ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের লালনছোঁয়া

১৩তম পর্ব

লেখক: অনামিকা তাহসিন রোজা

#প্রেমের_লালনছোঁয়া

#পর্ব_১৩

#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই একটা আকস্মিক চ/ড় পড়ল মিমির গালে। আচমকা এমন আ/ঘা/তে বিস্ফোরিত নয়নে সামনের ব্যক্তির দিকে তাকালো সে। মুখ দিয়ে অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে এলো," রি..মি!" একটা চ/ড় দেয়ার পর রিমি তবুও থামলো না, দ্বিতীয় বারের মতো আবারো চ/ড় মারল নিজের বোনের গায়ে। আজ পর্যন্ত কখনোই তাদের মধ্যে বিরাট ঝগড়া লাগেনি, সেখানে নিজের জমজ বোনের হাতে এই প্রথম থাপ্পড় খেয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় মিমি। আ/ঘাত পাওয়া লাল হয়ে যাওয়া গালে হাত রেখে হতবাক হয়ে বলে,

" তুই আমার মা/রলি রিমি?"

রিমির দুচোখ অশ্রুতে টলমল করছে। তারা দুজন জমজ হলেও রিমি মিমির থেকে পাঁচ মিনিটের বড়। এমন কি তাদের বাবা মা/রা যাওয়ার পর মিমি সবচেয়ে বেশি ভেঙ্গে পড়লে, রিমি তাকে আগলে নেয়। সমবয়সী সম্পর্ক টা পাশে রেখে বড় বোনের মতোই নিজের জমজ বোনটাকে আগলে ধরে। সেখানে আজ সেই বোনের গায়ে হাত তুলে তারও নিশ্চয়ই খুব একটা ভালো লাগছে না!

একটু আগে নিশান নিজের গাড়িতে করে রিমিকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে গেল। তবে বাড়ি ফেরার পথে রিমি যখন চিন্তিত মুখে গাড়ির জানালায় মাথা এলিয়ে দিয়ে ছিল। তখন নিশান বলে উঠলো,

" তুই খুব বুদ্ধিমতি রিমি। আমি জানি, বয়স কম হওয়ার পরেও তুই, শৈলী আর মিমের থেকে অনেক বেশি ম্যাচিউরড! তাই আমি আশা করব, বাড়িতে গিয়ে যেন মিমির সাথে আমার কথা বলতে না হয়। মিমি মামনি কে কী বলেছে, আমি জানিনা। আমার অগোচরে কী হয়েছে, আমি কিছুই জানি না। জানার ইচ্ছেও নেই। এখন এই বিষয়টা আমি তোর ওপর ছেড়ে দিলাম। যেটা তোর ভালো মনে হয় সেটা কর। আমি কোনো অযাচিত কিছু শুনতে চাই না!"

নিশানের কথার ইঙ্গিত ধরতে পারল রিমি। তাই চুপ করে মাথা নিচু করল। গাড়ির স্টিয়ারিং শক্ত হাতে ধরে নিশান আবারো বলল,

" তোদের বয়সটা আমি পার করে এসেছি। মিমি আবেগের বয়সে যেকোনো কিছু করতেই পারে। ওর হাবভাব আগেই বুঝেছি আমি। চুপ ছিলাম। ভেবেছিলাম সাহস পাবেনা...। মামনির উচিত এগুলোতে আস্কারা না দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া। আশা করি বুঝতে পারছিস। "

রিমি উপরনিচ মাথা নাড়াল। নিশানের এ কথার অর্থ হল রিমি যেন বাড়িতে গিয়ে মিমি এবং রাশেদা তালুকদারের সাথে সরাসরি কথা বলে।

নিশান আবারো বলে,

" আর আমি এটা নিশ্চিত করে তোকে বলে দিচ্ছি, শৈলী মোটেই নিজের ইচ্ছায় বাড়ি ছেড়ে যায়নি। তবে কেনো বাড়ি ছেড়ে গিয়েছে সেটা আন্দাজ করতে না পারলেও, কোথায় গেছে, সেটা আমি আন্দাজ করতে পারছি। তুই বাড়ির বিষয়টা সামলা, আমি আগামী তিন-চার দিন বাড়িতে আসবো না। "

~~

ঘটমান অতীত টা থেকে ফিরে এসে রিমি শক্ত হাতে মিমিকে ধাক্কা মেরে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা আটকে দিল। সতর্কতার দৃষ্টি ফেলে ছিটকিনি টাও লাগাল। মিমি এখনো বাকরুদ্ধ। রিমি কেনো হঠাৎ তার গায়ে হাত তুলল, কেনো হঠাৎ এরকম অদ্ভুত আচরণ করছে, সেটা তার মাথায় ঢুকছেনা। রিমি এবার মিমির বাহু সজোরে আকড়ে ধরল, ঢোক গিলে সরাসরি প্রশ্ন করল,

-" তুই মা কে কী বলেছিস?"

মিমি সেভাবেই উত্তর দিল,

-" কী বলেছি?"

-"সেটাই জিজ্ঞেস করছি আমি। কী বলেছিস তুই মা কে?"

-"আজব তো! রিমি তোর মাথা কি গেছে? আমি মা কে কী বলব? কীসের কথা বলছিস তুই? খোলাখুলি বল তো!"

রিমি এবার চোখ বুঁজে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চাপা কন্ঠে বলল,

" নিশান ভাই এর বিষয়ে... কী বলেছিস?"

মিমি এবার ভ্রু কুঁচকে তাকাল। নিশান ভাই এর ব্যাপার টা রিমি কীভাবে জানল সেটাই ভাবতে ব্যস্ত হলো যেন। রিমি আবারো তাড়া দিল,

" যা জিজ্ঞেস করেছি, তার উত্তর দে। "

মিমি এবার নিজের বাহু থেকে রিমির হাত সরিয়ে নিল। এরপরে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

" আমি তোকে আগেই বলতাম। কিন্তু প্রথমে মাকে বলে নিশ্চিত হয়ে তোকে বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।"

রিমি এবার কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকালো মিমির দিকে। মনে মনে বারবার করে চাইল যাতে অফিসে আকাশ নামক সেই লোকটার বলা কথাটা সত্যি না হয়। যেন তাকে নিজের বোনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করতে না হয়। কিন্তু রিমির প্রার্থনা যেন কবুল হলো না। তাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে মিমি সামান্য হেসে লাজুক কণ্ঠে বলে উঠলো,

" আমি...আমি আসলে নিশান ভাইকে ভালোবাসি। বিয়ে করতে চাই উনাকে।"

চোখজোড়া স্থির হলো রিমির। মিমি আবারো বলল,

" কিন্তু তোকে তো আমি এগুলো বলিনি! মাকেও বলেছি যাতে তোকে না বলে। তোকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। আগেভাগে এসব কথা কে বলল তোকে?"

রিমি যেন নিজের কানে বিশ্বাস করতে পারল না। এক বড়সড় বাজ ভেঙে পড়লো তার মাথায়। এতক্ষণ ধরে সে যে আশঙ্কা করছিল, সেটাই সত্যি! মিমি সত্যিই নিশানকে ভালোবাসে এবং তাকে বিয়ে করতে চায়! কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে থাকার পর রিমি ফিসফিস করে বলল,

" তুই....সত্যি বলছিস?"

মিমি একগাল লাজুক হাসি দিয়ে বলল,

"হুমম। কিন্তু তাই বলে তুই আমাকে মা/রবি। আমি তো তোকে বলতাম রে বোইন... সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য আগে বলিনি!"

রিমির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। নিশানের গাড়িতে বসে সে যা ভেবেছিল, এখন সেই চিন্তাগুলো আরও বেশি জট পাকিয়ে গেল। মিমির কথা পাত্তা না দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে রিমি গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

" তুই এসব মা কেও বলেছিস? "

-"হ্যাঁ, মা' ই তো প্রথম জানে।"

" কী বলেছে মা?"

জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে বলে উঠলো রিমি।

মিমি এবার নিজের জর্জেট ওড়নাটা আঙুলে পেঁচিয়ে মুখ নামিয়ে বলল,

" মা অনেক খুশি হয়েছে, আর জানিস আমাকে কথা দিয়েছে যে নিশান ভাই আমারই হবে। "

" মা রাজি হয়েছে?" হতবাক গলাতে বলল রিমি।

" হুম, মা তো রাজি হয়েছেই আর নিশান ভাইয়ের সাথেও নাকি আজকে কথা বলবে। এখন শুধু দোয়া কর যাতে নিশান ভাই রাজি হয়ে যায়! উফ! কী যে খুশি লাগছে রে রিমি!"

এই প্রথম! হয়তো এই প্রথম, রিমি তার বোনের খুশিতে খুশি হতে পারল না। বিষাদে ডুবে আঁধার নেমে আসলো ফর্সা মুখটায়। একটা শুকনো ঢোক গিলল রিমি। বাড়িতে যে কত বড় অশান্তি আসতে চলেছে সেটা ভেবেই মাথা গরম হয়ে উঠলো তার। অফিসে নিশানের হাবভাব দেখে রিমির এটুকু বুঝতে দেরি নেই যে নিশান এই বিষয়টা নিয়ে খুবই বিরক্ত এবং কোনোভাবেই নিশান মিমিকে বোনের নজরে ছাড়া আর কোনো নজরে দেখেনা। তাই রাশিদা তালুকদার যদি ভুল করেও নিশানের সামনে বিয়ের কথা তুলে, তাহলে নিশান তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়েই ছাড়বে! এ বিষয়ে আসলেই কোনো সন্দেহ নেই। রিমি এবার মনে মনে বিড়বিড় করে আওড়ালো,

" ভাগ্যিস, বিয়ের কথাটা নিশান ভাই এখনো জানে না!"

মিমি রিমির হাত ধরে আবারো বলল,

" আমার তো ভাবতেও খুব ভালো লাগছে জানিস। অবশেষে আমার এতদিনের পছন্দের মানুষটাকে আমি নিজের করে পাবো। আমি তো ভাবতেই পারিনি যে মা রাজি হবে। এখন খুব বেশি খুশি লাগছে!"

রিমি এবার রাগ সামলাতে পারল না। এক ধাক্কায় মিমির হাত সরিয়ে দিল

" সাট আপ, মিমি। আর একটা বাজে কথা বলিস না প্লিজ। তুই কি একটা বাচ্চা? বড় হোসনি তুই? সেন্স টুকু নেই? তুই কি জানিস, তুই একটা নিব্বির মতো আচরণ করছিস! তুই কী ভেবে এসব করলি, মিমি? তোর কি একবারও মনে হলো না, নিশান ভাই এসব জানে কিনা? তোর মনে হলো না, তোর আবেগের কারণে বাড়ির সবাইকে কতটা ঝামেলায় ফেলতে পারিস? আর ইউ ক্রেজি?"

মিমি এবার হতভম্ব হয়ে গেল,

" ঝামেলা? রিমি, তুই কেনো এত রাগ করছিস? আর কী বলছিস এসব? আমি তো কাউকে বিপদে ফেলিনি! আমি মাকে শুধু বলেছি যে আমি নিশান ভাইকে পছন্দ করি, ওনার সঙ্গে বিয়ে হলে আমি খুশি হবো। ব্যস এটুকুই! এখানে বিপদ, ঝামেলা, অশান্তি- এসব আসার কারণটা কী?"

রিমি এবার হতাশভাবে মাথা নাড়ল,

"তোর মাথায় কি একবারও আসেনি, নিশান ভাই কখনো তোর ব্যাপারে এভাবে আদৌও ভেবেছে কিনা? তিনি জানেনও না তুই এইরকম কিছু করেছিস! "

মিমি এবার একটু অস্বস্তিতে পড়ল,

" আমার মনে হয়, উনি বুঝতে পারেন। আমি তো কখনো উনাকে কিছু বলিনি, কিন্তু,,,, এমনও তো হতে পারে যে উনি আমাকে ভালোবাসে, অথচ বলতে পারে..

রিমি তখনই হাত তুলে থামিয়ে দিল তাকে। চোখেমুখে ঝলসে ওঠা ক্রোধ নিয়ে বলল,

" নিশান ভাই যদি বুঝতে পারতেন, তার যদি কোনো ফিলিংস থাকতো, তাহলে কি আজ আমাকে দায়িত্ব দিয়ে যেতেন? তুই জানিস না, আজ উনি আমাকে কী বলেছে!"

মিমি এবার একটু শঙ্কিত হলো,

" কি বলেছে?"

রিমি গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

" উনি তোকে নিয়ে কোনো কথা বলতে চান না, মিমি! তোর কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি নেই। তিনি এটা স্পষ্ট করে দিয়ে গেছেন যে, বাড়ির বিষয়টা আমার হাতে। মানে তুই বুঝতে পারছিস, নিশান ভাই ইন্ডিরেক্টলি আমাকে কী বলে গিয়েছে? ইউ নো হোয়াট মিমি, আমার এখন মনে হচ্ছে তুই একটা ছ্যাঁচড়া মেয়ে হয়ে গিয়েছিস। আমি কখনো ভাবতেও পারিনি যে আমার বোন এরকম ছ্যাঁচড়ামি করবে!"

মিমির মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। রিমির কথাগুলো যেন ওর শরীরের সমস্ত শক্তি শুষে নিল। নিশান ভাই তাকে নিয়ে কোনো কথাই বলতে চান না? বাড়ির ব্যাপারটা রিমির হাতে ছেড়ে দিয়েছেন? মিমি নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল, চোখের কোনায় জল চিকচিক করছে। ফিসফিস করে বলল,

"তুই... তুই এমন কথা কীভাবে বললি, রিমি? আমি তোর বোন...আর তুই আমাকে ছ্যাঁচড়া বলছিস?"

রিমি ততক্ষণে হাতের মুঠোয় নিজের রাগ চেপে ধরে ফেলেছে। তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,

"কারণ তুই নিজের আবেগের দাসী হয়ে গেছিস, মিমি! নিজের সম্মান, নিজের আত্মসম্মান সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে তুই এমন একটা ছেলেকে নিজের করে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছিস, যে তোকে নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবেনি! তুই কি বুঝতে পারছিস, তুই কত বড় ভুল করে ফেলেছিস? আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, নিশান ভাই আমাদের বড় ভাই। তুই কোন হিসেবে উনাকে ওসব নজরে দেখতে গিয়েছিলি?"

মিমি এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল,

" আমি কী দোষ করলাম, রিমি? আমি কি কাউকে ভালোবাসতে পারি না? আশ্চর্য, যেখানে মাও আপত্তি করল না,,,সেখানে তুই...!"

রিমির চোখে এবার কেবল হতাশা, রাগ দেখা গেল নাম গলা একটু নরম করল সে,

-"ভালোবাসা দোষ নয়, মিমি। কিন্তু একতরফা ভালোবাসার জন্য নিজের পরিবারকে বিপদে ফেলা, নিজের আত্মসম্মান ভুলে যাওয়া...এটা কি ঠিক? নিশান ভাই যদি তোকে ভালোবাসত, তাহলে সে নিজে এসে তোর পাশে দাঁড়াত। কিন্তু সে তো কিছুই করেনি! উল্টো বাড়ির বিষয়টা আমার হাতে দিয়ে গেছে, যাতে আমি তোকে বুঝিয়ে বলি!"

মিমির কান্না থামছে না, নীরবেই চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে থাকলো। সে মোটেই আবেগের বশে নিশানকে ভালোবাসেনি। মন থেকেই ভালোবেসেছিল। বয়স কম বলে কি তার ভালোবাসার মূল্য নেই! অঝোরে চোখের পানি ঝরিয়ে রিমি যেন বোঝাতে চাইল, সে সত্যিই ভেবেছিল, নিশান ভাই হয়তো তাকেও পছন্দ করে! নাহলে তার দিকে এত ভালোভাবে তাকাতো কেনো? কেন এত যত্ন নিত? কেনো নিজ থেকে কলেজে দিয়ে আসত? কেনো এসএসসি'র রেজাল্টে এত খুশি হয়েছিল? কেনো এত আগলে রাখতো? শুধু বড় ভাইয়ের কর্তব্য পালনেই?

রিমি এবার চোখ সরু করল, ক্লান্ত গলায় বলল,

" মিমি, বোন আমার, তুই না অনেক বুঝদার? তাহলে এত বড় ব্যাপারটা বুঝতে পারলি না যে, নিশান ভাই তোর দিকে স্নেহের চোখে তাকাত! পছন্দের নয়! সে তোকে একটা ছোট বোনের মতোই দেখেছে, মিমি। আর তুই সেটা প্রেম ভাবতে গিয়ে নিজের মান-সম্মান সব ভুলে বসে আছিস!"

মিমি নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে উঠল। মনে হচ্ছে, তার ভিতরটা একবারে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। রিমি এবার মিমির হাত শক্ত করে ধরল,

" তুই এখনো সময় থাকতে সামলে নে, মিমি। নয়তো নিজের ভুলের শাস্তি নিজেকেই পেতে হবে! "

মিমির মুখ শুকিয়ে গেল। এতক্ষণ পর্যন্ত সে ভাবছিল, নিশান হয়তো একটু হেসে বলবে, "তাই নাকি, মিমি? তুই আমাকে পছন্দ করিস? আমিও তোকে পছন্দ করি!" এমন কিছু একটা হবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, পুরো ব্যাপারটাই তার ভুল বোঝাবুঝি ছিল।

মিমি আস্তে করে ফিসফিস করে বলল,

"নিশান ভাই কি...আমার কথা শুনলেই রাগ করবে?"

রিমির চোখে এবার করুণা ফুটে উঠল। সে মিমির কাছে এসে আস্তে করে বলল,

"তুই ওনাকে চাস, সেটা আমি বিচার করতে চাই না। কিন্তু মিমি, কারও অনুভূতি জোর করে পাওয়া যায় না।"

মিমির চোখে আবারো পানি এসে গেল,

"আমি তো ওনাকে জোর করিনি...."

রিমি এবার একটুখানি মৃদু হাসল।

"কিন্তু তোকে না জানিয়েই ওনার ওপর এত বড় একটা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছিস। এটা কি ঠিক হলো?"

মিমি চুপ করে গেল। মনে হলো, সে এবার সত্যিই বুঝতে পারছে, তার আবেগ হয়তো তার ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। সে চোখের পানি মুছে ধীর গলায় বলল,

"তাহলে কি আমি ওনাকে কিছুই বলতে পারব না?"

রিমি এবার গভীর চোখে তাকিয়ে বলল,

"তুই যদি ওনাকে ভালোবাসতেই থাকিস, তাহলে একটা সময় পরে তোর উত্তর নিজেই পেয়ে যাবি। তুই কি ওনাকে ভালোবাসিস, নাকি শুধু নিজের কল্পনায় ওনাকে চেয়েছিস... সেটাও তখন পরিষ্কার হয়ে যাবে।"

মিমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। রিমির কথাগুলো তার মনে গেঁথে যাচ্ছে। এবার সত্যিই যেন মনে হলো, সে কিছু ভুল করেছে......

রিমি এবার লম্বা শ্বাস ফেলে বলল,

" আর সবচেয়ে বড় কথা...তুই বড় মামি কে চিনিস না? মামি তো আমাদেরকে দু চোখে সহ্যই করতে পারে না। সেখানে তুই ভাবলি কী করে যে উনি নিজের ছেলের বউ হিসেবে, তোকে মেনে নেবে? এটাও তো একটা বোকামি!"

মিমি এবার তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে বলল,

" একটু ভুল হলো রিমি...তোর এই ধারনা টা মিলল না যে!"

" মানে?"

বেশ অবাক হলো রিমি।

মিমি এবার রিমির চোখের দিকে তাকিয়ে বিষাদের হাসি হেসে বলল,

" বড় মামি তো রাজি হয়েছে....!"

" কীহহহহহহহ?????"

আবারো মাথায় বাজ পড়ল রিমির।

" মানে টা কী? বড় মামি রাজি মানে? মানে তোকে এ বাড়ির বউ করতে উনার কোনো সমস্যা নেই? এটা কি সত্যি? কী বলছিস তুই?"

মিমি এবার অন্যদিকে তাকিয়ে বলে,

" হুম সত্যি! "

রিমি যেন মানতেই পারল না,

" কিন্তু কীভাবে? এটা কীভাবে সম্ভব?"

মিমি এবার একটা শুকনো ঢোক গিলে। আশেপাশে তাকিয়ে ইতস্তত করে বলে,

" তুই যদি কয়েক ঘন্টা আগে আসতি,,,তাহলে বিষয়টা এত দূর এগোতো না। আমি এসব এখানেই থামিয়ে দিতাম। যেই মানুষটা আমাকে ঘৃনা করে, তাকে পাওয়ার জন্য এমন পাগলামি করতাম না। কিন্তু তুই অনেক দেরি করে এসে আমায় কথাগুলো জানালি....! "

রিমি মিমির কোনো কথা বুঝতে পারল না। মিমিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে সে গম্ভীর হয়ে বলল,

" পরিষ্কার করে বল মিমি। কী হয়েছে?"

মিমি এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কয়েকঘন্টার আগের ঘটনা বলতে শুরু করল,

" তুই যখন নিশান ভাইয়ের অফিসে গিয়েছিলি, তখন মা বড় মামার রুমে গিয়েছিল আর বড় মামাকে সরাসরি প্রস্তাব দিয়েছে, মানে নিশান ভাইয়ের সাথে আমার বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। আমি জানিনা ভেতরে কি হয়েছে, কিন্তু দরজার আড়াল থেকে শুনেছি.. প্রথম প্রথম বড় মামা রাজি না হলেও কি একটা ঘটনার জন্য... মা কি একটা বলল, আমি ভালো করে শুনতে পাইনি। কিন্তু কিছুক্ষণ পর মামা রাজি হয়ে গেল। আর তখুনি আগামী মাসে নিশান ভাইয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলল। মা বলেছিল নিশান ভাইয়ের মতামত ছাড়া এখনই বিয়ে ঠিক না করতে। কিন্তু বড় মামা বলল যে নিশান ভাই নাকি বড় মামার কথার বাইরে যাবে না। তাই তখনই ওরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। আসলে মা খুব ভালো করেই জানতো যদি বড় মামিকে আগে বলা হয়, তাহলে বড় মামি মোটেই রাজি হবে না বরং আমাদেরকে কথা শোনাবে। এইজন্য মা প্রথমে মামার কাছে গিয়েছে। আর মামাও নাকি আমাদের দুজনের মধ্যে, মানে আমাদের দুই বোনের মধ্যে যেকোনো একজনের সাথে নিশান ভাইয়ের বিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। আর যখন মামা শুনলো যে আমি নিশান ভাই কে পছন্দ করি এবং নিশান ভাইও হয়তো আমাকে পছন্দ করে, তখন বড় মামা রাজি হয়ে গেল। আর বড় মামি যখন আপত্তি করতে আসলো, তখন বড় মামা ধমক দিয়ে দিল, মানে বড় মামার জোর জবরদস্তির কারণে বড় মামি রাজি হয়েছে!"

রিমি স্তব্ধ হয়ে গেল। মাথাটা যেন ঝিমঝিম করছে। এত কিছু ঘটে গেল, অথচ সে কিছুই জানত না? সে কিছুক্ষণ মিমির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল, যেন যাচাই করতে চাইছে, সত্যিই এসব ঘটেছে কিনা। তারপর ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল,

"তুই...তুই কি বুঝতে পারছিস, কী বলছিস?"

মিমি হালকা হাসল, তবে সেই হাসিতে ছিল একধরনের শূন্যতা।

"হ্যাঁ, বুঝতে পারছি। নিশান ভাই আর আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, রিমি। এটা এখন থামানোর কিছু নেই। এখন থামাতে গেলে আরো অশান্তি হবে।"

রিমি হতভম্ব হয়ে কপালে হাত রাখল,

"কিন্তু... নিশান ভাই তো এখনো জানে না, তাই না?"

মিমি চোখ নামিয়ে আনল,

"না, এখনো না।"

রিমির হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল,

" হোয়াট দ্য হেল ভাই? মানে, নিশান ভাইয়ের মতামত না নিয়েই বিয়ের দিন পর্যন্ত ঠিক করে ফেলেছে? এটা তো জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে! তোর মনে হয়, নিশান ভাইয়ের মতো মানুষ এগুলো মানবে?"

মিমি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে তো নিজেই এখন স্তব্ধ হয়ে আছে। একটু আগ পর্যন্ত তার মধ্যে থাকা আনন্দটা ধুলোয় মিশে গিয়েছে ক্ষনিকের মধ্যেই।

"নিশান ভাই বড় মামার কথা ফেলবে না, এটা সবাই জানে। তাই তারা ধরে নিয়েছে, উনি রাজি হবেন। "

রিমি হতাশ হয়ে বলল,

"এভাবে একটা সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় না, মিমি! তুই নিজেও জানিস, নিশান ভাই তোর প্রতি কোনো ভালোবাসা বা হোয়াটএভার,,,ওরকম কিছু অনুভূতি পোষণ করেন না! কেবল বড় মামার ইচ্ছায় বিয়ে করলে সেটা কি সুখের হবে?"

মিমি এবার চোখ বন্ধ করল, যেন সব অনুভূতি থেকে নিজেকে আলাদা করতে চাইছে,

"জানি না, রিমি। কিন্তু আমি আর কিছু ভাবতে চাই না। আমি শুধু চাই, নিশান ভাই আমাকে অন্তত একটা সুযোগ....! "

মিমি চোখ খিঁচে বন্ধ করল। নির্লজ্জ বেহায়া মনটা যে মানছে না! নিশান তাকে একদম পছন্দ করে না, এটা জানার পরেও তার অবাধ্য মনটা চাইছে, নিশানকে নিজের করে পেতে।

রিমি হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। সে জানে, এভাবে চাপিয়ে দেওয়া একটা সম্পর্ক কখনোই ভালো হতে পারে না। নিশান যদি রাজি হয়েও যায়, তবুও এই বিয়েতে সত্যিকারের ভালোবাসা থাকবে তো? নাকি এটা কেবল পরিস্থিতির কাছে হার মেনে নেওয়া হবে? নিশান ভাই সবকিছু তছনছ করে দেবে!

রিমি গভীর দৃষ্টিতে তাকাল মিমির দিকে। শেষবারের মতো একটা প্রশ্ন করল,

"তুই কি সত্যিই মনে করিস, নিশান ভাই তোকে ভালোবাসে বা বাসবে?"

মিমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আস্তে করে বলল,

" আমি চাই উনি ভালোবাসুক....আর সেটা যদি সত্যি না হয়, তাহলে.....!"

কথাটা মাঝপথেই থেমে গেল। মিমির চোখে যেন একরাশ দুঃখ খেলা করছে। সে নিজেই জানে না, এই সিদ্ধান্তের শেষ কোথায়...

রিমি বিরক্তির শ্বাস ফেলে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে আসলো। একটু থেমে পিছনে না ঘুরেই শক্ত কণ্ঠে বলতে থাকলো,

" একটা কথা শুনে রাখ মিমি। আমি যদি ভুল না করি, আমার যদি ভুল না হয়, তাহলে নিশান ভাই কখনোই এই বিয়ে করবে না। কারণ নিশান ভাইয়ের মত মানুষ কখনই বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে না। তিনি স্বাধীন। হয়তো বাড়িতে অশান্তি করে তিনি বাড়ি থেকেই বেরিয়ে যাবেন, কিন্তু তবুও তোকে বিয়ে করবে না। স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দে মিমি। এখন তুই প্রশ্ন করতে পারিস, তোর মধ্যে এমন কি কমতি আছে যে নিশান ভাই তোকে বিয়ে করতে চাইবে না। তোর মধ্যে কোনো কমতি নেই মিমি। তবে আমার সিক্স সেন্স যদি খারাপ না হয়.... আমি যদি খুব একটা ভুল না করি... হয়তো নিশান ভাই ইতিমধ্যেই নিজের পাথরের ন্যায় মনটা অন্য কারো জিম্মায় ছেড়ে দিয়েছে অথবা তাকে হয়তো কোনো রমণী নীরবে ঘায়েল করতে পেরেছে। যা আজও সবার অজানা!"

কথাগুলো বলেই দরজার ছিটকিনি খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল রিমি, আর মিমি নিঃসঙ্গভাবে ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইল,,,,,তার স্বপ্নগুলোর মৃত্যু হতে দেখছে সে, অথচ কিছুই করতে পারছে না....

~~~~★

বাড়ির ভেতর টা সবকিছুই একটু বেখাপ্পা, একটু এলোমেলো হয়ে আছে। ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই মনে হবে, যেন কেউ একসঙ্গে অনেক কিছু গুছিয়ে রাখতে চেয়েও শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়েছে। টেবিলের ওপর রাখা বইগুলো এক পাশে কাত হয়ে আছে, কিছু পুরোনো ম্যাগাজিন আর খবরের কাগজও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। কর্নারের শো-পিসগুলো কেউ সরিয়েছে, যেন কোথাও রাখার পর ভুলে গেছে ফেরত দিতে।

ঘরের মাঝখানে রাখা কাঁচের সেন্টার টেবিলটায় জলের বোতল, কিছু কফির কাপে শুকিয়ে যাওয়া দাগ, আর একটা রিমোট রাখা। পাশের সোফার এককোণে একটা মোচড়ানো কম্বল অযত্নে পড়ে আছে, যেন কেউ শুয়ে উঠে আর ঠিক করতে ভুলে গেছে। আর ঠিক সেই সোফাতেই আধশোয়া হয়ে পড়ে আছে নিশান। একদম নির্বিকার ভঙ্গি তার। একহাতে সোফার হাতল ধরে আছে, অন্য হাতে রিমোট টিপছে অন্যমনস্কভাবে। তার চোখ টিভির পর্দায়, কিন্তু মন সেখানে নেই বলেই মনে হয়। খোলা শার্টের বোতাম দুটো একটু এলোমেলো, পায়ের নিচে একটা কুশন কোনদিকে গড়িয়ে পড়েছে। ঘরের হাল যেমন অগোছালো, নিশানের অবস্থাও যেন তেমনই। ভাবা যায়, সবসময় পরিপাটি হয়ে থাকা নিশান এমন উদ্ভট হয়ে আছে কেনো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই ক্লান্ত হয়ে মাথায় হাত রেখে নিশানের দিকে আহাম্মক মনে তাকিয়ে রয়েছে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি। বোঝাই যাচ্ছে, সে নিশানের কাছে খুব একটা পাত্তা পাচ্ছে না!

অনেকক্ষন টিভি দেখার পর খুব বোর ফিল করল নিশান। তাই একটা হাই তুলে টিভি টা অফ করল। পায়ের কাছে থাকা কুশন টা এক লাথি মারল, তৎক্ষনাৎ অপর অজ্ঞাত ব্যাক্তির মাথায় এসে লাগল সেটা। নিশান এবার উঠে দাঁড়িয়ে একটু হাত পা নাড়িয়ে ব্যায়াম করল। আগন্তুক চোখ পিটপিট করে নিশানের দিকে তাকিয়ে সেও উঠে গেল। নিশান এবার অজ্ঞাত ব্যাক্তি টাকে পাত্তা না দিয়ে তাকে অতিক্রম করে পকেটে হাত গুঁজে রান্না ঘরে এগিয়ে যেতে থাকলো। সেই ব্যক্তিও হা করে তার পিছু পিছু যেতে থাকল। নিশান প্রথমে গ্লাসে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে ঢকঢক করে খেল। এরপর আবারো সেই আগন্তুক কে ধাক্কা দিয়ে সাইড করে ফ্রিজের দিকে গেল। ফ্রিজ খুলে আশাপাশে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজলো যেন। তারপর মুচকি হেসে সারি সারি সাজানো লাল আপেল গুলোর মধ্য থেকে টুপ করে একটা আপেল তুলে কাঁমড় বসালো, মাথা নেড়ে বোঝালো যে বেশ মিষ্টি আছে! আরেক হাতে আরেকটা আপেল নিয়ে ফ্রিজ বন্ধ করে আরাম করে আপেলটা কাঁমড় বসিয়ে খেতে লাগল নিশান। আর অজ্ঞাত সেই ব্যাক্তি হা করে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখতেই লাগলো।

সব ঠিক ছিল। এই পর্যন্ত সবই ঠিক আছে। কিন্তু সমস্যা হলো, যেই বাড়িটাকে নিশান এতক্ষন ধরে নিজের টয়লেট টিস্যু ভেবে নিজের মতো করে ইউজ করছে, সেই বাড়িটা নিশানের নয়। বরং সে বাড়ির মালিককে পাত্তা না দিয়ে নিজের মতো করে টিভি দেখছে, খাচ্ছে, ঘুমোচ্ছে। এটা হলো সেই অজ্ঞাত আগন্তুকের বাড়ি। হ্যাঁ! এটা আকাশের বাড়ি!

আকাশ এতক্ষণ হাঁ করে যা দেখছিল, সেটা যে বাস্তবে ঘটছে, তা বিশ্বাস করতে বেশ সময় লাগল। এইটা কী হচ্ছে আসলে? নিজের বাড়িতেই সে এখন দর্শক, আর অতিথি হয়ে বসে আছে নিশান! সে এখনো নিশানের অভিব্যক্তি ধরতে পারল না। ছেলেটা কি শৈলীকে খুঁজে না পেয়ে পাগল হয়ে গেল?

নিশানের অফিস থেকে ফিরে এসে একটু আগেই গোসলে ঢুকেছিল আকাশ। গোসল থেকে বের হয়েই তার মাথায় এক ঝলক বাজ পড়ে। সে দেখে তার একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড নিশান নির্বিকার ভঙ্গিতে ড্রেস চেঞ্জ করছে। কিন্তু হঠাৎ করে নিশান কে নিজের বাড়িতে দেখে ভয়ানক অবাক হওয়া নয়নে তাকিয়ে থাকে আকাশ। যখন হতবাক হয়ে সে নিশানকে জিজ্ঞেস করে, "তুই এখানে কেন?" তখন নিশান পাত্তা দেয় না। নিজের মতো করে কাপড় চেঞ্জ করে মুখ হাত ধুয়ে ফেলে, এরপরে টিভি দেখতে শুরু করে। আর এরপর যা হওয়ার তা তো হলোই। আকাশ নিজেই এখন কনফিউশানে আছে যে এই বাড়িটা কার। নিজের বাড়িতে নিজেই অবহেলিত আকাশ।

এক নাম্বার প্রশ্ন, নিশান এই মুহূর্তে আকাশের বাড়িতে কী করছে?

দুই নাম্বার প্রশ্ন, সে আকাশের বাড়িতে কেনোইবা এসেছে?

তিন নাম্বার প্রশ্ন, আসার পর থেকে আকাশের সাথে একটা কথাও না বলে নিশান নিজের মতো করে কাজ করে যাচ্ছে যেন এটা নিশানের নিজেরই বাড়ি। এর কারন কী? দেখে মনে হচ্ছে এটা নিশানেরই বাড়ি আর আকাশ ভুল করে এখানে চলে এসেছে।

চতুর্থ প্রশ্ন, আকাশ কি অদৃশ্য হয়ে রয়েছে? নিশান তাকে পাত্তা দিচ্ছে না কেনো?

পঞ্চম প্রশ্ন, আবারও সেই একই প্রশ্ন, নিজের বাড়ি থাকা সত্ত্বেও কেন নিশান আকাশের বাড়িতে এসে এরকম অদ্ভুত আচরণ করছে?

তখন থেকে এতগুলো প্রশ্ন করেছে আকাশ। আল্লাহর ওয়াস্তে একটা প্রশ্নেরও জবাব পাইনি সে। আকাশের এখন প্রচুর সন্দেহ হচ্ছে সে কি জীবিত আছে নাকি মৃত আছে! তাকে দেখতে পাচ্ছে না কেনো নিশান। সে যেন নিশানের চোখে অদৃশ্য হয়ে রয়েছে!

নিশান নির্বিকারভাবে আপেল চিবিয়ে যাচ্ছে, যেন কিছুই হয়নি। আকাশ এবার আর সহ্য করতে পারল না।

"এই নিশান, তুই কি আমাকে দেখতে পাচ্ছিস না? এদিকে তাকা! ভাই, এটা কি হচ্ছে? এটা আমার বাড়ি তো?"

অবশেষে এতক্ষন পর নিশান ঠান্ডা ভঙ্গিতে তাকাল আকাশের দিকে। আকাশ এবার একটা সস্থির শ্বাস ফেলল, যাক সে জীবিত আছে! নিশান তাকে দেখতে পেয়েছে। নিশান একদম নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে, যেন এটাই স্বাভাবিক। এরপর আরো বেশি নির্বিকার ভঙ্গিতে পাল্টা প্রশ্ন করল,

" হুম, তো?"

" তো মানে? এটা আমার বাসা ভাই!"

" সো হোয়াট?"

" আবার সো হোয়াট মানে? এ নিশান! পাগল হলি নাকি? এটা আমার বাসা! তুই ঢুকলি কখন? কে তোকে ঢুকতে দিল? কেনো তুই আমার সোফায় শুয়ে টিভি দেখলি, আর এখন ফ্রিজ খালি করছিস?"

নিশান চোখ গোল করে তাকাল, যেন আকাশের কথা শুনে অবাক হয়ে গেছে।

" তুই এমন করছিস কেন? বন্ধুর বাড়ি মানে নিজের বাড়ি, তাই না? এত নিষ্ঠুর হয়ে গেছিস তুই?"

আকাশ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।

" ভাই, তুই আমার বাসায় ঢুকলি কীভাবে? দরজা তো বন্ধ ছিল!"

নিশান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার দিকে তাকাল।

"দরজা বন্ধ ছিল, কিন্তু জানালা তো ছিল! ওই দিয়ে এসেছি।"

আকাশের চোখ কপালে উঠে গেল।

"মানে! তুই আমার বাসার জানালা দিয়ে ঢুকেছিস? চোরের মতো?"

নিশান বিরক্ত হয়ে বলল,

"আজব তো! আরে ভাই, চোরের মতো কেনো? আমি তো শুধু জানালাটা খুলে ঢুকেছি। তোর বাসায় আসতে গেলে দরকার হলে ছাদ ফুঁড়েও ঢুকতে রাজি আছি। বন্ধুত্বে এত কষ্ট করা লাগে রে!"

আকাশ এবার চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠল।

" বন্ধুত্ব মানে এই না যে বাসায় না থাকলেও ঢুকে যা খুশি খাবে, ফ্রিজ খালি করবে, আর সোফায় লম্বা হয়ে শুয়ে থাকবে! তোর কী হয়েছে ভাই? বাড়ি যাস নি কেনো? বিশ্বাস কর, প্রথমে আমি তোকে দেখে মনে করেছিলাম, তুই হয়তো ভূত হয়ে এসেছিস!"

নিশান আবার এক কামড় দিল আপেলে।

" হুম ভালো, তুই থাকলে জিজ্ঞেস করতাম, তুই তো ছিলি না! এতদিন জানতাম, অতিথি ঈশ্বরের মতো, আর আজ আমাকে এভাবে কথা শোনাচ্ছিস? নাহ, সময় বদলে গেছে, মানুষও বদলে গেছে!"

আকাশ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। এ তো উল্টা তার দোষ হয়ে গেল!

" নিশান, ভাই আমার , প্লিজ তুই একটু লেবু পানি খা। তোরে কেও সিউর গাঁ'জা খাইয়েছে। ভাই তুই রান্নাঘর থেকে বের হ!"

নিশান একটু ভাবল, তারপর বলল,

" আচ্ছা, বের হবো, কিন্তু তার আগে ফ্রিজের শেষ আপেলটাও খেয়ে নেই, এইটাও তো আমার জন্যই রাখা, তাই না?"

আকাশ এবার সত্যি সত্যি মাথা ধরে বসে পড়ল। এদিকে নিশান মজা নিয়ে আরেকটা আপেল তুলে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল, যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে আকাশের হতভম্ব মুখটা দেখে মুচকি হেসে বলল,

" তোর ফ্রিজের আপেলগুলো বেশ মিষ্টি! রাতে আবার খাব!"

বলেই দরজা খুলে হাওয়া হয়ে গেল নিশান, আর আকাশ নিজের জীবনের সব সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন করা শুরু করল,

" নিশান পাগল হলো, নাকি আমি?"

আকাশ সত্যি সত্যিই এখন সন্দেহ করতে শুরু করেছে, এই দুনিয়া কি বাস্তব, নাকি সে কোনো আজব স্বপ্নের মধ্যে আটকে আছে? নিশান এঁটো আপেল ড্রয়িং রুমের টেবিলে রেখে বাথরুমে ঢোকে। এদিকে আকাশ ধপ করে সোফায় বসে পড়ে, নিশানের খালি প্লেটে পড়ে থাকা আপেলের আঁশটে গন্ধ তার নাকে আসতে থাকে। এই মুহূর্তে সে চিৎকার দিয়ে বলতে চায়,

"আল্লাহ, আমার জীবন এত দু:স্বপ্নময় কেন!"

ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে তার ছোট ভাই আদিব, হাতে একটা শপিং ব্যাগ। আসলে এই বাসায় আকাশ এবং তার ছোট ভাই আদিব থাকে, তাদের বাবা-মা আপাতত গ্রামে রয়েছে। আকাশের ছোট ভাই আদিব রিমি মিমির সাথেই সেম ব্যাচে পড়াশোনা করে।

আদিব ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ায়। তার চোখ প্রথমে আকাশের হতাশাগ্রস্ত মুখের দিকে, তারপর ফ্রিজের দিকে, যেটা নিশানের আক্রমণের শিকার হয়ে এখন প্রায় শূন্য।

"ভাই, বাসায় ডাকাত পড়েছিল নাকি?"

আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ে।

" ডাকাত না, নিশান পড়েছিল।"

আদিব হতভম্ব হয়ে ফ্রিজের দিকে ছুটে যায়।

" নিশান ভাই? ওহ নো! আমার কেক! আমার চকোলেট! আমার...."

আকাশ বিরক্ত হয়ে বলল,

" হ্যাঁ, সব তোর প্রিয় নিশান ভাই সাবাড় করে গেছে! আমি আর পারছি না। তুই গিয়ে তাকে কনভিন্স কর, বল যে আমি আস্তে আস্তে পাগল হয়ে যাচ্ছি!"

আদিব মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে।

" উফ যাক! নিশান ভাইকে আমি এমনি এমনি ভালোবাসি না। আমার খাবারে স্পর্শও করেনি। তোমার ভাগের খাবারগুলো খেয়ে ফেলেছে। সাবাস নিশান ভাই, সাবাস। কিন্তু এখন প্রবলেম হলো, তুমি তো আসল কথা এখনো জানোই না ভাই....!"

আকাশ কপাল কুঁচকে তাকায়।

" কী জানি না?"

আদিব গলা নামিয়ে দুষ্টু হেসে বলল,

" নিশান ভাই নাকি তিন-চার দিন বাসায় ফিরবে না। রিমি আমাকে বলল। মানে ভাই,তুমি বুঝতে পারছো? নিশান ভাই হয়তো আগামী তিন দিন আমাদের বাসাতেই থাকবে! কি মজা!"

আকাশ নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। তারপর রান্নাঘর থেকে একটা গ্লাসে পানি নিল, ঢকঢক করে খেল, এবং চোখ বন্ধ করল। কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে শান্ত গলায় বলল,

"আদিব, আজ রাতেই আমি পালাচ্ছি। তুই আমার জন্য একটা বাসের টিকেট বুক করে ফেল। দেরি করিস না!"

"কোথায় যাবা ভাই?"

" এমন কোথাও, যেখানে নিশান নাই!"

এদিকে, নিশান বাইরে দাঁড়িয়ে আকাশের দরজার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম রেখা টেনে মুচকি হাসছে। সে পকেট থেকে ফোন বের করে টাইপ করল,

"তোর বাসার মাটন কষাটা কেমন রান্না হয়, সেটা জানার খুব ইচ্ছে করছে... কী বলিস, খেয়ে দেখব?"

টেক্সট পাঠিয়েই সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে ভেতর থেকে ভেসে এলো,

"নিশান, গেট লস্ট!"

নিশান ঠোঁট বাকিয়ে হেসে উঠল। আজ রাতটা বেশ জমবে! কিন্তু নিশানের এমন উদ্ভট আচরণ করার নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে! সেই কারণটাই এখন অজানা!

~~~★

রাতের আকাশ নীরব, প্রশান্ত। চাঁদ তার সমস্ত সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে সুনামপুর গ্রামের উপরে। চারদিকে জোছনার শুভ্র আলো ছড়িয়ে আছে, যেন সারা গ্রামটা রুপোর আস্তরণে ঢেকে গেছে। বাতাসে হালকা শীতল স্পর্শ, তালগাছের পাতা নরম বাতাসে সলসিয়ে উঠছে। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে, মাঝে মাঝে দু-একটা রাতচরা পাখিও ডেকে উঠছে গভীর নিশীথ রাতে। দিগন্ত বিস্তৃত ধানের ক্ষেতগুলোও জোছনার শীতে কাঁপছে, আকাশের তারারা সেখানে প্রতিফলিত হয়ে ছোট ছোট জ্বলজ্বলে বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে। পুকুরের জলে চাঁদের ছায়া পড়েছে, হালকা ঢেউয়ে তা কেঁপে কেঁপে উঠছে, যেন চাঁদ নিজেই নেমে এসেছে জলের গভীরে।

পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছে শৈলী, একদম চুপচাপ। চারদিকের সৌন্দর্যে সে মুগ্ধ নয়, বরং এই নিস্তব্ধতা তাকে আরও বেশি আবদ্ধ করে রেখেছে এক অদ্ভুত ভাবনার মধ্যে। সাহস করে তো বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো! কিন্তু এখন...এখন যে নিশানকে খুব মনে পড়ছে তার। নিশান যে এখন কোথায় আছে, কেমন আছে, সে জানে না। শুধু জানে, নিশানের কথা তার মনের ভেতর এক বিশাল স্রোতের মতো বয়ে চলেছে, থামতে চাইছে না। এতদিন আর যাই হোক, লোকটাকে তো চোখের সামনে একবার হলেও দেখতে পেত শৈলী! এখন তো সেটাও দেখতে পাচ্ছে না সে!

শৈলীর পা খালি, কাঁধে নরম শাল জড়ানো। বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে, তবু সে অনড় দাঁড়িয়ে আছে। রাতের এই মায়াবী পরিবেশে, এই জোছনার আলোতে, সে যেন অনুভব করতে পারছে নিশানের উপস্থিতি। তার হাতটা কি নিশানের স্পর্শ খুঁজছে? তার চোখগুলো কি নিশানের ছায়া দেখতে চাচ্ছে?

একটা পাতা সশব্দে পড়ে গেল, হালকা বাতাসে জোছনার আলো নড়েচড়ে উঠল। শৈলী একটু কেঁপে উঠে পেছনে তাকায়, মনে হয় নিশান ডাক দিল! কিন্তু না, কেউ নেই। নিশান নেই। শুধু জোছনার আলো আছে, আর আছে তার গভীর অনুভূতি, যা নিশানের মতোই অবিনশ্বর। মনে মনে শৈলী নিজেকে প্রশ্ন করল,

" সেই নিষ্ঠুর লোকটা কি আমায় খুঁজছে? একবারে কী আমায় খুঁজেছে? আমায় খুঁজে না পেয়ে কি অস্থির হয়েছে? নাকি সস্থির নিঃশ্বাস ফেলেছে? এতক্ষণে কি সেই নিষ্ঠুর লোকটা আর মিমির বিয়ের পাকা কথা হয়ে গিয়েছে? নাকি..."

ভাবতে পারছে না শৈলী। বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে যেন।

তখুনি পেছন থেকে ভেসে এলো সমুদ্রের কন্ঠ,

" এতই যখন ভালোবাসিস, তাহলে ছেড়ে এলি কেনো? একবারো কি হাত টা বাড়িয়ে দেয়া যেত না?"

আচমকা কন্ঠস্বরে চমকেনশৈলী পেছনে তাকিয়ে দেখল, সমুদ্র দাঁড়িয়ে আছে গাছের ছায়ায়, তার চোখে গভীর প্রশ্ন। জোছনার আলোয় তার চেহারাটা কিছুটা রহস্যময় দেখাচ্ছে। সমুদ্র মানুষটাই অন্যরকম। এক দিক দিয়ে যেমন রসিক, তেমনি মানুষের অনুভূতি বুঝতে একদম দক্ষ! শৈলী কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। কী বলবে? উত্তর তো তার নিজের কাছেই নেই!

সমুদ্র ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে পুকুরপাড়ের পাশেই দাঁড়াল। বাতাসে তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে, ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি।

"তোর চোখে তো প্রশ্নই প্রশ্ন, কিন্তু উত্তর কোথায় শৈলী?"

শৈলী দীর্ঘশ্বাস ফেলল,

"সব কিছুর উত্তর হয় না, সমুদ্র ভাইয়া। কিছু কিছু ব্যাপার শুধু অনুভব করতে হয়...!"

সমুদ্র মাথা ঝাঁকালো, একটু ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

"হ্যাঁ, বুঝতে পারছি। তুই অনুভব করছিস নিশান তোকে খুঁজেছে কি না, নিশান তোকে মনে করছে কি না। অথচ তুই নিজেই ওকে ছেড়ে এলি, তোর নিজের ইচ্ছাতেই! এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিস, ওর কষ্ট হচ্ছে কি না! কী আজব রে শৈলী!"

শৈলীর বুকটা ধক করে উঠল।

"আমি কি উনাকে ছেড়ে আসতে চেয়েছিলাম, সমুদ্র ভাইয়া? আমি কি চেয়েছিলাম উনাকে....!"

গলার স্বর কেঁপে গেল শৈলীর। সমুদ্র এবার একটু কোমল হলো।

" ফিরে যা শৈলী। যে মানুষটার জন্য এত রাতেও ঘুমোতে পারিস না, যার চিন্তায় এত রাতেও তুই নির্ভয়ে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারিস, তার কাছে ফিরে যা, শৈলী।"

শৈলী মাথা নিচু করল।

"এত সহজ হলে কি আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকতাম ভাইয়া? তোমাকে তো সব বলেছি। আমি মামনির কথা অমান্য করতে পারবো না। আমার ছোট বোন মিমির দুঃখও দেখতে পারবো না আর আমি তো এটাও নিশ্চিত নই যে নিশান ভাই আমায় ভালোবাসে কিনা! তার হৃদয়ে এমন কিছু আছে কিনা সে সম্পর্কেও তো আমার ধারণা নেই!"

সমুদ্র চুপ করে গেল। জোছনার আলোয় শৈলীর চোখের জল চিকচিক করছে। নিশানের কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা যেন আবার একবার ফেটে যাচ্ছে! সমুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"আচ্ছা শৈলী, তুই কি জানিস, নিশান এখন কোথায়?"

শৈলী মাথা তুলে তাকাল। দুদিকে মাথা নেড়ে প্রথমে না বোঝালেও পরে ভেবে বলল,

" বাড়িতে হয়তো!"

সমুদ্র হালকা হেসে বলল,

" ওও আচ্ছা। কিন্তু আমি তো অন্যরকম খবর পেলাম!"

" মানে?"

জিজ্ঞাসু দৃষ্টি শৈলীর।

সমুদ্র যেন পল্টি মারল, কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

" নাহ কিছু না!"

বলেই পিছু ফিরে হাঁটা শুরু করল,

" আর দাঁড়িয়ে থাকিস না বোইন। ঘুমোতে যা! রাত হয়েছে!"

কিন্তু সমুদ্রের এমন খাপছাড়া কথার মানে বুঝলো না শৈলী। জোরদার প্রশ্ন করল,

" সমুদ্র ভাইয়া, তুমি আগে বলো, একটু আগে তুমি এটা কেনো বললে? কী খবর পেয়েছো তুমি?"

সমুদ্র এবার পড়নে থাকা লুঙ্গি ঠিক করতে করতে বলল,

" তুই তো জানিসই যে আমি একটু গোয়েন্দাগিরি করি। তো, আমাকে কি তোর নিজের মতো বলদ মনে হয়? তুই হঠাৎ করে এভাবে গ্রামে আসবি, আর এভাবে আসার কারণ আমি জানতে পারবো না, এটা কীভাবে হয় বল!"

শৈলী বিরক্তবোধ করল,

" উফ ভাইয়া! ভনিতা বাদ দাও। বলো না...!"

সমুদ্র এবার চলে যেতে যেতে গলা উঁচিয়ে বলতে থাকলো,

" গোপন সূত্রে খবর পেয়েছি, নিশান নাকি আজ সারাদিন বাড়িতেই যায়নি। তোর বড় বাপ ওকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে বিছানাতেই লটকায় পড়েছে, তোর বড়মা মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আমি এও খবর পেয়েছি যে আগামী তিন- চার দিন নিশান বাড়িতে ফিরবেও না। কিন্তু কোথায় গেছে সে সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে হ্যাঁ, কেনো তিন চার দিন বাড়িতে ফিরবেনা, সে সম্পর্কে আমি অবশ্যই অবগত। কিন্তু আমি তোকে জানাতে ইচ্ছুক নই!"

বলেই শিস বাজাতে বাজাতে প্রস্থান নিল সমুদ্র। পেছনে ফেলে রেখে গেল ভাবুক শৈলীকে। নিশান ভাই বাড়িতে আসবে না মানে? সে আবারো নিজের অন্যমনস্ক মনটাকে দমিয়ে রেখে চোখ রাখল পুকুরের দিকে। তখনই পেছন থেকে শোনা গেল সমুদ্র বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতেই গলা ছেড়ে গান শুরু করেছে, বেসুরো গলাতেই গাইতে থাকলো,

❝ না দেখলে পরে, পরান আমার পোড়ে

দেখলে পরে দুই নয়নে, তৃষ্ণা আরো বাড়ে!

সামনে আমার প্রেমের সিন্ধু,

পাইনা তারে এক বিন্দু

হায় আমি অভাগিনী, পিপাসার কাতর!

তুমি আমার জান বন্ধু অন্তরের অন্তর❞

চমকে আবারো পেছনে তাকালো শৈলী। সমুদ্র ভাই কি কোনোভাবে তাকে কিছুর ইঙ্গিত দিল?

চলবে......✨

🍁 নোট: সুন্দর মন্তব্য চাই🥹❤️ বলুন না, কেমন লেগেছে? ৫ হাজার প্লাস শব্দ🤲❤️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন