#১৫_বছর_বয়সী_মা (৬২)
#সোফিয়া_সাফা
একটা বদ্ধ রুম চারদিকে কৃত্রিম আভা। খাটের উপর এলোমেলো অবচেতন দুই নর নারী। উন্মুক্ত দেহদুটো কম্ফোর্টার প্যাচানো। যুবকটি মেয়েটির উন্মুক্ত বক্ষে মুখ গুজে ঘুমে নিমজ্জিত। যারা হলো আলভী আর অলি। এরইমাঝে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে লাবিব। সে নিজের শার্ট খুলে অলির থেকে আলভীকে ছাড়ানোর প্রয়াসে আলভীকে ধাক্কা দিতেই নেশাগ্রস্থ আলভী চোখ মেলে তাকায়। তার রক্তচক্ষু দেখে লাবিব একটা শুষ্ক ঢোক গিলল। নিজেকে সান্ত্বনা দিতে বলল,
“ও আমার কিছুই করতে পারবেনা। আরে ও তো ড্রাংক, আমার সাথে পারবে নাকি?”
লাবিব এসব ভেবেই খাটে উঠে গেল কম্ফোর্টার সরানোর উদ্দেশ্যে হাত বাড়ানোর কিয়তক্ষণের মধ্যেই আলভী তাকে ধাক্কা দেয়। সে টাল সামলাতে না পেরে খাট থেকে পড়ে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় কোমড়ে মারাত্মক আঘাত পেয়ে বহু কষ্টে উঠে দাড়াল, আলভীর দিকে তাকাতেই দেখল, আলভী শান্তচোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তার সেই চাহনি দেখে লাবিব আর এগিয়ে যাওয়ার সাহস পেলনা। একহাতে কোমড় চেপে ধরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। লাবিব চলে যাওয়া মাত্রই আলভী অলি সমেত কম্ফোর্টার মুড়ো দিল। প্রায় আধাঘন্টা সেভাবে থাকার পর আলভী অলিকে ছেড়ে খাটের অন্যপ্রান্তে চলে গেল। অসহায় কন্ঠে বিরবির করে বলল,
“আ'ম স্যরি, আ'ম স্যরি।”
বলতে বলতেই আলভীর চোখ লেগে যায়। ঠিক এই সময়েই রিফাত প্রবেশ করল। অলির কম্ফোর্টার টা সরিয়ে বিকৃত আচরণ করতে করতে বলল,
“তুই বলেছিলি ওর দিকে কেউ তাকালে তার চোখ তুলে ফেলবি। হাত বাড়ালে হাত কেটে ফেলবি। দেখ আমি দুটোই করেছি। পারলে কিছু করে দেখা দেখি।”
তার উক্ত কথাটা কানে পৌছাতেই আলভীর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে রিফাতের দিকে তাকাতেই রিফাতের হাতে থাকা ক্যামেরা টা পড়ে গেল। আলভী একবার অলির দিকে তাকিয়ে আবারও রিফাতের দিকে তাকাল, ইতোমধ্যেই আলভীর মুখাবয়ব রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। কালক্ষেপণ না করেই আলভী শোয়া থেকে উঠে একহাতে অলির কম্ফোর্টার ঠিক করে দিয়ে আরেক হাতে রিফাতকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে মুখ বরাবর একটা ঘুষি দিতেই রিফাত দূরে ছিটকে পড়ে। আলভী খাট থেকে নামতে উদ্যত হওয়া মাত্রই রিফাত কোনমতে ক্যামেরাটা তুলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। আলভী অনেকক্ষণ দরজার হ্যান্ডেল ধরে টানাটানি করেও দরজা খুলতে পারেনা। কারণ দরজাটা রিফাত বাইরে থেকে লাগিয়ে দিয়ে গেছে। আলভী পুনরায় অলির পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে, অলিকে টেনে নিজের কাছে এনে জড়িয়ে ধরে। সে অলিকে জাগানোর জন্য গালে আলতো চাপড় মা’রল, হিসহিসিয়ে বলল,
“ওপেন ইওর আইস। এই, হানিবি, কি হয়েছে? প্লিজ, আ'ম স্যরি।”
এরই মাঝে আলভী আবারও অদ্ভুত কিছু অনুভব করতে লাগল, দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসছে। নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে আলভী পুনরায় অলির ঘাড়ে মুখ গুজলো। অলির উষ্ণ শরীর থেকে নির্গত মিষ্টি ঘ্রাণে আলভী দ্বিগুণ নেশাগ্রস্থ হয়ে পরল। অলির হাতটা নিজের গালে ঠেকিয়ে মুখ তুলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল ঠোঁটজোড়ার পানে। একটা শুষ্ক ঢোক গিলে জিভ দিয়ে নিজের শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে একমূহুর্ত অপেক্ষা না করেই অলির ঠোঁটেজোড়া কামড়ে ধরল। আরও একবার নিয়ন্ত্রণহীন আলভী নিষিদ্ধ উন্মাদনায় অবৈধ স্পর্শে অবচেতন অলিকে কলঙ্কিত করল,
প্রায় একঘন্টা পর ঘড়ির কাটার টিকটিক শব্দ জানান দিচ্ছে রাত ২:২০ বাজে, আলভী এবার পুরোপুরিভাবে শান্ত হয়ে অলির পাশে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ যেতেই চোখের পাতা ভারী হয়ে উঠল, বহু চেষ্টার পরেও সে সেন্সে থাকতে পারলোনা। অলিকে আগলে ধরেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল, আলভীর একটা বদ অভ্যাস আছে ভালো ঘুম হলেই সে নাক ডাকে। এবারও তাই হলো। আলভীর নাক অলির কানের কাছে থাকায় অনবরত নাক ডাকার শব্দে অলির সেন্স ফিরে আসে।
“ছাড়ুন আমাকে, দয়া করে ছাড়ুন।”
একদিকে আরিশের কান্না আরেকদিকে আলভীর নাক ডাকার শব্দে অলি বিরক্তির শেষ পর্যায়ে চলে গেছে।
অলি আলভীকে সুড়সুড়ি দিল কিন্তু তাও আলভীকে একচুলো সরাতে পারলোনা। সোফায় জায়গা বেশি না থাকায় আলভী সম্পূর্ণভাবে অলির উপরেই ভর দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। একপর্যায়ে আরিশ কান্নার মাত্রা বাড়িয়ে দিলে আলভীর ঘুম হাল্কা হয়ে আসে,
“এভাবে ঘুমায় কেউ? কাদতে কাদতে ছেলেটা নীল হয়ে যাচ্ছে আর আপনি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন?”
অলি এবার আলভীর কানের কাছে মুখ নিয়ে চিল্লিয়ে উঠল,
“উঠুউউউনননন…..
আলভী এবার লাফিয়ে উঠল,
“কি হয়েছে? কি হয়েছে?”
আলভী উঠে যেতেই অলি সোফা থেকে নামতে চাইল কিন্তু সারা শরীর ব্যাথায় টনটন করছে। আলভী বাতি জ্বালাতে এগিয়ে যেতে নিলে অলি বাধা দিয়ে বলে,
“আগে আমার কাপড় খুঁজে দিন।”
আলভী এখনো বুঝে উঠতে পারছেনা সে স্বপ্নে আছে নাকি বাস্তবে আছে। এতোক্ষণ সে যা যা দেখেছিল সব কি আসেলেই স্বপ্ন ছিল? কিন্তু স্বপ্ন কি করে এতো বাস্তবিক হতে পারে?
“কি হলো? জলদি কাপড় খুঁজে দিন না।”
আলভী একটা শ্বাস ফেলে অলির কাপড়গুলো খুজতে লাগল কিন্তু অলির সালোয়ার আর আলভীর শার্ট শেকলেই প্যাচিয়ে আছে। আলভী বেশিকিছু না ভেবে শেকলের একপ্রান্ত নিজের হাত থেকে খুলে ফেলল। তারপর কাপড়গুলো অলির দিকে এগিয়ে দিয়ে নিজেও কাপড় পড়ে নিল। লাইট অন করতেই অলি সোফা থেকে নেমে দাড়াল। কিন্তু মুহূর্তেই তার মাথা ঘুরে যায়। আলভী অলিকে পুনরায় সোফাতে বসিয়ে দিয়ে চিন্তিত কন্ঠে বলে ওঠে,
“তুমি বসো আমি ছেলেকে নিয়ে আসছি।”
আলভী দ্রুতপায়ে এগিয়ে গিয়ে আরিশকে কোলে তুলে নিল। ছেলেটা কাদতে কাদতে হিচকি তুলে ফেলেছে। কাদার ধরণ একেবারে অলির মতো। আলভীর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
“ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছেন কেনো? ছেলের কান্না দেখে হাসি পাচ্ছে? আজব বাবা তো আপনি।”
আলভীর হাসি থেমে গেল, ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে গেল অলির দিকে। অলি আরিশকে কোলে তুলে বুকের দুধ খাওয়াতে লাগল। আলভী এগিয়ে গেল খাটের দিকে, খাট সহ পুরো রুমটাই এলোমেলো, গোছানো দরকার। আলভী প্রথমে খাট গোছাতে লাগল। আরিশ ঘুমিয়ে গেলে আলভী পুনরায় তাকে খাটে শুইয়ে দিল। অলি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে নামাজের সময় পেরিয়ে গেছে, এখন সকাল সাড়ে সাতটা বাজে।
“কখন থেকে ডাকছিলাম, ওঠেন নি কেন?”
আলভী তব্দা খেয়ে গেল, সে ঘুমের ঘোরেও অলির সাথে ইয়ে ইয়ে করায় ব্যস্ত ছিল কিন্তু সেসব অলিকে কিভাবে বলবে? আলভী ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলল,
“একটা স্বপ্ন দেখছিলাম। সেই জন্যই…
“কি এমন স্বপ্ন দেখছিলেন শুনি?”
আলভী আবারও হেসে উঠল, ভীষণ অস্বস্তি ফিল করছে, যেই প্রশ্নের উত্তর খোজার জন্য নিজের ছেলের NIPP টেস্ট পর্যন্ত করেছিল সে, সেই প্রশ্নের উত্তর এভাবে পেয়ে যাবে ভাবতেও পারেনি।
আলভীর হাসির ধরন দেখে অলির কপাল কুচকে গেল, আফসোসের সুরে বলল,
“আপনার জন্য আমার নামাজ মিস হয়ে গেল। আমি বসা থেকেও উঠতে পারছিনা। ওয়াশরুমে যাবো কিভাবে?”
আলভী ফট করে অলিকে কোলে তুলে নিল,
“আমি থাকতে চিন্তা কিসের? দরকার হলে আমিই তোমাকে গোসল করিয়ে দেব।”
অলি ছটফটিয়ে উঠল,
“না না। নামান আমাকে, আমি একাই যেতে পারবো।”
“তুমি একটু আগে না বললে? আমার জন্য তুমি বসা থেকেও উঠতে পারছোনা, তো আমার তোমাকে হেল্প করা উচিৎ নয়?”
অলি বারণ করা সত্ত্বেও আলভী তাকে ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে ভেতর থেকে দরজা লক করে দিল।
ঘড়ির কাটা ৮ টা ছুইছুই, জানালার পর্দা ভেদ করে সূর্যের রশ্মি রুমের ফ্লোরে লুটিয়ে পড়েছে, অলি সোফায় বসে আছে, একহাত দিয়ে সালোয়ারের হাটুর অংশ খামচে ধরে রেখেছে। আলভী তার চুল মুছে দিতে ব্যস্ত, হঠাৎ করেই অলির পেটের মধ্যে গুড়গুড় করে ওঠে, অলি লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে গেল,
“তোমার ক্ষুধা লেগেছে?”
অলি না বোধক মাথা নাড়তেই আলভী বলে ওঠে,
“তুমি যে মিথ্যা কথাও বলো তা জানা ছিলনা।”
অলি থতমত খেয়ে গেল। আলভীর দিকে তাকাতেই আলভী হেসে ওঠে,
“তোমার পেট বলছে ক্ষুধা লেগেছে আর তুমি বলছো লাগেনি। কোনটা সত্য?”
অলি নিশ্চুপ থেকে বলে ওঠে,
“পা থেকে এটা খুলে দিন।”
“আমি তোমাকে বিশ্বাস করতে পারছিনা। ওটা খুলে দিলেই যদি তুমি চলে যাও?”
“আমি যাবোনা আর।”
“তুমি একটু আগেও মিথ্যা বলেছো। আমি কিভাবে বিলিভ করবো যে তুমি এবারও মিথ্যা বলছোনা?”
অলি ছলছল নয়নে আলভীর দিকে তাকাতেই আলভী চোখ সরিয়ে নেয়,
“ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে লাভ নেই। তুমি অনেক ছলনা জানো। নইলে সেদিন আমাকে ঘুম পাড়িয়ে পালিয়ে যেতে পারতেনা।”
“পালিয়ে গিয়েই বা কি লাভ হলো? দেড় মাসের মাথায় খুঁজে বের করে ফেললেন।”
আলভীর হাত থেমে গেল, শান্ত কন্ঠে বলল,
“তোমার মনে হচ্ছে দেড় মাস হয়েছে?”
অলি অবাক চোখে তাকায়, আলভী ফের বলে ওঠে,
“দেড় মাস মানে কত সময় জানো?”
অলির কপালের ভাজ আরও গাঢ় হল, মৃদু কন্ঠে উচ্চারণ করল,
“পঁয়তাল্লিশ দিন।”
“পঁয়তাল্লিশ দিন নয় উনপঞ্চাশ দিন/এক হাজার একশো বাহাত্তর ঘন্টা/সত্তর হাজার তিনশো সাতচল্লিশ মিনিট/বিয়াল্লিশ লক্ষ বিশ হাজার আটশো একত্রিশ সেকেন্ড। আর এই প্রত্যেকটা সেকেন্ড ছিল একঘন্টার সমতুল্য। এবার তুমিই হিসাব করে দেখো তুমি আমার থেকে কত সময় দূরে ছিলে।”
বিস্ময়ে অলির ঠোঁটজোড়া আপনা আপনি ফাঁক হয়ে গেল। চোয়াল টাও ঝুলে পড়ার উপক্রম।
“আপনি এসব কি বললেন?”
আলভী তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠল,
“তুমি বুঝতে পারবেনা, যদি বুঝতেই পারতে তাহলে আমাকে ছেড়ে যাওয়ার আগে তোমার পাজোড়া অবশ হয়ে যেতো, নিশ্বাস নিতে কষ্ট হতো। হৃৎস্পন্দন থেমে যেতো। তুমি আমাকে ছেড়ে যাওয়া তো দূর একথা চিন্তাও করতে পারতেনা। যদি তুমি জানতে, তোমার অনুপস্থিতি আমাকে কতটা কষ্ট দেয় তাহলে আমাকে এতোটা কষ্ট দিতে পারতেনা। ভালো না বাসলেও একজন মানুষ হিসেবে কেউ কাউকে এতোটা কষ্ট দিতে পারেনা। যতটা তুমি আমাকে দিয়েছো।”
অলি সোফা থেকে নেমে আলভীর সামনে দাড়াল। আলভীর হাতদুটো ধরে মাথা উঁচু করে বলল,
“আপনি আমার উপর এতটা নারাজ?”
“আমি নারাজ হলেই বা তোমার কি?”
“আপনি আমার স্বামী। আপনি নারাজ হলে আমার অনেক কিছু।”
“আমি নারাজ নই। যা সত্যি তাই বললাম। আমি অবশ্যই তোমার ব্যবহারের কষ্ট পেয়েছি। আর আমি যে কষ্ট পেয়েছি সেটাও নিজ মুখে বলতে হচ্ছে। তুমি ভাবতে পারছো আমি কতটা অসহায়?”
অলি আলভীর হাতজোড়া নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আঘাত প্রাপ্ত স্থানে ঠোঁট ছোয়াল। আলভী ভ্রু কুচকে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। অলি হঠাৎ করেই আলভীর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি যখন আলোকে নিয়ে সন্দেহ করেছেন তখন আমিও কষ্ট পেয়েছিলাম। আপনি কেন সন্দেহ করলেন আমায়? সন্দেহ করার মতো কিছু কি করেছিলাম আমি?”
আলভী হাত সরিয়ে নিল। সে এই ব্যাপারটা ভুলে যেতে চায় কিন্তু অলির জন্য ভুলতে পারবে বলে মনে হচ্ছেনা।
“আমি তোমাকে এই কথাটা বলতে নিষেধ করেছি।”
“বলতে চাইছিনা তো। কিন্তু আমাকে এই ব্যাপারটা শান্তি দিচ্ছেনা। আমি শান্তি পাচ্ছিনা, বিশ্বাস করুন। কেনো সন্দেহ করলেন? বলুন না।”
আলভী অলিকে পাশ কেটে খাটে এসে বসল, অলিও আসতে চাইল কিন্তু পায়ের শেকলের একপ্রান্ত সোফার সাথে লক থাকার কারণে পারলোনা। আলভী আরিশের দিকে তাকিয়ে দেখল আরিশের ঘুম ভেঙ্গে গেছে। কান্না করবে করবে ভাব। আলভী আরিশকে কোলে নিয়ে বুঝতে পারল, আরিশের ডায়াপার পরিবর্তন করতে হবে, আলভী চোখমুখ কুচকে অলির দিকে তাকায়,
“আই থিঙ্ক হি হ্যাজ পুপড্।”
আলভীর অভিব্যক্তি দেখে অলির হাসি পেল তবুও চেহারায় গাম্ভীর্য টেনে বলল,
“আমার পা মুক্ত না করে দেওয়া পর্যন্ত আমি কিছুই করতে পারবোনা।”
আলভী অলির পাশে গিয়ে বসল,
“মানে কি? আমি ডায়পার এনে দিচ্ছি তুমি চেঞ্জ করে দেও। এটা খোলার প্রয়োজন কি?”
“অতো শত বুঝিনা। হয় এটা খুলে দিন নয় ওকে নিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে বসুন।”
আরিশ ঠোঁট ফুলিয়ে কেদে উঠতেই আলভী তাকে নিয়ে আলমারির দিকে এগিয়ে গেল। সেখান থেকে ডায়পার বের করে নিজেই পরিবর্তন করে দিতে লাগল। এই দৃশ্য দেখে অলির চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল,
ডায়পার চেঞ্জ করা শেষে আলভী ফোন হাতে তুলে নিয়ে একজন সার্ভেন্টকে কল দিল,
“দুজনের ব্রেকফাস্ট রুমে পাঠিয়ে দেও।”
আলভী এবার আরিশকে কোলে নিয়ে ওর কপালে ঠোঁট ছোয়াল, এরই মাঝে কেউ একজন দরজায় নক করল, আলভী দরজা খুলে দেখল একজন সার্ভেন্ট খাবার নিয়ে এসেছে তার সাথে ঊর্মিলা, নূরনাহার আর শাহানাজ বেগমও আছে। আলভী সরে যেতেই তারা রুমে ঢুকল, তাদের আসতে দেখে অলি পায়ে থাকা শেকল আড়াল করে বসল,
“তোমরা সকাল সকাল আমার রুমে?”
নূরনাহার বলল, “দুজনের খাবার দিয়ে কি করবে সেটাই দেখতে এলাম।”
ঊর্মিলা বলল, “আমি তো প্রচন্ড শকড, ভাবী? ভাইয়া তুই ভাবীকে কোথায় পেলি?”
কথাটা বলতে বলতেই ঊর্মিলা আলভীর দিকে এগিয়ে এল, আরিশকে দেখেই তার হাত নিসপিস করছে। আলভী ব্যপারটা বুঝতে পেরে বলল,
“ওই তোর মতিগতি তো ভালো ঠেকছেনা।”
“আহ আমার বাপজানকে একটু দেনা ভাইয়া।”
আলভী না করতে গিয়েও থেমে গেল, আরিশকে ঊর্মিলার কোলে দিতেই ঊর্মিলা ড্যাবড্যাব করে আরিশের দিকে তাকিয়ে থেকে টুস করে ওর ফোলাফোলা গালে চুমু খেয়ে নিল।
“তোর কলেজ নেই?”
“আজকে শুক্রবার ভাইয়া। কলেজ বন্ধ।”
নূরনাহার আর শাহানাজ বেগম অলির পাশে এসে বসতেই অলি মাথা নিচু করে সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুম”
তারা দুজনেই অলির সালামের জবাব দিল।
নূরনাহার বলল, “তুমি এভাবে কোথায় চলে গিয়েছিলে বউমা?”
অলি হাত কচলাতে লাগল, কি বলবে সে? কোথায় গিয়েছিল আর কেনইবা গিয়েছিল সেসব যে বলার মতো নয়। শাহানাজ বেগম দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমরা ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিলাম হয়তো সেইজন্যই অভিমান করে চলে গিয়েছিল।”
অলি চুপ করে রইল, আলভী এগিয়ে এসে বলল,
“বাদ দেও এসব কথা। ওর শরীর ভালো নেই। ব্রেকফাস্ট করে মেডিসিন খেতে হবে।”
নূরনাহার বসা থেকে উঠে দাড়াল। কিন্তু শাহানাজ বেগম হঠাৎ অলির হাত ধরে কেদে উঠলেন,
“আমাদেরকে ক্ষমা করে দেও বউমা। বিশেষ করে আমাকে, আমি তোমার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি। অনেক কটু কথা বলেছি, তোমার বাবা মাকেও ছেড়ে কথা বলিনি। কিন্তু তুমি চলে যাওয়ার পর আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। তোমাকে ছাড়া আমার ছেলেটা ম*রেই যাবে। তুমি দয়া করে আমাদের সাথে রাগ করে ওকে ছেড়ে যেওনা কখনো।”
অলি অবিশ্বাস্য চোখে শাহানাজ বেগমের দিকে তাকাল পরক্ষণেই আলভীর দিকে তাকাতেই আলভীর সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল,
“দেখো আমার ছেলেটার কি অবস্থা হয়েছে। তুমিও তো মা, বলোনা একজন মা কি পারে ছেলের এই অবস্থা সহ্য করতে? ছেলেটার দিকে তাকানো যাচ্ছেনা। এর আগে কখনো এই অবস্থায় দেখেছো ওকে?”
অলির চোখজোড়া জলে ভরে উঠল, টুপ করে কয়েকফোটা জল গড়িয়ে পড়তেই আলভীর থেকে চোখ সরিয়ে খুব সন্তর্পণে মুছে নিল,
“তুমি চলে যাওয়ার পর আমার ছেলেটা পাগল হয়ে গিয়েছিল। উন্মাদের মতো আচরণ করতো, আমার কাছে মনে হতো ছেলের এই অবস্থার জন্য আমিই দায়ী।”
অলি শাহানাজ বেগমের কাধে হাত রেখে বলল,
“শান্ত হোন আম্মা। আমি আর যাবোনা কোথাও।”
“তুমি আমাকে ক্ষমা করতে পেরেছো তো?”
“এভাবে বলবেন না, আপনি এভাবে বললে আমার খারাপ লাগে।”
শাহানাজ বেগম অলিকে বুকে টেনে নিলেন,
“আজ থেকে তুমি এই বাড়ির মেয়ে। আমি তোমাকে মেয়ের মতো করে রাখবো। যাতে তোমার কখনো এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার ইচ্ছা না জাগে।”
সবাই চলে যেতেই আলভী অলির পাশে এসে বসল,
“খাবার গুলো খেয়ে পেইন কিলার খেয়ে নেও। ব্যাথা কমে যাবে।”
অলি অভিমানী সুরে বলল,
“আগে আমার পা খুলে দেবেন তারপরই আমি খাবো। নয়তো খাবোনা।”
অলি ভাবল আলভী হয়তো রেগে যাবে কিন্তু আলভী চট করে অলিকে নিজের দিকে টেনে নিল, অলির কপালের উপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো কানের পেছনে গুজে দিয়ে বলল,
“আমি খুলে দেবো তার আগে ওয়াদা করো, আমি জীবিত থাকা অবস্থায় তুমি আমার অনুমতি ব্যতিত আমার থেকে দূরে যাবেনা।”
অলি লতানো গাছের ন্যায় মিইয়ে গেল, দৃষ্টি ফ্লোরে ছুড়ে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ল। আলভী অলির লজ্জামাখা মুখটা হাতের আঁজলায় নিল,
“তাকাও আমার দিকে,”
অলি আলভীর দিকে তাকাল, গলা শুকিয়ে আসছে। তার অবস্থা দেখে আলভীর ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল,
“মুখ দিয়ে উচ্চারণ করো।”
“কি?”
“বলো যে আমৃত্যু তুমি আমার সাথেই থাকবে।”
অলি সম্মোহনী সুরে বলল,
“আমি ওয়াদা করছি আমৃত্যু আপনার সাথেই থাকব।”
আলভীর মন প্রাণ জুড়িয়ে গেল, “ধন্যবাদ বউ।”
আলভী অলির গালে নাক ঘষতে লাগল, ফলস্বরূপ অলির শরীর শিরশির করে ওঠে, আলভী নেশালো কন্ঠে বলে,
“তোমার মাঝে এখনও সংকোচ আছে দেখছি। বিলিভ মি তোমার এই সংকোচ, জড়তা গুলো আমাকে আরও বেশি আকৃষ্ট করে।”
অলি আমতা-আমতা করে উঠল,
“আ…মার ক্ষুধা লেগেছে,”
আলভী দুষ্ট হেসে বলল,
“আদর খাবে?”
অলি ছটফট করতে লাগল, পুরো শরীর ব্যথায় জর্জরিত আলভীর অল্প ছোয়াতেই যেন প্রতিটি রক্তকোষ বিস্ফোরিত হচ্ছে। আলভী কোমড় চেপে ধরতেই অলি আর্তনাদ করে উঠল,
“উহ! ব্যা…থা পাচ্ছি।”
আলভী তৎক্ষনাৎ অলিকে ছেড়ে দিল, সোফা থেকে উঠে দাড়িয়ে বলল,
“স্যরি হানিবি। তুমি খাবার খেয়ে নেও। আমি তোমার জন্য মেডিসিন আনছি।”
“তার আগে আমাকে মুক্ত করুন।”
আলভী মাথা নেড়ে অলির পায়ের শেকল খুলে দিল।
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা- ২৩০০+