#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_60 ✦ প্রথমাংশ ✦
আজ আবারও আলিয়া এলেন। কারাগারের সেই চিরচেনা নীরব প্রহর। দুপুর তিনটা বাজতে না বাজতেই নির্ধারিত কাচঘরের দিকে পা বাড়ালেন তিনি। সুমু দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে। এলোমেলো চুলগুলো ঘাড় ছুঁয়ে নামছে, চোখে সেই একই নিষ্প্রভ আলো। ঠোঁটে কোনও শব্দ নেই, কিন্তু ডান হাতটা দিয়ে কিছু একটা আঁকছে পুরনো ডায়েরির পাতায়। আলিয়া চুপচাপ এসে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর ধীরে বললেন,
“আজকে একটু অন্যরকম লাগছে তোমাকে। কেমন যেন গা ছমছমে নিস্তব্ধতা। সব ঠিক তো?”
সুমু চুপ করে রইল। তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
“আজকে সকালে একটা চিঠি পেয়েছি। ওমানের কেন্দ্রীয় আপিল কোর্ট থেকে,” একটু থেমে আবারও বলল, “আমার মুক্তির দিন এগিয়ে এসেছে। নতুন তারিখ ঠিক হয়েছে। মাত্র বিশ দিন বাকি।”
আলিয়ার চোখ ছলছল করে উঠল,
“তুমি চলে গেলে আমি তো একা হয়ে যাব, সুমু।”
“আমার চলে যাওয়াটা কোনো শেষ নয়, বরং শুরু। আমি চাই, আপনি এই গল্পটাকে নিজের করে নিন। পৃথিবী জানুক— কেউ একজন ভালোবেসেছিল এমনভাবে, যে কারাবাসও তাকে থামাতে পারেনি।”
আলিয়া চুপ করে রইল। সুমু উঠে দাঁড়াল। পেছনে রাখা চাদরের নিচ থেকে একটা পোটলা বের করে আনলো। সেটা খুলে ছোট একটা কাঠের বাক্স দেখাল। বাক্সের গায়ে লেখা,
"সুমুরাজ!”
“এই বাক্সে আছে আমাদের সেইসব মুহূর্ত— কিছু চিঠি আর খান সাহেবের কিছু জিনিস। এগুলো আমি ওনার অজান্তে রেখে দিয়েছিলাম আমার কাছে।”
আলিয়ার চোখে বিস্ময়,
“তুমি এসব কারাগারে এনে রাখলে কীভাবে?”
সুমু চোখ বন্ধ করে বলল,
“ভালোবাসার জায়গায় আইন সবসময় পৌঁছাতে পারে না। কিছু স্মৃতি থাকুক না শুধু হৃদয়ের আদালতেই বন্দি হয়ে।”
আলিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে সুমুর দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে আজ অন্যরকম একটা তীব্রতা, যেন বহুদিনের সংযত এক সত্যি আজ আর আটকে রাখতে পারছে না। আলিয়া নিচু গলায় বললেন,
“কখনো তোমাকে কথাটা বলিনি, সুমু। কিন্তু আজ আর চুপ থাকতে পারছি না। তুমি অসম্ভব সুন্দরী একজন নারী। সত্যি বলছি, পাঁচটা বছর এই নোংরা, স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালের মাঝে কাটিয়ে দেওয়ার পরেও তোমার রূপের একটুও ঘাটতি পড়েনি, বরং আগের থেকেও তুমি অনেক বেশি দীপ্তিময় হয়েছ, যেন সব ব্যথা, সব চেপে রাখা কষ্ট তোমাকে আরও সুন্দর করে তুলেছে। তুমি যেমন সুন্দরী, তেমনই ভাগ্যবতী। আমি নিশ্চিত, সৃষ্টিকর্তা তোমাকে গড়েছেন প্রচন্ড ধৈর্য আর সহ্যের এক ছাঁচে। এতটা ধৈর্য আমি আর কারো মধ্যে দেখিনি। আর না তোমার মতো এতো সুন্দরী মেয়ে দেখেছি।”
সুমু হালকা তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
“আমি ভাগ্যবতী, এইটা মেনে নিলাম। কিন্তু আমি সুন্দরী, এটা আপনি কীভাবে বললেন?”
আলিয়া একটু চমকে তাকাল তার দিকে।
“তাহলে কী তুমি বলছ, তুমি সুন্দরী নও?”
সুমু এবার চুপ করে রইল। একটাও শব্দ করে না। চোখ দুটো ঘরের এক কোনায় আটকে রাখল যেন ওখানেই সমস্ত উত্তর লুকিয়ে আছে। আলিয়া গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বললেন,
“এক পাপিষ্ঠ পুরুষ, যিনি জীবনের কোনো নিয়ম মানতেন না। এক কথার মানুষ ছিলেন। কঠিন হৃদয়, হিম শীতল চোখ, বিষাক্ত রাগ যার প্রতিটা আচরণে ফুটে উঠতো। নারীর দিকে তাকানো দূরে থাক, তাদের উপস্থিতিও সে সহ্য করতে পারতো না। নারীকে সে ভাবতো দুর্বল, আবেগপ্রবণ, এমন কিছু, যাদের জন্য হৃদয়ে জায়গা রাখা বৃথা। কত শত মেয়ে তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল, সে চোখ তুলে তাকায়নি। কিন্তু তোমার সামনে এসে, তার সেই রাগ, সেই কঠোরতা গলে গিয়েছিল। তোমার চোখে সে খুঁজে পেত একধরনের নিশ্চিন্ত ঘর, একটা নিরাপত্তা। সে তোমায় দেখে থেমে যেত, তার কণ্ঠ আটকে যেত। এক কঠিন পুরুষ, যার হৃদয়ে আগুন ছিল। সে তোমার ভালোবাসায় নরম হয়ে গিয়েছিল।”
সুমু তাকিয়ে রইল আলিয়ার দিকে। আলিয়া মৃদু গলায় আবারও বললেন,
“দ্বিতীয়জন ছিল নারী-বিদ্বেষী, আত্মঘৃণায় পোড়া এক আত্মা। সে মেয়েদের ঘৃণা করত। সে এক রকম ভীষণ ঘৃণা, যে ঘৃণা তার চোখে ফুটে উঠত। তার জীবনে নারীর জায়গা ছিল না, বরং ঘৃণার চিহ্ন ছিল প্রতিটি পদক্ষেপে। সে বিশ্বাস করত, নারী মানেই দুর্বলতা, প্রতারণা, এক ধরণের বিষ। সে মেয়ে মানুষ দেখলে চোখ ফিরিয়ে নিত। ছোঁয়া তো দূরের কথা, তার বুক জুড়ে জমে ছিল অপমান, অভিমান, একরাশ অসহিষ্ণুতা। তবুও সেই মানুষটাই একদিন তোমার সামনে প্রথমবার তার সেই বিষাক্ত দেয়ালের ফাঁকে তোমাকে জায়গা দিয়েছিল। সে তোমার স্পর্শ চায়নি, চেয়েছিল তোমার পাশে থাকতে। তুমি তাকে পাল্টে দিতে শুরু করেছিলে।”
সুমু তাচ্ছিল্য করে হাসল। আলিয়া সেই হাসি সরু চোখে লক্ষ্য করে বললেন,
“তৃতীয়জন ছিল নেশাগ্রস্ত, লোভী, নারী-ভোগী, এক প্লে-বয়। নারী ছিল তার খেলনা। তার চোখে নারী মানেই এক রাতের শয্যাসঙ্গী। সে নারীদের কাছে যেত, ভোগ করত, তাদের চোখে প্রেম দেখিয়ে তারপর ছিঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিত টিস্যুর মতো। তার চারপাশে মেয়েরা ভিড় করত। কেউ তাকে ছোঁয়ার আশায় মরত, আবার কেউ একরাতের জন্য অপেক্ষা করত। সে কারও চোখে প্রেম খুঁজত না। কিন্তু সেই মানুষটাও তোমার কাছে থেমে গিয়েছিল। তোমাকে দেখে তার চোখে ভয় চলে এসেছিল। সেই মানুষটাও তোমার স্পর্শ চায়নি, চেয়েছিল তোমার কাছে ক্ষমা। তুমি তাকে ভেঙে দিয়েছিলে। ভালোবাসার সামনে তাকে নগ্ন করে দিয়েছিলে। তাহলে তুমি বলো, এতগুলো পুরুষ, যাদের একেকজনের জীবন ছিল ভয়ানক এবং মেয়েদের থেকে শত যোজন দূরে— তারা সবাই যদি তোমাকে এভাবে ভালোবেসে ফেলে, তাহলে কী তুমি সত্যিই বলবে, তুমি সুন্দরী নও?”
সুমু এক চিলতে হাসল। সেই হাসি বিষণ্ণ। সে যেনএক কৌতুক শুনলো নিজের ভাগ্য নিয়ে। শান্ত গলায় বলল,
“আপনি কী জানেন, নারীর সৌন্দর্য একটা অভিশাপ? যদি নারী দেখতে সুন্দরী না হয়, তাহলে সমাজ তার অস্তিত্বই মানতে চায় না। আর যদি নারী রূপবতী হয়, তাহলে সে শিকার হয়ে যায় জানোয়ারদের নজরে। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, নারীর রূপ তার অস্ত্র নয়, বরং তার শাস্তি হয়ে দাঁড়ায় এই সমাজে। এই রূপ, এই মুখ, এই চুল, এই চোখ, এগুলোর কারণেই তো আমি আজ এখানে। এই সৌন্দর্যের কারণেই আমাকে টার্গেট করা হয়েছিল। ভালোবাসার মুখোশ পরে তারা একজন একজন করে আমার সর্বনাশ করেছে। এই রূপই আমার দুর্ভাগ্য। এই চোখ, এই চুল, এই ঠোঁট, এগুলোই আমাকে ধ্বংস করেছে। আমি যদি সাধারণ একটা মেয়ে হতাম, দেখতে কুৎসিত হতাম, তবে আজ হয়ত এই কারাগারের ভেতর বসে গল্প বলতাম না।”
আলিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে শুনছে সব। সুমু দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বলল,
“আপনারা সবাই শুধু সেই তিনজন পুরুষের প্রেমের গল্প শুনেছেন। কেউ কখনও ভাবেননি, এই মেয়েটা ঠিক কতবার মরেছে ভিতরে ভিতরে। কতবার ভেঙেছে নিজেকে আবার জোড়া লাগিয়েছে।”
আলিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখে এবার শুধু বিস্ময় নয়, অশ্রু এসে জমেছে। এক নারী হয়ে আরেক নারীর আর্তি বুঝে নিল। আলিয়া ধীরে বললেন,
“তোমার গল্পটা শুধু এক ভালোবাসার গল্প নয়, সুমু। এটা এক যুদ্ধের দলিল। এক নারীর গল্প, যে শুধু ভালোবেসে হারায়নি, প্রতিদিন নিজেকে খুন করেছে, আবার জোড়া লাগিয়েছে। তুমি শুধু সুন্দরী নও, তুমি ভয়ঙ্কর রকমের শক্তিশালী।
সুমু হালকা মাথা নেড়ে বলল,
“ভালোবাসা যদি মানুষকে শক্তি দেয়, তবে সেই শক্তি দিয়ে আমি নিজেকে গড়েছি। কিন্তু সবাই জানে না, এই গড়ার পেছনে কতটা ধ্বংস লুকানো আছে।”
আলিয়া উঠে দাঁড়িয়ে পেছনে হেঁটে যায় কিছুটা। তার চোখের জল মুছতে চায়, কিন্তু পারে না। সে জানে, এই ঘরের মেয়েটা, যাকে সে এতদিন শুধু এক কয়েদি ভেবেছিল, সে আসলে এক মহাকাব্য। এক ‘সুমুরাজ’ নামক ভালোবাসার গল্প, যার ভিতরে লুকিয়ে আছে ভাঙা হৃদয়, ছেঁড়া চিঠি, গলিত কান্না আর ভয়ঙ্কর শূন্যতা। পেছন থেকে সুমু নিজের পুরনো ডায়েরি থেকে একটা পৃষ্ঠা বের করে বলন,
“একটা পৃষ্ঠা পড়বেন?”
আলিয়া ফিরে এসে বসল। সুমু একটা পাতলা, হলদেটে পৃষ্ঠা এগিয়ে দিল। ডায়েরির পাতার কোণায় আঁকা খান সাহেবের মুখ। সুমু সেই চিত্রটা লুকিয়ে রাখল। আলিয়া পড়তে শুরু করল,
“আপনার চোখে একটুখানি কোমলতা দেখলেই আমি বাঁচতে চাইতাম। আপনি যখন রাগ করতেন, তখন আমি ভয় পেতাম না, বরং ভালোবাসতাম সেই আগুনটাকেও। কারণ আমি জানতাম, সেই আগুনের মাঝে কোথাও আমার নাম লেখা। সেই রাতে, আপনি যখন প্রথম বললেন, ‘তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ সুমু’। তখন থেকেই আমার সমস্ত অপূর্ণতা ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। আমি তখন থেকেই জানতাম, মৃত্যুর পরও আমি শুধু আপনার হবো, শুধু আপনার।”
আলিয়ার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। সে পাতাটা বুকে চেপে রাখল। সুমু একটু হাসল। আলিয়া ধীরে বললেন,
“তোমার খান সাহেবের অনেক ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে আছে। আমি কখনো দেখেনি। আমি চেয়েছি তোমার মুখ থেকে তার বর্ণনা শুনব। কিন্তু তুমি কখনো বলোনি তো সুমু, তোমার খান সাহেব দেখতে কেমন ছিল?”
“আমার খান সাহেবকে নিয়ে কী বলব। তিনি ছিলেন ঠিক যেন কোনো আফগান পাহাড়ি রাজপুত্র। চোখে আগুন, চাহনিতে সম্মোহন, আর ব্যক্তিত্বে এক অদম্য ঠাণ্ডা ঝড়। তার চোখদুটো ছিল গভীর, যেন হাজার বছরের গল্প লুকিয়ে আছে সেখানে। ভ্রু’র কোণায় এক অভিমানী ভাঁজ, ঠোঁটে কঠিন নিরাসক্তি— কিন্তু সেই কঠিন মুখের আড়ালে আমি দেখতাম এক অদ্ভুত কোমলতা, যা কেবল আমার জন্যই বরাদ্দ ছিল। আমার খান সাহেব যখন সাদা শার্টে, হাতার গোটানো ভাঁজে, নীরবে হেঁটে যেতেন কোনো জায়গা দিয়ে— নারীদের চোখ যেন স্বাভাবিকভাবে তার দিকেই আটকে যেত। একবার যে তাকে দেখেছে, সে যেন আর নিজেকে ফেরাতে পারেনি। আমি ছিলাম সেই নারী, যার হাতে হাত রেখে হাঁটতেন তিনি। আমি ছিলাম সেই ভাগ্যবতী, যার দিকে তাকিয়ে শত নারী হাহাকার করে বলত— ‘কীভাবে পেল মেয়েটা এমন পুরুষকে?’ আর হ্যাঁ, আমার খান সাহেব ছিলেন সেই পুরুষ, যাকে ভালোবাসা মানেই ছিল গর্ব, ঈর্ষা আর অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ। আমি তার চোখে দেখেছিলাম ভালোবাসার শুদ্ধ ভাষা, আর সেখানেই আমার সমস্ত জয়ের গল্প লেখা ছিল।”
আলিয়া তাকিয়ে রইল অপলক। তার সামনে বসে আছে এমন এক নারী, যার মুখে আজ কেবল প্রেম নয় — আছে এক রাজকীয় বিষাদ, এক আভিজাত্যপূর্ণ ব্যথা, আর নিঃসঙ্গ জয়ের গল্প।
হঠাৎ ঘরের জানালা দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকল। ডায়েরির পাতাগুলো উড়তে শুরু করল। সুমু ডায়েরিটা বন্ধ করে বলল,
“কারাগারের পাঁচটা বছর আমি প্রতিদিন নিজেকে একটা করে চিঠি লিখেছি, যেন আমার স্মৃতি মরে না যায়।”
আলিয়া উঠে এসে সুমুর হাতটা ধরল। এই প্রথম তারা দুই নারী — একে অপরের চোখে নিজেদের প্রতিবিম্ব খুঁজে পেল। আলিয়া কাঁপা গলায় বলল,
‘তুমি কোনো কয়েদি নও, সুমু। তুমি এক পুরোনো ইতিহাস। এক অমর প্রেম। যে গল্প যুগ পেরিয়ে চললেও মানুষ শুনবে, কাঁদবে, আর বলবে, এমন ভালোবাসা কি সত্যি হয়?”
সুমু মাথা নিচু করে হাসল। চোখ তুলে বলল,
“হুম! হাজার জন প্রেম পায়, তাদের মধ্যে একশো জন সত্যিকারের ভালোবাসা পায়, আর সেই একশো জনের মধ্যে এক জন সেই ভালোবাসা ধরে রাখতে পারে। আমি সেই এক জনের একজন হতে চেয়েছিলাম। পারিনি। কিন্তু ভালোবাসাটা আমার ছিল। আমারই থাকবে, মৃত্যুর পরেও।”
ঘরটা আবারও কিছুক্ষণ চুপচাপ হয়ে গেল। বাইরের পাখিরা যেন এই নীরবতাকে সম্মান জানালো। বাতাসটা ধীরে আসে, আবার থেমে যায়। সুমু তখন ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠাটা খুলে আলিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিল। আলিয়া আবারও পড়তে শুরু করল,
“যদি কোনোদিন এই চিঠিগুলো কেউ পড়ে। তাকে বোলো, আমার জীবনটা কোনো নাটক ছিল না। এটা ছিল এক ভালোবাসার মহাকাব্য। আমার নাম ছিল ‘সুমাইয়া জাহান’। আর তার নাম— ‘শেরাজ খান’। সে ছিল শুধু সুমুর খান সাহেব।”
আলিয়ার পড়া শেষ হতেই সুমু একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে বলল,
“আজকে গল্প শুনবেন না?”
আলিয়া চোখের পানি মুছে তাকাল। সুমু মৃদু হেসে আবারও সেই পুরানো স্মৃতিচারণ করতে শুরু করল।
•
অন্ধকার রাস্তায় চারদিক নিস্তব্ধ। মাঝেমাঝে কুকুরের ডাকে রাতের নিস্তব্ধতা চিড় ধরছে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় রাস্তা পুরো আলোকিত। তার নিচে দিয়ে নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে যাচ্ছে সুমু। মাথায় ওড়না, মুখটা হালকা ঢাকা। শীতল বাতাস তার মুখের চারপাশে চুল উড়িয়ে নিচ্ছে। সে জানে না কোথায় যাচ্ছে। পা যেন নিজে থেকেই চলতে শুরু করেছে। বুকের ভেতর হাহাকার, নিঃশ্বাস ভারী তার। প্রতিটি পা ফেলার সাথে সাথে খান সাহেবের মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
হঠাৎ সামনের দিক থেকে একটা গাড়ি হেডলাইট জ্বালিয়ে এগিয়ে আসতে শুরু করল। ল্যাম্পপোস্টের নরম আলোর ওপর রাস্তার ওপর আচমকা উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল সুমুর। সে নিজের দু’হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ফেলল। মনে হলো, এবার বুঝি সব শেষ। তার চারপাশে যেন সময় থেমে গেছে। কিন্তু গাড়িটা ঠিক তার সামনে এসে থেমে গেল না, বরং একটু দূরে থামল। কোনো শব্দ নেই, ইঞ্জিনের গর্জন নেই। সুমু দু'হাতে ফাঁকা দিয়ে সামনে দেখার চেষ্টা করল। প্রথমে কিছু দেখতে না পেলেও ধীরে ধীরে তার সামনে ভেসে উঠল একজন ছায়ামানবের প্রতিচ্ছবি। সেই হেডলাইটের ভেতর দিয়ে কেউ এগিয়ে আসছে সে মানব। লোকটির গায়ে ওভারসাইজ হুডি জ্যাকেট, হুডি দিয়ে পুরো মাথা, মুখ সব ঢেকে রাখা। হাত দুটো পকেটে ঢোকানো, পায়ে ভারী বুটজুতো। পুরো শরীরটাই অচেনা, রহস্যে মোড়া, যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য।
সুমুর হৃদস্পন্দন মুহূর্তে থেমে যাওয়ার উপক্রম। সে ভয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। কিন্তু লোকটা থামল না। ঠিক তখনই, ভয় পেয়ে পেছন ফিরে সুমু দৌড়াতে শুরু করল। পায়ের নিচে রাস্তাটাও যেন পিছলে যাচ্ছিল। সুমু দৌড়াতে দৌড়াতে একবার পেছনে তাকাল। কেউ নেই। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে সামনে তাকাতেই বুকটা কেঁপে উঠল তার। লোকটা ঠিক তার থেকে কিছুটা দূরে সামনে দাঁড়িয়ে।
“সে কীভাবে এখানে এলো?”
সুমু আর কোনো চিন্তা না করে আবারও দৌড়াতে লাগল। এবার যেন জীবন বাঁচানোর দৌড়। পেছনে তাকিয়ে দেখল, লোকটা তার পেছন পেছন আসছে। কোনো শব্দ নেই, শুধু ছায়ার মতো ধেয়ে আসছে। হঠাৎ রাস্তায় একটা উঁচু অংশে হোচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল সুমু। মুখ থেকে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো—’আহ’ শব্দটা। হাত আর হাঁটুতে চোট পেলে সে। কিন্তু সে নিজেকে তুলতে গিয়েই অনুভব করলো—কেউ একজন তার পা চেপে ধরেছে।
সুমু চমকে পেছনে তাকাল। সেই ছায়ার মানুষটা। মুখ ঢাকা, হাতে গ্লাভস, একহাতে সুমুর পা চেপে ধরেছে, অন্যহাত জ্যাকেটের পকেটে ঢোকানো। হিমশীতল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে যেন তার চারপাশ দিয়ে। লোকটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। পায়ের ওপর থেকে চাপ সরিয়ে নিল, কিন্তু সামনে এগিয়ে এলো আরও। সুমু বসা অবস্থায় পেছাতে লাগল। ধুলো মেখে যাচ্ছে তার ওড়না, হাতে, মুখে। সুমু গলা কেঁপে উঠল। সে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,
“কে… কে আপনি?”
কোনো উত্তর নেই। লোকটা এবার পকেট থেকে আস্তে করে হাত বের করল। সুমু ভয়ে নিঃশ্বাস ফেলতেও ভুলে গেল। তার চোখ কুঁচকে উঠছে, মুখ শুকিয়ে আসছে। গলার ভেতর আটকে থাকা প্রশ্নটা আবার বেরিয়ে আসার আগেই লোকটা এক ধাপ এগিয়ে এসে সামনের বাতাসে কিছু একটা স্প্রে করে দিল। সুমুর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তার মুখের সামনে ধোঁয়ার মতো ঘোর লেগে গেল। সে হাত উঁচিয়ে কিছু একটা ঠেকাতে চাইল, কিন্তু শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল তার। চোখের পাতা ভারি হয়ে এলো, বুক ধড়ফড় করতে থাকল। তারপর ধপ করে শরীরটা রাস্তার ওপর পড়ে যেতে লাগল, কিন্তু লোকটা ঝাঁপিয়ে গিয়ে সুমুকে ধরে ফেলল। তার বুকের মধ্যে সুমুর মাথা এসে ঠেকল, যেন ক্ষণিকের জন্য সব থেমে গেল। সুমুকে জড়িয়ে ধরে লোকটা পকেট থেকে ফোন বের করল। দ্রুত কোনো একটা নাম্বারে কল করে আদেশের স্বরে বলল,
“ফাইভ মিনিট। এখুনি এখানে গাড়ি নিয়ে পৌঁছা।”
ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় কালো রঙের একটা গাড়ি এসে থামল রাস্তার ধারে। গাড়ির জানালায় ঝুঁকে কেউ কিছু বলল না, শুধু দরজা খুলে দিল। লোকটা সুমুর নিথর শরীরটা সাবধানে তুলে নিল। বুকের ভেতরে জড়িয়ে নিল এমনভাবে যেন সুমু কোনো কাচের পুতুল—ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগবে না। সে গাড়ির পেছনের সিটে সুমুকে শুইয়ে দিল। একবার নিচু হয়ে সুমুর মুখের দিকে তাকাল। আলোর রেখা পড়ে সুমুর মুখটা স্পষ্ট দেখা গেল। এলোমেলো চুল, মুখে ধুলো-মাখানো ক্লান্তি, ঠোঁটে অনুচ্চারিত ব্যথা। লোকটা হুডি টেনে মুখটা আরও ঢাকা নিল। নিজের গ্লাভস পরা হাত দিয়ে সুমুর গাল ছুঁয়ে সুমুর কপালের ওপর ঠোঁট ছুঁইয়ে নিজের লোকদের উদ্দেশ্যে বলল,
“খুব সাবধানে নিয়ে যাবি। ওর কিছু হলে, তোদের সাথে খুব ভালো কিছু হবে না।”
গাড়ির দরজা বন্ধ হলো। গাড়িটা ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। রাস্তায় আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো। লোকটাও নিজের আনা গাড়িতে উঠে চলে গেল। শুধু বাতাসে রয়ে গেল সুমুর পারফিউমের হালকা গন্ধ, আর কোনো এক অজানা গল্পের শুরু।
•
ঘড়ির কাঁটায় সময় রাত তিনটা। বাড়ি নিঃশব্দ। চারদিকে নিস্তব্ধতা এমন যেন নিজের নিঃশ্বাসও ভারি মনে হয়। মেইন গেটের বাইরে গাড়ি থামার শব্দ হলো। শেরাজ ফিরেছে। পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে উঠে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে এলো সে। হাত বাড়িয়ে দরজার হ্যান্ডেল চেপে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। রুমটা অন্ধকার। রুমের লাইট অন করতেই প্রথমেই চোখে পড়ল টেবিলের উপরে একটা কাগজ। তার উপর রাখা সুমুর পরিচিত সেই ছোট্ট পেন্ডেন্টটা, যেটা ওর মা দিয়েছিলেন। শেরাজ এগিয়ে গেল কাগজটার কাছে। পেন্ডেন্টটা সরিয়ে কাগজটা খুলে পড়ল সে। তার প্রতিক্রিয়া বোঝা গেল না। পকেট থেকে ফোনটা বের করে রাহিনের নাম্বার ডায়াল করল। কিছুক্ষণ রিং হতেই রাহিন কল রিসিভ করল। রাহিন কল রিসিভ করতেই শেরাজ গম্ভীর গলায় বলল,
“তোর বোন পালিয়েছে।”
ফোনের ওপাশ থেকে বোঝা গেল ঘুমন্ত রাহিনের ঘুম ছুটে গেছে।
“কী? কী বললি তুই? পালিয়েছে মানে?”
শেরাজ দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিল,
“আমি ঘরে ফিরেছি মাত্র। টেবিলের ওপর চিঠি রেখে গেছে তোর বোন। পেন্ডেন্ট খুলে রেখেছে। আর ফোনের সিমগুলো খুলে ফেলে দিয়ে গেছে। যেগুলো এখন আমার চোখের সামনে পড়ে আছে।”
রাহিন এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,
“ও কেনো পালাবে এস.কে?”
শেরাজ রাহিনের প্রশ্নটা উপেক্ষা করে বলল,
“বউ দেখি আমার পুরাই একটা কলিজা। কী সাহস আমার বউয়ের, হ্যাঁ। আমার বউয়ের সাহস দেখার পর আমি মুগ্ধ, শিহরিত, আহত, ব্যাহত, গর্বিত, অনুপ্রাণিত, ব্যথিত, মর্মাহত, শোকাহত, বিমোহিত, আনন্দিত, রাগান্বিত, আতঙ্কিত, রোমাঞ্চিত, ক্রন্দনরত, বেদনাদৃত, চিন্তিত, বিভোরিত, মোহিত, কম্পিত, সুরক্ষিত, কলংকিত, হাস্যরত, ক্রন্দিত, আরও কতিপয় কিছু বলার ছিলো। কিন্তু আমার মুখ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আমি দুঃখিত। সর্বোপরি নিহত।”
রাহিনের ঘুম কেটে গিয়ে এখন মাথা ঝিমঝিম করছে। শেরাজের কথাগুলো শুনে সে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“তুই কী কবিতা পড়ছিস, না মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিস, সেটা বুঝতে পারছি না। তোর মাথা ঠিক আছে এস.কে?”
শেরাজ হালকা হেসে বলল,
“তুই এখনো বুঝিসনি, রাহিন। তোর বোন আমাকে মেরে ফেলেছে। পেন্ডেন্টটা খুলে রেখে গেছে, ফোনের সিম ফেলে গেছে, কাগজে একটা চিঠি লিখে গেছে। তুই চাইলে তোকে কিছুটা পড়ে শোনাই।”
সেপকেট থেকে চিঠিটা বের করে পড়তে লাগল,
‘খান সাহেব’
“আমি পালাচ্ছি না। আমি হারিয়ে যাচ্ছি না। আমি শুধু একটু নিঃশ্বাস নিতে চাই। এই সম্পর্কের ভেতর আপনার রাগ, আপনার ভয়, আপনার ভালোবাসা সবকিছুই আমার নিজের মতো করে বোঝার প্রয়োজন ছিল। প্লিজ, খুঁজতে বের হবেন না। ভালো থাকবেন।”
‘সুমু’
সে উল্টাপাল্টা নিজের মনের মতো করে বানিয়ে পড়ে শোনাল। রাহিন চুপ করে রইল। শেরাজ বেলকনির দিকে হেঁটে গেল। চোখ তার দূরের অন্ধকারে আটকে।
“তোর বোনটা আসলেই সাহসী। এতটাই সাহসী যে আমার চোখে চোখ রেখে আমাকে যেমন ভালোবাসতে পারে, আবার পালিয়েও যেতে পারে একটুও পিছনে না তাকিয়ে।”
সে হঠাৎ করেই আবার হাসল। তীক্ষ্ণ সেই হাসিতে যেন বেদনাও বিদ্রূপ করে উঠল,
“একটা মেয়ে, যে নিজের সবকিছু আমার কাছে সমর্পণ করেছিল, আজ সেই মেয়ে আমাকেই রেখে নিজের স্বাধীনতা খুঁজতে গেছে। আমি তো ভেবেছিলাম, আমি তাকে আগলে রাখছি, ভালোবাসায় ভরিয়ে দিচ্ছি। এখন বুঝেছি, আমি তাকে শ্বাসরোধ করে ফেলছিলাম।”
রাহিন চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ। সে নিচু গলায় বলল,
“ভাই, তুই যদি ভাবিস তুই শ্বাসরোধ করছিলি, তাহলে তো ওর নিশ্বাস ফিরিয়ে আনাটাও তোর দায়িত্ব।”
শেরাজ গলায় বিষাদ মিশিয়ে বলল,
“আমি জানি রাহিন, আমার ভয়ানক রাগ, নিয়ন্ত্রণহীন ভয় আর অতিরিক্ত ভালোবাসা মিশে একটা চাপে পরিণত হয়েছিল। আমি ভাবিনি সেই চাপটা একদিন ওকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে,” একটু থেমে আবারও বলল, “কিন্তু ও কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? কিছুই তো নেয়নি সাথে। এই শহরে কাকে চিনে তোর বোন?”
রাহিন গলার স্বর শক্ত করে বলল,
“তাহলে তোকে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না, এস.কে। ওর সীমানা আমি জানি না। কিন্তু ওর না বলা কথাগুলো আমি শুনতে পারি। এখনই বের হতে হবে।”
শেরাজ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
“সবগুলোকে ঘুম থেকে তোল। এক্ষুনি সবাইকে নিয়ে বের হ। আমার বউকে খুঁজে আনতে হবে। বেঁচে থাকতে হলে, ওকে আমার দরকার।”
শেরাজ কল কেটে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। এদিকে রাহিনও সবাইকে ঘুম থেকে টেনে তুলে বেরিয়ে পড়ল।
চলবে..?
#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_60. ✦ বর্ধিতাংশ ✦
রাত প্রায় শেষ। ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর সাড়ে পাঁচটা। খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে শেরাজ একটার পর একটা রেড বুল ক্যান শেষ করে যাচ্ছে। পিচঢালা রাস্তার ধারে পড়ে আছে সাত-আটটা খালি ক্যানের বোতল। হাতে থাকা ক্যানটা শেষ করে সে আবার কেসের দিকে হাত বাড়াল, তখনই রাহিন এগিয়ে এসে তার হাত চেপে ধরল।
“কী সমস্যা তোর? মরতে চাস নাকি? একটার পর একটা খেয়েই যাচ্ছিস। সুমুকে খুঁজতে বের হয়েও খুঁজলি না, আর আমাদেরকেও খুঁজতে দিলি না। এসব কী করছিস, বল তো? কী চাইছিস তুই? আমি বিশ্বাস করতে পারছি না সুমু তোকে কোনো কারণ ছাড়াই ছেড়ে গেছে। প্লিজ, এস.কে আসল কথাটা বল।”
শেরাজ কিছু না বলে মাথা তুলে চোখ বন্ধ করে রাখল। আইয়ুব পাশে এসে রাহিনের কাঁধে হাত রাখল।
“ভাবিজি, কোনো কারণ ছাড়া যায়নি। এস.কের সব সত্যি জেনে গেছে, ভাবিজি।”
সবার মুখে বিস্ময়। স্যান্ডি ছুটে গিয়ে শেরাজের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“স্যার! সেদিন ওখানে ম্যাম ছিল?”
শেরাজ চুপ করে রইল। রাহিন উত্তেজিত গলায় বলল,
“তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে আছি কেনো আমরা? চল, খুঁজে বের করি ওকে।”
রাহিন এগোতেই শেরাজ ওর হাত চেপে ধরল। রাহিন প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেই শেরাজ পকেট থেকে ভাঁজ করা চিঠিটা বের করে রাহিনের দিকে বাড়িয়ে দিল। রাহিন চিঠি খুলে পড়তে শুরু করল। শেরাজ হাত বাড়িয়ে কেস থেকে আবারও একটা ক্যানের বোতল তুলে নিয়ে চুমুকে দিয়ে বলল,
“ও নিজে থেকেই যেতে চেয়েছে, আর আমিও যেতে দিয়েছি। ওর আবদার ছিল, আমি পূরণ করেছি।”
রাহিন দাঁতে দাঁত চেপে চিঠিটা ভাঁজ করে শেরাজের হাতে দিয়ে বলল,
“তুইও কী বাচ্চা এস.কে? সুমু জেদ ধরে বাচ্চাদের মতো আবদার করল, আর তুই ওকে যেতে দিলি? একটা ম্যাচিউর ছেলে হয়ে, সুমুর ক্ষেত্রে তুই এতো বড় ইম্যাচিউরের মতো কাজ করলি? ও বাচ্চাদের মতো যা আবদার করবে, তাই তোকে শুনতে হবে। ওর ক্ষেত্রে এতটা ইম্যাচিউর কেনো তুই? ওর জন্য তোর নিজের মধ্যে সবথেকে বেশি ম্যাচিউরিটি আনা উচিত।”
“ম্যাচিউরিটি কী শালা? বউ যদি বাচ্চাদের মতো আবদার করে, জেদ করে, কাঁদে, পাগলামি করে— তাহলে সেই পাগলামি সহ্য করার নামই তো হাজব্যান্ড। বউ কী শাসনের জিনিস? বউ তো ভালোবাসার আর আদরের জিনিস। বউ হচ্ছে মাথার তাজ। পুরুষের দায়িত্ব বউয়ের সব আবদার মাথা পেতে নেওয়া। নট শাসন করা। যে স্বামী নিজের বউকে বকা দেয়, শাসন করে, তাকে চোখের পানি উপহার দেয়, সে আবার কেমন পুরুষ রে? আমি ওর কান্না সহ্য করতে পারি না, রাহিন। তাই যদি ও ভুলও করে, আমি চুপ থাকি। কারণ ও আমার, আর আমি শুধুমাত্র ওর। শুধু ওর হাসির জন্য আমি আমার ইগো পর্যন্ত মাটিতে ফেলে দিতে পারি। এটাকেই আমি বলি আসল ম্যাচিউরিটি।”
শেরাজের কথা শেষ হতেই চারপাশে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। রাহিন কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। কারও চোখে কোনো ভাষা নেই, শুধু আছে বিস্ময় আর যন্ত্রণার ছাপ। রাহিন, স্যান্ডি, আইয়ুব, সাইফ, রিয়াদ সবাই আলাদা আলাদা গাড়িতে উঠে পড়ল। তাদের উদ্দেশ্য একটাই—সুমুকে খুঁজে বের করা। কিন্তু শেরাজ গেল না। সে একবারও গাড়ির দিকে পা বাড়াল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে।
আইয়ুব এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
“তুই যাবি না?”
শেরাজ শুধু মাথা নাড়ল। ধীরে এগিয়ে গেল নিজের গাড়ির দিকে। কালো রঙের রোলস-রয়েস নিঃশব্দে ছুটে চলে ফাঁকা হাইওয়ে ধরে। ভোরের কুয়াশা জড়ানো পথ যেন গিলে ফেলতে চাইছে শেরাজের কষ্ট। গাড়ির ভিতর শেরাজ নীরব। স্টিয়ারিংয়ের ওপর হাত রেখে বসে আছে ঠাণ্ডা চোখে। কেউ জানে না সে কোথায় যাচ্ছে, বা কেনো যাচ্ছে। গাড়ি একা চলতে থাকে নির্জন পাহাড়ি পথে। ভোরের কুয়াশায় ঢেকে থাকা রাস্তায় শুধু একটামাত্র গাড়ির শব্দ। শেরাজের মধ্যে নীরবতা, অভিমান, ভালোবাসা আর নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই চলছে।
গাড়ি এসে থামল দিবা পাহাড়ের পাদদেশে। আকাশ তখনো ধূসর। সূর্য ওঠার ঠিক আগের মুহূর্ত। শেরাজ দরজা খুলে নেমে দাঁড়াল। চোখে সানগ্লাস। হাত পকেটে। চোখের সামনে ছড়িয়ে আছে শুধু অসীম পাহাড়, আর তার ভেতরে জমে থাকা কষ্ট। তার পরনে আজ মিডনাইট নেভি ব্লু কালারের ফিটিং পোলো টি-শার্ট, যার স্লিভের প্রান্তে সূক্ষ্ম সাদা প্যাটার্ন। টি-শার্টটি তার গঠনবিন্যাস—মজবুত কাঁধ আর ছিপছিপে কাঠামো—চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। তার স্লিম ফিট স্টোন ওয়াশড ধূসর জিন্স যেন পাহাড়ি রঙের সঙ্গে মিশে এক আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা ভঙ্গিটি—না চাইলেও চোখ আটকে যায়। পায়ে সাদা-নীল ট্রেন্ডি স্নিকার্স। গলায় হালকা নীল স্কার্ফ। হাতে রয়েছে কালো ব্রেসলেট, চোখে কালো সানগ্লাস, ডান হাতের অনামিকা আঙ্গুলে প্ল্যাটিনাম ব্যান্ডের একটা রিং। হালকা বাতাসে তার চুল এলোমেলো হয়ে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে সে এগিয়ে গেল পাহাড়ের কিনারার দিকে। সূর্য প্রায় উঠে গেছে। সে কিছুক্ষণ চুপচাপ পাহাড়ের কিনারায় এসে দাঁড়িয়ে রইল। চোখের দৃষ্টি দূরের শূন্যতায় আটকে, যেন পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন। ভোরের আলো পাহাড়ের গায়ে ধীরে ধীরে লেপ্টে যাচ্ছে। বাতাস হালকা ঠাণ্ডা, কিন্তু শেরাজের ভেতরটা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে বাঁশির পরিচিত এক সুর। কিছুক্ষণ পর নিজের অজান্তেই গেয়ে ওঠে খুব মৃদু স্বরে,
“বল খুঁজি তোকে আর কিসে,
তুই জলে বাতাসে মিশে,
জানে মন, তুই জীবন!”
তার কণ্ঠে কোনো সুর নেই আজ। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুমুর মুখ, হাসি, অভিমান, ছোট ছোট পাগলামি, ‘খান সাহেব’ বলে ডাক দেওয়ার সেই কাঁপা স্বর, যেটা আজ কোথাও নেই। শেরাজ হঠাৎ থেমে গেল। চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে পাথরের ওপর হাঁটুমুড়ে বসে পড়ল। কন্ঠ নিচে নামিয়ে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি তো তোমাকে খুব যত্ন করে ভালোবেসেছিলাম। তার বিনিময়ে আজ এই দিনটা কী আমার প্রাপ্য ছিল? লোকে বলে, মানুষ যা চায়, তা পেয়ে গেলে নাকি আর মূল্য বোঝেনা। আমিও কী তোমার কাছে মূল্যহীন হয়ে গিয়েছি? তুমি তো আমার জীবনের সবচেয়ে শান্তির জায়গা। আমি এতগুলো বছর একা কাটিয়েছি এই বিশ্বাসে যে, শেষে তুমি আসবে, পাশে থাকবে। কিন্তু তুমি কী করলে? আমার এই বুকটাই খালি করে চলে গেলে? আমি তো আমার জীবনে কোনদিনও কোন নারীকে জায়গা দেইনি, শুধু তোমাকে দিয়েছিলাম আমার পুরোটা। তুমি আমার সব নিয়ে নিলে, বিনিময়ে রেখে গেলে শুধু এক বুক শূন্যতা। এই শূন্যতা কী দিয়ে ভরব আমি?”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবারও বলল,
“স্মৃতিগুলো কোথায় রাখা যায় বলো? তোমার চুলের ঘ্রাণ, ভেজা গলায় ‘খান সাহেব’ বলা ডাক, প্রতিটা রাতে তোমাকে জড়িয়ে ঘুমানো, ভোরে তোমার মায়াবী মুখটা দেখে ঘুম থেকে ওঠা। এসব কিছু আমি কোথায় রাখি, সুমু?”
সে চিঠিটা বের করে আনলো। সাদা কাগজটা একটু নীলাভ দেখাচ্ছে ভোরের আলোয়। হাত কাঁপছে তার। ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরেছে। চিঠিটার ওপর তার আঙুল বোলালো একবার। নিচু গলায় বলে উঠল,
“কত কথা লিখে রেখে গেছো এই চিঠিতে। তোমার লিখে রেখে যাওয়া প্রতিটা শব্দে আমার বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এতো কথা লিখলে, কিন্তু তোমাকে ছাড়া কীভাবে বাঁচতে হয়, সেটা কেনো লিখে রেখে গেলে না? তোমাকে ছাড়া কীভাবে নিঃশ্বাস নিতে হয়, রাতে কীভাবে বিছানায় শুয়ে তোমার অনুপস্থিতিকে জড়িয়ে ঘুমোতে হয়, সেগুলো কেনো লিখে গেলে না?”
কাগজা হাতের মুঠোয় নিয়ে চুপ করে রইল সে। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি ছাড়া বাঁচা—এটা একটা শাস্তি। আমি চাইনি কোনোদিন এমন পৃথিবী, যেখানে সূর্য ওঠে, কিন্তু তুমি নেই। যেখানে আযান হয়, কিন্তু তোমার কণ্ঠে কুরআনের আওয়াজ শোনা যায় না। যেখানে সবাই আছে, কিন্তু তুমি—আমার সুইটহার্ট, আমার সুমু—তুমি নেই। তুমি আমার দুনিয়া। তোমাকে ছাড়া আমি পুরোপুরি শূন্য। তুমি চলে গেছ মানে, আমি নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছি। আমি আজ আর শেরাজ খান নই, আমি কেবল একজন নিঃসঙ্গ পুরুষ।”
সে চুপ করে গেল। চোখ দুটো স্থির, মুখের রেখায় কোনো অনুশোচনা নেই, যেন সে দুঃখকেও অবহেলায় চিবিয়ে ফেলেছে। হঠাৎ ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বাঁকা, নির্মম হাসি। যেটা দেখে যে কারও ঘাম ছুটে যাবে। সে ধীরে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল তার আর সুমুর একটা কাপল পিক। শেরাজ সেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে চোখের পলক না ফেলে একটা ঠান্ডা হাসি হেসে বলল,
“একটা কথা জেনে রাখুন, ম্যাডাম। আপনার গল্পে আমি কোনো হিরো না। আমি সেই লোকটা, যার আগমন গল্পের মাঝখানে হয়, আর যেই আগমনের পর গল্পের রঙই পাল্টে যায়। তার তাকে বলে ভিলেন। আপনি আমাকে ভিলেনই বলতে পারেন। আপনি আমার পুরো সত্যি না জেনেই চলে গেলেন। আপনি জানেন না, আমার আরেকটা পরিচয় আছে। আমি একজন সিক্রেট মাফিয়া। আর মাফিয়াদের ভালোবাসা সস্তা হয় না, ম্যাডাম। আমরা যা একবার টার্গেট করি, তা নিজের করেই ছাড়ি। আর যদি পাবার পর সেটা পালাতে চায়, তবে তাকে জোর করে নিজের কাছে রাখতেও জানি। তাহলে আপনি ভাবলেন কীভাবে, আপনি আমাকে এত সহজে ছেড়ে যাবেন, আর আমি ছেড়ে দিব? আপনার সাথে এখনো অনেক কিছু বাকি আছে, ম্যাডাম। আপনার রাগ, ঘৃণা, কান্না সব আমি দেখব। কারণ আপনি আমার গল্পের ক্লাইম্যাক্স—মিসেস শেরাজ খান। আর ক্লাইম্যাক্সে তো মাফিয়া নায়কের এন্ট্রি জমে আগুন হয়।”
তার ঠোঁটের কোণে আবার সেই অদ্ভুত, হিমেল হাসি। সে গলা নামিয়ে আবারও ধীরে ফিসফিস করে বলল,
“শুধু একটা কথা মনে রাখবেন, মাফিয়ারা কখনো মাফ করে না। আপনার চলে যাওয়া ছিল এই গল্পের মধ্যভাগ। আর আমার ফিরে পাওয়া হবে এই গল্পের সবচেয়ে রক্তমাখা হ্যাপি এন্ডিং।
শেরাজ উঠে দাঁড়াল। দু'দিকে দু'হাত মেলে দিয়ে মুখ উঁচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,
“লাভ দ্যাট কিলস, সুইটহার্ট!”
•
হালকা কুয়াশা, পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকান। রাস্তার পাশে একখানা লাল-কালো বাইক দাঁড়ানো। সামিয়া আর নাজমিন স্কুল ইউনিফর্ম পরে ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো। নাজমিন চুইংগাম চিবোচ্ছে, আর সামিয়া চুপচাপ। চোখে হালকা বিরক্তি তার। দু’জনে রাস্তায় পা দিতেই চোখে পড়ল— সামনের দোকানে শাহরুখ আর পিয়াস দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। পিয়াস কালো পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে। এক হাতে চায়ের কাপ, আরেক হাতে ফোন। শাহরুখের সাথে একটু দূরে দাঁড়িয়ে হাসছে, আর পিয়াসের সাথে কী যেন বলছে।
পিয়াসদের দেখে নাজমিন ভাইয়া বলে ডাক দিল। দুজনে একসাথে তাকাল। সামিয়া পিয়াসের দিকে তাকিয়ে ভদ্রতাসূচক হালকা হাসল। পিয়াস যেন হাসি দেখে প্রায় কাপে চুমুক দিতেই ভুলে গেল। সামিয়া আর দাঁড়াল না। শাহরুখ পিয়াসকে ধাক্কা মেরে বলল,
“চলে যাচ্ছে, শালা।”
পিয়াসের হুঁশ ফিরল। সামিয়া আর নাজমিন গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ পেছন থেকে বাইকের শব্দ। দু’টা বাইক এসে একদম তাদের সামনে থামল। একটাতে বসে শাহরুখ, কালো সানগ্লাস চোখে। অন্যটাতে পিয়াস, ঠোঁটে সেই চিরচেনা লাজুক হাসি তার। শাহরুখ হেলমেট খুলে চুল ঝাঁকিয়ে বলল,
“গাড়ি নিয়ে আব্বু বেরিয়েছে। কখন আসবে ঠিক নেই। স্কুল তো অনেকটা দূর, হাঁটতে হাঁটতে তো দুপুর হয়ে যাবে। উঠে বস, আমরা দিয়ে আসি।”
নাজমিন লাফ দিয়ে শাহরুখের বাইকে উঠে বসে হেসে বলল,
“সত্যি? উফ! ক্লাসের আগে ছোট্ট ট্রিপ। চল, সামু।”
সামিয়া দাঁড়িয়ে রইল। সে ধীরে বলল,
“তুই যা! আমি অন্য গাড়ি নিয়ে নিব।”
পিয়াস তার সামনে এসে ধীরে বলল,
“চল না, সামু। আমি চালাব। কিছু হবে না, প্রমিজ।”
সামিয়া একটু চমকে তাকাল পিয়াসের দিকে। মাথা নিচু করে শান্ত গলায় বলল,
“না ভাইয়া, আমি চলে যেতে পারব।”
পিয়াসের মুখটা এক সেকেন্ডের জন্য মলিন হয়ে গেল। নাজমিন সামিয়াকে তাড়া দিয়ে বলল,
“আরে ধুর, সামু। একটু রাইড হয়ে যাবে। চল তো।”
সামিয়া নাজমিনের কথা শুনে একটুও নড়ল না। তার চোখে একধরনের জেদ। সে পিয়াসের দিকে তাকাল না, শুধু সামনের রাস্তায় তাকিয়ে রইল— যেন কারও দয়া বা অনুরোধে সে চলবে না। সে ধীরে হাঁটা ধরল। শাহরুখ পিয়াসকে কনুই দিয়ে এক ধাক্কা দিয়ে বলল,
“আবারও চলে যাচ্ছে, শালা।”
পিয়াস চুপ করে মাথা নিচু করে রেখেছে। বাইক স্টার্ট দেওয়ারও সাহস করল না। পুরো মহল্লার সকলে তাকে ভয় পেলেও, এই মেয়েটার সামনে সে ভয়ে নেতিয়ে পড়ে। শাহরুখ মুখ ফিরিয়ে সামিয়ার দিকে তাকিয়ে হালকা ঠাট্টারস্বরে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে, যাস না। কেউ যদি রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায়, তখন আবার আমাদের বলিস না।”
নাজমিন হেসে বলল,
“তুলে নিয়ে যাক না, ভাইয়া। ছেলেরা তো ভালোই পছন্দ করে ওকে।”
শাহরুখ ঠোঁট বাঁকা করে বলল,
“তাই তো। কিছুদিন আগে যা হলো। এই মেয়ে তবুও কথা শুনবে না।”
পিয়াস নিচু গলায় বলল,
“চল শাহরুখ, দেরি হয়ে যাবে।”
শাহরুখ আর কিছু না বলে সানগ্লাস পরে হেলমেট চেপে বলল,
“ওকে, ম্যাডাম! হেঁটেই আসুন, কিন্তু স্কুল পৌঁছাতে দেরি হলে দোষ আমাদের না।”
নাজমিন একটু দোনোমোনো করলেও শেষমেশ থেকে গেল। সে সামিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমি তোর সাথেই যাই।”
সামিয়া একটু হেসে বলল,
“না, তুই যা! আমি ঠিক চলে যাব।”
শাহরুখ নাজমিনের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই নাজমিন উঠে বসল। শাহরুখ বাইক স্টার্ট করে চলে যেতে যেতে হঠাৎ সামিয়ার দিকে একবার তাকাল। পিয়াস কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে গেছে। সামিয়া একা হেঁটে আসছে। পিয়াস কিছু দূর যেতেই দাঁড়িয়ে পড়ল। পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে দেখে বলল,
“এই মেয়ে চায় যেন আমি জোর করি, ধমক দেই, শাসন করি। সোজা কথায় এই মেয়েকে দিয়ে কিছু করানো যায় না।”
সে বাইক ঘুরিয়ে আবারও ফিরে এলো। সামিয়া এবার জোরে হাঁটা দিল। পিয়াস সামিয়ার সামনে বাইক থামিয়ে বলল,
“ওঠ!”
সামিয়া কিছু বলতে যাবে তার আগেই পিয়াস বলল,
“চুপচাপ উঠে বস। আর একটা কথা বললে, তোর আজ স্কুলে যাওয়া হবে না।”
সামিয়া থমকে দাঁড়াল। তার চোখ বড় হয়ে গেল— যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না পিয়াস এমন রূঢ়ভাবে কথা বলল। সে চুপচাপ বাইকের দিকে তাকিয়ে রইল। পিয়াস চোখে চোখ রেখে বলল,
“সেদিন ছাদে এমন কি হয়েছিল, যে সেদিনের পর থেকে তুই আমাকে ইগনোর করে চলছিস?”
এক মুহূর্তের নীরবতা। সামিয়ার গলার কাছটা শুকিয়ে গেল। পিয়াস আবারও বলল,
“ঠিক আছে! তোকে বলতে হবে না। কিন্তু তুই না উঠলে আমি তোকে আজ স্কুলে যেতে দিব না।”
সামিয়া চোখ সরিয়ে নিল। পিয়াসের দিকে তাকানও যেন অস্বস্তির একটা বিষয় তার কাছে। সে ধীরে বলল,
“আপনি তাহলে এখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন। আমি প্রয়োজনে স্কুলে যাব না আজ।”
পিয়াসের বুকের ভেতরটা কেমন চেপে ধরল সামিয়ার কথায়। এই মেয়েটা এত ঠাণ্ডা গলায় এত কঠিন কথা বলতে পারে, সেটা সে আগে কখনও ভাবেনি। সে চোখ নামিয়ে বাইকের গিয়ার চেপে ধরে রাখল, যেন রাগটা ওখানেই আটকে রাখতে চাইল। মুখ তুলে ধীরে বলল,
“তুই জানিস, আমি তোর জন্য এখানে দাঁড়িয়ে থাকব সারাদিন, যদি দরকার হয়। তুই স্কুলে না গেলে তোর টিচার রাগ করবে, ক্লাস মিস হবে, প্রেজেন্টেশন থাকবে। তবু আমি তোকে জোর করব না। কিন্তু একটা কথা বুঝে নিস সামু, সবকিছু থেকে পালিয়ে গেলেই যে শান্তি পাওয়া যায় না।”
সামিয়া এবারও কিছু বলল না। সে শুধু সামনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। পিয়াসের কোনো কথা তার কানে ঢুকল না। পিয়াস একবার গভীরভাবে তাকাল সামিয়ার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বাইক ঘুরিয়ে নিল। কিছুদূর গিয়েই থেমে গেল আবার। সামিয়া ভাবল, এবার সে বুঝি একেবারে চলে যাবে। কিন্তু পিয়াস না তাকিয়ে, বাইকের উপর বসেই বলে উঠল,
হয় আমার সাথে চল। নয়তো পড়াশোনা করার স্বপ্ন আজ থেকে বাদ দে।”
শব্দগুলো যেন সামিয়ার কানে ধাক্কা দিয়ে গেল। সে চোখ বন্ধ করে ফেলল এক মুহূর্তের জন্য। তার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। সামিয়া ধীরে চোখ খুলে পিয়াসের দিকে তাকাল। সে বাইকের উপর বসে আছে। সামিয়া হেঁটে এগিয়ে এসে বাইকের একদম কাছে দাঁড়াল। চোখে চোখ রেখে ধীরে বলল,
“ভালোবাসা দিয়ে কেউ স্বপ্ন ছিনিয়ে নেয় না, পিয়াস ভাইয়া।”
পিয়াস চমকে তাকাল। সামিয়ার ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল,
“আপনার এই ভালোবাসাটা কি আমাকে ভয় দেখানোর জন্য?”
একটা নিঃশব্দ মুহূর্ত। দুজনেই কিছু বলল না। সামিয়া পেছনে ফিরে হাঁটা ধরল। এইবার পিয়াস দাঁড়িয়ে থাকল না। সে বাইক ঘুরিয়ে, সামিয়ার সামনে গিয়ে আবার দাঁড়াল। হেলমেটটা খুলে হাতে নিয়ে ধীরে বলল,
“ভালোবাসা দিয়ে কেউ স্বপ্ন ছিনিয়ে নেয় না, ঠিক বলেছিস। কিন্তু ভয় দেখানো আর শেষ চেষ্টাটা এক জিনিস না। আমি শুধু তোর ভালো চাই।”
সামিয়া মৃদু গলায় বলল,
“আমাকে কেউ জোর করুক, এইটা আমার পছন্দ না। আমি আপনার বোন। আপনি আমাকে নাজমিন, ফারুপুদের মতো ভালোবাসেন ঠিক আছে। তবে আমার ওপর জোর খাটাতে আসবেন না।”
সে রাস্তার দিকেই আবার হাঁটা ধরল। পিয়াস তাকিয়ে রইল। সে বাইক স্টার্ট করল না। নিজের মনে বলল,
“ভালোবাসা যদি কেবল নিজের চাওয়া দিয়ে ভরে থাকে, তাহলে ওটা ভালোবাসা না। আমি তোর জন্য হারতে রাজি আছি, কিন্তু তোকে অন্যের হতে দিতে রাজি নই।
•
ঘড়িতে তখন বেলা বারোটা ছুঁই ছুঁই। শেরাজ খান ম্যানশনের বড় দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখল। তার চলার ভঙ্গিতে একটা দুর্দমনীয় চাপা আগ্রাসী থেমে থেমে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। পেছনে তার ছায়াটাও যেন ভয় পেয়ে তার থেকে দূরে সরে দাঁড়াতে চাইছে। ড্রয়িংরুমে তখন প্রায় সকলেই উপস্থিত। আজ রোজা এসেছে এই বাড়িতে। সে সোফায় চুপচাপ বসে তাকিয়ে আছে শেরাজের দিকে। শেরাজের অবস্থা দেখে তার বুকের ভেতর চাপা একটা কষ্ট অনুভব হলো। তবুও সে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“উই আর অল জাস্ট অডিয়েন্স ইন হিজ মুভি। অ্যান্ড দ্য ক্লাইম্যাক্স, ইজ গোইং টু বি ব্লাডি।”
সাহাবাজ সাহেব কপাল কুঁচকে এগিয়ে এসে বললেন,
“চোখ মুখের এই অবস্থা কেনো তোমার? আর সুমু মামনি কোথায়? সারবাজ, আরবাজও বাড়িতে নেই। ওরা কোথায়?”
শেরাজ কোনো উত্তর দিল না। এই সময় ইশিতা এসে, একটু কাঁপা গলায় বলে উঠল,
“ভাইয়া! সারবাজ ভাইয়া কল করে বলল সুমুকে নাকি পাওয়া যাচ্ছেনা?”
শেরাজ মাথা নিচু করে রইল। সে কারো দিকে তাকাল না, কোনো কথা বলল না। সোজা হাঁটতে শুরু করল। হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়াল অনন্যা খাতুন।
“তোমাকে সকলে কিছু জিজ্ঞেসা করছে, তুমি কি শুনতে পাচ্ছ না?”
শেরাজ স্থির। তার চোখ মেঝেতে গাঁথা। অনন্যা খাতুন এবার আর সহ্য করতে না পেরে ছেলের দু’বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে বললেন,
“কি হয়েছে বলছ না কেনো? সুমু মামনি কোথায়?”
শেরাজ হঠাৎ মুখ তুলল। চোখে একধরনের অন্ধকার। ঠোঁটে বিষাক্ত ব্যঙ্গ। সে চিৎকার করে বলল,
“মেরে গুম করে দিয়েছি, হ্যাপি?”
ঘরটা থমকে গেল। ইশিতা আঁতকে উঠে এক’পা পিছিয়ে গেল। অনন্যা খাতুন ছেলেকে ছেড়ে দিয়ে পেছনে সরে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বললেন,
“কি বললে তুমি? মেরে গুম করে দিয়েছ মানে?”
শেরাজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“হ্যাঁ! আমার সাথে ঝামেলা করেছে। নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারিনি, তাই মেরে ফেলেছি। গুম করেছি। যেটা শুনতে চাও, তাই বলছি। এখন প্লিজ, আমাকে একা থাকতে দাও।”
সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। পেছন থেকে অনন্যা খাতুন বলে উঠলেন,
“তুমি কী করেছ আমার মেয়ের সাথে, আমি জানি না। তবে একটা কথা মনে রেখো, মিস্টার শেরাজ খান। এই বাড়িতে সুমু মামনি থাকলেই তুমি থাকতে পারবে। নয়ত তোমার থাকার দরকার নেই এখানে। আমার মেয়ে এ বাড়িতে নেই, মানে তুমিও থাকবে না।”
শেরাজ থেমে গেল কয়েক সেকেন্ড। পেছনে না তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“ঠিক আছে, চলে যাব।”
তার পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে সিঁড়ির উপর মিলিয়ে যেতে রইল। ড্রয়িংরুম জুড়ে একটা মৃত্যুর আভাস নেমে এলো। না, শরীরের না! একটা সম্পর্কের মৃত্যু, ভালোবাসার মৃত্যু। শেরাজ নিঃশব্দে নিজের রুমে ঢুকল। তার হাঁটার ধরণটাই বদলে গেছে, যেন প্রতিটা পা ভারী হয়ে গেছে বেদনায়। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল দরজার কাছে। ধীরে এগিয়ে গেল ড্রেসিং টেবিলের দিকে। আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল সে। নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে। চোখ দু’টো তার রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। হঠাৎ এক অদম্য ক্ষোভে ড্রেসিং টেবিলের ওপরের সব জিনিসপত্র এক ঝটকায় মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিল। দু’হাত শক্ত করে আয়নার দিকে ঝুঁকে পড়ল। নিজের চোখে যেন নিজেকেই চিনতে পারছে না সে। একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। ধীরে গিয়ে বেডসাইড টেবিলের ড্রয়ার খুলে বিয়ারের বোতল বের করল। বোতল খুলে এক চুমুক বসাল। এগুলো খাওয়ার হ্যাবিট নেয় তার। আগে নিজের মধ্যের অশান্তি কাটানোর জন্য কখনও কখনও হালকা খাওয়া হতো। সুমু আসার পর থেকে সুমু ছিল তার শান্তির একমাত্র কারণ। এগুলো তারপর থেকে এভাবেই ফেলে রাখা ছিল। কয়েকবার চুমুক দেবার পর বোতলটাও ছুঁড়ে ফেলে দিল দেয়ালের দিকে। কাচ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। এক টুকরো ভাঙা কাচের ফলা সে হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। হাত কেটে রক্ত পড়ছে, কিন্তু তবুও ছেড়ে দিল না সে। ধপ করে বেডের ওপর পড়ল সে। দু’হাত ছড়িয়ে দিল। চোখদুটো ছাদের দিকে স্থির। মুখে একধরনের ক্লান্তি। হঠাৎ সে অনুভব করল কেউ পাশে বসে আছে। মাথা কাত করে তাকাল। সুমু! হ্যাঁ, সুমুই তো। সুমু বসে আছে। এক হাত দিয়ে চুল সরিয়ে মুখে একটা মিষ্টি হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
শেরাজ চমকে উঠল। তড়িঘড়ি করে উঠে সুমুর কোমর জড়িয়ে ধরল। মাথা গুঁজে দিল সুমুর মেদহীন পেটের মধ্যে। ঘ্রাণ নিতে চাইল, সেই চিরচেনা ঘ্রাণ। একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলল সে। সুমুর কোমরটা আঁকড়ে ধরে রাখল যেন ছেড়ে দিলে সুমুকে আবার হারিয়ে ফেলবে। সুমুর পেটের ভাঁজে মুখ গুঁজে রাখল সে। হঠাৎ সুমুর স্পর্শটা আর টের পেল না সে। চোখ মেলে তাকাল। সুমু নেই, খালি বিছানা। শুধু বিছানার একপাশে একটু ভেজা ছোপ, যেন সুমু সত্যিই কিছুক্ষণ আগে ছিল। না, ও ছিল না—এ তো শুধু তার কল্পনা, তার হ্যালুসিনেশন। শেরাজ উঠে বসল। দুহাতে মাথা চেপে ধরে নিজেকেই প্রশ্ন করল,
“আমি কী পাগল হয়ে যাচ্ছি?” তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল, “একবার এসে দেখে যান, ম্যাডাম। এই পাথরের মতো ছেলেটার কী অবস্থা করেছেন আপনি। কী অবস্থায় ফেলে রেখে গেছেন তাকে। আপনার শূন্যতা এই বাজে ছেলেটাকে কতটা পোড়াচ্ছে, একবার এসে দেখুন।”
তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল। বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে। চোখ দুটো ছাদের দিকে স্থির রেখে মৃদুস্বরে গান গেয়ে উঠল,
“তাকিয়ে আসমানের দিকে
সে কি বলো আছে সুখে?
ভাবিয়া কান্দিয়া মরি,
সে যে পাশে নাই!
বিধাতা আমাকে বলো,
কোথায় গেলে তারে পাবো?
যন্ত্রণাগুলো আমাকে
ভেতরে পোড়ায়!
ভাবতে ভাবতে তারে আমি
চোখ বুঝিয়া জড়াই ধরি!
চোখ মেলিয়া দেখি আমি
সে যে বুকে নাই!
প্রিয়া রে, প্রিয়া রে, প্রিয়া,
কেন দিলি আমায় ভাঙিয়া?
প্রিয়া রে, প্রিয়া রে, প্রিয়া,
মন আমার দিলি ভাঙিয়া!”
চোখ বন্ধ করল সে। এই মুহুর্তে তার একটু ঘুম প্রয়োজন। যদিও সে জানে, তার এখন ঘুম আসবে না। তারপরেও সে চেষ্টা করল ঘুমাতে।
চলবে..?