—বাংলাদেশ—
ঢাকার আকাশে তখনও সকালের কোমল রোদটা পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছেছে তমা মির্জা। শরীরটা ক্লান্ত হলেও মুখে তার সেই ক্লান্তির ছাপ নেই। বরং বহুদিন পর চিরচেনা অস্থান এ আসার এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছে তার ভেতরে।
বাড়িতে ঢুকেই এক মুহূর্তও বিশ্রাম নেয়নি সে।
কাপড় বদলে রান্নাঘরে ঢুকে নিজের হাতে দুপুরের রান্না শেষ করেছে। সাথে এক কাপ চা দোতালায় আজমল সাহেবের রুমে পাঠিয়েছেন। শাশুড়ির পছন্দের ডাল,ভাজি,মাছ সবকিছুই যত্ন করে বানিয়েছে। কাজ শেষ করে হাত-মুখ ধুয়ে এবার এসে বসল বাড়ির পুরোনো বারান্দায়। পুরো বাড়ির মধ্যে শুধু এই সাইট তাই বদলানো হয়নি।
ক্রিম রঙের দোতলা বাড়িটা সবুজ গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে শান্ত,স্নিগ্ধ আর অভিজাত এক সৌন্দর্য নিয়ে। সামনের উঠোনজুড়ে রঙিন ফুলের টব আর খোলা বারান্দাগুলো বাড়িটাকে প্রথম দেখাতেই আপন মনে করিয়ে দেয়।
সেখানে কাঠের মোড়ায় হেলান দিয়ে বসে আছেন ফাতেমা খাতুন।
বয়সের ভারে চুলের বেশিরভাগই সাদা হয়ে গেছে। চোখে পাতলা পাওয়ারের চশমা। সামনে রাখা পিতলের ছোট্ট বাটিতে পানপাতা,সুপারি,চুন,জর্দা সাজানো। হাতে পুরোনো দিনের লোহার সুপারি কাটার। বেশ আয়েশ করেই সুপারি কেটে কেটে পান সাজাচ্ছেন তিনি।
সব কাজ শেষ করে চুপচাপ এসে ফাতেমা খাতুনের পাশের মোড়াটায় বসল তমা মির্জা
মাথাটা হেলান দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। দু'হাত জোড়া করে বসে আছে।
ফাতেমা খাতুন একবারও তাকালেন সেই দিকে। চেহরাটা কি শুখিয়েছে। মনের ভেতর যত ঝড়ই চলুক,মুখে কখনো প্রকাশ পায় না
বৃদ্ধা আগের মতোই ধীরেসুস্থে সুপারি কাটতে লাগলেন
সুপারি কাটার শব্দে চারপাশের নীরবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠলো
অনেকক্ষণ পর তিনিই নীরবতা ভাঙলেন
"কি নিয়ে এতো চিন্তা শুনি আমাকে কি বলা যাবে?
সুপারি কাটতে কাটতেই প্রশ্নটা করলেন তিনি
তমা মির্জা যেন হঠাৎই চিন্তা থেকে বেরিয়ে এলো।
মৃদু হেসে বললো
"কি বলছেন কিসের চিন্তা?আমার কিসের চিন্তা হবে?
ভিতরে ভিতরে মেয়েটার জন্য চিন্তা করতে করতে শেষ হয়ে যাচ্ছি আমি। গত সপ্তাহেই শুনলাম কয়েকটা ছেলের সাথে নাকি আবার ঝামেলা করেছে। তারপর থেকে ঠিকমতো ঘুমা নেই আমার তা কি আমি আপানকে বলতে পারবো?এই জ্বালা যে আমার একাই ভোগ করতে হবে।
মনে মনে কথা গুলো ভাবলো তমা মির্জা।
ফাতেমা খাতুন এইরকমই কিছু আশা করেছিলেন। হলোও তাই।
"নাতনিটার খোঁজখবর নিস?
তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
"আর খোঁজ?
কিছুক্ষণ থেমে আবার বললো
"আচ্ছা আম্মা ও কার ওপর গেল বলেন তো?এত রাগ কোথা থেকে পেল?আমি আজও বুঝে উঠতে পারলাম না।
একটু থেমে ঠোঁট কামড়ে বললো
"এমন রাগ তো আমরাও ওর উপরে করতে পারলাম না।
কথাটা শেষ না করে তিক্ত হেসে ফেললো।
আজ এমন পরিস্থিতি কি ওর বাবার জন্য না?শুধুই কি আমার একলা দোষ?ওতো এখন এমন ভাব করে যেন আমি ওকে জন্মই দেইনি।
তোমার গলাটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠলো।
"সাড়ে পাঁচ বছরে পঞ্চাশবার গেছি ওর কাছে। শুধু এটুকু জানার জন্য কি কমতি ছিল ওকে দেওয়ার জন্য?কি এমন অপরাধে ও আমাকে এত্তো বড় শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছে?ওকি যানে ও সফল হয়নি ওর চেষ্টায়?
কেন এত রাগ?কেন একটা মুহূর্তে দেশ,পরিবার আত্মীয়-স্বজন সব ছেড়ে দিয়ে এমনভাবে চলে গেল?
কারও কথা কি ওর একটুও মনে পড়ে না?
নাকি আমাদের সবাইকে সত্যিই ভুলে গেছে?
আজ এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পিছনে কার সবচেয়ে বড় অবধান?
আপনি কি অশিকার করতে পারবেন আম্মা এইসব কিছুর মূল আপনারই ছেলে?বলুন?
শেষ কথাটা বলতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
চোখে জমে থাকা কষ্টটা এবার রাগ হয়ে ফুটে উঠছে।
এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিলেন ফাতেমা খাতুন।
তিনি কিছু বলবেন
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠ।
"আমার দোষ থাকলে তোমার ও যথেষ্ট দোষ আছে তমা।
দু'জনেই ঘুরে তাকালো।
আজমল মির্জা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। আজমল সাহেব তমা মির্জার পিছু পিছুই আসেছিলেন। বউকে কত দিন দেখেন না। সে যে বউকে দেখার জন্য তৃষ্ণার্ত তেমন ও না। তবে বউটা দেখার সাথে সাথে কথাও বলতে ইচ্ছে করছিল। তাই এসেছিলেন মার উসিলায় যদি টুকটাক কথা বলা যায় সেই ভেবে।
কিন্তু আসা মাএ এমন কিছু শুনবেন সে আসা করেননি।
ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন
"ও তোমারই মেয়ে। তোমার কাছ থেকেই ওই অদ্ভুত রাগ জেদ,অভিমান সব পেয়েছে।
তার গলাও ভারী হয়ে উঠলো।
"তোমার কারনে বাপ হয়ে আমি আজ আমার নিজের মেয়ের মুখটাই ভুলে যাচ্ছি। চাইলেও গিয়ে একবার দেখতে পারি না। শুধু তোমার জন্য শুধু তোমার একগুঁয়েমির জন্য। সেই দিন ওকে তুমি আটকাতে পারোনি কেন?কেন মা হয়ে মেয়ের দুঃখ কোথায় সেটা বুঝলে না।?
কথাটা শেষ হতেই তোমা মির্জার চোখ দুটো মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
"আপনি কোন মুখে সব দোষ আমার ঘাড়ে চাপাচ্ছেন?আমি একা দোষী?আপনি বাবা হয়ে কেন বুঝলেন না আপনার মেয়ের কোথায় দুঃখ কষ্ট আছে কেন ও চলে যাওয়ার সময় আপনি আটকালে না?
তমা মির্জা তিক্ত হেসে বললো
"আপনি কি দুধে ধোয়া তুলসীপাতা?আপনি যদি বাবা হয়ে একবার নিজের মেয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেন তাহলে হয়তো আজ এই দিন দেখতে হতো না।
আপনি সবসময় ভেবেছেন নিজের কথা।আর আজ আমাকে দোষ দিচ্ছেন?
আজমল মির্জাও আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
"নিজের দোষ কি তুমি আমার উপরে গোছিয়ে দিতে চাচ্ছ না?
দু'জনের কথার তীব্রতা বাড়তেই ফাতেমা খাতুন এবার রেগে সুপারি কাটার বঁটিটা নামিয়ে রাখলেন
উচ্চস্বরে বলে উঠলেন
"চুপ কর তোরা
পরিবেশ টা মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল।বৃদ্ধার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে।কাঁপা গলায় বললেন
"দোষী তোরা দুইজনই।আমার দাদুমণিটাকে এত দূরে পাঠানোর জন্য তোরা দুইজনই দোষী।একজন নিজের রাগ নিয়ে বসে ছিল আরেকজন নিজের অহংকার নিয়ে
বলতে বলতে বৃদ্ধার গলাটাও কেঁপে উঠলো
"তোদের ঝগড়ার আগুনে আমার দাদুমনিকে পুরিয়েছিস।কেউ নিজের দোষটা মানতে রাজি না তোরদের এই ঝগড়া দেখতে দেখতে আমার দুই নাতি নাতনি আজ এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে। না বাবা কে পায় না মা কে। কোনো কোন সন্তান নিজের বাবা মার করুণ দশা সয়ে নিতে পারে না।যেই সময় ওদের আদরের প্রয়োজন ছিলো তোরা দুজনি একে অপরের দোষ ধরতে ব্যস্ত ছিলিস।আর তোরা বলছিস কি না দিয়েছিস ওদের?
পৃথিবীর কোনো কিছু দিয়ে কি ওদের আদর যত্নের অভাবটা মিটাতে পারবি তেরা?
বৃদ্ধ এতটুকু বলে আর পারছে না গলা ধরে আসছে চোখ দিয়ে অনবরত নোনা জল বেয়ে পরছে
তমা মির্জা আজমল সাহেব দুজনেই একদম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কি বলবেন কেউ বুঝতে ওারলেন না ফাতেমা খাতুন যাযা বল্লেন একটা কথা ও মিথ্যা না
আজমল সাহেব একবার তমা মির্জার দিকে তাকিয়ে বারান্দা থেকে বের হয়ে গেলেন।পিছনে রেখে গেলেন স্ত্রী এবং মা—কে
তমা মির্জা ফাতেমা খাতুনকে কান্না করতে দেখে গিয়ে বসলেন তার কাছে।তার ও তো বুকটা পেটে যাচ্ছে কিন্তু সে যে বলতে পারছে না।পারছে না ফাতেমা খাতুন এর মতো সবার সামনে কেঁদে নিজের দুঃখ প্রকাশ করে কান্না করে মন হালকা করতে। ফাতেমা খাতুন নিজের চোখ গুলো মুছে উঠে দাঁড়ালেন তারপর বের হয়ে গেলেন বান্দা থেকে তমা মির্জা একাই বসে রিলেন।মাথাটা ঘুরিয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন অতীতের কিছু কথা
আজমল সাহেব বারান্দা থেকে বের হয়ে সোজা নিজের ঘরে এসে চেয়ারে বসে মাথাটা চেপে ধরলেন
তার মা যা যা বলল তার বুকে একেক টা কতা ছুরির নেয় এসে বুকে বেঁধেছে।
বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন কিছু
"আমাকে মাপ করে দিও তোমরা আজ আমার জন্যই তোমাদের এই করুণ দশা।আজ নিজের দোষের জন্য নিজের পরিবার হারিয়েছি আমি। আমি তোমাদের শূন্যতা যে আর নিতে পারছি না?আমাদের ওতো একটা সুন্দর সংসার হতো তমা আমাদের সন্তান নিয়ে আমরা ও তো আরো দশটা দম্পত্তির মতন সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করতাম। কিন্তু সবকিছু শেষ হওয়ার পিছনে একমাত্র আমি নিজে দায়ী আমি কিভাবে নিজেকে ক্ষমা করব?
কতা গুলো বলতে বলতে আজমল সাহেব ও অতীত এ পেলে আসা সৃতি গুলো মনে করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
তখন তন্ময় এর সাতে কথা শেষ করে তনুজা নিজের রুম এ এসে পরেছিল।তুষারের রুম এ আর এক মুহুর্তেও থাকতে পারছিলো না।ঘোরে এসে ধুপ করে বিছানায় শুয়ে ফোনটা চোখের সামনে নিল। আনোয়ার নাম্বারটা চেক করল। না কোন মেসেজ আসে নি।কি করবে তনুজা তার যে ভালো লাগছে না মানুষটার সাথে কথা না বলে
ভাবনা ছেড়ে সে ইন্সটাগ্রাম স্ক্রল করতে লাগলো। সবার স্টোরি দেখতে লাগলো।পর পর সবার টা দেখার সময়। তুষারের স্টোরি সামনে আসলো
"এই লোক এবার স্টোরি ও দেয়?
স্টোরি তে তুষার তনুজার বানানো একটা ক্রশের এর বানানো গেঞ্জি পরে আছে।ছবিটা মিরর সেলফি। চেহরার সামনে ফোন ধরে রাখায় চেহরাটা দেখা গেলো না।গেঞ্জিটা কালো রংঙের সাদা পেন্ট এর সাথে পরেছে প্যান্টের পকেটে এক হাত গুজা!চেহরা না দেখা গেলেও বডি ফিটনেস দেখেই মুগ্ধকর লাগছে।
সাথে একটা গানও লাগানো। তানভীর ইভান এর।
Aati Hoo Raaton Main
Sapno Mai Roz Roz!
Dekhun Main Tujko
Koh Ke Yun Saari Hosh
Rehti Ho Dil Main
Tujbin Kahan Majn Jaaun?
তুষারের কালো রঙ পছন্দ বলে। তনুজা কত গুলো গেঞ্জি সোয়েটার মাফলার।বানিয়ে দিয়েছে হিসাব নেই।কিন্তু এই লোক তো কখনো সেই গুলো পরা তে দূর তাকে থ্যাংকস পর্যন্ত বলেনি।আর এখন তার বানানো গেঞ্জি পরে স্টোরি লাগানো হচ্ছে একটা টেক মেরে থ্যাংকস বলতে পারত
তনুজা কথা গুলো বলে গানটায় মনোযোগ দিলো।চোখ গুলো ছোট ছোট করে বলল
"হুমমম প্রেম প্রেম গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে না?এই লোকের কপালে গার্লফ্রেন্ডও জুটেছে?আমি তো ভাবতাম তারকপালে জোরকরে কাউকে গোছাতে হবে নয়তো ওনার বিয়ে হবে কিভাবে?
বলেই হাসতে লাগলো।হাসতে হাসতে চোখ গেলো সামনে রাখা পান্ডা টার দিকে।এটা সেই অচেনা মানুষটা তাকে দিয়ে ছিলো কিছু দিন আগে।সে এটা তার বিছানায় রেখে দিয়ে ছিলো।তনুজা হাত বাড়িয়ে পান্ডা টা নিলো তার পর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো।পান্ডারটার সাথে একটা ছবি তুলে সেও স্টোরি দিল পান্ডা টার এক হাত তুলে হ্যালো লিখে
চলবে!
পর্ব সংখ্যা —৩২
অচেনা প্রনয়ের চিরকুট লেখিকা— তাসনিয়া জাহান