#১৫_বছর_বয়সী_মা (৫৮)
#সোফিয়া_সাফা
“ভাইয়া বিশ্বাস করো। আমি শুধু মাত্র তোমার আর রূপের বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। আর কোনোকিছু চাইনি।”
“তুই কতদিন ধরে রিফাতের সাথে যুক্ত ছিলি? আর ওকে পেলিই বা কিভাবে?”
আলভীর ঠান্ডা কন্ঠ শুনে ইয়াদ একটা শুষ্ক ঢোক গিলল,
“তুমি যেদিন ভাবীকে বাড়িতে এনেছিলে তার কিছুদিন পরেই আমার কাছে রিফাতের ফোন আসে। আমি জানিনা সে কিভাবে আমার সাথে কন্টাক্ট করেছিল। কিন্তু আমি রূপের স্বার্থে তাদের সাথে হাত মেলাতে রাজি হয়েছিলাম। রিফাতের মূল উদ্দেশ্যে ছিল তোমার শান্তি কেড়ে নেয়া। তবে ও একা ছিলোনা ওর সাথে আরও একজন ছিলো।”
আলভী ভ্রু কুচকে তাকালো। সে ভাবতেই পারছেনা যে এতগুলো লোক একসাথে তার পেছনে লেগেছিলো।
“এসবের পেছনে আর কে আছে?”
,
পরপর কলিংবেলের আওয়াজে সিদ্দিক দরজা খুললেন। দরজার ওপাশে ইয়াদকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সিদ্দিক হেসে উঠলেন।
“আরে ইয়াদ তুমি? কি খবর? কয়েকদিন ধরে ফোনেও পাওয়া যাচ্ছেনা ব্যাপার কি? এসো ভেতরে এসো।”
ইয়াদ রুমে না ঢুকে সাইডে সরে দাড়ালো। সাথে সাথেই তাকে পাশ কাটিয়ে সিদ্দিককে ঠেলে আলভী রুমের ভেতরে প্রবেশ করলো। আলভী সাথে করে কয়েকজন গুন্ডাও নিয়ে এসেছে। এই গুন্ডাদের দিয়েই আলভী ইয়াদকেও ধরে নিয়ে গিয়েছিলো। এরা শহরের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর গ্যাংয়ের লোক।
“কিরে সিদ্দিক? শুধু ইয়াদকেই মিস করছিলি বুঝি? আমাকে মিস করিসনি? দ্যাটস নট ফেয়ার।”
আলভীকে দেখে সিদ্দিকের কলিজা শুকিয়ে গেলো।
“তুই এখানে?”
ইয়াদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই ইয়াদ বলে ওঠে,
“ভাইয়া আমাকে ধরে ফেলেছিলো। আমি বাধ্য হয়েই আপনার নাম বলে দিয়েছি।”
সিদ্দিক রেগে গেল, “তুমি এটা কিভাবে করতে পারো ইয়াদ?”
আলভী ঠাস করে সিদ্দিকের গালে থাপ্পড় দিয়ে বলল,
“তোর সমস্যাটা কি আমাকে বল।”
সিদ্দিক বুঝতে পারলো এখন আর বাচার রাস্তা নেই। সে তড়িৎ গতিতে আলভীর পা জড়িয়ে ধরলো।
“আমাকে ছেড়ে দেও আলভী। আমার ভুল হয়ে গেছে।”
আলভী হেসে উঠলো। বাম হাতে প্যাচানো ওড়নাটা নাকের নিকটে এনে গভীরভাবে শ্বাস টেনে নিলো।
“তোর ভুল গুলো কি সেগুলো আগে স্বীকার কর। তারপর ভেবে দেখবো।”
আলভী পা ছাড়িয়ে সোফায় গিয়ে বসলো,
“বলতে শুরু কর।”
সিদ্দিক মেঝেতে বসেই বলতে লাগলো,
“আড়াই বছর আগে তোমার কারণে আমার ডাক্তারি লাইসেন্স বাতিল হয়ে গিয়েছিলো। তাই আমি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই রিফাতের সাথে হাত মিলিয়েছিলাম।”
“তুই রিফাতকে চিনলি কি করে?”
“ভুলে গেলে? আমি যেই হসপিটালে ডাক্তার হিসেবে ছিলাম তুমি সেখানে কার্ডিওলজি রেসিডেন্ট হিসেবে ছিলে। আমি প্রায়ই তোমাকে তোমার দুই বন্ধুর সাথে দেখতাম। সেখান থেকেই ওকে খুঁজে বের করেছিলাম।”
আলভী টেবিলের উপরে রাখা উইস্কির বোতল হাতে নিয়ে ঢকঢক করে খেতে লাগলো। খাওয়া শেষ হতেই বলল,
“কতদিন ধরে ওর সাথে মিলে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিস?”
সিদ্দিক একটা শুষ্ক ঢোক গিলল, “বেশি না একবছর।”
“অলিকে কিডন্যাপ করার পেছনে তোরও তো হাত ছিলো?”
সিদ্দিক না বোধক মাথা নাড়লে, ইয়াদ বলে ওঠে,
“উনি মিথ্যা বলছে। উনি তোমাকেও মে*রে ফেলতে চেয়েছিল ভাইয়া, শুধু আমার জন্যই পারেনি। আমি বলেছিলাম আমি তোমার মেডিক্যাল লাইসেন্স বাতিল করতে সাহায্য করবো। বিনিময়ে তোমার কোনো ক্ষতিই ওনারা করবেনা। সেই সাথে তোমার সম্পত্তির ৫০% ও আমি ওনাকে দিয়ে দেবো বলেছিলাম।”
আলভী রক্তচোখে ইয়াদের দিকে তাকিয়ে দেখলো ইয়াদ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আলভী আর কিছু শোনার প্রয়োজন বোধ করলোনা। উঠে গিয়ে সিদ্দিকের গলা চেপে ধরলো,
“তোকে আমি মে*রে ফেললেও কেউ জানবেনা কারণ তুই এমনিতেও জেল থেকে পালিয়ে এসেছিস। তাই তোকে ছেড়ে দেয়ার কোনো মানেই নেই।”
কথাগুলো বলতে বলতেই আলভী সিদ্দিকের শ্বাসরোধ করে মে*রে ফেলে। সিদ্দিকের এই বাড়িটা শহরাঞ্চল থেকে দূরে হওয়াতে তার লাশটাও বাড়ির পেছনেই পুতে দেয়। আলভী ইয়াদকে নিয়ে ফিরে যায় নিজের আন্ডারগ্রাউন্ড বাংকারে। যেটা মূলত ইয়াদকে আটকে রাখার জন্যই তৈরি করিয়েছে।
,
সকাল নয়টা, আলভী একটা সিগারেট ধরিয়ে ঠোঁটে চেপে ধরলো, সামনেই ইয়াদ বসে আছে।
“তো কি ডিসিশন নিলি?”
ইয়াদ নড়েচড়ে বসলো, “ভাইয়া ও আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবেনা।”
“আমি ওর মতামত জানতে চাইনি। তোর সিদ্ধান্ত জানতে চেয়েছি।”
ইয়াদ নিশ্চুপ হয়ে গেল, “তুই যে এমন পাগল সেটা আমি আগে জানতাম না। জানলে নিজে তোর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতাম।”
“আমি রূপের পাগল। আমি ওর জন্য সব করতে পারি।”
“সব করতে হবেনা শুধু ওকে বিয়ে করে নে। নইলে আই সোয়ার তোদের দুটোকেই মে*রে ফেলবো।”
“আমি ওকে কিভাবে বিয়ে করবো ভাইয়া? ও তোমাকে ভালোবাসে।”
“খবরদার এই কথাটা আর একবারও রিপিট করবিনা। ননসেন্স কোথাকার। তুই ওকে ভালোবাসিস, তোর উচিৎ ওর মস্তিষ্কের চিকিৎসা করানো।”
“ওর চিকিৎসা না, তোমাকে প্রয়োজন।”
“আমার ওকে প্রয়োজন নেই। আর শোন অনেক ভালোমানুষি দেখিয়েছিস। এবার জোর করে হলেও ওকে নিজের করে নে। অধিকার খাটা।”
ইয়াদের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো, “তুমি আমাকে জোর খাটাতে বলছো? তুমি নিজে জোর খাটাতে পেরেছিলে?”
আলভী ভ্রু কুচকে তাকালো। ইয়াদের কথা বোধগম্য হলোনা। ইয়াদ আবারও বলতে শুরু করলো,
“ভাবীকে নোমানের সাথে দেখেও তুমি জোর খাটাতে পারোনি কেনো ভাইয়া? স্বামীর অধিকার নিয়েও তো পারতে টেনে হিচরে নিজের সাথে নিয়ে আসতে। তুমি যেখানে স্বামী হয়েও অধিকার খাটাতে পারোনি। সেখানে আমি কোন অধিকার খাটাবো বলতে পারো? আমার কি আদৌ রূপের উপরে কোনো অধিকার আছে?”
“আমি এতো কিছু শুনতে চাইনা। হয় ওকে বিয়ে কর। নয় মৃত্যুকে বরণ কর।”
আলভীর কথার মাঝেই দুজন লোক একটা মেয়েকে নিয়ে এসে ঠাস করে মেঝেতে ছুড়ে মারলো।
“রূপ।”
ইয়াদ ছুটে গেলে রূপসার কাছে। রূপসার হাত, মুখ বাধা। ইয়াদ সেগুলো খুলে দিতেই রূপসা উঠে দাঁড়িয়ে আশেপাশে তাকালো। রূপসা গাড়ি থেকে নেমে কলেজে ঢোকার সময়েই দুজন লোক তাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে এসেছে।
“আমাকে এখানে কে এনেছে? ওরা কার লোক ছিল?”
আলভী সিগারেটের অবশিষ্ট অংশটা ফেলে দিয়ে বলল,
“আমি এনেছি। সেদিন তোর প্রাপ্য শাস্তিটা তোকে দিতে পারিনি। তাই আফসোস হচ্ছিলো। খুব শখ তোর মৃ*ত্যুকে আলিঙ্গন করার? তোর কি মনে হয়? আমার বউজানকে মে*রে ফেললেই আমি তোকে বিয়ে করে নিতাম?”
রূপ আলভীর দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে উচ্চারণ করলো,
“এভি?”
আলভী হেসে উঠে একজনকে ডেকে বলল,
“ওনাকে নিয়ে এসো।”
রূপসা নিজের বাহু থেকে ইয়াদের হাত সরিয়ে দিয়ে দুপা পিছিয়ে গেলো। এরই মাঝে একজন লোক রুমে প্রবেশ করলো। লোকটা হচ্ছে নিকাহ রেজিস্ট্রার,
“এখানে কি হচ্ছে?”
রূপসার কথার প্রেক্ষিতে ইয়াদ মিনমিনিয়ে বলল,
“ভাইয়া আমাদের বিয়ে দিতে চায়।”
রূপসা হতভম্ব হয়ে গেলো, “আমাদের মানে?”
ইয়াদ রূপসার দিকে দুপা এগিয়ে গেলো, “আমাদের মানে, আমার আর তোর।”
“অসম্ভব। মজা করছো, আমার সাথে?”
আলভী ভীষণ বোর হচ্ছে। সে আরেকটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল,
“মজাই করছি। তোদেরকে বাচিয়ে রাখবো ভাবতেই পারিনি। তোদের হাতে দশ মিনিট আছে। আমার মাইন্ড চেঞ্জ হওয়ার আগেই বিয়ে কর। নইলে দুটোকেই এখানে পুতে ফেলবো।”
ইয়াদ জানে আলভী মজা করছেনা। সে নিজের চোখে আলভীকে খু*ন করতে দেখেছে। ইয়াদ রূপসার হাত ধরতে গেলে রূপসা পিছিয়ে যায়।
“আমি তোমাকে বিয়ে করবোনা।”
আলভী ভ্রু কুচকে রূপসার দিকে তাকায়। মনে পড়ে যায় অলির কথা। অলিকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পর অলি বলেছিল,
***আমি ম'রে যাবো তবুও আপনাকে বিয়ে করবোনা। আপনাকে বিয়ে করার আগে আমি দরকার হলে বি'ষ খেয়ে নেবো***
আলভী এবার উঠে দাড়ালো, রূপসার দিকে এগিয়ে যেতেই ইয়াদ রূপসার সামনে এসে দাঁড়ায়,
“ভাইয়া ওকে কিছু বলোনা। আমি ওকে বিয়ে করে নেবো।”
“ওকে সাবধান করে দে, আর একবার যদি বিয়ে করবোনা শব্দটা উচ্চারণ করে তাহলে আমি ওর পোস্ট মর্টেম করার ব্যবস্থা করবো।”
রূপসা এবার শুষ্ক ঢোক গিলল। আলভীকে স্বাভাবিক দেখাচ্ছেনা। চোখদুটো লাল টকটকে হয়ে আছে। যে কেউ দেখলেই ঘাবড়ে যাবে।
“তোরা আমার বউজানকে মা*রতে চেয়েছিস। তবুও এবারের মতো ছেড়ে দিচ্ছি। এর থেকে আর বেশি কিছু কি চাই তোদের? কি ভেবেছিস? পার পেয়ে যাবি? নো ওয়ে আমার বউজানের চোখের সামনেই তোদেরকে শাস্তি দেবো। ততোদিন ম্যারিড লাইফ উপভোগ কর। দেখলি আমি কতোটা মহান। তোরা আমার আর অলির ডিভোর্স করাতে চেয়েছিস। আর আমি তোদের বিয়ে দিতে চাইছি। তোদের কি আমার শুকরিয়া আদায় করা উচিৎ নয়?”
ইয়াদ নিশ্চুপ হয়ে রইলো। রূপসা ছলছল নয়নে আলভীর দিকেই তাকিয়ে আছে,
“তোদের হাতে আর আট মিনিট সময় আছে।”
ইয়াদ এবার রূপসার দিকে তাকালো।
“চল।”
“নাহ আমি তোমাকে বিয়ে…
বাক্যটা শেষ করার পূর্বেই ইয়াদ বেশ জোরেশোরেই রূপসার গালে চড় দিয়ে বসলো। তারপর রূপসার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল সামনের দিকে। নিকাহ রেজিস্ট্রার বললেন,
“বিয়ে পড়ানোর জন্য তো এনআইডি কার্ড লাগবে।”
ইয়াদ আলভীর দিকে তাকাতেই আলভী বলল,
“আমার দিকে তাকাচ্ছিস কেনো?”
“ভাইয়া আমার ফোনটা দাও সেটার ভেতরেই এনআইডি কার্ডের ছবি আছে।”
আলভী একজনকে ইশারা করতেই লোকটা ইয়াদের ফোনটা এগিয়ে দেয়।
“আমার ফোনে এনআইডি কার্ডের ছবি নেই।”
রূপসার কথায় ভ্রুক্ষেপ করলোনা ইয়াদ। রূপসার হাত থেকে জোরপূর্বক ফোনটা নিয়ে রুনা খাতুনকে ম্যাসেজ পাঠালো,
—মা আমার এনআইডি কার্ডের ছবিটা লাগবে দু মিনিটে খুঁজে ছবি তুলে পাঠাও।
৫ মিনিট পেরোতেই রুনা খাতুন রূপসার এনআইডি কার্ডের ছবি তুলে পাঠিয়ে দিলেন।
বিকাল বেলা,
“তোমার কোনো সমস্যা হচ্ছেনা তো?”
নোমানের কথায় অলি মুখ তুলে চাইলো। না বোধক মাথা নেড়ে বলল,
“বাসে চড়ার অভ্যাস আছে আমার।”
নোমান একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল, “আচ্ছা আমরা তো তোমার খালার বাড়িতে যাচ্ছি তাইনা?”
“না রাবেয়া আন্টি আমার খালা নন। মায়ের বান্ধবী ছিলেন। আমরা সেখানেই যাচ্ছি।”
“আমি কি জানতে পারি যে আমরা সেখানে কেনো যাচ্ছি?”
অলি কোলে থাকা আরিশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি শুধু জানতে চাইবো, সে কেনো কাউকে কিছু না বলে চলে এসেছিলো।”
“তুমি তার ঠিকানা জানো কিভাবে?”
“২ বছর আগে মায়ের সাথে আন্টির গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলাম। সেই জন্যই ঠিকানা টা একটু আকটু জানা আছে।”
“তোমার কি মনে হয় আন্টি আংকেলের মৃ*ত্যু স্বাভাবিক ছিলোনা?”
“জানিনা। এতদিন সব স্বাভাবিক লাগলেও ইয়াদের বিষয়ে জানার পর সন্দেহ হচ্ছে। আচ্ছা আপনিই তো সেদিন আমাকে কিডন্যাপ করেছিলেন। আপনি কি এই ব্যাপারে কিছু জানেন?”
নোমান ভাবুক ভঙ্গিতে বলল, “আমার মনে হয়না যে তোমার বাবা মায়ের মৃ*ত্যুতে কারো হাত ছিলো। আর থাকলেও আমি জানিনা। আমাকে শুধু তোমাকে কিডন্যাপ করারই অর্ডার দেয়া হয়েছিল।”
“আমি এটাই বুঝতে পারছিনা যে বাবার সাথে মোবাইল ছিলো। সেটা কোথায় হাওয়া হয়ে গেলো। মোবাইলটা থাকলে অন্তত হসপিটালের লোকেরা আমাদের আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ করতে পারতেন।”
অলির কথায় যুক্তি আছে। নোমান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠলো,
“আচ্ছা তোমার চাচাতো দেবর ‘ইয়াদ’ তোমাকে মারতে চেয়েছিলো সেটা জানার পরেও তুমি ওকে কিছুই বলবেনা?”
অলি শান্তকন্ঠে বলল, “ওকে যা বলার ওর ভাই-ই বলবে।”
নোমান চমকে গেল, “আলভী ভাই কিভাবে জানবে যে এসবের পেছনে ইয়াদ আছে?”
প্রশ্নটা শুনে অলির মনে পড়ে যায় সেদিন মির্জা ভিলা থেকে পালিয়ে আসার সময় ব্যাগ আনতে বাগানে গিয়েছিলো সে। সেখানে গিয়েই ইয়াদের ব্যাপারে একদম নিশ্চিত হয়েছিল। মির্জা ভিলা থেকে বের হওয়ার পরেই তার মনে হতে থাকে,
“আমি সবাইকে এভাবে ছেড়ে দিয়ে যেতে পারিনা। ঘরের শত্রু বিভীষণ। ইয়াদের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমার পুরোপুরি ধারণা নেই।”
কথাটা ভেবেই অলি আবারও মির্জা ভিলাতে প্রবেশ করে। আসার সময় আলভীর রুমে থাকা মেইন গেটের এক্সট্রা চাবিটা আনার সুবিধার্থে প্রবেশ করতে তার বিশেষ ঝামেলাও হয়না। যদিও এরই মাঝে সে ক্লান্ত হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে যেকোনো সময়েই জ্ঞান হারাবে। তবুও অলি ফুলদানির উপরে রেখে যাওয়া নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে নোটপ্যাড ওপেন করলো তারপর সেখানেই চিঠির মতো করে সবকিছু তারাহুরো করে লিখে দিলো। বেশি সময় না থাকাতে অলি ততটা গুছিয়ে লিখতে পারেনি। এরই মাঝে ঊর্মিলা পানি খাওয়ার জন্য রুম থেকে বের হয়। তাকে বের হতে দেখে অলি ফুলদানির পেছনেই লুকিয়ে পড়ে। ঊর্মিলা নিচ থেকে জগে পানি ভরে নিজের রুমে যেতেই অলি সময় নষ্ট না করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে ৩০ মিনিট হাটার পর একটা বড়সড় ট্রাক নজরে পড়ে। অলি জানে এই রাতে ঘোরাঘুরি করাটা সেফ হবেনা। তার উপর শরীরের দূর্বলতাও জানান দিচ্ছে এখন আর সম্ভব নয়। অলি ব্যাগটা কাধে ঝুলিয়ে ওড়নার সাহায্যে আরিশকে নিজের সাথে বেধে নিলো। তারপর ট্রাকের পেছনে চেপে বসলো। সেটা ছিলো মূলত পাটবাহী ট্রাক। অলি সেখানে বসে থাকতে থাকতেই ঘুমিয়ে যায়। সকালে পানির ঝাপটায় তার ঘুম ভাঙ্গে৷ অলি তাকিয়ে দেখে একজন বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে আছে,
“এই মেয়ে কেডা তুমি? গাড়ির মধ্যে কি করো?”
অলি দ্রুত মাথা নেড়ে গাড়ি থেকে নেমে গেলো। চারপাশে আলো ফুটে গেছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো সে রেলস্টেশনের কাছাকাছি আছে। একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে অলি হাটা ধরলো কিন্তু লোকেদের নজর দেখে সে থমকে গেলো। তার পায়ে জুতো নেই। জামাটাও নোংরা হয়ে গেছে। সেই সাথে প্রচুর ক্ষুধা লেগেছে। অলি এবার না পেরেই একটা দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আশেপাশে কোথাও টাকা তোলার সিস্টেম আছে?”
দোকানদার অলিকে ইশারায় একটা ব্যুত দেখিয়ে দিলেন। অলি সেদিকে এগিয়ে গিয়ে প্রথম বারের মতো টাকা তুললো। সে টাকা তুলতে চায়নি কিন্তু এভাবে সে ক্ষুধার তাড়নায় মা*রা যাবে। এছাড়া আর উপায় নেই। অলি ক্রেডিট কার্ড সমেত টাকাগুলো ব্যাগে না রেখে নিজের কাছেই রাখলো। স্টেশনে অনেক সময়ই ব্যাগপত্র ছিনতাই হয়ে যায়। তাকে সতর্ক থাকতে হবে। অলি সেখান থেকে বেরিয়েই প্রথমে মার্কেটে ঢুকলো। নিজের জন্য বোরকা, নিকাব আর আরিশের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনলো। তারপর খাওয়াদাওয়ার জন্য রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলো। যদিও অলি বেশি কিছুই খেতে পারলোনা। খুবই সামান্য পরিমানের খেলো। আরিশের জন্য হলেও তাকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে হবে। এরই মাঝে সিদ্ধান্ত নিলো সে সিলেটে যাবে। তার মায়ের বান্ধবীর বাড়িতে। এছাড়া অন্য কোথাও গেলে আলভী খুব সহজেই তাকে পেয়ে যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। অলি টিকেট কেটে ট্রেনে উঠে বসলো।
অলির কথাগুলো শুনে নোমান কিছুটা স্বস্তি পেলো। অলির দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী রাবেয়া আখতারের বাড়ি এখান থেকে বেশি দুরে নয়।
সন্ধ্যার আগেই অলি আর নোমান রাবেয়া আখতারের বাড়িতে এসে পৌছায়। দরজায় নক করতেই এক তরুণী দরজা খুলে দেয়। দরজা খুলে অলিকে দেখে তরুনীটি ভীষণ আনন্দিত হয়ে গেলো,
“আরে অলি তুমি?”
“হ্যাঁ রায়া আপু। কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। ভেতরে এসো।”
অলি আর নোমান ড্রইংরুমে এসে বসতেই রায়া মাকে ডাকতে লাগলো,
“ও মা দেখে যাও কে এসেছে।”
রাবেয়া আখতার কিচেন থেকে বেরিয়ে অলিকে দেখেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন,
অলি ভদ্রভাবে সালাম দিলো, “আসসালামু আলাইকুম আন্টি।”
রাবেয়া আখতার সালামের জবাব দিলেন। যদিও তাকে দেখে অন্যমনস্ক লাগছে তবুও জিজ্ঞেস করলেন,
“কেমন আছো অলি?”
“ভালো আছি আন্টি। আপনার কি অবস্থা? এভাবে কাউকে কিছু না বলে চলে এলেন কেনো?”
রাবেয়া আখতার অলির উদ্দেশ্যে বললেন,
“সব কথাই বলবো মা, তুমি এতোদূর থেকে এসেছো। আগে ফ্রেশ হয়ে এসে খাওয়া দাওয়া করো।”
অলি স্বাভাবিক গলায় বলল, “না আন্টি আমি শুধু জানতে এসেছি যে সেদিন আমি কিডন্যাপ হওয়ার পর ঠিক কি ঘটেছিল। সেটুকু জেনেই চলে যাবো।”
রাবেয়া আখতার অলির সাথে নোমানকে দেখে অবাক হলেন। এরই মাঝে চোখ পড়ল আরিশের উপর,
“বাচ্চাটা কার অলি?”
অলি আরিশের গালে হাত রেখে বলল, “আমার ছেলে।”
রাবেয়া চমকালেন না। সে অলির প্রেগ্ন্যাসির ব্যাপারে জানতেন। আসমা বানু বলেছিল। স্বাভাবিক গলায় শুধালেন,
“জামাই কোথায়? তাকে তো দেখছিনা।”
“তার কাজ ছিলো তাই আসতে পারেনি। উনি আমার বন্ধু ওনাকে নিয়েই এসেছি।”
রাবেয়া আখতার নোমানকে উপর নিচ পরখ করে বললেন,
“আরে এনাকে নিয়েই তো সেদিন তোমার আর জামাইয়ের মাঝে ঝামেলা হয়েছিল তাইনা?”
অলি অস্বস্তিতে পড়ে গেল, মিনমিনিয়ে বলল,
“সেদিন আলোর বাবা ভুল বুঝেছিলেন। এখন সত্যিটা জানেন।”
রাবেয়া আখতার মুখে হাসি টেনে বললেন, “আজকে তোমাদেরকে কিছুতেই যেতে দিচ্ছিনা। সেদিনের ব্যাপারে সবকিছু বলবো কিন্তু তার আগে ফ্রেশ হয়ে খাওয়াদাওয়া করে নেও।”
রায়া এগিয়ে এসে অলির হাত ধরলো, “মা ঠিকই বলেছে। তুমি আমার সাথে চলো।”
অলি আর না করতে পারলোনা রায়ার সাথে চলে গেলো। এই বাড়িতে রাবেয়া আখতার নিজের ছোট ভাই আর দুই মেয়েকে নিয়ে থাকেন। নোমানকে সে ভাইয়ের রুম টাই দেখিয়ে দিলেন।
***
“আপু বাবুটা এত্তো সুন্দর কেনো?”
রিদির কথা শুনে রায়া হাসলো। রিদি হচ্ছে রায়ার ছোটো বোন ক্লাস সিক্সে পড়ে। আর রায়া এবার ইন্টার সেকেন্ডে ইয়ারে উঠেছে।
রায়া আরিশের গায়ে কাথা টেনে দিয়ে বলে,
“অলি দেখতে সুন্দর তো তাই ওর বেবিও সুন্দর।”
রিদি কিছুটা ভাবুক ভঙ্গিতে বলল, “কিন্তু বাবুটা মোটেও অলি আপুর মতো দেখতে না।”
অলি হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে এসে রিদির কথা শুনতে পায়। তবে কিছুই বলেনা,
“আচ্ছা আপু তোমার বিয়ে হয়ে গেলেও কি এই বাবুটার মতো তোমারও একটা বাবু হবে?”
কথাটা শুনে রায়া থতমত খেয়ে গেল। এই মেয়েটা বড্ড বেশিই পাকামো করে,
“এই তুই এসব কি বলছিস? আমার বিয়ের বয়স হয়েছে নাকি?”
রিদি মুখ বাকালো, “তুমি তো অলি আপুর থেকে বড় ক্লাসে পড়। তবুও তোমার বয়স হয়নি বলছো?”
“একটা চড় খাবি। যা গিয়ে পড়তে বোস।”
“এরকম করো কেনো আপু? একটা বিয়ে করে নেওনা। আমারও এরকম একটা বাবু চাই।”
“তোর বাবু লাগলে তুই-ই বিয়ে করে নেনা।”
“তাহলে আমার বিয়ে দিয়ে দেও। আমার একটা বাবু চাই।”
রায়ার এবার ভীষণ হাসি পেল, “বোকা মেয়ে। বেবি শুধু দেখতেই সুন্দর হয়। পালতে বহুত কষ্ট।”
“কিরকম কষ্ট?”
“এইযে বেবিকে গোসল করাতে হয় খাওয়াতে হয়, ঘুম পাড়াতে হয়।”
রায়া আরও কিছু বলতে যাবে তার আগেই কেউ বলে ওঠে,
“বেবির হাগুমুতুও পরিষ্কার করতে হয়।”
কথাটা শুনে অলি, রিদি আর রায়া ৩ জনই দরজার দিকে তাকালো। নোমান দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রায়া জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই নোমান বলে ওঠে,
“সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট আর কমপ্লিকেটেড কাজ হচ্ছে বেবির হাগুমুতু পরিষ্কার করা। আপনি সেটা বলতেই ভুলে গেছেন। আমি মনে করিয়ে দিলাম।”
রায়ার কপালে ভাজ পড়লো। লোকটাকে কথার মধ্যে বা হাত ঢোকাতে কে বলেছে সেটাই বুঝতে পারছেনা।
“শুনুন আমি বলতে ভুলে যাইনি। উল্টো আপনিই যেচে পড়ে বলতে এসেছেন।”
নোমান কথা বাড়ালোনা। অলির সামনে এসে দাঁড়ালো।
“আন্টি ডাকছে, চলো।”
অলি মাথা নেড়ে আরিশকে কোলে তুলে হাটা ধরলো।
খাওয়া দাওয়া শেষে রাবেয়া আখতার বলতে শুরু করলেন,
“সেদিন অলি কিডন্যাপ হবার পর ভাই অনেক অসুস্থ হয়ে যান। এরই মাঝে আসমাও অপারেশন চলাকালীন মা*রা যায়। খবরটা শোনামাত্রই ভাইয়ের অবস্থা আরও খারাপ হতে শুরু করলো, আমি তাকে সেই হসপিটালেই ভর্তি করি। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয়না। ভাইয়ের ফোন তখন আমার কাছেই ছিলো। এরই মাঝে একজন লোক এসে আমাকে ভয় ভীতি দেখাতে শুরু করে। বলে যে আমি যদি অলির কিডন্যাপের বিষয়ে কাউকে কিছু বলি তাহলে আমাকে গুম করে দেবে। এবং আমাকে শহর ছাড়তেও বাধ্য করে। ভুলবশত ভাইয়ের ফোনটা আমার ব্যাগেই থেকে যায়। পরবর্তীতে ভয় পেয়ে আমি সেটা ফেলে দিয়েছিলাম।”
সবকিছু শোনার পর অলি স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখের কার্ণিশ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তেই খুব সন্তর্পণে মুছে নিলো।
“আমাকে ক্ষমা করে দিও অলি। সেদিন আমার পালিয়ে আসাটা উচিৎ হয়নি। আমার পুলিশের কাছে যাওয়া উচিৎ ছিল।”
অলি হাসার চেষ্টা করে বলল, “না আন্টি আমি এখানে আপনার কোনো দোষ দেখছিনা।”
***রাত ৯ টা,
ইয়াদ ধীর পায়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। তার একপাশে রূপসা, মুখটা ফ্যাকাশে। দু’জনকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাড়ির ভেতরের বাতাস মুহূর্তে ভারী হয়ে গেল। কারও মুখে কথা নেই, কিন্তু চোখগুলো বিস্ময়ে স্থির হয়ে আছে তাদের দিকে। সবার দৃষ্টি এড়িয়ে হনহন করে ভেতরে ঢুকে গেল আলভী। মুখাবয়ব বরাবরের মতোই অনূভুতিশূন্য। ড্রইংরুমে ঢুকেই ভারী শরীরটা ছুড়ে দিলো সোফার উপর। কুশনের চাপা শব্দ চারপাশের নিস্তব্ধতা ভাঙ্গলো ক্ষণিকের জন্য।
হঠাৎ ছেলেকে চোখের সামনে পেয়ে নূরনাহার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কাঁপা হাতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেদে উঠলেন,
“বাবা কোথায় ছিলি? এরকম টা কেউ করে?”
ইয়ামিন মির্জা ব্যস্ত কন্ঠে বললেন, “তুই ঠিক আছিস তো?”
ইয়াদ হ্যাঁ বোধক মাথা নেড়ে মায়ের উদ্দেশ্যে বলল,
“আমি তোমাদের সামনে আসার সাহস পাচ্ছিলাম না মা। আসলে আমি অনেক বড় একটা অন্যায় করে ফেলেছি।”
ইয়াদের কথায় নূরনাহার কান্না থামিয়ে সোজা হয়ে দাড়ালেন। একবার রূপসার দিকে গভীর চোখে চেয়ে ফের ইয়াদের পানে তাকালেন,
“কি করেছিস তুই?”
ইয়াদ ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি রূপকে বিয়ে করেছি মা।”
কথাটা যেন বজ্রপাতের ন্যায়ে নূরনাহারের মাথায় আঘাত হানলো।
“কিহ! তুই মজা করছিস আমার সাথে?”
রূপসা এবার জড়োসড়ো হয়ে দাড়ালো। ছোট মামী তাকে আগে থেকেই ততটা পছন্দ করেনা। আর এখন তো…
ইয়ামিন মির্জা ইয়াদকে টেনে অন্য সাইডে নিয়ে গেলেন,
“তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে? কি বলছিস এসব?”
“আমি সত্যিই বলছি বাবা।”
নূরনাহার দুপা পিছিয়ে গেলেন। একি করে ফেলল তার ছেলে? শাহানাজ বেগম সহ বাড়ির বাকি সদস্যরাও স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নূরনাহার এবার চিল্লিয়ে উঠলেন,
“এটা তুই কি করলি হতভাগা? একটা বন্ধ্যা মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে এলি?”
কথাটা শুনে রূপসা দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়লো। এই কথাটা এতোটা ভারী কেনো? যতবার শোনে ততবারই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। ততবারই মনে হয় প্রথমবার শুনছে। আলভী একমনে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। ফোনের স্ক্রিনে হাসোজ্জল মেয়েটিকে শতবার দেখলেও যেন চোখ ভরেনা। তার মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা যেদিন সে অলিকে নিয়ে এবাড়ির চৌকাঠে পা রেখেছিল। সেদিন অলির পেটে আরিশ ছিলো। আর আজ রূপসাও বউ হিসেবে এই একই চৌকাঠে পা রেখেছে তবে বন্ধ্যাত্ব নিয়ে। আলভী এই দৃশ্য গুলো এনজয় করার জন্যই তো বাচিয়ে রেখেছে ওদের।
পুরো ১ ঘন্টা যাবত বাকবিতন্ডার শেষে অবশেষে ইয়াদ সবাইকে বুঝিয়ে শুনিয়ে রূপসাকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পেয়ে যায়। নূরনাহার আর কিইবা করবেন? একমাত্র ছেলে, রেগেমেগে চলে গেলে? সে অবশ্য জানে ইয়াদ উপরে উপরে হাসিখুশি দেখালেও ভেতরে ভেতরে ভীষণ জেদি।
ইয়াদ রূপসাকে নিয়ে নিজের রুমে চলে যায়। অবশ্য রূপসা পায়ে হেটে যায়নি। ইয়াদ তাকে কোলে করে নিয়ে গেছে। আলভী একভাবেই বসে আছে। তাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে ঊর্মিলা আর শাহানাজ বেগম এগিয়ে গেলেন।
“এভি, ইয়াদ এটা কি করলো?”
আলভী প্রাণহীন কন্ঠে জবাব দিল, “সেটাই যেটা তোমরা আমাকে দিয়ে করাতে চেয়েছিলে।”
ঊর্মিলা মাকে থামিয়ে দিয়ে ভাইয়ের কাধে হাত রাখলো,
“ভাইয়া ডিনার করে নিবি আয়।”
“আমি খেয়েই এসেছি।”
ঊর্মিলার একটা শ্বাস ফেলে ভাইয়ের দিকে তাকালো,
“কি খেয়েছিস? তোর কি মনে হচ্ছেনা ইদানীং তুই একটু বেশিই ওসব খাচ্ছিস?”
“কোনসব?”
শাহানাজ বেগম আফসোসের সুরে বললেন,
“তুই এরকম না করে বউকে খোঁজার চেষ্টা কর। মেয়েটা অভিমান করে চলে গেছে। তোর কি ওকে খুঁজে এনে মান ভাঙ্গানো উচিৎ নয়?”
ঊর্মিলাও তাল মেলালো, “হ্যাঁ ভাইয়া। তুই সবসময় ভাবীর কথাটা এড়িয়ে যাস কেনো?”
আলভী কোনো উত্তর দিল না। নিঃশব্দেই অলির ছবির দিকে তাকিয়ে রইল। শাহানাজ বেগম একটা শ্বাস ফেলে ডাইনিং রুমের দিকে পা বাড়ালেন। এদিকে আলভী ফোনের স্ক্রিনের উপর হাত রেখে ধীরে ধীরে ঠোঁট নাড়ল। প্রথমে শব্দগুলো স্পষ্ট হয়নি, পরে বোঝা গেল, সে আস্তে আস্তে গাইছে।
*ভাড়া কইরা আনবি মানুষ
কান্দিতে মোর লাশের পাশে
চারিদিকে রাখবি নজর,
সে না যেন দেখতে আসে।
সে যদি পায় রে খবর,
কেমনে দিবি লাশের কবর?
আমারে জাগিতেই হবে
যদি গো তার নয়ন ভাসে
চারিদিকে রাখবি নজর,
সে না যেন দেখতে আসে
গানটা শুনে শাহানাজ বেগম থমকে গেলেন। ঊর্মিলা অবাক চোখে ভাইয়ের দিকে চেয়ে রইলো। আলভীর চোখের সামনে ভেসে উঠলো অলির নামাজ আদায় আর কোরআন তেলওয়াতের দৃশ্য। গান থামেনি, বরং আরও ভারী হয়ে উঠল। প্রতিটি লাইন যেন আলভীর বুক ফুঁড়ে বেরোচ্ছে।
তার হৃদয় যেন পবিত্র
ওই মদিনারই মাটি
আমি তার হৃদয়ে বিছাইয়াছি
জায়নামাজের পাটি রে
জায়নামাজের পাটি
পাঁচ ওয়াক্ত মোনাজাতে
বলিতো সে জোড়া হাতে
আখেরাতের পরেও যেন
আমারে সে ভালোবাসে
চারিদিকে রাখবি নজর,
সে না যেন দেখতে আসে
আলভীর চোখ বেয়ে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো অলির ছবির উপর। আলভী ঝাপসা চোখেই অলির স্নিগ্ধ সরল মুখপানের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় পুনরায় গেয়ে উঠলো,
ভাড়া কইরা আনবি মানুষ
কান্দিতে মোর লাশের পাশে
চারিদিকে রাখবি নজর,
সে না যেন দেখতে আসে।
সে যদি পায় রে খবর,
কেমনে দিবি লাশের কবর?
আমারে জাগিতেই হবে
যদি গো তার নয়ন ভাসে
চারিদিকে রাখবি নজর,
সে না যেন দেখতে আসে*
শাহানাজ বেগম ছুটে এসে আলভীকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেদে উঠলেন,
“এসব তুই কি বলছিস এভি?”
“আমি একমূহুর্তের জন্য ওর ভালোবাসা অনুভব করেছিলাম, মনে হয়েছিল আমি ওর ভালোবাসা পেয়ে গেছি। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম মা। ও কখনোই আমাকে ভালোবাসেনি। একটুও না। কেনো ভালোবাসলোনা?”
আলভীর বিলাপ শুনে এবার ঊর্মিলার চোখজোড়াও ভিজে গেল। আলভী কান্নাজরিত কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
“ওকে এনে দেও মা। ওকে এনে দেও। আমি আর পারছিনা। আমি ওকে ছাড়া শেষ হয়ে যাচ্ছি।”
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা- ৩৪৫০+