ফন্ট সাইজ:
থিম:
১৫ বছর বয়সী মা

২৮তম পর্ব

লেখক: সোফিয়া সাফা

#১৫_বছর_বয়সী_মা (২৯)

#সোফিয়া_সাফা

"বাইরে গিয়ে দেখে আসুন আশেপাশে মোট কতোজন আছে।"

নোমান রুম থেকে বেরিয়ে গেলো ১৫ মিনিট পর সবকিছু চেক করে অলির কাছে ফিরে এলো।

"বাইরে বেশি গার্ডস নেই। সবাই ঘুমিয়ে গেছে। কিন্তু মেইন গেটে কয়েকজন গার্ডস আছে।"

অলি ঠোঁট চেপে কিছু একটা ভেবে বললো,

"আপনি কোনোভাবে ওনাদের গেইট থেকে ১মিনিটের জন্য সরাতে পারলেই আমি বেরিয়ে যেতে পারবো"

নোমান চিন্তিত কন্ঠে বলে,

"কিন্তু কোথায় যাবে তুমি?"

"আমি মায়ের কাছে যেতে চাই। আমি নিখোঁজ হওয়ার পর না জানি তাদের কি অবস্থা। আমি প্রথমে বাড়িতে যাবো। সেখানে তাদের না পেলে হসপিটালে যাবো"

নোমান একটা শ্বাস ফেলে বললো,

"তোমার এখন সেখানে যাওয়া উচিৎ হবেনা। তোমাকে না পেলেই এখানের লোকেরা হন্যে হয়ে খোজা শুরু করবে। মির্জা ভিলা এখান থেকে ২০ মিনিটের রাস্তা। তুমি বরং সেখানেই যাও। তাসনীম মির্জার সাথে থাকাটাই তোমার জন্য এখন বেশি সেইফ হবে।"

অলি অবাক চোখে তাকায়,

"আপনি মির্জা ভিলা কিভাবে চেনেন?"

"ডিভোর্স লেটার টা আনার জন্য আমি আজকে সকালেই সেখানে গিয়েছিলাম"

"ডিভোর্স লেটার ওই বাড়ি থেকে এনেছেন?"

নোমান হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ায়,

"কে দিয়েছিলো?"

"আমি জানিনা কে দিয়েছে। আমাকে শুধু লোকেশন দিয়ে বলা হয়েছিলো যে মির্জা ভিলার সামনে থাকা দাড়োয়ানের কাছ থেকে একটা লেটার আনতে হবে। ব্যস আমি শুধু তাদের অর্ডার ফলো করেছি।"

"আপনি তারাতাড়ি যান। আমাদের হাতে বেশি সময় নেই।"

নোমান একটু ইতস্তত করে বলল,

"অলি টাকাগুলো কখন দেবে? দেখো আমার কিন্তু টাকা গুলো অনেক প্রয়োজন।"

"আমি যে করেই হোক ২দিনের মধ্যে আপনার সাথে কন্টাক্ট করবো। তাছাড়া আপনার ফোনে তো আমার নম্বর আছেই।"

"তুমি আমার নম্বর ব্লক করে রেখেছো।"

অলি বেশ বিরক্ত হলো। এখন এসব কথা বলার জন্য তার হাতে সময় নেই।

"আপনাকে বললাম তো আমি নিজে থেকেই আপনার সাথে কন্টাক্ট করবো। বিশ্বাস করুন আমাকে।"

নোমান একটা শ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নেবে কিন্তু তার আগেই ফিরে এসে অলির দিকে কিছু টাকা এগিয়ে দেয়। অলি একবার টাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে পুনরায় নোমানের দিকে তাকায়। নোমান অন্যদিকে তাকিয়ে বলে,

"এখানে পাচশো টাকা আছে। নিজের কাছে রাখো। আর রাতের আধারে রাস্তা হারিয়ে ফেলোনা যেন। কোথাও লুকিয়ে থেকো। কারণ সকাল হওয়ার আগে কেউ তোমার পালিয়ে যাবার বিষয়ে জানতে পারবেনা। তবে সকাল হতেই একটা ট্যাক্সি নিয়ে মির্জা ভিলায় চলে যেও। আর আমার মনে হয় ওই বাড়িতেও তোমার শত্রু আছে তাই সবসময় চোখ কান খোলা রেখো।"

অলি মাথা নেড়ে টাকাটা নিলো। নোমান সামনের দিকে ঘুরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। অলিও তাকে অনুসরণ করে হাটা ধরলো। পথিমধ্যেই ২ জন গার্ড সামনে এসে পড়ে। তাদেরকে দেখে অলি দরজার আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। নোমান তাদেরকে অন্য দিকে নিয়ে বলে,

"তোমরা এখানে কি করছো? আমি তো আছি তাইনা। তোমরা নিশ্চিন্তে গিয়ে ঘুমাও। একটা মেয়েকে পাহাড়া দিতে এতোজন লাগে নাকি? তাছাড়া মেয়েটা ঘুমিয়ে গেছে।"

নোমানের কথা শুনে গার্ডস দুটো মাথা নেড়ে চলে যায়। অলির বুকের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক করছে। নোমান পেছনে ফিরে ইশারা করতেই অলি আবারও নোমানকে অনুসরণ করতে লাগলো। নোমান দরজার সামনে এসে দেখলো গার্ডসগুলো ভীষণ সতর্কতার সাথেই দরজা পাহাড়া দিচ্ছে। নোমান এগিয়ে গেলো সেইদিকে,

"হ্যালো গাইস। তোমরা পারোও বাবা। একটা মেয়ের জন্য এতো কড়া গার্ডের কি আছে?"

৩জনের মধ্যে একজন বলল,

"আমরা নিজেদের কাজ নিয়ে অনেক সতর্ক। সেখানে বন্দি ছেলে নাকি মেয়ে বা তারা সংখ্যায় কয়জন সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়।"

নোমান বুঝতে পারল শুকনো কথায় চিড়ে ভিজবেনা। সে পকেট থেকে একসেট তা*স বের করলো। যেগুলো মূলত সে স্টোর রুমে পেয়েছিল।

"আমি একা একা বোর হচ্ছি ঘুমও আসছেনা। চলোনা আমরা তা*স খেলি"

নোমানের কথা শুনে ৩জন গার্ডসই একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে।

"আরে ভয় পেওনা মেয়েটাকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ওর দরজা টাও বাইরে থেকেই লক করা।"

নোমানের কথা শুনে ৩ জনই রাজি হয়ে যায়। সেই ফাকেই নোমান পেছনে ফিরে অলিকে ইশারায় চলে যেতে বলে। অলিও ইশারা বুঝতে পেরে সন্তর্পণে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়।

অলি চলে গেছে কিন্তু বেচারা নোমান ফেসে গেছে। সে তো তাসের 'ত' ও জানেনা। খেলবে কিভাবে?

"তুমি তো খেলতেই পারছোনা।"

নোমান মিথ্যা মিথ্যা ঘুম আসার বাহানা করে বলে,

"আরে ভাই, আমার তো ঘুম আসছে। সেই জন্যই খেলতে পারছিনা। আপনারা খেলুন আমি বরং ঘুমাতে চলে যাই।"

নোমান কোনো রকম বাহানা দিয়ে ভেতরে চলে গেল।

"এখন নিজে বাচার জন্যও কিছু তো করতে হবে। নইলে ওরা আমাকেই সবার আগে সন্দেহ করবে। কিন্তু কি করবো আমি?"

নোমান কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে ড্রয়ার থেকে একটা ইঞ্জেকশন বের করলো। মূলত এটা ঘুমের ইঞ্জেকশন। অলিকে দেওয়ার জন্যই আনানো হয়েছিল,

"বাচার জন্য এটা করতেই হবে।"

নোমান একটা বড় শ্বাস টেনে নিজের হাতেই ইঞ্জেকশন পুশ করে নিলো।

---

রিফাত ড্রিংকস করে টাল হয়ে পড়ে আছে। তার সামনে বসে আছে একটা লোক। লোকটাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে সে রিফাতের উপর ভীষণ ক্ষেপে আছে।

"ওই সারাক্ষণ তো খালি এসব গিলেই টাল হয়ে পড়ে থাকিস। কাজের কাজ তো সব আমাকেই করতে হচ্ছে। তুই আছিস কি শুধু আমার কাজে ব্যাগড়া দিতে?"

রিফাত মাতাল কন্ঠেই বলল,

"তুই তুকারি করছিস কেনো?"

"তো তোকে কি বলবো শুনি? তুই মেয়েটাকে অতো কথা বলতে গেলি কেনো হুম? ওকে ওসব জানানোর তো কোনো প্রয়োজন ছিলোনা।"

রিফাত হেসে উঠলো,

"আরে তুই বুঝবিনা। আমি ওকে ওসব বলে মজা পেয়েছি। তাছাড়া কালকেই তো ওর শেষ দিন। বেচারির তো এসব জানার অধিকার আছে তাইনা? এভি তো এতোদিনেও নিজে থেকে মেয়েটাকে কিছুই বলতে পারলোনা। আমি জানি বাকি জীবনেও ও পারতোনা। হাহ সবার সামনে ও হচ্ছে লায়ন বাট ওই মেয়েটার সামনে ভেজা বিড়াল। দেখ, বন্ধু হিসেবে আমার একটা দায়িত্ব আছেনা? আমি ছাড়া ওর সাহায্য আর কে করবে বলতো? এভি এটা জানলে খুশি হবে যে ওর বউটা ম*রার আগে অন্তত সব সত্যিটা জেনেছিলো।"

সামনে বসে থাকা লোকটা রিফাতের কথাগুলো শুনে ভীষণ রেগে যায়,

"দেখ লাস্ট বারের মতো সাবধান করছি তোকে। এভির কখনো যদি সন্দেহ হয়, ও কিন্তু সবার প্রথমে তোকেই সন্দেহ করবে। আর ও যদি কোনোভাবে তুই অবধি পৌঁছে যায় তাহলে তোকে কিন্তু আমরা আমাদের প্ল্যান থেকে বাদ দিয়ে দেবো।"

কথাটা শুনে রিফাত হাসি থামিয়ে দিলো, সামনে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে বাজখাঁই কন্ঠে বলল,

"ভুলে যাসনা আমিই তোকে নিজেদের দলে নিয়েছিলাম। তোর হাতে আমাকে বাদ দেওয়ার কোনো ক্ষমতাই নেই"

"আমার হাতে নেই তো কি হয়েছে? যার হাতে আছে সেই তোকে বাদ দিয়ে দেবে। কারণ টা তুই ভালো করেই জানিস। ওনার কাছে বর্তমানে তোর থেকে আমার মূল্যটা বেশি"

রিফাতের মুখটা চুপসে গেল। সে জানে যে লোকটা সঠিক কথাই বলেছে। লোকটা কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে বলে,

"অলি তোকে চিনতে পেরেছে নাকি?"

রিফাত নিশ্চিন্তমনে বলে,

"নাহ, ও আমাকে চিনবে কিভাবে? আমি তো ওকে নিজের পরিচয় দেইনি। তাছাড়া ওর সাথে আমার শুধু একবারই সামনা সামনি কথা হয়েছিল।"

"যাক ভালো হয়েছে। এমনিতেও কালকে তো ওর আখেরি দিন। ও উপরে চলে যাওয়া মাত্রই আমার রাস্তা ক্লিয়ার"

---

অলি যতই সামনে এগোচ্ছে তার ভেতরে থাকা ভয়টা ততই বাড়ছে। চারদিকের ঘুটঘুটে অন্ধকারে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। অলি কিছুটা দূরে একটা বাড়ি দেখতে পায়। বাড়িটায় আলো জ্বলছে। কিন্তু অলি সেই বাড়ির দিকে না গিয়ে উল্টো দিকে হাটা ধরে।

"পৃথিবীতে সবচাইতে ভয়ঙ্কর নির্দয় প্রানী হচ্ছে মানুষ। ওই বাড়িতে খারাপ লোকও তো থাকতে পারে। সেখানে গেলে উল্টো বিপদে পড়তে পারি।"

অলি আরও কিছুক্ষণ হাঁটল। পা এখনো এগোতে চাইছে, অথচ শরীর বারণ করছে। একসময় সে এসে দাঁড়াল এক ফাঁকা রাস্তার ধারে। চারপাশে নিস্তব্ধতা, মাথার ওপর উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দু'পাশের ল্যাম্পপোস্টগুলো—হালকা কমলা আলো ছড়িয়ে দিয়েছে রাস্তার পিচ ঢালা বুকজুড়ে।

রাস্তার ওপাশে চোখ পড়তেই অলি থমকে গেল।

একটা মসজিদ।

নির্জন রাতে দাঁড়িয়ে থাকা একটুকরো শান্তির কেল্লা যেন।

ওর পা যেন মুহূর্তেই অবশ হয়ে এল। ক্লান্তিতে বা ভয়ে না। হয়তো ভেতরের সেই দম বন্ধ করে আসা চাপ থেকে। আর এক পা-ও যেন তোলা যাচ্ছে না। তবুও, ধীরে ধীরে এগোতে লাগল সে—সেই মসজিদের দিকে। মসজিদের পাশে গিয়ে জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে উঁকি দিল। ভেতরে আলো কম, কিন্তু জ্যোৎস্নার মতো এক শান্ত আভা ছড়িয়ে আছে।একজন বৃদ্ধ লোক কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন—তাহাজ্জুদের নামাজে নিমগ্ন। তাঁর কপাল মাটিতে, ঠোঁটে নিঃশব্দ কোরআনের আয়াত। এই দৃশ্য দেখে অলির বুক থেকে যেন ভার নেমে গেল। সে ধীরে এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মনে হলো, অনেকদিন পর বাতাসে একটু অক্সিজেন আছে।

"আর যাই হোক, খারাপ লোকেরা মসজিদের ধারে কাছেও আসবে না। এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিন্ত,"

মসজিদের উঠানে পা রাখতেই এক অদ্ভুত শীতলতা ছড়িয়ে পড়ল অলির সমস্ত শরীর জুড়ে। যেন পায়ের নিচের টাইলসে জমে থাকা রাতের শিশির সরাসরি ওর হৃদয় ছুঁয়ে গেল। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত অলি ধীরে ধীরে একটা দেয়ালের পাশে গিয়ে বসে পড়ল। আকাশ তখনো জেগে আছে। তারাগুলো নিঃশব্দে তাকিয়ে, যেন কোনো অজানা রহস্যের সাক্ষী হতে এসেছে। দূরে কোথাও একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠলো, আবার নীরবতা। মসজিদের দেয়াল ঘেঁষে বসে অলি চুপচাপ শুনতে থাকল নামাজের সুর। বৃদ্ধ লোকটি এখন রুকুতে গিয়েছে। সেই কোমল, নিরবধি গতি—কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো চাঞ্চল্য নেই। যেন তাঁর প্রতিটি সিজদা একেকটা নিঃশব্দ আর্তি। অলি চোখ বন্ধ করল।

আজ বহুদিন পর কোনো ভয় না পেয়ে চোখ বন্ধ করল সে।পেছন থেকে একটা হালকা বাতাস বইল, ওর ওড়নাটা একটু দুলে উঠলো। অলি তবুও স্থির। এই নির্জন সাহানেই সে একবিন্দু আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে, যতক্ষণ না সকাল হয়, যতক্ষণ না আবার বাস্তব তাকে টেনে নিয়ে যায় অন্য এক অন্ধকারে।

---

ভোর হতেই নামাজ আদায় করে কিচেনে চলে এসেছে শাহানাজ বেগম। তার সাথে রুনা খাতুন আর নূরজাহানও আছেন। শাহানাজ বেগম সার্ভেন্টদের রান্নার মেন্যু বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।

"বড় ভাবী, আমি আর রূপসা নিজেদের বাড়িতে চলে যাবো ভাবছি। মা মোটামুটি এখন সুস্থই আছে। তাছাড়া আগামী কালকে রূপসার বাবা দেশে ফিরবেন"

রুনা খাতুনের কথা শুনে শাহানাজ বেগম একটা শ্বাস ফেলে বললেন,

"আমি জানি রুনা এভির কাজকর্মে তোমরা অনেক বেশিই ব্যথিত হয়েছো। কিন্তু এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো যে ওই মেয়েটাই আমার ছেলেকে ফাসিয়েছিল। না জানি কোথা থেকে পেট বাধিয়ে সেই দায়ভার আমার ছেলের উপর চাপিয়ে দিয়েছে।"

শাহানাজের কথা শুনে নূরনাহারের একটু খারাপ লাগলেও সবকিছু জানার পর সেও আর অলিকে ভালো মেয়ে বলে মনে করতে পারছেন না। রুনা খাতুন সুযোগ পেয়ে বলে ওঠেন,

"ভাবী আমরা সবাই-ই বুঝতে পেরেছি যে মেয়েটাই আমাদের এভি বাবাকে ফাসিয়েছে কিন্তু এতোকিছুর পরেও তো এভি বাবা মেয়েটার জন্যই পা*গল হয়ে যাচ্ছে।"

"কিসব বলছো তুমি? আমার ছেলে ওর জন্য পা*গল হচ্ছেনা রুনা। আমার ছেলে তো নিজের করা ভুলের জন্য আফসোস করছে। ভাবছি ছেলেটা কিছুটা স্বাভাবিক হলেই একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে দেবো"

"তুমি কি রূপসাকে আর নিজের ছেলের বউ বানাতে চাইছো না ভাবী?"

শাহানাজ বেগম খুশি হয়ে বললেন,

"এতোকিছুর পরেও সেটা আমি কিভাবে চাইতে পারি বলো তো। তুমিই কি আর রূপসাকে এভির সাথে বিয়ে দিতে রাজি হবে?"

"দেখো ভাবী। এভির সাথে মেয়েটা চিটিং করেছে। তাছাড়া আমরা সবাই জানি যে এভি আর মেয়েটা আলাদা রুমে থাকতো। আমার তো রূপসাকে এভির সাথে বিয়ে দিতে কোনো আপত্তি নেই"

শাহানাজ বেগম যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছেন। এতোকিছুর পরেও রুনা খাতুন যে রূপসাকে এভির সাথে বিয়ে দিতে রাজি হবেন সেটা নিয়ে তার মনে একটু সন্দেহ ছিলো। সেটাই সে ক্লিয়ার করে নিয়েছেন।

"তাহলে আর কি, রূপসাকে বিয়ের জন্য তৈরী হতে বলো"

,

সকাল আটটা নাগাদ সবাই এক এক করে ডাইনিং টেবিলে এসে বসে। শাহানাজ বেগম সবার দিকে তাকিয়ে একটা ছোট্ট শ্বাস ফেললেন, ঊর্মিলার দিকে তাকিয়ে বললেন,

"তোর ভাইকে ডেকে নিয়ে আয়।"

ঊর্মিলা কপাল কুচকে মায়ের দিকে তাকায়,

"মা তুমিই যাওনা। জানোই তো ভাইয়াকে ডাকতে গেলেই ভাইয়া রেগে যায়। তাও বারবার কেনো আমাকেই যেতে বলো?"

"মামনি আমি ডেকে আনছি,"

বলেই রূপসা উঠে দাড়ালো। তখনই কলিংবেল বেজে ওঠে। একজন সার্ভেন্ট ব্যস্ত পায়ে দরজা খোলার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেল। বাকি সবাই একসাথে দরজার দিকেই তাকিয়ে আছে। মূলত এই সময়ে কে এসেছে সেটাই তাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। অবশ্য রূপসা সেদিকে খেয়াল না করেই আলভীকে ডাকতে চলে গেছে।

দরজা খুলে দিতেই অলি হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। এই সাত সকালে অলিকে আসতে দেখে উপস্থিত সবাই চমকে গেল। অলি আশেপাশে না তাকিয়ে সিড়িবেয়ে উপরে যেতে নেবে তখনই শাহানাজ বেগম বাধ সাধলেন।

"এই মেয়ে কোথা থেকে এসোছো? বলা নেই কওয়া নেই হন্যে হয়ে কোথায় যাচ্ছো শুনি?"

শাহানাজ বেগমের কথা শুনে অলি থমকে দাড়ায়। বউ হয়ে আসার পর এই প্রথম শাহানাজ বেগম অলির সাথে কথা বলেছেন। অলি মাথার ওড়নাটা আরেকটু টেনে শাহানাজ বেগমের দিকে তাকালো। অলির চেহারার অবস্থা দেখে উপস্থিত সবাই অবাক হলেও কোনোকিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করলোনা।

"আমার পরীক্ষা শেষ তাই আমি ফিরে এসেছি। নিজের রুমেই যাচ্ছিলাম"

অলির কথা শুনে শাহানাজ বেগম তেড়ে এলেন,

"এই মেয়ে বেশি ন্যাকামো করবেনা বলে দিলাম। এতোদিন অনেক সহ্য করেছি কিন্তু এবার আর সহ্য করবোনা। না*ঙের তো অভাব নেই। যাওনা তাদের সাথেই ফুর্তি করো। নাকি সেইসব না*ঙ তোমার চাহিদা ঠিকঠাক ভাবে পূরণ করতে পারছেনা?"

অলি ছলছল চোখে শাহানাজ বেগমের দিকে তাকালো,

"আম্মা আপনারা আমাকে ভুল বুঝবেন না দয়া করে আমার পুরো কথাটা শুনুন"

"একদম চুপ। আম্মা বলে ডাকবে না আমাকে। তোমার মতো মেয়ের চেহারা দেখলেও ঘেন্না লাগে আমার। কি ভেবেছিলে তুমি হ্যাঁ? তুমি যা ইচ্ছা তাই করে যাবে আর আমার ছেলে তোমাকে কিছুই বলবেনা?"

অলি অসহায় চোখে শাহানাজ বেগমের দিকে তাকিয়ে রইলো। তখনই রুনা খাতুন এগিয়ে এসে বললেন,

"কোন সাহসে এই বাড়িতে পা রেখেছিস বলতো? লজ্জা করলোনা একটুও। ওহহো লজ্জা থাকলে তো করবে। তোর মতো মেয়েরা তো লাজলজ্জা সব সস্তা দামে বাজারে বিক্রি করে দিস। নিশ্চয়ই তোর নতুন প্রেমিকের শখ মিটে গেছে? সেই জন্যই কি আবার চান্স খুজতে এই বাড়িতে এসেছিস?"

কথাগুলো শুনে অলির মাথা ঘুরতে লাগলো। সে জানে এখানে থাকাটা তার জন্য সেইফ হবেনা। সুযোগ পেয়ে এখন সবাই মিলে তাকে আক্রমণ করবে। অলি মুখে কিছু না বলে উল্টো দিকে ঘুরে দ্রুতপায়ে সিড়ি ডিঙিয়ে আলভীর রুমের দিকে ছুট লাগালো। আচমকা অলির কান্ডে বাকি সবাই হকচকিয়ে যায়।

"এই মেয়েটা আবারও গিয়ে আমার ছেলের ব্রেইন ওয়াশ করবে। কিন্তু সেটা আমি আর কিছুতেই হতে দেবোনা।"

বিড়বিড় করে কথাগুলো বলে শাহানাজ বেগমও অলির পিছু নিলেন। বাকি সবাইও খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়ে আলভীর রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো।

,

রূপসা বেশ কিছুক্ষণ ধরে আলভীর রুমের দরজায় নীরব উদ্বেগে কড়া নাড়ছিল। বারবার নক করলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়া আসছিল না। ঠিক এমন সময় রূপসার দৃষ্টি গেল দূরের হলরুমে—দ্রুতপায়ে ছুটে আসছে অলি। তার চোখেমুখে আতঙ্ক আর অস্থিরতার ছাপ, যেন কোনো অজানা শঙ্কা তাকে তাড়া করে ফিরছে। অলি একটিবারও রূপসার দিকে না তাকিয়ে সোজা গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল, যেন তার নিঃশেষিত প্রাণ শক্তিটুকু দিয়ে সে এই বন্ধ রুমের ভিতর পৌঁছাতে চায়।

"শুনছেন, দরজা খুলুন। দরজা খুলুন প্লিজ—" অলি কেঁপে উঠল, কণ্ঠস্বর থরথর করে উঠল কান্নায়। বাধা দিয়ে আর রাখতে পারল না নিজেকে। চোখের জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।

রূপসা থমকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল। মুখে বিস্ময়, চোখে অবিশ্বাস—

"এই মেয়ে, এই, তুমি এই বাড়িতে আসলে কিভাবে?"

তার কণ্ঠে ছিল হতচকিত রাগ। কিন্তু অলি কোনো উত্তর দিল না। সে যেন শুনছেই না। কেবল একটানা দরজায় ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে—কখনো হাত দিয়ে, কখনো কাঁধ ঠেকিয়ে। শরীরের প্রতিটা কোষ থেকে সে আকুতি ছুঁড়ে দিচ্ছে।

"আল্লাহর দোহাই লাগে, দরজাটা খুলুন"

হঠাৎ করেই অপ্রত্যাশিতভাবে দরজাটা খুলে গেল। অলি কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই সামনের দিকে ছিটকে গিয়ে সোজা আলভীর বুকের সাথে ধাক্কা খেল। তার সমস্ত ক্লান্তি, আতঙ্ক আর স্বস্তি যেন সেই একমুহূর্তে গলে গিয়ে আলভীর শরীরে ভর করল।

আলভী হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে এখনও ঘোলাটে দৃষ্টি। গতরাতে ড্রিংক করতে করতে সে জ্ঞান হারিয়েছিল। কিছুক্ষণ আগেই অলির করুণ আর্তিতে তার জ্ঞান ফিরেছে। রুমটা পুরোপুরি সাউন্ডপ্রুফ হলেও, দরজায় এমন ধাক্কাধাক্কির শব্দ প্রবেশ করেছে ভেতরে। এখনও তার শরীর থেকে এলকোহলের তীব্র গন্ধ বের হচ্ছে, চোখ লালচে, মুখ বিবর্ণ। অথচ অলি সেসব কিছুই অনুভব করছে না—সে কেবল বাঁচার আকুতিতে আলভীর শরীর আঁকড়ে ধরে আছে।

"প্লিজ আমাকে ভুল বুঝবেন না। আপনি যা দেখেছেন, যা শুনেছেন সব মিথ্যা ছিলো। আমি ইচ্ছা করে কিছুই করিনি। সবকিছুই আপনার বন্ধু রিফাতের প্ল্যান। সেই আমাকে আটকে রেখে এইসব কিছু করতে বাধ্য করেছে"

অলির কণ্ঠস্বর কাঁপছে, আলভী কিছু না বলে তাকিয়ে আছে অন্যদিকে—চোখে ঘোর, ভেতরে অস্বস্তি। তবে অলির মুখের ভীত প্রার্থনা যেন তাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

"ওরা আমাকে মে*রে ফেলবে। আমাকে বাঁচান প্লিজ..."

আলভী ধীরে ধীরে তাকাল দরজার বাইরে। সেখানে বাড়ির প্রায় সবাই দাঁড়িয়ে—নিস্তব্ধ, থমথমে এক পরিবেশে। অলি আর আলভীকে এই অবস্থায় দেখে রূপসা প্রচন্ড রেগে গেছে। ক্রোধের বশে তার হাত পা ও কাপছে।

"এভি এই মেয়েটাকে এক্ষুনি বাড়ি থেকে বের কর। এর জন্য আমাদের পুরো বাড়িটা একেবারে অপবিত্র হয়ে গেলো।"

শাহানাজ বেগমের কথা শুনে আলভী ভ্রু কুচকে তাকায়। তার নে*শা এখনো পুরোপুরি ভাবে কাটেনি। মনে হচ্ছে সে এখনো কোনো ঘোরের মাঝেই আছে।

আলভী মুখে কিছু না বলে অলির থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো। কিন্তু অলি ঘুরে গিয়ে আলভীর পেছনে লুকিয়ে পড়লো।

"এভি ওকে বের কর।"

কথাটা বলতে বলতেই শাহানাজ বেগম এগিয়ে এলেন আলভীর দিকে কিন্তু রুম থেকে আসা এলকোহলের উটকো গন্ধে সে অলিকে টেনে নিয়ে যেতে পারলেন না। শাহানাজ বেগম অবিশ্বাসের সুরে প্রশ্ন ছুড়লেন,

"এভি তুই বাড়িতে ম*দ এনেছিস?"

প্রশ্নটা শুনে অলি চোখ বড়বড় করে আলভীর দিকে তাকায়। কিন্তু আলভীর মাঝে কোনো ভাবাবেগ নেই। সে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলল,

"সকাল সকাল নাটক শুরু করেছো কেনো? সবাই বের হও আমার রুম থেকে।"

আলভী উল্টো দিকে ঘুরে ওয়াশরুমের দিকে চলে যেতে নিলে অলি পেছন থেকে আলভীর শার্টের অনেকটা অংশ খামচে ধরে। আলভী বেশ বিরক্ত হয়ে অলির দিকে তাকায়,

"কি সমস্যা? বের হ আমার রুম থেকে"

অলি একটা ঢোক গিলে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলো—শাহানাজ বেগম, রূপসা আর রুনা খাতুন জ্বলন্ত চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে,

"প্লিজ আমাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলার সুযোগ টুকু দিন। সবকিছু শোনার পর আপনি আমাকে বের করে দিলে আমি নীরবে বের হয়ে যাবো। প্লিজ"

আলভীর ঘোর কিছুতেই কাটছেনা। শাওয়ার নেওয়া জরুরী। সে অলির হাতটা ছাড়াতে গেলে অলি আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে। এরকম দৃশ্য দেখে ইয়ামিন মির্জা, নূরনাহার আর উসমান মির্জা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে ব্যস্ত পায়ে নিজেদের রুমে চলে যায়। আলভী খিটখিটে মেজাজে বলল,

"আমাকে ফ্রেশ হয়ে আসতে তো দিবি নাকি?"

অলি মাথা নাড়িয়ে না বললো।

চলবে,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন