ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

১০ম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (১০)

লেখনীতে- #মৃধা_মৌনি

_____

বাইক ছুটে চলছে মসৃণ পিচঢালা পথ ধরে। দু’জনের মাঝে নীরবতার এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। রোদ্দুরের মুখটা হেলমেটের কারণে দেখা না গেলেও বিকেল স্পষ্ট বুঝতে পারছে, মানুষটা কোনো কারণে বেশ তেঁতে আছে। কিন্তু এই অকারণে রেগে থাকার রহস্যটা বিকেলের মাথায় ঢুকছে না। সে বরং একটু আগে ঘটে যাওয়া দৃশ্যটা নিয়ে ভাবছে। মেহেরজান যেভাবে চিবিয়ে চিবিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ছিল, তাতে বিকেলের বুক কাঁপছে এখনো। কে জানে, এই দাওয়াত থেকে ফিরে আজ কপালে কত গালি আর অপবাদ লেখা হয়! মেহেরজান তাকে এত সহজে ছেড়ে দেবার পাত্রী তো নন!

কে বলবে, এই মানুষটা তারই আপন দাদী!

এসব দুশ্চিন্তায় আনমনা হয়ে বিকেল একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে। রোদ্দুরের কাঁধটা সে ধরে ছিল আলগাভাবে, কিন্তু চিন্তার ঘোরে অজান্তেই হাতের আঙুলগুলো একটু বেশি শক্ত হয়ে চেপে বসে। লম্বা নখের অগ্রভাগ রোদ্দুরের পাঞ্জাবি ভেদ করে কাঁধের চামড়ায় একটুখানি ছড়ে গেল।

আর সাথে সাথেই এক কড়া ব্রেক কষে বাইক থামিয়ে দিল রোদ্দুর। আচমকা এই ঝটকায় বিকেল প্রায় ছিটকে পড়ছিল, কোনোমতে রোদ্দুরকে জাপটে ধরে নিজেকে সামলাল সে। ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠল, 'কী হলো? হঠাৎ বাইক থামালে কেন?'

দু'পায়ে মাটির ভারসাম্য রেখে রোদ্দুর পেছন ফিরে তাকাল। হেলমেটের কাঁচের আড়ালে কেবল ওর জ্বলজ্বলে চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। ভ্রু কুঁচকে সে গম্ভীর গলায় জানতে চাইল, 'সমস্যাটা কী তোর?'

বিকেল পুরোপুরি আকাশ থেকে পড়ল। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমতা আমতা করে বলল, 'কী? আমার কিসের সমস্যা?'

'আমাকে খামচাচ্ছিস কেন?' রোদ্দুরের প্রশ্নে এবার রাগের আভাস স্পষ্ট।

বিকেল যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সে হাত-পা নেড়ে প্রতিবাদ করে উঠল, 'আমি খামচাতে যাব কেন? কী আজব কথা! আমি কি পাগল নাকি?'

'বেশি কথা বললে একটা থাপ্পড় খাবি। আমি কি মিথ্যে বলছি?' রোদ্দুর এবার সত্যিই চটে গেল।

বিকেলও নাছোড়বান্দা। অবুঝের মতো গলা উঁচিয়ে বলল, 'আমি সত্যি বলছি, আমি তোমাকে খামচাইনি রোদ ভাইয়া। সত্যি বলছি...'

'তাহলে কাঁধে কিসের গুঁতো খেলাম আমি? ওটা কি মশার কামড় ছিল?'

'কই? দেখি তো!' এই বলে বিকেল উৎসুক হয়ে রোদ্দুরের কাঁধের দিকে একটু ঝুঁকে দেখতে চাইল।

রোদ্দুর তড়িৎ গতিতে ওকে সরিয়ে দিয়ে কটমট করে তাকাল। দাঁত কিড়মিড় করে বলল, 'বেয়াদব মেয়ে! আমার শরীর দেখবি এখন? এই পাবলিক রাস্তায় দাঁড়িয়ে তুই আমার পাঞ্জাবি টেনে খুলে শরীর দেখতে চাস? লজ্জা-শরম কি একদম ধুয়ে খেয়েছিস? সত্যি, দেশটা আর দেশের আজকালকার ছেলেমেয়ে গুলো একদম রসাতলে চলে যাচ্ছে... ছিঃ!'

বিকেল এবার দ্বিতীয়বার আকাশ থেকে পড়ল। সে কি একবারও শরীর দেখতে চেয়েছে? সে তো জাস্ট নখের আঁচড়টা দেখতে চেয়েছিল। একটা মানুষ কীভাবে সামান্য বিষয়কে এমন আজাইরা আর বিশ্রী দিকে মোড় দিতে পারে, সেটা ভেবেই সে কূল পাচ্ছে না। অপমানে আর রাগে বিকেলের চোখমুখ লাল হয়ে উঠল।

নিজেকে ডিফাইন্ড করতেই প্রতিবাদে বলে উঠল, 'আমি মোটেও ওরকম কিছু মিন করিনি। তুমি এত নিচে যাচ্ছো কেন?'

'আমি নিচে নামছি! একে তো নখ বসিয়ে আমার মাংস তুলে নেওয়া হচ্ছে, তার ওপর আবার উল্টো আমাকেই ব্লেম করা? নাম... নাম বলছি এক্ষুনি!'

বিকেলের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল সত্যি সত্যি, পারছে না কেঁদে ফেলে। ভাগ্যিস রাস্তাটা এই মুহূর্তে নির্জন, নয়তো লোকজনের সামনে ওর আত্মসম্মানের ফালুদা হতে আর বাকি থাকত না।

'কী হলো? কানে কথা যায় না? নামতে বললাম না!'

রোদ্দুরের কড়া ধমকে প্রায় তড়িঘড়ি করেই বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল বিকেল। কাছে যদি একটা ইট থাকত, তবে এই মানুষটার মাথা বরাবর একটা বাড়ি দিলে বোধহয় খুব একটা পাপ হতো না- মনে মনে ভাবল। বিকেল মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল, ওর চিবুক প্রায় বুকের সাথে মিশে গেছে। জড়সড় হয়ে কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে বলল, 'বিশ্বাস করো, আমি ইচ্ছে করে তোমাকে আঁচড় দিইনি। আর শরীর দেখার মতো কোনো নেতিবাচক চিন্তা আমার মাথায় ছিল না। তুমি অযথাই আমার সাথে এমন রূঢ় আচরণ করছ। আমি কি সেঁধে তোমার বাইকে আসতে চেয়েছিলাম? তুমিই তো জোরাজুরি করে আনলে, এখন আবার মাঝপথে অপমান করে নামিয়ে দিচ্ছো...'

'বাপরে! মহা অপরাধ করে ফেলেছি আমি। আপনি তো মহামান্যা রাজকুমারী! আপনাকে বাইকে তোলার আগে বোধহয় হাইকোর্টে রিট জারি করে অনুমতি নিতে হতো। পরের বার থেকে কি আইনি পিটিশন দাখিল করব?' রোদ্দুরের গলার স্বর ব্যঙ্গাত্মক।

চোখের জলে ভিজে একাকার বিকেলের মুখটা। তবু সে তেজ হারাল না, 'আপনিই তো সেঁধে নিয়ে এসেছেন, আমি তো আসতে চাইনি একবারও....'

'ওরে বাবা! তুমি থেকে এক লাফে আপনিতে প্রমোশন! এত সম্মান তো আমি সইতে পারছি না।' রোদ্দুর হন্তদন্ত হয়ে বাইক স্ট্যান্ড করে নিচে নেমে এল। বিকেলের সামনে দাঁড়িয়ে নাটুকে ভঙ্গিতে বলল, 'সরি ম্যাডাম! আপনাকে অপমান করে আমি তো হিমালয় সমান অপরাধ করেছি। শাস্তি হিসেবে কী চান? মগজে দুটো গুলি ঢুকিয়ে দেবেন নাকি সরাসরি ক্রসফায়ারে পাঠাবেন?'

'তুমি অকারণে কেন সিন ক্রিয়েট করছ রোদ ভাইয়া?' বিকেল এবার মুখ তুলে সরাসরি তাকাল। ওর ভেজা চোখ দুটো টলটল করছে।

রোদ্দুর সেই অভিমানী মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে নিজের গলাটা একটু পরিষ্কার করে নেয়। গম্ভীর স্বরে শুধাল, 'প্রতিবাদ? তা এই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরটা তখন কোথায় থাকে রে? সব তেজ কি কেবল আমার বেলাতেই জমা থাকে?'

বিকেল অবাক হয়ে তাকাল, 'মানে?'

রোদ্দুর বাইকের সিটে হেলান দিয়ে আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গিতে নিজের হাতের আঙুলগুলো মটমট করে ফুটাল। তারপর স্থির দৃষ্টিতে বিকেলের দিকে চেয়ে বলল, 'তোর এই লড়াকু মেজাজটা সবসময় থাকে না কেন? যারা তোকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলে, তোকে ছোট করে, তাদের সামনে কেন তুই পাথরের মতো নির্বাক হয়ে যাস? আমার বেলায় তো বেশ গলা উঁচু করে জবাব দিচ্ছিস, তাদের বেলা কেন সুর নিচু হয়ে আসে? কেন নিজেকে ডিফেন্ড করতে পারিস না?'

বিকেল বুঝতে পারল মানুষটা আসলে কোন ক্ষতের কথা বলছে। ও উত্তর দিল না, কেবল ফ্যালফ্যাল করে রোদ্দুরের মুখপানে চেয়ে রইল। রোদ্দুর সেই স্তব্ধতার সুযোগ নিয়ে আরও একটু কাছে এগিয়ে আসে। কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বলে, 'কে কী বলল সেটা বড় কথা নয় বিকেল; ফ্যাক্ট হলো তুই জানিস যে তুই সঠিক। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কুকুরের মুখে সজোরে লাথি মেরে মুখ ভোঁতা করে দিতে হয়। সবসময় ঘেউঘেউ সহ্য করলে পাগলা কুকুর আরও পেয়ে বসে। এরপর থেকে ভ্যা ভ্যা করে ছাগলের মতো কাঁদবি না, বরং জবাবে সপাটে চড় কষিয়ে দিবি। যে আগুনটা এইমাত্র আমার জন্য তোর চোখে দেখলাম, আমি চাই সেই তেজটাই তুই দুনিয়ার সামনে দেখাবি। বড় হ বিকেল, নিজের ঢাল নিজে হতে শেখ। বুঝেছিস?'

বিকেল মন্ত্রমুগ্ধের মতো মাথা নাড়ল। রোদ্দুরের রুক্ষতার আড়ালে যে এমন এক অভিভাবকসুলভ মমতা লুকিয়ে ছিল, তা ও কল্পনাও করেনি।

'গুড!' রোদ্দুর হাত বাড়িয়ে বিকেলের মাথার হেলমেটটা একটু সোজা করে দিল। 'খিদে পেয়েছে? কিছু খাবি?'

বিকেল দু-পাশে ঘাড় নেড়ে 'না' বলতেই রোদ্দুর আবার বাইকে উঠে বসল। স্টার্ট দিয়ে বলল, 'এবার ঠিকঠাক ধরে বস।'

বিকেল এবার বেশ সাবধানে বসে। মৃদুস্বরে বলল, 'যদি আবার নখের আঁচড় লাগে?'

'তবে ওই নখ আমি নিজ হাতে উপড়ে দেবো!' রোদ্দুরের তাৎক্ষণিক জবাবে বিকেল আড়ালে মুখ ভেংচায়। সে আঙুলগুলো এমনভাবে মুঠো করে ধরল যাতে কোনোভাবেই নখ না লাগে।

রোদ্দুর লুকিং গ্লাসে বিকেলের ভারাক্রান্ত কিন্তু সপ্রতিভ মুখটা একবার দেখে নেয়। ওর ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে বিজয়ের হাসি। বাইকটা আবার গন্তব্যের দিকে তীব্র গতিতে ছুটতে শুরু করল।

★★★

আদিবাদের বাড়ির সামনে যখন বহর গিয়ে নামল, ততক্ষণে যোহরের আজান শেষ হয়েছে। দুপুরের কড়া রোদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আদিবার অবস্থা শোচনীয়; ভয়ে ওর কলিজা শুকিয়ে কাঠ হওয়ার দশা। বাড়িতে কাউকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। ও একবার সৌম্যকে বলেছিল যোগাযোগের কথা, কিন্তু সৌম্য সাফ বারণ করে দিয়েছিল। সে চেয়েছে যা হওয়ার সামনাসামনি হোক। সৌম্যর এই অটল সাহসের পেছনে বড় একটা স্তম্ভের নাম- উমেদ মির্জা। যেখানে তিনি স্বয়ং উপস্থিত আছেন, সেখানে পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেই সৌম্যর বিশ্বাস।

গাড়ি থেকে নামার পর আদিবার ফ্যাকাশে মুখটা দেখে সৌম্য ওর কাঁপা হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল। আদিবা আড়ষ্ট চোখে তাকালে সৌম্য অভয় দিয়ে বলল, 'এত ভয় পেলে চলে বোকা!'

আদিবা ম্লান হেসে উত্তর করে, 'এতক্ষণ তো হাত ধরার কেউ ছিল না সৌম্য, তাই ভয় লাগছিল। এখন আছে, আর ভয় নেই।'

সৌম্য পাল্টা হাসি উপহার দিয়ে আদিবাকে আশ্বস্ত করল। সবার আগে আদিবা কলিং বেল টিপে, দরজা খুলতেই যেন এক পশলা নীরবতা পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ল। আদিবার পেছন পেছন মেহেরজান থেকে শুরু করে উমেদ মির্জা, রেহনুমা, লতা, আইরিন সবাই সারিবদ্ধভাবে ভেতরে প্রবেশ করে।

মিশি আর স্বস্তি হাঁটছে সবার পেছনে। স্বস্তি গাড়িতে থাকার সময় থেকেই লক্ষ্য করছে মিশির মেজাজটা আজ বড্ড খিটখিটে। গাড়িতে তৃপ্তির কোনো রসিকতাতেও মেয়েটা সাড়া দেয়নি। গাড়ির ভেতর কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ না পেয়ে স্বস্তি এবার গা ঘেঁষে এলো, ফিসফিস করে শুধাল, 'কী হয়েছে তোমার আপা? এত আপসেট দেখাচ্ছে কেন? বড় বাবা কি কিছু বলেছে?'

মিশি বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে জবাব দিল, 'তিনি আমাকে কী বলবেন?'

'তাহলে এত রেগে আছো কেন? সারাটা পথ তো একটা কথাও বললে না!'

'তার কৈফিয়ত কি এখন তোকে দিতে হবে?' মিশির গলার স্বরে আগুনের আঁচ।

স্বস্তি সঙ্গে সঙ্গে দমে গিয়ে বলল, 'না না, তা না। চুপচাপ দেখে জাস্ট জিজ্ঞেস করলাম। আচ্ছা সরি!'

মিশির মাথার ভেতরে তখন যেন দাবানল জ্বলছে। বিরক্তি সামলাতে না পেরে গলায় একরাশ তিক্ততা নিয়ে জানাল, 'ইটস ওকে! আসলে এমনিতেই ভালো লাগছে না। আসার বিন্দুমাত্র মুড ছিল না আমার, সবাই জোরজবরদস্তি করে নিয়ে এল। এখন দেখ না, এখানে এসে কার কত ঢং সইতে হয়!'

স্বস্তি আর কথা বাড়াল না। সে জানে মিশি চিরকালই একটু ঘরকুনো স্বভাবের। কে যে ওর নাম মিশি রেখেছিল! বাড়ির সব ভাই-বোনের মধ্যে ও-ই সবচেয়ে অমিশুক আর একা থাকতে পছন্দ করা এক রহস্যময়ী। ভালো শ্রোতা হিসেবে ওর সুনাম থাকলেও, কথা বলার বেলায় ও বড় কৃপণ। স্বস্তি বুঝল, এই জনারণ্য আর পারিবারিক গেদারিং মিশির স্বভাবের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। তাই ওকে ওর মতো থাকতে দিয়ে স্বস্তি সরে গিয়ে তৃপ্তির পাশে পাশে হাঁটতে লাগল।

তৃপ্তির সঙ্গে বিকেল ও যোগ দিয়েছে ততক্ষণে। অবাক চোখে চারপাশ ঘাড় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে সে। বাড়িটা সুন্দর। ওদের মতোই তবে চালগুলো টিনের। চারপাশে দেয়াল তোলা যদিও, একতলাই। মাঝখানে একটা ছোট উঠান আছে! এরকম বাড়ি আজকাল ঢাকা শহরের মতো বড় অঞ্চলে দেখা যায় না। হয়তো এটাও আদিবার বাবার পৈতৃক ভিটা বলে টিকে আছে এখনো!

তৃপ্তি ওকেই দেখছিল বারংবার। গলার স্বর একদম নিচু করে প্রায় ফিসফিস করে বলল, 'কি? নায়কের সঙ্গে খুব মজা করেই এলি, হুঁ?'

আকস্মিক এমন কথায় বিকেল খানিকটা চমকে উঠলেও স্বাভাবিক রইলো। একটা হাসি ছড়িয়ে পড়ল তার ঠোঁটে। তবে মেকী রাগটা দেখাতে ভুললো না একদমই! আশেপাশে চেয়ে সেও বিড়বিড়িয়ে জবাব দেয়, 'ছাতার মাথা! হিরো না ভিলেইন! পথের মাঝখানে আমাকে তো নামিয়েই দিচ্ছিলো জানো না...'

'ওমা, কেন?'

'আমার নখের আঁচড়ে তার কাঁধের চামড়া ছড়ে গেছে, তাই।'

'এবাবা! কি এমন করছিলি যে একদম ছিড়ে টিরে একাকার, হুঁ?'

তৃপ্তির বলার ঢংয়ে হেসে গড়িয়েই পড়ল মেয়েটা। অনেক কষ্টে হাসি সামলাতে বলতে পারল, 'ধ্যাৎ যাও! তেমন কিচ্ছু না। হঠাৎ করেই লেগে গেছে...'

'আচ্ছা আচ্ছা! আর কি কি হলো?'

'কিচ্ছু না।'

'সত্যি?'

'হুম!'

'যাক, ক্রাশের সঙ্গে একটা বাইক ডেট মন্দ না, কি বলিস?'

'কচুর মাথা ক্রাশ...' লজ্জায় লাল হলো বিকেল।

তৃপ্তি চোখ পাকাল, 'এই না দু'দিন আগে কেঁদেকেটে একাকার করলি, তাকে তোর পছন্দ, তোর ক্রাশ... এখন আবার না বলছিস?'

ছোট একটা দম ছাড়ে ও, মাথাটা দুলিয়ে জানায়, 'বলছি।' তৃপ্তির চোখে চোখ রেখে বলে, 'ক্রাশ লিস্ট থেকে ক্যান্সেল করেছি তো...জানো না?'

চমকায় তৃপ্তি, দু'দিকে মাথা দুলিয়ে জবাব দেয়, 'না তো।'

'করে দিয়েছে কাটছাট। সে এখন শুধুই আমার কাজিন...নো ক্রাশ, নো ব্লাশ..ওকে?'

'আচ্ছা?'

'ইয়েস!'

'উমমম....ভালো ভালো!'

হঠাৎ করেই কিছু একটা মনে পড়বার ভঙ্গিতে বিকেল জানতে চাইল, 'তুমি আবার মাইন্ড করোনি তো?'

তৃপ্তি না বুঝতে পেরে শুধাল, 'কখন?'

'সেসময়, দাদী তোমায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলল আর ভাইয়া আমাকে ডেকে নিলো।'

শুনে হেসেই ফেলল মেয়েটা। 'আরে না, কিসের মাইন্ড করব, পাগলের কথা শোন...' হাসি আঁটকাতে পারল না, পেট ধরে মুচড়ে উঠে হাসে ও, বলতে লাগল, 'বোকা মেয়ে! দাদী বলায় আমি এগিয়ে গিয়েছিলাম, নইলে বুড়ি একটা নাটক করত, জানিসই তো.. ভালো হয়েছে, ভাইয়া আমাকে নেয়নি, কে যায় ওই জড়ো পদার্থের সঙ্গে! আমি গাড়িতে কি মজা করতে করতে এসেছি, জানিস?'

বিকেল অবিশ্বাস্য চোখে তাকায়, 'সত্যি?'

'একদম!'

একটা পাথর সরে নামে বুকের উপর থেকে। অপরাধবোধ হচ্ছিল বিকেলের, হয়তো তৃপ্তির মাইন্ডে লেগে যেতে পারে ব্যাপারটা তাই ভেবে... যাক, তৃপ্তি আসলে অমন মেয়েই না যে ওর মাইন্ডে লাগবে তাও এত ছোট ছোট সব ঘটনা! এই জন্যেই তো...এটা ওর বেস্ট ফ্রেন্ড!

গলায় হাত গলিয়ে জড়িয়ে ধরে বিকেল, তৃপ্তি হৈ হৈ করে ওঠে চাপা গলায়, 'আরে ছাড় ছাড়, মেহমান বাড়ি আছি, ভুলে গেছিস?'

বিকেল ছাড়ে না। কিছু একটা বলতে নিবে, কিন্তু তার আগেই ভেসে আসা চিৎকারে সবাই-ই নিজেদের জগত থেকে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে সামনে তাকাল। আদিবাকে ধরে একজন মরা কান্না জুড়ে দিয়েছে। এই মহিলাটা কে?

জানা গেল একটু পরেই, আদিবাও কাঁদছে হু হু করে।

কোনো এক অভিমান বা চাপা কষ্ট ছিল মেয়েটার মনেও, মায়ের সান্নিধ্য পেয়ে সেগুলিকে আর চেপে রাখা গেল না। মমতায় ভরা বুকের পাড়ে আঁছড়ে পড়ল এক অবাধ্য ঢেউয়ের ন্যায়, কেঁদে চলল মরিয়া হয়ে। এমন কান্না দেখে উপস্থিত সকলেই একদম স্তব্ধ হয়ে গেল। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। উমেদ মির্জার একটু উশখুশ লাগছে, মনে হচ্ছে সৌম্যর পাগলামিতে সায় দেওয়া বিরাট বড় বোকামি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিইবা করতেন তিনি! রোদ্দুর এমন ভাবে এসে চেয়ে বসল, যেতেই হবে....সৌম্যও তো তার সন্তান! তিনি ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সেসময় আর না করেননি... এই ছেলে তার কোটি টাকা মূল্যের সম্পদের চেয়েও দামী। তাকে নিয়ে তাঁর আকাশছোঁয়া স্বপ্ন - আশা! সেসব পূরণের জন্য হলেও ছেলের মন রাখা দরকারী!

আদিবার মা মেয়ের গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আর উদ্ভ্রান্তের মতো বিলাপ করে চলেছেন, 'তুই কোথায় গেছিলি রে মা... আমাকে একলা ফেলে রেখে কই চলে গেছিলি? আমি যে কতটা ভয় পেয়েছিলাম, তা কি একবারও ভেবেছিস? আমার তো মনে হচ্ছিল তুই আর কোনোদিন ফিরবি না। আমি আমার আদু মা-কে আর কক্ষনো চোখের সামনে দেখতে পাব না। আমাকে ফেলে এত বড় সিদ্ধান্ত তুই নিলি কেমন করে রে মা? পাষাণ মেয়ে আমার, একবারও কি এই অভাগী মায়ের কথা তোর মনে পড়ল না?'

আদিবা মায়ের কোল জাপটে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। ভাঙা গলায় সে বলতে লাগল, 'মনে পড়েছে মা, তোমার কথা আমি ভুলব কী করে? তুমি আমার জন্মদাত্রী, তোমাকে প্রতিটা মুহূর্ত মিস করেছি। এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পরই বুঝতে পেরেছি- মায়ের মতো আপন আর কেউ হয় না... সত্যিই কেউ হয় না মা।' নিজের দহন জ্বালায় পুড়তে থাকা মায়ের বিধ্বস্ত হৃদয়কে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টায় কথাগুলো কোনোমতে উগরে দিল আদিবা।

কিন্তু মায়ের হাহাকার তাতে একটুও শান্ত হলো না; বরং কান্নার রোল আরও জোরালো হয়ে উঠল। ভদ্রমহিলা নড়বড়ে কণ্ঠে ভাঙা স্বরে বলতে লাগলেন, 'তাহলে কেন চলে গিয়েছিলি মা? তোকে না পেয়ে আমার যে কী দশা হয়েছিল তা জানিস? আমি তো তোকে একনজর দেখার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম রে। আল্লাহ আমার ডাক শুনেছেন, এই কলিজা চেরা আর্তনাদ তিনি কবুল করেছেন বলেই আজ তোকে ফিরে পেয়েছি। আর কোথাও যাস না মা, আমার কোল খালি করে আর যাস না। তুই আমার একমাত্র মেয়ে। কত কষ্টে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে তোকে জন্ম দিয়েছিলাম... তোকে দেখার পর আমার সব কষ্ট স্বস্তি হয়ে ফিরে এসেছিল। সেই মুখটা দেখা থেকে আমাকে আর বঞ্চিত করিস না রে মা... করিস না।'

'মা... আম্মু!' আদিবা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।

ভদ্রমহিলা আর সইতে পারলেন না; শোক আর স্বস্তির আতিশয্যে মেয়ের কোলের ওপরই ঢলে পড়লেন। জ্ঞান হারানোর ঠিক আগের মুহূর্তেও তিনি আদিবাকে এমন শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রইলেন, যেন হাত ফসকালেই এই আদরের ধন আবার কোনো কুয়াশায় হারিয়ে যাবে।

আদিবা একা সামলাতে পারছিল না দেখে সৌম্য দ্রুত এগিয়ে এল সাহায্যের জন্য। কিন্তু সে হাত বাড়ানোর আগেই ঘরের ভেতর থেকে এক ভরাট ও বাজখাঁই কণ্ঠস্বর থমকে দিল সবাইকে। সম্পর্কের বিচারে যিনি আদিবার জন্মদাতা পিতা, তিনি ঘরের এক কোণে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবার আদেশ ও তাচ্ছিল্যের সুরে গর্জে উঠলেন, 'তোমাকে ধরতে হবে না। আসিফ...!'

ডাক দেওয়ার সাথে সাথেই এক হ্যাংলা-পাতলা যুবক ঝড়ের বেগে ছুটে এল।

'জি চাচাজি!' বলতে বলতেই সে আদিবার কোল থেকে প্রায় ছোঁ মেরে অচেতন ভদ্রমহিলাকে তুলে নিল। উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। দেখতে রোগাটে হলে কী হবে, আসিফের গায়ে যেন অসুরের শক্তি! সে পলকহীনভাবে নিথর মানুষটিকে কোলে তুলে নিয়ে ভেতরের ঘরের দিকে রওনা হলো। আদিবা লক্ষ্য করল, ভেতরের পর্দার আড়াল থেকে কৌতূহলী চোখে অনেকেই উঁকি দিচ্ছে। এদের কেউ তার চাচি, কেউ বুয়া, আবার কেউ ভাই-বোন। তাদের চোখের চাহনিতে বিস্ময় আর ভর্ৎসনা যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।

মাথা নিচু করতেই সৌম্যর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো কর্ণকুহরে, 'ছেলেটা কে?'

আদিবা উত্তর দেবার জন্য মুখ খোলার আগেই আবারও সেই পাথুরে স্বরটি নড়ে উঠল গম্ভীর ভঙ্গিতে।

'এ বাড়ির ছেলে।' তারপর প্রায় গটগট পায়ে এগিয়ে এসে উমেদ মির্জার মুখোমুখি হলেন তিনি। মেয়ের দিকে ফিরেও তাকালেন না। এমন মারমুখো ভঙ্গি!

উমেদ মির্জা হাত বাড়িয়ে দিলেন হ্যান্ডশেকের খাতিরে, পরিস্থিতি ভীষণ বিব্রতকর, তার নিজের মন মেজাজও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রকাশিত করলেন না, রোদ্দুরের কাছে এইটুকু বুঝিয়ে দিতে যান, ছেলে মেয়ের আবদার রক্ষার্থে তিনি সবকিছু করতে পারেন...সবকিছু।

আদিবার বাবা আশফাকুল রহমান আতিথিয়েতার ধার দিয়েও গেলেন না। গলার স্বর পূর্বের ন্যায় অটল রেখেই বললেন, 'আমার স্ত্রী হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমি দুঃখীত এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য।'

কথাবার্তায় স্পষ্ট চলে যেতে বলার আভাস।

উমেদ মির্জা বুঝতে পেরেও কিছু বললেন না। অপমানটা নীরবে হজম করে নিতে নিতে শুধু একবার চোখা চোখে রোদ্দুরের চেহারাটা দেখে নিলেন। ছেলেও তার শান্ত ভঙ্গিতে এদিকেই চেয়ে।

উমেদ মির্জা ঠোঁটে এক কণা পরিমাণ হাসি ফুটিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে শুধালেন, 'অসুবিধা নেই। আমার মেয়েও এরকম কিছু করলে আমার স্ত্রী ও হয়তো পাগল হয়েই যেতো।'

'আমার স্ত্রীর তার মেয়ের প্রতিই একটু বেশিই আদর, ভালোবাসা। বলে ছিলাম, এই অতিরিক্ত ভালোবাসা না একদিন কাল হয়ে দাঁড়ায়। যাইহোক, আপনারা এত কষ্ট করে এসেছেন...'

'না না, কষ্টের কি আছে। আমার বোনপুত আমার ছেলের মতোই। আমি ওকে ছেলে হিসেবেই দেখে এসেছি।' তারপর সৌম্যর দিকে তাকিয়ে ডাকলেন, 'এদিকে আয়।'

জড়সড় পায়ে সৌম্য এগিয়ে আসতেই উমেদ মির্জা ওর একটা হাত চেপে ধরে বললেন, 'এটা আমার বোনের বড় ছেলে, সৌম্য আহসান। ওর সঙ্গেই আপনার মেয়ে...'

বাকিটুকু শেষ করবার আগেই আশফাকুল রহমান হাত ইশারায় তাঁকে থামতে বাধ্য করলেন। গম্ভীর কণ্ঠে জানালেন, 'আমি জানি। আমার মেয়ের সঙ্গে এই ছেলের সম্পর্কের কথা আমি আগে থেকেই জানতাম। ওর সঙ্গে যে পালিয়ে গিয়ে আপনার বাড়িতে জায়গা করে নিয়েছে, তাও জানি।'

'বাহ, সবকিছুই জানেন দেখছি তাহলে বেয়াই সাহেব...'

আশফাকুল রহমান মুখে একটা ভেটকানো হাসি ফুটিয়ে তুললেন এবারে, বললেন, 'আমার নাম আশফাকুল, আপনি আমাকে ভাই বলে ডাকেন। বেয়াই সম্পর্কটা আমি মানি না, দুঃখীত।'

উপস্থিত সকলেই চুপ। এমনকি উমেদ মির্জা ও। আদিবার চোখজোড়া ছলছল করে ওঠে। সে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে নিশ্চল দৃষ্টিতে। জানা ছিল, বাবা তার পাথর মানব, কিন্তু এতগুলো মানুষের সামনেও যে নিজের দম্ভ খানিক কমবে না- তা কল্পনাতেও ভাবেনি মেয়েটা...

আশফাকুল রহমান আবার বলে উঠলেন, 'আমার মেয়েকে আমি চিনি। আপনার বোন পুত্রের উশকানিতেই সে যে এতবড় একটা কান্ড ঘটিয়েছে তাও জানি। আর তাই আমি আমার মেয়েকে মাফ করে দিয়েছি। কিন্তু এই সম্পর্ক মানা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি সে আমার নামটা তার পরিচয়ের সঙ্গে এরপরেও জুড়ে রাখতে চায় তবে এই সম্পর্ক ভেঙেই ফিরে আসতে হবে। আর যদি চায়, আমার চেয়েও দামী এই দুইদিনের হওয়া সম্পর্ক, তবে তাকে আপনারা নিয়ে ফিরে যান। আমার বিন্দুমাত্র মতামত নেই।'

উমেদ মির্জা এ পর্যায়ে বললেন, 'সবই বুঝলাম কিন্তু আপনার জানায় ভুল আছে সামান্য। আমার বোনের ছেলে আপনার মেয়েকে উশকায়নি, বরং আপনার মেয়েই ব্ল্যাকমেইল করে...'

'অসম্ভব! আমার মেয়ের মতো লক্ষী এ তল্লাটে আর একটিও আছে কিনা সন্দেহ! তার পক্ষে কাউকে জোর করে...'

'ভুল নিয়ে দম্ভ করছেন আপনি!' এই প্রথম রোদ্দুর মুখ খুলল, এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিল সে, এবার এগিয়ে এল সটান বুকে, গলার পারদ উঁচু করে বলল, 'আপনার মেয়েই আমার ভাইকে ব্ল্যাকমেইল করেছিল। এ কথা সে নিজের মুখে স্বীকার করেছে। আমার পরিবার আপনাদের মতো এত ছোট লোক নয় দেখেই সব শেষে মেনে নিয়েছে সুন্দর ভাবে। নইলে এমন দম্ভ আমাদেরও আছে! আমার ভাই-ও কোনো ফেলনা বস্তু নয়। আপনি হয়তো জানেন না, সৌম্য কত বড় হীরে...'

'এই ছেলে, মুখে লাগাম টেনে তারপর কথা বলবে। এই তোমার পারিবারিক শিক্ষা? বড়দের মাঝখানে এসে এমন বেয়াদবের মতো কথা বলো? সব কাঁচই নিজেকে হীরে ভাবতে শুরু করে একসময়...'

'আপনি আমার ছেলেকে বেয়াদব বলেন কোন সাহসে? সে মির্জা বাড়ির সবার বড় ছেলে। আমরা বড়রা তার মতামতকে সমর্থন করি আর আপনি কিনা...'

'এটা মির্জা বাড়ি না, এটা আমার বাড়ি।' যেন অনেক বড় কিছু মিস্টেক করতে যাচ্ছিলেন উমেদ মির্জা, তাই তাকে সংশোধন করিয়ে দিলেন আশফাকুল রহমান, 'ভুলে যাচ্ছেন কেন, এখানে আমার মতামতই সবার সমর্থন, আমার কথাই শেষ কথা....'

উমেদ মির্জার ব্রক্ষ্মতালু জ্বলে যাচ্ছে। জীবনে এমন অপমানিত তাকে কোথাও হতে হয়নি। কোনোদিনও না...আশফাকুল রহমানকে কি বলবেন তিনি, বাড়ি বয়ে তিনিই তো যেচে পড়ে এসেছেন এসব লাঞ্চনা গঞ্জনা মাথা পেতে নেওয়ার জন্যে....

আশফাকুল রহমান আবার বলে উঠলেন, 'আমার মেয়েকে ফাঁসিয়েছে আপনার বোনের ছেলে। তার কারণেই এতবছরের সম্পর্কের বাঁধন ছিঁড়ে সে রাতের আঁধারে পর পুরুষের হাত ধরে বেরিয়ে যাওয়ার সাহস পায়। অথচ এ বাড়িতে কোনো মেয়ে আজ পর্যন্ত এ ধরনের কাজ করার সাহস পায়নি। ওর মা মেয়ের শোকে পাগল প্রায়। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকে দিনরাত। কিছুতেই তাকে শান্ত করতে পারিনি আমরা। আমাদের কি হচ্ছে, কি হবে, কিচ্ছু না ভেবে আমার মেয়ে এতবড় চুনকালি মাখিয়ে চলে যেতে পারত না যদি না আপনার বোনের ছেলে না উশকাতো! আশেপাশে রটে গেছে সব...কি বিচ্ছিরি পরিস্থিতিতে পড়েছি আমরা! সবকিছু আপনাদের কারণে। পরিবার কদর্য হলে সন্তানেরা শিক্ষা পাবে কোথায়? শুনেছি এই ছেলের মাও নাকি তার নাগরের হাত ধরে বেরিয়ে গেছিল....'

'এনাফ!!' চিৎকার করে ওঠে সৌম্য। সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে তার। মুখটাকে আর ঠেসেঠুসেও বন্ধ করে রাখা সম্ভব নয়! আইরিন মুখ লুকিয়ে কাঁদছেন সমানে....কত আগের কথা! সেইসব এখনো মানুষের মুখে মুখে রচয়িত! অথচ মানুষটা মারাও গেছে কত বছর হয়ে এলো। কিছু মানুষের জিভ যেন বিষাক্ত সাপের ন্যায়....ছোবলে বিষ ঝরে পড়ে!

উমেদ মির্জা, রোদ্দুর- দু'জনকে ছাড়িয়েই আশফাকুল রহমানের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল সে। চোখ দিয়ে অগ্নি বর্ষণ হচ্ছে যেন...এতক্ষণ চুপ করে রইলেও আর চুপটি থাকার জো নেই...সমানে চেঁচিয়ে বলে উঠল, 'আপনাকে আমি সম্মান দেখিয়ে ভুল করছিলাম। আপনার মতো মানুষের আসলে সম্মান দেওয়া নয়, সপাটে চড় বসানো উচিত গাল বরাবর...'

'এই ছেলে...'

'একদম চুপ! একদম চুপ!

আমি ভদ্র ছেলে, আমি শান্ত, আমি কখনো কারো বিপরীতে দাঁড়িয়ে কথা বলতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি না বলে আমায় বা আমার পরিবারকে যা কিছু তাই বলা যায়? আপনার সাহস হয় কি করে আমাকে মা'কে এসবের ভেতর টেনে নিয়ে আসার? আপনি কি জানেন, আপনার মেয়ে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করেই বিয়েটা করিয়েছিল? হ্যাঁ, আমিও ওকে পছন্দ করি, কিন্তু আমি চাইনি এভাবে সবটা হোক! বরং ও ব্যর্থ ছিল আপনাদের থেকে সময় নিতে, আপনাদের কাছে আমাকে বা আমার পরিবারকে দাঁড়া করানোর সুযোগ দিতে। তবু আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ও যেভাবে যা চেয়েছে, করে গিয়েছি... যদি না করতাম না, ওই মেয়েটা লা'শ হতো সেদিন, লা'শ..বিষটা হাতের মুঠেই গোঁজা ছিল। বুঝতে পারছেন আপনি? বুঝতে পারছেন কি?'

সৌম্যর এমন হুংকারের রূপ কেউ দেখেনি ইহজন্মে। কেউ না। আইরিন ও নয়! বরাবরই শান্ত, চুপচাপ, সরল মনের ছেলে ভেবে আসা সন্তানের ভেতরও যে একটা সুপ্ত আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে, আজ নিজের চোখে দেখে বিস্মিত না হয়ে পারলেন না তিনি। হা করে চেয়ে আছেন কেবল সৌম্যর মুখ পানে.. একই অবস্থা আদিবারও!

জলে টলমল চোখে সৌম্যকে দেখছে সে। এ কোন সৌম্য! এই সৌম্যকে কি সে ভালোবেসেছিল?

উঠে এগিয়ে আসে মেয়েটা একটু একটু করে।

সৌম্য তখনো বলে চলেছে, 'আপনি আমায় যা বলার বলেন, আমি মাথা পেতে নিবো, কিন্তু আমার পরিবারকে বলার উপেক্ষা রাখেন না। আমার মা কারো হাত ধরে বেরিয়ে যায়নি, সে ভালোবেসেছিল। ওই শব্দটা অবশ্য আপনার মতো অশিক্ষিত মানুষ কি বুঝবে! আপনার কেবল পরিবার আর মেয়েকে নিয়ে যত দেমাগ...দম্ভ! অথচ ওসবের এক চুল পরিমাণ দাম তারা আদতে মন থেকে দেয় কিনা, কখনো জিজ্ঞেস করিয়েন। যেই মেয়ের জন্য আপনি আমার মা পর্যন্ত গেলেন না, ওই মেয়েই আপনার প্রতি এক আকাশ সম অভিযোগ জমা করে রেখেছে...আপনার মানসিক অত্যাচার, আপনার অবিচার, আপনার মুখের ভাষা- সবকিছুই আমাকে বলে বলে তার প্রতি আরও দুর্বল করে তুলেছিল। আমার পরিবার কে কদর্য বলবার আগে আপনি নিজে কি পরিমাণ নোংরা একটা মানুষ, সেটা স্বীকার করুন...'

চোখ সরিয়ে বিস্ময়ে হা হয়ে থাকা আদিবার মুখপানে চাইলো সৌম্য, জানতে চাইল, 'তুমি কি আমার স্ত্রী হয়ে থাকতে চাও?'

আশফাকুল রহমান নিজেও মেয়ের দিকে ঘুরে চাইলেন, তার চোখজোড়া রাগে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। যদি পারতেন, এক্ষুনি ভস্ম করে দিতেন সবকিছু। তার বাড়ি এসে তাকেই এত কুৎসিত সব কথা বলা! তিনিও জানতে চাইলেন মেয়ের কাছে, 'জন্ম দিয়েছি আমি!

ওই যে তোর মা- তোর শোকে মরে যাওয়ার অবস্থায় পড়ে। যদি এই বাড়ি থেকে আজ তোর এক পা বাইরে যায়, তবে মনে রাখিস, আমি বা তোর মা মরে গেলেও তুই লা'শ দেখার অধিকার পাবি না... আল্লাহর কসম!'

বজ্রাহত হলো আদিবা।

একবার বাবার দিকে চাইছে, একবার স্বামীর দিকে।

বলা বাহুল্য সেই মানুষটির দিকে যার চোখে একটা গোটা স্বপ্নের মতো জগত দেখতে পেয়েছে মেয়েটা....

সময় গড়াচ্ছে, উপস্থিত সকলেই থমথমে। কেউ আগ বাড়িয়ে একটা শব্দ ও করছে না। কেউ না!

এখানে সম্পর্কটা যাদের.. তারাই ঠিক করুক, সুতো জুড়বে না ছিঁড়ে ফেলবে!

নিরুত্তর চেয়ে রইল মেয়েটা।

দু'চোখের নোনাজলে ভেসে যাচ্ছে চোখের কোল, গালের কার্নিশ, জমছে আপেল খাঁজের থুতনিতে। কেউ যেন দেখছেই না কি পাড় ভাঙা অসহ্য যন্ত্রণায় নীল হয়ে উঠছে ও। বরং দু'জনের কাছেই রাগটা সমান তালে গুরুত্বপূর্ণ!

সৌম্যর জায়গায় সে ঠিক,

আশফাকুল রহমানের জায়গায় তিনি ঠিক;

ঠিক নয় কেবল ভালোবাসাটা! এ যেন ঘোরতর অপরাধ এ মুল্লকের!

উত্তর পেয়ে গেল সৌম্য। কিছু একটা ভেবে নিলো নিজে থেকেই। ঘাড় ফিরিয়ে উমেদ মির্জার দিকে তাকাল। তিনি দেখলেন, কি অস্বাভাবিক লাল হয়ে রাঙানো চোখ দুটি... ভাঙা গলায় বহু কষ্টে উচ্চারণ করল ছেলেটা, 'চলো, বাড়ি ফিরবো।'

আদিবার হৃদয় জমিন কেঁপে উঠল ওইটুকুতেই।

উমেদ মির্জা একবার রোদ্দুরের দিকে চাইলেন, সেও চুপচাপ, বাকি সবাই হতবাক, হতবিহ্বল, কারো মুখে রা নেই। শেষ একটা চেষ্টা চালাতেই উমেদ মির্জা বলতে নিলেন, 'ভাই, আপনি যদি একবার...'

তার আগেই হাত উঁচু করে থামিয়ে দেওয়া হলো তাকে। অনুরোধ কিংবা অনুনয়- কোনোটাই শেষ করতে পারলেন না তিনি। আশফাকুল রহমান ভীষণ রুঢ় স্বরে বললেন, 'দয়া করে চলে যান। আমার মেয়ের মান সম্মান নিয়ে আপনার বাড়ির ছেলে অনেক খেললো। আপনি আর খেলবেন না...তালাকনামা- পাঠিয়ে দেওয়া হবে।'

বোবা তুমি আদিবা? যে সাহস, যে দাপটে তুমি সৌম্যকে নিজের করে চেয়েছিলে, পেয়েই ছেড়েছিলে- সেসব কোথায় ফুঁস হয়ে গেল? তোমার বাবা তালাকের কথা বলছে! তালাক মানে ছাড়াছাড়ি- এরপর তোমার মুখটা দেখাও আমার জন্য হারাম, হারাম, হারাম...!

কথাগুলো চিত্ত চিরে বেরিয়ে এল সৌম্যর। করুণ, অসহায় চোখে সে নির্বাক মেয়েটার দিকে চেয়ে রইল কতক পল, তারপর চোখ ফিরিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল সবার আগে। তার পেছন পেছন ছুটল মিশি, স্বস্তি, দীপ্র...একে বাড়ির সকলে!

উমেদ মির্জা ছেলের পিঠ চাপরে বেরিয়ে এলেন। দাঁড়িয়ে রইল কেবল রোদ্দুর একা, আসবার পথে সে আশফাকুল রহমানকে কিছুই বলল না ঠিক, তবে আদিবার দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিলেন।

ওই হাসিতে শ্লেষা মেশানো, কটাক্ষ কিংবা ঘৃণা!

আদিবা ধপ করে বসে পড়ল জমিনের উপর।

চোখের সামনে মায়ের নিথর মুখখানি আর কানে বেজে চলেছে বাবার কীড়া কাটা কসমের বাক্যখান....

কে যেন জিজ্ঞেস করল, 'উনারা তো অনেক খাবার দাবার নিয়া আসছে। সব গেটের কাছে রাখা, কি করবো ভাইজান?'

তাতে আশফাকুল রহমান ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে জবাব দিলেন, 'রাস্তায় ফেল, কুকুররা খেয়ে সাফ করবে।'

আদিবা চোখজোড়া মুঁদে নিলো।

আফসোস, সে তার বাবার মতোই মাকে ঘৃণা করতে পারেনি! মায়ার গিট্টু ছিঁড়তে পারেনি! উড়ে চলে যেতে পারেনি...যেথায় প্রেম পাওয়া যায়!

(চলবে)

_______

দু'দিন না দেবার জন্য দুঃখীত!

অনেকেই গল্প পড়ে চলে যান, একটা লাইক বাটন চাপতে ভীষণ কষ্ট, আর আমার এতখানি লিখতে কোনো কষ্টই হয় না.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন