#১৫_বছর_বয়সী_মা (১২)
#সোফিয়া_সাফা
“আমাকে এতো এতো ভয় দেখিয়ো না, আমার হার্ট অনেক দুর্বল—বিয়ের আগেই বিধবা হয়ে যাবে।”
অলি আলভীর কথা বুঝতে না পারলেও দিহান আলভীর কথা বুঝতে পেরে হেসে ওঠে। আলভী যে ঠাট্টা করেছে সেটা দিহান বুঝতে পেরেছে।
“আঙ্কেল, আন্টি, গাড়িতে উঠে বসুন। আপনাদেরকে বাড়িতে রেখে আমাদের ফিরতে হবে।”
বাকিরা সবাই গাড়িতে উঠে বসল কিন্তু অলি পা নিয়ে হাঁটতেই পারছে না। ব্যথা যেন সময়ের সাথে সাথে বেড়েই চলেছে।
অলিকে আসতে না দেখে আসমা বানু আবারও নেমে যেতে চাইলে আলভী বলে, “আন্টি, আপনি বসুন। আমি দেখছি।”
আলভী অলির সামনে এসে অলিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তাকে কোলে তুলে নিল। আকস্মিক ঘটনায় অলি স্তব্ধ হয়ে গেল। আলভী অলিকে নিয়ে গিয়ে ব্যাকসিটে আসমা বানুর পাশে বসিয়ে দিয়ে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিল।
তাদের বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল। আসমা বানু আর লিয়াকত হোসাইন গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দরজা খুলে দিলেন। অলি গাড়ির বাইরে পা রাখতেই আলভী তাকে কোলে তুলে নিয়ে সোজা বাড়িতে ঢুকে গেল। অলি কিছুই বলল না। তার পা ব্যথায় ফুলে গেছে। আলভী অলিকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে দিয়ে অলির পা চেক করতে লাগল।
অলি বলে ওঠে, “এরকম ভাব করছেন যেন আপনি ধরলেই আমার পা সেরে যাবে!”
দিহান পাশ থেকে বলে উঠল, “এভির ধরাতে না সারলেও আমার ধরাতে সিওর সেরে যেত, কারণ আমি অর্থোপেডিক্সের ডক্টর। কিন্তু আমি তোমার পা সারাতে গিয়ে নিজের আঙুল হারাতে চাই না।”
অলি দিহানের দিকে তাকিয়ে বলল, “বাব্বাহ! আপনি ডক্টর?”
“ইয়েস! শুধু আমি না, তোমার হবু স্বামীও একজন হার্টের ডক্টর; মানে কার্ডিওলজিস্ট।”
কথাটা শুনে অলি চেঁচিয়ে ওঠে, “কী!”
অলির চিৎকার শুনে আসমা বানু আর লিয়াকত হোসাইনও ছুটে আসেন। আসমা বানু কিচেনে ডিনার রেডি করছিলেন। আর যাই হোক, আলভীর সাথেই অলির বিয়েটা হচ্ছে। অলির চিৎকারে আলভীও একটু ঘাবড়ে গেল।
“আপনি একজন ডক্টর?”
আলভী বিরক্তি নিয়ে অলির দিকে তাকায়।
“হ্যাঁ, তো কী হয়েছে? এভাবে চিল্লানোর কী আছে? লিসেন, আমি একজন ডক্টর, কোনো প্রেতাত্মা নই।”
“শিট! আমার কপাল সবদিক দিয়ে খারাপ দেখছি।”
আলভী আসমা বানু আর লিয়াকত হোসাইনের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।
“আসলে অলি ডাক্তারদের অনেক ভয় পায়।” লিয়াকত হোসাইনের কথা শুনে আলভী ফোস করে একটা শ্বাস ছাড়ল। পুরোটা জীবন লাগিয়ে দিল একজন দক্ষ কার্ডিওলজিস্ট হওয়ার পেছনে, শেষমেশ কিনা তার বউ তার প্রফেশনকেই ভয় পাবে! বাহ, দারুণ তো! লাইফে ইদানীং সবকিছুই কেমন যেন আনফেয়ার হচ্ছে।
প্রথমত, বিয়ে করার আগেই বাসর সেরে ফেলল; দ্বিতীয়ত, ঠিকমতো বাসর উপভোগ করার আগেই বাচ্চার বাপ হয়ে বসে আছে। এসব কিছু ভেবে আলভীর ভীষণ খারাপ লাগছে। তবে এর মধ্যে একটা ভালো ব্যাপার হলো, সে যাকে ভালোবেসেছে সেই তার বেড পার্টনার হয়েছে। তার বাচ্চার মা-ও সেই হতে চলেছে আর পরিশেষে তার লাইফ পার্টনারও সেই হবে।
“আন্টি, একটা আইস ব্যাগে করে কিছু বরফ এনে দিন, ওর পা অনেক ফুলে গেছে। আর একটা মোটা কাপড় আনবেন।”
আসমা বানু সেসব এনে দিতেই আলভী অলির পায়ে আইস ব্যাগ লাগিয়ে দেয়। তারপর মোটা কাপড় দিয়ে বেঁধে সোফার ওপর একটা বালিশ রেখে সেটার ওপর অলির পা রেখে দেয়। আলভী আর দিহান ডিনার করতে না চাইলেও মুখের ওপর না করতে পারে না। ডিনার করা শেষে আলভী আর দিহান চলে যেতে নিলে অলি ঘোর আপত্তি জানায়।
“আপনি আমাকে বিয়ে না করা অবধি নিজের বাড়িতে যেতে পারবেন না।”
আলভী অবাক চোখে অলির দিকে তাকায়।
“এটা কেমন কথা? আমি বিয়ে করব সেটা সবাইকে জানাতে হবে না? আয়োজন করতে হবে না?”
“না, কিচ্ছু করতে হবে না। আমি জানি আপনি একবার বাড়িতে গেলে আর আসবেন না। আপনার মা জীবনেও আমাদের বিয়ে হতে দেবে না।”
অলির কথা শুনে আলভী ভেবে দেখল যে অলি ঠিকই বলেছে।
“আচ্ছা, যাচ্ছি না।”
অলি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে ওঠে,
“শুনুন, আমার কিছু শর্ত আছে। সেগুলো মানলে তবেই আমি আপনাকে বিয়ে করব।”
আলভী বুকের ওপর হাত বেঁধে বলে, “আর যদি না মানি?”
“তাহলে জেলের ভাত খাওয়ার জন্য রেডি হয়ে যান।”
“তুমি সত্যিই আমাকে জেলের ভাত খাওয়াতে চাও?”
“আগে চেয়েছিলাম কিন্তু এখন বাবুর কথা ভেবে চাইছি না। সেই জন্যই তো বিয়ে করতে চাইছি। কিন্তু আপনি শর্ত না মানলে তো আমার আর কিছুই করার নেই।”
আসমা বানু ইশারায় অলিকে চুপ করতে বললেও অলি পাত্তা দেয় না। আসমা বানু তো বারবার ভয় পাচ্ছেন এই বুঝি আলভী বিয়ে করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে যাবে।
আলভী ঘুরে এসে অলির সামনে বসে।
“বলো, তোমার কী কী শর্ত আছে?”
“আলাদাভাবে বলব।”
অলির কথা শুনে বাকিরা অন্যরুমে চলে যায়।
“এবার বলো।”
“আমার প্রথম শর্ত, আপনি যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন কোনো রকম পরিস্থিতিতেই আরেকটা বিয়ে করতে পারবেন না।”
আলভী ভ্রু কুঁচকে অলির দিকে তাকায়।
“বউ থাকতে আরেক বিয়ে আমি করবই বা কেন?”
“আমার অবর্তমানেও করতে পারবেন না।”
“তোমার অবর্তমানে করলেই বা তুমি কী করবে?”
“ভালো প্রশ্ন করেছেন। আমার অবর্তমানে আপনি বিয়ে করলে আপনার সব সম্পত্তি আমার বাবু পাবে।”
আলভী একটা শ্বাস ফেলে রাজি হয়ে যায়।
“আপনি কোনো অবস্থাতেই আমাকে ডিভোর্স দিতে পারবেন না, কিন্তু আমি চাইলেই আপনাকে ডিভোর্স দিতে পারব।”
“এটা তো আনফেয়ার! ডিভোর্স কেউ না দিতে পারলেও একটা কথা ছিল।”
“হাহ! আপনি তো ক্যারেক্টারলেস, আপনার ওপর বিশ্বাস নেই। তাই ডিভোর্স দেওয়ার ক্ষমতা শুধু আমার হাতেই থাকবে।”
আলভী প্রত্যুত্তরে কিছুই বলল না।
“আমার চার নম্বর শর্ত হলো, আমার জন্য ওই বাড়িতে আলাদা একটা রুমের ব্যবস্থা করে দেবেন। আমি আপনার সাথে এক রুমে থাকতে পারব না। তাছাড়া আমার অনুমতি ব্যতীত আপনি আমাকে কখনো কোনো প্রকার পরিস্থিতিতে স্পর্শ করতে পারবেন না।”
অলির এই কথাটা শুনে আলভী অসহায় চোখে অলির দিকে তাকায়। অলি ভ্রু কুঁচকে বলে, “কী হলো? এভাবে তাকাচ্ছেন কেন? না পারলে বলে দিন।”
আলভী অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, “আর কী শর্ত আছে?”
“আমার লাস্ট শর্ত হলো, আপনি যদি মারা যান তাহলে আপনার স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তির মালিক বউ হিসেবে আমি হব।”
অলির কথা শুনে আলভী শান্ত চোখে অলির দিকে তাকিয়ে বলে, “আমি ম'রে গেলে তুমি সম্পত্তি দিয়ে কী করবে?”
“সেটা আপনার না জানলেও চলবে।”
“আচ্ছা, আমি সব শর্ত মেনে নিলাম।”
“মানলেই হবে না। আপনি কালকেই বিয়ের আগে একটা চুক্তিনামা বানিয়ে আনবেন। বিয়ের আগে সেটায় সই করবেন, তারপর বিয়ে হবে আমাদের।”
আলভী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে ওঠে, “৪ নম্বর শর্তটা বাদ দেওয়া যায় না?”
“আপনার তাহলে বিয়ে করতে হবে না, জেলের ভাত খাওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করুন গিয়ে।”
“এতো ভয় দিয়ো না। জানোই তো বেশি ভয় দেখালে ভয় ভেঙে যায়।”
“আমি ভয় দেখাচ্ছি না। লোকের কথার পরোয়া করি না আমি। দরকার হলে নিজে ম'রে গিয়ে আপনাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে যাব, তারপরও যেকোনো উপায়ে আপনাকে জেলের ভাত খাইয়েই ছাড়ব।”
আলভী অবাক চোখে অলির দিকে তাকায়। আলভীর চোখ দুটো রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। অলি চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকায়।
“এতো বেশি ঘৃণা করো আমাকে?”
“আপনার ভাবনার চেয়েও অধিক বেশি ঘৃণা করি আপনাকে।”
আলভী নিজের চুল টানতে লাগল। কিছুক্ষণ পর বলল, “ওকে, কালকে আমার বিয়ে, আমি অনেক এক্সাইটেড। এখন ঘুমাব কোথায় বলো?”
“আমাদের বাড়িতে দুটোই রুম, একটায় আমি থাকি আর একটায় আব্বু-আম্মু থাকেন। আপনি বরং আজকের রাতটা না ঘুমিয়েই কাটান। আপনি তো অনেক এক্সাইটেড, তাই না? এক্সাইটমেন্টের ঠেলায় ১ দিন না ঘুমালে খুব একটা সমস্যা হবে না।”
আলভী একটা শ্বাস ফেলে বলল, “আমি গতকাল রাতেও এক ফোঁটা ঘুমাইনি।”
“কেন কী হয়েছিল গতকাল রাতে? আচ্ছা আপনি কোথায় লুকিয়ে ছিলেন বলুন তো? আবার এতো সাহস জুগিয়ে আসলেনই বা কেন?”
“জেলের ভাত খেতে হবে তো, সেই ভয়েই এসেছি বুঝলে।”
“বাহ! আপনার মতো একজন খাম্বার মতো মানুষ জেলখানাকে এতো বেশি ভয় পায়?”
“হুম, তুমি যেমন ডাক্তারকে ভয় পাও আমিও তেমন জেলখানাকে ভয় পাই।”
অলি হেসে উঠল। আলভী মুগ্ধ নয়নে অলির দিকে তাকিয়ে রইল। আলভী মনে মনেই বলে, “তুমিহীনা আমার জীবন সত্যিই একটা জেলখানা হানিবি। আমি সেই জেলখানাকে ভীষণ ভয় পাই। কীভাবে এতো প্রয়োজনীয় হয়ে গেলে?”
আলভী একদৃষ্টিতে অলির দিকে তাকিয়ে আছে। অলির চেহারা দেখে তার ভীষণ মায়া লাগছে। এই বয়সে কতো কিছু ফেস করতে হচ্ছে তাকে, ভাবতেই নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে। সে যদি সেদিন কোনোভাবে নিজেকে কন্ট্রোল করে নিত, তাহলে এতোকিছু হতো না। আলভীকে তাকিয়ে থাকতে দেখে অলি ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? এভাবে তাকিয়ে থাকলে কিন্তু এটা নিয়েও একটা শর্ত দিয়ে দেব যে এক সেকেন্ডের বেশি তাকিয়ে থাকতে পারবেন না।”
অলির কথা শুনে আলভী অন্য দিকে তাকায়। এটা মেয়ে নাকি অন্যকিছু! আলভী অন্যদিকে তাকিয়েই গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে, “এভাবে পালিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। তোমার কোনো আইডিয়াই নেই যে তোমার সাথে কতো খারাপ কিছু হতে পারত।”
অলি একটা শ্বাস ফেলে বলল, “আমার সাথে ২ মাস আগেই সবচেয়ে খারাপ কিছু হয়ে গেছে। এখন আর ভয় পাওয়ার মতো কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমাকে ১ বার ধ/র্ষ/ন করা হোক বা ১০০ বার করা হোক, আমি তো ধ/র্ষি/তাই।”
আলভী জানে এসব সত্যি কথা কিন্তু অলি কি জানে এগুলো বারবার আলভীকে মনে করিয়ে দিয়ে সে বারবার তাকে মে'রে ফেলছে?
“অলি শোনো, আমি তো বারবার বলছি যে আমি ইচ্ছা করে কিছুই করিনি। সেদি...” আলভীকে আর কিছু বলতে না দিয়েই অলি বলে ওঠে, “সেদিন আপনার কী হয়েছিল সেসব জানতে আমি আগ্রহী নই। যতই অজুহাত দেন না কেন, দিন শেষে আপনি একজন ধ/র্ষ/কই থাকবেন। তাই অজুহাত না খুঁজে স্বীকার করে নিন।”
আলভীর অনেক কষ্ট লাগল কিন্তু অলি ঠিকই বলেছে।
“তাহলে আমার জেলে যাওয়াই উচিত। তুমি বরং কালকে আমার সাথে পুলিশের কাছে যাবে, আমি নিজে থেকেই সেখানে গিয়ে স্বীকার করে নেব।”
“এতো ভালোমানুষি দেখাতে হবে না। স্বীকার করার হলে আরও আগেই স্বীকার করে নিতেন, এতোদিন পালিয়ে থাকতেন না।”
আলভী অলির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি আগেই স্বীকার করে নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমিই তো তোমার বাবা-মায়ের ভয়ে কাউকে জানাতে চাওনি। এখন তো তারা জেনেই গেছে, তোমার তো আর কোনো ভয় নেই। এখন আমার স্বীকার করে নেওয়া উচিত।”
অলির মনে পড়ল যে আলভী ঠিকই বলছে। অলি কিছুক্ষণ ভেবে বলে ওঠে, “আমি সেদিনই সবাইকে জানিয়ে দিতাম কিন্তু আপনার মা আমাকে ভয় দেখিয়েছিল, বুঝেছেন?”
অলির কথা শুনে আলভী অবাক হয়ে যায়।
“আমার মা এই ব্যাপারে জানেন?”
“হুম, সেদিন দরজাটা তিনিই খুলে দিয়েছিলেন নইলে তো আমি বেরই হতে পারতাম না আর সেদিনই সবকিছু জানাজানি হয়ে যেত।”
অলি আর কিছুই বলল না। কিন্তু আলভী বাকিটাও বুঝতে পেরেছে। সে বুঝে গেছে তার মা অলিকে বিভিন্ন আজেবাজে কথা বলে ভয় দেখিয়েছিলেন।
“অলি, ইউ ডিজার্ভ বেটার। আন্টি আর আঙ্কেলের কথা শুনে তুমি অ্যাবো'রশন করে নাও।”
কথাটা শুনে অলি চমকে তাকাল। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আপনিও কি চান যে আমি অ্যাবো'রশন করে ফেলি?”
আলভীর গলা শুকিয়ে আসছে। ইদানীং যেন একটু বেশিই তার এরকম অনুভূতি হয়। আলভী মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে বলে, “আমি কী চাই বা না চাই সেটা যদিও ম্যাটার করে না। আমি শুধু জানি এটাই তোমার জন্য ভালো হবে। আর আমিও তোমার ভালো চাই।”
“আমার ভালো আমিই বুঝে নিতে পারব মিস্টার আলভী তাসনীম মির্জা। আপনাকে কষ্ট করে সেসব নিয়ে ভাবতে হবে না। আপনি শুধু আমার শর্তগুলো পূরণ করে আমাকে বিয়ে করুন। আপাতত এটাই আপনার শাস্তি।”
আলভী বিস্ময় নিয়ে অলির দিকে তাকাল। এই মেয়েটার বয়স কতো?
“অলি, তোমার বয়স কতো?”
“আপনার থেকে বেশি নয়। চিন্তা করবেন না।”
অলির শরীর বেশ ক্লান্ত লাগছে। প্রচুর ঘুম আসার কারণে হাই তুলছে। আলভী আবারও অলির দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা যেন একটা জীবন্ত আর্ট। এতো সুন্দর একটা মেয়ের সাথে সেরকম কিছু না হলেই কি হতো না? আলভী না হয় আরও ৪-৫ টা বছর অপেক্ষা করে নিত। অলির পরণে হলুদ রঙের টপস আর লাল রঙের স্কার্ট, সাথে লাল রঙের ওড়না। লম্বা সিল্কি চুলগুলো ডান সাইডে এনে বেণী করে রাখা। চুলগুলো উসকোখুসকো। তবুও তাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে, যাকে বলে ভয়ংকর সুন্দর।
আলভী অলিকে ড্রয়িংরুমের সোফায় এনে বসানোর পর অলি আর ওঠেনি। অলির মা সেখানেই ভাত দিয়ে গিয়েছিলেন। আলভী অলির দিকে তাকিয়ে আছে। অলির বসে থাকা অবস্থাতেই চোখ লেগে গেছে। মেয়েটা বেশি রাত অবধি জেগে থাকতে পারে না।
দিহান অলির রুমে বসে বসে ঊর্মিলার সাথে কথা বলছিল। মেয়েটা তাকে অলির ব্যাপারে বলছে।
“আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে আমার ভাই একটা বাচ্চা মেয়ের সাথে ওরকম কিছু করেছে। সেই সাথে মায়ের ওপরেও প্রচণ্ড রাগ উঠছে। ভাইয়া কি এই আকাম করেছে বলেই বিয়ে না করে পালিয়ে গেছে?”
দিহান চুপচাপ ঊর্মিলার কথা শুনছে। ঊর্মিলা বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনি আদৌ আমার কথা শুনছেন?”
“হুম শুনছি তো, বলতে থাকো।”
“আপনার কি আমাকে বাচাল বলে মনে হয় নাকি? যে আপনি চুপ করে থাকবেন আর আমি বলেই যাব। শুনুন, আপনি ছাড়াও আমার অনেক ফ্রেন্ড আছে, আমি চাইলেই তাদের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতে পারি। কিন্তু এটা পারিবারিক কথা বলে আমি ওদের সাথে শেয়ার করতে পারব না। আপনিই বলুন, নিজের ভাইয়ের আকামের কথা কি ফ্রেন্ডসদের কাছে বলা যায়?”
ঊর্মিলার কথা শুনে দিহান বলে ওঠে, “তুমি কি ইনডিরেক্টলি বলতে চাইছো যে আমি তোমার জাস্ট ফ্রেন্ড নই?”
ঊর্মিলা স্তব্ধ হয়ে গেল। সে উল্টোপাল্টা বলে ফেলেছে।
“না, আমি সেটা বলিনি। আপনি তো ভাইয়ারও বন্ধু, তাই আপনাকে বলাই যায়। নিজের ফ্রেন্ডের আকামের কথা জানলে সমস্যা নেই। আপনি তো আর অন্যদেরকে বলতে যাবেন না। যদিও আমার সন্দেহ আছে যে আপনি হয়তো এসব আগে থেকেই জানেন। আর ভাইয়ার সাথেও আপনার যোগাযোগ আছে। প্লিজ যদি আপনার যোগাযোগ থেকে থাকে তাহলে ওকে এই বিষয়ে জানাবেন। বাড়িতে কিন্তু এই ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ঝামেলা হচ্ছে। ঝামেলা বললে কম, স্নায়ুযুদ্ধ চলছে।”
“তোমার কী মনে হয় তোমার ভাই সেরকম কিছু করতে পারে?”
“আমি জানি না। ছেলেমানুষ সব করতে পারে। তাছাড়া আমি দেখেছিলাম অলি ভাইয়াকে দেখে ভয় পাচ্ছিল। আর ভাইয়ার গালে মেহেন্দি লেগেছিল, পরে আমি লক্ষ্য করেছিলাম যে অলির হাতের মেহেন্দিও লেপ্টে ছিল। আমি সিওর যদি কিছু হয়েই থাকে তাহলে মেহেন্দির রাতেই হয়েছিল। যদিও আমি এখনো মানতেই পারছি না যে আমার ভাইয়া অলির সাথে সেরকম কিছু করেছে।”
“হুম দেখি কী করা যায়। তুমি চিন্তা কোরো না, যা হবে ভালোই হবে।”
আসমা বানু আর লিয়াকত হোসাইন নিজেদের রুমে বসে কথা বলছেন।
“আচ্ছা, ছেলেটা ওর মায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে অলিকে বিয়ে করতে রাজি হলো কেন?” আসমা বানুর কথার উত্তরে লিয়াকত হোসাইন বলেন, “হয়তো জেল খাটতে হবে সেই ভয়েই বিয়ে করতে চাইছে। বলছি কী, মেয়েটাকে ওই বাড়িতে পাঠানো কি ঠিক হবে?”
আসমা বানু বললেন, “আমি মেয়েকে ওই বাড়িতে পাঠাব না বুঝলে। বিয়ের পরেও অলি এই বাড়িতেই আমাদের সাথে থাকবে।”
“আলভী কি এতে রাজি হবে?”
“দেখি কী করা যায়।”
আসমা বানু আর লিয়াকত হোসাইন ড্রয়িংরুমে এসে দেখলেন অলি সোফাতেই ঘুমিয়ে আছে আর আলভী একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। লিয়াকত হোসাইন একটু কেশে উঠলেন।
আলভী থতমত খেয়ে গেল।
“আঙ্কেল, আপনারা ঘুমাননি?”
লিয়াকত হোসাইন অন্যপাশের সোফায় বসে বললেন, “না ঘুমাইনি। আসলে আপনার মা গতকাল রাতে আমাদের সাথে যেই ব্যবহার করলেন তারপর অলিকে ওই বাড়িতে যেতে দিতে আমাদের মন সায় দেবে না।”
আলভী একটা শ্বাস ফেলে বলে, “আঙ্কেল, প্রথমত আমি বয়সে আপনার থেকে ছোট। আপনি আমাকে তুমি বলে সম্বোধন করতে পারেন। দয়া করে আপনি বলবেন না। আর রইল অলির থাকার বিষয়টা; সেটা অলির ওপর, ও যেখানে থাকতে চাইবে সেখানেই থাকবে।”
আসমা বানু বললেন, “আমি বলি কী, বিয়ের পর ও আমাদের সাথেই থাকুক। ও তো বাচ্চা মেয়ে, তার ওপর আবার প্রেগন্যান্ট। নিজের খেয়ালটাই তো রাখতে পারে না, এই অবস্থায় নতুন জায়গায় গেলে ও মানিয়ে নিতে পারবে না।”
কথার আওয়াজে অলির ঘুম ভেঙে গেল। অলি চোখ মেলে আশেপাশে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসল। ঘুম-ঘুম চোখেই বলে, “আমি শ্বশুরবাড়িতে গিয়েই থাকব। আমি এখনই আমার শাশুড়ি মাকে মিস করছি।”
অলির কথা শুনে আলভী চোখ ছোট ছোট করে অলির দিকে তাকায়। অলি চোখ কচলাচ্ছে আর হাই তুলছে।
“অলি পাগলামি করিস না। সেখানে গিয়ে শুধু শুধু ঝামেলা করার কোনো মানেই হয় না। তুই যেহেতু বাচ্চাটা রাখতেই চাইছিস সেহেতু আমরা শুধু বাচ্চাটার জন্য নাম-পরিচয় চাই। আলভী তোকে বিয়ে করবে সেটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আর কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই।”
অলির ঘুম-ঘুম ভাবটা কেটে গেছে। সে স্বাভাবিক স্বরেই বলে ওঠে, “মা, আমি ওই বাড়িতে গিয়েই থাকব। কারণ বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই মেয়েদের নিজের বাড়ি। আমি মাঝে মাঝে বেড়াতে আসব এখানে, তুমি চিন্তা কোরো না।”
আলভী অলির দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে ওঠে,
“তুমি চাইলে আমি তোমার জন্য ফ্ল্যাট ভাড়া করে দিতে পারি। ২ জন সার্ভেন্ট রেখে দেব, তোমার থাকতে কোনো প্রবলেম হবে না। সত্যি বলতে আমিও চাই না যে তুমি ওই বাড়িতে গিয়ে থাকো।”
“আপনি কি কোনোভাবে আমাকে আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চাইছেন নাকি? ওই বাড়িতে থাকাটা আমার অধিকার। যদি আমাকে ওই বাড়িতে নিয়ে যেতে না পারেন তাহলে বিয়ে করতে হবে না।”
আলভী মাথায় হাত দিয়ে একটা বিরক্তির শ্বাস ফেলল। অলি ওপরে ওপরে ম্যাচিউর সাজার চেষ্টা করলেও ভেতরে ভেতরে একদম বাচ্চা। নিজের কিসে ভালো হবে সেটাও বোঝে না।
“আমি আগেই বলেছি, তুমি যেখানে থাকতে চাইবে সেখানেই রাখব।”
“তাহলে আর কী! আমি কালকে ওই বাড়িতে যাচ্ছি আর এটাই ফাইনাল।”
আসমা বানু আর লিয়াকত হোসাইন একটা শ্বাস ফেলে আলভীর উদ্দেশ্যে বললেন, “আলভী, তুমি তোমার বন্ধুকে নিয়ে অলির রুমে শোও। অলি, তুই আমার সাথে এই রুমে শো। তোর বাবা ড্রয়িংরুমেই শুয়ে পড়বে।”
আলভী ভদ্রভাবে বলল, “আমি আর দিহান এখানে ড্রয়িংরুমেই ঘুমাতে পারব। আপনাদের কষ্ট করতে হবে না আন্টি। আপনারা গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন।”
আসমা বানু কিছু বলতে গেলে অলি বলে, “মা, উনি যেহেতু এখানেই ঘুমাতে চাইছেন তাহলে ঘুমান। আমরা ঘুমিয়ে পড়ি চলো।”
“এটা কেমন কথা? ওরা এখানে ঘুমাবে কেন? যাও তোমরা অলির রুমে গিয়ে ঘুমাও।” লিয়াকত হোসাইনের কথার ওপরে অলি আর কিছুই বলতে পারল না। আলভীও মাথা নেড়ে অলির রুমে চলে গেল। গিয়ে দেখল দিহান এখনো ফোনে কথা বলছে। আলভীকে আসতে দেখে দিহান কল কেটে দেয়।
এদিকে আসমা বানু অলিকে ধরে ধরে রুমে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেয়। তারপর নিজেও অলির পাশে শুয়ে পড়ে। অলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, “শুধু শুধু কেন জেদ করছিস? আলভীর যেহেতু সমস্যা নেই তাহলে এখানেই তো থাকতে পারতি। তাছাড়া তুই আমাকে ছাড়া ওই বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারবি?”
অলি মাকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কেঁদে ওঠে, মনে মনেই বলে, “তোমাদের অপমানের বদলা নেওয়ার জন্য আর আমার বাবুর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আমি ওনাকে বিয়ে করব। তাই আমাকে ওই বাড়িতে যেতেই হবে মা। আমি ওনার মায়ের দম্ভ ভাঙতে চাই। বোঝাতে চাই যে আমি আসলে কোন ধরনের মেয়ে।”
আসমা বানু অলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
“কী হলো বল, তুই আমাকে ছাড়া থাকতে পারবি তো?”
অলি কান্নাগুলো গিলে অস্ফুটস্বরে বলে ওঠে, “আমাকে পারতেই হবে মা। সব মেয়েকেই পারতে হয়। তুমিও তো পেরেছিলে, আমিও পারব দেখো।”
আসমা বানুর চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে জানত এই দিনটা আসবে কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি আসবে সেটা সে ভাবেওনি।
“তুই কেন এতো তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেলি অলি? আমি ভাবতেই পারছি না কালকে তুই অন্য একজনের বউ হয়ে যাবি। তারপর আমাদেরকে ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে পাড়ি জমাবি।”
“কান্না কোরো না মা, মেয়েদের জীবনটাই এমন। তবে আমি প্রতি সপ্তাহে আসব তোমার কাছে। তুমি কেঁদো না প্লিজ।”
আলভী ঘুমাতে পারছে না, শুধু এপাশ-ওপাশ করছে। পাশেই দিহান বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। আলভীর একা ঘুমানোর অভ্যাস, বেড শেয়ার করলে সে ঘুমাতে পারে না। তার ওপর বাড়ির চারপাশ থেকে আসা গোলাপ ফুলের গন্ধে তার চোখ-মুখ জ্বলছে। চোখ-নাক থেকে সমানে পানি পড়ছে। সেই সাথে শরীরও চুলকাচ্ছে।
“এতো মহা মুশকিল! আজকেও ঘুমাতে পারব না দেখছি। হাহ, এরকমই হওয়া উচিত। কে বলেছিল একটা bee কে ভালোবাসতে! তাও আবার ব্যাপারটা ভালোবাসা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নেই।”
চলবে,,,