ফন্ট সাইজ:
থিম:
খান সাহেব

৮৮তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া জাহান

#খান_সাহেব

#সুমাইয়া_জাহান

#পর্ব_88. ✦ প্রথমাংশ ✦

​ঢাকার ব্যস্ততা পেছনে ফেলে মাইক্রোবাসের বহর যখন সুমুদের শেখ বাড়ির সামনে এসে থামল, তখন সন্ধ্যার ম্লান আলো গাছের পাতায় আলসেমি করে লেপ্টে আছে। এই বাড়িটি শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়, এটি সুমুর অস্তিত্বের শিকড়। গাড়ির দরজা খুলতেই সুমুর নাকে ভেসে এলো মাটির সেই আদিম সোঁদা গন্ধ, যা ওমানের মরুভূমিতে সে হাজার খুঁজেও পায়নি।

​বাড়ির সকলে সুমুদের জন‍্য অধীর অপেক্ষায়। সুমু গাড়ি থেকে নামতেই চারপাশে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। জেলফেরত মেজো ভাইয়ের মেয়েটাকে দেখে সাখাওয়াত সাহেবের বুকটা এক অজানা হাহাকারে ভরে উঠল। শামীম সাহেব যেন মেয়েকে দেখে পাথর হয়ে গেছেন। বাড়ির বড় ছেলে সজীব মাস খানেক হলো সৌদি আরব থেকে ফিরেছে। সে নিজেও সুমুকে দেখে হতভম্ব হয়ে রইল। কারণ সুমুর জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো কাহিনী তার অজানা নয়।

​হাসি বেগম এতক্ষণ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। সুমু টলমল পায়ে এগিয়ে গিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়াল, হাসি বেগম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। এতগুলো বছরের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা আর সমাজের হাজারো কটু কথাকে উপেক্ষা করে তিনি তার কলিজার টুকরোকে জড়িয়ে ধরলেন। তার বুকফাটা কান্নায় শেখ বাড়ির আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠল।

​“আমার মা ফিরে এসেছে! আমার রাজকন্যা ফিরে এসেছে।”

হাসি বেগমের এই আর্তনাদে উপস্থিত সবার চোখের জল বাঁধ ভাঙল। সুমু মায়ের কাঁধে মাথা রেখে জীবনের সমস্ত ক্লান্তি বিসর্জন দিতে চাইল। পাশে রুমা বেগম আর সুমি বেগমও আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছেন। সুমি বেগমের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে শান্তনা দিচ্ছেন মুক্তাক সিকদার।

​ভেতর থেকে লাঠিতে ভর দিয়ে বেরিয়ে এলেন অশীতিপর বৃদ্ধা মাজেরা বেগম। সুমুকে দেখে তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। সুমু দাদির কাছে এগিয়ে গেল। মাজেরা বেগম কাঁপাকাঁপা হাতে সুমুর মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে বললেন,

“বেঁচে থাক, বোইন।”

​ড্রয়িংরুম তখন এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। আইয়ুব, সারবাজ আর আরবাজরা তাদের স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বড়দের সালাম করল। আইয়ুবের কোলে ছোট্ট নিশান, আর আরবাজ কোলে রুহি। অন্যদিকে রাহিনের কোলে ফুটফুটে হাসফা আর শাহরুখের কোলে ছোট্ট আহিয়া। নতুন এই শিশুদের আগমনে শেখ বাড়ির শূন্যতা নিমেষেই পূর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও দুজন মানুষ বড্ড অস্থির। রিয়াজ তার বড় ভাইয়কে খুঁজছে আর ফিরোজা তার লাভকে দেখার জন্য পাগলপ্রায়। রিয়াজ অস্থির হয়ে সামিয়াকে জিজ্ঞেস করল,

“ভাবিজি, আমার ব্রো কোথায়? আমি এখনই যাব ব্রো’র কাছে।”

​ফিরোজাও বলতে লাগল,

“নিউ ফ্রেন্ড, এবার আমাকে আমার লাভের কাছে চলো।”

সুমু এগিয়ে এসে রিয়াজ আর ফিরোজার কাঁধে হাত রাখল। তার চোখ দুটো বড্ড শান্ত। সে নিচু স্বরে বলল,

“রিয়াজ, ফিরোজা—শান্ত হও। তোমাদের ভাইয়া এখানেই আছে, এই শহরেই। কিন্তু এখনো সময় হয়নি তার সাথে দেখা করার। ওনার একটু চিকিৎসার প্রয়োজন, একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। আমি কথা দিচ্ছি, খুব তাড়াতাড়ি তোমরা ওনাকে দেখতে পাবে।”

সুমুর কথার জাদুতে রিয়াজ কিছুটা দমল, কিন্তু তার দীর্ঘশ্বাসে শেরাজকে দেখার ব্যাকুলতা স্পষ্ট। আইয়ুব আর সারবাজ তাদের সামলে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল।

​শামীম সাহেব টলমল পায়ে এগিয়ে এলেন। এতগুলো বছর পর নিজের মেয়েকে চোখের সামনে দেখছেন, কিন্তু তার দৃষ্টি আটকে গেল সুমুর দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফুটফুটে দুটো শিশুর ওপর। বিশেষ করে সিমরানকে দেখা মাত্রই শামীম সাহেবের পা দুটো যেন আর চলল না। তিনি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন ধুলোমাখা মাটিতে।

​সিমরান বড় বড় চোখে তার নানার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই একই তীক্ষ্ণ ভ্রু, একই রাজকীয় চিবুক আর দুর্ধর্ষ সেই চাহনি—যে চাহনি একসময় শেরাজ খানের পরিচয় ছিল। শামীম সাহেব কাঁপা কাঁপা হাতে সিমরানের গাল ছুঁয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তিনি সুমুর দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে বললেন,

“মা রে, এ তো স্বয়ং শেরাজ ফিরে এসেছে। ওমানের সেই বাঘটা বুঝি আজ আমার বাড়ির ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়িয়েছে।”

​সাখাওয়াত সাহেব আর রুমা বেগমও এগিয়ে এলেন। তারা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দেখছেন সিমরান আর শেরানকে। সিমরান তার ছোট ছোট হাতে রুমা বেগমের শাড়ির আঁচল ধরে টান দিয়ে বলল,

“তুমি তাঁতদছ তেন? আমাল মাম্মা বলেতে এই বালিতে অনেত চতনেট আর তেলনা আতে। তেলনা দাও, তান্না তরো না!”

​সিমরানের কথা শুনে কান্নার রোলের মধ্যেও সবার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সুমি বেগম তাকে কোলে তুলে নিয়ে চুমুতে ভরিয়ে দিয়ে বললেন,

“হ্যাঁ রে দাদুভাই, খেলনা-চকোলেট সব আছে। তুই শুধু আমাদের ঘরটা আলো করে থাক।”

​ঠিক এই সময়ে এগিয়ে এলো নাতাশা। সুমুকে দেখা মাত্রই নাতাশা জড়িয়ে ধরল তাকে। কান্নায় তার কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে। সে সুমুকে আঁকড়ে ধরে বলতে লাগল,

“ম্যাম, আপনি কেমন আছেন? আমি জানতাম আপনি নিরপরাধ, আমি জানতাম আপনি ফিরবেন।”

​সুমু নাতাশাকে টেনে তুলল। তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বলল,

“কেঁদো না নাতাশা। জেলের দেয়াল শরীরটা শুকিয়ে দিলেও আত্মাটাকে মারতে পারেনি। দেখো, আমি ঠিক ফিরে এসেছি।”

ফারিন, ফারিয়া, শাহরুখ, আশিক মিলে সুমুকে ঘিরে ধরল। ফারিন আর ফারিয়া একসাথে সুমু জড়িয়ে ধরল। সুমুও বোনদের আঁকড়ে ধরল।

ড্রয়িংরুমের এককোণে পিয়াস মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। এতগুলো বছর বয়ে গেছে জলধারার মতো, কিন্তু পিয়াসের মনের কোণে জমে থাকা সামিয়ার প্রতি সেই একতরফা ভালোবাসার চোরাবালি আজও তাকে সমানভাবে গ্রাস করে আছে।

​সামিয়া হাসফাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পিয়াস দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার চোখে আজ কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু এক গভীর হাহাকার। ​সে বিড়বিড় করে নিজেকেই যেন শোনাল, “মানুষ বদলে যায়, ভাগ্য বদলে যায়, কিন্তু কারো কারো জন্য রাখা দীর্ঘশ্বাসটা কেন বদলায় না?”

আজ তার ছোট্ট সামু অনেক বড় হয়ে গেছে। সে এখন রাহিনের ঘর আলো করে থাকা এক সুখী গৃহিণী, এক সন্তানের মা, পিয়াস তা জানে, মানে, কিন্তু তার অবাধ্য মনটা বোধহয় মানতে চায় না।

সামিয়া হঠাৎ পিয়াসের দিকে তাকাতেই সে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। এই লুকোচুরি খেলাটা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। পিয়াস জানে, এই ভালোবাসা তাকে কেবল দহনই দেবে, কোনোদিন পূর্ণতা দেবে না। তবুও সামিয়ার ওই হাসিমুখটুকু দেখার জন্য সে বারবার এই বাড়িতে ছুটে আসে, ঠিক যেমন আজ এসেছে ওমান থেকে ফেরা সুমুদের ভিড়ে সামিয়াকে একপলক দেখার তৃষ্ণায়। সে আবারও বিড়বিড় করে বলল,

“স্মৃতিদের মিছিলে না চাইতেও কত কিছু ধূসর হয়ে যায়, কত পরিচিত মুখ ধুলো জমে আড়ালে চলে যায়। তবে প্রহর শেষে প্রার্থনার জায়নামাজে বসে যখন আপনাকে ভুলতে চাই, ঠিক তখনই কেন আপনার নামটা হৃদস্পন্দনে আরও জোরালোভাবে বেজে ওঠে? বিস্মৃতি কি তবে আপনার মায়ার কাছে হেরে গেছে, নাকি আমার প্রার্থনায় কোনো খাদ ছিল?”

​হঠাৎ শুরু হলো বাচ্চাদের নিয়ে এক অভাবনীয় হট্টগোল। হাসফা আর আহিয়া মুহূর্তেই সিমরান, রুহি, শেরান আর নিশানের সাথে মিশে গেল। শেখ বাড়ির ড্রয়িংরুমে এখন আর কোনো মাফিয়া জগতের অন্ধকার নেই, নেই কোনো ষড়যন্ত্রের গন্ধ। আছে শুধু এক ঝাঁক শিশুর কলকাকলি।

​সিমরান তার ছোট বোন হাফসা, আহিয়া আর রুহির সাথে মিলে ড্রয়িংরুমের মধ্যে একটা বল নিয়ে ছুটোছুটি শুরু করল। সাখাওয়াত সাহেব হাসিমুখে বললেন,

“দেখ শামীম, মেয়েটার হাঁটাচলাও একদম ওর বাবার মতো।”

​শামীম সাহেব মাথা নাড়লেন। ​সুমু হাসল, কিন্তু তার মনের কোণে তখন এক গভীর অস্থিরতা। সে জানে, এই পারিবারিক আনন্দটুকু পরম প্রশান্তি হলেও তার আসল গন্তব্য তার খান সাহেব। যেখানে তার প্রাণের মানুষটা আজ এক অচেনা আগন্তুক হয়ে আছে। সুমু ঘড়ির কাঁটার দিকে আড়চোখে তাকাল। সময় বয়ে যাচ্ছে। তাকে যেতে হবে।

•

রাতের খাবার শেষে পুরো বাড়ি কিছুটা শান্ত হতেই, সুমু রুমে এসে তার পুরোনো জানালার ধারে গিয়ে বসল। বাড়ির সবাই এখন বাচ্চাদের নিয়ে মেতেছে। সামিয়া আর ফারিয়া তাদের সন্তানদের সামলাতে ব্যস্ত। কিন্তু সুমুর মন পড়ে আছে শহরের সেই নিভৃত কোণে, যেখানে ‘এস.কে’ নামধারী একটা মানুষের স্মৃতির থেকে সুমু গভীর অতলে হারিয়ে গেছে। হঠাৎ সে স্যান্ডিকে কল করল।

​“সান ভাইয়া, কনফারেন্স রুম রেডি তো? মিস্টার এস.কে-কে বলুন আমি আসছি।”

​স্যান্ডির গম্ভীর উত্তর এলো,

“সব রেডি, ম্যাম! উনি আপনার ডিলের জন্য ওয়েট করছেন। উনি জানেন না ওমান থেকে আসা এই বিজনেস টাইকুন আসলে উনার নিজের স্ত্রী।”

​সুমু ফোনটা রেখে অন্ধকার ড্রয়িংরুমের দিকে তাকাল। ​আপাতত ড্রয়িংরুমে কেউ নেই। বাচ্চাদের আওয়াজ শামীম সাহেবের ঘর থেকে আসছে। সুমু আবারও গিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। অপেক্ষা সকলের ঘুমিয়ে পড়ার।

রাতের গভীরতা বাড়ার সাথে সাথে শেখ বাড়ির কলকাকলি ধীরে ধীরে আরও স্তিমিত হয়ে এলো। ওমান থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া আর বাংলাদেশে নামার পর এই দীর্ঘ ভ্রমণের ধকল সবার চোখেমুখে ক্লান্তির ছায়া ফেলে দিয়েছে। একে একে আইয়ুব, নিহাল, সারবাজ যার যার রুমে বিশ্রামের জন্য চলে গেল। বাড়ির বড়রাও আজ অনেক আবেগের আতিশয্যে শরীর এলিয়ে দিয়েছেন বিছানায়।

​পুরো বাড়িটা এখন নিঝুম, সুমু তার ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকার বাগানটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার পরনে তখনো সেই সাদা শাড়ি, যা সে জিয়ারতের সময় পরেছিল। তার মাথায় ঘুরছে কেবল একটাই চিন্তা—কীভাবে আজ রাতে চুপিচুপি বের হওয়া যায়।

​ঠিক সেই সময় দরজায় টোকা পড়ল। সুমু পেছন ফিরতেই দেখল সিমরান আর শেরান দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখে ঘুম নেই। শেরান এগিয়ে এসে সুমুর হাত ধরে বলল,

​“মাম্মা, আত তি আমলা তোমাল তাতে না তুয়ে দাদু আর দিদুনের তাতে তুতে পারি? দিদুন আমাদেল অনেত চুন্দর রূপততার দল্প শোনাবে বনেছে।”

​সিমরানও পাশ থেকে মাথা নেড়ে সায় দিল,

“হ্যাঁ মাম্মা! নানুভাই আমাদেল জন্য ততগুলো চতনেট বালিতের নিতে লুতিয়ে রেতেছে। আজ আমলা ওথানেই থাতব। তুমি নাগ তলবে না তো?”

​সুমুর জানে, ওরা সাথে থাকলে আজ রাতে তার বেরিয়ে যাওয়া অসম্ভব হবে। সে হাঁটু গেড়ে বসে দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরল। তাদের কপালে পরম মমতায় চুমু খেয়ে বলল,

“না মাম্মা, মাম্মা একদম রাগ করবে না। বরং আমি খুব খুশি যে তোমরা নানু আর দিদুনকে সময় দেবে। যাও, সাবধানে থেকো আর বেশি রাত করো না কিন্তু।”

​বাচ্চারা হাসিমুখে লাফাতে লাফাতে পাশের ঘরে চলে গেল। সুমু দেখল তার মা হাসি বেগম দরজা আগলে দাঁড়িয়ে আছেন। হাসি বেগম মৃদু হাসলেন।

“তুই চিন্তা করিস না সুমু, ওরা আমার কাছে আরামে থাকবে। তুই অনেক ক্লান্ত মা, এবার একটু ঘুমিয়ে নে।”

​সুমু হাসার চেষ্টা করল,

“হ্যাঁ আম্মু, আমি এখনই শুয়ে পড়ব।”

​হাসি বেগম চলে যেতেই সুমুর শরীরের সমস্ত জড়তা যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। সে দ্রুত কাবার্ড খুলে বের করে আনল তার সেই চিরাচরিত ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট আর ডার্ক জিন্স। চুলের খোপাটা খুলে শক্ত করে পনিটেল করে নিল। ​

সে দেখল ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা বেজে পনেরো মিনিট। বাড়িতে এখন সকলের প্রায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সুমু বেরোতে গিয়েও আবার থেমে গেল। না, এভাবে সে যাবে না। নিজেকে তার খান সাহেবের মনের মতো করে সাজিয়ে তুলতে হবে।

সে ফোনটা বেডের ওপর রেখে কাবার্ড খুলে একটি উজ্জ্বল কুচকুচে কালো রঙের শাড়ি বের করে আনলো। শাড়ির কাপড়টি মসৃণ ও সিল্কি ধাঁচের। শাড়ির আঁচল এবং পাড় জুড়ে কালো রঙের সিকুইনের কাজ করা বর্ডার রয়েছে। শাড়ির সাথে মিলিয়ে সে একই রঙের কালো সিকুইন করা গর্জিয়াস ব্লাউজ বের করল। ব্লাউজটি ফুল স্লিভ এবং গলার অংশটি ভি আকৃতির। সে শাড়িটার ওপর একবার হাত বুলিয়ে চেঞ্জ করার ওয়াশরুমে চলে গেল।

মিনিট দশেক পর বেরিয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে বসল। গলায় সে একটি ভারি এবং কারুকার্যমণ্ডিত ডায়মন্ড পাথরের নেকলেস পরে নিল। কানে একই ঝুমকো ধাঁচের দুল। দু’হাতের আঙুলে আংটি পরে নিল। চোখ দুটোকে হাইলাইট করার জন্য মাশকারা ব্যবহার করল। তার সিল্কি, লম্বা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে রাখল। নখে মেরুন রঙের নেলপলিশ খুব ধীরে যত্ন করে পরল। সাজ শেষ হতেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের এই ক্লাসিক লুকটি বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ফ্লন্ট করে কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ নিল।

বাড়ির সবাই এখন ঘুমে। সুমু নিঃশব্দে গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে জানে, মস্তিস্ক ভুলে গেলেও হৃদপিণ্ড হয়তো তার মালিককে ঠিকই চিনে নেবে। সুমু খুব সাবধানে বিড়ালের মতো নিঃশব্দে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। সদর দরজার ছিটকিনিটা এমনভাবে খুলল যাতে বিন্দুমাত্র শব্দ না হয়। ​বাইরে বেরোতেই ঝিরঝিরে ঠাণ্ডা হাওয়া তার মুখে এসে লাগল। গ্যারেজের এক কোণায় শাহরুখের কালো এসইউভি গাড়িটা রাখা। সুমু চাবি দিয়ে গাড়িটা স্টার্ট দিল খুব ধীর গতিতে।

​গাড়িটা শেখ বাড়ির ফটক পার হয়ে মেইন রোডের দিকে মোড় নিল, সুমু লুকিং গ্লাসে একবার তার ফেলে আসা বাড়ির দিকে তাকাল। সেখানে তার মা, বাবা আর কলিজার টুকরো দুটো শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। সে বিড়বিড় করে বলল,

“খান সাহেব, তৈরি থাকুন। আপনার সুইটহার্ট আসছে আপনাকে আবারও তার মায়ায় বন্দী করতে।”

​•

সেগুন কাঠের ভারী টেবিলের দুই প্রান্তে দুজন শিকারি যেন একে অপরের শক্তি পরিমাপ করছে। ঘরের আলোটা মৃদু হলেও আবহাওয়াটা এখন বরফশীতল। সুমু তার কুচকুচে কালো শাড়ির আঁচলটা সুন্দর করে গুছিয়ে নিয়ে পেশাদার ভঙ্গিতে বসে আছে। তার চোখের চাহনিটা তীরের মতো তীক্ষ্ণ।

শেরাজ তার দুই হাতের আঙুলগুলো একের ভেতর অন্যটি ঢুকিয়ে টেবিলের ওপর রাখল। তার পেশীবহুল শরীরটা চেয়ারে হেলান দেওয়া। সে একবার সুমুর চোখের দিকে তাকাল, তারপর খুব দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। কেন জানি না, এই নারীটির চোখের দিকে তাকালে তার মস্তিস্কের ভেতরে একটা শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছে, যা আগে কখনো হয়নি।

​স্যান্ডি ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে পাথরের মতো দেখছে। তার ভেতরটা রীতিমতো কাঁপছে। ওমানের সেই রয়্যাল দম্পতি আজ পাঁচ বছর পর আবারও মুখোমুখি, কিন্তু একজন অন্যজনকে চেনে না।

​শেরাজ গম্ভীর গলায় কথা শুরু করল,

“দেখুন মিসেস... দুঃখিত, আপনার নামটা আমার জানা হয়নি। স্যান্ডি শুধু বলেছে ওমান থেকে একজন ইনফ্লুয়েনশিয়াল ইনভেস্টর এসেছেন। তো, আপনার অফারটা কী? সরাসরি পয়েন্টে কথা বলাই ভালো, আমি অকারণ গল্প একদম পছন্দ করি না।”

​সুমু একটু হাসল। সেই হাসিতে খেয়ালীপনা, যেন সে সামনে থাকা মানুষটার কঠোরতা দেখে বেশ মজা পাচ্ছে। সে তার ব্যাগ থেকে একটা ফাইল বের করে শেরাজের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

“বিজনেসে মানুষ শুধু পয়েন্ট খোঁজে মিস্টার এস.কে, কিন্তু আমি খুঁজি বিশ্বাস। ওমানে বসে আমি আপনার পুরোনো প্রজেক্টগুলো স্টাডি করেছি। আপনার কাজের ধরন বড্ড একগুঁয়ে, অনেকটা একরোখা বাজিগরের মতো।”

শেরাজ ভ্রু কুঁচকাল। ফাইলটা না খুলেই বলল,

“বাজিগর? বিজনেস কি আপনার কাছে জুয়া খেলা মনে হয়?”

​সুমু চেয়ারে একটু এগিয়ে এসে বসল। তার চোখের মণি তখন শেরাজের চোখের মণির ওপর স্থির। সে মখমলের মতো মোলায়েম সুরে বলল,

“সব বিজনেসই তো আসলে এক ধরণের বাজি, খান সাহেব। কেউ টাকা বাজি রাখে, আর কেউ রাখে তার অস্তিত্ব। ওমানের সেই রাজত্ব থেকে আপনি আজ বাংলাদেশের এই ছোট্ট শহরে— এটাও কি একটা বাজি নয়?”

​শেরাজ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ‘খান সাহেব’ সম্বোধনটা যখন সুমুর ঠোঁট থেকে বের হলো, তখন শেরাজের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে হাতের কলমটা শক্ত করে ধরল। কেন যেন মনে হলো, এই নারীর কথা বলার ভঙ্গি, তার বসার স্টাইল—সবই তার খুব চেনা।

স্যান্ডি দেখল শেরাজের কপালে এক বিন্দু ঘাম জমেছে। সে জানে, সুমু এখন দাবার চালটা খুব সূক্ষ্মভাবে দিচ্ছে।

​শেরাজ নিজেকে সামলে নিয়ে ফাইলটা খুলল। পাতার পর পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলল,

“আপনার দেওয়া ডিলটা লজিক্যাল। ফিফটি-ফিফটি শেয়ারে জয়েন্ট ভেঞ্চার করা সম্ভব। কিন্তু আপনি কি শুধু প্রফিটের আশায় এসেছেন? কারণ ওমান থেকে বাংলাদেশে এসে ইনভেস্ট করার কোনো যৌক্তিক কারণ আমি দেখছি না।”

সুমু তার পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা খোলা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে নিয়ে খুব আলতোভাবে বলল,

“মানুষ সবসময় লজিক দিয়ে চলে না মিস্টার এস.কে। মাঝে মাঝে কিছু হারিয়ে যাওয়া জিনিস উদ্ধার করতেও মানুষকে সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে হয়। আমি শুধু বিজনেসের মুনাফা নিতে আসিনি, আমি এসেছি এমন এক পার্টনারের খোঁজে—যাকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়।”

শেরাজ ফাইলের দিকে তাকিয়ে থেকেও যেন কিছু দেখছে না। তার চোখের সামনে বারবার সুমুর সেই মায়াবী চোখ দুটো ভেসে উঠছে। সে ফাইলটা সশব্দে বন্ধ করে দিয়ে সুমুর দিকে সোজা হয়ে তাকাল।

​“আপনি খুব চমৎকারভাবে কথা বলেন, ম‍্যাম। কিন্তু মনে রাখবেন, বিজনেস টেবিলে আমি আবেগপ্রবণ হই না। আপনার ডিলটা আমি কনসিডার করব। তবে...”

​সুমু মাঝপথেই কথা কেড়ে নিল। সে দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল,

“তবে কি? আপনি কি আমাকে পরখ করতে চান? মনে রাখবেন মিস্টার, আপনি যাকে পরখ করতে চাইছেন, সে আপনার পুরো রাজত্বটা নিজের হাতের তালুর মতো চেনে। ডিলটা সই হবে কি হবে না, সেটা আপনার ওপর নয়—আমার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।”

সুমু আবারও বসে পড়ল। শেরাজ বাঁকা হেসে খুব মন দিয়ে ফাইলের একটা ক্লজ পড়তে শুরু করল। সুমু বিরক্ত হয়ে গেল। সে হঠাৎ খুব নিচু স্বরে বলল,

​“এক মিনিট মিস্টার এস.কে! আপনার গালে কিছু একটা লেগে আছে।”

শেরাজ থমকে গেল। অত্যন্ত সচেতন এই মানুষটি নিজের পরিপাটি থাকা নিয়ে সব সময় খুঁতখুঁতে। সে ভ্রু কুঁচকে ফাইল থেকে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন,

“কী? কোথায়?”

​সে নিজের হাত দিয়ে গালটা ঘষার চেষ্টা করতেই সুমু ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটে উঠল। খুব সাবলীল ভঙ্গিতে সে বলল,

“আরে ওটা মুছলে কি আর যাবে? ওটা তো আপনার জন্মগত কিউটনেস। ওটা মুছার সাধ্য আপনার নেই।”

​শেরাজের হাতের গতি স্তব্ধ হয়ে গেল। কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা স্যান্ডি বিষম খাওয়ার উপক্রম করল। সে ভাবতেই পারেনি পাঁচবছরের আগে দেখা ওমানের সেই রাশভারী সুমু এখানে এসে এমনভাবে ফ্লার্ট করবে।

​শেরাজের মুখভঙ্গি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল। তার পৌরুষে যেন কিছুটা আঘাত লাগল। সে চেয়ারটা সামান্য পিছিয়ে নিয়ে সুমুর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

“ম্যাম! আপনি কি এখানে বিজনেস ডিল করতে এসেছেন নাকি বাকি নারীদের মতো আমাকে অ্যাপ্রোচ করতে? মনে রাখবেন, এই ডেস্কে বসে আমি অসভ্যতা একদম পছন্দ করি না।”

​শেরাজের মুখে বাকি নারী শব্দটা শুনে সুমুর বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠল। সে নিজেকে সামলে মনে মনে সে এক চিলতে রাগ নিয়ে বলল,

“বড় এসেছেন নীতিবান পুরুষ। অন্য কোনো মেয়ে হলে তো এতক্ষণে গলে জল হয়ে যেতেন। আর কত মেয়ে যে আপনাকে এভাবে পটানোর চেষ্টা করে কে জানে।”

​শেরাজকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সুমু আবারও সেই মায়াবী হাসিটা ঠোঁটে টেনে বলল,

“না মিস্টার এস.কে, আপনি ভুল বুঝছেন। আমি আসলে হ্যান্ডসাম পুরুষদের প্রশংসা করতে জানি, এটা আমার একটা স্বভাব। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো—আপনি জানেন না।”

​শেরাজ কিছুটা কৌতূহলী হলো, “কী জানি না আমি?”

“সুন্দরী মেয়েদের প্রশংসা করতে জানেন না। আপনার সামনে একজন গর্জিয়াস লেডি বসে আছে, আর আপনি কিনা তাকে অ্যাপ্রোচ করার অপবাদ দিচ্ছেন? আপনার এই নিরামিষ ব্যবহার তো বিজনেসের জন্য মোটেও ভালো নয়।”

​শেরাজ হালকা ব্যঙ্গাত্মক হাসল। তার সেই চেনা বাঁকা হাসিটা দেখে সুমুর কলিজাটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। শেরাজ ফাইলটা একপাশে ঠেলে দিয়ে বলল,

“প্রশংসা দিয়ে পেট ভরে না, ম্যাম। কাজের কথায় আসি—দিনের আলো থাকতে এই গভীর নাইটে মিটিং ডাকার কারণটা কী? বিজনেস মিটিং কি দিনের আলোয় করা যেত না?”

​“অন্ধকারে মানুষকে আমি খুব ভালো চিনতে পারি, মিস্টার এস.কে। দিনের আলোয় তো সবাই মুখোশ পরে ঘোরে, কিন্তু অন্ধকারের নির্জনতায় মানুষের আসল সত্তাটা বেরিয়ে আসে। তাছাড়া...” সে একটু থামল, তারপর ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল, “অন্ধকার আমার খুব পছন্দের। নাউ, সাইনটা করে দিন।”

শেরাজ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এই নারীর প্রতিটি শব্দ তার অবচেতন মনে তপ্ত সীসার মতো বিঁধছে। তার মনে হচ্ছে, এই অন্ধকার কনফারেন্স রুমে তিনি নন, বরং এই মায়াবী নারীটিই সব নিয়ন্ত্রণ করছে।

​স্যান্ডি ঘড়ির দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারছে, সুমু আজ রাতের জন্য তার কাজ করে দিচ্ছে। এগুলোই আজ রাতে তার স‍্যারের মস্তিস্কে ঝড় তুলবে।

শেরাজ এখনো স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইল। একজন নারী তার সামনে দাঁড়িয়ে তাকেই চ‍্যালেঞ্জ দিচ্ছে? অথচ তার রাগ হচ্ছে না, বরং মনে হচ্ছে এই নারীটির সামনে সে কত ছোট। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে একটু গম্ভীর হলো। সে টেবিলের ওপর রাখা ড্রাফট পেপারটার দিকে একবার তাকিয়ে সুমুর দিকে চোখ ফিরিয়ে গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে বেশ কাটখাট্টা গলায় বলল,

“ম্যাম, এই কনট্রাক্টটা অনেক বড়। এর প্রতিটি ক্লজ না বুঝে আমি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যেতে পারছি না। আমি এখনই এটা সই করছি না। আমার একটু সময় প্রয়োজন। আমি এ বিষয়ে পরে ভেবে আপনাকে জানাব, তারপর দিনের কোনো এক সময়ে মিটিং রেখে আমরা সাইন করার ব্যবস্থা করব।”

​শেরাজের এই পেশাদার দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা দেখে সুমু ভেতরে ভেতরে একটু হাসল। তার সেই খেয়ালী মনটা যেন আরও জেদি হয়ে উঠল। সে চেয়ার থেকে ওঠার উপক্রম করেও আবার একটু ঝুঁকে বসল।

“দিনকাল তো খুব খারাপ মিস্টার এস.কে। অনেক সময় পরের জন্য কিছু ফেলে রাখলে সেটা হাতছাড়া হয়ে যায়। দিনের আলোয় তো সবাই কাগজপত্রে সাইন করে, সেটা তো খুব সাধারণ।”

​শেরাজ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

“তাহলে আপনি কী চান?”

​সুমু কণ্ঠস্বরটা আরও খাদে নামিয়ে আনলো,

“সাইনটা যে এই বিজনেস কনট্রাক্ট পেপারেই করতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। আপনার যদি খুব ইচ্ছে হয়, তবে আপনি চাইলে রেজিস্ট্রি পেপারেও সাইন করতে পারেন। আমার কিন্তু কোনো আপত্তি নেই।”

​কথাটা বলেই সুমু নিজের চোখের পলক একবার মায়াবী ভঙ্গিতে ফেলে শেরাজের প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।

​ঘরের কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা স্যান্ডি যেন স্তম্ভিত। সে মনে মনে ভাবল, “সর্বনাশ! ম‍্যাম তো ডিরেক্ট বিয়ের প্রস্তাবের ইঙ্গিত দিয়ে দিল। এই স্মৃতিভ্রষ্ট বাঘের সামনে দাঁড়িয়ে এতো সাহস কোথায় পায়?”

​শেরাজ কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলল। রেজিস্ট্রি পেপার শব্দটা তার কানে গিয়ে বাজার পর তার হৃৎপিণ্ডটা এক লাফে কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। একজন বড় মাপের ইনভেস্টরের প্রথম মিটিংয়েই এমন দুর্ধর্ষ রসিকতা—নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গভীর ইঙ্গিত আছে?

​শেরাজ নিজেকে কিছুটা শক্ত করে বলল,

“রেজিস্ট্রি পেপার? আপনি কি রসিকতা করছেন মিসেস...?”

“রসিকতা কি না, সেটা না হয় সময়ের ওপর ছেড়ে দিলাম। তবে মনে রাখবেন, আমি একবার কোনো পেপারে সাইন করালে সেখান থেকে ফিরে আসার রাস্তা আমি নিজেই বন্ধ করে দিই। আপনার সেই সাহস আছে তো?”

শেরাজের কপালে চিন্তার ভাজ গভীর হলো। তার ভেতরের সেই কঠোর ডিসিপ্লিনড সত্তাটা যেন ফুঁসে উঠল। সে চেয়ার ছেড়ে সশব্দে উঠে দাঁড়াল। কক্ষের তাপমাত্রা যেন কয়েক ডিগ্রি নেমে গেল মুহূর্তেই। সে স্থির দৃষ্টিতে সুমুর দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল,

“ম্যাম, আপনি অসভ্যতা করছেন।”

সুমু যে এই প্রতিক্রিয়ার জন্য তৈরি ছিল না, তা নয়। তবে শেরাজের এই অসভ্যতা শব্দটা তার কানে গিয়ে একদম তীরের মতো বিঁধল। অথচ সে ঘাবড়াল না। বরং খুব ধীরস্থিরভাবে বলল,

​“অসভ্যতা? আমার কথাগুলো কি আপনার কাছে খুব বেশি অশোভন মনে হলো মিস্টার এস.কে? নাকি আপনি নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে ঢাকতে আমাকে এই অপবাদ দিচ্ছেন?”

“বিজনেস ডিল নিয়ে কথা বলতে এসে আপনি রেজিস্ট্রি পেপারের অফার দিচ্ছেন। এটাকে আপনি আর কী বলবেন? আপনি কি সব পুরুষকেই এভাবে হ্যান্ডেল করেন?”

​“সব পুরুষের জন্য তো আর এই সুমু কালো শাড়ি পরে আসে না, মিস্টার। আর রেজিস্ট্রি পেপারের কথা শুনে আপনার এত রাগ কেন হচ্ছে? একজন সুন্দরী নারী যদি আপনাকে আপনার অজান্তেই কোনো অধিকার দিতে চায়, সেটা কি আপনার কাছে অসভ্যতা মনে হয়?”

​শেরাজ তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে স্যান্ডির দিকে তাকাল, যেন সাহায্য খুঁজছে। তারপর আবার সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি অধিকার বা মায়া—কোনোটাতেই বিশ্বাসী নই। আমি শুধু কাগজ আর কলম চিনি। আপনার সাথে আমার পরিচয় মাত্র আধঘণ্টার। এই স্বল্প সময়ে আপনি যা করছেন, তা একজন ডিগনিফাইড বিজনেসওম্যানের সাথে যায় না।”

​সুমু তার এক হাত টেবিলের ওপর রেখে শেরাজের চোখের দিকে খুব গভীরে তাকিয়ে বলল,

“কীসের বিজনেস ডিল মিস্টার এস.কে? এই কাগজের টুকরোগুলো তো যেকোনো সময় ছিঁড়ে ফেলা যায়। আসল কথা বলি—আপনাকে না আমার বড্ড ভালো লেগে গেছে। আপনি মানুষটা বড্ড বেশি সুন্দর।”

​শেরাজ কিছু বলতে যাবে, তার আগেই সুমু তাকে থামিয়ে দিয়ে একদম নিচু স্বরে বলল,

“সোজা কথায় আসি—বিয়ে করবেন কি না বলুন? কারণ আমি ভাবছি আপনাকে আমি আর হাতছাড়া করব না।”

​ “হোয়াট? আর ইউ ক্রেজি?”

“আরে শোনেনই না! আমাকে বিয়ে করলে কিন্তু আপনার লাভই লাভ। কারণ আমাকে বিয়ে করলে আমার সাথে আরও কিছু জিনিস আপনি ফ্রি পাবেন। ওটাকে কী বলে আপনাদের বিজনেসের ভাষায়? ওহ হ্যাঁ, বোনাস।”

​শেরাজ পুরো হতভম্ব। স্যান্ডি দেওয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিজের হাসি চাপার চেষ্টা করছে। শেরাজ রাগী চোখে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,

“কীসের ফ্রি?”

​ “আমাকে বিয়ে করলে সাথে দুটো বাচ্চাও পাবেন। মানে সুন্দরী বউয়ের সাথে দুটো কিউট বেবি একদম ফ্রি। আপনাকে আর কষ্ট করে বেবি নেওয়ার ঝামেলার মধ্য দিয়ে যেতে হবে না। সব একদম রেডিমেড তৈরি আছে। বলুন, এমন লাভজনক অফার আর কেউ দেবে আপনাকে?”

​ “আপনি... আপনি কি আজ কোনো ড্রাগস নিয়ে এখানে এসেছেন? নাকি কোনো সস্তা সিনেমার স্ক্রিপ্ট আমাকে শোনাচ্ছেন? আপনি নিজের বাচ্চাদের কাউকে ফ্রি দেওয়ার কথা বলছেন?”

“অফারটা তো খারাপ না। ভেবে দেখবেন। আমার বেবিরা কিন্তু দেখতে একদম আপনার মতোই—জেদি, একরোখা আর ঠিক আপনার মতোই কিউট।”

​শেরাজ স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,

“স্যান্ডি! এই পাগল মহিলাকে এখনই এখান থেকে নিয়ে যাও। সি ইজ ড্যাঞ্জারাস।”

সুমু এবার তার চূড়ান্ত চালটি চালল। সে ধীরস্থিরভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সুমু চলে যাবে ভেবে শেরাজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। কিন্তু তার ভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করে সুমু সরাসরি শেরাজের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শেরাজ তার কঠোর ভঙ্গি বজায় রাখার চেষ্টা করলেও সুমুর এই আকস্মিক পদক্ষেপে কিছুটা হকচকিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

​সুমু শেরাজের বসার চেয়ারের হাতল ধরে তাকে নিয়ে দিয়ে ঘুরিয়ে দুই হাতলে নিজের হাত রেখে তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। তার লম্বা, সিল্কি চুলগুলো পিঠ থেকে আলগা হয়ে শেরাজের মুখের সামনে ঝুলে পড়ল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সুমুর চুলের সেই চিরাচরিত ঘ্রাণ শেরাজের নাসারন্ধ্রে গিয়ে এক প্রবল আঘাত হানল।

​শেরাজ যেন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাল। এক অদৃশ্য মোহে আচ্ছন্ন হয়ে সে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। তারপর দীর্ঘ এক প্রশ্বাসে সুমুর চুলের ঘ্রাণ বুক ভরে টেনে নিল। শেরাজের এই অবস্থা দেখে সুমুর মনের পর্দায় স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে পাঁচ বছর আগের সময়গুলো ভেসে উঠল। শেরাজ যখন তার সেই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী খান সাহেব ছিল, তখন তার চুলের ঘ্রাণ নেওয়া ছিল শেরাজের সবচেয়ে প্রিয় এবং অবাধ্য এক অভ্যাস। মস্তিস্ক হয়তো স্মৃতিগুলো ধুয়ে মুছে দিয়েছে, কিন্তু শরীরের কোষগুলো যেন আজও সেই পুরনো অভ্যাস ভোলেনি।

শেরাজ আবারও চোখ মেলে তাকাল, তার দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত ঘোর। সুমু ভ্রু নাচিয়ে খুব শান্ত স্বরে বলল,

“আপনি কি জানেন মিস্টার এস.কে, আমাদের দুজনের মধ্যে একটা জায়গায় অনেক মিল আছে?”

​শেরাজ তখনো সুমুর চুলের ঘ্রাণের রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সে সম্মোহিতের মতো ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,

“কীসের মিল?”

“বলছি! তার আগে বলুন তো, আপনি কি নিজেকে ভালোবাসেন?”

“অবশ‍্যই বাসি!”

​সুমু তার একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“মিলটা হলো, আপনিও নিজেকে ভালোবাসেন, আর আমিও আপনাকে ভালোবাসি। তার মানে কী দাঁড়াল? আমরা দুজনেই একটি মানুষকে ভালোবাসি।”

কথাটা বলেই সুমু সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে বিজয়ী বাঘিনীর মতো বাঁকা হাসি। শেরাজ পাথর হয়ে নিজের চেয়ারে বসে রইলেন। ‘আমরা দুজনেই একই মানুষকে ভালোবাসি’—এই বাক্যটি তার মস্তিস্কের প্রতিটি তন্ত্রীতে এক তীব্র ঝঙ্কার তুলল। সে বুঝতে পারছে না, এই নারী তাকে ধ্বংস করতে এসেছে নাকি বিজনেস করতে।

কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা স্যান্ডি দেখল, শেরাজের হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে। সে মনে মনে ভাবল, “অভ্যাস কোনোদিনও ভুলে যাওয়া যায় না, স‍্যার। আপনি যতই নিজেকে নতুন মানুষ ভাবুন না কেন, আমার ম‍্যামের মায়ার কাছে আপনাকে বার বার হার মানতেই হবে।”

সুমু তার ব্যাগটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বলল,

“আজকের জন্য এইটুকুই। ডিলের বাকি কথা না হয় কোনো এক আলো-ছায়ার বিকেলে হবে। ভালো থাকবেন, মিস্টার কিউট!”

স্যান্ডি এগিয়ে এসে দরজার পাল্লা খুলে দিল। সুমু চলে যাওয়ার সময় আবারও একবার শেরাজের দিকে তাকাল। সে জানে, আজকের রাতের জন্য এইটুকুই যথেষ্ট। শেরাজকে সে এক বিশাল গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে বের হওয়ার একমাত্র চাবিকাঠি হলো ভালোবাসা।

শেরাজ উঠে দাঁড়িয়েও ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। তার বুকটা প্রবলভাবে ওঠানামা করছে। হার্টবিট তখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। স্যান্ডি এগিয়ে এসে গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে ভাবল—আগামীকাল সকালে এই বাড়িতে যে প্রলয় আসতে যাচ্ছে, তার জন্য হয়তো কোনো সাইক্লোন শেল্টারও যথেষ্ট হবে না। শেরাজ স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে বলল,

“স্যান্ডি, এই মহিলা কে? উনি কেন আমাকে খান সাহেব বলে ডাকছিল? আর ওনার গায়ের পারফিউমটা... ওটা কেন আমার এতো চেনা লাগছে?”

​স্যান্ডি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলল,

“স‍্যার, পৃথিবীতে কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর না পেলেই বোধহয় জীবনটা রহস্যময় হয়। উনি আপনার নতুন পার্টনার, এটুকুই জেনে রাখুন।”

​বাইরে গাড়িতে উঠে সুমু চোখ বুজল। তার শরীরটা কাঁপছে। সে জানে, আজকের রাতের এই আলাপটুকু শেরাজ খানকে সারা রাত এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাতে দেবে না। তার হারানো খান সাহেবকে ফিরে পাওয়ার লড়াইটা ঠিক এখান থেকেই শুরু হলো। সে মনে মনে বলল,

“খুব শীঘ্রই আপনার মস্তিস্ক হার মানবে, খান সাহেব। আপনার সুইটহার্ট ফিরে এসেছে।”

​স্যান্ডি ফাইলটা হাতে নিল। শেরাজ চেয়ারে হেলান দিয়ে কপালে হাত রাখল। তার মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে আবারও বেরিয়ে এলো,

“স্যান্ডি, এই মেয়েটা কি পাগল? নাকি উনি আমাকে পাগল করার জন্য এসেছে? উনি রেজিস্ট্রি পেপারের কথা কেন বলল?”

​ “স‍্যার, সব সই কলম দিয়ে হয় না, কিছু সই ভাগ্য দিয়েও হয়। তাছাড় ম‍্যাম কিন্তু অনেক সুন্দরী। আপনার জন‍্য একদম পারফেক্ট। দারুণ মানাবে আপনাদের।”

স্যান্ডির এই অপ্রত্যাশিত মন্তব্যে শেরাজ যেন আকাশ থেকে পড়ল। কনফারেন্স রুমের সেই গুমোট করা নিস্তব্ধতায় স্যান্ডির কথাগুলো যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢেলে দিল। শেরাজ তার টেবিলের ওপর রাখা একটা ভারি পেপারওয়েট সজোরে চেপে ধরল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো, কপালে ধপধপ করছে রাগের শিরা। সে স্থির দৃষ্টিতে স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“স্যান্ডি! তুমিও কি ওই পাগল মেয়েটার সাথে হাত মিলিয়েছ? উনি আমার ফেসভ্যালু নিয়ে মজা করল, আমাকে বিয়ে করার মতো ধৃষ্টতা দেখাল, এমনকি বাচ্চা পর্যন্ত ফ্রি দিতে চাইল—আর তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওনার রূপের প্রশংসা করছ?”

​স্যান্ডি একটুও বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। সে মেঝের দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসল, তারপর খুব শান্ত স্বরে বলল,

“স‍্যার, রাগ করবেন না। আমি শুধু একটা সত্যি কথা বললাম। আপনি ওনাকে পাগল বলুন আর যাই বলুন—ম্যাম কিন্তু আসলেই বেশ সুন্দরী। শুধু সুন্দরী বললে ভুল হবে, ওনার মধ্যে এমন এক ধরণের আভিজাত্য আর তেজ আছে, যা আমি আগে কোনো বিজনেসওম্যানের মধ্যে দেখিনি।”

​স্যান্ডি একটু থেমে শেরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে আবারও বলল,

“আর আপনি কি একবারও খেয়াল করেছেন স‍্যার? উনি যখন আপনার দিকে তাকিয়ে ‘খান সাহেব’ বলে ডাকছিলেন, তখন আপনার নিজের অবস্থাও খুব একটা স্বাভাবিক ছিল না। আপনিও কিন্তু ওনার চোখের মায়া থেকে নিজেকে সরাতে পারছিলেন না।”

​শেরাজ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। স্যান্ডির কথাগুলো তীরের মতো তার বুকের একদম গভীরে গিয়ে বিঁধল। সত্যিই তো, মেয়েটা যখন কাছে এসেছিল, তখন তার সেই পারফিউমের তীব্র ঘ্রাণ আর চোখের ওই মায়াবী চাহনি তার মস্তিস্কের কোনো এক অন্ধকার কোণায় হাহাকার তুলেছিল। কিন্তু নিজের দম্ভ আর বর্তমান পরিচয়ের খাতিরে সে সেটা স্বীকার করতে পারছে না।

শেরাজ সজোরে টেবিল চাপড়ে বলল,

“থামাও তোমার এই বাজে বকবক। উনি সুন্দরী নাকি কুৎসিত তা দিয়ে আমার কোনো কিছু যায় আসে না। আমি শুধু জানি, উনি আমার বিজনেস প্রোটোকল ভেঙেছে। আর কাল উনি যদি সত্যিই ওনার ওই তথাকথিত ফ্রি গিফট মানে বাচ্চাদের নিয়ে আমার বাড়িতে আসে, তবে আমি ওনাকে পুলিশের হাতে তুলে দেব।”

​স্যান্ডি এবার একটু বাঁকা হাসল। সে মনে মনে ভাবল, “পুলিশের হাতে তুলে দেবেন? নিজের কলিজার টুকরোদের সামনে দাঁড়ানোর পর আপনি নিজেকেই সামলাতে পারবেন না, পুলিশ তো দূরের কথা।” সে মুখে শুধু বলল,

“ঠিক আছে স‍্যার! রাত অনেক হয়েছে, আপনার বিশ্রামের প্রয়োজন। আমি ফাইলগুলো নিয়ে নিচ্ছি।”

শেরাজ আর কোনো কথা বলল না। সে বড় বড় পা ফেলে কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে নিজের বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু সুমুর সেই কথা আর তার চোখের চাহনি তাকে এক মুহূর্তের জন্যও স্থির হতে দিচ্ছে না।

​পুরো বাংলো যখন নিস্তব্ধ, শেরাজ তখন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শহরের অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার কানে অনবরত বাজছে সুমুর সেই খামখেয়ালি কণ্ঠ— ‘আমাকে বিয়ে করলে দুটো বাচ্চা ফ্রি পাবেন’।

​শেরাজ নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলল,

“কে এই মেয়ে? কেন ওনাকে দেখে আমার ভেতরে এক অদ্ভুত দহন শুরু হলো? কেন মনে হচ্ছে ওই কালো শাড়িটা উনি শুধু আমার জন্যই পরে এসেছিলেন?”

চলবে..?

#খান_সাহেব

#সুমাইয়া_জাহান

#পর্ব_88. ✦ বর্ধিতাংশ ✦

​ভোরের মিষ্টি রোদ বাড়ির জানালার কাচ ছুঁয়ে সুমুর মুখে এসে পড়তেই এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে তার ঘুম ভাঙল। শেরাজের বাংলো থেকে ফিরে এসে তার শরীর ক্লান্তি আর মনের জেদের কাছে নতি স্বীকার করেছিল।

​

আজ বাড়িটার মেজাজ একদম আলাদা। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা পিঠার সুঘ্রাণ আর বারান্দায় বাচ্চাদের ছুটোছুটির শব্দে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে দীর্ঘদিনের নিঝুম এ বাড়িটি। খবর এসেছে, বিকেলে ইফতিয়ারা আর রাইশারাও এখানে পৌঁছাবে। পুরো পরিবার যেন এক বিশাল মিলনমেলার অপেক্ষায় অধীর হয়ে আছে।

​

সুমু সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছিল, তার পরনে সাধারণ এক সুতির সালোয়ার কামিজ। ড্রয়িংরুমে পৌঁছাতেই সারবাজ আর আইয়ুব তাকে দেখে প্রায় দৌড়ে এলো। সুমু কিছু বোঝার আগেই তারা তাকে ঘিরে ধরল। সুমু কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হাসল।

​সারবাজ অস্থির হয়ে আইয়ুবের দিকে তাকাল, তারপর সরাসরি সুমুর চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু কিন্তু উৎসুক কণ্ঠে বলল,

“কাল রাতে কী হলো সুমু? দেখা হয়েছিল এস.কে-র সাথে?” সে ঠোঁট টিপে হেসে বলল, “ডিলটা কি সত্যিই এগোলো নাকি শুধুই ছাইপাঁশ আলাপ হলো?”

​

আইয়ুবও পাশ থেকে চোখ বড় বড় করে বলল,

“আরে রাখ তো ডিল! শেরাজার রিয়্যাকশন কী ছিল, ভাবিজি? ও কি একবারও আপনার খান সাহেব হয়ে উঠেছিল নাকি এখনো সেই কাঠখোট্টা এস.কে হয়েই বসে আছে?”

​

সুমুর চোখের সামনে কাল রাতের সেই কনফারেন্স রুমের দৃশ্যগুলো চলচ্চিত্রের মতো ভেসে উঠল—শেরাজের সেই চুলের ঘ্রাণ নেওয়া, রেজিস্ট্রি পেপারের কথা শুনে থমকে যাওয়া, আর তাকে অসভ্য বলা। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,

​“খান সাহেবের মস্তিস্ক এখনো স্মৃতিদের সাথে আড়ি করে বসে আছে, ভাইয়া। কিন্তু ওনার আত্মা আর শরীরের কোষগুলো ঠিকই আমাকে চিনে নিতে শুরু করেছে। উনি আমাকে অসভ্য বলেছেন, পাগল বলেছেন, এমনকি পুলিশের ভয়ও দেখিয়েছেন—কিন্তু দিনশেষে আমার মায়া থেকে নিজেকে সরাতে পারেননি।”

​সারবাজ আর আইয়ুব একে অপরের দিকে অর্থবহ দৃষ্টিতে তাকাল। সুমু আলতো করে হেসে বলল,

“আজ সকালে ঝড়টা আরও জোরালো হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সিমরান আর শেরানকে আজ ওনার সামনে নিয়ে যাব। ওনার সেই পাষাণ হৃদয়ের দেয়াল ভাঙার জন্য আমার এই দুই সৈন্যই যথেষ্ট।”

​ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে বাচ্চাদের নামার শব্দ পাওয়া গেল। সিমরান আর শেরানকে আজ খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। সিমরানকে আজ একটি আফগান পশতুন ফ্রক পরানো হয়েছে। ফ্রকটি লাল আর গোলাপি রঙের মিশেলে তৈরি, যার হাতাগুলো অনেক ঘেরওয়ালা এবং ঝুলের অংশে সুন্দর এমব্রয়ডারি করা। ড্রেসটির বুকের অংশে নীল, সবুজ আর হলুদ সুতোর কাজ করা। তার লম্বা সিল্কি চুলগুলো আধখোলা অবস্থায় পিঠের ওপর ঢেউ খেলছে, আর কপালে পরেছে একটি সুন্দর নকশা করা টিকলি। ঠিক যেন ছোট এক রাজকুমারী, যার প্রতিটি চাহনিতে তার বাবা শেরাজ খানের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টির ছোঁয়া।

​সুমু নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,

“স্মৃতির দুয়ার যদি বন্ধই থাকে খান সাহেব, তবে আজ রক্তের টান সেই দুয়ারে কড়া নাড়বে। দেখা যাক, নিজের প্রতিচ্ছবিকে দেখেও আপনি নিজেকে অস্বীকার করতে পারেন কি না।”

বাড়ির বিশাল ডাইনিং টেবিলটা আজ যেন কানায় কানায় পূর্ণ। অনেক বছর পর এই বাড়িতে এত মানুষের সমাগম। হাসি বেগম, সুমি বেগম আর রুমা বেগম ব্যস্ত হাতে গরম গরম পরোটা আর ভুনা মাংস টেবিলে সাজাচ্ছেন।

​ব্রেকফাস্টের এই সময়ে সবাই যখন টেবিলে বসল, সুমু দেখল পুরো পরিবারটা যেন এক সুতোয় বাঁধা। মাঝখানে বসেছেন শামীম সাহেব, সাখাওয়াত সাহেব আর মুক্তাক সিকদার। তাদের চোখেমুখে তৃপ্তির ছাপ, যদিও সুমুর জন্য সকলের মনের কোণে একটা সূক্ষ্ম হাহাকার এখনো রয়ে গেছে।

​সিমরান আর শেরানকে ঘিরে বসেছে হাসফা, আহিয়া আর রুহি। ছোটদের এই আলাদা এক জগত। শেরান খুব গম্ভীর মুখে পরোটার টুকরো মুখে দিচ্ছে, ঠিক যেভাবে শেরাজ খান খুব ডিসিপ্লিন মেনে খাবার খেত। শামীম সাহেব অপলক চোখে নাতির খাওয়া দেখছেন। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাখাওয়াত সাহেবকে বললেন,

“দেখছ বড় ভাই, মেয়েটা বাবার চেহারা পেয়েছে আর ছেলেটা স্বভাব।”

​অন‍্যদিকে পিয়াস এক কোণায় বসে নিরবে খাবার নাড়াচাড়া করছে। তার চোখ মাঝে মাঝেই চলে যাচ্ছে টেবিলের ওপাশে থাকা সামিয়ার দিকে, যে পরম মমতায় হাসফাকে খাইয়ে দিচ্ছে। পিয়াসের খাওয়া যেন গলায় আটকে যাচ্ছে। সামিয়ার এই মাতৃত্বপূর্ণ রূপ তাকে এক লহমায় আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, আবার এক অদ্ভুত মায়ায় বেঁধেও ফেলছে।

​সারবাজ সুমুর পাশে বসে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“সুমু, তুমি কি সত্যিই আজ সিমরান আর শেরানকে নিয়ে যাবে? এস.কে যদি হিতে বিপরীত কিছু করে ফেলে?”

​সুমু ধীরস্থিরভাবে কফির কাপে চুমুক দিল। তার চাহনি এখন অনেক বেশি স্থির। সে শান্ত গলায় উত্তর দিল,

“হৃদপিণ্ডের সাথে যুদ্ধ করা যায় ভাইয়া, কিন্তু নিজের প্রতিবিম্বের সাথে নয়। সিমরান যখন ওনার সামনে দাঁড়াবে, তখন মিস্টার এস.কে তার নিজের অতীতকে অস্বীকার করার শক্তি হারিয়ে ফেলবেন। আমি তো যাবই, স্যান্ডি ভাইয়াকেও রেডি থাকতে বলেছি।”

​ঠিক তখনই নাতাশা এক বাটি মিষ্টি নিয়ে সুমুর পাশে এসে বসল।

“ম্যাম, আপনি ফিরে এসেছেন এটাই আমাদের কাছে ঈদ। এখন থেকে শুধু আনন্দ করার দিন”

​সুমু হাসল। ব্রেকফাস্ট শেষ হতেই বাড়ির বড়রা চা নিয়ে আড্ডায় মজে উঠলেন। বাচ্চারা আবারও ড্রয়িংরুমের সেই বলটা নিয়ে খেলতে লাগল।

​

সুমু উঠে দাঁড়িয়ে সিমরান আর শেরানের কাছে গিয়ে নিচু হয়ে বসল। পরম মমতায় তাদের চুলগুলো ঠিক করে দিয়ে বলল,

“আমার মাম্মারা, আজ আমরা একটা বিশেষ মানুষের কাছে যাব। তোমরা কি তৈরি?”

​

সিমরান তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সুমুর চোখে রেখে বলল,

“মাম্মা, আমলা তি আমাদেল হিনো পাপার তাতে যাত্তি?”

​

সুমু এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বাচ্চাদের এই সহজ প্রশ্নটি তার কলিজায় গিয়ে বিঁধল। সে চোখের জল সামলে নিয়ে শুধু মাথা নাড়ল।

•

শহরের নির্জন এক প্রান্তে শেরাজ খানের শুভ্র বাংলোটি সকালের শান্ত রোদে স্নান করছে। বাড়ির চারপাশ ঘিরে থাকা কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া গাছগুলো যেন বাড়িটিকে পাহারা দিচ্ছে।

​শেরাজ আজ খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠেছে। কাল সারা রাত সে ঠিক করে ঘুমাতেই পারেনি। বারবার সেই কালো শাড়ি পরা মেয়েটির কণ্ঠস্বর—‘আমরা দুজনেই একই মানুষকে ভালোবাসি’—তার কানের কাছে ভ্রমরের মতো গুঞ্জন করেছে। অস্থিরতা কাটাতে সে সকালেই নিজের ব্যক্তিগত জিমে এক ঘণ্টা ঘাম ঝরিয়েছে। সুঠাম দেহের প্রতিটি পেশী আজ যেন বিদ্রোহ করছে।

​জিম শেষে শাওয়ার নিয়ে শেরাজ আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। ভেজা চুলগুলো কপালে অবাধ্য হয়ে লেপ্টে আছে। চুলগুলো আগের থেকে এখন অনেকটা ছোট করে ফেলেছে। সে হেয়ার ড্রায়ার নিয়ে চুলগুলো বেশ কিছুটা সময় নিয়ে শুকিয়ে নিল। চুল শুকানো শেষ হতেই একটি লাল-কালো প্রিন্টেড শার্ট পরে নিল, যার বোতামগুলো আলগা হয়ে তার সুঠাম বক্ষ কিছুটা উন্মুক্ত। মাথায় সে একটি গাঢ় কালো ও সবুজ নকশা করা ব্যান্ডানা শক্ত করে বেঁধে নিল। হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি নিয়ে সে তার স্টুডিও রুমে প্রবেশ করল। বিজনেস জগতের বাইরে শেরাজের এক নিভৃত জগত আছে—তা হলো পেইন্টিং। ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ালে সে নিজেকে ফিরে পায়, যদিও সেই নিজে আসলে কে, তা সে নিজেও জানে না।

​স্টুডিওর জানালা দিয়ে আসা উত্তরের আলোয় শেরাজ ক্যানভাসটা সাজাল। প্যালেটে রঙ মেশাতে মেশাতে তার মনটা অবাধ্যভাবে কালরাতের সেই কনফারেন্স রুমে চলে গেল। কফি কাপে শেষ চুমুক দিয়ে সে তুলি হাতে নিল। আজ তার কোনো ল্যান্ডস্কেপ বা বিমূর্ত ছবি আঁকার কথা ছিল। কিন্তু তুলি যখন ক্যানভাসে আঁচড় কাটতে শুরু করল, শেরাজ খেয়াল করল তার হাত দুটো যেন অন্য কারো ইশারায় চলছে।

​সে আঁকতে শুরু করল দুটো গভীর চোখ। যে চোখ দুটোতে মাশকারার গাঢ় প্রলেপ থাকলেও তার আড়ালে এক সমুদ্র বিষাদ আর অতল মায়া লুকিয়ে আছে। শেরাজ খুব সচেতনভাবে সেই চোখের মণিগুলোর ওপর আলো-ছায়ার কাজ করল। আঁকতে আঁকতে সে এক সময় এতটাই ডুবে গেল যে, তার ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল।

​তুলির শেষ টানে যখন ক্যানভাসে ফুটে উঠল সেই চিরচেনা মায়াবী চাহনি, শেরাজ নিজেই শিউরে উঠল। সে তুলিটা সরিয়ে এক পা পিছিয়ে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলল,

“এই চোখ দুটো আমাকে এত অস্থির করছে কেন? কেন মনে হচ্ছে আমি এই দৃষ্টির কাছে হাজার বছর ধরে বন্দী?”

​

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। স্যান্ডি ঘরে প্রবেশ করল। স্যান্ডির দৃষ্টি সরাসরি গিয়ে পড়ল ক্যানভাসের ওপর। সুমুর সেই নিখুঁত চোখ দুটো দেখে স্যান্ডি কয়েক মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,

“স‍্যার, আপনি কি আজ সকালে স্বপ্ন দেখেছেন, নাকি কাল রাতের সেই ব্যবসায়ী ম্যাম আপনার হৃদয়ে পুরোপুরি জায়গা করে নিয়েছেন?”

​

শেরাজ অপ্রস্তুত হয়ে ক্যানভাসটা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করল। তার গলার স্বর কিছুটা গম্ভীর করে বলল,

“বাজে কথা রাখো, স্যান্ডি। এটা স্রেফ একটা অবয়ব। কাজের কথা বলো।”

স‍্যান্ডিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে ​ক্যানভাসে সুমুর সেই মায়াবী চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল। ওই দৃষ্টির সম্মোহন থেকে বাঁচতে সে তুলি নামিয়ে রেখে গিটার নিয়ে জানালার পাশে গিয়ে বসল। বাইরের রোদ এসে সরাসরি তার মুখের ওপর পড়ল, যার তেজে তার গায়ের রং যেন তপ্ত সোনার মতো উজ্জ্বল দেখাল। নিজের অস্থিরতাকে দমানোর চেষ্টায় শেরাজ আপনমনেই গুনগুন করে একটি সুর ধরল,

“চাহে দুঃখ হো, চাহে সুখ হো,

দিল নে তুঝকো হি পুকারা!

তু নে হামকো হ্যায় বানায়া,

তু নে হামকো হ্যায় সাঁওয়ারা!

জাহাঁ কো তো রাব কা হ্যায়,

হমে তেরা হ্যায় সহারা!

বাস তেরা সাথ হো,

চাহে জো বাত হো!

তেরে কহনে সে কর জায়েঙ্গে,

হম মর জায়েঙ্গে হো!”

গান থামিয়ে সে বাইরের শূন্যতায় দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে হাজারো উত্তরহীন প্রশ্ন। রোদ আর ছায়ার এই লুকোচুরিতে তাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক পরাজিত সম্রাট, যে নিজের অজান্তেই তার রানির মায়ার জালে পুনরায় আটকা পড়েছে।

হঠাৎ স্যান্ডি একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,

“কাজের কথা তো ম্যাম নিজেই বলতে আসছেন। একটু আগেই গেট থেকে ফোন এলো—সুমু ম্যাম এসেছেন। তবে তিনি একা নন, তার সাথে নাকি সেই বোনাস, সরি… গিফট দুটোও আছে।”

​

শেরাজ হাতের গিটার’টা টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রাখল। সে শক্ত গলায় বলল,

“উনি কি সত্যিই চলে এসেছেন? উনি কি সত্যিই বাচ্চাদের নিয়ে এখানে ঢুকে পড়েছেন?”

​স্যান্ডি মাথা নাড়ল। শেরাজ জানালা দিয়ে নিচের গেটের দিকে তাকাল। একটি কালো এসইউভি এসে থেমেছে। দরজা খুলতেই সুমু নামল—আজ তার পরনে হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি। তার দুপাশ থেকে নেমে এলো দুটি ছোট শিশু।

​শেরাজ কাচের আড়াল থেকে ছোট মেয়েটিকে আর ছেলেটিকে দেখল—ছেলেটি ঠিক তার নিজের মতো করে কলার ঠিক করছে। শেরাজের মস্তিস্কে এক তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো। সে নিজের কপাল চেপে ধরল।

•

​বাংলোর ড্রয়িংরুমে এক ভারী নিস্তব্ধতা। শেরাজ ওপর থেকে ধীর পায়ে নিচে নেমে এলো। তার পরনে এখনো সেই শার্ট, চুলগুলো কিছুটা অবিন্যস্ত। সিঁড়ির শেষ ধাপে আসতেই তার চোখ আবারও আটকে গেল সোফায় বসে থাকা দুটো ছোট্ট শিশুর ওপর।

​সুমু শান্ত ভঙ্গিতে পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। শেরাজকে দেখেই সিমরান এক লাফে সোফা থেকে নেমে পড়ল। তার ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে গিয়ে শেরাজকে জড়িয়ে ধরল। মুখ তুলে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আধো আধো গলায় বলল,

“পাপা! তুমি এতো বলো বালিতে এতা এতা থাতো তেনো? আমাদেল তাতে চনো তুমি।”

​

শেরাজের শরীরটা মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। এই ‘পাপা’ ডাকটা তার কানে তপ্ত সীসার মতো লাগল। সে খুব রুক্ষভাবে সিমরানের হাতটা সরিয়ে দিয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল। সুমুর দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,

“ম্যাম, আপনি কি সত্যিই পাগল হয়ে গেছেন? এই বাচ্চাদের শিখিয়ে এনেছেন আমাকে ‘পাপা’ ডাকতে? আমি বলেছি না, আমি এসব সস্তা ড্রামা পছন্দ করি না। ওদের সরিয়ে নিন আমার সামনে থেকে।”

​সুমু কিছু বলল না, সে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ধরে রাখল। ​ঠিক তখনই শেরান এগিয়ে এলো। সে সিমরানের মতো চঞ্চল নয়, বরং অনেক বেশি ধীরস্থির। সে শেরাজের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শেরানকে দেখা মাত্রই শেরাজের মস্তিস্কের কোণে কে যেন হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করল। ছেলেটার চোখের চাহনি, দাঁড়ানোর ভঙ্গি—সবই যেন শেরাজের নিজের আয়না।

​

শেরাজ না চাইতেও শেরান আর সিমরানের গালের দিকে হাত বাড়াতে গিয়েও মাঝপথে থেমে গেল। তার ভেতরে এক প্রবল যুদ্ধ চলছে। একদিকে চরম বিরক্তি—কেন এই অচেনা বাচ্চারা তাকে ঘিরে ধরছে, অন্যদিকে এক অমোঘ টান—যা তাকে বারবার বাধ্য করছে ওদের দিকে তাকাতে।

​

শেরান খুব শান্ত গলায় বলল,

“পাপা, তুমি তো অনেত হ‍্যানতাম।”

​

শেরাজ এবার প্রায় চিৎকার করে উঠল,

“স্যান্ডি! ওদের নিয়ে যাও এখান থেকে। আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে।”

​

তার চিৎকার শুনে সিমরান আর শেরান ভয়ার্ত চোখে শেরাজের দিকে তাকাল, শেরাজের ভেতরের সেই কাঠখোট্টা মানুষটা হঠাৎ যেন মোমের মতো গলে গেল। সে নিজের অজান্তেই নিচু হয়ে সিমরান আর শেরানের কাঁধে হাত রাখল। পরক্ষণেই আবার কী ভেবে হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিল। সে বুঝতে পারছে না, কেনো এই ছোট্ট স্পর্শে তার হৃৎপিণ্ডটা এতো জোরে ধুকপুক করছে। ​সে সুমুর দিকে তাকিয়ে অস্থিরভাবে বলল,

“আপনি কী চাইছেন আমার কাছে? টাকা? ক্ষমতা? নাকি আমাকে পাগল প্রমাণ করতে চাইছেন?”

​

সুমু ধীর পায়ে শেরাজের কাছে এগিয়ে এলো। শেরাজের খুব কাছে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলল,

“আপনার আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে? আমার কি টাকা বা ক্ষমতার অভাব পড়েছে? লিসেন মিস্টার, টাকা বা ক্ষমতা আমার অনেক আছে। আমি তো এসেছি আপনাকে আপনার আয়না দেখাতে। আপনি ওদের সরিয়ে দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু আপনার হাত দুটো কেন কাঁপছে? আপনার চোখ কেন বারবার এই দুটো ছোট্ট শিশুর মাঝে নিজেকে খুঁজছে?”

​

শেরাজ কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে দেখল সিমরান আবারও তার কাছে আসার চেষ্টা করছে। সে বিরক্তি আর মায়ার এক অদ্ভুত দোলাচলে পড়ে ড্রয়িংরুম ছেড়ে বাগানের দিকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু বাগানে গিয়েও সে শান্তি পেল না। তার কানে এখনো বাজছে সেই আধো আধো ডাক—‘পাপা’।

​

স্যান্ডি এক কোণায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, তার স‍্যারের মস্তিস্ক হয়তো স্মৃতিগুলো অস্বীকার করছে, কিন্তু তার রক্ত কোনোভাবেই এই দুই উত্তরাধিকারীকে অস্বীকার করতে পারছে না।

​সুমু ড্রয়িংরুমে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখল শেরাজ কীভাবে ঝড়ের বেগে বাগানের দিকে চলে গেল। সে জানে, এই মুহূর্তে শেরাজের ভেতরে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি বইছে। সে স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। স্যান্ডিও অবাক হয়ে দেখছে তার কঠোর স‍্যারকে এই দুই খুদে জাদুকর কীভাবে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে।

​

সুমু স্যান্ডিকে কাছে ডেকে বলল,

“সান ভাইয়া, সিমরান আর শেরানকে একটু বাংলোর আশপাশটা ঘুরিয়ে দেখান। ওনাকে এখন একটু সময় দেওয়া দরকার। আমি ওনার কাছে যাচ্ছি।”

​স‍্যান্ডি মাথা নেড়ে সায় দিল। সে বাচ্চাদের উদ্দেশ্যে বলল,

“চলো তো লিটল চ্যাম্পস! তোমাদের পাপার এই সুন্দর বাগানে অনেক রঙিন প্রজাপতি আছে, দেখবে?”

​

সিমরান আর শেরান উৎসুক হয়ে স্যান্ডির হাত ধরল। সুমু একবার বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হলো, তারপর ধীর পায়ে বাগানের দিকে পা বাড়াল।

​

বাগানের এক কোণায় থাকা একটি পুরোনো মেহগনি গাছের নিচে শেরাজ দাঁড়িয়ে আছে। তার পিঠ সুমুর দিকে। দুপুরের রোদ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এসে তার লাল-কালো শার্টের ওপর এক অদ্ভুত নকশা তৈরি করেছে। শেরাজের এক হাত গাছের কাণ্ডে, অন্য হাতে সে নিজের কপাল চেপে ধরে আছে। তার নিঃশ্বাস এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

​সুমু কোনো শব্দ না করে তার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। কিছু সময় নিস্তব্ধতায় কেটে গেল। সুমু শান্ত স্বরে বলল,

“স্মৃতিরা মাঝে মাঝে খুব বেইমানি করে, তাই না খান সাহেব? কিন্তু রক্ত আর স্পর্শ কি কখনো বেইমানি করে?”

​

শেরাজ ঝট করে পেছনে ফিরল। তার চোখ দুটো অস্থির। সে সুমুর খুব কাছে এসে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“কী জাদু করেছেন আপনি আমার ওপর? কেন ওই বাচ্চাদের দেখলে আমার মনে হচ্ছে আমার হৃৎপিণ্ডটা কেউ ছিঁড়ে ফেলছে? কেন মনে হচ্ছে আমি আপনাকে হাজার বছর ধরে চিনি? কে আপনি? সত্যি কি আপনি আমার বিজনেস পার্টনার নাকি আমার ধ্বংসের কোনো নীল নকশা?”

​

সুমু পিছু হঠল না। সে শেরাজের একদম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি আপনার ধ্বংস নই, মিস্টার এস.কে। আমি আপনার সেই অর্ধেকটা, যেটা ছাড়া আপনি অপূর্ণ। আপনি স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন মস্তিস্কে, অথচ আপনার উত্তর লুকিয়ে আছে আপনার বুকের এই ধুকপুকানির ভেতরে। আপনি ওদের সরিয়ে দিলেন, কিন্তু একবারও কি পেরেছেন নিজের সত্তাকে ওদের কাছ থেকে সরাতে?”

​

শেরাজ সুমুর দু’কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরল। তার স্পর্শে এক তীব্র টান আর রাগ মিশে আছে। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,

“আপনি আমাকে পাগল করে দেবেন। ওই ছেলেটা... ওর নাম কী বললেন? শেরান? ও কেন হুবহু আমার মতো করে কলার ঠিক করে? কেন মেয়েটার চোখগুলো আমার মতো তীক্ষ্ণ?”

​সুমু শেরাজের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। খুব মোলায়েম সুরে বলল,

“কারণ ওরা আপনার বোনাস নয় খান সাহেব, ওরা আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ ডিল। ওরা আপনার রক্ত। আপনি যতই অস্বীকার করুন, আপনি তো ওদের পাপাই।”

​শেরাজ সুমুকে ছেড়ে দিয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল। সে ভেঙে পড়ল। ঘাসের ওপর বসে পড়ে সে নিজের মাথা নিচু করে রাখল। ​তার অবস্থা দেখে সুমুর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। শেরাজ যেভাবে কপাল চেপে ধরে ঘাসের ওপর বসে পড়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে তার মস্তিস্ক আর হৃদয়ের এই দ্বন্দ্বে সে ভীষণ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সুমু মুহূর্তেই বুঝতে পারল, সে একটু বেশি তাড়াহুড়ো করে ফেলেছে। স্মৃতি পুনরুদ্ধারের এই ধাক্কা শেরাজের মস্তিস্ক হয়তো নিতে পারছে না।

​

সুমু দ্রুত নিজের ভেতরের অস্থিরতা সামলে নিল। তাকে এখন পরিস্থিতি হালকা করতে হবে, নয়তো শেরাজ অসুস্থ হয়ে পড়বে। সে নিজের গলার স্বরে একটা আলগা চপলতা এনে একটু বাঁকা হেসে বলল,

​“ওমা! মিস্টার এস.কে, আপনি তো দেখছি বড্ড ভীতু। বড় বড় বিজনেস ডিল সামলানো বিজনেস টাইকুন দেখি এইটুকু রসিকতাতেই দমে গেল? আমি তো আপনার সাথে একটু মজা করছিলাম, আর আপনি তো দেখি একদম সিরিয়াস হয়ে গেছেন।”

সুমুর এই আকস্মিক ভঙ্গি বদল দেখে শেরাজ স্তম্ভিত হয়ে মাথা তুলল। তার চোখে এখনো যন্ত্রণার রেশ, কিন্তু সুমুর মুখে ওই তাচ্ছিল্যভরা হাসি দেখে তার পৌরুষে বড়সড় একটা চোট লাগল। সে ঝট করে উঠে দাঁড়াল। রাগে তার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। সে সুমুর খুব কাছে এসে এক হাত উঁচিয়ে গর্জে উঠল,

​“মজা? আপনি আমার সাথে মজা করছিলেন? লিসেন, আপনি জানেন না আমি কে? আমার বাড়ির ভেতরে ঢুকে আমার ইমোশন নিয়ে খেলা করার সাহস আপনাকে কে দিল?”

​সুমু ভয় পাওয়া তো দূরে থাক, উল্টো এক পা এগিয়ে শেরাজের একদম বুকের কাছাকাছি চলে এলো। সে তার কাজল মাখা চোখের পাতাগুলো খুব দ্রুত কয়েকবার ঝাপটানি দিয়ে মায়াবী স্বরে বলল,

​“ইমোশন? আপনি কি নিশ্চিত যে ওটা ইমোশন ছিল? আমার তো মনে হয় ওটা ছিল আমার মতো সুন্দরী আর গর্জিয়াস নারীর প্রতি আপনার একধরণের দুর্বলতা। আর সাহস? সাহস তো আপনি নিজেই আমাকে দিচ্ছেন আপনার ওই রাগী-রাগী চোখ দিয়ে তাকিয়ে থেকে।”

​শেরাজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“ইউ... আপনি কি জানেন আপনি কি বলছেন?”

​

সুমু শেরাজের শার্টের কলারটা খুব আলতো করে একটু ঠিক করে দিল। শেরাজ থতমত খেয়ে পিছিয়ে যেতে চাইলে সুমু তার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

​“জানেন মিস্টার এস.কে, আপনি যখন রেগে যান তখন আপনাকে আরও বেশি হট লাগে। ওই যে কপালে কয়েকটা শিরা জেগে ওঠে না? ওগুলো দেখলে আমার ডিল-ফিল সব মাথা থেকে উবে যায়। আর এই যে ব্যান্ডানাটা পরেছেন, আপনাকে একদম সেই দুর্ধর্ষ দস্যুর মতো লাগছে যে আমাকে চুরি করতে এসেছে।”

​শেরাজ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। কাল রাতেও এই মেয়েটা এমন অসভ্যতা করেছিল, আর আজও সে একই কাজ করছে। সে ক্ষিপ্ত হয়ে বলল,

“আপনি... আপনি কি সব সময় এভাবে পুরুষদের সাথে ফ্লার্ট করেন? একজন মেয়ে এসব করতে আপনার লজ্জা করে না?”

​সুমু খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে বাগানের নিস্তব্ধতা যেন ভেঙে গেল। সে হাসতে হাসতে বলল,

​ “লজ্জা? ওটা তো আমি অনেক আগেই ওমানের মরুভূমিতে ফেলে এসেছি। আর সব পুরুষের সাথে ফ্লার্ট করার সময় কই আমার? আমি তো শুধু আপনার মতো এই জেদি আর কিউট বাঘটার সাথেই একটু দুষ্টুমি করছি। আপনি চাইলে পুলিশ ডাকতে পারেন, কিন্তু পুলিশ এসে দেখবে—আপনি নিজেই আমাকে একদৃষ্টিতে পরখ করছেন।”

​

শেরাজ রাগে কথা খুঁজে পাচ্ছে না। সে শুধু অনুভব করছে, সুমুর ঠোঁটের সেই মায়াবী হাসি আর তার গায়ের মিষ্টি পারফিউম তাকে আবারও এক অদৃশ্য জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে। সে বুঝতে পারছে না—এই মেয়েটা কি সত্যিই কোনো ব্যবসায়িক পার্টনার, নাকি তার জীবনে আসা এক অদ্ভুত কালবৈশাখী ঝড়।

​

সুমু তার পিঠে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে নিয়ে বলল,

“কী হলো? পুলিশ ডাকবেন? নাকি আপনার ওই স্টুডিওতে নিয়ে গিয়ে আমার আরও একটা পেইন্টিং করবেন? এবারেরটা না হয় একটু বোল্ড হোক?”

​

শেরাজ চোখ বড় বড় করে তাকাল। সে ভাবছে, এই মেয়েটা কি তবে জেনে গেছে সে তার চোখ এঁকেছে? তার বুকটা আবারও ধক করে উঠল। তার মনে হলো কেউ যেন তার ব্যক্তিগত ডায়েরির সবচেয়ে গোপন পাতাটি ছিঁড়ে ফেলেছে। সে বড় বড় পা ফেলে সুমুর আরও সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে এখন রাগের চেয়েও বিস্ময় বেশি। অত্যন্ত নিচু কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“আপনি কীভাবে জানলেন আমি পেইন্টিং করেছি? আমি তো আমার স্টুডিওর দরজা সবসময় লক করে রাখি। আর ওই পেইন্টিং’টার কথা স্যান্ডি ছাড়া আর কেউ জানে না। আপনি কি আমার বাড়িতে স্পাই বা সিসিটিভি লাগিয়েছেন?”

​

সুমু একটুও ঘাবড়াল না। সে খুব আয়েশ করে বাগানের একটি বেঞ্চে গিয়ে বসল। সে জানত শেরাজ এই প্রশ্নটি করবেই। সুমু তার ঠোঁটের বাঁকা হাসির রেশটুকু ধরে রেখেই বলল,

“স্পাই? সিসিটিভি? মিস্টার এস.কে, আপনি আমাকে বড্ড ছোট ভাবছেন। একজন মানুষের চোখ দেখলেই বলে দেওয়া যায় সে সারা সকাল কী করেছে। আপনার ওই আঙুলের ডগায় রঙের একটুখানি দাগ লেগে আছে, আর আপনার চোখে আছে কোনো কিছু সৃষ্টি করার সেই গভীর আচ্ছন্নতা। একজন শিল্পী যখন তার সবচেয়ে প্রিয় কোনো কিছু ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে, তার সারা শরীরে সেই সৃষ্টির ঘ্রাণ থেকে যায়।”

​

শেরাজ নিজের আঙুলের দিকে তাকাল। সত্যিই, প্যালেটে রঙ মেশানোর সময় অজান্তেই একটুখানি রঙ তার কড়ে আঙুলের নখে লেগে ছিল। সে দ্রুত হাতটা মুঠো করে পেছনে নিয়ে গেল।

​সুমু আবারও উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এলো,

“তাছাড়া, আমি তো জানি—এখন আপনি যখন খুব অস্থির থাকেন, তখন ছবি আঁকা ছাড়া আপনার আর কোনো গতি থাকে না। আর কাল রাতে আমি আপনাকে যে অস্থিরতা উপহার দিয়ে গিয়েছি, তাতে আপনি ল্যান্ডস্কেপ আঁকবেন না সেটা আমি নিশ্চিত ছিলাম। নিশ্চয়ই আমার এই মায়াবী চোখ দুটোই আঁকছিলেন, তাই না?”

​

শেরাজ এবার পুরোপুরি দিশেহারা। সে বিরক্তি লুকিয়ে ফুঁসে উঠে বলল,

“আপনার আত্মবিশ্বাস তো আকাশছোঁয়া! আমি কার ছবি আঁকব না আঁকব সেটা আমার ব্যাপার। আপনি এখানে বিজনেস ডিল করতে এসেছেন, তো ডিল নিয়েই কথা বলুন। পার্সোনাল স্পেসে ঢোকার চেষ্টা করবেন না।”

​

সুমু হাসতে হাসতে বলল,

“বিজনেস টাইকুন যখন ঘাবড়ে যায়, তখন সে এমনই পার্সোনাল স্পেস-এর অজুহাত দেয়। ঠিক আছে, পেইন্টিংয়ের কথা বাদ দিলাম। কিন্তু ক্যানভাসে আমার চোখগুলো ঠিকঠাকভাবে এঁকেছেন তো? নাকি সব ভুলে গেছেন?”

​শেরাজ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে মনে মনে ভাবল, “আমি কি সত্যিই ঠিকঠাক এঁকেছিলাম? আর এই মেয়েটি কি কোনো জাদুকরী? নাকি ও আসলেই আমার আত্মার খবর রাখে?”

​ঠিক তখনই দূর থেকে স্যান্ডির গলা শোনা গেল। সে সিমরান আর শেরানকে নিয়ে বাগানের এদিকটাতেই আসছে। বাচ্চাদের হাসির শব্দ শুনে শেরাজ আবারও সচেতন হয়ে উঠল, কিন্তু সুমুর সেই মায়াবী রহস্যময় চাহনি থেকে সে কিছুতেই নিজের দৃষ্টি সরাতে পারল না।

স্যান্ডি সিমরান আর শেরানকে নিয়ে শেরাজদের কাছে এসে পৌঁছাল, সে দেখল শেরাজ আর সুমুর মধ্যে এক অদ্ভুত তপ্ত বাক্যবিনিময় চলছে। শেরাজ তপ্ত রাগে ফুটছে, আর সুমু ঠিক তার উল্টো—একদম শান্ত এবং বিজয়ীর মতো হাসছে।

সুমু স্যান্ডিকে দেখে তার দিকে তাকিয়ে বেশ জোর গলায় বলল,

“সান ভাইয়া, আপনি আপনার স্যারকে একটু বোঝান তো! উনি কি পেইন্টিং করতে গিয়ে আমার চোখগুলো ঠিকঠাকভাবে এঁকেছেন? একজন ইনভেস্টরের প্রতি এমন অবহেলা কি বিজনেসের জন্য ভালো?”

​

স্যান্ডি মুহূর্তেই বুঝতে পারল সুমু ডিরেক্ট হিট করেছে। সে মনে মনে হাসল এবং শেরাজের দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,

“বলেন কী ম্যাম! স্যার ঠিকঠাকভাবে আঁকেননি নাকি? এটা তো অসম্ভব! স্যার তো কাল রাত থেকে ওই চোখজোড়া ছাড়া আর কিছু চোখেই দেখছেন না। আমি তো দেখলাম স্যার ড্রয়িংটা করার সময় মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাসও ফেলছিলেন।”

​শেরাজ রাগে ফেটে পড়ল। সে স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,

“স্যান্ডি! অনেক হয়েছে। তুমি আমার কর্মচারী নাকি এই মহিলার বেতনভুক্ত স্পাই? তোমার কাজ হলো ফাইল রেডি রাখা, আমার দীর্ঘশ্বাসের হিসেব রাখা নয়। আর এক মুহূর্তও যদি তুমি এই ফালতু আলাপে যোগ দাও, তবে কাল থেকে তোমার এই বাংলোতে ঢোকা তো দূরের কথা, এই জেলাতেই কোনো চাকরি জুটবে না। ইউ আর ফায়ারড!”

​স্যান্ডি এবার সত্যি সত্যি বিষম খেল। সে জানত তার স্যার রাগলে বাঘ হয়ে যায়, কিন্তু আজ তো দেখছে তিনি একদম আহত বাঘ। সে বুঝতে পারল পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। সে তৎক্ষণাৎ দুই কানে হাত দিয়ে জিভ কামড়ে ধরল। একদম অসহায় একটা চেহারা বানিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল,

​ “আরে না না স্যার! আমি... আমি তো জাস্ট... মানে... ম্যাম বলছিলেন তো তাই... চাকরি খাবেন না স্যার! আমার ওই বৃদ্ধ মা আর তিনটে অবিবাহিত বোন... মানে নেই, কোনো মা-বোন নেই, কিন্তু থাকতে তো পারত! আমি তো আসলে বলতে চাইছিলাম যে, স্যার ইচ্ছা করেই হয়তো পেইন্টিং’টা ঠিকঠাকভাবে করেননি, যাতে ম্যামকে আবারও সামনাসামনি থেকে দেখতে পারেন। আই মিন... মাফ করে দেন স্যার! আমার মুখটা না আসলে একদম অসভ‍্যের মতো, কিছুই আটকায় না।”

​শেরাজ ধমক দিয়ে বলল,

“স্টপ ইট! একদম চুপ!”

​স্যান্ডি দ্রুত সিমরান আর শেরানের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল এবং নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

“আমি তো স্যারের ভালোর জন্যই বলছিলাম। সুন্দরী বউ আর দুটো রেডিমেড কিউট বাচ্চা—এমন অফার তো টাটা-আম্বানিরাও পায় না। স্যার তো দেখি সব লাথি দিয়ে ফেলছেন।”

​

সুমু স্যান্ডির কাণ্ড দেখে হেসে উঠল। সে শেরাজের খুব কাছে গিয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“বেচারা সান ভাইয়াকে বকছেন কেন? উনি তো শুধু সত্যিটাই বলছিলেন। আপনার ওই ক্যানভাসটা কিন্তু আমি আজ দেখেই ছাড়ব মিস্টার এস.কে। দেখি, আপনি আমাকে কতটুকু মনে রেখেছেন।”

শেরাজ অসহায়ভাবে সুমুর দিকে তাকাল। তার রাগের পাহাড় যেন এই অদ্ভুত নারীর হাসির কাছে বারবার বালির বাঁধের মতো ভেঙে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না—সে কি এই পাগল মহিলাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে, নাকি তার হাত ধরে বলবে, “আমি সত্যিই তোমাকে চিনি কি না সেটার প্রমাণ আমাকে দাও।” তার মেজাজ এখন সপ্তমে। সুমুর ফ্লার্টিং আর স্যান্ডির রসিকতা—সব মিলিয়ে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সে স্যান্ডির দিকে আঙুল উঁচিয়ে একদম চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার মতো করে বলল,

​“অনেক হয়েছে, স্যান্ডি! তুমি আমার উদারতার সুযোগ নিচ্ছ। আজ থেকে তোমার আর আমার কোনো সম্পর্ক নেই। গেট আউট ফ্রম হেয়ার! কাল থেকে এই বাংলোর আশেপাশেও যেন তোমাকে না দেখি। ইউ আর পার্মানেন্টলি ডিসচার্জড!”

​স্যান্ডি এবার বুঝতে পারল তার স‍্যার আসলেই ফুঁসছেন। সে দুই সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল, তারপর হঠাৎ করে একদম কান্নার মতো মুখ করে ফেলল। সে শেরাজের দিকে এক পা এগিয়ে গিয়ে হাত জোড় করে বলতে শুরু করল,

​“না স্যার, এটা করবেন না! আমাকে এভাবে মাঝপথে ফেলে দেবেন না। আপনি কি জানেন না স্যার, আমার এই দুনিয়াতে কেউ নেই? আমার কোনো বউ নেই যে রাতে আমার জন্য অপেক্ষা করবে, কোনো বাচ্চাকাচ্চা নেই যারা আমাকে পাপা বলে ডাকবে” সে একবার সুমুর বাচ্চাদের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নিল “ আমি একদম একা স্যার, এই দুনিয়ায় আমার একটা সংসারও নেই।”

​

শেরাজ ধমক দিয়ে উঠল,

“তাতে আমার কী?”

“আরে স্যার, এই বাংলোটাই তো আমার সংসার! এই চাকরিটাই আমার মা-বাবা, আমার ভাই-বোন আর আমার বউ। আপনি এই চাকরিটা খেয়ে নিলে আমি তো আবার এতিম হয়ে যাব, স্যার! আমাকে এভাবে দ্বিতীয়বার এতিম করবেন না। দরকার হলে আপনি আমার বেতন কেটে নিন, আমাকে দিয়ে বাগান পরিষ্কার করান, এমনকি ওই ড্রয়িংরুমে ঝাড়ু দেওয়াতেও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু এই এতিম স্যান্ডিটাকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলবেন না, স্যার!”

​সুমু ঠোঁট টিপে হাসি চেপে শেরাজকে বলল,

“দেখুন মিস্টার এস.কে, বেচারা কত অসহায়! আপনি কি আসলেই একজন এতিম মানুষের পেটে লাথি মারবেন? আপনার কি একটুও মায়া নেই?”

​শেরাজ দাঁতে দাঁত চেপে স্যান্ডিকে বলল,

“তুমি এতিম? গত মাসেই তো বললে তোমার দাদি মারা গেছে বলে তিন দিনের ছুটি চাই। আর এখন বলছ তোমার কেউ নেই?”

​স্যান্ডি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, সে সাথে সাথেই পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার জন‍্য বলল,

“স্যার, ওটা তো ছিল আমার কাল্পনিক দাদি। মনের দুঃখে বলে ফেলেছিলাম। আসলে আমার সত্যি কেউ নেই স্যার! বিশ্বাস করুন, আপনি ছাড়া আমার আর কেউ নেই।”

​শেরাজ বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ওপরের দিকে তাকাল। স্যান্ডির এই পাগলামি আর সুমুর রহস্যময় চাহনির মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার মনে হচ্ছে সে কোনো এক পাগলাগারদে ঢুকে পড়েছে। সে রাগ সামলাতে না পেরে বলল,

​“স্টপ ইট, স্যান্ডি! যদি আর একটাও বাড়তি কথা মুখ থেকে বের করেছ, তবে চাকরি তো যাবেই, সাথে ওই কান্নার জন্য জেলখানাও রেডি রাখব। এখন চোখের সামনে থেকে দূর হও।”

​স্যান্ডি বুঝল চাকরিটা আপাতত বেঁচে গেছে। সে দ্রুত দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল এবং সুমুর দিকে তাকিয়ে একটা চোখ টিপে সঙ্কেত দিল—যার অর্থ মিশন সাকসেসফুল।

​

•

রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাপিয়ে এক নিঝুম ঘরের ভেতর থেকে গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে। শহরের এক পরিত্যক্ত গুদামঘরের অন্ধকার ঘরটিতে ভ্যাপসা গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। ঘরের মাঝখানে তিনটে চেয়ারে তিনজন লোককে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাদের মুখে টেপ আঁটা, চোখেমুখে আতঙ্ক।

​হঠাৎ ঘরের ভারী লোহার দরজাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। বাইরের চাঁদের আলোতে দরজার সামনে একটি অবয়ব ফুটে উঠল। লম্বা ছিপছিপে শরীরের ওপর একটি ব্লেক লেদার জ্যাকেট, কালো জিন্স আর পায়ে হাই-হিল বুট। নারীটি ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই বুটের খটখট শব্দ পুরো ঘরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

​নারীটি আর কেউ নয়— সেই হাসিখুশি, চঞ্চল সুমু। কিন্তু এই সুমু সেই সুমু নয়। আজ তার চোখে আগ্নেয়গিরির লাভা। তার পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে স্যান্ডি, তার হাতে একটা রিভলভার। স্যান্ডির চেহারাও এখন পাথরের মতো কঠিন।

​সুমু লোকগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাতে একটি চকচকে ধারালো ছুরি, যা অন্ধকারের মধ্যেও চাঁদের আলোতে ঝিকমিক করে উঠছে। সে অত্যন্ত শীতল গলায় বলল,

​“ওমান থেকে এই শহর পর্যন্ত আসতে অনেক কষ্ট হয়েছে, তাই না? কিন্তু বাংলাদেশে ঢোকার আগে তোরা হয়তো ভুলে গেয়েছিলি—শেরাজ খানের সীমানায় পা রাখলে ফিরে যাওয়ার রাস্তাটা খুব সরু হয়ে যায়।”

​

লোকগুলো গোঙাতে লাগল। স‍্যান্ডি একজনের মুখের টেপটা একটানে ছিঁড়ে ফেলল। লোকটা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে ওমানি উচ্চারণে আরবি আর ভাঙা ইংলিশে বলল,

“আমাদের ছেড়ে দিন! আমরা শুধু খবর নিতে এসেছি এস.কে সত্যি বেঁচে আছে কি না।”

​

সুমু ছুরির ডগাটা লোকটার চিবুকের নিচে চেপে ধরল। লোকটি চিৎকার করে উঠল। সুমুর ঠোঁটের কোণে সেই ভয়ঙ্কর সুন্দর হাসিটা ফুটে উঠল। সে নিচু স্বরে বলল,

​“খবর তো তোরা পেয়েই গেছিস—বাঘ এখনো বেঁচে আছে। তবে দুঃখের বিষয় হলো, এই খবরটা ওমানে তোদের বস পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য তোরা আর সুস্থ থাকবি না। তোদের বস কি ভেবেছে, শেরাজকে একবার মারতে পারলেই কেল্লা ফতে? সে জানে না, শেরাজের আগে তাকে এই সুমুর মুখোমুখি হতে হবে।”

​

স্যান্ডি পাশ থেকে গম্ভীর গলায় বলল,

“ম্যাম, এরা আজ বিকেলেও বাংলোর আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিল। ওদের কাছে স্যারের লেটেস্ট ফটো আর লোকেশন পাওয়া গেছে। ওদের বসের অর্ডার ছিল—খবর কনফার্ম হলেই আজ রাতে কাজ শেষ করে দেওয়া।”

​সুমু ফিসফিস করে বলল,

“তোরা ভেবেছিলি শেরাজ স্মৃতি হারিয়েছে মানে সে অরক্ষিত? ভুল! শেরাজ খানের জন্য এই সুমু ধ্বংসীনি হতে পারে।”

​

লোকগুলো আর্তনাদ করে উঠল,

“প্লিজ! আমাদের মারবেন না।”

​সুমু ঘাড়টা সামান্য কাত করে লোকগুলোর দিকে না তাকিয়েই বরফশীতল গলায় বলল,

​“তোদের সাহস তো কম না! শেরাজ খান বেঁচে আছে কি না—এই খবরটা কনফার্ম করার জন্য সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছিস? কিন্তু তোরা একটা হিসাব করতে বড্ড ভুল করে ফেলেছিস রে। শেরাজ খান মরে গিয়েও বেঁচে আছে কি না সেটা জানার জন্য তোরা জান বাজি রেখেছিস, অথচ শেরাজ খানের বউ যে এখনো জ্যান্ত আছে—এই খবরটা তোরা জানতি না?”

​একটু থেমে সে আবারও বলল,

​ “ওমানের অন্ধকার জগতটা যদি শেরাজ খানের রাজত্ব হয়, তবে মনে রাখিস—সেই রাজত্বের সিংহাসনটা আজও এই সুমু আগলে বসে আছে। আজকের পর তোদের এই নরক যন্ত্রণা দেখে ওমানের প্রতিটি শত্রু যেন বুঝতে পারে, বাঘ স্মৃতি হারিয়েছে বলে জঙ্গলটা এতিম হয়ে যায়নি। শেরাজ খানের দিকে তাকানোর আগে তোদের এই সুমুর সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখতে হবে।”

সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। লেদার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটি টিস্যু বের করে ছুরির রক্ত মুছতে মুছতে বলল,

​“তোরা জানিস, দীর্ঘ পাঁচটি বছর আমি কীভাবে কাটিয়েছি? প্রতিটা সেকেন্ড লড়েছি শুধুমাত্র আমার সন্তানের বাবাকে আর আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় স্বামীকে বাঁচিয়ে রাখার জন‍্য। নিজের সুখ, শান্তি, ঘুম—সব বিসর্জন দিয়েছি যাতে আমার খান সাহেবের গায়ে একটা ফুলের টোকাও না লাগে। জেলের অন্ধকূটে থেকেও আমি শুধু ওনার নিঃশ্বাসটুকু বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখেছি। আর তোরা... তোরা এসেছিস ওমানের কোন এক নর্দমার কীটের নির্দেশে আমার সাজানো বাগান জ্বালিয়ে দিতে? আমার খান সাহেবকে শেষ করতে?”

​

সুমু হঠাৎ লোকটার চুলের মুঠি ধরে মাথাটা পেছনের দিকে হেঁচকা টান দিয়ে ধরল।

​“একেবারে মেরে ফেললে তো তোরা মুক্তি পেয়ে যাবি। এতো সহজ মুক্তি সুমু কাউকে দেয় না। তোদের আমি এমনভাবে বাঁচিয়ে রাখব যে, মৃত্যু তোদের জন্য বিলাসিতা মনে হবে। তোরা এস.কে-কে দেখেছিস, কিন্তু এই খবর ওমানের কাছে কাছে পৌঁছে দিতে পারবি না।”

​সুমু স্যান্ডির দিকে না তাকিয়েই হাত বাড়িয়ে দিল।

“স্যান্ডি ভাইয়া, আমার টুলবক্সটা দিন।”

​

স্যান্ডি কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে ব্যাগটা এগিয়ে দিল। সুমু অত্যন্ত দক্ষ হাতে একের পর এক কাজ সারতে লাগল। তার প্রতিটি মুভমেন্ট ছিল একজন সার্জনের মতো নিখুঁত কিন্তু নিষ্ঠুর। প্রথমে সে লোকগুলোর কণ্ঠনালীতে এমনভাবে আঘাত করল যে তাদের চিৎকার করার ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে গেল। এরপর তীক্ষ্ণ সুঁচালো অস্ত্র দিয়ে তাদের শ্রবণশক্তি আর দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিল। শেষে খুব ঠাণ্ডা মাথায় তাদের হাতের কবজি আর পায়ের রগ কেটে দিল।

​পুরো ঘরটা রক্তে ভেসে গেল, কিন্তু সুমুর সাদাটে মুখটাতে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। সে লোকগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থেকে নিচু স্বরে বলল,

​“এখন তোরা না পারবি কাউকে দেখতে, না পারবি কারো কথা শুনতে। তোদের এই অবশ হাত কোনোদিন কলম ধরতে পারবে না, আর এই স্তব্ধ কণ্ঠ কোনোদিন কারও কানে খবর পৌঁছাতে পারবে না যে—শেরাজ খান বেঁচে আছে। বেঁচে থাক তোরা, নিজের শরীরের এই অন্ধকার কবরে আজীবন বন্দী হয়ে।”

​

সুমু হাতের রক্তটুকু টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে স্যান্ডি এই পুরো দৃশ্যটা দেখে শিউরে উঠল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। ​সে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,

“ওহ গড! যেমন স্বামী, ঠিক তেমন তার স্ত্রী। দুজনেই সমান ভয়ঙ্কর। শেরাজ খান যখন বাঘ হয়ে গর্জে ওঠে তখন বড় বড় মাফিয়ারাও কাঁপে, আর সুমু ম্যাম যখন দংশন করেন তখন শত্রুরা পালালোর পথ খুঁজে পায় না। এই জুটির মাঝখানে আসা মানে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা।”

​

সুমু দরজার কাছে গিয়ে থেমে গেল। পেছনে না তাকিয়েই শীতল কণ্ঠে বলল,

“সান ভাইয়া, এদের শহরের বাইরে কোনো ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে আসুন। আর হ‍্যাঁ! শত্রু ঘরের হোক বা বাইরের—খান সাহেবের দিকে হাত বাড়ালে সেই হাত আমি এভাবেই উপড়ে নেব।”

সে দরজার হাতলে হাত লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,

​“বাঘ স্মৃতি ভুলে গেছে বলে তোরা বড্ড হালকা চাল চেলে চলে এসেছিস, তাই না? ভেবেছিস সে এখন শুধু রং-তুলি আর গিটার চেনে? মনে রাখিস—শেরাজ খান তার অতীত ভুলতে পারে, কিন্তু তার কিলিং স্কিল আজও তার আঙুলের ডগায় জ্যান্ত হয়ে আছে। ঘুমন্ত বাঘকে ঘুমিয়েই থাকতে দে। কারণ সে যদি একবার জেগে ওঠে, তবে ওমানের বালুচর তোদের রক্তে লাল হয়ে যাবে।”

​সে এগিয়ে এসে স্যান্ডির হাত থেকে লোকগুলোর ওমানি বসের পাঠানো সেই ছবিটা কেড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলল। ছেঁড়া কাগজগুলো লোকগুলোর রক্তাক্ত শরীরের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে সে শেষবারের মতো গর্জে উঠল,

​“তোদের নরকের এই যাত্রায় একটা মেসেজ সাথে নিয়ে যা। যদি কোনোদিন কারো ইশারায় আবার কথা বলতে পারিস, তবে তোদের বসকে গিয়ে বলিস—টাইগার জিন্দা হ্যায়! আর টাইগারের পাশে তার বাঘিনী এখন শুধু রক্ষক নয়, আজরাইল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”

​

কথাটা শেষ করে সুমু নিজের লেদার জ্যাকেটের জিপারটা টেনে এক ঝটকায় দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। ​স্যান্ডি পেছন থেকে সুমুর এই রূপ দেখে আবারও মনে মনে বিড়বিড় করল,

“স্যার তো স্মৃতি হারিয়ে শুধু একজন শান্তশিষ্ট মানুষ হয়েছেন, কিন্তু ম্যাম তো দেখছি স্মৃতি আগলে রেখে আস্ত একটা ডাইনামাইট হয়ে গেছেন।”

চলবে..?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন