ফন্ট সাইজ:
থিম:
এলিচার্ড (সিজন ২)

১৯তম পর্ব

লেখক: মিথুবুড়ি

১৯

'কায়নাত ম্যানশন আজ ভরে উঠেছে আনন্দ-হাসির রোলায়। ইস্কার খুশি আজ যেন ঈদের খুশিকেও হার মানায়। রান্নাঘরে ইবরাত শাড়ির আঁচল কোমরে বেঁধে দু'হাতে ব্যস্ত রান্নায়। দীর্ঘ দশ বছর পর বাড়ির ছেলে ফিরছে-ফিরছে এই ম্যানশনের প্রাণ দুটি। তাদের আগমনে নতুন করে সাজানো হয়েছে ম্যানশনের প্রতিটি কোণ।

'এদির দেশ ছাড়ার অল্প কিছুদিন পর প্রিয় বন্ধুর টানে নিহাদও দেশ ছেড়ে চলে যায়। তবে নিহাদ মাঝেমধ্যে দেশে ফিরলেও, এরিদ ফিরেনি কখনও। হঠাৎ করেই সকলের সাথে দূরত্ব বাড়িয়ে নেয় সে। এ নিয়েই এলিজাবেথের মনে গভীর অভিমান। রিচার্ড একাধিকবার সুইজারল্যান্ডে গিয়ে ছেলের সঙ্গে দেখা করলেও, এলিজাবেথ একবারও যায়নি। মাতৃমনে জমে আছে অপার অভিমান আর সেই অভিমানে গত দশ বছর ছেলের সঙ্গে তেমন কথাও হয়নি তার।

'সেজন্যই আজ সবার মুখে হাসি থাকলেও এলিজাবেথের মুখ গম্ভীর। অথচ কানটা প্রতিক্ষণে খাড়া সদর দরজার দিকে কখন গাড়ির হর্ণ বাজবে, কখন তার ছেলে আসবে, আর সে ছেলেকে দেখবে। মনে মনে জানে ছেলের চেহারায় বিশেষ পরিবর্তন হয়নি; এরিদ তো তার পাপারই কার্বন কপি-স্বভাব, চেহারা, গঠন, আচার-আচরণ সবই। তবে শুনেছে, উচ্চতায় নাকি বাবাকেও ছাড়িয়ে গেছে। রিচার্ড ইতিমধ্যেই এয়ারপোর্টে গেছে ছেলেকে আনতে।

'হঠাৎ গাড়ির হর্নে এলিজাবেথের বুকটা কেঁপে উঠল। এতক্ষণ অভিমান জমে থাকলেও মাতৃমন এবার যেন হু হু করে উঠল। তবু সে নিজেকে সামলে নিল, দৌড়ে গেল না।

ইস্কা শেষবার ভাইকে দেখেছিল যখন তার বয়স মাত্র পাঁচ। এখন সে পনেরো বছরের তরুণী। ভাইয়ের প্রতি তার টান অপরিসীম। যেমন ভাই তার কাছে প্রিয়, তেমনি সেও ভাইয়ের নয়নের মণি। ইস্কা আর অপেক্ষা না করে ছুটে গেল দরজার দিকে। রান্নাঘর থেকে হাত-মুখ মুছতে মুছতে ইবরাতও এগোল।

'রিচার্ড ছেলেকে নিয়ে ঘরে ঢুকতেই ইস্কা দৌড়ে গিয়ে ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরল। এরিদ হেসে বোনকে বুকের ভেতর টেনে নিল, তারপর স্নেহভরে দু'গালে চুমু খেল। ইবরাত কাছে আসতেই আর সামলাতে পারল না, কান্নায় ভেঙে পড়ল এরিদের কাঁধে ঝুঁকে। নিহাদ কাজে বাইরে থাকায় ফিরতে দেরি হবে। রিচার্ড ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে। আর দু'পাশে ডালপালার মতো ভর দিয়ে আছে লুকাস আর ন্যাসো। সবার বয়স বেড়েছে, তবুও দেহ ও চেহারা থেকে হারায়নি সেই তেজ। এলিজাবেথ দূর থেকে একনিষ্ঠ চোখে দেখছে বাবা-ছেলেকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে।

'গ্যাংস্টার বস রিচার্ড কায়নাত এখন পঞ্চান্ন বছরের পুরুষ। অথচ মুখমণ্ডল কিংবা চামড়ায় বয়সের ছাপ নেই বললেই চলে। এ বয়সেও অটুট তার দাপট আর সৌন্দর্য। তার তুলনায় পঁয়তাল্লিশ বছরের এলিজাবেথকে দেখলে বয়সের ছাপ খানিকটা ধরা পড়ে, কিন্তু রিচার্ডের ক্ষেত্রে তা প্রায় অসম্ভব। একসাথে দাঁড়ানো বাবা-ছেলেকে দেখে মনে হয় তারা কম বাবা-ছেলে, বরং ভাই-ভাই। দু'জনেরই সমুদ্র-নীল চোখ, একই তেজদীপ্ত দৃষ্টি, একই ধারালো সৌষম্য অঙ্গসৌষ্ঠব্যে যেন আকারে এক মূর্তি। এলিজাবেথের চোখ ধাঁধিয়ে গেল সেই দৃশ্য দেখে।

'এরিদ আলাদা করে বোনের জন্য আনা ট্রলিটা ইস্কার হাতে বুঝিয়ে দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। এলিজাবেথের চোখে চোখ পড়তেই সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল। গোপনে আঁচল দিয়ে চোখের ভেজা মুছে ফেলল। এরিদ চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে মায়ের হাত ধরে তাকে নিয়ে গেল লিভিং রুমে। সোফায় বসতে দিয়ে হঠাৎ নিজেই হাঁটু গেড়ে বসল সামনে। তারপর ঝুঁকে মায়ের পা ছুঁয়ে সালাম করে নিদারুণ কোমল কণ্ঠে ডাকল,

'মাম্মা...'

'এই এক ডাকে এলিজাবেথের বুকটা যেন বিদ্যুতের মতো কেঁপে উঠল। থলথলে চোখ তুলে স্বামীর দিকে তাকাতেই রিচার্ড প্রসন্ন হাসিতে মাথা নাড়ল। মুহূর্তেই সমস্ত অভিমানের সুতো ছিঁড়ে গেল। এলিজাবেথ আঁকড়ে পড়ল ছেলের বুকে, দশ বছরের অভিমান আর দূরত্ব গলে গিয়ে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল। এরিদ শক্ত বাহুবেষ্টনে মাম্মাকে আঁকড়ে ধরে শান্ত করতে লাগল। মাকে এভাবে কাঁদতে দেখে ইস্কা ছুটে গিয়ে পাপার বুকে লুকিয়ে পড়ল। রিচার্ড হেসে মেয়েকে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেল মা-ছেলের কাছে। এরিদ এক হাতে মাম্মাকে, আরেক হাতে বোন আর পাপাকেও জড়িয়ে ধরল। দীর্ঘ এক যুগ পর পূর্ণ হলো কায়নাত পরিবারের বৃত্ত।

'দীর্ঘ দশ বছর পর খোলা হলো এরিদের ব্যক্তিগত কক্ষের ধুলো জমা

হলো কায়নাত পরিবারের বৃত্ত।

'দীর্ঘ দশ বছর পর খোলা হলো এরিদের ব্যক্তিগত কক্ষের ধুলো জমা তালা। এরিদের বারো বছর বয়স থেকেই সেখানে প্রবেশ ছিল সকলের জন্য নিষিদ্ধ। সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার আগে নিজ হাতে দরজায় তালা ঝুলিয়ে চাবিটা আমানত হিসেবে দিয়ে গিয়েছিল পাপার কাছে। রিচার্ডও তার আমানত রক্ষা করেছে।

'তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল এরিদ। চারপাশে জমে আছে ধুলোর স্তর। লাইট অন করতেই সবার আগে চোখ আটকাল বেডসাইডের দেয়ালে টাঙানো বিস্তর এক ছবিতে। বাদামি চুলের মেয়েটি আনমনে তাকিয়ে আছে ফুলের দিকে। মুহূর্তেই এরিদের বুকের ভেতর জ্বলে উঠল তীব্র আক্রোশ। সে দরজা ভেতর থেকে লক করে ফুলদানি হাতে তুলে নিল। আর এক ঝটকায় সেটি ছুড়ে মারল দেয়ালের দিকে। মুহূর্তেই ছবিটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। এরপর ব্যাগ খুলে বের করল একটি ইনজেকশন। নিঃশব্দে সেটি ডান হাতে পুশ করে দিল। ধুলোমাখা বিছানায় মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। কারণ ঘুমই একমাত্র ঔষধ, যা মানুষের ভেতরের যন্ত্রণা সাময়িকভাবে নিভিয়ে দিতে পারে।

'ও... নিঝুম রাতের, জোছনা হয়ে আমার হাতে,

পরে যায় সে নিজের মতন, আমার ঘরে...'

'দুই লাইন গেয়েই হঠাৎ থেমে গেল ইস্কা। মুহূর্তের নীরবতা ভেদ করে তার পেছন থেকে ভেসে এলো পুরুষালী অথচ সুমিষ্ট কণ্ঠে এক সুকরুণ সুর-যেন বেহালার তারে বেজে ওঠা মায়া,

'সাঁতার কেটেছি, ঘুমিয়ে হেঁটেছি,

এতটা ডুবেছি, তোরিই তো কারণে,

তোকে ভালোবাসতে গিয়ে...!

খোলাখুলি বলতে গেলে,

পড়ে গেছি তোর কবলে,

তলিয়েছে মন, ভীষণ রকম, অথৈ জলে!'

'ইস্কার পায়ের নিচটা কেঁপে উঠল। শিরশির করে গেল রক্তস্রোত। নিশ্বাস আটকে এলো বুকে, অথচ সে পিছন ফিরে তাকাল না। মনের গভীরেই জানত মানুষটা কে। কুঁচকে যাওয়া চোখজোড়া কেঁপে উঠল কেবল তখনই যখন পরিচিত সেই কণ্ঠ সুকোমল স্নেহে ডাকল তার নাম,

'ইস্ক?'

'হৃদয়ের ভেতরটা কামড়ে ধরল ইস্কা। তবু সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল। বাদামি চোখের ঝলকায় দাঁড়িয়ে আছে নিহাদ। হাসতে হাসতে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিল ফুলভর্তি একগুচ্ছ সাদা স্বপ্ন। অবাক হয়ে ফিসফিস করে ইস্কা জিজ্ঞেস করল,

'তোমার মনে ছিল?'

'নিহাদ মৃদু হাসিতে এলোমেলো করে দিল ইস্কার লাল কেশরাশি। চোখভরা আলোয় উত্তর দিল,

'কীভাবে ভুলব? এই নে, বছরের প্রথম দোলনচাঁপা তোর হাতেই উঠল। অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে আমাকে এর জন্য। ভাইয়ের কাছে একটা ইচ্ছের কথা বলেছিস আর তা পূরণ না হয়ে যায় কী করে! ধর, আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি।'

'ইস্কার কাঁপা হাতে এল সাদা সুভ্র দোলনচাঁপা। কিন্তু 'ভাই' শব্দটা কানে যেতেই মুহূর্তের মধ্যে নাকের ডগায় ভেসে থাকা জাফরানরঙা আভা মিলিয়ে গেল, মুছে গেল তার চোখের আলোও।

'অনবরত বাজতে থাকা যান্ত্রিক ফোনের কর্কশ শব্দে চোখের পর্দায় লেপ্টে থাকা তন্দ্রা শেষপর্যন্ত ছিঁড়ে গেল। এরিদ ধীর হাতে বালিশের নিচ থেকে ফোনটা বের করে কানে নিতেই চোখের পাতার ভারী ঘুম যেন মুহূর্তে ছুটে গিয়ে মাথার ভেতর হিংস্র দাবানল জ্বেলে দিল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে উঠে দাঁড়াল। ব্যাগ থেকে একটানে বের করল হকিস্টিক। হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল কায়নাত ম্যানশন থেকে। লিভিং রুমে তখন নিস্তব্ধতা। তাই এরিদের ধারালো চোয়ালে জমে থাকা ক্রোধের নৃশংস ঝড় কারও চোখেই ধরা পড়ল না।

'কিন্তু গন্তব্যে গিয়ে তার আর কিছু করার প্রয়োজন পড়ল না। ইস্কার স্কুলে গিয়ে দেখতে পেল কাজটা ইতোমধ্যেই সেরে ফেলেছে নিহাদ। ক্লাসরুমের সামনে মাটিতে পড়ে আছে ইস্কাকে টিউশন পড়ানো ছেলেটা -রক্তাক্ত, ক্ষত-বিক্ষত, নিথর। চারপাশে হতভম্ব ছাত্রছাত্রীর ভিড়। নিহাদ তখনও শ্বাস ফেলছে ক্রোধের ঝড়ে, লোহার রড আঁকড়ে ধরে ক্ষতবিক্ষত দেহটার দিকে ফোঁসফোঁস তাকিয়ে। ইস্কা ভাইয়ের পাশে কাঁপছে ভয়ে। ছেলেটার ভুল একটাই ছিল, সে ইস্কাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে।

'এরিদ এক ঝলক দৃষ্টি দিল রক্তাক্ত ছেলেটার দিকে, তারপর কোনো কথা না বলে বোনের হাত ধরে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এল। গেইটের কাছেই মুখোমুখি হলো রোজের। তার পাশে ছোট্ট পিয়াস-লাড়া আর প্রেমের সন্তান। রোজ পিয়াস-কে নিতে এসেছিল স্কুলে। রোজ প্রথমে তাকাল মাটিতে পড়ে থাকা ছেলেটার দিকে, তারপর চোখ গেল এরিদের হাতে ধরা হকিস্টিকের দিকে। ঠোঁট কষে প্রসারিত করে ছুড়ে দিল তাচ্ছিল্যের হাসি।

'এরপর সে সোজা এরিদের চোখে তাকিয়ে কটাক্ষ ছুড়ে দিল, 'সাইকো।'

'বলে পিয়াসের হাত ধরে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল রোজ।

এরিদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। মুহূর্তেই তেড়েফুঁড়ে গিয়ে রোজের হাত টেনে পিছন ফিরিয়ে গর্জে উঠল, 'কী বললে তুমি?'

'রোজ দাঁতে দাঁত চেপে চোখে আগুন ছড়িয়ে উত্তর দিল,

'এরিদ, ছাড়ো বলছি।'

'ইস্কা কৌতূহলী চোখে রোজ আর তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু নিহাদ দ্রুত পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে একটানে ইস্কার হাত ধরে টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেল সেখান থেকে।

'এরিদ বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল,

'হোয়াট ডিড ইউ সে রাইট নাও!'

'তার চিৎকারে চারপাশের বাতাস কেঁপে উঠল। আশেপাশের পথচারীরা থমকে দাঁড়িয়ে বাঁকা চোখে তাকাল তাদের দিকে। রোজ আড়চোখে চারদিক লক্ষ্য করল, তারপর এক ঝাঁকুনিতে হাত ছাড়িয়ে নিল এরিদের কবল থেকে।

'ঠাণ্ডা অথচ তীক্ষ্ণ গলায় বলল,

'আমাকে এভাবে যখন-তখন ছোঁবে না, এরিদ। আমার পারমিশন ছাড়া না। আই'ম গোয়িং টু গেট ম্যারিড।'

'এরিদ স্তব্ধ হয়ে গেল। ফোঁসফোঁস শ্বাস নিতে নিতে ফিসফিস করে বলল, 'হোয়াট?'

'রোজ দৃঢ় স্বরে উত্তর দিল,

'ইয়েস, যা শুনেছ তাই। আমি বিয়ে করছি।'

'সে ব্যাগ থেকে এক মুহূর্তে বিয়ের কার্ড বের করে এরিদের হাতে ঠেলে দিল। তারপর কোনো উত্তর শোনার সুযোগ না দিয়েই দ্রুত গাড়িতে উঠে সেখান থেকে চলে গেল। এরিদ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কাঁপা হাতে কার্ডের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ ক্ষোভে সেটি ছুঁড়ে মারল পাশের ড্রেনে। তারপর দুহাতে মাথার চুল খামচে ধরে ফেটে পড়ল এক উন্মত্ত চিৎকারে।

'রাত তখন এগারোটা। ড্রয়িংরুমে রিচার্ড আর এলিজাবেথ মগ্ন ইস্কার আঁকা ছবিগুলো দেখছিল। ন্যাসো আর লুকাস বসে কিছু ফাইল ঘাঁটছিল। আর রান্নাঘরে ব্যস্ত ইবরাত। এখন সে যথেষ্ট ভালো রাধুনি হয়ে উঠেছে। প্রায় সারাক্ষণ নতুন নতুন পদ রান্না করে সবাইকে খাওয়ায়। তার রান্নার সবচেয়ে বড় ভক্ত ভোজনরসিক লুকাস, তবে ন্যাসো বেজায় বিরক্ত। বউকে এই বয়সেও ঠিকমতো সময় পায় না বলে গজগজ করে।

'রিচার্ড মেয়ের আঁকা দেখলেও ফাঁকেফাঁকেই নিহাদের পাঠানো মেসেজ চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল। এলিজাবেথ কিন্তু অস্থির। ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে বারবার। ছেলেটা এতদিন পর বাসায় ফিরেছে, এসেই ঘরে ঢুকে ঘুম, আর সকালে বের হয়ে আবার লাপাত্তা। রাত গড়িয়ে গেল, তবুও কোনো খোঁজ নেই তার।

'হঠাৎ দরজা খুলে ভেতরে এলো নিহাদ। কাঁধে ভর দিয়ে টেনে আনছে এরিদকে। ছেলেটা প্রায় দাঁড়াতেই পারছে না, শরীর টলছে এদিকওদিক। দু'হাতের গোড়ালি থেঁতলানো, ক্ষতবিক্ষত।

'ছেলের এই অবস্থা দেখে এলিজাবেথের বুক কেঁপে উঠল। সে দৌড়ে এগিয়ে গেল এরিদের দিকে। রিচার্ডের ইশারায় নিহাদ একপাশে সরে গেল।

'উদ্বেগে কাঁপা গলায় এলিজাবেথ বলল,

'এরিদ, তোমার হাতের এই অবস্থা কেন?'

'সে ছেলের হাত ধরতে চাইলে এরিদ হঠাৎ হাত ঝটকে সরিয়ে নিয়ে গর্জে উঠল,

'ডোন্ট টাচ মি।'

'হঠাৎ পাওয়া ছেলের হুংকারে স্তব্ধ হয়ে গেল এলিজাবেথ। ঠোঁট কাঁপল। চোখের কোল ভিজে উঠল মুহূর্তেই। ঠিক তখনই নাকে এল অস্বস্তিকর গন্ধ, এরিদের নিঃশ্বাসে তীব্র মদের গন্ধ। গা গুলিয়ে উঠল এলিজাবেথের। মুখ বিকৃত করে চাপা কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,

'এরিদ... তুমি মদ খেয়েছ?'

'প্রশ্নটা যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল। এরিদের চোখ লাল হয়ে উঠল। দাঁত চেপে সে হুংকার দিল,

'হ্যাঁ, খেয়েছি তো! আমি কী পাঁচ বছরের বাচ্চা নাকি, যে নিজের ইচ্ছেমতো মদও খেতে পারব না? আর এখানে এতো ভিড় কেন? তোমরা কী বসে ছিলে আমার জন্য? আমি আর বাচ্চা নই, যে রাত করে বাসায় ফিরতে পারব না!'

'ন্যাসো আর লুকাস বিস্ময়ে পাথর হয়ে তাকিয়ে আছে এরিদের দিকে। স্বল্পভাষী, শান্ত স্বভাবের এরিদকে তারা এমন রূপে আজই প্রথম দেখল। ওদিকে রিচার্ডের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছে, ক্রোধের রেখা ক্রমশ ভয়ংকর হয়ে উঠছে। এলিজাবেথের অশ্রুসিক্ত চোখে একবার তাকিয়ে সে বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল,

'এরিদ! তোমার সাহস হলো কী করে আমার সামনে আমার স্ত্রীর সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলার? জবানে লাগাম টানো বলছি, এরিদ কায়নাত! আই ওয়ার্ন ইউ। তোমার পাপার বয়স হলেও স্ত্রীর সম্মান রক্ষার মতো ক্ষমতা আর সাহস আমার এখনও আছে। আমাকে ভাবাতে বাধ্য করো না-ফল আগে না গাছ আগে।'

'এরিদ দুলতে দুলতে এগিয়ে এলো রিচার্ডের সামনে। তার হাত থেকে তখনও গলগল করে রক্ত ঝরছে, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। নিহাদ তাকে সামলাতে এগোতেই এরিদ ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল।

'বাজপাখির মতো শাণানো চোখে রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে এরিদ তাচ্ছিল্যের হাসি ছুড়ে দিয়ে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল,

'তোমার স্ত্রী, রাইট?'

'রিচার্ডের অতল দৃষ্টি যেন হঠাৎ ছেলের ভগ্ন হৃদয়ের গভীরে নেমে যেতে চাইল। চারপাশ স্তব্ধ হয়ে গেল। সকলে নির্বাক, নিস্তব্ধ, ম্লান মুখে তাকিয়ে আছে এরিদের দিকে।

'হঠাৎই বিরহাক্রান্ত কণ্ঠে এরিদ ফেটে পড়ল,

'আমার বাচ্চাকালের ভালোলাগা, কৈশোরের প্রথম বন্ধু... চৌদ্দ বছর ধরে একটু একটু করে গড়ে তোলা ভালোবাসা... সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে! অন্য কারো হয়ে যাচ্ছে ও। আর আমি কিছুই করতে পারছি না। তোমরা কি বুঝতে পারছো আমার যন্ত্রণা? আমার বুকের ভেতরটা কেমন ছিঁড়ে যাচ্ছে?

ওর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে অন্য কারোর সঙ্গে! আমি পারলাম না... পারলাম না আমার চৌদ্দ বছরের ভালোবাসাকে পূর্ণতা দিতে। শি নেভার লাইকড মি ব্যাক! দ্যাট ওয়াজ জাস্ট ফাকিং ওয়ান সাইডেড লাভ!'

'এরিদের কণ্ঠ টগবগে অথচ ভাঙনের কিনারায়। হতবিহ্বল চোখে সকলে তাকিয়ে রইল তার দিকে। এরিদের হাহাকার ভেদ করে রান্নাঘর থেকে ছুটে এলো ইবরাত, দাঁড়াল বোনের পাশে। অন্যদিকে এলিজাবেথ স্থবির। অশ্রুভেজা চোখে তাকিয়ে রইল নিজের ছেলের দিকে। বুক কেঁপে উঠল ওর। সে আজ বুঝল তার গম্ভীর ছেলের ভেতরে কত অস্থিরতা, কত অসহনীয় যন্ত্রণা পাথরের মতো জমাট বেঁধে ছিল, অথচ কোনোদিন কেউ তা টেরই পায়নি। সবসময় ভেবে এসেছে ছেলেটা গম্ভীর।

'এরিদ এবার ধীরে ধীরে গিয়ে দাঁড়াল এলিজাবেথের সামনে। চোখে কাতরতা, কণ্ঠে ভাঙা সুর,

'প্রিয় মানুষকে অন্য কারোর হয়ে যেতে আমি কীভাবে দেখব, মাম্মা? কোন অধিকারে ওকে তুলে আনব, যখন ও আমাকে ভালোবাসেনি? রোজ কেন ভালোবাসল না আমাকে? আমার কি কোন কমতি ছিল? হ্যাঁ, আমি পারফেক্ট নই, আমার খুব রাগ, আমি হিংস্র। কিন্তু কে-ই বা পারফেক্ট? আমার ভালোবাসা কি এতটাই তুচ্ছ ছিল যে ও তার ওপর প্রশ্ন তুলতে পারে? শি জাস্ট ডেস্ট্রয়ড মি, মাম্মা... শি জাস্ট ডেস্ট্রয়ড মি।'

'ইস্কা হঠাৎ ফুপিয়ে উঠল। ছুটে এসে পিছন থেকে ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এলিজাবেথের চোখ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়তে লাগল অশ্রু। কাঁপা হাতে ছেলের কাঁধে হাত রাখতে চাইতেই এরিদ হঠাৎ সরে গেল।

'মাম্মা, আই অ্যাম ম্যাড ইন মাই লাভ... আই জাস্ট লাভ হার। মা হয়ে ছেলের কষ্টটা বুঝতে পারছ না কেন? তোমার ছেলে তিলে তিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে, জাস্ট শেষ হয়ে যাচ্ছে।'

'মুষড়ে পড়া কণ্ঠে কথাগুলো বলে এরিদ হনহনিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল। এলিজাবেথ নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল। মাতৃহৃদয় ভারে নত হয়ে এলো। স্থির দৃষ্টিতে তাকাল উপরের দিকে, ছেলের অদৃশ্য হওয়ার পথে। রিচার্ডের মুষ্ঠি শক্ত হয়ে উঠেছে। লুকাস আর ন্যাসো রিভলভার লোড করতে করতে এগিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল। রিচার্ড প্রস্তুত হচ্ছিল বেরিয়ে যাওয়ার জন্য।

'ঠিক তখনই পিছন থেকে এলিজাবেথ শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে ডেকে উঠল,

'মিস্টার কায়নাত।'

'রিচার্ড ঘুরে তাকাল, 'এরিদের মাম্মা?'

'আমাদের ছেলেটা ভেতরে ভেতরে এতো কষ্ট পুষে রেখেছে, আমরা কিছুই টের পাইনি। কবে এতো বড় হয়ে গেল ছেলেটা, আমরা জানতেও পারিনি।'

'রিচার্ড নির্বাক। সে সবটা জেনেও কিছু করতে পারেনি। এরিদ নিজেই তার সামনে প্রাচীর তুলে রেখেছিল। হঠাৎ এলিজাবেথের চাহনি বদলে গেল। অগ্নিবৎ নারী রূপে সে স্থির চোখে তাকাল রিচার্ডের দিকে। গম্ভীর কন্ঠে, নিঃশব্দে বিস্ফোরণের মতো উচ্চারণ করল,

'চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ওই মেয়েকে আমি আমার ঘরের পুত্রবধূ হিসেবে দেখতে চাই। স্ত্রী হিসেবে নয়, ড্রাগন গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে এটা আমার আদেশ আপনার কাছে, মি. কায়নাত।'

'ম্যানশনের দুর্গের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে এরিদ। মাথার ওপর আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সে-ই কখন থেকে মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে। চারপাশে বিকট বজ্রপাতের শব্দ, তবুও এরিদ নিশ্চল। তার বুকের ভেতর থেকে আসা শব্দ এই বজ্রপাতকে হার মানাচ্ছে। আজ তার প্রতিটি পাঁজরে, পাঁজরে ভাঙনের আওয়াজ।

'বৃষ্টির ফোঁটার সাথে সাথে তার রক্তও চুইয়ে পড়ছে হাত থেকে। হঠাৎ সে দু'হাত মেলে ধরল পাখির ডানার মতো, চোখ বুজল। ঠোঁটে ভেসে উঠল তাচ্ছিল্যের হাসি। ঠিক তখনই বিশাল এক থাবার মতো হাত এসে পড়ল তার কাঁধে। একটানে তাকে নিচে নামিয়ে আনল।

'চোখ খুলতেই এরিদের সামনে দাঁড়িয়ে রিচার্ড। মুহূর্তেই সব ভেঙে পড়ল তার ভেতরে। ছুটে গিয়ে পাপার বুকে মুষড়ে পড়ে হাহাকার করে উঠল এরিদ,

'ওর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, পাপা, আমি পেলাম না আমার ভালোবাসা!'

'অকস্মাৎ রিচার্ড ছেলেকে বুক থেকে সরিয়ে দিল। প্রথমবারের মতো ছেলের গায়ে হাত তুলল সে। থাপ্পড় খেয়ে স্তব্ধ এরিদ গালে হাত চেপে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। রিচার্ড বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠল,

'তুমি আমার সন্তান, এরিদ! তুমি সেই রিচার্ড কায়নাতের সন্তান, যার বজ্রনির্ঘোষ শব্দ ছিল-আমি সে-ই নায়ক হতে চাই না, যে আত্মত্যাগের নামে ভালোবাসা বিসর্জন দেয়। আমি ভিলেন, যে সত্যের বিরুদ্ধে গিয়ে দুনিয়াকে পায়ের নিচে পিষে নিজের ভালোবাসা ছিনিয়ে আনে। আর তুমি? আমার ছেলে হয়ে কিনা এভাবে ভেঙে পড়ছ?'

'এরিদ চোখ তুলে বাবার চোখে চোখ রাখল। বজ্রপাত ছিন্নভিন্ন করল রাতের আকাশ। বাবা-ছেলের দৃষ্টির ভেতর ঝলসে উঠল এক ভয়ংকর ভাষাহীন বোঝাপড়া। এমন এক বোঝাপড়া, যার মানে শুধু তাদের দু'জনেরই জানা।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন