পর্ব - ১১
ইয়াশের দায়সারা প্রত্যুত্তর। ওর কথা শুনে বিপন্ন দেখালো প্রিসি-লাকে। অচেনা, অজানা দেশ, চারিপাশে আপন বলে কেউ নেই। ব্যাপারটা ভাবতেই কেমন ফাঁকা হয়ে গেলো মস্তিষ্ক। ভেতর থেকে উগড়ে কান্না চলে এলো। নিজেকে জুতসই সামলে নিয়ে আবারও ইয়াশকে গিয়ে বললো,
মশকরা করছি না ইয়াশ, আমি সত্যিই আর হাঁটতে পারছি না।
তো আমি কি করবো?
একটা হোটেল বুক করো। আই ওয়ান্ট সাম রেস্ট।
এতোক্ষণে হাঁটার গতি থমকে গেলো ইয়াশের। তপ্তশ্বাস ছেড়ে প্রিসিলার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিপাত করলো সে। ল্যামপোস্টের হলদে আলোয় ওর মুখটাকে মোমের মতো কোমল দেখাচ্ছে। প্রকৃতির বৈরী হাওয়ায় লম্বা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে। চোখের কোলে ক্লান্তি জমেছে। বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখতে না রাখ-তেই ইতালিয়ান মেম সাহেবের যে বেহাল দশা, তা বেশ ভালোই বোঝা যাচ্ছে। প্রিসিলার মরিমরি অবস্থাতেও ইয়াশের মাঝে ভা-বাবেগ হলোনা খুব একটা। সে দূর্দম গতিতে হাটা ধরলো আবারও। যেতে যেতে প্রিসিলাকে উদ্দেশ্য করো বললো,
তুই চাইলে থাকতেই পারিস। আমি কোনো হোটেল ফোটেলে থাকবো না।
তাহলে কোথায় থাকবে?
মাহিন আঙ্কেলের বাড়িতে।
মাহিন আঙ্কেলটা আবার কে? তুমি কি এদেশে এসেছো আগেও?
বিপরীতে ইয়াশ কিছু বলার আগেই কোনো এক অভূতপূর্ব দৃ-শ্যের মুখোমুখি হয়ে অকস্মাৎ থমকে গেলো তার পা। ইয়াশের সঙ্গে সঙ্গে প্রিসিলাও দাঁড়িয়ে পড়লো এবার। দু'জনই একযোগে সামনে তাকিয়ে আশ্চর্য চোখে দেখলো, মেঘেঢাকা মুখ ভার করা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে, এলোমেলো ঝোড়ো হাওয়ার মাঝেই সি আর বি চত্ত্বরে বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে গিটারের গায়ে টুংটাং আওয়াজ তুলে গলা ছেড়ে গান ধরেছে একটা মেয়ে,
শয়নে স্বপনে দেখি
আসিলো এক বুজুরগান
রাস্তার মাঝে কত লোকে
করিতেছে সন্ধান, করিতেছে সন্ধান।
রাস্তা থামায়ে দিলো,
রাস্তা থামায়ে দিলো, রাস্তা থামায়ে দিলো,
রাস্তা থামায়ে দিলো কাফিলা,
এলো দিল্লিতে নিজামুদ্দিন আউলিয়া
এলো দিল্লিতে নিজামুদ্দিন আউলিয়া।
গলা ছেড়ে মনের আনন্দে গাইতে থাকা মেয়েটার পড়নে ব্লু জিন্স আর সাদা কুর্তি। পিঠ ছাড়িয়ে নেমে আসা কালো চুলগুলো হাও-য়ায় উড়ছে, উড়ছে তার গলায় ঝোলানো ওড়নাটাও। গান শুরু করার কয়েকমূহুর্ত বাদেই আশেপাশের পথচারীরা এসে জড়ো হলো তার চারপাশে। মূহুর্তেই নিরিবিলি পরিবেশটা উৎসব মুখর হয়ে উঠলো। গানের তালে একযোগে পা দোলাতে শুরু করলো সবাই। কেউ কেউ পাশ দিয়ে ভিডিও করছে। কয়েকজন শিল্পী-গোছের লোক চায়ের কাপ বেঞ্চিতে রেখে গলা মেলালো মেয়ে-টার সঙ্গে। এবার যেন সবকিছুর উর্ধ্বে গেলো মূহুর্তটা।
সুর আর তালের মাঝে এমন ভাবেই ডুবলো তারা, যে চায়ের খবর আর নেওয়া হলোনা। ঠান্ডা হয়ে পরে রইলো সেখানেই।
গানের সুর আর গিটারের টুংটাং আওয়াজ শুনে একটা অকারণ মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়লো ইয়াশের চোখের তারায়। ই-স্পোর্টস বাদে যদি তার কোনোকিছুতে আগ্রহ থেকে থাকে তবে সেটা শুধুই গি-টার। যদিও
সচারাচর গিটার বাজায়না সে। মানুষের সামনে তো একদমই না। ফ্রিতে কাউকে বিনোদন দেওয়া তার ধাঁচে নেই, তবে একান্ত ব্য-ক্তি সময় কিংবা কোনো মনখারাপের দিনে গিটারই তার একমাত্র সঙ্গী।
ইয়াশের চোখমুখে যে উপচে পরা মুগ্ধতা তা দৃষ্টি এড়ালো না প্রি-সিলার। এতোটা মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থেকে কাউকে নির্নিমেষ দেখে যেতে আগে কখনো দেখেনি ইয়াশকে। মূলত ওর গম্ভীর আর কপাল গোছানো চেহারাতেই অভ্যস্ত মেয়েটা, তাই আজ অপরিচিত লাগছে ভীষণ। একটু অবাক হয়েছে অবশ্য।
জোড়া ভ্রুর মাঝখানে সদর্পে দাঁড়িয়ে থাকা তীক্ষ্ণ নাসারন্ধ্রখানা একটু বেশিই নজরকাড়া তবে সবচেয়ে সুন্দর ঠোঁটের নিচের ওই ছোট্ট কালো তিল, তারচেয়েও যদি কিছু সুন্দর হয়ে থাকে তাহলে সেটা ইয়াশের কন্ঠস্বর। মাদকীয় একটা ব্যাপার আছে, শুনলেই কেমন নেশা ধরে যায়। কিন্তু আগেতো বিরক্ত লাগতো!
মুগ্ধ নয়নে ইয়াশকে অবলোকন করতে গিয়েই অকস্মাৎ প্রশ্নটা জেঁকে বসলো প্রিসিলার মনে। সহসা মুখ ভেঙিয়ে দৃষ্টি ঘোরালো সে। তক্ষুনি ভীরের মধ্যে থেকে কেউ একজন এসে প্রিসিলার ব্যাগ নিয়ে দিলো ভোঁ দৌড়।
-আরেহ, আমার ব্যাগ! ইয়াশ আমার ব্যাগ।
সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার দিয়ে দৌড়াতে উদ্যত হয় প্রিসিলা। কিন্তু ওর হাত ধরে আটকালো ইয়াশ। শান্ত গলায় বললো,
যাস না।
যাবো না মানে? আমার ব্যাগ নিয়ে গেলো তো।
প্রিসিলার কণ্ঠে উদ্বেগ। ইয়াশ ততোধিক শান্ত গলায় বললো,
বৃষ্টি নামবে এক্ষুনি। চল ফিরে যাই।
ফিরে যাবো মানে? আমার ফেবরেট ব্যাগ ছিল ওটা। তুমি কি কিছুই করবে না?
-নাহ, মারামারি করতে ইচ্ছে করছে না এখন।
ইয়াশের দায়সারা কথা শুনে আশাহত হয়ে পড়লো প্রিসিলা। মনেমনে ছেলেটার উপর ভীষণ রাগ হলো, কষ্টও পেলো খুব। ইয়া-শের তাতে যায় আসেনা। সে নির্লিপ্ত গলায় বললো,
- আঙ্কেলকে কল করে জানিয়ে দিয়েছি। একটু পরেই গাড়ি চলে আসবে, ওয়েট কর।
বিপরীতে বারুদের মতো জ্বলে উঠলো প্রিসিলা। ইয়াশের দিকে বিরক্ত চোখে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললো,
- ইউ আর আ কাউয়ার্ড।
ইয়াশ যেন শুনেও শুনেনি কথাটা। সেভাবেই এড়িয়ে গেলো প্রি-সিকে। একটুবাদেই গাড়ি চলে আসলো। ড্রাইভার লোকটা ইয়া-শের হাতে চাবি দিয়ে আস্তে করে নেমে গেলো। ইয়াশ ড্রাইভিং সিটে বসে সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে প্রিসিলার উদ্দেশ্যে বললো,
তুই এখানে বসে বসে ব্যাগের জন্য শোক পালন কর, আমি যাচ্ছি।
- ঠিক আছে যাও।
ঘুরে দাঁড়িয়ে সত্যি সত্যিই এবার কেঁদে ফেললো মেয়েটা। বুকের ভেতর পাথরের মতো একটা চাপা ব্যথা।
মনেমনে ভাবলো,
কিসের এতো অহংকার এই ছেলের? কথায় কথায় অপমান করে। কাগজে কলমে হলেও তো আমি ওর বিয়ে করা বউ আমার জন্য কি এইটুকুনি কষ্ট করা যেতনা? সুযোগ পেলে কঠিন শিক্ষা দিবো আমি তোকে, দেখে নিস বজ্জাত।
মনের মাঝে অভিমানের পসরা। চোখের কোলে তপ্ত নোনাজল। অথচ বোঝার মতো কেউ নেই।
পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্টদায়ক মূহুর্ত এটা। আর সহ্য করা যাচ্ছে না। রাগে দুঃখে মুষড়ে গেলো প্রিসিলা।
একটু বাদে আবারও ভেসে এলো ইয়াশের পুরুষালি কন্ঠস্বর,
- কান্না শেষ হলে বলিস। আমি ওয়েট করছি।
এবারে ঘুরে তাকালো প্রিসিলা। নাক টেনে ঝেঁঝে উঠে বললো,
তুমি না চলে যাচ্ছিলে?
রেখে গেলে যদি হারিয়ে যাস? পরে তো আমাকেই খুঁজে মরতে হবে। তোকে খোজার মতো অহেতুক টাইম আমার নেই।
গোটা আমিটাই তো তোমার কাছে অহেতুক।
ঠিকই বলেছিস।
গাড়িতে ওঠার আগ পর্যন্ত খারুস ডাঁটিয়াল লোকটা যে কিছুতেই স্বস্তি দেবেনা তা আর বুঝতে বাকি রইলো না প্রিসিলার। তাই কা-ন্নাকাটি বাদ দিয়ে জলদি গাড়িতে উঠে বসলো সে।
চোখের পানি মোছ।
ইয়াশের অকস্মাৎ বাক্যে হতচকিত হলো প্রিসিলা। পাশ ফিরে শুধালো,
কেন?
ড্রাইভিং এ ফোকাস করতে পারছি না। তোকে দেখে ভয় করছে।
ইয়াশের কথা শুনে তাজ্জব বনে গেলো প্রিসিলা। আশ্চর্য গলায় বললো,
-ভয় পাওয়ার কি আছে? আমি কি ভূত?
-না তুই পেত্নী।
-আচ্ছা, তুমি আমাকে এতো অপছন্দ কেন করো?
প্রিসিলার প্রশ্নটা অপ্রত্যাশিত ছিল। তবুও মুখ খুললো ইয়াশ। নি-রুত্তাপ স্বরে জবাব দিলো,
নো রিজন। তোকে আমার অকারণেই সহ্য হয়না।
ইয়াশ কথাগুলো অকপটে বলে দিলেও, তার বলা প্রতিটি বাক্য যেন তীরের ফলার মতোই বুকে গিয়ে বিঁধলো প্রিসিলার। মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড়ালো,
- নিষ্ঠুর, পাষাণ লোক একটা। -
বলতে বলতেই লুকিং মিররে তাকিয়ে ধীরে ধীরে চোখ মুছতে লা-গলো মেয়েটা। ইয়াশের অবচেতন দৃষ্টিও সেই একই গ্লাসে গিয়ে থমকালো। সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়টা ছলকে উঠলো প্রিসিলার। অপ্রস্তুত হয়ে দৃষ্টি নামাতেই যাবে তখনই ইয়াশ বলে উঠলো,
আফসোস এই পাষাণ লোকটা তোর বর, আর তুই তার ভো-লাভালা ইনোসেন্ট বউ।
ড্রাইভ করতে করতে আনমনেই বাক্যটুকু মুখ ফস্কে বেড়িয়ে এলো ইয়াশের। তারপর যখন সংবিৎ ফিরে পেলো। তখন হুট করেই কথাটা মস্তিষ্কে গিয়ে আটকালো। মনের মাঝে ভাবার্থ উদয় হলো, সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো ইয়াশ। ভেতর ভেতর অস্বস্তিতে গুম হয়ে রইলো কিছুক্ষণ। বাকিটা রাস্তা আর কথা হলোন দু'জনার। কেউ কিছু না বললেও বুকের মাঝে বড়সড় একটা চিড় ধরলো তখনই। নিজেদের অজান্তেই নতুন সম্পর্ক-টাকে একটু একটু করে স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে অন্তর। এ যেন হিংসা আর দ্বন্দ্বের আড়ালে পরাজয়ের প্রথম ধাপ।
-সামনে রেস্টুরেন্ট আছে তুই গিয়ে বস, আমি একটু আসছি।
গাড়ি চালিয়ে কয়েকক্রোশ যেতে না যেতেই অকস্মাৎ একটা নি-র্জন রাস্তায় ব্রেক কষে প্রিসিলাকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বললো ইয়াশ। একেতো গুমোট আবহাওয়া, চারিদিকে হাওয়ার তুফান, তারউপর অচেনা দেশ। এমন পরিস্থিতিতে ইয়াশের কথাটা শুনে একটু বেশিই অবাক হলো প্রিসিলা। মনে মনে ভড়কালো,
কোনোভাবে কি তাকে ফেলে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে ইয়াশ?
পরক্ষণেই ফুঁসে উঠলো আত্মবিশ্বাসী মন,
ফেলে গেলে যাক, সে কি ছোট নাকি? তুষার জাওয়াদের মে-য়ের কি এতোটা পরনির্ভরশীলতা মানায়? মোটেই না।
মনের ভাবনা মনেই থেকে গেলো। মুখ ফুটে বললো,
রেস্টুরেন্টে কেন যাবো?
রেস্টুরেন্টে মানুষ কেন যায়? খেতে অবশ্যই!
কিন্তু আমাকে একা কেন যেতে বলছো?
প্রিসিলার কণ্ঠটা মলিন শোনালো। ইয়াশ মাথায় একটা ক্যাপ ছড়িয়ে সিটবেল্ট খুলতে খুলতে বললো,
-আমি একটু আসছি।
যদি আর না ফেরো?
মেয়েটার চোখমুখে চাপা উদ্বেগ, যা দেখে হাতদুটো থেমে গেলো ইয়াশের। ঘাড় ঘুরিয়ে পূর্ণ দৃষ্টিতে প্রিসিলাকে পরখ করলো সে, তার তীক্ষ্ণ চাহনিতে আড়ষ্ট হয়ে গুটিসুটি মেরে বসলো মেয়েটা, ভেবেছে মারবে হয়তো। কিন্তু তা না করে নিশ্চুপে কিছুক্ষণ সেভা-বেই চেয়ে রইলো ইয়াশ।
- কি দেখছো?
প্রিসিলার অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নে যেন সংবিৎ ফিরে পেলো ইয়াশ, তবে চোখ সরালো না। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অবিচল রেখে জিভ দিয়ে গাল ঠেলে বললো,
- বিশ্বাস নেই আমার উপর?
- থাকার মতো কিছু করেছো কি?
জরাজীর্ণ গলায় জবাব দিলো প্রিসিলা। বিপরীতে একটা তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়লো ইয়াশ। আঙুলের সাহায্যে কিছুক্ষণ স্টিয়ারিং-য়ের উপর তবলা বাজিয়ে আনমনেই বলে উঠলো,
তা ঠিকই বলেছিস। কপটতা আমার রক্তে মিশে আছে। মুড সুইং হলে তোকে গুম টুম ও করে ফেলতে পারি।
চলছে.....