ফন্ট সাইজ:
থিম:
চেরি ব্লসমের সাথে এক সন্ধ্যা

৩৫তম পর্ব

লেখক: ইফরাত মিলি

#চেরি_ব্লসমের_সাথে_এক_সন্ধ্যা

#লেখা: ইফরাত মিলি

#পর্ব: ৩৫

____________

মিতুল বারান্দায় বসে গুনগুন করছিল। এর মাঝেই দেখলো জোহানের গাড়ি প্রবেশ করছে বাড়ির ভিতর। কিছুক্ষণ আগেই তো জোহান ক্লাবে যাবে বলে বেরিয়ে গেল। তাহলে আবার ফিরে এলো কেন?

মিতুল ব্যাপারটা বুঝতে দৌড়ে নিচে চলে এলো। প্রবেশ দরজার সামনে মুখোমুখি হলো জোহানের।

"কী ব্যাপার? তুমি না ক্লাবে যাবে বলে বের হলে, তাহলে ফিরে এলে কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে?"

"হ্যাঁ। আমার যে সকল বন্ধুদের ক্লাবে যাওয়ার কথা ছিল, তার ভিতরে একজনের এক্সিডেন্ট হয়েছে!"

মিতুল আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বলে উঠলো,

"এক্সিডেন্ট? কার এক্সিডেন্ট হলো? তার অবস্থা কি মারাত্মক?"

"ওহ মিতুল, তুমি তো এমন করে বলছো যেন আমার ফ্রেন্ড বিমান এক্সিডেন্ট করেছে। ওর কোনো গুরুতর এক্সিডেন্ট হয়নি। সাইকেল এক্সিডেন্ট করেছে।"

"সাইকেল?"

জোহান হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লো।

মিতুল জিজ্ঞেস করলো,

"আঘাত পায়নি সে?"

"হাত একটুখানি ছিলে গেছে।"

মিতুল দুঃখ প্রকাশ করলো,

"আহারে! ওনার জন্য..."

"মিতুল..." মিতুলের কথার মাঝে রেশমী সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ডেকে উঠলেন ওকে।

থেমে গেল মিতুল। ডাক অনুসরণ করে সিঁড়ির দিকে তাকালো।

"আমার রুমে এসো।" রেশমী মিতুলকে রুমে আসতে বলে চলে গেলেন।

ভয়ের দানা জমতে শুরু করলো মিতুলের মনে। রেশমী আন্টি কেন ডাকছে? জোহানের সাথে এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে সেজন্য?

মিতুল জোহানকে বললো,

"আচ্ছা, তোমার কী মনে হয়? তোমার মম কেন ডাকছে আমাকে?"

"কেন ডাকছে সেটা আমি জানবো কী করে? গিয়ে দেখো।" কণ্ঠে বিরক্তি ঝরিয়ে চলে গেল জোহান।

মিতুলের নিজের উপর নিজের বিরক্ত লাগছে। কী দরকার ছিল বারান্দা থেকে এখানে এসে জোহানের সাথে কথা বলার? রেশমী আন্টি ডেকে নিয়ে কী বলবে এখন? ও নিশ্চিত এতক্ষণ জোহানের সাথে কথা বলছিল সে ব্যাপারেই কিছু বলবে সে।

মিতুল ভয়ে ভয়ে রেশমী আন্টির রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো। ভয় করছে ওর। বুঝতে পারছে না এত ভয় পাচ্ছে কেন। এখানে ভয় পাওয়ার কী আছে? রেশমী আন্টি যদি সত্যিই এই ব্যাপার নিয়েই কিছু বলে, তবে মুখের উপর জবাব দেবে। বলবে,

'জোহানের সাথে কথা বলা কি আমার অপরাধ? একটা মানুষের সাথে কথা বলা অপরাধ হিসেবে গণ্য হলো কবে? কে এই অপরাধের উদ্ভাবন করেছে? তুমি?'

হ্যাঁ, বলে দেবে মুখের উপর। মিতুল আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো। ও নিশ্চিত ছিল রেশমী আন্টি জোহানকে নিয়ে প্রশ্ন করবে। কেন কথা বলেছে, কী কথা বলেছে এসব জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু রেশমী আন্টি তা করলেন না। তিনি বললেন,

"কানাডা এসে আমাদের বাড়িতে থাকতে তোমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো মিতুল?"

রেশমী আন্টির প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল মিতুল। ও কী ভাবলো, আর রেশমী আন্টি কী বললো! এতদিন পর এ কী প্রশ্ন করছেন রেশমী আন্টি? কানাডা এসেছে কতদিন হয়ে গেছে। এখন এতগুলো দিন পর এই প্রশ্ন করছে রেশমী আন্টি? কিন্তু হঠাৎ কেন জিজ্ঞেস করছে এসব কথা? এর কী উত্তর দেবে এখন?

মিতুল মনে মনে কথা সাজিয়ে ফেললো। একটু হাসার চেষ্টা করে বললো,

"অসুবিধা? অসুবিধা হবে কেন? আমার তো এখানে থাকতে এমন একটা ফিল হচ্ছে, যেন আমি নিজ বাড়িতে আছি। মোটেই অসুবিধা হচ্ছে না আমার।"

মিতুল মনে মনে নিজেকে বাহবা না দিয়ে পারলো না। বললো,

'বাহ মিতুল, বাহ। এক্সট্রা লবণ দিয়ে খুব সুন্দর বুঝই তো দিতে পারিস তুই।'

মনে মনে হাসলো মিতুল।

রেশমী আন্টি ওয়্যারড্রবের দিকে এগিয়ে গেলেন। দুটো চকলেট বক্স এবং একটা সাইড ব্যাগ বের করে মিতুলের কাছে এলেন আবার। চকলেট এবং ব্যাগ মিতুলের হাতে দিয়ে বললেন,

"ব্যাগটা পছন্দ হয়েছিল। তাই তোমার জন্য কিনে আনলাম। পছন্দ হয়েছে তোমার?"

রেশমী আন্টির ব্যবহারে আবেগে জর্জরিত হলো মিতুল। রেশমী আন্টি ওর জন্য ব্যাগ, চকলেট কিনেছে? ও আপ্লুত কণ্ঠে বললো,

"থ্যাঙ্ক ইউ আন্টি। খুব পছন্দ হয়েছে আমার।"

রেশমী হেসে চুমু খেলেন মিতুলের কপালে।

রেশমী আন্টির প্রতি যে ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল তা নিমেষে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল মিতুলের। এত ভালো একজন মানুষকে ও কালকে খারাপ ভেবেছিল। ছি! নিজের ভাবনার প্রতি নিজেরই রাগ হচ্ছে এখন।

______________

আজকের দিনটি ফুরফুরা ধরনের লাগছে মিতুলের। নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশ। মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। গাছে গাছে চোখ জুড়ানো ফুলের সমারোহ। আর সেই সাথে আবার রঙিন প্রজাতির ওড়াউড়ি। সব মিলিয়ে এক রোমাঞ্চকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। ওখানে আবার ওক গাছের ডালে নীল পালকের একটি পাখি লেজ নাড়াতে নাড়াতে কণ্ঠে মিষ্টি সুর তুলে ডাকছে। মিতুলের কাছে বেশ লাগছে কিন্তু পাখির ডাকটা। ও মোবাইল বের করে ছবি তুললো পাখিটার। পাখিটা সেই অনেকক্ষণ ধরে এখানে বসে আছে। উড়ে যাচ্ছে না। মিতুলের মনে হচ্ছে ওকে সঙ্গ দিতেই বসে আছে পাখিটা। বাহ! এই কানাডার পাখি গুলোও দেখছে খুব বুদ্ধিমান।

মিতুল এসে দোলনায় বসলো। সকালবেলা উঠে একবার এই গার্ডেনে এলেই মন ভালো হয়ে যায় ওর। যদিও কালকে থেকে ওর মন খুব ভালোই আছে। জোহান ওর জন্য আতশবাজির ব্যবস্থা করেছিল, সেটা ভাবতেই বার বার পুলকিত হয় ও। তাছাড়া রেশমী আন্টি যে আচরণ করলো কাল। রেশমী আন্টির এতগুলো দিনের মধ্যে সব থেকে বেশি আন্তরিক আচরণ বোধহয় কালই ছিল। কালকের পর থেকে রেশমী আন্টির প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আরও বেড়ে গেছে ওর। সত্যিই খুব ভালো রেশমী আন্টি। তার দেওয়া চকলেট খেয়ে টেস্ট করেছে রাতে। বেশ ইয়াম্মি চকলেট। ওর হঠাৎ ইচ্ছে হলো জোহানকেও এই চকলেট খেতে দেয়। আচ্ছা জোহান এখন কোথায় আছে? মিতুল ঘাড় ঘুরিয়ে জঙ্গলের দিকে তাকালো। জোহান সম্ভবত এখন জঙ্গলের ভিতর নিজের টাইম হাউজে আছে। কারণ, রুমে দেখেনি জোহানকে। মিতুল বুঝতে পারে না, বাড়ি ছেড়ে টাইম হাউজে থাকায় কী এমন মজা আছে? একা একা একটি ঘরে কার ভালো লাগে থাকতে? জোহান কীভাবে থাকে? ও হলে জীবনেও থাকতে পারতো না।

মিতুল দোলনা থেকে নেমে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে জঙ্গলের রাস্তা ধরলো।

হাঁটতে হাঁটতে এসে গেল জোহানের টাইম হাউজে। এসে বেশ অবাকই হলো আজকে। জোহানের টাইম হাউজের দরজা পুরোপুরি খোলা। এর আগে যতবার এসেছে ততবারই দেখেছে দরজা বন্ধ। আজকে দরজা খুলে রেখেছে যে, কাহিনি কী?

মিতুল কোনো শব্দ না করেই ধীর পা ফেলে ঢুকলো জোহানের টাইম হাউজের ভিতর।

কিচেন থেকে জোহান এবং আরও একটা পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে আসছে। কণ্ঠটি বেশ পরিচিত পরিচিত ঠেকছে ওর কাছে। কার কণ্ঠ এটা? মিতুল ধীর পায়েই এগিয়ে এলো কিচেনের দিকে। কিচেনে উঁকি দিয়ে দেখলো জোহানের সাথে সাদাত আঙ্কল। সাদাত আঙ্কলকে দেখে অবাক হলো ও। সাদাত আঙ্কল? সাদাত আঙ্কলের কণ্ঠ ও চিনতে পারেনি? ওর নিজেকে এই মুহূর্তে অকর্মণ্য মনে হলো। সাদাত আঙ্কলের কণ্ঠ কীভাবে না চিনে পারে ও?

মিতুল কিছুক্ষণ চুপিচাপি তাকিয়ে রইল বাবা-ছেলের দিকে। বাবা-ছেলে মিলে অমলেট তৈরি করছে। ভীষণ হাসাহাসি চলছে দুজনের মাঝে। বাহ! সুন্দর একটা দৃশ্য! ও এসেছে তা কেউ টের পায়নি। চায়ও না আর টের পাক ও এসেছে। বাবা এবং ছেলের ভালোবাসার মাঝে নিজেকে ঢোকানো একেবারেই অনুচিত মনে হচ্ছে ওর কাছে।

মিতুল চুপিচুপি বেরিয়ে এলো টাইম হাউজ থেকে। মনে হচ্ছে সাদাত আঙ্কল নিজের ছেলেদের প্রতি ভীষণ যত্নশীল। খুব ভালোবাসে ছেলেদেরকে। তা না হলে এত ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও ছেলেকে এমন ভাবে সময় দিতো?

মিতুল টাইম হাউজ থেকে কিছুটা দূর চলে আসতেই পিছনে খুবই ছোটো করে শুনতে পেল জোহানের ডাক,

"হেই তুলতুল!"

মিতুলের পা না চাইতেই দাঁড়িয়ে গেল। জোহান কীভাবে টের পেল ও এখানে এসেছে? ও তো কোনো শব্দ করেনি টাইম হাউজে থাকতে।

জোহান দৌড়ে এলো মিতুলের কাছে।

"হেই, আমাকে না জানিয়ে চুপিচুপি চলে যাচ্ছ কেন আমার টাইম হাউজ থেকে?"

"তুমি তোমার ড্যাডের সাথে ছিলে, তাই ভাবলাম তোমাদের ডিস্টার্ব না করি।"

"বুঝলাম। কিন্তু তুমি এসেছিলে কেন?"

মিতুল হকচকিয়ে গেল। কেন এসেছিল ও জোহানের এখানে? নিজেই তো জানে না সঠিক। জোহানকে কী বলবে?

মিতুল কিছু বলার আগে জোহানই বলে উঠলো,

"আমাকে ছাড়া থাকতে পারছিলে না, তাই না? মিস করছিলে খুব, তাই না?"

জোহানের কথা শেষ হতে না হতেই মিতুল বললো,

"মোটেই না। তোমাকে মিস করবো কেন? তোমার টাইম হাউজে একটা জিনিস হারিয়ে ফেলেছি আমি। সেটাই খুঁজতে এসেছিলাম।"

"ও আচ্ছা। একটা জিনিস হারিয়ে ফেলেছিলে আমার টাইম হাউজে? তো কী জিনিস হারিয়ে ফেলেছো তুমি? নিজের মন?"

মিতুলের হৃৎপিণ্ড যেন আচমকা দুলে উঠলো। হার্টবিট বাড়তে শুরু করলো দ্রুত। আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব না জোহানের সামনে। এখনই বাড়ি চলে যাবে এখান থেকে।

মিতুল ঘুরে হাঁটা দিলেই জোহান এসে পথ আটকে ধরলো।

"কী হলো? কিছু না বলে চলে যাচ্ছ কেন? বলো, কী হারিয়ে ফেলেছো তুমি এখানে?"

মিতুল টের পাচ্ছে ও দুর্বল হয়ে পড়ছে। জোহানের সামনে কিছুতেই আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। ও কিছু না বলে জোহানকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া দিলো।

জোহান আবারও বাধা দিলো ওকে। রুখে গেল ওর পা। জোহান একটু ঝুঁকে বললো,

"ব্যাপার কী মিতুল, বলো তো? আজকে এভাবে পালিয়ে বেড়াচ্ছ কেন তুমি?"

জোহানের প্রশ্নের কোনো উত্তর এলো না মিতুলের থেকে। জোহান বললো,

"আচ্ছা, যাক বাদ দিই এসব। শোনো, কালকে তো ক্লাবে যাওয়া হয়নি। তাই আজকে ক্লাবে যাচ্ছি আমি। ক্লাবের কোনো মেয়ের সাথে ছবি তুলে তোমাকে পাঠানোর দুঃসাহস কি আমি দেখাতে পারি? না কি..."

মিতুল জোহানের কথার মাঝেই বলে উঠলো,

"তোমার যা খুশি তাই করো।"

বলেই পাশ কাটিয়ে দৌড়ে চলে গেল ও।

জোহান পিছন থেকে ডাকলো,

"হেই তুলতুল! তুমি তো দেখছি সত্যিই পালিয়ে যাচ্ছ। কেন? আমার থেকে পালাচ্ছো কেন? আমাকে মিস করো বলেই তো এসেছিলে, তাহলে আবার পালিয়ে যাচ্ছ কেন?"

________________

আব্বুর সাথে ফোনে কথা হচ্ছিল মিতুলের। এর মাঝেই নিচ থেকে ভেসে আসে রেশমী আন্টির উচ্চৈঃকণ্ঠস্বর। ও প্রথমে গ্রাহ্য করতে চাইলো না সেসব। কিন্তু রেশমী আন্টির চ্যাঁচানো গলা থেকে থেকে ভেসে আসছিল কানে। এবার আর গ্রাহ্য না করে পারলো না ও। ভয় হলো ওর। হঠাৎ কী হলো যে রেশমী আন্টি এমন চ্যাঁচামেচি করছেন?

মিতুল আব্বুকে বললো,

"আব্বু আমি পরে ফোন করবো তোমায়। নিচে একটা জরুরি কাজ আছে আমার। এখন রাখি আমি।"

মিতুল বাবাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন কেটে দিলো। তারপর দ্রুত পায়ে ছুটে এলো সিঁড়ির দিকে। হলরুমে নামার আগে ওর পা সিঁড়িতেই থমকে গেল। প্রথমেই চোখ পড়লো জোহানের উপর। রেশমী আন্টির সামনে কিছুটা মাথা নত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে জোহান। মাথা একটু নুইয়ে রাখলেও হলরুমের আলোক বাতিতে ওর মুখ দেখা যাচ্ছে। মুখের জায়গায় জায়গায় লাল দাগের উপস্থিতি! মিতুলের অন্তর কেঁপে উঠলো! আবারও মার খেয়েছে জোহান?

(চলবে)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন