#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_84. ✦ প্রথমাংশ ✦
অন্ধকার প্রকোষ্ঠের গভীরে বাতাসটা হঠাৎ যেন রূক্ষ হয়ে উঠল। সুমু ধীরে ধীরে শ্বাস নিল। তার বুকের ভেতরে বোধহয় সদ্য জন্ম নেওয়া কোনো ভয়ের কুঁড়ি
মাটির নিচের শেকড়ের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। রায়য়ানের সব সত্যি তার সামনে দাঁড়িয়ে— সে যেন অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক অগ্নিভস্ম।
রায়য়ান অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সুমুকে খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
“তোমরা জীবনকে যেভাবে কাটিয়েছ , আমি তা কখনও পাইনি। জন্ম থেকেই আমি সভ্যতার প্রান্তে ছুঁড়ে রাখা এক কালো খণ্ড। আমাকে আলো দেখতে শেখায়নি কেউ— তাই আজও অন্ধকার আমার উপাসনার মন্দির।”
সুমু শুকিয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলল,
“কিন্তু… অন্ধকারেও তো আলো জন্ম নেয়।”
রায়য়ান মৃদু হাসল—সেই হাসিতে উষ্ণতা নয়, ধ্বংসের খেলা যেন।
“আলো জন্ম নেয় তাদের ভেতরে,” সে ফিসফিস করে বলল, “যাদের হৃদয়ে ভাঙনের পরও এক বিন্দু হলেও কোমলতা থাকে। আমার ভেতর যে কণাগুলো ছিল—সেগুলো আমি নিজেই এক, এক, করে পিষে ফেলেছি। প্রতিটি শক্ত মানুষের পেছনে একটি ভেঙে যাওয়ার গল্প লুকিয়ে আছে। আমারও তাই।”
সে থেমে গেল। মুহূর্তটা যেন সময়ের কাঁটা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাতাসে ঝুলে রইল। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রেখে আবারও তাকাল অন্ধকারের দিকে। তার চোখদুটি যেন রক্তগঙ্গা থেকে উঠে আসা দুটি নরক-বাতি। মুখের রেখা যেন দীর্ঘদিনের দহন আর প্রতিজ্ঞার পাথরে খোদাই করা।
আরিয়ান এতক্ষণে মাথা তুলল। তার চোখে ক্ষতবিক্ষত যন্ত্রণার ছাপ, যেন সে ঠকে গেলে। জীবনের সবদিক থেকে আজ সে ঠকে গেল।
“তোদের সবকিছুই বুঝলাম, কিন্তু তোরা কেন তোদের নোংরা খেলার কেন্দ্রবিন্দু আমাকে বানালি? কী রে রায়য়ান—তুই কেন আমার সাথে এসব করলি? আফতাব চৌধুরী আমার ড্যাড হলেও… তার সাথে আমার সম্পর্ক কখনোই মসৃণ ছিল না। সবসময় একটা দূরত্ব… একটা অদৃশ্য দেয়াল আমাদের মাঝে ছিলই। কিন্তু তুই… তুই কেন? তোর সাথে যা হয়েছে, সেসবে তো আমার কোনো দোষ ছিল না।”
রায়য়ান ঘুরে তাকাল। সে আরিয়ানের দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন এই প্রথমবার তাকে দেখছে—না বন্ধু হিসেবে, না ভাইয়ের মতো পরিচিত মুখ হিসেবে— বরং একধরনের অব্যক্ত প্রতিফলন হিসেবে দেখছে।
“দোষ?” রায়য়ান ফিসফিস করে বলল, “মানুষ ভাবে ভুল করলেই সে দোষী, ভুল না করলে সে দোষী নয়। কিন্তু আরিয়ান— দোষ রক্তে থাকে, বংশে থাকে, বিপর্যয়ের কেন্দ্রে লুকানো জন্মসূত্রে থাকে।”
আরিয়ানের মুখ শক্ত হলো,
“মানে কি তুই বলছিস— ড্যাড তোর সাথে যা করেছে, সেটার জন্য তুই আমাকে শাস্তি দিবি?”
রায়য়ানের চোখে দপদপে বিষণ্ণতা ভেসে উঠল।
মায়ার মতো এক বিষণ্নতা, কিন্তু মরণব্যাধির মতো বিপজ্জনকও।
“না, আরিয়ান!” সে দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ল, “তোকে শাস্তি দিতে চাইনি। তোকে তো আমি ব্যবহার করেছি। তুই ছিলি আমার সবচেয়ে সুবিধাজনক ‘ভাঙা দরজা’। তোর ড্যাড, আফতাব চৌধুরী— ওই মানুষটা আমার সাথে যা করেছে, তা কোনো শত্রুও শত্রুর সাথে করে না। আমি অনেক কষ্ট করে আজ এত বড় হয়েছি। আমার মাথার ওপর বাবা নামক সেই বটগাছটা ছিল না, যে আমাকে সঠিক পথের আলো দেখাবে। কিন্তু আমার পিঠে দগ্ধ চিহ্ন আঁকার জন্য মানুষের অভাব ছিল না।”
আরিয়ান নিঃশ্বাস আটকে এলো। সে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“কিন্তু তুই তো আমার বন্ধু ছিলি, রায়য়ান। তুই তো আমাকে আমার থেকেও ভালো করে জানিস। আমি তো ড্যাডের মতো ছিলাম না।”
রায়য়ান হাসল,
“বন্ধুত্ব? জীবনে যেদিন প্রথমবার প্রতিশোধের পথ ধরলাম— তুই তখন ছিলি আমার সবচেয়ে সহজ রাস্তা। তোর মাধ্যমে আমি ফিরে এসেছিলাম আফতাব চৌধুরীর সামনে। তোর দুর্বলতা, তোর একাকিত্ব, তোর বাবার সাথে দূরত্ব— সবকিছুকে অস্ত্র বানিয়েছিলাম আমি।”
রুমটা আবারও স্তব্ধ হয়ে গেল। শেরাজ দুজনকে একবার ভালো করে দেখে বলল,
“হয়ে গেছে তোদের অতীতের স্মৃতিচারণ? তাহলে এবার থাম। অনেক বকেছিস, এবার আমার মাথা ধরেছে।”
রায়য়ান তীক্ষ্ণ গলায় বলল,
“কি করবি? মেরে ফেলবি? ধ্বংসের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়েও আমি বলব, ব্রো খেলা এখনো শেষ হয়নি। তোর সাথে আমার বিরোধীতা সারাজীবন থাকবে, এস.কে।”
অন্ধকারের ভেতর থেকে সুমু চেঁচিয়ে উঠল,
“খান সাহেব, আমাকে এখান থেকে মুক্ত করুন। কেন আটকে রেখেছেন আমাকে এখানে?”
শেরাজ কিছু বলার আগেই রায়য়ান বলল,
“এস.কে, কোনো সাধারণ ভিলেন নয়। ও এক সাইকো–অ্যারিস্টোক্র্যাট। পিওরলি অ্যারিস্টোক্র্যাটিক প্রেডেটর। নির্মম কিন্তু কম্পোজ্ড।”
সুমুর ভ্রু কুঁচকে এলো,
“মানে? কি বলতে চাইছেন?”
“মানেটা তোমার হাজব্যান্ডকে জিঙ্গাসা করো।”
শেরাজ, রায়য়ানের দিকে তাকাল,
“রায়য়ান… আমার বউয়ের সামনে বেশি কথা বলবি না। যা জানিস, মাথার ভেতরে রাখ।”
রায়য়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল,
“ওকে! সুহাসিনী এসব জানতে পারলে কী তোদের বিবাহিত জীবনে সমস্যা হয়ে যাবে? কিন্তু তুই তো আইস–মাইন্ডেড প্রেডেটর। তোর মতো লোকেরা কাঁদে না, কাঁদায়। ভয় পায় না, ভয় পাওয়ায়। তোর মতো লোকেরা মালিকানা দাবি করে আর সবাইকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করে। যাকে বলে ডমিনেট করা।”
সুমুর কণ্ঠ আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল,
“আপনি ঠিক কি বোঝাতে চাইছেন? খান সাহেব কি আমাকে বন্দি করে রেখেছেন?”
শেরাজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল অন্ধকারের দিকে। সে ধীরে বলল,
“হ্যাঁ, বন্দি করে রেখেছি। কারণ বাইরে যারা আছে, তাদের কাছে তুমি সেফ নও, তুমি শুধু আমার কাছে সেফ।”
রায়য়ান সঙ্গে সঙ্গে একটি শুষ্ক হাসি হাসল,
“দেখেছো? আমি তো ভুল বলিনি। এটাই অ্যারিস্টোক্র্যাটিক প্রোটেকশনিজম— যেটা প্রেমের নামে আসে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে শ্বাসরোধ করে মারে।”
আরিয়ান দম নিয়ে বলল,
“বেবিগার্ল, বুঝতে পারছো তো? এই মানুষটা তোমাকে ভালোবাসে— হ্যাঁ পাগলের মতো ভালোবাসা। কিন্তু ভালোবাসার চেয়ে বেশি তোমাকে রক্ষা করার নামে দখলে রাখতে চায়।”
সুমু একটু উঁচু গলায় বলল,
“দু’জনেই চুপ! আমি কোনো অস্ত্র নই, কোনো তত্ত্ব নই, কোনো প্রতিশোধের কেন্দ্র নই। আমি মানুষ! আর আমার খান সাহেব আমার সাথে যা খুশি করুক, তাতে আপনাদের কী?”
শেরাজ উঠে দাঁড়াল। সে তার বসে থাকা চেয়ারটায় লাথি মেরে ফেলে দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, বন্দি করে রেখেছি, তাতে তোদের সমস্যা কী? আমার বউ, আমার প্রোপার্টি, আমি যা খুশি করব। দেখছিস না, আজ একদম সোনার খাঁচায় বন্দি করে রেখেছি? এভাবেই সারাজীবন আমার বাহুদরে বন্দি করে রাখব ওকে।”
রায়য়ান হাসল,
“এটাই তো তোর আসল রূপ, এস.কে। তোর ভদ্রতার মুখোশ খুলে গেলে তোর মধ্যে থেকে ঠিক এমনই একটি সাম্রাজ্যবাদী জানোয়ার বের হয়। প্রোপার্টি? তুই তোর স্ত্রীকে, একজন মানুষকে, প্রোপার্টি বলছিস?”
আরিয়ান গলার স্বর উঁচু করল,
“ওর থেকে এর চেয়ে ভালো আর কি আশা করিস? শোন এস.কে, বেবিগার্ল কোনো জিনিস না, কোনো খাঁচার পাখি না—ও একজন মানুষ।”
সুমু কড়া গলায় বলল,
“আপনারা দু’জন চুপ করবেন? এটা আমার আর আমার স্বামীর ব্যাপার। সে আমাকে বন্দি করুক, আদর করুক, বকা দিক, মারুক, যাই করুক— সেটা ওনার অধিকার। এসব ব্যাপারের মধ্যে আপনারা ঢুকবেন না। আমি আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাইরের লোকের ঢোকাটা একদম পছন্দ করি না।”
শেরাজ তাকাল অন্ধকারের দিকে। সে খুব ধীরে, হিমশীতল স্বরে বলল,
“স্বাধীনতা বলে কিছু নেই, সুইটহার্ট। অন্তত তোমাকে আমি সেটা দেব না। তুমি আমার, শুধু আমার। এটা নিয়ে আমি কারও সাথে তর্ক করতে চাই না।”
সুমু চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল। রায়য়ান আর আরিয়ান দুজনেই নির্বাক—দুজনের চোখেই একই প্রশ্ন, ‘এ কেমন ভালোবাসা? এ কেমন দাবি?’
রায়য়ান হেসে উঠে বলল,
“এর জন্যই সুহাসিনীকে তুই কখনও একা ছাড়িসনি। চারবছর আগেও মুক্তি দেবার নাম করে ওকে নিজের আয়ত্ব হিসাবে আমার কাছে রেখেছিলি?”
শেরাজ উন্মাদের মতো বলল,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ! রেখেছিলাম!”
“কিন্তু আমার কাছেই কেন? নিজের শত্রুর কাছেই কেন নিজের বউকে রাখলি?”
“কারণ তোকে আমি খুব ভালো করে চিনি। তুই আর যাই করিস, সুমুর কোনো ক্ষতি করবি না। তুই অযাচিতভাবে আমার বউয়ের দিকে হাতও বাড়াবি না। তোর কাছে আমার বউ সেফ-ই থাকবে, হাজার হোক ভাবিজি হয় তোর। এইটুকু সম্মান তুই ওকে করবি, আমি জানতাম। আর তাই তোর সবথেকে বেশি বিশ্বস্ত লোক, মাহিনের মাধ্যম আমি সেইরাতে সুমুকে তোর কাছে পাঠাই। আর মাহিন তোকে জানায়, যে তোর লোকেরা সুমুকে পেয়েছে।”
“মানে… তুই আমাকে এতকিছুর পরেও শুধু শত্রু ভাবিসনি—একইসাথে আমাকে সবচেয়ে বড় প্রহরীও বানাইছিলি?”
“হ্যাঁ। কারণ আমি জানি, তুই যেমন আমাকে মারার জন্য হাজারটা প্ল্যান করতে পারিস— ঠিক তেমনি আমার বউকে রক্ষার জন্য হাজারটা প্ল্যান করতে পারিস।”
“তুই কি জানিস, এস.কে? আমি তখন প্রতিশোধের আগুনে পুড়ছিলাম। তোর দিকে তাকালেই মনে হতো—তোর সবকিছু শেষ করে ফেলতে পারলে আমার সব ব্যথার কিছুটা হিসেব শোধ হয়ে যাবে। কিন্তু তোর মাথায় যে এমন বিকৃত, অদ্ভুত, অসুস্থ চিন্তা আছে— এটা আমার জানা ছিল না রে, এস.কে। তুই আমাকে একইসাথে ঘৃণা করিস, ভরসা করিস, আবার ব্যবহারও করিস।”
শেরাজ এবার একটু এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,
“তুই করিস নি? আরিয়ানেরর বন্ধুত্ব, আরিয়ানের পরিবারের ফাটল, আরিয়ানের বিশ্বাস— সব ব্যবহার করিস নি?”
রায়য়ান মুখ তুলল,
“হ্যাঁ! কিন্তু আমি ওকে ব্যবহার করেছি, তোর আর আফতাব চৌধুরীর পতনের জন্য—আর তুই আমাকে ব্যবহার করেছিস, তোর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসকে রক্ষা করতে। দুইয়ের মধ্যে তফাৎ আছে।”
অন্ধকারের গহ্বর ভেদ করে সুমুর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“আমি জানতে চাই—সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল? কেন আমাকে পাঠালেন? কোন আতঙ্ক আপনাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল?”
শেরাজ খুব ধীরে সুমুর দিকে ঘুরল। সে নিচু, কিন্তু ভারী স্বরে বলল,
“সেই সময় আমার একটি মিশন ছিল ইন্ডিয়াতে।
আর ঠিক সেই সময়ই তোমার চোখের সামনে থেকে সরে গিয়েছিল আমার ছায়াচ্ছন্ন জগতের পর্দা। তুমি বুঝে গিয়েছিলে আমি আসলে কী—আর সেই বোঝা থেকেই তুমি আমার থেকে পালাতে চেয়েছিলে। তোমাকে নিয়ে আমার মন ছিন্নবিচ্ছিন্ন ছিল। তুমি যখন তখন পালাবে এই আতঙ্কে আমি ঠিকমতো কাজে মনও দিতে পারছিলাম না। কিন্তু মিশন তো আর অপেক্ষা করে না, আমাকে মিশনে বের হতেই হত। সেই সময় তোমার মানসিক অবস্থা এমন ছিল যে, তোমাকে জোর করে ইন্ডিয়াতে নিয়ে যেতেও পারতাম না। আর জোর করে নিয়ে গেলেও, আমি জানতাম, আমি ঘর ছাড়লেই তুমি পালিয়ে যাবে। শেরাজ খানের-ই তো বউ তুমি, এসব তুমি ইজিলি করে ফেলবে আমি জানতাম। দিনে তোমাকে চোখে চোখে রাখলেও, রাতে তুমি ঠিক পালিয়ে যেতে। তাই আমাকে একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজতে হয়েছিল—যেখানে থাকলে তুমি নিজের অজান্তেই আমার আয়ত্বের ভেতরে থাকবে, এবং কোথাও পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাববেও না।”
“আর সেই কারণেই আমাকে নিজের শত্রুর কাছেই পাঠালেন? আমার নিরাপত্তার নামে?”
শেরাজ চোখ নামিয়ে বলল,
“হ্যাঁ! কারণ আমি জানতাম—আমার সবচেয়ে বড় শত্রুই তখন তোমার সবচেয়ে বড় রক্ষক হয়ে দাঁড়াবে। রায়য়ানের কাছে থাকলে তুমি নিরাপদ থাকবে, আর আমার আয়ত্বের ভেতরেই থাকবে।”
তার কণ্ঠ আরও নীচে নেমে এলো। সে আরিয়ান আর রায়য়ানের দিকে একসাথে দুটো গান তাক করে বলল,
“চল, অনেক কথা হয়েছে। এবার তোদের লাইফলাইন… খতম।”
রুমের বাতাস হঠাৎই জমাট বাঁধা ধাতুর মতো ঠাণ্ডা হয়ে উঠল। সুমুর গলা ফেটে চিৎকার বেরিয়ে এলো,
“না, খান সাহেব! এমনটা করবেন না! দয়া করে, ওদের ছেড়ে দিন। আমাকে এখান থেকে মুক্ত করুন। জীবনে অনেক রক্তে হাত ভিজিয়েছেন, আর না। ওরা অন্যায় করে থাকলে আইন ওদের শাস্তি দিবে, আপনি প্লিজ কিছু করবেন না।”
শেরাজ চোখ না সরিয়েই বলল,
“ওদের ছেড়ে দিলে, ওরা সবকিছু শেষ করে দেবে, সুইটহার্ট। ওরা আজ ভালো—আগামীকাল খারাপ। একেক দিন একেক রূপ ওদের। দুজনেরই মাথার স্ক্রু ঢিলা। আজ শান্ত, পরের মুহূর্তে আগুন। আজ বন্ধু, কাল শত্রু। আজ অনুতপ্ত, কাল আবার রক্তপিপাসু। ওদের মাথায় যখন-তখন আমার সন্তানদের খুন করার নেশা জেগে ওঠে—আবার সেই নেশা পাঁচ মিনিট পরেই উবে যায়। এমনভাবে যদি ওরা ঘুরে বেড়ায়, তাহলে একদিন না একদিন ওরা আমার বাচ্চাদের ক্ষতি করবেই। আর একজন বাবা হিসাবে আমি কিছুতেই সেটা হতে দেব না।
সুমুর চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে এলো। সে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“তবুও হত্যা কোনো সমাধান নয়, খান সাহেব।”
শেরাজ ধীরে ঘুরে তাকাল তার দিকে,
“সুইটহার্ট… এসব জায়গায়, সমাধান বলে কিছু নেই। থাকে কেবল বাঁচা—নইলে শেষ হয়ে যাওয়া। ওদের প্রাণবায়ু শেষ হয়ে এসেছে। আজ ওদের মরতেই হবে। অনেক সুযোগ দিয়েছি দুটোকে, আর নয়। সেদিন রাতে আমি ওদের বলেছিলাম, ওই সময়টা ওদের আর তার পরের সময়টা আমার। আর তাই একজন ম্যাফস্টার হিসাবে আমি আমার কথা রাখতে বাধ্য। তাছাড়া তুমি ওদের ব্যাপারটা একটু বোঝো, ওরা সেই কখন থেকে আমার হাত থেকে মরবে বলে ছটফট করছে, বলো তো।”
“খান সাহেব, না! প্লিজ, এমনটা করবেন না। দয়া করে ওদের ছেড়ে দিন।”
শেরাজ শুনলো না সুমুর কথা, সে আরিয়ানদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল,
“বল তোদের শেষ ইচ্ছা কী?”
আরিয়ান রক্তলাল চোখে মাথা তুলে তাকিয়ে বলল,
“বেবিগার্লকে শেষবারের জন্য একবার দেখতে চাই।”
শেরাজ বাঁকা হেসে রায়য়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোরটা বল?”
রায়য়ান তাচ্ছিল্যপূর্ণ হেসে বলল,
“প্রথমত, সুহাসিনীকে শেষবারের জন্য দেখতে চাই। দ্বিতীয়ত, আমার ফোনটা পাঁচমিনিটের জন্য চাই।”
শেরাজের চোখের পাতা একবারও নড়ল না, কিন্তু তার ভেতরের আগুন হঠাৎই যেন গর্জন তুলে উঠল। আলোর নিচে তার মুখের শিরাগুলো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল, বুকে রুদ্ধ শ্বাসের মতো জমে উঠল অস্বস্তিকর নীরবতা। সে দাঁত চেপে বলল,
“আমার সুইটহার্টকে শেষবারের জন্য দেখতে চাওয়া তো মৃত্যুর অগ্নিকুণ্ডের ভেতর দাঁড়িয়ে পানি চাওয়ার মতো বোকামি। তোরা ভাবলি কি করে, আমি তোদের সেই ইচ্ছা পূরণ করব?”
সে ধীরে মাথা কাত করে তাকাল। চোখে মৃত্যুর নিষ্ঠুর আলো জ্বলে উঠল। ঠোঁটে এমন এক হাসি—যেটা হাসি নয়, রক্তমাখা ব্যঙ্গ। নিচু স্বরে বলল,
“তোদের আজ মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো সতর্ক করছি। আমার স্ত্রীর দিকে চোখ তুলে তাকাবি না, ওর নাম মুখে নিবি না, আর ওকে দেখার অনুমতি? সেটা তোদের মতো প্রতারক, কাপুরুষ, রক্তের গন্ধে মেতে থাকা নেশাখোরদের দেওয়া হবে না। শুধু তোদের কেন, দুনিয়ার কোন পুরুষকেই দেওয়া হবে না। তবে রায়য়ানের দ্বিতীয় ইচ্ছাটা পূরণ করে দিচ্ছি।”
টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে রায়য়ানের কাছে গেল। রায়য়ানের হাত খুলে দিয়ে ফোনটা তার হাতে দিল। শরীরের যন্ত্রণায় ফোনটা ধরতেও কষ্ট হলো রায়য়ানের, তবুও সে অনেক কষ্টে ফোনটা হাতে নিয়ে আনলক করল। বহুত কষ্টে আলিশার নাম্বার বের করে মেসেজ করল। দু’মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ করে ফোনটা আবারও রেখে দিল। শেরাজ ফোনটা নিয়ে আবারও পুনরায় জায়গায় এসে বসল। সে এবার আর রায়য়ানকে বাঁধল না। কারণ সে জানে, আরিয়ান, রায়য়ান কারই উঠে দাঁড়ানোর মতো ক্ষমতা নেই।
আরিয়ান রক্তলাল চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এস.কে, শুধু একবার আমাকে ওকে দেখতে দে। শেষবারের জন্য। আমি ওর মুখটা দেখতে চাই, শুধু একবার।”
“মরার আগেও বিকৃত চিন্তা তোর, আরিয়ান।”
আরিয়ান ঠোঁট কামড়ে রাখল,
“হতে পারে আমার চিন্তা-ভাবনা বিকৃত, এস.কে! তবুও শুধু একবার মাত্র। শুধুমাত্র একপলক দেখতে চাই, বেবিগার্লকে। দয়া করে, এইটুকু ভিক্ষা দে। প্লিজ, একবার দেখতে দে।”
শেরাজ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে হিমশীতল স্বরে বলল,
“তোর চোখে যে কুৎসিত ইচ্ছে জেগেছে, সেটা আমি চিরকালের জন্য নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছি।”
আরিয়ান তাচ্ছিল্যপূর্ণ হেসে বলল,
“একজন অপূর্ণতার স্বাদ গ্রহণ করে বলেই, অন্যজন পূর্ণতার স্বাদ পায়।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকালো,
“কি বলতে চাস? ঠিক করে বল।”
“তুই পূর্ণতার স্বাদ পাচ্ছিস, কারণ আমরা বেবিগার্লের জন্য অপূর্ণ হয়ে যন্ত্রণার শেষ সীমা দেখে এসেছি।”
“ওকে তোদের আগে থেকে আমি ভালোবাসি। ও আমার বউ, ডাফার।”
“আমিও ওকে ভালোবাসি।” সে থেমে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, “আমি এক আকাশ সমান চাই না। আমি চাই, আমার জন্য আপনার মনে একবিন্দু মায়ার জন্ম হোক। হোক না সেই মায়ার পরিমাণ স্বল্প, তবুও খাঁটি হোক এবং একান্তই আমার জন্য হোক। দিবেন আমায় একবিন্দু ভালোবাসা। আজ তো আমার শেষ সময়, একবার কি মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকাবেন আমার দিকে? একবার বলুন না, আপনার স্বামীকে, যাতে একটাবার আপনার মুখটা আমাকে দেখতে দেয়। আপনার মুখটা না দেখতে পেয়ে মরলে যে, আমার ব্যর্থ জীবনে বিশাল বড় একটা অপূর্ণতা থেকে যাবে। এই অপূর্ণতা নিয়ে আমি মরব কীভাবে, বলুন তো? আমার রূহটা যে ছটফট করছে আপনাকে দেখার আশায়। একবার বলুন না। বেঁচে থাকতে তো আপনাকে পেলাম না, মৃত্যুর আগেও কি একবার দেখতে পাব না?”
ওদের দুজনের কথার মাঝেই রায়য়ান চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল,
“চোখ বন্ধ হওয়ার আগে যদি শেষবার আপনাকে দেখতে পারতাম, তবে মৃত্যুটা হয়তো এতটা ভয়ংকর লাগতো না। আপনি জানেন, পৃথিবীর কোনো অভাব আমাকে কাঁদাতে পারেনি, কিন্তু আপনার অভাব আমাকে প্রতিটি নিঃশ্বাসে কাঁদিয়েছে। আজ হয়ত সবকিছুর সমাপ্তি হবে। কিন্তু আপনি কি জানেন, সমাপ্তি সুন্দর, ভীষণ রকমের সুন্দর। কারণ সমাপ্তি মানেই, আর কোনো আকাঙ্ক্ষা থাকবে না। আর কোনো অপেক্ষা থাকবে না।”
সুমু মুখে হাত দিয়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। আরিয়ানের করুণ চিৎকার আর রায়য়ানের ভাবনার মাঝেই হঠাৎ একটা বিকট শব্দ হলো। দুটি গুলি একসাথে আরিয়ান আর রায়য়ানের কপাল ভেদ করে মাথার পেছনের দিক দিয়ে বেরিয়ে গেল।
সুমুর নিঃশ্বাস থেমে গেল। মনে হলো পৃথিবীটা ধসে পড়ল তার পায়ের নিচে। ঘরটাও নিস্তব্ধ। শুধু রক্তের শব্দ টুপ, টুপ, টুপ, করে অন্ধকার ঘরের মেঝেতে স্রোতের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।
আরিয়ানের কপাল থেকে রক্তের রেখা বয়ে যাচ্ছে চোখের কোণ দিয়ে, আর রায়য়ানের কানপাশ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে ঠোঁট রাঙিয়ে দিচ্ছে। দুজনেই নিথর। দুজনেই শব্দহীন। দুজনের চোখের পাতা আর কেঁপে উঠল না। না, আরিয়ান আর একবার সুমুকে দেখার জন্য পাগলের মতো ভিক্ষা চাইল না। আজকের পর আর এই আরিয়ান চৌধুরী নামক অসহ্য লোকটা আর তাকে জ্বালাতে আসবে না, আর না রায়য়ান চৌধুরীর মতো কঠোর লোকটা আর তাকে নিঃশব্দে গোপনে ভালোবাসে, পাশে বন্ধু হয়ে দাঁড়াতে আসবে। আসবে না আর তারা। তাকাবে না আর তার দিকে। আজ থেকে যে সুমু মুক্ত। না, শুধু সুমু মুক্ত না। আজ থেকে এই দুই পাপী পুরুষও মুক্ত। আজ থেকে সুমু নামক এক বিবাহিত নারীর মায়া আর তাদের কষ্ট দিবে না। আজকের পর আর তারা একতরফা ভালোবাসার যন্ত্রণা ভোগ করবে না।
সুমু ভাবল, ‘মৃত্যু এত সহজ? এত তাড়াতাড়ি? এত নির্মমভাবে?’ তার গলা থেকে শব্দ বেরোল না, কিন্তু চোখের ভেতরের আতঙ্কটা যেন হাড়ে হাড়ে ছড়িয়ে পড়ল। তার চোখের সামনে দুটো জীবন শেষ হয়ে গেল—ঠিক যেন জ্বলন্ত মোমের ওপর হঠাৎ ঠাণ্ডা বাতাসের আঘাত। আগুন নিভে যায়—কিন্তু ধোঁয়াটাই বেশি ভয়ংকর লাগে। আর সবচেয়ে ভয়ের এখন শেরাজের মুখটা। না, আজ তাকে আর মানুষ মনে হলো না। না রাগ, না উল্লাস, না ব্যথা—শুধু পাথরের মতো ফাঁকা দেখাচ্ছে। চোখ দুটো শান্ত, কিন্তু বিপজ্জনকভাবে গভীর। তার বাকি শিকারীদের থেকে আরিয়ান আর রায়য়ানকে সে যেন সহজ মৃত্যুই দিল, তবুও তাকে যেন আজ একটু বেশি-ই নিষ্ঠুর, বেশি-ই পাষাণ মনে হলো।
সুমু ভেঙে পড়ল। অনুভব করল—এই মুহূর্তটা শুধু ভয় আর নিষ্ঠুরতার নয়, বরং করুণতারও এক অসীম স্রোত। আরিয়ান, যে এতক্ষণ তার জন্য পাগলের মতো বুক ফাটিয়েছে, সে এখন নিথর। যে চোখ দিয়ে সে শেষবারের জন্য একবার তাকে দেখার জন্য আবেদন করেছিল, ও চোখগুলো এখন বন্ধ। রায়য়ান, যে এতক্ষণ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিল, তার চোখগুলো এখন বন্ধ। তার মুখে আর কোনো শব্দ নেই। শুধু রক্তের স্রোত, এবং নিথর দেহের নিস্তব্ধতা। সুমু যেন সমস্ত করুণতার বীভৎস রূপ একবারে অনুভব করল, পৃথিবী কি এত নিষ্ঠুর হতে পারে? একটি চোখের পলকে ওদের দুজনের আবদার, আশা, ভালোবাসা— সব রক্তে মিশে গেল।
সুমুর কান্না বেরোচ্ছে না—শুধু বুকের ভেতর কেঁপে উঠছে। শ্বসন আটকে গেছে, মন কাঁপছে, হৃদয় থেমে গেছে। সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে বুঝিয়ে বলতে লাগল,
“এটা হতে পারবে না। এসব সত্যি হতে পারবে না।”
কিন্তু চোখ খুলতেই আবারও তিন পুরুষের নিষ্ঠুরতা, ভালোবাসা, প্রতিশোধ, করুণা— সবকিছুই একসাথে এক ঝলক দেখল সে। আর এই এক ঝলকে, এই এক মুহূর্তেই সে বুঝল, ‘আজ সে পৃথিবীর সবচেয়ে করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি’। যে বাস্তবতা সে চাইলেও কোনদিন বাদলাতে পারবে না।
চলবে..?
#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#পর্ব_84. ✦ বর্ধিতাংশ ✦
শেরাজ মেঝের ওপর হাঁটুমুড়ে বসে পড়ল। চোখের সামনে তার প্রাণপ্রিয় দুই বন্ধুর লাশ— যাদেরকে কিছুক্ষণ আগে সে নিজের হাতেই মেরেছে। রক্তে ভেজা মেঝেটার দিকে তাকিয়ে থাকল সে, যেন সেখানে কোনো উত্তর লেখা আছে। কিন্তু না, সেখানে শুধু নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি। তার হাত দুটো কাঁপছে না। হাতদুটো আজ আশ্চর্যরকম স্থির। কিন্তু বুকের ভেতর কোথাও যেন কিছু একটা চিরে চিরে ভেঙে পড়ছে। সে বুঝতে পারছে—এই ক্ষত কোনোদিন রক্ত ঝরাবে না, শুধু সারাজীবন ব্যথা দেবে। রায়য়ানের মুখের দিকে তাকাল। ঠোঁটে সেই তাচ্ছিল্যভরা হাসিটা আর নেই। আরিয়ানের চোখের দিকে তাকাল—যে চোখ দুটো এতক্ষণ সুমুকে দেখার জন্য ভিক্ষা করছিল, এখন সেখানে শুধু শূন্যতা।
শেরাজ ধীরে চোখ নামিয়ে নিল। আজ আবারও অনেকদিন পর তার মনে হলো—এই দুটো প্রাণকে সে শুধু শত্রু হিসেবে নেয়নি, বন্ধু হিসেবেও একদিন নিয়েছিল। একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে। দীর্ঘশ্বাসটা খুব ধীর, খুব ভারী।
“আমি তোদের কোনদিনও মারতে চাইনি। আমাদের মাঝে যাই হয়ে যাক, আমি হাজার সুযোগ পেয়েছিলাম তোদের মারার, তবুও মারিনি কারণ আমি ভাবতাম যাই হোক, তোরা আমার বন্ধু” সে ফিসফিস করে বলল, “কিন্তু শেষমেশ তোদের নোংরা কাজে অতিষ্ঠ হয়ে আমি তোদের আজ মারলাম।”
ঘরের বাতাস জমাট বেঁধে রইল। কোনো প্রতিধ্বনি হলো না। মৃতরা কোনো উত্তর দেয় না—শেরাজ সেটা জানত। তবুও কিছুক্ষণ বসে রইল। হয়তো শেষবারের মতো নিজের বন্ধুদের খুঁজছে।
হঠাৎ সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে দু’জনের নিথর হাত ধরে ফেলল। ঠাণ্ডা, অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা। তবুও সে দু’হাত শক্ত করে ধরে রেখে কাঁপা গলায় বলল,
“চল… ক্রিকেট খেলব। আজ আবারও আমি তোদের হারিয়ে জিতব।” তার ঠোঁট কাঁপছে। চোখে অশ্রু জমে উঠেছে, কিন্তু পড়ছে না, “তারপর তোরা রাগ করবি,” সে হালকা হাসার চেষ্টা করল, হাসিটা মাঝপথেই থেমে গেল, “বলবি এস.কে, তুই সব সময় চিটিং করিস। আম্পায়ারকেও তুই কিনে রেখেছিস।”
সে একটু থামল। গলার স্বর আরও ভেঙে গেল।
“আর তারপর, কিছুক্ষণ পরেই… তোরা আবার এসে আমাকে জড়িয়ে ধরবি। বলবি ঠিক আছে, এস.কে আজ থাক। কাল আবার খেলব।”
কোনো হাত নড়ল না। কোনো রাগী কণ্ঠ শোনা গেল না। কেউ আর তাকে জড়িয়ে ধরল না। শেরাজ হঠাৎ করে দু’জনের বুকের ওপর মাথা নামিয়ে রাখল। এই প্রথম তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল খুব ছোট ছোট কাঁপুনিতে, যেন বহু বছর ধরে জমে থাকা কোনো পাহাড় আজ ভিতর থেকে ধসে পড়ছে।
“উঠ,” সে ফিসফিস করে বলল, “এভাবে শুয়ে থাকলে খেলতে পারবি না। তোরা তো এমন ছিলি না। উঠ এখনই।”
কিন্তু মৃতরা খেলতে পারে না। মৃতরা আর ফিরে এসে কাউকে জড়িয়ে ধরে না। শেরাজ বুঝে গেল—আজ সে শুধু দু’জন মানুষকে মারেনি, সে নিজের অতীতটাকেও কবর দিয়েছে। যে অতীতে বন্ধুত্ব ছিল, হাসি ছিল, অহংকার ছিল—সবকিছু।
সে মাথা তুলল। চোখ দুটো লাল, কিন্তু ফাঁকা। এই ফাঁকাটাই যেন সবচেয়ে ভয়ংকর।
সুমু নিঃপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এই মুহূর্তে তার সামনের শেরাজ খান কোনো মাফিয়া না, কোনো প্রেডেটর না, কোনো স্বামীও না। এই মুহূর্তে সে শুধু একজন মানুষ, যে বুঝে গেছে—কিছু জয় এমন হয়, যেগুলোতে জিতেও মানুষ সারাজীবনের জন্য হেরে যায়।
শেরাজ হঠাৎ হেসে উঠল, যেন নিজের কথা সে নিজেকেই বিশ্বাস করতে চাইছে।
“তোরা তো আমার শত্রু ছিলি, তাই না?” তার গলার স্বর কাঁপছে, কিন্তু সে সেটা চাপা দিতে চাইছে, “শত্রুকে মরলে তো এমন লাগার কথা না।” বুকের ওপর হাত রাখল। একটু চেপে ধরল, “এই যে… এইটা,” ফিসফিস করে বলল, “এইটা কষ্ট না। কষ্ট না, বুঝলি? কষ্ট হলে আমি চিৎকার করতাম। কই আমার তো কিচ্ছু হচ্ছে না। শুধু বুকের ভেতর কেমন একটা জ্বালা।” সে আবারও নিজের কথাই নিজেই ঠিক করে নিল, “হয়তো এসিডিটি। হ্যাঁ, এসিডিটিই হবে। আজ ঠিকমতো খাইনি তো। মাথাও একটু ঝিমঝিম করছে।”
সে আরিয়ানের হাতটা ছেড়ে দিল। আবার ধরল। আবার ছেড়ে দিল।
“তোদের জন্য আমার কেন কষ্ট হবে? তোরা তো আমার বিরুদ্ধে ছিলি। আমার বউকে পেতে চেয়েছিলি। আমার জীবন নষ্ট করতে চেয়েছিল। আমার বাচ্চাদের মারতে চেয়েছিলি।” সে রায়য়ানের মুখের দিকে তাকাল। দীর্ঘ সময়। খুব দীর্ঘ, “কিন্তু তোরা তো একসময় আমার পাশে ছিলি। আমার সাথে হেসেছিস। আমার সাথে মাঠে দৌড়েছিস। আমার কাঁধে হাত রেখেছিস।” সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল, যেন কেউ তার ভাঙনটা দেখে না ফেলে।
“না, না,” সে মাথা ঝাঁকাল, “ওসব পুরনো কথা। পুরনো। এখন ওসবের কোনো মানে নেই।”
সে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু শরীর তার কথা মানল না।
হাঁটু দুটো হঠাৎ শক্তি হারিয়ে ফেলল। আবার বসে পড়ল। এবার আর ভর করে নয়—একেবারে ভেঙে। বুকের ভেতরের সেই ব্যথাটা হঠাৎ যেন ছড়িয়ে পড়ল। শুধু বুক না, গলা, কাঁধ, মাথা—সবখানে ছড়িয়ে পড়ল।
“এইটা এসিডিটি না,” সে খুব আস্তে বলল, “এইটা… এইটা অন্য কিছু। তোরা তো আমার শত্রু ছিলি। আর শত্রুকে মারাটা সহজ হয়। শত্রুকে মারলে রাতে শান্তিতে ঘুমানো যায়।” একটু থেমে আবারও বলল,“কিন্তু তোরা কেন এত চুপ করে পড়ে থাকলি রে? একবার বললেই তো হতো, এস.কে থাম। কিন্তু কেউ বললি না। কেউ থামালি না। কেন? বললে কি তোরা ছোট হয়ে যেতিস? নাকি আজ আমাকে এভাবে জিতিয়ে দিয়ে তোরা ইচ্ছাকৃত হার মেনে নিলি, কারণ আসলে জয়টা তোদের হলো, তাই না?”
সে মাথা তুলল। চোখ দুটো লাল, কিন্তু অশ্রু নেই।
“আমি তো শক্ত মানুষ,” সে নিজেকে আবারও বোঝাতে চাইল, “আমার কষ্ট হয় না। আমার বুক ভাঙে না। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে… আমি হয়তো ঠিকই শক্ত। শুধু এই শক্ত মানুষটার ভেতরে আর কিছু বেঁচে নেই। কিছু শত্রু থাকে, যারা যত অন্যায়ই করুক না কেন, তারা হয়তো কোনদিনও শত্রু হয় না। তারা হয়তো থেকে যায়—বুকের ভেতরের সেই জায়গাটায়, যেই জায়গাটার নাম আমি কোনোদিন উচ্চারণ করতে শিখিনি।”
সে লাশ দুটোর একদম মাঝখানে বসে পড়ল। মেঝের ঠাণ্ডা তাকে ছুঁয়ে গেল, কিন্তু সে সেটা টের পেল না। রায়য়ানের দিকে ঝুঁকে খুব আস্তে বলল,
“এইভাবে চুপ করে আছিস কেন? তোরা তো এত কথা বলতি। এখন কী হলো? সব কথা শেষ?”
সে আরিয়ানের দিকে তাকাল,
“তুই তো একটু পরপর কথা কাটাকাটি করতি। কত ঝগড়া, কত তর্ক করতি, আর একটু পর পর এটা ওটা নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতি। তাহলে এখন চুপ কেন? আজ আমি তো তোদের শত্রুই মনে করেছিলাম, কারণ শত্রু মনে করলে তোদের মারাটা সহজ হবে। গুলি চালানোর সময় হাত কাঁপবে না।” সে রায়য়ানের কাঁধে হাত রাখল
“কিন্তু তোরা তো ভয় পাসনি, কেউ একবারও বলিসনি—ভাই, থাম। একবার ভাব।”
সে হঠাৎ হেসে উঠল,
“হয়তো তোরা জানতি, আমি থামব না। তাই তোরা চুপ করে রইলি।” মেঝের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “আমি তো তোদের বলেছিলাম—আমার বউয়ের দিকে তাকাবি না। তোরা তবুও তাকিয়েছিলি। তোরা আমার ছোট বাচ্চা দুটোকে মারতে চেয়েছিলি, তাও কেন আমার বুকটা এমন করছে?”
হঠাৎ সে নিজের বুক চাপড়াতে লাগল,
“এইটা ঠিক জায়গায় নেই। কিছু একটা সরে গিয়ে ভুল জায়গায় বসে গেছে।”
সে আরিয়ান আর রায়য়ানের মৃত হাত তুলে নিজের কাঁধে রাখল,
“দেখ, এইভাবেই রাখতি আর বলতি, এস.কে, তুই অনেক ভাবিস। একটু থাম। তাহলে আজ থামতে বললি না কেন?” সে রায়য়ানের দিকে ফিরে খুব ধীরে বলল, “তুই তো সব বুঝতি। আমার মাথার ভেতরের অন্ধকারটাও জানতি। তুই কেন থামাসনি রে? আমি তো শক্তই থাকতে চেয়েছিলাম। শক্ত থাকলে কেউ কষ্ট অনুভব করে না। কিন্তু তোরা আজ মারা গেলি, আর আমি বেঁচে রইলাম। “এটা কি ঠিক হলো? তোরা চুপ করে থাকবি আর আমি সারাজীবন কথা বলব? এটা কীভাবে সম্ভব? তোরা যদি আজ আমাকে একবার গালি দিতি। একবার বলতি এস.কে, তুই ভুল করছিস—তাহলে হয়তো…”
কথাটা শেষ করল না। শেষ করার শক্তি তার নেই। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সুমু তখনো নড়েনি। সে তাকিয়ে আছে শেরাজের দিকে। এই মানুষটার এক মুহূর্তে রক্ষক, আরেক মুহূর্তে ধ্বংস। এই মানুষটা আজ পর্যন্ত নিজের কোনো কাজের জন্য অনুশোচনাবোধ করেনি, কিন্তু আজ তার কি হলো। আজ সুমুর চোখে প্রথমবারের মতো শেরাজকে অজানা লাগল। ভীষণ অজানা। ভয়ংকর রকমভাবে অচেনা।
শেরাজ এখন সিদ্ধান্তের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। সে মাথা তুলল। গলার স্বর অস্বাভাবিক শান্ত। ভয়ংকরভাবে শান্ত।
“এই মাফিয়া জগতে আসার পর আমরা একে অপরকে কথা দিয়েছিলাম—বাঁচলে একসাথে বাঁচব আর মরলে একসাথে মরব। আজ তোরা নেই। নাউ মাই টার্ন।”
পাশে পড়ে থাকা গানটা তুলে নিল। ঠাণ্ডা ধাতব স্পর্শ করল তার কপাল। ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে সুমুর মাথার ওপর লাইটটা জ্বালিয়ে দিল। খাঁচার ভেতর বন্দি সুমু এতক্ষণে কান্না থামাল। সে আঁতকে উঠল।
“না!” শব্দটা গলা ভেঙে বেরিয়ে এলো, “খান সাহেব, না!”
তার শরীর খাঁচার গায়ে ধাক্কা খেল। সে হাত দিয়ে খাঁচার ওপর আঘাত করতে শুরু করল, যেন বৃথা ভাঙার চেষ্টা।
“আপনি এটা করতে পারেন না, খান সাহেব।”
শেরাজ তাকাল না। সে চোখ বন্ধ করে রাখল।
“আমি আর সত্যি কিছু করতে পারি না, সুইটহার্ট। এখন আমি শুধু আমার প্রতিশ্রুতি রাখতে পারি।”
সুমু চিৎকার করে কেঁদে উঠল। খাঁচায় সজোরে আঘাত করতে করতে হাত ফেটে স্রোতের মতো গড়িয়ে নামছে। সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
“না, খান সাহেব। যা হবার হয়ে গেছে, ওরা চলে গেছে—কিন্তু আপনার কিছু হয়ে গেলে আমার কি হবে? একটু বোঝার চেষ্টা করুন, খান সাহেব।”
“আমি তো আজ আর মানুষই রইলাম না। মানুষ হলে আজ এই মেঝেতে বসে লাশের সাথে কথা বলতাম না। আমি আজ পাগল হয়ে গেছি। আর পাগল কিছুই বুঝতে পারে না।”
সে গানটা আরও শক্ত করে ধরল,
“তোরা দেখছিস?” সে লাশ দুটোর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি আমার কথা রাখছি।”
সুমু আবারও চিৎকার করে উঠল,
“ওই প্রতিশ্রুতি ভুল ছিল! ভুল মানুষকে ভুল সময়ে ভুল কথা দিয়েছিলেন আপনি।”
“ভুল হলে আজ কষ্ট হতো না, আজ বুকটা এমন ফাঁকা লাগত না।”
“আপনার কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচব না, খান সাহেব।”
সে খাঁচার সোনার রড দুটো আঁকড়ে ধরে মাটিতে বসে পড়ল। কান্না যেন আজ আর চাপা থাকতে চায় না—শব্দ হয়ে বেরিয়ে আসে।
“খান সাহেব…” কণ্ঠটা কাঁপছে। শব্দগুলো যেন ছিঁড়ে ছিঁড়ে বেরোচ্ছে, “আপনার কিছু হয়ে গেলে আমি সত্যি বাঁচতে পারব না।”
শেরাজের আঙুল ট্রিগারের কাছে শক্ত হয়ে রইল। সুমু ভেজা চোখে মুখটা তুলে তাকাল,
“আপনি আমার কথা না ভাবুন,” সে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “অন্তত আপনার সন্তানদের কথা ভাবুন।”
সন্তানদের কথা ভেবে শেরাজের নিঃশ্বাসটা আটকে এলো। সুমু চোখের অশ্রু মুছে বলল,
“আমার সিমরানটা…, ও যে তার পাপাকে ছাড়া থাকতেই পারে না, খান সাহেব।”
সে হাত বাড়িয়ে দিল—খাঁচার ভেতর থেকে, যেন শেরাজকে ছুঁতে পারবে।
“ছোট্ট অবুঝ মেয়েটা আমার, এখনো তো কিছু বোঝে না। তবুও আপনার কোল ছাড়া কারও কোলে থাকতে চায় না।”
একটা দমকা নিঃশ্বাস শেরাজের বুক ফুঁড়ে বেরোলো। সুমু ফিসফিস করে বলল,
“ও যখন বড় হয়ে আমাকে জিঙ্গেস করবে,‘পাপা কোথায়?’ তখন আমি কী উত্তর দেব, খান সাহেব?”
শেরাজের হাত এবার স্পষ্ট কাঁপছে। এক ফোঁটা অশ্রু তার চোখ থেকে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল। তবুও সে একটুও নড়ল না। সুমুর প্রতিটি কথা যেন বাতাসে এসে তার বুকের ভেতর আঘাত করল—কিন্তু সে সেই আঘাতগুলো গ্রহণ করেও ফিরিয়ে দিল।
“সিমরান বড় হয়ে কেমন হবে আমি জানি। ও স্ট্রং হবে। আমার থেকেও বেশি স্ট্রং। আমার শেরানও তার পাপাকে বুঝবে।” তার চোখ খুলে গেল। চোখে অশ্রু আছে, কিন্তু দৃষ্টি কঠিন, “আর তুমি?” সে খাঁচার দিকে তাকাল। “তুমি কাঁদবে। ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাঁচবে।”
সুমু চিৎকার করে উঠল,
“আমি বাঁচব না!”
শেরাজ হালকা হাসল,
“বাঁচবে! কারণ তুমি আমার থেকেও শক্ত।” সে লাশ দুটোর দিকে একবার তাকাল,“আর আমি? আমি বাঁচলে প্রতিদিন একটু একটু করে মরব। আর এভাবে প্রতিনিয়ত একটু একটু করে মরে, আমি বাঁচবে পারব না।”
“আপনি তো সাহসী, খান সাহেব। কিন্তু এটা তো সাহস না। এটা পালানো। ওদের জন্য যখন এতোটাই কষ্ট পাচ্ছেন, তাহলে ওদের মারলেন কেন?”
শেরাজ মাথা নাড়ল,
“এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার, সুইটহার্ট। ভালোবাসা আর যুদ্ধ—এই দুই জায়গায় সবকিছুই ন্যায্য। আর এটা পালানো না। এটা হিসাব মেটানো। এই দুনিয়ায় কিছু ঋণ আছে, যেগুলো বেঁচে থাকলে শোধ হয় না।”
এক মুহূর্তের জন্য তার ঠোঁট কাঁপল। তারপর সে চোখ বন্ধ করল।
“মাফ করে দিও। কথা রাখতে পারলাম না আমি। থাকতে পারলাম না তোমার সাথে সারাজীবন। তোমাকে ছেড়ে বেইমানের মতো চলে যেতে হচ্ছে আমাকে।”
“খান সাহেব! আপনি যদি নিজের কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করেন, তাহলে আমিও নিজেকে আজ শেষ করে দিব।”
শেরাজ কোনো কথা শুনলো না, সে ট্রিগারে চাপ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। এক সেকেন্ডেই যেন সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। সুমু আর কোনো পথ দেখল না। আচমকাই সে দুই আঙুল দিয়ে নিজের নাক জোরে চেপে ধরল। খুব শক্ত করে। তার শ্বাস আটকে গেল মুহূর্তেই। বুকটা হঠাৎ ধাক্কা খেল, চোখ বড় বড় হয়ে উঠল।
“খা…খান…”
কথা বেরোবার আগেই কণ্ঠ থেমে গেল। খাঁচার ভেতরে সে হেলে পড়ল। শরীরটা কাঁপতে শুরু করল, যেন বাতাসের জন্য মরিয়া হয়ে কোনো পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে। চোখের মণি উল্টে যেতে চাইছে, ঠোঁট ফ্যাকাশে হয়ে এলো। শেরাজ ট্রিগারে চাপ দেওয়ার আগে লুকিয়ে চোখের কোণ দিয়ে একবার শেষবারের জন্য সুমুকে দেখতে চাইল। এক ঝটকায় সে ফিরে তাকাল।
“সুমু?”
খাঁচার ভেতর সুমু আর দাঁড়িয়ে নেই। মেঝেতে আধশোয়া, নাক চেপে ধরা, শ্বাসের জন্য ছটফট করছে।
“না, না, না…”
শেরাজের কণ্ঠ ভেঙে গেল। গানটা তার হাত থেকে পড়ে গেল মেঝেতে। ধাতব শব্দটা ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো। সে দৌড়ে গেল খাঁচার দিকে।
“ছাড়ো! নাক ছাড়ো!” খাঁচার সোনার রড ধরে চিৎকার করে উঠল, “এইটা কী করছ তুমি!”
সুমুর চোখে পানি জমে আছে, কিন্তু সে নাক ছাড়ছে না। শুধু চোখ দিয়ে তাকিয়ে আছে, যেন একটা অনুরোধ, একটা শেষ চেষ্টা করছে শেরাজকে আটকানোর। শেরাজ পাগলের মতো চিৎকার করল,
“আমাকে মারতে দিচ্ছিলে না, কিন্তু এখন নিজেকে মারছ কেন?”
কোনো উত্তর নেই। শুধু শ্বাসহীন কাঁপুনি। শেরাজ বুঝে গেল, সে যদি আর এক সেকেন্ড দেরি করে, তাহলে আজ সে তিনটা লাশ দেখবে। তার হাত কাঁপতে কাঁপতে রড আঁকড়ে ধরল। চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল।
“থামো, সুমু! প্লিজ, থামো…”
সে কাঁপা হাতে পকেট থেকে চাবিটা বের করল।
চাবিটা তালায় ঢোকাতে গিয়েই হাত কেঁপে উঠল। খাঁচার দরজা খুলতেই সে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
“সুমু…”
সে তাকে ধরতে এগোতেই সুমু হঠাৎ পিছিয়ে গেল। খাঁচার সাথে ধাক্কা খেল তার পিঠ। নাক এখনো শক্ত করে চেপে ধরা। চোখে পানি জমে আছে, মুখ লাল হয়ে গেছে।
“আমাকে ছুঁবেন না…”
শেরাজ আর সহ্য করতে পারল না। এক ঝটকায় সে এগিয়ে গিয়ে সুমুর কবজি ধরে ফেলল।
“এইসব বন্ধ করো!”
সে জোর করে সুমুর হাত নামিয়ে দিল। এক হাত দিয়ে নাকে চেপে ধরা আঙুলগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে পাগলের মতো সুমুর সারা মুখে চুমু খেয়ে তাকে নিজের বুকের ভেতর শক্ত করে টেনে নিল। সুমু হেঁচকি তুলে শ্বাস নিল। হঠাৎ বাতাস ফুসফুসে ঢুকতেই সে কেঁপে উঠল। শেরাজ দু’হাত দিয়ে তাকে চেপে ধরে রাখল।
“পাগল হয়েছ? এইসব কী করছিলে তুমি?”
সুমু কাঁদতে কাঁদতে তার বুকে মুখ গুঁজে দিল।
শব্দ বেরোচ্ছে না, শুধু শরীর কাঁপছে। শেরাজ চোখ বন্ধ করে তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন ছেড়ে দিলেই সে হারিয়ে যাবে।
“এমন করে না, জান।”
সুমুর আঙুলগুলো ধীরে ধীরে শেরাজের শার্ট আঁকড়ে ধরল। শেরাজ কপাল নামিয়ে সুমুর কপালে ঠেকাল। দুজনেই চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। শেরাজ ধীর স্বরে বলল,
“এই দুনিয়াতে বেঁচে থাকতে হলে, আমার তোমাকে লাগবেই। অ্যাকচুয়ালি, বেসিক্যালি, টেকনিক্যালি, প্র্যাকটিক্যালি, নরমালি, ফিজিক্যালি, মেন্টালি, ইমোশনালি, লিটারেলি, সিরিয়াসলি, অনেস্টলি, ট্রুলি, অবভিয়াসলি, আলটিমেটলি, অ্যাবসলিউটলি, ডেফিনিটলি, ইউনিভার্সালি, পার্সোনালি, ইমোশনালি, স্পিরিচুয়ালি, লজিকালি, কেমিক্যালি, বায়োলজিকালি, ন্যাচারালি, ইটারনালি, অফিসিয়ালি, প্রফেশনালি, আনডাউটেডলি, আনকন্ডিশনালি অ্যান্ড ওয়ান অ্যান্ড ওনলি— আমার তোমাকে লাগবেই। আই নিড ইউ। মাই হার্ট নিডস ইউ। তোমার মতো কার্বন কপি হলেও হবে না। আমার তোমাকেই লাগবে।”
“তাহলে ফিরে চলুন আমার সাথে।”
“তা আর সম্ভব না, সুইটহার্ট।”
“কেন সম্ভব না?”
“এখন অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। আজ আমি ফিরে গেলে আমার জায়গা হবে জেলের গহীন অন্ধকারে। আর তারপর ফাঁসি।”
সুমু থমকে গেল।
“ফাঁসি মানে? এসব কী বলছেন আপনি?” সে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “আমি আপনার কিছু হতে দেব না। আমি আপনাকে আর আমার সন্তানদের নিয়ে অনেক দূরে পালিয়ে যাব। সেখানে আমাদের কেউ খুঁজে পাবে না। আপনি চলুন আমার সাথে।”
“আমি পালাতে পারব না, সুইটহার্ট। কারণ শেরাজ খান পালাতে শেখেনি। আর আমি পুলিশের কাছে ধরা দিতেও পারব না। কারণ আমি ধরা দিলে শুধু আমি মারা যাব না, আমার সন্তানদের ভবিষ্যতও মারা যাবে। ওরা বড় হয়ে জানবে—তাদের পাপা একজন খুনি ছিল। একজন ক্রিমিনাল। একজন ভয়ংকর ম্যাফস্টার। এই কলঙ্ক আমি বাবা হয়ে ওদের কপালে লাগতে দিতে পারি না।”
সুমু চিৎকার করে উঠল,
“তাহলে আত্মহত্যা কি পালিয়ে যাওয়া নয়? যদি সমস্যা হয়, তাহলে সমস্যার কথা না ভেবে
সমাধানের কথা ভাবা উচিত। কিন্তু আপনি তো সব ছেড়ে পালিয়ে যেতে চাইছেন।”
শেরাজের চোখ খুলল। খুব ধীরে সে বলল,
“হয়তো! তবে বাকি দুটোর থেকে এটা অনেক সম্মানের। আর তাছাড়া…” সে লাশ দুটোর দিকে তাকাল, “আমি আমার কথা রাখছি।”
সুমু হঠাৎ তার থেকে সরে বসল। সে দু’হাত দিয়ে শেরাজের পা জড়িয়ে ধরে বলল,
“আপনার পায়ে ধরি খান সাহেব, চলুন আমার সাথে। আপনি হীন কোনো সম্মান আমি আর আমার সন্তানদের চাই না। আমার বাচ্চাদের শুধু তাদের বাবাকে চাই। আর আমার চাই আমার স্বামীকে।”
শেরাজের চোয়াল শক্ত হলো। চোখের কোণ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
“যদি আমি থাকি, তাহলে তোমাদের জীবন কখনো নিরাপদ হবে না। আরিয়ান, রায়য়ানের মতো আরও অনেকে আসবে তোমাদের ক্ষতি করতে। বেঁচে থাকলে এই প্রফেশন আমি ছাড়তে পারব। কিছু মানুষ অন্ধকারে ডুবতে ডুবতে এতোটাই অতলে ডুবে যায়, যে তার আর ফিরে আসার কোনো রাস্তা থাকে না। আমার আর রায়য়ানের ঠিক তেমন অবস্থা। ওতো বেঁচে গেল, এবার আমার পালা।” সে সুমুর মাথার ওপর হাত রাখল, “এই স্পর্শটা শেষ স্পর্শ। আমাকে ঘৃণা করো, আর সুন্দর করে বাঁচতে শিখো।”
সুমু তাকিয়ে রইল। শেরাজ তার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না। ওই ভেজা চোখ জোড়ার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। সে খাঁচার সাথে মাথা হেলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখল। এই মুহুর্তে কষ্টটাকে কমাতে হবে। তার কাছে আর কোনো উপায় নেই। কষ্ট কমানোর জন্য সে গান ধরল,
“আমার আগুনের ছাই জমে জমে,
কত পাহাড় হয়ে যায়!
আমার ফাগুনেরা দিন গোনে গোনে,
আর উধাও হয়ে যায়!
যত পথের বাধা, সবই তো কালো সাদা,
কবে ঠিকানা পেয়ে হবে রঙিন!
চেনা নামেরই ডাকে, আমি কি পাবো তাকে,
কবে রে আসবে সে রোদেলা দিন!”
গানটা যেন শেরাজের কষ্টের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করল। সুমুরও সহ্য হলো না এমন সময়ে এই গানটা। সে শেরাজের মুখের ওপর হাত রেখে তাকে থামিয়ে দিল। শেরাজ চোখ মেলে তাকাল। সুমু কাঁপা গলায় বলল,
“কিন্তু আত্মহত্যা যে মহাপাপ, খান সাহেব।”
শেরাজের ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে হাসতে চাইল, কিন্তু পারল না।
“পাপ?” সে ফিসফিস করে বলল, “আমি তো পাপের পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে আছি, সুইটহার্ট।” নিজের বুক চেপে ধরল, শ্বাস যেন ঠিকমতো ঢুকছে না, “তুমি আমাকে এসব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দাও। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমি যে প্রতিদিন, প্রতিটা নিঃশ্বাসে মরছি। বন্ধুদের মুখ, রক্ত, চিৎকার—সব মাথার ভেতর ঘুরে ঘুরে আমাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে।”
সুমু তার মুখটা দু’হাতে ধরে চোখে চোখ রাখল।
“এইটা মুক্তি না,” সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “এটা পালানো। আমাকে ছেড়ে পালানো।”
শেরাজ মাথা নাড়ল।
“না, এটা পালানো না। এটা নিজেকে থামানো। এই যন্ত্রণাটাকে থামানো।”
“আমাকে ছেড়ে গিয়ে থামাতে চান? আপনি চলে গেলে কি আমার যন্ত্রণা থামবে? আপনার কিছু হয়ে গেলে আমি বাঁচব কীভাবে?”
“তুমি স্ট্রং। তুমি পারবে।”
“আমি পারব না! আমি আপনাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না। আপনি যদি এত পাপই করে থাকেন, তবে বেঁচে থেকে তার দায় নিন। মরে গেলেই সব দায় শেষ হয়ে যায় না, খান সাহেব।”
শেরাজ আর কোনো কথা বলল না। সে উঠে গিয়ে পড়ে থাকা বন্দুকটা তুলে নিল। ধীর পায়ে ফিরে এসে আবার সুমুর সামনে বসে পড়ল। সুমু অঝোরে কাঁদছে। তার কান্নার শব্দে ঘরটা ভরে উঠেছে, অথচ শেরাজ যেন সেই শব্দও ঠিকমতো শুনছে না। সে বন্দুকটা দু’হাতে ধরে সুমুর দিকে বাড়িয়ে দিল।
“জীবনের প্রথম… আর শেষবারের মতো তোমার কাছে কিছু চাইছি, সুইটহার্ট।”
সুমু ভয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“না! এটা করবেন না…”
শেরাজ যেন শুনলই না। সে চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি কারও কাছে কখনও ভিক্ষা চাইনি। কারও কাছে কখনও মাথা নত করিনি। কিন্তু আজ করছি তোমার কাছে। আত্মহত্যা মহাপাপ—তুমি নিজেই বলেছ। তাহলে তুমি আমাকে মৃত্যু দাও।” সে বন্দুকটা আর একটু এগিয়ে দিল, “আমাকে শুট করো, সুইটহার্ট।”
সুমু আঁতকে উঠে পিছিয়ে গেল।
“আপনি পাগল হয়ে গেছেন? আপনি কি জানেন, আপনি কী বলছেন?”
শেরাজ হেসে উঠল।
“পাগল? হয়তো!” সে নিজের বুকে আঙুল দিয়ে বলল, “কিন্তু এইখানের পাগলামিটা থামানোর আর কোনো রাস্তা আমার কাছে নেই। আমি আর পারছি না। প্রতিটা নিঃশ্বাসে মনে হচ্ছে কেউ আমার বুকের ভেতর ছুরিকাঘাত করছে। তুমি আমাকে সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দাও, সুইটহার্ট। তুমি আমাকে মারলে, সেটা খুন হবে না। সেটা হবে, দয়া।”
সুমু চিৎকার করে উঠল,
“না! আমি পারব না এসব। এটা মানে আমাকে আজীবনের অভিশাপ দিয়ে যাওয়া। আমাকে নিজের হাতে নিজের শান্তিকে খুন করতে বলা। নিজের সুখকে মেরে ফেলতে বলা।”
“প্লিজ, সুইটহার্ট… আমি আর পারছি না। তুমি না করলে আমি নিজেই করব। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, তুমি দোষী হবে না। আমার চোখের দিকে তাকাও। দেখছো না, আমি কতটা ক্লান্ত? আমি সারাজীবন সবাইকে রক্ষা করেছি। আজ শুধু একবার… একবার তুমি আমাকে রক্ষা করো।”
সুমু কান্না থামাতে পারল না। তার শরীর কাঁপছে। শ্বাস এলোমেলো হচ্ছে বারবার।
“প্লিজ, এভাবে কেঁদো না। আমাকে যেতে দাও,” শেরাজ প্রায় শিশুর মতো বলল, “আমি আর শক্ত হতে পারছি না।”
সুমু অনুভব করল, এই মানুষটা আসলে মরতে চাইছে না, সে শুধু যন্ত্রণাটাকে থামাতে চাইছে। সুমু চোখ বন্ধ করল। নিজেকে শক্ত করল। খুব ধীরে, ভাঙা গলায় বলল,
“ঠিক আছে…”
শেরাজ চমকে তাকাল।
“কি?”
সুমু চোখ নামিয়ে বলল,
“আমি… আমি করব।”
এই কথাটা বলতেই, তার বুকের ভেতর সবকিছু যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। শেরাজের চোখে এক মুহূর্তের জন্য শান্তি নামল। সে কাঁপা হাতে বন্দুকটা এগিয়ে দিল।
“ধন্যবাদ! তুমি খুব দয়ালু, সুইটহার্ট।”
সুমু বন্দুকটা নিল। লোহার ঠাণ্ডা স্পর্শে তার আঙুলগুলো অবশ হয়ে এলো। হাত কাঁপছে এতটাই যে বন্দুকের ওজনটুকুও আর সহ্য হচ্ছে না।
শেরাজ ধীরে চোখ বন্ধ করল। মুখে একরাশ ক্লান্তি, যেন বহু যুদ্ধের শেষে পাওয়া সামান্য বিশ্রাম।
“এখানেই সব শেষ,” সে খুব নিচু গলায় বলল, “আমি প্রস্তুত, সুইটহার্ট।”
সুমু বন্দুকটার দিকে তাকাল। তার চোখের সামনে রক্ত, কান্না, মৃত মুখ, সন্তানদের হাসি সব ঝাপসা হয়ে এলো। ট্রিগারের ওপর আঙুল রাখতেই নিঃশ্বাস আটকে গেল। হঠাৎ তার কানে ভেসে এলো,
“পাপা…”
একটা অবুঝ কণ্ঠ। হয়তো সিমরান আর শেরানের কণ্ঠ। সুমুর বুকের ভেতর থেকে আর্তনাদ বেরিয়ে এলো।
“না… না…”
তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল। হাতের শক্তি ফুরিয়ে গেল। বন্দুকটা মেঝেতে পড়ে গিয়ে একটা ধাতব শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল। শেরাজ চোখ খুলে তাকাল। সুমু ভেঙে পড়ে চিৎকার করে উঠল,
“আমি পারব না! আমি আপনাকে মারতে পারব না!”
সে দৌড়ে গিয়ে শেরাজকে জড়িয়ে ধরল। এতো শক্ত করে ধরল, যেন ছেড়ে দিলেই সে হারিয়ে যাবে।
“আপনি মৃত্যু, এটা মুক্তি না,” সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “এটা আমাকে আজীবনের শাস্তি দিয়ে যাওয়া।”
শেরাজ স্তব্ধ হয়ে রইল।
“আমি ক্লান্ত,” সে ফিসফিস করে বলল, “আমি সত্যিই খুব ক্লান্ত…”
সুমু মাথা নাড়ল,
“আমি জানি। কিন্তু ক্লান্ত মানুষ বিশ্রাম নেয়—শেষ হয়ে যায় না।” সে তার মুখটা দু’হাতে ধরে চোখে চোখ রাখল, “আপনি যদি মারা যান, তাহলে হয়তো আপনার যন্ত্রণা থামবে—কিন্তু আমারটা শুরু হবে।”
শেরাজের ঠোঁট কেঁপে উঠল। সে কিছু বলল না। কিন্তু তার হাতটা উঠে এসে সুমুর পিঠে রাখল। হঠাৎই সে সুমুর কাছ থেকে সরে গেল। তার চোখে আর আগের সেই আকুতি নেই। এখন সেখানে একরাশ জেদ আর উন্মত্ত স্থিরতা।
“না,” সে নিচু স্বরে বলল, “এভাবে হবে না।”
সে মেঝে থেকে বন্দুকটা তুলে নিয়ে সুমুর দিকে এগিয়ে দিল।
“তুমি করো, এটাই একমাত্র উপায়।”
সুমু মাথা নাড়তে লাগল। চোখ বেয়ে জল পড়ছে, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না। শেরাজ এগিয়ে এসে তার কপালে কপাল ঠেকাল।
“শোনো,” সে ফিসফিস করল, “আমি যদি বেঁচে থাকি, তাহলে আমি প্রতিদিন একটু একটু করে পচব। আর তুমি প্রতিদিন আমাকে তোমার চোখের সামনে পচতে দেখবে।” সে সুমুর হাত ধরে বন্দুকের গ্রিপে চেপে ধরাল।
“আমার চোখের দিকে তাকাও, আমি ভয় পাচ্ছি না। তুমিও ভয় পেও না।”
“প্লিজ, খান সাহেব। প্লিজ না।”
শেরাজ তাকে থামিয়ে দিল।
“এবার এটা আমার আদেশ।”
সুমু চোখ বন্ধ করল। সব শক্তি ফুরিয়ে গেছে তার। মৃদু স্বরে বলল,
“ঠিক আছে!”
শেরাজ নিঃশ্বাস ছাড়ল।
“এই তো, মাই গার্ল। তাড়াতাড়ি করো কাজটা।”
সুমু কাঁপা গলায় বলল,
“খান সাহেব, গানে সাইলেন্সার লাগিয়ে দিয়ে, চোখ বন্ধ করুন। গুলি চলার ওই তীব্র শব্দটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে, কষ্ট দেয়।”
শেরাজ কোনো প্রশ্ন করল না। সে বন্দুকটা হাতে নিয়ে সাইলেন্সার লাগিয়ে সুমুর হাতে দিয়ে আবার চোখ বন্ধ করল। সুমু এগিয়ে এলো। এখন তার হাত কাঁপছে এতটাই যে নিজের শরীরের ভারও ধরে রাখতে পারছে না। সে খুব সাবধানে বন্দুকটা শেরাজের বুকে ঠেকাল। লোহার ঠাণ্ডা স্পর্শে শেরাজ একটুও নড়ল না। সে সম্পূর্ণ স্থির, সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। সুমু খেয়াল করল, শেরাজের কপাল শান্ত। আজ আর ভ্রু কুঁচকানো নেই। ঠোঁট শক্ত করে ধরা নেই। সে সত্যিই প্রস্তুত। এই মানুষটা সত্যিই মরার জন্য প্রস্তুত। সুমুর নিঃশ্বাস হঠাৎ আটকে গেল। সে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি একটুও ভয় পাচ্ছেন না?”
শেরাজ চোখ না খুলেই বলল,
“ভয় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, সুইটহার্ট। এখন আমি মরার জন্য প্রস্তুত।”
সুমু মাথা নেড়ে বলল,
“আপনি প্রস্তুত… কিন্তু আমি না।”
“এই মুহুর্তে আর পিছিয়ে যেও না, সুইটহার্ট। কাউকে মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড় করিয়ে পিছিয়ে যেতে নেই।”
“এখনও বলছি, ফিরে চলুন। সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনিও এই পথ ছেড়ে দিয়ে ভালো হয়ে যাবেন।”
“আমি নষ্ট, জন্ম থেকে নষ্ট। তোমার পবিত্র হাতেও আমার নষ্টত্বের কালিমা মুছবে না। ভালো হতে বলো? ভালো কাজ আমার পোষায় না, সুইটহার্ট। আমি যেমন নষ্ট, তেমনই থাকবো — অন্ধকারই আমার ঠিকানা। বহুত চেষ্টা করলাম ভালো হবার। কিন্তু না! পরিশেষে দেখলাম, আমি ভালো হলে গোটা দুনিয়াটাই খারাপ হয়ে যাবে,
তাই এজনমে আমার আর ভালো হওয়া হলো না।”
সুমু তাচ্ছিল্য করে হাসল,
“আপনাকে আঘাত করতে আমার খুব কষ্ট হবে… কিন্তু এখন আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আপনার পাপগুলোকে না মারলে, আমার ভালোবাসা পাপ হয়ে যাবে। আপনাকে এখনও ভালোবাসি, এটাই হয়তো আমার সবচেয়ে বড় পাপ। আজ আমি আপনাকে মারব না, আপনার ভেতরের শয়তানটাকে মারব। পরজনম বলতে কিছু নেই জানি। তবুও যদি থেকে থাকে, পরের জন্মে ফেরত আসবেন সাদা পাঞ্জাবি পরে। তখনও যদি আমাকে ভালোবাসতে পারেন— তাহলে আমার দেওয়ার আজকের এই রক্তের দাগ মুছে নিব নিজ হাতে।”
শেরাজের ঠোঁটে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটল, যেন এমন কিছুই সে এতক্ষণ শুনতে চেয়েছিল,
“একটা কথা বলো, মরার আগে আরেকবার তুমি আমাকে ভালোবাসবে?”
“যখন আপনার বুকে বুলেট ঢুকবে, তখন আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা রক্ত হয়ে ঝরে পড়বে। ভালোবাসি বলেই হয়তো কষ্টটা এত তীব্র হচ্ছে। ভেবেছিলাম আপনি আমার আলো, কিন্তু আপনি যে অন্ধকার—সেটা আগে বুঝিনি।”
“শেষবারের জন্য আমার চোখে চোখ রাখো, তারপর আঁধারে হারিয়ে যাই, সুইটহার্ট।”
“আপনি কি জানেন? আমার সমস্ত স্বপ্নের মধ্যে একটাই আপনি ছিলেন। আর আজ সেই স্বপ্নকেই আমি শেষ করতে চলেছি? আমার ভালোবাসাকে কেন হত্যা করলেন, খান সাহেব?”
“নতুন করে জীবনটা আবারও গুছিয়ে নিও। পারলে অন্য কারও…”
থেমে গেল সে। পুরো কথাটা শেষ করার মতো ক্ষমতা তার নেই। কিন্তু সুমু বুঝে নিল তার কথার বাকি অংশটুকু।
“আপনি ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের ছোঁয়া আমার গায়ে লাগার আগেই, যেন আমার শরীর পচে যায়। আপনি ছাড়া আর কোনো চোখ আমার দিকে লালসা নিয়ে তাকানোর আগেই, যেন আমার শরীরে আগুন ধরে যায়। আপনি ছাড়া আমার বিয়ে অন্য কারো সাথে হবার আগে, যেন আমার দেহ কবরে চলে যায়।”
শেরাজ চুপ করে রইল। সুমু ধীরে বলল,
“যেদিন প্রথম আপনার চোখে চোখ পড়েছিল, ভাবিনি এই চোখই একদিন আমার মৃত্যুর আয়না হবে। রোজরাতে আপনার বুকের ওপর ঘুমিয়েছে, আর আজ সেই বুকেই বন্দুক চালাব। আমি জানি, আপনি পাপী, খুনি, কিন্তু আমার কাছে আপনি শুধু আমার ভালোবাসার মানুষ ছিলেন। আপনাকে মেরে ফেলব ঠিকই, কিন্তু বিশ্বাস করুন, যখন আপনার রক্ত আমার চালানো বন্দুক থেকে ঝরে পড়বে, তখন হয়তো আপনাকে না, তখন আমি আমার ভালোবাসাকেই মেরে ফেলব। আজ যেন আমি আপনাকে মারছি না, আমি আমার ভালোবাসাটাকে মেরে ফেলছি। কিন্তু আপনিই বলুন, পাপীর শাস্তি তো মৃত্যুই। তবু কেন এই পাপকে আমি এখনো ভালোবাসি?”
শেরাজ চোখ বন্ধ রাখা অবস্থাতেই বলল,
“কিছু মানুষ তোমার জীবন থেকে চলে গেলে তোমার ভালো হবে, কিন্তু তারা তোমার ভেতরের ক্ষতগুলোকে চিরকালের জন্য তীব্র করে দিয়ে যাবে। তুমি তাদের ভুলে যেতে চাইবে, কিন্তু স্মৃতি তাদের আরও তিক্ত করে তুলবে। যেমনটা তোমার জীবনে, আমি। দেখো, আমরা দু’জনেই এখনো বেঁচে আছি, অথচ আমাদের ভালোবাসা কবরের নিচে ঘুমিয়ে আছে।”
“মরার আগে বলুন, একটিবারের জন্যও কি আপনি আমাকে সত্যি ভালোবেসেছিলেন?”
“হয়তো!”
“হয়তো? জোর গলায় আজ বলতেও পারছেন না? কথার মধ্যে হেঁয়ালি ধরে রেখেছেন কেন?”
“পালিয়ে যাবার সময় হয়ে এসেছে যে।”
“হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন! তাহলে আমি জীবনের কি পেলাম, বলুন? আজ মনে হচ্ছে, আমি আপনার কাছে হারিনি, আমি আমার মনের কাছে হেরে গেছি। একটা স্বার্থপরকে নিজের সবটা উজাড় করে ভালোবেসেছি, যে আজ আমাকে একা ফেলে পালিয়ে যেতে চাইছে।”
“তুমি সময় নষ্ট করছ, সুইটহার্ট। কাম ওন, শুট মি।”
“এই মুহূর্তে আর আমার হাত কাঁপছে না জানেন? কারণ আপনার চেয়ে বড় খুনি আমি —আজ আমি আমার নিজের স্বপ্নগুলোকে মেরে ফেলতে যাচ্ছি।”
“শুট মি, সুইটহার্ট!”
“বারবার এক কথা বলবেন না। আপনি বুঝতে পারছেন না, আপনাকে আঘাত করার কথা ভাবলেই আমার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে? আপনিই তো শিখিয়েছিলেন কীভাবে ভালোবাসতে হয়, কিন্তু আজ আপনাকেই শেষ করতে হচ্ছে। আজ হয়তো আপনার পাপগুলোকে না মারলে, আমার ভালোবাসাটাই মরে যাবে। তবুও মারতে হবে, কারণ আর পথ নেই। ভালোবাসা দিয়েও তো আপনাকে পাল্টাতে পারিনি। পায়ে পড়ে, ভিক্ষা চেয়েও আপনাকে ফেরাতে পারলাম না আজ। ক্ষমা করবেন না আমাকে। আর পারলে অভিশাপ দিন, যেন পরের জন্মে আর কাউকে এভাবে ভালো না বাসি।”
“আমাকে ভালোবাসা উচিত না। আমাকে ভালোবেসে শুধু শুধু নরক যন্ত্রণা ভোগ করলে। আমাকে অন্তত আর ভালোবেসো না।”
“বেশ তো, বাকিরা আপনাকে ভালোবেসে পূণ্য করেছিল, শুধু আমি করেছিলাম একমাত্র নরক ভোগের জন্য। আপনি তো আমার জীবনে প্রবেশ করেছিলেন এক ঝড়ের মতো। যেটা ছিল অনাহুত, অপ্রস্তুত, অথচ ধ্বংস নিশ্চিত। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই ঝড়ের দমকা হাওয়ার সাথে নিজেকে মিশিয়ে নিয়েছিলাম।”
শেরাজ চুপ করে রইল। সুমু মৃদু হেসে বলল,
“যে মানুষ চুপ থাকে, তার ভেতরের বিষ সবচেয়ে বেশি তিক্ত।”
শেরাজ চোখ বন্ধ অবস্থায় কিছু বলতে নিতেই হঠাৎ তার শরীরের মাংস ভেদ করে কিছু একটা ঢুকে গেল। সে চোখের মেলে সুমুর দিকে তাকাল। চোখে দুটোর সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে এলো। চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। ঢলে পড়তে নিতেই সুমু তাকে আঁকড়ে ধরল। তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। শেরাজের চোখ বন্ধ হয়ে গেল। সুমু কেঁদে উঠল।
“আমাদের ভালোবাসার শপথ ছিল চিরন্তন, অথচ নিয়তির রক্তমাখা কলম লিখে দিল আমাদের মর্মান্তিক পরিণতি।”
সে শেরাজের মাথাটা বুকের সাথে মিশিয়ে নিল।
“আমরা একে অপরের জন্যই জন্মেছিলাম, তবুও নিয়তি আমাদের আলাদা করে দিল, যেন এক আকাশ—দুটি মৃত নক্ষত্র। আপনি ছিলেন আমার শেষ স্বপ্ন, কিন্তু সেই স্বপ্নটাই ভেঙে গেল খুনের মতো নিষ্ঠুর বাস্তবতায়।”
শক্ত হাতে সে নিজের চোখ মুছে নিল। শেষবারের মতো শেরাজের শুকনো ঠোঁটে ঠোঁট রাখল। খুব দীর্ঘ, গভীর একটা চুমু খেল। শেরাজের প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করল। আনলক করে ডায়াল প্যাডে গিয়ে স্যান্ডির নাম্বার খুঁজে বের করে কল করল। কল রিসিভ করতেই সে বলল,
“হ্যালো, সান ভাইয়া! এখনই আসুন, দ্রুত। আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই।”
কল কাটল সে। পাঁচমিনিটের মধ্যে স্যান্ডি এসে উপস্থিত হলো, যেন আশেপাশেই ছিল। হাতে কেরোসিন তেলের দুটো বোতল। তাকে দেখে সুমু শেরাজের মাথাটা সযত্নে মেঝের ওপর রেখে উঠে গেল।
“যা যা বলেছিলাম, সব এনেছেন?”
স্যান্ডি যেন সুমুর কথা শুনলো না। সে শেরাজের দিকে এগিয়ে যেতে নিতেই সুমু তার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“এখন ইমোশনাল হাবার সময় নেই। কাজে লেগে পড়ুন।”
“কিন্তু ম্যাম, আমার স্যার…”
“যেটা বললাম, সেটা করুন।”
স্যান্ডি বাধ্য হয়ে নিজের কাজে মনোনিবেশ করল। সে কেরোসিনের বোতল নিয়ে এগিয়ে গেল। পাতালপুরীর সবগুলো রুম, সবগুলো কর্ণারের চারদিকে কেরোসিন আর রায়য়ানের সমস্ত মদের বোতল থেকে মদ ছিটিয়ে দিতে লাগল। সুমু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
দশমিনিটের মধ্যে নিজের কাজ শেষ করে ফিরে এলো স্যান্ডি। সুমু মৃদু স্বরে বলল,
“এবার আপনি চলে যান। সমস্ত ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি। সমুদ্রপথ দিয়ে সোজা বাংলাদেশে চলে যাবেন। খান সাহেবের পরিবর্তে এখন আপনার সব দায়িত্ব আমার। আপনি ওই সিমানার বাহিরে গেলেই আমি আমার বাকি কাজ শুরু করব। এদিকে কথা ভাববেন না। আমি সবটা সামলে নিব। মনে রাখবেন, আপনার ওপর অনেক বড় দায়িত্ব দিচ্ছি, আমি আশা রাখব আপনি আপনার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করবেন।”
“কিন্তু ম্যাম আপনি…”
“আমার চিন্তা করবেন না। আপনাকে যতটুকু বলেছি, ততটুকু যথাযথভাবে পালন করুন।”
“ম্যাম, আপনি বুঝতে পারছেন না এরপর কি…”
তাকে থামিয়ে দিল সুমু। ঘুরে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বলল,
“ইটস মাই অর্ডার।”
স্যান্ডির পা যেন চলে না, তবুও সে সুমুর কথা শুনতে বাধ্য হলো। সুমু শেষবারের মতো তাকিয়ে দেখলে তার ভালোবাসার মানুষটিকে। তার পা যেন নড়ে না, স্থির হয়ে রইল।
মিনিট পনেরো বাদে নিয়ম অনুযায়ী সুমুর হাতে থাকা শেরাজের ফোনে স্যান্ডির মেসেজ এলো। সুমু বুঝল, স্যান্ডি সিমানার বাহিরে চলে গেছে। সে আর দাঁড়িয়ে রইল না। মেঝে থেকে স্যান্ডির আনা দিয়াশলাইটা হাতে তুলে নিল। ফিরে যেতে গিয়েও একবার পেছন ফিরে তাকাল। একে একে সমস্ত লাশগুলোকে দেখে পাতালপুরীর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলো। বাহিরে এখনো ঘুটঘুটে অন্ধকার। সে পাতালপুরীর দরজার দিকে ঘুরে তাকাল। হাতে থাকা দিয়াশলাইটা জ্বালিয়ে পাতালপুরীর ভেতরে ফেলে দিল। মুহুর্তেই আগুন দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করল।
সুমুর চোখ বেয়ে আবারও পানি গড়িয়ে পড়তেই সে শক্ত হাতে মুছে নিয়ে বলল,
“আমার ভালোবাসার গল্পের বইয়ের শেষ পৃষ্ঠা লিখে দিল নিয়তি, আর তাতে কালি হিসেবে ব্যবহার করল আমাদের বিচ্ছেদের অশ্রু।”
সে শেরাজের ফোনটা আবারও আনলক করল। ডায়াল প্যাডে গিয়ে ইশিতার ফোনে কল করল। ওপরপাশ থেকে কল রিসিভ হতে সে কথা না বলে কল কেটে দিল। এই মুহুর্তে কারও সাথে কথা বলার মতো অবস্থাতে নেই সে। ইশিতার নাম্বারে টেক্সট করে লোকেশন পাঠিয়ে দিয়ে লোকেশন অনুযায়ী সবাইকে নিয়ে আসতে বলল। ইশিতা টেক্সট সিন করতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুটা সময় নিয়ে থানায় কল করল সে।
চলবে..?