#১৫_বছর_বয়সী_মা (৫৫)
#সোফিয়া_সাফা
আরিশের কান্নার শব্দে আলভীর মাথায় ধপ করে জ্বলে ওঠা আগুন নিমিষেই নিভে যায়। অলি সাথে সাথেই আরিশের মুখে খাবার গুজে তাকে শান্ত করে ফেলে। তারপর আলভীর উদ্দেশ্যে নিম্নস্বরে বলে,
“আমি আপনার সাথে বাজে বিহেভ করতে চাইনা। আমাকে কিছুসময় নিজের মতো থাকতে দিন।”
“তুমি নিজের মতো থাকতে চাইলে থাকতেই পারো। কিন্তু সারাদিন না খেয়ে থাকাটা একটু বেশি বেশিই হয়ে যাচ্ছেনা?”
“আমার ক্ষিধে লাগেনি, সকালে খেয়ে নেবো।”
আলভী উঠে চলে যেতে নিলে অলি তার হাত ধরে ফেলে।
“শুয়ে পড়ুন।”
কথাটা শুনে আলভী ভ্রু কুচকে অলির দিকে তাকায়, অলি জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“আপনাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে, সেই জন্যই বলেছি।”
আলভী ফোনটা হাতে নিয়ে একজন সার্ভেন্টকে কল দিলো। সার্ভেন্ট এসে কাচগুলো পরিষ্কার করে চলে যেতেই আলভী লাইট অফ করে দিয়ে খাটের উপর শুয়ে পড়ে। আরিশ ঘুমিয়ে গেছে, অলি তাকে ডান পাশে শুইয়ে দিয়ে আলভীর দিকে ঘুরে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। অলির আলিঙ্গনে আলভী হকচকিয়ে গেলো। একটু আগেই কেমন রূঢ় বিহেভ করলো আর এখন আবার জড়িয়ে ধরছে? কি ব্যাপার? আলভী বেশি কিছু ভাবতে পারলোনা তার আগেই অলি বলল,
“আপনার ঘুম আসছেনা?”
আলভী নিশ্চুপ রইলো। মনে মনেই বলল,
“আমার মান-অভিমান, যন্ত্রণা কিংবা ভালোবাসার ভাষা বোঝার ক্ষমতা তোমার হয়নি অলি।”
অলি দ্বিধা নিয়ে আলভীর মাথায় হাত রাখলো। এটুকু স্পর্শেই আলভী চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো। অলি ধীরে সুস্থে আলভীর মাথায় ভালোবাসা সহিত হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো,
অলির কোমল ছোয়ায় কিছুক্ষণের মধ্যেই আলভীর চোখজোড়া লেগে যায়। অলি যেন এই সুযোগটারই অপেক্ষায় ছিলো। সে ধীরেসুস্থে উঠে বসলো তারপর আরিশকে কোলে তুলে খাট থেমে নেমে দাড়ালো।
দরজার কাছে এসে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো অলি। আবার ফিরে গিয়ে টেবিল থেকে আলভীর ফোন আর নিজের ফোন হাতে তুলে নিলো। শেষবারের মতো চোখ রাখলো আলভীর ঘুমন্ত মুখে। বুকের গভীরে কেমন যেন চিনচিন করে উঠলো, কিন্তু মুখে কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশ পেলোনা। দরজা খুলে বাইরে পা রাখলো। নিঃশব্দে দরজাটা বাইরে থেকে লক করে দিয়ে ফোনদুটো পাশের ফুলের টবের উপর রেখে গেলো, যেন আলভী পরে খুঁজে পায়।
অনেক আগেই চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলো অলি। সেই জন্য দরকারি কিছু জিনিস আর কাগজপত্র গোপনে ব্যাগে গুছিয়ে বাগানে ফেলে দিয়েছিলো। কিন্তু আলভীর জন্য দেরি হয়ে গেলো। যার জন্য এখন এই মাঝ রাতেই তাকে আশ্রয় খুঁজতে হবে।
বাগানে এসে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে ব্যাগটা খুঁজতে লাগলো অলি। ঝোপঝাড়ের মধ্যে ফেলে দেওয়া ব্যাগটা খুঁজে পেতেই হালকা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ঠিক তখনই কান খাড়া হয়ে উঠলো, কারো কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। অলি একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। কোলে আরিশ নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে, ছোট্ট বুকটা ধীর লয়ে ওঠানামা করছে। অলি একবার চারপাশে তাকালো, তারপর গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে কণ্ঠস্বরের উৎসের দিকে এগোতে শুরু করলো। যত এগোল, ততই কথাগুলো স্পষ্ট হতে লাগলো,
—বাচ্চাটা দুনিয়াতে এসে গেছে। এবার আর ওই মেয়েটাকে আমাদের প্রয়োজন নেই। যেকোনো উপায়ে মেয়েটাকে মে*রেই ফেলবো।
অলি নীরব দর্শকের মতো গাছের পেছনে লুকিয়ে কথাগুলো শুনতে লাগলো। ছায়ামানবটি হাসতে হাসতেই বলল,
—দুপুরে এভি ছিলোনা সেই সুযোগে ওর খাবারে পয়জন মিশিয়ে দিয়েছিলাম কিন্তু মেয়েটা বোধহয় খাবার গুলো খায়নি। হাহ ওর গুড লাক কতোদিন ওকে বাচিয়ে রাখতে পারে আমিও দেখে নেবো।
লোকটার কথা শুনে অলির সারা শরীর কেপে উঠলো। শ্বাস প্রশ্বাসের গতিও বেড়ে গেলো। লোকটা কল কেটে দিয়ে সামনে তাকাতেই বাগানে লাগানো লাইটের আলোয় অলি পুরোপুরি ভাবে লোকটার চেহারা দেখতে পায়। লোকটা হচ্ছে ‘ইয়াদ’। ইয়াদও অলির দিকে তাকাতেই নেবে কিন্তু তার আগেই ফোনটা আবারও বেজে ওঠে। ইয়াদ একটা শ্বাস ফেলে কলটা রিসিভ করে,
—ফোন দিচ্ছিস কেনো? তোর কি মনে হয়, এভির সর্বনাশ করার পরিকল্পনা করা ছাড়া আমার আর কোনো কাজ নেই?
ইয়াদ থামলো,
—একদম কান্নাকাটি করবিনা। তোর কান্নার শব্দগুলো একদম বিরক্তিকর। মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।
ফোনের অপাশ থেকে কিছু হয়তো বলল, যা শুনে ইয়াদ আবারও থেমে গেলো। তারপর বলতে লাগলো,
—লজ্জা করছেনা? যে তোর এতোবড় সর্বনাশ করলো তার জন্য হাউমাউ করে কান্না করতে? ও তোর থেকে মা হওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। বুঝিস এটার মানে? একটা মেয়ের মাঝে যদি মা হওয়ার ক্ষমতাটাই না থাকে তাহলে তার জীবন মূল্যহীন হয়ে যায়। শোন ফার্দার কল করে কান্নাকাটি করবিনা। তুই এভির বাচ্চার মা হতে চাস সেই জন্যই কিন্তু বাচ্চাটার কোনো ক্ষতি করিনি। নইলে এতোদিনে তুই এভির বউ হয়ে যেতে পারতি। মা আর বউ একসাথে হতে চাইলে তো একটু বেশিই ধৈর্য্য ধরতে হবে রূপ।
অলি গাছের আড়ালে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যেন শরীরটা ভারী পাথরে পরিণত হয়েছে। আর কোনো সন্দেহের অবকাশ রইলো না। এসবের নেপথ্যে ইয়াদই আছে। ফুপাতো বোনের স্বার্থ রক্ষার জন্যই সে এমন নির্মম ফাঁদ পেতেছে, এমনকি অলিকে মে*রে ফেলতেও দ্বিধাবোধ করছে না।
ইয়াদ কল কেটে সোজা বাড়ির দিকে পা বাড়াল। অলি তাকিয়ে রইলো তার চলে যাওয়ার দিকটায়। কিছুক্ষণ পর ধীরপায়ে গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। নিজের পায়ের শব্দ যেন নিজেই শুনতে পাচ্ছেনা। ভারী মন নিয়ে অলি নতুন পথে হাঁটা শুরু করলো। যেদিকে দুচোখ যাবে সেদিকেই চলে যাবে সে। তবুও এই অভিশপ্ত বাড়িতে আর এক মুহূর্তও থাকবে না।
যেই বাড়ি তার থেকে সব কেড়ে নিয়েও ক্ষান্ত হয়নি। এখন তার বাচ্চাটাকেও কেড়ে নেওয়ার জাল বুনছে। এমনকি বেচে থাকার অধিকার টুকুও কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত করছে। সে থাকবেনা আর এই বেঈমান মুখোশধারী জানো*য়ারদের সাথে। যদি আল্লাহ তার নসিবে মৃত্যু লিখে থাকেন, তবে তা হোক অন্য কোথাও; কিন্তু এই জানো*য়ারদের হাতে সে ম*রবে না। আর নাতো এই জানো*য়ারদের হাতে নিজের সন্তানকে তুলে দেবে।
ভোরের দিকে,
ঘুমের ঘোরে অভ্যাসবশতই অলিকে জড়িয়ে ধরার উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিলো আলভী কিন্তু ফাঁকা বিছানায় হাত পড়তেই তার ঘুম ভেঙে গেলো। মুহূর্তের ভেতরেই চোখ মেলে তাকাল, পাশের জায়গাটা শূন্য পরে আছে। আঁতকে উঠে এক লাফে খাট থেকে নেমে গেলো আলভী। প্রথমেই দৌড়ে গেলো ওয়াশরুমে, তারপর ব্যালকনিতে। প্রতিটি জায়গায় অস্থির চোখে খুঁজলো, কিন্তু কোথাও অলির ছায়া পর্যন্ত নেই। আলভী ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মাথার চুল টানতে টানতে দরজা খুলতে চাইলো কিন্তু দরজা বাইরে থেকে লক করা। গতদিন দরজাটা ভেতর থেকে লক থাকায় ভাঙ্গার সময় শুধু ভেতরেই লকটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো কিন্তু বাইরের লকটা পুরোপুরি অক্ষত ছিলো।
এক মুহূর্ত দেরি না করে ফোন খুঁজতে শুরু করল আলভী। বিছানা, টেবিল, চারপাশ সব তন্নতন্ন করে খুঁজেও ফোনের কোনো হদিস মিলল না। কয়েক সেকেন্ডের ভেতরেই বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠলো, অলি কি তবে ছেলেকে নিয়ে অজানায় পাড়ি জমিয়েছে? ব্যপারটা বোধগম্য হতেই আলভীর মাথার ভেতর যেন বজ্রাঘাত হলো। শরীর মুহূর্তেই অবশ হয়ে এলো, হাতপা কাঁপতে লাগলো। দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে ধপ করে ফ্লোরেই বসে পড়লো,
“অলিইইইইই”
আলভী চিৎকার করে ডাকতে লাগলো। যদিও সে জানে এই ডাক আর অলি অবধি পৌছাবে না। আলভী বহু কষ্টে নিজেকে ব্যালকনি পর্যন্ত টেনে আনলো তারপর সেখানে দাঁড়িয়েই গগনবিদারী চিৎকারে ডাকতে লাগলো,
“অলিইইই যেওনা, আমাকে ছেড়ে। প্লিজ, ফিরে এসো।”
আলভী পাগলের মতো আচরণ করছে। বিভ্রমের বশে যেদিকেই তাকাচ্ছে অলিকেই দেখতে পাচ্ছে, যেমন এখন সে দেখতে পাচ্ছে অলি বাগানের সাইডে থাকা পুকুর পাড়ে বসে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আলভী গলায় কম্পন অনুভব করলো, অসহায় কন্ঠে আবারও চিল্লিয়ে উঠলো,
“হানিবি… দাঁড়াও, আমি আসছি। আমাকে ছেড়ে তুমি যেতে পারোনা। আমি তোমাকে কোত্থাও যেতে দেবোনা।”
বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা সেই মরিয়া অনুভূতি আলভীকে আর স্থির থাকতে দিলোনা। একপর্যায়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ব্যালকনির রেলিঙে উঠে গেলো সে। চোখে মুখে ছিল শুধু একটাই দৃশ্য ‘অলি’। আলভী কোনো কিছু না ভেবেই সেখান থেকে ঝাপ দিলো।
“আমি সবকিছু ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম হানিবি শুধু তোমার জন্যই ফিরে এসেছি। আমৃত্যু তোমার জন্যই ফিরে আসবো। পরিস্থিতির চাপে পথ ভিন্ন হতে পারে কিন্তু আমার লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য একমাত্র তুমি অবধি পৌছানো। জীবনের যেই রাস্তা ধরেই হাটিনা কেনো শেষ অবধি আমি বারবার, হাজার বার তোমার কাছেই ফিরে আসবো। তুমি শুধু আমার জন্য অপেক্ষা কোরো। করবে তো?......”
সকাল ১১ টা
“এক্সকিউজ মি, জানালার পাশের সিটটা আমার।”
পুরুষালি কন্ঠ শুনে জানালার পাশের সিটে বসে থাকা নিকাব পরিহিতা নারীটি পুরুষটির দিকে তাকাতেই থমকে গেলো। বিরবির করে উচ্চারণ করলো, “নোমান ভাই?”
এদিকে নিকাবের আড়ালে থাকা ষোড়শী রমণীটিকে চিনতে কিছুটা বেগ পেতে হলো। তবুও কনফার্ম হওয়ার জন্য বলে উঠলো, “মিসেস অলি? আর ইউ মিসেস অলি?”
অলি আনমনেই মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে ফেললো। নোমান যেন আকাশ থেকে পড়েছে। তৎক্ষনাৎ চোখ পড়ে অলির কোলে থাকা জোনাকি পোকা আর্ট করা বেবি র্যাপারে মোড়ানো নবজাতকের উপর।
“ওহ মাই গড। তোমার বেবি?”
অলি একটা শুষ্ক ঢোক গিলে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ে। নোমান ধপ করেই অলির পাশের সীটে বসে পড়লো। ট্রেনে করে সিলেট যাওয়াকালীন অলিকে বাচ্চা সমেত দেখাটা যেন কল্পনাতীত ছিলো।
“আলভী ভাই কোথায়?”
অলি এদিক সেদিক তাকিয়ে বলে উঠলো, “আছে আশেপাশেই।”
নোমান একটা শ্বাস ফেলে বলল, “বাহঃ তো কোথায় যাচ্ছো তোমরা?”
অলি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে ওঠে, “ঘু…রতে, ঘুরতে যাচ্ছি।”
“এতো ছোট্ট বেবিকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়াটা পিসফুল হবে?”
অলি অবাক চোখে তাকাতেই নোমান কথা ঘুরিয়ে বলে ওঠে,
“না মানে। বলতে চাইছিলাম, বাচ্চা সামলাবে নাকি আনন্দ উপভোগ করবে?”
“আমার বাচ্চাই আমার আনন্দ, আমার সবকিছু।”
নোমানের মুখে ম্লান হাসি ফুটে উঠলো। যাক ভালোবাসার মানুষটিকে সুখে দেখাটাও একটা সৌভাগ্য। যার মাঝে আলাদাই শান্তি আছে। নোমান এই মূহুর্তে সেই শান্তিটাই অনুভব করছে।
“স্যরি ওভাবে বলার জন্য।”
অলি নিশ্চুপ হয়ে রইল।
“আসলে ছেলে জাতির অন্তর্ভুক্ত তো তাই চাইলেও একজন মায়ের ফিলিংসগুলো পুরোপুরি অনুমান করতে পারবোনা।”
অলি প্রতিউত্তর করলোনা। বেশ খানিকক্ষণ কেটে গেলো, নোমান আঁড়চোখে অলির দিকে তাকালো। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে কিন্তু সে আলভীকে একবারও দেখেনি।
“মিসেস অলি, আলভী ভাই কোথায়? ট্রেন তো ছেড়ে দিয়েছে।”
অলি ফের বলল, “আছে আশেপাশেই।”
নোমান আর কিছু বলতে পারলোনা। সে বুঝে গেছে যে ঝামেলা কিছু একটা আছে। আর সেটার ব্যপারে অলি কিছু বলতে চাইছেনা। নোমান ঠিক করলো শেষ পর্যন্ত সে অলিকে পর্যবেক্ষণ করবে।
ঘড়ির কাটা টিকটিক শব্দে জানান দিচ্ছে এখন সন্ধ্যা ৬ টা। ট্রেন টি সবেমাত্র সিলেট শহরের স্টেশনে এসে পৌঁছেছে। পুরোটা রাস্তা নীরবেই কেটেছে। প্রয়োজন ব্যাতিত নোমান অলিকে আর কিছুই জিজ্ঞেস করেনি।
ট্রেন থেকে নামতেই অলি লক্ষ্য করলো নোমান তার পিছুপিছু আসছে। অলি হাটার গতি বাড়িয়ে দিলো ফলস্বরূপ নোমানও তাল মেলালো। অলির একহাতে ব্যাগ আরেক হাতে আরিশ। বাচ্চাটা বেশি জ্বালাতন করেনা বললেই চলে। একদম ঠান্ডা আর শান্ত স্বভাবের বাচ্চা। অলি পেছনে না তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলো, “আপনি আমাকে ফলো করছেন কেনো?”
নোমান দাড়িয়ে গেলো, “ফলো করছিনা আমি জাস্ট দেখতে চাইছি আলভী ভাই কোথায়।”
অলি এবার পিছু ফিরে তাকায়, “নেই কোথাও নেই। আমি তাকে মুক্তি দিয়ে এসেছি। আমার জন্য তার জীবন জাহান্নাম হয়ে গিয়েছিলো। আমি তার বিশ্বাসের যোগ্য ছিলাম না। তাই… আমি…
অলি আর বলতে পারলোনা। গলা শুকিয়ে গেছে। শরীরে আর শক্তি অবশিষ্ট নেই। সে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত, বেচে থাকার জন্য লড়াই করতে করতে সে হয়তো মৃ*ত্যুর খুব নিকটে চলে এসেছে। অলি ফের প্রাণহীন কন্ঠে বলল,
“আপনি দয়া করে আমার পিছু নেবেন না।”
“আমি শুধু তুমি যেখানে যাচ্ছো সেখানে পৌঁছে দিয়ে আসবো। কিছুক্ষণ পর রাত হয়ে যাবে এভাবে একা একা চলাফেরা করাটা সেফ হবেনা।”
অলি ঠোঁট চেপে নিচের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“আমার কোনো গন্তব্য বা লক্ষ্য নেই, আমি আশ্রয়হীন অস্তিত্বহীন এক যাযাবর। নদীর কিনারায় ঘড় বেধেছিলাম কিন্তু পোড়াকপালে সেটাও সইলোনা। দমকা ঝড়ে আমার সুখের ঘড়টা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো, আমার শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নিয়ে আমাকে করে দিলো অস্তিত্বহীন। আমি এখন মৃ*ত্যু পথের যাত্রী। মৃ*ত্যু আমাকে টেনে নিচ্ছে নিজের দিকে। আর আমিও হেটে চলেছি অবলীলায়।”
অলির মতো পিচ্চি একটা মেয়ের মুখ থেকে এতো ভারী কথাগুলো শুনে নোমান রীতিমতো অবাক হলো। সেই সাথে বুঝতেও পারলো, সেদিনের পর অলিকে হয়তো আরও কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছে।
“আমি তোমার কথা বুঝতে পারলাম না মিসেস অলি। তুমি ম*রে যেতেই চাইলে পালিয়ে এলে কেনো? ওখানে বসেই তো ম*রে যেতে পারতে।”
“আ*ত্ম*হ*ত্যা করতে চাইনি আমি তাই পালিয়ে এসেছি। তবে সেখানে থাকলে অন্যের হাতে ম*রতে হতো। আমি অন্যের হাতেও ম*রতে চাইনা। আমার আলোকে তাদের হাতে সঁপে দিতে পারবোনা আমি। ও যে বড্ড নিষ্পাপ। মা হয়ে কি করে জানো*য়ারদের হাতে তুলে দিতাম?”
নোমান নিশ্চুপ হয়ে গেলো। অলি সামনের দিকে ঘুরে হাটা ধরলো।
***
হসপিটালের শুভ্র বেডের উপর শুয়ে আছে আলভী। মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। মাথায় আর বাম হাতে ব্যান্ডেজ প্যাচানো। পাশেই হার্টরেট মনিটরিং ডিভাইসের টুংটুং শব্দ জানান দিচ্ছে শেষ নিশ্বাস টুকু এখনো আটকে আছে। কাচের জানালার ওপাশ থেকে শাহানাজ বেগম ছেলের অবস্থা দেখে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছেন। নূরনাহার তাকে সান্ত্বনা দিতে ব্যস্ত। ঊর্মিলা বাবার বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেদে উঠছে, দিহান, ইয়াদ আর ইয়ামিন মির্জা পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।
“বাবা, ভাইয়া কিভাবে ব্যালকনি থেকে পড়ে গেলো? আর ভাবীই বা ছেলেকে নিয়ে কোথায় উধাও হয়ে গেছে? ভাইয়ার রুমের দরজা বাইরে থেকে লক করা ছিলো কেনো? ফোনদুটোই বা ফুলের টবের উপরে কে রেখেছিলো?”
ঊর্মিলা তখন থেকেই বিলাপ করে যাচ্ছে। হাজারটা প্রশ্ন তার মনে, তবে উত্তর দেয়ার কেউ নেই। বাকিদের মনেও একই প্রশ্ন। দিহানের আজকে বিকেলে ফ্লাইট ছিলো। কিন্তু প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে এই অবস্থায় রেখে যাওয়া সম্ভব নয় বলে টিকেট ক্যান্সাল করে দিয়েছে।
রাত সাড়ে নয়টা,
আলভীর জ্ঞান ফিরতেই নিজেকে হসপিটালের বেডে দেখে চমকে গেলো। মুখ থেকে অক্সিজেন মাক্সটা সরিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসলো। সামনে বসে থাকা বাড়ির লোকগুলো কিছু বলতে যাবে তার আগেই আলভী চিল্লিয়ে ওঠে,
“হোয়ার ইজ অলি? অলি ফিরে এসেছে? এসেছে তাইনা? আমি জানতাম ও ফিরে আসবে। ওর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আমিই ওর শেষ আশ্রয়। আমি ছাড়া ওর কেউ নেই। ও কোথায়? আসতে বলো। আমি কিছুই বলবোনা ওকে। তবে এবার থেকে ওকে আমি লক করে রাখবো। দরকার হলে শেকল দিয়ে বেধে রাখবো। ডাকো ওকে।”
আলভীর কথা গুলো শুনে সবাই হতভম্ব হয়ে গেলো,
“কি বলছিস? ভাবী কোথায় গেছে?”
দিহান প্রশ্ন ছুড়লো কিন্তু এই প্রশ্ন শুনেই আলভী বুঝলো অলি ফিরে আসেনি। কথাটা বোধগম্য হতেই আলভী দিকবিদিকশুন্য হয়ে উঠে দাড়ালো। দাঁড়ানো মাত্রই তার মাথা ঘুরে গেলো। ব্যালকনি থেকে পড়ে যাওয়ার কারণে মাথার পেছনের সাইড ফেটে গেছে। বাম হাতটা পিঠের নিচে পড়ায় সেটাও মচকে গেছে। আলভী মাথা চেপে ধরে মনে মনেই আওড়ালো,
“তুই আমাকে ছেড়ে চলে গেলি? কিভাবে পারলি চলে যেতে? আমি কখনো ভাবতেও পারিনি যে তুই আমাকে ছেড়ে চলে যাবি। আরে আমি তো জানতাম তোর পুরো দুনিয়াটাই আমার মাঝে সীমাবদ্ধ। আর যাই হোক আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারবিনা। এভাবে আমাকে ভুল প্রমাণ করে দিলি? এখন আমি কোথায় খুজবো তোকে?”
আলভীকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে শাহানাজ বেগম জিজ্ঞেস করলেন, “বউমা দাদুভাইকে নিয়ে কোথায় গেছে?”
আলভী বলল, “চলে গেছে।”
“চলে গেছে মানে? কোথায় চলে গেছে?”
দিহানের প্রশ্নের উত্তরে আলভী ছোট্ট করে উচ্চারণ করলো,
“জানিনা।”
আলভী আর কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়না। সে ডান হাত দ্বারা মাথা চেপে ধরে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো। বাকিরা শুধু আহাম্মকের মতো তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো।
৩ দিন পর।।।
কেটে গেছে ৩ দিন। তবে আলভীর কাছে মনে হচ্ছে ৩ যুগ পেরিয়ে গেছে। অলিকে ছাড়া একেক সেকেন্ড যেনো একেক ঘন্টার সমতুল্য।
এখন মাঝরাত,
ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আলভী। মাথার আর হাতের ব্যান্ডেজ খোলা হয়নি। আরও কয়েকদিন পর খোলা হবে। পুরো রুমে জিনিসপত্রের ছড়াছড়ি, আসবাবপত্রও লণ্ডভণ্ড। খাটের উপর আরিশের জন্য কিনে আনা আদূরে পোশাক আর খেলনা গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। আলভীর চোখ আটকে আছে ড্রেসিং টেবিলের ভাঙ্গা আয়নায়। সেই আয়না, যেখানে প্রতিনিয়তই তার প্রিয়তমা স্ত্রীর প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠত। এই আয়নাটার সামনে বসেই সে চুল বাধতো। চুল বাধা ছিলো যেন তার মৌলিক কাজের অংশ। আর আলভীর চোখে সেই দৃশ্য ছিল জাদুর মতো। আলভী অগণিত বার তাকে চুল বাধতে দেখেই বেসামাল হয়ে গিয়েছিলো। আজ সেই আয়না শুধু ভাঙা কাঁচের টুকরোয় আলভীর নিঃসঙ্গ প্রতিচ্ছবি ফিরিয়ে দিচ্ছে। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অন্ধকারে সেই প্রতিচ্ছবিও যেন অপরিচিত ঠেকছে।
“তোর আমার কথা মনে পড়ে না, তাই না? তাহলে আমার কেন এতো মনে পড়ে তোর কথা? আমি কি পাপ করেছিলাম বলেই এই শাস্তি পাচ্ছি? তোকে ভালোবাসাটা কি আসলেই পাপ ছিলো? কিন্তু… আমি তো জানতাম ভালোবাসা পাপ নয়।”
আলভী হঠাৎ থেমে গেল। কাঁপা হাতে একটা সিগারেট জ্বালালো। নীলচে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। ঘরের স্তব্ধ বাতাসে ধোঁয়াটা যেন অলির স্মৃতি হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। আলভী ধোঁয়ার আড়াল থেকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ভাঙা আয়নার দিকে। ঠোঁট নড়ে উঠল আবার,
“আমি তোকে খুঁজে বের করবোই। খুঁজে বের করে… শেকল দিয়ে বেঁধে রাখব। তবু তোকে সত্যিটা বলতে পারব না। কেন জানিস? কারণ সেই সত্য সহ্য করার শক্তি তোর কখনো ছিল না, আজও নেই, আর ভবিষ্যতেও হবে না। আর আমি… আমি সেই সত্যটাকে বহু আগেই নিজের হৃদয়ের গহীনে কবর দিয়ে ফেলেছি।”
সিগারেটটা শেষ হতেই আলভী ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ইনজেকশন বের করল। সে জানে, ভেতরে মর*ফিন আছে, এক ধরনের শক্তিশালী ওপিওয়েড, যা দ্রুত শরীরকে নিস্তেজ করে দেয়। ঘাড়ে নিজে নিজে ইনজেকশন পুশ করা ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ, তবুও সে এটাই করবে।
সুচটা ঢুকতেই ঠান্ডা ধাতুর খোঁচায় চামড়া কেটে গেল। ধীরে ধীরে তরলটা শিরায় মিশে যাওয়ার সাথে সাথেই আলভী বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ভারি চাপ অনুভব করলো। হাত-পা ক্রমশ ঢিলে হয়ে আসছে, দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আলভীর শরীর এবং মাথা দুটোই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। টলতে টলতে সে ঠাস করে খাটে লুটিয়ে পড়লো। চোখের পাতা যেন ইটের মতো ভারী হয়ে এসেছে। শরীর জুড়ে অদ্ভুত এক অস্থিরতা কাজ করছে, কিন্তু প্রতিরোধ করার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই। চারপাশের সবকিছু আস্তে আস্তে অন্ধকারে ডুবে গেলো। শ্বাস ধীর হয়ে এলো, তবে মৃদু, স্থির ছন্দে চলতে থাকলো।
আলভীর অবচেতন মস্তিষ্কে ভেসে উঠলো আজ থেকে ২০ দিন আগের ঘটনা,
ফ্ল্যাশব্যাক—
আলভী ল্যাপটপে একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ করছিলো তখনই তার ফোনে একটা আননোন জিমেইল থেকে মেইল আসে মেইল টা ওপেন করতেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে…
চলবে,,,