#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_67 ✦ প্রথমাংশ ✦
ভোরের আলো আজ শেখবাড়িতে যেন কিছুটা ভারী হয়ে ঢুকল। বাগানের ফুলগুলো রোদে হেসে উঠলেও, ঘরের ভেতরকার আবহ ছিল অদ্ভুত চুপচাপ। আজ সকালবেলা নাস্তার টেবিলে এখনো সবাই জড়ো হয়নি। সাখাওয়াত সাহেব আগের মতোই চুপচাপ পত্রিকা উল্টাচ্ছেন, কিন্তু তার দৃষ্টিতে একটা কঠোরতা স্পষ্ট।
সামিয়া টেবিলে বসে আছে। সে মুখে হালকা হাসি রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু চোখ দুটো যেন সারারাত ঘুমহীন থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। সুমু বোনের পাশে বসে— তার ভেতরের অস্থিরতা অনুভব করছে।
হঠাৎ সাখাওয়াত সাহেব পত্রিকা ভাঁজ করে রাখলেন। চারপাশে নিস্তব্ধতা। তিনি গভীর গলায় বললেন,
“সামিয়া!”
সামিয়া চোখ তুলে তাকাল তার দিকে।
“জি বড়বাবা!”
“আমি জানি তুমি কি চাও। নিজের ক্যারিয়ারের প্রতি তোমার টান আমি বুঝি। কিন্তু তোমাকে বুঝতে হবে— সবকিছু শুধু আবেগ দিয়ে চলে না, দায়িত্ব দিয়েও চলে। তুমি এখন বড় হয়েছ। একদিন না একদিন তো তোমাকে আমাদের বিয়ে দিতেই হবে। তুমি পড়াশোনা করছো, করো। পিয়াস আমাদের ভালো ছেলে। বিয়ের পর ও তোমার পড়াশোনা বন্ধ করবে না। বরং তোমার সব স্বপ্ন পূরণ করতে, তোমার পাশে ছায়ায় মতো থাকবে।”
সামিয়া মাথা নিচু করে রইল। সুমু এগিয়ে এসে নরম স্বরে বলল,
“বড়বাবা, এখানে বোনের সুখও তো জরুরি। পরিবার মানে শুধু দায়িত্ব নয়, হৃদয়ের শান্তিও।”
কিছুক্ষণ নীরবতা। শুধু চায়ের কাপে চামচের শব্দ শোনা গেল। সাখাওয়াত সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ধীর গলায় বললেন,
“সময়ই ঠিক করবে কোনটা সঠিক। আজ আর এ নিয়ে কথা নয়।”
তিনি চলে গেলেন। টেবিলে নেমে এলো আরও গভীর নিস্তব্ধতা। সামিয়া সুমুর হাত চেপে ধরল। তার চোখের কোণে চিকচিক করছে অশ্রু।
সুমু আস্তে করে বলল,
“তুই আমাকে সব মনের কথা বল, সামু। তোর এই কষ্ট কীসের জন্য?”
সামিয়া কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে রুমে চলে গেল। সুমু তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
উপরে এসে সামিয়া রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। আয়নায় নিজের ক্লান্ত মুখ দেখে মনে হলো—এই চোখদুটো যেন কত কিছু বলতে চাইছে, অথচ কেউ শুনছে না। বিছানার পাশে বসে ডায়েরিটা খুলল। ডায়েরির প্রতিটি পাতায় পাতায় শুধু রাহিনের কথা, তার সাথে কাটানো মুহূর্তের টুকরো টুকরো স্মৃতি। সামিয়ার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল পাতার ওপর। পাতার ওপর ঝরে পড়া অশ্রু মুছে সে ডায়েরি বুকের সাথে চেপে ধরল। তার বুকের ভেতর যেন শূন্যতা আর কান্নার এক অদ্ভুত ঢেউ উঠছে। মনে পড়তে লাগল রাহিনের সাথে সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো।
•
ডাইনিং রুমটা এখন গমগম করছে। লম্বা টেবিলে সবাই আস্তে আস্তে বসতে শুরু করেছে। মাঝখানে সাজানো সকালের নাস্তা আর ডেজার্ট। হাসি বেগম আর রুমা বেগম দু’জন মিলে খাবার সার্ভ করছেন।
শেরাজ এসে সুমুর পাশে বসল। সুমু চুপচাপ মাথা নিচু করে রেখেছে। আইয়ুব প্রথমেই কথা শুরু করল,
“বিডিতে এলেই শুধু বিয়ের দাওয়াত খাই।”
নিহাল হেসে বলল,
“বিয়ে হলে খাওয়া ও দারুণ হয়, ভাই। এখন আবার ওয়ার্ক ফ্রম হোম।”
সারবাজ জুসের গ্লাস হাতে নিয়ে বলল,
“অফিসের কথা বলতেই মনে পড়ল—ইনায়া, কালকের প্রেজেন্টেশন দারুণ হয়েছিল।”
ইনায়া লাজুক হেসে উত্তর দিল,
“ধন্যবাদ, এস.কে স্যার গাইড না করলে এতো সুন্দর হতো না।”
শেরাজ গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল;
“টিমওয়ার্ক ছাড়া কিছুই সম্ভব না। সবাই পরিশ্রম করেছে।”
অমিত আর রিয়াদ একসাথে বলে উঠল,
“এস.কে টিমওয়ার্ক বললি, কিন্তু টিমের অর্ধেক তো তোর ভয়ে কাঁপে।”
সবাই হেসে উঠল। রাহিন চুপচাপ সামিয়ার খোঁজে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। কিন্তু সামিয়া আজ টেবিলে নেই। রিসান খেয়াল করল ওর চাহনি। সে ঠোঁটে চাপা হাসি টেনে বলল,
“কী রে, খাচ্ছিস না কেন? কারও জন্য অপেক্ষা করছিস নাকি?”
রাহিন অস্বস্তি লুকাতে চাইল, কিন্তু অমিত সঙ্গে সঙ্গে কথায় ঢুকে পড়ল।
“এখানে এসব কথা বলিস না। আন্টিরা আছে।”
আইয়ুব হেসে বলল,
“রাহিনের অবস্থা এখন কাবির সিং এর মতো।”
সাইফ কপাল কুঁচকে বলল,
“তুই কি কখনও সিরিয়াস হতে পারিস না, আয়ুবা?
আইয়ুব হেসে বলল,
“আরে ভাই, সিরিয়াস হলে তো, এ টেবিলের মজা থাকবে না।”
নাতাশা চাপা গলায় বলল,
“মজা করতে পারেন, তবে মেয়ে মানুষের বিয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে, আর কারো ফিলিংস নিয়ে মজা করবেন না। সবাই জানে, রাহিন ভাইয়ার মনে এখন কী ঝড় বইছে।”
টেবিল হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। হাসি বেগম খাবার সার্ভ করতে করতে বললেন,
“সবাই চুপ কেন?”
রুমা বেগম চারদিকে তাকিয়ে বললেন,
“সবাই চুপ কেন? খাও, খাও, খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
নাজমিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে চাপাস্বরে বলল,
“চুপ হয়ে গেল কারণ, কেউ না কেউ মনের কথা ঢাকতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে।”
পাশে বসা আইয়ুব কাটাচামচ বাজিয়ে হালকা মজা করে বলল,
“বেবি, মনের কথা না খুললেই তো ভালো। মনের কথা বেরোলেই ঝামেলা।”
সারবাজ সিরিয়াস হয়ে বলল,
“ঝামেলা হলেও, সত্যি চাপা দিয়ে রাখা যায় না। এখনকার জেনারেশন খোলাখুলি সবকিছু বলে না। চাপা দিলে ভেতরে আগুন জ্বলতে থাকে।”
শেরাজ গম্ভীর মুখে সুমুর দিকে একবার তাকাল। সুমু মাথা নিচু করে বসে আছে। খাবার বা টেবিলের কারো দিকে মন নেই তার।
ইশিতা পরিবেশ হালকা করতে হাসিমুখে বলল,
“আচ্ছা নাজমিন, বিয়ের কোনো প্ল্যানিং নেই তোমার?”
নাজমিন আলতো হেসে বলল,
“আছে আপু! তোমাকে পরে বলব সব।”
রুমা বেগম আবারও টেবিলের কাছে এসে বললেন,
“বিয়ের আগে মেয়ে-ছেলের মতামত জানতে হয়। শুধু বড়দের সিদ্ধান্তে সংসার টিকে না। আর আমাদের বাড়ির ছেলে-মেয়েরা তো তাদের নিজের পছন্দ করা মানুষটাকেই পাচ্ছে। ওরা সকলে খুব সুখী হবে।”
এই কথা শুনে টেবিলে আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো। রাহিন নিচু গলায় বলল,
ঠিকই বলেছেন, আন্টি! মনের ইচ্ছা না থাকলে বিয়ে মানে শুধু সম্পর্কের নাম, তার ভেতরে কোনো শান্তি থাকে না।”
সবাই থমকে গেল। রাহিনের চোখে অদৃশ্য কষ্ট স্পষ্ট। সাইফ কণ্ঠ নামিয়ে বলল,
“তুই কি কিছু বলতে চাইছিস, রাহিন?”
রাহিন চুপচাপ জুসের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে থাকল। কিছু না বলে স্রেফ ঠোঁট কামড়াল। হঠাৎ সুমু বলল,
“ঠিক বলেছ, বড়মা। বিয়েতে ছেলে-মেয়ে দুজনের মতামত জানতে হয়। কিন্তু সত্যি কি তোমরা সকলের মতামত নিয়েছ?”
রুমা বেগম একটু অবাক হয়ে বললেন,
“মানে?”
হাসি বেগম কিচেন থেকে ছুটে এসে বললেন,
“কিছু না, আপা। ও এমনি বলেছে।”
হাসি বেগম এসে সুমুর হাত ধরে তাকে চেয়ার থেকে উঠিয়ে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে, শেরাজ বাঁধা দিয়ে বলল,
“সাবধানে আম্মু। আপনি ভুলে যাচ্ছেন, বউ আমার প্রেগনেন্ট।”
হাসি বেগম সুমুর হাত ছেড়ে দিল। সুমু হালকা রাগ দেখিয়ে বলল,
“আমাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছো কেন, আম্মু? আমি কি ছোট বাচ্চা? নাকি আমার মুখে তালা দিয়ে রাখবে?”
টেবিলটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। শেরাজ সুমুর হাত ধরে শান্ত স্বরে বলল,
“সুমু, প্লিজ! তুমি শান্ত হও। তোমার শরীরের অবস্থা এখন…”
সুমু কণ্ঠ উঁচু করে বলল,
“শরীরের অবস্থা নিয়ে সবাই ভাবে, কিন্তু মনের অবস্থা নিয়ে কেউ ভাবে না। তোমরা সবাই বলছো ছেলে–মেয়ের মতামত নিতে হয়। কিন্তু সত্যি করে বলো তো, সামিয়ার মতামত নিয়েছ? কেউ জিজ্ঞেস করেছে, সে কাকে চায়?”
এইবার যেন বোমা পড়ল টেবিলে। সবাই স্তব্ধ। রাহিনের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। গ্লাস হাতে ধরা হাত কাঁপতে শুরু করল। নাজমিন চাপা গলায় বলল,
“আপু প্লিজ, এখন এসব…”
কিন্তু সুমু থামল না। চোখে জল এসে গেছে তার।
“আমরা বাহির থেকে হাসি–খুশি পরিবার দেখাই, কিন্তু ভেতরে কতটা অশান্তি, কেউ জানে না। সামিয়াকে তোমরা জোর করে অন্যদিকে ঠেলে দিচ্ছো। বিশেষ করে আমার জন্মদাত্রী মা। সে আমার সাথেও এমনটাই করেছিল।”
রুমা বেগম বললেন,
“কিন্তু সামিয়া তো অমত করেনি।”
সুমু দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“করবে কীভাবে? যদি ইমোশনালি কাউকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়, তাহলে সে আর কথা বলে কীভাবে?”
টেবিলে যেন বজ্রপাত হলো। সবাই থম মেরে বসে রইল। সুমু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, তখনই হঠাৎ করেই দরজার দিক থেকে ভেসে এলো সামিয়ার কণ্ঠ,
“থামো আপু! আর কিছু বলো না।”
সবাই একসাথে তাকাল। সামিয়া ডাইনিং রুমে এলো। তার মুখে একরাশ ক্লান্তি, চোখ লাল, কিন্তু গলায় দৃঢ়তা। সে সোজা সুমুর সামনে এসে দাঁড়াল।
“আমি মন থেকেই বিয়েটা করতে চাই।”
টেবিলের সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। রাহিনের হৃদয় কেঁপে উঠল, যেন বুকের ভেতর সবকিছু ভেঙে পড়ল এক মুহূর্তে। সুমু হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে বলল,
“সামু, তুই?”
সামিয়া ভেতরের কষ্ট চেপে রেখে কণ্ঠ স্থির করার চেষ্টা করল।
“হ্যাঁ আপু। পিয়াস ভাইয়াকে আমি মেনে নিয়েছি। উনি ভালো ছেলে। উনি আমাকে বোঝে। উনি আমার পড়াশোনা, স্বপ্ন—সব চালিয়ে যেতে দেবে।”
রুমা বেগম তৃপ্তির হাসি দিলেন।
“দেখলে তো? ওর মুখ থেকেই শুনলে সবাই?”
কিন্তু শেরাজ গম্ভীর মুখে সামিয়ার দিকে তাকাল।
“শালিকা, তুমি সত্যিই মন থেকে চাও? নাকি কাউকে খুশি করার জন্য বলছো?”
সামিয়া মুহূর্তখানেক থমকালো। চোখ নামিয়ে নিল সে। ঠোঁট কেঁপে উঠল তার, কিন্তু আবার জোর করে মাথা তুলে বলল,
“আমি মন থেকেই চাই।”
টেবিল জুড়ে আবার নিস্তব্ধতা। শুধু রাহিনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। সে গ্লাস নামিয়ে ধীরে ধীরে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমার একটা কল করার আছে, আমি যাচ্ছি।”
রাহিনের চোখ নামানো, কিন্তু ভেতরের ভাঙচুর সবাই টের পাচ্ছে। সে চুপচাপ টেবিল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।
সুমুর চোখ ভিজে গেল। সে তাকিয়ে দেখল, সামিয়া, রাহিনের এতক্ষণ বসে থাকা চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে আছে— যেন কথাগুলো বলেছে ঠোঁটে, কিন্তু হৃদয়ের ভেতরটা এখনো কাঁদছে।
ডাইনিং টেবিলে হঠাৎ যেন খাবারের স্বাদ হারিয়ে গেল। সবাই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নেই। হাসি বেগম জোর করে হাসি আনতে চাইলেন মুখে।
“চলো, সবাই খাও। এত কথা বললে খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।”
কেউ জবাব দিল না। শুধু চামচের শব্দ টুংটাং করে ভেসে আসছে। সামিয়া চুপচাপ তাকিয়ে রইল। তার হাত কাঁপছে সামান্য, কিন্তু ঠোঁটে কোনো কথা নেই। সুমু তাকে গভীর দৃষ্টিতে দেখছে— স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ওর বোনের ঠোঁটের কথা আর চোখের ভাষা মেলে না। কিছুক্ষণ পর, সামিয়া আস্তে করে বলল,
“আম্মু, আমি রুমে যাচ্ছি!”
কেউ কিছু বলল না। সামিয়ার পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল করিডরে। রাহিন আগেই বেরিয়ে গেছে। বাইরে বাগানে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। মুঠি শক্ত করে ধরে আছে নিজের হাত। তার ঠোঁট ফেটে বেরিয়ে এলো চাপা শব্দ,
“মন থেকে চাই? যদি মন থেকে চাইত, তবে চোখে এতো ব্যথা থাকত না”, একটু থেমে রাহিন আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে বলল, “ভালোবাসা যদি নাই পাই, তবে কেন এভাবে ওর নাম খোদাই করা আমার নিঃশ্বাসে?”
•
সুমু নিজের রুমে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করল। শেরাজ পেছনে এসে দাঁড়াল, কিন্তু কিছু বলল না। সুমু ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলল,
“আমার বোনকে আমি হারাচ্ছি, খান সাহেব। ওর হাসির আড়ালে কষ্ট লুকানো যাচ্ছে না।”
শেরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“কিছু কিছু সত্যি মানুষ জোর করেই সবটা লুকায়, সুইটহার্ট। হয়তো সামিয়া এখন নিজের মনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আমরা যদি এখন কিছু করি, তাহলে সবটা এলোমেলো হয়ে যাবে। তুমি একটু ধৈর্য্য ধরো, সবটা ঠিক করে দিব আমি।”
সুমু চোখ মুছে নিয়ে বলল,
“কিন্তু আমি চুপ করে থাকতে পারব না। এবার আমিই সামিয়ার সত্যিটা শুনব।”
শেরাজ সুমুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“এতো চাপ নিওনা। আমি আছি তো।”
সুমু আস্তে মাথা নেড়ে শেরাজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। শেরাজের টি-শার্টের ওপর গড়িয়ে পড়ল সুমুর চোখের পানি। সে আলতো করে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
•
সামিয়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে অশ্রু চিকচিক করছে, কিন্তু মুখে একটা হাসি টেনে সে বলছে নিজের প্রতিফলনকে,
“হ্যাঁ, আমি মন থেকে চাই, তাই তো?”
কিন্তু তার ভেতর থেকে উত্তর ভেসে এলো,
“না সামিয়া, তুই মিথ্যে বলছিস। তুই রাহিনকেই ভালোবাসিস।”
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সামিয়া ভেঙে পড়ল। সে কাঁদতে কাঁদতে মেঝের ওপর বসে পড়ল। তার বুক ফেটে বেরিয়ে এলো আর্তনাদ,
“আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমি হারাচ্ছি— যেটা আমি সবচেয়ে বেশি চাই, সেটাই হারাচ্ছি আমি। আমার ভালোবাসা আমার হয়েও আমার নয়। সে আমার, কিন্তু আমি তাকে পাবো না। আমি শুধু হারাচ্ছি, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি নিঃশ্বাস, শুধু যন্ত্রণার মধ্যে আমি তাকে হারিয়ে ফেলছি।”
হঠাৎ সামিয়া ফোন থেকে রাহিনের একটা ছবি বের করে বলল,
“তোমাকে চেয়েছিলাম জীবনসঙ্গী হিসেবে, অথচ ভাগ্য আমাকে ঠেলে দিচ্ছে অন্য কারও পাশে। তুমি ছাড়া বিয়ে করতে বসা মানে যেন নিজের কবরের ওপর বসা। আমি জানি তুমি কষ্ট পাচ্ছো, অথচ আমি কিছুই করতে পারছি না। এ অসহায়তাই আমাকে মেরে ফেলছে”, সামিয়া একটু থেমে আবারও অভিযোগ করে বলল,
“কেন আমাকে এভাবে ভেঙে দিলে, আল্লাহ? যাকে প্রাণ ভরে ভালোবাসলাম, তার হাতটা ধরতে পারব না। যে ছেলেটার চোখে আমি আমার সুখ খুঁজেছিলাম, তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক হবে না। আমার বিয়ে হবে অন্য কারও সাথে, অথচ হৃদয়টা যে পড়ে আছে ওই মানুষটার কাছে। আমি কীভাবে বাঁচব? কীভাবে হাসব? হাসি তো সাজাতে পারব সবার সামনে, কিন্তু বুকের ভেতর এই রক্তক্ষরণ কীভাবে থামাব?”
সে মাথা নীচু করে কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“হয়তো সবাই আমাকে বউ সাজিয়ে অন্যের হাতে তুলে দেবে, কিন্তু আসল আমি তো আজ থেকেই মরে যাচ্ছি। ভালোবাসা যদি এভাবে অবহেলিত হয়, তবে কেন জন্ম দিলা আমার বুকে এই অকারণ অনুভূতি? সে তো শুধু আমার ছিল, তবু কেন হলো না আমার? আমি তো তার জন্য বউ সাজতে চেয়েছিলাম, তবে কেন আমাকে বউ সেজে কাফনের বেশে অন্যের হাত ধরতে হবে। আজ আমার মনে হচ্ছে, কাফনের কাপড় সবসময় সাদা হয় না, কাফনের কাপড় কখনও কখনও বেনারসির লাল রঙেও হয়ে থাকে।”
ঘরটা ভরে উঠল তার কান্নার শব্দে। জানালার ওপাশে হাওয়া বয়ে যায়, কিন্তু সামিয়ার ভেতরের ঝড়টা থামাতে পারে না। হঠাৎ সামিয়ার রুমে নক পড়ল। নাজমিন একটানা ডেকে যাচ্ছে তাকে। সামিয়া ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে-মুখে পানি দিয়ে এসে দরজা খুলে দিল। নাজমিন ভেতরে ঢুকে দরজা লক করে দিয়ে বলল,
“রাহিন ভাইয়াকে তুই ভালোবাসিস। তাহলে নিচে কেন বললি, তুই এই বিয়েতে রাজি? তুই তো এই বিয়েতে রাজি নস।”
সামিয়া তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“কেন তোরা খুশি নস? তোরা তো এইটাই চাস। পিয়াস ভাইয়ার পাওয়ার আছে। তোর ধারণা, আমাকে না পেলে, সে হয়তো সবাই জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়াবে। দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হবে। ফারিয়া আপু আর শাহরুখ ভাইয়ার বিয়েতে সমস্যা হবে— এসব তো তোরাই বললি। আমার বড় আপুর বিয়েতে ঝামেলা হয়েছে, এখন আমিও এমন করলে, পাড়ায় আমাদের বদনাম হবে— এসব তো তোদের কথা।”
“আমি বলেছিলাম, সামু। কিন্তু আমি চাই, তুই যাকে ভালোবাসিস তাকেই যেন পাস। ওসব আমি বলেছিলাম কারণ, আমি চেয়েছিলাম যেকোন ডিসিশন নেবার আগে তুই অন্তত ভেবে নিস।”
“এখন তো ভেবেই ডিসিশন নিয়েছি। তাহলে এসব কেন বলছিস?”
“সামু, পিয়াস ভাইয়া তোকে ভালোবাসে। রাহিন ভাইয়াও তোকে ভালোবাসে। আর তুইও রাহিন ভাইয়াকে ভালোবাসিস। পিয়াস ভাইয়া যেমন তোর সবসময় খেয়াল রাখত। রাহিন ভাইয়াও কিন্তু তোর পেছনে লোক রেখে তোর খবর রেখেছে। প্রতিদিন তোর খোঁজ খবর নিয়েছে। একদিন তোকে ফোনে না পেলে, সে কেমন পাগলামি করত, তুই না জানলেও আমি জানি।”
সামিয়া হঠাৎ চুপ করে গেল। চোখের পলক ফেলছে না, যেন কান্না আটকে রাখছে। নাজমিন তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“তুই ভাবছিস তুই একা কষ্ট পাচ্ছিস? রাহিন ভাইয়া প্রতিদিন মরে যাচ্ছে তোকে না পেয়ে। তোর হাসি না দেখলে ওনার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়। তোরা দু’জন দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে, অথচ মন একে অপরের কাছে বাঁধা। তুই যদি জোর করে এই বিয়েতে হ্যাঁ বলিস, তাহলে শুধু নিজের না, ওনার জীবনটাও শেষ করে দিবি।”
সামিয়া তাচ্ছিল্যের হাসি দিলেও চোখ ভিজে উঠল। সে আস্তে করে বলল,
“তুই কি বুঝিস না, নাজমিন? ভালোবাসা থাকলেই সব পাওয়া যায় না। দায়িত্ব, সম্পর্ক, সমাজ—সবকিছু বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। আমি জানি রাহিন ভাইয়া আমায় ভালোবাসে। আমিও তাকে ছাড়া কিছুর কথা ভাবতেই পারি না। কিন্তু, আমি যদি না মানি, তাহলে শুধু আমার নয়, পুরো পরিবারের অপমান হবে। আমার বড় আপুর বিয়েতে যেমন ঝামেলা হয়েছিল, এবার যদি আমার ক্ষেত্রেও হয়? আমার আম্মু কেমন করে তা সহ্য করবে?”
নাজমিন চোখ মুছে বলল,
“কথাগুলো আমাকে শোনালি? সেদিন আমি এসব বলেছিলাম বলে, আজ আমাকে সবটা ফেরত দিলি? কিন্তু সামু, তোর মায়ের সম্মান আর সমাজের ভয় কি তোর সুখের চেয়ে বড়? তুই কি সারাজীবন একটা মুখোশ পরে কাটাবি? পিয়াস ভাইয়ার সাথে বিয়ে হলে হয়তো সবাই বাহবা দেবে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তুই যে মরবি— ওরা কি সেটা দেখবে?”
সামিয়া ভেঙে পড়ল। সে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। বুক ভেঙে কান্নার স্রোত বেরোতে লাগল।
“আমি পারছি না, নাজমিন। আমি প্রতিদিন মরছি। রাহিন ভাইয়া ছাড়া প্রতিটা মুহূর্ত নিঃশ্বাস নেওয়া যেন শ্বাসরুদ্ধকর। কিন্তু আমি কারো কাছে সেটা বলতে পারছি না। আমার মনের কথা, আমার কষ্ট—কেউ বোঝে না। এমনকি আম্মুও না।”
নাজমিন, সামিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“আমি বুঝি সামু, আমি বুঝি। তুই যদি একবার সাহস করে নিজের মনের কথা বলিস, হয়তো সবকিছু বদলে যেতে পারে। তুই ভাবছিস ভাগ্য তোকে ঠেলে দিয়েছে, কিন্তু আসলে তুই নিজেই নিজেকে ঠেলে দিচ্ছিস অতল গহ্বরে।”
সামিয়া মাথা তুলে তাকাল।
“তুই বলছিস আমি যদি এখনও নিজের মনের কথা সবাইকে জানাই, কিছু বদলাতে পারে?”
নাজমিন দৃঢ় স্বরে বলল,
“হ্যাঁ সামু! তুই যদি সত্যিই রাহিন ভাইয়াকে ভালোবাসিস, তাহলে এই সময়টাই তোর শেষ সুযোগ। না হলে কাল হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।”
সামিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখে অশ্রু চিকচিক করছে। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না। একটু সময় নিয়ে সে আবারও হেসে বলল,
“বাদ দে।! তোর সমস্যা কোথায়, আমি খারাপ থাকলে? সেদিন তুই, তোরা সবাই আমাকে যা যা বলেছিস, আমি সবটা মেনে নিয়েছি। নাউ, প্লিজ যা।”
নাজমিন তার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,
“সামু, ভালোবাসা লুকিয়ে রাখলে সেটা অভিশাপে পরিণত হয়। তুই ভাবছিস তুই ত্যাগ করছিস, কিন্তু আসলে তুই তিনটা জীবন ধ্বংস করে দিচ্ছিস—তোরটা, রাহিন ভাইয়ারটা আর পিয়াস ভাইয়ারটা।”
সামিয়ার বুক ভেঙে আসছে, তবু সে ঠোঁটে জোর করে হাসি টেনে বলল,
“কিন্তু নাজমিন, সবকিছু কি ভালোবাসার উপর দাঁড়িয়ে থাকে? দায়িত্ব, সমাজ, পরিবারের ইজ্জত—এগুলোও তো আছে। আমি যদি নিজের ভালোবাসা দাবি করি, তাহলে অনেক সম্পর্ক ভেঙে যাবে।”
“সম্পর্ক ভাঙবে যদি মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে থাকে। তুই কি চাস, পিয়াস ভাইয়া সারাজীবন এমন একজন মেয়েকে পাশে পাক, যার হৃদয় অন্য কারও কাছে পড়ে আছে? এটা তো ওনার জন্যও অবিচার।”
সামিয়ার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে বিছানার কিনারায় বসে পড়ল, বুক চেপে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“আমি জানি, রাহিন ভাইয়াকে ছাড়া আমি বাঁচব না। প্রতিটা নিশ্বাসে আমি তাকে খুঁজি। কিন্তু আম্মু, আমার আম্মু যদি আমার মুখ থেকে এই কথা শুনে ভেঙে পড়ে? তার চোখের পানি আমি দেখতে পারব না । আমি তার অবাধ্য হতে পারব না।”
নাজমিন আস্তে করে সামিয়ার মুখ দু’হাতে তুলে চোখে চোখ রাখল।
“তোর মা তোর কষ্টটা দেখতে পারছে না, সামু। তুই যদি আজ নিজে থেকে সত্যিটা না বলিস, তবে ভবিষ্যতে একদিন তোর মা-ও বুঝবে, যে তুই শুধু হাসিমুখে সাজানো একটা লাশ ছিলি। তুই কি সেই লাশ হয়ে বাঁচতে চাস?”
“রাহিন ভাইয়াকে আমি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি, কিন্তু মুখ ফুটে বললেই যদি সবকিছু হয়তো শেষ হয়ে যাবে— এইটাই সবাই বলছে। কিন্তু কেউ ভাবল না, আমি কীভাবে বাঁচব।”
“বেঁচে থাকার একটাই পথ আছে সামু—সত্যি বলা। তুই যদি এখনো রাহিন ভাইয়াকে চাস, তবে কালকের আগেই, সবাইকে জানিয়ে দিতে হবে। না হলে সত্যি খুব দেরি হয়ে যাবে।”
সামিয়া চোখের পানি মুছে বলল,
“তোর তো শাহরুখ ভাইয়া আর ফারিয়া আপুর কথা ভাবা উচিত। হঠাৎ আমাকে নিয়ে এতো ভাবছিস কেন?”
নাজমিন, সামিয়ার পাশে বসে বলল,
“সেদিন আমি জানতাম না, তুই রাহিন ভাইয়াকে ভালোবাসিস। আমি সবসময় রাহিন ভাইয়াকে তোর জন্য পাগলামি করতে দেখেছি, কিন্তু তোর মধ্যে এমন কিছু দেখেনি। সেদিন যখন কাকিমনি ফুপির সাথে ফোনে কথা বলছিল, আমি সবটা শুনে খুব খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু সেইরাতেই যখন তোকে কাকিমনি এই ব্যাপারে সবটা বলল, আর তুই অমত করতে শুরু করলি, তখন আমি ভেবেছিলাম তুই হয়তো তোর পড়াশোনার জন্য অমিত করছিস। তাই কাকিমনি তোকে ওসব বলে বোঝানোর সময়, আমিও তোকে বোঝাচ্ছিলাম। কিন্তু সেদিন গভীর রাতে যখন কারো কান্না আর আর্তনাদ শুনে আমার ঘুম ভেঙে গেল, তখন আমি আমার ভুলটা বুঝতে পেরেছিলাম।”
সামিয়ার ঠোঁটে জোর করে টানা হাসিটা এমন ছিল, যেন নিজের বুকের ভেতরের রক্তক্ষরণ ঢাকতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। নাজমিন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। সামিয়া আস্তে করে বলল,
“বাদ দে! এই ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই। আমি বা রাহিন ভাইয়া—আমরা তো কেউ কোনোদিন কাউকে ভালোবাসি বলিনি। ভালোবাসায় যদি এতটাই নীরব থেকে যায়, তবে সেটা দাবি করার অধিকারও নেই।”
নাজমিন তাকিয়ে রইল। সামিয়া আবারও বলল,
“দয়া করে তুই এখন যা। আমি একটু ঘুমাতে চাই।”
এ কথা বলে সামিয়া মাথা নামিয়ে নিল। চোখের কোণ বেয়ে আবারও পানি ঝরে পড়তে লাগল। সে বালিশ টেনে মুখ ঢেকে দিল, যেন কান্নার শব্দ কারো কানে না যায়।
নাজমিন নিঃশব্দে বসে রইল কিছুক্ষণ। তার বুকের ভেতরেও কষ্ট জমে উঠল, কিন্তু সে কিছু বলল না। সামিয়ার মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে আস্তে করে উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে গিয়েও একবার পেছন ফিরে তাকাল— দেখল, একটা ভেঙে পড়া মেয়ে, যে নিজের ভালোবাসা অস্বীকার করে, নিজের জীবনকে ধীরে ধীরে অন্ধকারের গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল সে। ঘর ভরে রইল সামিয়ার কান্নার শব্দে।
•
ডাইনিং টেবিলে দুপুরের খাবারের আয়োজন জমকালো হলেও, সবার চোখে-মুখে একধরনের অস্বস্তি ছড়িয়ে আছে। পরিবেশটা অদ্ভুত রকমের ভারী। রুমা বেগম খাবার পরিবেশন করতে করতে চারদিকে তাকিয়ে বললেন,
“সামিয়া কোথায়? খেতে এলো না?”
হাসি বেগম গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন,
“ও একটু ক্লান্ত, বিশ্রাম নিচ্ছে।”
কেউ আর কোনো প্রশ্ন করল না, কিন্তু টেবিলের নিস্তব্ধতা অনেক কিছু বলে দিচ্ছিল। শেরাজ চামচ নামিয়ে বলল,
“সবার মুখ এমন গম্ভীর কেন?”
আইয়ুব হালকা হাসি টেনে বলল,
“সবাই মনে হয় কথার ডায়েট শুরু করেছে, তাই কেউ কথা বলছে না আজ।”
আইয়ুবের কথা শোনার পর হালকা হাসাহাসি উঠলেও মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। হঠাৎ সারবাজ গ্লাস নামিয়ে বলল,
“সবাই চেষ্টা করছে, কিন্তু মন খুলে হাসতে পারছে না।”
তার কথা শুনে সবাই থমকে গেল। ফাহিম তাকাল রাহিনের দিকে। রাহিন খাচ্ছে না। সে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। তার আঙুল অন্যমনস্কভাবে টেবিলে ছন্দ তুলছে। রিসান পরিবেশ হালকা করার চেষ্টা করে বলল,
“আচ্ছা, এভাবে চুপচাপ খেলে খাবারের স্বাদ নষ্ট হয়ে যাবে। কাল আমরা একসাথে বিয়ের শপিংয়ে যাচ্ছি, আমাদের তো খুশি হওয়ার কথা।”
এই কথার পর টেবিলে আবারও এক অদৃশ্য চাপা অস্বস্তি নেমে এলো। সামিয়ার অনুপস্থিতি, আর রাহিনের অদৃশ্য কষ্ট যেন সকলে টের পাচ্ছিল। স্যান্ডি খেতে খেতে হঠাৎ উঠে গেল। কিছুক্ষণ পর এসে আবারও চেয়ারে বসে চাপাস্বরে শেরাজকে কিছু একটা বলল। শেরাজ একটু বাঁকা হেসে রুমা বেগম আর হাসি বেগমের উদ্দেশ্যে বলল,
“বড়মা আর আম্মু! আপনাদের একটা কথা বলতে চাই।”
সকলে কৌতুহলবশত তাকাল শেরাজের দিকে। শেরাজ একটু সময় নিয়ে বলল,
“আজ সন্ধ্যায় এই বাড়িতে আমার চারজন গেস্ট আসবে। আর তারা হয়তো কিছুদিন থাকবে এখানে।”
শেরাজ কথাটা বলতেই টেবিলে আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সকলে অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
রুমা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,
“কারা আসছে, বাবা?”
শেরাজ হালকা রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল,
“এখনই সব বলে দিলে মজা নষ্ট হয়ে যাবে, বড়মা।”
আইয়ুব কাটাচামচ ঘুরাতে ঘুরাতে মজা করে বলল,
“কি রে, বিয়ের আগে আবার নতুন সারপ্রাইজ নাকি?”
শেরাজ শুধু হালকা হেসে মাথা নেড়ে দিল। সুমু পাশ থেকে চাপাস্বরে বলল,
“কারা আসবে?”
“পরে জানতে পারবে, সুইটহার্ট!”
সুমু আর কথা বাড়াল না। শেরাজ আবারও বলল,
“তো বড়মা! তারা এখানে কিছুদিন থাকলে কোন আপত্তি নেই তো আপনাদের?”
রুমা বেগম চুপচাপ কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর হালকা হাসি দিয়ে বললেন,
“আপত্তি কীসের, বাবা? বাড়িতে বিয়ে, নতুন মেহমান এলে আমাদের ভালো লাগবে।”
শেরাজ মাথা নাড়ল। সবার চোখে মুখে হালকা উত্তেজনার ছোঁয়া। ডাইনিং টেবিলটা যেন আজ সন্ধ্যার নতুন গেস্টদের অপেক্ষায়।
◆◆ঘড়ির কাঁটায় সন্ধ্যা ছয়টা। রাহিন একা ছাদে দাঁড়িয়ে। শেরাজের গেস্টরা এখনো এসে পৌঁছায় নি, তাই বাকি সবাই গেস্টদের অপেক্ষায় এখন ড্রয়িংরুমে। বেশি মানুষজন রাহিনের এখন ভালো লাগছে না। তাই সে ছাদে একা দাঁড়িয়ে। তার চোখে অশ্রু, বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে। সে নিজের প্রতি, ভাগ্যের প্রতি, এমনকি পৃথিবীর প্রতি কড়া অভিযোগ জড়ো করছে।
“কেন এমন হলো? কেন আমার জীবনকে এতো কষ্টে ভরা হলো? আমি শুধু চাইছি আমার পিচ্চিটার সঙ্গে থাকব। কিন্তু কেন সবকিছু আমাকে তার থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে? আল্লাহ তুমি দেখছ, আমি কি ভুল করেছি? আমি কি কখনও কাউকে আঘাত দিয়েছি? তবুও কেন আমার ভালোবাসার থেকে আমাকে আলাদা হতে হবে?” সে রেলিং চেপে ধরে আবারও বলল, “আমি সবসময় চেষ্টা করেছি সত্যির সঙ্গে থাকার, নিষ্ঠার সঙ্গে বাঁচার। কিন্তু কেন আমার ভালোবাসা এতো অমীমাংসিত? কেন সে আমার নয়? আমার জীবনের প্রতিটা অংশ তার জন্য তৈরি। আমি চাইছি তার কাছে যাব, শুধু একবার। কিন্তু পারছি না। কোন পাপের শাস্তিস্বরূপ তাকে আমার থেকে কেড়ে নিচ্ছো?”
সে মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকাল।
“আমি তার কাছে যেতে চাই, তার হাতে হাত রাখতে চাই, তার চোখে চোখ রাখতে চাই। তাকে ভালোবাসি বলতে চাই। কিন্তু পারছি না। আমি কি এতই অপরাধী? আমি কি তাকে যথেষ্ট ভালোবাসি নি? আমি কি তাকে সুখ দিতে পারব না? কেন আল্লাহ, কেন আমার হৃদয়ের সমস্ত আশা শেষ হয়ে যাচ্ছে? আমি কি তার জন্য যথেষ্ট নই? আল্লাহ, কেন আমাকে এতো কষ্টে ফেলে দিলে? আমার ভালোবাসার পৃথিবীটা কেন এতো নিষ্ঠুর?”
সে হাঁটুমুড়ে বসে পড়ল ছাদের ওপর। ধীরে বলল,
“আমার পিচ্চি অন্যকারো হয়ে যাবে, অন্য কারো জন্য বউ সাজবে, অন্য কেউ তাকে স্পর্শ করবে, অন্য কারো বুকে মাথা রাখবে, আর আমি বেঁচে থেকে কীভাবে এসব সহ্য করব? নিজের প্রিয় মানুষটাকে অন্য কারো পাশে কীভাবে মেনে নিব?”
হঠাৎ অমিত ছাদে এলো। সে রাহিনের কাছে এগিয়ে পাশে বসে হালকা কণ্ঠে বলল,
“এখানে বসে কষ্ট না পেয়ে, নিচে চল। এস.কের গেস্টরা এসে গেছে। আর দশ মিনিটের মধ্যে তারা এই বাড়িতে ঢুকবে। এস.কে নিচে যেতে বলেছে। আর তুই কী বোকা? এভাবে ভেঙে পড়েছিস কেন? এস.কে কখনোই সামিয়ার বিয়ে পিয়াসের সাথে হতে দিবে না। এখন চল ভাই।”
রাহিন ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“ভালো লাগছে না।”
অমিত তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“আমি জানি, কিন্তু বিশ্বাস রাখ। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
রাহিন সম্মতি জানাল। অমিত রাহিনকে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। দুজনে ধীরে ধীরে ছাদ থেকে নেমে গেল।
•
ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা আগে থেকেই একটু ভারী। সবাই খোলামেলা হাসি বা কথা বলছে না। সকলে গেস্টদের অপেক্ষায়। অমিত আর রাহিন এসে বসল। হঠাৎ বাইরে গাড়ি থামার শব্দ শোনা গেল। সবাই চুপচাপ বাড়ির দরজায় দিকে তাকাল।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই শেখবাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল স্যান্ডি। তার পেছনে ধীরে-ধীরে ঢুকে এলো রায়য়ান চৌধুরী, আরিয়ান চৌধুরী, রোজা চৌধুরী আর আলিশা।
ড্রয়িংরুমে সবাই তাদের দিকে তাকাল। মুহূর্তেই অবাক হয়ে গেল সকলে। চোখ বড় করে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে সবাই। আইয়ুব, নিহাল, সাইফ, অমিত, সারবাজ, আরবাজ, রিয়াদ, ফাহিম, রাহিন, রিসান, শাহরুখ একসাথে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অবাক হলো সুমু। তার চোখ বড় হয়ে গেল। সে এতক্ষণ বসে আইসক্রিম খাচ্ছিল। তার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। বুকের ভেতর একধরনের অদ্ভুত উত্তেজনা আর কৌতূহল মিশ্রিত হয়ে ধক করে উঠল। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। শেরাজের ঠোঁটে তখন রহস্যময় একটি হাসি। সে বাঁকা হেসে তাকিয়ে আছে রায়য়ানদের দিকে। সুমু অবাক চোখে শেরাজের দিকে তাকিয়ে আছে। আলিশা দৌড়ে এসে সুমুকে জড়িয়ে ধরল। সুমু প্রথমে হকচকিয়ে গেল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে আলিশাকে জড়িয়ে ধরল। শামীম সাহেব, সাখাওয়াত সাহেব, হাসি বেগম আর রুমা বেগম হাসিমুখে রায়য়ানদের গ্রহণ করে নিল।
চলবে..?
#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_67 ✦ দ্বিতীয় অংশ ✦
রাত নেমেছে। ড্রয়িংরুমের বাতি হালকা আলো ছড়াচ্ছে। বাইরে কোলাহলের ছুটি। সব কিছু যেন শান্ত, কিন্তু ভেতরে মনে হচ্ছে আবেগের ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
সুমু একা বসে আছে রুমের সোফায়। চোখে এখনও সন্ধ্যার বিস্ময় ও অবাক হওয়া মিশে আছে। বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত উত্তেজনা আর নিঃশ্বাসের তাড়না। সে বাইরে থেকে ভেঙে পড়লেও নিজের মনকে সামলানোর চেষ্টা করছে।
হঠাৎ দরজা খুলে শেরাজ প্রবেশ করল। সুমু তার দিকে তাকাল, কিন্তু কোন কথা বলল না। সে শান্তভাবে শুয়ে পড়ল, যেন নিজের ভেতরের অনুভূতি লুকানোর চেষ্টা করছে। শেরাজ ধীরে এগিয়ে এসে সুমুর পাশে বসল। সে হাত বাড়াল, কিন্তু সরাসরি স্পর্শ করল না। কেবল চুপচাপ সুমুর দিকে তাকিয়ে রইল।
সুমু চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিল। মনে হচ্ছে, শেরাজের উপস্থিতি শুধু তাকে শান্ত করছে না, বরং তার হৃদয়ের প্রতিটা অংশে একটা অদ্ভুত কম্পন ঘটাচ্ছে। শেরাজ ধীরে বলল,
“সুইটহার্ট! তুমি আজকের জন্য খুশি না, তাই না?”
সুমু কিছু না বলে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। শেরাজ ধীরে হাত বাড়িয়ে সুমুর চুলের ওপর হালকা আঙুল বুলালো। সুমু নড়ে উঠল, কিন্তু কোন কথা বলল না। মুহূর্তটা নিস্তব্ধ, শুধু তাদের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। শেরাজ একটু কাছাকাছি ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
“কথা বলবে না?”
সুমু চোখ বন্ধ করে ধীরে বলল,
“আপনার সাথে আর কথা বলব না।”
শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“কথা বলো, নয়তো আজ রাতে তোমার সাইলেন্ট ভায়োলেন্স আমি বদলে দিবো।”
সুমু রাগ করে উঠে গেল। শেরাজ সুমুকে টেনে নিজের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“নারাজ হো তুম,
পার মে তুমহারি পাস আয়ু,
এক মুসকান সে,
সাব গাম মিটা দু!”
সুমু রাগ দেখিয়ে বলল,
“ছাড়ুন আমাকে! আমার মেজাজ খারাপ, আর আপনি এখানে বসে বসে শায়েরি বলছেন? ওদেরকে কেন এনেছেন আপনি? আরিয়ানকে আপনি জানেন না? ও আমার সাথে কতটা খারাপ করেছিল ভুলে গেছেন? আর রোজা? রোজাকে কেন আনলেন? ভালো লাগছিল না নাকি রোজাকে ছাড়া? তাহলে রোজার কাছে যান। আমার কাছে কি? আমাকে ছাড়ুন! আমাকে ছোঁবেন না আপনি? আপনি জাস্ট অসহ্য। আমাকে ছাড়ুন। রোজার কাছে যান। আমি…”
শেরাজ সুমুর ঠোঁটে ঠোঁট মেশালো। সুমু দু’হাতে শেরাজকে সরানোর চেষ্টা করল। শেরাজ আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিল সুমুকে। কিছু সময় যেতেই শেরাজ সুমুকে ছেড়ে দিল। ছাড়া পেতেই সুমু আবারও বলল,
“সরুন আপনি! আমার বিরক্ত লাগছে সবকিছু। এমনিতেই টেনশনে আছি। আপনি আরও টেনশন এনে দিলেন। আপনি…”
শেরাজ আবারও সুমুর ঠোঁটে ঠোঁট মেশালো। এবার আরও দীর্ঘ আর গভীর হলো তার ছোঁয়া। কিছু সময় পর শেরাজ ছেড়ে দিল সুমুকে। সুমু জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে শেরাজের বুকের ওপর ঢলে পড়ল। শেরাজ ধীরে ধীরে সুমুর চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে এক অদ্ভুত কোমলতা, কিন্তু সেই সাথে একচ্ছত্র অধিকারবোধ।
“সুইটহার্ট! তুমি রাগ করেছ, আমি জানি। কিন্তু আমাকে একটু সময় দাও। আমি শুধু চাই তোমার পাশে থাকতে, সবকিছু ঠিক করতে।”
সুমু হালকা কাঁপতে কাঁপতে পিছনে সরে গেল। কিন্তু শেরাজ তার হাত ধরে আবারও কাছে টেনে আনল।
“আমি জানি, আজকের ঘটনা তোমার জন্য সহজ নয়। ওদের এখানে আসাটা তোমার পছন্দ হয়নি। কিন্তু এখন কিছু করার নেই, সুইটহার্ট। ওরা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”
সুমু চোখ বুঁজে ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছে। তার বুকের ভেতর ঝড়ের মতো অনুভূতি। সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল, কিন্তু শেরাজের কোমলতা ও শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরার ছোঁয়া তাকে আর প্রতিহত করতে পারল না।
“রাগ করে না, বউ। আমি কখনও তোমাকে আঘাত দেব না। আমি শুধু চাই তুমি শান্ত হও, তোমার সব দুঃখ, সব চিন্তা ভুলে যাও।”
সুমু চোখ খুলে শেরাজের দিকে তাকাল। মুহূর্তে চোখে অশ্রু জমল তার। শেরাজ ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে সুমুর চুলের ওপর হালকা আঙুল বুলালো। সে ধীরে মাথা নিচু করে সুমুর কপালে ঠোঁট রাখল। অল্প মৃদু, কোমল চুম্বন—যার মধ্যে লুকানো যত্ন, সুরক্ষা আর গভীর ভালোবাসা। সুমু তার হাত শেরাজের কাঁধে রাখল। তার শরীরের প্রতিটা কোণ যেন শেরাজের ছোঁয়ায় জেগে উঠল। চোখ বন্ধ রেখে সে অনুভব করল, শেরাজ শুধু তার পাশে নেই, তার হৃদয়ও তার সঙ্গে মিলেছে। শেরাজ ধীরে সুমুর চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে শুধু প্রেম আর কোমলতা, আরেকদিকে অদম্য অধিকারবোধ।
“আমি তোমাকে কখনো ছেড়ে যাব না, সুইটহার্ট। তুমি আমার সব।”
শেরাজের কণ্ঠে এমন মৃদু আবেগ, যা সুমুর অন্তর থেকে সব ভয় ও দুঃখ মুছে দিচ্ছিল। সুমু হালকা হাসি দিয়ে চোখ মেলে তাকাল। সে ধীরে তার হাত শেরাজের হাতে রাখল। দুই হাত একে অপরকে স্পর্শ করল—শুধু স্পর্শ নয়, তাদের হৃদয়ের নিঃশব্দ কথাবার্তা, ভালোবাসার অদ্ভুত সংলাপ যেন এই স্পর্শে মধ্য দিয়ে শুরু হলো।
•
পরের দিন সকালে সূর্যের হালকা রোদ যেন নতুন উদ্দীপনা এনে দিয়েছে। সকলে একত্রিত হয়ে বিয়ের শপিং করার উদ্দেশ্যে বের হলো। সামিয়া, নাজমিন, ইনায়া, নাতাশা, ফারিন, ফারিয়া, আলিশা এক গাড়িতে উঠল। নিহাল, সাইফ, অমিত, রিয়াদ, ফাহিম, রাহিন, রিসান, স্যান্ডি এক গাড়িতে উঠল। সুমু, শেরাজ, ইশিতা, আরবাজ, আইয়ুব, সারবাজ এক গাড়িতে উঠল। আর পেছনের গাড়িতে উঠল আরিয়ান, রায়য়ান, রোজা। তাদের শপিংমল পযর্ন্ত নিয়ে যাবে পিয়াস।
গাড়ির মধ্যে হালকা চিৎকার, হাসি-তামাশা আর আগ্রহের আলোচনা। সবাই কী ধরনের পোশাক, গয়না বেছে নেবে—সেসব কিছু নিয়েই আলোচনা চলছে।
সুমুর মনে এখনো কৌতূহল। শেরাজ তার পাশে বসে ফোনে স্ত্রল করছে। গাড়ি চলছে নিজ গতিতে। সকলের ভেতর খুশির ঝলক।
শপিংমলে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই হালকা উত্তেজনা আর রঙিন আলোতে সবাই যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। মেয়েরা সরাসরি পোশাকের দোকানে ছুটল। সুমু, সামিয়া আর নাজমিন একসাথে শাড়ি, লেহেঙ্গা আর ড্রেস দেখছে। সুমু মাঝে মাঝে শেরাজের দিকে তাকিয়ে থাকে। শেরাজ হালকা হাসি দিয়ে তার পাশে বসে আছে। সে কোনো মন্তব্য করছেনা, শুধু সবকিছু চোখে চোখে রাখছে।
ফারিয়া আর ফারিন একসাথে গয়নার দোকানে ঢুকল। তারা হাতের আংটি, চুড়ি আর নেকলেস দেখে একে অপরকে পরামর্শ দিচ্ছে। নাতাশা মাঝে মাঝে সেলফি তুলে রাখছে, আর আলিশা তাদের সঙ্গে মজা করছে।
রাহিন সামনের দিকে হাঁটছে আর সামান্য দূরে বসে থাকা সামিয়ার দিকে নজর রাখছে। রায়য়ান আর আরিয়ানের এসবে কোন ইন্টারেস্ট নেই। তারা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে আছে।
কাপড়ের দোকানের ভিতরে রঙিন লেহেঙ্গার সামনে সামিয়া দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে এক অদ্ভুত খালি ভাব, মুখে দুঃখের ছায়া। পিয়াস তার পাশে দাঁড়িয়ে, চোখে উচ্ছ্বাস আর মুখে আনন্দের হাসি। সে সামিয়ার জন্য লেহেঙ্গা হাতে নিয়ে দেখছে, পরখ করছে, এবং সামিয়ার প্রতিটি ছোট ছোট প্রতিক্রিয়ার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। তবে সামিয়ার মধ্যে খুশি নেই। সে প্রতিটি লেহেঙ্গা দেখার সময়ে হালকা চোখে তাকাচ্ছে। কোনো আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে না সে। তার মন এখনো রাহিনের কথা ভাবছে। সে জানে, পিয়াসের সঙ্গে থাকার এই মুহূর্তগুলো তার মনে পুরোপুরি আনন্দ আনছে না, আর না কোনদিনও আনতে পারবে।
দোকানের এক প্রান্তে রাহিন দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে সে সমস্ত দৃশ্যটা নজরে রাখছে। পিয়াসের খুশি, সামিয়ার দূরত্বে দুঃখ—সব মিলিয়ে তার মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করছে। রাহিনের ব্যথা, বুকের ভেতরের হাহাকার তাকে শেষ করে দিচ্ছে।
আইয়ুব, নিহাল এবং সাইফরা দোকানের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে রাহিনকে লক্ষ্য করল। তারা রাহিনের কাছে এলো।
আইয়ুব বলল,
“দেখছিস তো, ভাই! সামিয়া এখন পিয়াসের সঙ্গে, কিন্তু মনটা সেখানে নেই।”
নিহাল বলল,
“ঠিক বলেছিস, ওর মধ্যে ব্যথা আছে। কিন্তু ও কিছু বলছে না, শুধু সহ্য করছে সব।”
সাইফ হালকা হাসি দিয়ে আইয়ুবকে চাপাস্বরে বলল,
“ভাই, ওর জন্য আমাদের কিছু করা দরকার। না হলে এই পরিস্থিতি ওর জন্য কঠিন হয়ে যাবে।”
রাহিন নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে। সে জানে, সামিয়ার মন খারাপকে দূর করতে, সে ছাড়া আর কেউ নেই। কিন্তু আজ, সে শুধু দূর থেকে দেখতে পারে, কাছে গিয়ে কিছু বলতে পারবে না।
ফারিয়া সামিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখ সামিয়া, এই লেহেঙ্গাগুলো কত সুন্দর। এইটার মধ্যে তুই একদম ঝলমল করবি। তোর পছন্দ হয়েছে কি?”
সামিয়া হালকা মাথা নেড়ে বলল,
“দেখছি!”
পিয়াস বলল,
“তুই দেখছিস না, সামু। এই লেহেঙ্গা একদম তোর জন্য তৈরি। শুধু তুই পরলেই বুঝতে পারবি, এইটা তোর জন্য পারফেক্ট।”
রাহিন সেই দূর থেকে সবটা দেখছে। সে নিজেকে ধীরে বলল,
“সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আইয়ুব রাহিনের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“চিন্তা করিস না, ভাই। সব ঠিক হয়ে যাবে। সামিয়া যতই মন খারাপ করুক। তোদের শেষটা সুন্দর হবে।”
রাহিন হালকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। সে বুঝতে পারল, মাঝে মাঝে দূর থেকে দেখা ও মনোযোগ রাখা, কাছাকাছি না থাকা, কিন্তু পাশে থাকার এই নীরব সমর্থনটাই অনেক বড় কিছু।”
নাতাশা, ইনায়ার সাথে সেকেন্ড থার্ড ফ্লোরে গিয়েছিল। নাতাশার হাতে অনেকগুলো টেডি বিয়ার। সে ঠিক করেছে এগুলো তার ম্যামকে দিবে। হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়াল স্যান্ডি। হাঁটার মাঝখানে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াতে পড়ে যেতে নিচ্ছিল নাতাশা। স্যান্ডি তাকে ধরে ফেলল। নাতাশা তার হাত ছাড়িয়ে নিল। শপিংমলের অভিজাত ফ্লোরে দু’জনের মুখোমুখি দাঁড়ানো। আশপাশে ঝলমলে আলো, মানুষজন ঘোরাঘুরি করছে। হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে উঠল পরিবেশ।
নাতাশা রাগে গলা উঁচু করে বলল,
“আপনি সব জায়গায় আমার পথে এসে দাঁড়ান কেন? আমাকে ছাড়া কি আর কাউকে চোখে পড়ে না আপনার?”
স্যান্ডি ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনি ভুলে যাচ্ছেন নাতাশা, এইটা পাবলিক প্লেস। আর শুনুন, আপনার সৌভাগ্য, যে আপনি সবসময় আমার সামনেই পড়েন।”
চারপাশের মানুষ থমকে তাকিয়ে আছে। দু’জনের গলার স্বর ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। নাতাশা দাঁত চেপে বলল,
“এ আসছে আমার কোথাকার কোন হিরো রে, তার সামনে পড়া নাকি সৌভাগ্যের ব্যাপার। লিসেন, আপনার এই দাম্ভিকতা একদিন আপনাকে ধ্বংস করবে। ভাবছেন সবাই আপনাকে পছন্দ করে? আসলে সবাই বিরক্ত হয়ে গেছে।”
স্যান্ডি হাসি চাপতে না পেরে বলল,
“ওহ প্লিজ, আমাকে পছন্দ না করলে মানুষ কেন আমার সঙ্গে থাকতে মরিয়া হয়? বরং আপনার কথায় করুণা হয়—আপনি এখনো আমার সমকক্ষ হতে পারেননি।”
“আপনি আমাকে অপমান করতে খুব ভালোবাসেন, তাই না? কিন্তু মনে রাখবেন, আমি নাতাশা। আমি কারো সমান হতে চাই না। আর আপনার মতো তো, নো ওয়ে।”
স্যান্ডি ভ্রু উঁচু করে তাকাল,
“চেষ্টাও করবেন না, প্লিজ। কারণ যা পারবেন না, তা চেষ্টা করে লাভ নেই।”
চারপাশে সকলে ওদের ঝগড়া শুনে হাসছে। কারো কারো মুখে বিস্ময়। গার্ডরা এগিয়ে এসে দু’জনকে দূরে সরাতে চেষ্টা করল। কিন্তু দু’জনের চোখে চোখ, যেন আগুনের লেলিহান শিখা। ইনায়া, নাতাশাকে সরাতে চাইল। কিন্তু সে আরও এগিয়ে এসে বলল,
“আমি আপনার মতো কৃত্রিম নই। আমি সত্যি মানুষ। আপনার মতো কৃত্রিম হাবার আমার কোন ইচ্ছা নেই।”
স্যান্ডি তেজ দেখিয়ে বলল,
“আর আমি আপনার মতো মাঝারি মানের নই। আমি এক্সক্লুসিভ। মনটাকে একটু বড় করুন। সবসময় ঝগড়া না করে, কখন অন্যকিছু করার চেষ্টা করুন।”
মুহূর্তে ছুটে এলো আইয়ুবরা। অমিত স্যান্ডিকে সরিয়ে নিয়ে বলল,
“এরা তো অলওয়েজ ঝগড়া করে, যেখানেই যায় কেলেঙ্কারি বাঁধায়।”
নাতাশা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“দেখেছেন? উনি আমাকে সবসময় অপমান করতে চান। আপনারা না আসলে উনি আমাকে আজকেই অপমান করে মাটিতে ফেলে দিতেন।”
স্যান্ডি কপাল কুঁচকে বলল,
“আপনি যেই নাটকবাজ, তাতে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিরও লজ্জা লাগবে। আমি কি আপনাকে ছুঁয়ে ফেলেছিলাম নাকি? বরং পড়তে যাচ্ছিলেন, আমি ধরেছিলাম।”
নাতাশা বিদ্রূপ করে বলল,
“ওহ! তাই নাকি? তাহলে তো আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত? দুঃখিত, আমি এতটা ভদ্র নই।”
স্যান্ডি একটু এগিয়ে এসে বলল,
“জানি, আপনি ভদ্রতা শিখেননি”
নাতাশা আরেক পা এগিয়ে এলো,
“আপনার অহংকার একদিন আপনাকে ভিখারি বানাবে। আর মনে রাখবেন, আমি আপনার মতো নই। আমি সবার নজরে আসার জন্য সার্কাস করি না।”
চারপাশের ভিড় আরও ঘন হয়ে গেল। ইনায়া উদ্বিগ্ন হয়ে নাতাশার হাত টেনে বলল,
“চলো না নাতাশা, এত লোকের সামনে এসব কেন করছ? লোকজন দেখছে আমাদের।”
কিন্তু নাতাশা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে স্যান্ডির চোখে চোখ রেখে বলল,
“আমি আপনাকে সোজা ভাষায় একবারে ক্লিয়ার করে দিচ্ছি, আমার পথের মধ্যে আর দাঁড়াবেন না।”
স্যান্ডি হেসে বলল,
“আর আমি আপনাকে বাঁকা ভাষায় ক্লিয়ার করে দিলাম, আমি যেখানে ইচ্ছে দাঁড়াব। আপনি থামাতে পারবেন না।”
অমিত, রাহিন, সারবাজরা, স্যান্ডিকে সরিয়ে নিয়ে গেল। অমিত বিরক্ত গলায় বলল,
“সান মামা! তোমাদের দুজনের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? মলজুড়ে তোমাদের ঝগড়া ছাড়া আর কিছু নেই।”
আইয়ুব হাসতে হাসতে সারবাজকে বলল,
“এদের আলাদা না করলে, শপিংমলটা জ্বালিয়ে দিবে।”
নাতাশা বুকের ভেতর জমে থাকা রাগে টেডিগুলো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশের লোকজন এখনো ফিসফিস করছে। কয়েকজন মোবাইলও বের করেছে, ভিডিও করতে চাইছে। নাতাশা কাঁপা গলায় রাগ চেপে বলল,
“আজ না হলে কাল, আমি আপনাকে আপনার জায়গা বুঝিয়ে দেব।”
স্যান্ডির তখন মুখে ঠাণ্ডা হাসি। অমিত তাকে টেনে নিচ্ছে। স্যান্ডি পাল্টা তাকিয়ে বলল,
“চেষ্টা করে দেখুন! তবে মনে রাখবেন, আপনি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী নন।”
নাতাশার চোখে আগুন জ্বলে উঠল। ইনায়া ভয়ে ভয়ে তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
“চলো, পাগলামি করো না, নাতাশা।”
নাতাশা ঠোঁট কামড়ে স্যান্ডির দিকে শেষবার তাকিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। হঠাৎ শেরাজ আর সুমু এসে হাজির হলো। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে প্রথমে স্যান্ডির দিকে, তারপর নাতাশার দিকে তাকাল।
“এটা কি নাটক হচ্ছে এখানে? মলটা কি তোমাদের ফাইট ক্লাব?”
সুমু ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“এতসব লোকের সামনে নিজেদের এভাবে নিচে নামাচ্ছো? নাতাশা, সান ভাইয়া—তোমরা আসলে কি করতে চাইছো?”
স্যান্ডি কিছু বলতে যাচ্ছিল, শেরাজ হাত তুলে থামাল।
“চুপ! একটা শব্দও না। আমি চাই, তোমাদের এই শিশুসুলভ আচরণ এখানেই শেষ হোক।”
নাতাশা চোখ নামিয়ে ফেলল, কিন্তু মুঠো শক্ত করে রইল। স্যান্ডি দাঁত চেপে মুখ ফিরিয়ে নিল। আইয়ুব হেসে পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করে বলল,
“দোস্ত, এদের কন্ট্রোল করা যায় না। এরা যতদিন বাঁচবে, ততদিন ঝগড়া চলবেই।”
শেরাজ গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
“ঝগড়া করতে হলে বাসায় গিয়ে করো। বাইরে আর একবার করলে, এবার আমি-ই থামাব, আর সেটা ভালোভাবে না।”
পরিবেশ থমথমে। চারপাশের মানুষজন ধীরে ধীরে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। কিন্তু নাতাশা আর স্যান্ডির চোখে চোখ এখনও এক অদৃশ্য লড়াইয়ের আগুন জ্বলছে। শপিংমলের উত্তপ্ত পরিবেশ কিছুটা শান্ত হতেই, হঠাৎ শেরাজের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে নাম দেখে তার মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেল। সে এক মুহূর্ত নীরব থেকে, নাতাশা আর ইনায়ার দিকে তাকাল।
“আপনারা দু’জন সুমুকে নিয়ে যান।”
সুমু অবাক হয়ে বলল,
“কিন্তু, আপনি যাচ্ছেন কোথায়?”
“একটা জরুরি কল। আমি কিছুক্ষণ পরেই আসছি।”
ইনায়ারা চুপচাপ মাথা নেড়ে সায় দিল। নাতাশা যদিও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু শেরাজের চোখের কঠিন দৃষ্টি দেখে থেমে গেল। শেরাজ দ্রুত পা ফেলে শপিংমলের থেকে দিয়ে বেরিয়ে গেল। সুমুকে নাতাশা আর ইনায়া নিয়ে গেল।
•
বিশ মিনিট পর শেরাজ দ্রুত ভেতরে ঢুকল। ব্ল্যাক শার্টে গম্ভীর রূপ আর চোখে চিন্তার ছাপ। সে এক মুহূর্ত থেমে শ্বাস নিল, তারপর এস্কেলেটরের কাছে এসে দাঁড়াল। একটু ওপরে উঠে আসতেই তার চোখ পড়ল পাশের এস্কেলেটরে। একজন মেয়ে নামছে। তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো বোরকায় ঢাকা শুধু চোখদুটো সানগ্লাস দিয়ে ঢাকা— যেন সে নিজেকে লুকাতে চাইছে।
শেরাজের বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত ধাক্কা খেল। সে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে— যেন হাজার বছর পর চেনা কারো সাথে দেখা তার। তার চোখ বড় হয়ে গেল। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। মেয়েটি ধীরে ধীরে নিচে নামছে। ভিড়ের মধ্যে সে একদম আলাদা। বোরকার কাপড়ে লুকিয়ে থাকলেও তার ভঙ্গি, তার হাঁটার ধরণ—শেরাজের চেনা। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে পাশের এস্কেলেটর দিয়ে নিচে নেমে এসে মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মেয়েটা থমকে দাঁড়াতেই শেরাজ বলল,
“এই লুক নিয়ে কোথায় যাচ্ছো, সুইটহার্ট?”
সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। শেরাজ, সুমুর চোখ থেকে সানগ্লাস খুলল। সুমু মৃদু হেসে বলল,
“সকলের ধারণা, বিশেষ করে আপনার বোন রোজা আপুর ধারণা আপনি আমাকে হাজার জনের মধ্যে থেকে খুঁজে নিতে পারবেন না। ওদের কথার কখনও দাম দেইনি। কিন্তু কখনও কখনও এসব মাথামোটাদের সরাসরি প্রমাণ দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয় যে, সুমুরাজ দুই দেহ, এক আত্মা।”
শেরাজের ঠোঁটে হালকা এক ঝলক হাসি ফুটল। সে সানগ্লাসটা হাতে ঘোরাতে ঘোরাতে সুমুর চোখে গভীরভাবে তাকাল।
“দুই দেহ, এক আত্মা— এটা শুধু কথার খেলা নয়, সুইটহার্ট। আমি যদি অন্ধও হয়ে যাই, তবুও তোমাকে চিনে নেব। কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
সুমু মৃদু হেসে চোখ নামিয়ে নিল। কিন্তু গালে লালচে আভা ছড়িয়ে গেল। চারপাশে মানুষ চলাফেরা করছে, কেউ খেয়াল করছে না, অথচ তাদের দু’জনের চোখে চোখ যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে দিল। শেরাজ এগিয়ে এসে সুমুর হাত ধরল।
“তুমি ভেবেছিলে আমি তোমাকে চিনতে পারব না? কিন্তু, তুমি ভুলে গেছ, তোমার প্রতিটা অঙ্গ-ভঙ্গি আমার নখদর্পনে।”
“তাহলে আপনি প্রমাণ করলেন, আমি যতই লুকোতে চাই না কেন, আপনি আমাকে খুঁজে বের করবেন।”
শেরাজ হেসে বলল,
“আমার থেকে লুকাতে পারলে তো খুঁজে বের করার প্রশ্ন আসবে।”
“কিন্তু সবাই তো আমাদের এভাবে দেখে না। তাদের ভুল ধারণা, আমরা একে অপরের জন্য নই।”
শেরাজ মাথা নেড়ে ধীরে তার কপালে ঠোঁট রাখল।
“হু কেয়ারস্! আমাদের ম্যাটার আমরা ঠিক করব, দুনিয়া না। তারা হাজার কথা বলুক, কিন্তু আমরা, আমরা সুমুরাজ। যেখানে একটা নাম শেষ হয়, আরেকটা শুরু হয়।”
সুমু আলতো হাসল। শেরাজ সুমুর হাত ধরে বলল,
“চলো, বাড়িতে ফিরি। সবাইকে আমি কল করে বলছি, বাহিরে আসতে।”
“বাড়ি ফিরব মানে? এদের শেষ হয়নি এখনো।”
“ওরা শেষ করুক। তুমি চলো।”
সুমু মিষ্টি হাসি নিয়ে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। শেরাজ দুহাতে সুমুর মুখটা নিয়ে বলল,
“তুমি পাশে থাকলে, আমার কাছে পুরো স্বপ্নের মতো লাগে। কিন্তু তুমি ছাড়া, লাখো মানুষের ভিড়েও আমি একা।”
সুমু আবার হেসে ফেলল। শেরাজ ধীরে বলল,
“তুমছে রূঠ কার ভি,
দিল তুমহে হি পুকারতা হে।
তুম সামনে হো ফির ভি,
মুঝে খোনে কা ডার সাতা তা হে।
সুইটহার্ট!
মেরি হার সাঁস তুমহারে বিনা আধুরি হে,
তুম হি তো মেরি জিন্দেগি কি সবসে বাড়ি জরুরি হে!”
সুমু লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। শেরাজ দ্রুত ফোন বের করে কল করল। কয়েক মুহূর্ত পর সে কল কেটে দিল।
“সবাই নিচে আসছে। এখন আমরা একসাথে বের হবো।”
সুমু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানলো। শেরাজ তার হাত শক্ত করে চেপে ধরল। এতোক্ষণের সব কাহিনী ওপর থেকে দেখল রোজা, আরিয়ান আর রায়য়ান।
•
শুনশান রাত। আকাশে ঝলমলে তারা, বাতাসে সামান্য ফুলের ঘ্রাণ, আর শহরের আলো দূরে ঝলমল করছে। নীরবতার মাঝে বাইকের ইঞ্জিনের গর্জন ভেসে আসছে। বাইক রেসের জন্য একত্রিত হয়েছে সবাই। আইয়ুব, নিহাল, সাইফ, অমিত, সারবাজ, আরবাজ, রিয়াদ, ফাহিম, রাহিন, রিসান আর শেরাজ সকলে রেসিং স্যুট পরে রেডি। আজ স্যান্ডিও রেসে অংশগ্রহণ করবে।
শেরাজ তার বাইকের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। হালকা হাওয়া তার মুখে স্পর্শ করছে। সে একহাতে চুলগুলোকে পেছনের দিকে সরিয়ে দিয়ে হেলমেট পরে নিল। তাদের বাইকের হেডলাইট থেকে আলো বের হয়ে রাতের অন্ধকারকে ছেদ করছে। সবাই রেসের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু হঠাৎ শেরাজের নজর যায় সুমুর দিকে। শেরাজ সুমুকে এই রাতের বেলায় বাহিরে আনতে চায়নি। কিন্তু বাড়িতে এখন আরিয়ান, রায়য়ান আর রোজা আছে— এই তিনজনের একজনকেও বিশ্বাস করে না শেরাজ। তাদের জন্যই শেরাজ সুমুকেও সাথে নিয়ে এসেছে। আর সুমুকে দেখে রাখার জন্য তার সাথে এসেছে নাজমিন, ফারিয়া, ফারিন, ইনায়া, নাতাশা, শাহরুখ, সামিয়া, আলিশা, ইশিতা, শাহরুখ, আশিক। তাদের সকলের মধ্যে রেসের ব্যাপারটা নিয়ে এখন টানটান উত্তেজনা। সামিয়া অবশ্য আসতে চায়নি। সকলে মিলে জোর করে এনেছে তাকে।
শেরাজ এখনো সুমুর দিকে তাকিয়ে আছে। সুমু ফোল্ডিং চেয়ারে বসে আছে। সে হাসিমুখে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“খান সাহেব, সাবধানে!”
শেরাজ হালকা হাসল। সে হালকা মাথা নাড়িয়ে সুমুকে আশ্বাস দিল। রেস শুরু হলো। শাহরুখ বাঁশিতে ফু দিল। বাইকগুলো এক মুহূর্তের জন্য স্থির। তারপর—গর্জন, চাকা ঘোরে, ইঞ্জিনের আওয়াজে রাত কেঁপে ওঠে। শেরাজ ফ্রন্টে, অন্যান্যরা প্রতিযোগিতা করছে তার পিছু নেওয়ার জন্য। বাতাসে উড়ে যাচ্ছে উচ্ছাস, নাইট স্কাইতে তারা যেন এক ঝলমলানো রোদ।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুমুর চোখের মধ্যে দারুণ উচ্ছ্বাস আর উদ্বেগ মিশে আছে। সামিয়া হাসি লুকাতে পারল না, ফারিয়া আর ফারিন চিৎকার করে উল্লসিত। ইনায়া, নাতাশা, এবং নাজমিনের মধ্যে হালকা টানাপোড়ন। সুমু শেরাজের প্রতি দৃষ্টি আটকে রেখেছে।
শেরাজের বাইক বাতাস কেটে এগিয়ে চলল। তার পেছনে অন্যরা ঝাপিয়ে পড়ল, কিন্তু স্পিডে সে সবাইকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। রেসের শেষ মুহূর্তে, শেরাজ লাইন ক্রস করে বাইক থামিয়ে রেখে তাকাল সুমুর দিকে। তার চোখে জিতার আনন্দ।
সুমু হালকা হাসল। সকলে চিয়ার আপ করল। আইয়ুবরা সকলে হেলমেট খুলছে। শেরাজ বাইক থেকে নেমে হেলমেট পরা অবস্থায় সুমুর সামনে গিয়ে হাঁটুমুড়ে বসল। সুমু আলতো হেসে হাত বাড়িয়ে শেরাজের হেলমেট খুলে নিজের কোলের ওপর রাখল। দু’হাতে শেরাজ সুমু আগলে নিয়ে হেসে বলল,
“আমার ভিলেন!”
দু’হাতে সুমুকে আগলে ধরে শেরাজ আলতো হেসে বলল,
“দেখলে সুইটহার্ট? তোমার চোখের ভরসায় আমি আবারও জিতলাম।”
সুমু হালকা হেসে মুখ মৃদু স্বরে বলল,
“খান সাহেব, আপনার জেতার এই কৌশলটা আমার প্রাণের ভয়ের সঙ্গে মিশে যায়। আপনি যেভাবে রাইড করেন, আমার ভয় হয়।”
শেরাজ সুমুকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“তুমি থাকলে আমি ভয় পাই না। বরং তুমি না থাকলে আমি ভয় পাই।”
চারপাশে আইয়ুব, নিহাল, সাইফ, অমিত, সারবাজ, আরবাজ, রিয়াদ, ফাহিম, রাহিন, রিসান— সকলে হেলমেট খুলে শিস দিয়ে, হাততালি দিয়ে উল্লাস করছে। নিহাল হেসে বলল,
“দোস্ত, তুই না থাকলে রেসে কোনো মজা নেই। তুই যেন আলাদা এক আগুন।”
আইয়ুব খোঁচা দিয়ে বলল,
“আগুন না, রোমিও! ফাস্ট হওয়ার পরেই বাইক ছেড়ে সরাসরি বউয়ের কাছে চলে গেল।”
সবাই হো হো করে হাসতে লাগল। ফারিয়া, ফারিন, ইনায়া চিৎকার করছে। নাজমিন আর নাতাশাও তাদের সাথে যোগদান করবে। শুধু সামিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে। তার চোখে অভিমান, যেন এই রেসের মাঝেও তার মনখারাপ কেউ টের পাচ্ছে না।
শাহরুখ হাসতে হাসতে তার কানের কাছে গিয়ে বলল,
“তুই না চাইলেও তোকে টেনে আনাটা ঠিকই হয়েছে।”
সামিয়া মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“আমার একদম ভালো লাগছে না।”
শাহরুখ খোঁচা দিয়ে হেসে বলল,
“আসলেই? নাকি অন্যকারো জন্য মন খারাপ?”
সামিয়া আর কিছু না বলে মাথা নিচু করে রইল। এদিকে শেরাজ সুমুকে ছাড়ছে না। বাইকের গর্জন থেমে গেছে, রাত আবার শান্ত হয়ে এসেছে। চারদিকে হাওয়া বইছে, চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে পুরো জায়গাটা। শেরাজ সুমুর চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে আবার বলল,
“তুমি থাকলে আমি আমার জীবনের সব রেসে জিতব, সুইটহার্ট। তুমি যদি আমার হাত না ছাড়ো, আমি কোনোদিন হেরে যাব না।”
সুমু হেসে তার কাঁধে মাথা রাখল। চারপাশের উল্লাস, হাসাহাসি, খুনসুটি—সবকিছুর ভেতরেও দু’জনের মাঝে যেন অন্য এক দুনিয়াতে চলে গেল।
হঠাৎ দুটো বাইক এসে থামল তাদের পাশে। সকলে তাকাল। আরিয়ান আর রায়য়ান একসাথে হেলমেট খুললো। রোজা আরিয়ানের পেছন থেকে বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল। তার পরনে ওয়ের্টান। সে গিয়ে আলিশার পাশে দাঁড়াল। রায়য়ান বাঁকা হেসে বলল,
“চল এস.কে, আমাদের সাথেও রেস কর।”
শেরাজ উঠে দাঁড়াল। আরিয়ান আর রায়য়ান বাইক রেখে এগিয়ে এলো শেরাজের কাছে। আরিয়ান একটু হেসে বলল,
“ওদেরকে তো হারালি। এবার আমাদেরও হারা।”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“যদি পারি?”
রায়য়ান বলল,
“তাহলে তুই যা বলবি, তাই।”
শেরাজ মাথা নাড়ল। সে বাইকে উঠে বসতেই আরিয়ান বলল,
“আর যদি হারিস?”
শেরাজ পেছনে না তাকিয়ে বলল,
“যা চাইবি, তাই!”
আরিয়ান এসে শেরাজকে সাইডে সরিয়ে নিয়ে গেল। রায়য়ানও চললো তাদের সাথে। শেরাজকে সাইডে এনে আরিয়ান বলল,
“আমরা তিনজনই সুমুর জন্য পাগল। আর তাই রেসে যে জিতবে, সে সুমুকে নিয়ে রেস জেতার পর বাইকে করে লং ড্রাইভে যাবে। আমাদের দুজনের মধ্যে কেউ জিতলে সুমুকে লং ড্রাইভে যাবার জন্য রাজি করাবি তুই।”
শেরাজের রাগ হলো। তবুও সে নিজেকে সুমুর জন্য কন্ট্রোল করে রেখে নিচু স্বরে বলল,
“ও আমার বউ। কোনো ট্রফি না, যেটা নিয়ে তোরা বাজি ধরতে পারিস।”
আরিয়ান ঠোঁটে ঠাণ্ডা হাসি টেনে শেরাজের দিকে ঝুঁকে বলল,
“ট্রফি হোক বা না হোক, আমাদের তিনজনের ভালোবাসা তো। আজকের রেসের দাম আছে এস.কে। তুই হেরে গেলে নিজের হাতেই সুমুকে উইনারের কাছে পাঠাবি। তুই তোর দেওয়া কথা ভাঙবি না, তাই তো?”
রায়য়ানের বিশ্বাস সে জিতবে। আর জেতার পর এমন একটা সুযোগ সে হাত ছাড়া করতে চাইল না। তাই সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“আজকের রেসে গতি আর ভাগ্য—দুটোই পরীক্ষা হবে। দেখি কে জেতে।”
শেরাজের চোখে সেই মুহূর্তে এমন এক দৃষ্টি ফুটে উঠল, যেটা দেখে আশেপাশের বাতাসও যেন থমকে গেল। সে দাঁত চেপে ধীরে ধীরে উত্তর দিল,
“সুমুর নাম নিয়ে বাজি ধরার সাহস কীভাবে হলো তোদের? আমার সুইটহার্টের ওপর তোদের লোভ আমি মাটিতে মিশিয়ে দেব।”
ওদিকে একটু দূরে বসে থাকা সুমু উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে সব লক্ষ্য করছিল। শেরাজকে আরিয়ান আর রায়য়ান সাইডে ডাকার পর থেকেই তার বুক কেঁপে উঠছিল। সে ইশিতার হাত শক্ত করে চেপে ধরে সে বলল,
“ইশিতা, কিছু একটা হচ্ছে। ওরা খান সাহেবকে কিছু বলছে।”
ইশিতা আশ্বস্ত করার ভঙ্গি করলেও নিজের চোখে চিন্তার ছাপ লুকাতে পারল না। ইনায়া ঠোঁট কামড়ে বলল,
“ওখানে কোনো সাধারণ রেসের কথা হচ্ছে না। আমি ভালো কিছু দেখতে পাচ্ছি না।”
ফারিয়া উত্তেজিত হয়ে ফিসফিস করে বলল,
“সাধারণ হোক আর না হোক। ভাইয়াকে হারতে পারবে নাকি?”
ফারিন জবাব দিল,
“অসম্ভব! দেখো, উনার চোখ। আগুনের মতো জ্বলছে।”
শেরাজ পা বাড়াতেই পেছন থেকে আরিয়ান বলল,
“হার মেনে নিলি নাকি সুমুর কাছে শেষবারের মতো দোয়া চাইতে যাচ্ছিস?”
শেরাজ জানে, সুমু কাছে গেলে সে এখন আর তাকে রেসে নামতে দিবে না। শেরাজ আর কোনো কথা না বলে ধীরে হেলমেট মাথায় পরল। তার চোখের আগুনটা তখনও স্পষ্ট। ইঞ্জিনের গর্জন উঠতেই চারপাশের নীরবতা ছিন্ন হয়ে গেল।
আরিয়ান আর রায়য়ানও একসাথে বাইকে গিয়ে বসে বাইক স্টার্ট করল। তিনটা হেডলাইট রাতের অন্ধকারকে ছেদ করে যেন দাঁড়িয়ে আছে।
সুমু অস্থির হয়ে ফিসফিস করে বলল,
“খান সাহেব! প্লিজ, সাবধানে।”
তার চোখে অশ্রু চিকচিক করছে। ইশিতা তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“বিশ্বাস রাখো, সুমু। ভাইয়া হারার মানুষ না।”
সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে। বাতাস যেন থমকে গেছে। শাহরুখ ধীরে বাঁশি ঠোঁটে তুলতেই চারপাশে নীরবতা নেমে এলো। মুহূর্তের মধ্যে, বাঁশির শব্দের সাথে সাথে তিনটা বাইক বজ্রপাতের মতো ছুটে গেল সামনে।
প্রথম কয়েক সেকেন্ডেই শেরাজ এগিয়ে গেল। তার গতি এতটাই তীব্র যে বাতাস কেটে শরীরে হুইসেল তুলছিল। পেছন থেকে আরিয়ান তাকে কাটার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে রায়য়ান একেবারে তার ডান পাশে এসে পড়ল।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের ভিড়ে চিৎকার উঠল। সুমু চোখ বন্ধ করে ফেলল। রেসের ট্র্যাক ঘুরছে। গতি বাড়ছে, ইঞ্জিনের গর্জন আকাশ কাঁপিয়ে তুলছে। শেরাজের বাইক গর্জন তুলে এগিয়ে চলেছে। হাওয়া যেন তার শত্রু হয়েও তাকে পথ করে দিচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ পিছন থেকে আরিয়ান গতি বাড়িয়ে বাঁ পাশ দিয়ে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল।
মুহূর্তেই সকলের মুখে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। নাজমিন চিৎকার করে বলল,
“ওরা ইচ্ছে করে এক্সিডেন্ট করাতে চাইছে।”
কিন্তু শেরাজ চোখের পলকে বাইক কাত করে ব্যালান্স করল। তার চোখে তখন কেবল আগুন, আর ঠোঁটে বাঁকা হাসি। সে চিৎকার করে বলল,
“আমার বউয়ের নাম নিয়ে বাজি ধরেছিস? এখন দেখবি, বাজি কাকে বলে।”
রায়য়ানও পিছিয়ে ছিল না। সে ডান দিক থেকে শেরাজকে ব্লক করার চেষ্টা করল। দুই পাশ থেকে ফাঁদ পেতেছে ওরা। ট্র্যাকের বাঁক ঘনিয়ে আসছে।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুমু বুক চেপে ধরল। তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সে কাঁপা গলায় বলল,
“খান সাহেব!”
আরবাজ আর শাহরুখ একসাথে চিৎকার করে বলল,
“ব্রো, সামলে চালাও।”
বাঁকের মুখে পৌঁছেই শেরাজ হঠাৎ গিয়ার নামিয়ে বাইক হেলে দিল। রাবারের চাকা রাস্তায় ঘষা খেল, স্ফুলিঙ্গ ছিটকে উঠল। কিন্তু সেই মুহূর্তেই তার বাইক বজ্রপাতের মতো বাঁক কেটে আরিয়ান আর রায়য়ানকে অনেক পেছনে ফেলে দিল।
আইয়ুব লাফ দিয়ে উঠে চিৎকার করে বলল,
এস.কে, লিডে!”
সারবাজ হেসে বলল,
“আফটার লং টাইম, এস.কের এমন রেস দেখছি।”
আরিয়ান দাঁত চেপে চিৎকার করে বলল,
“এই রেস শেষ হয়নি, এস.কে।”
তিনটা বাইক ঝড়ের মতো ছুটছে। শেরাজের চোখে তখন শুধু সুমু, শুধু তার ভালোবাসা। সে দাঁত চেপে বলল,
“আমার কাছে জয়ের মানে শুধু ফিনিশ লাইন নয়, আমার জয়ের মানে সুমু।”
শেষ ল্যাপ। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু ইঞ্জিনের গর্জন আর টায়ারের ঘর্ষণের শব্দ। আরিয়ান আর রায়য়ান মরিয়া হয়ে উঠেছে। দু’জন দু’পাশ থেকে শেরাজকে কাটার চেষ্টা করছে। মুহূর্তে ট্র্যাকের বাতাসে টান টান উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল।
সুমু চেয়ারে বসে হাত জোড় করে রেখেছে। চোখে অশ্রু জমে আছে তার। হঠাৎ শেষ বাঁক ঘুরতেই আরিয়ান বাইক হেলে দিয়ে ধাক্কা দিতে গেল, কিন্তু শেরাজ সেই মুহূর্তে ব্রেক কেটে স্পিড ডাবল করল। তার বাইক যেন ঝড় হয়ে রাস্তা চিরে সামনে ছুটল।
রায়য়ান চোখ বড় করে চিৎকার করে বলল,
“অসম্ভব!”
ঝড়ের বেগে শেরাজের বাইক ফিনিশ লাইন ছেদ করে গেল। হেডলাইটের আলো এক মুহূর্তের জন্য রাতকে সাদা করে দিল। লাইন ক্রস করার সাথে সাথেই শেরাজ হঠাৎ বাইক ঘুরিয়ে সোজা সুমুর সামনে এসে থামল। টায়ারের ঘর্ষণে স্ফুলিঙ্গ উড়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
শেরাজের ফ্রেন্ডরা একসাথে চিৎকার করে উঠল,
“এস.কে, এস.কে!”
শেরাজ হেলমেট খুলে ধীরে বাইক থেকে নামল। তার কপালে ঘাম জমেছে, কিন্তু ঠোঁটে বিজয়ের হাসি। সে সরাসরি সুমুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সুমুর গাল বেয়ে পানি পড়ছে। শেরাজ হাঁটুগেড়ে বসে হেলমেটটা মাটিতে রাখল। সে সুমুর দিকে তাকিয়ে হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“জান, আমার জয়ের মানে শুধু রেস না, আমার জয়ের মানে তুমি।”
সুমু আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শেরাজের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। চারপাশে তুমুল হাততালি, চিৎকার আর উল্লাস ছড়িয়ে পড়ল।
আরিয়ান আর রায়য়ান দাঁতে দাঁত চেপে দূর থেকে তাকিয়ে রইল। তাদের চোখে হারের জ্বালা, আর শেরাজের চোখে শুধু সুমুর ভালোবাসা।
চারপাশে সবাই উল্লাস করছে। ফারিয়া, ফারিন, নাজমিনরা চিৎকার করছে। ইশিতার মুখে স্বস্তির হাসি। সামিয়া, যে এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, এবার সেও হাততালি দিল। সুমু এখনও শেরাজকে আঁকড়ে ধরে আছে। তার চোখে আনন্দের অশ্রু।
কিন্তু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আরিয়ান আর রায়য়ানের মুখ অন্ধকার হয়ে আছে। রায়য়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“এই জয়, জয় না, এস.কে। তোর এই জয়ের দিন বেশিদিন থাকবে না।”
আরিয়ান ঠোঁটে শীতল হাসি টেনে বলল,
“খুব বড় খেলা খেললি, এস.কে। কিন্তু খেলার মাঠ তো এখানেই শেষ না।”
আইয়ুব এগিয়ে এসে শেরাজের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ভাই, জয়েই তোকে মানায়।”
শেরাজ হালকা মাথা নাড়ল। তার চোখ তখনও আগুনের মতো জ্বলছে। সে ধীরে সুমুর হাত ধরে কানে ফিসফিস করে বলল,
“চলো, তুমি আর আমি একটু অন্যরকম লং ড্রাইভে যাই।”
সুমু অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল,
“এখন? এত রাতে?”
শেরাজ হালকা হেসে বলল,
“হুম চলো!”
বেশি কিছু না বলে শেরাজ বাইকের হেলমেট এগিয়ে দিল সুমুর দিকে। সুমু এক মুহূর্ত দ্বিধায় দাঁড়াল, তারপর হালকা হাসি দিয়ে হেলমেট হাতে নিতে যেতেই, শেরাজ নিজে থেকে সুমুকে হেলমেট পড়িয়ে দিল।
ইশিতা এগিয়ে এসে বলল,
“সাবধানে নিয়ে যাবেন, ভাইয়া।
শেরাজ সম্মতি জানিয়ে বাইকে উঠে, সুমুকে পেছনে বসাল। বাইক স্টার্ট হতেই ইঞ্জিনের গর্জনে চারপাশ কেঁপে উঠল। সুমু আলতো করে শেরাজের কোমর জড়িয়ে ধরল। শেরাজ বলল,
“ভয় পাচ্ছো?”
সুমু মাথা নাড়ল,
“না! আমি জানি, আপনি আছেন।”
রাতের হাইওয়ে ফাঁকা। তারা ভরা আকাশের নিচে, বাতাস চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছে, চারপাশে শুধু নীরবতা আর গতির সুর। সুমু চোখ বন্ধ করে বাইকের গতির সাথে শেরাজের বুকে মাথা রাখল। শেরাজের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল। সে বাইক ঘুরিয়ে আরিয়ান আর রায়য়ানের কাছে গেল। বাইক নিয়ে কিছুক্ষণ ঘুরতে লাগল তাদের দুজনের চারপাশ দিয়ে। বাইক নিয়ে দুজনেই চারপাশ দিয়ে ছয়টা পাক দিয়ে শেরাজ বাঁকা হেসে বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেল।
রায়য়ান আর আরিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে সবটা সহ্য করল। রোজা অসহায় দৃষ্টিতে শেরাজের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। আলিশা দূর থেকে তাকিয়ে রইল রায়য়ানের দিকে।
•
রাত অনেক গভীর। চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু দূরের কুকুরের ডাকে আর হালকা বাতাসের শব্দে যেন পরিবেশ আরও ভৌতিক লাগছে। ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে ইনায়া ফোনে কথা বলছে। তার কণ্ঠস্বর চাপা, তবুও নার্ভাস লাগছে।
“হ্যাঁ! আমি সব দেখেছি। কিন্তু আপনি যা ভাবছেন, তা এত সহজ হবে না। আমি ঠিক সময়ে আপনাকে জানাব। আর শুনুন, আমি আর এসবের মধ্যে থাকতে চাই না। আমি সব ছেড়ে দিব।”
কথা শেষ করেই ফোন কেটে দিল ইনায়া। সে ভারী নিঃশ্বাস নিয়ে মাথা একটু নিচু করে দাঁড়িয়ে ঘুরতেই সামনে তাকিয়ে দেখল শেরাজ দু’হাত পকেটে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে।
চলবে..?
#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_67 ✦ বর্ধিতাংশ ✦
ইনায়া বুকটা কেঁপে উঠল। সে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে থেকে চলে যাবার জন্য পা বাড়াতেই, হঠাৎ শেরাজের গম্ভীর, ধারালো কণ্ঠ ভেসে এলো তার পেছন থেকে,
“ডিটেকটিভ ইনায়া বিনত সাঈদ আল-হারথি। বাবার নাম— সাঈদ বিন হামাদ আল-হারথি। মায়ের নাম— আমিরা বিনত খালফান আল-বুসাইদি। সালালার গর্ব, কিন্তু শত্রুদের চোখে কাঁটা।”
ইনায়া থমকে গেল। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। সে আর পা এগোল না।
“আট বছর দু’মাস আগে সমুদ্র দেখতে গিয়েছিলেন বাবা-মা। আর ফিরে এলেন লাশ হয়ে। সবাই বলল এক্সিডেন্ট। কিন্তু ইনায়া বিনত সাঈদ আল-হারথি জানতেন, এটা হত্যা।”
ইনায়ার চোখ বড় হয়ে গেল। ঠোঁট শুকিয়ে এলো। সে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
“সাঈদ বিন হামাদ ছিলেন ভীষণ সৎ একজন পুলিশ অফিসার। এতটাই সৎ, যে সততাই একদিন তাকে শেষ করে দিল। তার শত্রুদের সংখ্যা ছিল অগণিত। তখন ইনায়া বিনত সাঈদ আল-হারথি ছিলেন পড়াশোনার জন্য দেশের বাইরে। মা-বাবার মৃত্যুর খবর শুনেই ফিরে এলেন। আর তিনি বিশ্বাস করলেন না, যে তার বাবা-মা হঠাৎ স্রেফ দুর্ঘটনায় মারা যেতে পারেন। কারণ, সাঈদ বিন হামাদ আল-হারথি সবসময় ইনায়া বিনত সাঈদ আল-হারথির সাথে শেয়ার করতেন তার কাজের গল্প। শত্রুদের তালিকা। ঝুঁকির কথা।”
ইনায়ার চোখে পানি এসে গেল। সে ঠোঁট চেপে ধরল।
“সেখান থেকেই ইনায়া বিনত সাঈদ আল-হারথি যাত্রা শুরু। প্রতিশোধের। ন্যায়বিচারের। মাত্র এক বছরে সমস্ত প্রমাণ জোগাড় করলেন। বাবা-মায়ের খুনিদের শাস্তি দিলেন তিনি। আর এখন ইনায়া বিনত সাঈদ আল-হারথি সিআইডির ডিটেকটিভ, এসিপি প্রশান্ত ঘোষের আন্ডারে। কাগজে কলমে নাম তার ‘ইনায়া’।
ইনায়া চুপ করে আছে। শেরাজ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
“এই জীবন কাহিনীগুলো ঠিক কার জীবন কাহিনীর সাথে মিল যাচ্ছে, আমি ঠিক মনে করতে পারছি না। তো মিস ইনায়া, আপনি কি আমাকে বলতে পারবেন, এই গল্পগুলো কার জীবনের?”
চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। ইনায়ার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে, ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না তার মুখ দিয়ে।
শেরাজ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। তার চোখে অদ্ভুত এক ঝলক, যেন সত্যিটা জানার পরও আরও গভীরে খোঁড়াখুঁড়ি করতে চায়। সে ব্যঙ্গ মিশ্রিত গলায় বলল,
“এই কাহিনীগুলো ভীষণ সিনেমাটিক মতো শোনাচ্ছে। সততার জন্য খুন হওয়া এক পুলিশ অফিসার, তার কন্যা প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে ওঠা, তারপর একে একে খুনিদের শাস্তি, হুম। কিন্তু, আমার প্রশ্ন হচ্ছে— এই গল্পটা ঠিক কার?”
সে একটু থামল, তারপর এক পা সামনে এসে দাঁড়াল। ইনায়ার চোখে চোখ রেখে বলল,
“বলতে পারবেন, মিস ইনায়া? নাকি আমি ধরে নেব, এই গল্পটা আপনার জীবনের?”
ইনায়া এক মুহূর্ত চুপ করে তার চোখ নামিয়ে নিল। ঠোঁট কাঁপল। চারপাশের নিস্তব্ধতায় যেন শুধু তার হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সে কাঁপা গলায় বলল,
“আমি এসব কিছুই জানি না।”
শেরাজ হালকা হাসল। মাথা একপাশে কাত করে বলল,
“ওহ, আমি কিছুই জানি না? তাহলে আপনার চোখ পানি কেন? গলা কাঁপছে কেন? আমার তো মনে হচ্ছে, আমি কথা দিয়ে সঠিক জায়গাতেই আঘাত করেছি?”
ইনায়া মুখ ফিরিয়ে নিল, চোখ মুছে ফেলল তড়িঘড়ি করে। কিন্তু তার শরীরের কম্পন শেরাজের চোখ এড়াল না। শেরাজ আবারও বলল,
“ওপস্ সরি! পিকচার আভি বি বাকি হে। এরপরের পার্টটা শুনবেন না, মিস ইনায়া?”
ইনায়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“আমার অফিসে ঢোকা। প্রথম থেকেই সারবাজকে টার্গেট করে, ওর সাথে ঝগড়া করে, একটা আলাদা বন্ডিং তৈরি করার চেষ্টা। আস্তে আস্তে আমার অফিসের বেস্ট স্টাফ হয়ে ওঠা। নিজের কাজ দিয়ে সকলের নজরে বেস্ট একটা জায়গা তৈরি করে নেওয়া, যাতে সারবাজের নজরে আসা যায়। এরপর আমার ভাইকে প্রেমের ফাঁদে ফেলানো। ওর ক্লোজ হয়ে, ওর থেকে আমার সম্পর্কে জানতে চাওয়া।”
ইনায়া স্থির দাঁড়িয়ে আছে, মাথা নিচু তার। তার আঙুলগুলো কাঁপছে, যেন ভেতরের অস্থিরতা লুকোতে পারছে না।
“এরপরের পার্টটা মিস করলাম নাকি? আপনি তো বেশ চালাক। অফিসে ঢুকলেন একেবারে আমার ছায়ার ভেতর দিয়ে। সারবাজকে আগে টার্গেট— ঝগড়া, মান-অভিমান, ছোটখাটো নাটক, একটা ভিন্নরকম সম্পর্ক তৈরি করার খেলা। তারপর আস্তে আস্তে আমার পুরো টিমের চোখে সেরা স্টাফ হয়ে ওঠা”, সে একটু থেমে আবারও বলল, “কেন জানেন? কারণ, সারবাজের চোখে পড়লে আমার দরজায় পৌঁছানো সহজ হবে, তাই না? আর হ্যাঁ, খেলা এখানেই শেষ না। শেষ দাওয়াইটা তো দিলেন, প্রেমের ফাঁদে ফেলে। বাট ইউর গেম ইজ ওভার, মিস ইনায়া।”
ইনায়ার বুক কেঁপে উঠল। সে ধীরে মুখ তুলল। তার চোখে একরাশ আগুন, রাগ আর কষ্ট মিশ্রিত।
“আপনি যা ভাবছেন, সব ভুল।”
শেরাজ হাসল,
“ভুল? তাহলে আমার ভাইয়ের কাছে গিয়ে ওর থেকে এতটা জায়গা কেন নিলেন? কেন ওর সামনে এমনভাবে দাঁড়ালেন, যেন আপনি সত্যিই ওকে ভালোবাসেন?”
ইনায়া দাঁত চেপে বলল,
“হয়তো…”
কথা শেষ করতে পারল না ইনায়া। হঠাৎ শেরাজের দু’পাশে এসে দাঁড়াল আরিয়ান আর রায়য়ান।
ইনায়া ভয়ে এক'পা পিছিয়ে গেলেও চোখের দৃষ্টি শক্ত রাখল। সে ব্যঙ্গ করে বলল,
“তো মিস্টার শেরাজ খান ওরফে ম্যাফস্টার। এত ভয়ের খেতাব আপনার নামে। আপনার খুনের স্কিল নাকি ভয়ংকর? অথচ একটা সামান্য মেয়েকে মারতে আপনার দু’দুজন মাফিয়া আর গ্যাংস্টার লাগে?”
শেরাজ হেসে মাথা নিচু করল। তারপর ঠোঁটে বাঁকা হাসি টেনে তাকাল ইনায়ার দিকে।
“না, ভুল বললেন। আমাকে “ম্যাফস্টার” বলা হয় এই দুইজনের জন্যই। একজন গ্যাংস্টার, একজন মাফিয়া। নামটা এসেছে ওদের রক্ত থেকে।”
শেরাজ এক ধাপ এগিয়ে এলো। ইনায়ার বুক কেঁপে উঠল।
“আর আপনাকে মারতে আমার একজন গার্ডই যথেষ্ট। আপনার মতো বাচ্চাদের জন্য আমাকে হাত নোংরা করতে হয় না।”
ইনায়া ঠোঁট কামড়ে ধরল, কিন্তু ভেঙে পড়ল না।
“তাহলে এত আয়োজন কেন?”
শেরাজ হেসে মাথা নেড়ে পাশে দাঁড়ানো আরিয়ান আর রায়য়ানের দিকে ইশারা করল।
“কারণ, আমার এই ভাই— আরিয়ান চৌধুরী। যদিও আমি তাকে ভাই বলতেই লজ্জা পাই। সে একজন গ্যাংস্টার হয়ে শুধুমাত্র আপনার জন্য ওমান থেকে বাংলাদেশে এসেছে। আর এইজন— রায়য়ান চৌধুরী। একজন নামকরা মাফিয়া। সেও এসেছে শুধুমাত্র আপনাকে একবার দেখার জন্য। এখন আপনিই বলুন, ওরা যদি আপনাকে শেষবার দেখতে চায়, আমি কি ওদের ইচ্ছা ফেলতে পারি?”
ইনায়ার কেঁপে উঠল। সে নিঃশ্বাস আটকে ফেলল, চারপাশের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল।
শেরাজ আবারও গভীর গলায় বলল,
“যদিও, ওদের এখানে আসার কারণ শুধু আপনি না। ইভেন আরেকটা বড় কারণ আছে।”
ইনায়া কপাল কুঁচকে বাঁকা হেসে জবাব দিল,
“দু’জনেই তো আপনার বউকে নিয়ে টানাটানি করছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে— আপনি কীভাবে এখনো ওদের সাথে আছেন?”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে এক তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে মাথা সামান্য কাত করল।
“আমি এখানে আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে আসিনি। তবে একটা জিনিস জেনে রাখবেন, শত্রুর শত্রু সবসময় বন্ধু।”
ইনায়া হালকা হাসল, চোখ নামিয়ে আবার তার দিকে তাকাল।
“আচ্ছা! পুরানো বন্ধু?”
শেরাজ এক ভ্রু উঁচু করে থামল কয়েক সেকেন্ড। তারপর চোখে আগুনের নিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“বাহ! এটাও জানেন দেখছি? বাট অল ক্রেডিট গোজ টু মি। বিকজ এইসব ইনফরমেশন তো আমি নিজেই আপনাকে পেতে সাহায্য করেছি।” সে হালকা হেসে আরেক পা এগোল। কণ্ঠ নীচু করে বলল, “মানে দাঁড়াল, আপনি যতটুকু জানেন, সব আমার ইচ্ছাতেই জানেন।”
ইনায়ার হাসিটা মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। তার বুক ধুকপুক করতে লাগল, কিন্তু মুখে সে দমে গেল না।
“তাহলে আপনার খেলা এখানেই শেষ, ম্যাফস্টার। কারণ এবার যে চালটা হবে, সেটা আপনার বোর্ডে নয়— আমার বোর্ডে।”
শেরাজ, আরিয়ান আর রায়য়ান একসাথে হেসে উঠল। শেরাজ হাসি থামিয়ে বলল,
“আপনি আসলে আমার খেলার গুটিই ছাড়া কিছু না, ডিটেকটিভ।”
ইনায়া দাঁত চেপে তাকিয়ে রইল। শেরাজ ভ্রু উঁচু করে আবারও হেসে উঠল, সেই হাসিতে শীতলতা আর ব্যঙ্গের ঝিলিক। সে পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে কিছু ট্যাপ করে ফোনটা আবারও পকেটে রেখে বলল,
“বলুন কার হাতে মরবেন? রায়য়ান নাকি আরিয়ান? আরিয়ান আবার খুন-টুন করেনা। ওর সব কাজ, ওর লোকেরা করে। কিন্তু রায়য়ান, রায়য়ানের কিলিং স্কিল আবার বেটার। ও খুব আয়োজন করে মার্ডার করে। আর মার্ডার করার আগে, দারুন দারুন গেম প্লে করে।”
ইনায়া ঠোঁট চেপে ধরল। মনে ভয় এলেও মুখের ভেতর সাহস জড়ো করল।
“মৃত্যুর হাত কার কেমন, সেটা আমার জন্য কোনো ব্যাপার না। ব্যাপার হলো— আজ মরবে কে।”
আরিয়ান, রায়য়ান দুজনেই হেসে উঠল। সেই হাসি নিস্তব্ধ ছাদটাকে আরও ভয়ংকর করে তুলল। শেরাজ বাঁকা হেসে দু’হাত বুকের সামনে ভাঁজ করল।
“বাহ, ডিটেকটিভ! সাহসটা এখনো যায়নি দেখছি। কিন্তু আমি আপনাকে একটু রিয়েলিটি চেক দিই।”
সে আঙুল তুলে পাশের বিল্ডিংয়ের ছাদ দেখাল। এক এক করে লাল লেজার ডট ইনায়ার শরীরে এসে পড়ল। স্নাইপার রেড ডটগুলো তার বুক, কপাল, গলায় নাচতে লাগল। শেরাজ হাসি চেপে রেখে বলল,
“ওরা সবাই আমার লোক। একটুখানি সিগন্যাল দিলেই, টাটা, গুডবাই ডিটেকটিভ, ইনায়া।”
ইনায়া শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। শরীর কাঁপলেও চোখে দৃঢ়তা। রায়য়ান দাঁত চেপে এক ধাপ এগিয়ে এলো। সে গর্জে ওঠে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বালের কাহিনী বন্ধ কর, এস.কে। আর এক সেকেন্ডও দেরি করিস না। এটাকে এখানেই ফেলে দে।”
শেরাজ ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল।
“তুই এখনো বাল কাটিসনি, রায়য়ান? ছ্যা! এমন খবিসের মতো থাকলে, তোকে আমি একদিন নর্দমায় ফেলে আসব।”
রায়য়ান গর্জে উঠল। চোখ লাল হয়ে গেছে তার।
“বাল বাল করা বন্ধ কর। আর এটাকে মার, শেষ কর এখানেই।”
শেরাজ হঠাৎ তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুড়ে দিল। এক সেকেন্ডে নিস্তব্ধতা আরও ভারী হয়ে উঠল।
“তোরা ভুলে গেছিস, আজকে আমি কী বলেছিলাম?”
কিছুক্ষণের নীরবতা। তারপর রায়য়ান আর আরিয়ান একে অপরের দিকে তাকাল। দু’জনেই বিরক্ত মুখে ছাদ থেকে বেরিয়ে গেল।
শেরাজ একা দাঁড়িয়ে রইল। বাতাস তার শার্টের কলার উড়িয়ে দিচ্ছিল। সে একবার ইনায়ার দিকে তাকাল।
“আজ বাঁচলেন, ডিটেকটিভ। কিন্তু প্রতিবার ভাগ্য আপনাকে বাঁচাবে না।”
এ কথা বলে সে ধীর পায়ে ছাদ ত্যাগ করল। ইনায়া একা দাঁড়িয়ে রইল, বুক ধুকপুক করছে তার, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। আকাশে আধখানা চাঁদ যেন আরও ভয়ংকর হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
হঠাৎ ছাদের দরজার কপাট ধাক্কা খেয়ে খুলে গেল। কঠিন, ভারী পায়ের শব্দ ছাদের নিস্তব্ধতায় কেঁপে উঠল। ইনায়া চমকে তাকাল। অন্ধকারের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো একটা ছায়া। চাঁদের আলোয় তার মুখ স্পষ্ট হয়ে গেল। সারবাজ দাঁড়িয়ে। কালো শার্টের হাতা গোটানো, চোখে আগুন, মুখে তীব্র রাগের ছাপ। সে একদৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকাল। তারপর ছাদের মেঝেতে রাখা একটা চেয়ার লাথি মেরে ফেলে দিল। চেয়ারটা কট করে পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল। সে গর্জে উঠে বলল,
“আমাকে খেলার গুটি মনে হয় তোমার? ভালোবাসার নামে ছলনা করলে?”
ইনায়া বুক ভরে শ্বাস নিল, কিন্তু কিছু বলল না। তার হাত এখনো সামান্য কাঁপছে, চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। সারবাজ ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার পায়ের শব্দে যেন ছাদটাই কেঁপে উঠছে।
“আর কাউকে পেলে না, এসব করার জন্য? আমাকেই কেন, ইনায়া? আমি তো তোমাকে সত্যি ভালোবেসেছিলাম। কেন আমার বিশ্বাস নিয়ে এভাবে খেললে?”
ইনায়া এগিয়ে এসে বলল,
“সারবাজ! আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি। হতে পারে প্রথমে সব মিথ্যা ছিল। কিন্তু এখন কোনো ছলনা নেই, কোনো খেলা নেই। আমি এই খেলার মধ্যেই তোমাকে ধীরে ধীরে ভালোবেসে ফেলেছি।”
“আমি বিশ্বাস করিনা? এখনো মিথ্যা বলা বন্ধ করো, প্লিজ।”
ইনায়া ছাদের মেঝের ওপর বসে পড়ল। সে ধীরে বলল,
“তোমার ভাইয়ের কিছুই কি তোমার চোখে পড়ছেনা। আমি যেটা করেছি, সেটা আমার দায়িত্ব ছিল। কিন্তু তোমার ভাই তো একজন…”
সারবাজ একহাত উঁচিয়ে ইনায়াকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আমার ভাই সম্পর্কে কোন বাজে কথা শুনতে চাই না। আজ আমার ভাই আছে বলেই, তুমি এখনো বেঁচে আছো।”
ইনায়া কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“মানে?”
সারবাজ হেসে বলল,
“ওরা শুরু থেকেই তোমার সম্পর্কে সবটা জানতো। রায়য়ান আরও আগেই তোমাকে মেরে দিত, কিন্তু এস.কের জন্য পারেনি। রায়য়ান আর আরিয়ান ঠিক করেছিল, রায়য়ান ইন্ডিয়া থেকে ব্যাক করলেই তোমাকে ওরা মারবে। কিন্তু রায়য়ান ইন্ডিয়া থেকে ব্যাক করার আগেই এস.কে তোমাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এলো, ইভেন তোমাকে ওদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য, আমাদের সাথে বিডিতে নিয়ে এলো। কারণ তোমাকে ওখানে রেখে এলে, এতোদিনে তুমি আর এই দুনিয়াতে থাকতেনা। কিন্তু এস.কে জানত না যে, ওরা বিডিতে চলে আসবে। ওরা যেদিন বিডিতে এলো, এস.কে ইচ্ছে করেই ওদের এই বাড়িতে এনে রাখল, কারণ এখানে এস.কের সামনে থাকলে ওরা তোমার ক্ষতি করার সুযোগ পাবে না। আর আজকের বাইক রেস হয়েছিল একটা বাজিতে। ওরা রেসের বাজি হিসাবে সুমুকে রেখেছিল, আর এস.কে রেখেছিল তোমার প্রাণ। এস.কে ওদের বলেছিল, ও রেসে জিতলে, ওরা আর কোনোদিনও তোমাকে মারার চেষ্টা করতে পারবে না। আর হলোও তাই, এস.কে রেস জিতল। রায়য়ানরা খারাপ হলেও, ওরা যাকে যা কথা দেয়, তা রাখে। তাই ওরা আর কোনদিনও তোমাকে মারতে চাইবে না। এখন তুমি ইচ্ছামতো ওদের ধ্বংস করার প্ল্যান করতে পারো। তোমার আর কি কি ইনফরমেশন লাগবে আমাকে বলো, আমি তোমাকে সব উত্তর দিয়ে দিব। কিন্তু আজকের পর, আর কোনদিনও তোমার এই মুখটা নিয়ে আমার সামনে আসবে না।”
ইনায়া বুকের ভিতর চাপা কান্না ধরতে পারল না। সে কেঁদে উঠল। সারবাজ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“কি হলো? বলো, কি জানতে চাও?”
ইনায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি আর কিছু জানতে চাই না, সারবাজ। আমি… আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি। আমি তোমাকে হারাতে পারব না। এই দুনিয়ায় আমার বলতে এক তুমি ছাড়া কেউ নেই। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও, সারবাজ। আমি তোমার জন্য আমার এই প্রফেশন ছেড়ে দেব। আমি যে ভালোবাসার কাঙাল, সারবাজ। আমার কাছে এই প্রফেশনের চেয়ে একটা ভালোবাসার মানুষ বেশি দরকার। প্লিজ, তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না। হতে পারে আমি তোমাকে ব্যবহার করেছি। তোমার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করেছি, কিন্তু এখন আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি।”
সারবাজ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“তোমার প্রফেশন নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা ছিল না। তুমি আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে ইনফরমেশন কালেক্ট করেছো, সেটা নিয়েও আমার কোন সমস্যা ছিল না। কারণ, এস.কের জন্য এসব কিছুইনা। কিন্তু তুমি তো আমার বিশ্বাসের সাথে খেলা করেছ। আমার ভালোবাসাকে ব্যবহার করেছ। তুমি ভাবলে কীভাবে এতোকিছুর পরেও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিব? সরি ইনায়া! বেটার হবে, যদি তুমি আমার থেকে দূরে থাকো।”
কথাগুলো বলে ছাদ থেকে চলে গেল সারবাজ। তার পায়ের ধাক্কা বাতাসে প্রতিধ্বনি হয়ে গেল। ইনায়া ছাদের মেঝেতে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ল। তার দম বন্ধ কান্নার সঙ্গে মিলিয়ে রাতের নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
•
পরের দিন দুপুর। বাতাস হালকা, সূর্যের আলো বাগানের ফুলগুলোকে উজ্জ্বল করে তুলেছে। শেখবাড়ির প্রতিটা কোণা আজকে বিশেষ করে সাজানো হচ্ছে।
আজ রাতের মেহেন্দীর জন্য সবাই আগ্রহে মুখরিত। নাজমিন, সামিয়া আর ফারিয়া—তিন জনেরই আজ মেহেন্দীর আয়োজন হবে শেখবাড়ি থেকেই। ঘরের ভেতর রঙিন লাইট, কুশন, ফুলের সুবাসে পরিবেশ আরও রোমাঞ্চকর হয়ে উঠেছে।
শেরাজ শাওয়ার শেষে বেডে বসে টাওয়েল বুকের ওপর ঝুলিয়ে ফোনে স্ক্রল করছে। তার ভেজা চুল থেকে পানি টপটপ করে পড়ছে।
সুমু, নাতাশার সাথে কিছু ইমপর্টেন্ট বিষয়ে কথা বলে এসে রুমে ঢুকল। সে ভ্রু কুঁচকে দেখল, শেরাজ ভেজা চুল নিয়ে ফোনে ব্যস্ত। রুমের দরজা লক করে সে এগিয়ে এলো শেরাজের কাছে। ফোনটা হাত থেকে কেড়ে বেডের ওপর ফেলে দিয়ে, টাওয়েল হাতে নিয়ে বলল,
“কি চাইছেন আপনি? অসুস্থ হলে ভালো লাগবে, তাই না?
সে ধীরে ধীরে শেরাজের চুল মুছতে শুরু করল। শেরাজ মুচকি হেসে একটানে সুমুকে কোলের ওপর তুলে নিল। সুমু দু’পা নিজের কোমরের সাথে জড়িয়ে নিয়ে একটানে সুমুর ওড়না ফেলে দিল। সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনার লক্ষণ ভালো না। একদম দুষ্টুমি করার চেষ্টা করবেন না।”
শেরাজ দুষ্টু হেসে বলল,
“এই স্টাইলে রাউন্ডে কথা মনে আছে, সুইটহার্ট?”
সুমু চোখ রাঙিয়ে বলল,
“চুপ করুন! বাজে কথা বলে আমাকে লজ্জায় ফেলবেন না।”
শেরাজ তাকিয়ে রইল। সুমু চুল মোছায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পরে শেরাজ আবারও সুমুর বুকের মাঝখানে মুখ গুঁজে দিল। সুমু তাকে সরিয়ে দিল। শেরাজ একই কাজ আবার করল। সুমু কপাল কুঁচকে বলল,
“কি হয়েছে আপনার? সবকিছু ঠিক আছে তো?”
শেরাজ ধীরে মাথা নাড়ল। সুমু চুল মুছতে মুছতে জিজ্ঞাসা করল,
“তাহলে এমন করছেন কেন?”
শেরাজ তার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“নিড ইউ, বউ। আই ব্যাডলি নিউ ইউ।”
সুমু কোল থেকে নামার চেষ্টা করল। শেরাজ আরও শক্ত করে ধরে বলল,
“প্লিজ!”
সুমু কপাল কুঁচকে বলল,
“পাগল হয়েছেন আপনি? আপনি জানেন না আমি…”
তার কথার মাঝেই শেরাজ বলল,
“জানি তো, জান। কিন্তু এতোগুলো দিন কীভাবে থাকব। আমার যে খুব কষ্ট হবে, বউ।”
সুমু কিছু বলতে পারল না। শেরাজ হঠাৎ তার গলায় ঠোঁট ছোঁয়াল। সুমু নড়ে উঠতেই শেরাজ বলল,
“একটু জান। ভয় নেই, আমি বেশি কিছু করব না। আর অন্য কোনদিকেও যাব না। ব্যস্ত নেককিস করব। নিজের চ্যাম্পদের জন্য এইটুকু সহ্য করে নিতে পারব আমি।”
রুমের মধ্যে দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ। মেঝের ওপর পড়ে আছে সুমুর পরনের আনারকলি। শেরাজ সুমুকে জড়িয়ে তার গলায় মুখ গুঁজে বসল। সে সুমুর কোমর আরও শক্ত করে ধরল।
সুমু কিছুটা হকচকিয়ে থাকল, তারপর ধীরে তার হাত শেরাজের পিঠে রাখল। দু’জনের নিঃশ্বাস মিলতে লাগল, রুমে স্রেফ তাদের নিঃশব্দ মিলনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল।
শেরাজ তার গলায় ঠোঁটের ছোট ছোট ছোঁয়া দিয়ে ভরিয়ে দিল। শেরাজের ছোঁয়ার সাথে সাথে সুমুর বুকের ওঠানামা বেড়ে গেল। সে হালকা কাঁপছে। কিন্তু তার মনের মধ্যে আছে একরকম বিশ্বাস আর আত্মসমর্পণ। সুমুর হাত অবশ হয়ে শেরাজের পিঠ আরও শক্ত করে আকড়ে ধরল। শেরাজ আলতো হেসে আবদারের সূরে বলল,
“একটু আদর করো না, বউ।”
সুমু আলতো হেসে শেরাজের কপালে গভীরভাবে ঠোঁটে ছোঁয়াল। শেরাজ চোখ বন্ধ করে অনুভব করল। সুমু ধীরে ধীরে শেরাজের গালে আলতো ঠোঁটের স্পর্শ করল। পরমুহূর্তে সে শেরাজের চোখের পাতা জুড়ে হালকা ঠোঁটের ছোঁয়া দিল। তারপর সে শেরাজের ঠোঁটের দিকে ধীরে এগিয়ে গিয়ে গভীরভাবে ঠোঁট ছোঁয়াল। শেরাজ চোখ বন্ধ রেখেই তার ভালোবাসার স্পর্শ মাখা নিঃশ্বাস অনুভব করল। শেষে সুমু শেরাজের গলায় আলতো হাত রেখে ঠোঁটের স্পর্শ দিল। শেরাজ তার প্রেয়সীর এই গভীর ভালোবাসা অনুভব করতে লাগল। রুমের মধ্যে নিস্তব্ধতা বয়ে গেল। শুধু শোনা গেল দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ।
চলবে..?