পর্ব - ৭
রাতের শহরের বুক চিড়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে অটোস্ট্রাদা এ-ওয়ান মহাসড়ক। মিলান থেকে সরাসরি রোমের সংযোগস্থল বলে এখানে সবসময় থাকে গাড়ির জোয়ার। রাস্তার দুপাশের শয়ে শয়ে বিলবোর্ড আর পোস্টারের রঙিন আলোয় ঝলমল করছে মসৃণ রূপোরঙা সড়ক। শহরের সবচেয়ে ব্যস্ততম মহাসড়ক হওয়ায় এই রাস্তায় ঘন্টায় গতিবেগ বেধে দেওয়া হয়েছে ৩০ কিলোমিটার। অথচ সেই গতিবেগের বেমালুম তোয়া-ক্কা না করে আশেপাশের সব গাড়িকে টেক্কা দিয়ে তীরের বেগে ছুটে চলেছে একটা ছাঁদখোলা বিলাসবহুল ল্যাম্বরগিনি।
বাতাস কেটে কেটে এগিয়ে যাওয়া ঝকঝকে কালো গাড়িটার গতিবেগ দেখে তাজ্জব হয়ে আছে পুরো শহর। ব্যস্ত সড়কে এতোটা দক্ষ কার ড্রাইভিং কোনো প্রফেশনাল গেইমার ছাড়া সম্ভব নয়।
অথচ গাড়িটাকে সিসিটিভি ক্যামেরায় পরখ করতে থাকা শহরের চিফ ভালো করেই জানেন ভেতরে যে বসে আছে সে কোনো গেই-মার নয় বরং প্রোগেইমার।
কালো ল্যাম্বগিনির এহেন উদভ্রান্ত গতিবেগ দৃষ্টি এড়ায়নি রাস্তায় ডিউটিরত পুলিশের। তবে তাদের জরিমানা টিকেট প্রদানে কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দিয়েছে উপর মহল। কারণ গাড়ির মধ্যে অন্যকেউ নয়, বসে আছে স্বয়ং ইয়াশ ইউভান। তুষার জাও-য়াদের একমাত্র ছেলে, ইয়ং মাস্টার অব প্যারালাল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রি।
দেখতে দেখতেই আলোক ঝলমলে শহর পেড়িয়ে নির্জন সড়কে সে পৌঁছেছে গাড়িটা। মহাসড়ক ছাড়িয়ে নেইবারহুডের দিকে আসতে না আসতেই
চারিপাশে ছোটবড় অসংখ্য ঝোপঝাড় আর বড়বড় পাইন গাছের হিড়িক পড়েছে। ক্রমশ নিকশ নিবিড় আঁধারে তলিয়ে যাচ্ছে রা-স্তাটা। যা দেখে নৈঃশব্দ্যে একটা বাঁকা হাসির রেখা ফুটলো ইয়া-শের রিং আবৃত ঠোঁটে। দাঁতের মাঝে রিং সহ ঠোঁটটাকে কামড়ে ধরে হাসিটাকে জোড়ালো করলো সে।
পরপরই দক্ষ হাতে গিয়ার টেনে ইউটার্ন নিলো অকস্মাৎ। জঙ্গ-লের এবড়োথেবড়ো পথ ধরে একশোর উপর গতি তুলে চোখের পলকে ছুটে গেলো কয়েকক্রোশ। তারপর হঠাৎ করেই আড়াআ-ড়ি করে গাড়িটাকে তুলে দিলো রাস্তার মাঝে। তার এই অত্যাশ্চ-র্য্য কর্মকান্ডে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একপ্রকার ছিটকে পড়লো সামনের গাড়িটা। এতেও ভাবান্তর ঘটলো না ইয়াশের মাঝে, উল্টো কোনো-রূপ ওয়ার্নিং ছাড়াই আবারও ধাক্কা দিলো গাড়িটাকে। সঙ্গে সঙ্গে ব্রেক হারিয়ে রাস্তা থেকে সরে ঘন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেলো সাদা রঙের টয়োটা সুপরা।
গতির অসামঞ্জস্যতায় তৎক্ষনাৎ বন্ধ হয়ে গেলো গাড়ির ইঞ্জিন।
পরবর্তী কয়েক মূহুর্ত গোটা জঙ্গল জুড়ে খেলে গেলো অদ্ভুতুরে এক নৈঃশব্দ্য। এর মাঝেই গাড়ি থেকে নেমে পরলো ইয়াশ। হাতে তার রাবার দিয়ে প্যাচানো দু'দুটো হকিস্টিক। প্রথমে পা দিয়ে গা-ড়ির দরজা ঠেলে হাতের সাহায্যে মাথার হুডিটা টেনে দিলো সে। তারপর শুকনো পাতার গায়ে কাঁপন তুলে সোজা হেঁটে গেলো ঝোপঝাড়ের মাঝে অসার হয়ে পরে থাকা সাদা টয়োটার দিকে। টার্গেট অবশ্য গাড়ি নয়, গাড়ির মালিক। সহসা
গাড়ির মধ্যে থেকে কলার ধরে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনলো একজন কে। রাস্তার অদূরে টিমটিমিয়ে জ্বলতে রাতবাতির ক্ষীণ আলোয় গাড়ির মালিকের মুখটা দেখা মাত্রই চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো তার। অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলো,
জ্যাকভ!
জ্যাকভ তখন হাওয়ার মতো দুলছে। পায়ে প্রচন্ড জোরে চোট পেয়েছে, তারউপর নেশাগ্রস্ত।
কলার ধরেও দাঁড় করিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না ছেলেটাকে, যার দরুন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ওকে অদূরে ছুড়ে ফেললো ইয়াশ। হঠাৎ বড়সড় ধাক্কায় কিছুটা সতর্ক হয়ে উঠলো এবার জ্যাকভ। পেছনে ঘুরে ভ্রু বাকিয়ে বললো,
ইউ্য ন্যাস্টি জার্ক! আমার গায়ে তোলার সাহস কোথায় পেলে তুমি?
কোনোপ্রকার জবাব ছাড়াই, নির্বিকারে সিগারেট ধরালো ইয়াশ। জ্বলে ওঠা লাইটারের একটুকরো দ্রীপ্ত শিখায় আগুনের মতোই দাউদাউ করে উঠলো তার তীক্ষ্ণ ফলার মতো চোখ। যা দেখে শু-স্ক ঢোক গিললো জ্যাকভ। গলার জোর খাদে নামিয়ে কম্পমান স্বরে আওড়ালো,
-ইয়াশশশ!
হেয়ার আই এ্যাম!
ছোট্ট একটা বাক্য, অথচ জ্যাকভের সমগ্র শরীর বরফের মতো জমে গেলো। ফ্যাকাশে হয়ে গেলো মুখ। ভীতিগ্রস্ত হয়ে বললো,
হঠাৎ আমার সঙ্গে কি দরকার তোমার? আমিতো কিছু করিনি।
তাচ্ছিল্যের স্বরে হাসলো ইয়াশ। হাতে থাকা হকিস্টিকটা দেখিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে রহস্য জড়ানো গলায় জবাব দিলো,
এটা দেখছো? গাড়িতে আরও কয়েকটা আছে। সবগুলো তো-মার শরীরে ভাঙবো আজ। আপাতত এটাই প্ল্যান।
আর ইউ ক্রেইজি?
নো আ'ম নট।
তাহলে আমাকে কেন মারতে চাইছো? আমি তো তোমার কোনো ক্ষতি করিনি।
আমার ক্যারিয়ার, স্বপ্ন সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে এখন ইনোসেন্ট সাজছিস শুয়োর!
ইয়াশের গর্জনের দাপটে রক্তশূন্য হয়ে উঠলো জ্যাকভের মুখ। সে ভালো করেই চেনে এই রূঢ়ভাষী ছেলেটাকে। সবার সামনে ভাবা-বেগহীন নির্লিপ্ত হলেও আড়ালে ও একটা মনস্টার। তাইতো ক্যা-ম্পাসে একসঙ্গে চারটা বছর কাটালেও কখনো যেচে পড়ে লা-গতে যায়নি জ্যাকভ। অথচ গ্রাজুয়েশনের অন্তিম লগ্নে এসে সেই মনস্টারের ব্যঘ্র থাবার মুখেই পড়তে হলো ওকে। সহসা ভয়ে তট-স্থ হয়ে গেলো বান্দা। জরাজীর্ণ স্বরে আওড়ালো,
আমি কিছু করিনি। বিলিভ মি ইয়াশ, আমি জানতাম না এটা তোমার পুরো ক্যারিয়ার নষ্ট করে দিবে। আমিতো শুধু ওর জন্য.....
বাক্যসম্পন্ন না করেই অকস্মাৎ মাঝপথে থেমে গেলো জ্যাকভ। যা দেখে কপাল গোছালো ইয়াশ। দাঁতে দাঁত পিষে প্রশ্ন ছুড়লো,
কার জন্য?
- ন...না মানে কেউ না।
কথা বলতে গিয়ে অস্বাভাবিক ভাবে তোতলাচ্ছে জ্যাকভ। এবারে আর রাগটাকে সামলে রাখতে পারলো না ইয়াশ। ক্রোধান্ধ হয়ে একের পর এক হকিস্টিকের আঘাতে ধরাশায়ী করে ফেললো জ্যাকভকে। মাটি থেকে উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ পেলোনা বান্দা, তার আগেই শক্ত পদাঘাতে ওর ঘাড় টাকে চেপে ধরলো ইয়াশ।
হোয়াইট স্নিকার্সের শক্ত পদতলে ওর মাথাটাকে পিষে দিয়ে বললো,
-বল কে বলেছে এসব? কার জন্য আমার সিস্টেমে বাগ ঢুকি-য়েছিস তুই।
ইয়াশের পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে যেতে যেতে আবারও অস্থির হয়ে বলে উঠলো জ্যাকভ,
আমি তো তোমার শত্রু নই ইয়াশ। আমার বোন রোজ তো-মাকে ভীষণ পছন্দ করে, আমিও তাই। ইভেন ইফ ইউ্য ওয়ান্ট উই কুড বি গুড ফ্রেন্ডস।
এবার আর জবাব দিলো না ইয়াশ। হাতে থাকা হকিস্টিক দিয়ে আবারও শুরু করলো বেধড়ক মার। ব্যথায় চিৎকার করে বার-বার শুধু লাফিয়ে উঠছে জ্যাকভ। মারতে মারতে একপর্যায়ে ভেঙে গেলো হকিস্টিক। হাত পা ভেঙে অসার হয়ে মাটিতে লুটি-য়ে পড়েছে জ্যাকভ। সমগ্র শরীর তার রক্ত ঘামে ভিজে একা-কার। তবুও থামলো না ইয়াশ। হকিস্টিকের ভাঙা অংশটা দিয়ে ওর মুখটাকে চোখের সামনে তুলে ধরে শীতল গলায় বললো,
দিস ইজ দ্যা লাস্ট ওয়ার্নিং, হয় ওর নামটা বল, নয়তো এই ভাঙা হকিস্টিক সোজা তোর মুখে চালান করবো আমি।
মাত্রাধিক ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে গেলো জ্যাকভ। এদিকে ওদিকে তাকিয়ে পালানোর পাঁয়তারা করলো, কিন্তু শরীর নাড়িয়ে ওঠার সাধ্য নেই। অগত্যা জীবন বাঁচাতে মুখ খুলতেই হলো তাকে। রক্তা-ক্ত ঠোঁট নাড়িয়ে বিপন্ন গলায় জবাব দিলো,
প.. প্রিসিলা। সবকিছু ওরই প্ল্যান, কথা ছিল প্ল্যান সাকসেসফুল হলে ও আমার সঙ্গে ডেটে যাবে।
এক মূহুর্তের জন্য নিজ কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না ইয়াশ। ফলস্বরূপ প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি ঘটলো আবারও,
কোন প্রিসিলা?
প্রিসিলা জাওয়াদ! তো... তোমার বোন।
জ্যাকভের বলা শেষ কথাটুকু শুনেও বোধ হয় শুনলো না ইয়াশ। কর্ণকুহরে নামটা পৌঁছানোর পরপরই থমকে গেলো ওর শ্বাসপ্র-শ্বাস। মস্তিষ্কটা ফাঁকা হয়ে এলো, অচিরেই আধভাঙ্গা হকিস্টিক-খানি হাত ফস্কে ছিটকে পড়লো মাটিতে। একটুখানি ফুরসত পে-তেই কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে পা টেনেটেনে ছুটে পালালো জ্যাকভ।
ইয়াশ আর আটকালো না ওকে। বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠের ন্যায় আচানক ধাক্কায় বাকরুদ্ধ হয়ে সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো জঙ্গলের ভেতর।
ইয়াশ যখন বাড়িতে ফিরলো তখন মোটামুটি ভালোই রাত হয়েছে। সচরাচর সে কখনো এতো জলদি বাড়ি ফেরেনা। সারা-রাত জেগে ইন্টারনেট ক্যাফেতে বসে গেমিং করে, ভোর রাতের দিকে বাড়ির কথা মনে পড়ে তার। কারণ সেসময় ড্যাড আর মম অপেক্ষা করে ওর জন্য। দক্ষিণের খোলা জানালা গলিয়ে গভীর নজর রাখে ইয়াশের ঘরে। সবসময় অবশ্য থাকেনা, আমাবস্যা হলে কোথায় যে মুখ লুকায় দু'জন মিলে কে জানে?
আজ কেন যেন বসতে ইচ্ছে করলো না পিসিতে। গেইমিং এর উপর ভীষণ অনীহা কাজ করছে হুট করেই। আজ থেকে ডেয়ার-ডেভিল টিমের সঙ্গে ইয়াশের আর কোনো সংযোগ নেই। নিকোর সঙ্গে মিলে কাঁধে কাঁধ রেখে খেলা হবেনা আর। সে আর ওই টি-মের ক্যাপ্টেন নয়। এসব ভাবলেই বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত চি-নচিনে ব্যথা হয়। দম বন্ধ হয়ে আসে ইয়াশের।
ইয়াশ বাস্তববাদী মানুষ, সে ভালো করেই জানে সময় সবকিছু বদলে দেয়, তবুও নিজের ভাগ্যের উপর ভীষণ অভিমান তার। অভিমান শেষ রাতে চাঁদের পাশে প্রহরীর মতো দ্রীপ্তমানওই উজ্জ্বল নক্ষত্র দু'টোর উপর।
কেন যে তার বাবা মা পৃথিবীতে না থেকে ওমন শুকতারা হয়ে গেলো কে জানে? ইয়াশের জন্য থেকে গেলেও তো পারতো।
এমনিতে খুব একটা ড্যাড মমের কথা মনে পড়েনা ইয়াশের। পাপা মাম্মা ওকে এতোটাই ভালোবাসায় মুড়িয়ে রাখে যে মিস করার সুযোগটাই হয়না। তবে মন খারাপ হলে পৃথিবীর সবার ভা-লোবাসা ছাপিয়ে কেবল ওই মানুষ দু'টোর কথাই মনে পড়ে তার।
এই বাড়ির প্রতি খুব একটা আত্মিক টান নেই ইয়াশের। ফিরতেও ইচ্ছে করেনা মাঝেমধ্যে। কিন্তু পাপার জন্য ভবঘুরে হৃদয়হীন হতে-হতেও আবার অনুভূতিপ্রবন সত্তায় ফিরে যেতে হয় ইয়া-শকে। ওই মানুষটার কথা কিছুতেই ফেলতে পারেনা সে।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই সদর দরজা ঠেলে ঘরের ভেতরে পা রাখলো ইয়াশ। সঙ্গে সঙ্গে একরাশ আলোর জোয়ার ছুটে এসে হামলে পড়লো তার চোখের উপর। আলোর ঝলকানিতে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেললো সে, তারপর ধীরে ধীরে চোখ দু'টো শিথিল হতেই দৃষ্টি খুলে সম্মুখীন হলো অপরিচিত কিছু মুখের। চারিদিকে একটা উৎসব মুখর আমেজ। সহসা ঘাড় ফিরিয়ে এদিকওদিক দেখলো ইয়াশ। বসার ঘরটা আজ সাদা নেটের পর্দা দিয়ে ডেকো-রেট করা হয়েছে। মাথা উপর দিগুণ বড় চ্যান্ডেলিয়র। জ্বলছে মোমবাতিও। একটা মেদুর আতরের খুশবু বাতাসের সঙ্গে ভেসে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। হলরুমে উপস্থিত সবাই সাদা পোশাক পড়ে আছে বলে, একটা শুভ্র স্নিগ্ধ আবহ বিরাজ করছে চারপাশে।
ইয়াশ একাই শুধু কালোরঙের হুডি পড়ে আছে। সহসা ঘরে উপ-স্থিত সকলের দৃষ্টি চলে গেলো তার দিকে। ওকে দেখা মাত্রই হা-সিমুখে এগিয়ে এলো ফ্লোরা। ছেলের বাহু আঁকড়ে ধরে স্নেহের স্বরে বললো,
- উপরের ঘরে কস্টিউম রাখা আছে। চটজলদি রেডি হয়ে নিচে এসো। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
ইয়াশ জবাব দিলোনা, নড়লো ও এক পা।
চলছে.......