#১৫_বছর_বয়সী_মা (৫১)
#সোফিয়া_সাফা
{রহস্যের অন্তরালে}
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে অলির অবস্থা দেখে আলভী স্তব্ধ হয়ে গেলো। অলির চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। চোখ মুখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। আলভী দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো,
“কি হয়েছে তোমার, এই অবস্থা হলো কিভাবে?”
অলি ডান হাত দিয়ে বাম হাত চুলকাতে চুলকাতে বলল,
“জানিনা কি হয়েছে। কিন্তু জ্বলে যাচ্ছে।”
আলভী অলির বাম হাত থেকে ফুলের তোড়াটা নিয়ে রুমের কোণায় থাকা ডাস্টবিনে ফেলে দিলো। এদিকে অলির এবার হাচিও আসছে,
“গোলাপ ফুলে তো আমার এলার্জি তোমার এই অবস্থা হলো কেনো?”
আলভীর কথা শুনে অলি চোখজোড়া মুছে বলল,
“আমি কিভাবে বলবো? আপনার সাথে থাকতে থাকতে বোধহয় আমার সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে।”
আলভী অলিকে উপর নিচ পরখ করে দেখতে লাগলো। তারপর একটা শ্বাস ফেলে বলল,
“তোমার আগে কখনো এমনটা হয়েছে?”
অলি নাবোধক মাথা নাড়তে গিয়েও কিছু একটা মনে করে থেমে যায়।
“এর আগে একবার হয়েছিলো যখন আমি পরীক্ষার জন্য বাড়িতে গিয়েছিলাম তখন আমি আজকের মতোই ফুলের ঘ্রাণ নিতে গিয়েছিলাম, তারপর এমনটাই হয়েছিলো। আমি তখন ভেবেছিলাম হয়তো ধুতরা পাতা লেগেছে কিন্তু আজকে কি হলো?”
“তার মানে প্রেগন্যান্ট হওয়ার আগে এমনটা কখনো হয়নি তাইনা।”
অলির খানিকটা রাগ উঠলো সে হাত মুখ চুলকাতে চুলকাতে অস্থির আর আলভী এসব কি প্রশ্ন করছে,
“আগে কিছু করুন। আমার শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।”
আলভী ঘাবড়ে গেলো সে অলিকে ওয়াশরুমে নিয়ে বেসিনের সামনে দাড় করালো। কল ছেড়ে দিয়ে বলল,
“চোখেমুখে পানি দেও আরাম লাগবে।”
অলি চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিলো তারপর হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে এলো। আলভী দেখলো অলির চোখমুখ আরো বেশি ফুলে যাচ্ছে। সে কি করবে দিশা পাচ্ছেনা। অলির তো তার থেকেও বেশি রিয়েকশন হচ্ছে। ভাগ্যিস গতকাল অলি ফুলের বাগান থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো নইলে কি হতো আলভী আর ভাবতে পারছেনা। অলি এগিয়ে এসে বলল,
“আপনারও তো গোলাপে এলার্জি হয়। তখন আপনি যেই মেডিসিন খান সেটা আমাকে দিন তারাতাড়ি। অনেক কষ্ট হচ্ছে আমার।”
আলভী মেডিসিন আনতে গেলেও মেডিসিন টা হাতে নিয়ে থেমে যায়,
“অলি তুমি হুট করেই এসব ওষুধ খেতে পারবেনা। কারণ সব অ্যান্টিহিস্টামিন প্রেগন্যান্সিতে সেফ নয়। আমি রিস্ক নিতে পারবোনা।”
“তাহ…লে এখন কি করবো?”
আলভী তাড়াহুড়ো করে বিছানার পাশের ড্রয়ার থেকে স্যালাইন সলিউশন আর এক টুকরো তুলা বের করল। তারপর অলিকে বিছানায় বসিয়ে অলির চোখ মুখ ধীরে ধীরে মুছে দিতে দিতে বলল,
“চোখে এটা দেয়ার পরও যদি না কমে তবে আমি তোমাকে হসপিটালে নিয়ে যাবো। সেখানে সেফ অ্যান্টিহিস্টামিন বা অন্য চিকিৎসা দেওয়া যাবে।”
অলি ম্লান হেসে আলভীর দিকে তাকিয়ে রইলো। লোকটা বরাবরই তার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রোটেক্টটিভ। কিছুক্ষণ যেতেই অলি কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেলো। কিন্তু নিজের অবস্থা দেখে সে ভীষণ হতাশ। গোলাপ তার প্রিয় ফুল, এরকম টা তো আলভীর সাথে দেখা হবার আগে কখনোই হয়নি।
“আমি কি আর গোলাপ ফুলের ঘ্রাণ নিতে পারবোনা? সেগুলো ছুতেও পারবোনা?”
আলভী কিছুক্ষণ ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“দেখো অলি, প্রেগন্যান্সিতে শরীর একটু বেশিই সংবেদনশীল হয়ে যায়। তাই হয়তো তোমার এরকমটা হয়েছে। আই থিংক বেবিটা হয়ে গেলে তুমি আবারও নরমাল হয়ে যাবে।”
“প্রেগন্যান্সিতে সবার সাথেই কি এমনটা হয়?”
“তা হয়না। কিন্তু প্রেগন্যান্ট অবস্থায় এসব ফুল টুল থেকে দূরে থাকাই ভালো।”
“আপনি তাহলে এতোকিছু জেনেও কেনো ফুল এনেছেন, তারউপর আপনারও তো গোলাপে এলার্জি তারপরেও সেটা কিনলেনই বা কেনো?”
আলভী নির্লিপ্ত চোখে অলির দিকে তাকালো, “কারণ আজকে তোমার জন্মদিন ছিলো। আর আমি সেটা ভুলে গেছি। আমি ভাবলাম ফুলগুলো দেখলে তুমি খুশি হয়ে যাবে আর রাগ করে থাকবেনা কিন্তু সবকিছু গুলিয়ে গেলো।”
অলি অবাক চোখে তাকায়, চোখেমুখে এক আকাশ বিস্ময়। লোকটা তাকে খুশি করতে এলার্জি থাকা সত্ত্বেও তার জন্য গোলাপ ফুল কিনে এনেছিলো? অলির চাহনি দেখে আলভী খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো, নিম্নস্বরে বলল,
“তুমি এখনো রেগে আছো?”
অলির কপাল কুচকে এলো। আলভী এবার একটা শুষ্ক ঢোক গিলে বলল,
“দেখো অলি আমার এখানে কোনো দোষ নেই। বেবিটা তোমার পেটে আছে বলেই কিন্তু তোমার এতো এতো মুড সুইং হচ্ছে তার উপর এলার্জির জন্যও ওই বেবিটাই দায়ী আমি একদম নিষ্পাপ।”
অলি ধীরে ধীরে আওড়ালো,
“মুড সুইং?”
“হুম এইযে তুমি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আমার উপর রেগে যাচ্ছো। উদ্ভট কথাবার্তা বলছো, অকারণেই কাদতে কাদতে হিচকি তুলে ফেলছো। এগুলোই তো মুড সুইং।”
অলি জানে মুড সুইংয়ের মানে। কিন্তু সে কোথায় অকারণে কেদেছে?
“শুনুন আমি অকারণেই কাদিনি। আপনি আমাকে অবহেলা করেছেন সেই জন্যই কেদেছি।”
আলভী সরু চোখে তাকিয়ে বলল, “আমি তোমাকে অবহেলা করিনি তুমিই উল্টো পাল্টা ভেবে নিচ্ছো।”
অলি আলতো ভাবে আলভীর হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,
“ওহ আচ্ছা আমি উল্টো পাল্টা ভেবে নিচ্ছি? তাহলে আপনিই সোজা সাপ্টা ভাবে বলুন। কেনো এড়িয়ে যাচ্ছেন আমাকে?”
“আমার কাজ ছিলো, বোঝার চেষ্টা করো। তুমি সকালে ঘুমোচ্ছিলে আমি তোমাকে জাগাতে চাইনি। সেই জন্যই না বলে চলে গিয়েছিলাম।”
অলি আর কথা বাড়ালোনা।
“যাও শুয়ে পড়ো গিয়ে,”
অলি মাথা নেড়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো, আলভীও লাইট অফ করে অলির পাশে এসে শুয়ে পড়লো। সে ফোন চাপছে, অলি অন্যদিকে ঘুরে শুয়ে আছে। কিছুক্ষণ যেতেই আলভী ফোনটা রেখে শুয়ে পড়লো। অলি একটা বড় শ্বাস টেনে আলভীর দিকে ঘুরে গেলো। হঠাৎ এরকম করায় আলভী ভ্রু কুচকে তার দিকে তাকায়, টেবিল ল্যাম্পের কমলা রঙের আলোয় আলভীর চেহারা দৃশ্যমান হতেই এতোক্ষণ ধরে জমানো সাহসটুকু ছু হয়ে গেলো। অলি একটা ঢোক গিলে অন্যদিকে ঘুরতে গেলেই আলভী তার দিকে খানিকটা ঝুকে যায়,
“কিছু কি বলবে?”
অলির গলা শুকিয়ে আসছে, আলভীকে এতোটা কাছে দেখে তার দম আটকে আসার উপক্রম। বুকের গহীনে থাকা প্রাণপাখীটা যেন এক্ষুনি উড়ে যাবে। তবুও সবটুকু সাহস পুনরায় একত্রিত করে সে হঠাৎই আলভীর ঠোঁটে নিজের দাঁত বসিয়ে দিলো। এক সেকেন্ড হবে কিনা সন্দেহ অলি পুনরায় অন্যদিকে ফিরে কম্ফোর্টার মুড়ো দিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লো। ঘটনার আকস্মিকতায় আলভী হতবিহ্বল হয়ে গেলো। অলি যেন তাকে কারেন্টের শকড দিয়েছে। পুরো ব্যাপারটা বুঝতে তার বেশ কিছুক্ষণ লাগলো। নিজের অধরে আঙুল ঠেকিয়ে তাকিয়ে রইলো অলির পানে। পুরো ব্যাপারটা বোধগম্য হতেই সে অলির কম্ফোর্টার ধরে টানতে লাগলো,
“এই মেয়ে এই, এটা কি করলে আমার সাথে?”
অলি কম্ফোর্টার আরো শক্ত করে চেপে ধরে রিনরিনে গলায় বলল,
“আমি শুধু ধন্যবাদ দিলাম গিফটের জন্য আর কিছু না। এভাবে ধন্যবাদ দেয়া তো আপনিই শিখিয়েছিলেন ভুলে গেলেন?”
আলভী থমকে গেলো। ওষ্ঠদ্বয় শুকিয়ে আসছে তার। সে জিভ দিয়ে ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে আচমকা একটানে কম্ফোর্টার টা তুলে ফেললো। তারপর অলির হাত ধরে টেনে ওঠালো।
“আপনি কি বেশিই ব্যাথা পেয়েছেন? কিন্তু আমি তো আস্তেই দিয়েছি। রাগ করছেন কেনো?”
আলভী একপ্রকার অলিকে টেনেটুনে নিজের কোলে এনে বসালো। অলি নিজের ওড়না ঠিক করতে গেলে আলভী ওড়না টা খুলে দূরে ফেলে দেয়। অলি সাথে সাথেই হাত দিয়ে বুক ঢেকে ফেলে,
“এমন করবেন না। আমি স্যরি বলছি।”
আলভী বাকা হেসে অলির কানের কাছে মুখ নিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
“স্বামীকে স্যরি আর ধন্যবাদ জানানোর পদ্ধতি সেম। তুমি যদি স্যরি আর ধন্যবাদ একসাথে জানাতে চাও তাহলে তোমাকে একটু বেশি কষ্ট তো করতেই হবে। তোমার স্বামীর যে এটুকুতে মন ভরেনা। উল্টো অল্প সল্প আদরে তার অস্থিরতা আরও বেড়ে যায়।”
অলির ভীষণ লজ্জা লাগছে, আলভী অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। অলি না পেরে বুক থেকে হাত সরিয়ে আলভীর চোখজোড়া ঢেকে ফেললো। আলভী বিরক্তি সূচক শব্দ উচ্চারণ করে বলল,
“এভাবে আমার হক নষ্ট করছো কেনো? দেখতে দেও আমাকে। স্বামীর হক আদায় করা স্ত্রী হিসেবে তোমার জন্য ফরজ।”
অলি কেপে উঠলো আলভীর মুখ থেকে নির্গত প্রত্যেকটি বাক্য তার লোমকূপেও যেন আলোড়ন তুলছে। সে ঠোঁট চেপে ধরে হাসফাস করতে লাগলো। আলভীর এবার মেজাজ খারাপ হলো। তবুও নিজেকে সামলে বিরসকন্ঠে বলল,
“ছাড়ো আমাকে, ভয় নেই আমি তোমার সাথে জোরাজুরি করবোনা।”
আলভী নিজেই একহাতে অলির হাতজোড়া সরিয়ে দিয়ে আরেক হাতে নিজের চোখজোড়া ঢেকে নিলো,
“আমার চাহনি তোমার কাছে অনেক অসহ্যকর লাগে তাইনা? মাঝে মাঝে মনে হয় আমার চোখদুটো না থাকলেই ভালো হতো। যদি আমি অন্ধ হতাম তাহলে আমি তোমাকে চাইলেও দেখতে পারতাম না। আর তোমার অস্বস্তির কারণও হতাম না।”
আলভী অলির ওড়না আনার উদ্দেশ্যে উঠে যেতে নিলে অলি তার বুকের উপর আছড়ে পড়ে।
“আপনি এভাবে বলছেন কেনো? বিশ্বাস করুন আমার আপনাকে অনেক ভালো লাগে। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। আপনার মতো একজনকে পেয়ে আমি নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করি। তবে আপনি কাছে এলেই আমার শরীর অদ্ভুত আচরণ করে কিন্তু আমার মন আপনাকে ছাড়া কিছুই বোঝেনা। আপনি দূরে গেলে আমার কাছে সবকিছু অর্থহীন লাগে। আপনি কেনো বোঝেন না, আমি পারিনা আপনাকে ছাড়া থাকতে। আমাকে এভাবেই আগলে রাখুন না, ছেড়ে দেবেন না প্লিজ। আমি আপনার বুকের সাথে লেপ্টে থাকতে চাই আপনার শরীরের সবটুকু ঘ্রাণ শুষে নিতে চাই।”
অলি জানেনা সে কি বলছে, সে শুধু আলভীকে নিজের কাছে আটকে রাখতে চায়। সে যদি পারতো আলভীকে নিজের বুকের ভেতর ঢুকিয়ে রাখতো কোথাও যেতে দিতোনা। অলি শক্ত করে আলভীকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। ঘাড়ে মুখ গুজে পাগলের মতো চুমু খাচ্ছে। আলভী মন দিয়ে অলির বলা প্রত্যেকটা কথা শুনেছে। সে বুঝে গেছে অলিকে সে জয় করে নিয়েছে। অলির ভালোবাসা সে পেয়ে গেছে। আলভী অলির পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। অলির ঠোঁটের এলোমেলো স্পর্শে সে যেন সুখের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। অলি হাপিয়ে গিয়ে আলভীর বুকের সাথে লেপ্টে রইলো। আলভী অলিকে ধীরে সুস্থে খাটে শুইয়ে দিলো তারপর একটু সরে গিয়ে ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিয়ে আবারও অলির কাছে ফিরে এলো।
“আমি অনেক তৃষ্ণার্থ বউজান। একটু আদর করি কেমন? আমি জানি আমাদের সম্পর্কটা আর দশটা সম্পর্কের মতো হালাল ভাবে শুরু হয়নি। আমি এও জানি বেবিটা না হওয়া পর্যন্ত আমাকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই থাকতে হবে।”
আলভীর কথাগুলো শুনে অলি বরফের মতো গলে যেতে লাগলো। আলভী এবার অলির ঘাড়ের ভাজে মুখ গুজে মাতাল কন্ঠে বলল,
“লিমিট ক্রস করবোনা প্রমিস।”
অলি আর বাধা দিলোনা আলভীকে। নিজের শরীরের বিরুদ্ধে গিয়ে সে মনকে সমর্থন করলো। তার মন যে চায় আলভীর মধ্যে জমে থাকা সবটুকু ভালোবাসা আর আদরের স্বাদ গ্রহণ করতে। আর আলভীও চায় নিজের সবটুকু অলির তরে উজাড় করে দিতে।
***
ভালোবাসা, ভালোলাগা, আদর আর সোহাগের মাঝে চোখের পলকেই ১৫ টা দিন অতিবাহিত হয়ে গেলো। অলি যেন টেরই পেলোনা। এই কটা দিন সে আলভীর ভালোবাসার মাঝেই ডুবে ছিলো।
আজকে মির্জা ভিলাতে এক উৎসব মুখর পরিবেশ। হবে নাই বা কেনো বাড়ির একমাত্র মেয়েকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে আজ। হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন কদিন আগেই ঊর্মিলার ইয়ার ফাইনালের এক্সামে শেষ হয়েছে। দিহান বেচারাও আর অপেক্ষা করতে পারছিলোনা। অবশ্য দিহানের থেকে ঊর্মিলা বিয়ে নিয়ে অনেক বেশিই এক্সাইটেড। আলভী অবশ্য চেয়েছিলো অলির ডেলিভারির পরেই এসব করতে কিন্তু দিহানকে আবার কদিনের জন্য দেশের বাইরে যেতে হবে।
তাই দিহানের ফ্যামিলির সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজকেই মেয়ে দেখতে আসবে আর মেয়ে পছন্দ হলে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে যাবে। যদিও এসব শুধুই ফর্মালিটি, আলভী আগেই সবাইকে দিহান আর ঊর্মিলার ব্যাপারে রাজি করিয়ে ফেলেছে। বলে রাখা ভালো যে দিহান আর ঊর্মিলার সম্পর্কের ব্যাপারে কাউকেই জানানো হয়নি। সবাই জানে দিহান ভালো ছেলে তাই আলভী বোনের জন্য তাকে পছন্দ করেছে।
ঊর্মিলাকে শাড়ি পড়িয়ে রেডি করে দিচ্ছেন নূরনাহার। রূপসা আর তার মাকে দাওয়াত দেয়নি কেউ কারণ এতে আলভীর কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিলো। ইদানীং শাহানাজ বেগমও যেন ছেলের কথা বড্ড মান্য করেন সে হয়তো বুঝে গেছেন ছেলে কিসে ভালো থাকবে। তাছাড়া অলিও ধীরে ধীরে তার প্রিয় বউমা হয়ে উঠেছে অবশ্য এর মুখ্য আর প্রধান কারণ হচ্ছে নাতির জন্ম দেওয়াটা। অলি দেখতে শুনতে সুশ্রী, মনের দিক দিয়েও ভালো। আর কি চাই, টাকা পয়সা কি তার ছেলে কম কামাই করে অলির বাপের টাকাপয়সা থাকলেই বা তাদের কি আহামরি লাভ হতো। শাহানাজ বেগম এসবই ভাবছেন আর কিচেনে রান্নাবান্নার তদারকি করছেন। মেহমান এলো বলে, দাদুমনি একসপ্তাহ যাবত একটু সুস্থ হয়েছেন বেশি হাটাচলা না করতে পারলেও লাঠিতে ভর করে ড্রইংরুমে এসে বসেছেন।
অলির মনেও আনন্দের দোল লেগেছে। কতোদিন পর একটু আনন্দ উদযাপনের সুযোগ পাবে। যদিও আলভী তাকে খুব একটা তিড়িং বিড়িং করতে দেবে বলে মনে হয়না। লোকটা সবসময় গার্ডের মতো তার সামনে পেছনে ঘুরঘুর করে। অলির ন’মাস চলছে, যখন তখন তার লেবার পেইন শুরু হয়ে যেতে পারে। আলভী তাই অলিকে চোখের আড়াল পর্যন্ত হতে দেয়না। অলি ঊর্মিলার রুমে বসে পাস্তা খাচ্ছে আর ঊর্মিলার সাজুগুজু দেখছে। তার অনেক শখ ছিলো শাড়ি পড়ার কিন্তু এই পেট নিয়ে শাড়ি পড়লে তাকে কেমন দেখাবে সেটা ভেবেই আর পড়েনি। ঊর্মিলাকে একটা গোলাপি রঙের জামদানী শাড়ি পড়ানো হয়েছে, দেখতে অপূর্ব লাগছে।
“আপু তোমাকে তো অনেক সুন্দর লাগছে গো।”
অলির কথা শুনে ঊর্মিলা লাজুক হাসলো। এতোক্ষণ এক্সাইটমেন্ট থাকলেও এখন কেমন যেন অদ্ভুত টাইপের ফিলিংস হচ্ছে। এরই মাঝে আলভী দরজায় নক করে অলিকে ডাক দেয়,
“অলিই।”
অলি পাস্তার প্লেট টা রেখে আস্তে করে উঠে দাড়ালো। ওড়না টা ভালো করে টেনে ধীরপায়ে এগিয়ে গেলো দরজার দিকে। দরজা খুলে উঁকি দিতেই আলভী গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“বেরিয়ে এসো। তোমাকে না বলেছি রুমেই থাকবে। বের হলে কেনো বলোতো?”
অলি রুম থেকে বেরিয়ে এসে গাল ফুলিয়ে বলল,
“আমার রুমে বসে থাকতে ভালো লাগছিলোনা।”
আলভী একটা চাপা শ্বাস ফেললো, “আচ্ছা এসো তাহলে তোমাকে দাদুমনির পাশে বসিয়ে রেখে আসছি। সে যদি একটু বলে কয়ে বোঝাতে পারে।”
অলি মাথা নেড়ে হাটা ধরলো, পথিমধ্যে দেখা হয়ে গেলো ইয়াদের সাথে। ইয়াদ বরাবরের মতোই একটা হাসি উপহার দিয়ে নিজের রুমে চলে গেলো।
***
“দিহান ঊর্মিলাকে আংটিটা পড়িয়ে দে।”
মায়ের কথায় সম্মতি জানিয়ে দিহান ঊর্মিলার দিকে হাত এগিয়ে দেয়। ঊর্মিলা মাথা নিচু রেখেই দিহানের হাতের উপর হাত রাখলো। দিহান আংটিটা পড়িয়ে দিয়ে ঊর্মিলার দিকে তাকাতেই ঊর্মিলা সবার অগোচরে দিহানকে চোখ টিপ মারলো। এহেন কান্ডে দিহান হকচকিয়ে গেলো। এদিকে ঊর্মিলার চোখ টিপ দেওয়াটা অলি, আলভী আর ইয়াদ লক্ষ্য করেছে। ইয়াদ আর আলভীর ভ্রু কুচকে গেলেও অলি ফিক করে হেসে উঠলো। দিহান পানি খাওয়ার উদ্দেশ্যে টেবিলের দিকে হাত বাড়াতেই ইয়াদ এগিয়ে এসে তার দিকে পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিলো। দিহান গ্লাসটা হাতে নিয়ে একবার ইয়াদের দিকে তাকায়। ছেলেটা একদমই ইন্ট্রোভার্ট টাইপের। কখনোই প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেনা। অদ্ভুত,
“তো সামনের মাসেই ওদের বিয়ের ডেট ফিক্সড করি? কি বলেন বেয়াই সাহেব?”
দিহানের বাবার কথার প্রতিউত্তরে উসমান মির্জা সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ অবশ্যই। শুভ কাজ ফেলে রাখতে নেই।”
এভাবেই পাকা কথা হয়ে গেলো। সবাই বিকেলের নাস্তা করে বাড়িতে ফিরে গেলেন। অলিসহ বাড়ির সবাই ড্রইংরুমেই বসে আছে। আলভীও এতোক্ষণ ছিলো কিন্তু একটা ফোন আসাতে সে উপরে চলে গেছে। নূরনাহার আর শাহানাজ বেগম কিচেনে সার্ভেন্টদের গোছগাছের তদারকি করছেন। ইয়াদ টেবিল থেকে একটা নাশপাতির টুকরো মুখে নিয়ে চিবুতে চিবুতে ঊর্মিলার উদ্দেশ্যে বলল,
“কিরে তুই আমাদের মানসম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেললি কেনো হু?”
ঊর্মিলা থতমত খেয়ে গেলো। সে আবার কখন কি করেছে? ইয়াদের কথা শুনে বাকি সবাই অবাক চোখে তাকায়, দাদুমনি বললেন,
“কি বলছো দাদুভাই?”
ইয়াদ তীর্যক হেসে বলল, “তোমার পেয়ারের নাতনি সবার সামনে কি করেছে জানো?”
ঊর্মিলা এবার একটা ঢোক গিলে বলল, “ভাইয়া তুমি কিসব বলছো আমার নামে?”
“কিসব বলছি মানে? তুই সবার সামনে দিহান ভাইকে চোখ টিপ মারলি কেনো গাধী? যদি তার বাবা মা দেখে ফেলতো কি ভাবতেন ওনারা?”
ইয়াদের কথা শুনে দাদুমনি হেসে উঠলেন। অলিও তার সাথে তাল মেলালো। উসমান মির্জা আর ইয়ামিন মির্জা বিব্রতবোধ করে নিজেদের রুমের দিকে পা বাড়ালেন। এদিকে ঊর্মিলা বাবা আর কাকার সামনে ভারী লজ্জা পেয়েছে। তবে তারা চলে যেতেই সে বলে উঠলো,
“ভাইয়া তুমি কি বলোতো দিলে তো বাবা আর কাকার সামনে আমার প্রেস্টিজ পাঞ্চার করে।”
ইয়াদ এগিয়ে গিয়ে ঊর্মিলার মাথায় চাপড় দিয়ে বলল,
“আর তুই যে আমাদের সবার প্রেস্টিজের ফালুদা বানিয়ে তোর শ্বশুর শাশুড়ীর সামনে পরিবেশন করেছিলি তখন?”
ঊর্মিলা এবার না পেরে বলল, “আরে ভাইয়া আমি ইচ্ছা করে করিনি আমার চোখে কি যেন সমস্যা হয়েছিলো তাই ভুল করে তেমনটা হয়ে গিয়েছিল।”
“ও আচ্ছা তাহলে চল তোকে ভাইয়ার কাছে নিয়ে যাই। বিয়ের আগে চোখে সমস্যা হওয়া তো ভালো লক্ষ্মণ নয়”
ঊর্মিলা কাদোকাদো মুখ করে বলল, “ওর কাছে কেনো যাবো?”
“অভিয়াসলি ভাইয়া একজন ডাক্তার সেই জন্য। যখন পিঠের উপর ভাইয়ার হাতের স্পেশাল ডোজ পড়বে তখন তোর চোখের সকল সমস্যারা সুড়সুড় করে পালিয়ে যাবে।”
কথাটা বলে ইয়াদ ঊর্মিলার মাথায় আবারও চাপড় দিলো ঊর্মিলা এবার ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“ভাইয়া প্লিজ, ভুল হয়েছে আমার।”
ইয়াদ এবার হেসে উঠলো, তার সাথে দাদুমনিও হাসছে কিন্তু অলির হাসি মুহুর্তেই থেমে গেলো। কানে বারবার স্পষ্টভাবে বেজে উঠতে লাগলো,
—দেখা যাক তুই কতোক্ষণ টর্চার সহ্য করতে পারিস। পিঠের উপর যখন স্পেশাল ডোজ পড়বে তখন সুড়সুড় করে পেপারে সাইন করে দিবি।
এই একটা কথাই যেন দেয়ালের গায়ে প্রতিধ্বনি হয়ে আবারও ফিরে আসছে। অলির শরীর জমে গেলো, সে কাঠকাঠ চোখে ইয়াদের দিকে তাকাতেই দেখলো ইয়াদ তার দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই ইয়াদ ঠোঁটের কোণে হাসি টানলো। অলির নিশ্বাস থমকে গেলো, গলা শুকিয়ে চৌচির। ইয়াদ তো ঊর্মিলার সাথে আবারো ইয়ার্কি করেই যাচ্ছে কিন্তু অলি তড়িৎ গতিতে বসা থেকে উঠে দাড়ালো। তার পা জোড়া অসম্ভব রকমের কাপছে। মনে হচ্ছে কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে পেছন থেকে টেনে ধরছে। অলি একমূহুর্ত আর অপেক্ষা করলোনা। দ্রুতপায়ে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো তাকে এভাবে চলে যেতে দেখে ইয়াদ কথা বলা থামিয়ে দিলো। তার চোখ অলিকে পেছন থেকে নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এরই মাঝে অলি আরেকবার পিছু ফিরে তাকায়। আবারও চোখাচোখি হতেই ইয়াদ হাসি উপহার দিলো। অলি ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে তাকালো আর ভুলেও ইয়াদের দিকে তাকালোনা।
অলি রুমের সামনে এসে হাপাতে লাগলো, মনে হচ্ছে সে মরুভূমির বুকে হারিয়ে গিয়েছিলো মাত্রই একটু পানির দেখা পেয়েছে। সে দরজা খুলে রুমে ঢুকে দেখলো আলভী রুমে নেই। অলি ওড়না দিয়ে কপালের ঘামগুলো মুছে নিলো তারপর বাম হাত দিয়ে কোমড়ের পেছনটা চেপে ধরে এগোতে লাগলো ব্যালকনির দিকে। ব্যালকনির দরজা ফাঁক করে উঁকি দিতেই অলির কানে আলভীর বলা কিছু কথা ভেসে এলো, যেগুলো শুনে তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেলো যেন।
চলবে,,,