#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_81. ✦ প্রথমাংশ ✦
দুপুরের পর থেকে সিমরান আর শেরানের প্রচণ্ড জ্বর এসেছে। শেরাজ বাড়িতে নেই। সকালে অফিসের কথা বলে বেরিয়েছে। সুমু অনেকবার কল করেও তাকে ফোনে পায়নি। রাহিনদের কল করলে, ‘তারা জানিয়েছে শেরাজ গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিংয়ে আছে।’ কিন্তু সুমু বুঝতে পারছেনা, সকাল থেকেই একটা মানুষ কী এত মিটিং করছে। তার হাতের সমস্ত কাজ যেন থেমে গেছে, মনে এক অজানা ভয় জমে আছে। সে ছোট্ট দুই প্রাণের দিকে বার বার তাকাচ্ছে, চোখের জল জমেছে। ডাক্তার এসে দেখে গেছে, তবুও বাচ্চাদের জ্বর কমছেনা।
“খান সাহেব কোথায় আপনি?” সুমু ফিসফিস করে বলল।
সিমরান আর শেরান জ্বরের তোপে খুব জ্বালাচ্ছে আজ। দুজনেই কেঁদে চলেছে। সুমু একবার সিমরানকে কোলে তুলে রুম জুড়ে হেঁটে বেরাচ্ছে, তো একবার শেরানকে। কোল থেকে নামালেই আর কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেই দুজন কেঁদে বাড়ি মাথায় তুলছে। দুজনকে বার বার কোলে উঠানো নামানো করার জন্য স্টিচের অংশটাতে তীব্র ব্যথা হচ্ছে তার। তবুও সে সন্তানদের কষ্ট দেখে সবটা মুখ বুঝে সহ্য করে নিচ্ছে। এদিকে সিমরান, শেরান আজ মায়ের কোল ছাড়া কারও কোলে থাকছেনা। রুমের মধ্যে বাড়ির প্রত্যেকটা মহিলা সদস্য উপস্থিত। তবে কেউ রাখতে পারছেনা তাদের দুজনকে।
“সুমু তোমার কষ্ট হচ্ছে। এখন একটু বিশ্রাম নাও, আমি আর ইশিতা ওদের রাখছি।” এগিয়ে এসে বলল ইনায়া।
“ওরা তো থাকছেনা তোমাদের কাছে। এদিকে জ্বরটাও কমছেনা। আমি এখন কী করব,?”
ইনায়া ধীরে হাতে হাত ধরে বলল,
“দুশ্চিন্তা করো না। ডাক্তার তো বলল, এমন নাকি হয়। সব ঠিক হয়ে যাবে, সুমু।”
সুমু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। বুকের ভেতর কেমন এক অজানা কাঁপুনি উঠছে। সে সিমরান আর শেরানকে, ইনায়া আর ইশিতার কোলে তুলে দিল। অনন্যা খাতুন তাকে। টেনে নিয়ে বেডের সাইডে বসালেন। ছোট্ট সিমরান কাঁপা কাঁপা ঠোঁট ফাঁকা করে কান্নার আওয়াজ তুলল, তার পাশে শেরানও কাঁদতে শুরু করল। দুই নবজাতক সন্তানের একসাথে কান্নায় ঘরটা যেন কেঁপে উঠল।
সুমু ছুটে গিয়ে সিমরানকে ইনায়ার থেকে কোলে নিল, তারপর অন্য হাতে শেরানকে জড়িয়ে ধরল। কোলের ভেতর দুটো নরম, গরম শরীর। সুমুর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
“আল্লাহ… ওদের একটু শান্তি দাও।” ফিসফিস করে বলল সে।
বেডে বসে বাচ্চাদের মুখে দুধ দিল। জ্বরের উত্তাপে কাঁপছে দুজনে। সে কাঁপা হাতে ওদের কপাল ছুঁয়ে জ্বর চেক করল। সে যেন নিজের শরীরের ব্যথা ভুলে গেছে। স্টিচের জায়গাটা টান খাচ্ছে ব্যথায়, কিন্তু সে একবারও বসে বিশ্রাম নিচ্ছে না।
নাতাশা এগিয়ে এসে বলল,
“ম্যাম, আপনি একটু শুয়ে পড়ুন। আমরা ওদের দেখছি।”
সুমু মাথা নেড়ে না করল,
“না, ওরা এখন শুধু আমার কাছেই চুপ করে। একটুখানি নামালেই কেঁদে ওঠে। দেখো, আমার বুকের মধ্যে রাখলে একটু শান্ত হয়ে থাকে।”
ইনায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“বাচ্চারা অসুস্থ থাকলে কিছু ভালো লাগেনা।”
সুমু, শেরান আর সিমরানকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করল। দুজনেই দুধ খেতে খেতে ঘুমে ঢলে পড়ল। সে ইনায়াদের ওদের কাছে বসতে বলল। ইনায়া আর নাতাশা দুজনের পাশে বসল।
সুমু ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে বেলকনিতে গিয়ে আবার কল করল শেরাজকে। এবারও ফোন বন্ধ। সে রাহিনকে কল করল। কল রিসিভ হতেই সুমু উদ্বিগ্ন কন্ঠ বলল,
“রাহিন ভাইয়া সত্যি করে একটু বলুন তো, খান সাহেব কোথায়?”
ওপাশ থেকে রাহিন বলল,
“সুমু, ও এখনো মিটিংয়ে।”
ফোনটা নামিয়ে সুমু এক মুহূর্ত স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল বাচ্চাদের দিকে। নিজেকে সামলে সে বলল,
“অফিস, মিটিং, এসব সম্পর্কে আমার আইডিয়া আছে, ভাইয়া। ভুলে যেওনা আমিও এই ওমানে বসে আমার ইন্ডিয়ার বিজনেস সামলাই। এমন কী মিটিং করছে উনি, যে সকালে শুরু হয়েছে কিন্তু এখনো শেষ হয়নি?”
রাহিন এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। একটু সময় নিয়ে বলল,
“আমি জানি, সুমু… কিন্তু আজকের মিটিংটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর আজ অফিসেও অনেক কাজ। আমি নিজেও সকাল থেকে কিছু খায়নি। আমি চেষ্টা করছি। এস.কে মিটিং শেষ করে বের হলে আমি ওকে জানিয়ে দিব।”
সুমু চোখ বন্ধ করল, ঠোঁট কেঁপে উঠল।
“ঠিক আছে, ভাইয়া। তোমাকে আর কষ্ট করে সাজিয়ে মিথ্যা বলতে হবেনা। আমি কিন্তু শেরাজ খানেই ওয়াইফ। কিছু বোঝার জ্ঞান না থাকলে তো আর তার মতো মানুষের বউ হতে পারতাম না। দয়া করে তুমি আর আমাকে মিথ্যা বলে সান্ত্বনা দিতে এসো না। তুমি শুধু ওনাকে বলে দিও, বাচ্চাদের অবস্থা ভালো না। আমি একা কিছুই সামলাতে পারছি না। বাকিটা আমি উনি বাড়িতে ফেরার পর ওনার সাথে বুঝে নিব।”
কলটা কেটে গিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারদিক। দূরের আকাশে সূর্য ডুবে যাচ্ছে, নরম সোনালি আলো গায়ে এসে পড়েছে তার। তবু সেই আলোয় উষ্ণতা নেই—মনে কেবল এক শূন্যতা।
ঘরে ফিরে সুমু দেখল, সিমরান আবার কেঁদে উঠেছে। ইনায়া তাকে সামলানোর চেষ্টা করছে। সে দ্রুত ছুটে গিয়ে সিমরানকে বুকের মাঝে টেনে নিল।
“কাঁদেনা মাম্মা।”
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ইনায়া! থার্মোমিটারটা দাও!”
ইনায়া ছুটে এসে দুজনের জ্বর মেপে চিন্তিত কন্ঠে বলল,
“শেরানের জ্বরটা কমেছে। তবে সিমরানের জ্বর আবার বেড়ে গেছে।”
সুমুর গলা কেঁপে উঠল,
“আমি এখনই ডাক্তারকে ফোন দিচ্ছি।”
সে ফোন হাতে তুলে ডাক্তারের নাম্বারে ডায়াল করল,
“ডক্টর, আমি মিসেস খান বলছি। শেরানের জ্বর একটু কমেছে। তবে সিমরানের জ্বর এখনো কমেনি, উল্টো বেড়ে গেছে…”
ডাক্তারের শান্ত গলায় বলল,
“চিন্তা করবেন না, ম্যাডাম। ওদের শরীর খুব ছোট, প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক। ঠান্ডা কাপড় ভিজিয়ে কপালে রাখবেন, বুক খুব গরম লাগলে একটু ভেজা তোয়ালে দিয়ে মুছে দিন। যদি রাতের মধ্যে কমে না, তাহলে আমাকে কল করবেন, আমি চলে আসব।”
সুমু কেঁপে ওঠা কণ্ঠে বলল,
“ঠিক আছে, ডাক্তার। ধন্যবাদ।”
কল কেটে সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। অনন্যা বেগম কাছে এসে বলেন,
“সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।”
সুমু চোখ নামিয়ে বলল,
“কখন ঠিক হব, আম্মু? যখনই ওদের কাঁদতে দেখি, মনে হচ্ছে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে। আমি আর সহ্য করতে পারছিনা ওদের কষ্ট।”
সুমু চলে গেল বেডের কাছে। বাইরে তখন রাত নেমে এসেছে। দু’টো ছোট্ট দেহ বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে সে নরম গলায় বলল,
“আল্লাহ, আমার সন্তানদের রক্ষা করো। ওদের জ্বর কমিয়ে দাও। আমি আর কিছু চাই না, শুধু ওদের সুস্থ করে দাও।”
•
রাত অনেকটা গড়িয়েছে। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত একটা ছুঁই ছুঁই। পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ। সিমরান আর শেরান ঘুমিয়ে আছে। সুমু বসে দোয়া পড়ছে আর মাঝে মাঝে বাচ্চাদের কপালে ঠান্ডা তোয়ালে চেপে ধরছে। তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে, শরীর ক্লান্ত, কিন্তু বুকের ভেতর এক অজানা শক্তি যেন তাকে জেগে থাকতে বাধ্য করছে।
অনন্যা খাতুন আর আফিয়া খাতুনকে জোর করে রুমে পাঠিয়েছে সে। কিন্তু ইনায়া, নাতাশা আর ইশিতা রুমে যায়নি। তারা বলেছে, “ভাইয়া না আসা পর্যন্ত তারা এখানেই থাকবে”।
ওদিকে, সারবাজ আর আরবাজও সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে এসেছে। সুমু তাদের শেরাজের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস না করলেও, ইনায়া সারবাজকে জিজ্ঞেস করতেই সে জানিয়েছে, আজকের মিটিং অফিসের বাহিরে ছিল। শেরাজ একাই আজ মিটিংয়ে গিয়েছিল। আর সেখান থেকেই সে সন্ধ্যায় আরও কিছু ক্লাইয়েন্টের সাথে বিজনেসের কিছু ডিল করবে। ওর ফিরতে অনেক রাত হবে। ও ফোন অন করার সময় পায়নি, এসব স্যান্ডি তাকে টেক্সট করে জানিয়েছে।”
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে টুপটাপ। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকে উঠতেই ঘরটা আলোকিত হলো এক মুহূর্তের জন্য। সেই আলোয় দেখা গেল—সুমুর চোখ বেয়ে নেমে আসা জল। সে নরম কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“খান সাহেব, আপনি জানেন না, আপনার বাচ্চারা কত কষ্ট পাচ্ছে আজ। আমি যে একা কিছুতেই ওদের সামলাতে পারছিনা…”
বাচ্চাদের দুজনেরই শরীর গরম হয়ে আছে। সুমু কপাল ছুঁয়ে দেখল, সিমরানের জ্বর সন্ধ্যায় কমলেও এখন আবার একটু বেড়েছে। বুকটা ধক করে উঠল তার। সে আবার ফোনে ডায়াল করল, “খান সাহেব”।
ফোনটা এবারও বন্ধ। সুমুর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। চোখের কোণের জমে থাকা অশ্রু ঝরে পড়ল বাচ্চাদের গরম গালে।
“মাম্মা কাঁদে না, মাম্মা আছে না তোমাদের কাছে…”
ঠিক সেই সময় দরজার বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল। নাতাশা দ্রুত জানালা দিয়ে উঁকি দিল,
“ম্যাম! মনে হয় স্যার এসেছেন।”
সুমু কিছু বলল না। তার বুকের ভেতর ধকধক করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে রুমে প্রবেশ করল সাদা শার্টে ভিজে যাওয়া শেরাজ খান, মুখ গম্ভীর, চোখে উদ্বেগের ছায়া। সে কিছু না বলে এগিয়ে এসে বাচ্চাদের কপালে হাত রাখল। গরম শরীর ছুঁয়েই মুখ কঠিন হয়ে গেল তার।
“জ্বর এত বেশি! ডাক্তার কি এসেছিল?”
“এসেছিল… কিন্তু কমছেনা কিছুতেই,” ইনায়া চিন্তিত গলায় বলল।
সুমু যেন চুপ। শেরাজ কাবার্ড থেকে একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে ওয়াশরুমে চলে গেল। ইশিতা উঠে এসে সুমুর পাশে বসে বলল,
“এখন আমরা যাই, সুমু। ওদের খেয়াল রেখো। আর দরকার পড়লে অবশ্যই আমাদের ডেকো।”
সুমু হালকা মাথা নাড়ল। ইশিতা, ইনায়া আর নাতাশা রুম থেকে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হতেই পুরো ঘরে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা।
সুমু বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে ক্লান্তি, মুখে একরাশ নীরব অভিমান। শেরাজ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো, চুল ভেজা, মুখে তীব্র গাম্ভীর্য। সে এগিয়ে এসে বেডের পাশে দাঁড়াল। বাচ্চাদের কপালে হাত রাখল।
“তুমি জ্বর মেপেছ?”
সুমু উত্তর দিল না। সে সিমরানের মাথায় হাত বুলিয়ে যেতে লাগল। শেরাজ আবারও বলল,
“ডক্টর কী বলেছে?”
তবুও কোনো উত্তর এলো না। সুমুর চোখ নিচের দিকে, ঠোঁট শক্তভাবে চেপে আছে, যেন নিজের কান্নাটাকে আটকে রেখেছে সে।
শেরাজ এক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইল স্ত্রীর দিকে। এতক্ষণে তার চোখে প্রথমবার দেখা গেল ক্লান্তি আর অনুশোচনা। সে ধীরে একটা চেয়ার টেনে বেডের পাশে বসল। বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি জানি, আজ সারাদিন তোমার খুব কষ্ট হয়েছে। কিন্তু কিছু কাজ ছিল যা এড়িয়ে যেতে পারিনি।”
সুমু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। শুধু হালকা করে সিমরানের গায়ে কম্বলটা টেনে দিল। শেরাজ নিঃশ্বাস ফেলল, কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল তার,
“তুমি রেগে আছো, জানি। কিন্তু অন্তত আমার দিকে একবার তাকাও, সুইটহার্ট।”
সুমু যেন পণ করেছে আজ সে কথা বলবেনা। শেরাজ চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে বলল,
“আমি জানি, আমি দোষী। কিন্তু তোমার এই নীরবতা আমার বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ করছে, সুইটহার্ট।”
সুমু তবুও কোনো কথা বলল না। বাচ্চাদের কপালে হাত রেখে দোয়া করতে লাগল,
“আল্লাহ, ওদের ভালো করে দাও।”
শেরাজ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। সেই দেখল এই দৃশ্য, যেখানে এক মা, এক ক্লান্ত নারী, যিনি সারাদিনের সব কষ্ট ভুলে শুধু সন্তানদের জন্য জেগে আছেন। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে আস্তে করে একটা কম্বল নিয়ে সুমুর কাঁধে দিল।
সুমু আজ অবাক হয়ে তাকাল না। রাত এখন আরও গভীর। শেরাজ বাচ্চাদের পাশে বসে রইল। মাঝে মাঝে জ্বর মাপছে, আবার কখনও ঠান্ডা কাপড় বদলে দিচ্ছে।
সুমু এক কোণে বসে, অচেতন চোখে তাকিয়ে আছে দুটো ছোট্ট মুখের দিকে। বাইরে বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে। কিন্তু ঘরের ভেতর দু’জন মানুষ, একজনের মুখে অভিমান, অন্যজনের চোখে অপরাধবোধ। আর তাদের মাঝখানে দু’টো নিঃশ্বাসে গরম ছোট্ট জীবন।
•
ভোরের আলোটা জানালার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকেছে। সাদা পর্দা বাতাসে হালকা দুলছে। সিমরান আর শেরান দুজনেই এখন ঘুমে।
সুমু সারা রাত এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করেনি। চোখে হালকা ফোলা ভাব, তবুও বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে মুখে এক অদ্ভুত শান্তি দেখা যাচ্ছে তার। পাশে টেবিলে থার্মোমিটার, ঔষধের বোতল আর আধা খাওয়া গ্লাসে পানি।
শেরাজ চেয়ারেই বসে ছিল সারা রাত। এখনো চোখে ক্লান্তি, তবু দৃষ্টি নিবদ্ধ সুমুর দিকে।
সুমু ধীরে উঠে দাঁড়াল, সিমরানের গায়ে চাদরটা টেনে দিল। তারপর নিজের কাজ শুরু করল—একটাও কথা না বলে।
শেরাজ ধীরে বলল,
“সুমু, একটু পানি দাও।”
সুমু হাতের কাজ থামাল না। টেবিলের গ্লাসটা তুলে তার দিকে বাড়িয়ে দিল, কিন্তু একবারও তাকাল না।
শেরাজ নিঃশ্বাস ফেলল।
“এভাবে কতদিন চুপ থাকবে তুমি?”
কোনো উত্তর নেই।
“আমি জানি, তোমার কষ্ট হয়েছে। আই এম সরি, সুইটহার্ট। প্লিজ, কথা বলো।”
তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সুমু পর্দা সরিয়ে বাহিরের দিকে তাকিয়ে রইল। শেরাজ উঠে দাঁড়াল।
“সুমু, আমি তোমার স্বামী। তুমি যদি আমার সাথে এভাবে নীরব থেকো, তাহলে আমি কি করে বুঝব তুমি কী চাও?”
সুমু এবারও চুপ। শেরাজ তার কাছে এসে দাঁড়াল।
“এনাফ, সুইটহার্ট। এখন তুমি আমার সাথে কথা বলবে। তোমার এই চুপ থাকাটা আর সহ্য হচ্ছে না আমার।”
সুমু ধীরে ঘুরে তাকাল। ঠান্ডা গলায় বলল,
“কাল কোথায় ছিলেন আপনি, খান সাহেব?”
ঘরের ভেতর মুহূর্তে নীরবতা। শেরাজ থমকে গেল। চোখ নামিয়ে বলল,
“আমি বাইরে ছিলাম।”
“বাইরে?” সুমু ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি দিল, “ওমানে ‘বাইরে’ বলতে অনেক জায়গা বোঝায়, তাই না? অফিস, মিটিং, বা অন্য কোথাও?”
শেরাজ মুখ তুলে তাকাল। গলার স্বর ভারী হয়ে এলো।
“তুমি আমাকে অবিশ্বাস করছ?”
সুমু ধীরে বলল,
“না! শুধু বিশ্বাসটা হারিয়ে গেছে কবে, সেটাই এখন মনে করতে পারছি না।”
সে বাচ্চাদের কাছে চলে গেল, যেন শেরাজর কথা আর শুনতে চায় না। শেরাজের বুকের ভেতর কিছু একটা কেমন যেন চেপে ধরল। সে এগিয়ে এসে সুমুর হাত ধরতে গেল, কিন্তু সুমু হাত সরিয়ে নিল।
“খান সাহেব, এখন হয়তো বাচ্চাদের জ্বর কমছে। তবে এই মুহুর্তে আমার কাছে ওদের যত্ন করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
শেরাজ আর কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল স্ত্রীর মুখের দিকে, যেখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু তা অভিমানের পর্দায় ঢাকা।
“কাজ ছিল,” মৃদুস্বরে বলল সে।
সুমু একটা হাসি দিল, কিন্তু সে হাসি মিষ্টি নয়, তাচ্ছিল্যময়।
“কী কাজ ছিল আর কোথায় কাজ ছিল, খান সাহেব? সেটাই জানতে চাইছি,” সে বলল, হাত ঘুরিয়ে ছোট্ট বাচ্চাদের দিকে দেখাল যেন সময় নষ্ট করতে চায় না।
শেরাজ কিছু বলতে চাইল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। সে চুপ করে রইল। সুমু আবারও হালকা তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
“আপনি চুপ, কারণ আপনি আমাকে মিথ্যা বলতে পারেন না, তাই না?”
শেরাজের কিছু বলল না, কেবল তাকিয়ে রইল। সুমুর হাসি যেন এক রকম জোর করে বের করা, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত ধারালো ব্যথা লুকানো তার। সে আবার দুই ছোট্ট সন্তানদের দিকে তাকাল, ঠোঁটের কোণে নরম হাসি। শেরাজ চুপচাপ এগিয়ে এসে সুমুর কাঁধে হাত রাখল। সুমু হাত সরিয়ে দিল। তার মন বলছে, ‘বড় কোনো ঝড় আসবে। যে ঝড় সব তছনছ করে দিবে। তার খান সাহেব হয়তো আবারও রক্তে হাত ভিজিয়েছে। আর এবার হয়তো সব শেষ হয়ে যাবে। তার জীবনের সুখের দিনের পাতা হয়তো এবার শেষ হয়ে যাবে।’
চলবে..?
#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_81 ✦ বর্ধিতাংশ ✦
রাত তখন গভীর। বাইরে বৃষ্টি থেমেছে, কিন্তু বাতাসে এখনো ভেজা মাটির গন্ধ। রায়য়ান হাতে একটি ব্যাগ নিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ির গেট খুলে ভেতরে ঢুকল। ড্রাইভওয়ের আলোয় তার মুখে দেখা গেল অদ্ভুত ক্লান্তি, চোখ দুটো লাল, কিন্তু ঠোঁটে একরকম তৃপ্তির ছাপ। সে নিঃশব্দে ড্রয়িংরুম পার হয়ে গেল। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে একবার পেছনে তাকাল, যেন কেউ অনুসরণ করছে কি না দেখল। তারপর সোজা গিয়ে থামল আলিশার রুমের দরজার সামনে। দরজাটা আধখোলা ছিল। হালকা আলো ছিটকে বেরিয়ে আসছে ভিতর থেকে।
আলিশা, রায়য়ানের একটা ছবি নিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে। সে ধীরে ছবিটার ওপর ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। হাতের আঙুলগুলো ছবিটার ওপর ঘষে গেয়ে উঠল,
“আঁখি ভরে দেখি তারে,
পরাণ দিয়ে ছুঁই!
যতই মোরে দূরে সরায়
তত কাছে রই!
হায়রে একি তার ছলনা,
কেনো মোরে দেয় বেদনা!
বোবা মনের ভালোবাসা,
সে তো বোঝেনা!”
রায়য়ান ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। দরজা খোলার শব্দ পেয়ে উঠে বসল সে। বুকের ওড়নাটা ঠিক করে বেড থেকে নেমে দাঁড়াল।
“তুমি তো ঠিকমতো এখানে আসো না, তো আজ হঠাৎ এই অসময় এলে যে?”
রায়য়ান এগিয়ে এসে সোফার ওপর আরাম করে বসল। পা দুটো তুলে দিল সেন্টার টেবিলের ওপর। পকেট থেকে ছোট্ট একটা বিয়ারের বোতল বের করে চুমুক দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিয়ে বলল,
“আমি এতিম রে। আর তাই আমি মরে গেলে আমার জন্য কাঁদার আর আমাকে মনে রাখার জন্য একমাত্র তুই আছিস। তাই আজ শেষ সময় তোর কাছে এলাম। মনে রাখবি তো আমায়?”
আলিশার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে ধীর পায়ে হেঁটে এসে রায়য়ানের সামনে মেঝের ওপর বসল। ব্যথার দৃষ্টিতে রায়য়ানের দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে বলল,
“তুমি মরে যাবে মানে? কীসব বলছ তুমি?”
রায়য়ান হালকা হেসে মাথাটা পিছনে ঠেকাল। চোখদুটো আধবোজা, ঠোঁটের কোণে তৃপ্তি আর রহস্যের হাসি মিশেল।
“মরণ মানে তো সব শেষ না, আলিশা। কখনো কখনো মানুষ বেঁচে থেকেও মরে যায়। যেমন এখন আমি।”
আলিশা কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
“তুমি এমন কথা বলছ কেন, আর.সি? তুমি কিছু করেছ নাকি?”
রায়য়ান চুপ করে তাকাল তার মুখের দিকে। হালকা হেসে বলল,
“করেছি বললে হয়তো তুই ভয় পাবি। না বললে তুই প্রশ্ন করবি। তাই ভাবলাম… এসব বাদ দেই।”
আলিশা কেঁপে উঠল।
“আর.সি, আমি ভয় পাচ্ছি। তোমার চোখদুটো এমন লাল কেন? ওই ব্যাগে কী আছে?”
রায়য়ান ব্যাগটার দিকে তাকাল। চোখ এক মুহূর্তের জন্য নরম হলো। শান্ত গলায় বলল,
“এই ব্যাগে আমার নিষিদ্ধ পাপ আছে, আলিশা। এমন পাপ, যেটা ধুয়ে ফেলতে হলে সাগরের পানিও কম পড়ে যাবে।”
আলিশা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল,
“না আর.সি! তুমি এমন কিছু করতে পারো না। তুমি তো খারাপ না… তুমি খারাপ না।”
রায়য়ান নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার দিকে, যেন সেই কান্নার শব্দ তার বুকের ভেতরে আজ তোলপাড় করে দিচ্ছে। নিচু গলায় বলল,
“খারাপ হতে হয়, আলিশা। কারণ এই স্বার্থের দুনিয়ায় ভালোদের জায়গা নেই। ভালোবাসার দৃষ্টিতে মানুষ যতই স্বর্গীয় দেখাক, দুনিয়ার প্রতিটি মানুষের পেছনে অন্ধকার লুকিয়ে আছে।”
“তুমি এসব কী বলছ আর.সি, আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা।”
“তোকে এতকিছু বুঝতে হবেনা”, সে প্যাকেটটা হাতে তুলে নিয়ে আলিশার দিকে বাড়িয়ে দিল, “এরমধ্যে তোর জন্য একটা গিফট আছে। আজ খুলে দেখবিনা। আমি যেদিন মেসেজ করে খুলে দেখতে বলব, সেদিন খুলে দেখবি।”
আলিশা চোখ মুছে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তারমানে এই এত রাতে এইটা দেবার জন্য আর এইসব গাঁজাখুরি গল্প শুনিয়ে আমাকে কাঁদানোর জন্য এসেছ?”
রায়য়ান একটা আলতো হাসি দিল। সেই হাসিতে যেন প্রাণ নেই।
“এবার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য অনেক দূরে চলে যাচ্ছি। কবে ফিরব, আদো কোনদিনও ফিরতে পারব কিনা জানিনা। তুই, তোর আর আন্টির খেয়াল রাখিস।”
আলিশা হঠাৎ রায়য়ানের হাতটা চেপে ধরল, যেন ওকে চলে যেতে দিবে না।
“তুমি যাচ্ছ মানে? কোথায় যাচ্ছ তুমি, আর.সি? বলো না! আমি ভয় পাচ্ছি।”
রায়য়ান ধীরে তার হাতটা সরিয়ে নিল। চোখে এক মুহূর্তের জন্য এক অদ্ভুত কোমলতা ভেসে উঠল, তারপর আবার পাথর হয়ে গেল তার মুখ।
“আমাকে যেতে হবে, আলিশা। আন্টি ঘুমাচ্ছে বলে, চলে যাবার আগে একবার তার সাথে দেখা করে যেতে পারলাম না।”
“তুমি কোথাও যাবেনা, আর.সি। আমি তোমাকে যেতে দিব।”
“আমার সময় হয়ে এসেছে, পাগলী। আমাকে যেতেই হবে।”
“আর.সি, চলোনা আমরা একটা নতুন জীবন শুরু করি। সেই জীবনে আমরা অনেক সুখে থাকব আর.সি, আমি কথা দিচ্ছি তোমাকে।”
“সম্ভব না আলিশা! আমি যে আমার সুহাসিনীকে ভালোবাসি। তাকে কাছে পাইনি, তবু তার প্রতি আমার ভালোবাসার শেষ নেই।”
“সে তোমার জন্য নিষিদ্ধ, তুমি এইটা কেনো বুঝতে পারোনা।”
“শুনেছি, নিষিদ্ধ ফলটাই নাকি সবচেয়ে মিষ্টি লাগে। তাই তো যা পাওয়া সহজ, তা মানুষকে টানে না। কিন্তু যা পাওয়া যায় না, সেটাই মানুষকে পাগল করে তোলে।”
“তুমি আমার গল্পের শেষে অপূর্ণতা হয়ে থেকে যাবে, এই দহন আমি সইব কেমন করে বলো তো? তোমার মতো কেউ ছিল না, কেউ থাকবেও না, যে আমার না হয়েও, আমার কল্পনাতে একান্তই আমার হয়ে থাকবে।”
“পরজনমে তুই আবারও আমার প্রেমে পড়িস। আমি সেই জনমে তোকে ভালোবেসে পূর্ণতা কাকে বলে দেখিয়ে দিব।”
“পরজনম বলতে কিছু হয়না, পারলে এই জনমেই রেখে দিও।”
রায়য়ান তাচ্ছিল্য করে হাসল। ভালোবাসা সত্যি বড্ড পোড়ায়। সে উঠে দাঁড়াল। পেছনে আলিশাকে ফেলে চলে গেল রুম থেকে। আলিশা তাকিয়ে রইল। ধীরে উঠে দাঁড়াল। ব্যস্ত পায়ে হেঁটে বেলকনিতে এসে দাঁড়াল। চোখের পানি মুছে নিচে তাকাল। রায়য়ানের গাড়িটা চোখের বাহিরে না চলে যাওয়া অব্দি তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর হুঁ হুঁ করে উঠল। বাহিরে আবারও বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আলিশা হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি ছুঁয়ে তার ফেলে রাখা গানটি আবারও গেয়ে উঠল,
“নাগার আমার নিঠুর বড়,
মনও বোঝেনা!
আমার ভাঙা খাঁচা পড়ে আছে,
সে তো আসেনা!
পোড়া মনে ভালোবাসা,
বাসা বাধে না!”
বেলকনির ভেজা মেঝের ওপর বসে পড়ল সে। বুকের ভেতরটায় যেন কেউ বিষমাখা ছুরি গেঁথে দিয়েছে। বাহির থেকে বৃষ্টির ঝাপটা এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে তাকে।
•
রায়য়ান রাতের অন্ধকার পেরিয়ে নিজের পাতালপুরীতে ফিরল। ধুলো-মাটি আর খাঁচার লোহার গন্ধ ভেসে আছে চারপাশে। বাতাসে ফুসফুসে জ্বাল দেয়ার মত মদ ও সিগারেটের গন্ধ ভেসে আছে। মেঝের এক কোণে আরিয়ান নেশায় মাতাল হয়ে পড়ে আছে। তার চুল এলোমেলো, চোখ আধখোলা, শরীর জড় হয়ে গেছে মেঝের সঙ্গে। হালকা খিচুনি আওয়াজ করছে সে, মাঝে মাঝে অজান্তেই ফিসফিস করে কিছু বলছে। রায়য়ান ধীর পায়ে এগোতে লাগল, আরিয়ানকে ডিঙিয়ে কক্ষের ভেতর ঢুকল। আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এই মানুষটা কতটা দুর্বল। সে ঝুঁকে গিয়ে আরিয়ানকে শক্ত করে ধরে টেনে তুলল।
“আরিয়ান, উঠে দাঁড়া!”
আরিয়ান অস্থির হয়ে হাত নেড়ে চেষ্টা করল দাঁড়াতে, কিন্তু ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে ঝুঁকে পড়ল। রায়য়ান আবারও শক্ত করে ধরে তাকে টানতে লাগল। আরিয়ান চোখ মেলে পুরোপুরি তাকাল। রায়য়ান তাকে কাঁধে চাপিয়ে এক পাশে বসিয়ে দিল,
“তুই ঠিক আছিস তো, ব্রো?” রায়য়ান জিজ্ঞাসা করল।
আরিয়ান কিছু না বলে হালকা মাথা নাড়ল। রায়য়ান তার মুখে পানি ছিঁটাল। আরিয়ান আবারও চোখ মেলে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
“আমাকে লং ড্রাইভে নিয়ে চল, রায়য়ান।
রায়য়ান বিরক্ত স্বরে বলল,
“তুই পাগল নাকি? এই অবস্থায় কোথা যাবি?”
আরিয়ান মাথা নেড়ে হাসল,
“জীবনটা থেমে আছে, রায়য়ান। আজ একটু গতি চাই।”
রায়য়ান তার কলার চেপে ধরল, কন্ঠ ভারী হয়ে গেল তার।
“তুই নিজের সর্বনাশ করছিস, আর আমি সেটা দেখতে পারব না। ওঠ, পানি খা।”
আরিয়ান মৃদু হেসে সোজা হয়ে বসল।
“আমাকে থামাতে পারবি না, রায়য়ান। আমি জানি কোথায় যেতে হবে।”
রায়য়ান চোখ কুঁচকে তার মুখের দিকে তাকাল,
“কোথায়?”
আরিয়ান চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। ধীরে বলল,
“যেখানে সুমু আছে…”
রায়য়ান তাকে টেনে দাঁড়াল করালো। হাতে দুটো ওয়াইনের বোতল নিয়ে আরিয়ানকে নিয়ে বেরিয়ে এলো। আরিয়ানকে সিটে বসিয়ে নিজে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট করল। নিস্তব্ধ রাতে গাড়িটা গর্জন তুলে ছুটে চলল।
গাড়ি এসে থামল মাঠের কিনারে। চারপাশে শুধু অন্ধকার আর ভেজা ঘাস। রায়য়ান প্রথমে গাড়ি থেকে নামল, তারপর আরিয়ান। দুজনেই একসাথে মাঠের মাঝখানে এগোল। ভেজা ঘাসের স্পর্শে এক চিলতে কুঁচকে তারা হেসে উঠল। রায়য়ান মাঠের ভেজা ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল। আরিয়ানও অনুশীলনের মতো একইভাবে শুয়ে পড়ল। দুজনের ঠোঁটে হাসি, হাতে ওয়াইন এবং বোকা বোকা উন্মত্ততার ছায়া। আরিয়ান ওয়াইনের বোতলে চুমুক বসিয়ে বলল,
“দিয়ে এসেছি?”
রায়য়ান মাথা নাড়ল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“হ্যাঁ! জিনিসটা দিয়ে একেবারে শেষ বিদায় নিয়ে এসেছি।”
“আসতে দিল তোকে?”
“আমাকে আটকে রাখার ক্ষমতা একমাত্র সুহাসিনীর ছাড়া আর কারও নেই।”
আরিয়ান ব্যথাতুর হেসে বলল,
“সে ভালোবাসতে জানত, অথচ আমায় ভালোবাসেনি। সে আমার সব হয়ে উঠেছিল,
তবু আমি তার কিছুই হয়ে উঠতে পারলাম না।”
রায়য়ানও হেসে উঠল এবার। সে উঠে বসে পুরো ওয়াইনের বোতল এক চুমুকে শেষ করল। ভেজা ঘাসের দিকে তাকিয়ে হাপাতে হাপাতে বলল,
“তার ভালো চাইতে গিয়ে, আমার আর ভালো থাকা হলো না।”
•
শেরাজ আজও ভোর হতেই বেরিয়ে গেল। সুমু আজ আর কোনো প্রশ্ন করল না তাকে। সে চুপচাপ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে কফির মগ, চোখের নিচে হালকা কালো দাগ—রাতে না ঘুমানোর ছাপ। বাইরে আকাশটা ঘন মেঘে ঢেকে আছে, যেন তার মনের মতোই ভারী।
শেরাজ যখন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে জুতা পরছিল, সুমু তখনও চুপ ছিল। সে সিমরান আর শেরানের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলেছিল,
“মাম্মা তোমাদের সাথে আছে, মাম্মা কাউকে আর কিছু জিজ্ঞেস করবেনা।”
শেরাজ একবার তাকিয়েছিল, যেন কিছু বলতে চায়। কিন্তু সুমুর নীরব চোখ দেখে সে থেমে গিয়েছিল। কারণ সেই মুহুর্তেও সুমুর নীরব চোখে ছিল অভিমান, ক্লান্তি, আর এক অদ্ভুত দূরত্ব।
গাড়ির শব্দ মিলিয়ে যেতেই সুমু ধীরে দরজাটা বন্ধ করে নিঃশব্দে ঘরের ভেতর ফিরে এলো। সিমরান আর শেরান তখনো ঘুমাচ্ছে। দুজনের মুখে শান্তির ছাপ। ওদের দিকে তাকিয়ে সুমুর ঠোঁটে একটু নরম হাসি ফুটল, কিন্তু চোখের কোণে অশ্রুর রেখা। সে ধীরে ওদের মাথায় হাত রেখে হালকা কণ্ঠে দোয়া করল,
“আল্লাহ, আমার সন্তানদের তুমি সবসময় ভালো রেখো।”
বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হলো। বেডের ওপর অযত্নে পড়ে থাকা ফোনটার জ্বেলে উঠল। সুমু ফোনটা হাতে তুলল। শেরাজের মেসেজ,
“সুইটহার্ট, বিকেলের আগে ফিরতে পারব না। কিছু ক্লায়েন্ট মিট করতে হবে। বাচ্চাদের খেয়াল রেখো। আই লাভ ইউ।”
সুমু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সে ধীরে ফোনটা রেখে দিল। ঠোঁটের কোণে হালকা এক ব্যঙ্গভরা হাসি খেলল।
“আই লাভ ইউ…” এই তিনটি শব্দ এখন যেন শুধু তার কাছে হাওয়ায় ভেসে থাকা শূন্য প্রতিধ্বনি। সে পর্দা সরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। বৃষ্টির জল কাচ বেয়ে নামছে, নিচে গাছের পাতায় টুপটাপ শব্দ হচ্ছে। সেই শব্দের মধ্যেও যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। মনটা কেমন হাহাকার করে উঠল তার। মনে হলো, সব কিছু ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। বাড়ি আছে, মানুষ আছে, সন্তান আছে—তবু কোথাও যেন এক বিশাল শূন্যতা তার। সে ফিরে এসে বাচ্চাদের গায়ে কম্বলটা ঠিক করে দিল। টেবিলে বসে নিজের ডায়েরিটা খুলল। অনেক দিন পর কলম হাতে নিল। পাতার ওপর প্রথম লাইন লিখল,
“বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে, সম্পর্কটা থাকলেও তার মধ্যের ভালোবাসাটা যেন হারিয়ে যায়।”
কলম থেমে গেল। চোখে জল জমে উঠল। বুকের ওপর হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
“খান সাহেব, আপনি বুঝবেন না, একজন নারী তখন ঠিক কতটা কষ্ট পায়, যখন তার ভালোবাসার মানুষটা তার থেকে কিছু লুকিয়ে যায়।”
সুমু কেঁদে উঠল। বৃষ্টির শব্দে ঢেকে গেল তার মৃদু কান্না আওয়াজ। সে জানেনা, তার আড়ালে কী হচ্ছে। তবে খুব খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে, এইটা সে খুব ভালো করে বুঝতে পারছে। কান্নার ফলে সুমুর স্টিচের অংশে ব্যথা করে উঠল। সে তীব্র যন্ত্রণায় চোখমুখ কুঁচকে ফেলল। মাথা নিচু করে নিজের পেটের দিকে তাকাল। স্টিচের অংশে হাত রাখতেই তার হাত ভিজে উঠল। চোখের সামনে হাতটা এনে দেখল তাজা রক্ত। আঁতকে উঠল সে। স্টিচের অংশ চেপে ধরে বেডের কাছে গেল। ফোনটা তুলে নিয়ে শেরাজকে কল করল, কিন্তু ফোনটা বন্ধ পেল। সুমু আর দেরি না করে ইশিতার নাম্বার ডায়াল করল।
চলবে..?