ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ভেলা

২১তম পর্ব

লেখক: সুরাইয়া রাফা
সন্ধ্যারাত, উড়ো মেঘের আড়ালে ক্ষণে ক্ষণে মিলিয়ে যাচ্ছে রুপোলী থা-লার মতো সুন্দরী চাঁদ। যার দরুন প্রকৃতিতে বিরাজ করছে আলো ছায়ার এক জাদুকরি রোশনাই। সেই সন্ধ্যা থেকে ছাঁদের পাঁচিল ঘেঁষে দাড়িয়ে এক নাগারে আকাশ দেখছে অরু। মৃদু বাতাসে এলোপাতাড়ি উড়ছে ওর রেসমের মতো মসৃণ লম্বা চুল। খানিক বাদে অরু অনুভব করলো ওর খোলা চুলে মুখ ডুবিয়েছে কেউ, কল্পনা হোক কিংবা বাস্তব এই বেসামাল স্পর্শটা ওর ভালো করেই চেনা। সহসা বিচলিত না হয়ে ক্রীতিকের কাছ থেকে দু'পা পিছিয়ে গিয়ে সরে দাঁড়ালো অরু। আকাশের দিকে স্থির তা-কিয়ে থমথমে মুখে বললো,
--- আপনাকে ফিরে যেতে বলেছিলাম, এখনো যান নি কেন?
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ক্রীতিক। অরুকে ছেড়ে দিয়ে প্যান্টের পকেটে দু'হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে শান্তস্বরে বলে,
ফিরবো তো তোমাকে সাথে নিয়ে।
আমি ফিরবো না কোথাও।
- অনুমতি চেয়েছি?
সরু চোখে তাকিয়ে তীর্যক কন্ঠে কথা ছোড়ে ক্রীতিক।
অরু এবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ক্রীতিকের পানে, ব্যগ্র কন্ঠে বলে উঠলো,
--- কেন বুঝতে চাইছেন না আমার সমস্যাটা? আমি মানসিক ভাবে মো-টেই স্ট্যাবল নই। বাস্তবতা ভুলে সারাক্ষণ কল্পনার জগতে বিচরণ করি আমি। এমনকি এই মূহুর্তে দাঁড়িয়ে আপনি আদৌও আমার কল্পনা নাকি বাস্তবতা সেটাই বুঝতে পারছি না। ঠিক কতটা ডিজঅর্ডারে ভুগছি আমি সেটা অনুমান করতে পারছেন নিশ্চয়ই?
প্রত্যুত্তর করার প্রয়োজন বোধ করলো না ক্রীতিক। বরং জোর গতিতে সামনে এগিয়ে এসে ঘাড় নুয়িয়ে অকস্মাৎ কামড়ে ধরলো অরুর অধর। ওর এহেন কান্ডে প্রচন্ড ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে অরু। দু'হাতে ক্রীতিককে দূরে সরিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে থাকে অনবরত। বিধিবাম এইটুকুনি চুনোপুঁটির মতো মেয়ের কি আর অমন শক্ত পোক্ত ক্রীতি-ককে দূরে সরানোর সাধ্যি আছে?
অগত্যাই হার মেনে নিলো অরু। কয়েক মূহুর্ত বাদে অরুর ঠোঁটের মাঝে একটা বড়সড় ক্ষত তৈরি করে তবেই সরে দাঁড়ালো ক্রীতিক। অরুর চোখ ছলছল করছে সেভাবেই কাটা ঠোঁটে হাত ছুয়িয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে।
অরুকে ব্যথা দিয়ে কোনোরূপ ভাবান্তর হলো না ক্রীতিকের মাঝে। সে ভাবলেশহীন গলায় এক ভ্রু উঁচিয়ে বললো,
এবার নিশ্চয়ই বিশ্বাস হয়েছে?
অরু কান্না চেপে রেখে ধরা গলায় বললো,
কেনো এসেছেন এখানে?
তোমার জন্য।
বিয়ের রাতে যখন আমার উপর সকল দায় চাপিয়ে দিয়ে ওভাবে চলে গিয়েছিলেন, তখন মনে ছিলনা? তারপর খোঁজ নিয়েছেন কখনো? আর এখন এতো মাস পরে হুট করেই এসে বলছেন আপনার আমাকে চাই।
অরু অভিযোগের পসরা সাজিয়েছে। ক্রীতিক ভেতরের আহত বাতাস টুকু নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বের করে ওকে মাঝপথে আটকে দিয়ে বললো,
তোমাকে আমার চাই না সেটাও তো বলিনি কখনো।
আর কোনো জবাব না দিয়ে, অভিমানে নাক টেনে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে চাইলো অরু। ক্রীতিক একা একাই বললো,
লন্ডন থেকে ফিরে সবার আগে তোমার ডরমিটরিতে গিয়েছিলাম আমি অরু। ভোর রাত পর্যন্ত সেখানেই একটানা অপেক্ষা করি, কিন্তু তোমাকে খুঁজে পাইনি। অতঃপর অনন্যাকে কল করে জানতে পারি তুমি কিছুদিন আগেই সবকিছু গুটিয়ে নিয়ে ইউ এস এ ত্যাগ করেছো। বিশ্বাস করো তখন খুব রাগ হয়েছিল তোমার উপর, মনে হচ্ছিল সামনে পেলে তোমাকে তখনই ছিড়ে খাবো আমি।
আপনি রেগে গেলে বড্ড হিংস্র হয়ে যান। যেন মানুষ নয় ভয়ঙ্কর কোনো জন্তু জানোয়ার।
ক্রীতিক নিশ্চুপ হয়ে গেলো, মাথা উঁচিয়ে দৃষ্টিপাত করলো সুবিশাল আকাশের পানে।
এবার কৌতুহলী হয়ে পরে অরু, কিঞ্চিৎ আগ বাড়িয়ে শুধায়,
--- কিন্তু আপনি আমার ঠিকানা কোথায় পেলেন? আমিতো কোনোদিন কাউকে বলিনি।
হুট করেই অদ্ভুত এক ক্রুর হাসি খেলে গেলো ক্রীতিকের ঠোঁটের আগায়। সেই হাসিটুকু সন্তর্পণে আড়াল করে ও গমগমে আওয়াজে বলে,
অনন্যা বলেছিল তুমি বাংলাদেশের কোনো একটা পাহাড়ি এলাকায় থাকো, এছাড়া আর কিছুই জানা নেই ওর। বাকিটা আমি নিজেই খুঁজে বের করেছি। ওইজন্যই তো একমাস লেগে গেলো।
ক্রীতিকের কথাগুলো এবার বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো অরুর নিকট। সত্যি তো এটাই যে ওর কাছের বন্ধুরাও জানেনা ওর এমন পারিবারিক জটিল-তায় মোড়ানো জীবনের কথা। কিন্তু আজ ক্রীতিককে সবটা খুলে বলতে ইচ্ছে হলো অরুর, ক্রীতিক যেহেতু ভালোবাসার টানে এতো দূর এসেই পরেছে তাহলে এতো লুকোচুরি করেই বা কি লাভ? তাইতো ক্রীতিকের কথার জের ধরে সহসা বলতে শুরু করে অরু,
আমি একটা নামি-দামি সম্ভ্রান্ত পরিবারের উচ্ছিষ্ট মাত্র জায়ান। জী-বনে কোনোদিন অভাব অনটনের মুখ না দেখলেও পারিবারিক টানাপো-ড়েন আর সম্পর্কের জটিল সমীকরণের দায়ে ছোট বেলা থেকেই ভীষণ নিঃসঙ্গ আমি।
অরুর কথায় খুব একটা ভাবান্তর দেখা গেলো না ক্রীতিকের মাঝে। তার ভাবখানা এমন যেন সে সব কিছুই বহু আগে থেকে জানে এসব। তবুও আনমনে বলতে লাগলো অরু,
বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। সেই জের ধরেই মূলত এই দূর্বার পাহাড়ি অঞ্চলে আগমন তার। আমার মা বাঙালি নন, তিনি ছিলেন চাকমা সম্প্রদায়ের আদবাসী। মায়ের পরিবার বহুকাল থে-কেই বান্দরবানে বসবাস করে। আর এখানেই শুরু হয়েছিল আমার বাবা আর মায়ের অসম প্রেমের কাহিনি। তারা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন একে অপরকে। শুধুমাত্র বাবাকে ভালোবেসে মা তার গোষ্ঠী, ধর্ম সব-কিছু থেকে বেরিয়ে আমাদের ধর্ম গ্রহন করেছিলেন।
এই বাড়িটা ও তখনকার বানানো। জাহান শেখ হলেন আমার দাদি। আসলে বাবা-মায়ের বিয়েটা কোনোদিন ও স্বাভাবিক ভাবে নেইনি আমার দাদা-দাদি। তখন ফোন কলের সিস্টেম ছিল অতি নগন্য, বার্তা আদান-প্রদানের একমাত্র মাধ্যম ছিল চিঠি। সূদুর ঢাকা থেকে এই পার্বত্য অঞ্চ-লের চিঠি যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিল বেশ নড়বড়ে। বাবা চিঠিতে বহুবার বিয়ের কথা জানিয়েছিলেন দাদা-দাদিকে। কিন্তু তারা সরাসরি এই বি-য়েতে অস্বীকৃতি জানান। ফল স্বরূপ এখানে এই পাহাড়ী অঞ্চলেই আমাকে নিয়ে শুরু হয় আমার বাবা মায়ের ছোট্ট সুখের সংসার। চার বছর বয়স পর্যন্ত আমার ছোট বেলার দিনগুলো ভালোই কেটেছিল, অন্যসব বাচ্চাদের মতোই ভরপুর আদর, যত্ন আর আনন্দে দিব্যি বেড়ে উঠছিলাম আমি।
তবে এই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলোনা আমার কপালে।
হুট করেই একদিন চিঠি এলো আমার দাদি মুমুর্ষু হয়ে বিছানা শয্যায়। যখন তখন ইহকাল ত্যাগ করতে পারেন তিনি। অকস্মাৎ মায়ের এহেন অসুস্থতার খবর শুনে সে রাতেই আমাকে আর মা'কে রেখে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন বাবা।
এটুকু বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো অরু, ক্রীতিক চাইছে অরু আজ সবকিছু বলুক। ওর মনটা হালকা করুক। ক্রীতিককে সবচেয়ে কাছের মানুষের আসনে বসাক বিনা দ্বিধায়। যার দরুন ক্রীতিক বলে উঠলো,
তারপর?
একটু সময় নিয়ে পুনরায় বলতে আরম্ভ করলো অরু,
-তারপর আর কি? সুখের দিনের ইতি টেনে সূচনা হলো আমাদের কষ্ট জর্জরিত ব্যথাতুর দিনের। বাবা সেই যে গেলেন আর কখনো ফিরলেন না। দিন যায়, মাস যায়, সময় অতিবাহিত হতে হতে বছরের কাছাকাছি চলে যায়। পথ চেয়ে চেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ি আমি আর মা। তাও বাবা কোনোদিন ফেরেনা।
যোগাযোগটা ও সেই থেকেই বন্ধ। মা সপ্তাহে একবার করে চিঠি পাঠা-লেও ওপাশ থেকে তার কোনো প্রত্যুত্তর আসেনা কোনোদিন। এক পর্যায়ে দিশেহারা হয়ে মা সিদ্ধান্ত নেয় তিনি শহরে যাবেন বাবার খোঁজ করতে।
যেই ভাবা সেই কাজ, একদিন আমাকে আমলকী হরীতকীর কাছে রেখে মা বেড়িয়ে পড়লো বাবার সন্ধানে। সেদিন সেভাবেই চলে যায়, তিনটে প্রাণ তিন জায়গাতে ছন্নছাড়া হয়ে যাই আমরা।
পরের দিন ছিল ঝুম বৃষ্টি। আকাশ বাতাস কালো করে সারাদিন মুশলধা-রায় বৃষ্টি হয়েছিল সেদিন। আমি মায়ের জন্য কাঁদছিলাম খুব। আমার সাথে তাল মিলিয়ে প্রকৃতিও যেন কেঁদে ভাসাচ্ছিল সমগ্র ধরনী। অব-শেষে মাঝরাতে কাকভেজা হয়ে একাই ফিরে এলো মা। আমি মা'কে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলাম
বাবা কোথায়?
মা উত্তর দিলেন না কোনো। ভেজা শরীরে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে চলে গেলেন ভেতরের ঘরে। পরে জানতে পারলাম অসুস্থতা ছিল বা-বাকে কব্জা করার জন্য আমার দাদির ক্ষুদ্র এক কৌশল মাত্র। বাবা শহরে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তাকে পরিস্থিতির চাপে ফেলে অন্যত্র বিয়ে করানো হয়। মা আদিবাসী বলে বাবা মায়ের বিয়েটাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গিয়েছিলেন আমার দাদি। তার চেয়েও আপসোসের বিষয় হলো শহরে গিয়ে একটাবার বাবার মুখোমুখি অবধি হতে পারেনি মা। কারণ বাবা ইতিমধ্যে তার দ্বিতীয় স্ত্রী সহ অন্য জেলায় পোস্টিং নিয়ে চলে গিয়েছিলেন।
সে রাতে হাড় কাঁপিয়ে জ্বর এসেছিল মায়ের। জ্বরের ঘোরে এতো সখের ভালোবাসাকে এভাবে হারিয়ে ফেলার বেদনা আর প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রনায় উন্মাদের মতো আচরণ করেছিল আমার মা। সেই যে শহর থেকে ফিরে জ্বরে শুয়ে পরলো, আর কোনোদিন বিছানা ছেড়ে উঠলো না সে। তার মনের জোর, বেঁচে থাকার ইচ্ছে, সবকিছুই হারিয়ে গিয়েছিল বোধ হয় সেদিন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন