#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_75. ✦ প্রথমাংশ ✦
ক্যাফের ভেতরে ঢুকতেই সুমুর নিঃশ্বাস যেন ভারি হয়ে গেল। চারপাশের উষ্ণ আলো আর কফির গন্ধ তার মাথার ঘোরা আরও বাড়িয়ে দিল। সামিয়া আর নাজমিন দু’পাশ থেকে তাকে ধরে বসিয়ে দিল কোণের এক টেবিলে।
সুমুর মুখ ফ্যাকাশে, ঠোঁট কাঁপছে। তার দু’চোখ যেন সেই রক্তাক্ত শিশুর মুখটা দেখছে বারবার। সে কাঁপা কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“বাচ্চাটার চোখের দিকে তাকাতেই আমার মনে হলো, যেন... যেন আমারই সন্তান কাঁদছে।”
সামিয়া দুশ্চিন্তায় ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“আপু, তুমি ঠিক আছো তো?”
সুমু কোনো উত্তর দিল না। শুধু হাত দিয়ে নিজের পেটটাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন অজানা ভয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে চাইছে ভেতরের অনাগত জীবনকে।
ওয়েটার তাড়াতাড়ি এক গ্লাস পানি এনে দিল। নাজমিন গ্লাসটা সুমুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“আপু, পানি খাও। ভয় পাবে না। কিছু হয়নি।”
কিন্তু সুমুর চোখে তখনো আতঙ্ক। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত টান। সেই শিশুটির চিৎকার, রক্তমাখা মুখ আর শূন্য চোখের দৃষ্টি যেন তার মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে।
ঠিক তখনই ক্যাফের দরজায় ছায়া পড়ল। ভারি পদক্ষেপে শেরাজ ভেতরে ঢুকল। সামিয়ারা প্রথমে খেয়াল না করলেও, সুমু হঠাৎ মুখ তুলে তাকাতেই সে দৌড়ে গিয়ে শেরাজকে জড়িয়ে ধরল। শেরাজ হঠাৎ অপ্রস্তুত হয়ে গেল। চারপাশের সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে আছে, অথচ সুমু যেন আর কিছুই পরোয়া করছে না। সে দু’হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“খান সাহেব! আমি ভয় পেয়েছি, খুব ভয় পেয়েছি।”
শেরাজের চোখ মুহূর্তেই নরম হয়ে এলো। তার স্বভাবসিদ্ধ রাগি মুখের ভাঁজ মুছে গিয়ে জায়গা নিল উদ্বেগ আর কোমলতা। সে আলতো করে সুমুর মাথায় হাত রেখে বলল,
“সুইটহার্ট, আমি এসে গেছি। আমি তোমার কিছু হতে দিব না। তুমি শান্ত হও।”
সামিয়া আর নাজমিন দুশ্চিন্তায় এগিয়ে এসে বলল,
“ভাইয়া, আপুর হঠাৎ মাথা ঘুরে গেছিল। আমরা ধরে এনেছি ভেতরে।”
শেরাজ ওদের দিকে কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকাল, তারপর সুমুকে চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করে সামিয়াদের বলল,
“তোমরা একটু সরে দাঁড়াও।”
সুমুকে নিজের বুকে আঁকড়ে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিল শেরাজ। গ্লাসটা তুলে নিজের হাতে সুমুর ঠোঁটের কাছে ধরে বলল,
“একটু পানি খাও, সুইটহার্ট।”
সুমু গ্লাসে সামান্য চুমুক দিল, কিন্তু হাতটা এখনো শেরাজের শার্টে আঁকড়ে ধরা। সে কাঁপা কন্ঠে বলল,
“ওই বাচ্চাটার চোখে আমি আমাদের শিশুকেই দেখলাম, খান সাহেব। যদি... যদি কখনো…”
বাকিটা শেষ করতে পারল না সে। গলা ভারী হয়ে গেল তার। শেরাজের বুকের ভেতর যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে সুমুর দুই গাল দু’হাতের মাঝে নিয়ে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“একটা কথা মনে রেখো সুইটহার্ট! তুমি আর আমাদের সন্তান, তোমরা আমার জীবনের চেয়ে মূল্যবান সম্পদ। আমি তোমাদের কিছু হতে দিব না।”
সুমুর চোখ বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। শেরাজ তার কপালে চুমু এঁকে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি আমার সাথে নিরাপদ। কেউ তোমাকে ছুঁতে পারবে না।”
ক্যাফের চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সামিয়া আর নাজমিন নীরবে দাঁড়িয়ে রইল, যেন এই দু’জনের পৃথিবীতে অন্য কোনো শব্দ ঢুকতে না পারে। হঠাৎ ইনায়া আর ইশিতা ছুটে এলো সুমুর কাছে।
ইনায়া আতঙ্কিত চোখে বলল,
“সুমু! কী হয়েছে তোমার? এত ফ্যাকাশে লাগছে কেন?”
ইশিতা সুমুর হাত নিজের হাতে নিয়ে কেঁপে ওঠা কণ্ঠে বলল,
“আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, হঠাৎ শুনলাম তুমি নাকি পড়ে যাচ্ছিলে। এখন কেমন লাগছে?”
সুমু কিছু বলতে পারল না। শুধু মৃদু একটা হাসি দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তার সেই হাসি গড়িয়ে গেল অশ্রুর ভেতরে। শেরাজ সবার দিকে দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে বলল,
“তোমরা ওকে ভয় দেখিও না। সুমু শুধু একটু শকে আছে। এখন ওকে শান্ত হতে দাও।”
ইনায়া আর ইশিতা থেমে গেল। তারা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। শেরাজ তখন ধীরে ধীরে সুমুর চুলে হাত বুলিয়ে বলল,
“চলো, এখন আর এখানে থাকা ঠিক হবে না। আমি তোমাকে বাসায় নিয়ে যাচ্ছি।”
তারপর সে দাঁড়িয়ে সামিয়া, নাজমিন, ইনায়া আর ইশিতার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমরা সবাই একসাথে থেকো, আমি গাড়ি আনতে যাচ্ছি।”
শেরাজ বেরিয়ে যেতেই সুমুর বুক আবার ধুকপুক করতে লাগল। ইশিতা মৃদুস্বরে বলল,
“সুমু! শান্ত হও। সব ঠিক হয়ে গেছে।”
সুমু চোখ নামিয়ে বলল,
“আমার মনটা খুব অশান্ত লাগছে।”
ঠিক তখনই বাইরে থেকে হর্নের শব্দ ভেসে এলো। শেরাজ গাড়ি নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ক্যাফের কাচের জানালা দিয়ে সুমুর চোখ শেরাজের দিকে পড়তেই সে যেন এক মুহূর্তের জন্য স্বস্তি পেল।
সুমুকে নাজমিনরা আলতো করে ধরে ক্যাফের বাইরে নিয়ে এলো। সন্ধ্যার আলো তখন শহরের রাস্তায় গড়িয়ে পড়ছে, চারপাশে গাড়ির শব্দ আর মানুষের কোলাহল। কিন্তু সুমুর কানে যেন কেবল নিজের হৃদয়ের ধুকপুকানি বাজছিল।
শেরাজ গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। নাজমিনরা সুমুকে এগিয়ে দিতেই সে তৎক্ষণাৎ সুমুর হাত ধরে বলল,
“সুইটহার্ট, সাবধানে।”
সুমু মাথা নিচু করে গাড়ির সিটে বসে পড়ল, যেন পুরো শরীরটাই ক্লান্ত আর ভাঙা। শেরাজ ওর পাশে বসতেই সুমু চোখ তুলে একবার তাকাল। সুমুর দৃষ্টি শেরাজের বুক কাঁপিয়ে দিল। সে নরম গলায় বলল,
“আজকে তুমি অনেক ভয় পেয়েছো, তাই না?”
সুমু চোখ নামিয়ে মৃদুস্বরে উত্তর দিল,
“এই বাচ্চাটাকে দেখে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, আমার কোলেই ও কাঁদছে।”
শেরাজ তার হাত নিজের হাতে নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“কোনো অশুভ ছায়া তোমাকে ছুঁতে পারবে না। আমি আছি তোমার সাথে, সুইটহার্ট।”
সুমু চোখ বুজে ধীরে মাথা রাখল শেরাজের কাঁধে। গাড়ির ভেতরে মুহূর্তের জন্য যেন এক গভীর নীরবতা নেমে এলো।
হঠাৎ সারবাজ দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“এস.কে! একটু আয় তো। আইয়ুব একটা ছেলের সাথে ঝামেলা বাঁধিয়েছে।”
শেরাজ তৎক্ষণাৎ সিট নেমে দাঁড়িয়ে বলল,
“কোথায়?”
সারবাজ ইশারায় সামনের মোড়ের দিকে দেখাল। শেরাজ বিন্দুমাত্র দেরি না করে দ্রুত পা বাড়াল।
সুমু সিট থেকে সোজা হয়ে বসল। তার বুক ধুকপুক করছে। সে মৃদুস্বরে বলল,
“খান সাহেব?”
শেরাজ পিছন ফিরে একবার তাকিয়ে ধীরে বলল,
“তুমি গাড়ির ভেতরেই থাকো, সুইটহার্ট। আমি বাদরটাকে নিয়ে আসছি।”
সুমু কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ইতোমধ্যেই শেরাজ সারবাজকে সাথে নিয়ে দ্রুত ছুটে গেল।
নাজমিন কৌতূহল আর ভয় মিশ্রিত গলায় বলল,
“আবার কী হলো, কে জানে। উনি আবার কার সাথে ঝামেলা বাঁধাল।”
সামিয়া তৎক্ষণাৎ সুমুর হাত চেপে ধরে বলল,
“আপু, দুশ্চিন্তা করো না। ওরা এসে যাবে।”
•
সামনের মোড়ে আইয়ুব এক যুবকের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত। যুবকটা লম্বা-চওড়া, মুখে রাগের ছাপ। তাদের আশেপাশে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।
আইয়ুব গর্জে উঠে বলল,
“বিপদে পড়লে মানুষকে সাহায্য না করে, ভিডিও করিস। তোর মুখে আবার বড় বড় কথা।”
ছেলে কড়া গলায় বলল,
“তাতে তোর কি? কি করবি তুই?”
আইয়ুব কপাল কুঁচকে বলল,
“তোর কি মনে হয়, দূর্বল আমি? পাওয়ারফুল আছি, বেটা।”
ছেলেটা তেড়ে গিয়ে বলল,
“তোর মার না, আয়। এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
আইয়ুব রাহিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই রাহিন মার তো এদের? এদের মেরে প্রমাণ কর যে, তুই শক্তিশালী আইয়ুবের বন্ধু।”
রাহিন যেন অবাক হলো। সে কটমট দৃষ্টিতে আইয়ুবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোর মতো বন্ধুকে বিক্রি করে থালা-বাসন কেনা উচিত। শা*লা আমাকে ফাসিয়ে দিল।”
হঠাৎ ছেলেটা এগিয়ে এসে আইয়ুবের কলার ধরতে গেল, ঠিক তখনই শেরাজের কণ্ঠ বজ্রের মতো গর্জে উঠল,
“হাত নামা।”
ছেলেটি থমকে গেল। চারপাশের সবাই নিস্তব্ধ। শেরাজ ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে ছেলেটার চোখে চোখ রেখে বলল,
“আমার বন্ধুর গায়ে হাত তোলার সাহস কীভাবে হলো?”
আইয়ুব পেছন থেকে দাঁত চেপে বলল,
“এই ছেলেটা আমার সাথে অযথা ঝামেলা করছে। ভাবিজি তখন এদের কথা শুনিয়েছে বলে, এরা ভাবিজিকে নিয়ে বাজে কথা বলছিল।”
শেরাজ ছেলেটার দিকে ধীরে ধীরে আরও এগিয়ে বলল,
“কি বলেছিস তুই?”
ছেলেটার হাত কাঁপতে লাগল। আইয়ুব ধীরে ধীরে ছেলেটার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“এবার বুঝেছিস? কার বউকে নিয়ে তুই বাজে মন্তব্য করেছিস।”
ছেলেটা কোন উত্তর দিতে পারল না। শুধু মাথা নীচু করে পেছনে সরল। শেরাজ, আইয়ুবের পাশে দাঁড়িয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। সে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই, নাজমিন দৌড়ে এসে এগিয়ে বলল,
“ভাইয়া, তাড়াতাড়ি চলুন। আপু অনেক হাইপার হয়ে পড়েছে।”
শেরাজ আর এক মুহূর্ত ও দাঁড়াল না। সে দৌড়ে চলে গেল সুমুর কাছে। সুমুর কথা শুনে আইয়ুবরাও শেরাজের পেছন পেছন ছুটল।
সুমুর গাড়ি ভেতর অস্থির হয়ে বসে আছে। ইনায়ারা চেষ্টা করেও তাকে সামলাতে পারছেনা। শেরাজ দৌড়ে এসে গাড়িতে ঢুকে সুমুর পাশে বসল। সে সুমুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“শান্ত হও, সুইটহার্ট। এইতো আমি এসে গেছি।”
সুমু শেরাজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখল। সে শেরাজের বুকের মধ্যে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে গেল। শেরাজ সুমুকে কোলে তুলে নিয়ে পেছনের সিটে গিয়ে বসে রাহিনকে বলল,
“সকলকে গাড়িতে উঠতে বল। আর তাড়াতাড়ি গাড়ি স্টার্ট দে।”
রাহিন আর দেরি না করে গাড়িতে উঠে বসল। সকলে একে একে গাড়িতে উঠতেই তাদের গাড়ি ছেড়ে দিল বাড়ির উদ্দেশ্যে।
•
গাড়ি এসে থামল বাড়ির সামনে। সুমু পেছনের সিটে বসে শেরাজের কোলে ঝুঁকে আছে। তার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এসেছে, কিন্তু চোখে এখনও সেই অস্থিরতার ছাপ। শেরাজ ধীরে ধীরে তার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে তাকে কোলে তুলে গাড়ি থেকে বের করে আনল। তার শক্ত বাহু সুমুর জন্য যেন নিরাপত্তার আবরণ হয়ে দাঁড়ালো। বাড়ির প্রবেশদ্বারের দিকে এগোতে এগোতে শেরাজ ফিসফিস করে বলল,
“চিন্তা করো না, সুইটহার্ট। আমি আছি।”
সুমু তার হাত শক্ত করে শেরাজের কাঁধে জড়িয়ে ধরল। রাহিন এগিয়ে এসে দরজা খুলে দিয়ে বলল,
“সাবধানে নিয়ে যা। আমি সবাইকে নিয়ে আসছি। আর আইয়ুবকে বলেছি, ডক্টরকে কল করতে। সুমুর এখনই একটা চেকআপ দরকার।”
শেরাজ মাথা নাড়িয়ে ধীরে ধীরে সুমুকে কোলে নিয়ে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল। সে সুমুকে রুমে নিয়ে গিয়ে কোমলভাবে বিছানায় শুইয়ে দিল।
প্রায় দশ মিনিটের মধ্যে রাহিন আর আইয়ুব ডক্টরকে নিয়ে রুমে প্রবেশ করল। ডক্টর দ্রুত সুমুকে পরীক্ষা করতে লাগল। শেরাজ মাথা ঘুরিয়ে ডাক্তার দিকে তাকাল। ডাক্তার শান্ত স্বরে বলল,
“চিন্তা করার কিছু নেই। কিছুটা আতঙ্ক ও চাপের কারণে এমন হয়েছে। তবে সব ঠিক আছে। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করব, তারপর পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
শেরাজ চুপ করে রইল। হঠাৎ রুমে প্রবেশ করল আলিশা, রায়য়ান, আরিয়ান,রোজা আর নাতাশা। রায়য়ান আর আরিয়ান সুমুর দিকে তাকিয়ে রইল। শেরাজ সামনে থাকায় তারা কিছু বলল না।
নাতাশা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়ে সুমুর পাশে বসে বলল,
“আপনার কি হয়েছে ম্যাম? শুনলাম, আপনি নাকি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন?”
সুমু মৃদু হেসে বলল,
“চিন্তা করার কিছু নেই, নাতাশা। আমি এখন ঠিক আছি।”
শেরাজ হঠাৎ সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“সুমু এখন ঠিক আছে। ডক্টর তো দেখছে ওকে। আমি মনে হয়, এই রুমে এখন এতো মানুষের ভিড় না করাই ভালো। সকলে এখন যাও। আর হ্যাঁ, ডিনার করে সকলে শুয়ে পড়ো।”
সকলে নীরব হয়ে হালকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। রায়য়ান আর আরিয়ান সুমুর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
নাতাশা একটু দম নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, স্যার! আমি ম্যাম আর আপনার খাবারটা রুমে দিয়ে যাচ্ছি।”
সে সুমুর হাতকে হালকা স্পর্শ করে বিদায় জানালো। সুমু হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। সকলে একে একে বেরিয়ে গেল। রাহিনরা ডাক্তারকে এগিয়ে দিয়ে আসতে গেল।
মিনিট খানেক সময়ের মধ্যে সুমুদের রুমে খাবার এলো। শেরাজ খুব যত্ন করে সুমুকে খাইয়ে দিয়ে, নিজেও খেয়ে নিল। খাওয়া শেষ হতেই সে খাবারের প্লেট বেড সাইড টেবিলের ওপর রেখে রুমের লাইট অফ করে দিল। সুমু চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। শেরাজ ধীরে সুমুকে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে তার কপালে ঠোট ছোঁয়াল। শেরাজের ছোঁয়ায় সুমু পরম শান্তিতে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমালো।
•
নতুন দিনের সূর্য ঢেউ খেলানো আলো নিয়ে আসলো। জানালার বাইরে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে, আর পাখিরা চিৎকার করছে। সুমু ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তার পাশে বসে শেরাজ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে তাকিয়ে আছে। তার ঠোঁটে হালকা হাসি ছড়িয়ে আছে। সে মৃদু কণ্ঠে বলল,
“শুভ সকাল, সুইটহার্ট। কেমন ঘুম হলো?”
সুমু আলতো করে হেসে বলল,
“আপনার সঙ্গ পেলে সবসময় নিশ্চিন্তে ঘুম হয়ে।”
শেরাজ হাত বাড়িয়ে তার চুল ছুঁয়ে বলল,
“ঠিক আছে, জান আমার। আজকের কথা মনে আছে আপনার?”
সুমু শেরাজের হাতের তালুতে মুখ ছোঁয়াল। জানালা দিয়ে আসা আলো তার চেহারায় স্নিগ্ধতার ছাপ ফেলল। বাইরে থেকে পাখির চিৎকার আর হালকা বাতাসের শব্দ রুমের শান্তিতে মিলিত হয়ে নতুন দিনের উচ্ছ্বাস আনল।
শেরাজ ধীরে ধীরে লম্বা নিঃশ্বাস বলল,
“তুমি তো এখন অসুস্থ। আমি কি ফিরে যাওয়ার ডেট পিছিয়ে দিব?”
সুমু চোখে অল্প চঞ্চলতা নিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“দরকার নেই। আমি ফিরতে চাই। ওখানে সবাইকে অনেক মিস করছি। আর কিটিটার কথাও অনেক মনে পড়ছে। যেদিন ওকে আমার কাছে এনেছিলাম, তারপর থেকে ওকে আমার কাছ ছাড়া করিনি। ওর কথা, ফিরোজার কথা, রিয়াজের কথা অনেক বেশি মনে পড়ছে। আপনি আমাকেই কালই নিয়ে চলুন।”
শেরাজ আলতো হেসে সম্মতি জানালো। হঠাৎ তার কিছু একটা মনে পড়াতে উঠে দাঁড়াল সে। তারপর বেড সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা বক্স বের করে এনে সুমুর পাশে বসল। সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“এতে কি আছে?”
শেরাজ বক্সটা খুলে একটা হার্ট সেইপের লকেট বের করল। সুমু তাকিয়ে রইল। শেরাজ হঠাৎ হার্টের মাথার দিকে থেকে খুলে ফেলল। সুমু কিছু বলতে যাবে তার আগেই শেরাজ বেড সাইড টেবিলের ওপর রাখা ফলের ঝুড়ি থেকে ছুরি তুলে নিল। সুমু বিস্ময় হয়ে তাকিয়ে রইল। মুহুর্তেই শেরাজ নিজের আঙুল কেটে ফেলল। সুমুর বুকটা ধক করে উঠল। সে হন্তদন্ত হয়ে শেরাজের হাত ধরতে গেলে, শেরাজ হাত সরিয়ে নিয়ে হার্টের মধ্যে রক্ত ফেলে ভরতে লাগল। সুমুর চোখ পানি চলে এলো। সে কান্নাভেজা গলায় বলল,
“আপনি কি করছেন এসব?”
শেরাজ কোনো কথা বলল না। সে হার্টের ভেতরটা পুরো রক্ত দিয়ে ভরে তারপর আবার হার্টের মুখটা লাগিয়ে দিল। সুমু শেরাজের হাত টেনে নিজের সামনে আনল। শেরাজ সেদিকে পাত্তা না দিয়ে লকেটটা সুমুর গলায় পরিয়ে দিয়ে বলল,
“এই ব্লাড লেকলেসটা তুমি কখনো খুলবে না। এইটা আমার ভালোবাসার রক্তে ভরা প্রতীক।”
সুমু কিছুক্ষণ ছলছল নয়নে তাকিয়ে থেকে বলল,
“এসব কেন করেন আপনি? আমাকে কষ্ট না দিতে পারলে কি আপনার ভালো লাগেনা?”
তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। শেরাজ আলতো হাতে সুমুর চোখ মুছে দিল। সুমু বেড সাইড টেবিলের ড্রয়ার থেকে ফাস্টএইডের বক্স করে শেরাজের আঙুলে ব্যান্ডেজ করে দিল। শেরাজ চুপচাপ প্রেয়সীর যত্ন গ্রহণ করল। ব্যান্ডেজ করা শেষ হতেই সে সুমুকে বেড থেকে নামিয়ে ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে ফ্রেশ করিয়ে আনল। তারপর সুমুকে নিয়ে নিচে চলে গেল ব্রেকফাস্ট করার জন্য।
•
বিকালের রোদ হালকা সোনালী আলো বয়ে নিয়ে এলো। সুমুদের বাড়ি ভেতর যেন উৎসব লেগেছে। সাখাওয়াত সাহেবের পরিবার, মুস্তাক সাহেবের পরিবার সকলেই এসেছেন আজ। তাদের জন্য এলাহি আয়োজন করা হয়েছে। শেরাজ সবাইকে তার নতুন বাড়িতে জাকজমক ভাবেই স্বাগতম জানিয়েছে। সকলে এখন বাড়ির ভেতরে আড্ডা জমিয়েছে।
সুমু রেডি হয়ে নিচে নেমে এসে এগিয়ে গেল টেবিলের কাছে। টেবিলের ওপর রাখা খাবারের গন্ধে চারপাশ ভরে গেছে। শেরাজ, সাখাওয়াত সাহেবদের নিয়ে টেবিলের কাছে এলো। সে সকলে বসতে বলে, আইয়ুবদের কাছে গেল। ইশিতা, ইনায়া, সামিয়া আর নাজমিন সবাইকে খাবার সার্ভ করতে লাগল। সুমু ধীরে ধীরে টেবিলের পাশে গিয়ে বসল। সবাই খাবারের দিকে মনোযোগ দিয়ে হালকা কথাবার্তা শুরু করল। হাসি বেগম সুমু আর সামিয়ার জন্য খাবার নিয়ে গিয়ে তাদের খাইয়ে দিতে লাগল। রুমা বেগমও নাজমিনকে খাইয়ে দিতে লাগল। তাদের দুজনেই চোখে পানি। মেয়েরা কাল চলে যাবে ভেবেই, তাদের বুক ভেঙে আসতে লাগল।
সাখাওয়াত সাহেব খেতে খেতে শেরাজদের উদ্দেশ্যে বলল,
“তোমরাও বসে যাও। সকলে একসাথে খাওয়ার মজাই আলাদা।”
শেরাজ ভদ্রতাসূচক হেসে বলল,
“আপনারা আগে খেয়ে নিন, বড়আব্বু। এইসব আয়োজন আজ স্পেশালি আপনাদের জন্য।”
“তবুও সকলে একসাথে বসলে ভালো লাগত।”
শেরাজ আর কোনো কথা বলল না। পাশ থেকে পিয়াস বলল,
“হ্যাঁ! সবাই একসাথে বসলে, খাবার টেবিলটা জমে যেত।”
শামীম সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
“সেটাই! তোমরাও বসে পড়ো। কালতো তোমরা চলেই যাবে। আবার কবে না কবে আসবে। আজ অন্তত সকলের সাথে একসাথে খাওয়া যাক।”
শেরাজ আর আপত্তি করল না। সে বাকিদের নিয়ে বসে পড়ল। তারা বসতেই খাবার টেবিলটা আনন্দে ভরে উঠল। সকলে খেতে খেতে হাসি, আনন্দে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
•
খাওয়া শেষ হতেই সকলে ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসল। ড্রয়িংরুমের বড় সোফা আর আরামদায়ক চেয়ারগুলোতে সবাই ছড়িয়ে পড়ল। হালকা আলো আর ঘরের উষ্ণ পরিবেশে আনন্দের গুঞ্জন বাড়ল।
সাখাওয়াত সাহেবরা ঘন্টাখানেক কথাবার্তা বলে চলে গেলেন। তারা যাওয়ার আগে শেরাজদের বলে গেলেন, তারা সকলে কাল সকালে যেন শেখ বাড়িতে ফিরে যায়। শেরাজ তাদের কথা দিল, যে তারা কাল শেখ বাড়িতে ফিরে যাবে এবং সেখান থেকেই এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে কাল সন্ধ্যায় রওনা হবে। সাখাওয়াত সাহেবরা চলে যেতেই রাহিন আর সামিয়াও বেরিয়ে পড়ল। তাদের দুজনের সাথে ইফতিয়ারাও ফিরে গেল তাদের নিজ গন্তব্যে।
চলবে…?
#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_75 ✦ বর্ধিতাংশ ✦
বিকেলের নরম আলো ধীরে ধীরে আঙিনার গায়ে মিশে যাচ্ছে। সূর্য যেন আজ বিষণ্ণ আলো ছড়াচ্ছে। সোনালি রোদ শেখ বাড়ির জানালা দিয়ে করিডোর এসে পড়ছে। পাখির ডাক, দূরে আজানের সুর, সব মিলিয়ে একটা বিদায়ের সংকেত ভেসে বেড়াচ্ছে। শেখ বাড়ির ভেতরে এখন ব্যস্ততা চলছে। সুটকেস খোলা, কাপড় গুছানো, উপহার আলাদা করে রাখা—সবকিছুতেই যেন একধরনের তাড়াহুড়ো। তবু সেই ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকেই সবার চোখে লেগে আছে কান্নার ছাপ।
সুমুরা আজ সকালেই শেখ বাড়িতে ফিরে এসেছে। চারপাশে যেন বিদায়ের গন্ধ ভাসছে। ওমানে ফিরে যাওয়ার জন্য সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে প্যাকিংয়ে। জামাকাপড় গুছিয়ে নেওয়ার শব্দে ঘর ভরে উঠলেও, সামিয়া, নাজমিন আর সুমুর মন যেন একেবারেই গুছোতে চাইছে না। তিনজনের চোখেমুখে শুধু ভারী বিষণ্ণতা, যেন এই ঘর, এই বাড়ি, এই মুহূর্তগুলো ছেড়ে যেতে তাদের মন একেবারেই মানতে পারছে না। সামিয়া বারবার জামা-কাপড় ভাঁজ করতে গিয়ে থেমে যাচ্ছে। কখনো চুপ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে, আবার কখনো গোপনে চোখ মুছে নিচ্ছে। নাজমিনেরও একই অবস্থা। তার হাতের কাজ বারবার গুলিয়ে যাচ্ছে। সুটকেসে কাপড় রাখতে গিয়ে আবার বের করে নিচ্ছে, যেন মন চাইছে না কোনো কিছুই গুছিয়ে ফেলতে। সুমু বিছানার কোণে বসে আছে। তার চোখে অশ্রু জমে আছে, অথচ ঠোঁটে জোর করে টেনে আনা হাসির ছাপ। সে হাত দিয়ে একেকটা জামা গুছাচ্ছে, আবার বুকের কাছে টেনে ধরে রাখছে—যেন প্রতিটি জিনিসের সাথেই লেগে আছে প্রিয়জনদের অমূল্য স্মৃতি। ইনায়া, ইশিতা আর নাতাশাও তাদের সুটকেস গুছিয়ে নিচ্ছে। ফারিন আর ফারিয়া তাদের সাহায্য করে দিচ্ছে।
আরিয়ানরা আজ সকালেই ওমানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে। শেরাজের ভাষ্যমতে, “ওরা আলাদা এসেছে, আলাদাই ফিরে যাবে।” সুমু আলিশাকে নিজের সাথে রাখতে চাইলেও, শেরাজ রাখতে দেয়নি।
শেখ বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠারা এদিক-ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখছেন। তারা মুখে কিছু বলছেন না, কিন্তু তাদের চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বিদায়ের কষ্ট। সুমি বেগম সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে বারবার বলছেন,
“যা মা, ভালো থাকিস। আর তোর বোনদের দেখে রাখিস।”
হাসি বেগম নীরবে সামিয়ার সুটকেসের ভেতর কাপড় গুছিয়ে দিচ্ছেন। আর রুমা বেগম সামিয়ার হাত ধরে বসে আছেন। কিছু বলতে পারছেন না তিনি। শুধু তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
ঘরজুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। বাইরে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। বিদায়ের ভার যেন সবার বুকের ভেতর চেপে বসে আছে।
ড্রয়িংরুমেও এখন গম্ভীর পরিবেশ। সাখাওয়াত সাহেব, শামীম সাহেব আর মুস্তাক সাহেব আরাম করে সোফায় বসে আছেন। তাদের সামনে কফির কাপ, চায়ের কাপ আর হালকা নাস্তার আয়োজন। তাদের সাথে শেরাজ ও তার বন্ধুরাও আছে। সবাই যেন বিদায়ের আগে শেষবারের মতো একসাথে সময় কাটাতে চাইছে। কথাবার্তায় হালকা গাম্ভীর্য থাকলেও, ভেতরে ভেতরে লুকিয়ে আছে একরাশ আবেগ আর অদ্ভুত টানাপোড়েন।
শামীম সাহেব কফির কাপে হালকা চুমুক দিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন,
“ওমানে তো এখন শীত শুরু হয়ে গেছে, তাই না?”
শেরাজ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল,
“জি, আব্বু। সন্ধ্যার পর বেশ ঠান্ডা পড়ে। তবে কাজের ব্যস্ততায় খুব একটা টের পাওয়া যায় না।”
সাখাওয়াত সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
“ব্যস্ততা ভালো। কিন্তু নিজের শরীরের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। শুনছি তোমার ব্যবসার ভালোই প্রসার।”
শেরাজ ভদ্র ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
“আলহামদুলিল্লাহ, দোয়ার বরকতেই সব এগোচ্ছে। তবে এখনও অনেক কিছু শেখার আছে।”
মুস্তাক সাহেব এবার সামনের দিকে ঝুঁকে বললেন,
“শেখার বয়স তো আসলে কোনোদিন শেষ হয় না। তোমাদের তরুণ প্রজন্মের ভেতরে এই আগ্রহটাই আমাদের ভরসা।”
শেরাজের পাশে বসা আইয়ুব মৃদু হাসি দিয়ে বলল,
“এস.কে তো আমাদের কাজের সময় কড়া শাসন করে। কাজের ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই ওর কাছে।”
শামীম সাহেব হেসে তাকালেন শেরাজের দিকে,
“কড়া হওয়াটাই ভালো। দায়িত্ব নিতে গেলে দৃঢ়তা চাই।”
শেরাজ একটু নিচু গলায় উত্তর দিল,
“দায়িত্বই আসলে মানুষকে বদলে দেয়।”
সাখাওয়াত সাহেব কথাটা শুনে থেমে গেলেন কিছুক্ষণ, তারপর সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। পাশ থেকে শামীম সাহেব আবারও বললেন,
“এরপর এলে অবশ্যই বেয়াই, বেয়াইনকে নিয়ে আসবে। ছেলেরা কোন বাড়ির মেয়েদের বিয়ে করেছে, সেটা কি তারা কোনোদিনও দেখবে না।”
শেরাজ হালকা গলায় উত্তর দিল,
“অবশ্যই, আব্বু। এবার সময়ের স্বল্পতার জন্য হয়ে উঠল না। তবে ইনশাআল্লাহ, পরেরবার যখন আসব, তখন দুই পরিবার এখানে একসাথেই বসবে।”
মুস্তাক সাহেব চশমা খুলে চোখ মুছে বললেন,
“ঠিকই বলেছো। পরিবারের মানুষদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হলে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।”
শেরাজ সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“পরেরবার সত্যিই কি একসাথে আসা সম্ভব হবে? সব বাধা কি মুছে যাবে?”
তার ভাবনার মাঝেই সাখাওয়াত সাহেব বললেন,
“আমার বেয়াই আর বিয়াইনদেরও নিয়ে এসো।”
আইয়ুব আলতো হেসে বলল,
“ইনশাআল্লাহ, আব্বু! এরপর এলে অবশ্যই সবাইকে নিয়ে তারপর আসব।”
শেরাজ চারপাশটা একবার লক্ষ্য করে বলল,
“পিয়াস এলো না?”
মুস্তাক সিকদার গম্ভীর গলায় বললেন,
“কি দরকার? আমার ছেলে এখানে না আসাটাই ভালো।”
শেরাজ ভদ্রতাসূচক হেসে বলল,
“আঙ্কেল! আমি আজ আবারও আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। তবে আজ আমরা চলে যাচ্ছি, পিয়াসের সাথে একবার দেখা না হলে আমাদের খারাপ লাগবে।”
পাশ থেকে শাহরুখ বলল,
“পিয়াসের সাথে আমার টেক্সটটে কথা হয়েছে। সকলে বেরোনোর আগেই ও চলে আসবে।”
মুস্তাক সিকদার ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার গলার স্বর আগের মতোই কঠিন। তিনি ধীরে বললেন,
“দেখা করার মতো তেমন কিছু নেই, শেরাজ। তবুও যদি আসে, আমি কিছু বলব না।”
সাখাওয়াত সাহেব হালকা কেশে নরম গলায় বললেন,
“ভুল সবাই করে। আর এখন তো সবকিছু অনেকটাই ঠিক হয়ে গেছে। এভাবেই একদিন সব পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবে।”
শেরাজ গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল,
“আমারও তাই বিশ্বাস, বড়আব্বু। পরিবারের ভেতর দূরত্ব যেন আর না বাড়ে।”
ঠিক তখনই বাইরে বাইকের শব্দ শোনা গেল। শাহরুখ দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে দরজার কাছে গিয়ে বলল,
“ পিয়াস এসেছে।”
ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। সবার দৃষ্টি একসাথে দরজার দিকে স্থির হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই দরজার কাছে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল। ড্রয়িংরুমের পরিবেশ মুহূর্তেই আরও ভারী হয়ে উঠল। সবার দৃষ্টি সেদিকেই আটকে রইল। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল পিয়াস। তার মুখে একরাশ দ্বিধা, চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। গায়ের পোশাকও যেন অগোছালো।
মুস্তাক সিকদার ঠোঁট চেপে বসে রইলেন। সাখাওয়াত সাহেব ও শামীম সাহেব দু’জনেই একটু গম্ভীর ভঙ্গিতে একে অপরের দিকে তাকালেন।
শেরাজ ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার ঠোঁটে ভদ্রতাসূচক একটুকরো হাসি। সে দৃঢ়তার সাথে বলল,
“পিয়াস! ভালো লাগছে তুমি এলে বলে। আজ আমরা চলে যাচ্ছি। ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আসবে না। দেখা না হলে, খারাপ লাগত খুব।”
পিয়াস কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ঘরের নীরবতা যেন আরও গভীর হয়ে উঠল। তারপর সে নিচু গলায় বলল,
“আজ আমাকে আসতেই হতো।”
শাহরুখ পেছন থেকে মজা করে বলল,
“ভাগ্যিস এলি, না হলে তো আমি ভাবতাম আমাদের এড়িয়ে যাচ্ছিস।”
পিয়াসের হালকা হেসে চাপাস্বরে বলল,
“শেষবারের মতো দেখতে এলাম। কে জানে, আবার কবে দেখতে পাব।”
শাহরুখের মুখের হাসিটা নিভে গেল। তবুও সে জোরপূর্বক হেসে বলল,
“চল ভেতরে।”
সে পিয়াসকে ভেতরে নিয়ে এলো। পিয়াস আসতেই সকলে আবারও কথা বলতে বলতে নাস্তায় মন দিল।
•
সন্ধ্যার নরম আলোয় চারপাশটা যেন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ঢেকে গেল। সুমুদের বাড়ির আঙিনায় ব্যস্ততা থাকলেও, সবার চোখেমুখে এখন আরও বেশি গভীর কষ্টের ছাপ। বিদায়ের সময় এসে পড়েছে—এই সত্যিটা যেন কেউ মুখে বলছিল না, তবু সকলের হৃদয়ে ভারী হয়ে আছে।
সুমু রেডি হয়ে রুমে একা বসে আছে। তার চোখ দূরের ল্যাম্পপোস্টের দিকে। শেরাজ নিঃশব্দে রুমে এলো। সে সুমুকে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। হঠাৎ রুমের কোণে থাকা ফুলদানি থেকে সে একটা গোলাপ ফুল হাতে তুলে নিল। সুমু এতোটাই অন্যমনস্ক যে, সে শেরাজের উপস্থিতি এখনো বুঝেতে পারেনি। শেরাজ ধীরে পায়ে এগিয়ে এলো তার কাছে। সে সুমুর কাঁধে হাত রাখতেই সুমু চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। শেরাজ পেছনে ফুলটা লুকিয়ে রেখে একবার সুমুর মুখটা ভালো করে দেখে বলল,
“আজ অনেকটা জার্নি করতে হবে, সুইটহার্ট। আমাকে এনার্জি দাও।”
সুমু বুঝতে পারল শেরাজের কথার মানে। সে সরে যেতে চাইলে, শেরাজ তার হাত ধরে বলল,
“প্লিজ!”
সুমু হাতাশার নিঃশ্বাস ফেলে। সে জানে, তার এই মানুষটার কাছে তার মুক্তি নেই। সে একটু সময় নিয়ে শেরাজের দু'পায়ের ওপর পা রেখে উঁচু হয়ে দাঁড়াল। তারপর সে শেরাজের ঘাড়ের পেছনে একহাত রেখে অন্যহাত শেরাজের পিঠে রেখে তাকে কাছে টেনে এনে অধরে অধর ডোবাল। শেরাজ চোখ বন্ধ করে সুমুর অধরের ছোঁয়া উপভোগ করল। কিছু সময় যেতেই সুমু ছেড়ে দিল শেরাজকে। শেরাজ আলতো হেসে সুমুর হাতে ফুলটা দিয়ে বলল,
“চলো, যেতে হবে আমাদের।”
সুমু মাথা নাড়িয়ে ধীরে পায়ে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। শেরাজ তার পাশে থেকে তাকে সাবধান নিচে নিয়ে গেল।
বাড়ির ভেতর থেকে বের হওয়ার আগে সুমু একবার চারপাশটা গভীর দৃষ্টিতে দেখে নিল। দেয়ালের প্রতিটি ছবি, বারান্দার প্রতিটি চৌকাঠ, এমনকি দরজার কাঠের গন্ধ—সবকিছু যেন তাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। তার চোখ ভিজে উঠল, বুকটা কেঁপে উঠল। সামিয়া আর নাজমিন তখন তার পাশে এসে দাঁড়াল। তাদের দু’জনের চোখেও জল চিকচিক করছিল।
হাসি বেগম কাঁপা গলায় বললেন,
“আমার মায়েরা, ভালো থাকিস তোরা। আল্লাহ তোদের মঙ্গল করুক। আমাদের দোয়া সবসময় তোদের সাথেই থাকবে। পৌঁছে গিয়ে সাথে সাথে আমাদের জানাবি।”
সুমু কিছু বলতে পারল না। শুধু মায়ের হাত শক্ত করে চেপে ধরল। তার ঠোঁট কাঁপছিল, চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
শামীম সাহেব তখন শেরাজের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“মেয়েটার যত্ন নিও, বাবা। আমার নাতি হোক বা নাতনি, তারও খেয়াল রেখো।”
শেরাজ ভদ্র গলায় মাথা নেড়ে উত্তর দিল,
“দোয়া করবেন, আব্বু।”
শামীম সাহেব শেরাজের কাঁধে একবার হাত রেখে রাহিনের কাছে এগিয়ে গেলেন। তিনি সামিয়াকে ডেকে এনে গোপনে চোখের পানি মুছে রাহিনকে বললেন,
“আমার বুকের ভেতর দুটো পাজর ছিল। একটা অনেক আগেই তার মালিকের হাতে তুলে দিয়েছি। আর অন্যটাও কিছুদিন আগে তার মালিকের হাতে চলে গেছে। আমার দুটো মেয়ে আমার কলিজার টুকরা। ওদের ওপর আমার অভিমান হলেও, ওরাই আমার সব। আমি জানি, আমি তোমাকে প্রথমে মেনে নিতে পারিনি। তবে আজ আমি স্বেচ্ছায় আমার ছোট মেয়েটাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। তুমি আমার এই মেয়েটাকে দেখে রেখো। ওকে কখনও কষ্ট দিওনা।”
কথাগুলো বলে তিনি সামিয়ার হাত রাহিনের হাতের ওপর দিলেন। রাহিন সামিয়ার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“আপনি চিন্তা করবেন না, আব্বু। আমি আপনার মেয়েকে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করব। আমি আপনাকে কথা দিলাম, ওকে আমি কখনও কষ্ট পেতে দেবনা।”
সামিয়া একটু জোরে কেঁদে উঠল। শামীম সাহেব আলতো হাসলেন। তিনি মেয়ে জামাইকে একসাথে বুকে টেনে নিলেন।
এদিকে, নাজমিন! সাখাওয়াত সাহেব আর রুমা বেগমকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে চলেছে। আইয়ুব তার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ফারিয়া আর ফারিন অনেক চেষ্টা করছে নাজমিনকে সামলানোর। সুমি বেগম! হাসি বেগম আর রুমা বেগমকে সামলাচ্ছেন। শাহরুখ আর আশিক একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ভেতরটা ভেঙে গেলেও, তারা যেন নীরব। তাদের দুজনের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে পিয়াস। তার মুখে মুচকি হাসি থাকলেও, চোখে ব্যথা স্পষ্ট।
হঠাৎ সামিয়া আর নাজমিন একসাথে এগিয়ে গেল শাহরুখ আর আশিকের কাছে। দুজনকে গিয়ে দুই ভাইয়ের জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল। শাহরুখরা নিজেদের শক্ত করে বোনদের সামলালো। কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ নাজমিন তাকাল পিয়াসের দিকে। পিয়াস অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নাজমিন তার সামনে গিয়ে বলল,
“আমাদের ক্ষমা করে দিও, ভাইয়া। নিজের খেয়াল রেখো। আর এই বোনদের মনে রেখো।”
পিয়াস ধীরে নাজমিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। সামিয়া একপলক পিয়াসের দিকে তাকাল। তারপর সে ধীরে এগিয়ে গেল পিয়াসের কাছে।
পিয়াস তার দিকে তাকাতেই সামিয়া বলল,
“নিজের খেয়াল রাখবেন। আসি।”
কথাটা বলে সরে এলো সে। সামিয়ার আর নাজমিন ধীরে গিয়ে দাঁড়াল মুস্তাক সিকদার, সুমি বেগম আর ফারিনের সামনে। সামিয়া! ফারিনের হাতদুটো ধরে বলল,
“আজ অন্তত রাগ করে থাকিস না। চলেই তো যাচ্ছি, বল। কিছুক্ষণ পর থেকে তোর এই খারাপ বোনটাকে আর চাইলেও চোখের সামনে দেখতে পাবিনা। এই কিছুক্ষণ সময়ের জন্য আমার ওপর থাকা সমস্ত রাগ ভুলে গিয়ে, আমাকে একবার জড়িয়ে ধরবি?”
ফারিন নিজেকে আটকাতে পারল না। সে সামিয়া আর নাজমিনকে একসাথে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলল,
“একটু রাগ করেছিলাম বলে, আজ আমাকে আর আমার আপুকে একা ফেলে এতোদূরে চলে যাচ্ছিস? ঠিক আছে যা। আমিও আর কোনোদিনও কথা বলব না তোদের সাথে। তোরা দুজনেই খুব খারাপ। সুমু আপুও খারাপ। সবাই আমাদের ফেলে যাচ্ছে। এই শোন, আজ আসবি না এখানে। এইভাবে বারবার এসে আমাদের এইভাবে মায়ায় ফেলে চলে যাবি, আর আমরা সেসব সহ্য করব, তাই না? যা চলে, যা।”
সে নাজমিন আর সামিয়াকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু নাজমিন আর সামিয়া যেন আঠার মতো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখল তাকে। ফারিয়াও এসে তাদের সাথে অংশগ্রহণ করল। মুহুর্তেই পরিবেশটা কান্নায় ভারি হয়ে উঠল। শাহরুখ আর আশিক এসে ওদের সামলালো। নাজমিন আর সামিয়া! মুস্তাক সিকদার আর সুমি বেগমের থেকেও বিদায় নিল। তারা দুজনও আজ সামিয়াকে আবারও আপন করে নিল। পিয়াস কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিল। ইশিতা, ইনায়া আর নাতাশাও একে একে সকলের থেকে বিদায় নিল।
বাইরে গাড়িগুলো প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লাগেজ একে একে তোলা হচ্ছে। চাকার শব্দে বাড়ির আঙিনায় এক অদ্ভুত শূন্যতা ভর করছে। সকলে নীরবে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে, যেন হঠাৎ করেই সবকিছু বদলে যাচ্ছে। শেরাজের সব ফ্রেন্ডরা একে একে সকলের থেকে বিদায় নিয়ে আগেই গাড়িতে উঠে পড়ল। শেরাজরা বাকিদের নিয়ে ধীরে ধীরে বাহিরে বেরিয়ে এলো। সুমু আজ নিজেকে যথেষ্ট শক্ত রেখেছে। আজ সে খুব একটা কাঁদেনি, ভেঙেও পরেনি।
মুস্তাক সিকদার বাহিরে এসে তাড়া দিয়ে বললেন,
“এবার ওদের ছাড়ো। এরপর বেরোলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।”
শেরাজ ধীরে মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল,
“ঠিক আছে! তাহলে আমরা আসি। আপনারা সকলে একে অপরের খেয়াল রাখবেন।”
সে ধীরে পিয়াসের কাছে গিয়ে বলল,
“পরের বার আসলে, তোমাকে সবার আগে বিয়ে দিব। আপাতত আসি, ব্রো। নিজের খেয়াল রেখো।”
পিয়াস ভদ্রতাসূচক হাসল। শেরাজ তার কাঁধে একবার হাত রেখে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে সুমুকে পাশে বসাল। গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন শুরু হলো, চাকার শব্দ ছড়িয়ে পড়লো সন্ধ্যার নিরিবিলি বাতাসে। শেরাজ জানালার দিকে তাকিয়ে একটি মুহূর্তের জন্য থেমে রইল, যেন চোখে চোখ রেখে সমস্ত বিদায়ের ব্যথা ও ভালোবাসা ধারণ করতে চাইছে।
সুমু তার হাত নীরবে শেরাজের হাতের ওপর রাখল। তার চোখে অশ্রু, মুখে সামান্য হাসি। ধীরে ধীরে গাড়ি বাড়ির আঙিনা ছেড়ে চলে যেতে লাগল। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই তাদের বিদায়ের দৃশ্য দেখছিল। তাদের গাড়ি ধীরে ধীরে শেখবাড়ির সীমানা থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
•
রাত প্রায় শেষের দিকে। প্লেনের চাকাগুলো ভেসে চলা ক্লাউডের ওপরে আলোয় ঝলমল করছে। ধীরে ধীরে প্লেন ল্যান্ডিং রানওয়ে স্পর্শ করল। গাইডের মৃদু গর্জন আর চাকার শব্দ ভেসে আসছে। সুমুর হাতে শেরাজের হাত। সে নরম কন্ঠে বলল,
“সুইটহার্ট, আমরা পৌঁছে গেছি।”
প্লেন থেমে গেল। সাফে ল্যান্ডিংয়ের স্থিরতা। সুমুর হৃদয় ধুকপুক করছে। সে ধীরে শেরাজের হাত আরও শক্ত করে ধরল। চারপাশের আলো, বোর্ডিং গেটের ব্যস্ততা, মানুষের পদচারণা—সবকিছু যেন একসঙ্গে থেমে গেছে।
গেট খুলল। যাত্রীরা একে একে নামতে লাগল। সুমু এবং শেরাজ ধীরে ধীরে কার্গো এলাকা পার হলো। লাগেজ নিতে গিয়ে সুমুর চোখ চারপাশে ছুটে বেড়াচ্ছে।
শেরাজ একবার পিছনে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো যে, কেউ তাদের দিকে অযাচিত নজর দিচ্ছে কিনা। সে শান্ত ও দৃঢ়ভাবে স্যান্ডিকে বলল,
“সবাইকে নিরাপদে নিয়ে এসো। আমি আর সুমু এগোচ্ছি।
স্যান্ডি মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। শেরাজ সুমুকে নিয়ে এগিয়ে গেল। তারা লাগেজের কাছে পৌঁছে তাদের ব্যাগগুলো খুঁজতে লাগল। সুমুর চোখ এখন আর চারপাশে ঘুরছে না, তার মন পুরোপুরি শেরাজের পাশে স্থির। শেরাজ তার দৃষ্টিকে চারপাশে রাখতে ভুলল না। সে কাজের ফাঁকে ফাঁকে চারপাশেও নজর রেখে সুমুকে বলল,
“তুমি কি নিজের লাগেজটা ঠিকভাবে দেখছো?”
সুমু মাথা নেড়ে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ, সব ঠিক আছে।”
শেরাজ ব্যাগগুলো একে একে বের করল। রাহিনরা এসে ব্যাগগুলো গাড়ির দিকে সরাতে শুরু করল। সকলে বাহিরে এসে গাড়ির দিকে এগোল। শেরাজ দরজা খুলে সুমুকে প্রথমে উঠতে বলল, তারপর নিজে সিটে বসল। তারা দুজন উঠতেই একে একে সকলে গাড়িতে উঠে পড়ল। গাড়ি ধীরে ধীরে বিমানবন্দর এলাকা থেকে বের হলো। সুমু জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। এবার সবকিছু কিছুটা পরিচিত মনে হচ্ছে তার কাছে। শেরাজও তার চোখে সতর্কতা রেখেছে। সে দেখছে, কেউ তাদের দিকে নজর রাখছে না, সব কিছু ঠিকঠাক আর নিরাপদে আছে কিনা। এখন তার মাথায় একটাই চিন্তা, সবাইকে নিয়ে নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছানো।
চলবে...?