#প্রেমের_লালনছোঁয়া
#পর্ব_৮ ( প্রথম অংশ)
#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
শৈলী চুপচাপ জানালার পাশে বসে আছে, বাইরে মেঘলা আকাশ। গাছের পাতা নিস্তব্ধ হয়ে আছে, বাতাসের কোনো সাড়া নেই, ঠিক যেন তার মনের মতোই ভারী, নীরব। তার ছোট্ট ঘরটাকে হঠাৎ করেই আগের চেয়ে বেশি সংকীর্ণ লাগছে, যেন দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে, তাকে আরো অসহায় করে তুলছে। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা, একটা অপমানের কষ্ট, যেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। চোখে পানি জমে আছে, কিন্তু সে চাইলেও ফেলে দিতে পারছে না। আজকের পর থেকে তাকে নিশানকে ভাইয়া বলতে হবে, শুধু এই একটা চিন্তাই তার মনটাকে অস্থির করে তুলছে। কিছু কিছু সম্পর্কের নাম পরিবর্তন হয়ে গেলে, সেটার ব্যথা বোঝানোর মতো কোনো শব্দ থাকে না। ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল শৈলী। হাতের আঙুলগুলো মুঠো করে ধরল। তার এতদিনের সব অনুভূতি, সব মুহূর্তগুলো কি এক মুহূর্তেই অর্থহীন হয়ে গেল? তার কি সত্যিই এখানে থাকার কোনো অধিকার নেই?
শৈলী জানালার বাইরে তাকাল, এক পশলা বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে, ঠিক যেমন করে তার আবদ্ধ কান্নাগুলো বুকের গভীরে চেপে বসে আছে।
অনেকক্ষন চুপচাপ থেকে শৈলী ধীরে ধীরে ডায়েরির পাতাটা উল্টে নিল। তার ছোট্ট নীল রঙের ডায়েরি, যেখানে কেবল তার মনের কথা লেখা থাকে..কেউ কখনো পড়ে না, জানে না। পাতাটা খালি দেখে একটা গভীর শ্বাস নিল শৈলী, তারপর কলমটা হাতের মধ্যে শক্ত করে ধরে প্রথম লাইনটা লিখল...
❝ সব সম্পর্কের নাম দেওয়া যায় না। কিছু অনুভূতি কেবল অনুভব করাই ভালো। ❞
তার হাত কাঁপছে, কিন্তু সে থামল না। অক্ষরগুলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকল, তার ভেতরের কথা যেন কাগজে ফুটে উঠছে।
❝ আজ আমাকে নতুন একটা নাম দিতে বলা হয়েছে। যে মানুষটাকে দেখে এই কঠিন দুনিয়াটাকে সহ্য করা শিখেছি, যার কথায় একটু ভরসা পাই...তাকে আজ থেকে অন্য নামে ডাকতে হবে। কিন্তু আমার মনের ডাক কি বদলে যাবে? আমি কি পারব সত্যিই...?"
কলমটা থামিয়ে শৈলী গভীর শ্বাস নিল। বুকের মধ্যে যেটা দলা পাকিয়ে আছে, সেটা বের করে দেওয়ার জন্যই যেন এই ডায়েরি। বাইরে বৃষ্টি বাড়ছে, জানালার কাঁচ বৃষ্টির ফোঁটায় ঢেকে যাচ্ছে, আর শৈলী তার মনের ভেতরের বৃষ্টি ডায়েরির পাতায় নামিয়ে আনছে...একটা একটা শব্দের ভেতর দিয়ে।
আরো কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে, ভেবে লেখা পাতাটা উল্টে ফেলল শৈলী। এরপরে নতুন পৃষ্ঠায় আবারো প্রথম থেকে খুব যত্ন করে লিখতে শুরু করল কারো উদ্দেশ্যে কিছু কথা..যা ব্যক্ত হবে ডায়েরিতে, আটকা পড়ে থাকবে কাগজে!
❝ প্রিয়..
এই সম্বোধনটার মানে আপনি জানেন কি না, জানি না। জানার প্রয়োজনও হয়তো নেই। তবু লিখলাম, কারণ আপনার নাম উচ্চারণ করার অধিকার আমার নেই। আমি যে কিছু চাইতে পারি না, আমি যে শুধুই কাঙাল!
আপনার সামনে এলেই আমি কথা হারিয়ে ফেলি, নিজেকেই অপরিচিত মনে হয়। আপনি কি জানেন, কতবার ইচ্ছে হয়েছে কিছু বলার? কিন্তু আমি তো জানি, আমার বলা-না-বলার কিছুই এসে যায় না। আপনি যেমন ছিলেন, তেমনই থাকবেন। তবু আমার এই একরোখা হৃদয় যেন মানতে চায় না। দূরত্ব রেখেও আপনাকে কাছে পাওয়ার এই আকাঙ্ক্ষা কীভাবে বোঝাই?
আমি আপনাকে ভয় পাই, শ্রদ্ধা করি, আর নিঃশব্দে...হয়তো একরকম দুর্বলতাই বলতে পারেন...আপনার ছায়া হয়ে থাকতে চাই। আপনার একটুখানি প্রশ্রয় পেলে মনে হয় এ জীবন ধন্য, আবার একটুখানি অবহেলাতেই শূন্য লাগে।
আর একটা কথা... আপনি মাঝে মাঝে আমাকে 'হিমরূপা' বলে ডাকেন। কেন ডাকেন, জানি না। হয়তো কোনো বিশেষ অর্থ আছে, হয়তো কোনো এক অলিখিত নাম যেটা শুধু আপনার কাছেই অর্থবহ। কিন্তু আমি জানি, এই নামটা শুনলেই আমার হৃদয় এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে যায়। আপনি জানেন না, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে কতবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করেছি...আমি কি সত্যিই হিমরূপা? আমি কি সত্যিই আপনার ডাকে তৈরি এক প্রতিচ্ছবি?
আপনি কখনো বুঝতে পারবেন না, আমি কেমন করে আপনার প্রতিটা কথা মনে রাখি, আপনার প্রতিটা অভিব্যক্তি লক্ষ করি। কতবার ইচ্ছে হয়েছে জানতে, আমি কি একবারের জন্যও আপনার চোখে পড়েছি? কিন্তু জানতে চাইতে পারিনি। কারণ এই শৈলী নামক এতিমের চাওয়া-পাওয়া থাকলে নাকি সেটা আরও বেদনাদায়ক হয়ে যায়।
তাই কিছু চাই না, কিছু বলতেও চাই না। শুধু এটুকুই বলি..নিশান ভাই, আপনার মনের যেকোনো কোণে যদি একটুখানি জায়গা ফাঁকা থাকে, তবে একবার আমাকে মনে রাখবেন। আমি চাই না আপনি আমাকে বুঝুন, শুধু চাই, আপনার পৃথিবীর কোথাও আমার অস্তিত্বটা থাকুক...একটুখানি থাকলেও থাকুক!
"কারো পথের ধুলো হয়ে, আমি কি থাকতে পারি?
কারো চাহনির আলো ছুঁয়ে,
কেউ যদি আমায় ডাকে"হিমরূপা" নাম ধরে।
কেও জানবে কি? বুঝবে কি?
একটা মন নিরবে চায়, কারো ছায়ায় একটুখানি ঠাঁই!"
কোনো একজনের হিমরূপা,
শৈলী।
দাঁড়ি টেনে দিতেই বড় করে শ্বাস ফেলল শৈলী। আজ অনেকদিন পর ডায়েরিতে লিখে তার শান্তি লাগছে। অসহনীয় যন্ত্রনা যখন সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যায় তখনই মাঝে মাঝেই শৈলী ডায়েরিতে মনে থাকা সব অগোছালো শব্দগুলো গুছিয়ে কলমের কালিতে ফুটিয়ে তোলে। গত কয়েকদিন সময় না পাওয়ায় আজ আবারো ডাইরিটা হাতে তুলেছে সে। নিশানের উদ্দেশ্যে যত কথা থাকে, সব কথাই শৈলী খুব গুছিয়ে এই ডাইরিতে লিখে রাখে ।মাঝে মাঝে পড়তেও ভালো লাগে ।
সম্প্রতি লেখায় কলমটা গুঁজে ডাইরিটা বন্ধ করলো শৈলী। চোখ তুলে তাকালো শূন্যে। ঠোঁট কাঁমড়ে কিছু একটা ভেবে শুকনো ঢোক গিললো। মাঝে মাঝে জীবনের মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু এটাও তো সম্ভব না!
~~~★
মাত্র রিমি চৌকাঠ পেরিয়ে বাড়িতে ঢুকলো। দুহাতে একগাদা শপিং ব্যাগ, মুখে আনন্দের ঝলক। চোখেমুখে এমন উচ্ছ্বাস, যেন পুরো শপিং মলই সে কিনে এনেছে! গাঢ় নীল একটা টপ, সাথে কালো জিন্স, সব মিলিয়ে বেশ সাজগোজ করেই বেরিয়েছিল রিমি। এখন হাতে এতগুলো ব্যাগ সামলাতে সামলাতেই হাঁপিয়ে উঠছে। বাড়িতে ঢুকেই উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে রিমি ডাক দিল,
" শৈলীপু! ও শৈলীপু! আল্লাহ'র ওয়াস্তে নিচে নামো। আমায় একটু সাহায্য করো। দেখো আজ কী কী এনেছি! পুরো দোকান ফাঁকা করে দিয়েছি।”
কণ্ঠে খুশির রেশ থাকলেও কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম আর হাঁপানো দেখে মনে হচ্ছে, বিশাল এক যুদ্ধ জিতে ফিরেছে!
ঘরে অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকা শৈলী চমকে তাকালো দরজার দিকে, যেন হঠাৎ ঘোর কেটে গেল। রিমিকে এমন পাগলের মতো চিৎকার করতে খুব একটা দেখা যায় না! হঠাৎ তাড়াহুড়ো করে চেয়ার ছেড়ে উঠে নিচে নামতে গেল শৈলী। কিন্তু এতটাই তড়িঘড়ি করছিল যে খেয়ালই করল না, নিজের সবচেয়ে গোপন জিনিসটিই রেখে যাচ্ছে বিছানায়, তার ডায়েরি।যে ডাইরিটা এতদিন সর্বদাই শৈলী আলমারির ভেতরে ঢুকিয়ে রাখত, আজ তাড়াহুড়ো করে তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে হন্তদন্ত হয়ে নিচে ছোটার কারণে যত্নে রাখা ডায়েরিটা অযত্নে ফেলে গেলো বিছানার উপরে।
সারা দিনের যত্নে রাখা সেই ডায়েরি আজ অসাবধানতায় পড়ে রইল বিছানার উপর। পাতাগুলো বন্ধ থাকলেও একপ্রকার চাপা শ্বাস ফেলে অপেক্ষা করছে, যেন মুক্তির আশায় বন্দি ছিল এতদিন।
ঘরের জানালাটা খানিকটা খোলা, আর বিকেলের নরম বাতাস ধীরে ধীরে ঢুকছে ভেতরে। হঠাৎ একটা তীব্র হাওয়া এসে ঝাপটা দিল জানালায়, পর্দা উড়ে উঠল বাতাসের তালে। সেই সাথে বিছানায় পড়ে থাকা ডায়েরিটার ওপরও লাগল বাতাসের ছোঁয়া। প্রথমে মৃদু কাঁপল পাতাগুলো, তারপর যেন এক অলিখিত নির্দেশে ধীরে ধীরে খুলে যেতে লাগল! অক্ষরগুলো যেন বাতাসের স্পর্শে প্রাণ ফিরে পেল, পাতাগুলো উল্টে উল্টে প্রকাশ করতে লাগল শৈলীর নিখুঁতভাবে লুকিয়ে রাখা অনুভূতিগুলো।
প্রথম পাতাটা উল্টে গেল, তাতে অগোছালো কটি শব্দ, কিছু এলোমেলো রেখার নকশা। পরের পাতায় আরেকটু স্পষ্ট, অতি যত্নে লেখা নিশানের নাম, পাশে হালকা কালো কালি লেগে থাকা কিছু লেখা।
তারপর আরও একটা..
" হিমরূপা" এই নামে কেনো ডাকেন উনি?"
পাতাগুলো উল্টে যাচ্ছে, যেন শৈলীর মনই নিজেকে উজাড় করে দিচ্ছিল বাতাসের কাছে। নিঃশব্দ সেই সাক্ষী ছিল শুধু ঘরের নিস্তব্ধতা আর জানালা দিয়ে উড়ে আসা একটুখানি বাতাস।
~~★
দ্রুত সিড়ি দিয়ে নামতেই শৈলী দেখল, রিমি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে, দুহাত ভরে একগাদা শপিং ব্যাগ ধরে রেখেছে, যেকোনো মুহূর্তে হাত থেকে পড়ে যাবে। মুখে অসহায়তার ছাপ স্পষ্ট! শৈলী দ্রুত এগিয়ে গিয়ে অবাক হয়ে বলল,
" হায় আল্লাহ! এত কিছু কিনেছিস? কোথায় যাচ্ছিস এত বোঝা নিয়ে?"
রিমি কপালে হাত ঠেকিয়ে একটু ভাব নিয়ে বলল,
" এক্সকিউজ মি শৈলীপু, আমি অনেক দয়ালু। দোকানদারদের প্রতি দয়া দেখিয়েছি, বুঝলে? এই কারণে খুব একটা কিনলাম না। মাত্র বিশ হাজার টাকার শপিং করে আসলাম। এতক্ষণ ধরে ব্যাগগুলো টানতে টানতে হাত দুটো অবশ হয়ে গেছে! হা করে না থেকে ব্যাগগুলো একটু ধরো। তুমি যদি এখনই না ধরো, আমি এখানেই লুটিয়ে পড়ব!"
শৈলী রিমির নাটকীয়তা দেখে চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে রইল। এরপর দ্রুত দুটো ব্যাগ হাত থেকে নিয়ে বলল,
"বিশ হাজার টাকার শপিং করেও বলছিস খুব একটা করোনি? তুই দোকান ফাঁকা করে দিয়ে এসেছিস নাকি?"
রিমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ ভার করে বলল,
"হায়রে! তুমি কোনো দিনই আমার পরিস্থিতি বোঝো না, শৈলীপু! কত কষ্ট করে শপিং করেছি জানো? একটা একটা করে জিনিস পছন্দ করেছি, দরদাম করেছি, তারপর কিনেছি! এ যে একপ্রকার যুদ্ধ, বোঝো? এ যুদ্ধের দাম কেউ দেয় না!"
শৈলী হেসে বলল,
"তা যুদ্ধজয়ী রানী, এখন যুদ্ধের জিনিসপত্র নিয়ে ভেতরে আসবে, নাকি মামনির ঝারি খাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে?"
রিমি সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় নেড়ে বলল,
"অবশ্যই আসব! তবে একটা কথা, আমার জন্য কফি রেডি রেখো। এত পরিশ্রমের পর এখন এক কাপ কফি ছাড়া আর কিছুতেই শান্তি পাব না!"
শৈলী মাথা নেড়ে রিমির ব্যাগগুলো নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল, আর রিমি তার নাটকীয়তা বজায় রেখেই পেছন পেছন চলল। শৈলী এবার সিড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে হেসে বলল,
" রিমি, এত শপিংয়ের টাকা পেলি কোথায়?"
রিমি চোখ টিপে হাসল,
"ঐ যে আমাদের প্রিয় নিরামিষ নিশান ভাই!"
শৈলী তৎক্ষনাৎ ভ্রু কুঁচকালো,
" মানে?"
" মানে তেমন কিছু না। আমি নিশান ভাইয়ের অফিসে গিয়ে শুধু একটু মুখ কালো করে বললাম, ‘নিশান ভাই, আমার শপিং করতে মন চাচ্ছে, কিন্তু মায়ের কাছে টাকা চেয়েছি বলে অনেক বকা খেয়েছি।' ব্যাস! বাকিটা ইতিহাস!"
শৈলী চোখ পিটপিট করে তাকালো, এরপর দুজনে একসাথে ফিক করে হেসে ফেলল। এই দু-বোন বেশ ভালোই নিশানের সাথে বন্ধুসুলভ। আজ পর্যন্ত শুধু শৈলীই পারেনি, নিশানের সাথে ফ্রি হতে। রিমি এবং মিমির মত সে কখনো এভাবে সরাসরি নিশানের কাছে আবদার করতে পারবে না। সেই সাহস কেনো যেন নেই তার। এর কারণটাও জানা নেই!
~~★
রিমি খুশি মনে শৈলীকে নিজের ঘরে নিয়ে গেল। উচ্ছ্বাসে চোখে-মুখে আনন্দের ঝলক। সে মনে মনে ভাবছিল, এতদিন ধরে নিজের জন্য যা কিছু কিনেছে, এখন তার সঙ্গে শৈলীকে শেয়ার করতে পারবে! রিমি ব্যাগগুলো সাবধানে বিছানার উপর রাখল, তারপর এক এক করে তার শপিং করা জিনিসপত্র বের করতে লাগল। টপ, স্কার্ট, ব্রেসলেট, নতুন একটা জুতা,সবই ছিল। শৈলী হাসিমুখে সব দেখতে থাকলো।
" শৈলীপু, দেখো, এইটা আমি শুধু তোমার জন্যই কিনেছি!"
রিমি একপাশে মিষ্টি একটা পিচ কালার টপ তুলে শৈলীর সামনে ধরল। এরপর বলল,
"কেমন লাগছে?"
শৈলী অবাক হয়ে বলল,
" তুই আমার জন্য কিনতে গিয়েছিস কেনো? আমার তো দরকার নেই!"
রিমি এবার ঠোঁট ভিজিয়ে মেকি হেসে মনে মনে আওড়ায়,
" আমি কি আর সাধে তোমার জন্য কিনেছে নাকি শৈলীপু! আসল কাহিনী কি আর বলা যায়? আমি যে নিশান ভাইয়ের কাছ থেকে কোন শর্তে টাকা নিয়েছি, সেটা শুধু আমিই জানি।"
ভেবেই মেকি হেসে মিষ্টি করে রিমি বলল,
" তুমি এসব কী কথা বলছো শৈলীপু? শপিং করলাম আমি। মিমের জন্য কিনেছি,তাই তোমার জন্য কিনলাম। তুমি তো আর কখনো শপিং করতে যাবে না। তাই তোমার জন্য নিয়ে এসেছি। তোমার এই ছোট বোন তোমার জন্য এনেছে আর তুমি নেবে না?"
শৈলী মাথা দুদিকে নেড়ে কাতর গলায় বলল,
" না রিমি, বড়মা জানতে পারলে খুব খারাপ হবে। আর আমার তো দরকার নেই এসব আমার যখন দরকার হবে, আমি তখন তোর কাছে চেয়ে নেব।"
রিমি আরো জোরাজুরি করলেও শৈলীর সাথে পেরে উঠলো না। শেষে রিমি আতঙ্কে জর্জরিত হয়ে শৈলীর জন্য আনা ড্রেস টা নিজের আলমারিতে লুকিয়ে রাখল। শুধু একট লোক এই বিষয়ে জানতে না পারলেই হয়!
~~★
রাশিদা তালুকদার বাগানে পানি দিয়ে কেবলই বাড়িতে ঢুকলেন। এরপর মিমির ঘরে গিয়ে বিছানা গুছিয়ে খুঁজলেন মেয়েকে। ঘরে মিমি কে কোথাও না পেয়ে রাশিদা ভাবলেন মিমি হয়তো শৈলীর ঘরে গিয়েছে। এই কারণে তিনি দ্রুত শৈলীর ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে দেখলেন মিমি নেই। বারান্দায়ঃ খুঁজে দেখলেন, কিন্তু মিমি কোথাও নেই।
মিমিকে না পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসদে চাইলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ ঘরের মধ্যে বিছানার একপাশে পড়ে থাকা শৈলীর ডায়েরির দিকে চোখ পড়লো তার। প্রথমে তিনি তা নজরে আনেননি, তবে কিছুটা অদ্ভুত মনে হলো। শৈলীর ডায়েরি যেখানে সাধারণত যত্নে রাখা হয়, সেখানে আজ এমন অযত্নে ফেলে রাখা কেনো?
রাশিদা তালুকদার বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে ডায়েরির দিকে নজর দিলেন। কৌতূহল জাগল তার। কিছু সময়ের জন্য তিনি থেমে রইলেন, মনে হলো যেন কিছু একটা অনুভব করছেন। তাঁর মনের মধ্যে কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, কেনো শৈলী এই ডায়েরিটি ফেলে রেখেছে? কিছুক্ষণ থেমে তিনি ডায়েরিটি তুলে ধরে খোলার আগেই মনে মনে ভাবলেন,
"এটা তো শৈলীর ব্যক্তিগত বিষয়, আমার কি দেখে নেওয়া উচিত?"
তবে শেষ পর্যন্ত তিনি তা না দেখে ডায়েরিটি ফের বিছানায় রেখে দিলেন। শৈলীর ব্যক্তিগত জায়গায় অনুপ্রবেশ করতে তিনি ঠিক মনে করলেন না। কিন্তু ডায়েরির সেই অপলক দৃষ্টি, যা কিছু বলে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, রাশিদার মন থেকে আর একেবারেই মুছে গেল না।
রাশিদা এবার যেতে উদ্যত হলে আবারো ডায়েরির পাতা বাতাসে উল্টে যায়। তিনি বিষয়টা খুব একটা নজর না দিলেও পৃষ্ঠার মাঝখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা "নিশান ভাই" লেখাটায় চোখ আটকাল তার। কিছুটা অবাক হলেন থমকে যাওয়া রাশিদা তালুকদার।
চলবে........✨
😓 আজকের পর্ব ভালো হয়নি জানি.. মনটা ভালো নেই। আজ একটু কষ্ট করে মানিয়ে নিন পাঠক মহল।🥹 আগামীকালকে একটা ধামাকা
#প্রেমের_লালনছোঁয়া
#পর্ব_৮ ( বাকি অংশ)
#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
ঠিক রাত সাড়ে এগারোটায় বাড়ি ফিরে আকাশ থেকে পড়ল নিশান। আজ অফিসে সেই পুরোনো ফ্যাক্টরির বিষয় নিয়ে বড়সড় একটা মিটিং হয়েছে। যে কারণে তাকে আজকে এত দেরিতে বাড়ি ফিরতে হলো। নিশান ভেবেছিল সবাই ইতিমধ্যে নিজেদের মতো করে ঘুমিয়ে গিয়েছে। নিজের কাছে সব সময় বাড়ির এক্সট্রা চাবিটা রাখার কারণে অনায়াসে বাড়ির ভেতরে ঢুকতেও তার কোনো সমস্যা হলো না। নিশান দরজা বন্ধ করে ক্লান্ত ভঙ্গিতে হাত গলিয়ে কোটটা খুলল। শরীর এতটাই অবসন্ন লাগছিল যে মনে হচ্ছিল, এখনই একটা জায়গায় বসে চোখ বন্ধ করলে আর উঠতে পারবে না। সবই ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু বাড়ির ভেতরে ঢোকার পর ড্রয়িং রুমের কাছে আসতেই মাথায় রীতিমতো বাজ ফেটে পরল নিশানের। ড্রয়িং রুমের দিকে কয়েক পা এগোতেই মুহূর্তেই সমস্ত ক্লান্তি উবে গেল। নিশান হতবাক! ক্লান্ত মস্তিষ্ক টা সজাগ হয়ে চোখজোড়া স্থির হলো সামনে।
ডাইনিং টেবিলের গ্লাসের উপর হাত রেখে মাথা এলিয়ে ঘুমিয়ে আছে শৈলী। তার নিশ্বাসের ধীর ওঠানামা টের পাওয়া যাচ্ছে, যেন বেশ গভীর ঘুমে ডুবে গেছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের পাশে লুটিয়ে পড়েছে, আর টেবিলের একপাশে প্লেটে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবার সাজানো আছে।
এতক্ষণ দেহ ক্লান্ত থাকলেও এবার যেন মনটা অস্থির হলো নিশানের। শৈলী এখানে ঘুমোচ্ছে কেনো এখনো ভেবে পেল না সে। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে নিশান ধীরে ধীরে কয়েক কদম এগিয়ে এল। হাতে থাকা সুটকেস টা টেবিলের উপরে রাখতেই চোখ পড়ল শৈলীর মাথার কাছে ঢাকা দিয়ে রাখা খাবার ভর্তি প্লেটটা। এবার আরো বিস্মিত হলো নিশান। তাহলে কি শৈলী তার জন্য অপেক্ষা করছিল?রাত এতটা হয়ে গেছে, সবাই নিজেদের ঘরে চলে গেছে, অথচ শৈলী এখানেই ছিল!
নিশান কখনোই এত দেরি করে বাড়িতে ফেরে না। তাই সবার সাথে ডিনার করার সুযোগটাও পায়। আজ ডিনার বাড়িতে করতে পারবে না বলেই তো সে বাইরে থেকে খেয়ে এলো। সে যদি জানতো যে এখানে কেও একজন তার জন্য খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে, তাহলে কি সে আর মুখে কিছু তুলতো?
একটা অদ্ভুত অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল নিশানের ভেতর। বুকের কোথাও যেন অদৃশ্য একটা টান লাগল। সে এতটা দেরি করেছিল, অথচ শৈলী…নিশান এবার ধীর গতিতে এক হাত উঠিয়ে নিজের চুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে ক্লান্ত চোখ মুছল। এরপর শৈলীর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠান্ডা খাবারের দিকে একবার তাকিয়ে আবার শৈলীর দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ।
তারপর নরম স্বরে ডাকল,
" শৈলী?”
কোনো সাড়া নেই। শৈলী এতটাই গভীর ঘুমে যে ডাক শুনেও টের পেল না। নিশানও জানে যে এই মেয়ে বেশি রাত জেগে থাকতে পারে না! তাহলে কেনো অপেক্ষা করছিল? নাকি মামনি জোর করে ওকে অপেক্ষা করতে বাধ্য করেছে? ভাবতে পারল না নিশান! যাই হোক না কেনো? ইচ্ছে করেই হোক, আর জোর করেই! অপেক্ষা তো করছিল! এটাই কয়জনে করে?
নিশান এবার একটু ঝুঁকে, আরও নিচু গলায় বলল,
“হিমরুপা, ওঠো…”
নিশানের এত নিচু আওয়াজ কি রমণীর কানে পৌঁছেছে। এত রাতে সবার ঘুমের মধ্যে জোরে আওয়াজ করেও ডাকতে পারছে না নিশান। এবার সে এক হাত উঠিয়ে নিঃসংকোচে আলতো করে রাখল শৈলীর চুলের উপর। আঙুলগুলো চুলের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দিয়ে একটু জোরে ডেকে উঠলো,
" এই শৈলী! উঠে পড়.....!"
নিশানের আঙুলের স্পর্শে শৈলীর ভ্রু কুঁচকে উঠল। সে ঘুমের মধ্যে সামান্য নড়ল, যেন মৃদু অস্বস্তিতে পড়েছে। কিন্তু তখনো চোখ খুলল না। নিশান এবার তার কপালের একপাশে চুল সরিয়ে দিয়ে আরেকবার ডাকল,
“শৈলী, ওঠ।"
শৈলীর চোখের পাতাগুলো এবার কাঁপল, তারপর ধীরে ধীরে খুলল। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না সে। ঘরের নরম আলোয় ঝাপসা চোখে সামনে ধরা পড়ল নিশানের মুখ। কিছুক্ষণের জন্য বোঝার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলল শৈলী...এটা স্বপ্ন, না বাস্তব?
চুল থেকে হাত সরিয়ে নিশান ভ্রু কুঁচকে তার মুখের দিকেই তাকিয়ে আছে।
" এটা ঘুমানোর জায়গা? ঘর নেই তোর? এখানে ঘুমিয়েছিস কেন? তোর কি কোনো হুঁশ আছে?”
নিশানের কড়া কন্ঠের প্রশ্নের তোপে শৈলী এবার পুরোপুরি জেগে উঠল। মাথা তুলতেই বুঝতে পারল, এতক্ষণ টেবিলের উপর মাথা এলিয়ে ছিল! দ্রুত চারপাশে তাকিয়ে যেন বাস্তবতায় ফিরল। ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবারগুলো দেখে মনে পড়ল সে অপেক্ষা করছিল… নিশানের জন্য। কিন্তু কখন ঘুমিয়ে পড়ল, জানেই না!
লজ্জা পেল শৈলী। শেষে কিনা ঘুমিয়ে পড়ল! এটা কি ঠিক? একেবারে চুপ হয়ে রইল শৈলী। কিছু বলার মতো শব্দ পেল না মুখে। নিশানের চোখে তখনো প্রশ্ন খেলা করছে।
শৈলী দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে বলতে চাইল,
" সরি নিশান ভাই.. আমি... আমি আসলে... ওই ভুল করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! নাহলে...
কিন্তু কথাটা সম্পূর্ণ করার আগেই নিশান ধীরে ধীরে বলল,
"তোকে কেউ অপেক্ষা করতে বলেছে, না তুই নিজে থেকেই অপেক্ষা করছিলি?"
নিশানের গলার স্বর অদ্ভুত রকমের গভীর ছিল। যেন সে খুব মনোযোগ দিয়ে শৈলীর প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বুঝতে চাইছে। শৈলীর বুকের ভেতর ধুকপুক বেড়ে গেল। সে জবাব দিতে পারল না। আসলে কাহিনী টা অনেক বড়।
খাদিজা তালুকদার নিজের আদরের ছেলের জন্য নিজে অপেক্ষা করছিলেন খাবার গুছিয়ে রেখে। তবে হঠাৎ করে তার হাঁটু ব্যথা বেড়ে যাওয়ায় রাশিদা তালুকদার এসে তাকে ঘরে নিয়ে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দেন এবং আশ্বাস দেন যে নিশান কে রাতের খাবারটা তিনিই বেড়ে দিবেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায়। এত রাত পর্যন্ত জাগার যে অভ্যাস নেই। এজন্য তিনি শৈলীকে এখানে বসতে বলে ঘরে চলে গিয়েছেন এবং যাওয়ার সময় বলে গিয়েছেন যে নিশান আসলে যেন তাকে ডাক দেয়। আর এটা জানতে পেরে খাদিজা প্রথমে একটু রাগারাগি করলেও পরে শৈলীকে একটু খাটাতে বিষয়টা মেনে নেন।
শৈলী এখন কীভাবে বলবে যে, সে নিজে থেকে অপেক্ষা করছিল না। তার যে এত বড় সাহস নেই। কোন অধিকার এই মানুষটা জন্য এত রাতে অপেক্ষা করবে সে?
নিশান শৈলীর নীরবতা দেখে 'হ্যাঁ' ভাবতে চাইলেও সে শৈলীর চোখ দেখে বুঝলো যে সে নিজে থেকে মোটেই নিশানের জন্য অপেক্ষা করছিল না। ছোট করে আড়ালে শ্বাস ফেলল নিশান, শৈলীর দিকে আরও এক মুহূর্ত চেয়ে থেকে আস্তে বলল,
“যা ঘুমিয়ে পড়। এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকাটা তোর জন্য ভালো না।”
তারপর কোনো উত্তর শোনার অপেক্ষা না করেই পকেট থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিলো নিশান। শৈলী চুপচাপ মাথা নিচু করে রইলো। নিশানকে চলে যেতে দেখে সে ভাবল নিশান মুখ হাত ধুতে গেছে, এখন খেতে বসবে। কিন্তু নিশান বেসিনের দিকে না গিয়ে সিঁড়ির দিকে পথ ধরল। চোখ তুলে নিশানের গটগট করে চলে যাওয়ার এই দৃশ্য দেখে শৈলী আঁতকে উঠল। দ্রুত গতিতে দৌঁড়ে সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে বলল,
" নিশান ভাই, কোথায় যাচ্ছেন? খাবেন না?
নিশান সিঁড়ির অনেকটা উপরে উঠেছে, সেখানেই থেমে মাথা ঘুরিয়ে কড়া কন্ঠে জানান দিলো,
" অতিরিক্ত অধিকার খাটাতে আসিস না শৈলী। তোকে আমি মোটেও আমার জন্য খাবার নিয়ে অপেক্ষা করতে বলিনি! আর যদি তোর মনে হয় যে আমাকে খাওয়ানোটা তোর দরকার, তাহলে খাবার নিয়ে ঘরে আসবি। ক্লিয়ার?"
বলেই নিশান রাগান্বিত অভিব্যক্তি নিয়ে বড় বড় পা ফেলে উপরে উঠে গেল। নিজের ঘরে ঢুকে ঠাস করে জোরে দরজাটাও আটকালো। এত জোরে ধড়াম করে দরজা আটকানোর শব্দে আহাম্মক বনে দাঁড়িয়ে রইলো শৈলী। সে বুঝতে পারল যে নিশান রেগে গেছে৷ কিন্তু কারনটা ধরতে পারল না। মানুষটার মধ্যে কি গিরগিটির আত্মা ভর করেছে! হঠাৎ করে নিশানের এরকম আগুনঝড়া রাগের কারণটা ধরতেই পারল না শৈলী। বুঝতেই পারল না যে, কেউ একজন তার কাছে অনেক বেশি কিছু আশা করেছিল!
~~~★
পড়নে থাকা ঘর্মাক্ত শার্টটা শরীর থেকে খুলে অদূরে ছুঁড়ে মারল নিশান। শুধু গায়ে আঁট শাট বেঁধে আটকে রইলো ভেতরে থাকা টিশার্টটা। মন মেজাজ একদম ঠিক নেই তার। থাকবেই বা কী করে? একটু আগেই সে যখন শৈলীকে নিজের জন্য অপেক্ষা করতে দেখেছিল, তখন তার মনে এক প্রশান্তির হাওয়া বয়ে গিয়েছিল। অথচ যখন জানতে পারল যে তাকে কেউ অপেক্ষা করিয়েছে, বাধ্য করেছে। তখন তার রাগটা দ্রুত মাথায় চড়ে উঠলো। কেনো? তাকে অপেক্ষা করতে বাধ্য হতে হবে কেন? সে কি নিজে থেকে অপেক্ষা করতে পারে না? নাকি তার জন্য অপেক্ষা করাটা অন্যায়!
নিশান বিছানার এক কোণে বসে দু'হাতে মুখ ঢেকে ফেলল। ভেতরটা ধকধক করছে রাগে, বিরক্তিতে, অভিমানে, একসঙ্গে এতগুলো অনুভূতি যেন বুকের ভেতর তাণ্ডব চালাচ্ছে। শার্টটা মেঝেতে পড়ে আছে, ভাঁজহীন, এলোমেলো। ঘরের বাতাস ভারী লাগছে তার, যেন কিছু একটা তাকে শ্বাস নিতে দিচ্ছে না। কেনো এত রাগ হচ্ছে তার? সে কি শৈলীর অপেক্ষার কারণ জানতে চাওয়ার পর এমন প্রতিক্রিয়া দেখাতে চেয়েছিল? নাকি সে অন্য কিছু আশা করেছিল?
নিশান দাঁতে দাঁত চেপে হাত দিয়ে চুলের গোছা টেনে ধরল, যেন এভাবে মাথার ভেতরের অস্থিরতাটা টেনে বের করতে পারবে। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। শৈলীর সেই নরম মুখটা, চোখ নামিয়ে থাকা চুপচাপ অভিব্যক্তিটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
"নিজে থেকে অপেক্ষা করছিল না... তাই এত রাগ লাগল?"
নিশান হতাশ হয়ে একদম পিছনে হেলান দিল। ঠোঁটের কোণে একটুখানি বাঁকা হাসি ফুটল। নিজেকেই তাচ্ছিল্যের হাসি দিল সে। কী আশ্চর্য! যদি শৈলী নিজে থেকে অপেক্ষা করত, তাহলে কি সে খুশি হতো? তাহলে কি সে রাতের খাবারটা স্বাভাবিকভাবে খেতে পারত?
"তুই কি চেয়েছিলি, শৈলী নিজে থেকে তোর জন্য অপেক্ষা করুক?"
নিশান চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতর এখনো কিসের যেন অস্থিরতা! রাগ কি পুরোপুরি কমেছে? নাকি নতুন করে অন্যকিছু জন্ম নিচ্ছে? সেটা জানার ইচ্ছে নেই তার। বুক ভরে একদফা দীর্ঘশ্বাস ফেলল নিশান। রাগটা ধীরে ধীরে ক্লান্তিতে বদলে যাচ্ছে। তবু একটা অস্বস্তি ঠিকই রয়ে গেল, যে অস্বস্তির নাম সে এখনো জানে না।
~~~★
শৈলী হতভম্ব হয়ে সিঁড়ির দিকে তাকিয়েই রইল। নিশানের শেষ কথাগুলো এখনো কানের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,
"অতিরিক্ত অধিকার খাটাতে আসিস না শৈলী!"
সে কি সত্যিই অধিকার খাটানোর চেষ্টা করছিল? না কি নিশানই তার মধ্যে এমন কিছু খুঁজতে চাচ্ছে যা সে নিজেও বোঝে না?
ডাইনিং টেবিলে রাখা খাবারগুলো এখনো ঠিক সেইভাবেই আছে, ঠান্ডা হয়ে গেছে অনেক আগেই। নিশানের জন্য রাখা গরম খাবারও এখন কেবল একটা অব্যবহৃত অপেক্ষার চিহ্ন। শৈলী ধীরে ধীরে পায়ের আঙুল দিয়ে মেঝেতে অকারণে দাগ কাটতে কাটতে নিজেকেই প্রশ্ন করল,
" উনি হঠাৎ এত রেগে গেলেন কেনো? আমি তো কিছু করিনি, রেগে যাওয়ার মত কোনো কথাও তো বলিনি! তাহলে রাগ করলো কেনো?"
শৈলী বিভ্রান্ত চোখে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। নিশানের আচরণ আজ একেবারে বোঝার বাইরে। সে কি সত্যিই অতিরিক্ত কিছু করেছে? শৈলী নিচু গলায় নিজেকেই বলল,
"আমি তো শুধু খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করেছি! এতটুকুতেই এত রাগ?"
কোনো উত্তর নেই, শুধু রাতের নিস্তব্ধতা তাকে আরও বেশি অস্বস্তিতে ফেলছে। নিশান ভাই তো এমন নয়, তবে আজ কেনো এতটা তীব্র প্রতিক্রিয়া?
নিশানের ওই কঠোর গলা, রাগান্বিত অভিব্যক্তি, আর দরজা বন্ধ করার সেই তীব্র শব্দ বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত খচখচে অনুভূতি রেখে গেল।
শৈলীর চোখ গেল ঠান্ডা হয়ে যাওয়া খাবারের দিকে। নিশান কি সত্যিই না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে? নাকি অভিমানে নিজের ক্ষুধাকেও উপেক্ষা করবে? কিছুক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে শৈলী দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে খাবারের দিকে তাকাল।
"খাবারটা কি নিয়ে যাবো? কিন্তু যদি উনি না খায়?"
শৈলী জানে নিশান একবার রেগে গেলে তার মুড পাল্টানো কঠিন। কিন্তু শৈলী এটাও জানে যে নিশান এই মুহূর্তে ক্ষুধার্ত, আর এইভাবে না খেয়ে ঘুমানো ওর স্বভাব নয়। শৈলী একবার খাবারের দিকে তাকাল, একবার নিশানের বন্ধ দরজার দিকে। দ্বিধা কাটিয়ে প্লেটে খাবার গুছিয়ে নিলো সে। ধীর পায়ে সিঁড়ির দিকে এগোতেই বুকের ভেতর ধুকধুক করতে লাগল।
নিশান ভাই কি দরজা খুলবে? নাকি আরও বেশি রেগে যাবে?
নিশানের রুমের দরজার সামনে এসে এক মুহূর্ত দ্বিধায় পড়ল শৈলী। দরজার ওপাশ থেকে কোনো শব্দ নেই। নিশান কি শুয়ে পড়েছে? নাকি এখনো রাগে গুম হয়ে বসে আছে? শৈলী গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
" নিশান ভাই...!"
বিছানায় হাতে ভর দিয়ে গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকা নিশান শৈলীর কন্ঠে ধপ করে চোখজোড়া খুলল। ভ্রু কুঁচকে তাকালো বদ্ধ দরজার দিকে। মেয়েটা কি এখন থাপ্পড় খেতে এসেছে? শৈলীর ডাকে নিশান চুপ করে শুধু তাকিয়েই রইলো!
শৈলী দ্বিধায় পড়ে দ্বিতীয় দফায় ডাকল,
" নিশান ভাই.. দরজাটা একটু খুলুন..খেয়ে নিন। নইলে সকালে বড় মার কাছে খুব বকা খাব।"
কোনো উত্তর এল না। তবে শৈলীর কথা শুনে বেশ হাসি পেল নিশানের। সেও যদি আজ বাড়ির অন্যান্য সদস্যের মত শৈলীকে অবহেলা করতো, তাহলে হয়তো আসলেই আজ শৈলীকে নিজের মায়ের কাছ থেকে বকা খাওয়াতো। মেয়েটা খাদিজা তালুকদার কে বেশ ভয় পায়।
শৈলী এবার আরও একবার ডাকল,
"নিশান ভাই?"
এবার দরজার ওপাশ থেকে খুবই নিচু গলায় উত্তর এলো,
" চলে যা..তামাশা দেখাতে এসেছিস কেনো? খাবো না আমি।"
তৎক্ষনাত শৈলীর চোখ বিস্ফোরিত হলো। নিশান ভাই খাবেনা মানে? তার না খাওয়া মানে তো সকালবেলা শৈলীর কপালে শনি আছে। কাঁদো কাঁদো গলায় শৈলী আকুতির স্বরে বলল,
" এমন করবেন না নিশান ভাই। খেয়ে নিন। আপনি কি রাগ করেছেন? রাগ করলেন কেনো?"
নিশান আরেকবার ঠোঁট চেপে ফেলল। রাগ না বলে একে আসলে অভিমানই বলা উচিত। কিন্তু সেটা স্বীকার করার মানুষ সে না। দরজার ওপাশ থেকে ঠান্ডা স্বরে বলল,
"তুই কেনো চিন্তা করছিস আমি খাব কি না? এটা তোর কাজ না, শৈলী। দ্রুত দূর হো। নইলে প্লেট সহ তোকেও আঁছাড় মারব!"
শৈলী এবার সত্যিই কেঁদে ফেলবে মনে হলো। নিশান তো এমন না! এমন নিষ্ঠুর আচরণ তো সে আগে কখনও করেনি! দ্বিধা নিয়ে বলল,
"আমি কী ভুল করলাম বলুন তো? আমি তো কিছু করিনি। "
নিশান এবার সত্যি এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধায় পড়ল। শৈলী যদি জানত যে আসল ভুলটা কী, তাহলে কি সে এটা জিজ্ঞেস করতো?
দরজার ওপাশে থাকা নিশান ঢোক গিলে চোখ বন্ধ করল। গলার স্বর এবার আরেকটু নরম হলো, কিন্তু কঠিন ভাবটা এখনো বজায় রেখে বলল,
"তুই কিছু করিসনি, শৈলী। কিন্তু যা করিসনি, সেটাই আমার রাগের কারণ।"
শৈলী এবার সত্যিই কিছু বুঝতে পারল না। যা করিনি, সেটার জন্য কেউ রাগ করে নাকি? কী বলতে চাচ্ছেন নিশান ভাই? দ্বিধান্বিত হয়ে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল,
"মানে?"
নিশান এবার কোনো উত্তর দিল না। শুধু একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মেয়ে কিছুই বোঝে না। আর সে... সে বোঝানোর ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছে।
শৈলী এবার সত্যিই কান্না আটকাতে পারল না। একটু নাক টেনে ফুঁপিয়ে বলল,
"নিশান ভাই, প্লিজ! দরজা খুলুন, আপনি যদি না খান, তাহলে বড় মা সকালে আমাকে...!"
"বড় মা বড় মা করিস না, আমি তো তোকে বকা দেব না!"
নিশান দরজার ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় বলল।
শৈলী এবার প্রায় হাল ছেড়ে দিল। কিন্তু হাল না ছাড়লে নিশান ভাই তো খাবে না! সে নরম গলায় আবার অনুনয় করল,
"দেখুন, আমি কিছু না বুঝে থাকলে বলুন, কিন্তু না খেয়ে রাগ করে থাকবেন না। প্লিজ, দরজা খুলুন!"
দরজার ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ এল না। শৈলী মনে মনে ভাবল, হয়তো এবার সে সত্যিই রেগে গেছে! কিন্তু হঠাৎ করেই নিশানের কণ্ঠ শুনে চমকে উঠল,
" খাইয়ে দিলে খেয়ে নেব!"
শৈলী স্তব্ধ হয়ে গেল। এই কথাটা সে ঠিকমতো শুনেছে তো?
"ক..কী?"
নিশান এবার ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসিটা চেপে চোখ বুঁজে বেশ আয়েশ করে বলল,
" কেও আমায় খাইয়ে দিলে মন্দ হতো না। চুপচাপ খেয়ে নিতাম।"
শৈলী চোখ পিটপিট করে তাকালো,পুরোপুরি চুপচাপ অবস্থা। মাথার ভেতর যেন হঠাৎ ঝড় বয়ে গেল। এটা...এটা কেমন কথা!
"কিন্তু..."
নিশান এবার বদ্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে ঘোর লাগা কন্ঠে বলল,
" হিমরূপা যদি এই অধমের মুখে খাবার তুলে দিত! কতই না আশ্চর্যজনক বিষয় হতো! এই আশ্চর্যকর কান্ডটা ঘটাতে মন চাইছে।"
নিশানের গলার স্বর একেবারে নিশ্চিন্ত, যেন এটাই স্বাভাবিক কথা! কিন্তু শৈলীর ভ্রু কুঁচকে গেল।
"আপনি মজা করছেন, নিশান ভাই? "
নিশান এবার দরজার ওপাশ থেকে আরেকটু আয়েসি ভঙ্গিতে বলল,
"একদমই না! আমার শর্ত একটাই। নিজ হাতে খাওয়ালে খাবো, নাহলে ঘুম! এমনিতেও আমি বেশ ক্লান্ত!"
শৈলীর মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বেরোল না। মাথার ভেতর যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল। নিজের হাতে খাওয়াতে হবে? এ তো বিশাল কাণ্ড!
শৈলীর বুক ধুকপুক করতে লাগল। এটা তো অবিশ্বাস্য দাবি! কিন্তু যদি না খাওয়ায়, তাহলে তো সে সত্যিই না খেয়ে থাকবে....আর সকালে বড় মায়ের রাগটা কেবল শৈলীর দিকেই পড়বে! শৈলী চোখ বন্ধ করে এক গভীর শ্বাস নিল। আর কোনো উপায় নেই!
ওদিকে থাকা নিশান শেষমেশ সত্যি কথাটা বলেই ফেলল,
" আমি বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি। ঘুমোতে যা তুই! "
নিশান জানত শৈলী অসস্তিতে পড়ে আর কথা না বাড়িয়েই চলে যাবে। তাই সে আবারো চোখ বুঁজে বাঁকা হাসলো। অথচ তখুনি...জানালা থেকে আসা ঘন বাতাসের মতোই ভেসে এলো শৈলীর ক্লান্ত হতাশমাখা একটুকরো কথা।
নিশান মিথ্যে বলছে এটা ভেবে হাতে থাকা থালাটা চেপে ধরে শৈলী ঠোঁট কাঁমড়ে কান্না আটকে সেও বলেই ফেলল অপ্রিয় সত্যিটা,
" দয়া করে খেয়ে নিন নিশান ভাই। আমি যে এখনো খাইনি। বড়মা বলেছেন আপনাকে খাওয়াতে না পারলে, আমি যেন ভাতের থালা না ছুঁই। আমার যে খিদে পেয়েছে। আপনি খেয়ে নিলে আমিও খেতে পারতাম। একটু দয়া করুন!"
ধপ করে চোখজোড়া এক ঝটকায় খুলল নিশান। বিস্ফোরিত নয়নে চেয়ে রইলো দরজার দিকে। কথাটা মাথায় ঠিকঠাক বসতেই নিশানের শ্বাস আটকে গেল এক মুহূর্তের জন্য। বুকের মাঝে কেমন একটা মোচড় উঠল। ঠান্ডা শীতল অনুভূতি নিয়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে আবারো তাকাল দরজার দিকে। এগুলো কী বলল শৈলী? কেমন নি/র্ম/ম কথা শোনালো তাকে? কেমন নির্দয়তার গল্প টা শোনাতে চাইলো তাকে?
পুরো শরীর কেমন থমকে গেল নিশানের, ঠিক যেন কোনো অদৃশ্য ঘা এসে লাগল বুকে। শৈলীর কণ্ঠস্বর... এতটা ভাঙা, এতটা অনুনয় মাখা..সে কখনো শোনেনি।
"আমি যে এখনো খাইনি...!"
কথাটাই নিশানের শিরদাঁড়ায় কেমন একটা অদ্ভুত শীতল অনুভূতি এনে দিল। যেন বুকের মধ্যে কোনো ভারী পাথর বসে গেল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শৈলীকে দেখতে না পেলেও নিশান স্পষ্টই অনুভব করতে পারল মেয়েটার ক্লান্ত মুখ, ক্ষুধায় কেঁপে যাওয়া হাত, আর চোখের কোণায় জমে থাকা চুপচাপ কষ্টগুলো।
বুকের ভেতর তোলপাড় করতে থাকা সব অনুভূতি নিয়েই নিশান গভীর শ্বাস নিল।কোনো কথা না বলে ধীর পায়ে দরজার কাছে গেল সে। হাত বাড়িয়ে দরজার লক খুলে ধীর পায়ে দরজাটা টেনে খুলে দিলো। দরজাটা আস্তে করে খুলতেই, সামনের দৃশ্যটা নিশানের শ্বাসকেই থামিয়ে দিল।
শৈলী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, মাথা নিচু, হাতের থালাটা শক্ত করে চেপে রেখেছে বুকে। মুখের ক্লান্তি, চোখের নিচের হালকা কালি, ঠোঁটের ফাঁটে যন্ত্রণা মাখা দাগ...সবই এই মুহুর্তে নিশানের চোখে পড়ল।
মেয়েটা সত্যিই না খেয়ে আছে। সত্যিই কষ্ট পাচ্ছে। আর তার এই কষ্টের জন্য দায়ী কে? আর কেউ না জানলেও নিশান জানে যে,মেয়েটা হাজার কষ্ট পেলেও কখনো মুখ ফুটে বলে না, অথচ আজ বলল। তাহলে কি কষ্টের মাত্রাটা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গিয়েছে?
নিশান নিজের রুক্ষ কণ্ঠস্বরকে অনেকটা কোমল করেই বলল,
"ভেতরে আয়।"
শৈলী মাথা নিচু রেখেই বলল,
" না না, নিশান ভাই। আপনি প্লেটটা নিন। আমি চলে যাই।"
কন্ঠ চওড়া এবং কঠোর হলো নিশানের,
" অবাধ্য হচ্ছিস? ভেতরে আসতে বলেছি না?"
শৈলী তাকাল না, শুধু মাথা হালকা নাড়ল,আর নিশান ঠায় দাঁড়িয়ে রইল, নিজের বুকের মোচড়টাকে আরেকবার অনুভব করে...
নিশান দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে শৈলীকে ভেতরে ঢুকতে দিল। শৈলী দেরি করল না। দ্রুত ভেতরে গিয়ে প্লেটটা বেডসাইড টেবিলে রেখে দরজা দিয়ে বের হতে চাইলে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে নিশান। দুহাত বুকে গুঁজে গম্ভীর হয়ে বলে,
" যেতে বলেছি তোকে?"
শৈলী দুদিকে মাথা নাড়ে। নিশান এবার বাইরে উঁকি মেরে সতর্ক হয়ে দরজাটা আটকে দেয়। তারপর শৈলী কে নিজের বিছানায় বসিয়ে দিয়ে ছোট করে বলে,
" একটু বোস...আসছি।"
বলে বারান্দায় চলে যায়।
শৈলী বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। নিশান ভাই এখানে বসালো কেনো? কিছুক্ষণ পর নিশান টিশার্ট খুলে একটা শার্ট পড়ে বেরিয়ে আসে। শৈলী ডাগর আঁখি তুলে তাকায়। নিশান সেই নয়নে একবার চেয়ে শার্টের হাতা গোটাতে থাকে। বলা যায়, বেশ দ্রুত প্লেটটা হাতে নিয়ে মুরগির মাংস ভাতে মাখাতে থাকে। শৈলী বিচলিত হয়ে রইলো। কোনোকিছু বুঝে উঠার আগেই নিজে ঠোঁটের সামনে এক লোকমা ভাত দেখে মাথায় বাজ পড়ল শৈলীর।
নিশান ভাত মাখিয়ে শৈলীর মুখের সামনে ধরে রেখেছে। শৈলীর হতবাক হয়ে যাওয়া মুখটা দেখে ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলো,
" মুখে কি ফেবিকল লাগিয়েছিস? মুখ খুলছিস না কেনো? খাওয়াবো কী করে?"
শৈলী এবার সম্বিত ফিরে পেয়ে না ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলে,
" নিশান ভাই....এটা তো আপনার জন্য। "
নিশান চোখ নামিয়ে একটু ইতস্তত করে বলে,
" আমি সত্যি সত্যিই বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি। পেট একদম ভরা। আই উইস, পেটে যদি আধইঞ্চি বা তারও একটু কম জায়গা থাকত, আমি তোর আনা খাবারটা অবশ্যই খেতাম!"
ছোট করে "ওও" বলে শৈলী আর কোনো কথা বলল না, শুধু নিশ্চুপ হয়ে ভাতের দিকে তাকিয়ে থাকল।
কিন্তু তখনই নিশান হালকা একটা নিঃশ্বাস ফেলল, তার চোখের কোণে কিছুটা অনুশোচনা স্পষ্ট। হাতের প্লেটটা আরও কাছে নিয়ে শৈলীর মুখের সামনে ধরে রেখে বলল,
" বেশি ভাবিস না, খেয়ে নে। তাহলে খাবারো শেষ হবে, তুইও বকা খাবি না!"
শৈলী কিছুক্ষণ নীরব রইলো। নিশানের হাতে খাওয়ার মতো সৌভাগ্য কখনো আসবে কখনো ভাবেনি সে। এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু পাওয়ার লোভ ঘিরে ধরল তাকে। কিন্তু নিজেকে সংযত করে সে মিনমিন করে বলল,
" আমি নিজে খেতে পারব, নিশান ভাই! "
শৈলীর বলতে দেরি, নিশানের গরম চোখ করে তাকাতে একটুও দেরি হলো না। ভয়ংকর সেই চাহনি দেখে শৈলী মাথা নুইয়ে ফেলল। কোনো বাক্য ব্যয় না করে নিশানের হাতে থাকা ভাতাটুকু মুখে পুরে নিল। মাথা নিচু রেখেই আস্তে আস্তে চিবোতে থাকলো। নিশান তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে আবারো ভাত মাখাতে মন দিল।
চলবে...…....…
★ পরবর্তী পর্ব পরশুদির আসবে ইনশাআল্লাহ 🥹❤️
পরীক্ষা চলছে তো...🥲
পর্ব আসবে ইনশাআল্লাহ ❤️ আর ছোট পর্বের জন্যও খুব দুঃখীত🤧