পর্ব -১৯
নিভানের আম্মু এবার আরও কাছে এগিয়ে এলেন। ছেলেটা লম্বায় তার দিগুণ। মুখ দেখতে হলে মাথা তুলে তাকাতে হয়। কি-ছুক্ষণ সেভাবেই মাথা তুলে তাকিয়ে রইলেন ভদ্রমহিলা। তারপর কোনো কথা না বলে, হুট করেই দু'হাত মেলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন অচেনা ছেলেটিকে। একটু বাদেই ইয়াশের ইস্পাত কঠিন বুকের মধ্যে থেকে ভেসে এলো রমণীর ফুঁপিয়ে কাঁদার ক্ষীণ আওয়াজ। তার এই অভূতপূর্ব কাণ্ডে নিভান প্রিসিলা দু'জনই আশ্চর্যের শিয়র ছুঁলো। সেসবে ভ্রুক্ষেপ করলো না ইয়াশ, রম-নীর কম্পমান পিঠে আলতো হাত বুলিয়ে শ্লেষ হেসে বললো,
চিনতে পারলে তাহলে?
এতোক্ষণে ইয়াশের বুক থেকে মুখ তুললো রমণী। কান্নাকাটিও থেমেছে একটু। চশমার আড়ালে চোখ মুছে ছেলেটার চিবুকে আদর মাখা হাত বুলিয়ে বললো,
-কত বড় হয়ে গেছো তুমি। ড্যাডের চেয়েও লম্বা হয়েছো।
আবারও এক চিলতে তরল হাসির ফোয়ারা দেখা দিলো ইয়াশের অধর কোলে। খুব গর্ব নিয়ে বললো,
সবাই বলে। ড্যাড ওয়াজ অনলি সিক্স থ্রী আর আমি সিক্স ফাইভ।
দেখতে কিন্তু হুবহু ড্যাডের মতোই হয়েছো। সেই একই রকম ঘন পাপড়িতে ঢাকা চোখ, মাথা ভর্তি ঝাকড়া চুল, বাদামি ঠোঁট, ঠোঁটের নিচের তিলটাও নিয়ে বসে আছো দেখছি।
সপ্রশংস গলায় কথাগুলো বলতে বলতেই একটু গম্ভীর হয়ে গেলো নিঝুম। মুখের আদলে মেকি অভিমান নিয়ে বললো,
-আমার বেস্টফ্রেন্ডের কোনোকিছুই ধরে রাখোনি দেখছি।
ইয়াশের হাসিহাসি মুখটা অচিরেই শক্ত হয়ে উঠলো। চিরাচরিত গাম্ভীর্য নিয়ে জবাব দিলো,
মানুষ বলে আমার হাসিটা মমের মতো। কিন্তু আমিতো হাসিইনা।
মানুষ ঠিকই বলে বাবা। তোমার হাসিটা সবচেয়ে স্পেশাল।
আদুরে ভঙ্গিতে সায় জানিয়ে ইয়াশের চিবুক ছুঁয়ে আঙুলের ডগায় চুমু খেলো নিঝুম। ততক্ষণে ওপাশ থেকে জলদি পায়ে এগিয়ে এলো নিভান। মায়ের চোখে চোখ রেখে সন্দিগ্ধ গলায় প্র-শ্ন করলো,
আম্মু, তুমি ইয়াশকে কিভাবে চিনলে? ওরা তো মাত্র কিছুদিন হলো বিডিতে এসেছে।
ছেলের কৌতুহল দেখে মৃদু হাসলো নিঝুম। বললো,
-ইয়াশ আমার চিরচেনা অস্তিত্ব বাবা।
মায়ের কথার ভার অনেক, তা বুঝতে অসুবিধা হলোনা নিভানের।
তবুও জানতে চাইলো,
কিন্তু কিভাবে?
সে অনেক কথা। আগে খেতে বস। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে, ওরা দু'জন না খেয়ে আছে। খেতে খেতে না হয় বলবো।
-তূর্য আঙ্কেল রাইট?
নিভান আর নিঝুম টেবিলের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যেতেই ছবিটার দিকে আঙুল তাক করে প্রশ্নটা করলো ইয়াশ। সঙ্গে সঙ্গে পাশ থেকে নিভান বলে উঠলো,
হ্যা উনি আমার বাবা তূর্য জাওয়াদ। বর্তমানে ব্যবসার কাছে দেশের বাইরে আছেন।
অবশেষে একসঙ্গে খাবার খেতে বসলো ওরা সবাই। খাবার টে-বিলে জমিয়ে গল্প। ইয়াশ যে নিঝুমের একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ডের ছেলে সেটাও জানতে পারলো নিভান। এতোকিছুর মাঝেও ইয়াশ যেন নির্লিপ্ত। কোনো বিশেষ কারণে চেহারা জুড়ে একটা থমথমে ভাব খেলা করছে তার। কথায় কথায় নিঝুম হঠাৎ প্রিসিলাকে জিজ্ঞেস করলো,
তোমরা দু'জনই এসেছো? পরিবারের কেউ আসেনি?
না আন্টি।
খেতে খেতে জবাব দিলো প্রিসিলা। নিঝুম আবারও বললো,
তোমার নিশ্চয়ই এখনো পড়াশোনা শেষ হয়নি?
- জি না। আমি সবেমাত্র সেকেন্ড সেমিস্টারে উঠেছি।
ভদ্র মেয়ের মতোই উত্তর দিলো প্রিসিলা। সঙ্গে সঙ্গে নিঝুম বলে উঠলো,
-তারমানে বিয়ে শাদির এখনো অনেক দেরী আছে। তাইতো?
নিঝুমের মুখ ফস্কে কথাটা বেরোতেই আচানক বিষম খেলো মে-য়েটা। নিভান দ্রুত পানি এগিয়ে দিলো ওকে। ইয়াশ তখনও মু-র্তির মতো খাবার খাচ্ছে। যেন আশেপাশের কোনোকিছুই কানে আসছে না তার। মেয়েটার এহেন নাজেহাল অবস্থা দেখে চিন্তিত হয়ে পড়লো নিঝুম। অস্থির গলায় বললো,
-এ বাবা কি এমন বললাম। তুমি হঠাৎ এভাবে আঁতকে উঠলে কেন?
খাওয়া দাওয়া শেষ করে নিঝুম একটু বিশ্রাম নিতে ঘরে গেলো। ইয়াশ প্রিসিলা আর নিভান বসার ঘরেই ছিল, সামনে বিশাল পর্দায় বাংলা মুভি চলছে। আপাতত টিভিতে কারোরই মন নেই। ইয়াশ ডুবে আছে সোশ্যল মিডিয়ার নীল দুনিয়ায়, প্রিসিলা জানা-লার ফাঁক গলে বাইরে তাকিয়ে আছে। আকাশে ঘনকালো মেঘ করেছে, একটু বাদেই কেঁপে বৃষ্টি নামবে বোধ হয়।
তখনই হঠাৎ চমৎকার একটা অফার দিয়ে বসলো নিভান। বললো,
আমাদের দোতলায় একটা ইনডোর প্লে গ্রাউন্ড আছে। চলো তোমাদের ঘুরে দেখাই।
এতোক্ষণ বসে বসে ঝিমাতে থাকা প্রিসিলার কাছে নিভানের এই প্রস্তাবটা দারুণ লাগলো। সহসা চট করে উঠে দাঁড়ালো ও। উচ্ছ্বা-সিত হয়ে বললো,
লেটস গো।
দোতলার অনেকটা জায়গা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে এই বিশেষ প্লে গ্রাউন্ডটি। ভেতরে ক্যারাম থেকে শুরু করে টেবিল টেনিস, সুকার সহ বেশ কয়েক ধরনের গেইম সাজানো রয়েছে।
প্রিসিলা সবার আগে ছুটে গিয়ে ক্যারামের গুটি নিয়ে খেলতে আরম্ভ করলো, নিভানও এগিয়ে গিয়ে সঙ্গ দিলো ওকে। কিন্তু ইয়াশ ভেতরে ঢুকতেই এগিয়ে গিয়ে সুকার বোর্ডের উপর সাজি-য়ে রাখা কিউ স্টিকে হাত দিলো। লক্ষ্য স্থির রেখে দক্ষ হাতে কিউ স্টিকটাকে আয়ত্ত করে সরু প্রান্তটা ঠেলে দিতেই পরপর তিনটে বল গিয়ে পড়লো টেবিলের পকেটে। তার এই বিশেষ দক্ষতা দেখে অভিভূত হলো প্রিসিলা। তৎক্ষনাৎ ফড়িং এর মতো ছুটে গেলো সুকার বোর্ডের কাছে, হাত বাড়িয়ে আরেকটা কিউ স্টিক নিয়ে দৃঢ় গলায় বললো,
আমিও খেলবো।
- এসব বাচ্চাদের খেলা নয়, দূরে যা!
অতি রুক্ষস্বরে প্রিসিলাকে ভৎসর্না করে আবারও বোর্ডের দিকে ঝুকলো ইয়াশ। দু'টো আঙুলের মাঝখানে খুব আলতো ভাবে স্টি-কটা রেখে বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে ঠুকলো বলের গায়। ফের আবারও পকেটের ভেতর গড়িয়ে গিয়ে পড়লো পরপর কয়েকটা বল।
প্রিসিলার ফর্সা মুখটা মলিন হয়ে গেলো। খেলতে পারবেনা ভেবে স্টিক রেখে চলেই আসছিল, তখনই বাঁধ সাধলো নিভান। হুট করেই ওর কব্জিটা টেনে ধরে বললো,
চলো আমি শিখিয়ে দিচ্ছি।
নিভানের মুখ থেকে বের হওয়া বাক্যটা ইয়াশের কর্ণগোচর হতেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো তার। প্রথমবারের মতো একটা গুটিও পকেটে না পরে এদিক সেদিক ছড়িয়ে গেলো। মুখে কিছু না বললেও অকারণ একটা ক্রোধ শক্ত পাথরের মতো চেপে বসলো তার ডে-তরে। অভিব্যক্তি হলো পাথরের মতো কঠিন।
ঠিক সেসময় পেছন থেকে ঝুঁকে দু'টো হাত প্রিসিলার হাতের উপর রেখে কিউ স্টিকটা চেপে ধরলো নিভান। তারপর সেভাবেই আঁকড়ে ধরে একের পর এক গাইড করতে লাগলো প্রিসিলাকে। ইয়াশের আর বলের দিকে তাকানো হলোনা। ফনা তোলা সাপের মতোই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুঁসতে লাগলো সে। কিউ স্টিকটাকে শক্ত হাতে মুঠিবদ্ধ করে তীক্ষ্ণ ফলার মতো দৃষ্টি দিয়ে ভস্ম করে দিতে লাগলো নিজের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে।
ছন্নছাড়া মনটা যায় আসেনা বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেল-লেও আগ্রাসী মনটা কিছুতেই মানছে না সেই বারণ। ইচ্ছে করছে প্রিসিলাকে স্পর্শ করার অপরাধে নিভানকে মে'রে এখানেই পুঁতে রেখে দিতে। বড্ড কসরত করে দাঁতে দাঁত পিষে নিজেকে সামলা-চ্ছে ইয়াশ। কিন্তু এই সংযম ঠিক কতক্ষণ ধরে রাখা সম্ভব তা জানা নেই ওর। নিভানের প্রতিটি পদক্ষেপ ইয়াশের মস্তিষ্কে ক্রমশ আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। শরীরের প্রতিটি রক্ত কনিকা যেন টগবগ করে ফুটছে। মনেমনে জেঁকে বসেছে আশ্চর্য এক অধি-কারবোধ। যার প্রবণতায় আগ্রাসী হয়ে উঠলো ইয়াশ। ঝড়ের বেগে ছুটে গেলো নিভানের নিকট। ঈগলের মতো ছোঁ মেরে কলা-রটাকে ধরতেই যাবে, ঠিক সেসময় নিচ তলা থেকে গলা উঁচিয়ে ডেকে উঠলো নিঝুম,
নিভান! একবার নিচে এসোতো, দেখে যাও।
সঙ্গে সঙ্গে প্রিসিলাকে ছেড়ে দিলো নিভান। থমকে দাঁড়ালো ইয়াশও।
-আসছি আম্মু।
নিঝুমের ডাকে সারা দিয়ে কিছু না বলেই হেঁটে চলে গেলো নি-ভান। প্রিসিলা ঘুরে দাঁড়িয়ে নিভানকে চলে যেতে দেখে নিজেও হাঁটা ধরলো তার পিছু পিছু। তবে প্লে গ্রাউন্ডের চৌকাঠ মাড়ানোর আগেই একটা জোড়ালো হাত ঝটিকা প্রবাহের মতো ভেতরে টেনে আনলো ওকে। মেয়েটা কোনোকিছু বুঝে ওটার আগেই, শী-র্ন দেহটা শূন্যে তুলে আচানক ফেলে দিলো সুকার টেবিলের উপর। শরীরের ভার ভূমি স্পর্শ করতেই তীব্র ব্যথায় ককিয়ে উঠলো প্রিসিলা। মুখ থেকে
আহহ!
শব্দটা ছিটকে বেড়িয়ে এলো। সঙ্গে সঙ্গে ওর সুন্দর ফ্রকের বু-কের কাছটা চেপে ধরে অতর্কিত ভাবে টেনে বসালো ইয়াশ। কো-নোকিছু না বলেই মুখটাকে ওর শরীরের কাছে নিয়ে অদ্ভুতভাবে শুঁকতে লাগলো ক্রমাগত। ইয়াশের এই উন্মত্ত আচরণে একটু ভয়ই পেয়ে গেলো প্রিসিলা। আড়ষ্ট হয়ে শুধালো,
- কি হয়েছে? কিসের ঘ্রাণ নিচ্ছো এভাবে?
হঠাৎ করেই চোখ তুললো ইয়াশ। ওর চোখের তারায় দাউদাউ করছে ক্রোধের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। তা দেখে ভড়কালো প্রিসিলা। শুষ্ক একটা ঢোক গিলে ঠোঁট নাড়িয়ে আবারও প্রশ্ন করলো,
-ক.. কি হয়েছে?
ইউ্য আর স্মেল লাইক হীম!
বলেই আচমকা প্রিসিলার জামা ধরে টানাহেঁচড়া শুরু করলো সে । উন্মাদের ন্যায় অস্থির হয়ে বলতে লাগলো,
খোল এটা, খুলে ফেল। এক্ষুণি খোলললল!
টানাহেঁচড়ার একপর্যায়ে সত্যিই জামার কিছুটা অংশ ছিঁড়ে প্রি-সিলার ইনারওয়্যার বেড়িয়ে এলো। যা দেখা মাত্রই ধৈর্যহারা হয়ে ইয়াশের বুকের উপর সজোরে ধাক্কা হাঁকালো প্রিসিলা। তার শীর্ণ হাতের ধাক্কায় ইয়াশের ওই ছ ফুট তিন ইঞ্চির পেটানো শরীরটা নড়লোও না চড়লোও না, তবুও চিৎকার দিয়ে উঠলো মেয়েটা,
- সমস্যাটা কি তোমার? হাউ ডেয়ার ইউ্য টু টেক অফ মাই ড্রেস?
থেমে গেলো ইয়াশের হাত। বাঁকানো কপাল ক্রমশ সরল হয়ে উঠলো। সহসা মেয়েটার দিকে ঝুঁকলো সে। ওর নীলাভ কম্পিত দু'চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে চোয়ালের পেশী শক্ত করে থেমে থেমে জবাব দিলো,
ইউ্য.... আর... মাই... ওয়াইফফফ! বিয়ে করেছি তোকে আমি।
সো হোয়াট!
আগুনে ঘি ঢালার মতোই ঝেঝে উঠলো প্রিসিলা। ইয়াশ একই স্বরে বললো,
--- হোয়াই ডিড ইউ লেট হীম টাচ ইউ্য?
--- তাতে তোমার কি যায় আসে?
প্রশ্নটা করতে গিয়ে সামান্য কেঁপে উঠল প্রিসিলার কন্ঠস্বর। পর-ক্ষণেই ওকে আরও শক্ত করে চেপে ধরলো ইয়াশ। হাত বাড়িয়ে মুখটাকে ওর মুখের কাছে নিয়ে স্তিমিত স্বরে জবাব দিলো,
-ইফ ইউওর বডি স্মেলস লাইক হিম এগেইন, দেন লেট মি টেল ইউ্য, আজকে তো শুধু জামা ছিঁড়েছি, নেক্সট টাইম চামড়া ছিঁড়ে ফেলবো। এ্যান্ড ইট'স আ ওয়ার্নিং।
--- ইউ্য আর সো ডমিন্যান্ট, ইয়াশ!
ভয়ে, আতঙ্কে ছেলেটার বাহুতলে মুষড়ে গিয়ে কাতর গলায় বা-ক্যটা আওড়ালো প্রিসিলা।
--- ইয়েস আই এ্যাম।
চলছে.....