#১৫_বছর_বয়সী_মা (৩১)
#সোফিয়া_সাফা
"একদম চুপ"
আলভীর জোরালো কন্ঠে পুরো বাড়িটাই যেনো কেপে উঠলো,
"একদম নিজেদের সীমা লঙ্ঘন করবেন না। আপনাদের সাহস হয় কি করে আমার সামনে এই ধরনের মন্তব্য করার?"
শাহানাজ বেগম বললেন,
"তুই যতোই আমাদের উপরে চিল্লাস না কেনো। তুই নিজেও কি একদম জোর দিয়ে বলতে পারবি যে ওটা তোর বাচ্চা?"
আলভী শাহানাজ বেগমের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
"তোমাদেরকে কখনো কেউ এরকম প্রশ্ন করেছিলো? কেউ জিজ্ঞেস করেছিলো? যে আমি উসমান মির্জার ছেলে কিনা? কাকীমা, আপনার দিকে কেউ আঙুল তুলে জিজ্ঞেস করেছিলো যে ইয়াদ—ইয়ামিন মির্জার ছেলে কিনা? ফুপি, আপনাকে করেছিলো কেউ এই ধরনের প্রশ্ন?"
আলভীর কথা শুনে সবাই হতভম্ব হয়ে আলভীর দিকেই তাকিয়ে আছে,
"তাহলে আপনারা কোন সাহসে এই ধরনের প্রশ্ন করছেন?"
শাহানাজ বেগম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে ওঠে,
"এভি তুই ভুলে যাচ্ছিস আমি বনেদি পরিবারের মেয়ে। কখনো তোর মায়ের চরিত্র নিয়ে কাউকে বাজে মন্তব্য করতে শুনেছিস? কেউ বাজে মন্তব্য এই জন্যই করতে পারেনি কারণ আমার চরিত্রে এই পর্যন্ত কোনো দাগ লাগতে দেইনি আমি। সেই জন্যই আমাকে কেউ প্রশ্ন করতে আসেনি যে তুই উসমান মির্জার ছেলে কিনা। শুনে রাখ আমাদের সাথে তোর চরিত্রহীনা বউয়ের তুলনা করতে আসিস না। তোর বউয়ের চরিত্রে দাগ আছে বিধায় ওকে এই সমস্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে আর ভবিষ্যতেও হবে"
আলভী বলার মতো আর কিছু খুঁজে পেলোনা। সে জানে অলিকে তারা পছন্দ করেনা সেই জন্যই সুযোগ পেয়ে সবাই মিলে এভাবে আক্রমণ করছে। আর এই সুযোগটা মূলত অলিই তাদেরকে করে দিয়েছে। আলভী কারো দিকে না তাকিয়ে বেসিন থেকে হাত ধুয়ে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে হাটা ধরলো। অলি এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও আলভীকে চলে যেতে দেখে সেও তার পিছু পিছু ছুটে গেলো।
আলভী গাড়ির দরজা খোলার উদ্দেশ্যে হাত বাড়াতেই অলিকে তার দিকে ছুটে আসতে দেখে থমকে যায়। অলি কোনো কিছু না বলে চুপচাপ আলভীর সামনে এসে দাড়ালো,
"কি চাই? পিছুপিছু ঘুরছো কেনো?"
অলি নিজের চোখজোড়া মুছে মাথা নত করে বললো,
"আমি আপনার সাথেই যেতে চাই। প্লিজ আমাকে একা রেখে যাবেন না।"
আলভী ঘুরে দাড়াল অলির দিকে,
"আমার সাথে কোথায় যাবে?"
অলি কিছুক্ষণ ঠোঁট চেপে পেভমেন্টের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
"২ দিন আগে আমার মা এক্সিডেন্ট করেছিলেন। তাকে নিয়ে হসপিটালে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখান থেকেই আপনার বন্ধু রিফাত—নোমান ভাইয়াকে দিয়ে আমাকে কিডন্যাপ করিয়ে নিয়েছিলো। আমি এখন পর্যন্ত জানিনা আমার মা কেমন আছে। আপনি যদি আমাকে সেখানে নিয়ে যেতেন...
আলভী অবাক হয়ে বলল,
"ওয়েট ওয়েট, আম্মু কিভাবে এক্সিডেন্ট করেছিলেন? আমি তো এই বিষয়ে কিছুই জানতে পারলাম না"
অলি কান্না আটকে বলল,
"শপ থেকে ফেরার পথে ছিনতাইকারী মায়ের ব্যাগ নিয়ে যায় মা তাদের পিছু নিলে উল্টো দিক থেকে আসা একটা গাড়িতে মায়ের এক্সিডেন্ট হয়েছিলো। আমি আপনাকে কল দিয়েছিলাম কিন্তু আপনার ফোন তো অনেকদিন ধরেই বন্ধ বলছে"
আলভী কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
"তুমি বললে যে, তোমাকে সেখান থেকে কিডন্যাপ করা হয়েছিলো? তারমানে গতকালকের সবকিছু তোমাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গিয়ে তোমাকে দিয়ে ফোর্সফুলি করিয়েছিলো তাইতো?"
অলি উপরনিচ মাথা নাড়ালো। আলভী বলল,
"তাহলে এখন তুমি ছাড়া পেলে কিভাবে? তারা তোমাকে এমনি এমনি ছেড়ে দিলো?"
অলি বেশিকিছু না ভেবেই বলে ওঠে,
"আমাকে ভয় দেখিয়ে ডিভোর্স পেপারে সাইন দিতে বলেছিলো। তাদের প্ল্যান ছিলো ডিভোর্স পেপারে সাইন করিয়ে আমাকে মে*রে ফেলবে। ভাগ্যিস নোমান ভাইয়া ছিলো। নইলে তো এতোক্ষণে ওরা আমাকে আর বাবুকে মে*রেই ফেলতো। সত্যিই নোমান ভাইয়া অনেক ভালো"
অলির মুখ থেকে নোমানের প্রশংসা শুনে আলভী বেশ রেগে যায়। অলি সেটা না বুঝেই বলে ওঠে,
"আপনার কাজ শেষ হলে কি আমাকে একবার মায়ের কাছে নিয়ে যাবেন?"
আলভী কোনোকিছু না ভেবেই বলে ওঠে,
"পারবোনা। তুমি বরং তোমার নো-ম্যান সাইয়ার সাথেই চলে যাও। সে তো অনেক ভালো তাইনা? তোমাকে সেইফলি তোমার মায়ের কোলে ল্যান্ড করিয়ে দেবে।"
কথাটা বলেই আলভী গাড়ির দরজা খুলে গাড়িতে উঠে বসতে যাবে তখনই অলি পেছন থেকে আলভীর ওভারকোটের কোণা টেনে ধরে। আলভী ভ্রু কুচকে অলির দিকে তাকায়। অলির চোখজোড়া ছলছল করছে। আলভী একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল,
"ভাবছি চুক্তিনামায় আমিও একটা শর্ত এড করবো। এইযে সকাল থেকে তুমি আমার জামাকাপড় ধরে টানাটানি করছো এটা আমার মোটেও ভালো লাগছেনা।"
অলি আলভীর ওভারকোট ছেড়ে দিল,
"প্লিজ আমাকে নিজের সাথে নিয়ে যান।"
আলভী কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিলো। তখনই অলি বলে ওঠে,
"আপনি আমাকে রেখে গেলে আমার যেদিকে দুচোখ যাবে আমি সেদিকেই চলে যাবো। এই জীবনে আর কক্ষনো আপনার মুখোমুখি হবোনা।"
আলভী গাড়ির উইন্ডো দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলে,
"তাতো জানিই এখন তো তোমার যাওয়ার জায়গাও আছে তাইনা? তো তোমার সেই শুদ্ধ পুরুষ নো-ম্যানের কাছে যাবে নাকি অন্য কারো কাছে যাবে?"
অলি কিছু একটা ভেবে বলে ওঠে,
"অফকোর্স আই ওন্ট টেল ইউ,"
অলির কথায় আলভী স্তব্ধ হয়ে যায়। মেয়েটা সুযোগ পেলেই তার কথা তাকেই ঘুরিয়ে দেয়। আলভীকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে অলি উল্টো দিকে ঘুরে হাটা ধরলো। আলভী না থাকলে তাকে নিজের জন্য একটা সেইফ প্লেস খুজতে হবে। তার হাতে বেশি সময় নেই। না জানি ওদিকে নোমানের উপর দিয়ে কি ঝড় বয়ে যাচ্ছে। অলি কয়েক পা এগিয়ে যেতেই আলভী পেছন থেকে ডেকে ওঠে,
"মিসেস অলি তাসনীম মির্জা, আপনার দুচোখ যেন আমার দিকে ছাড়া আর অন্য কোনো দিকে না যায়। সেই বিষয়ে খেয়াল রাখবেন। ইউ হ্যাভ অনলি ফাইভ সেকেন্ডস তারাতাড়ি আমার দিকে চলে আসুন কুইক।"
অলির ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠলো। এইমূহুর্তে আলভীর সাথে থাকাটাই তার জন্য সবচাইতে সেইফ। কারণ আলভীর কোনো ক্ষতিই সেই লোকগুলো করবেনা। যদিও অলি জানেনা যে আলভীকে ২য় বিয়ে করিয়ে তাদের কি এমন লাভ হবে বা আলভীকে তাদের ঠিক কি কাজে লাগবে। তবে রিফাতের কথাগুলো থেকেই অলি বুঝে গেছে, আপাতত আলভীর কোনো ক্ষতিই তারা করবেনা।
অলি দ্রুতপায়ে আলভীর দিকে চলে যায়। আলভী অলির জন্য ডোর ওপেন করতেই অলি গাড়িতে উঠে বসে।
বেলা এগারোটা বাজে।
দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, কারণ অফিসরুমের পরিবেশ নিঃস্তব্ধ। বড় একজোড়া জানালা দিয়ে রোদের নরম আলো এসে পড়েছে সাদা পর্দার ওপর। পর্দার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া রোদের রেখা ছায়া ফেলছে অফিসরুমের এককোণে রাখা ধূসর রঙের সোফার ওপর। সেই সোফাতেই বসে আছে অলি।
সে নিঃশব্দে বসে আছে, কিন্তু চোখেমুখে বিরক্তি স্পষ্ট। দুই কনুই হাঁটুর ওপর ভর করে থুতনি ঠেকিয়ে রেখেছে তালুর ভেতর। তার পায়ের তালু দুটো বারবার কার্পেটের গায়ে ঘষা খাচ্ছে। কখনো সে আলভীর দিকে তাকায়, কখনো দেয়ালে ঝুলে থাকা কালো ফ্রেমের অদ্ভুত কিছু আর্ট দেখে। কয়েক মিনিট পরপরই সে বিরক্ত মুখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
অলির সামনে বসা আলভী একেবারে ডুবে আছে নিজের কাজে। চোখ দুটো স্ক্রিনে আটকে, একের পর এক মেইল পড়ছে, প্রেজেন্টেশন যাচাই করছে। মাঝে মাঝে কী-বোর্ডে টাইপ করার শব্দ ভেঙ্গে দিচ্ছে অফিসরুমের নিঃস্তব্ধতা।
আলভীর ডেস্কের পাশে কফির কাপ ঠান্ডা হয়ে গেছে, কিন্তু সে খেয়ালই করছে না। রুমে থাকা সেন্টের মৃদু সুবাস আর এসির ঠান্ডা বাতাসেও অলির অস্থির মন শান্ত হচ্ছে না।
অলি শুধু ভাবছে কখন সে মায়ের কাছে যাবে। মায়ের জন্য ভীষণ চিন্তা হচ্ছে তার। হঠাৎ করেই অলির পেট থেকে গুড়গুড় শব্দ ভেসে আসে। অলি আঁতকে উঠে আলভীর দিকে তাকায়—আলভী শুনেছে কিনা বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু না, আলভী তখনো মন দিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে, টাইপ করে যাচ্ছে।
কিন্তু… কয়েক সেকেন্ড যেতেই আলভীর আঙুল থেমে যায়। সে আস্তে করে মনিটর থেকে চোখ সরিয়ে অলির দিকে তাকায়। অলি এখন সোফার পাশের বালিশে হেলান দিয়ে চোখ বুজে আছে। ঠোঁটের কোণে ক্লান্তি। আলভীর মনে পড়ে যে অলি সকাল থেকে এই পর্যন্ত কিচ্ছুটি খায়নি। কাজের প্রেশারে সে ব্যাপারটা ভুলেই গিয়েছিল। আলভী অলির থেকে চোখ সরিয়ে তার পিএ সোহেলকে মেইল পাঠালো।
—আমার অফিসরুমে খাবার পাঠিয়ে দেও।
সোহেল নিজের ডেস্কে বসে কাজ করছিলো। আলভীর মেইল দেখে সে বেশ অবাক হয়ে যায়। তবে পরক্ষণেই মনে পড়ে যে আজকে মিসেস তাসনীম মির্জাও আলভীর সাথে এসেছেন। ভাবনাটা মাথায় আসতেই সোহেল জিজ্ঞেস করে,
—কি খাবার পাঠাবো স্যার?
—নুডলস, স্যান্ডউইচ, পেস্ট্রি, আর জুস… যত তারাতাড়ি সম্ভব পাঠাও,
মেইলটা পাঠিয়ে আলভী পুনরায় অলির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
"ডাম্ব গার্ল, ক্ষুধা লেগেছে সেটাও মুখ ফুটে বলতে পারছেন না। আমার সাথেই যত্তসব ন্যাকামি। ওই নো-ম্যানের সাথে গিয়ে তো ভালোই নুডলস অর্ডার করে খেতে পেরেছিল"
আলভী পুনরায় কাজে মন দেয়, যেন কিছুই হয়নি।
১৫ মিনিট না পেরোতেই কেউ একজন দরজায় নক করে। যার শব্দে অলি তড়িঘড়ি করে উঠে বসে নিজের মাথার ওড়না ঠিক করে নেয়। বোরকা না পড়ে আসাতে তার একটু অস্বস্তি লাগছে কিন্তু তখন বোরকা পড়ে আসার মতো সময় ছিলোনা তাছাড়া তার সব কাপড়চোপড় সে বাবার বাড়িতেই রেখে এসেছে। আলভী স্ক্রিনের দিকে চোখ নিবদ্ধ রেখেই
ছোট্ট করে বলল,
"কাম ইন"
অনুমতি পাওয়া মাত্রই একজন স্টাফ ট্রে ভর্তি খাবার নিয়ে রুমে ঢুকে পড়ে। ট্রে ভর্তি খাবার দেখে অলির চোখ আটকে যায়। স্টাফ ট্রে টা অলির সামনের টেবিলের উপরে রেখে অফিসরুম থেকে বেরিয়ে যায়। অলি একবার আলভীর দিকে তাকায় কিন্তু আলভীর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে সে নিজের কাজে অনেক ব্যস্ত। অলি বেশি কিছু না ভেবে নুডলসের বাটিটা হাতে নিয়ে খেতে লাগলো। পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা থাকায় নুডলস টা যেন অমৃত বলেই মনে হচ্ছে। অলির খাওয়ার গতি দেখে আলভীর চোখ আটকে যায়। মেয়েটা এতো বেশি ক্ষুধা নিয়েও চুপচাপ বসে ছিলো?
খাওয়ার মাঝেই হঠাৎ অলির চোখ যায় আলভীর দিকে। আলভীকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে অলি মুখের খাবার টুকুও যেন গিলতে ভুলে যায়। অলির রিয়েকশন দেখে আলভী চোখ সরিয়ে পুনরায় স্ক্রিনের দিকে মনোযোগ দিলো। কিছুক্ষণ যেতেই কাধের উপর কারো আলতো স্পর্শে আলভী ভ্রু কুচকে পাশে তাকাতেই দেখলো অলি পেস্ট্রি হাতে দাঁড়িয়ে আছে,
"কি চাই?"
আলভীর গম্ভীর কণ্ঠ শুনে অলি একটা শুষ্ক ঢোক গিলে মিনমিনিয়ে বলল,
"স্যরি, আমি হয়তো আপনার জন্য আনা খাবার গুলো খেয়ে ফেলেছি।"
অলির কথা শুনে আলভী থমকে গেলো। আলভীকে চুপ থাকতে দেখে অলি পুনরায় বলে ওঠে,
"আপনি এটা খেতে পারেন। আমি এটায় হাতও লাগাইনি।"
আলভী একবার অলির হাতে থাকা পেস্ট্রির দিকে তাকিয়ে পুনরায় অলির দিকে তাকায়। আলভীর সাথে চোখাচোখি হওয়া মাত্রই অলি মাথা নিচু করে নেয়,
"খাবার গুলো তোমার জন্যই আনা হয়েছিল। তাই এটাও তুমিই খেয়ে নেও"
আলভীর শীতল কন্ঠে অলির শরীর অসাড় হয়ে এলো৷ সে প্লেটটা নিয়ে ফিরে আসার জন্য ২পা এগিয়ে আবারও আলভীর দিকে ফিরে তাকায়। আলভী এখনো অলির গতিবিধিই পর্যবেক্ষণ করছিলো। অলি একটু ইতস্তত করে বলেই ফেলে,
"আপনিও তো সকালে ব্রেকফাস্ট শেষ না করেই চলে এসেছিলেন। আপনার ক্ষুধা লাগেনি?"
আলভী স্ক্রিনের দিকে ফোকাস করে বলল,
"কাজ করার সময় আমি ক্ষুধা অনুভব করিনা। যাও এখান থেকে"
"এটা কিভাবে সম্ভব এখন বেলা সাড়ে এগারোটা বাজে আর আপনি বলছেন কাজ করছেন সেই জন্য ক্ষুধা অনুভব করছেন না?"
"আমি অনেক ব্যস্ত আছি। বিরক্ত কোরোনা।"
অলি আর বেশিকিছু না বলে আলভীর কাছ থেকে সরে যায়। আলভী একবার আড়চোখে অলির দিকে তাকিয়ে আবারও কাজে মন দেয়। কিছুক্ষণ যেতেই অলি আবারও আলভীর পাশে এসে দাড়ালো। এইমূহুর্তে আসমা বানুর বলা একটা কথা তার মনে পড়ছে,
*আচ্ছা তুই কখনো এরকম কিছু করেছিস যার জন্য আলভীর তোর কথা মনে পড়বে?*
অলি সব ভাবনা সাইডে রেখে এক টুকরো পেস্ট্রি হাতে নিয়ে আলভীর মুখের সামনে ধরলো। আচমকা এরকম হওয়াতে আলভী হকচকিয়ে অলির দিকে তাকায়। অলি দ্রুতগতিতে বলে ওঠে,
"দেখুন আমি নিজের হাত খুব ভালো করে ধুয়ে এসেছি। আপনাকে কোনো কিছু অনুভব করতে হবেনা শুধু হা করুন"
আলভী কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই অলি পেস্ট্রির টুকরোটা আলভীর মুখে ঢুকিয়ে দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় আলভীর চোখ বড়বড় হয়ে যায়। তবে সে অলিকে কিছুই বলতে পারেনা। আলভীকে চুপচাপ খেতে দেখে অলির ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে ওঠে। আলভী মুগ্ধ হয়ে অলির দিকেই তাকিয়ে আছে। অলির গালের দাগগুলো কালচে রঙ ধারণ করতে শুরু করেছে। আলভী আনমনেই অলির গালে হাত রেখে বলে ওঠে,
"এগুলো মেক-আপ নয়, তাইনা?"
আলভীর আলতো স্পর্শেও অলি খানিকটা ব্যাথা পেয়ে যায়, মুখ ফসকে বলে ফেলে,
"হাত সরান প্লিজ"
অলির কথাটা আলভীর পছন্দ হলোনা সে নিজের হাত সরিয়ে বলল,
"আমি তোমাকে স্পর্শ করার জন্য ডেস্পারেট নই। জাস্ট মেক-আপ গুলো একটু বেশিই রিয়েলিস্টিক লাগছিলো। সেই জন্যই...
আলভী কথাটা শেষ করতে পারলোনা তার আগেই অলি নিজের দুহাত দিয়ে আলভীর ডান হাতটা ধরলো তারপর আলভীর সেই হাতটা নিজের গালে ঠেকাল। আলভী অবাক চোখে অলির দিকেই তাকিয়ে আছে। অলির হাতের কম্পন সে অনুভব করতে পারছে। অলির হাতদুটো অসম্ভব রকমের কাপছে। অলি জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে ওঠে,
"আপনি আমাকে যখন ইচ্ছা তখন স্পর্শ করতে পারেন আমি অনুমতি দিয়ে দিলাম। আর ১,৩ নম্বর শর্ত বাদে বাকি শর্তগুলোও আমি তুলে নেবো।"
আলভী কিছু বলতে যাবে তার আগেই দরজায় নক পড়ে। অলি আলভীর হাত ছেড়ে দিয়ে একটু দূরে সরে দাঁড়ায়। অলি জানেনা কেনো কিন্তু আলভীকে এখনো সে ভয় পায়। আলভীর হাত ধরা আর সিংহের হাত ধরা তার কাছে সমান ছিলো। এদিকে এমন টাইমে ডিস্টার্ব করায় আলভী বেশ বিরক্ত হলো তবুও দরজার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে বলল,
"কাম ইন"
সোহেল হাতে করে অনেকগুলো ফাইল নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো। ফাইলগুলো আলভীর ডেস্কের উপর রেখে বললো,
"স্যার ফাইলগুলোতে আপনার সাইনের প্রয়োজন।"
আলভী ফাইলগুলোর দিকে তাকিয়ে বেশ বিরক্ত হলো। সাইন চাইলেই কি সাইন দিয়ে দেওয়া যায়? সেগুলো তো আগে চেক করতে হবে তাইনা? কিন্তু এতো গুলো ফাইল সে কতোক্ষনে চেক করবে? আলভী একবার অলির দিকে তাকালো। মেয়েটা অন্যদিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আলভী কিছু একটা ভেবে বলে ওঠে,
"ইয়াদ অফিসে আছে?"
সোহেল বলল,
"না স্যার, ইয়াদ স্যার আজকে অফিসে আসেননি।"
"ওকে, তুমি যাও। আমি এগুলোতে সাইন করে তোমাকে ডাক দেবো"
সোহেল মাথা নেড়ে চলে যায়। ফাইলগুলো দেখে আলভীর প্রচন্ড রাগ উঠছে। সে তো সব কাজ তারাতাড়ি শেষ করতে চাইছিলো। কিন্তু কাজ আরও বেড়ে গেল। তার উপর ইয়াদও আসেনি। উসমান মির্জা আর ইয়ামিন মির্জাও নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছেন। তাছাড়া এই ফাইলগুলো অনেক বেশিই ইম্পোর্ট্যান্ট, তার নিজেরই চেক করে দেখা উচিৎ। আলভী একটা শ্বাস ফেলে ফাইলগুলো চেক করতে লাগলো। অলিও বুঝতে পারলো যে আলভীর অনেক কাজ আছে। সে আর আলভীর কাছে না গিয়ে সোফায় গিয়ে বসে পড়লো।
অন্যদিকে---
"বস বিশ্বাস করুন, আমি নিজেও জানিনা যে মেয়েটা কিভাবে পালিয়ে গেছে।"
নোমানের কথা শুনে রাগে ফেটে পড়ে ফোনের ওপাশে থাকা রিফাত,
"আমার কেনো মনে হচ্ছে যে তুই নিজেই ওকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিস?"
"বস আপনি এসব কি বলছেন? আপনি তো জানেনই যে টাকাগুলো আমার কতো বেশি প্রয়োজন। তাছাড়া আমি যদি মেয়েটাকে বাচাতেই চাইতাম তাহলে কি কিডন্যাপ করে নিয়ে আসতাম? আপনিই বলুন,"
ফোনের ওপাশে থাকা রিফাতের হাত থেকে অন্য লোকটা ফোনটা নিয়ে বলে ওঠে,
"অতোগুলো গার্ডস থাকতে কি করে মেয়েটা পালিয়ে গেলো? তুই কি করছিলি তখন?"
"বস আমি মেয়েটার হাতে ঘুমের ইঞ্জেকশন পুশ করে দিয়ে নিজের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তারপর আমার আর কিচ্ছু মনে নেই। সকালে আমার ঘুম ভাঙ্গতেই দেখলাম আমি হসপিটালে আছি। বস মেয়েটা প্রচন্ড চালাক, আমাকেই ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে পালিয়ে গেছে।"
ফোনের ওপাশে থাকা লোকটা কর্কশ কন্ঠে বলে ওঠে,
"আমি জানিনা কিভাবে কিন্তু মেয়েটাকে আবারও বন্দি কর নোমান। নয়তো ওই মেয়েটার জায়গায় তোর নানীকেই ক*বর দেবো আমি। তুই আমাকে চিনিস না।"
লোকটার কথা শুনে নোমান আঁতকে উঠল। লোকটা যে এতটা নৃশংস সেটা নোমান ভাবতেও পারেনি। নোমান যদি জানতো যে আঘাত টা তার নানুর উপর এসে পড়বে তাহলে অলিকে সে কোনোভাবেই পালিয়ে যেতে সাহায্য করতোনা। টুট টুট আওয়াজে কল কেটে যায়,
---
বিকেল ৩টা আলভীর কাজ কিছুক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে। আলভী সব ফাইল গুলো গুছিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালো। রুমের কোণায় থাকা সোফার দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেল। সেখানে বসে থাকতে থাকতে অলি কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, সে নিজেও টের পায়নি। চোখ বোজা মুখটায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। অলির গালের দাগগুলো দেখে আলভীর বুক কেঁপে উঠলো। সে চোখ নামিয়ে ধীরে ধীরে অলির সামনে এসে বসল। অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ—চোখে একরাশ অপরাধবোধ।
"তোর চেহারার এই অবস্থা রিফাত করেছে তাইনা? আমি ওকে ছাড়বোনা হানিবি। আ'ম স্যরি আমি তোকে প্রোটেক্ট করতে পারিনি। আমার উচিৎ ছিলো তোকে জোর করে নিজের কাছে আটকে রাখা। আসলে আমি শুনেছিলাম ভালোবাসলে নাকি আটকে রাখতে নেই। মুক্ত করে দিতে হয়। আর মুক্ত করে দেওয়ার পরেও যে চলে না গিয়ে ফিরে আসে তাকে অনেক যত্ন করে আগলে রাখতে হয়। আমি জানিনা কি হচ্ছে বা ভবিষ্যতে কি হবে কিন্তু আমি আজ থেকে তোকে প্রটেক্ট করবো, তোকে আগলে রাখবো। প্রমিস করলাম"
অফিসরুমের ভেতরে যেন একটা ভারী নীরবতা নেমে এলো। জানালার পর্দা নড়ছে ধীরে ধীরে, আলভী নীচু হয়ে অলির চুলে হাত বুলিয়ে দিলো নিঃশব্দে।
চলবে,,,