#১৫_বছর_বয়সী_মা (২০)
#সোফিয়া_সাফা
বউভাতের আয়োজন শেষ হতে হতে সন্ধ্যার শেষ আলোটুকুও নিভে গিয়েছে। গাঢ় নীল আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে রাতের শান্ত ছায়া। মির্জা ভিলার চত্বরে তখন ধীরে ধীরে নেমে এসেছে নিরবতা। আলো ঝলমলে দিনের উৎসবমুখরতা এখন শুধু অতীতের প্রতিচ্ছবি। সবাই একেবারে রাতের খাবার খেয়ে নিজেদের রুমে চলে গেছে। কিছু কিছু আত্মীয়রা আগামীকাল সকালেই নিজেদের বাসস্থানে ফিরে যাবেন। বাকিরা পরশুদিন নাগাত চলে যাবেন বলেই ঠিক করে রেখেছেন। ঊর্মিলা কিছুক্ষণ আগেই গায়ে থাকা গাঢ় পিংক রঙের শাড়িটি খুলে হালকা আরামদায়ক পোশাক পরে নিয়ে ক্লান্ত চোখে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছিলো, ঠিক তখনই তার ফোনে একটি মেসেজ আসে। ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই চোখে ভেসে ওঠে,
"আমি তোমাদের বাড়ির পার্কিং লটে অপেক্ষা করছি। একবার একটু এসো প্লিজ।"
প্রেরক: দিহান।
মেসেজটা পড়ে ঊর্মিলা দ্বিধা নিয়েই উঠে দাঁড়ায়। ঘর অন্ধকার, আলো জ্বালেনি সে। মাথায় একটা ওড়না জড়িয়ে নীরবে রুমের দরজা ঠেলেই বেরিয়ে পড়ে। আজ তিশার স্বামী আসায় ইশা একাই অলির সাথে শুয়েছে। নিঃশব্দ পায়ে ঊর্মিলা অন্ধকার ড্রইংরুম পেরিয়ে মেইন দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসে। বাড়ির ভেতরে আলো জ্বললেও বাইরে তখন এক নিস্তব্ধ নৈঃশব্দ্য—শুধু দূরে কোথাও কুকুরের হালকা ঘেউ ঘেউ শোনা যাচ্ছে। ঊর্মিলা পার্কিং লটে এসে দেখে, দিহান গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ফোন টিপছে। মাথা নিচু, চোখ ফোনের স্ক্রিনে নিবদ্ধ। আবছা আলোয় তার অবয়বটা যেনো খানিকটা অন্যরকম ঠেকলো ঊর্মিলার চোখে...
"আপনি কিভাবে ভাবলেন যে এতো রাতে আপনার ম্যাসেজ পেয়েই আমি ছুটে চলে আসবো? আ'ম ইউর জাস্ট ফ্রেন্ড। এতোকিছু আশা করবেন না আমার থেকে।"
ঊর্মিলার কণ্ঠে ছিল ঠান্ডা প্রতিবাদ, কিন্তু তার চোখের গভীরে ফুটে উঠছিল দ্বিধা। দিহান হালকা হেসে উঠলো, যেনো ঊর্মিলার এই বিরূপ স্বরটাও তার নিকট পরিচিত।
"হাসবেন না, যান এখান থেকে।"
ঊর্মিলার গলার স্বর কঠিন শোনালেও দিহান জানে, তাকে একা দেখে ঊর্মিলার বুকের ভেতরে একধরনের অস্থিরতা ঠিকই কাজ করছে।
"তুমি বলতে চাইছো যে আমি তোমার অপেক্ষা করে ভুল করিনি, তাই তো?"
ঊর্মিলা নীরব থাকে। চোখ নামিয়ে নেয় পাথরের পেভমেন্টে। মুহূর্ত খানেক পর ধীরে বলে ওঠে—
"কি বলবেন তারাতাড়ি বলুন।"
"কিছুই বলবোনা। তোমাকে দেখতে ইচ্ছা করলো তাই আসতে বলেছি।"
ঊর্মিলা তাকিয়ে দেখে, দিহানের ঠোঁটের কোণে একটুকরো হালকা হাসি। লোকটা অকারণেই হাসে, তবে প্রয়োজনে হাসতে যেনো কষ্ট হয়।
"আমাকে দেখতে ইচ্ছা করলো কেনো আপনার? বেশ তো ছিলেন ২দিন। এখন এতো আলগা দরদ দেখাচ্ছেন কেনো?"
দিহান যথারীতি দূরত্ব বজায় রেখেই দাঁড়িয়ে থাকে।
"আমি কিছুক্ষণ আগে কল দিয়েছিলাম, রিসিভ করোনি কেনো?"
ঊর্মিলার মুখের অভিব্যক্তি মুহূর্তেই বদলে গেলো। ভেতরে জমে থাকা অপ্রকাশিত অপেক্ষাগুলো যেন হঠাৎ বিস্ফোরিত হলো। ভেতরে থাকা রাগ যেনো দপ করে জ্বলে উঠলো,
"রিসিভ করবোনা, কল দিবেন না আমাকে।"
দিহান ধীর ভঙ্গিতে ফোনটা পকেটে রেখে বুকের উপর হাত জড়ো করে দাড়ালো, চোখে নরম অথচ অদম্য এক প্রশ্ন—
"রেগে যাচ্ছো কেনো, সেটা তো বলবে?"
"আমি মোটেও রাগ করছিনা। আপনি ছাড়াও আমার অনেক গুলো ফ্রেন্ডস আছে। তাদের সাথে কথা বলেই আমার টাইম পাস হয়ে যাবে।"
"আমি তোমাকে আমার সাথে টাইম পাস করতে বলছিনা ঊর্মি।"
"ঊর্মি বলে ডাকবেন না আমাকে। এখন থেকে আমরা আর বন্ধু নই। ঊর্মিলা বলে ডাকবেন।"
ঊর্মিলা সামনে ফিরে হাঁটতে শুরু করে। তার চিবুক নিচু, পায়ের ভঙ্গিমায় দৃঢ়তা। কিন্তু সে কিছুদূর যেতেই দিহান তাড়াতাড়ি কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
"আমিও তোমার বন্ধু হয়ে থাকতে চাইনা, ঊর্মিলা।"
"তাহলে?"
দিহান এক মুহূর্তের জন্য কোনো শব্দ খুঁজে পায়না। নিঃশ্বাস টেনে সাহস জড়ো করে, হঠাৎ দ্বিধা ভেদ করেই বলে ফেলে—
"আই লাভ ইউ ঊর্মিলা, উইল ইউ বি মাই লাইফলাইন?"
মুহূর্তেই সময় যেন থেমে যায়। বাতাস থমকে যায় চারপাশে। ঊর্মিলার মুখে অনড় বিস্ময়ের ছায়া। তার পুরো শরীর জমে আসে। ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করে অস্ফুটস্বরে শুধায়—
"কি বললেন?"
দিহান এবারও একচিলতে হাসি নিয়ে বলে—
"আই লাভ ইউ।"
ঊর্মিলা দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চুপ, মুখে একরাশ বিষ্ময়। তার চোখে মেঘ জমে, ঠোঁটে কোনো উত্তর আসেনা।
"উত্তর দিবেনা?"
ঊর্মিলা ধীরে মাথা নাড়ে—না। তারপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না। দিহানকে পাশ কাটিয়ে দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়। দিহান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শেষবারের মতো মির্জা ভিলার দিকে তাকায়। তারপর গাড়িতে উঠে বসে, এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। গাড়ির হেডলাইটে ঝিলমিল করা ধুলোবালি ঘিরে ধরে তার যাত্রার পথকে। রাত গভীর হয়ে আসে,
*
অলি বিছানায় শুয়ে ছিলো। জানালার কাচের ওপারে রাত গভীর হয়ে এসেছে, পাশেই ইশা কারো সঙ্গে নিম্নকন্ঠে ফোনে কথা বলছে যা অলির ঘুমে বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল। অলির চোখে তখনও ঘুম জমে ছিল, কিন্তু শান্তিতে ঘুমাতে পারছিল না। সে বিরক্ত ভঙ্গিতে, আধো কণ্ঠে বলে ওঠে,
"আপু সামির ভাইয়া তো বিকেলে এসেছেই। তুমি বরং ফোনে কথা না বলে সামনা-সামনি গিয়ে কথা বলো।"
ইশা নরম স্বরে বিরক্তি ঝেড়ে দিয়ে উত্তর দেয়,
"বনু তুই ঘুমা না। আমি তো আস্তে আস্তেই কথা বলছি। ফোনে যতটা সহজ ভাবে কথা বলা যায় সামনা-সামনি সেভাবে কথা বলা যায়না।"
অলি আর কোনো কথা না বলে মুখ ঘুরিয়ে চোখজোড়া বন্ধ করে নেয়। তার চোখে ঘুম ভর করলেও কানের মধ্যে ইশার কণ্ঠ একটা শোরগোল তুলছে, কিছুতেই নিস্তার মিলছেনা। ঠিক তখনই হঠাৎ তার পাশে থাকা বালিশের নিচে রাখা ফোনটা জোরে বেজে ওঠে।
"আরে আপু ফোনটা রিসিভ করো।" – অলির গলায় বিরক্তির ঝাঁজ।
ইশা তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে নিজের ফোনটা চেপে ধরে, ফিসফিস করে বলে—
"আমার না, তোর ফোন বাজছে।"
এ কথা শুনে অলি তড়িঘড়ি করে উঠে বসে। তার চোখ ছলছল করছে ঘুমে, কিন্তু মনের ভিতর চিন্তার ঢেউ। মা-বাবা ছাড়া তার ফোন নম্বর তো আর কেউ জানেনা। তাহলে তারাই কি কল দিয়েছে? সে দ্রুত বালিশের পাশে রাখা ফোনটা হাতে তুলে নেয়। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নম্বরটা দেখে অচেনা উত্তেজনায় গলা শুকিয়ে আসে তার।
"এটা তো ওনার নম্বর! উনি এত রাতে আমাকে কেনো কল দিচ্ছেন?"
অলি এখনো দ্বিধায়, রিসিভ করবে কি না—ততক্ষণে কল কেটে যায়। অন্যদিকে, অলি কল রিসিভ না করায় আলভীর মনটা খারাপ হয়ে যায়। একধরনের হতাশা আর অধৈর্যের তাড়নায় সে আবারও অলির নম্বর ডায়াল করলো।
অলি ফোনটা রাখতেই যাচ্ছিল, তার আগেই আবারও কল আসে। এবার আর দেরি না করে অলি কলটা রিসিভ করে ফোনটা কানে লাগিয়ে ছোট্ট করে বলে,
"হ্যালো।"
তার ঘুমভাঙা কণ্ঠ শুনেই আলভীর নিদ্রাহীন চোখে যেন আরও রাত জেগে ওঠে। অন্য প্রান্ত থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে অলি ভ্রু কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকায়। আবার ফোনটা কানে লাগিয়ে বলে,
"হ্যালো? কল দিয়ে ঘুমিয়ে গেছেন নাকি?"
আলভী কী বলবে বুঝতে পারছে না। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর, শান্ত গলায় বলে ওঠে,
"হানিবি, আমি ঘুমাতে পারছিনা।"
'হানিবি' ডাকটা শুনে অলির কপালে ভাঁজ পড়ে। একটু বিরক্তি এলেও পরের কথাটা শুনে সে ভাবনায় পড়ে যায়—
"কেনো, আপনার কি শরীর খারাপ?"
আলভীর কণ্ঠে তখন হালকা ক্লান্তির সুর,
"না, শরীর খারাপ লাগলে মেডিসিন খেয়ে নিতাম। আমার তো মন খারাপ।"
অলি একটু থেমে, নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
"কেনো? কী হয়েছে আপনার?"
"জানিনা..." আলভী একটুখানি থেমে যায়।
তারপর ধীর কণ্ঠে বলে ওঠে,
"তুমি একবার আসবে আমার রুমে?"
অলি থমকে যায়। কথাটার মধ্যে যেন একটা ভিন্ন রকম আবেদন ছিলো, যা তাকে দ্বিধায় ফেলে দেয়।
"আমি গিয়ে কি করবো?"
আলভী আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, যেন নিজের আবেগ সামলাতে ব্যস্ত সে। তারপর এক নিঃশ্বাসে বলে ওঠে,
"আচ্ছা তুমি ঘুমাও, রাখছি।"
অলি কিছু বলার আগেই কল কেটে যায়। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা পাশে রেখে দেয়। ইশার কথাবার্তা ইতিমধ্যেই শেষ। অলি আবার শুয়ে পড়তেই ইশা জানতে চায়,
"কে কল দিয়েছিলো?"
অলি শান্তভাবে উত্তর দেয়,
"তোমার ভাই।"
আলভী কল দিয়েছে শুনে ইশা খুশিমনে শুধায়,
"ভাইয়া এত রাতে কল দিয়েছিলো কেনো?"
অলি মুখ ভার করে বললো,
"বললো তার নাকি মন খারাপ। আমি জিজ্ঞেস করলাম 'কেনো?' সে উত্তরে বললো 'জানিনা, তুমি একটু আসবে আমার রুমে?' আমি জিজ্ঞেস করলাম 'আমি কি করতে যাবো?'..."
অলির কথার মাঝেই ইশা হো হো করে হেসে ওঠে।
অলি বিরক্ত হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে,
"হাসছো কেনো আপু? উনি ডাক্তার মানুষ—শরীর বা মন খারাপ লাগলে নিজের চিকিৎসা নিজেই তো করে নিতে পারে, তাই না? আমাকে যেতে বলছে কেনো?"
ইশা হাসি থামিয়ে একসময় গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে,
"মন খারাপের কোনো মেডিসিন নেইরে অলি। ভাইয়ার হয়তো তোকে প্রয়োজন। তোর উচিৎ তার কাছে যাওয়া।"
ইশার কথায় অলির গলার রন্ধ্রে যেন কিছু একটা আটকে গেলো। মুহূর্তেই মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আসে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই অন্ধকার রাতটা—যখন আলভীর রুমে আটকে পড়েছিল সে। সেই স্মৃতি শরীরের প্রতিটি কোষে ভয় ছড়িয়ে দেয়। ঠোঁট কেঁপে ওঠে। কয়েকবার ঢোক গিলে সে বলল,
"আমি তার কাছে যেতে পারবোনা আপু। তাকে দেখলে আমার ভয় করে।"
অলির ভয়ানক বিব্রত মুখ দেখে ইশা খানিক অবাক হলেও, তার বয়সের কথা মাথায় রেখে এবার কণ্ঠস্বরটা একটু নরম করল,
"আমি এবার বুঝতে পারলাম যে ভাইয়া তোকে আলাদা রুমে কেনো রেখেছে। প্রবলেমটা ভাইয়ার নয় প্রবলেমটা তোর। তুই-ই হয়তো আলাদা রুমে থাকতে চেয়েছিস তাইনা?"
অলি মাথা নিচু করে ধীরগতিতে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে আসে। ইশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
"বাচ্চামো করিস না অলি। আমাদের নানুর যখন ১২ বছর বয়স ছিলো তখন নানাভাইয়ের সাথে তার বিয়ে হয়েছিলো। তার দ্বিতীয়বার পিরিয়ড হওয়ার আগেই সে কন্সিভ করেছিলো। সে কি নিজেকে মানিয়ে নেয়নি? তোরও নিজেকে মানিয়ে নেওয়া উচিৎ।"
অলির বুকের ভেতর কেমন জানি একটা অস্বস্তির স্রোত বইতে থাকে। তবু ইশা থামে না,
"যদিও এভি ভাই সেরকম নয়। কিন্তু পরিশেষে সেও একজন পুরুষ মানুষ। আর পুরুষ জাতি বউকে কাছে না পেলে বাইরে নজর দেবে সেটাই স্বাভাবিক।"
কথাটা শুনে অলি চমকে তাকায়। তার চোখেমুখে রাগ ও হতাশার ছাপ স্পষ্ট। ইশার কথাগুলো যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো। আলভীর সম্পর্কে মনে আবার আজেবাজে ভাবনা আসে। ঠোঁট চেপে, নিজমনেই বলে ওঠে—
"তোমরা ওনাকে যতটা মহান মনে করো, উনি ততোটাই অসভ্য আর খারাপ লোক। আমি তার কাছে যাই বা না যাই উনি তো বাইরে নজর দেবেই। তাই শুধু শুধু হরিণ হয়ে বাঘের গুহায় যাওয়ার কোনো মানেই হয় না। নিশ্চয়ই খারাপ কোনো উদ্দেশ্যেই আমাকে নিজের রুমে ডাকছেন উনি।"
"কি ভাবছিস?"
অলি নাবোধক মাথা নাড়ায়।
ইশা আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
"তুই প্রেগন্যান্ট অলি। ভাইয়া একজন ডক্টর। আপাতত তোর ভয় পাওয়ার কারণ দেখছিনা। তুই নিশ্চিন্ত মনে ভাইয়ার রুমে যা।"
"নাহহহহহ!"
অলি হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, যার তীব্রতায় ইশা খানিকটা চমকে যায়।
"আমি ওনার রুমে কিছুতেই যাবোনা।"
অলির গলায় দারুণ রাগ আর ভয়।
"জেদ করছিস কেনো? তোর এসব বাচ্চামো শুধুমাত্র এভি ভাই বলেই সহ্য করছে, অন্য কেউ হলে এতোক্ষণে তুলে নিয়ে যেতো।"
অলি দুহাতে নিজের কানজোড়া চেপে ধরে, মৃদুস্বরে বলে ওঠে।
"উনি তেমনটা করতে পারবেনা আপু।"
ইশার মুখটা এবার মলিন হয়ে আসে। হালকা কণ্ঠে বলে,
"বেচারা ভাইটার জন্য কষ্ট লাগছে। সেই সাথে তোর উপর ভীষণ রাগ উঠছে। আরে ওর রুমে গেলে ও কি তোকে খেয়ে ফেলবে?"
ইশার কথাগুলো অলি কান থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইলেও প্রতিটি শব্দ যেন তার মনের ভেতর খচখচ করে বাজছে। অলি এবার কান থেকে হাত সরিয়ে রাগী কণ্ঠে বলে ওঠে,
"আপু ওনার জন্য আজকে আমার এই অবস্থা। আর তুমি প্রশ্ন করছো আমাকে খেয়ে ফেলবে কিনা?"
অলির কথায় ইশা যেন কিছুটা স্তব্ধ হয়ে যায়।
"এটা কোনো কথা? তোকে প্রেগন্যান্ট বানিয়ে দিয়েছে বলে তুই সারাজীবনে আর ভাইয়ার কাছে যাবিনা?"
অলি মাথা নেড়ে স্পষ্টভাবে বলে,
"হ্যাঁ ঠিক ধরেছো।"
ইশা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,
"তাহলে আর কি, ভাইয়ার জন্য আর একটা ম্যাচিউর টাইপের মেয়ে খুজতে হবে দেখছি।"
"মানে?"
অলির প্রশ্নে ইশা শুয়ে পড়তে পড়তে বলে ওঠে,
"মানে আবার কি? তুই ভাইয়ার কাছে না গেলে ভাইয়াকে আবার বিয়ে করাতে হবেনা?"
অলি এবার শান্ত গলায় কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলে,
"উনি আর বিয়ে করতে পারবেনা।"
"হুহ দেখা যাবে।"
ইশা চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ে।
রুমটা খানিকটা নীরব হয়ে আসে। অলি কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে বসে থেকে একসময় আস্তে করে অন্যপাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। বাইরে তখন গভীর রাত। জানালার ওপারে নিঃশব্দে ঝরে পড়ছে পুকুরপাড়ের পাতাগুলো, আর অলির বুকের ভেতরেও নেমে এসেছে কুয়াশাভেজা এক অস্থিরতা।
দুই দিন পর…
সময় নিঃশব্দে গড়িয়ে গেছে। আজ সকালেই আলভীর মামা-খালার পরিবারের সদস্যরা মির্জা ভিলা ছেড়ে চলে যাবে। সকাল গড়িয়ে দশটা বাজতেই, একে একে সকলে লাগেজ টেনে, ব্যস্ত পায়ে ড্রইংরুমে এসে জড়ো হয়। আলভী আজকে খুব সকালেই হসপিটালে চলে গেছে। সবাই চলে যাবে ভাবতেই অলির মন খারাপ হয়ে যায়। বিশেষ করে ইশা চলে যাচ্ছে সেই জন্য সে বেশি চিন্তিত। একা একা ঘুমাতে হবে ভাবতেই তার গলা শুকিয়ে আসছে। ইশা আর তিশা শেষবারের মতো অলিকে জড়িয়ে ধরে তারপর সবার থেকে বিদায় নিয়ে বাকিদের সাথে বেরিয়ে যায়। ঊর্মিলা, রূপসা আর ইয়াদ সকাল ৮ টা বাজেই ভার্সিটিতে চলে গেছে। বাড়ি যেন হঠাৎ করেই ফাঁকা হয়ে গেলো। চেনা শব্দের ভিড়ে যে কোলাহল ছিল, আজ তার বদলে আছে একঘেয়ে নীরবতা।
---
বিকেলের রোদ একটানা হেলে পড়ছে দাদুমনির ঘরের জানালায়। অলি তার পাশেই বসে আছে, মুখে অল্প কাঁচা হাসি। সামনে একটা ছোট্ট বাটিতে নিজহাতে বানানো পান এগিয়ে দেয় দাদুমনির দিকে।
"দাদুমনি এটা খেয়ে বলো কেমন হয়েছে?"
দাদুমনি কাঁপা হাতে পানটা মুখে নিয়ে হাসিমুখে বলে ওঠে—
"অনেক ভালা হয়েছে নাতবউ। তুমি যেমন মিষ্টি দেখতে, তোমার হাতের পানখানাও বহুত মিষ্টি খেতে।"
অলি চোখ নামিয়ে মৃদু হেসে বলে,
"তাহলে এখন একটা গল্প শোনাও।"
বৃদ্ধা দাদুমনির কণ্ঠে একটা মায়ামাখা সুর ভেসে আসে ঘরজুড়ে, সে স্মৃতির ভাঁজ থেকে গল্প টেনে এনে অলিকে শোনাচ্ছে আর অলিও মুগ্ধ হয়ে শুনছে। হঠাৎ করেই সেই শান্ত দৃশ্য ভেঙে দিয়ে রূপসা রুমে প্রবেশ করে। রূপসার চোখে ঈর্ষার ছায়া। ঠোঁটে একরকম তাচ্ছিল্যভরা হাসি।
"দাদুমনি এসো চুল বেধে দেই"
দাদুমনি একবার রূপসার দিকে তাকিয়ে বললো,
"নাতবউ চুল বেধে দিয়েছে। রূপ তুই এখানে এসে বোস।"
কথাটা শুনে রূপসার মুখের হাসি মুহূর্তেই হিম হয়ে যায়। মুখে যদিও সংযত হাসি ফুটিয়ে বলে ওঠে,
"তোমার নাতবউ দুদিন আগে এসেই আমার জায়গা দখল করে নিয়েছে দেখছি।"
অলির মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। সে ধীরস্বরে জবাব দেয়,
"আমি আপনার জায়গা নেইনি আপু। এই বাড়ির বউ হিসেবে কি আমি দাদুমনির কাজ করে দিতে পারিনা? আপনি এভাবে বলছেন কেনো?"
রূপসা কোনো উত্তর দেয় না, শুধু অগ্নিচোখে অলির দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠিক তখনই ভেসে আসে গম্ভীর, স্পষ্ট একটা কণ্ঠস্বর—
"অলিইইইই"
ডাকটা শুনে অলিসহ বাকিরা দরজার দিকে তাকালো আলভী অলিকে ডাকতে ডাকতে এদিকেই আসছে।
"দাদুমনি, অলি কি এইরুমে আছে?"
কথাটা শুনে দাদুমনি বললো,
"হ্যাঁ দাদুভাই তোমার বউ এখানেই আছে। অতো অধৈর্য্য হয়োনা"
আলভী রুমে ঢুকে কোনোদিকে না তাকিয়ে অলির উদ্দেশ্যে বললো,
"অলি চলো"
"কোথায় যাবো? আপনি কখন আসলেন?"
"আমি কিছুক্ষণ আগেই এসেছি। তোমার রুমে তুমি ছিলেনা তাই খুজতে খুজতে এখানে চলে আসলাম। চেক-আপের জন্য তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি। রেডি হয়ে নেও"
অলি একটা ঢোক গিলে বললো,
"আমি হাসপাতালে যাবোনা"
আলভী অলির দিকে এগিয়ে গেলো। রূপসা একদৃষ্টিতে আলভীর দিকে তাকিয়ে আছে। আলভী যেনো রূপসাকে দেখেইনি। আগে যাও তার সাথে দু একটা কথা বলতো কিন্তু অলি এইবাড়িতে আসার পর থেকে আলভী যেনো তাকে চোখেই দেখেনা। আলভী অলির সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
"তুমি বাবুকে দেখতে চাওনা?"
অলি চুপ করে রইলো। আলভী শান্তকন্ঠে বলে,
"ভয় পেয়োনা আল্ট্রাসাউন্ড করাবো শুধু, রেডি হয়ে নেও কুইক"
অলি ঠোঁট চেপে নিচের দিকেই তাকিয়ে রইলো। দাদুমনি স্নেহমাখা কন্ঠে বললো,
"দাদুভাইয়ের সাথে যাও নাতবউ। স্বামী সাথে থাকলে ভয় কিসের?"
অলি মাথা নেড়ে উঠে দাড়ালো। বাধ্য মেয়ের মতো রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। এমনিতেও বাবুর জন্য সে সবকিছুই করতে পারবে। আলভী ড্রইংরুমে বসে কারো সাথে ফোনে কথা বলছিলো। অলি রেডি হয়ে আসতেই আলভী অলিকে উপরনিচ পরখ করে নিলো। অলি বোরকা পড়েছে মাথায় হিজাব, হাতে একটা ছোট্ট ব্যাগ। আলভীর চাহনি দেখে অলি খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে ব্যস্ত হাতে নিজের হিজাব ঠিক করতে লাগলো। আলভী একটা শ্বাস ফেলে অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,
"ওড়না ঠিকঠাকই আছে। লেটস গো"
আলভী হাটা ধরলো। অলি তাকে অনুসরণ করে বেরিয়ে গেলো। আলভী সেইফলি কার ড্রাইভ করে হাসপাতালের সামনে গাড়ি পার্ক করলো। অলি বেশ বিরক্ত হয়েছে আলভী অনেক আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়েছে। সে বেশ কয়েকবার স্পিড বাড়াতে বলেছিলো কিন্তু বিনিময়ে আলভী শুধু শীতল চাহনি নিক্ষেপ করেছে।
হাসপাতালের চত্বরে গাড়ি থেমে যায়,
"নামো"
আলভীর কন্ঠ শুনে অলি তাকাতেই দেখতে পেলো আলভী কার ডোর ওপেন করে দাঁড়িয়ে আছে। অলি ধীরপায়ে গাড়ি থেকে নেমে দাড়ালো। আলভী একবার অলির দিকে তাকিয়ে হাটা ধরলো। পথিমধ্যে বেশ কয়েকজন পরিচিত চিকিৎসক আর নার্স আলভীর সাথে কথা বলেছে। তবে কেউ অলিকে ততোটা গুরুত্ব দেয়নি। তারা লিফটে করে ৭ তলায় এসে থামলো। লিফট থেকে নামতেই দিহান এগিয়ে আসলো,
"দিহান সব রেডি করে রেখেছিস?"
"হুম, ভাবী কেমন আছেন?"
'ভাবী' ডাকটা অলির কানে অদ্ভুত এক রেশ ফেলে, অলি উত্তর না দিয়ে মুখে সৌজন্যমূলক হাসি টানলো। আলভী অলিকে নিয়ে সোনোগ্রাফি রুমে প্রবেশ করলো। পুরো হাসপাতালেই এয়ার কন্ডিশনার লাগানো যার জন্য অলির একটু ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। যদিও মির্জা ভিলাতেও এসি আছে কিন্তু হাসপাতালের এসির টেম্পারেচার একটু বেশিই ঠান্ডা। অলি বেডের উপর বসতেই আলভী সোনোগ্রাফি রুমের ডোর লক করে দিলো ফলস্বরূপ অলি বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায়,
"দরজা আটকালেন কেনো?"
"কেনো আবার তোমার আল্ট্রাসাউন্ড করা হবে সেইজন্যই বন্ধ করে দিলাম"
অলি ভ্রু কুচকে বললো,
"ডাক্তার তো আসেনি। আল্ট্রাসোনোগ্রাম কে করবে?"
আলভী সোনোগ্রাফি মেশিনের সামনে চেয়ার টেনে বসলো। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বললো,
"আমি থাকতে আবার ডক্টরের কি প্রয়োজন? পেটের উপর থেকে কাপড়টা সরিয়ে ওখানে শুয়ে পড়ো"
"কিহহহহহ"
চলবে,,,