ফন্ট সাইজ:
থিম:
খান সাহেব

৬৩তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া জাহান

#খান_সাহেব

#সুমাইয়া_জাহান

#পর্ব_63 ✦ প্রথমাংশ ✦

ভোরের হালকা আলো পর্দার ফাঁক দিয়ে ঢুকে ঘরে পড়েছে। বাইরে রাতের বৃষ্টি থেমে গেছে, শুধু গাছের পাতায় জমে থাকা পানি ফোঁটা টুপটাপ করে পড়ছে মাটিতে। বাতাসে কাঁচা মাটির গন্ধ। ভোরের আলো ঘরে ঢুকলেও সুমুর চোখ খুলতে পারছে না। শরীরটা অদ্ভুত গরম লাগছে তার। শ্বাস ভারী, কপালে ঘাম জমে আছে। তবুও সে অনেক কষ্টে ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। শরীর এখনো ব্যথায় অবশ, কিন্তু তার কানে ভেসে আসছে এক মৃদু, স্থির শ্বাসের শব্দ। সে অনুভব করল, নিজের মাথা শেরাজের বুকের ওপর রাখা, আর শেরাজের হাত শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে তাকে—যেন ভয় আছে, ছেড়ে দিলেই সে হারিয়ে যাবে।

সুমু কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে রইল। বাইরে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। সে আস্তে করে মুখ তুলে তাকাল শেরাজের দিকে। তার চুল এলোমেলো, চোখের নিচে ক্লান্তি। তবুও ঘুমের ভেতরে মুখে শান্তির ছাপ। তার মনে পড়ে গেল রাতের প্রতিটা মুহূর্ত—ব্যথা, ঝড়, কান্না আর সেই অব্যক্ত ভালোবাসা। সে ধীরে ধীরে শেরাজের বুক থেকে মাথা সরাতে গেল, কিন্তু শেরাজের হাতের বন্ধনটা আরও শক্ত হয়ে গেল। চোখ না খুলেই শেরাজ ফিসফিস করে বলল,

“কোথায় যাবে, সুইটহার্ট?”

সুমু উত্তর দিল না। সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে না পেরে আবারও চোখ বন্ধ করে ফেলল। শেরাজ প্রথমে বুঝতে পারেনি, কিন্তু সুমুর শরীর নিজের বাহুর ভেতর অস্বাভাবিক গরম লাগায় সে সুমুর কপালে হাত রাখতেই আঁতকে উঠল।

“কলিজা, তোমার শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।”

সুমু আধো ঘুমে কিছু অস্পষ্ট শব্দ করে, আবার চোখ মেলে তাকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সে তাকাতে না পেরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। ঠোঁট শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে, গলার স্বর কর্কশ তার।

“পানি!”

শেরাজ তড়িঘড়ি করে বেডসাইড টেবিল থেকে গ্লাস তুলে এনে তার ঠোঁটে ধরল,

“ধীরে খাও!”

পানি খাওয়ার পর সুমু বিছানায় হেলান দিয়ে বসতে চাইল, কিন্তু শরীরের ব্যথা যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। মুখ বিকৃত হয়ে গেল কষ্টে। শেরাজের বুকের ভেতর কেমন যেন খচখচ উঠল। সে চুপচাপ তার চুলগুলো সরিয়ে কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। অপরাধীর ন‍্যায় তাকিয়ে বলল,

“গতরাতে খুব বেশি হয়ে গেছে। কিন্তু তুমি আমাকে থামাওনি, সুইটহার্ট। এখন তোমার এই অবস্থা দেখে আমার নিজের উপর রাগ হচ্ছে।”

সুমু কিছু বলল না, সে চোখ বন্ধ করে রাখল। শেরাজ ব্লাঙ্কেটের মধ্যে সুমুকে ভালোভাবে জড়িয়ে দিয়ে উঠে গিয়ে হালকা গরম পানিতে কাপড়ের টুকরো ভিজিয়ে নিয়ে এলো। সুমুর কপাল, গলা আর হাতের তালুতে আলতো করে চেপে দিল, যেন জ্বরটা কিছুটা কমে। শেরাজ কাপড় দিয়ে সুমুর কপালে চেপে ধরে রাখল কিছুক্ষণ। তার চোখে এখন কোনো আগ্রাসন নেই, আছে শুধু গভীর চিন্তা আর অপরাধবোধ। সে আস্তে করে সুমুর হাত নিজের হাতে নিয়ে চেপে ধরল। সুমুর চোখ আধখোলা, ঠোঁটে ক্ষীণ হাসির মতো কিছু, সে জ্বরের ঘোরে উল্টাপাল্টা বলতে শুরু করল।

“আপনি অফিস যাবেন না?”

শেরাজ মাথা নাড়ল। সে বিছানার পাশে বসে তার চুলে হাত বুলিয়ে যেতে থাকল, যেন প্রতিটা স্পর্শে রাতের সব ব্যথা মুছে দিতে চাইছে।

“তুমি জানো না সুইটহার্ট, গত তিন বছর তোমাকে ছাড়া আমার প্রতিটা সকাল ছিল মরুভূমির মতো শুকনো। আজ তুমি আছো, তাই এই সকালটা আমার কাছে বেঁচে থাকার মতো।”

সুমু চোখ বন্ধ রেখেই আস্তে বলল,

“ব্যথা তো এখনও আছে।”

শেরাজ ঝুঁকে তার কপালে ঠোঁট রাখল। মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে বলল,

“আমি জানি, সুইটহার্ট। আর সেই ব্যথা আমি সারিয়ে তুলব, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।”

সে আবার কাপড়ের টুকরো ভিজিয়ে সুমুর কপালে চেপে দিল। সুমু আবারও বলল,

“একটা কথা দিন খান সাহেব, আর কখনও কাঁদাবেন না আমাকে, প্লিজ। আমার চোখের পানি আপনার ভালো লাগেনা, বলেছিলেন তো?”

“শুধু রাত ছাড়া আর কখনো কাঁদাব না। তবে কথা দিতে পারছিনা, কারণ মাঝে মাঝে দিনেও কাঁদাতে পারি।”

“কেন? এতো নিষ্ঠুর কেন আপনি?”

“রাতের অন্ধকারে আমি খুব নিষ্ঠুর হতে পারি। আমার স্পর্শে তোমার চোখে পানি এলে, সে কান্না আমাকে পাগল করে দেয়।”

“রাতেই কেন? দিনে পারবেন না?”

এই পর্যায়ে এসে শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হাসল। সে জানে, তার ঝাঁসির রানি জ্বরের ঘোরে উল্টাপাল্টা বলছে। সে হাসি চেপে বলল,

“দিনে কখনও কখনও অসভ‍্য হই। তবে দিনে আমি বেশিরভাগ সময়-ই সভ‍্য স্বামী হয়ে থাকি, কিন্তু রাতে? রাতে তোমার জন‍্য আমার ভেতরের পুরুষত্বকে আর কন্ট্রোল করা সম্ভব হয় না। তখন সেই পুরুষ শুধু আদর করতে জানে না, সে দাবী জানে, শাস্তি জানে, স্পর্শে কাঁদাতে জানে।”

“আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?”

“না! আমি শুধু বলছি, তোমাকে ভালোবাসা মানে সব সময় কোমলতা নয়। কখনও সেটা গভীর কামনার কান্না, যেটা রাতের বুকে হারিয়ে যেতে চায়।”

“তাহলে কথা দিন, দিনে আমাকে ভালোবাসবেন, আর রাতে আমাকে ভেঙে, আবার গড়ে তুলবেন।”

“কথা দিলাম, দিনে তোমার সভ‍্য স্বামী হবো। আর রাতে, তোমার প্রিয়তম অত্যাচারী— শুধু তোমার জন্য।”

সুমুর চোখ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এলো। শেরাজ সুমুর কপাল থেকে চুল সরিয়ে আলতো করে গালে হাত বোলালো। তার আঙুলের স্পর্শে সুমুর নিঃশ্বাস খানিক কেঁপে উঠল। শেরাজ নিচু স্বরে বলল,

“তুমি জানো না সুইটহার্ট, তোমাকে হারানোর ভয় আমার সব রাগ, সব কঠোরতা গলিয়ে দেয়।”

সুমু আধো ঘুমে ফিসফিস করে বলল,

“তাহলে আমাকে আর কষ্ট দেবেন না, খান সাহেব।”

শেরাজ একটু ঝুঁকে তার কানে ফিসফিস করে বলল,

“দিনে তোমার হাসি দেখাই আমার সুখ। আর রাতে, তোমার কান্না শোনাই আমার পাগলামি।”

সুমু চোখ বন্ধ রেখেই হালকা হাসল।

“আপনি তাহলে আমাকে ইচ্ছা করে কাঁদাবেন?”

শেরাজের ঠোঁটে হালকা দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।

“যে কান্না ভালোবাসার, সেটাই কষ্ট নেই, সুইটহার্ট। সেই কান্না আমার কাছে তোমার সবচেয়ে সুন্দর স্বীকারোক্তি।”

“আপনি জানেন, আমি আপনার সামনে দুর্বল হয়ে যাই?”

শেরাজ আলতো করে তার গাল দুটো নিজের হাতে নিয়ে বলল,

“দুর্বলতা নয়, এটা আমার প্রতি তোমার আস্থা। তুমি জানো, তুমি যদি ভেঙে পড়ো, আমি তোমাকে ধরে রাখব। তুমি যদি হারিয়ে যাও, আমি তোমাকে খুঁজে আনব।”

সুমু আস্তে করে তার হাত চেপে ধরল।

“আর যদি আপনি কখনও হারিয়ে যান?”

“তাহলে আমি তোমার হৃদয়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকব। যত দূরেই যাই, তোমার ডাকে ফিরব। কারণ তোমার কাছে ফেরাটাই আমার আসল ঠিকানা।”

সুমু ধীরে বলল,

“আপনি কি প্রতিশ্রুতি দেবেন, যতদিন বাঁচবেন আমার হাত ছাড়বেন না?”

শেরাজ তার হাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,

“প্রতিশ্রুতি দিলাম সুইটহার্ট, শুধু এই জীবন নয়, যদি পরের জন্মও থাকে, সেখানেও তোমাকে খুঁজে বের করব। কারণ তুমি আমার শেষ, আর আমার শুরু।”

সুমুর মুখে এক অশ্রুসিক্ত হাসি ফুটে উঠল। শেরাজ ধীরে তাকে বুকে টেনে নিল। দু’জনের নিঃশ্বাস মিশে গেল। হৃদস্পন্দনের তালে তালে যেন এক অটুট প্রতিশ্রুতির সুর বেজে উঠল। সুমু ধীরে চোখ খুলে দেখল, শেরাজ তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। জ্বরের ক্লান্তি থাকা সত্ত্বেও বুকের ভেতর একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল তার—এই মানুষটা, যাকে সে যতটা ভয় পায়, তার চেয়েও বেশি ভালোবাসে। সুমু নরম গলায় বলল,

“খান সাহেব, আপনি কখনো ভাবেন, যদি আমি আপনার জীবনে না আসতাম?”

শেরাজ তার দিকে তাকাল, ঠোঁটে তীক্ষ্ণ হাসি তার।

“ভাবলেই রাগ হয়। কারণ তোমাকে ছাড়া আমার জীবন মানেই অপূর্ণ শ্বাস, অসম্পূর্ণ সকাল, আর নির্জন রাত।”

সুমুর ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল,

“তাহলে কী আমি আপনার জীবন বদলে দিয়েছি?”

শেরাজ ধীরে ধীরে তার আঙুলগুলো সুমুর আঙুলের ভাঁজে জড়িয়ে নিল।

“তুমি শুধু জীবন বদলাওনি, তুমি আমার ধ্বংস হওয়া ভেতরটাকে নতুন করে গড়ে তুলেছো। সুইটহার্ট, তুমি না থাকলে আমি আজও শুধু রাগ আর শূন্যতা নিয়েই বেঁচে থাকতাম।”

সুমু গলা নামিয়ে বলল,

“আপনি জানেন, আমি আপনাকে শুধু ভালোবাসি না, আমি আপনাকে ভয়ও পাই।”

শেরাজ হালকা হেসে সুমুর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল।

“ভয় পাওয়া ভালো। তাতে ভালোবাসার গভীরতা টিকে থাকে। তবে মনে রেখো, আমাকে কঠোরতার চেয়ে আমার ভালোবাসা অনেক বেশি প্রবল।”

সুমুর চোখ ভিজে এলো।

“কথা দিন, এই ভালোবাসা কখনো বদলাবে না।”

শেরাজ তার চোখের পানি আঙুলের ডগায় মুছে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“এ ভালোবাসা বদলাবে শুধু একভাবে—সময় যত যাবে, তত বাড়বে। এবার পুরো পৃথিবী জানবে তুমি শুধু আমার।”

সুমু হালকা কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“আমি তো এখনই আপনার, খান সাহেব।”

“জানি। কিন্তু আমি চাই, এই সত্যিটা তোমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে, প্রতিটা স্পর্শে, প্রতিটা ধ্বনিতে অনুভব করাতে। যাতে কোনদিন, কোনো মুহূর্তে তুমি আমাকে ছাড়া নিজেকে কল্পনাও করতে না পারো।”

সুমু চুপ করে রইল। শেরাজ সুমুর মুখের দিকে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে নিচু স্বরে বলল,

“সুইটহার্ট, তুমি জানো কেন আমি তোমার দিকে এতক্ষণ তাকিয়ে থাকি?”

সুমু অবাক হয়ে মাথা নাড়ল।

“কেন?”

“কারণ আমি ভয় পাই, চোখ সরালেই তুমি হারিয়ে যাবে। আমি তোমাকে এতটাই কাছে চাই, যেন আমার ছায়াও তোমার থেকে দূরে যেতে না পারে।”

সুমুর শ্বাস হালকা কেঁপে উঠল,

“খান সাহেব, আপনি জানেন, আমি কখনও কারো জন্য নিজের সব কিছু ছাড়িনি। কিন্তু আপনার জন্য আমি আমার স্বপ্ন, আমার অহংকার, এমনকি নিজের সুখও ছেড়ে দিতে পারি।”

শেরাজ তার হাত দুটো নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল।

“না, সুইটহার্ট! তোমাকে কিছু ছাড়তে হবে না। তোমার প্রতিটা স্বপ্ন আমি নিজের হাতে পূরণ করব। তোমার হাসিটা আমার জয়ের মুকুট, আর তোমার কান্না আমার পরাজয়ের ঘোষণা।”

“আপনি কি সত্যি আমাকে সারাজীবন এভাবে ভালোবাসবেন?”

শেরাজ চোখের গভীরতায় প্রতিশ্রুতি মিশিয়ে বলল,

“যতদিন আমার শ্বাস চলবে, ততদিন আমার হৃদয়ে শুধু তোমার নাম থাকবে। আর যদি কখনও আমার ভালোবাসা কমে যায়, তখন আমি বেঁচে থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলব।”

সুমু নিঃশব্দে চোখের পানি মুছে ফেলে বলল,

“এতো কেন ভালোবাসেন আমাকে?”

শেরাজ ঠোঁটে রহস্যময় হাসি টেনে বলল,

“কারণ তুমি আমার শুধু ভালোবাসা নও, তুমি আমার অধিকার। তুমি আমার গল্পের একমাত্র নায়িকা, আর আমার জীবনের শেষ ঠিকানা।”

সুমু তার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন কিছু বলার শক্তি নেই। শেরাজ ধীরে ধীরে বলল,

“একদিন তুমি বুঝবে সুইটহার্ট, আমি যতটা তোমাকে ভালোবাসি, ততটা কেউ কোনোদিন কাউকে ভালোবাসেনি।”

সুমু ধীরে শ্বাস নিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল। বুকের ভেতর যেন একসাথে হাজারো প্রশ্ন আর উত্তর জাগছে, কিন্তু মুখ দিয়ে কিছু বেরোলো না। শেরাজ আলতো করে তার থুতনি তুলে ধরে বলল,

“চুপ হয়ে গেলে কেন, সুইটহার্ট?”

সুমু ধীরে বলল,

“কারণ আমি ভয় পাচ্ছি। এই মুহূর্তটা যেন স্বপ্ন না হয়। যদি হঠাৎ চোখ খুলে দেখি, সব মায়া ভেঙে গেছে?”

“যতদিন আমি আছি, ততদিন এই মুহূর্ত কোনো স্বপ্ন নয়। এটা আমাদের বাস্তব, আমাদের গল্প।”

“আপনি কি জানেন, আমি আপনাকে শুধু ভালোবাসি না। আমি আপনাকে আমার জীবনের একমাত্র প্রার্থনা বানিয়ে ফেলেছি।”

শেরাজ তার কপালে দীর্ঘ চুমু দিয়ে বলল,

“আর আমি তোমাকে আমার একমাত্র নিশ্চিত ঠিকানা বানিয়েছি। পৃথিবী যতই বদলাক না কেন, আমার শেষ গন্তব্য সবসময় তুমি।”

সুমু হালকা কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“যদি কোনদিন আমি আপনাকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হই?”

শেরাজের চোখ কঠিন হয়ে উঠল, তবুও সে নরম কণ্ঠে বলল,

“তাহলে আমি তোমার হাত ছেড়ে দেব না। তোমাকে হারানো মানে আমার নিজেকে হারানো। আমি তোমাকে আঁকড়ে ধরব, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার শ্বাস আছে।”

সুমুর চোখ ভিজে এলো। শেরাজ সেই অশ্রু মুছে দিয়ে হালকা হাসল।

“এই চোখের পানি আমি পছন্দ করি না। তবে যদি ভালোবাসার জন্য কাঁদো, আমি তোমার কান্না আমার বুকে সযত্নে রেখে দেব।”

সুমু তার বুকে মুখ লুকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“খান সাহেব, আপনি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দুঃসাহস।”

শেরাজ ঠোঁটে হাসি এনে তার কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে বলল,

“আর তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে মিষ্টি বন্দিত্ব। এই কারাগার থেকে আমি কখনো মুক্তি চাই না, কারণ এই বন্দিত্বেই আমার মুক্তি লুকানো।”

কিছুক্ষণের নীরবতার মধ্যে শুধু দু’জনের হৃদস্পন্দন শোনা যাচ্ছে। শেরাজ নিচু স্বরে বলল,

“তুমি জানো সুইটহার্ট, তোমাকে আলিঙ্গন করার এই মুহূর্তটাই আমার সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। এখানে আমি কোনো ভয় পাই না, কোনো শূন্যতা থাকে না।”

সুমু ধীরে বলল,

“আপনি সবসময় এমন থাকবেন তো? বদলে যাবেন না তো?”

শেরাজ হালকা হেসে তার কপালে চুমু দিয়ে বলল,

“বদলাবো, তবে শুধু তোমাকে ভালোবাসার পরিমাণ প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়বে।”

“আপনার এসব কথা শুনে মনে হয়, আমি আপনার জন্য কিছুই করতে পারিনি।”

শেরাজ গম্ভীর চোখে তাকিয়ে বলল,

“তুমি আমার জন্য শ্বাস নিচ্ছো, সেটাই যথেষ্ট। তোমার অস্তিত্বই আমার প্রতিদিনের অলৌকিকতা।”

সুমু চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“আপনি কি জানেন, আপনাকে ছাড়া আমি নিজেকে অসম্পূর্ণ মনে করি?”

“তুমি অসম্পূর্ণ নও, তুমি আমার মধ্যে পূর্ণতা পেয়েছ, যেমন আমি তোমার মধ্যে পেয়েছি। আমরা একে অপরের শেষ অংশ। যেটা ছাড়া আমাদের গল্প অসমাপ্ত থেকে যেত।”

সুমু চুপচাপ তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। শেরাজ ফিসফিস করে বলল,

“প্রতিদিন তোমার চোখে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে চাই, সুইটহার্ট। যাতে মনে থাকে, আমি তোমার, আর তুমি শুধু আমার।”

সুমু আস্তে বলল,

“আমি সবসময় আপনারই থাকব, খান সাহেব।”

শেরাজ ঠোঁটে একটা হাসি টেনে বলল,

“এই প্রতিশ্রুতিটা আমাদের জীবনের শেষ পর্যন্ত থাকবে। আর সেদিন, যখন আমরা বুড়ো হয়ে যাবো, তখনও আমি তোমাকে এভাবেই বলব—সুইটহার্ট, তুমি আমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত।”

“কিন্তু, আপনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না, আমি জানি।”

শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হেসে গান ধরল,

“ম‍্যা যো জি রাহা হুঁ,,,

ওয়াজা তুম হো....”

সুমু আলতো হাসল। কথা বলতে বলতে সুমুর চোখ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এলো। নিঃশ্বাসের শব্দ ধীর হলো, আর মুহূর্তের মধ্যে সে আবারও ঘুমিয়ে পড়ল। শেরাজ তার মুখের ওপর থেকে চুল সরিয়ে বেডে আরাম করে শুইয়ে দিয়ে ব্লাঙ্কেট ঠিক করে দিল, যেন ঠাণ্ডা না লাগে। তাদের তিন বছরের জমানো কথার সময়টা আজ একটু বেশি দীর্ঘ হলো। সে একবার সুমুর শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে হালকা শ্বাস ফেলে নিঃশব্দে বেডসাইড টেবিল থেকে নিজের ফোনটা হাতে তুলে নিল। বেড থেকে নেমে বেলকনির দিকে হাঁটল। ফোনে ডায়াল করে স্যান্ডিকে কল দিল। লাইন ধরতেই কণ্ঠ কঠিন হয়ে গেল তার।

“ত্রিশ মিনিটের মধ্যে একজন ডক্টর নিয়ে আমার চোখের সামনে হাজির হবে।”

লাইন কেটে সে কিছুক্ষণ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে রইল। দূরে শূণ্যের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, তার মন পড়ে রইল ঘরের ভেতরের ঘুমন্ত মেয়েটির কাছে। সে ফোনটা পকেটে রেখে আবার ভেতরে এলো। সুমুর কপালে হাত রেখে দেখল, জ্বর এখনো কমেনি। তার চোখে আবারও সেই অদৃশ্য অপরাধ বোধের ছায়া ফিরে এলো।

•

সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে এসেছে। সুমু এখন বিছানায় বসে আছে, পিঠে নরম বালিশ ঠেস দিয়ে। হাতে একটা বই, পাতাগুলো ধীরে ধীরে উল্টাচ্ছে। ডাক্তার এসে তাকে দেখে গেছে। তার জ্বর এখনও আছে, তবে চিন্তার কিছু নেই বলে গেছেন।

শেরাজ আজ নিজ হাতে সুমুর জন‍্য স‍্যুপ বানিয়েছে। সে টেবিলের ওপর খাবারের ট্রে রেখে সুমুর পাশে এসে বসে আছে।

“বইটা এখন রাখো, সুইটহার্ট। আগে কিছু খেয়ে নাও।”

সুমু মাথা তুলে তাকাল।

“আপনি এখন আমাকে বাচ্চাদের মতো ট্রিট করছেন।”

শেরাজ ঠোঁটের কোণে হাসি এনে বলল,

“না, আমি তোমার, আমার মতো করে যত্ন নিচ্ছি। এখন মুখ খোলো।”

সুমু একটু গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,

“আমি নিজে খেতে পারি।”

শেরাজ মাথা নেড়ে চামচে স‍্যুপ তুলে ধরে বলল,

“আমি জানি তুমি পারো। কিন্তু আজ আমি খাওয়াতে চাই। একদিনের জন্য হলেও আমার ইচ্ছে পূরণ হতে দাও।”

সুমু কোনো কথা না বলে চামচের দিকে এগিয়ে এলো। শেরাজ ধীরে ধীরে তাকে খাওয়ালো। খাবার শেষে সে পানি এগিয়ে দিয়ে, ডাক্তার দেওয়া ওষুধগুলো একে একে হাতে তুলে দিল। সুমু ওষুধ খেয়ে হালকা বিরক্তির ভঙ্গি করে বলল,

“ঔষধের স্বাদ খুব বাজে।”

শেরাজ তার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,

“ঔষধের স্বাদ যদি তিক্ত হয়, আমি কি মিষ্টি কিছু দিয়ে সেটা ভুলিয়ে দেব?”

“আপনার মিষ্টি মানে তো…”

শেরাজ চোখ মেরে বলল,

“মানে তুমি খুব ভালো করেই জানো।”

সে ট্রেটা সরিয়ে রেখে আবার সুমুর পাশে বসে পড়ল।

“এবার বই বন্ধ করো।”

সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,

“না, খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস পড়ছি।”

“কি পড়ছ?”

“‘ফিফটি শেডস অফ গ্রে’ বুক। অনেকদিন ধরে বইটির কথা শুনছিলাম। অনেক রিভিউ ও দেখলাম। ভাবলাম, দেখি কী এমন আছে। তাই, আজ থেকে পড়া শুরু করলাম। আচ্ছা, এইটা নিয়ে নাকি মুভিও আছে? আপনি দেখেছেন মুভিটা?”

“হুম, কেন?”

“আগে স্টোরিটা পড়ে দেখি। ভালো লাগলে মুভিটাও দেখব।”

“হঠাৎ এই মুভি কেনো দেখতে চাইছ?”

“কি আর বলব। একা একা বোর হচ্ছিলাম। ফেসবুক স্ক্রোল করতে করতে মুভিটার রিভিউ দেখলাম। কিউরিয়াস লাগল। আপনি বলেন না, কি হয়। একটু রিভিউ দিন না। আমি দেখতে চাই।”

“রিভিউ কীসের দরকার? আমি তো আছি। তোমার জন্য এই মুভির প্রতিটা সিন লাইভ করে দেখাতে পারি।”

“আপনি?”

“হুম! তুমি যদি দেখার সাহস রাখো—তাহলে গল্পের বাইরেও অনেক কিছু শেখানো যায় তোমাকে।”

সুমুর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

“আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন?”

শেরাজ ঠোঁটের কোণে এক দুষ্টু হাসি টেনে নিয়ে বলল,

“মানে, বইয়ে পড়লে শুধু কল্পনা পাবে, কিন্তু আমার কাছে বাস্তব অভিজ্ঞতা পাবে।”

“আপনার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে, আপনি আমাকে বই পড়তে দেবেন না।”

“তোমার হাতে বই মানে, আমার সময় নষ্ট হওয়া। আর আমি আমার সময় নষ্ট হতে দেওয়া মানুষ নই, সুইটহার্ট।”

সুমু ঠোঁট কামড়ে চুপ করে রইল। শেরাজ তার মুখের ভঙ্গি লক্ষ্য করে কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,

“তুমি যদি ফিফটি শেডস পড়তে চাও, আমি তোমার জন্য সিক্সটি শেডস তৈরি করে দেব। যেটা শুধু আমার আর তোমার গল্প হবে।”

“আপনি তো খুবই…”

শেরাজ কথা কেটে নিয়ে দুষ্টু হেসে বলল,

“খুবই কী?”

“খুবই ডেঞ্জারাস।”

শেরাজ ঠোঁটে হালকা চাপা হাসি টেনে ধীরে বলল,

“তোমার জন্য আমি সবসময় ডেঞ্জারাস, কিন্তু সেই বিপদেই তুমি সবচেয়ে নিরাপদ থাকবে।”

সুমু মুখ ঘুরিয়ে বাইরে তাকাল, কিন্তু তার গাল লাল হয়ে উঠল। শেরাজ তার গাল আলতো করে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,

“অনেকদিন পর তোমার লজ্জামাখা মুখটা দেখলাম।”

“আপনি আজ এমন কথা বলছেন কেন?”

“কারণ তোমাকে এই লজ্জা পাওয়া মুখটায় খুব মানায়, সুইটহার্ট। মনে হয়, এই পৃথিবীতে তোমার জন্য সবকিছু থমকে আছে, শুধু আমার হৃদস্পন্দন ছাড়া।”

“আপনি সবসময় এমন নাটকীয় কথা বলেন কেন?”

“নাটকীয় নয়, সত্যি। তুমি যখন লজ্জা পাও, তখন আমার মনে হয়, আমি তোমার ভেতরের সবচেয়ে কোমল অংশটাকে ছুঁতে পেরেছি।”

“আপনি কী সবসময় আমাকে এভাবে টিজ করবেন?”

“টিজ করব, আদর করব, রাগাবো, হাসাবো, সবই করব। কারণ আমি তোমাকে শুধু ভালোবাসতে চাই না, তোমার প্রতিটা আবেগে থাকতে চাই।”

“চুপ করুন!”

“চুপ করব কেনো? সকালে জ্বরের ঘোরে তুমি আমার সাথে যা যা করলে। এখন আমি সমাজে মুখ দেখাব কীভাবে?”

সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

“কী করেছি আমি?”

“আমার তিন বছরের ভার্জিনিটি নষ্ট করে দিয়েছ। আমার ইজ্জত লুট করেছ।”

“আমি বিশ্বাস করিনা। আমি এসব করিনি।”

“আমার ইজ্জত লুট করে, এখন তুমি অস্বীকার করছ? আমি জানি, সবাই এমন করে। প্রথমে বাজে দৃষ্টি দিল, তারপর সুযোগ বুঝে ইজ্জত লুট করে। আর তারপর দায়িত্ব নেওয়ার ভয়ে সবাই অস্বীকার করে। তুমিও আমার সাথে তেমনটাই করছ।”

সুমু দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“দেখুন খান সাহেব…”

কথা কেড়ে নিল শেরাজ।

“কাল রাতেই তো দেখলাম। আবারও দেখাতে চাও? ওকে, আই এম রেডি ঝাঁসির রাণী। ওপেন।”

“আপনি আমাকে লজ্জায় ফেলছেন।”

শেরাজ হালকা হেসে বলল,

“তাহলে লজ্জা পেতে থাকো, সুইটহার্ট। কারণ তোমার এই লজ্জাই আমাকে সবচেয়ে বিপজ্জনক করে তোলে।”

ওদের কথার মধ্যেই হঠাৎ দরজা জোরে ঠেলে রুমে ঢুকে এলো নাতাশা। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

“ম্যাম, আপনার কী হয়েছে? আপনি নাকি অসুস্থ?”

তার দৃষ্টি সুমুর দিকে, কিন্তু এক মুহূর্তের মধ্যে তার চোখ গিয়ে পড়ল শেরাজের ওপর। শেরাজের গভীর, ঠাণ্ডা দৃষ্টি তার দিকে পড়তেই নাতাশা যেন জমে গেল। তড়িঘড়ি করে ‘সরি’ বলে সে বেরিয়ে যেতে গেল। দরজার বাইরে পা দিতেই নাতাশা স্যান্ডির সাথে ধাক্কা খেলো। স্যান্ডির হাতে থাকা ফাইল পড়ে নিচে যেতে গেল। স্যান্ডি বিরক্ত হয়ে বলল,

“হেই! সামনে তাকিয়ে হাঁটতে পারেন না নাকি?”

নাতাশাও কম যায় না। সে ভ্রু কুঁচকে উত্তর দিল,

“আপনি নিজেই তো রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছিলেন।”

“আমি রাস্তা আটকাইনি। আপনি হুট করে রুম থেকে বের হলেন কেন?”

নাতাশা দু’হাত কোমরে রেখে চোখ রাঙিয়ে বলল,

“আমি ম্যামকে দেখতে এসেছিলাম। আর আপনি কে?”

স্যান্ডি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

“আমি যেই হই না কেন, অন্তত অন্ধভাবে কাউকে ধাক্কা মারি না।”

“ওহ! মানে আপনি বলতে চাইছেন, আমি অন্ধ?”

“যদি জোরে ধাক্কা দিয়ে কারও জিনিস ফেলে দেওয়ার অবস্থা করেন। তাহলে হ্যাঁ, সেটাই বলতে চাইছি।”

দুজনের চোখে চোখ আটকে গেল, যেন যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতর থেকে শেরাজের কঠিন কণ্ঠ ভেসে এলো,

“দুজনেই ভেতরে এসো!”

স্যান্ডি নাতাশার দিকে শেষবার এক বিদ্রূপী দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। নাতাশা বিরক্ত মুখে ফিসফিস করে বলল,

“উফ! কী অভদ্র লোক।”

স্যান্ডি ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে মনে মনে বলল,

“এই মেয়ে তো একেবারে তেড়েমেড়ে টাইপ।”

স‍্যান্ডি ঢুকতেই নাতাশাও ভেতরে ঢুকল। শেরাজ চোখ সরু করে দুজনের দিকে তাকিয়ে কঠিন গলায় বলল,

“এতো জোরে ঝগড়া করছো কেন তোমরা দুজন? বাইর থেকে তোমাদের দুজনের আওয়াজ এখান পর্যন্ত আসছে।”

নাতাশা মুখ খুলে কিছু বলতে চাইলে স্যান্ডি আগে বলে উঠল,

“আমি আসছিলাম স‍্যার, উনি এসে ধাক্কা দিয়ে…”

নাতাশা সাথে সাথে কথা কেটে দিল,

“মিথ্যে বলছেন উনি। উনিই রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছিলেন।”

শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,

“চুপ! এখানে আমি কোনো বাজার বসাইনি। তোমরা দুজনেই চুপচাপ থাকবে।”

দুজনই মুখ বন্ধ করে চুপ দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু চোখে চোখ পড়তেই ভেতরে ভেতরে যেন আবারও ছোট্ট যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল তাদের। নাতাশা স‍্যান্ডিকে মুখ ভেঙিয়ে সুমুর দিকে তাকাল। হঠাৎ সে খেয়াল করল সুমুর গলায় রক্তের মতো ছোপ ছোপ দাগ। নাতাশা বিচলিত হয়ে বলল,

“ম‍্যাম, আপনার হঠাৎ এতো জ্বর এলো কীভাবে? আর আপনার গলায়…”

নাতাশা কথাটা শেষ করতে পারল না। তার আগেই স‍্যান্ডি তার হাতে চিমটি কাটল। নাতাশা চমকে উঠল। স্যান্ডির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“এই, আপনি আমাকে চিমটি কাটলেন কেন?”

স্যান্ডি মুখে একেবারে নির্দোষ ভাব এনে বলল,

“আমি? আহা! হয়ত ভুল করে লাগিয়ে ফেলেছি। আপনি তো এমনিতেই গরম হয়ে আছেন, তাই বুঝতে পারেননি।”

শেরাজ ভ্রু কুঁচকে দুজনের দিকে তাকাল।

“তোমরা আবার শুরু করেছ নাকি?”

নাতাশা ঠোঁট কামড়ে চুপ হয়ে গেল, কিন্তু তার দৃষ্টি এখনও সুমুর গলায়। সুমু অপ্রস্তুত হয়ে ওড়না সামলে নিল। শেরাজ সেটা লক্ষ্য করে সুমুর দিকে একবার তাকিয়ে নাতাশা আর স‍্যান্ডির দিকে তাকিয়ে সোজা গলায় বলল,

“দুজনেই এখন যাও!”

নাতাশা গম্ভীর মুখে মাথা নাড়াল। স্যান্ডি হালকা হাসি চেপে ফাইলের কাগজ উল্টাতে থাকল, যেন কিছু হয়নি। নাতাশা মাথা সোজা করে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগোলো, কিন্তু বের হওয়ার সময় সুমুর দিকে একবার দীর্ঘ দৃষ্টি ফেলে গেল। ঘরে আবারও নীরবতা নেমে এলো। শেরাজের মনোযোগ আবারও পুরোপুরি সুমুর দিকে ফিরে গেল। স‍্যান্ডি ও নাতাশার পিছু পিছু বেরিয়ে গেল।

দুজনেই নিচে আসতেই, স‍্যান্ডি নাতাশার পথ আটকে বলল,

“আপনি কি বাচ্চা?”

নাতাশা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“মানে?”

“মানে, ম‍্যামের গলায় কিসের দাগ আর জ্বর আসার কারণটা কী আপনি বুঝেন না?”

নাতাশা চোখ বড় করে স্যান্ডির দিকে তাকাল।

“আপনি বলতে চাইছেন, কাল রাতে স‍্যার এখানে ছিল? আর তারা দুজন…”

নাতাশা লজ্জা পেয়ে চুপ করে গেল। স্যান্ডি ঠোঁটে কৌতুকমাখা হাসি এনে ফিসফিস করে বলল,

“কিছু বিষয় আছে, যা জিজ্ঞেস না করাই ভালো। বিশেষ করে যখন সেটা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঘটে।”

নাতাশার মুখে লজ্জা, রাগ আর অস্বস্তি মিশে।

“আপনি খুব বাজে মানুষ।”

স্যান্ডি হালকা হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

“আমি শুধু বাস্তব বুঝি। আর আপনি বুঝতে চান না বলেই এতো প্রশ্ন করেন।”

নাতাশা ঘুরে চলে যাওয়ার সময় পেছন ফিরে একবার কটমট করে তাকাল।

“আপনার সাথে আর কথা বলার ইচ্ছে নেই আমার।”

স্যান্ডি মুচকি হেসে পিছন থেকে বলল,

“ভালোই হবে, তাতে আমার কানও বাঁচবে।”

নাতাশা বিরক্ত ভঙ্গিতে কটমট করতে করতে চলে গেল। স্যান্ডিও মাথা নেড়ে নিজের কাজে চলে গেল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে সেই বিদ্রূপী হাসিটা রয়েই গেল।

চলবে..?

#খান_সাহেব

#সুমাইয়া_জাহান

#পর্ব_63 ✦ বর্ধিতাংশ ✦

সুমু বিছানায় আধশোয়া হয়ে চুল আঙুলে পাকাচ্ছে। তার চোখে যেন একটু নতুন উজ্জ্বলতা এসেছে—জ্বর অনেকটাই কমে গেছে। সে হঠাৎ উঠে বসে বলল,

“আমি একটু শাওয়ার নিয়ে আসি, শরীরটা হালকা লাগবে।”

শেরাজ তখন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কাউকে টেক্সট পাঠাচ্ছিল। সুমুর কথা শুনে সে ঘুরে তাকাল। তার চোখে একরাশ দুষ্টুমি।

“একা যাবে?”

সুমু অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,

“না! গোটা পৃথিবীর দুধের শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ, সবাইকে নিয়ে যাবো।”

শেরাজ কাছে এগিয়ে এলো। সুমু আবারও বলল,

মানেটা কি? আমি তো প্রতিদিন একাই যাই।”

শেরাজ গম্ভীর গলায় বলল,

“তুমি ভুলে যাচ্ছো, তুমি এখনও পুরোপুরি সুস্থ না। আমি তোমাকে একা যেতে দেব না।”

সুমু মুখে হালকা বিরক্তি এনে বলল,

“আরে, আমি তো শাওয়ার নিতে যাচ্ছি, পাহাড়ে চড়তে নয়।”

শেরাজ ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি এনে ফিসফিস করে বলল,

“পাহাড়ে চড়া আর তোমার শাওয়ার—দুটোই সমান রিস্কি আমার জন্য।”

সুমুর চোখ বড় হয়ে গেল,

“আপনি কী বলতে চাইছেন?”

শেরাজ হালকা ঝুঁকে তার কানের কাছে মুখ এনে বলল,

“মানে তুমি যদি শাওয়ারে ঢোকো, আর মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে ব‍্যথা পাও?”

“আপনি থাকলে আমি শান্তিতে শাওয়ারও নিতে পারব না।”

শেরাজ দুষ্টু হেসে বলল,

“তাই তো বলছি, তোমাকে শান্তিতে শাওয়ার নিতে দেব না। আজ তোমার সিকিউরিটি আমি নিজেই হবো।”

“খান সাহেব, আপনি সত্যি অসহ্য।”

“হুম! কিন্তু এই অসহ্যটাই তো তোমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ।”

সুমু আর কিছু বলার আগেই শেরাজ তার হাত ধরে বলল,

“চলো, আমি তোমাকে নিয়ে যাই। যদি পড়ে গিয়ে আবার জ্বর বাড়িয়ে ফেলো, তখন তো আমি তোমার কাছে যেতে পারব না। আর এটা আমি কোনোভাবেই হতে দেব না।”

শেরাজের দৃঢ় কণ্ঠে যেন কোনো আপত্তির সুযোগই নেই। সুমু বেডের ওপর বসে থেকেই বলল

“তাহলে আপনি কথা দিন, আপনি ওয়াশরুমের দরজা থেকে ভেতরে এক কদমও এগোবেন না।”

শেরাজ এক ভ্রু তুলে বলল,

“কেনো? আমি তো পাহারা দেব বলেছি।”

“পাহারা দরজার বাইরে থেকেও দেওয়া যায়।”

শেরাজ ঠোঁটে মৃদু হাসি এনে বলল,

“দরজার বাইরে থেকে যদি পাহারা দিই, তাহলে যদি তুমি ভেতরে পড়ে যাও, আমি কী তখন দরজা ভেঙে ঢুকব?”

সুমু বিরক্ত হয়ে বলল,

“আপনি সবসময় এত বাড়াবাড়ি করেন কেন?”

শেরাজ শান্তভাবে উত্তর দিল,

“কারণ তোমার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি মানেই আমার দায়িত্ব।”

সুমু চোখ ঘুরিয়ে বলল,

“ঠিক আছে, কিন্তু ভেতরে যাবার কথা ভুলেও ভাববেন না।”

শেরাজ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

“ঠিক আছে, কিন্তু আমি দরজার একদম সামনে দাঁড়িয়ে থাকব। তোমার এক সেকেন্ড দেরি হলে ভেতরে ঢুকে যাব, মাথায় রাখবে।”

সুমু মুখে একরাশ লাজুক বিরক্তি নিয়ে বসে রইল। সুমুর অবস্থা দেখে শেরাজের ঠোঁটে হালকা দুষ্টু হাসি খেলে গেল।

“বেশি সময় নিচ্ছো না তো, সুইটহার্ট?”

“আপনি কী টাইমার ধরেছেন?”

“না! কিন্তু যদি সময়সীমা পেরিয়ে যায়, আমি জরিমানা নেব।”

“জরিমানা? সেটা আবার কী?”

“তোমার কাছ থেকে আমার পছন্দের কিছু আদায় করব।”

সুমুর গাল লাল হয়ে উঠল। সে চুপ করে গেল। শেরাজের হাসি আরও গভীর হলো। সে সুমুকে আর সময় না দিয়ে কোলে তুলে নিল। সুমু অবাক হয়ে তাকাল। শেরাজ হালকা বাঁকা হেসে সুমুকে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে সুমুকে নামিয়ে দিয়ে ভেতর থেকে দরজা লক করে দিল। সুমু ভ্রু কুঁচকে বল,

“এই আপনি দরজা কেন লক করলেন? এক্ষুনি বাহিরে যান।”

শেরাজ ধীরে ধীরে সুমুর দিকে এগোলো। সুমু পিছুতে পিছুতে দেওয়ালের সাথে মিশে গেল। শেরাজ সুমুকে দু'হাতে আটকে দুষ্টু হেসে বলল,

“বউ হও তুমি আমার। বাহিরে কেনো যাবো?”

সুমুর বুক ধড়ফড় করতে লাগল। তার হাত দুটো নিজের ওড়না শক্ত করে চেপে ধরল।

“আপনি সীমা ছাড়াচ্ছেন। আমি এখন অসুস্থ।”

শেরাজ চোখে গভীর দৃষ্টি রেখে নিচু স্বরে বলল,

“সীমা? আমি তো কেবল আমার দায়িত্ব পালন করছি।”

“দায়িত্ব পালনের নাম করে আপনি…”

সুমু কথা শেষ করার আগেই শেরাজ তার চুলের একগুচ্ছ আলতো করে কানের পেছনে সরিয়ে দিল। তার স্পর্শে সুমুর শরীর কেঁপে উঠল। শেরাজ ঠোঁটে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,

“দায়িত্বের আরেক নাম যদি হয় তোমার যত্ন নেওয়া, তাহলে আমি এই সীমা বারবার ভাঙতে রাজি।”

সুমু গম্ভীর গলায় বলল,

“আপনি খুব বেশি কাছে চলে এসেছেন। আমি সত্যি এখন অসুস্থ।”

শেরাজ আরও এক পা এগিয়ে এলো। তাদের মাঝে ফাঁকা জায়গাটা মিলিয়ে গেল।

“তুমি যখন অসুস্থ হও, আমি দূরে থাকতে পারি না।”

সুমু চুপ করে চোখ নামিয়ে ফেলল। শেরাজ হালকা স্বরে বলল,

“তুমি যদি চাও, আমি এখনই চলে যাব। কিন্তু কে জানে, তোমাকে ভেতরে পড়ে যাওয়া থেকে আমি বাঁচাতে পারব কি না।”

সুমু তাকাল। তার চোখে রাগ, লজ্জা মিশে। সে ভ্রু কুঁচকে বল,

“আমি স্ট্রং! আপনার থেকেও বেশি স্ট্রং।”

শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,

“কে বেশি স্ট্রং, সেটা তো বেডে গেলেই প্রমাণ হয়। স্ট্রং বলেই আমার এক স্পর্শে, একরাতে জ্বর বাঁধিয়ে ফেলেছ।”

“আপনি সত্যিই অসহ্য।”

শেরাজ হালকা হেসে ফিসফিস করে বলল,

“আর তুমি ঠিক সেই কারণেই আমাকে সহ্য করো।”

এক মুহূর্ত নীরবতা। শুধু দুজনের শ্বাসের শব্দ। শেরাজ ধীরে ধীরে তার হাত সুমুর কাঁধে রেখে, এক পা পিছিয়ে এলো।

“ঠিক আছে, শাওয়ার নাও। আমি এখানে থাকব, তোমার পাহারাদার হয়ে।”

সুমু গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,

“পাহারাদাররা কিন্তু ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকে না।”

শেরাজ চোখ মেরে বলল,

“কিন্তু আমি সাধারণ পাহারাদার নই।”

সে পেছন ঘুরে গিয়ে দেয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সুমু অবিশ্বাসের চোখে তার দিকে তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। শেরাজের মুখে সেই একই দুষ্টু হাসি খেলে গেল। সুমু শাওয়ারের পানি অন করার আগেই আচমকা শেরাজ তাকে কাছে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে শাওয়ারের পানি অন করে দিল। শাওয়ারের পানি সুমুর শরীরে পড়তেই সে শেরাজের পিঠ খামচে ধরে ব‍্যথাতুর শব্দ করে উঠল। ঠাণ্ডা পানির ধারা সুমুর গলা বেয়ে নামতেই সে হঠাৎ কেঁপে উঠল। শরীর ছোপ ছোপ লাল দাগে পানি পড়তেই যেন আগুনের মতো জ্বালা করে উঠল তার শরীর।

শেরাজ সঙ্গে সঙ্গে তার মুখের দিকে তাকাল, কিন্তু পিছু হটল না। বরং তার বাহুতে আরও শক্ত করে সুমুকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“কি হলো, বউ? এই জ্বালাও কী আমাকেই দোষ দিবে?”

সুমু বিরক্ত গলায় বলল,

“আপনার জন্যই এসব হয়েছে। এখন আবার মজা করছেন।”

পানির ধারা তাদের দুজনের শরীরে বয়ে যাচ্ছে, চুল ভিজে শেরাজের কপাল থেকে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা পানি। পানির ফোঁটা যত বেশি পড়ছে, সুমুর শরীর তত জ্বালাময় হয়ে উঠছে। সে ব‍‍্যথা সহ‍্য করতে না পেরে তার নক শেরাজের পিঠে গেঁথে দিল। নখের ধারালো আঁচড়ে লাল দাগ কেটে গেল শেরাজের চামড়ায়। শেরাজ তীব্র এক ঘন শ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল,

“উফ্! এই ব্যথাটা। তুমি জানো না সুইটহার্ট, এটা আমি কতটা উপভোগ করি।”

সুমুর চোখ বড় হয়ে গেল। সে বিচলিত হয়ে বলল,

“আপনি অসুস্থ নাকি? ব‍্যথা কোথা থেকে এলো? কী হয়েছে আপনার? দেখান আমাকে।”

শেরাজ ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,

“হ্যাঁ, তোমার ভালোবাসায় অসুস্থ। দেখো না, তুমি অসুস্থ হয়েও আমাকে সিডিউস করতে ছাড়ছো না।”

“আমি? আমি সিডিউস করছি আপনাকে?”

শেরাজ চোখে গভীর দৃষ্টি রেখে বলল,

“হুম! এই লাজুক রাগ আর তোমার এই নখের আঁচড় তো আমার সর্বনাশ করে দিচ্ছে।”

সুমু ভ্রু কুঁচকে তার বুকের ওপর চাপ দিল, কিন্তু শেরাজ নড়লও না। বরং ধীরে ধীরে তার গাল ছুঁয়ে বলল,

“তুমি যতই দূরে ঠেলো না কেন, আমি জানি তুমি আমাকে থামাতে চাইছ না।”

ঠাণ্ডা পানি গা ভিজিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু শেরাজের বাহুর শক্ত আলিঙ্গনে সুমুর শরীরের তাপ যেন আরও বেড়ে গেল।

“ছাড়ুন, আমি নিজেই পারব।”

শেরাজের হাতের চাপ একটুও কমল না। সে তার কানে ফিসফিস করে বলল,

“তুমি পারবে, আমি জানি। কিন্তু পারা আর আমাকে দূরে রাখা—দুটো এক নয়, সুইটহার্ট।”

সুমুর আঙুলগুলো এখনো শেরাজের পিঠে শক্ত করে গাঁথা। সে আলতো হেসে বলল,

“তোমার শরীরের এই ব্যথাগুলো তোমাকে মনে করিয়ে দেবে, আমি তোমার কতটা কাছে ছিলাম।”

সুমু শ্বাস নিতে নিতে বলল,

“আপনি পাগল!”

শেরাজ হেসে নিচু স্বরে বলল,

“তোমার জন্যই পাগল।”

পানি ক্রমাগত গড়িয়ে পড়ছে দুজনের ওপর। চুল ভিজে কপালে লেগে গেছে সুমুর। সে চোখ বন্ধ করে শেরাজের বুকে মাথা গুঁজে দিল। আর কিছু বলার সাহস হলো না তার। শেরাজ আলতো করে তার চিবুক উঠিয়ে চোখে চোখ রাখল।

“দেখছ? অসুস্থ তুমি, আর অসহায় আমি।”

সুমু ঠোঁট কামড়ে চোখ সরিয়ে নিল, কিন্তু তার গালের উষ্ণতা আর বুকের ধড়ফড় শেরাজের চোখ এড়িয়ে গেল না। পানি পড়তে পড়তে মুহূর্তটা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল। শেরাজের আঙুলগুলো ধীরে ধীরে সুমুর ভেজা গাল বেয়ে নামতে থাকল।

“জানো, বউ! এই ভেজা গাল, এই কাঁপুনি—সবই প্রমাণ দেয় তুমি এখনো আমার ছোঁয়াতে নিজেকে সামলাতে পারো না।”

সুমু চোখ বন্ধ করেই বলল,

“আপনি কেনো সবসময় এমন করেন? আমি এখন অসুস্থ।”

শেরাজ ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি টেনে ফিসফিস করে বলল,

“তুমি অসুস্থ হলে তো আমার যত্ন নেওয়ার অজুহাত বেড়ে যায়। আর যত্ন নিতে গিয়ে যদি একটু বাড়াবাড়ি হয়, সেটা কী খুব দোষের?”

সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

“আপনার যত্ন মানেই আমার মাথাব্যথা।”

শেরাজ তার কপাল কপালে ঠেকিয়ে বলল,

“তাহলে আমি প্রতিদিন তোমার মাথাব্যথা হবো।”

সুমুর শ্বাস আরও দ্রুত হয়ে গেল। শেরাজ নিজের পিঠের দিকে ইঙ্গিত করে হালকা স্বরে বলল,

“তুমি কি জানো, এই আঁচড়গুলো আমাকে মনে করিয়ে দেবে যে, অসুস্থ অবস্থাতেও তুমি আমাকে সিডিউস করার মতো শক্তি রাখো।”

“আমি ইচ্ছে করে এগুলো করিনি।”

“হয়তো ইচ্ছে করে করোনি। কিন্তু তোমার শরীর তো সব কথা বলে দিচ্ছে, বউ।”

সুমুর গলা শুকিয়ে এলো। ঠাণ্ডা পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে তার গলা বেয়ে, আর শেরাজের দৃষ্টি সেখানেই আটকে আছে। সে আরও ঝুঁকে এসে বলল,

“এই নখের দাগ, এই কাঁপুনি— এগুলো তো আমার জন্যই, তাই না?”

সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকে এক ধাক্কা দিল, কিন্তু শেরাজের বাহুতে যেন পাথরের মতো শক্তি।

“খান সাহেব, আমাকে দূর্বল করবেন না। আমি এতোটাই অসুস্থ যে, আমার মধ্যে আর সহ‍্য করার ক্ষমতা নেই।”

“অসুস্থ বলেই তো তোমাকে এমনভাবে ধরতে ইচ্ছে করছে। যাতে তুমি ভুলেই যাও, তুমি অসুস্থ।”

সুমু নিঃশ্বাস ফেলে চোখ সরিয়ে নিল। শেরাজ তার চিবুক আলতো করে তুলে বলল,

“আমার চোখে চোখ রেখে বলো, তুমি এই মুহূর্তটা পছন্দ করছ না?”

সুমু আর কোন কথা বলল না। শেরাজ আর অপেক্ষা না করে শাওয়ারের পানি অফ করে সুমুকে চেঞ্জ করিয়ে দিল। সুমুর চুলে টাওয়েল পেঁচিয়ে সুমুকে কোলে তুলে নিয়ে বাহিরে বেরিয়ে এলো।

বেডরুমে পৌঁছে সে সুমুকে আস্তে করে বিছানায় বসিয়ে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছে দিল। তার আঙুলগুলো আলতো করে সুমুর গলা ছুঁয়ে নামতে থাকল। সুমু চোখ বন্ধ করে বসে রইল।

“দেখো, বউ! তোমার ভেজা শরীর, এই উষ্ণ ত্বক—এসব সামলানোর জন্য আমারও তো ইমিউনিটি লাগে।”

“আমি আপনাকে দূরে থাকতে বলেছিলাম।”

শেরাজ হেসে বলল,

“দূরে থাকলে কি তুমি ভালো হয়ে যাবে? নাকি তোমার জ্বালা কমাতে পারবে?”

সুমু চোখ মেলে তাকাল। এরমধ্যেই রুমে ঢুকে এলো সুমুর পোষা বিড়াল ‘কিটি’। সে দু’দিন ধরে নাতাশার কাছে ছিল। বিড়ালের বাচ্চাটা এসেই সুমুর কোলে উঠে বসল। বিড়ালের বাচ্চাটাকে সুমুর কোলে উঠতে দেখে শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,

“এইটা এখন এখানে কেনো এলো? ও দেখতে পাচ্ছেনা, হাজব‍্যান্ড ওয়াইফের মধ্যে প্রাইভেট টাইম চলছে? নক না করেই রুমে ঢুকে এলো।”

সুমু কিটির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল,

“আজব তো! ও কীভাবে নক করবে? আর ও কেনো-ই বা নক করে আসতে যাবে?”

“ও মিউ মিউ বলে নক করবে। আর হাজব‍্যান্ড-ওয়াইফের প্রাইভেট টাইমে নক করেই তো আসবে। একটুও ম‍্যানার্স জানেনা তোমার এই বেয়াদব বিড়ালের বাচ্চা।”

“একদম ওকে বেয়াদব বলবেন না।-

“ওকে, বলব না!”

শেরাজ ইন্টারকমে কল করল। দু'মিনিটের মধ্যে নাতাশা এসে রুমে হাজির হলো। শেরাজ নাতাশার উদ্দেশ্যে বলল,

“এটাকে নিয়ে যান। এটা আমাদের প্রাইভেট সময় নষ্ট করে দিচ্ছে।”

সুমু হালকা রাগ দেখিয়ে বলল,

“ও যাবে না। নাতাশা তুমি যাও।”

শেরাজ নাতাশাকে চোখ দিয়ে ইশারা করতেই নাতাশা থতমত খেয়ে বলল,

“ম‍্যাম! ওর খাবারের সময় হয়ে এসেছে।”

সুমু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখল। সে বিড়ালটাকে একটু আদর করে নাতাশার কোলে দিয়ে দিল। নাতাশা কিটিকে নিয়ে নিচে চলে গেল।

•

ঘড়ির কাটায় সন্ধ্যা সাতটা বাজে। সুমু আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বটা মনোযোগ দিয়ে দেখছে। গয়নার আলোক ঝলকানো অংশগুলো ঠিকঠাক আছে কিনা, আর তার চুল ঠিকমতো আছে কিনা তা পরীক্ষা করে নিচ্ছে। রায়য়ানের বাড়িতে একটি বড় পার্টিতে যাবার জন্য রেডি হচ্ছে সে। আজ সে হালকা গোলাপি শাড়ি পরেছে, যার ঝলমলে কাজগুলো সুমুর মাধুর্যকে আরও বৃদ্ধি করেছে। তার মুখে সূক্ষ্ম হাসি, কিন্তু চোখে একটা ছোট্ট অনিশ্চয়তা লুকিয়ে আছে। সে জানে, এই পার্টি শুধু আনন্দ নয়, কিছু জটিলতাও বয়ে আনতে পারে।

নাতাশা পাশে এসে দাঁড়িয়ে সুমুর চুল ঠিক করে দিয়ে বলল,

“আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছে, ম‍্যাম। যেমনটা সবসময়ই লাগে।”

সুমু একটু হেসে বলল,

“খান সাহেব কোথায়?”

“ম‍্যাম, স‍্যার আর স‍্যারের ওই অ‍্যাসিস্টেন্ট ড্রয়িংরুমে বসে আছে।”

“ড্রয়িংরুমে বসে আছে? গিয়ে দেখোতো কী করছে দুজনে।”

“ওকে ম‍্যাম!”

নাতাশা চলে গেল। সুমু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবারও একবার নিজেকে দেখায় ব‍্যস্ত হলো।

নাতাশা নিচে নেমে এলো। নিচে নামতেই সে দেখল, শেরাজ আর স‍্যান্ডি মিলে কিটিকে ধরে রেখেছে। নাতাশা দৌড়ে গিয়ে বলল,

“কিটিকে এভাবে ধরে রেখেছেন কেনো আপনারা?”

শেরাজ তাকাতেই নাতাশা চুপ করে গেল। স‍্যান্ডি নাতাশার সামনে এসে বলল,

“ওর ইয়ে চেক করছি। আপনার কোনো সমস্যা?”

নাতাশা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“ইয়ে মানে?”

“আপনাকে বলব না।”

“এখানেই দাঁড়ান। আমি এক্ষুনি ম‍্যামকে ডেকে আনছি।”

নাতাশা উপরে চলে গেল। শেরাজ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“স‍ান, আমার বউ আসার আগে ওর ইয়েটা চেক করো।”

স‍্যান্ডি থতমত খেয়ে বলল,

“স‍্যার, আপনি করুন না।”

শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,

“অসম্ভব! ও যদি মেয়ে হয়? আমি অন‍্য মেয়েদের এসব দিকে তাকাতে পারব না। আমার ঘরে বউ আছে।”

স‍্যান্ডি কান্নাভেজা গলায় বলল,

“স‍্যার, আমার ঘরে বউ নেই। আমি ইনোসেন্ট একটা ছেলে। মেয়েদের দিকে তাকাই না। বিয়ের আগে অন‍্য মেয়ের এসব দেখলে, আমার গায়ে কলঙ্ক লেগে যাবে, স‍্যার।”

“আরে সান, ছেলেদের গায়ে কলঙ্ক লাগেনা। তুমি চেক করো।”

স‍্যার, ওর নাম তো কিটি, তার মানে ও মেয়েই হবে। আপনি ওতো চিন্তা করবেন না।”

শেরাজ রাগি লুকে তাকিয়ে বলল,

“আগে তুমি চেক করো। ও কিটি না ক‍্যাট—সেইটা চেক করার পরেই বোঝা যাবে।”

স‍্যান্ডি আর কিছু বলার সাহস পেল না। সে চোখ বন্ধ করে ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে বিড়ালটাকে উঁচু করে ধরল। শেরাজের মন ফোনের দিকে। স‍্যান্ডি প্রথমে এক চোখ খুলে তাকাল। বিড়ালটা ছেলে বিড়াল দেখে সে দু'চোখ খুলে বলল,

“স‍্যার, এইটা ছেলে বিড়াল।”

শেরাজ ফোন রেখে উঠে দাঁড়াল। সে স‍্যান্ডির কাছে এসে বিড়ালকে হাতে নিয়ে বলল,

“তাই তো বলি, এই শালা সারাদিন আমার বউয়ের গা ঘেঁষে কোলে উঠে বসে থাকে কেনো। শালা ক‍্যারেক্টারলেস! অন‍্যের বউয়ের দিকে নজর।”

“স‍্যার, এইটা কিটি না ক‍্যাট। ম‍্যাম এর ইয়ে না চেক করেই নাম রেখেছে।”

শেরাজ খানিকটা উঁচু গলায় বলল,

“আমার বউ কেন অন‍্য পুরুষের ইয়ে দেখবে? ভালোই হয়েছে আমার বউ ওর ইয়ে চেক করেনি। কিন্তু দেখলে তো, এই শালা সারাদিন আমার বউয়ের গায়ে লেগে থাকে, কোলে উঠে বসে থাকে। একেবারে চরিত্রহীন, আমার বউ ছাড়া অন্য কিছু বুঝেনা”, সে কিটির দিকে তাকিয়ে বলল, “এই তোকে আমি লেডি ক‍িটি এনে দিব।”

স্যান্ডি লজ্জায় মাথা নিচু করে বলল,

“স‍্যার, এই বিড়ালটা আসলেই একটু বেশি ‘অ্যাটাচড’। সব সময় মিয়াও করে ম‍্যামের কোলে চড়ে বসে।”

ওদের কথাবার্তার মধ্যেই সুমু আর নাতাশা সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল। সুমুর মুখে সতেজ এক হাসি, আর চোখে স্পষ্ট একটা আত্মবিশ্বাস। নাতাশা পাশ থেকে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,

“ম‍্যাম, সব ঠিকঠাক হয়েছে? পার্টিতে যাওয়ার জন্য রেডি তো?”

সুমু মাথা নেড়ে বলল,

“হ্যাঁ, আজ একটু আলাদা মেজাজে যাচ্ছি।”

নাতাশা উৎসাহ দিয়ে বলল,

“এই আত্মবিশ্বাসই আপনাকে সবার থেকে আলাদা করবে।”

দুজনে কথা বলতে বলতে নিচে নামল। শেরাজ কিটিকে স‍্যান্ডির হাতে দিয়ে সুমুর কাছে গেল। নাতাশা স‍্যান্ডির হাত থেকে কিটিকে নিয়ে কিটির রুমে রেখে আসতে গেল।

শেরাজ সুমুর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,

“আজকে তোমার রূপ যেন পুরো রাতের অন্ধকারকে ছাপিয়ে আলোকিত হয়ে গেছে। তোমার চোখের এই জ্বলজ্বলানি, ওই মাধুর্যময় হাসি — সব মিলিয়ে যেন এক পূর্ণিমার চাঁদের আভা।

সুমু চুপ করে শুনলো। শেরাজ আরও একটু এগিয়ে এসে কণ্ঠস্বর নরম করে বলল,

“তোমার এই সৌন্দর্য শুধু বাহ্যিক নয়, তোমার মনের আলোকেও আলোকিত করে।”

সুমু লাজুক হয়ে একটু তাকিয়ে থেকে বলল,

“এবার যাওয়া যাক?”

“হুম চলো!”

•

“আর সি: দ‍্য ব্ল‍্যাক হেভেন” আজ পুরো অন‍্যরকম ভাবে সেজেছে। রায়য়ানের বাসার গেটের সামনে ঝলমলে আলো ঝলমল করছে, ড্রেসডাউন আর বিলাসবহুল সাজসজ্জা চোখে পড়ছে। ভেতরে ঢুকতেই সুমুর চোখে পড়ল বড় বড় ক্রিস্টালের ঝুমরি বাতি, আর জানালা দিয়ে প্রবাহিত সন্ধ্যার হালকা হাওয়া পুরো ঘরকে করে তুলেছে স্বপ্নময়। সবার মধ্যে জমে উঠেছে পার্টির মেজাজ। মিউজিকের রিদমে কেউ নাচছে, কেউ হাসছে, আর কেউ মাদকসেবার মাঝে কথা বলছে। রায়য়ান নিজেও মাইক্রোফোন হাতে হাসিমুখে অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছে।

সুমু একটু একটু করে সবাইকে চেনে, কেউ তাকে হাই জানাচ্ছে, কেউ প্রশংসার কথা বলছে। নাতাশা সুমুর পাশে এসে বলল,

“ম‍্যাম, আজকের এই পরিবেশে আপনি অসাধারণ লাগছেন।”

সুমু আলতো হাসল। আরিয়ান আর রায়য়ান দূর থেকে সুমু আর শেরাজকে ঢুকতে দেখে এগিয়ে এলো। আরিয়ান এখন পর্যন্ত রায়য়ানের সাথে কথা বলেনি। রায়য়ান আর আরিয়ানকে একসাথে এগিয়ে আসতে দেখে সুমু একটু অপ্রস্তুত হলো। শেরাজ ওদের একসাথে এগিয়ে আসতে দেখে বাঁকা হাসল।

রায়য়ান একটু এগিয়ে এসে, মাইক্রোফোন হাতে হাসি দিয়ে বলল,

“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম‍্যান, দ্য মোমেন্ট উইভ অল বিন ওয়েটিং ফর হ্যাজ অ্যারাইভড। দ্য পারসন ইন হুজ অনার দিস পার্টি ইজ বিয়িং হেল্ড ইজ হিয়ার উইথ আস টুনাইট। প্লিজ জয়েন মি ইন গিভিং আ ওয়ার্ম অ্যান্ড হার্টফেল্ট ওয়েলকাম টু আওয়ার স্পেশাল গেস্ট, সুমু।”

সবার চোখ সুমুর দিকে ফিরল। সবাই হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানাতে শুরু করল। রায়য়ান তার হাসি বজায় রেখে বলল,

“সুমু, তোমার মতো মানুষকে পেয়ে আমরা সবাই ধন্য। আজকের রাতটা শুধু তোমার জন‍্য, পুরোটা উপভোগ করো।”

পার্টি শুরু হলো একেবারে জমজমাটভাবে। ডিজে বক্স থেকে ভেসে আসছে তীব্র বেসের সঙ্গে ইংলিশ আর হিন্দি গানের মিক্স। হলঘরের একপাশে বার কাউন্টার—রঙিন বোতল, রঙিন ককটেল, আর গ্লাসের টুংটাং শব্দে সরগরম। অন্যপাশে ফুড কর্নারে সাজানো বিভিন্ন দেশের খাবার—সুশি থেকে শুরু করে কাবাব, চকলেট ফোয়ারা থেকে শুরু করে আইসক্রিম বার।

সুমু চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে দেখল। রঙিন আলো, মানুষের হাসির শব্দ, আর মাঝে মাঝে ভেসে আসা ফ্ল্যাশলাইটের ঝলক—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, “আর সি: দ‍্য ব্ল‍্যাক হেভেন” সত্যিকার অর্থে স্বর্গের মতো একটা রাত শুরু হয়েছে।

রায়য়ান দূর থেকে সুমুকে দেখে এগিয়ে এলো। হাতে শ্যাম্পেন গ্লাস। সে মুচকি হেসে বলল,

“ইনজয় দ‍্যা নাইট, প্রিন্সেস।”

শেরাজ ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক বাঁকা হাসি নিয়ে খানিকটা পেছনে দাঁড়িয়ে চুপচাপ পর্যবেক্ষণ করছিল। হঠাৎ আরিয়ান মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে মৃদু হাসি দিয়ে বলল,

“তো লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, আজকের পার্টির আসল তারকাদের নিয়ে একসাথে মিলে একটা যুগলবন্দী গান পরিবেশন করা যাক? কেমন হবে? যেমন ধরুন—মিসেস খান, মিস্টার খান, মিস্টার রায়য়ান চৌধুরী আর আমি।”

সবাই উৎসাহে হাততালি দিতে লাগল। সুমু রাজি হলো না। কিন্তু সকলের রিকোয়েস্ট শেষমেশ সে রাজি হলো। রায়য়ান পেছন ফিরে সঙ্গীতের লয় ধরার জন্য মিউজিশিয়ানদের ইশারা দিল। পার্টির বাতাস যেন এক মুহূর্তে আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। আরিয়ান সবাইকে স্টেজে ডাকল। শেরাজ সুমুর হাত ধরে স্টেজে উঠে এলো। তাদের সাথে রায়য়ানও এলো। একজন লোক এসে সুমু, শেরাজ আর রায়য়ানের হাতে মাইক্রোফোন দিয়ে গেল। পার্টিতে উপস্থিত সকলে উৎসাহ দিতে লাগল। হলরুমের লাইট অফ হয়ে গেল। শুধু স্টেজের ওপর স্পটলাইট পড়ল। সুমু একবার শেরাজের দিকে তাকাল। তারপর মনের কোন এক ভাবনা থেকে গান ধরল,

“আই’ম সো লোনলি, ব্রোকেন অ্যাঞ্জেল

আই’ম সো লোনলি, লিসেন টু মাই হার্ট!”

গানের দ্বিতীয় কলি ধরল শেরাজ,

“ইউ, ইউ আর দা ওয়ান

আই মিস ইউ সো মাচ

নাও দ্যাট ইউ’আর গন

ডোন্ট, ডোন্ট বি অ্যাফ্রেইড

আই’ল বি বাই ইওর সাইড

লিডিং দা ওয়ে!”

তারপরের কলি আবারও ধরল সুমু,

“আই’ম সো লোনলি, ব্রোকেন অ্যাঞ্জেল

আই’ম সো লোনলি, লিসেন টু মাই হার্ট

ওয়ান অ্যান্ড অনলি ব্রোকেন অ্যাঞ্জেল

কম অ্যান্ড সেভ মি বিফোর আই ফল অ্যাপার্ট!”

সুমু থামতেই এবার রায়য়ান শুরু করল,

“আই উইশ দ্যাট আই কুড টাচ

টাচ ইউ এগেইন

ফিলিং ইন লাভ

ডোন’t ওয়ান্ট ইট টু আ‍্যন্ড!”

পরের কলি ধরল আরিয়ান,

“টু, টু ওয়ার্ডস অ্যাপার্ট

লেস ইন আ ড্রিম

ইট’স ব্রেকিং মাই হার্ট!”

গান শেষ হতেই স্টেজে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা। না করতালির শব্দ, না ফিসফিসানি —মুহূর্তের জন্য সবাই যেন থেমে গেল। স্টেজে দাঁড়ানো চারজন মানুষের হৃদয়ের ভেতর থাকা গোপন ব‍্যথা হয়ত আজ একটু হলেও সকলের সামনে প্রকাশ পেল। সুরের শেষ প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যাওয়ার পরও, সেই আবেগমাখা পরিবেশে শ্বাস নেওয়াটাও যেন কষ্টকর হয়ে উঠল। হলরুমের বাতাস ভারী হয়ে এলো—ভরা চোখ, থমকে যাওয়া দৃষ্টি, আর এক গভীর প্রশংসার নীরবতা চারপাশে ছড়িয়ে।

প্রথমে এক কোণে বসে থাকা নাতাশা আর স‍্যান্ডি পরিবেশটাকে স্বাভাবিক করার জন‍্য হাততালি দিয়ে উঠল। ওদের দুজনকে দেখে ধীরে ধীরে হাততালি দেওয়া শুরু করল সকলে। ধীরে ধীরে গোটা হলরুম হাততালিতে ভরে উঠল। কারো চোখে অশ্রু, কারো ঠোঁটে বিস্ময়ের হাসি।

শেরাজের দৃষ্টি সুমুর চোখে আটকে রইল। স্পটলাইটে দাঁড়িয়ে সুমুর গাল সামান্য লাল হয়ে উঠেছে, ঠোঁট শুকনো, কিন্তু চোখ ভরা অদ্ভুত এক আলোয়, যেন এই গান গেয়ে সে নিজের হৃদয়ের একটা গোপন ব‍্যথাময় অংশ সবার সামনে উন্মোচন করে ফেলেছে।

রায়য়ান আর আরিয়ান দু’জনেই মৃদু হেসে মাইক্রোফোন নামিয়ে রাখল। গানের শেষে যেই নীরবতা ভেঙে গেল, এবার শুরু হলো পার্টির আরেকটি উচ্ছ্বাস, ড‍্যান্সের আবদার। হলরুম জুড়ে সবাই একযোগে চিৎকার করে বলল,

“স্পেশাল গেস্টের ড‍্যান্স দেখব।”

সুমু সবার ভীড়ে একটু হেসে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ হালকা হাসি দিয়ে বলল,

“নিজেকে এমন জায়গায় এনেছ—এসব এখন স্বাভাবিক। নিজের মনে কথা শোনো। আমি তোমাকে আমার থেকে দূরে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনকিছুতে বাঁধা দিব না।”

সুমুর মধ্যে যেন এক মিষ্টি প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল। তার হাত শেরাজের হাতের ওপর নরম করে রেখে সে মাথা ঝোঁকলো। স্পটলাইট ধীরে ধীরে আবার তার ওপর পড়তে লাগল। শেরাজ, আরিয়ান আর রায়য়ান স্টেজ থেকে নেমে গেল। স্পটলাইট একবার অফ হতে সুমু শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে নিল। স্পটলাইট আবার অন হতেই মিউজিক শুরু হলো,

“নাজার জো তেরি লাগি, মে দিওয়ানি হো গায়ি

দিওয়ানি হাঁ দিওয়ানি, দিওয়ানি হো গায়ি

মাশহুর মেরে ইষ্ক কি কাহানি হো গায়ি

জো জাগ নে না মানি তো ম্যায়নে ভি থানি

কাহাঁ থি ম‍্যায় দেখো কাহাঁ চালি আয়ি

কেহেতে হে, ইয়ে দিওয়ানি, মস্তানি হো গায়ি!”

গানের বিটের সঙ্গে সুমু আজ যেন আর থামল না। সে স্টেজের ওপর ঘুরছে, মনের আনন্দ আর বেদনা মিশিয়ে। হলরুমের সবাই স্তব্ধ হয়ে একটার পর একটা মূর্ছনা শুনছে। আরিয়ান আর রায়য়ান দৌড়ে এগিয়ে যাওয়ার আগেই, শেরাজ তাড়াতাড়ি দৌড়ে গিয়ে সুমুকে ধরে ফেলল। অসুস্থ শরীরের মেয়েটা নেতিয়ে পড়ল তার প্রিয় মানুষটার বুকে। সুমুর জ্বরটা আবারও ফিরে এসেছে। শেরাজ জড়িয়ে ধরে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, যেন সব কষ্ট ও ভয়কে ঢেকে ফেলতে চাইছে সে।

কিছু সময় নীরবতার পর, সুমু ধীরে ধীরে মুখ তুলে শেরাজের দিকে তাকাল। তার চোখে বেদনার পাশাপাশি এক আলোর আভা ঝলমল করছে। আলতো হাসি দিয়ে আস্তে আস্তে বলল,

“আমি তো শুধু আমার আপনিটাকে নিয়ে, আমাদের ছোট্ট একটা সুন্দর সংসার চেয়েছিলাম, খান সাহেব। যেখানে শুধু ভালোবাসা থাকত, কোনো কষ্ট না, কোনো জোরাজুরি না। কিন্তু, আপনারা তিন পুরুষ তো আমাকে নিয়ে খেলতে লাগলেন। আমাকে ফেলে দিলেন আপনাদের জেদের এক আবরণে। আমি শুধু চেয়েছিলাম আপনার ভালোবাসার নিরাপদ আশ্রয়, কিন্তু পেলাম এক অচেনা যুদ্ধক্ষেত্র।”

শেরাজ কিছুক্ষণের জন‍্য থমকে গিয়ে বলল,

“সুইটহার্ট, আমি জানি আমি সবসময় কঠোর থাকি, কিন্তু আমার এই কঠোরতার নিচে তোমার জন্য অগাধ ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। আমি কখনও তোমাকে দুঃখ দিতে চাইনি। তোমার যন্ত্রণাগুলো আমার হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। তুমি আমার জীবন, আমার শান্তি। যে যুদ্ধক্ষেত্র তুমি দেখেছ, আমি সেটা মুছে দিব। কিন্তু তোমাকে নিজের করে রাখার জন‍্য যদি এমন যুদ্ধ বার বার ঘোষণা করতে হয় আমার— তবে আমি তাই করব।”

সুমুর চোখে মিশে আছে ক্লান্তি আর আশার আলো, আর শেরাজের চোখে অঙ্গীকার আর সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি। হলরুমের আলো যেন ম্লান হয়ে গেছে, সবাই সুমুরাজের সেই মধুর এবং বিষাদের মিশ্র অনুভূতিতে নিমগ্ন।

শেরাজ ধীরে ধীরে সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

“আমার জীবনের সবচেয়ে অমূল্য সম্পদ তুমি। আমি যতই কঠোর হই না কেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ের সব দরজা খোলা। তুমি যেখানেই যাও, আমি তোমার সঙ্গে আছি।”

আরিয়ান আর রায়য়ান একটু এগিয়ে এলো সুমুকে দেখতে। কিন্তু শেরাজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তারা নিজেকে থামাল। শেরাজ মৃদু বাঁকা হেসে বলল,

“এই জিনিস সামলানোর ক্ষমতা শুধু আমারই আছে— তোদের নেই। তাই, দূরে থাক।”

এক জোড়া হাত জোরালো হয়ে সুমুর কোমর ঘিরে ধরে, ধীরে ধীরে হলরুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে এগিয়ে গেল। প্রতিটি পদক্ষেপে যেন ঘোষণা দিল—সুমুকে আর কেউ কষ্ট দিতে পারবে না। সুমু শেরাজের কাঁধে মাথা রেখে, অদ্ভুত এক শান্তি অনুভব করল। সে বিড়বিড় করে বলল,

“জীবনের সমস্ত যুদ্ধ যত কঠিনই হোক, আমি কখনও একা নই, আমার পাশে আছে এমন একজন— যিনি সব যুদ্ধের জন্য সবসময় প্রস্তুত।

•

রুফটপে হালকা বাতাসে দাঁড়িয়ে আছে রায়য়ান। একের পর এক সিগারেট ফুঁকছে, ধোঁয়া মনমরা আকাশে মিশে যাচ্ছে। তার চোখে অদ্ভুত এক কঠোরতা, যেন অন্তরে বুনেছে কোনো অমীমাংসিত ঘৃণা।

পেছনে দাঁড়িয়ে আছে মাহিন, চুপচাপ ও স্থির হয়ে। মুখে কোনো ভাবান্তর নেই, শুধু নিঃশ্বাস নিয়েছে গভীর এক নিঃশ্বাস, যেন অনেক কথা জমে আছে তার গলার। সে নিরবতা ভেঙে বলল,

“তিনবছর সময় পেয়েও ম‍্যামকে কিছু জানালেন না কেনো, বস?”

রায়য়ান আবারও একটা সিগারেট ধরিয়ে হালকা হেসে বলল,

“বললে আমাদের মাঝে বন্ধুত্বটাও থাকত না। ও কখনোই আমাকে গ্রহণ করত না। তিন বছর ধরে যখন ও আমার কাছে ছিল—দিনে মিথ্যা হাসি আর রাতে হৃদয় ছেঁড়া আর্তনাদ নিয়ে ছিল। ওর কান্না কেউ না শুনতে পেলেও, আমি পেতাম। তিন বছর ধরে ও এক সেকেন্ডের জন্যও এস.কে’কে ভুলতে পারেনি।”

“কিন্তু বস, আপনি…”

“আমি চাই ও সুখে থাকুক। আমি শেষ পর্যন্ত লড়াই করব। কিন্তু আমি চাই ও সুখে থাকুক। ভালোবাসা মানে শুধু নিজের নয়, তার ভালো থাকা দেখতে হয়। থাকুক না সে আমার থেকে দূরে, না হোক সে আমার—তবুও সে সুখে থাকুক।”

“বস, আপনি কেন আপনার মনে কথা প্রকাশ করেন না?”

রায়য়ান হাসল। সে সিগারেট টানতে টানতে বলল,

“যখন বুঝলাম, চোখের জল সব ব‍্যথা প্রকাশ করতে পারে না। তখন থেকেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখলাম আমার সব ব্যথা।”

“যখন অনুভব করলাম, সব কথা বললেও কেউ বুঝবে না। তখন থেকেই মন খুলে বলা বন্ধ করে দিলাম।”

“যখন দেখলাম, আবেগ প্রকাশ করলে শুধু ক্ষত বাড়ে। তখন থেকেই অনুভূতিগুলোকে নিজের ভেতরে কবর দিয়ে রাখলাম।”

“যখন বুঝতে পারলাম, বুকের ব‍্যথা মুখ দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। তখন থেকেই চুপ হয়ে গেলাম।”

“যখন বুঝলাম, বুকের ভার হালকা করার জন্য সব কান প্রস্তুত নয়। তখন থেকেই নিজের সঙ্গেই কথা বলা শিখে গেলাম।”

“যখন অনুভব করলাম, আমার নীরবতা কারও কাছে গল্প নয়। তখন থেকেই শব্দের বদলে নিঃশ্বাসে জমিয়ে রাখলাম আমার সব ব্যথা।”

“যখন দেখলাম, মনের কথা বললেই শুধু ভুল বোঝা হয়। তখন থেকেই চুপ থাকাকে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বানালাম।”

“যখন বুঝলাম, সব ব্যথার ভাষা নেই। তখন থেকেই মনে মনে চিৎকার করে বাইরে থেকে নীরব হয়ে গেলাম।”

“যখন শিখে গেলাম, সব কষ্টের ভাষা হয় না। তখন থেকেই নীরবতা হয়ে গেল আমার একমাত্র আশ্রয়।”

পুরো কথাগুলো সে থেমে থেমে বলল। মাহিন শুনলো তার বসের কথা। একটা মানুষ কতটা যন্ত্রণা নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখে নিজেকে পাথর, পাষাণ করে গড়ে তুলেছে— আজ মাহিন হয়ত তার কিছুটা বুঝতে পারল। হঠাৎ মাহিনের কাঁধে হাত রাখল কেউ। সে পেছনে তাকাতেই দেখল আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে।

চলবে..?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন