ফন্ট সাইজ:
থিম:
খান সাহেব

৭৯তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া জাহান

#খান_সাহেব

#সুমাইয়া_জাহান

#পর্ব_79 ✦ প্রথমাংশ ✦

খান বাড়িতে আজ আবারও উৎসবের আমেজ। খান বাড়ির রাজকন্যা আর রাজপুত্রকে নিয়ে আজ বাড়িতে ফিরেছে খান পরিবার। সুমু আর শেরাজ তাদের দু’সন্তানকে কোলে নিয়ে বাড়ির সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। শেরাজ একহাতে কলিং বেল চাপল। ওমনি সাথে সাথে দরজা খুলে গেল। দরজা পুরোপুরি খুলতেই রঙিন বেলুন আর ফুলে ভরে ড্রয়িংরুম চোখে পড়ল সুমুদের। বাড়ির ভেতরে থাকা প্রতিটা সদস‍্য একসাথে বলে উঠল,

“ওয়েলকাম হোম, শেরাজ খান'স লিটল প্রিন্স অ্যান্ড প্রিন্সেস — দ্য হার্টবিটস অব খান হাউস!”

সুমুরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সবাই হাসিমুখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। অনন‍্যা খাতুন আর আফিয়া খাতুন এগিয়ে এসে সুমুকে নিয়ে ভেতরে এলো। শেরাজ তার মেয়েকে নিয়ে ভেতরে এসে সুমুর পাশে দাঁড়াল। ছোট্ট মেয়েটা তার বাবার মতোই গম্ভীর মুখে সবাইকে দেখছে, আর ছেলেটা মায়ের মতোই মিষ্টি হাসিতে তাকিয়ে আছে। সুমু হালকা ক্লান্ত, তবু তার চোখে প্রশান্তির ছোঁয়া—মাতৃত্বের প্রথম পরিপূর্ণ অনুভব যেন তাকে আলোকিত করে তুলেছে। শেরাজের মুখে সেই চিরচেনা দৃঢ়তা, কিন্তু আজ সেখানে এক অনন্য কোমলতা। দু’হাতে মেয়েটাকে ধরে রাখার ভঙ্গিটাই বলে দিচ্ছে—এই দুই প্রাণই এখন তার রাজ্য, তার দুনিয়া।

ইনায়া আর ইশিতা এগিয়ে এসে শেরাজ আর সুমুর কোল থেকে বাচ্চাদের কোলে নিয়ে নানান রকমের কথা বলতে লাগল। অনন‍্যা খাতুন সুমুকে নিয়ে সোফায় বসিয়ে দিল। সাহাবাজ সাহেব এসে শেরাজের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,

“ভাবছিলাম, আজ বিকালেই আমার দাদুভাইদের নামকরণ করে ফেলব। তুমি কি বলো?”

“অবশ‍্যই ড‍্যাড! নাম ছাড়া দুজনকে ভাকতেও পারছিনা।”

“সেটাই! সুমু মামনি, তুমি কি বলো?”

সুমু ধীরে বলল,

“আপনারা যেটা ভালো মনে করেন, আব্বু।”

“ঠিক আছে! তাহলে বিকালেই ওদের নামকরণ করে ফেলি।”

অনন‍্যা খাতুন এসে স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,

“সে করা যাবে। আপাতত ওরা রুমে যাক। আমার দাদুভাইরা আসবে বলে, আজ ওদের রুমটা আমি আবারও ভালো করে পরিষ্কার করিয়েছি।”

“হ‍্যাঁ! এখন ওদের রুমে যাওয়া উচিত। আমিও একটু শপে যাব। ওখানে শেহেজাদ একা আছে। আমি একটু গিয়ে ঘুরে আসি।”

“যান তাহলে।”

সাহাবাজ সাহেব বেরিয়ে গেলেন। অনন‍্যা খাতুন সুমুর দিকে তাকিয়ে বললেন,

“বাচ্চাদের নিয়ে রুমে যাও।”

সুমু উঠে দাঁড়াল। অনন‍্যা খাতুন ইনায়া আর ইশিতার উদ্দেশ্যে বললেন,

“বাচ্চাদের রুমে দিয়ে এসো।”

ইনায়া আর ইশিতা বাবুদের নিয়ে ওপরে চলে গেল। শেরাজ সুমুকে ধরে ওপরে নিয়ে গেল। অনন‍্যা খাতুন স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে সুমুদের জন‍্য দোয়া করল। তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আফিয়া খাতুনের সাথে কিচেনে চলে গেল।

•

রুমে বসে আছে সুমু। বাচ্চারা তার পাশে ঘুমিয়ে আছে। শেরাজ বসে ল‍্যাপটপে কাজ করছে। দুদিনে তার অনেক কাজ জমা হয়েছে। হঠাৎ বেলকনির কাছে কিছু পরার আওয়াজ কানে এলো তাদের। সুমু উঠতে নিলেই শেরাজ তাকে বসতে বলে নিজে উঠে বেলকনিতে গেল। কিটি বেলকনিতে আর একটা বিড়ালের সাথে মুখের কাছে মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শেরাজের ভ্রু কুঁচকে এলো। সে একটু লক্ষ্য করে দেখল, কিটির সাথে থাকা বিড়ালটা একটা মেয়ে বিড়াল। শেরাজ তড়িঘড়ি করে ফোন বের করল। সে ক‍্যামেরা অন করে ভিডিও শুরু করে বলল,

“ওরে শালা! সেই স্বাদ, তাইনা? আমার বাড়িতে থেকে আমারই রুমের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে মেয়ে এনে ইটিশপিটিশ করা হচ্ছে?”

মেয়ে বিড়ালটা বেলকনি দিয়ে লাফিয়ে চলে গেল। কিটি এসে শেরাজের পায়ের কাছে দাঁড়াল। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,

“তোকে আমার আগে থেকেই সন্দেহ হতো, বেটা বিড়াল। এখন আমার পায়ের কাছে কেন? এসব বলব, তোর মালকিনকে?”

কিটি শেরাজের পায়ের চারপাশে ঘুরতে লাগল। শেরাজের ভ্রু আরও কুঁচকে এলো। সে ক‍্যামেরা জুম করে বলল,

“তুই কি চাইছিস বলতো? এই তোর লজ্জা করেনা, বাড়িতে মেয়ে এনে ফষ্টিনষ্টি করিস। দাঁড়া তোর মালিককে বলছি।”

সে রুমে যাবার আগেই কিটি দৌড়ে রুমে চলে গেল। শেরাজ রুমে এসে দেখল, কিটি সুমুর কোলে উঠে বসে আছে। শেরাজ এগিয়ে এসে সুমুর চোখের সামনে ফোনটা ধরে বলল,

“তোমার নির্লজ্জ অবলা বিড়ালের বাচ্চার অবস্থা দেখো। ও বাড়িতে মেয়ে এনে এসব করছে।”

সুমু ফোনটা নিয়ে ভিডিওটা দেখে বলল,

“আর আপনিও নির্লজ্জের মতো এসব ভিডিও করেছেন?”

“আজব! তুমি আমাকে নির্লজ্জ বলছো?”

“তো আর কাকে বলব? কারো প্রাইভেট টাইমের ভিডিও আপনি কীভাবে করতে পারেন?”

“বাহ রে ভাই বাহ! মানবতা আজ কোথায়? ওরা ইন্টুপিন্টু করলে দোষ নেই, আর আমি ভিডিও করলে দোষ?”

“তা নয়ত কি? আপনার লজ্জা হওয়া উচিত।”

“ঠিক আছে, স্বীকার করছি আমি একটু কৌতূহলী হয়ে পড়েছি। কিন্তু, একটু ভাবো, ওরা আমার বেলকনিতে প্রেম করছে। কিছুদিন পর তোমার এই কিটি ওই মেয়ে বিড়ালের বাচ্চার বাবা হবে। তুমি ভাবতে পারছ, সুইটহার্ট?”

সুমু হাসি ধরে রাখতে পারল না।

“কোথায় দেখেছেন, প্রেম করছে। ওরা তো কেবল মুখের কাছে মুখ নিয়েছে।”

শেরাজ চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল,

“ওরে আমার ইনোসেন্ট বউ রে! তুমি কি জানো, এটা কী ধরনের প্রাইভেট মুহূর্ত? ওরা একে অপরকে কিস করছিল। না জানি আগে আরও কি কি করেছে।”

সুমু কিটিকে আলতো করে আদর করতে করতে বলল,

“যাই করুক না কেন, আপনার তাতে কি? আমার বাচ্চাটা বড় হয়ে গেছে। এই বয়সে এসব করবেনা, তো কবে করবে? আর তাছাড়া, কিটি এসব আপনার থেকেই শিখেছে।”

“বউ! তুমি সত্যি আমার বউ নাকি শত্রু? তুমি সবসময় এসব ক্ষেত্রে আমার দোষ দেখো কেন?”

“কারণ আপনি একটা নির্লজ্জ পুরুষ। কিটির সামনেও অনেকবার…”

থেমে গেল সুমু। শেরাজ দুষ্টু হেসে ভ্রু নাচালো। সুমু আর কোনো কথা না বলে কিটিকে আদর করতে লাগল। হঠাৎ বেডের ওপর শেরাজের ফোনটা বেজে উঠল। সুমু ফোনের দিকে তাকানোর আগেই শেরাজ ফোনটা নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

•

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। খান ম্যানশনের পুরো ড্রয়িংরুম এখন আলোয় ভরে গেছে। চাঁদের মতো গোল লাইট, ফুলের মালা, আর সোনালি পর্দায় সাজানো মঞ্চ। আজ শেরাজের রাজকন্যা ও রাজপুত্রের নামকরণ অনুষ্ঠান।

সুমু আজ পরেছে সাদা-মুক্তার কাজ করা অফ-হোয়াইট শাড়ি, চুলগুলো খোলা, মুখে হালকা মেকআপ। কোলে তার রাজপুত্র, পাশে দাঁড়িয়ে আছে শেরাজ—কালো পাঞ্জাবিতে, চোখে তৃপ্তির ছায়া।

আজ সবাই দুই ছোট্ট প্রাণের নাম কী রাখা হবে, সেটা শোনার অপেক্ষায় আছে। শেরাজ আর সুমু বাচ্চাদের নিয়ে নিচে নেমে এলো। ফিরোজা দৌড়ে এসে শেরাজের পাশে দাঁড়াল। শেরাজ একহাতে ফিরোজার হাত ধরল।

অনন‍্যা বেগম এগিয়ে এসে বললেন,

“চলো বেটা, নামটা ঘোষণা করো।”

শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

“তুমি বলবে, সুইটহার্ট।”

সুমু মুচকি হেসে বলল,

“না! ওদের নাম আপনি ঘোষণা করবেন।”

শেরাজ মৃদু হেসে সুমুর দিকে তাকাল। সে চোখ নামিয়ে এনে তার রাজকন্যার কপালে চুমু খেয়ে নরম কণ্ঠে বলল,

“আমাদের প্রিন্সেসের নাম—সিমরান খান। অর্থ—যে আল্লাহকে সবসময় মনে রাখে এবং হৃদয়ে যার নামের পবিত্রতা থাকে।”

সবাই তালি দিয়ে বলে উঠল,

“মাশাআল্লাহ!”

ছোট্ট সিমরান যেন বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল। এরপর শেরাজ সুমুর কোলে থাকা রাজপুত্রের দিকে তাকাল। তারপর নরম কণ্ঠে বলল,

“আর আমার ছোট প্রিন্সের নাম—শেরান খান। অর্থ—সাহস, বীরত্ব, আর রক্ষাকারী।”

মুহূর্তেই করতালিতে ভরে উঠল ড্রয়িংরুম। শেরাজ ধীরে ধীরে দুই সন্তানের কপালে চুমু খেয়ে বলল,

“সিমরান আমার আলো, আর শেরান আমার শক্তি।

সে সুমুর দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

“আর ওদের মাঝখানে তুমি আমার জান্নাত।”

সুমু আলতো হাসল। শেরাজ তাকে নিয়ে সোফায় গিয়ে বসল। অনন‍্যা খাতুন আর সাহাবাজ খান ওদের থেকে নাতি-নাতনিকে কোলে নিয়ে সোফায় বসলেন। রিয়াজ আর ছোট ফিরোজা এসে ছোট প্রাণ দুটির সাথে কথা বলতে লাগল। সুমু ঠোঁটে হাসি নিয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। পাশেই শেরাজ বসে ফোনে স্ক্রল করতে লাগল। হঠাৎ শেরাজের ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। শেরাজ কথা বলার জন‍্য উঠে চলে গেল। সুমু ক‍ৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার কিছু একটু ঠিক লাগল না। সে চোখ সরিয়ে সাহাবাজ খান আর অনন‍্যা খাতুনের কোলে থাকা সিমরান আর শেরানের দিকে তাকাল। মনে একটা ভয় এসে গেল। সে মনে মনে বলল,

“কিছু একটা ঠিক লাগছেনা। কেন বার বার মনে হচ্ছে, খারাপ কিছু হবে। আমার মনটা এতো অশান্ত লাগছে কেন? হে আল্লাহ! তুমি সবকিছু ঠিক রেখো। আর কোনো বিপদ যেন না হয়। সবাই যেন ভালো থাকে। আমি যেন আমার স্বামী, সন্তান আর আমার শশুরবাড়ির সবাইকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে সংসার করতে পারি।”

•

ঘড়িতে সময় রাত এগারোটা। রাহিন একা রুমে বসে, হালকা ক্লান্ত চোখে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। বাইরে রাস্তায় আলো-ছায়ার খেলা। সামিয়া এখনো রুমে আসেনি। রাহিন বুঝে উঠতে পারছে না, ওই মেয়েরা সারাদিন এতো কী কথা বলে।

রাহিন মাঝেমাঝে নিজের ল্যাপটপের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু মন ঠিক কাজ করছে না। সে নিজের মোবাইল হাতে নিল। ফোনটা আনলক করে সামিয়াকে টেক্সট করল,

“তোর গল্প করা কি শেষ হয়নি, সামু? রুমে কখন আসবি? আমি যদি ড্রয়িংরুমে আসি, তাহলে কিন্তু নাজমিনের সামনে দিয়ে তোকে কোলে করে রুমে নিয়ে আসব।”

টেক্সট সেন্ড করে সে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর সামিয়া রিপ্লাই এলো,

“সমস‍্যাটা কি আপনার? ঘুমান আপনি। আমি পরে আসব।”

রাহিন টেক্সটটা পড়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। সে আইয়ুবের ফোনে কল দিল। একবার রিং হতেই আইয়ুব কল রিসিভ করল। সে কিছু বলার আগেই রাহিন বাজখাঁই গলায় বলল,

“শা*লা তোর বউকে রুমে যেতে বলিস না কেন? তোর বউয়ের জন‍্য আমার বউও রুমে আসছেনা।”

আইয়ুব তেজ দেখিয়ে বলল,

“শোন! সেই দশটা থেকে রুমে এসে, বউয়ের অপেক্ষায় বসে আছি। এই পযর্ন্ত পাঁচশো টেক্সট করেছি। তোর বউ তো তাও তোর টেক্সটটের রিপ্লাই করে। আমারটা তো সিন করে রেখে দেয়।”

রাহিন ভ্রু কুঁচকে বলল,

“তোর বউই তো আমার বউয়ের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে আর তুই এভাবে অভিযোগ করছিস?”

“তোর বউ আমার বউয়ের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। আমি দশটা থেকে বসে আছি, টেক্সট পাঠাচ্ছি, আর ও শুধু সিন করছে। মানে, আমার বউও তোর বউয়ের মতো রুমে আসবে না।”

“হুম, মানে আমরা দুজনেই বউদের টেকনিক্যাল সমস্যার মধ্যে আটকে আছি। এখন কি করব?”

আইয়ুব হালকা কণ্ঠে বলল,

“তুই চিন্তা করিস না, আমি একটা আইডিয়া বের করছি।”

রাহিন চোখ বড় করে বলল,

“তোর আইডিয়া আর যুদ্ধ—দুটোই তোর আউট অফ দ্যা বক্স। শোন ওসব বাদ, একটা বাজি ধরি আয়।”

“কি বাজি?”

“আমাদের মধ্যে যে প্রথম বুদ্ধি দিয়ে বউকে রুমে নিয়ে আসতে পারবে, সেই জয়ী।”

“ওকে, ডান!”

দু’জনেই কল রাখল। রাহিন একটু ভেবে সামিয়াকে টেক্সট করল,

“সামু! আমার না ভীষণ মাথা যন্ত্রণা করছে। সারাদিন অনেক কাজ করেছি তো। তুই প্লিজ এখনই রুমে আয়।”

অপরদিকে, আইয়ুব নাজমিনকে টেক্সট করে বলল,

“ব্রাউন গার্ল! আমার ভীষণ পেটে ব‍্যথা করছে। আজ সন্ধ্যায় এস.কে’দের বাড়ি থেকে অনেক বেশি খেয়ে ফেলেছি তো, তাই এখন অসম্ভব পেটে ব‍্যথা করছে। তুমি প্লিজ রুমে এসো। তোমার স্বামী মরে যাচ্ছে যন্ত্রণায়।”

সামিয়া আর নাজমিন ড্রয়িংরুমে বসে। দুজনেই একসাথে টেক্সট দেখল। সামিয়া টেক্সট পড়ে বলল,

“ওনার নাকি অনেক মাথা ব‍্যথা করছে। এবার আমার রুমে যাওয়া উচিত। তুইও রুমে চলে যা।”

নাজমিন ভ্রু কুঁচকে বলল,

“রাহিন ভাইয়ার মাথা ব‍্যথা করছে? এদিকে উনিও তো টেক্সট করে বলল, ওনার নাকি পেট ব‍্যথা করছে। বুঝলাম না! দুজনেই একসাথে অসুস্থ হয়ে পড়ল।”

সামিয়া একটু ভেবে হেসে বলল,

“বাহ! দারুণ তো, দুজনেই একসাথে অসুস্থ হলো। আমার তো কেমন একটা গণ্ডগোলের মনে হচ্ছে।”

“ঠিক বলেছিস। আমি শিওর দুজনে প্ল‍্যান করে এসব করছে। কোনো পেট ব‍্যথা, মাথা ব‍্যথা না। এসব করে আমাদের রুমে নেবার প্ল‍্যান।”

সামিয়া বাঁকা হেসে বলল,

“তাহলে দুজনকে একটা শিক্ষা দেই, চল।”

নাজমিন কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“কীভাবে?”

“আজ আমি আর তুই একসাথে ঘুমিয়ে পড়ি চল।”

“ঠিক বলেছিস! আজ আমরা রুমে যাব না। মিথ্যা বলে আমাদের রুমে নেবার প্ল‍্যান। আজ আমরা রুমেই যাব না।”

দুজনে একসাথে হেসে উঠল। আর বসে না থেকে দুজনেই উঠে নিচের একটা রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল।

চলবে..?

#খান_সাহেব

#সুমাইয়া_জাহান

#পর্ব_79 ✦ বর্ধিতাংশ ✦

ভোরের আলো এখনো পুরোপুরি ফুটেনি। জানালার ফাঁক গলে হালকা আলো এসে পড়ছে ঘরের ভেতর। আবছা অন্ধকারে ঘরের পর্দাগুলো দুলছে হালকা বাতাসে।

বিছানায় সুমু এখনো ঘুমিয়ে—তার নিঃশ্বাস ধীরে পড়ছে। পাশে শুয়ে আছে ছোট্ট সিমরান, আর একপাশে শেরান, মায়ের বাহু আঁকড়ে। দু’জনের মুখে শান্তির ঘুম।

ওদিকে রুমের কোণে দাঁড়িয়ে শেরাজ ওয়ার্কআউট করছে—উন্মুক্ত বুক, ঘামে ভেজা শরীর, নিঃশব্দে কেবল শ্বাসের ওঠানামা আর ডাম্বেলের ঠকঠক শব্দ। প্রতিটি মুভমেন্টে তার শরীরের পেশি টানটান হয়ে উঠছে, তবুও তার চোখ মাঝেমাঝে ঘুরে যাচ্ছে বিছানার দিকে—সুমুর শান্ত মুখের দিকে। মুখে এক ফোঁটা হাসি ফুটে উঠল শেরাজের। সে আস্তে বলল,

“আমার সকল শক্তির কারণ যদি কেউ হয়—তবে সে তুমি, সুইটহার্ট।”

তারপর আবার ডাম্বেল তোলায় মন দিল। হঠাৎ ঠকঠক শব্দে সুমুর ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলে তাকাতেই আধো আলোয় শেরাজকে দেখতে পেল — ঘামে ভেজা শরীর, গম্ভীর মুখে মনোযোগ দিয়ে ওয়ার্কআউট করছে।

সুমু আধো ঘুমে চোখ পিটপিট করে উঠে বসল। তার লম্বা চুল এলোমেলো হয়ে মুখের পাশে এসে পড়েছে। ঘুমঘুম কণ্ঠে বলল,

“খান সাহেব, এত সকালে এইসব শব্দ না করলে হয়না?”

শেরাজ থেমে তাকাল, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি,

“সুইটহার্ট, ভোর মানেই তো এনার্জি। তুমি তো জানো, আমি দিনের শুরুটা ওয়ার্কআউট দিয়ে শুরু করতে পছন্দ করি।”

সুমু বালিশে মুখ গুঁজে বলল,

“আপনার শক্তির দরকার হলে কফি খান। আমি ঘুমাতে চাই…”

শেরাজ হালকা হাসল, টাওয়েল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে এসে বিছানার পাশে বসল। এক ঝটকায় সুমুর চুল সরিয়ে তার কানে ফিসফিস করে বলল,

“তুমি ঘুমাও। আমি আর বিরক্ত করব না”

সুমু চোখ না খুলেই মিষ্টি হেসে বলল,

“আপনি আমার সবচেয়ে সুন্দর আর কিউট ডিস্টার্ব, খান সাহেব।”

শেরাজ হালকা হাসল। সে টাওয়েলটা কাঁধে থেকে রেখে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঘামভেজা শরীরের প্রতিটি পেশি যেন আরও ফুলে উঠেছে। তার ভেইনি হ্যান্ডসের প্রতিটা শিরা ফুলে আছে। আয়নার দিকে তাকিয়ে সে হালকা হেসে হাত দুটো শক্ত করে ফ্লেক্স করল। এরপর একে একে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে নিজের বডির ভিডিও করতে লাগল — যেন নিজের শৃঙ্খলা আর পরিশ্রমের প্রতিফলন ক্যামেরায় বন্দি করছে।

সুমু আধো ঘুমে চোখ খুলে সেই দৃশ্য দেখছে। তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। ধীরে বলল,

“আপনি কি আবার নিজের প্রেমে পড়েছেন, খান সাহেব?”

শেরাজ আয়নার দিকে তাকিয়ে ফোন নামিয়ে হেসে বলল,

“না, সুইটহার্ট! আমি শুধু চেক করছি, আমার মিসেস খানকে মুগ্ধ করার মতো ফিট আছি কিনা।”

সুমু বালিশে মুখ লুকিয়ে হাসল,

“আপনি না, একদম পাগল।”

শেরাজ ফোন রেখে তার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

“তোমার জন্যই তো পাগল, সুইটহার্ট। আপাতত এসো একটা ভিডিও মেক করি।”

সুমু ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে উঠল,

“ভিডিও? এই সকালবেলা? আপনি কি পাগল হলেন?”

শেরাজ হেসে মাথা নেড়ে বলল,

“সেটা তো কবেই হয়েছি।”

সুমু মুখে বালিশ চেপে হেসে ফেলল,

“আমি এভাবে ভিডিও করব না, একদম না।”

শেরাজ ক্যামেরা অন করে বলল,

“তুমি না বললেই বা কী হবে, সুইটহার্ট? তুমি জানো তো, তোমাকে ছাড়া কোনো দৃশ্য সম্পূর্ণ হয় না।”

সুমু চাদর টেনে মাথা ঢেকে ফেলল,

“না মানে! আমি এখনো ঠিকমতো চুলে চিরুনীও করিনি। পাগলের মতো লাগছে আমাকে। আমি করব না।”

“এসো! তোমাকে ফেস দেখাতে হবেনা।”

“বললাম তো করব না। আপনি একা একা করুন।”

শেরাজ আয়নার সামনে চলে এল। সুমু মাথা বের করে দেখল। শেরাজ আবারও ভিডিও করছে। সুমু উঠে গিয়ে শেরাজের পেছন থেকে তার বুকের হাত রাখল। শেরাজের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে আয়নাতে ক‍্যামেরা ধরে রাখল। সুমু আলতো হাতে শেরাজের বুকে নখ বসিয়ে দিয়ে স্লাইড করে বলল,

“সকাল সকাল এভাবে বডি দেখাচ্ছেন কেন? আমি মোটেও ইন্টারেস্টেড না আপনার বডির ওপর। তার ওপর এখন তো আপনি দুই বাচ্চার বাবা হয়ে বুড়ো হয়ে গেছেন। বুড়োদের ওপর তো আমার এমনিতেও ইন্টারেস্ট আসবেনা।”

শেরাজ দুষ্টু হেসে বলল,

“তো তোমারটা দেখাও, সুইটহার্ট। আমি কিন্তু সেই লেভেলের ইন্টারেস্টেড তোমার ওপর।”

সুমু কিছু বলতে নিতেই পেছন থেকে শেরানের কান্নার আওয়াজ এল। সুমু দৌড়ে গেল। শেরানের ডায়পার লিক হয়ে গেছে। সুমু দুজনকে বেবি ক্রিবে রেখে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,

“বাবুদের ডায়পার চেঞ্জ করতে হেল্প করবেন, আসুন।

শেরাজ ফোনটা রেখে টাওয়েলটা হাতে তুলে নিয়ে বলল,

করতে পারি! যদি রাতে তুমি আমার মুড বানাতে স্বেচ্ছায় হেল্প করো।

সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,

“দুই বাচ্চার বাবা হয়েছেন, এবার তো একটু লজ্জাশরম পেতে শিখুন।”

শেরাজ এগিয়ে এসে শেরানকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,

“লজ্জার পাওয়া তো সেদিনই ভুলে গিয়েছিলাম, যেদিন থেকে বাচ্চা প্রেসেসিংয়ের কাজ শুরু করেছিলাম।”

“নির্লজ্জ পুরুষ একটা!” দাঁতে দাঁত চেপে বলল সুমু।

শেরাজ দুষ্টু হেসে বলল,

“নির্লজ্জ যখন বললে, এবার একটু নির্লজ্জ কাজও করতে দাও। নির্লজ্জতা না করে শুধু শুধু নির্লজ্জের উপাধি তো আমি মেনে নিব না, সুইটহার্ট।”

সুমু চোখ বড় বড় করে তাকাল,

“আপনার লজ্জা বলে কিছু নেই, তাই না?”

শেরাজ শেরানকে কোল থেকে নামিয়ে সযত্নে বেবি ক্রিবে রাখল। তারপর ধীরে ধীরে সুমুর দিকে এগিয়ে এলো। মুখে একচিলতে দুষ্টু হাসি।

“লজ্জা পাই শুধু তখনই, যখন তুমি আমার থেকে দূরে থাকো।”

সুমু দুই হাত বুকের কাছে তুলে পিছিয়ে গেল,

“না, না, এখন একদম এসব নয়। সকালে বাচ্চাদের সামনেই এসব কথা বলছেন। আপনি না, সত্যি একদম ইনসেন।”

শেরাজ হেসে এক পা এগিয়ে এল,

“ইনসেন না, সুইটহার্ট। ইন লাভ উইথ ইউ — সব সময়, সব মুহূর্তে।”

সুমু একচিলতে হেসে মুখ ফিরিয়ে নিল,

“আপনার ডায়ালগগুলো দিন দিন ড্রামা সিরিয়ালের মতো হয়ে যাচ্ছে।”

শেরাজ কাছে এসে তার কানের পাশে ফিসফিস করে বলল,

“ড্রামা নয়, রিয়েল লাইফ লাভ স্টোরি, সুইটহার্ট। আর তুমিই আমার হিরোইন।”

সুমু কিছু বলার আগেই, পাশের ক্রিব থেকে সিমরান হালকা শব্দ কেঁদে উঠল। সুমু দৌড়ে গিয়ে মেয়েটাকে কোলে তুলে নিল,

“আল্লাহ! দু’জনেই এখন একসাথে জেগে গেছে।”

শেরাজ হেসে বলল,

“ওদের সামলাও। আমি বরং তোমার জন্য কফি বানিয়ে নিয়ে আসি — এক্সট্রা স্ট্রং, যেন সারাদিন আমার মতো এনার্জি থাকে।”

সুমু মাথা নেড়ে হেসে ফেলল,

“না, আমার শুধু একটু শান্তি চাই, খান সাহেব। আর একটু ঘুম।”

শেরাজ সুমুর কপালে আলতো চুমু খেয়ে বলল,

“ঘুমের দরকার নেই, সুইটহার্ট। তোমার এই অবসন্ন চেহারাটা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস।”

সুমু চোখ নামিয়ে বলল,

“এসব কথা শুনে বারবার আপনার প্রেমে পড়ে যাই।”

শেরাজ হাসল,

“তো পড়ে যাও না। আমি তো প্রতিদিনই তোমার প্রেমে পড়ে যাচ্ছি, সুইটহার্ট।”

শেরাজের ফোন হঠাৎ বেজে উঠল। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে “স্যান্ডি” নামটি। সে দ্রুত কল রিসিভ করে এয়ারপডস কানেক্ট করে বেলকনিতে চলে গেল, আর সুমু বাচ্চাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

প্রায় পাঁচ মিনিট পর শেরাজ ফিরে এল। সুমু তার দিকে তাকিয়ে বলল,

“কী হয়েছে? হঠাৎ চুপচাপ কেন?”

শেরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“সাতটা আফগানের কোচি আফগান ক্লাসিক বা চারমদার যেটাকে বলে, এই ড্রেস এসেছে। আপাতত এই ড্রেসগুলোর ভিডিও শুটের জন্য ভালো মডেল লাগবে। সান, যেসব মডেল দেখিয়েছে, একটাও এই শুটের জন্য পারফেক্ট নয়।”

সুমু হালকা স্বরে বলল,

“আরে চিন্তা করবেন না। মডেলের অভাব নেই। পেয়ে যাবেন।”

শেরাজ সুমুর দিকে তাকাল। সুমু কাজ করতে করতে শেরাজের দৃষ্টি অনুভব করল। ভ্রু কুঁচকে বলল,

“কী? ওভাবে কী দেখছেন?”

শেরাজ নরম কণ্ঠে একটু টেনে বলল,

“সুইটহার্ট…”

সুমু সরাসরি চোখে চোখ রাখল,

“দেখুন খান সাহেব, একদম না। আমি এখন এসব পারব না।”

শেরাজ ধীরে হেসে বলল,

“আমার জন্য তোমার থেকে ভালো মডেল আর কে হবে, সুইটহার্ট।”

সুমু বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি এখন এই কাজে যেতে পারব না, খান সাহেব। বাচ্চাদের জন্য আমার সময় দরকার।”

শেরাজ ধীরে এগিয়ে এসে বসে সুমুর হাত ধরে বলল,

“সুইটহার্ট, আমি জানি তুমি বাচ্চাদের জন্য যত্নশীল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবেনা। ওদের জন‍্য ওদের তো পাপা আছে।”

সুমু কিছুটা চুপ। শেরাজ আরও এগিয়ে বলল,

“আরও ভালো লাগার কথা হলো, ইনায়া, নাতাশা, ইশিতা—তারা সবাই থাকবে। আর শুট হবে পুরোপুরি আমাদের বাড়ির ভেতরে আর বাড়ির সামন। সারবাজ শুটের সব ব্যবস্থা করবে।”

সুমু শ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল। শেরাজ আলতো হেসে সুমুর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। তার ফোনে আবারও টুং করে শব্দ হলো। শেরাজ মেসেজ চেক করে বলল,

“এই দেখো, ড্রেসগুলো। দুটো ফিরোজা কালার (টারকোয়েজ), একটা রেড, একটা ইয়োলো, একটা গ্রিন, একটা হোয়াইট অ‍্যান্ড গ্রিন কম্বিনেশন, আর এইটা ব্ল‍্যাক, হোয়াইট, গ্রিন, পিংক, কম্বিনেশনে। এখানের প্রতিটা ড্রেসই বিভিন্ন রঙের কম্বিনেশনে। বাট যেসব কালারগুলো বেশি হাইলাইট করা, আমি ঠিক সেই কালারগুলোর কথা বললাম।”

“হুম! ড্রেসগুলো অসম্ভব সুন্দর। বিশেষ করে এই ফিরোজ কালারের ড্রেসটা। একদম প্রেমে পড়ে যাবার মতো।”

“তোমার লাগবে?”

“না!”

“ঠিক আছে, এনে দিব।”

“চাইনা তো!”

“আমার চাই।”

সুমু আলতো হাসল। শেরাজ তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বলল,

“আমার বউজানটা। আমার বাবুদের আম্মুটা।”

সুমু শেরাজ বুকের মধ্যে মিশে রইল। এখানেই যেন দুনিয়ার সব শান্তি মেলে তার।

•

বিকালে শুট শুরু হলো। সকলে গার্ডেনে উপস্থিত। শেরাজ সিমরানকে কোলে নিয়ে বসে আছে। সে আর রাজকন‍্যার সাথে কথার ভান্ডার খুলে বসেছে। অপরদিকে, শেরান ইনায়ার কোলে। সেও যে শেরানের সাথে কথা বলাতে ব‍্যস্ত আছে।

ইশিতা আর নাতাশা সুমুকে তৈরি করে গার্ডনে নিয়ে এলো। তাকে প্রথমেই ফিরোজা রঙের কোচি আফগান ক্লাসিক ড্রেসটা পরানো হয়েছে। তার সাথে ম‍্যাচিং অর্নামেন্টস আর ফিরোজা এবং হোয়াইট রঙের ফুলের একটা বুকে তার হাতে দেওয়া হয়েছে। শেরাজ সুমুকে দেখে যেন একমুহূর্তের জন‍্য থমকাল। কোলের মধ্যে সিমরান নড়ে উঠতেই তার নজর আবারও সিমরানের দিকে গেল।

সারবাজ ক‍্যামেরা ঠিকঠাক করে বলল,

“সুমু, শুরু করা যাক। প্রথম শুট হবে, এই বাড়ির সামনে। তুমি গেট খুলে ভেতরে যাবে। হালকা ঘুরতে তারপর একদম গিয়ে এই ফুলটার কাছে এসে ফুলে টাচ করবে। ওকে?”

সুমু মাথা নাড়ল। সকলে প্রস্তুত হলো। ভিডিও শুট শুরু হলো। সারবাজ প্রতিটা ক্লিপ নিয়ে আবারও সুমুর কাছে গিয়ে বলল,

“সেকেন্ড শুট হলো, তুমি সিঁড়ি দিয়ে তিন ধাপ ওপরে গিয়ে দাঁড়াবে, তারপর ফুলগুলো উঁচু করবে, হালকা ঘুরবে, তারপর আবারও দু’ধাপ নিচে নেমে গিয়ে বসে পড়বে। তোমার ওড়না মেলে ধরবে। কখনও ওড়নাটা কাঁধে ফেলবে।”

সুমু সারবাজের নির্দেশ মতো সব করল। সারবাজ আবারও এগিয়ে এসে বলল,

“এবার পুলের কাছে গিয়ে বসো। হাতে কলসিটা নাও।”

সুমু পুলের কাছে গেল। সারবাজ তার ভিডিও শুট করল। একে একে সে সাতটি ড্রেসেই সুমুর শুট করল। শুটের মাঝে সুমু অনেকবার ব্রেক নেওয়াতে রাত হলো তার শুট শেষ করতে।

সুমু রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে নিল। সিমরান আর শেরান এখন ঘুমিয়ে। আজ তারা দুজন তাদের পাপাকে প্রচণ্ড বিরক্ত করেছে। শেরাজও শুয়ে আছে ওদের সাথে। সুমু ফ্রেশ হয়ে বাহিরে বেরিয়ে এল। সে এসে বাচ্চাদের আদর করে শেরাজের পাশে গিয়ে বসল। শেরাজ বালিশ থেকে উঠে এসে সুমুর কোমর জড়িয়ে ধরে তার কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করল।

•

রাতের আকাশে আজ মেঘ জমেছে। রায়য়ান আর আরিয়ান আজ একসাথে রাস্তা বেরিয়েছে, দুজনের হাতে ওয়াইনের বোতল। বাতাসে মৃদু শীত, আর ল্যাম্পপোস্টের নরম আলো তাদের ছায়ায় খেলছে। কখনো কখনো তারা হেসে ওঠে, আর কখনো দৃষ্টির কোণ থেকে চুপচাপ একে অপরকে তীক্ষ্ণভাবে দেখছে। রাস্তার ধারে শোভাবর্ধক গাছগুলো বাতাসে দুলছে, যেন তাদের মধ্যে রহস্যময় কিছু বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

রায়য়ান গাড়ি ড্রাইভ করছে, আরিয়ান তার পাশে দেবদাসের মতো বসে আছে। চোখের কোণে হালকা দুঃখ, আর মুখে অর্ধেক হাসি। মাঝেমাঝে সে আঙুল দিয়ে বোতল ঘুরাচ্ছে।

•

গাড়ি এসে থামল বারের সামনে। বারের ভেতরের হালকা আলো বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে, আর কাঁচের জানালা দিয়ে ভেতরের জমকালো পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। রায়য়ান গাড়ি থেকে নামল। কিন্তু আরিয়ান এখনও বসে আছে, চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নিচ্ছে। রায়য়ান আরিয়ানের পাশের দরজা খুলে দিয়ে হেসে বলল,

“নাম! চলে এসেছি।”

আরিয়ান ধীরে চোখ মেলল, মাথা কাত করে বলল,

“হুম, ঠিক আছে।”

আরিয়ান গাড়ি থেকে নামল। দুজন ধীরে ধীরে বারের ভেতরে ঢুকল। ভেতরের আলো আর গানের শব্দে মেতে আছে সবাই। রায়য়ান আরিয়ানকে নিয়ে বার কাউন্টারে চলে গেল। সেখানে রায়য়ানের দুই ডান হাত আর বাম হাত রুদ্র আর মাহিন এক সঙ্গে কিছু জঘন্যতম পরিকল্পনায় ব্যস্ত। আরিয়ান আর রায়য়ান এসে বসল তাদের সামনে। রায়য়ান ঠোঁটের মাঝখানে একটা সিগারেট রেখে আগুন ধরিয়ে বলল,

“কি করতে হবে জানিস তো?”

মাহিন রোবটের মতো করে বলল,

“ইয়েস বস!”

রায়য়ান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলল,

“আকিকার দিন অনেক লোকজন থাকবে ওদের বাড়িতে। কাজটা সাবধানে করা চাই। যেভাবেই হোক শেরাজের বাচ্চা দুটোকে নিয়ে আসবি। এস.কে, কী কম ছিল আমাদের জন‍্য। আবার একটা না, পুরো দুটো বীজ এসে হাজির হয়েছে। এস.কের বীজ দুনিয়াতে থাকুক আমি চাইনা। এসব করলে, সুহাসিনী কষ্ট পাবে আমি জানি। কিন্তু এখন কিছু করার নেই। আগে এস.কে’কে শেষ করার মাধ্যম একটাই ছিল, আর সেটা হলো সুহাসিনী। যেটা আমাদের পক্ষে মরে গেলেও সম্ভব না। এস.কে’কে শেষ করার জন‍্য সুহাসিনীর ক্ষতি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। কিন্তু এবার…এবার এস.কে’কে শেষ করার জন‍্য অন‍্য আরও দুটো মাধ্যম এসেছে। ওর বাচ্চাদের কিছু হলে, ও এমনিতেই অর্ধেক শেষ হয়ে যাবে। আর ও অর্ধেক শেষ হলে, বাকি অর্ধেক আমারই ওকে সহজে শেষ করতে পারব। আর তাই এই কাজটা তোদের করতেই হবে। যদি কাজটা না করতে পারিস, তাহলে তোরা নামক বীজ দুনিয়াতে থাকবি না।”

চলবে..?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন