#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_69 ✦ প্রথমাংশ ✦
নতুন দিনের শুরু হলো। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ধরণীকে আলোয় ভরিয়ে তুলছে। গাছে গাছে পাখিরা মিষ্টি সুরে গান গাইছে। শেখবাড়ির সকল আত্মীয়-স্বজনদের জন্য বাড়ির বাহিরে গার্ডেনে চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে নাস্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে, আর বাড়ির ভেতরের টেবিলে বাড়ির সকলের জন্য নাস্তার আয়োজন করা হয়েছে। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, সাথে পরোটা, সবজি, ডিম আর সেমাই। সকলে একসাথে বসে ব্রেকফাস্ট করছে। পরিবেশটা একেবারে শান্ত, তবে ভেতরে উৎসবের আমেজ টের পাওয়া যাচ্ছে—কারণ আজ সন্ধ্যায় সামিয়াদের গায়ে হলুদ। গার্ডেনে সাখাওয়াত সাহেব, শামীম সাহেব, ইফতিয়াক সাহেব, আনোয়ার সাহেব, সকল আত্মীয়স্বজনদের দেখাশোনা করছে। বাড়ির ভেতরে বাড়ির মহিলারা সবটা সামলাচ্ছে।
খাবার টেবিলে সকলে উপস্থিত। হঠাৎ আশিক কফির কাপ নামিয়ে রেখে গম্ভীর গলায় বলল,
“শুনলাম, কাল রাতে নাকি পিয়াস ভাইয়ার পার্টির একটা ছেলে, ওই যে পাড়ার মোড়ে মোজাম্মেল চাচার ছেলে অর্ণব। সে নাকি বাড়ি ফেরেনি। সকলে ভেবেছিল, বোধহয় বন্ধুদের বাসায় আছে, কিন্তু ফোনে বার বার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি। শেষমেশ সব বন্ধুদের থেকেও কোনো খোঁজ মেলেনি তার। ছেলেটা নাকি পুরো উধাও।”
টেবিলের চারপাশে মুহূর্তেই নিরবতা নেমে এলো। কারো চামচের শব্দ থেমে গেল, কেউ থমকে গেল আধখাওয়া পরোটা মুখে নিয়েই। নাজমিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“উধাও মানে? মানুষ হাওয়ায় মিলিয়ে যায় নাকি?”
ফারিন কৌতূহলী গলায় বলল,
“কাল রাতেই তো শেষবার ওকে দেখা গেছিল, তাই না? এই বাড়িতে এসেছিল তো।”
সুমুর হাত থেমে গেল। তার চোখ এক ঝলক ঘুরল শেরাজের দিকে। তারপর সে একবার আরিয়ান আর রায়য়ানের দিকে তাকাল। শেরাজ মাথা নিচু করে নীরবে খেতে থাকল, যেন কিছুই শোনেনি। রায়য়ান আর আরিয়ান একে অপরের দিকে ক্ষণিকের জন্য তাকাল, তারপর চোখ সরিয়ে নিল। তাদের দুজনের মুখ অস্বাভাবিকভাবে গম্ভীর।
সুমুর তিনজনকে একবার পরখ করে দেখে মনে মনে বলল,
“হঠাৎ ছেলেটা উধাও কীভাবে হলো? কালরাতে তো এই বাড়িতে ওই ছেলের সাথে একটা ছোট ঝামেলা হলো, আর আজ সে উধাও। কে করতে পারে এই কাজ। খান সাহেব, আরিয়ান নাকি রায়য়ান? কিন্তু আরিয়ান আর রায়য়ান তো এমন না। আর খান সাহেব তো কাল বাড়িতেই ছিল।”
নিজের মনকে নিজেই প্রশ্ন করল সুমু। চারপাশের অস্বস্তিকর নীরবতায় শুধু কাঁটাচামচের শব্দ আর চায়ের কাপ নামানোর টুং শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সুমুর ভেতরে প্রশ্নের ঝড় থামছিল না। তার বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠছিল। হঠাৎই সে চমকে উঠে আশিকে বলল,
“এই ব্যাপারটা কিন্তু সিরিয়াস। একটা ছেলে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল, আর কোনো কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না—এটা স্বাভাবিক না। আমি বলি, তাদের থানায় খবর দেওয়া উচিত।”
আশিক গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, মোজাম্মেল চাচার জায়গায় আমার বাবা হলে তো আজকেই জিডি করত।”
টেবিলের সবাই এ নিয়ে কথা বলতে শুরু করল। মহিলারাও উদ্বিগ্ন চোখে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিল। শেরাজ তখনও মাথা নিচু করে খাচ্ছিল। তার আঙুলে কাঁটাচামচের শব্দটা বারবার ধাতব ঠকঠক আওয়াজ তুলছিল। রায়য়ান ঠোঁট চেপে ধরেছিল, যেন ভেতরে ভেতরে নিজের রাগ বা অস্থিরতাকে চেপে রাখছে। আরিয়ান হালকা কাশির ভান করে নিজের চেয়ারে হেলান দিল।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে একটা কণ্ঠ শোনা গেল,
“মোজাম্মেল চাচা এসেছেন।”
সবাই একসাথে চমকে উঠল। কয়েক মুহূর্ত আগেই যার ছেলের খোঁজে আলোচনা হচ্ছিল, তিনি বাড়ির ড্রয়িংরুমে সাখাওয়াত সাহেবের সাথে প্রবেশ করলেন। তার মুখ শুকনো, চোখ লাল, যেন সারারাত একফোঁটা ঘুম হয়নি। তিনি ঢুকেই ভারী গলায় বললেন,
“আজ আপনাদের বাড়িতে একটা আনন্দের দিন। কিন্তু কি করব বলুন, ভাই? কালরাত থেকে আমার ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছি না। কারো কাছে কি কোনো খবর নেই?”
বাড়ির ভেতর হঠাৎ করে চাপা নীরবতা নেমে এলো। সুমু নিঃশ্বাস আটকে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ শান্ত মুখে উঠে দাঁড়িয়ে সুমুকে বলল,
“বসে না থেকে, খেয়ে নাও। তুমি ভুলে যাচ্ছ, তোমাকে এখন রুটিন মেনে খেতে হয়।”
শেরাজের হঠাৎ করে সুমুকে উদ্দেশ্য করে বলা কথায় সবাই কিছুটা থমকাল। সুমু হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকাল, তারপর জোর করে ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে চামচ হাতে নিল। বুকের ভেতরটা তখনও কাঁপছে তার।
মোজাম্মেল সাহেব সোফায় বসতেই সাখাওয়াত সাহেব সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে বললেন,
“আপনি চিন্তা করবেন না, ভাই। মাত্রই তো সকাল হলো। সবাই মিলে খোঁজ করলে আশা করি পাওয়া যাবে।”
মোজাম্মেল সাহেব ভারী গলায় বললেন,
“থানায় গেছি, আশেপাশের সব বন্ধুদের বাড়ি ঘুরেছি। কিছুতেই খুঁজে পাইনি। ফোনটাও বন্ধ পাচ্ছি। বুকের ভেতরটা অস্থির হয়ে আছে, মনে হচ্ছে কোনো অঘটন ঘটেছে।”
পরিবেশে আবারও হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এলো। উৎসবের আবহ যেন মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। নাজমিন আস্তে করে বলল,
“কোথায় নেশা করে পড়ে আছে।”
সামিয়া দ্বিধাভরা কণ্ঠে নিচুস্বরে বলল,
“কালরাতেও এখানে এসে ঝামেলা করেছে, আর এখন গায়েব। কে জানে, কোথায়, কোন মেয়ের সাথে অসভ্যতামি করতে গিয়েছে, আর সেখানে লোকজন ধরতে পেরে বেঁধে রেখেছে।”
নাজমিন ঠোঁট টিপে হাসল। রোজা ভ্রু কুঁচকে শেরাজদের দিকে একপলক তাকিয়ে আবারও খাওয়াতে মন দিল।
সাখাওয়াত সাহেব গম্ভীর মুখে ঠাণ্ডা গলায় বললেন,
“ছেলেপেলেরা তো মাঝে মধ্যে বন্ধুদের সাথে বাইরে রাত কাটায়। হয়তো ও অন্য কোন দূরের বন্ধুর বাড়িতে আছে। ফোনে হয়ত চার্জ নেই। আর অর্ণব বাবা হয়ত এখনো ঘুমিয়ে আছে। ভাইজান আপনি চিন্তা করবেন না। অর্ণব ঠিক ফিরে আসবে।”
তাদের আলোচনার সময় রায়য়ান আর আরিয়ান একদম চুপচাপ বসে রইল। দুজনেই কারও চোখের দিকে তাকাল না, যেন কিছুই জানে না। তাদের এই অস্বাভাবিক নীরবতা রোজা আর আইয়ুবদের চোখ এড়াল না।
মোজাম্মেল সাহেব ভারী নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“আচ্ছা, আমি যাচ্ছি। যদি কারো কাছে কোনো খবর আসে, দয়া করে আমাকে জানাবেন।”
তিনি চেয়ার থেকে উঠে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোলেন। কিছু আত্মীয় তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বিদায় জানাল।
তিনি চলে যেতেই ঘরে এক মুহূর্তের জন্য চাপা নীরবতা নেমে এলো। কারো চায়ের কাপ নামানোর শব্দ পর্যন্ত যেন কানে বিঁধছিল। তখনই সাখাওয়াত সাহেব কাশি দিয়ে সবার দৃষ্টি নিজের দিকে টেনে নিলেন। শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“শোনো সবাই! আমাদের এখন একটা দায়িত্ব আছে। এই বাড়িতে এখন আনন্দের দিন। সকলে মন খারাপ করলে চলবে না। আল্লাহ্ ভরসা, অর্ণব ঠিক ফিরে আসবে। এখন সবাই সামিয়াদের গায়ে হলুদের প্রস্তুতিতে মন দাও।”
তার কথায় পরিবেশে একটু হলেও ভার কমলো। মহিলারা আবারও নিজেদের কাজে মন দিল। আশিক নাস্তা শেষ করে চেয়ার-টেবিল গোছাতে সাহায্য করতে গেল। সাখওয়াত সাহেবও চলে গেলেন। সবকিছু যেন আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠল। সকলে নাস্তা শেষ করে যার যার কাজে মন দিল।
গার্ডেনের আঙিনায় রঙিন কাপড় ঝোলানো শুরু হলো। ফুলওয়ালা এসে পৌঁছাল টাটকা গাঁদা আর গোলাপের মালা নিয়ে।
শেখবাড়ির ভেতরে রান্নাঘর জমজমাট। বিশাল হাঁড়িতে ভাজা হচ্ছে পিয়াজু আর কাবাব, অন্যদিকে মিষ্টির ট্রে সাজানো হচ্ছে। রান্নাঘরের চারপাশে সুগন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে, যেন উৎসবের ঘ্রাণ পুরো বাড়িটাকেই আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
এদিকে ছেলেরা মঞ্চ সাজাতে ব্যস্ত। রঙিন কাপড়, লাইট আর ফুল দিয়ে সাজানো হচ্ছে গায়ে হলুদের আসর। কয়েকজন আবার ডিজে সেট আর সাউন্ড সিস্টেম ঠিকঠাক করছে।
পুরো পরিবেশে উৎসবের আমেজ। হাসি-ঠাট্টা, কাজের ব্যস্ততা আর গান-বাজনায় বাড়িটা যেন আলোয় আর আনন্দে ভরে উঠছে।
•
সন্ধ্যা নামতেই শেখবাড়ি রঙিন আলোয় ঝলমল করে উঠল। চারপাশে লাইট ঝুলছে, গার্ডেনে রঙিন কাপড় আর ফুল দিয়ে সাজানো মঞ্চ। গায়ে হলুদের আমেজে পুরো পরিবেশটাই উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে।
ঘরটা আলো আর ফুলে ভরে গেছে। গায়ে হলুদের উজ্জ্বল আবহে তিনজন বোনকে বসানো হয়েছে মাঝখানে। সামিয়া পরেছে গাঢ় হলুদ লেহেঙ্গা, যার ঘেরজুড়ে ঝলমলে সোনালি কাজ করা। মাথায় বেলি আর গাঁদা ফুল দিয়ে খোঁপা, গলায় গাঁদা ফুলের মালা, হাতে ফুল দিয়ে বানানো গাজরা। তার সাজ নিখুঁত হলেও মুখে তেমন হাসি নেই। চোখে এক ধরনের অস্বস্তি, ঠোঁটে জোর করে রাখা হালকা হাসি। মাঝে মাঝে আঙুল দিয়ে লেহেঙ্গার ঘের টানছে—যেন মন তার অন্য কোথাও।
ফারিয়া একেবারে উচ্ছ্বাসে ভরা। তার লেহেঙ্গা সামিয়ার লেহেঙ্গার মতোই হলুদ, তবে ব্লাউজের গলায় আর হাতায় রঙিন সুতো দিয়ে সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি করা। মাথার খোঁপায় লাল-সাদা গোলাপ গুঁজে দেওয়া হয়েছে। সে খিলখিল করে হাসছে, আশেপাশে যারা বসেছে তাদের সাথে লাগাতার মজা করছে।
নাজমিন এর সাজটা একেবারেই স্নিগ্ধ। হালকা হলুদ লেহেঙ্গার সাথে সবুজ দুপাট্টা, যা ফুল দিয়ে আটকানো। গলায় সাদা ফুলের মালা, হাতে গাঁদা ফুলের গাজরা।
ঘরের ভেতর অন্য মেয়েরা হাসি-ঠাট্টায় মেতে আছে, সামিয়ার মুখের অনাগ্রহ কারো চোখ এড়াচ্ছিল না। বিশেষ করে সুমুর। সে সামিয়ার চোখে তাকিয়ে দেখল, বোনটা যেন জোর করে সবকিছুতে অংশ নিচ্ছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কোথাও যেন ভারী হয়ে আছে।
হলুদের স্টেজটা সাজানো হয়েছে তাজা ফুল দিয়ে। গাঁদা আর গোলাপের মালা ঝুলছে চারপাশে। রঙিন ফেয়ারি লাইট জ্বলছে টিমটিম করে, চারদিকে ঝলমলে আবহ। হলুদ কাপড়ে মোড়ানো কুশন আর আসন রাখা হয়েছে স্টেজের মাঝখানে।
সামিয়াদের তিন বোনকে ধীরে ধীরে স্টেজে নিয়ে আসা হলো। সামিয়া মাঝখানে, দুপাশে ফারিয়া আর নাজমিনকে বসানো হলো। সামিয়া মাথা নিচু করে বসে রইল। ঠোঁটে জোর করে টেনে আনা হাসি, কিন্তু চোখ দুটো যেন ভারী হয়ে আছে। তার গায়ের হলুদ লেহেঙ্গা আর ফুলের গয়না তাকে রূপকথার রাজকন্যার মতো সাজিয়ে তুলেছে, তবুও ভেতরের অস্বস্তি তার মুখের অভিব্যক্তি লুকোতে পারছে না।
ফারিয়া আর নাজমিন খুশিতে উজ্জ্বল। তাদের হলুদের সাজ, হাসি আর প্রাণচাঞ্চল্য চারপাশের পরিবেশে প্রাণ ঢেলে দিয়েছে। তারা গান আর হাসিতে মাতিয়ে রাখছে। অতিথিরা মোবাইল বের করে ছবি তুলছে, ভিডিও করছে।
এদিকে পিয়াস, শাহরুখ আর আইয়ুবকে আলাদা স্টেজে একসাথে বসানো হলো। বাড়ির বড়রা একে একে প্রথমে গিয়ে পিয়াসদের গায়ে হলুদ ছুঁয়ে তাদের মিষ্টি খাইয়ে দিল। তারপর তারা চলে গেলে সামিয়াদের কাছে।
বড়দের হলুদ ছোঁয়ানো শেষ হতেই সব মেয়েরা এগিয়ে গেল। সকলে একে একে তাদের ছয়জনের মুখে হলুদ মাখিয়ে দিল। হলুদের রঙে ভরে উঠেছে স্টেজটা।
হঠাৎই সামিয়ার দৃষ্টি চলে গেল ভিড়ের একপাশে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে রাহিন। সামিয়ার বুক কেঁপে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস আটকে গেল।
হঠাৎ চারপাশে আবার হইচই পড়ল। সামিয়াদের গায়ে হলুদ লাগানোর জন্য একে একে ছেলেদের ডাকা হলো।
শামীম সাহেব মজার ছলে বললেন,
“এই যে, মেয়েদের হলুদ লাগানো শেষ, এখন ছেলেদের পালা। তোমরা ছেলেরা এগিয়ে যাও।”
সবাই হেসে উঠে দাঁড়াল। অমিত, আরবাজ, সারবাজ, নিহাল—এক এক করে এগিয়ে গেল। তারা আগে পিয়াসদের গালে হলুদ লাগিয়ে এগিয়ে গেল সামিয়াদের দিকে। রাহিন আইয়ুবের গালে হলুদ লাগিয়ে চলে যেতে নিলে সারবাজ রাহিনকে আটকে দিল। অমিতরা আগে গিয়ে সামিয়াদের গালে আস্তে করে হলুদ মেখে দিল। ফারিয়া আর নাজমিনের গালেও লাগাল। চারপাশে হাততালি আর হাসির রোল উঠল।
রাহিন সারবাজের হাত ছেড়ে একটু পেছনে সরে দাঁড়াল। তার মুখে কোনো হাসি নেই। চোখে অদ্ভুত অস্বস্তি। সে নিচু গলায় বলল,
“আমি যাব না, আমাকে ছাড়।”
সারবাজ মজা করে তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“কী রে, এত লাজুক হলি কবে থেকে? চল না, সামিয়া তো তোরও বোনের মতো।”
রাহিন রাগিলুকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি বলছি, আমি যাব না। ছাড় তো, ভালো লাগছে না।”
আইয়ুব তাদের দেখে স্টেজ থেকে নেমে এসে হেসে বলল,
“আরে না গেলে হবে নাকি? আজ কারো ছাড় নেই। চল, আমিও হলুদ লাগাব আমার শ্যামকন্যাকে।”
রাহিন যেতে চাইল না। তারা দুজন মিলে হইচই করে রাহিনকে টেনে স্টেজের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। রাহিন হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার চেষ্টার কোনো ফল হলো না। অমিতরা হাসতে হাসতে বলল,
“আজ না বলে কোনো উপায় নেই, তোকে যেতেই হবে।”
স্টেজে উঠে যখন তাকে সামিয়ার সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো, তখন রাহিনের বুকটা ধক করে উঠল। সামিয়া মাথা নিচু করে বসেছিল, কিন্তু রাহিনকে সামনে দাঁড়ানো দেখে একবার মুখ তুলে তাকাল।
দু’জনের চোখ কয়েক সেকেন্ডের জন্য মিলল। সামিয়ার চোখে তখনো সেই চাপা বিষণ্ণতা। রাহিন মুহূর্তেই সরে যেতে চাইল, কিন্তু চারপাশ থেকে হাততালি আর হাসি ভেসে উঠল। সারবাজ হলুদের বাটি রাহিনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“চল, এখন লাগা!”
রাহিন কাঁপা হাতে বাটি ধরল। কিন্তু তার আঙুল যেন নড়ছিল না। সে জোর করে সামিয়ার গালে সামান্য হলুদ ছুঁইয়ে দিল। সামিয়ার ঠোঁটে হালকা কাঁপন খেলে গেল।
চারপাশে সবাই আবারও হেসে উঠল। কিন্তু তাদের ভেতরে ভেতরে যে অন্যরকম কিছু চলছে, সেটা কেউ বুঝতেই পারল না।
রাহিন হলুদ লাগিয়ে নামতেই স্টেজের চারপাশে আবার করতালি বেজে উঠল। সে ভিড়ের মধ্যে জায়গা করে নিচে নামল। ঠিক তখনই শাহরুখ আর পিয়াস স্টেজ থেকে নেমে সামিয়াদের দিকে এগিয়ে এলো।
সামিয়া ভেতরে ভেতরে অস্বস্তিবোধ আরও বেড়ে গেল। মুহূর্তখানেক আগে রাহিনের চোখের দৃষ্টি তার বুকের ভেতর ঝড় তুলেছিল। এখন আবার পিয়াস—দুজনের আগমন যেন তাকে আরও ভারাক্রান্ত করে তুলল।
শাহরুখ এসে প্রথমে হাসিমুখে সামিয়ার গালে হলুদ মাখিয়ে বলল,
“আমাদের সামুকে আজ একদম রাণীর মতো লাগছে।”
পিয়াস, সামিয়ার পেছনে দাঁড়িয়ে চাপাস্বরে বলল,
“সত্যিই, আজকে সবাইকে হার মানিয়েছিস।”
সামিয়া চুপ করে রইল। তার মনের মধ্যে চলা ঝড়কে সে বার বার ঢাকতে চেষ্টা করল। এরই মধ্যে নাচ-গান শুরু হলো। নাচ-গানের আয়োজনে প্রথমে স্টেজে ডাকা হলো আইয়ুব আর নাজমিনকে। সাউন্ড সিস্টেম গান বেজে উঠল,
“মন ভাবে তারে,
এই মেঘলা দিনে!
শীতল কুয়াশাতে,
তার স্পর্শে!
তার রুমঝুম নুপুরের সাজে,
বাতাসে যেন মৃদু সুবাসে!
নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক,
পায়েল খানি বাজে!
মাদল বাজে সেই সঙ্গেতে,
শ্যামা মেয়ে নাচে!”
আইয়ুব আর নাজমিন ধীরে ধীরে স্টেপ মিলিয়ে নাচছে। নাজমিনের লেহেঙ্গা ঘুরতে ঘুরতে বাতাসে ভাসছে, চুলের ছোট্ট ফুল আর পায়ে পড়া নুপুরের ঝিনিক মিলিয়ে এক অনন্য ছন্দ তৈরি করছে। আইয়ুব হাসিমুখে তার পাশে তাল মিলিয়ে নাচছে, মাঝে মাঝে নাজমিনের দিকে হালকা চোখে তাকিয়ে উৎসাহ দিচ্ছে।
ভিড়ের মধ্যে থাকা সকলে উচ্ছ্বাসে হাততালি দিচ্ছে। কেউ কেউ ফোনে ভিডিও করছে। কেউ স্টেজের আলোও তাদের নাচের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে, গার্ডেনের চারপাশে আনন্দের ঝংকার ছড়িয়ে পড়ছে।
সারবাজরা একপাশে বসে চুপচাপ নাচ দেখছিল। হঠাৎই ইনায়া তাদের কাছে এলো। অমিতরা ইনায়াকে দেখে হাসতে হাসতে চলে গেল। সারবাজও উঠে যাওয়ার চেষ্টা করল। ঠিক সেই মুহূর্তে ইনায়া দ্রুত তার দিকে এগিয়ে এসে সারবাজের হাত ধরে তাকে আটকালো।
সারবাজ রাগ দেখিয়ে বলল,
“কি করছেন?”
ইনায়া সারবাজের মুখে ‘আপনি’ সম্মোধন শুনে থমকালো। সে ব্যথাতুর হেসে বলল,
“আপনি? যাক ভালো! এতোটা পর করে দিলে যে, তুমি থেকে আপনিতে নিয়ে এলে। কিন্তু, তুমি উঠে চলে যাওয়ার আগে আমাকে একটু সময় দাও।”
সারবাজ তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
“কোথায় যেন পড়েছিলাম, আপনি থেকে তুমিতে আসার গল্পটা অনেক সুন্দর। তবে, তুমি থেকে আপনিতে যাবার গল্পটা অনেক বেদনার।”
ইনায়া দম বন্ধ হয়ে আসা কণ্ঠে বলল,
“সারবাজ! আমি জানি, আমি ভুল করেছি। কিন্তু আজ আমি সত্যি বলছি, আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবাসি। শুধু একবার আমাকে সুযোগ দাও, তুমি দেখবে আমি কতটা পরিবর্তিত।”
সারবাজ ঠোঁট চেপে ধরল। তার ভেতরটা অস্থির। সে চুপচাপ ইনায়ার চোখে চোখ রাখল। মুহূর্তটা ভারাক্রান্ত, যেন সময় থমকে গেছে। ইনায়া ধীরে ধীরে বলল,
“আমার ভালোবাসা তোমার জন্য, সারবাজ। আমি সত্যি তোমাকে ভালোবাসি। প্লিজ, একটা শেষ সুযোগ দাও!”
সারবাজ হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“কেন? আবারও আমার মন নিয়ে খেলার জন্য? দেখো ইনায়া! আমি তোমাকে পরিষ্কার করে বলছি, আমার থেকে দূরে থাকো, প্লিজ।”
ইনায়ার চোখে অশ্রু জমে এলো। সে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“সারবাজ! আমি আজ মিথ্যা বলছি না। আজ আমি সত্যিই তোমার কাছে এলাম, নিজের ভুল স্বীকার করতে। তুমি আমাকে ইগনোর করো, তবুও আমি হাল ছাড়ব না। শুধু একবার বিশ্বাস করো আমাকে। আমি সত্যি সব ঠিক করে দেব।”
সারবাজের মন একটু নরম হলো, কিন্তু সে মুখে কিছুই প্রকাশ করল না।
“সরি, আমার দ্বারা আর সম্ভব না।”
ইনায়া তার হাত ধীরে ছেড়ে দিয়ে বলল;
“একদিন তুমি ঠিক বুঝবে। আর আমি অপেক্ষা করব সেই দিনটার।”
সারবাজ নীরবে তাকিয়ে রইল ইনায়ার দিকে। ইনায়া হতাশ হলেও চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে চলে গেল।
•
সামিয়াকে হলুদ দিয়ে শেরাজকে না বলেই নিজের রুমের চলে এলো সুমু। চোখের সামনে বোনের কষ্ট দেখতে ভালো লাগছে না তার, অন্যদিকে শরীরটাও একটু খারাপ লাগছে। রুমে ঢুকতেই হালকা নিঃশ্বাস ফেলল। দরজাটা ধীরে চাপিয়ে রেখে বেডে গিয়ে বসে রইল। চোখের সামনে সামিয়ার কষ্ট তাকে ভেতর থেকে কাঁপাচ্ছে। চোখ বন্ধ করে সে বলল,
“বোনটা এত কষ্টের মধ্যে আছে, আর আমি কিছু করতে পারছি না।”
পাশের ছোট বালিশে মাথা রেখে সে অনুভব করল—হৃদয়ের ভেতর অস্বস্তি আর দুশ্চিন্তা একে একে জড়িয়ে ধরছে। সুমু ধীরে হাত দিয়ে নিজের কপাল চাপল। মনে মনে বলল,
“যদি আমি কিছু করে বোনটাকে এই কষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারতাম।”
গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বালিশে মাথা গুঁজল। শরীরটা হালকা দুর্বল লাগছে, গায়ে একটু অসহনীয় ব্যথা। চোখ বন্ধ রেখেও মনে হচ্ছিল সামিয়ার কষ্টের ছাপ তার নিজের ভেতরে লেগে আছে।
হলুদ, ভিড়, খুশির মধ্যে লুকানো বোনের অশ্রু—সব মিলিয়ে সুমুর মনে একটা অদ্ভুত ভারী চাপ তৈরি করছে। সে জানে, সামিয়ার পাশে থাকার জন্য তার শক্তি দরকার।
তার এসব ভাবনার মাঝে হঠাৎ দরজা খোলার একটা শব্দ হলো। সুমু চোখ মেলে তাকাল। সে মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই গেলেই, কেউ একজন তার মুখ চেপে ধরল।
চলবে..?
#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_69 ✦ বর্ধিতাংশ ✦
সুমু ভয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল। হঠাৎই বুকের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক শুরু হলো। কিন্তু পরের মুহূর্তেই পরিচিত গন্ধ নাকে এলো। আতঙ্কের ভেতরেই তার বুকটা ধীরে ধীরে শান্ত হলো। সে গলা ভারী করে বলল,
“খান সাহেব?”
শেরাজ ধীরে হাত সরিয়ে নিয়ে ঠোঁটে একরকম নরম হাসি ফুটিয়ে তুলল। তার চোখের দৃষ্টিতে অদ্ভুত গভীরতা,
“হ্যাঁ, সুইটহার্ট! তুমি আমাকে এড়িয়ে চলে আসবে, আর আমি চুপ করে বসে থাকব?”
সুমু লজ্জা আর বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
“এভাবে হঠাৎ করে আসেন কেন? আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
শেরাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার পাশে বসে পড়ল। তার চোখ সুমুর ক্লান্ত মুখ আর নিস্তেজ চোখে আটকে গেল। সে নিচু গলায় বলল,
“আমি ভয় পাই তোমার জন্য। তুমি বুঝতেও পারো না, তোমার একেকটা অস্থির নিঃশ্বাস আমার বুকের ভেতর আগুন ধরায়। তুমিই বলো, তোমার মুখে এই দুর্বলতা দেখেও আমি কী বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি?”
সুমু কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। সে নিচু চোখে তাকিয়ে বালিশের কিনারা চেপে ধরল। শেরাজ ধীরে তার হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“তোমার বোনের কষ্ট তুমি একা বয়ে বেড়াচ্ছো, আমি জানি। কিন্তু মনে রেখো, তোমার কাঁধে এসব বোঝা রাখার অনুমতি আমি কখনও দেব না। তুমি আমার স্ত্রী, আমার বাচ্চাদের মা। তোমার প্রতিটা কষ্ট আমারও কষ্ট”, সে ধীরে সুমুর মাথার ওপর হাত রেখে বলল, “চোখ বন্ধ করো। বিশ্রাম নাও। আমি আছি, আমি সব সামলে নিব।”
সুমু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। বুকের ভেতর জমে থাকা সব অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা আর ক্লান্তি একসাথে বের হয়ে এলো। সে হঠাৎই মাথাটা শেরাজের বুকের ওপর হেলিয়ে দিল। চোখের জল আটকাতে না পেরে কেঁদেই ফেলল।
“আমি পারছি না, খান সাহেব। বোনটার কষ্ট দেখে আমি ভেঙে পড়ছি। কিছুই করতে পারছি না আমি ওর জন্য।”
শেরাজের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে শক্ত হাতে সুমুকে জড়িয়ে ধরে গম্ভীর গলায় বলল,
“সুইটহার্ট, কান্না থামাও। তোমাকে কিছু করতে হবে না। আমি আছি তো। তোমার প্রতিটা সমস্যার সমাধান করার দায়িত্ব আমার।”
সুমুর নিঃশ্বাস কাঁপছে। শেরাজ তার মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে দিল। সেই স্পর্শে সুমুর বুকের অস্থিরতা যেন ধীরে ধীরে কমে এলো। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা কাটিয়ে শেরাজ নিচু গলায় বলল,
“তুমি শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থেকো। আমি চাই না তোমার চোখে কোনো কষ্টের ছাপ থাকুক। তোমার এই চোখ দুটো শুধু আমাকে দেখার জন্য। তোমার হাসিটা ফিরিয়ে আনাই আমার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।”
সুমু ভাঙা গলায় বলল,
“আপনি থাকলে আমি শক্তি পাই।”
শেরাজ তার মুখটা হাতে নিয়ে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল।
“তাহলে প্রতিজ্ঞা করো, তুমি আর নিজেকে আড়াল করবে না। নিজের কষ্ট লুকাবে না। আমাকে জানাবে। আমি তোমাকে এক মুহূর্তও একা ফেলে রাখব না।”
সুমু কাঁদতে কাঁদতে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। সে আস্তে করে চোখ বন্ধ করে শেরাজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে লেগে রইল।
•
রাত তখন গভীর। শেখবাড়ির প্রতিটি কোণে নীরবতা নেমে এসেছে। বাইরে কেবল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরে কুকুরের হালকা ডাক শোনা যাচ্ছে। দিনের ক্লান্তি, হলুদের আনন্দ— সব মিলিয়ে সকলে এখন ঘুমে মগ্ন।
সুমুও ক্লান্তি আর কান্নার চাপে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সে হঠাৎই অনুভব করল—কারও নরম স্পর্শ তার কাঁধে। আধো ঘুমের মধ্যে সে চোখ মেলে তাকাতেই, শেরাজের মুখ। শেরাজ গম্ভীর অথচ কোমল কণ্ঠে বলল,
“সুইটহার্ট, উঠে এসো।”
সুমু বিস্মিত হয়ে উঠল,
“এই রাতের বেলা? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে, খান সাহেব?”
শেরাজ কিছু বলল না। সে আলতো করে তার হাত ধরে আয়নার সামনে বসাল। টেবিল ল্যাম্পের ক্ষীণ আলোয় ঘরটা যেন অন্যরকম আবহে ভরে উঠল। আয়নায় নিজের ক্লান্ত মুখ দেখে সুমু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। শেরাজ সুমুকে বসিয়ে রেখে কাবার্ড ভেতর থেকে আস্তে করে একটা স্কাই ব্লু কালারের শাড়ি বের করল। রেশমি কাপড়টা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় ঝলমল করে উঠল।
সুমু বিস্মিত চোখে তাকাল,
“খান সাহেব, আপনি শাড়ি আনলেন কেন?”
শেরাজ একটু রহস্যময় হাসল,
“কারণ, আমার সুইটহার্টকে আমি আজ নিজের হাতে সাজাতে চাই।”
সুমু ভ্রু কুঁচকালো,
“এতরাতে ঘুম থেকে তুলে কী শুরু করেছেন? আর আপনি গিয়েছিলেন কোথায়?”
শেরাজ কোনো জবাব দিল না। সে আলতো করে সুমুর কাঁধে শাড়িটা রাখল। তারপর ধীরে ধীরে তাকে দাঁড় করাল। সুমুর বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছে, হাতের আঙুলগুলো নার্ভাস হয়ে কাঁপছে।
শেরাজ খুব মনোযোগ দিয়ে প্রথমে কোমরে শাড়ির পাড় গুঁজে দিল। তারপর আস্তে আস্তে ভাঁজ করে করে শাড়ি পেঁচাতে লাগল। সুমু চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, ঠোঁট শুকিয়ে এসেছে তার। শেরাজের হাতের উষ্ণ স্পর্শে শরীর কেঁপে উঠছে বারবার।
শাড়ির আঁচল যখন কাঁধে তুলে দিল, তখন শেরাজ একটু থেমে সুমুর চোখে তাকাল। শেষে আঁচলটা গুছিয়ে ঠিক করল সে। তারপর আয়নার সামনে সুমুকে দাঁড় করিয়ে পেছনে গিয়ে বলল,
“দেখো তো, কেমন লাগছে?”
আয়নায় সুমু দেখল—সে যেন একেবারে নতুন রূপে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের নিচের ক্লান্তি ঢাকা পড়ে গেছে। তার শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে আছে শেরাজের নিঃশব্দ ভালোবাসা। মৃদু হেসে বলল,
“আপনার চোখ দিয়ে দেখেছি নিজেকে। আমাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। এই আয়নার কোনো প্রয়োজন নেই আমার।”
শেরাজ আলতো হেসে ধীরে ধীরে তার এলোমেলো চুল ঠিক করে দিল। এরপর ড্রয়ার থেকে একটা ছোট্ট বাক্স বের করে আনলো। ভেতরে সোনালী রঙে কাজ করা কানের দুল। সেটা সুমুর কানে পরিয়ে দিতে দিতে নিচু গলায় বলল,
“তুমি যখন কাঁদো, তখন আমার কলিজাটা ছিঁড়ে যায়। তাই আমি চাই না তোমার মুখে আর অশ্রুর ছাপ থাকুক। আজকে তোমাকে আবার নতুন করে সাজাতে চাই।”
সুমু স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। চোখ ভিজে এলেও শেরাজ তার চিবুক তুলে ধরে বলল,
“না, আজকে আর কান্না নয়। আজ শুধু হাসি চাই।”
শেরাজ এবার নিজ হাতে সুমুর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক ছোঁয়াল, চুলে গুঁজে দিল সাদা ফুল। হাতে পরিয়ে দিলে বেলিফুলের গাজরা।
আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সুমু অবাক হয়ে গেল—ক্লান্তি আর অশ্রুর ছাপ মুছে দিয়ে তাকে যেন সত্যিই নতুন করে সাজিয়ে তুলল শেরাজ। সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। শেরাজ তার কানে ফিসফিস করে বলল,
“এভাবেই চাই তোমাকে সবসময়, সুইটহার্ট। পৃথিবীর সব দুঃখ ঢেকে দিয়ে শুধু আলো হয়ে আমার পাশে থাকবে।”
সুমুর চোখ ভিজে উঠল, তবে এবার অশ্রু ছিল আনন্দের। শেরাজ সুমুর চোখ মুছে দিয়ে তাকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
•
বর্ষার পানিতে পুকুরের পানি আর খাল-বিলের পানি এক হয়ে মিশে গেছে। জোৎস্না রাতে চাঁদের আলো নারিকেল গাছের ফাঁক দিয়ে ঝিলমিল করে পানির ওপর পড়ছে। পানির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঢেউয়ের সাথে চাঁদের আলো যেন নেচে উঠছে। চারপাশে শত শত জোনাকি উড়ছে, বাতাসে হালকা মৃদু খুসখুস শব্দ। একটু দূরে বিলের পানিতে শাপলা আর পদ্মফুল ফুঁটেছে।
শেরাজ সুমুর চোখ বেঁধে বাড়ির পেছনের পুকুর পাড়ে নিয়ে এলো। পুকুর পাড়ে পৌঁছতেই সে ধীরে সুমুর চোখ থেকে কাপড় খুলে দিল। সুমু চোখ খুলতেই যেন রূপকথার রাজ্যে পা দিয়েছে। বিস্ময়ে তার যেন মুখের শব্দ হারিয়ে গেল। সামনে রাখা নৌকা, যেটা ফুল আর গোলাপের পাপড়ি দিয়ে সাজানো। নৌকাটিতে ফুলের বিছানা তৈরি করা হয়েছে, এবং চারপাশে রাখা তাজা ফুলের সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
সুমুর হৃদয় ধুকধুক করতে লাগল। বাতাসের সঙ্গে ফুলের গন্ধ আর জোনাকির আলো মিলিয়ে রাতের পরিবেশ একেবারেই রূপকথার মতো করে দিল। শেরাজ ধীরে হাত বাড়িয়ে সুমুর হাত ধরল। সে সুমুর হাত ধরে নৌকায় উঠাল। সে সুমুকে শত শত ফুলের মধ্যে ফুলের পাপড়ির বিছানার ওপর বসিয়ে দিল। নিজে গিয়ে নৌকার শেষ প্রান্তে বসে বৈঠা হাতে তুলে নিল। নৌকা ধীরে ধীরে পুকুরের মধ্য দিয়ে ভেসে যেতে লাগল। চারপাশের জোনাকি ছোট ছোট আলো ফোটাচ্ছে। চাঁদের আলো পানি স্পর্শ করে রূপালি রেখা তৈরি করছে, আর ফুলের গন্ধ বাতাসে মৃদু ঢেউ হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে।
সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। নৌকার দোলায় দুলতে থাকা চাঁদের আলো যেন তার চোখে প্রতিফলিত হচ্ছিল। সে আস্তে বলল,
“খান সাহেব! এত কিছু আমার জন্য?”
শেরাজ বৈঠার ছন্দ থামাল না। শুধু গভীর চোখে তাকাল সুমুর দিকে, ঠোঁটে এক অদ্ভুত শান্ত হাসি খেলল তার।
“হুম, সুইটহার্ট! তোমাকে অবাক করার জন্যই সব। তুমি আমার জীবনে আসার পর থেকে প্রতিটা মুহূর্তকেই আমি রূপকথায় পরিণত করতে চাই।”
সুমু নিচু হয়ে হাতের তালুতে ছড়ানো গোলাপের পাপড়ি নিয়ে শেরাজের দিকে ছুঁড়ে দিল। পাপড়ি বাতাসে ভেসে গিয়ে শেরাজের গায়ে গড়িয়ে পড়ল।
শেরাজ থেমে গেল। সে হালকা হাসি দিয়ে বৈঠা নামিয়ে রাখল। ধীরে নৌকার শেষ প্রান্ত থেকে উঠে এসে সুমুর সামনে বসল। সুমুর হাত ধরে নিজের বুকের ওপর রাখল।
“শোনো! এই রাতের মতোই আমি চাই তোমার প্রতিটা দিন শান্তি আর ভালোবাসায় ভরে থাকুক। আমি তোমার সব অশ্রু, সব কষ্ট চুরি করে নিতে চাই।”
সুমু নিচু গলায় বলল,
“আপনি থাকলেই আমার কষ্টগুলো গলে গিয়ে শান্তিতে পরিণত হয়, খান সাহেব।”
শেরাজ তার মুখের ওপরের চুল সরিয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“তাহলে আজ থেকে শুধু হাসবে। আমার সুইটহার্ট কষ্টে থাকলে সেটা আমার সহ্য হয় না।”
সুমু আলতো হাসল। চারপাশে বাতাসে ফুলের ঘ্রাণ, জোনাকির আলো আর জোৎস্না মিলেমিশে মুহূর্তটাকে আরও জাদুময় করে তুলল। নৌকা ধীরে দুলে চলল, আর তাদের নীরবতা ভরে উঠল শুধু হৃদয়ের শব্দে।
মাঝবিলে এসে নৌকাটা যেন থমকে গেল। চারপাশ নিস্তব্ধ—শুধু পানির টলমল শব্দ আর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। সুমু ফুলের পাপড়ির নরম বিছানায় এক’পা ভাঁজ করে শুয়ে আছে, তার শাড়ির লম্বা আঁচল বাতাসে উড়ে পানির ওপর নেচে বেড়াচ্ছে। সে মৃদুস্বরে গান গাইছে,
“রাতের সব তারা আছে দিনের গভীরে,
বুকের মাঝে মন যেখানে, রাখব তোকে সেখানে,
তুই কি আমার হবি রে?”
শেরাজ বৈঠা চালাতে চালাতে একবারে থেমে গিয়ে সুমুর দিকে তাকাল। মুখে মৃদু হাসি নিয়ে বলল,
“সুইটহার্ট!”
সুমু চাঁদের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল,
“হুম!”
শেরাজ হেসে বলল,
“তোমাকে হাসানোই ছিল আমার আসল উদ্দেশ্য। আর সেটা আমি পেরেছি।”
সুমু ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হলো।
“খান সাহেব! আপনি সত্যিই পাগল।”
শেরাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে নৌকার প্রান্ত থেকে কিছু ফুল তুলে এনে সুমুর চারপাশে ছড়িয়ে দিল। পাপড়িগুলো উড়ে গিয়ে তার চুলে, শাড়িতে লেগে গেল।
“পাগল তো কবেই হয়েছি। তবে এই পাগলামি শুধু তোমার জন্য।”
সুমু হালকা হেসে চোখ বন্ধ করল। সেই হাসিটাই ছিল শেরাজের জয়। তার বুকটা ভরে উঠল এক অদ্ভুত তৃপ্তিতে। হঠাৎ শেরাজ পকেট থেকে ফোন বের করে “শাহরুখ খান” আর “তাপসী পান্নুর” ডানকি মুভির “ও মাহি” গানটা প্লে করল। এমন রোমাঞ্চকর পরিবেশ, সুমুর প্রাণখোলা হাসির সাথে গানটা যেন সময়টাকে আরও সুন্দর করে তুলল।
সুমু উঠে বসল। নৌকার একদম সাইডে বসে হালকা কাপড় তুলে বিলের জলে পা ডোবাল। সে হাত বাড়িয়ে কয়েকটা শাপলা আর পদ্মফুল তুলে নিল হাতে। পানিতে পা ডুবিয়ে মৃদু ঢেউয়ের পরশ উপভোগ করছে সে। তার হাতে ধরা শাপলা আর পদ্মফুলগুলো চাঁদের আলোয় আরও সুন্দর লাগছে।
শেরাজ অনেকগুলো পদ্মফুল ফুলে একটা সুন্দর ক্রাউন বানালো। বৈঠা রেখে উঠে এসে সুমুর মাথায় পরিয়ে দিল। সুমু আলতো হাসল। শেরাজ পাশে বসে প্যান্ট ফোল্ড করে পানিতে পা ডুবাতেই দুজনের পায়ের ছোঁয়ায় পানিতে ছোট ছোট ঢেউ তৈরি হলো। গানটা তখনও হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে, আর রাতের পরিবেশকে আরও স্বপ্নময় করে তুলছে।
সুমু শেরাজের কাঁধে মাথা রেখে বিলের পানির দিকে তাকিয়ে রইল। শেরাজ সুমুর হাত থেকে একটা পদ্মফুল নিয়ে বলল,
“এই ফুলের মতোই তুমি! শান্ত, সুন্দর আর পবিত্র।”
সুমু ধীরে বলল,
“আমি এইটা ভেবেই অবাক হচ্ছি যে, একটা মানুষ একটা মানুষকে কতটা ভালোবাসলে তার একটু মন খারাপ দেখে, এই মাঝরাতে নিজের ঘুম বাদ দিয়ে সেই মানুষটাকে ঘুম থেকে তুলে, তাকে একটু হাসানোর জন্য এতসব আয়োজন করে।”
শেরাজ একটু থমকে গেল। সে সুমুকে একহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমি আপনাকে ঠিক ততটাই ভালোবাসি, যতটা ভালোবাসার কথা সাত যুগ ভেবে কেটে গেলেও, আপনার কল্পনার সীমায় ধরা দেবে না। আমি আপনাকে ততটাই ভালোবাসি, যতটা ভালো সাত যুগ ধরে আপনি কাউকে বেসে গেলেও, আপনার ওই ভালোবাসা আমার ভালোবাসার গভীরতার কাছে পৌঁছাতে পারবে না, ম্যাডাম। সুমু আর শেরাজ একে অপরের জন্য সৃষ্টি। তাদেরকে আলাদা করে ভাবা সম্ভব না, আর এভাবেই সুমু আর শেরাজ মিলে তৈরি হয়েছে— ‘সুমুরাজ’।”
সুমু শেরাজের কাঁধে মাথা রেখে চুপচাপ রইল। রাতের নীরবতা তাদের মাঝে যেন আরও ঘন হয়ে উঠল। শুধু ফোনের মৃদু গান শোনা গেল।
সুমু ধীরে উঠে আবারও ফুলের পাপড়ির বিছানার মাঝখানে বসল। শেরাজ পকেট থেকে ফোন বের করে “ও মাহি” গানটির রিপিট অন অপশন চালু করল। তারপর সে উঠে এসে সুমুর বিপরীতে নিজের পিঠ সুমুর পিঠের সঙ্গে লাগিয়ে বসল।
কিছুক্ষণ তারা চুপচাপ বসে রইল, শুধু রাতের নীরবতা আর নৌকার হালকা দুলে ভেসে আসা বাতাসের শব্দ আর গান। হঠাৎ সুমু সামনের দিকে সরে গিয়ে দু’হাত পেটের ওপর রেখে এক’পা ভাঁজ করে শুয়ে পড়ল। শেরাজও ধীরে ধীরে এক’পা ভাঁজ করে শুয়ে পড়ল। তাদের দুজনের মাথা দুজনের দিক থেকে উল্টো হয়ে পাশাপাশি হলো।
সুমু ঘাড় কাত করে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজও সুমুর চোখে চোখ রেখে তাকাল। মুহূর্তটা যেন থেমে গেল—দুই জন ভালোবাসার মানুষ, রোমাঞ্চকর রাত, ফুলের সুবাস, চাঁদের আলো, আর গানটির মৃদু সুর—সব মিলিয়ে রূপকথার মতো এক নিস্তব্ধ, মধুর মুহূর্ত সৃষ্টি করল।
দুইজন উল্টো হয়ে শুয়ে একে অপরকে দেখতে লাগল। হঠাৎ শেরাজ উঁপুর হয়ে সুমুর মুখের ওপর ঝুঁকে রইল। সে মৃদুস্বরে গানটির সাথে গলা মেলালো,
“হো.... থোড়ি উমার হে,
পেয়ার জ্যাদা মেরা!
ক্যাছে বাতায়ে ইয়ে,
সারা তেরা হোগা!
ম্যানে মুজেহে হে,
তুঝকো সঁপনা....!
আহোঁ পে বাহোঁ পে,
রাহোঁ পনাহোঁ পে!
আহোঁ পে বাহোঁ পে,
সাহোঁ সালাহোঁ পে!
মেরি ইশাক পে হাক হুয়া তেরা…,
ও... মাহি মাহি বে!
ও মাহি ও মাহি, ও মাহি ও মাহি,
ও মাহি ও মাহি, ও মাহি ও মাহি!
লো মে কায়ামাত তাক হুয়া তেরা,
ও... মাহি, মাহি বে!
থেমে গেল শেরাজ। সুমু ড্যাপড্যাপ করে তাকিয়ে রইল। ফোনে গান আপন সুরে বাজতেই রইল। শেরাজ ধীরে ধীরে সুমুর দিকে ঝুঁকে, হালকা ঠোঁট দিয়ে সুমুর ঠোঁটে ছোঁয়াল। সুমুর মনে ভয়ের জেগে উঠল। সে বুঝতে পারল পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে গেছে।
সে উঠে বসতে চাইল, কিন্তু শেরাজের শক্ত হাত তার ইচ্ছাকে আটকে দিল। শেরাজ ধীরে ধীরে তার হাত শক্ত করে ধরে আকুতি ভরা কণ্ঠে বলল,
“প্লিজ! আই প্রমিজ, কিছু হবে না।”
সুমু তবুও উঠতে চাইল। শেরাজ তাকে শক্তভাবে ধরে রেখে সোজা হয়ে শুয়ে পড়ল সুমুর পাশে। সুমু বুঝতে পারল, আজ আর বাঁধা দেওয়া সম্ভব না।
শেরাজ সুমুর কপালে গভীর দীর্ঘভাবে ঠোঁট ছুঁয়ে সুমুর গলায় মুখ ডোবাল। সুমু চোখ বন্ধ করে শেরাজের স্পর্শ অনুভব করল। তার বন্ধ করে রাখা চোখ বেয়ে উষ্ণ পানি গড়িয়ে পড়ল। গানটি তখনও বাজছে,
“ও মাহি… ও মাহি, ও মাহি…, ও মাহি,
লো মে কায়ামাত তাক হুয়া তেরা....!”
রাতটা আরও মধুর হয়ে উঠল। নৌকার ওপর বিছানো ফুলের পাপড়িগুলো দুমড়ে-মুচড়ে যেতে শুরু হলো। জোনাকিরা তাদের মৃদু আলো নিয়ে চারপাশে ঘোরাঘুরি করছে। বাতাসের সাথে গানের সুর ভেসে যাচ্ছে। চাঁদের আলো মৃদু হয়ে এসেছে— যেন চাঁদ নিজের আলো কমিয়ে সুমুরাজকে ঢাকতে চাইছে।
•
ভোরের প্রথম আলোয় শেখবাড়ি যেন একেবারে নতুন রূপে জেগে উঠল। সোনালি রোদ্দুর ধীরে ধীরে জানালার ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকছে, বাতাসে এখনো ভোরের শিশিরের ঘ্রাণ। গার্ডেনের গাছে গাছে ফুল, আর মাটিতে পড়া শিশিরবিন্দু সূর্যের আলোয় হীরের মতো ঝলমল করছে।
বাড়ির ভেতরে আজ অন্যরকম হইচই। রান্নাঘর থেকে আসছে মিষ্টি আর খাবারের ঘ্রাণ, আঙিনায় কর্মব্যস্ততা, আত্মীয়-স্বজনরা একে একে কাজে লেগে পড়েছে।
সুমুর ঘরে সকালের আলো জানালা দিয়ে ঢুকে তাকে আলতো ছুঁয়ে দিচ্ছিল। রাতভর আবেগ আর ক্লান্তির পর সুমু একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে বসে আছে। তার চুল খোলা, মুখে এখনো রাতের স্মৃতির কোমল আভা। পাশে সাজপোশাক আর গয়নার বাক্স খোলা।
সুমু আয়নার সামনে বসে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে রইল। আয়নায় যেন ভোরের আলো মিশে তার চোখে এক অদ্ভুত কোমল দীপ্তি ছড়িয়ে দিয়েছে। ঠোঁটে অচেতন এক মৃদু হাসি খেলে যাচ্ছে—যেন রাতের স্মৃতিগুলো এখনো তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
হঠাৎ পেছন থেকে দরজায় নক করার শব্দ এলো,
“সুইটহার্ট!”
সুমু চমকে তাকাল দরজার দিকে। শেরাজ ঢুকে এলো, পরনে একটা চেক শার্ট আর ট্রাউজার। চোখেমুখে যেন রাজকীয় এক গাম্ভীর্য, কিন্তু সুমুকে দেখেই সে হালকা মুচকি হাসল। সে এগিয়ে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল, এক মুহূর্ত আয়নায় দুজনের প্রতিচ্ছবি পাশাপাশি ধরা পড়ল। শেরাজ সুমুর খোলা চুলে হাত বুলিয়ে বলল,
“কাল রাতের লজ্জা এখনো যায়নি, ম্যাডাম?”
সুমু হালকা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলে ধীরে বলল,
“খান সাহেব! এত বাড়িতে কাজকর্ম চলছে, আপনি এখানে কেন?”
শেরাজ মুচকি হেসে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“কাজের জন্য হাজার মানুষ আছে, কিন্তু আমার কাজ তো একটাই—আপনাকে আদর করা।”
সুমু হেসে ফেলল। তার হাসি ভোরের আলোর সাথে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
•
সামিয়া আর নাজমিন নিজেদের রুমে বসে। টেবিলের ওপর মেকআপের জিনিসপত্র ছড়ানো, গহনার বাক্স খোলা। নাজমিন মোবাইল হাতে নিয়ে মিষ্টি হেসে যাচ্ছে, আর আঙুলের তালে তালে মেসেজ লিখছে। ফোনের স্ক্রিনে বার বার ভেসে উঠছে আইয়ুবের টেক্সট।
অন্যদিকে, সামিয়া চুপচাপ জানালার পাশে বসে আছে। বাইরে হাসি-ঠাট্টা, আতিথেয়তার হইচই—সব তার কানে পৌঁছালেও মনে ঢুকছে না। তার চোখ দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে, কণ্ঠহীন নিঃশ্বাস যেন বুক ভরিয়ে ফেলছে।
নাজমিন একপাশ থেকে তাকিয়ে সামিয়ার মুখটা লক্ষ্য করল,
“কি হলো সামু? তোর মুখ এত মলিন কেন? আজও কি একইভাবে বিষণ্ন থাকবি?”
সামিয়া ধীরে জানালা থেকে চোখ ফেরাল। ঠোঁটে জোর করে একটা হালকা হাসি টানল,
“কিছু না, কেবল একটু একা লাগছে।”
নাজমিন ভালো করেই জানে, সামিয়ার চোখে আলো নেই, আছে ভাঙা স্বপ্নের কুয়াশা। সে এগিয়ে এসে সামিয়ার হাত চেপে ধরল।
“শোন, আজ একটা বিশেষ দিন আমাদের জন্য। সবকিছু ভুলে আজ শুধু হাসবি।”
সামিয়া মৃদু গলায় উত্তর দিল,
“হাসতে তো পারি নাজমিন, কিন্তু ভেতরে কান্না যে আটকানো যায় না। আর শোন, বিশেষ দিন শুধু তোদের জন্য। আমার জন্য আজ আমাকে জ্যান্ত মেরে ফেলার দিন।”
একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল সামিয়ার চোখ থেকে। ভোরের হালকা বাতাসে তার চুল উড়ছে। তবে ভিতরে মনটা একদম অস্থির। রাহিনকে ভালোবাসার কথা বারবার তার মনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, আর সেই একই সময়ে মনে পড়ছে পিয়াসের সঙ্গে আজকের বিয়ে—সব মিলিয়ে ভেতরটা এক বিশাল ঝড়। সে ধীরে ধীরে বলল
“নাজমিন! তুই জানিস না, রাহিন ভাইয়ার জন্য আমার মন কতটা পুড়ছে। আমি জানি, আজ সব ঠিকঠাকই হবে, কিন্তু ভেতরের ব্যথা কে বোঝে?”
“সামু, আমি জানি তোর জন্য এটা সহজ না। কিন্তু আজকের দিন, এই মুহূর্ত, চেষ্টা কর শুধুই একটু হাসার। বাকিটা সময়ের হাতে ছেড়ে দে।”
“আমি চেষ্টা করব!”
খুলে দেওয়া জানালা দিয়ে ভোরের হালকা রোদ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এসে সামিয়ার চোখে পড়ল। একটু সময় ধরে সে শুধু তাকিয়ে থাকল। পাশে বসে থাকা নাজমিন ধীরে একবার সামিয়ার কাঁধে হাত রাখল। দুজনের মধ্যে আর কোনো শব্দ হলো না।
•
সন্ধ্যা ছয়টা বাজতেই পুরো শেখবাড়ি সাজ-সজ্জার আলোর ঝলকানিতে আরও বর্ণিল হয়ে উঠল। চারপাশে অতিথিদের ভিড় জমতে শুরু করেছে। ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসছে গানের সুর আর হাসি-আনন্দের শব্দ।
নাজমিন আর সামিয়াকে সাজানোর প্রস্তুতি শুরু হলো। সামিয়াকে আয়নার সামনে বসিয়ে সাজানো হচ্ছে। সোনালি জরি আর স্টোনের কাজ করা পার্পেল লেহেঙ্গা , ভারী অলঙ্কার, হাতে মেহেদির রঙ—সবকিছু মিলিয়ে তাকে একদম পরীর মতো সুন্দর লাগছে। কিন্তু আয়নায় নিজের সাজানো মুখের দিকে তাকিয়ে সামিয়ার বুকটা হঠাৎ যেন ভার হয়ে উঠল। চোখে জল জমতে চাইছিল, কিন্তু সে সামলে রাখল। মনে মনে বলল,
“আজ আমায় হাসতে হবে। যত কষ্টই হোক, আজ কারো চোখে আমার দুঃখ ধরা দেওয়া যাবে না।”
পাশে নাজমিনকেও সাজানো হচ্ছে। তাকে গোলাপি-সোনালি মিশ্রণের লেহেঙ্গায় পরীর মতো লাগছে। আয়নার সামনে বসে নাজমিন ফোন হাতে এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। হঠাৎ আইয়ুবের টেক্সট দেখেই হালকা হেসে উঠল। সে সামিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সামু, তোকে আজ একেবারে রূপকথার রাণীর মতো লাগছে।”
সামিয়া মৃদু হাসল, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে ব্যথা লুকানো ছিল স্পষ্ট। নাজমিন তার বোনের চোখে সেই ব্যথা পড়তে পেরে ধীরে বলল,
“মন খারাপ করিস না, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
সামিয়া কিছু বলল না। শুধু জানালার দিকে তাকাল, বাইরে ঝলমলে আলো আর বাজনার শব্দ যেন তার ভেতরের নিঃশব্দ কান্নাকে আরও গভীর করে তুলছে।
•
সুমু আয়নার সামনে বসে গয়নার বাক্স খুলছিল। বিছানার ওপর লাল, গোলাপি, নীল—বিভিন্ন রঙের শাড়ি রাখা। হঠাৎ পেছন থেকে শেরাজ কাবার্ডের দরজা খুলে একেবারে ভেতর থেকে একটা হোয়াইট শাড়ি বের করে আনলো। যার পুরোটা গোল্ডেন স্টোনের কাজ করা।
শাড়িটা সুমুর হাতে তুলে দিয়ে সে মুচকি হেসে বলল,
“সুইটহার্ট! শুনেছি, আকাশের সব পরীর পোশাকই নাকি সাদা হয়। আমিও আজ আমার পৃথিবীর পরীকে সাদাই দিলাম। আজ আমার পৃথিবীর পরীও সেই সাদা শাড়িতে স্বপ্ন হয়ে আমার সামনে আসুক।”
সুমু শাড়িটা হাতে নিয়ে এক মুহূর্ত থমকে গেল। তার চোখের ভেতরে যেন আলো ঝলমল করে উঠল। সাদা শাড়ির কোমল দীপ্তি আর শেরাজের মমতাভরা কণ্ঠ তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিল।
শেরাজ এগিয়ে এসে তার চুলে একপাশ সরিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আজকের রাত শুধু লাল-সবুজের ঝলকানিতে আটকে থাকবে না। আজকের রাতের আমার সাদা পরী জ্বলজ্বল করবে।”
সুমু চোখ নামিয়ে নিল, বুকের ভেতর চেনা একটা স্পন্দন ছুটে বেড়াল। হাতে ধরা শাড়িটা গালে ঠেকিয়ে সে মৃদু হেসে ফেলল। শেরাজ আয়নার সামনে রাখা গয়নার বাক্সটা বন্ধ করে বলল,
“এই শাড়ির সাথে শুধু হাসিটাই গয়না হোক, ম্যাডাম।”
সুমু লাজুক হাসল। সে শেরাজের হেল্প নিয়ে শাড়িটা পরে নিল। গলা খালি রাখলেও কানে ঝুলে রইল ডায়মন্ডের বড় দুটো দুল। ডান হাতে চকচক করছে ডায়মন্ডের কাজ করা ঘড়ি, আর বা’হাত ভর্তি সাদা ডায়মন্ডের চুড়ি যেন আলাদা জ্যোতি ছড়াচ্ছে তার। সুমুর লম্বা চুলগুলো একপাশে দিল শেরাজ। তারপর তার সূক্ষ্ম আঙুলে দুটো সাদা টিউলিপ ফুল কানের নিচে গুঁজে দিয়ে একটু থমকালো। এক মুহূর্ত চুপচাপ তাকিয়ে রইল শেরাজ। সুমুর মুখের লাজুক হাসি, চোখের গভীরতা, সাদা শাড়ির সরল আভিজাত্য আর ফুলের কোমল সৌরভ—সবকিছু যেন মিশে গিয়ে তাকে একেবারে পরীর মতো করে তুলেছে। শেরাজের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটল।
“পারফেক্ট, বউজান!”
সুমু লাজুকভাবে চোখ নামিয়ে ফেলল। সে বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি থেকে বুঝতে পারল—সে শুধু সাজলো না, শেরাজের চোখে সে আজ নতুন করে আবারও হয়ে উঠল তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর নারী।
নিচের ড্রয়িংরুম তখন ভীষণ সরগরম। আত্মীয়স্বজন, বড়রা সবাই গুছিয়ে নিচ্ছেন নিজেদের। সকলে একে একে গাড়িতে উঠছেন। সাখওয়াত সাহেব সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,
“চলো, দেরি করো না কেউ।”
সাথে থাকা সুটকেস, উপহার আর মিষ্টির বাক্সগুলো একে একে গাড়িতে তুলে দেওয়া হলো। সবার মুখেই উৎসবের উচ্ছ্বাস।
শাহরুখ হাসতে হাসতে গাড়ির দিকে গেল। সে মাঝে মাঝে ছোটদের সাথে ঠাট্টা করছে, আবার কোনো বয়োজ্যেষ্ঠের জন্য দরজা খুলে দিচ্ছে।
সাখওয়াত সাহেবের গাড়ি থেকে শুরু করে এক এক করে কয়েকটা গাড়ি ভরতি হলো। গাড়ির হর্ন বাজতেই দলবেঁধে তারা ওয়েডিং হাউজের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
উপরে বারান্দা থেকে সুমু দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিল। হাতের আঙুল চেপে ধরে নিচের হইচইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। শেরাজ এসে চুপচাপ তার পাশে দাঁড়াল।
“সবাই চলে গেল, এবার আমাদেরও নামতে হবে।”
সুমু হালকা মাথা নাড়ল। তার চোখে তখনও সামিয়ার জন্য অজানা কষ্ট লুকানো।
নিচে শামীম সাহেব বাকিদের নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তিনি একটু তাড়াহুড়ো দিয়ে বললেন,
“আমাদের গাড়ি কিছুক্ষণ পর বের হবে।”
ওদিকে, পিয়াসরা ইতিমধ্যেই আলাদা প্রস্তুতি সেরে নিজেদের বাড়ি থেকে ওয়েডিং হাউজে যাবার জন্য বেরিয়ে পড়েছে।
বাড়ির ভেতরটা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে এলো, কেবল ভেসে আসছিল বিদায়ের আগে শেষ মুহূর্তের হইচইয়ের প্রতিধ্বনি।
নাজমিনরা সকলে বেরিয়ে এলো। শেরাজ, সুমু আর দুই কনেকে নিয়ে একটা গাড়িতে উঠল। আইয়ুব ও তাদের সাথে উঠতে চাইলে, আইয়ুবকে রাহিনদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। শামীম সাহেব বাড়ির বাকি বড়দের নিয়ে গাড়িতে উঠে শেরাজদের উদ্দেশ্যে বলল,
“আকাশের অবস্থা আজ ভালো না। মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে। ওদের নিয়ে সাবধানে এসো।”
শেরাজ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। শামীম সাহেবদের গাড়ি বেরিয়ে যেতেই রায়য়ানরা পরবর্তী গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেল। বাকি রইল শেরাজদের গাড়ি আর তার ফ্রেন্ডদের গাড়ি।
শেরাজ গাড়ি স্টার্ট দিতেই আকাশ গর্জে উঠল। আকাশে জমে থাকা মেঘ যেন কোনো অচেনা অশুভ ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গাড়ির ভেতর সুমু জানালার পাশে বসে বাইরের অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তার পাশে বসা শেরাজের মুখটা হালকা গম্ভীর। সে এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে রেখেছে আর অন্য হাতটা সুমুর হাতের ওপর রাখা।
নাজমিন, সামিয়া আর ইশিতা পিছনের সিটে বসে নিজেদের মধ্যে হালকা কথাবার্তা বলছে। তাদের পেছনের সিটে বসা ইনায়া আর নাতাশাও আড্ডায় অংশগ্রহণ করেছে। তাদের আড্ডার মাঝে হঠাৎ নাজমিন বলল,
“আবহাওয়া যদি খারাপ হয়, ওয়েডিং হাউজে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাবে না তো?”
শেরাজ চোখ না সরিয়েই উত্তর দিল,
“চিন্তা করো না, আমি আছি।”
তার কণ্ঠে দৃঢ়তা থাকলেও চোখেমুখে যে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা খেলা করছে, সেটা সুমু স্পষ্ট টের পেল।
এরই মধ্যে শেরাজের ফ্রেন্ডদের গাড়ি পেছন থেকে হর্ন বাজিয়ে এগিয়ে আসছিল। সারবাজ, নিহাল আর আইয়ুবদের হাসি-ঠাট্টার শব্দ ভেসে আসছে গাড়ির ভেতর। মুহূর্তের জন্য পরিবেশটা খানিকটা হালকা হয়ে গেল।
সুমু, শেরাজের হাত হালকা চাপ দিয়ে আস্তে বলল,
“খান সাহেব! সব ঠিক থাকবে, তাই না?”
শেরাজ মুখ ঘুরিয়ে একঝলক তাকাল, তারপর গভীর কণ্ঠে বলল,
“আমার পরী যতক্ষণ আমার পাশে আছে, ততক্ষণ কোনো খারাপ কিছু হতে পারবে না।”
এমন সময় আকাশে হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকালো, তার সাথে ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে এলো। গাড়ির কাচে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘোষণা করল।
শেরাজদের গাড়ি যত এগোচ্ছে, বৃষ্টির তোপ যেন আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। চারদিক ধোঁয়াশার মতো বৃষ্টির পর্দায় ঢেকে গেছে, উইন্ডশিল্ড ওয়াইপারের শব্দই শুধু ঘড়ঘড় করে ভেসে আসছে।
এমন সময়েই সুমুর ফোন বারবার বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে ‘আব্বু কলিং…’, সুমু তড়িঘড়ি করে রিসিভ করল,
“হ্যালো আব্বু! আমরা রাস্তায় আছি, বৃষ্টি খুব বেড়ে গেছে।”
ওপাশ থেকে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠ,
“তোমরা এখনো পৌঁছাওনি। এদিকে বিয়ের জন্য তো দেরি হয়ে যাবে। সকলে ওয়েট করছে। এক ঘণ্টার রাস্তা, তোমাদের তো দেড়-দুই ঘণ্টা হয়ে গেল। সবাই চিন্তায় পড়ে গেছে। শেরাজকে বলো সাবধানে গাড়ি চালাতে।”
সুমু শেরাজের দিকে তাকাল,
“খান সাহেব, সবাই চিন্তায় আছে।”
শেরাজ কোনো উত্তর দিল না। সে ফোনটা সুমুর হাত থেকে নিয়ে বলল,
“আব্বু! বউ সাথে না থাকলে, আরও ত্রিশ মিনিট আগে পৌঁছে যেতাম। কিন্তু আমার সাথে আমার বউ আছে। আর সে এখন আমার বাচ্চাদের মা হতে যাচ্ছে। তাকে সাথে নিয়ে আমি কোনো রিস্ক নিতে পারব না। আপনি বড়বাবাদের বলুন, ফারিয়া আর শাহরুখের বিয়ে পড়ানো শুরু করে দিতে।”
কথাগুলো বলে কল কাটল শেরাজ। স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে রাস্তার দিকে চোখ রাখল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, যেন পরিস্থিতির সাথে যুদ্ধ করছে।
পিছনের সিটে বসা সামিয়া উদ্বিগ্ন চোখে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। নাজমিনও এবার ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
গাড়ির গ্লাসে টুপটাপ শব্দের সাথে মাঝে মাঝে বাজ পড়ার বিকট আওয়াজ কানে লাগছে খুব। সুমু, শেরাজের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“খান সাহেব! ভয় লাগছে।”
শেরাজ এবার এক ঝলক তার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সুইটহার্ট। আমি আছি তো।”
গাড়ির গতি কমিয়ে সাবধানে এগোতে থাকল সে। কিন্তু বাইরে ঝড়ো বাতাস আর ঘন বৃষ্টি যেন রাতটিকে আরও ভীতিকর করে তুলছে।
শেরাজ হঠাৎ গাড়ি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। সুমু আবাক হয়ে তাকাল। সে কিছু বলার আগেই শেরাজ গাড়ির ব্রেক কষলো একটা কাজি অফিসের সামনে। অফিসের ভেতর থেকে কিছু লোক ছাতা হাতে বেরিয়ে এলো। নাজমিনরা সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। লোকগুলো আসতেই শেরাজ বলল,
“আমাকে একটা ছাতা দিন। পেছনের দুই কনে, আর পেছনের গাড়িতে দুই বরকে নিয়ে ভেতরে যান।”
শেরাজের নির্দেশে সবাই কিছুটা হকচকিয়ে তাকাল। সুমু চোখ বড় করে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“খান সাহেব! আপনি কী করতে চাইছেন?”
শেরাজ হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“চিন্তা করো না। শুধু দেখতে থাকো।”
সুমু শ্বাস ফেলল। লোকগুলো পিছনের দুই কনেকে ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামতে বলল। নাজমিন আর সামিয়া একটু দ্বিধান্বিত হলেও শেরাজের দৃঢ় দৃষ্টি দেখে গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে চলে গেল।
পেছনের গাড়ির ভেতরে থাকা আইয়ুব আর রাহিনকেও নামানো হলো। শেরাজের নির্দেশে সরাসরি অফিসের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল তারা। শেরাজ গাড়ি বাইরে এসে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“থ্যাংকস্ গড! সবকিছু আগে থেকে প্রি-প্ল্যান থাকলেও, আজ এই বৃষ্টিটা ওদের জন্য দোয়া হয়ে নামল।”
সকলে ভেতরে ঢুকতেই অদ্ভুত একটা নীরবতা তৈরি হলো। সামিয়া আর নাজমিনকে আলাদা রুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শেরাজ সুমুকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে রাহিনের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“মাত্র পাঁচ মিনিট সময় পাবি। এরমধ্যে যা করার করবি।”
রাহিন মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। শেরাজ দ্রুত কাজির কাছে এগিয়ে গেল। রাহিনকে অমিতরা ধরে সামিয়াকে নিয়ে যাওয়া রুমের সামনে রেখে এলো।
একদিকে, ইনায়া ভেতরে ঢুকল। সে ধীরে নাজমিনকে বুঝিয়ে বাহিরে নিয়ে এলো। নাজমিন কিছুটা ভীত হলেও ইনায়ার চোখে দৃঢ়তা দেখে চুপচাপ অনুসরণ করল।
নাজমিন বাইরে চলে আসার সঙ্গে সঙ্গেই রাহিন ভেতরে প্রবেশ করল। রাহিন ভেতরে ঢুকতেই সামিয়া হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। তার চোখে অদ্ভুত এক অস্থিরতা, আর বুকের ভেতর অজানা কাঁপন। রাহিন ধীরে ধীরে সামিয়ার দিকে এগিয়ে এলো। তার চোখে এতগুলো বছরের অপেক্ষার সমস্ত আবেগ লুকিয়ে।
“সামু!”
রাহিনের কণ্ঠে কেঁপে ওঠা অনুনয় মেশানো। সামিয়া তাকিয়ে রইল।
“আমি জানি, এতদিন ধরে আমি তোকে কিছু বলিনি। কিন্তু আজ এতদিন অপেক্ষার পর আমি তোকে বলছি, আমাকে বিয়ে করবি, সামু? আমি তোকে প্রিন্সেসের মতো করে রাখব। বউ হবি আমার?”
সামিয়া চোখ নামিয়ে রাখল। তার মনে ঝড় চলছে—রাহিনের কথা শুনে সমস্ত স্মৃতি জেগে উঠছে তার মনে। কিন্তু আজ তার বিয়ে, আর সমাজ, পরিবার—সব কিছু তার সিদ্ধান্তকে বাঁধা দিচ্ছে। সে ধীরে বলল,
“এই সামান্য একটা কথা বলতে এত বেশি দেরি করে ফেললে, রাহিন ভাই? কিন্তু এখন যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার জীবনের অন্য একটি রাস্তা শুরু হতে যাচ্ছে আজ।”
রাহিন একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এসে সামিয়ার হাত ধরল। তার চোখে এক গভীর আকুতি, আর কণ্ঠে অজানা বেদনা।
“আমি জানি, আমি অনেক সময় নষ্ট করেছি। কিন্তু আজও যদি তুই আমাকে একটা সুযোগ দিস, আমি সব কিছু ঠিক করে দিব। সামিয়া, প্লিজ—একবার আমার কথা শোন! এসব সমাজ আর পরিবারের কথা না শুনে নিজেরটা ভাব।”
সামিয়া কান্না ধরে রাখতে পারল না। তার চোখের অশ্রু ঝরে পড়ল, বুকের ভেতর বেদনা আর ভালোবাসার সংঘাত একসাথে ঘেরা হয়ে উঠল। সে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ল। রাহিন তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“মাত্র পাঁচ মিনিট সময় আছে আমার হাতে, সামু। এই মুহূর্তে তুই যদি না মানিস, তাহলে সারাজীবন আমাকে আর তোকে কষ্ট পেয়ে কাটাতে হবে।”
সামিয়া অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল। রাহিন চলে যাবার জন্য পা বাড়াল। সে দরজার কাছে আসতেই পেছন থেকে সামিয়ার কন্ঠ ভেসে এলো,
“কোথায় যাচ্ছো? বিয়ে করবে না আমাকে?”
রাহিন থমকে দাঁড়াল। সে পেছন ঘুরে দৌড়ে এসে সামিয়ার সামনে দাঁড়াল। সে সামিয়াকে জড়িয়ে ধরতে যেতেই আইয়ুব এসে বলল,
“এই থাম! বিয়ের আগে এসব কী হ্যাঁ?”
সামিয়া চোখের পানি মুছে লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সকলে একে একে রুমে এলো। সুমু, সামিয়ার কাছে এসে বলল,
“ভাইয়া! আমার মিষ্টি বোনটাকে একদম লজ্জায় ফেলবেন না।”
সকলে মিলে হেসে উঠল। শেরাজ এসে সকলকে তাড়া দিল। সুমুরা সামিয়াদের নিয়ে বাহিরে বেরিয়ে গেল। শেরাজ সারবাজ আর ইনায়া উদ্দেশ্যে বলল,
“তোমরা দুজন এখানেই দাঁড়াও।”
দুজনে দাঁড়িয়ে পড়ল। শেরাজ দুজনের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে অদ্ভুত এক গম্ভীরতা, কণ্ঠে অল্প তীক্ষ্ণতা। সে সারবাজ আর ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“জাস্ট দুইটা প্রশ্ন করব। সময় মাত্র তিন মিনিট। প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর চাই শুধু ‘ইয়েস’ বা ‘নো’—বাহুল্য নয়।”
সারবাজ আর ইনায়া একপলক একে অপরের চোখে চোখ মেলাল। দুই জনের মুখে মৃদু অস্থিরতা। শেরাজ একটু সময় নিয়ে বলল,
“তোমরা দুজন দুজনকে সত্যি ভালোবাসো?”
ইনায়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে পানি। সারবাজ চুপচাপ অন্যদিকে তাকিয়ে রইল। শেরাজ হাত তুলে ঘড়ির দিকে ইঙ্গিত করল—যেন সময়ের গুরুত্ব বোঝাচ্ছে।
“প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত উত্তর দাও, কারণ সময় নেই হাতে।”
দুইজন শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শেরাজ হালকা ধমকেরস্বরে বলল;
“আনসার মি!”
দুজনেই কেঁপে উঠে একসাথে বলল,
“হ্যাঁ!”
শেরাজ হালকা মাথা নেড়ে একটু ভাবুক হয়ে বলল,
“সারাজীবন একসাথে থাকতে পারবে দুজনে?”
ইনায়া মৃদুস্বরে বলল;
“হ্যাঁ!”
শেরাজ সারবাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সারবাজ তুই?”
সারবাজ চোখ তুলে তাকিয়ে বলল,
“হঠাৎ এসব প্রশ্ন কেনো, এস.কে?”
শেরাজ একহাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল,
“যা জিঙ্গাসা করেছি, ব্যাস সেইটুকুর উত্তর দে।”
সারবাজ মাথা নিচু করে বলল,
“হ্যাঁ, পারব।”
শেরাজ মৃদু হেসে বলল,
“ওকে, বাহিরে আয়।”
দুজনেই থম মেরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শেরাজের পেছন পেছন বাহিরে বেরিয়ে এলো। শেরাজ বাহিরে এসে কাজির উদ্দেশ্যে বলল,
“কাজি সাহেব! আজ এখানে তিনটা বিয়ে একসাথে হবে। আপনি সবকিছু তাড়াতাড়ি রেডি করুন।”
সকলে অবাক হয়ে তাকাল। সুমু কপাল কুঁচকে বলল,
“তিনটা বিয়ে মানে?”
শেরাজ মৃদু হেসে বলল,
“সারবাজ-ইনায়া, সামিয়া-রাহিন আর আইয়ুব-নাজমিন।”
শেরাজের কথা শুনে অমিতরা হৈহুল্লর করে উঠল। কাজি বিয়ের প্রস্তুতি শুরু করল। কেউ কেউ একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল। উপস্থিত কেউ যেন কল্পনাও করতে পারছিল না এখানে এমন কিছু হবে।
কাজি সাহেব তৎপরভাবে পদক্ষেপ নিলেন। তিনি একদম বিয়ের প্রস্তুতির কাজে মন দিলেন। তিনি সবকিছু গুছিয়ে বললেন,
“আসুন, আমরা শুরু করি।”
সারবাজ ও ইনায়া একে অপরের দিকে চুপচাপ তাকাল। শেরাজ পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দিল। দুজনে গিয়ে পাশাপাশি চেয়ারে বসল। কাজি সাহেব তাদের বিয়ে পড়ানো শুরু করলেন। বিয়ে পড়ানো শেষ করে তিনি রেজিস্ট্রেশনের কাগজে স্বাক্ষর সম্পন্ন করলেন। সকলে দূরে দাঁড়িয়ে সন্তুষ্টির সঙ্গে পুরো বিয়েটার স্বাক্ষী রইল।
পরের পালা সামিয়া ও রাহিনের। কাজি সাহেব তাদের দুজনের বিয়ে পড়িয়ে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করল। শেরাজ তাদের দিকে মৃদু হেসে তাকাল।
শেষে, আইয়ুব ও নাজমিনের। কাজি সাহেব তাদের বিয়ের পড়িয়ে রেজিস্ট্রেশন সব সম্পন্ন করলেন।
তিন দম্পতির বিয়ে শেষ হতেই সকলে একসাথে হাততালি দিল। অফিসের মধ্যে উৎসবের আবহ সৃষ্টি হলো। শেরাজ দূরে দাঁড়িয়ে সন্তুষ্টির সঙ্গে সব দেখল। সুমু হেসে বলল,
“এত দ্রুত সব হবে। সত্যিই আজকের দিনটা অবিশ্বাস্য।”
অমিতরা, যারা শুরু থেকেই হৈহুল্লর করছিল, এখন আনন্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরতে শুরু করল। কেউ কেউ কাগজপত্রের ছবি তুলতে লাগল।
শেরাজ ধীরে এগিয়ে গিয়ে সারবাজ ও ইনায়ার দিকে তাকাল।
“আজ তোমাদের দিন। একে অপরের প্রতি বিশ্বাস আর ভালোবাসা রেখো।”
সারবাজ ও ইনায়া একে অপরের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে হালকা হাসি দিল। শেরাজ এবার সামিয়া ও রাহিনের দিকে ফিরে তাকাল।
“তোমরাও একে অপরের পাশে থাকো। ভালোবাসা আর বিশ্বাস কখনও হারাতে দেবে না।”
সামিয়া ও রাহিন একে অপরের দিকে তাকাল। শেরাজ আইয়ুব ও নাজমিনের দিকে নজর দিল।
“আজকের দিনটা শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, প্রতিটি মুহূর্তের জন্য মনে রাখার দিন।”
আইয়ুব ও নাজমিন একসাথে হেসে তাকাল। কাজি সাহেব সব কাজ শেষ করে বললেন,
“সবকিছু সম্পন্ন! এখন তিনটি বিবাহ রেজিস্ট্রেশনসহ আইনি স্বীকৃত।”
শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আজকের বৃষ্টি গড গিফটেড।”
সুমু মৃদু হেসে বলল,
“সবটা স্বপ্নের মতো।”
শেরাজও মৃদু হেসে বলল,
“ভালোবাসা, প্রতিশ্রুতি আর একসাথে থাকার প্রতিশ্রুতি—এই তিনটি আজ সত্যিই আবারও জীবন্ত হয়ে উঠল।”
সকলে ধীরে ধীরে কক্ষ থেকে বের হতে লাগল। শেরাজ, সুমু আর বিয়ে সম্পন্ন করা তিন দম্পতি একসাথে ধীরে ধীরে অফিস থেকে বাহিরে বের হলো। ইশিতা ধরে রেখেছে সামিয়াকে আর নাতাশা ধরেছে নাজমিনকে।
হঠাৎ আরবাজ মজা করে বলল,
“সবাই বিয়ে করে নিচ্ছে। সান মামা! তুমিও কিন্তু নাতাশাকে বিয়ে করে নিতে পারতে।”
নাতাশা কিছু বলতে যাবে তার আগে স্যান্ডি বলল,
“এমন ঝগড়াটে মেয়েকে, অসম্ভব স্যার।”
নাতাশা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আপনাকে বিয়ে করতে আমার বয়ে গেছে। নেহাতই এখন একটা ভালো সময়। নয়তো আপনাকে আমি…”
“কী করতেন?”
নাতাশা কিছু বলার আগে সুমু বলল,
“তোমার কেমন ছেলে পছন্দ নাতাশা?”
নাতাশা একটু লাজুক হেসে বলল,
“পাতি মেরা হোয়াইট হো,
গুস্সা উসকা লাইট হো,
কামাই উসকা টাইট হো,
লাম্বি উসকি হাইট হো,
জাব ভি সাস সে মেরি ফাইট হো,
ও কাহে জানু, তুম হি রাইট হো!”
সুমু হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল। সকলে একসাথে হেসে উঠল। স্যান্ডি বিড়বিড় করতে করতে গাড়ির কাছে চলে গেল।
এরই মধ্যে সুমুর ফোনে কল এলো। সুমু স্ক্রিনে শামীম সাহেবের নাম্বার দেখে থতমত খেয়ে গেল। শেরাজ কলটা রিসিভ করে সালাম জানিয়ে বলল,
“ফারিয়া আর শাহরুখের বিয়ে হয়ে গেছে?”
অপরপাশ থেকে শামীম সাহেব বললেন?
“হ্যাঁ! ওদের বিয়ে সম্পূর্ণ। কিন্তু তোমরা কোথায়? বৃষ্টিতো এখন নেই। আর কতক্ষণ লাগবে আসতে?”
শেরাজ নিদ্বিধায় বলল,
“বাড়িতে ফিরে আসুন। ওখানে আর কোনো বিয়ে হবার নেই।”
কথাটা বলে সে কল কেটে দিল। সকলে আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে আছে। সুমু এগিয়ে বলল,
“ওরা এখন কোথায় যাবে?”
শেরাজ অকপটে জবাব দিল,
“শেখবাড়িতে!”
“কী?”
“হ্যাঁ! বিয়ের যখন করেছে, তখন সবকিছুকে ফেস করার ক্ষমতাও রাখতে হবে।”
“আপনি বুঝতে পারছেন না, কী হতে পারে। আগুন লাগবে।”
“আমি জানি সব। আর এটাও জানি, ওদের আগুনের মুখোমুখি হতে হবে।”
সুমু আর কিছু বলল না। শেরাজও আর কোন কথা বলল না। সকলে আতঙ্কের চোখে শেরাজের দিকে তাকিয়ে রইল।
চলবে..?