পর্ব - ৯
বাবা মায়ের নীরব সমঝোতায় আশাহত হয়ে অবশেষে প্রিসিলাও সাইন করতে বাধ হলো বিয়ের পেপারে। নিজের সমস্ত জীবনটা লিখে দিলো একটা অনিশ্চিত ভবিতব্যের নাম। যেখানে না আছে ভালোবাসা, আর নাতো বিশ্বাস।
ব্রাইড আর গ্রুমের সাইন শেষ হলে স্বাক্ষীর তলব করলো অফি-সার ডেরেক। স্বাক্ষীর কথা শুনে ফ্লোরা বিচলিত হলেও তুষার প্র-সন্ন গলায় বললো,
এক্ষুণি চলে আসবে, একটু ওয়েট করুন।
যন্ত্রমানবের এহেন কথা ইয়াশ নিজেও ভেতর ভেতর কিছুটা কৌ-তুহলী হয়ে পড়লো। ফ্লোরা তো বলেই উঠলো,
-কার কথা বলছো তুমি?
তুষারের আর জবাব দেওয়ার প্রয়োজন পড়লো না। তার আগেই দৃশ্যপটে এসে উপস্থিত হলো নিকো আর নোভা। ওদের দেখা মা-এই নয়ন বিস্ফারিত হয়ে উঠলো ইয়াশ প্রিসিলার। দু'জনই এক-যোগে বলে উঠলো,
তোরা এখানে?
ওদের প্রশ্নের বিপরীতে নিকো কোনো জবাব না দিলেও। নোভা এগিয়ে এসে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো,
পালোয়ানের মতো দেখতে একটা লোক। আচমকা ডর্ম থেকে ধরে নিয়ে এলো।
-রোহান!
প্রিসিলা বিচলিত হয়ে নামটা উচ্চারণ করতেই ওপাশ থেকে জবাব দিলো তুষার,
-হ্যা। আমিই পাঠিয়েছি তাকে।
পাপা আর ইউ্য ইনসেইন? এসবের মধ্যে আবার আমাদের বন্ধুদের কেন ইনভলভ করতে গেলে তুমি?
হঠাৎ করেই ক্ষুব্ধস্বরে প্রশ্ন ছুড়লো ইয়াশ। বিপরীতে তুষার কিছু বলার আগেই নিকো জানতে চাইলো,
---কি হয়েছে বলতো? আবার কি অঘটন ঘটিয়েছিস তুই?
একইভাবে নোভাও প্রশ্ন ছুড়লো প্রিসিলাকে,
ইজ এনিথিং রং প্রিসি? এভাবে কাঁদছো কেন তুমি? চোখ দু'টোকে তো নীল সমুদ্র বানিয়ে ফেলেছো।
আপাতত ইয়াশ আর প্রিসিলার বিয়ের স্বাক্ষী হিসেবে পেপারস গুলোতে সাইন করো। বাকি ইতিহাস পরেও জানতে পারবে।
নোভার প্রশ্নের বিপরীতে তীর্যক বাক্য ছুড়ে দিলো তুষার। যা শোনা মাত্রই একযোগে চ্যাঁচিয়ে উঠলো ওরা দু'জন,
কিইইইইহ!
বিয়ের সকল কার্জক্রম শেষ হলে আংটি বদলের অনুমতি দিলেন অফিসার ডেরেক। যেহেতু বিয়েটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত, তাই আং-টির কোনো ব্যবস্থা ছিলনা। ফলস্বরূপ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অমূল্য রত্নখনি ব্লাড ডায়মন্ডকেই নিয়ে আসা হলো ইয়াশের তরফ থেকে প্রিসিলাকে বৈবাহিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য।
মখমলের প্রসিদ্ধ মোড়ক খুলে দিতেই একটা অদ্ভুত দ্যুতি ছড়িয়ে পড়লো চারিপাশে। আংটি খানা দেখা মাত্রই সবার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠলো। প্রিসিলা নিজেও কান্নাকাটি ভুলে অবাক হয়ে পরখ করলো রক্তের মতো রঞ্জিত এই ধাতুটিকে। চকচকে হীরকের আবরণে ভেতর তাজা রক্তের তরল। ব্লাড ডায়মন্ড যতই ঝলমল করুকটা কেন, তার ভেতরে রহস্যের আধার। সহসা আংটিটাকে দেখা মাত্রই চোখমুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো প্রিসিলার। পাশ থেকে নোভা বলে উঠলো,
- এটা এমন কেন? আমার তো দেখেই বুক ধড়ফড় করছে।
নোভার তোলা প্রসঙ্গটা চটজলদি পাল্টে ফেললো ফ্লোরা, ইয়া-শকে ডেকে বললো,
তোমার স্ত্রীকে আংটিটা পড়িয়ে দাও ইয়াশ।
স্ত্রী শব্দটা কানে পৌঁছাতেই বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত কাঁপন অনুভব করলো ইয়াশ। ছন্নছাড়া মনটা বিদ্রুপ করে বললো,
এটা কি আদৌও সম্ভব? যেই মেয়েটাকে সারাজীবন দুচোখে সহ্য করতে পারতিস না, যার ভুলের জন্য নিজের ক্যারিয়ার, স্বপ্ন সব শেষ হয়ে গেলো, সেই পিচ্চি মেয়েটা নাকি আজ তোর স্ত্রী!
মনের কথাকে খুব শক্তভাবে প্রশ্রয় দিলো ইয়াশ। মুখে কিছু না বললেও ব্লেডের মতো ধারালো দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো প্রিসিলার উপর। আংটিটাকে তুলে বিরক্তিভাব নিয়ে বললো,
-হাত দেখি?
আড়ালে শুষ্ক ঢোক গিলে নিজের বাম হাতটা বাড়িয়ে দিলো প্রি-সিলা। কোমল তুলতুলে কব্জিটা হাতের উপর লুটিয়ে পড়তেই হুট করে থেমে গেলো আত্মিক বাকবিতন্ডা। দৃষ্টি শিথিল হয়ে এলো ইয়াশের। জীবনে প্রথমবার কোনোরূপ বিরক্তি ছাড়াই সে হাতটা ধরলো প্রিসিলার। তারপর খুব দায়সারা ভাবেই অনামিকা আঙু-লের মাঝে ঢুকিয়ে দিলো আংটিটা।
আংটি পড়ানোর সময় চোখে চোখ পড়ে গেলো দু'জনার। অনা-কাঙ্ক্ষিত তবুও অদ্ভুত এক অনুভূতির তুফানে বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করে উঠলো প্রিসিলার। ভাগ্যের কি নিয়তি? কয়েকমূহু-র্ত আগেও যাকে জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রুর আসনে বসিয়ে রে-খেছিল, এখন তার সঙ্গেই গোটা জীবন জুড়ে গেলো। এক জী-বনে ইয়াশকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারুক আর না-ই পারুক, তবে এই সিদ্ধান্তের জন্য জন্য পাপাকে কখনোই ক্ষমা করতে পা-রবেনা প্রিসিলা।
মনের ভাবনা থেকে বেড়িয়ে আসা মাত্রই আবারও সেই তীর্যক দৃ-ষ্টির সম্মুখীন হলো মেয়েটা। ইয়াশের নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে অপ্রস্তুত হয়ে চোখ সরিয়ে নিলো তৎক্ষনাৎ। ফ্লোরাকে চোখের ইশারা করে পরিশ্রান্ত গলায় জানালো,
- আমার খুব ক্লান্ত লাগছে মাম্মা। শীত করছে ভীষণ।
প্রিসিলার বরাবরই ঠান্ডার ধাঁচ আছে, তাইতো মেয়ের কথায় বিচ-লিত জলদি পায়ে এগিয়ে এলো ফ্লোরা। তাপমাত্রা অনুমান করার জন্য কপালে হাত উদ্বিগ্ন স্বরে বললো,
- সেকি তোর তো জ্বর এসেছে। গা পুড়ে যাচ্ছে একদম।
মায়ের কথার বিপরীতে আর কথা বাড়ালো না প্রিসিলা। সবার অগোচরে চুপচাপ উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
একটু শুতে ইচ্ছে করছে মাম্মা। আমি বরং উপরে যাই।
মেয়ের অধৈর্য ভাবটা খুব ভালোভাবেই টের পেলো ফ্লোরা। সে জানে প্রিসিলার মনের অবস্থা ঠিক নেই, পাপার প্রতি অভিমান জমেছে খুব। তাইতো চোখের ইশারায় মেয়েকে উপরে যাওয়ার অনুমতি দিলো সে।
ওদিকে তার পাপাকে দেখো, কত সহজেই না এতো বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে আছে। কথায় বলে যুগ পাল্টায় কিন্তু মানুষের স্বভাব নয়। তুষারের ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই উপলদ্ধি করলো ফ্লোরা। মনেমনে দাঁত খিঁচিয়ে বিড়বিড়ালো,
- দয়া-মায়াহীন নিষ্ঠুর লোক একটা।
শুনশান নিস্তব্ধ চারিপাশ। কোথাও কোনো মানুষের উপস্থিতি নেই। অদূরের ঝোপঝাড় থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝি পোকার নি-রবধি সয়লাব। অক্টোবরের মেঘমুক্ত আকাশ জুড়ে সদ্য ফোঁটা শিউলির মতো ছড়িয়ে আছে অজস্র তারকারাজি। তার ঠিক নি-চেই কলেজের রাস্তা ধরে ধীর গতিতে হেঁটে চলেছে একজোড়া ক্লান্ত পা। শেষরাতের নরম হিমেল হাওয়া আলতো পরশে ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে তাদের। হাটতে হাটতেই একজন হঠাৎ করে বলে উঠলো,
না। সারারাত একসঙ্গে ছিলাম অথচ আপনার নামটাই জানা হলো
আমি নোভা। নোভা মার্টিন। আর আপনি?
নিকো। নিকো উইলসন।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে স্নোফ্লেক্স ম্যানর থেকে বেরোতে বে-রোতে সময় গড়িয়েছিল রাত তিনটা। ফ্লোরা অবশ্য আসতে দিতে চায়নি। তবে এ্যাটেনডেন্সের দোহাই দিয়ে নোভা নিজেই চলে এসে তাড়াহুড়ো করে। এ্যাকাডেমিক গেইট পর্যন্ত রোহানই এগি-য়ে দিয়েছে গাড়ি করে। তবে বিপত্তি বেঁধেছে ডর্মিটরির সামনে এসে। রাত বেশি হওয়ায় গেইট বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। যা দেখে নোভার একেবারে মাথায় হাত। মাসের শেষে বাজেটের নি-রন্তর টানাটানি, তারউপর এই শোচনীয় অবস্থা। এই মূহুর্তে ওর পক্ষে হোটেল বুক একদমই অসম্ভব। আত্মমর্যাদার ভারে কারোর কাছে হাত পাতারও সুযোগ নেই।
তবে ভাগ্য সহায়, নিকো তখনও সঙ্গেই ছিল ওর, নয়তো নির্ঘাত রাস্তায় কাটাতে হতো রাতটুকু।
নিকোর বাড়িটা ক্যাম্পাস থেকে খুব কাছেই। মিনিট পনেরো হাঁট-লেই ওদের নেইবারহুড। তাই বাড়িতে থাকার প্রস্তাবটা সেই দিয়ে-ছিল নোভাকে। প্রথমে এক কথায় না করে দিলেও, যখন শুনলো নিকোর সঙ্গে ওর পরিবার থাকে, তখনই গড়িমসি করতে করতে এক পর্যায়ে রাজি হয়ে গেলো নোভা। আর এই মূহুর্তে নিকোর বা-ড়ির উদ্দেশ্যেই হেঁটে যাচ্ছে ওরা দু'জন।
-আই সি।
নিকোর জবাবের বিপরীতে প্রসন্ন হাসলো নোভা। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করলো নিকো,
- আপনার আর কিছু জানার নেই?
ঠোঁট উল্টে এদিকওদিক মাথা নাড়ালো নোভা। ভাবুক স্বরে বললো,
না তো।
একটা অপরিচিত ছেলের সঙ্গে তার বাড়িতে যাচ্ছেন। অথচ তার সম্মন্ধে আপনার কিছুই জানার নেই? আশ্চর্য!
নিকোর কথা শুনে অকস্মাৎ থমকে গেলো নোভার পদক্ষেপ। শ্যামবর্ণের সুশ্রী মুখটা হুট করেই পাংশুটে হয়ে গেলো তার। তৎ-ক্ষণাৎ পাশ ফিরে নিকোর মুখোমুখি দাঁড়ালো সে। শুষ্ক একটা ঢোক গিলে সন্দিগ্ধ গলায় বললো,
আপনার ইনটেনশ কি বলুন তো?
সঙ্গে সঙ্গে ভূবণ কাঁপিয়ে হেসে উঠলো নিকো। লোকটার হাসি দেখে বোকা বনে গেলো নোভা। চোখমুখ শক্ত করে বললো,
- আস্তে হাসুন। আপনিতো পুরো শহর জাগিয়ে ফেলবেন।
কথাকটা বলেই হনহনিয়ে হাঁটা ধরলো সে। নিকো ওর পথ অনু-সরন করে বললো,
- আপনি সত্যিই ভয় পেয়েছিলেন?
চেহারায় কৃত্রিম গাম্ভীর্য টেনে আনলো নোভা। আত্নবিশ্বাসী গলায় বললো,
মোটেই না।
– তাহলে ওভাবে রিয়্যাক্ট করলেন কেন?
ভয় পাওয়ার প্রসঙ্গটা সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে গেলো নোভা। নি-কোকে পর্যুদস্ত করার জন্য উল্টো প্রশ্ন করলো,
আমিও তো অচেনা একটা মেয়ে। আমাকে এভাবে বাড়িতে নি-য়ে যাচ্ছেন, আমার সম্মন্ধে জানতে চাননা?
চাই তো, অনেক কিছু জানতে চাই। তবে এখন নয়, ধীরে ধীরে।
ধীরে ধীরে কেন?
কারণ আমি আপনার প্রতি আগ্রহ হারাতে চাইনা। কোনো না কোনকিছু জানার অযুহাতে বারবার শুধু আপনার কাছেই ছুটে যেতে চাই।
কিঞ্চিৎ অপ্রতিভ স্বরে কথাটা বলেই চুপচাপ হাটা ধরলো নিকো। নোভাও আর প্রশ্ন করলো না কোনো। বাকিটা পথজুড়ে তাদের মধ্যে জায়গা করে নিলো অমীমাংসিত এক থমথমে নৈঃশব্দ্য।
সেদিনের সেই ঘটনার পরে সকাল হলো, সকাল গড়িয়ে রাত। অথচ সারাদিনেও বাড়ি ফিরলো না ইয়াশ। তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীর জ্বর কমেছে নাকি বেড়েছে সেই খোঁজ টুকুও নেওয়ার প্র-য়োজনবোধ করলো না সে। গোটা একটা দিন অতিবাহিত করে ইয়াশ যখন বাড়ি ফিরলো তখন মাঝরাত। বাড়িটা নিস্তব্ধ হয়ে আছে। গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে প্রতিটি সদস্য।
ঠিক এমন সময় নিঃশব্দে কদম ফেলে নিজের ঘরে প্রবেশ করলো ইয়াশ। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকা মাত্রই সবসময়ের মতো আন্তরিক গলায় অভিবাদন জানালো এক স্প্যানিশ রমণী,
হোলা ইয়ং মাস্টার।
আজকে তার ভুল শুধরে দিলো না ইয়াশ। চুপচাপ ভেতরে ঢুকে একটা ব্যাগ দিয়ে শুরু করলো গোছগাছ। জামাকাপড় প্রয়োজন জিনিসপত্রের পাশাপাশি নিজের পাসপোর্টও নিলো। সবকিছু গোছানো হয়ে গেলে এগিয়ে গেলো জানালা লাগানোর উদ্দেশ্য। ঠিক তখনই খেয়াল করলো, আপাদমস্তক কম্ফোর্টারে ঢেকে ওর বিছানায় শুয়ে আছে কেউ। কাত হয়ে শোয়ার দরুন মুখটা দেখা যাচ্ছে না ঠিকই, তবে মাথা নেমে পুরো বিছানায় ছড়িয়ে থাকা দিঘল সোনালি চুলগুলো দেখে চিনতে অসুবিধা হলোনা ইয়া-শের। সহসা স্পষ্ট গলায় ডেকে উঠলো,
প্রিসি!
চলছে......