#খান_সাহেব
#সুমাইয়া_জাহান
#অন্তিম_পর্ব.
দীর্ঘ ক্লান্তি শেষে শেরাজরা যখন শেখবাড়িতে পা রাখল, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। মাইশা-নয়ন আর রিফাত-অজান্তা তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে গেছে, এখন শুধু পরিবারের মূল সদস্যরা বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ করল।
ড্রয়িংরুমে ঢুকেই শেরাজরা সোফায় গা এলিয়ে দিল। শেরান আর সিমরান আধো ঘুমে আচ্ছন্ন। শেরাজের বন্ধুরা আর বাকি ছোট সদস্যরা ফ্রেশ হবার জন্য একে একে রুমে চলে গেল।
বাড়ির বড়রা আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন। হাসি বেগম আর রুমা বেগম ট্রে-তে করে গ্লাসভর্তি ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এগিয়ে এলেন। শেরাজের ক্লান্ত মুখটা দেখে হাসি বেগম চিন্তিত স্বরে বললেন, “বাবা, তোমাদের কি শরীর খারাপ লাগছে? মুখটা এমন শুকিয়ে আছে কেন?”
শেরাজ পানির গ্লাসে চুমুক দিয়ে ম্লান হেসে শুধু বলল, “না আম্মু, একটু বেশি ধকল গেছে এই যা।”
ড্রয়িংরুমের চওড়া সিঁড়ি দিয়ে নামার শব্দ পাওয়া গেল। ওপর থেকে নেমে এলেন অনন্যা খাতুন, রুহি খাতুন আর আফিয়া খাতুন। তাদের দেখে সুমু তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল।
অনন্যা খাতুন এগিয়ে এসে সুমুর মাথায় হাত রাখলেন। তিনি সুমুর ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে গভীর চোখে তাকালেন। একজন অভিজ্ঞ মানুষের দৃষ্টিতে তিনি হয়তো বুঝে নিলেন যে, সাজেকে শুধু বই প্রকাশ আর জন্মদিন পালন হয়নি, তার চেয়েও বড় কিছু ঘটে গেছে।
রুহি খাতুন সিমরানকে কোলে নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন। সিমরান ঘুমের ঘোরেই তার কোল জাপটে ধরল।
রুহি খাতুন হেসে সুমুকে বললেন, “আমার মামনির কি তবে সাজেক ভালো লাগেনি?”
আফিয়া খাতুন শেরাজের পাশে গিয়ে বসলেন। তিনি শেরাজের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন, “শহর থেকে দূরে পাহাড়ের চূড়ায় তো গিয়েছিলি শান্তি খুঁজতে, কিন্তু শান্তি কি সত্যিই সাথে করে নিয়ে আসতে পেরেছিস, বেটা?”
সারবাজরা সবাই চুপ করে রইল। শেরাজ তার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। সে জানে, এই বাড়িতে বড়দের তীক্ষ্ণ নজর এড়ানো দায়। সুমু তখন হাসি বেগমের দেওয়া পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। শেরাজ উঠে দাঁড়িয়ে সুমুকে ইশারায় বলল ঘরে যাওয়ার জন্য। বাড়ির শান্ত পরিবেশটা নষ্ট হোক সে চাইছে না।
রাতের শেখবাড়ি ঘুমের নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে। কিন্তু সুমুর চোখে আজ ঘুম নেই। সে বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে, তার দৃষ্টি সামনের দেয়ালে স্থির। সাজেকের সেই রাতের দৃশ্যটা—সেই ধারালো ছুরি, ঘাতকের রক্তাক্ত দেহ আর নিজের রক্তমাখা হাত—সবকিছু বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। সে নিজের হাতের তালুর দিকে তাকাল। যদিও শেরাজ পরম মমতায় সব রক্ত মুছে দিয়েছিল, তবুও সুমুর মনে হচ্ছে আজও সেখানে সেই উষ্ণ রক্তের গন্ধ লেগে আছে।
শেরাজ ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে ফিরে এসে দেখল সুমু ওই একইভাবে আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। সে বুঝতে পারল, সুমু এখন এক ভয়াবহ মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাইরে সে নিজেকে যতটা ডাইনামাইট হিসেবে জাহির করুক না কেন, দিনশেষে সে একজন মা।
সে একবার সুমুর পাশে ঘুমন্ত সিমরান আর শেরানের মুখের দিকে তাকাল। এরপর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বিছানায় বসল। সে সুমুর কাঁধে হাত রাখতেই সুমু চমকে উঠল। শেরাজ ওকে টেনে নিজের বুকের খুব কাছে নিয়ে এলো। সুমুর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। শেরাজ সেগুলো মুছে দিয়ে গভীর স্বরে বলল, “সুইটহার্ট, ওসব ভাবা বন্ধ করো। যেটা হয়েছে সেটা আমাদের টিকে থাকার লড়াই ছিল। তুমি কোনো ভুল করোনি।”
সুমু, শেরাজের শার্টটা শক্ত করে চেপে ধরে ভেজা গলায় বলল, “খান সাহেব, আমি কি বদলে যাচ্ছি? আমি তো শান্তিতে থাকতে চেয়েছিলাম, কিন্তু রক্ত কি কোনোদিনও আমাদের ছাড়বে না? আমার বইয়ের সেই ভালোবাসার গল্পের মাঝেও এই বিষাক্ত অধ্যায়টা কেন চলে এলো?”
শেরাজ সুমুর চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল। সে সুমুর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে বলল, “শোনো সুইটহার্ট, সারাদিন লম্বা জার্নি করে ফিরেছ। শরীর আর মস্তিষ্ক দুটোই এখন ক্লান্ত, তাই উল্টোপাল্টা চিন্তাগুলো মাথায় ভিড় করছে। তোমার ওপর এই ধকলটা অনেক বেশি গেছে।”
সুমু তবুও নিজেকে শান্ত করতে পারল না। সে উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। শেরাজ বুঝল, সুমুর ভেতরে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তা থামানোর জন্য এখন কোনো যুক্তির চেয়ে ভালোবাসার স্পর্শ অনেক বেশি প্রয়োজন।
শেরাজ এক ঝটকায় সুমুকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। সুমু অপ্রস্তুত হয়ে শেরাজের গলা জড়িয়ে ধরল। শেরাজ তাকে অতি সাবধানে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজেও তার পাশে এসে আধশোয়া হলো। সে সুমুকে নিজের চওড়া বুকের ভেতর টেনে নিল, যেন দুনিয়ার কোনো দুশ্চিন্তা এই বাহুবন্ধন ভেদ করে ভেতরে ঢুকতে না পারে।
শেরাজ পাশেই রাখা ফুলদানি থেকে একটা রক্তলাল গোলাপ তুলে নিল। কাল রাতের সেই ভয়ংকর স্মৃতি ধুয়ে দিতেই হয়তো সে আজ আবারও সুমুর নাগালে এক চিলতে ভালোবাসা এনেছে। শেরাজ গোলাপের কোমল পাপড়িগুলো দিয়ে সুমুর গাল, কপাল আর চিবুকের ওপর খুব ধীরলয়ে বিচরণ করতে লাগল। গোলাপের স্পর্শে সুমুর শরীরের সব ক্লান্তি আর আতঙ্ক যেন এক নিমিষে উবে গেল।
শেরাজ গুনগুন করে গান ধরতেই সুমুও গেয়ে উঠল,
“সারাটা দিন,
ঘিরে আছো তুমি এত রঙ্গীন,
হয়নি কখনও মন!
সারাটা রাত,
আসছে না ঘুম ধরেছি হাত,
থাকবো সারাজীবন!”
গানটা গাইতে গাইতে সুমু শেরাজের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। শেরাজ সুমুর এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে বলল, “কাল সকালে তোমার অনেক বড় কাজ আছে। পাবলিকেশন হাউজে যেতে হবে, সব কাজ শেষ করতে হবে। তোমার ‘খান সাহেব’ বইটা এখন মানুষের হাতে পৌঁছানোর অপেক্ষায়। সেই মুহূর্তটা উপভোগ করার জন্য তোমার এখন এই দুশ্চিন্তাগুলো ঝেড়ে ফেলা দরকার।”
সে সুমুর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বুকের ওপর রাখল। সুমু অনুভব করল শেরাজের হৃদস্পন্দনের ছন্দ। শেরাজ আবার বলল, “চোখ বন্ধ করো। জাস্ট ভাবো আমরা এখন সাজেকের সেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে জোনাকি দেখছি। আমি আছি তো তোমার পাশে। এখন শুধু শান্তিতে একটু ঘুমাও।”
শেরাজের আশ্বাসে সুমুর অস্থির মনটা ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করল। সে শেরাজের বাহুলগ্নে নিজেকে সঁপে দিল। শেরাজ ঘুমন্ত সুমুর দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, “তোমাকে আমি এই পৃথিবীর সব অন্ধকার থেকে আগলে রাখব, সুইটহার্ট।” একটু থেমে আবারও বলল, “রাজহাঁস সাধারণত সারাজীবনের জন্য একটিই সঙ্গী বেছে নেয়, যা তাদের অগাধ বিশ্বস্ততার প্রতীক। ঠিক তেমনি, আমি আমার পুরোটা জীবনের জন্য কেবল একজনকেই বেছে নিয়েছি—সেটা তুমি। ইউ আর মাই সোয়ান।”
ভোরের প্রথম আলো জানালার পাতলা পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতর এসে লুটোপুটি খাচ্ছে। শেরাজ বিছানা ছাড়ল। সে ধীরপায়ে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। বেশ কিছুক্ষণ ওয়ার্কআউট করে শরীরের রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে নিয়ে রুমে ফিরল।
সুমু এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। শেরাজ তোয়ালে দিয়ে ঘাড়ের ঘাম মুছতে মুছতে বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। সুমুর নিষ্পাপ আর শান্ত মুখটার দিকে তাকালে মনেই হয় না কাল রাতে এই মেয়েটি ভয়াবহ মানসিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে। তার এলোমেলো চুলগুলো বালিশের ওপর ছড়িয়ে আছে। শেরাজ সুমুর মাথার কাছে বসে তার কপালে আলতো করে নিজের হাতের স্পর্শ দিয়ে খুব নিচু স্বরে গুঞ্জরণ করে উঠল,
“ঘুম ঘুম স্বপনে শুধু তোরই বসবাস,
তোকে লিখে দিয়েছি মনেরই নীল আকাশ।
ওওও তোরে ছাড়া থাকা যায়না,
ওরে আয়না কাছে আয়না,
দূরে গেলে যাই যে পুড়ে একি শিহরণ. .
জানিনা জানিনা আমি কি যে করি এখন
বুঝিনা বুঝিনা তোর মনটা পাব কখন।”
শেরাজ গান গাইতে গাইতে সুমুর হাতের একটা আঙুল নিজের হাতে নিয়ে খেলা করতে লাগল। তারপর সুমুর কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। সুমু ঘুমের ঘোরেই যেন সেই স্পর্শ অনুভব করল, আর তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
শেরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “এই হাসিটুকুর জন্যই আমি দুনিয়ার যে কোনো রক্তক্ষয়ী লড়াই লড়তে প্রস্তুত।
সে ঘড়ি দেখল—আজ অনেক স্পেশাল একটা দিন। সুমুর দীর্ঘ শ্রমের ফসল ‘খান সাহেব’ বইটির আজ চূড়ান্ত প্রহর। সে প্রস্তুত হতে শুরু করল, যেন আজ সব প্রতিকূলতা জয় করে সে তার প্রিয়তমাকে সাফল্যের চূড়ায় বসাতে পারে।
শেখবাড়ির ড্রয়িংরুমে উৎসবমুখর। সিঁড়ি দিয়ে শেরাজ আর সুমু যখন একসাথে নেমে এলো, তখন ড্রয়িংরুমের আনন্দ যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
ড্রয়িংরুমে যেন চাঁদের হাট বসেছে। সাহাবাজ খান, শামীম সাহেব আর সাখাওয়াত সাহেব গদিতে বসে নিচু স্বরে আলাপ করছেন। হাসি বেগম, অনন্যা খাতুন আর রুমা বেগমরা মিলে সুমুকে মিষ্টিমুখ করানোর প্রস্তুতি সেরে রেখেছেন।
সুমু সামনে আসতেই মাজেরা বেগম আর আশাবানু হাত বাড়িয়ে ওকে কাছে টেনে নিলেন। মাজেরা বেগম কাঁপাকাঁপা হাতে সুমুর চিবুক ছুঁয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন, “আজ তোর স্বপ্ন পূরণের দিন। আল্লাহর দোয়ায় তোর এই কলম যেন আজীবন সত্য আর সুন্দরের কথা বলে।”
আইয়ুব ফুরফুরে মেজাজে বলে উঠল, “এস.কে, ভাবিজির কাছে কি আমরা এখন থেকেই অটোগ্রাফের জন্য লাইনে দাঁড়াব?”
শেরাজ স্মিত হেসে সুমুর কাঁধে হাত রাখল। পিয়াস আর ইফতিয়া, রাহিন আর সামিয়া— প্রতিটি দম্পতিই আজ সুমুর এই অর্জনে সমানভাবে আনন্দিত। স্যান্ডি আর নাতাশা তো সব কাজ গুছিয়ে আগেভাগেই রেডি। নাতাশা সুমুর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “আপনার জন্য অনেক অনেক অনেক শুভকামনা, ম্যাম।”
ইশিতা, ইনায়া, ফারিয়া সবাই সুমুকে শুভকামনা জানাল। রিয়াজ, ফিরোজা আর শাহরুখ সুমুকে নিয়ে দুষ্টুমি করতে লাগল। এদিকে বাচ্চাদের কাণ্ড দেখে হাসির রোল পড়ল পুরো ঘরে। সিমরান তার ছোট হাতে একটা ডায়েরি নিয়ে ঘুরছে, যেন সে-ও রাইটার। নিশান, রুহি আর হাসফারা মিলে ঠিক করেছে তারা সবাই লাইব্রেরিতে গিয়ে সুমুকে ঘিরে একটা মানব-শৃঙ্খল তৈরি করবে। শেরান বরাবরের মতো শান্ত, সে তার নানুভাই শামীম সাহেবের হাত ধরে দেখছিল সবার এই হুল্লোড়।
অনন্যা খাতুন আর সাহাবাজ খান, সুমু আর শেরাজকে সামনে ডেকে পরম মমতায় দোয়া করে দিলেন।
সাহাবাজ খান কোমল স্বরে বললেন, “সুমু মামনি, তোমার পরিশ্রম সার্থক হোক। আমরা গর্বিত যে আমাদের ঘরের মেয়ে আজ লেখিকা হতে যাচ্ছে।”
পুরো পরিবার দরজার দিকে পা বাড়াল। বাইরের এক সারিতে সব গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে। আইয়ুব, সারবাজরা ড্রাইভিং সিটে বসে হর্ন বাজিয়ে জানান দিচ্ছে—দেরি সইছে না আর। সুমু একবার পেছন ফিরে তার বাড়ির দিকে তাকাল।
শেরাজ তার হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ধীরস্থির গলায় বলল, “চলুন লেখিকা সাহেবা, আজ আপনার কলম আর আমার ভালোবাসা মিলে নতুন ইতিহাস লিখবেন।”
•
রাজধানীর ব্যস্ততম রাজপথের এক কোণে অবস্থিত সেই পাবলিকেশন হাউজটি আজ যেন এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। চারদিকে বইপ্রেমী পাঠকদের গুঞ্জন, হাসাহাসি আর গণমাধ্যমকর্মীদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশের ঝলকানি। এই উৎসবমুখর হট্টগোলের মাঝে যখন বিশাল গাড়ি বহর এসে থামল, তখন উপস্থিত সবার দৃষ্টি সেদিকে নিবদ্ধ হলো। গাড়ি থেকে শেরাজ আর সুমু নামল। তাদের পেছনেই পুরো বাহিনী—আইয়ুব, নিহাল, অমিতদের টিম।
পাবলিকেশন হাউজের ভেতরে সুমুর জন্য নির্ধারিত মঞ্চটি সাজানো হয়েছে সাদা, পার্পেল আর নীল রঙের টিউলিপ ফুল দিয়ে। সুমু যখন মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন তার দুপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে তার আপনজনেরা। রাহিন-সামিয়া, নাজমিন-আইয়ুব, স্যান্ডি-নাতাশা, শাহরুখ-ফারিয়া, পিয়াস-ইফতিয়া সবার চোখে আজ গর্ব।
ইনায়া আর ইশিতা ফিসফিস করে বলল, “আজকের সন্ধ্যাটা শুধুই আমাদের সুমুর, ওর কলমের জাদুর কাছে আজ আমরা পরাস্ত।”
সিমরান আর রুহি তাদের ছোট্ট হাতে সুমুর বইয়ের প্রথম কপিটা আগলে ধরে মঞ্চের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। সিমরান বারবার তার পাপা দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় যেন বলছে, “দেথো পাপা, আমাল মাম্মা নাইতাল!”
শেরান শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার চোখে মায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। নিশান আর হাসফারা নিজেদের মধ্যে তর্কে মেতেছে কে আগে সুমুর অটোগ্রাফ নেবে।
প্রকাশক মহোদয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে সুমুর পরিচয় করিয়ে দিল। শেরাজ মঞ্চের ঠিক সামনের সারিতে বসা। তার তীক্ষ্ণ আর গর্বিত দৃষ্টি কেবল সুমুর ওপরেই স্থির। তার সাথে ফিরোজা, রিয়াজ, শাহরুখ, ফারিন, তিশা, রাইফরা সবাই বসে আছেন।
যখন সুমুকে মাইক্রোফোনের সামনে ডাকা হলো, তখন পুরো হলরুমে করতালির ঢেউ বয়ে গেল। সুমু একপলক শেরাজের দিকে তাকাল। তারপর কাঁপা হাতে মাইক্রোফোনটা ধরল। তার সামনে বসে আছে তার পুরো পৃথিবী—তার স্বামী, তার সন্তান, আর একঝাঁক নিঃস্বার্থ বন্ধু ও আত্মীয়। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলতে শুরু করল, “‘খান সাহেব’ কেবল একটি উপন্যাস নয়, এটি একটি জীবনের গল্প, এক কঠিন সংগ্রামের মাঝে এক চিলতে ভালোবাসার গল্প।”
সুমুর কথা শেষ হতেই আইয়ুব হর্ষধ্বনিতে পুরো পাবলিকেশন হাউজ মাথায় তুলল। সারবাজ তখন লেন্সবন্দি করছিল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যেখানে একজন লেখিকা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন উৎসর্গ করছে তার জীবনসঙ্গীকে।
•
রাত তখন খুব একটা গভীর নয়, ঘড়ির কাঁটা এগারোটা কি বারোটার ঘর ছুঁইছুঁই। পাবলিকেশন হাউজের কাজ শেষে শেখবাড়িতে ফেরার পর থেকেই আনন্দের অন্তহীন স্রোত বয়ে যাচ্ছিল। আত্মীয়-পরিজন আর বন্ধুদের প্রাণবন্ত আড্ডার মধ্যমণি হয়ে সুমু এতক্ষণ নিচেই ছিল। দীর্ঘ ধকল শেষে শরীর আর মন যখন বিশ্রামের জন্য ব্যাকুল, তখন সে শেরানকে নিয়ে ধীরপায়ে নিজের শয়নকক্ষে প্রবেশ করল।
রুমে ঢুকেই সুমু থমকে গেল। শেরাজ আর সিমরান তো ঘণ্টাখানেক আগেই উপরে চলে এসেছিল, কিন্তু বিছানাটা এখন খাঁ খাঁ করছে। সুমু ভ্রু কুঁচকে চারপাশটা একবার দেখে নিল। বিস্ময়ভরা চোখে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে তাকাল। শেরাজের ঘড়িটা টেবিলের ওপর অযত্নে পড়ে আছে, যার অর্থ সে বাড়ির বাইরে কোথাও যায়নি।
সুমু শেরানকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে মনে মনে ভাবল, এই অসময়ে বাপ-বেটি উধাও হলো কোথায়? কক্ষের শূন্যতা সুমুর মনে কৌতূহল আর মৃদু আশঙ্কার জন্ম দিল। বিড়বিড় করে নিজেকেই সুধাল, “এগারোটার পর তো দুজনেই রুমে এলো, এখন তবে গেল কোথায়?”
হঠাৎ একজোড়া বলিষ্ঠ হাত পেছন থেকে এসে তার কোমরবেষ্টন করল। চেনা স্পর্শে সুমুর ওষ্ঠাধরে এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। আলতো করে সেই বাঁধন ছাড়িয়ে শেরাজের দিকে ফিরল, তারপর পরম আবেশে শেরাজের গলা জড়িয়ে ধরে শুধাল, “কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলেন?”
শেরাজ ওর চোখের মণিদ্বয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজতে খুঁজতে অত্যন্ত গম্ভীর আর আর্দ্র স্বরে বলল, “আমার ‘সোয়ান’-এর জন্য এক অমোঘ সারপ্রাইজ সাজাতে।”
সুমু ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তাই নাকি?”
শেরাজ মাথা হেলিয়ে সায় দিল, “জি ম্যাডাম!”
ঠিক সেই মুহূর্তে ছোট্ট সিমরান এসে সুমুর আঁচল টেনে ধরল। তার ডাগর চোখে তখন রাজ্যের খুশী। সে আধো আধো গলায় বলল, “মাম্মা চনো! আমি আর পাপা তত্তো চুন্দর তলে সবতা তলেছি।”
সুমু হাঁটু গেড়ে বসতেই সিমরান আর শেরান দুই দিক থেকে ঝাপিয়ে পড়ে মায়ের দুই গালে আদরের বৃষ্টি নামাল। এই দৃশ্য দেখে শেরাজ নিজেও নিচু হয়ে বসল। সে কৃত্রিম অভিমানী কণ্ঠে বলল, “বা রে! আমি বুঝি বাদ থেকে যাব?”
বাবার এমন অসহায়ত্ব দেখে দুই ভাই-বোন খিলখিল করে হেসে উঠল এবং একযোগে শেরাজের দুই গালে চুমু খেল। শেরাজ সজোরে দুজনকে দুই বাহুতে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। সুমুর দিকে সম্মোহনী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আহ্বান জানাল, “চলুন রাণী সাহেবা! আমার তৈরি দুনিয়ায় আপনাকে সশরীরে নিয়ে যাই।”
বাবার কোল থেকে দুই ভাই-বোন যেন এক জোড়া ফড়িংয়ের মতো ডানপিটে চালে আগে আগে ছুটে গেল। শেরাজ সুমুকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসাল।
কাবার্ডের কোণ থেকে সে বের করে আনলো পোশাক—বেগুনি, নীল, গোলাপি আর শুভ্রতার সংমিশ্রণে তৈরি একটি ‘হানফু’ ড্রেস। সাথে হেয়ার ক্লিপ আর কারুকার্যময় হেয়ার ব্যান্ড।
শেরাজ আজও যেন দক্ষ শিল্পী হয়ে উঠল। সে পরম মমতায় নিজ হাতে সুমুকে সাজিয়ে তুলল। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সুমুর হঠাৎ মনে পড়ল, ঠিক এমন একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ তো কিছুক্ষণ আগে সিমরানের গায়েও শোভা পাচ্ছিল!
সাজসজ্জা শেষে শেরাজ দুই হাত পকেটে গুঁজে সুমুর ঠিক পেছনে দাঁড়াল। আয়নার ভেতর দিয়ে সুমুর চোখের মণিদ্বয়ে চোখ রেখে গম্ভীর স্বরে বলল, “চলো!”
শেরাজের পিছু পিছু সুমু বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলো। সে কিছুটা চঞ্চল পায়ে আগে আগে হাঁটছিল। শেরাজ তখন ফোনে অত্যন্ত ব্যস্ত, যেন কোনো জরুরি আলাপ সারছে। কিন্তু মুহূর্তের ব্যবধানে দৃশ্যপট বদলে গেল। শেরাজ ফোনটা পকেটে পুরে হাঁটতে থাকা সুমুকে এক ঝটকায় ঘুরিয়ে এক হাতে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল।
সুমু আকস্মিক ও হুটহাট কাণ্ডে একদম অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তার হৃদপিণ্ড যেন এক লাফে গলায় এসে ঠেকল। এই অতর্কিত আক্রমণে খানিকটা ভীত স্বরে সে অস্ফুট এক চিৎকার দিয়ে উঠল। অপ্রস্তুতভাবে হন্তদন্ত হয়ে সে শেরাজের শক্ত কাঁধ আঁকড়ে ধরল। খানিকটা থতমত খেয়ে কাঁপা গলায় বলে উঠল, “খান সাহেব! একি উন্মাদনা শুরু করলেন? ছাড়ুন আমায়, কেউ দেখে ফেলবে তো!”
শেরাজ ভ্রুক্ষেপহীন। তার বাহুদ্বয়ের বাঁধন আরও দৃঢ় হলো। সুমু তার বুকের ধকধকানি অনুভব করতে করতে আবারও অনুযোগের সুরে বলল, “আপনার এই অকারণ দুঃসাহসিকতা মাঝেমধ্যে বড্ড ভীতিপ্রদ হয়ে ওঠে। নামিয়ে দিন বলছি, এভাবে কতদূর যাবেন?”
শেরাজ স্মিত হাসল। সুমু বুঝতে পারল, এই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মানুষটির জেদের কাছে আজ আবারও তার সব প্রতিবাদ ম্লান। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শেরাজের বুকের ওমে নিজের কপাল ঠেকাল।
স্পট থেকে কিছুটা ব্যবধানে সুমুকে সাবধানে নিচে নামাল সে। সুমু স্থির হয়ে দাঁড়াতেই তার সম্মুখপানে অপার্থিব সুন্দর দৃশ্য উন্মোচিত হলো। বিস্তীর্ণ খোলা আকাশের নিচে জাঁকজমকপূর্ণ ‘ক্যান্ডেল লাইট ডিনার’-এর আয়োজন। মোমবাতির শিখাগুলো হাওয়ায় থরথর করে কাঁপছে। ডেকোরেশনের প্রতিটি ছত্রে ছড়িয়ে আছে সুমু আর শেরাজের অমূল্য মুহূর্তগুলোর ছবি। সেই ফ্রেমবন্দি স্মৃতির মাঝে সুমুর সদ্য প্রকাশিত ‘খান সাহেব’ বইটি চারপাশে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। রঙিন বেলুন, সুগন্ধি পুষ্পরাজি আর নিপুণ আলোকসজ্জার যেন পুরো স্থানটিকে রূপকথার রাজ্যে রূপান্তরিত করেছে।
সুমু বিস্ময়াভিভূত হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। শেরাজ পকেটে হাত দিয়ে পাশে এসে দাঁড়াল। সুমু দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু স্বরে বলল, “এ তো হুবহু আমার উপন্যাসের সেই কাল্পনিক অধ্যায়, খান সাহেব!”
“কল্পনা যখন রক্ত-মাংসে ধরা দেয়, তখনই তো তা পূর্ণতা পায়। উপভোগ করো, সবটা তোমার জন্য।”
সিমরান আর শেরান খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে দৌড়ে এসে ওদের জাপটে ধরল। সুমু দেখল, কিটিও এখানে উপস্থিত। সুমু বসে কিটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। শেরাজ, সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কিটিকে আদর করে কোলে তুলে নিল। কিন্তু কিটি হাওয়ায় মৃদু নড়তে থাকা বেলুন দেখে কোল থেকে নেমে গিয়ে খেলতে শুরু করল।
শেরাজ আলতো হেসে সুমুর হাতে একটা গোলাপের গাজরা পড়িয়ে দিয়ে হাতের ওপর ঠোঁট ছুঁয়ে এগিয়ে গিয়ে সযত্নে বাচ্চাদের জন্য চেয়ার টেনে দিল। খোলা আকাশের নিচে, তারাময় চন্দ্রাতপের তলায় চারজনে মিলে ডিনারে বসল। টেবিলের ওপর মোমদানি আর সুগন্ধি ফুলের সমারোহ। সিমরান তার খুদে আঙুলে একটা চিকেন উইংস তুলে নিয়ে পাপার মুখের সামনে ধরল। শেরাজ পরম মমতায় মেয়ের সেই ছোট্ট গ্রাসটুকু মুখে নিল।
শেরান শান্ত ভঙ্গিতে সুমুর পাশে বসে ডিনার উপভোগ করছে। সুমু মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল তার এই ছোট্ট পৃথিবীর দিকে। শেরাজ সুমুর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “উপলব্ধি করছ সুমু? এই পরিপূর্ণতাটুকুই ছিল আমার শেষ লক্ষ্য।”
সুমু মৃদু হাসল। সিমরান হঠাৎ গ্লাস উঁচিয়ে আধো আধো গলায় বলে উঠল, “হ্যাপি বুত মাম্মা!”
সুমু মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। হঠাৎ ওপর থেকে তুষারশুভ্র পার্টি স্প্রে ঝরতে শুরু করল। শেরাজ সুমুর চোখের মণিদ্বয়ে স্থির দৃষ্টি রেখে উদাত্ত কণ্ঠে বলতে শুরু করল, “সুইটহার্ট, আমার এই রিক্ত হৃদয়ের হাহাকার কোনো পার্থিব বস্তুর প্রত্যাশী নয়। আমি তো সেই অভিশপ্ত সম্রাট, যে তার সমস্ত আভিজাত্য বিসর্জন দিয়ে আজ তোমার ওই মায়াবী চাহনির গোলকধাঁধায় স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেছে।”
সুমু মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল। শেরাজ তার হাতটা নিজের তপ্ত করপুটে নিয়ে পুনরায় গুঞ্জরিত করল, “বিস্মৃতির দুর্ভেদ্য প্রাচীর যখন আমায় ঘিরে ধরেছিল, তখন আমার অস্তিত্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু কেবল তোমারই নামের জপমালা গেঁথেছে। তুমিই আমার বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী সুধা।”
সুমুর চোখের কোণে এক ফোঁটা আনন্দাশ্রু চিকচিক করে উঠল। সে শেরাজের হাতের ওপর নিজের অন্য হাতটি রেখে সিক্ত কণ্ঠে উত্তর দিল, “খান সাহেব, আপনার এই অমোঘ আকর্ষণ আমায় তিলে তিলে আপনার ঐশ্বরিক প্রেমের কিনারে টেনে নিয়ে গেছে। আমি তো সেই তৃষ্ণার্ত আত্মা, যে আপনার নিবিড় সান্নিধ্যের এক চিলতে অধিকারে নিজের সমস্ত দহন জুড়াতে চায়।”
শেরাজ মৃদু হাসল। সুমু পুনরায় ম্লান হেসে বলল, “এই বিশাল শূন্যতায় আপনিই আমার একমাত্র ধ্রুবতারা। আমার এই উদভ্রান্ত পথচলা যেন আপনার হৃদস্পন্দনেই এসে শেষ হয়। আমায় এভাবেই আগলে রাখুন চিরকাল।”
সিমরান আর শেরান উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে তাদের বাবা-মায়ের দিকে। শেরাজ সুমুর কপালে এক দীর্ঘ ও উষ্ণ চুম্বন এঁকে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ইউ আর মাই সোয়ান, সুমু। এই রাজত্বে আমাদের প্রেমই হবে অমর উপাখ্যান।”
সুমু মৃদু হেসে বলল, “চলুন, এবার ডিনার শুরু করি।”
টেবিলের ওপর ভোজের সমারোহ। শেরাজ পরম মমতায় এক টুকরো মাংস ছিঁড়ে সুমুর মুখের সামনে ধরল। সুমু কিছুটা সলজ্জ হেসে সেই গ্রাসটুকু গ্রহণ করল এবং প্রতিদানস্বরূপ শেরাজের মুখেও তুলে দিল এক চামচ ফিরনি।
ওদিকে শেরান খুব সাবধানে নিজের প্লেট সামলাচ্ছিল, কিন্তু দুষ্টু সিমরান তার প্লেট থেকে জোর করে এক টুকরো চিকেন তুলে নিয়ে নিজের মুখে পুরে দিল। শেরান ভ্রু কুঁচকে কিছু বলতেই সিমরান চোখ বড় বড় করে, গাল ফুলিয়ে বেশ বিজ্ঞের মতো বলল, “পাপান মেয়ে বনে তথা! পাপা যা তলে, আমানও তাই তলতে হয়। তোমান তাবাল মানেই আমান তাবাল!”
শেরান হেসেই ফেলল। সে নিজের বোনকে এক লোকমা খাইয়ে দিতে দিতে বলল, “আচ্ছা বাবা, তুমি-ই তব থাও।”
সিমরান আয়েশ করে পাপার কাঁধে মাথা রেখে চিবুক উঁচিয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর মুখে বলে উঠল, “মাম্মা, পাপা তো আমান হিনো! পাপা দেমন তোমাতে আদল তলে, তেমন আমাতেও তলে! আমিও বনো হনে তানো বউ হবো।”
সিমরানের পাকা কথায় শেরাজ অট্টহাসি হাসতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল। সে মেয়ের নাকে একটু ক্রিম মাখিয়ে দিয়ে বলল, “বড় হলে তো তুমি এমনিতেই অন্য কারও রাণী হবে, মাম্মা!”
সিমরান তড়িৎবেগে মাথা নেড়ে প্রতিবাদ জানাল, “উঁহু! আমি তুধু বউ হব।”
সুমু মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল এই দৃশ্যটির দিকে। শেরাজ দুই সন্তানকে দুই বাহুতে আগলে নিয়ে সুমুর চোখের দিকে তাকাল।
সিমরান হঠাৎ হাত বাড়িয়ে ওপর থেকে ঝরে পড়া সেই তুষারধবল কণাগুলো ধরার এক বিফল চেষ্টায় রত হলো। সে উত্তেজিত স্বরে বলে উঠল, “পাপা! আমি এই বনফ ধলব, আমায় ধলিয়ে দাও!”
শেরাজ মেয়ের এই অবুঝ আবদার দেখে মৃদু হাসল। সে সিমরানের চিবুক ছুঁয়ে শান্ত গলায় বলল, “এগুলো তো কৃত্রিম তুষারপাত, মাম্মা। আমাদের সব কাজ সম্পন্ন হোক, আমি তোমায় শুভ্র বরফের দেশে সশরীরে নিয়ে যাব।”
কিন্তু জেদি সিমরান আজ কোনো যুক্তির ধার ধারল না। তার ওইটুকু মুখে তখন এক আকাশ অভিমান। শেরাজ আর দ্বিধা করল না, সে এক ঝটকায় সিমরান আর শেরানকে দুই বাহুতে তুলে নিয়ে কৃত্রিম বরফবৃষ্টির মাঝে নেমে পড়ল। শুরু হলো এক আনন্দময় কাণ্ড! শেরাজ দুই সন্তানকে নিয়ে তুষারকণা লোফালুফির খেলায় মেতে উঠল।
সুমু মন্ত্রমুগ্ধের মতো দৃশ্যটি উপভোগ করছিল। হঠাৎ তার দৃষ্টি স্থির হলো টেবিলের ওপর রাখা ‘খান সাহেব’ বইটির ওপর। বইটির ঠিক পাশেই একটি স্ফটিক পাত্রে সাজানো রয়েছে বেগুনি, গোলাপি, শুভ্র আর নীলচে টিউলিপের এক অপূর্ব তোড়া। বইটির ওপরে একটি টকটকে তাজা গোলাপ রাখা। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই সুমুর নজরে এলো একটা অদ্ভুত বিষয়। সুবিন্যস্ত বইটির ভাঁজে অতি সন্তর্পণে কিছু একটা গুঁজে রাখা হয়েছে। সে কৌতূহলী হাতে বইটির ভাঁজ থেকে বের করে আনল একটি হলদেটে, পুরনো ঘরানার পার্চমেন্ট সদৃশ কাগজ। ভাঁজ খুলতেই পরিচিত হস্তাক্ষর তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সে একবার বাচ্চাদের সাথে দুষ্টুমি করতে থাকা শেরাজকে দেখে নিয়ে পড়তে শুরু করল,
“আমার অর্ধাঙ্গিনী,
জানিনা কোনো লেখকের কাছে মনের অর্গল খুলে ধরা কতটা ধৃষ্টতা, কারণ শব্দ তো তোমারই আজন্ম সখা। তবুও আজ হৃদয়ের গহীনে জমে থাকা কিছু অব্যক্ত কথা কলমের ডগায় সঁপে দিলাম। আজ যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষের মুগ্ধ চোখের সামনে তুমি কথা বলছিলে, তখন আমার কেবলই সেই ধূসর অতীত মনে পড়ছিল। আমি তো ছিলাম এক রুক্ষ মানুষ, যে কেবল শাসন আর দাপটের ভাষাই রপ্ত করেছিল। কিন্তু অতর্কিতে তুমি এলে, আর আমার সেই মরুময় জীবনে বসন্তের রঙ ছড়িয়ে দিলে। তোমাকে দেখলে মনে হয়, কোনো শক্তিমান ঔপন্যাসিক তার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের সবচেয়ে মায়াবী চরিত্রটি সৃষ্টি করতে গিয়ে তোমাকে প্রাণ দিয়েছেন। তুমি আমার অস্তিত্বের সেই ধ্রুবতারা, যাকে লক্ষ্য করে আমি দিকভ্রান্ত নাবিকের মতো বারবার আপন গন্তব্য খুঁজে পাই।
লোকে বলে সময়ের স্রোতে ভালোবাসা, মুগ্ধতা ফিকে হয়ে যায়, কিন্তু তোমাকে দেখার সেই আদিম মুগ্ধতা আজও আমায় আচ্ছন্ন করে রাখে। আমার এই অগোছালো জীবনের পাণ্ডুলিপিতে তুমি এক অনিবার্য বসন্তের মতো আগন্তুক। তুমি আমার জীবনে আছো বলেই আমি মানুষ হিসেবে এতটা পূর্ণতা পেয়েছি। জানো তো, কিছু অনুভূতি সামনাসামনি বলতে গেলে কেমন যেন এক দুর্ভেদ্য আড়ষ্টতা মানুষকে ঘিরে ধরে, অথচ নির্জনে কাগজের বুকে আর কলমের ডগায় তারা বড্ড বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করে। জানিনা গত কয়েক বছরে তোমাকে ঠিক কতবার বলা হয়েছে যে আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি। কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত বিশেষণের সমাহার করলেও তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার গভীরতা পরিমাপ করা অসম্ভব। তুমি কেবল আমার সহধর্মিণী নও, তুমি আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের ছন্দ, আমার প্রতি প্রার্থনার আদি ও অন্ত। তোমার চোখে চোখ রাখলে আজও আমি সেই প্রথম দিনের মতোই মুগ্ধ হই। আমার এই সাদামাটা জীবনকে তুমি যেভাবে মমতা দিয়ে আগলে রেখেছ, তা কোনো ধ্রুপদী রূপকথার চেয়ে কম কিছু নয়।
আমার জীবনে আসার জন্য তোমাকে এক আকাশ কৃতজ্ঞতা। তোমার উপস্থিতিতে আমার ঘর আজ এক টুকরো স্বর্গ। কিন্তু তোমার কাছে এর চেয়েও বড় ঋণ সেই উপহারের জন্য, যা তুমি আমায় দিয়েছ—আমার কলিজার টুকরো সিমরান আর শেরান। ওরা আমার জীবনে সবথেকে দামী উপহার। আমাদের এই ক্ষুদ্র নীড়কে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য আর আমাদের সন্তানদের মাঝে তোমার সুন্দর গুণগুলো বুনে দেওয়ার জন্য আমি তোমার কাছে আজন্ম ঋণী। আমি হয়তো গুছিয়ে কথা বলতে পারিনা, হয়তো কাজের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সবসময় তোমার হাতটি ধরা হয় না, কিন্তু বিশ্বাস করো সুইটহার্ট, আমার প্রতিটি হৃদস্পন্দনে শুধু তুমি আর আমাদের ওই দুই প্রাণভোমরা মিশে আছে। সুইটহার্ট, আমি হয়তো কোনো নিখুঁত মানুষ নই, হাজারো খুঁত আমার মধ্যেও আছে, কিন্তু তোমার জন্য একজন শ্রেষ্ঠ স্বামী আর সিমরান-শেরানের জন্য একজন শ্রেষ্ঠ বাবা হওয়ার চেষ্টা আমি আমরণ করে যাবো। আমি চাই আমাদের এই ছোট্ট নীড়টি সবসময় এভাবেই মায়া আর ভালোবাসায় ভরে থাকুক।
আজ এই চারপাশের সৌন্দর্যের বিশালতা আমাদের ভালোবাসার সাক্ষী থাক যে, শেরাজ খান তার অন্তিম নিঃশ্বাস পর্যন্ত তোমাদের তিনজনকে আগলে রাখবে। তোমার সাফল্যের এই ক্ষণে আমার কেবল একটিই আকুতি— আমাদের এই ছোট্ট পৃথিবীটা যেন এভাবেই অমলিন আর রঙিন থাকে।
ইতি,
তোমার প্রেমিক পুরুষ, তোমার ‘খান সাহেব’।”
চিঠিটা পড়া শেষ করে সুমু দীর্ঘক্ষণ স্থির হয়ে রইল। তার চোখের কোণটা সামান্য ভিজে উঠলেও ঠোঁটের কোণে লেগে রইল প্রশান্তির হাসি। সে অতি সন্তর্পণে চিঠিটা পুনরায় বইয়ের ভাঁজে গেঁথে রাখল। টেবিল থেকে কয়েকটা তাজা সাদা, পার্পেল আর গোলাপি টিউলিপ হাতে নিয়ে সে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল।
শেরাজ তখন দুই সন্তানকে নিয়ে দুষ্টুমিতে মেতে। সুমুকে এগিয়ে আসতে দেখে সে মিষ্টি করে হেসে ওর কোমর জড়িয়ে নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল, “ভালোবাসি।”
সুমু মৃদু হাসল, সে শেরাজের চোখের মণিদ্বয়ে স্থির দৃষ্টি রেখে খানিকটা অভিমানী সুরে শুধাল, “এই যে কথায় কথায় ‘ভালোবাসি ভালোবাসি’ করে আমায় পাগল করেন, সেই ভালোবাসার গূঢ় সংজ্ঞা কি আদেও বোঝেন আপনি?”
শেরাজ মুহূর্তকাল স্তব্ধ হয়ে রইল। সে সুমুর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে গম্ভীর স্বরে বলতে শুরু করল, “পৃথিবীর ইতিহাসে কত সহস্র কবি ভালোবাসাকে নিয়ে অগণিত কবিতা আর মহাকাব্য রচনা করেছেন, অথচ কেউ কখনো তার প্রকৃত রূপের সঠিক বর্ণনা দিতে পারেননি। ভালোবাসা বরাবরই ছিল এক অদৃশ্য অনুভূতি। কিন্তু তোমাকে দেখার পর আমার মনে হলো, সেই না-দেখা ভালোবাসার যদি কোনো রক্ত-মাংসের অবয়ব থাকতো, তবে সে নিশ্চিতভাবেই তোমার মতোই হতো। আমার মাঝে মাঝে এও মনে হয়, স্রষ্টা বুঝি এই মহাবিশ্বে ভালোবাসাকে একটি দৃশ্যমান রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তোমাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যদি ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র থাকতো, তবে তার প্রতিটি পথের শেষ গন্তব্য হতে শুধু তুমি। রূপহীন সেই পবিত্র অনুভূতির যদি কোনো নাম থাকতো, তবে সেই নামটি হতো— শুধু তুমি আর তুমিই!”
সুমু, শেরাজের প্রশস্ত বুকে নিজের হাত রেখে বলল, “খান সাহেব, আপনার এই অমোঘ প্রেমের আবর্তে আমি বারবার দিশেহারা হই। যদি ভালোবাসার কোনো অন্তিম আশ্রয় থাকত, তবে সে নিশ্চিতভাবেই আপনার এই বলিষ্ঠ বাহুডোর। আমার সমস্ত অস্তিত্বের পাণ্ডুলিপিতে আপনিই সেই ধ্রুব সত্য, যাকে ছাড়া জীবনের প্রতিটি পৃষ্ঠা বড় বেশি বিবর্ণ ও অসম্পূর্ণ।”
“সুইটহার্ট, আমার এই রুক্ষ মরুজীবনে তুমি এক অনিঃশেষ সঞ্জীবনী সুধা। মহাকালের স্রোত যখন সব স্মৃতি ধুয়ে মুছে নিয়ে যাবে, তখনও আমার এই তপ্ত হৃদস্পন্দনে কেবল তোমারই নামের জপমালা ধ্বনিত হবে। তুমিই আমার অন্ধকার জগতের একমাত্র ধ্রুবতারা, যার আলোয় আমি নিজের মুক্তির পথ খুঁজে পাই।”
সুমু আলতো হাসল। শেরাজ তাকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে গেয়ে উঠল,
“তোর নাম এই বুকে, রাখবো লিখে
তুই ছাড়া ভাল লাগেনা।
মনটা কথা শোনেনা,
তোর কাছে ছুটে আসে,
তাইতো পড়ে আছি,
তোর পাড়ার আশেপাশে।”
গান থামিয়ে সে পরম মমতায় সুমুর চিবুকটি উঁচিয়ে ধরল। অতি সাবধানে সুমুর ললাটে এক দীর্ঘ ও উষ্ণ চুম্বন এঁকে দিল। সিমরান আর শেরান খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে দৌড়ে এসে ওদের মাঝে ঢুকে পড়ল। সুমুও এবার যোগ দিল বাচ্চাদের উম্মাদনায়। চারজনে মিলে শুভ্র কণাগুলো লোফালুফির এক মহোৎসবে মেতে উঠল। সিমরান তার পাপার গায়ে স্প্রে মাখিয়ে দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, আর শেরান সুমুর হাত ধরে হাসছে।
হঠাৎ সুমু, শেরাজকে ডেকে বলল, “আপনারা একটু এখানে অপেক্ষা করুন, আমি এখনই আসছি।”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে সুমুর চোখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা সন্দিগ্ধ স্বরে শুধাল, “কোথায় যাচ্ছ এই অসময়ে?”
সুমু এক চিলতে হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে আশ্বস্ত করল, “ভয় নেই খান সাহেব, বিশেষ প্রয়োজনে যাচ্ছি। অতি শীঘ্রই ফিরব।”
শেরাজ কিছু বলার আগেই সুমু চটপটে পায়ে পা বাড়াল। ঝোপঝাড়ের আড়ালে পৌঁছাতেই তার তীক্ষ্ণ নজর আটকে গেল এক রহস্যময়ী অবয়বের ওপর।
আবছায়া আলোয় দেখা গেল, এক নারী অত্যন্ত সন্তর্পণে মুখ লুকিয়ে প্রস্থান করার উপক্রম করছে। সুমু এক মুহূর্ত দেরি না করে গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ দিল, “দাঁড়ান! আর এক পা-ও নড়বেন না।”
নারীটি সেখানেই স্থবির হয়ে গেল। কিন্তু সে একবারের জন্যও সুমুর দিকে ফিরে তাকাল না। সুমু ধীর পায়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করল, “কে আপনি? আর আমাদের কেন অনুসরণ করছেন? দূর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে কি দেখছেন?”
নারীটি দীর্ঘক্ষণ নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ সে আবারও ঘুরে দাঁড়াল। সুমু কিছু বুঝে ওঠার আগেই নারীটি তার হাতের মুঠোয় একটি ভাঁজ করা চিরকুট গুঁজে দিল। সুমু বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তাকে কোনো সুযোগ না দিয়েই নারীটি অন্ধকারের গহীনে মিলিয়ে গেল।
সুমু ছায়ামূর্তিকে ধরার জন্য ক্ষিপ্রবেগে কয়েক পা ছুটে গেল, কিন্তু নারীটি যেন কর্পূরের মতো উবে গেল। সুমু থমকে দাঁড়িয়ে ধীরহস্তে চিরকুটটা খুলল। চাঁদের ম্লান আলোয় অক্ষরের রেখাগুলো তার চোখের সামনে ফুটে উঠল—কোনো নাম নেই, নেই কোনো পরিচয়, আছে কেবল একটা সংকেত—
“আমি কে জানতে হলে নিচের ধাঁধাটির সমাধান খুঁজে বের করুন। যদি সমাধান খুঁজে পান তাহলে বুঝে নিবেন আমি সেই মানুষটার নিকটের কেউ।”
নিচে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা চার লাইনের একটি ধাঁধা,
“খাদ্য আমার শুষ্ক কাষ্ঠ, পবন আমার প্রাণ,
পরশ পেলে ছাই করি সব, করি রূপ ম্লান।
জন্ম আমার ঘর্ষণ হতে, বিনাশ করি ডর,
পবন যখন রোষে মাতে, হই সর্বনাশর।”
সুমু চিরকুটের লেখাগুলোর ওপর আঙুল বুলাল। ধাঁধাটির উত্তর তার মস্তিষ্কের কোণে বিদ্যুৎচমকের মতো খেলে গেল—‘আগুন’, সে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে অস্ফুট স্বরে পুরো নামটি উচ্চারণ করল, “‘আগুন তালুকদার’।”
সুমুর ঘোরগ্রস্ত ভাবনার মায়াজাল ছিন্ন করে শেরাজের গম্ভীর কণ্ঠস্বর কানে ভেসে এলো। সে দ্রুত চিরকুটটা সযত্নে লুকিয়ে ফেলে ফিরে এলো তাদের ছোট পৃথিবীর মাঝখানে। অবলীলায় শেরানকে কোলে তুলে নিল সে।
শেরাজ তার তীক্ষ্ণ ও কৌতূহলপূর্ণ দৃষ্টিতে সুমুকে একবার মেপে নিল, কিন্তু এই আনন্দের মুহূর্তে কোনো অপ্রীতিকর প্রশ্ন করে তালভঙ্গ করল না। বরং সিমরানকে কোলে তুলে নিয়ে সামনের দিকে ইশারা করে বলল, “ঐ দেখো, ওখানে টেন্ট টানানো হয়েছে। আজ রাতটা এই উন্মুক্ত গগনতলে নক্ষত্ররাজির নিচেই কাটাব আমরা। সবকিছু ভুলে একটু ভিন্নভাবে।”
সুমু শেরাজের বলিষ্ঠ বাহুর আশ্রয়ে নিজেকে সঁপে দিয়ে এক চিলতে ম্লান হাসল। শেরাজের চোখের মণিদ্বয়ে চোখ রেখে বলল, “আমি আপনাকে অসম্ভব ভালোবাসি, খান সাহেব। কখনো আমাকে আপনার থেকে দূরে যেতে দেবেন না, প্লিজ। আপনি তো আমার সেই ‘খান সাহেব’, যার দোর্দণ্ড প্রতাপের আড়ালে আমার মতো এক সাধারণ মানবী পরম নিশ্চিন্তে নিজের এক টুকরো স্বর্গ খুঁজে পায়।”
শেরাজ সুমুর কপালে আলতো করে নিজের কপাল ঠেকিয়ে নিশ্চয়তার সুরে বলল, “মহাকালের গর্ভে কত সাম্রাজ্য ধূলিসাৎ হয়, কত ইতিহাস বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। কিন্তু আমাদের এই অনুরাগের উপাখ্যান কোনো নশ্বর দলিল নয়। যেখানে তোমার কলমের মায়া আর আমার হৃদয়ের দোর্দণ্ড প্রতাপ মিলেমিশে একাকার হয়েছে, সেখানেই জন্ম নিয়েছে এক অপরাজেয় অবিনশ্বর ভুবন। যুগান্তরের বিবর্তনেও এই ‘শেরাজ খান’ তার রাজত্ব ত্যাগ করতে পারে, কিন্তু তার হৃদয়ের অধিশ্বরীকে নয়। তুমি আমার সেই অবিনশ্বর পাণ্ডুলিপি, যা পড়লে আমার অস্তিত্বের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়। এভাবেই সহস্র দহন, ভালোবাসা, দাপট, গভীর অনুরাগ আর অমোঘ আকর্ষণের মেলবন্ধনে তিলে তিলে গড়ে উঠেছে এক অবিনাশী প্রেমকাব্য— যার নাম ‘সুমুরাজ’।”
সুমু শেরাজের প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শেরাজ সুমুকে নিজের বাহুপাশে আরও নিবিড় করে টেনে নিল। সুমু শেরাজের প্রশস্ত বুকের ওমে মুখ লুকিয়ে চোখ বুজে বলল, “আমার এই ভবঘুরে জীবনের প্রতিটি পৃষ্ঠায় আপনি এক অনিবার্য গল্পের মতো মিশে আছেন। পৃথিবীর সমস্ত শব্দভাণ্ডার যখন ক্লান্ত হয়ে থেমে যায়, তখন আপনার ওই গম্ভীর চাহনিতেই আমি আমার সহস্র কবিতার উত্তর খুঁজে পাই। আপনি আমার সেই প্রশান্তির তটভূমি, যেখানে আছড়ে পড়ে আমার সব দহন নিমেষেই শীতল হয়ে যায়—আপনি আমার মুক্তি, আমার পরম আরাধ্য খান সাহেব।”
সে আড়চোখে একবার শেরাজের দিকে তাকাল। মানুষটি কী নিদারুণ নিশ্চিন্তে তার স্বপ্নের জাল বুনে চলেছে! সুমু মনে মনে আওড়াতে লাগল, ‘কেন সেই বিস্মৃত অতীতের প্রেতচ্ছায়া আবার আমার বর্তমানের দুয়ারে কড়া নাড়ছে? কেন সেই অভিশপ্ত স্মৃতিগুলো পিছু ছাড়ছে না? আমি তো কেবল এক চিলতে স্থিতি চেয়েছিলাম। একটু অবিমিশ্র শান্তি।’
সুমু নিজের অজান্তেই শেরাজের হাতের ওপর শক্ত করে হাত রাখল। তার অন্তরাত্মা যেন মনে মনে অব্যক্ত চিৎকারে কেঁদে উঠল, “আমি আমার সন্তানদের নিয়ে ভালো থাকতে চাই। আর ভালো থাকতে চাই আমার এই খান সাহেবকে নিয়ে। কোনো অশুভ ছায়া, কোনো অদৃশ্য বাধা যেন আমাদের এই ক্ষুদ্র স্বর্গে ফাটল ধরাতে না পারে। বিশ্বাস করুন, আপনাকে ছাড়া আর একটি মুহূর্তও এই বিরহের অগ্নিপরীক্ষায় দগ্ধ হতে পারব না, আমার প্রেমিক পুরুষ, আমার মন-মস্তিষ্কের রাজা, আমার প্রিয় খান সাহেব।”
…অসমাপ্ত…
[গল্পের এই দীর্ঘ পথচলা যখন আজ একটি মোহনায় এসে থমকে দাঁড়াল, তখন মনের কোণে জমে থাকা কিছু কথা আপনাদের সাথে ভাগ করে নিতে চাই। ৪৪০ দিনের এই দীর্ঘ সফর—যা শুরু হয়েছিল ৬ জানুয়ারি ২০২৫-এ এবং আজ ২২ মার্চ ২০২৬-এ এসে যার যবনিকা টানছি—এটি কেবল একটি গল্প ছিল না, ছিল আমার এক টুকরো যাপিত জীবন। ১ বছর ২ মাস এবং ১৬ দিনের এই যাত্রায় আপনারা যারা ছায়ার মতো পাশে ছিলেন, এই কৃতিত্বটুকু আপনাদেরই প্রাপ্য। কিছু উপাখ্যান আসলে কোনোদিনও শেষ হয় না। সুমুরাজের জীবনের সমাপ্তি টানার সাহস নেই বলেই, এই অসমাপ্ত উপাখ্যান। ‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে, শেষ হইয়াও হইল না শেষ’—রবীন্দ্রনাথের সেই সত্যের মতোই এই গল্পের চরিত্রগুলো আপনাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকুক।
তবে বিদায়বেলায় আমি আপনাদের জন্য একটি নিগূঢ় রহস্যের বীজ বুনে দিয়ে গেলাম। সুমুর হাতে আসা সেই ধাঁধা কিংবা সেই ছায়ামূর্তির অন্তর্ধান— এটি কি নিছকই কোনো শেষ, নাকি নতুন কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস? আমি চাই না এই গল্পটি আপনাদের কাছে স্মৃতির পাতায় ধুলো জমা কোনো অধ্যায় হয়ে থাকুক, বরং এক অমীমাংসিত রহস্য হয়ে আপনাদের ভাবনার জগতে ঘুরপাক খাক।
ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা জানবেন। প্রতিটি পূর্ণচ্ছেদ আসলে এক-একটি নতুন বাক্যের সূচনা মাত্র। ‘খান সাহেব’ আর সুমুর এই পৃথিবী আপনাদের মনে বেঁচে থাকুক চিরকাল। আপনাদের জন্য রাখা আরও এক টুকরো ভালোবাসা পড়ুন, ই-বই ‘খান সাহেব (A Love Called SumuRaz)”
https://link.boitoi.com.bd/BH1G8 ]