পর্ব - ৫
'আজ ফ্রাইডে। এরিদের স্কুল বন্ধ। সে ঠোঁটে তালাবদ্ধ করে বাইরে তাকিয়ে আছে। কপালের পাশের নীলচে রগ চিরায়ত গম্ভীর ভঙ্গিমায় ফুলেফেঁপে উঠছে। নাকেট পাটা টানটান। একটু পরপর বিরক্তিকর চোখে সামনে তাকিয়ে দেখছে মাম্মা কীভাবে পাপার হাতের ভাঁজে হাত মিশিয়ে রেখেছে। গাড়ি চলছে সেই কখন থেকে। তারা কোথায় যাচ্ছে এরিদ জানে না। সে শুধু ঘোর বিস্ময় নিয়ে দেখে মাম্মা কী সুন্দর পাপার সাথে মিটিমিটি হেসে কথা বলছে। তাদের সুকোমল, মিষ্টি আচার-আচরণে ধরা মুশকিল গত রাত্রে কিছু হয়েছিল তাদের মাঝে। অথচ, কী ভয়ংকর কান্ড ঘটতে যাচ্ছিল কাল রাতে। এখন ওদের সবকিছু ঠিক, মাঝখান দিয়ে এরিদের তার পাপার সাথে কথা বলা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এরিদ কথা বলবেও না-সে খুব রাগ করেছে পাপার উপর।
'কিন্তু বেশিক্ষণ আর চুপ থাকতে পারল না এরিদ। ছোট্ট মনের ভেতর কচি, কচি প্রশ্নগুলো ঢেউ খেলছে। অপারগ হয়ে এবার তাকে ঠোঁটের তালা খুলতেই হলো।
'আমরা কোথায় যাচ্ছি?'
'প্রত্যুত্তর এলো রিচার্ডের কাছ থেকে, 'হসপিটালে।'
'এরিদ কিছুটা অবাক হলেও পাল্টা প্রশ্ন করল না। এটার মানে এটাই, সে পাপার সাথে এখনও রেগে আছে।
'শীততাপনিয়ন্ত্রিত কেবিনের ভেতর এরিদ মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে আছে। এলিজাবেথ নরম স্নেহময় হাতে ছেলেটার ব্যান্ডেজ মোড়ানো মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। রিচার্ড গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে এরিদের দিকে। এরিদ কল্পনাও করতে পারেনি তার পাপা তাকে সকাল, সকাল এখানে নিয়ে আসবে। এটাকেই বলে-যার জন্য করলাম চুরি, সে-ই বলে চুর।
'এরিদের চোখে পানি এসে জমল, যখন মাম্মা রাস্কেলটার কপালে আলতো চুমু খেলো। রিচার্ডের গার্ডরা তখনও ভেতরে ফলফলাদি এনে রাখছে। ইতিমধ্যেই পুরো ফ্লোর ভরে গেছে। ছেলেটা অবাক বিস্ময়ে শুধু চারপাশ দেখছে, আর শুকনো ঢোক গিলছে। এখন সত্যি, সত্যিই মনে হচ্ছে এরিদের পাপা খুব প্রভাবশালী কেউ; তাদের থেকেও অনেক বেশি। নয়তো, টানা দুইদিন ধরে কে আসে হসপিটালে এতো জিনিস নিয়ে? রোগী দেখতে ফুলফল আনা স্বাভাবিক, কিন্তু ভিডিও গেমস, ট্যাব, এমনকি পিসি-এ একেবারেই অস্বাভাবিক ঘটনা। যা সাধারণ মানুষের স্বভাবের সাথে যায় না। ছেলেটা আরও বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে এরিদের মাম্মার দিকে। তার লাল চুল যেন আগুনের স্রোত। এমন চুল সে আগে কখনো দেখেনি।
'নীরবতার সুতো হঠাৎ ছিঁড়ে গেল রিচার্ডের গম্ভীর কণ্ঠে, 'এরিদ, সে স্যরি টু হিম।'
'এরিদ বিস্ফোরিত চোখে পাপার দিকে তাকাল। কিন্তু পাপার বিদ্যুতের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে মিইয়ে গিয়ে ভেজা বেড়ালের মতো বিড়বিড় করে বলল, 'স্যরি, ব্রো...'
'পানচুয়ালি।'
'এরিদ এবার সোজা তাকিয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে বলল, 'আই'ম সো স্যরি।'
'রিচার্ডের মুখে সন্তুষ্টির ছাপ ফুটে উঠল। সে এলিজাবেথকে নিয়ে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো ছেলেটার মাথায় হাত ছুঁইয়ে দিল। অতঃপর এরিদের উদ্দেশ্য নিরেট ঠান্ডা গলায় বলল, 'আমরা একটা কাজে বের হচ্ছি, তুমি ওর সাথে থাকো এরিদ। ওর পাপা-মাম্মা জবে আছে।'
'এরিদ সুনিপুণ বিস্ময়ে পাপার দিকে তাকাল, চোখ দু'টো কুঁচকে ছোট করে। রিচার্ড কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে শুধু উচ্চারণ করল, 'বি আ গুড বয়।'
'তারপর আর কিছু না শুনিয়েই এলিজাবেথকে নিয়ে সোজা কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। এরিদ বুঝতে পারল, পাপা তাকে সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট দিচ্ছেন। বেচারা এরিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সোনালি চুলগুলো ফুঁ দিয়ে সরিয়ে দিল কপাল থেকে। তারপর দাপ করে গিয়ে বসল ছোট্ট ছেলেটার পাশে। ছেলেটি গুটিয়ে গেল ভয়ে। সে এরিদকে ভয় পায়! ভীষণ ভয় পায়। সাংঘাতিক হয়ে উঠেছে এই দশ বছরের শিশু।
'মি. কায়নাত?'
'রিচার্ডের এক হাত এলিজাবেথের আঙুলের ভাঁজে জড়ানো, অপর হাতে ধরা ফোন। নির্বিকার দৃষ্টিতে স্ক্রিনে তাকিয়ে শান্ত স্বরে জবাব দিল, 'ইয়েস, মাই লাভলি ওয়াইফ?'
'এলিজাবেথ কণ্ঠে চিন্তার ছাপ ফুটিয়ে বলল, 'আপনার কী মনে হয়, রোজের প্রতি ওর এই অবসেশন বড় হলে থাকবে?'
'রিচার্ড নিঃসংকোচে হেসে বলল, 'কেন থাকবে না? অবশ্যই থাকবে। বাপের ছেলে বাপের মতোই হবে।'
'এলিজাবেথ সরু চোখে তার দিকে তাকাল, 'বাপ কেমন?'
'রিচার্ড ফোনটা নামিয়ে নিয়ে ভ্রু নাচিয়ে আত্মবিশ্বাসভরা কণ্ঠে উত্তর দিল, 'এক নারীতে আসক্ত।'
'এলিজাবেথ ঠোঁট বাঁকিয়ে কুটিল হাসি হেসে বলল, 'সত্যি?'
'অচানক রিচার্ড ফোনটা একপাশে রেখে ভরা রিসেপশনের মাঝেই এলিজাবেথকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। ধাতস্থ হতে এলিজাবেথ রিচার্ডের কলার খামচে ধরল। প্রশস্ত বাহুর ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল, চারপাশের সবাই মিটিমিটি হেসে তাকিয়ে আছে। নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে সব দৃষ্টি এড়িয়ে হেঁটে যেতে, যেতে রিচার্ড ফিসফিস করে বলল, 'দুই ঘণ্টা সময় হাতে আছে। ছেলে এখানে থাকতেই আশা করি আপনাকে বোঝাতে পারব সত্যি না কী।'
'এরিদ বুকে হাত ভাঁজ করে বেশ কিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা মাথা নত করে আছে। ভ্রু কুঁচকে এরিদ জিজ্ঞেস করল, 'তোমার নাম কী?'
'ছেলেটা শুকনো ঢোক গিলে মিনমিন করে বলল, 'ইয়াদ।'
'এরিদ বুঝতে না-পারা ভঙ্গি করে ব্যঙ্গের সুরে বলল, 'কুয়াদ?!'
'ছেলেটা আবার গম্ভীর স্বরে বলল, 'ইয়াদ!'
'বিয়াদ!!'
'ইয়াদ।'
'বিরাদ?'
'এবার তেতে গেল ইয়াদ। দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, 'আরে ইয়াদ! তুমি কানে শুনতে পাও না?'
'তৎক্ষণাৎ সতর্ক হলো এরিদ। অভিযোগের ভঙ্গিতে বলল, 'তুমি আমাকে ধমকালে কেন? পাপা কী বলে গেল-ব্যাড জব করলে স্যরি বলতে হয়। তুমি আমাকে ধমক দিয়ে ঠিক করোনি। আমাকে এখনই স্যরি বল।'
'ভরকে গেল ইয়াদ। সে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কী তোমার স্যরির রিভেঞ্জ নিচ্ছ?'
'গা-ঝাড়া ভাব নিয়ে এরিদ বলল, 'হতে পারে। আগে তুমি স্যরি বলো।'
'না বললে?'
'এরিদের কণ্ঠ এবার ঠান্ডা হয়ে এলো। সে নির্বিকার মুখে বলল, 'দেখো, আমার পাপা আমাকে শিখিয়েছে ভুল করলে স্যরি বলতে হয়। আর আমি স্যরি বলতে পারি। তাই ভুল করতে আমার প্রবলেম হয় না। সো স্যরি বলো, বলছি। নয়তো...'
'শান্ত অথচ ভয় ধরানো সেই সুরে কেঁপে উঠল ইয়াদ। সে দ্রুত শুকনো ঢোক গিলে বলল, 'স্যরি।'
'কিন্তু এরিদ সন্তুষ্ট হলো না। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে কড়া স্বরে বলল, 'আমার নাম এরিদ কায়নাত।'
'ইয়াদ দ্রুত ভুল শুধরে নিয়ে বলল, 'স্যরি, এরিদ কায়নাত।'
'মুহূর্তেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল এরিদ। উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিল এরিদ।
'তুমি খুব ভালো। আমার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করবে? তাহলে স্কুলে আর কেউ তোমাকে মোটা বলতে পারবে না।'
'ইয়াদের চোখেমুখে বিস্ময়ের ঢেউ বয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই এরিদের মুখের রঙ আর কণ্ঠস্বর বদলে গিয়েছে। ইয়াদ সুচারু কণ্ঠে জানতে চাইল, 'কেন, কেন?'
'এরিদ শান্ত গলায় বলল, 'কারণ, এরিদ তার বন্ধুকে কখনো কষ্ট পেতে দেয় না।'
'কথাটা ইয়াদের অন্তর ছুঁয়ে গেল। আবেগভরা স্বরে সে বলল, 'তুমি খুব ভালো, এরিদ।'
'এরিদ তৎক্ষণাৎ হাসল, 'দেখলে, আমি সত্যিই খুব ভালো। শুধু, শুধু তোমার পাপা আমার পাপার কাছে আমাকে পঁচা বলল। বলো তো, আমি কী পঁচা?'
'ইয়াদ চপল হেসে জবাব দিল, 'তুমি খুব চালাক!'
'এরিদ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বলল, 'সেটা তো সবাই বলে। আমি আমার পাপার ছেলে না। তবে তোমার মুখ থেকে শুনে আমি সো হ্যাপি। আচ্ছা, তোমার হবি কী?'
'আমি খেতে ভালোবাসি।'
'আপেল খাবে? জানো, আমার দুধ খেতে একদম ভালোলাগে না।'
'আমারও।'
'আপেল খাবে তুমি? আমি ওয়াশ করে দেবো। আমি এসব পারি। পাপা আমাকে শিখিয়েছে মাম্মাকে টাইম টু টাইম খেতে দেওয়ার জন্য। আসলে আমার বোন হবে তো, তাই মাম্মাকে আমরা খুব আদর করি।'
'এক নিশ্বাসে বলে থেমে গেল এরিদ। ইয়াদ মুখ ভার করে বলল, 'আমার বার্গার খেতে খুব ইচ্ছে করছে।'
'বার্গার?'
'ইয়াদ মাথা নাড়ল। কিছুক্ষণ ভেবে এরিদ বলল, 'আচ্ছা, আমি তোমাকে খাওয়াবো। কিন্তু প্রমিস করতে হবে আমি যা বলব তুমি তাই শুনবে।'
'কী করতে হবে তোমাকে?'
'কিছু না, শুধু আমার পাপার কাছে আমার নামে ভালো রিভিউ দেবে। পাপা আমার উপর রাগ করেছে।'
'ইয়াদ মুগ্ধ হয়ে বলল, 'তুমি তো সত্যি, সত্যিই ভালো এরিদ।'
'সেটা তো তুমি জানো, আর কেউ তো জানে না। তুমি আমার পাপার কাছে বলবে এরিদ গুড বয়। আমার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করেছে।'
'ইয়াদ চমকে উঠে বলল, 'মানে, তোমার পাপা বলেছে তোমাকে আমার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করতে, সেজন্য তুমি করেছো?'
'এরিদ দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলল, 'উঁহু! পাপা শুধু বলেছে, তোমাকে স্যরি বলতে। ফ্রেন্ডশিপ আমি নিজে থেকে করেছি।'
'ইয়াদ ছোট করে নিশ্বাস ফেলে বলল, 'ওহ!'
'এরিদ খুশি হয়ে বলল, 'আমি কাল থেকে রোজ তোমার ক্লাসে তোমার সাথে দেখা করতে যাবো, কেমন?'
'ইয়াদ নরম স্বরে বলল, 'আচ্ছা।'
'এরিদ ছুটে বেরিয়ে এলো বাইরে। দরজার সামনে পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে দু'জন গার্ড। উচ্চতায় লম্বা, গায়ে হাফহাতা কালো পোশাক। এরিদ ঘাড় উঁচু করে একজনের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, 'আমি বার্গার খাবো।'
'গার্ডের মুখে কোনো ভাঁজ পড়ল না; অটল ভঙ্গিমায় যান্ত্রিক সুরে উত্তর এলো, 'বসের অনুমতি ছাড়া কিছু দেওয়া যাবে না, ছোট স্যার।'
'এরিদের মতে এরা আসলে মানুষ নয়, রোবট। পাপার বানানো রোবট! যারা পাপার আদেশ ছাড়া বড় করে নিশ্বাসও নেয় না। তাই এবার সে কৌশল বদলাল।
'আচ্ছা, তবে আমিও বলে দেব পাপাকে।'
'মুহূর্তেই টনক নড়ল দু'জনের চেহারায়। চোখের মণি ধীরে ঘুরে গিয়ে আটকে রইল এরিদের সুকোমল অথচ দুষ্টু মুখে। একজন শুকনো ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করল, 'কী বলবেন?'
'এরিদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসল, বলল, 'বলব, তোমরা ডিউটি ঠিকমতো করোনি। আমাকে একা রেখে ওয়াশরুমে গিয়েছিলে।'
'গার্ডরা আতঙ্কিত হয়ে উঠল। 'না ছোট স্যার! বস জানলে তো আমাদের গর্দান যাবে!'
'এবার এরিদ নির্দ্বিধায় সাফ কথা কেটে দিল, 'তাহলে যা বলছি, দ্রুত করো।'
'চোখে শয়তানি ঝিলিক নিয়ে ফটাফট নির্দেশ দিল সে। আর কিছু করার ছিল না তাদের। অগত্যা রাজি হতে হলো। এতোদিন বাবা ঠান্ডা কণ্ঠে তাদের নিশ্বাস আটকে রাখতে হতো-এবার ছেলের পালা।
'হিয়ার ইজ দ্য নিউ চেয়ারম্যান অফ ড্রাগন গ্রুপ।'
'বলেই রিচার্ড একটি ফাইল এগিয়ে দিল এলিজাবেথের দিকে। মুহূর্তেই পুরো হলরুম ভরে গেল হাসির কলতান আর করতালিতে। সকলের মুখে উজ্জ্বল স্বাগতমের হাসি অথচ এলিজাবেথ হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রিচার্ডের দিকে। হঠাৎ করে অফিসে নিয়ে এসে কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়েই এত বড় দায়িত্ব চাপিয়ে দেবে রিচার্ড, তা সে কল্পনাও করেনি। চোখের কোণে অশ্রু জমে এলো। অশ্রুসিক্ত চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে এলিজাবেথ ভেজা গলায় বলল, 'এসবের কী দরকার ছিল?'
'রিচার্ড ঠোঁটে মৃদু হাসি ঠোঁটে টেনে এলিজাবেথের কানের কাছে মুখ ঝুঁকিয়ে ফিসফিস করে বলল, 'এরিদের মাম্মা ইন্ডিপেন্ডেন্ট হোক, কিন্তু রিচার্ড কায়নাতের ছায়ার বাইরে যেন কখনো না যায়।'
'এলিজাবেথ আলগোছে চোখের পানি মুছে নরম কণ্ঠে জবাব দিল, 'এরিদের মাম্মার এই বর্বর, পাষণ্ড রিচার্ড কায়নাত ছাড়া যে কোথাও যাবার জায়গা নেই।'
'রিচার্ডের ঠোঁটে এক অদৃশ্য, রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। কোটের কলার ঠিক করে সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। পেপারস এগিয়ে দিলে এলিজাবেথ তাতে সই করল অনায়াস ভঙ্গিতে। মুহূর্তেই সকলের সামনে ঝুঁকে রিচার্ড চুমু খেল এলিজাবেথের কপালে। হলরুমের আলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আলোর ঝলকানি, লেন্সের ক্লিক, হাসির আওয়াজ সব মিলিয়ে এক উৎসবের আবহ। কিন্তু এলিজাবেথের কাছে এটা যেন এক যুদ্ধের ঘোষণা। স্বাধীনতার মঞ্চে দাঁড়িয়েও সে জানে রিচার্ডের ছায়া তার গায়ে লেগেই থাকবে। আর সে ছায়া কখনো স্নিগ্ধ, কখনো দমবন্ধ করা।
'রিচার্ড এলিজাবেথের দিকে এক সেকেন্ড বেশি তাকাল। সেই দৃষ্টি ছিল অধিকারী এবং একইসঙ্গে ভয়ংকর কোমল। এলিজাবেথও সোজা হয়ে দাঁড়াল। চোখে জল থাকলেও ঠোঁটে ফুটল এক পাতলা হাসি। যা ছিল না সম্পূর্ণ সুখের, না সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের। বরং তা ছিল এক ধরনের নিঃশব্দ চুক্তি। ঠিক তখনই রিচার্ড মাইক্রোফোনের দিকে এগিয়ে গিয়ে গভীর কণ্ঠে বলল, 'ড্রাগন গ্রুপের আজকের ইতিহাসে এলিজাবেথ কায়নাত শুধু চেয়ারম্যান নন, তিনি এই সাম্রাজ্যের রাণী। ট্রিট হার লাইক আ কুইন, এন্ড নেভার ট্রাই টু লুক এ্যট হার।'
'হলরুমে আবার গর্জে উঠল করতালি। ফ্ল্যাশের আলোয় মুহূর্তটা জমে গেল সময়ের ফ্রেমে। যেখানে ক্ষমতা, ভালোবাসা, অধিকার আর অনিশ্চয়তা একসঙ্গে মিশে আছে।
'রিচার্ড নিজের কেবিনে বসে আছে। তার ফোনে হসপিটালের সিসিটিভি ফুটেজ চলছে। পর্দায় দেখা যাচ্ছে এরিদ ইয়াদকে বাথরুমে যেতে সাহায্য করছে। তারপর দু'জনে একসঙ্গে লাঞ্চ করেছে, ভিডিও গেম খেলেছে। দৃশ্যটা দেখে রিচার্ডের ঠোঁটে এক প্রশান্ত হাসি ফুটে উঠল। প্রকৃতির মতো চঞ্চল এই প্রাণটা এক নিঃশ্বাসে কত কথা যে বলে ফেলে সে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখল। এরিদের মধ্যে পাপার মতোই উগ্র মেজাজ আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আছে, তবে মনটা... মনটা ঠিক মাম্মার মতোই কোমল।
'এলিজাবেথ ওয়াশরুমে গেছে। বেরোলেই তাঁরা হসপিটালে যাবে। এলিজাবেথের কিছু চেকআপ হবে তারপর এরিদকে নিয়ে ফিরবে ম্যানশনে। ডেলিভারির পর এলিজাবেথের যত্ন নিতে হবে তাই রিচার্ডকে দ্রুতই ইতালি যেতে হবে, অনেকগুলো ডিল ঝুলে আছে সেখানে। এরিদ জন্মের পর থেকেই রিচার্ড তার গ্যাংস্টার জগতের সাথে সরাসরি জড়িত নয়। এখন সে আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করে। তার কালো দুনিয়াটা পরিবার থেকে আলাদা, দূরে রাখে। বছরের চার মাস রিচার্ড থাকে ইতালিতে, তখন সে ফিরে যায় গ্যাংস্টারের রূপে। বাকিটা সময় বাংলাদেশে সকলের চোখে কেবল একজন সফল ব্যবসায়ী।
'হঠাৎ কারো ভারি পদধ্বনিতে সোজা হয়ে বসল রিচার্ড। দৃষ্টি তুলতেই দেখতে পায় সামনে দাঁড়িয়ে সিআইডি অফিসার প্রেম। রিচার্ডের মুখে বিন্দুমাত্র ভাঁজ পড়ল না। প্রেম ড্যাসিং ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে রিচার্ডের টেবিলের সামনে বসে পড়ল পায়ের উপর পা তুলে। সঙ্গে সঙ্গে রিচার্ডের দু'মুঠো শক্ত হয়ে গেল। এক ঝলক ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখল।
'প্রেম চুইংগাম চিবোতে চিবোতে বাঁকা হাসি ছুড়ে বলল, 'দ্য কিং অফ ইতালি, গ্যাংস্টার বস রিচার্ড কায়নাত। নাইস টু মিট ইউ।'
'রিচার্ডের ঠোঁটের আগায় খেলে গেল রহস্যময় হাসি। সে ঠান্ডা হেসে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিল হিমশীতল কণ্ঠে, 'ইজ ইট রিয়েলি নাইস?'
'প্রেম তার ইঙ্গিত বুঝে উঠতে না পারলেও উত্তর দেওয়ার সুযোগ পেল না। ঝড়ের মতো পিছন থেকে লুকাস এসে ঝাঁপিয়ে এসে তার মাথা মুচড়ে দিয়ে, এমনভাবে চেপে ধরল, যে নিজের হাঁটুর সাথে ঘাড় গেঁথে গেল। মটমটে শব্দে হাড় কেঁপে উঠল। অপ্রস্তুত প্রেম কোনো প্রতিরোধই করতে পারল না।
'রিচার্ড ঠোঁট চেপে হাসল। হিসহিসিয়ে বলল, 'আহ লোকা... আস্তে। গেস্ট।'
'লুকাস মাথা ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল রিচার্ডের পাশে রক্ষাকবচের মতো বুক বাঁধা ভঙ্গিতে। প্রেম ধীরে সোজা হয়ে বসল। ঘাড়ের ব্যথায় মুখ লালচে হয়ে উঠেছে। টগবগে ক্রোধে কোপদৃষ্টি ছুড়ে দিল রিচার্ডের দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসে গর্জনে বলল, 'হোয়ার ইজ লাড়া? আই ওয়ান্ট হার।'
'রিচার্ডের চোখে কাঁটা-ধরা তীক্ষ্ণতা। সে বলল, 'ইজ শি ইয়োর ওয়াইফ ওর গার্লফ্রেন্ড?'
'প্রশ্নে থমকে গেল প্রেম। নিজের ভিতরেই সন্দেহ জাগল সে আসলে কে? কিছুক্ষণ নীরব থেকে প্রেম বলল, 'আই লাভ হার।'
'রিচার্ড উঠে দাঁড়াল, কণ্ঠে হিমশীতল স্থিরতা নিয়ে বলল, 'দ্যন ইট'স ইয়্যুর ডিউটি টু ফাইন্ড ইয়্যুর লাভ।'
'প্রেম উত্তেজনায় গর্জে উঠতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেল। রিচার্ড চোখ সরু করে প্রেমের তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, 'শাটআপ। মাই ওয়াইফ ইজ কামিং।'
'এলিজাবেথ প্রেমকে দেখে খানিক বিস্মিত হলেও রিচার্ড একটুও সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে গেল। প্রেম ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তার চোখে বিস্ময়, ঠোঁটে অদৃশ্য এক রেখা। সে স্পষ্ট দেখল গ্যাংস্টার বস রিচার্ড কায়নাত, ক্ষমতার শীর্ষে দাঁড়িয়েও স্ত্রীর প্রতি কতটা দুর্বল।
'এরিদ এবার আর পিছনের সিটে বসেনি। সে গা ঘেঁষে বসেছে তার পাপার কোলে। তার মুখে তৃপ্তির হাসি। রিচার্ড একহাতে স্টিয়ারিং আর অপর হাতে ছোট্ট এরিদের হাত জড়িয়ে ধরে গাড়ি চালাচ্ছে। পাশে বসে এলিজাবেথ মুগ্ধ চোখে দেখছে বাবা-ছেলের এই উষ্ণ মুহূর্ত।
'গাড়ি হঠাৎ থামল গুলশানের এক অভিজাত ফুলের দোকানের সামনে। রিচার্ড নেমে গেল এরিদকে সঙ্গে নিয়ে। কিছুক্ষণ পর কোমরের ব্যথা ভুলে এলিজাবেথও বেরিয়ে এলো। ঠিক তখনই এরিদের চোখে ধরা দিল এক অনুপম দৃশ্য-পাপা তার মাম্মার হাতে ফুল তুলে দিল, আর মাম্মা এমন স্নিগ্ধ হাসি দিল যে মুহূর্তেই বিস্ময়ে এরিদের চোখ বড় হয়ে গেল।
'হঠাৎ সে-ও ছুটে গিয়ে দোকানের ভেতর থেকে একটি ফুল তুলে নিয়ে মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। ফুলটা এগিয়ে দিয়ে সরল কণ্ঠে বলল, 'মাম্মা, আই লাভ ইউ।'
'অবাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলেও পরমুহূর্তেই এলিজাবেথের চোখ ভিজে উঠল। ফুল হাতে নিয়ে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই রিচার্ড মজা করে বলে উঠল, 'বাট, ইয়োর মাম্মা লাভস মি মোর দ্যান ইউ।'
'সঙ্গে সঙ্গেই এরিদের মুখ ম্লান হয়ে গেল। ফুল ছুঁড়ে ফেলে শিশুসুলভঅভিমান ভরা মন নিয়ে সে দৌঁড়ে ছুটে গেল গাড়ির দিকে। রিচার্ড চাপা হাসি চেপে দ্রুত ছেলের পিছু নিল। আর এলিজাবেথ স্থির দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল বাবা-ছেলের ভালোবাসার খেলাচ্ছলে রঙ মাখা মুহূর্তগুলো।
চলছে......