ফন্ট সাইজ:
থিম:
১৫ বছর বয়সী মা

৪০তম পর্ব

লেখক: সোফিয়া সাফা

#১৫_বছর_বয়সী_মা (৪১)

#সোফিয়া_সাফা

বিকেলের দিকে সূর্যের তাপ কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে এসেছে। ক্লান্তি ভরা দুপুরের ভার নেমেছে কিছুটা। আলভী আর অলি হসপিটাল থেকে বাইরে আসতেই দেখলো দিহান গাড়ির পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। আলভী রেগেমেগে এগিয়ে গেলো সেই দিকে,

“এই তুই এখানে কি করছিস হ্যাঁ? তোর সাহস তো কম না।”

দিহান ঝড়ের বেগে আলভীর সামনে এসে বলল,

“ওই শা*লা তুই কোথায় গিয়েছিলি ওকে আটকে রেখে? তোর মধ্যে কমন সেন্স টুকুও নেই দেখছি।”

আলভী রাগের বশে ফের দিহানের শার্টের কলার চেপে ধরে দাতে দাত চেপে বলল,

“খবরদার শা*লা বলবিনা। আমার বোনের ধারে কাছেও আমি আর তোকে ঘেষতে দেবোনা। যা ভাগ এখান থেকে।”

“হুম তুই তো ওর বড় ভাই তুই আমার শা*লা হবিনা। কিন্তু তুই কাজটা ঠিক করিসনি সম্বন্ধি। প্লিজ ওকে আনলক কর।”

“আমাকে সম্বন্ধি বললি তুই? এত্তোবড় সাহস?”

অলি এগিয়ে এসে যেইনা আলভীর শার্টের কোণা ধরতে যাবে ঠিক তখনই আলভী ধমক দিয়ে বলে,

“আমার শার্টে হাত দিলে আমি কিন্তু ওর সাথে তোমাকেও লক করে রাখবো।”

অলি একটা ঢোক গিলে ঊর্মিলার দিকে এগিয়ে গেলো। জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলো ঊর্মিলা হাটুতে মুখ গুজে বসে আছে।

“ঊর্মি আপু, তুমি ঠিক আছোতো?”

ঊর্মিলা মুখ তুলে অলির দিকে তাকালো। অলিকে দেখে ঊর্মিলা ডুকরে কেদে ওঠে,

“ভাবী প্লিজ আমাকে বের করো এখান থেকে। আমার অবস্থা অনেক খারাপ। ওয়াশরুমে যেতে হবে।”

ঊর্মিলার কান্না দেখে অলির ভীষণ খারাপ লাগলো। কিন্তু সে কি করবে? অলি কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে আলভীর কাছে আসলো। আলভী তো দিহানের সাথে একপ্রকার মা*রামা*রিই লাগিয়ে দিয়েছে। অলি কিছু না ভেবেই বলে ওঠে,

“শুনছেন? আপু বলেছে আপনি তাকে বের না করলে সে নাকি আপনার গাড়িতেই হি'সু করে দেবে।”

আলভী দিহানকে ঘুষি দেয়ার জন্য হাত উঠিয়েছিলো কিন্তু অলির কথা শুনে সে তব্দা খেয়ে অলির দিকে তাকায়। দিহানও ভ্রু কুচকে অলির দিকে তাকালো। তার মানে এতোক্ষণ যাবত ঊর্মিলা এই জন্যই কান্না করছিলো? সে এতোবার জিজ্ঞেস করার পরেও মেয়েটা কিচ্ছুটি বললোনা। আলভী দিহানকে ছেড়ে দিয়ে গাড়ির দিকে দৌড় দিলো।

“শিট,,,

দিহানও তার পিছুপিছু আসতে আসতে বললো,

“কিরে এখন দৌড়ে যাচ্ছিস কেনো। মার*বিনা আমাকে?”

আলভী তড়িঘড়ি করে গাড়ির লক খুলে দিতেই ঊর্মিলা বেরিয়ে এলো। সে জানেনা হঠাৎ অলি কি এমন বলেছে যার জন্য আলভী এভাবে দৌড়ে এসে গাড়ির লক খুলে দিলো। ঊর্মিলা বের হতেই আলভী গাড়ি চেক করে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

“আয় আমার সাথে।”

ঊর্মিলা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আলভীর দিকে তাকাতেই আলভী গলা পরিষ্কার করে বলে।

“ওয়াশরুম দেখিয়ে দিচ্ছি।”

কথাটা শুনে ঊর্মিলা থতমত খেয়ে গেলো। সে বুঝতে পারলো, তার পিচ্চি ভাবীটাহ তার মান সম্মানের ফালুদা বানিয়ে সবাইকে খাইয়েছে। আলভী দিহানের উদ্দেশ্যে বলল,

“অলিকে রেখে যাচ্ছি। কষ্ট করে আবারও হসপিটালের ভেতরে যেতে হবেনা। ওকে দেখে রাখিস।”

দিহান মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। আর আলভীও হাটা ধরলো। ঊর্মিলা মাথা নিচু করে তাকে অনুসরণ করতে লাগলো। তারা চলে যেতেই দিহান অলির উদ্দেশ্যে বলল,

“ঊর্মির জায়গায় আমি থাকলে নিশ্চিত গাড়িতেই… করে দিতাম। কিন্তু এই মেয়ে এতো ইনোসেন্ট আহ। এভির মতো দজ্জালের গাড়িকে ক্লিন রাখতে ও এতোক্ষণ কষ্ট কেনো করলো? দ্যাটস আনফেয়ার।”

দিহানের কথা শুনে অলি সরু চোখে তার দিকে তাকায়।

“উনি দজ্জাল নন। আপনিই বন্ধু হিসেবে বেঈমান। আপনার জন্যই আমার নির্দোষ ননদটাকে এতোক্ষণ কষ্ট পেতে হলো।”

দিহানের কপাল কুচকে এলো। মেয়েটা বলে কি?

“আপনি এটা কি বললেন ভাবী? এখানে আমার দোষ কোথায়? আপনার নির্দোষ ননদটাই তো আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়েছিলো। আপনিই ভেবে দেখুন আমি যদি ওকে না করে দিতাম, তাহলে ও অন্য ডাক্তারের কাছে চলে যেতো এটা কি শোভনীয় দেখাতো? বন্ধুর বোন আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়েছে আমি সেটাও যদি না দিতে পারি তাহলে কেমন বন্ধু হলাম?”

কথাগুলো সব অলির মাথার উপর দিয়ে গেলো। সে শুধু ড্যাবড্যাব করে দিহানের দিকে তাকিয়ে রইলো। দিহানও বুঝতে পারলো যে অলি কিছুই বোঝেনি। সে একটা শ্বাস ফেলে বললো,

“আপনাকে সহজ ভাষায় বলছি ভাবী। আমি আপনার ননদকে ভালোবাসি। তাই ও আমার সাথে দেখা করতে চাওয়ায় আমি না করতে পারিনি।”

অলি সন্দিহান চোখে দিহানের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনি সত্যিই আপুকে ভালোবাসেন?”

“হুম। অনেক ভালোবাসি।”

অলি আনমনেই প্রশ্ন করলো,

“কতোটা?”

দিহান আড়চোখে একবার অলির দিকে তাকিয়ে বলল,

“যতটা ভালো এভি আপনাকে বাসে। আমিও ঠিক ততোটাই ভালো আপনার ননদকে বাসি।”

অলি চমকে গেলো। দিহান তার প্রতি আলভীর ভালোবাসাকে উদাহরণ দিয়ে ভালোবাসার গভীরতা বোঝাতে চাইছে?

“আমি সব কাজ ছেড়ে ছুড়ে গাড়ির সামনেই সারাটাদিন দাড়িয়ে ছিলাম। আপনি ভাবতে পারছেন? দুপুরের উত্তপ্ত রোদের মাঝেও ওকে পাহারা দিয়েছি। ভাগ্যিস ও আমাকে কল দিয়েছিলো। নইলে তো আমি ভাবতাম এভি ওকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে।”

দিহানের কথার মাঝেই আলভী ঊর্মিলাকে নিয়ে চলে আসে। ঊর্মিলা চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসলো। অলি সামনের সিটে বসতে গেলে আলভী তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,

“অলি তুমি ঊর্মির পাশে বসো।”

অলি প্রশ্ন না করেই ঊর্মিলার পাশে গিয়ে বসলো। আলভী ড্রাইভিং সিটে বসে দিহানের উদ্দেশ্যে বলল,

“গাড়িতে উঠে বস।”

তার কথায় দিহানের সাথে সাথে অলি আর ঊর্মিলাও অবাক হলো।

“তারাতাড়ি ওঠ।”

দিহান একটা শ্বাস ফেলে গাড়িতে উঠে বসলো। আলভী গাড়িটাকে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে এনে থামালো। তারা চারজন গিয়ে একটা টেবিলে বসলো। একপাশে অলি আর ঊর্মিলা বসেছে আরেকপাশে দিহান আর আলভী বসেছে। ঊর্মিলা চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে। আলভী হঠাৎ জিজ্ঞেস করলো,

“ঊর্মি তুই দিহানকে ভালোবাসিস?”

আলভীর প্রশ্নে অলি আড়চোখে আলভীর দিকে তাকায় কিন্তু মুখে কিছুই বলেনা। সে এতোদিনে বুঝতে পেরেছে দিহান রিফাতের মতো বাজে লোক নয়। কিন্তু তারপরও দিহানকে সে ঊর্মিলার প্রেমিক হিসেবে বিশ্বাস করতে পারছেনা।

“কিরে বলছিস না কেনো?”

ঊর্মিলা কান্না আটকে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ে। আলভী দিহানের দিকে তাকিয়ে ভারী গলায় প্রশ্ন করে,

“তুই ওকে প্রপোজ করেছিলি? নাকি ঊর্মি তোকে প্রপোজ করেছে?”

দিহান স্বাভাবিক স্বরেই বলে,

“আমিই তোর বোনকে প্রপোজ করেছি।”

আলভী একটা চাপা শ্বাস ফেলল। দিহান আলভীর মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে বললো,

“আমি জানি তুই রিফাতের বলা কথাগুলো ভাবছিস। ও নিজের বোনকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলেছিলো। তুইও কি সেগুলোই ভাবছিস এভি?”

আলভী নিশ্চুপ হয়ে রইলো।

“দেখ এভি। রিফাত একটা জঘন্য ছেলে। ওর কথার কোনো লজিক নেই। আমি সত্যিই ঊর্মিকে ভালোবাসি। তবে তুই যদি না চাস, আমি তোর বোনের সাথে সম্পর্ক রাখবোনা।”

দিহানের কথায় আলভী ভ্রু কুচকে তার দিকে তাকায়। আর ঊর্মিলা তো ছলছল চোখে দিহানের দিকেই তাকিয়ে আছে। দিহান একবার ঊর্মিলার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নেয়।

“তুই আমার কথায় ঊর্মির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবি?”

আলভীর প্রশ্নের উত্তরে দিহান মলিন হেসে বলে।

“তুই আমার বন্ধু কম ভাই এভি। তুই জানিস আমার কখন সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে?”

দিহান থামলো। একটা শ্বাস টেনে বলল,

“যখন তুই রিফাতের সাথে আমাকে তুলনা করিস তখন। রিফাত একটা বাজে ছেলে এভি। সেটা তুই আর আমি আগে থেকেই জানতাম। তবুও ছোটবেলার বন্ধু ভেবে আমরা ওকে যথেষ্ট ছাড় দিয়েছি। দয়া করে কক্ষনো আমাকে ওর সাথে কম্পেয়ার করিসনা।”

অলি যখন শুনলো যে ঊর্মিলাও দিহানকে ভালোবাসে তখনই তার মনে থাকা দিহানকে নিয়ে উল্টো পাল্টা চিন্তাগুলো বিলীন হয়ে গেছে। তাছাড়া সে দেখেছিলো সেইদিন গুলোতে যখন আলভী অলিকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলো তখন দিহান একা হাতেই সবদিক সামাল দিয়েছিলো। দিহানের অসৎ উদ্দেশ্যে থাকলে এতোকিছু করতোনা নিশ্চয়ই?

আলভী কিছুক্ষণ বসে থেকে খাবার অর্ডার করলো এসবের চক্করে কেউই লাঞ্চ করেনি। এখন বিকেল চার টা বাজে। অলিকে এতোক্ষণ না খাইয়ে রাখাটা একদমই ঠিক হয়নি। খাবার দিয়ে গেলে বিনাবাক্যে সবাই খেয়ে নিলো। তারপর আলভী উঠে দাড়িয়ে বলল।

“তুই যদি আমার বোনকে ভালোবেসেই থাকিস তাহলে নিশ্চয়ই ওর খারাপ চাইবিনা?”

দিহান জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। আলভী গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,

“সামনে ওর ইয়ার ফাইনাল এক্সাম। সেটা নিশ্চয়ই জানিস?”

দিহান হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ে।

“যদি ওর আর নিজের ভালো চাস তাহলে ওকে ক্লাস ফাকি দিতে দিবিনা। ওর ছেলেমানুষীতেও সায় দিবিনা বুঝলি?”

ঊর্মিলা ভয়ার্ত চোখে একবার আলভীর দিকে তাকায়। আলভীর শান্ত কন্ঠ শুনে সে অবাকই হচ্ছে। আলভী হঠাৎ করেই বলে ওঠে,

“আমি বলেছিলাম ও এক্সামে ফেল করলে ওকে মুচি, রিক্সাওয়ালা বা নাপিত দেখেই বিয়ে দেবো। তো সেটা আমি আবারও রিপিট করছি।”

আলভীর কথা শুনে সবাই আহাম্মকের মতো আলভীর দিকেই তাকায়। আলভী মৃদু হেসে বলল,

“সিম্পল, ঊর্মি এক্সামে ফেল করলে তোকে এই ৩ টার মধ্যে একটা প্রফেশন বেছে নিতে হবে তবেই আমি ওকে তোর সাথে বিয়ে দেবো। নইলে তুই পাত্রের লিস্ট থেকে আউট হয়ে যাবি। কারণ ফেল করা মেয়ে তোর মতো MBBS পাশ করা ছেলের সাথে যায়না।”

আলভীর কথা শুনে দিহান আর অলি ফিক করে হেসে উঠলো। ঊর্মিলা বেচারি ভেতরে ভেতরে রেগে গেলেও আপাতত আলভীকে কিছু বলার সাহস নেই। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। কিছুক্ষণ পর আলভী সিরিয়াস গলায় বলল,

“ওর এক্সাম শেষ হোক তারপর সোজা অভিভাবক নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসবি। তার আগে ওর সাথে দেখা করা একদম বন্ধ। যদি আমার কথার অবাধ্য হয়ে দেখা করিস তাহলে কিন্তু…

“ভয় দেখাতে হবেনা ভাই আমি তোর বোনের সাথে আর দেখা করবোনা।”

“হুম সেটাই ভালো। আমার মাকে তো চিনিসই, যদি একবার নিজের মেয়ের এই কুকর্মের কথা তার কানে যায়। তাহলে ওকে কি করবে তা আমিও জানিনা। মনে রাখিস আমার সুপারিশ ছাড়া কিন্তু এই জন্মে তোদের বিয়ে হবেনা।”

দিহান একগাল হেসে আলভীকে জড়িয়ে ধরলো,

“হয়েছে হয়েছে, ছাড়।”

এরপর আলভী ঊর্মিলা আর অলিকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

,

সন্ধ্যার সময় আলভী নিজের রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলো। অলি সেই ফাঁকে রুম থেকে বেরিয়ে কিচেনে আসে। এইবাড়িতে আসার পর সে এই প্রথম কিচেনে এসেছে। সেখানে এসে দেখল, কয়েকজন সার্ভেন্ট মিলে ডিনার রেডি করছে। নূরনাহার তাদের কাজের তদারকি করছেন। শাহানাজ বেগমকে না দেখে অলি একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল,

অলিকে কিচেনের দিকে আসতে দেখে নূরনাহার জিজ্ঞেস করলেন।

“কিছুকি লাগবে?”

অলি মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে বলল,

“কাকীমা, আমি কি কিচেন টা ব্যবহার করতে পারি?”

অলির কথার উত্তরে নূরনাহার অবাক হলেন,

“তুমি কিছু খেতে চাইলে আমাকে বলো আমি রান্না করে দিচ্ছি।”

নূরনাহারের ব্যবহারে অলি খুশি হলো। এদিকে অলিকে দেখে নূরনাহার আগের ঘটনা ভুলে গেছেন। তাছাড়া আলভীর সেগুলো নিয়ে কোনো সমস্যা না হলে তারও বিশেষ সমস্যা নেই। হয়তো ছবিতে থাকা ছেলেটা অলির আত্মীয় বা পরিচিত কেউ ছিলো। সেটা নিয়ে অলিকে এতো কথা শোনানো যুক্তিযুক্ত নয়। তার উপর মেয়েটা বাবা মা হারিয়েছে কিছুদিন হলো মাত্র। এইসব ভেবেই নূরনাহার পুরোনো ঘটনা সব ভুলে গেছেন।

“আপনার বড় ছেলের জন্য নিজের হাতে কফি বানাতে চাইছি কাকীমা। আমাকে কি কিচেন ব্যবহার করতে দেবেন?”

নূরনাহার মুখে হাসি টেনে বলল,

“বাহঃ খুব ভালো। কিন্তু তুমি কি কফি বানাতে জানো?”

অলি নাবোধক মাথা নাড়ে,

“তাহলে কিভাবে বানাবে?”

অলি নিজের ফোনটা বের করে একটা ভিডিও প্লে করে নূরনাহারকে দেখায়।

“এই ভিডিওতে দেখানো কফির রেসিপি অনুসরণ করেই আমি বানিয়ে নেবো কাকীমা।”

“তুমি চাইলে আমি তোমাকে সাহায্য করতেই পারি।”

নূরনাহারের কথা শুনে অলির চোখজোড়া চকচক করে উঠলো। খুশি হয়ে বলল,

“আপনি আমাকে সাহায্য করবেন?”

“হুম, কেনো করবোনা। এসো আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।”

অলি মাথা নেড়ে চুলার দিকে এগিয়ে যায়।

নূরনাহার তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন,

“পার্ফেক্ট কফি বানাতে হলে পরিমাণ মতো উপাদান দিতে হয়। প্রথমে ইনস্ট্যান্ট কফি পাউডার, তারপর দুধ, তারপর চিনি। চাইলে একটু দারচিনি পাউডারও দেয়া যায়। তবে আলভী সাধারণত প্লেইন কফিই পছন্দ করে।”

তিনি হাত বাড়িয়ে কাঠের র‍্যাক থেকে কফি জার নামিয়ে আনলেন। তারপর একটা ছোট সসপ্যানে আধা কাপ দুধ, আধা কাপ পানি মিশিয়ে বললেন,

“এই পরিমাণে ১ চামচ কফি, ১ চামচ চিনি দিলেই যথেষ্ট। পানি আর দুধ গরম করে কফি ও চিনি মিশিয়ে নিলেই হয়ে যাবে।"

অলি মন দিয়ে সব শুনলো। তার চোখে মুখে আগ্রহ উপচে পড়ছে। নূরনাহার একটু হাসলেন,

“তুমি চেষ্টা করলেই পারবে,”

এরই মাঝে ইয়ামিন মির্জার ডাক ভেসে আসে। সে নূরনাহারকে ডাকছেন। নূরনাহার অলির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“আমি একটু দেখে আসি, তোমার কাকা শ্বশুর কেনো ডাকছেন। তুমি চালিয়ে যাও, কিছুর দরকার হলে সার্ভেন্টদের কাউকে জিজ্ঞেস করো কেমন?”

অলি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললো। নূরনাহার চলে যেতেই অলি নিজ হাতে সবটা করতে শুরু করলো।

সসপ্যানের দুধ আর পানি গরম হতে দিলো। এক চামচ কফি পাউডার ঢাললো নিখুঁতভাবে। কিন্তু চিনি নিতে গিয়ে সে বিভ্রান্ত হলো। কিচেনের তাকের ওপর দুইটা হুবহু একরকম কাচের বয়ামের একটাতে চিনি, আরেকটাতে লবণ রাখা ছিল।

অলি সার্ভেন্টদের একজনকে জিজ্ঞেস করার উদ্দেশ্যে পেছনে তাকাতেই দেখলো শাহানাজ বেগম কিচেনে এসেছেন। তার চাহনি দেখেই বোঝা যাচ্ছে তাকে নিয়ে সে মনেমনে কটু কথা বলছেন। কিন্তু আলভী বাড়িতে থাকায়, নিজের রাগটার বহিঃপ্রকাশ করতে পারছেন না। এরকম পরিস্থিতিতে অলি আর কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলোনা। সে একটা শুষ্ক ঢোক গিলে আন্দাজেই একটা বয়াম থেকে এক চামচ চিনি নিয়ে মিশিয়ে দিলো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই কফি তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু শাহানাজ বেগমের জ্বলন্ত দৃষ্টির জন্য অলি ঠিকঠাকভাবে ফোকাস করতে পারছেনা। সে সসপ্যান থেকে মগে কফি ঢালতে উদ্যত হয়। কিন্তু তার হাত পা অস্বাভাবিক ভাবে কাপছে। যার কারণে সে নিজের উপরেই বিরক্তবোধ করছে। ছোটবেলায় দেখা দজ্জাল শাশুড়ী ছবিটার কথা মনে পড়ছে। তার ভাগ্যেই এমন দজ্জাল শাশুড়ী জুটতে হলো? কাপাকাপির ঠেলায় অসাবধানতা বশত কিছুটা গরম কফি তার বাম হাতের বৃদ্ধা আঙুলের উপর পড়তেই অলি শিউরে ওঠে। মুখ থেকে আপনা-আপনিই মৃদুস্বরে বেরিয়ে আসে,

“ও মাগোওওও।”

অলি চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে নেয়। বন্ধ চোখের পাপড়ি ভেদ করে একফোঁটা নোনাজল গাল বেয়ে চিবুকে এসে ঠেকে। তবুও নিজেকে সংযত করে চোখ মেলে কফি টুকু মগে ঢালে। একহাতে চোখের পানিটুকু মুছে শাহানাজ বেগমের দিকে তাকাতেই দেখলো। এতোক্ষণ যাবত রাগীচোখে তাকিয়ে থাকলেও তার চাহনি কিছুটা কোমল হয়েছে। অলির সাথে চোখাচোখি হতেই শাহানাজ বেগম চোখ সরিয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে যান। অলি মাথার ওড়না টা ঠিকঠাক করে কফির মগ হাতে ধীরে ধীরে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গেলো।

আলভী অনলাইনে মিটিং এটেন্ড করছিলো। মাত্রই তার মিটিং শেষ হয়েছে। এরই মাঝে অলি এসে আলভীর দিকে কফির মগটা এগিয়ে দেয়। আলভী হকচকিয়ে অলির দিকে তাকাতেই অলি মিষ্টি হেসে বলে,

“আপনার জন্য অলি ফাস্ট টাইম কফি বানিয়েছে।”

অলির কথা বলার ধরন শুনে আলভী খুশি হলেও সে কফি বানিয়েছে শুনে আলভীর কপাল কুচকে এলো।

“তোমাকে কফি বানাতে কে বলেছে?”

অলি আলভীর সামনে বসে বলল,

“কেউ বলেনি। কিন্তু কেউ একজন বলেছিলো যে আমার স্বামীর ভাগ্যে নাকি কফিটুকুও জুটবেনা। আমি শুধু মাত্র সেই কথাটাকে ভুল প্রমাণ করতে চাইছি।”

“কাম অন অলি। ওই বেয়াদবের কথায় তুমি এসব করতে যেওনা।”

অলি ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

“কফিটা ঠান্ডা হয়ে যাবে। খাবেন না?”

আলভী একটা শ্বাস ফেলে কফির মগটা হাতে নিয়ে বলে, “তুমি ফাস্ট টাইম কফি বানিয়েছো রাইট?”

অলি হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ে। আলভী এবার সুক্ষ্ম চোখে অলির দিকে তাকিয়ে বলে,

“আবার হাতে টাতে ফেলোনি তো?”

অলি বাম হাতটা আলগোছে ওড়নার নিচে নিয়ে না বোধক মাথা নেড়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে ওঠে,

“আপনি কি কফি ঠান্ডা করেই খান নাকি?”

আলভী ল্যাপটপ টা সাইডে রেখে সোজা হয়ে বসলো। তারপর কফির মগটায় একটা চুমুক দিতেই তার মুখ বেকে যায়। এমন বাজে কফি সে এই জন্মে খেয়েছে কিনা সন্দেহ আছে। সে একবার অলির দিকে তাকিয়ে দেখলো, অলি কফির টেস্ট সম্পর্কে জানার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে। আলভী মূহুর্তেই ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটিয়ে বলল,

“বাহঃ এতো ভালো কফি আমি জীবনেও খাইনি।”

অলির চোখে মুখে বিশ্বজয়ের হাসি ফুটে ওঠে।

“সত্যিই ভালো হয়েছে?”

আলভীর ইচ্ছা তো করছে অলিকে কাছে এনে আদর করে দিতে। অলিকে খুশি দেখে সে নিজেও খুশি হয়ে গেছে। অলিকে এভাবে হাসতে আর লজ্জা পেতে দেখতে বড্ড বেশিই আদূরে লাগে। আলভী পুনরায় কফির মগে চুমুক দেয়। এই বিদঘুটে নোনতা স্বাদের কফিও তার কাছে অমৃত বলে মনে হচ্ছে।

সে লক্ষ্য করেছে সে যেই কয়বার কফির মগে চুমুক দেয় সেই কয়বার অলি একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চাহনি একদম নিখুঁত। অলির সেই চাহনিতে সে নিজেও হারিয়ে যায়। আলভীর কফি খাওয়া শেষ হতেই অলি বলে ওঠে, “আপনি কেমন জানি,”

আলভী থমকে গেলো, “মানে?”

“মানে আমি প্রথম বারের মতো কফি বানিয়ে আনলাম, আপনি আমাকে একবার টেস্ট করতেও বললেন না? এটা কি ঠিক করলেন?”

আলভী কি বলবে খুঁজে পেলোনা। অনেক ভাবনা চিন্তা করে বলল, “স্যরি হানিবি। আসলে কফিটা অনেক বেশিই মজা ছিলো তো। তাই আমি তোমাকে টেস্ট করার কথা বলতেও ভুলে গিয়েছি। তুমি কি রাগ করেছো?”

অলি সাথে সাথেই মাথা নেড়ে না বলল। আলভী অলির দিকে দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“এতো ভালো কফি খাইয়েছো তার জন্য তোমাকে একটা গিফট দেই, কাছে এসো।”

আলভীর কথা শুনে অলি ভ্রুকুটি করে বলে,

“আপনাকে নিজে থেকে গিফট দিতে হবেনা। যদি গিফট দিতেই চান তাহলে আমি যা চাইবো তাই দিন।”

অলির কথা শুনে আলভী সিরিয়াস গলায় বললো,

“তোমার কিছু লাগলে তুমি আমার কাছে এমনিতেই তো চাইতে পারো হানিবি।”

অলি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“আপনার কাছে ফোন থাকলে আমি অবশ্যই কল করে আসার সময় নিয়ে আসতে বলতাম।”

“আজকে বাইরে গেলাম তখনও তো চাইতে পারতে।”

“ঊর্মি আপুর জন্য মনেই ছিলোনা।”

আলভী ভাবলো অলি হয়তো ভীষণ দরকারি কিছুই চাইবে।

“কি লাগবে তোমার, শুধু বলো আমাকে।”

অলি মাথা নিচু করে বলতে লাগলো,

“কালকে ঊর্মি আপু আমার জন্য আমের আচার এনেছিলো।”

“হু?”

“আমার খেতে ইচ্ছা করেছিলো কিন্তু ফুপিমণি বানিয়েছে শুনে আমি আর খাইনি। আপনিই তো বলেছিলেন কেউ কিছু দিলে না খেতে।”

“হুম ভালো করেছো”

অলি একবার আলভীর দিকে তাকায়।

“আমার ভীষণ কাঁচা আমের আচার খেতে ইচ্ছা করছে। প্লিজ আপনি যেখান থেকে পারেন এনে দিন।”

অলির কথা শুনে আলভী সাথে সাথেই বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়।

চলবে,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন