ্রু কুঁচকে তাকাল শেরাজের দিকে। রাগিসুরে বললেন,
“এইসব কি ড্রামা হচ্ছে? তোমার বউয়ের হাতের সামান্য কিছু ক্ষতর জন্য তুমি ফাস্ট ট্রিটমেন্ট প্লাস ডাক্তার পযর্ন্ত ডাকছ বাড়িতে। আর এইদিকে রোজার গলায় যে কতখানি অংশ কেটে গেছে, সেইটা তোমার চোখে পড়ছেনা?”
শেরাজ পাত্তা দিলোনা তার মায়ের কথায়। সে সুমুর হাত আলতো করে ধরে নিচুস্বরে বলল,
“সোফার পযর্ন্ত পায়ে হেঁটে যেতে পারবে? নাকি কোলে তুলে নিব?”
সুমু চোখ রাঙিয়ে শেরাজের দিকে তাকাল। সে সকলের অগোচরে শেরাজের বুকে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে চাপাস্বরে বলল,
“সিরিয়াস সময়েও আপনার অসভ্যমার্কা কথা যায়না, তাইনা?”
“রোমান্স কি আর দিন, তারিখ, সময়, সিচুয়েশন দেখে আসে বলো? যার বউ হট, সুন্দরী, তার রোমান্স অলওয়েজ রক্তে আর বডির প্রতিটি পার্টসে লেগে থাকে। তুমি সামনে থাকলেই আমার বডির প্রতিটি পার্টসে লেগে থাকা রোমান্সগুলো সুড়সুড়ি দিয়ে আমাকে জাগিয়ে তোলে, বউ। আর রোমান্স লেগে থাকা রক্তগুলো চলাচল করতে শুরু করে।”
“চুপ করুন!”
“আচ্ছা, করলাম। পরে আর বলব না, তখন ডিরেক্ট রোমান্স করব। এখন চলো, বসবে।”
শেরাজ সুমুর হাত ধরে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসাল। শাহরুখ ফাস্ট এইড নিয়ে এলো। শেরাজ ফাস্ট এইডের বক্সটা হাতে নিয়ে বলল,
“ডাক্তার কতদূর?”
“দশমিনিটে চলে আসবে, ভাইয়া।”
সুমু অস্বস্তিবোধ করল। নিচুস্বরে বলল,
“এই সামান্য একটা ব্যপারের জন্য ডাক্তার কেনো, খান সাহেব?
“এইটা সামান্য না বউ। রাক্ষসীর নখ থেকে এমন হয়েছে তোমার। তুমি জানো রাক্ষসীদের নখে কত বিষ থাকে? আল্লাহ না করুক, যদি সেই বিষ তোমার সর্বাঅঙ্গে ছড়িয়ে তোমার বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যায়। আমি তোমাকে নিয়ে কোনো রিস্ক নিতে পারব না।”
সুমু চুপ করে রইল। শেরাজ আলতো হেসে আবারও বলল,
“আমার বউয়ের শরীরে আমার করা আদরের স্পট ছাড়া আর কোনো স্পট সহ্য হবেনা আমার।”
সুমু আর কোনো কথা বলল না। কারণ, এসব অসভ্যমার্কা কথা কারো কানে গেলে তাকেই লজ্জায় পড়তে হবে, তাই সে চুপ করে রইল। শেরাজ যত্নসহকারে সুমুর হাতে ঔষধ লাগিয়ে দিতে দিতে বলল,
“এই যে শশুরের মেয়ে, বলেছিলাম না কেউ কিছু বললে চুপ করে না থাকতে। এতক্ষণ ধরে আমার মা জননী আপনাকে ওয়াজ শোনাচ্ছে, আর আপনি নিরব শ্রোতার মতো শুনেই চলেছেন?”
সুমু তবুও চুপ করে রইল। শেরাজ ঠান্ডা কন্ঠে আবারও বলল,
“এমন কেউ করে ম্যাডাম? কাউকে মৃত্যুর সামনে দাঁড় করিয়ে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনতে আছে বলেন? ছুরিটা ধরেছিলেন যখন চালিয়ে দিতেন। শেরাজ খানের বউ দুই এইটা মার্ডার করলে বেমানান লাগত না। আজ আপনাকে আমি একটা নিউ প্রমিস করি। এখন থেকে আমার অনুপস্থিতে কেউ আপনার দিকে হাত বাড়ালে বা চোখ তুলে তাকিয়ে বাজে কথা বললে, আপনি তাকে সোজা কবরের পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। আমার অনুপস্থিতিতে নিজের সেফটির জন্য মার্ডার করার দায়িত্ব আপনার। আর সেগুলোকে নিখুঁত সুন্দরভাবে ভামাচাপা দেওয়ার দায়িত্ব আমার।”
সুমু বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে তার খান সাহেবের দিকে। উপস্থিত সকলে শেরাজের কথা শুনে অবাকের শেষ সিমানায়। আরিয়ান স্বাভাবিকভাবেই বসে আছে, যেন শেরাজের বলা কথাগুলো তার কাছে স্বাভাবিক। রোজা ভয়ে অনন্যা খাতুনের পেছনে লুকাল। অনন্যা খাতুন তেঁতে উঠে বললেন,
“এমনতেই আমার মনে হচ্ছে এই মেয়ে…”
শেরাজ ঠান্ডা চোখে তাকাল তার মায়ের দিকে। অনন্যা খাতুন নিজের ভুল সংশোধন করে বললেন,
“তোমার বউ! এমনিতেই তোমার বউ একজন লেডি মাফিয়া। রোজাকে খুন করতে গিয়েছিল। আর এখন তুমি ওকে শাসন না করে, আশকারা দিচ্ছো? খুন করতে শেখাচ্ছ? তুমি কি মাফিয়া শেরাজ, যে তোমার বউকেও এইসব শেখাচ্ছ?
“জান বাঁচানো ফরজ মম। নিজের জান বাঁচানোর জন্য মানুষরূপী পশুদের মার্ডার করাই যায়। আমি চাই আমার বউ সেল্ফ ডিপেন্ডন্ট হোক। আত্মরক্ষা করতে জানুক।”
“তাই বলে তুমি নিজের ঘরের লোকদে…”
ডাক্তার বাড়ির ভেতরে ঢুকে এলো। অনন্যা খাতুন চুপ করে গেলেন। খান ম্যানশন থেকে কিছুটা সামনে গেলেই হসপিটাল। ডাক্তার আসতেই শেরাজ উঠে দাঁড়িয়ে কুশল বিনিময় করল। ডাক্তার সুমুর থেকে কিছুটা ডিসটেন্স মেইনটেইন করে দূরে বসল। সুমুর হাত নিয়ে চেক করে শেরাজের উদ্দেশ্যে বলল,
“ভালোই ডিপ ক্ষত। আপনি তো ফাস্ট ট্রিটমেন্ট করে দিয়েছেন। এখন আর তেমন কোনো সমস্যা হবেনা। তবুও আমি একটা মেডিসিন লিখে দিচ্ছি, যাতে এই ক্ষতগুলো ঘাঁ টাইপ না হয়ে যায়।”
“শুধু মেডিসিন না। এমন মেডিসিন দিন যাতে এগুলোর জন্য আমার ওয়াইফের হাতে কোনো স্পট না পরে।”
শেরাজ তাকাল রোজার দিকে। বিড়বিড়িয়ে বলল,
“আপনার মেডিসিনের ওপর অনেকের অনেক কিছু নির্ভর করছে।”
ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“কোনো চিন্তা করবেন না। আমি একটা স্পর্টক্লীন ক্রীমের নাম লিখে দিয়ে যাচ্ছি। এই ক্ষতগুলো শুকিয়ে গেলে ম্যাডামের হাতে এই ক্রীমটা রোজ রাতে শোবার আগে ইউজ করবেন। কোনো স্পর্ট পড়বে না। আর পড়লেও থাকবে না।”
মেডিসিন লিখে দিয়ে ডাক্তার উঠে দাঁড়াল। শেরাজের সাথে আবারও কুশল বিনিময় করে চলে গেলেন। আরবাজ সাথে গেল এগিয়ে দিয়ে আসতে। শেরাজ আবারও শাহরুখকে ডাক দিল। শাহরুখ আসতেই সে বলল,
“ফ্রিজ থেক রেড বুল ক্যানের বোতল নিয়ে আয়। আর বাসায় পপকর্ন থাকলে নিয়ে আয়।”
উপস্থিত কেউ বুঝল না শেরাজের কথার মানে। শাহরুখ চলে গেলে তার দায়িত্ব পালন করতে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফিরে এলো সবকিছু নিয়ে। শেরাজ পপকর্ন সুমুর হাতে দিল। ক্যানের বোতল খুলে টেবিলের ওপর রেখে বলল,
“পপকর্ন ছাড়া সিনেমা দেখে মজা নেই, সুইটহার্ট। এখন আমি সিনেমা দেখাব। এগুলো খেতে খেতে সিনেমা দেখো।”
শেরাজ উঠে দাঁড়াল। শাহরুখকে কিছু একটা বলে দিল। শাহরুখ শরাজের ফোন নিয়ে গেল। টিভির কাছে গিয়ে কিছু একটা করে রিমোট এনে শেরাজের হাতে দিল। শেরাজ রিমোট হাতে নিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“তো এভরিওয়ান, লেটস জাস্ট ওয়াচ এ মুভি।”
কথাটা বলে শেরাজ টিভি অন করে একটা ভিডিও প্লে করল। ভিডিওটা শেরাজের বেডরুমের। ভিডিওর মধ্যে সুমু আর রোজাকে দেখা যাচ্ছে। সকলে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে টিভির দিকে। অনন্যা খাতুন ভিডিও ফুটেজ দেখে চুপসে গেলেন। রোজা ভয়ে অনন্যা খাতুনকে জোরে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আরিয়ান রোজার দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। তার বিশ্বাস হচ্ছেনা তার বোন এতোবড় বোকামি করতে পারে।
ভিডিও শেষ হতেই শেরাজ টিভি অফ করে দিল। সাহাবাজ সাহেব হুংকার ছেড়ে অনন্যা খাতুনের উদ্দেশ্যে বললেন,
“এখন কি বলবে তুমি? আমার বাড়ির বউয়ের গায়ে হাত তোলার সাহস কি করে পায় তোমার ভাইয়ের মেয়ে? সুমু মামনি তো কোনো অন্যায় করেনি। সবকিছুতো আগে তোমার ভাইয়ের মেয়ে শুরু করেছে, তাই সুমু প্রতিবাদ করেছে।”
অনন্যা খাতুন মাথা নিচু করে রাখলেন। সাহাবাজ সাহেব সুমুর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“সাব্বাস মামানি! আমার ছেলের যোগ্য বউ তুমি। তুমি কোনো অন্যায় করোনি।”
শেহেজাদ সাহেব বললেন,
“ভাবিজি! আপনি সবটা না জেনে শুনে এতক্ষণ যাবত এই বাড়ির বউকে এত অপমান করলেন। আপনি তো মা, আপনার আগে সব সত্যিটা জেনে নেওয়া উচিত ছিল।”
অনন্যা খাতুন উচ্চস্বরে বললেন,
“তাতে কি হয়েছে? সুমু কি ছেড়ে দিয়েছে রোজাকে। সেও তো একই কাজ করেছে। তোমরা শুধু রোজার ভুলটাই দেখছ। সুমুর…”
“এনাফ ইজ এনাফ মম!”
গর্জে উঠল শেরাজ। অনন্যা খাতুন চুপ করে গেলেন। শেরাজ এগিয়ে গেল রোজার কাছে। রোজা কেঁদে ফেলল। “ফুফুমনি” বলে অনন্যা খাতুনকে আরও জোরে চেপে ধরল। অনন্যা খাতুন ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি কি করতে চাইছ, বেটা?”
শেরাজ অনন্যা খাতুনের কথা উপেক্ষা করে রোজার উদ্দেশ্যে বলল,
“তুই আমাকে ভালোবাসিস তাইনা?”
রোজা হয়তো এমন প্রশ্ন আশা করেনি। সে কান্না থামিয়ে শেরাজের দিকে তাকাল। সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার খান সাহেব কি করতে চাইছে বোঝার চেষ্টা করল।
“কি হলো, বল?”
“বাসি এস.কে। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। আই লাভ ইউ এস.কে। আই লাভ ইউ।”
সকলে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। সুমু পপকর্ন মুখে নিতে গিয়েও নিল না। আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে শেরাজের উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করছে।
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“তাহলে চল তোর ভালোবাসার এক্সাম নেই। আমিও দেখি তুই আমাকে কতটা ভালোবাসিস।”
চোখের পানি মুছে ভ্রু কুঁচকালো রোজা।
“এক্সাম?”
“হুম, এক্সাম। যদি তুই পাশ করিস, তাহলে তুই যা বলবি আমি তাই করব।”
“সত্যি এস.কে?”
“হুম সত্যি!”
“যদি বলি, সুমুকে ডিভোর্স দিয়ে আজ এই মুহুর্তে আমাকে বিয়ে করতে, করবে তুমি?”
“আমি তোকে কি বললাম? তুই যা বলবি তাই করব।”
“আচ্ছা! তাহলে বলো কি এক্সাম?”
শেরাজ “আলিশা” নামের একজন সার্ভেন্টকে ডাক দিল। মেয়েটি মাথা নিচু করে এগিয়ে এসে মৃদুস্বরে বলল,
“আদেশ করুন মেজোসাহেব।”
“আপনাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ দিব। যদি ঠিকমতো করতে পারেন, তাহলে আপনি যা স্যালারি পান তার দ্বিগুন বাড়িয়ে দেওয়া হবে। আর যদি না পারেন, তাহলে আপনার চাকরি যাবে। এখন বলুন পারবেন আপনি?”
“চেষ্ট করব মেজোসাহেব।”
“চেষ্টা না। কাজটা আমার হওয়া চাই।”
“ঠিক আছে মেজোসাহেব।”
“আপনার হাতে নেইল আছেনা?”
“জি মেজোসাহেব, আছে।”
“ওকে! রোজা আপনার মেজো খান সাহেবার পবিত্র হাতে তার নোংরা ছোঁয়া দিয়ে ঠিক যেই স্থানে ক্ষত করেছে, আপনিও ঠিক রোজার হাতের সেই স্থানে আপনার নেইল দিয়ে খুব ডিপলি ক্ষত করবেন। আমার ওয়াইফের ক্ষতের থেকেও বেশি ডিপ ক্ষত করবেন। এইটা আপনার কাজ।”
“কিন্তু মেজোসাহেব…”
“উহুম! কোনো কিন্তু নয়। আপনি পারবেন নাকি পারবেনা সেইটা বলুন।”
সার্ভেন্টটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“পারবো মেজোসাহেব।”
“গুড!”
অনন্যা খাতুন রাগিস্বরে বললেন,
“এইসব কি ধরনের অসভ্যতামি, শেরাজ? তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? এইটা কি ধরনের ভালোবাসার এক্সাম?”
“এইটাই এক্সাম মম। দয়া করে তুমি চুপ থাকো। রোজাকে আমি এই ফাস্ট অ্যান্ড লাস্ট একটা সুযোগ দিয়েছি। তুমি বেশি কথা বললে রোজা ওর এই সুযোগটা হারাবে।”
রোজা একবার নিজের হাতের দিকে তাকাল। কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,
“থাক না, ফুফুমনি। তুমি আর কিছ বলোনা। আমি পারব। এস.কের জন্য এইটুকু আমি সহ্য করে নিব।”
“কিন্তু রোজা…”
“কোনো কিন্তু নয় ফুফুমনি। আমি পারব।”
শেরাজ হাসল। রোজার উদ্দেশ্যে বলল,
মনে রাখিস, কোনো রকমের চিৎকার করা যাবেনা। চোখে একবিন্দু পানি আসা যাবেনা।”
রোজা অসহায় দৃষ্টিতে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ আলিশাকে বলল কাজ শুরু করতে। আলিশা একবার ভীতু চোখে রোজার দিকে তাকাল। রোজার রাগ চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে আলিশার দিকে। আলিশা রোজার হাত ধরল। শেরাজ ওয়ান, টু, থ্রি কাউন্ট করার সাথে সাথে রোজার হাতে নিজের নখ বসিয়ে দিল আলিশা। সহ্য করতে পারল না রোজা। জোরে চিৎকার করে উঠল। অনন্যা খাতুন দৌড়ে গিয়ে রোজাকে ধরল। আলিশা ভয়ে সরে দাঁড়াল। শেরাজ আলিশাকে চলে যেতে বলে, অনন্যা বেগমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দু'হাত পকেটে গুঁজে বলল,
“প্রসঙ্গ যখন আমার বউয়ের বেলায়, তখন আমি কাউকে ছেড়ে কথা বলব না। আমার আসল রূপ দেখতে না চাইলে, তোমার বংশের সবাইকে বলো, আমার বউয়ের থেকে দূরে থাকতে। আমার বউকে যে কষ্ট দিবে আমি তার জীবন জাহান্নাম বানিয়ে দিব, মাইন্ড ইট।”
কথাগুলো বলে শেরাজ সুমুর কাছে গেল। সুমুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। সুমু মুচকি হেসে শেরাজের হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। শেরাজ ফিসফিসিয়ে বলল,
“দেখেছ সুইটহার্ট, সামান্য নখের ব্যথা সহ্য করতে পারেনা। সে নাকি আমাকে বিয়ে করে আমার দেওয়া ক্যারেন্টের ব্যথা সহ্য করবে। ক্রেজি গার্ল।”
শেরাজ সুমুর হাত ধরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল। শেহেজাদ সাহেব সাহাবাজের সাহেবের কাছে গিয়ে বললেন,
“দেখেছেন ভাইজান, একদম বাবা-চাচার মতো হয়েছে আমাদের শেরাজ।”
সাহাবাজ সাহেব আলতো হেসে অনন্যা বেগমের দিকে একপলক তাকিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালেন। একে একে সকলে যার যার রুমে চলে গেল। আরিয়ান গিয়ে রোজার হাত ধরে ছাদের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। অনন্যা খাতুন আরিয়ানকে আটকে বললেন,
“রোজাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
“একটু ছাদে যাচ্ছি, ফুফুমনি। তুমি রুমে যাও। আর কোনো চিন্তা করোনা। এই ব্যাপারটা এই খান ম্যানশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”
আরিয়ান রোজাকে নিয়ে ছাদের চলে গেল। অনন্যা খাতুন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।
•
রাতে সকলে ডিনার করার জন্য নিচে নামলেও শেরাজ সুমুকে নিয়ে ডিনার করার জন্য নিচে নামেনি।
সুমু বেডের মাঝখানে বসে আছে। শেরাজ ফিরোজাকে সারবাজের রুমে দিয়ে এসে দেখল সুমু মন খারাপ করে বসে আছে। শেরাজ এসে তার পাশে বসল। সুমু দু'হাত দিয়ে শেরাজের হাত আঁকড়ে ধরে শেরাজের বাহুতে মাথা রাখল। শেরাজ সুমুর মুখের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলো আলতো হাতে কানের পাশে গুঁজে দিয়ে বলল,
“মন খারাপ?”
“আজ যেগুলো হয়েছে, এগুলো ঠিক হয়নি।”
“ফরগেট ইট!”
“ভুলে যাব?”
“ইয়েস! ভুলে যাবে। কারণ আমি পাস্ট মনে রাখিনা। আমার লাইফে আমি যেটাই করি, হোক সেটা ভুল বা ঠিক। কাজটা করার পর আমি আর মনে রাখিনা। তখন যেটা হয়েছে এখন সেইটা পাস্ট। সো, ফরগেট ইট।”
সুমু চুপ করে কিছুক্ষণ বসে থেকে আবারও বলল,
“এই রুমে ক্যামেরা আছে?”
“শুধু এই রুমে নয়। এই বাড়ির প্রতিটি কোণায় কোণায় ক্যামেরা আছে।”
“রোজা আপু আজ এক্সামে জিতে গেলে আপনি কি করতেন?”
“ওকে ছোটবেলা থেকে চিনি। ও কখনোই জিততে পারত না।”
সুমু চুপ করে রইল। শেহেরাজ সুমুর মন ভালো করার জন্য বলল,
“তুমি জানো সুইটহার্ট? আমি তোমার সাথে ঠিক কীভাবে রোমান্স করতে চাই?”
সুমু মাথা তুলে তার দিকে তাকাল। শেরাজ সুমুর নাক টেনে দিয়ে আলতো হেসে বলল,
“ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করতে চাই, লং টাইম হাগ করতে চাই, এক কাপে চা শেয়ার করে খেতে চাই, সবসময় তোমার হাতের ওপর আমার হাত রাখতে চাই, লং টাইম তোমার কপালে চুমু খেতে চাই, লেট নাইট একসাথে নেটফ্লিক্স দেখতে চাই, লেট নাইট খালি পায়ে দুজনে হাত ধরে শুনশান রাস্তা দিয়ে হাঁটতে চাই।”
সুমু শেরাজের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে । শেরাজ সুমুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“চলো বাহির থেকে ডিনার করে আসি।”
সুমু যেতে রাজি হলো না। শেরাজ জোর করে সুমুকে রেডি হতে পাঠাল। সুমু পাশের রুম থেকে তার মিনি শপিংমল থেকে নিজের পছন্দমতো ব্ল্যাক কালারের একটা বোরকা নিয়ে এলো। তারপর বোরকা পরে রেডি হয়ে নিল। শেরাজ ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে। সুমু হিজাব বাঁধার জন্য ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সুমুর হিজাব বাঁধার মধ্যে শেরাজ সুমুকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাঁড় করাল। নিজ হাতে সুমুর হিজাব ঠিক করে দিতে লাগল। সুমু মুগ্ধ নয়নে তার খান সাহেবকে দেখছে। শেরাজ সুমুর হিজাব ঠিক করে দিয়ে সুমুর কপালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। বেড সাইড টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা হাতে নিল। সুমুর হাতে ফোনটা দিয়ে সে পেছন থেকে সুমুকে জড়িয়ে ধরল। দুজনে একসাথে মিরর পিক তুলে বেরিয়ে পড়ল রেস্টুরেন্টের উদ্দেশ্যে।
•
গাড়ি এসে থামল ওমানের “মারহাবা” রেস্টুরেন্টের সামনে। সুমু যাতে নিজের দেশের খাবার তৃপ্তি করে খেতে পারে, তাই শেরাজ সুমুকে বাংলাদেশী ফুড পাওয়া যাবে এমন রেস্টুরেন্টে নিয়ে এলো। বেশি রাত না হওয়ায় রেস্টুরেন্ট ভর্তি মানুষ। গাড়ি থেকে নামার আগে শেরাজ মুখে মাস্ক পড়ে নিল। নিজে গাড়ি থেকে নেমে সুমুর পাশের দরজা খুলে দিয়ে হাত বাড়াল। সুমু শেরাজের হাত ধরে নামল গাড়ি থেকে। দুজনে একসাথে ঢুকলো রেস্টুরেন্টের ভিতরে। শেরাজ সুমুকে নিয়ে কর্নারের একটি টেবিলে বসল। ওয়েটার আসতেই সুমুর পছন্দমতো সব খাবার অর্ডার দিল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ওয়েটার এসে খাবার সার্ভ করে দিয়ে গেল। দুজনেই খাবার সামনে নিয়ে বসে আছে। সুমু মুচকি হেসে বলল,
“এখানে এসে ডিনার করার প্ল্যানটা আপনার, তাহলে এখন শুরু করছেন না কেনো?”
শেরাজ মাস্ক খুলল। স্পুনে খাবার তুলে আগে সুমুর মুখে দিল। দুজনে একসাথে অর্ধেক খাবার খেয়ে শেষ করল। আচমকাই একটা মেয়ে এসে দাঁড়াল শেরাজের পাশে। শেরাজ খাবার মুখে নিয়ে মেয়েটার দিকে তাকাল। রেস্টুরেন্টে বসে থাকা সকলের মধ্যে খুশির বন্যা বয়ে গেল। সকলে সেলফি নেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। শেরাজ অনুমতির জন্য সুমুর দিকে অসহায় চোখে তাকাল। সুমু মুচকি হেসে অনুমতি দিল। শেরাজ একে একে সকলের সাথে সেলফি নিল। সেলফি তোলা শেষে সকলের মনে একটাই প্রশ্ন শেরাজের সাথে বসে থাকা মেয়েটা কে?
শেরাজকে প্রশ্ন করতেই সে সকলকে উদ্দেশ্যে বলল,
“আজ রাত একটায় লাইভে আসব আমি। তখন সকলের প্রশ্নের উত্তর দিব। এখন এখানে ডিনার করতে এসেছি। আমাদের শান্তিতে ডিনারটা করতে দিন।”
সকলে সরে গিয়ে যার যার টেবিলে গিয়ে বসল। কিছু কিছু মেয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে রইল। সুমু হঠাৎ অস্বস্তি অনুভব করল। স্নিকার্স প্রচন্ড টাইট করে বাঁধার ফলে পায়ে ব্যথা হচ্ছে তার। শেরাজ সুমুর মুখের অবস্থা দেখে কি হয়েছে কারণ জানতে চাইল। সুমু নিচুস্বরে বলল,
“পায়ে ব্যথা হচ্ছে। জুতো অনেক টাইট করে বেঁধে ফেলেছি।”
শেরাজ উঠে দাঁড়াল। সুমুর চেয়ার ঘুরিয়ে তার পায়ের সামনে এক হাঁটুমড়ে বসল। শেরাজের কাণ্ডে সুমু চট করে উঠে দাঁড়াল। রেস্টুরেন্টে উপস্থিত সকলে হা করে তাকিয়ে আছে। শেরাজ সুমুর হাত টেনে ধরে চেয়ারে বসিয়ে বলল,
“চুপ করে বসে থাকো। আমি বেঁধে দিচ্ছি।”
“কিন্তু আপনি…”
“চুপ!”
শেরাজ সুমুর স্নিকার্সে হাত দিল। দু'পায়ের স্নিকার্স খুলে সুন্দর করে আবারও বেঁধে দিল। রেস্টুরেন্টের সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কেউ কেউ আবারও ফটো তুলে নিল। শেরাজ উঠে দাঁড়াল। বিল পেমেন্ট করে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এলো।
•
শুনশান রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছে। একটা ফাঁকা মাঠের কাছে গাড়ি থামাল শেরাজ। সোডিয়ামের আলোয় সবকিছু স্পষ্ট। দুজনে গাড়ি থেকে নেমে মাঠের দিকে হাঁটা ধরল। মাঠের একপ্রান্তে দোলনা দেখে সুমু দৌড়ে গিয়ে দোলনার ওপর বসে পড়ল। দোলনার ওপর বসে সুমু প্রানখোলা অট্টহাসিতে মেতে উঠল। সুমুর ঠোঁটের হাসি শেরাজের ঠোঁটকে হাসতে বাধ্য করল। শেরাজ সুমুর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। আস্তে আস্তে দোল দিতে লাগল। সুমু হাসতে হাসতে বলল,
“আপনিও বসুন, খান সাহেব।”
শেরাজ এসে সুমুর পাশের দোলনায় বসল। দুজনে একসাথে দোলনায় দোল খেতে খেতে সময়টা উপভোগ করায় ব্যস্ত হলো।
বিশ মিনিট বাদে দুজনে উঠে দাঁড়াল। সুমু জুতো খুলে হাত নিয়ে বলল,
“আমি খালি পায়ে হাঁটব।”
শেরাজ সুমুর হাত থেকে জুতোজোড়া নিয়ে আগে আগে হাঁটা শুরু করল। সুমু দৌড়ে গিয়ে শেরাজের হাত আকঁড়ে ধরে তার বাহুতে মাথা রেখে সমান তালে এগিয়ে চলল। গাড়ির কাছে এসে দুজনে গাড়িতে উঠে পড়ল। গাড়ি ছুটল খান ম্যানশনের উদ্দেশ্যে।
•
বারোটা ত্রিশের দিকে শেরাজদের গাড়ি খান ম্যানশনের সামনে এসে দাঁড়াল। সুমু ঘুমিয়ে আছে। শেরাজ গাড়ি থেকে নেমে সুমুর পাশের দরজা খুলল। সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে তাকে কোলে তুলে নিল। ছাদ থেকে সবটা দেখল আরিয়ানে। হাতের মধ্যে থাকা অ্যালকোহলের বোতলটা সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরে রেখেছে সে। শেরাজ বাড়ির ভেতরে এসে সোজা নিজের রুমে গিয়ে বেডে শুইয়ে দিল সুমুকে। আলগোছে সুমুর শরীর থেকে বোরকা আর হিজাব খুলে নিল। সুমু একটু নড়েচড়ে উঠল, তবে ঘুম ভাঙাল না। শেরাজ এসি অন করে নরমাল টেম্পারেচার দিয়ে সুমুর গায়ে ব্লাঙ্কেট টেনে দিল। নিজের গায়ে পোশাক চেঞ্জ করে শর্ট-প্যান্ট আর টি-শার্ট পরে নিল। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে সোশ্যাল মিডিয়াতে ঢুকল। নোটিফিকেশনের জন্য অতিষ্ঠ হয়ে উঠল শেরাজ। রেস্টুরেন্টে সুমুর জুতো বেঁধে দেওয়ার ছবি অনেকে আপলোড দিয়ে শেরাজকে ট্যাগ করেছে। আইয়ুবরাও এই ব্যাপারটা নিয়ে মজা করে শেরাজকে টেক্সট পাঠিয়েছে। অনেকে ইনবক্সে কান্না কাটির শুধু করেছে। শেরাজ সবকিছু ইগনোর করে লাইভে ঢুকল। লাইভ স্টার্ট করা সাথে সাথে সকলের প্রশ্নের বন্যা বয়ে গেল। শেরাজ বিয়ের বিষয়টা সকলকে জানালো। সকলে সুমুকে দেখতে চাইল। শেরাজ সুমুকে দেখতে চাওয়ার ব্যাপারটা ইগনোর করল। প্রায় একঘণ্টা লাইভ করে শেরাজ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বেরিয়ে এলো। প্রচন্ড টায়ার্ড সে। এখন সোশ্যাল মিডিয়াতে থাকলে সে পাগল হয়ে যাবে। ফোন রেখে বেডের কাছে গেল। নিজের বালিশটা একটু নিচে নামিয়ে ঘুমন্ত সুমুর বুকের মধ্যে মাথা রাখল। সে সুমুর কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করল।
•
অন্ধকার রুমের মধ্যে বসে শেরাজ পুরো লাইভটা ফেক একাউন্ট দিয়ে দেখল সেই মানব। ঠোঁটে লেগে তার বাঁকা হাসি। শেরাজের একটি ছবি বের করে ভালো করে পরখ করে বলল,
“তোর সবকিছু ধ্বংস করে দিব এস.কে। তোর লাইফ থেকে কেড়ে নেব তোর এই ভালোবাসাকে। তোকে শূন্য করে দিব। কিছু থাকবেনা তোর। সব ধ্বংস করে দিব আমি। তোর এই সুখের মেয়াদ বেশিদিনের হবেনা।
কথাগুলো বলে মানবটি অট্টহাসিতে মেতে উঠল। সে হাতে ওয়াইনের বোতল নিয়ে একচুমুকে অর্ধেক শেষ করে সামনে থাকা আয়ানার দিকে বোতল ছুঁড়ে মারল। মুহুর্তেই আয়নাটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ভাঙা কাচের দিকে তাকিয়ে লোকটি আবারও হেসে উঠল।
চলবে..?