ঘুমানোর সময় নুসরাতের কাছে সহনীয় শীত মনে হলেও রাতের মধ্যভাগের দিকে অনুভব হলো মাত্রারিক্ত শীতলতা। হাত পা অসাড় হয়ে আছে শীতের জন্য। কম্ফোটার গায়ে জড়াতে নিবে কিছুই পেল না হাতের সানিধ্যে। আশপাশ হতে হিটার চালানোর শব্দ আসছে, কিন্তু কোথা থেকে সেই শব্দের উৎপত্তি ধরতে পারল না সে। ঘুমে চোখ শক্ত করে বুজে থাকলেও বাহিরের জাগতিক জিনিসগুলো এসে ছাড়া ছাড়া শব্দে নাড়া দিল কানে। কান সজাগ করতেই কানে আসলো অপরিচিত কন্ঠ, 'তুই মেয়েটাকে ঘুমের ঘোরে তুলে নিয়ে এসেছিস?'
এরপর আরেকটা গলার শব্দ, 'ভাইয়া ওকে বললেই তো ও আসতো, কেন এমন করে নিয়ে আসছেন?'
নুসরাত ধারণা করে নিল ওইটা মমোর কন্ঠ। তাহলে প্রথম কন্ঠস্বরের মালিক কে! অবচেতন মনে নিজেই নিজেকে বলল, মমো বাসায় আসেনি, তাহলে তুই এসব স্বপ্নেই দেখছিস।
'আরশ প্রশ্নের উত্তর দে! এ কেমন বেয়াদবী!'
ওপাশ থেকে কী উত্তর দিল তা বুঝল ঠিক নুসরাত। ঘুমের ঘোরে সামান্য চোখ খুলে তাকাল। অন্ধকারের মধ্যে ক্ষীণ আলো সংমিশ্রণে চোখ বন্ধ করে নিল আবার। ভুলে বসল আরশ চলে গিয়েছে বেড়াতে। বিরক্ত সুরে কপালে ভাঁজ ফেলে বলে ওঠল, 'ল্যাম্পসেড অফ করুন আরশ!'
পরপর আবার ঈষৎ ঢোক গিলে বিড়বিড় করল, 'আপনি তো চলে গিয়েছেন আমাকে রেখে!'
নুসরাতের যখন ঘুম ভাঙল তখন কাটায় কাটায় সকাল দশটা। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল। তখনো ঘুম থেকে উঠায় জাগতিক ভাবনা থেকে বহু দূরে সে। রুমটুকু চোখ না বুলিয়ে অগ্রসর হলো ওয়াশরুমের দিকে। চোখ বন্ধ করে রুমে যেখানে ওয়াশরুম সেইদিকে এক পা দু-পা করে এগোলো। ভিন্ন রুম হওয়ায় সেখানে দরজা না থাকায় কপালে ধুপ করে বারি খেল। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠে কপালের মধ্যভাগ চেপে ধরে আশপাশের দরজা খুঁজল কানার মতো। চোখ খুলে দেখার কোনো প্রবণতা দেখা গেল না নুসরাতের ভেতর। সে হাত দিয়ে হাতড়ে হাতড়ে দরজা খুঁজল, হয়তো পেয়েও গেল, আলগোছে দরজার নব ঘুরিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করল। সিঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে তাকাল ঝাপসা চোখে। প্রথমে অক্ষিপটে কোনো কিছুই ধরা দিল না, তাই ব্রাশ নিজের যে স্থানে থাকে ওখান থেকে তুলে নিয়ে দাঁত ঘষে নিয়ে কুলি কুচি করল। যখন দ্বিতীয় বারের ন্যায় পানির ঝাপটা দিল চোখে মুখে, তখন সামনের সবকিছু একদম পরিস্কার নয়নে আটল। প্রতিবিম্ব সৃষ্টিকারী গ্লাসের মিররের দিকে তাকাতেই অদ্ভুত ঠেকল কিছু একটা। আশপাশ দেখে যখন সবকিছুই অপরিচিত মনে হলো, তখন চোখ-মুখ খিঁচিয়ে অস্বাভাবিক কন্ঠে চিৎকার করে উঠল, 'আ আ আ..! আমাকে কিডন্যাপ করে ফেলেছে আম্মাআআ!'
ওয়াশরুম থেকে বের হওয়ার আগেই আরশ এসে প্রবেশ করল সেখানে। নুসরাত নিজের হাতের ব্রাশ আরশের দিকে তাক করে আসতে আসতে বলল, 'আপনি আমাকে তোলে এনেছেন?'
আরশ নুসরাতের পায়ের গতির সাথে মিলিয়ে পিছু হাঁটল। বলল, 'অস্বাভাবিক প্রশ্ন করেন আপনি, আপনাকে আমি তোলে আনব কেন, ঘুমের ঘোরে নিয়ে আসছি।'
আরশের পিঠ ট্রান্সপারেন্ট শাওয়ার এর গ্লাসের সাথে ধাক্কা খেতে সে থেমে গেল। নুসরাত এক হাত কোমরে রেখে অন্য হাত রাখল গ্লাসের উপর। ভ্রু উচিয়ে বলে ওঠল, 'তার মানে আপনি আমাকে ইনডায়েরেক্টলি কিডন্যাপই করেছেন!'
'হ্যাঁ, তো?'
'তার মানে আপনি আপনার দোষ স্বীকার করছেন?'
'আমি দোষ স্বীকার করেছি কোথায়?'
'তাহলে আপনি এই একটু আগে কী বলেছেন?'
আরশ ঢোক গিলে শব্দ করে শ্বাস ফেলল। বানোয়াট কাহিনি বানিয়ে বাচ্চা বুলাবার মতো বলল, 'আমি বলতে চাইছি, আমি সত্যি সত্যি গাড়ি নিয়ে চলে গেছিলাম ফেঞ্চুগঞ্জ রোডে, তখন মনে হলো একটা জিনিস রয়ে গেছে সৈয়দ বাড়িতে। তাই গাড়ি ইউ-ট্রান নিয়ে যখন বাসায় ফিরে আসলাম, তখন ওই জিনিসটাকে দেখলাম কম্ফোটার টেনে মাথা ঢেকে শুয়ে আছে। আমি আমার জিনিসটা কম্ফোটারের ভেতর থাকায় কম্ফোটার সহ পেঁচিয়ে নিয়ে আসলাম। ওখানে যে আপনি শুয়ে ছিলেন সেটা তো আমি দেখিনি। কম্ফোটারের সাথে ওই জিনিসটা পেঁচানোতে আপনিও হয়তোবা চলে এসেছেন! এখানে আমার দোষ কোথায়?'
নিষ্পাপ ভঙ্গিতে কথাটা বলে শেষ করল আরশ। নুসরাতের মস্তিষ্ক রাগে দপদপ করে উঠল। সেকেন্ডের ভেতর মেজাজ খারাপ হয়ে যাওয়ায়, কানে তালা লাগানো চিৎকার করে উঠল, 'একদম মিথ্যে বলবেন আপনি, আমাকে বোকা পেয়েছেন? আপনি না নিয়ে আসলে আমি হেঁটে হেঁটে চলে এসেছি?'
'হতেই তো পারে!'
'এইইইই, আপনি আমাকে দোষ দিচ্ছেন? তার মানে আপনার সাথে ভুল করে আসায় আমি দোষী! আমি এখানে আসায় দোষ হয়েছে, অ মাই গস, ইয়া আল্লাহ, এ কেমন লোক, আল্লাহ এই লোককে তুমি সুমতি দাও, বুদ্ধি দাও, জ্ঞান দাও, জ্ঞানহীন, জ্ঞানভ্রষ্ট লোক একটা...!'
আরশ নুসরাতের হাতের ব্রাশের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল, 'এটা আমার ব্রাশ।'
নুসরাত তেতিয়ে উঠল, বলল, 'আপনার ব্রাশ তো কী হয়েছে, আমি খেয়ে ফেলছি এটাকে!'
'আমি তেমন কিছু বলিনি।'
নুসরাত হঠাৎ থামল, চোখ দুটো গোল গোল করে হাতের ব্রাশের দিকে দিল। চোখ দুটো রসগোল্লার ন্যায় প্রকট করে আরশকে জিজ্ঞেস করল, 'এটা আপনার ব্রাশ?'
আরশ উপর নিচ মাথা নাড়াল। বলে ওঠল, 'আপনার জন্য আলাদা ব্রাশ নিয়ে এসেছিলাম।'
আরশের এই কথাতেই নুসরাতের হাত থেকে মেঝেতে ছিটকে পড়ল ব্রাশ। রাগে কান দিয়ে ধোঁয়া বের হতে লাগল তার। দু-হাতে গলা টিপে ধরার মতো ভঙ্গি করে থাবা বসাল ড্রপ সোল্ডার টিশার্টের বুকে। অগ্নিগিরি লাভার ন্যায় ফুলে উঠে হিসহিসিয়ে বলে ওঠল, 'আগে বললেন না কেন?'
পরপর বিড়বিড় করে উঠল, 'সব দোষ আপনার, সব, সব...'
আরশ আঁখি যুগল কিঞ্চিৎ তীক্ষ্ণ করে শুধাল, 'সব দোষ আমার কীভাবে?'
'আপনি আমাকে তোলে নিয়ে না আসলে আমি কী এখানে আসতাম?'
আরশ ঠাট্টা করে বলে ওঠল, 'ঘুমের ঘোরে তুলে নিয়ে কেউ যদি বাসর করে ফেলত, তবুও বুঝতে পারতেন না, আর এখন গলা ফাটিয়ে চিৎকার হচ্ছে!'
'ভালো করেছি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেছি, আপনিও করুন আমার সাথে!'
'আমি পাগল নই এমনি চিৎকার চেচামেচি করব।'
নুসরাত চোখ দুটো অপ্রাকৃতভাবে বড় বড় করে বলল, 'আপনি আমাকে পাগল বলেছেন?'
আরশ থতমত খেয়ে নুসরাত তোলা তর্জনী আঙুল নিচে নামিয়ে দিল, বলল, 'আরে আমি এটা কখন বললাম?'
'তার মানে আমি মিথ্যে বলছি!'
আরশ খ্যাক করে উঠল। ঝাঁঝাল স্বরে বলল, 'আমি মিথ্যে বলেছি, খুশি আপনি, তাহলে এই ভাঙা রেডিও বন্ধ করুন, সকাল সকাল এসব কানে তোলার মতো শক্তি আমার নেই।'
নুসরাত দপ করে নিভে গেল। চোখের পাতা ঝাপটে বলে ওঠল, 'আমি ভাঙা রেডিও এর মতো করি!'
আরশ জিভ গালের এক কোণে নিয়ে কিঞ্চিৎ হাসল নিজস্ব ভঙ্গিতে। গ্রীবা বাঁকিয়ে সামনে দাঁড়ানো হঠাৎ নরম হয়ে আসা রমনীর দিকে ঝুঁকে সুক্ষ্ম ঠোঁটে চুমু খেল আলগোছে। ওয়াশরুম থেকে বের হতে হতে খাঁদে নামানো শীতল কন্ঠে বলে ওঠল, 'জ্বি না, ওটা আপনার মুখ বন্ধ করানোর জন্য বলেছি।'
নুসরাত শীতল স্রোতের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। মুখে নেমে আসা বিষন্নতা সরে গিয়ে তার উপর খুশির ঝলক ফুটল। ভার হওয়া হৃদয় হালকা হয়ে আসলো নির্বিঘ্নে।
নুসরাত চুল বেঁধে নিচে নামতেই দেখা পেল পরিচিত অপরিচিত মানুষের দর্শন। সবার আগে তার নজর কাড়ল আরশের পাশে বসারত রমনী। সুশ্রীর গোলগাল মুখ, কোমর সমান চুল, ফর্সা মোলায়েম দেহ। ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে যত নামল হৃদ গহ্বরের অস্বাভাবিক কম্পন বৃদ্ধি পেল। চোখ বুজে শ্বাস ফেলে সবার উদ্দেশ্যে সালাম দিল, 'আসসালামু আলাইকুম!'
আরশ এসে উঠে দাঁড়াল নুসরাতের পাশে। একহাতে নুসরাতের হাত নিজের মুষ্টিতে চেপে ধরে পরিচয় করিয়ে দিল, 'মিট মাই ওয়াইফ, সৈয়দা নুসরাত নাছির!'
মাহাদির মা রুমি খান এসে জড়িয়ে ধরলেন নুসরাতকে। কপালে সূক্ষ্ম চুমু খেয়ে বলে ওঠলেন, 'ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসতে কষ্ট হয়নি তো? আগামীকাল রাতেই দেখা করতাম কিন্তু তুমি আরশ এসেছ ভোর রাতে, তাই আর দেখা করতে পারিনি।'
আরশ বলে ওঠল, 'কষ্ট হবে কেন ওর, সারারাত তো আমার গায়ের উপর পা তুলে ঘুমিয়ে এসেছে। আমাকে জিজ্ঞেস করুন, ওকে নিয়ে আসতে আমার কষ্ট হয়নি?'
আরেকজন বুড়ো মহিলা আসলেন সেখানে। হেসে এসে আরশকে জড়িয়ে ধরতে ধরতে জানতে চাইলেন, 'কষ্ট হবে কেন তোর, তুই কী ওকে কোলে করে নিয়ে আসছিস?'
আরশ উনাকে বুকে একহাতে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠল, 'অবশ্যই কোলে ছিল ও!'
বয়স্ক মহিলা হাসলেন। আরশ ফিসফিসিয়ে কানের কাছে বলল, 'ঘুমিয়ে ছিল তাই কোলে বসিয়ে ড্রাইভিং করেছি।'
তারপর দু-জনেই দু-জনের দিকে তাকিয়ে হাসল সামান্য। নুসরাত নিজেও ঝুঁকে এসে গাল বাড়িয়ে দিল বুড়ির দিকে। ভদ্র মহিলা গালে চুমু খেয়ে স্নেহের ভঙ্গিতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর পাতা গালে আরো দুটো স্নেহের পরশ একে দিলেন। তখনো নুসরাতের বাঁ-হাত আরশের মুষ্টিতে। নুসরাত প্রথমে সাজিদাকে একহাতে জড়িয়ে ধরল, তারপর মমোকে, মাহাদি এসে নুসরাতের সাথে হ্যান্ড শেক করতে করতে আরশের হাতের দিকে ইশারা করে বলল, 'তোর বউকে আমরা উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছি না, হাত ছেড়ে দিতে পারিস।'
'ও আমার সাথে এসেছে, তাই ওর দায়িত্ব ও আমার উপর। উনার শ্বশুর মশাইয়ের শক্ত আদেশ কোনোভাবে যেন হাতের বাহিরে না যেতে দেই বাড়ির বউকে।'
মাহাদি হেসে চলে গেল। মৃন্ময় এসে হ্যান্ডশেক করতেই, লাল কেশরাশির এক রমনীর উদয় ঘটল পেছন থেকে। নুসরাতকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠল, 'ইয়া আল্লাহ, তুমি কী মায়াবী, গতকাল রাতে তোমাকে দেখেছি কিন্তু পুরোপুরি আলোর অভাবে দেখতে পারিনি, তোমার জামাইকে বললাম আলো জ্বালাতে, জ্বালাল-ই না, বলে সকালে দেখে নিও যদি এত দেখার ইচ্ছে হয়। ওহ, আমার পরিচয় দেইনি, আমার নাম, নুসাইফা, ইবনাত আপনার মৃন্ময় ভাইয়ার স্ত্রী।'
আরেকটা মেয়ে এসে উঁকি দিল। চোখ দুটোতে প্রশ্ন ছাপিয়ে নিয়ে শুধাল, 'এটা আরশ ভাইয়ের বউ?'
পরপর আরশের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠল, 'এটা আপনার বউ আরশ ভাই?'
আরশ মাথা নাড়াতেই মেয়েটা হেসে উঠল। দু-হাতে গলা জড়িয়ে ধরে বলে ওঠল, 'আমি গতকাল থেকে আপনার অপেক্ষায় বসেছিলাম, ভাইয়া যখন জানাল আপনি আসবেন না, তখন আমার ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল। তাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে উঠে জানতে পারলাম আপনি এসেছেন, তখন থেকে অপেক্ষায় ছিলাম আপনার সাক্ষাতের। একবার তো ভেবেছিল রুমে গিয়ে ঢুকব, কিন্তু ভাই ঢুকতে দেননি, বলেন জার্নি করে এসেছেন সারারাত আপনাকে নাকি না জাগাতে।'
মেয়েটা ফরফর করে কথা বলে চলল। এরপর নিঃশ্বাস নিতে থামতেই দেখল আরশ ইশারায় না করছে কিছু না বলার জন্য। মেয়েটা এসব কানেই তুলল না, বলতে লাগল, 'ভাইয়া তো দরজার সামনে এমনভাবে দাঁড়িয়ে ছিল যেন ওই রুমের সিকিউরিটি গার্ড, কাউকে ঢুকতে না দেওয়াই কাজ। আমি বললাম, একটু দেখব দরজার ফাক গলে উনি কী বলছেন জানেন! বলে, না দেখার প্রয়োজন নেই, এত দেখলে চোখে সর্ষের ফুল দেখব।'
আরশ ধমকে উঠে বলল মেয়েটাকে, 'হয়েছে আনায়া, মুখ এবার বন্ধ করো।'
আনায়া মুখ বন্ধ করল না, সে কিছু বলতে মুখ খুলতে নিবে, আরশ নুসরাতকে টেনে নিয়ে চলে গেল। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল, 'ও রাত থেকে কিছু খায়নি, টেবিলে নাস্তা দিয়ে দাও।'
আনায়া হেসে উঠল শব্দ করে। বলে ওঠল, 'আরশ ভাই, আমার থেকে বউমণিকে রক্ষা করতে চাচ্ছ, হবে না, হবে না...!'
আরশ টেনে নিয়ে বসাল নুসরাতকে। ততক্ষণে রুমি খান খাবার সাজিয়ে ফেলেছেন ডায়নিং টেবিলে। মাহাদির দাদি ফৌজিয়া চেয়ার টেনে বসতে বসতে শুধালেন, 'অনিকা কোথায়? এতক্ষণ তো এখানেই ছিল?'
নুসরাত আড় চোখে তাকাল আরশের দিকে, না, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই মুখে। প্লেট খাবার নিচ্ছে সে! আরশের দিক থেকে চোখ সরল চেয়ার টেনে নেওয়ার শব্দে। মেঝের সাথে চেয়ারে ঘর্ষণে শব্দের সৃষ্টি হলো, যা ০.০১ সেকেন্ড পর প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসলো ওই কক্ষে। নুসরাত গোমড়া মুখে প্রথমেই নজরে আসা ফর্সা গোলগাল রমনীকে দেখল। গায়ে সেলোয়ার-কামিজ পরিহিত। নিজের দিকে তাকাল, ব্যাগি প্যান্ট, আর কুর্তি পরেছে সে। নিজেকে নিয়ে দ্বিধায় ভুগল, মনে হলো আরশ তো অনিকাকে দেশে থাকতে পছন্দ করত, তাকে তো একবার ছবি ও দেখিয়েছিল, এইটুকু কথা মনে হওয়া মাত্র এতক্ষণের সকল উচ্ছ্বাস খুশি ফুরুৎ করে উড়ে গেল। চুপচাপ টেবিলের দিকে চোখ নিবদ্ধ করতেই আরশ তার সামনের প্লেট টেনে নিল ডান হাতে, বাঁ-হাতের মুষ্টিতে তখনো বন্দী মেয়েলি হাত। নুসরাত নিষ্প্রাণ মুখে বলে ওঠল, 'ওইটা আমার প্লেট।'
আরশ ভ্রু উচিয়ে কিঞ্চিৎ বিরক্তি নিয়ে শুধাল, 'তো?'
প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে ওপাশ হতে উত্তরের আশা করল না, নিজের প্লেটে বেড়ে নেওয়া খাবার বাড়িয়ে দিল নুসরাতের দিকে। আদেশ দিল, 'খান!'
নুসরাত মিনমিনিয়ে বলে ওঠল, 'এটা আপনার প্লেট...!'
'আমার প্লেট হলে কী হলো?'
নুসরাত আরশের প্রশ্নে হতবিহ্বল চেহারা বানিয়ে তাকিয়ে রইল। বলল, 'আপনি নিজের জন্য বেড়েছেন।'
আরশ বিরক্তিতে চ সূচক শব্দ বের করে বলল, 'আমি আপনাকে বলেছি, এটা আমি নিজের জন্য বেড়ে নিয়েছি।'
নুসরাত মৃদু আওয়াজে আওড়াল, 'জ্বি না!'
'তাহলে এত বেশি কথা বলেন কেন, খেতে দিয়েছি খাবেন চুপচাপ, প্রশ্ন করে করে আপনার মুখে ব্যথা হয় না?'
'আপনার চিৎকার করতে করতে মুখ ব্যথা হয় না?'
'না হয় না, এবার খাবার খান।'
নুসরাত ভেংচি কেটে আওড়াল, 'না হয় না....'
আরশকে তার দিকে ব্যগ্র করে তাকাতে দেখে বলে ওঠল, 'এভাবে তাকাবেন না।'
'কেন তাকাব না? আমার চোখ দিয়ে আমি যার দিকে যেভাবে ইচ্ছে তাকাব!' নুসরাত চোখ দুটো উল্টে ভেঙচাল। বলল,
'যার দিকে ইচ্ছে তাকান, দয়া করে আমার দিকে এভাবে তাকাবেন না।'
আরশ জেদি স্বরে বলল,
'আমার চোখ, আমি দেখব, যেভাবে ইচ্ছে, যাকে ইচ্ছে, আপনি কে?'
'আপনি তার মানে এভাবেই আমার দিকে তাকাবেন?'
'অফকোর্স! কী করবেন আপনি?'
'ফর্ক দিয়ে চোখ তুলে নিয়ে ক্যারাম খেলব।'
আরশ আকস্মিকভাবে হেসে উঠল। নুসরাত কপালে ভাঁজ ফেলে কারণ জানতে চাইলে, আরশ হিসহিসিয়ে বলল, 'মাহাদির বাবা এদিকেই আসছেন, আর ওর দাদি মা আপনার দিকেই তাকিয়ে আছেন।'
নুসরাত হাসল, হেসে আড়চোখে তাকাল সবার দিকে। ক্ষীণ কন্ঠে দাঁতের পাটি চেপে বলল, 'আমার দিকে না, আমাদের দিকে বলুন!'
আরশ ফিসফিসিয়ে বলে ওঠল,
'সব দোষ আপনার।'
নুসরাত আকাশ থেকে পড়ে গেছে এমন ভাব করল। চোখ দুটো উল্টে নিয়ে আরশের কথা মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে উড়িয়ে দিল। তেতো আওয়াজে বলল, 'আমার দোষ, হ্যাঁ, আমার দোষ, আর আপনি তো সুশ্রী, সাবেত্রী!'
'মুখে মুখে তর্ক না করে এটা বলুন কী করা উচিত। আর ফর্ক আমার দিকে যে তাক করে রেখেছেন, তা নিচে নামান।'
নুসরাত হেসে হেসে সবার দিকে তাকাল। ফর্কের মুখে লাগানো এঁটো খাবার আরশের মুখের ভেতর নিয়ে ঢুকিয়ে দিল। ঠোঁট এলিয়ে হেসে বলে ওঠল, 'সোয়ামি...!'
আরশ এঁটো খাবারটুকু গিলে নিল কোনোরকম। কড়মড় করে বলে ওঠল, 'সৈয়দ আরশ হেলাল কারোর এঁটো খাবার খায় না...!'
পরপর মনে মনে আওড়ায়, 'সেটা মহোদয়া নুসরাত নাছির হলে কোনো নারাজি ছাড়াই বরদাস্ত!'
নুসরাত আরশের মনে মনে কথা শুনল না। ঠোঁটের কোণ বাঁকা করে বলে ওঠল, 'সেটা মহামান্য সৈয়দ আরশ হেলালের ব্যাপার, আমার না!'
নুসরাত মিটিমিটি হেসে সবার দিকে তাকাল। অনিকাকে তাদের দিকে তাকাতে দেখে আরশকে বলল, 'চুলে হাত বুলিয়ে দিন।'
আরশ হকচকিয়ে উঠল। বিভ্রান্ত চোখে আশেপাশে এক পলক দেখে জিজ্ঞেস করল, 'কী? আবার বলুন, বুঝিনি?'
নুসরাত মুখের একপাশ হাত দিয়ে ঘুরে বলল,
'চুল কানের পেছনে গুজে দিন, জীবনে প্রেমিকার চুল কানের পেছনে গুজেননি, বা চুলে হাত বুলাননি!'
আরশ না ভঙ্গিতে মাথা নাড়াতেই নুসরাত নিজেই টেনে নিল আরশের হাত নিজের মাথার উপর। নিজেই আরশের হাত দিয়ে ঘষে ঘষে চুল বুলিয়ে নিয়ে, লজ্জা মিশ্রিত চোখে সবার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠল, 'ইসশ, আপনি ও না!'
নতুন দম্পতির দিকে তাকিয়ে সবাই হাসলেও অনিকার মুখ বেজার করে
রাখা। আরশ খাবার খাওয়া শেষে বসে রইল নুসরাতের পাশে। অনিকা
যখন জিজ্ঞেস করল, 'টেবিল থেকে উঠছো না কেন, তোমার তো খাবার
খাওয়া শেষ?' তখন আরশ সহজ গলায় বলে ওঠল, 'ওর খাওয়া শেষ
হোক, তারপর উঠব।' তখন নুসরাতের গালের কোণে কিঞ্চিৎ হাসির
মিশ্রণ দেখা গেল। এমনকি আরেকটা ঘটনা ঘটল-নিজের খাবারের
প্রথম লোকমা আরশ নুসরাতের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। নুসরাত অবাক
হয়ে কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে, তখন বলে ওঠল, 'চুপচাপ খান।'
এরপরও আর তাদের ভেতর বাক্য বিনিময় হয়নি, কিন্তু আরশের এই
ছোটখাটো কেয়ারগুলো নুসরাতের মনে জায়গা করে নিতে শুরু করল।
বুকের ভেতর জমা হওয়া বিষন্নতার পাহাড়ে এক মুহূর্ত সময় লাগল না
ধস নামতে।