ফন্ট সাইজ:
থিম:
১৫ বছর বয়সী মা

৪৬তম পর্ব

লেখক: সোফিয়া সাফা

#১৫_বছর_বয়সী_মা (৪৭)

#সোফিয়া_সাফা

আলভী কিছুক্ষণ অলির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

“তো? ২৮ সপ্তাহ আর সাড়ে ছয় মাস কি একসমান নয়?”

অলি ভ্রু কুচকে তাকালো। আলভী ঠিকই বলেছে,

“আই থিংক আমাদের একবার হসপিটালে যেতে হবে।”

“কেনো? হসপিটালে যাবো কেনো?”

“তুমি বেবির নড়াচড়া অনুভব করছোনা। তোমার কি মনে হয়, ২৮ সপ্তাহে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার?”

অলি কথাটা বুঝতে পারলোনা।

“স্বাভাবিক ব্যাপার নয় মানে?”

আলভী হয়তো অলিকে কিছু বলতে চাইলো কিন্তু অলির চেহারাটা দেখে সে আর বলে উঠতে পারলোনা। সে জানে এই কথাটা অলিকে বললে, অলি অনেক চিন্তায় পড়ে যাবে।

“কিছুনা, রেডি হয়ে নেও।”

***

ঘড়ির কাটা জানান দিচ্ছে এখন সময় ৬ টা। অলিকে নিয়ে আলভী হসপিটালে এসে পৌছেছে। তারা করিডর দিয়ে হেটে যাচ্ছিলো তখনই অলি বলে ওঠে,

“একটা বিষয় জানানোর ছিলো,”

“হুম বলো।”

বেশ কিছুক্ষণ পেরিয়ে গেলো, কিন্তু অলি কথাটা বলে উঠতেই পারছেনা। আলভী ফোন চাপছিলো, সে এবার ফোনটা পকেটে রেখে অলির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো, অলি তার থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। আলভী পিছিয়ে এসে দেখলো অলি ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে হাত কচলাচ্ছে, আলভী একটা শ্বাস ফেলল,

“এরকম করছো কেনো? যা বলতে চাইছো বলে ফেলো।”

অলি আলভীর শার্টের বাটনের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো,

“আসলে আমার সব জামাকাপড় টাইট হয়ে গেছে…

আলভী ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নিজের উপরেই খানিকটা বিরক্ত হলো। তার এই বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিৎ ছিলো।

“আ…এখান থেকে বেরিয়ে আমরা শপিং করতে যাবো।”

অলি মাথা নিচু রেখেই ডান দিকে ঘাড় কাত করলো। অলির এই ব্যাপার গুলো আলভীর কাছে অনেক কিউট লাগে। ইচ্ছা করে আদূরে ভঙ্গিতে গাল টেনে দিতে। আলভী এবার অলির হাত ধরে হাটতে লাগলো। কিছুদূর যেতেই অলি আবারও বলে ওঠে,

“আল্ট্রাসনোগ্রাম কে করবে?”

“চিন্তা কোরোনা, একজন ফিমেল রেডিওলজিস্ট করবে।”

অলি দাঁড়িয়ে পড়লো, আলভী কিছু বুঝে ওঠার আগেই অলি বলে উঠলো,

“আমি চাই আজকের আল্ট্রাসনোগ্রাম টা আপনিই করুন।”

আলভীর চোখজোড়া বিস্ময়ে বড়বড় হয়ে গেলো। অলি নিজে থেকেই তাকে আল্ট্রাসাউন্ড করতে বলছে?

“আর ইউ সিওর?”

অলি হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। ফলস্বরূপ আলভীর ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠলো। আলভী পুনরায় অলির হাত ধরে সনোগ্রাফি রুমে নিয়ে এলো। অলিকে বেডে বসিয়ে দিয়ে আলভী স্ক্রিটের সামনে বসলো। অলি একটা শ্বাস ফেলে বিনাবাক্যে বোরকা টা বুক পর্যন্ত তুললো। তারপর কাপা কাপা হাতে টপস সরাতেই ফর্সা পেট উন্মুক্ত হয়ে গেলো। আলভী প্রোবটা হাতে নিয়ে অলির দিকে তাকাতেই দেখলো অলি চোখমুখ খিচে বন্ধ করে রেখেছে। আলভী অলির দিকে খানিকটা ঝুকে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“তোমার অস্বস্তি লাগলে আমি চলে যাচ্ছি।”

অলি ফট করে চোখ খুলে না বোধক মাথা নাড়ে। আলভী মৃদু হেসে অলির পেটের দিকে তাকালো। তারপর একটা শুষ্ক ঢোক গিলে প্রোবটা নামিয়ে রেখে জেলের বোতল খুলল।

“জেলটা একটু ঠান্ডা লাগবে,”

বলেই পেটের ওপর পাতলা করে জেল মাখিয়ে দিয়ে প্রোবটাতেও জেল মেখে নিলো। রুমের লাইটের আলো ডিম করে দিয়ে স্ক্রিনের আলোটা বাড়িয়ে দিলো।

প্রোব ছোঁয়াতেই স্ক্রিনে দানা-দানা ছায়া পরিষ্কার হয়ে গোল মাথার আউটলাইন দেখা দিল। আলভী গলার স্বর নামিয়ে অলির দিকে তাকায়,

“স্ক্রিনে দেখো…এটা মাথা। এই যে সরু সরু দাগ দেখছো এটা মেরুদণ্ড।”

সে প্রোবটা অন্যদিকে ঘোরাতেই স্পন্দন ধরা পড়ল। আলভী ডপলার চালু করতেই ঘরটা টুং-টুং শব্দে ভরে উঠল। আলভী একদৃষ্টে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,

“এটাই ওর হার্টবিট। রেটটা প্রায় একশো চল্লিশের আশেপাশে, যার মানে নরমাল আছে,”

অলি অন্যমনস্ক হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো।

“আচ্ছা ও নড়ছেনা কেনো…”

অলির কন্ঠস্বর আটকে আসছে। চোখের কোণেও পানি জমেছে।

আলভী প্রোবটা একটু উপরে টেনে নিয়ে ডানে বামে ঘুরিয়ে নিল। স্ক্রিনে শিশুটির হাত হালকা ভাঁজ হয়ে খুলে গেল, পায়ের দিক থেকেও ক্ষীণ নড়াচড়া পরিলক্ষিত হলো। আলভী স্ক্রিনে আঙুল রেখে বলল,

“মুভমেন্ট আছে, এই দেখো এখনই হাত পা নাড়ল,”

অলি মুখটা ছোটো করে বলল, “কই? আমি তো কিছুই অনুভব করিনি।"

আলভী আরও কিছু বিষয় পর্যবেক্ষণ করে বলতে শুরু করলো,

“তোমার প্লাসেন্টা সামনে দিকে, যাকে ‘অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা’ বলা হয়। বেবি নড়লে ধাক্কাগুলো আগে প্লাসেন্টাতেই লাগে, প্লাসেন্টা অনেকটা কুশনের মতো ধাক্কাগুলোকে শুষে নেয়। তাই তুমি কম টের পাচ্ছো। এটা কমন, চিন্তার কিছু নেই।”

আলভী এবার স্ক্রিনে ছোট ছোট ক্যালিপার বসিয়ে মাপগুলো নিতে লাগলো। মাথার ব্যাস, পেটের ঘের, উরুর হাড়ের লম্বা। সবশেষে সে শান্ত গলায় বলল,

“গ্রোথ এজ ঠিকই আছে, আঠাশ সপ্তাহের সাথে প্রায় মিলছে,”

প্রোব নিচের দিকে নামিয়ে আবারও বলল,

“ফ্লুইডও ভালো আছে। এই যে…এটা পজিশন। চিন্তার কিছু নেই এই বয়সেও পজিশন পাল্টায়, শেষের দিকে মাথা নিচের দিকে চলে আসবে।”

অলি এতোকিছু না বুঝলেও নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সায় জানালো। তার কপালের টানটান ভাবটা একটু নরম হয়েছে। আলভী কতগুলো টিস্যু দিয়ে জেল মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,

“তুমি হয়তো সবসময় নড়াচড়া টের পাবে না। বিশেষ করে বসা অবস্থায় বা হাঁটাচলা করলে। তবে রাতে পাশ ফিরে শুয়ে শান্ত হয়ে থাকলে টের পাওয়ার চান্স আছে।”

আলভী শেষ বারের মতো আরও একবার স্ক্রিনে চোখ বুলালো। ছোট্ট ইমেজটা স্পষ্ট, নাক-ঠোঁটের রেখা, বুকের ভেতর অনবরত ধকধক। আলভী মনে মনে আওড়ালো,

“হার্টবিট স্টেবল, মুভমেন্ট প্রেজেন্ট, প্লাসেন্টা অ্যান্টেরিয়র, সব ঠিক আছে”

“থ্যাঙ্ক ইউ, আমাকে এতো ভালোভাবে বুঝিয়ে বলার জন্য”

অলির মিনমিনিয়ে বলা কথাটা শুনে আলভী ভ্রু কুচকে তাকালো। রুমের লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে বলল,

“ধন্যবাদ দিচ্ছো কেনো? শোনো তোমার কাছ থেকে ধন্যবাদ পাওয়ার জন্য আমি কিছুই করিনি। অন্য কেউ এসে সারাদিন ধন্যবাদ দিলেও আমি কোনো প্রেগন্যান্ট মহিলার আল্ট্রাসাউন্ড করতাম না।”

অলি টপস আর বোরকা ঠিকঠাক করে উঠে বসলো।

“এভাবে বলছেন কেনো? আগেরবার করতে চেয়েছিলেন বলেই তো আমি এবার আপনাকেই করতে বললাম।”

আলভী একটা শ্বাস ফেলে বলল,

“তুমি ভাবতেও পারছোনা যে তুমি যখন বললে বেবির নড়াচড়া ফিল করতে পারোনা তখন আমি কতোটা চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। তাও তুমি যে আমাকে আল্ট্রাসাউন্ড করতে দিলে সেই জন্য তুমি অবশ্যই একটা থ্যাংকস ডিজার্ভ করো। নিজের চোখে না দেখলে আমি কিছুতেই চিন্তামুক্ত হতে পারতাম না।”

অলি অবিশ্বাসী চোখে আলভীর দিকে তাকায়,

“বেবির নড়াচড়া অনুভব না করাটা যে চিন্তার বিষয় সেটা আপনি তখন কেনো বললেন না?”

“বললে কি হতো? তুমিই তো বেবিটাকে প্রেশারে রাখো। সেই জন্যই বেবিটা এতো কম এক্টিভ। আমি যদি তখন বলে দিতাম তাহলে তুমি আরও চিন্তা করতে আর তোমার সব প্রেশার গুলো গিয়ে পড়তো বেবিটার উপর।”

অলি মুখটা কাচুমাচু করে ফেললো।

***

রাতের আধারে প্রকৃতি নিমজ্জিত হয়েছে। তবুও কৃত্রিম আলোয় শপিং মলটা ঝলমল করছে। এখন যে রাত্রিবেলা সেটা বোঝার জো নেই। আলভী অলিকে নিয়ে একটা দোকানে এসে বসলো,

“তোমার যা যা লাগে নিয়ে নেও।”

অলি পুরো দোকানে একবার চোখ বুলালো। দোকানের সিলিংয়ে লাগানো হরেক রকম লাইটের আলোয় তার চোখ ধাধিয়ে যাচ্ছে। সে তিশার বিয়ে উপলক্ষে একবার বাবা মায়ের সাথে এই শপিং মলে এসেছিলো। ভাবতেই তার চোখজোড়া চিকচিক করে উঠলো। আলভী সেটা লক্ষ্য করে সাবধানতা সহিত বলল,

“বেশি সময় নেই অলি। তারাতাড়ি করো।”

অলি আড়ালে চোখদুটো মুছে শান্তকন্ঠে বলল,

“কিছু টপস আর স্কার্ট দেখান ফ্রি সাইজের।”

দোকানি একবার অলির দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলো তার জন্য কেমন স্টাইলের জামাকাপড় পার্ফেক্ট হবে। এই অবস্থায় ঢিলেঢালা পোশাকই পরিধান করা উচিৎ। সেই হিসেবেই সে বেশ অনেকগুলো জামা কাপড়ের কালেকশন বের করে দিলো। এত এত কালেকশন দেখে অলি বিড়ম্বনায় পড়ে গেলো। নিজে থেকে কোনো কিছু কেনার অভ্যাস তার নেই। এই পর্যায়ে এসে মায়ের জন্য মনটা খুব পুড়ছে। মা বরাবরই তার জন্য জামাকাপড় পছন্দ করে দিতেন। লোকে বলে কেউ মা*রা গেলে তার জন্য কোনোকিছুই নাকি থেমে থাকেনা।

কিন্তু অলির মতো অনাথ ছেলেমেয়েরা বোঝে মা বাবা ছাড়া জীবন কতোটা দুর্বিষহ। কতটা অন্ধকার আচ্ছন্ন। অলির যেই সময়ে মাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেই সময়েই তার মা বাবা দুজনেই তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। অলি ঠোঁট চেপে কান্না গুলো গিলে ফেলতে চাইলো কিন্তু ব্যার্থ হলো। আলভী কি করবে বুঝে উঠতে পারলোনা। শপকিপার দুজনও অলির কান্না দেখে হকচকিয়ে গেছেন। আলভী একটা শ্বাস ফেলে অলিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,

“আহা কাদছো কেনো? কি হয়েছে? আমাকে বলো।”

অলি মাথা নিচু করে বলল,

“মা…বাবার কথা মনে পড়ছে। মা বাবাই সবসময় আমার জন্য জামাকাপড় পছন্দ করে দিতেন। আমি কখনো নিজে পছন্দ করতে পারিনি।”

“প্লিজ কান্না কোরোনা।”

অলি ফুপিয়ে উঠতেই আলভী বলে ওঠে,

“আমি তোমার জন্য পছন্দ করে দিচ্ছি।”

আলভী অলির চোখদুটো মুছে দিয়ে কাপড় সিলেক্ট করতে লাগলো। প্রায় ৩৫ সেটের মতো ড্রেস সিলেক্ট করে সে থামলো। আলভীর কান্ড দেখে অলি কান্না ভুলে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে,

“আপনি এতোগুলো কেনো সিলেক্ট করলেন? একবারে কেউ এতো গুলো কাপড় কেনে?”

আলভী অলির দিকে তাকিয়ে বলল,

“কমাতে পারবোনা। সিলেক্ট কৃত সবগুলোই পছন্দ হয়েছে। তবে তুমি চাইলে আরও সিলেক্ট করতে পারি। করবো?”

অলি নাবোধক মাথা নাড়লো। সবগুলো কাপড় প্যাক করে বিল মিটিয়ে তারা বের হয়ে গেলো। কিছুদূর আসতেই অলি একটা দোকানের সামনে এসে থেমে যায়। আলভী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়,

“কি হলো? আর কিছু লাগবে?”

অলি মাথা নেড়ে আঙুল দিয়ে একটা দোকানের দিকে ইশারা করতেই আলভী থমকে গেলো।

“ওটা তো বেবিস কর্ণার।”

অলি বাম হাতটা পেটের উপরে রেখে নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো। আলভী তার দিকে অনেকটা ঝুকে গিয়ে বলল,

“পরেরবার থেকে কিছু লাগলে ফ্লোরের দিকে নয় আমার দিকে তাকাবে। কারণ ফ্লোরের দিকে তাকালে আমার হিংসে হয়। মনে হয়—তুমি আমার হক নষ্ট করছো।”

আলভীর সোজাসাপ্টা কথা শুনে অলির গালজোড়ায় রক্তিম আভা ফুটে উঠলো। আলভীর দুহাত শপিং ব্যাগে ভর্তি। সে নিজের বাম বাহু অলির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে ওঠে,

“প্রয়োজন ছাড়া তো ভালোই আমার শার্ট ধরে টানাটানি করতে পারো। এখন যখন দেখছো হাত ভরা থাকায় তোমার হাত ধরতে পারছিনা। তখন নিজে থেকেও তো হাতটা ধরতে পারো নাকি?”

অলি হকচকিয়ে আলভীর দিকে তাকাতেই আলভী ইশারায় নিজের বাহু ধরতে বললো। অলি একটা ঢোক গিলে আলতো হাতে আলভীর বাহু আঁকড়ে ধরলো। আলভী এবার অলিকে নিয়ে বেবিস কর্ণারে এলো ঠিকই কিন্তু অলির মনোভাব বুঝে উঠতে পারলোনা।

চারদিকে সাজিয়ে রাখা বাচ্চাদের জিনিসপত্র দেখে অলির চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠলো। তার ইচ্ছা করছে এখানে থাকা সবকিছু কিনে নিয়ে যেতে। কতো কিউট সবকিছু আহা! অলি ছেলে বাবুদের কর্ণারে এসে জামাকাপড় দেখতে লাগলো। সেখান থেকে কয়েকটা জামাকাপড় আর একজোড়া জুতো তার খুব পছন্দ হলো। সেই সাথে সে বেশ কিছু খেলনাও পছন্দ করলো। আলভী মনে মনেই আওড়ালো,

“এখন তো দিব্যি সিলেক্ট করতে পারছে। তখন নিজের জন্য তো কিছুই সিলেক্ট করতে পারছিলোনা। ডাম্ব গার্ল।”

শপিং বেশি হয়ে যাওয়াতে আলভী একটা ট্রলি এনে সবগুলো শপিং ব্যাগ সেটার মধ্যে নিলো। কিন্তু অলির এখনো শপিং করা হয়নি। এই সুযোগে বাচ্চাদের জন্য প্রয়োজনীয় a-z সবকিছুই সে কিনে নিচ্ছে। আলভী হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো এখন দশটা ছয় বাজে। শপিং শেষে অলি ক্লান্ত হয়ে আলভীর সামনে এসে দাঁড়ায়। আলভী ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলে,

“শেষ?”

অলি মিষ্টি হেসে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ে।

“ওকে চলো তাহলে।”

আলভী স্লিপ নিয়ে বিল মিটিয়ে দোকান থেকে বের হতেই অলি পেছন থেকে বলে ওঠে,

“এই যাহ, আমার আর আলোর জন্য কতোকিছু কিনলাম কিন্তু আপনার জন্য তো কিছুই কিনলাম না।”

আলভী এবার কিছুটা বিরক্ত হলো,

“অলি…আমার কিছুই লাগবেনা। তোমাদের জন্য শপিং করতেই তো এসেছিলাম। প্লিজ চলো আ'ম হাংরি।”

অলি বুঝতে পারলো আলভী এতোক্ষণ যাবত অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে গেছে। তাই সে কথা না বাড়িয়ে আলভীর পিছু পিছু হাটতে লাগলো। আলভী শপিং ব্যাগগুলো সব গাড়ির ব্যাক সিটে রেখে দরজা বাইরে থেকে লক করে দিলো। তারপর অলির উদ্দেশ্যে বলল,

“প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে চলো কিছু খেয়ে নেই।”

আলভী অলিকে নিয়ে ডিনার করার জন্য রেস্টুরেন্টে এলো। খাওয়ার একপর্যায়ে অলি বলে ওঠে,

“আমাদেরকে এতোকিছু কিনে দেওয়ার জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।”

আলভী কয়েক সেকেন্ড অলির দিকে তাকিয়ে থেকে বিরবির করে বলল,

“ধন্যবাদ জানিয়ে ধন্য করেছে আমাকে। এখন এই ধন্যবাদ ধুয়ে ধুয়ে পানি খাবো আমি।”

অলি কথাটা পুরোপুরি শুনতে পায়নি সে ভ্রু কুচকে বলল,

“কিছু কি বললেন?”

আলভী মেকি হেসে বলতে লাগলো, “বলেছি ধন্যবাদ জানিয়ে আমাকে ধন্য করেছেন এবার চুপচাপ খাবার গুলো খেয়ে আমাকে উদ্ধার করুন মাই লর্ড।”

আলভীর কথা বলার ধরন শুনে অলি মুখ চেপে হেসে উঠলো। আলভী একটা শ্বাস ফেলে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। খাওয়া দাওয়া শেষে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

বাড়িতে এসে বোরকা খুলে ফ্রেশ হয়ে এশারের নামাজ আদায় করে নিলো অলি। তারপর আলমারি খুলে একসাইড খালি করে সেখানে বাচ্চার জন্য আনা সব কাপড়চোপড় গুছিয়ে রাখতে লাগলো। আলভী ফ্রেশ হয়ে এসে দেখলো অলি বাচ্চার জন্য আনা দোলনা টা রুমের এককোনায় গুছিয়ে রাখছে। আলভী একটা শ্বাস ফেলে বেডের উপর বসলো। অলি সবকিছু গুছিয়ে রেখে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আচড়াতে লাগলো। আলভী অনেক দিন পর অলিকে নিজের চুল নিজেকে আচড়াতে দেখছে। আলভী উঠে গিয়ে অলিকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। অলির সারা শরীর শিরশির করে উঠলো। আলভী অলির গলা থেকে ওড়না টা সরিয়ে ঘাড়ে মুখ গুজে দিলো।

“ক…কি করছেন?”

আলভী অলিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,

“বউকে আদর করছি কিন্তু বউ কি এটাও বুঝতে পারছেনা?”

অলি ঠোঁট কামড়ে স্কার্টের একপাশ খামচে ধরলো। আলভী অলির থুতনি উঁচু করে বলল,

“বউ কি স্বামীকে কিভাবে ধন্যবাদ জানাতে হয় সেটাও জানেনা?”

অলি লজ্জাবতী গাছের পাতার ন্যায়ে নুইয়ে গেলো। আলভী অলির মুখটা দু হাতের আঁজলায় নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

“বউকে সবকিছুই শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে দেখছি।”

আলভী অলিকে চুমু খেতে গেলে অলি মুখ ঘুরিয়ে নেয়। আলভীও হাল না ছেড়ে অলির গলায় মুখ ডুবিয়ে আলতো চুমু খেতে লাগলো। অলি দিশেহারা হয়ে আলভীর পিঠের শার্ট খামচে ধরলো। ফলস্বরূপ আলভী অলির চুলের মাঝে আঙুল গলিয়ে দিয়ে তার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো। অলি আলভীর উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে নিজের ঠোঁটজোড়া মুখের ভেতরে লুকিয়ে নিলো। এতে করে আলভী হাসফাস করে উঠলো কয়েকটা শুষ্ক ঢোক গিলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলো কিন্তু পারলোনা। ক্রমশই তার ধৈর্য্যের বাধ ভেঙ্গে যাচ্ছে। একপর্যায়ে সে না পেরে অলির গালজোড়া চেপে ধরলো। অলি ব্যাথায় ককিয়ে উঠতেই আলভী অলির অধর জোড়া নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। আলভীর কপালে বিরক্তির ভাজ পড়েছে। সে আক্রোশ মেটাতে অলির ঠোঁট কামড়াতে লাগলো। অলি ছটফট করে আলভীকে সরিয়ে দিতে চাইলো কিন্তু পারলোনা। উল্টো ক্ষিপ্ত আলভী আরও বেশি হিংস্র উঠলো।

বেশ অনেকক্ষণ পর,

আলভী পরিতুষ্ট হয়ে অলির ঠোঁট জোড়া ছেড়ে দেয়। অলি নিজের ঠোঁট জোড়া যেন অনুভবই করতে পারছেনা। মনে হচ্ছে তার ঠোঁট জোড়া কেউ শরীর থেকে আলাদা করে ফেলেছে। আলভী অলির ঠোঁটের দিকে তাকাতেই থমকে গেলো,

“শিট”

অলির চোখের কোণে পানি জমেছে। সে নিজের ঠোঁটে হাত দিতে গেলে আলভী আটকে দিয়ে বলে,

“স…স্যরি হা…নিবি।”

আলভীর হাতের বাধন আলগা হতেই অলি আয়নার দিকে তাকায়। নিজের র*ক্তাক্ত ঠোঁটজোড়া পরিলক্ষিত হতেই অলি আঁতকে ওঠে, আলভী হতাশায় নিজের চুল টানতে লাগলো। কিছুক্ষণ আগে সে নিজের মধ্যেই ছিলোনা যেন। অলি একটা টিস্যু নিয়ে ঠোঁটের র*ক্ত গুলো মুছে নিলো।

“স্যরি হানিবি। আমি ইচ্ছা করে…

অলি পুনরায় চিরুনী টা হাতে নিয়ে আলভীর দিকে না তাকিয়েই বলল,

“আপনি এরকম টা করে কি মজা পান আমি বুঝিনা। অদ্ভুত মানুষ আপনি।”

আলভী এক্সপ্লেইন করার মতো ভাষা খুঁজে পেলোনা। শুধু বিড়বিড় করে বলল,

“ফিলিংস গুলো ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”

***

দু’সপ্তাহ কেটে গেছে। সূর্যের আলো জানালার ফাঁক গলে নরম ছায়া ফেলেছে রুমের ফ্লোরে। অলি এখন সাত মাসের গর্ভবতী। শরীরের ভার ও ক্লান্তি নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠলেও, নিজের ভেতরে থাকা ছোট্ট প্রাণের অস্তিত্বটার জন্য দিনগুলো সহ্য করে যাচ্ছে। অলি সারাটা দিন নিজের রুমেই কাটিয়েছে। কখনও জানালার পাশে বসে বাবা মায়ের কথা ভেবে নিঃশ্বাস ফেলেছে, কখনও বা বিছানায় হেলান দিয়ে ইউটিউবের ফিডে স্ক্রোল করেছে। শরীর আগের তুলনায় ভারী হয়ে এসেছে, সাত মাসের পেট নিয়ে আগের মতো আর স্বাচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারেনা। আজকে বাড়িতে, সে, দাদুমনি আর শাহানাজ বেগম ছাড়া কেউ নেই। আলভী খুব সকালেই একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং এটেন্ড করতে বাকিদের সাথে অফিসে গেছে। নূরনাহার বোনের অসুস্থতার কথা শুনে ২ দিন আগেই বোনের বাড়িতে ছুটে গেছেন। ঊর্মিলা এখনো ভার্সিটি থেকে ফেরেনি।

বিকেলের দিকে একটু হাঁটার উদ্দেশ্যে ধীরপায়ে সিড়ি ডিঙিয়ে ড্রইংরুমে আসতেই অলি থমকে দাঁড়াল। শাহানাজ বেগম সোফায় বসে আছেন, মাথা হেলানো, চোখ আধবোজা। যেন ঝিমুচ্ছেন। তার ঠোঁটের ফাঁক থেকে অদ্ভুত গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে। অলি কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে এগিয়ে গেল। শাশুড়ির সঙ্গে তার সম্পর্ক কোনো কালেই সহজ ছিল না। তবুও শাশুড়িকে এই অবস্থায় দেখে তার মনের ভেতরে অজানা দুশ্চিন্তারা খচখচ করতে লাগল। অলি একটু সাহস সঞ্চয় করে হাত বাড়াল শাহানাজ বেগমের দিকে।

কপালে হাত রাখতেই অলি আঁতকে উঠল। শরীরের তাপমাত্রা বেশ গরম। অলি তৎক্ষণাৎ বুঝে যায় জ্বর এসেছে।

এক মুহূর্তের জন্য অলি দোটানায় পড়ল। সেবা করবে, না কি তার আচরণের কথা মনে করে দূরে সরে যাবে? অলির মনে পড়ে যায় তার বাবা মায়ের সাথে করা শাহানাজ বেগমের খারাপ ব্যবহারের কথা। অলি সেগুলো মনে করে এড়িয়ে যেতে চাইলো কিন্তু তার ভেতরে জন্ম নেয়া সুপ্ত মাতৃত্ববোধ তাকে এড়িয়ে যেতে দিলোনা। ধীরে ধীরে সে শাহানাজ বেগমের পাশে বসল। কণ্ঠে অচেনা কোমলতা ফুটিয়ে বলল,

“আম্মা, আপনি ঠিক আছেন তো?”

কোনো উত্তর এল না। অলি বুঝতে পারলো সে উত্তর দেয়ার মতো অবস্থায় নেই। অলি উঠে সোজা কিচেনে এসে দেখে সেখানে কেউ নেই। সার্ভেন্টরা এই সময়টাতে সাধারণত বিশ্রাম নেয় কারণ রাত নামতেই তারা ডিনার রেডি করার প্রস্তুতি নেবে। অলি একটা শ্বাস ফেলে এক গ্লাস কুসুম গরম পানি নিয়ে আবারও শাশুড়ির নিকট চলে এলো। আলতো করে শাহানাজ বেগমকে জাগিয়ে পানি খাওয়ালো। তারপর তোয়ালে ভিজিয়ে এনে কপালে জলপট্টি দিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পরপরই তোয়ালেটা পানি দিয়ে ভিজিয়ে এনে বদলে দিল।

মুহূর্ত কয়েক পর শাহানাজ বেগম আধখোলা চোখে অলিকে দেখে নিলেন। হয়তো অবাক হয়েছিলেন, যেই মেয়েকে তিনি কখনোই মন থেকে গ্রহণ করেননি, সব সময় তুচ্ছ তাচ্ছিল্য আর তিরস্কার করে গেছেন সেই মেয়েই আজ তার পাশে বসে সেবা করছে। সে হয়তো কিছু বলতে চাইলো কিন্তু ক্লান্ত শরীর তাকে কিছু বলার সুযোগ দিলোনা।

অলি পাশে বসে রইল। বারবার নিজের হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে দিল। ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“আম্মা, দুপুরে কিছু খেয়েছিলেন?”

শাহানাজ বেগম না বোধক মাথা নাড়লেন। অলি ধীরপায়ে আবারও কিচেনে এলো। কিন্তু সে তো রান্নাবান্নার কিছুই জানেনা। সে হাতে থাকা ফোনটায় একটা ভিডিও অন করলো তারপর সেটা ফলো করেই চিকেন স্যুপ বানানোর চেষ্টা করতে লাগলো। পেট বড় হয়ে আসায় কাজ করা সহজ ছিলোনা, তবুও যতটুকু সম্ভব ধৈর্য্য ধরে করলো সবটা।

অলি বেশ কয়েকবার আলভীকে কল করে খবরটা জানাতে চেয়েছে কিন্তু আলভী হয়তো ব্যস্ত আছে সেই জন্য কল রিসিভ করেনি। অলি একটা বাটিতে স্যুপটুকু ঢেলে শাহানাজ বেগমের সামনে এসে বসলো। তারপর আস্তেধীরে খাওয়ানোর চেষ্টা করল। শাহানাজ বেগম দুর্বলভাবে কয়েক চুমুক খেলেন।

সকাল থেকেই শাহানাজ বেগমের শরীর খারাপ লাগছিলো। সে লাঞ্চ করার উদ্দেশ্যে কিচেনের দিকে যেতেই তার শরীর একদম ভেঙ্গে পড়ে। শরীর টা এতোটাই দূর্বল লাগছিলো যে সিড়ি বেয়ে নিজের রুমে যাওয়ার সাহসটুকুও করেননি।

অলি পাশে বসে মনে মনে ভাবলো মানুষ যতই বিরাগ পোষণ করুক না কেন, একজন আদর্শ মানুষ কখনো কারো দূর্বলতার সুযোগ নেয়না। তাছাড়া সে তার ছেলের বউ। সেই হিসেবে শাশুড়ি যেমনই হোকনা কেনো তার সেবা করা অলির দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

চলবে,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন