ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের লালনছোঁয়া

১৭তম পর্ব

লেখক: অনামিকা তাহসিন রোজা

#প্রেমের_লালনছোঁয়া

#পর্ব_১৭

#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

রাত বাড়ছে ধীরে ধীরে। আকাশে একফালি চাঁদ ঝুলে আছে, যেন নিঃসঙ্গ এক প্রত্যক্ষদর্শী। শীতল বাতাসের স্পর্শে চারপাশের গাছপালাও যেন এক গভীর নিস্তব্ধতার গল্প শোনাচ্ছে। পুকুরের পানিতে চাঁদের প্রতিবিম্ব কাঁপছে, মাঝে মাঝে হালকা ঢেউ এসে তাকে বিকৃত করে দিচ্ছে, আবার আগের মতো স্থির হয়ে যাচ্ছে। দূরে কোথাও একঝাঁক ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে, আর মাঝে মাঝে রাতের কোনো পাখি ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে অজানার উদ্দেশ্যে।

শৈলীর জন্য অপেক্ষা করে নি আর নিশান আর আকাশ, তার ইতোমধ্যে রাতের খাবার খেয়ে ঘরে চলে গেছে। বাড়ির উঠোনটা এখন প্রায় ফাঁকা, শুধু বাতাসের দোলায় দোলনচাঁপার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। রান্নাঘরের এক কোণে রাহেলা বানু হাঁড়িপাতিল গোছাতে ব্যস্ত। একটু আগে সমুদ্রও খাবার খেয়ে সকিনার সাথে আবারো দেখা করতে গেছে, কোনো এক জরুরি কারনে। আর যাওয়ার সময় সাথী হিসেবে নিয়ে গেছে আকাশ কে। আসলে সকিনাদের বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখানোর উদ্দেশ্যেই আকাশকে নিয়ে গিয়েছে সে। যদিও নিশানকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, তবে নিশান ক্লান্ত হওয়ায় ঘরেই রয়ে গিয়েছে।

এদিকে সকিনাদের বাড়ি থেকে সমুদ্রের সাথেই ফিরে এসেছিল শৈলী, কিন্তু বাড়িতে ঢোকেনি এখনো। পুকুর পাড়েই দাঁড়িয়ে রয়েছে। চারপাশের নিস্তব্ধতার মাঝেও তার মনে তোলপাড় চলছে। নিশান এখন ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা, সে জানে না। কিন্তু একটা ব্যাপার সে জানে, আজ রাতটা আর আগের রাতগুলোর মতো নয়। আজ সে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আজ সে নিজের মনের কাছে মিথ্যে বলবে না। শৈলী মনে মনে ভেবেও নেয় যে নিশান ঘুমোলে ঘরে ঢুকবে এবং আগামীকাল সকাল ভদ্র মেয়ের মতো নিশান যাই বলবে তাই করবে। কিন্তু...আর ভাবল না সে। দেখা যাক কাল কী হয়! চাঁদের আলো মিশে যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে, যেমনভাবে শৈলীর মনের দ্বিধাগুলো মিশে যাচ্ছে নতুন এক অনুভূতির সাথে, সাহসের সাথে!

~~~★

" নাহ! এভাবে আর চলতে দেয়া যাবে না গাইস! এবার মেবি যা করার আমাদের কেই করতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে জীবনে মিয়া-বিবির মিল হবে না! আল্লাহ'র ওয়াস্তে দুটোই তো মুখচোরা। মুখের ভেতর চায়না বোম মারলেও মুখ থেকে কথা বের হবে না। আর তোমরা বলছো, টাইম দিতে? হাহ! জীবনে হবে না ভাই। শৈলী যতই বলুক, মেইন টাইমে গিয়ে ওই বেডির মুখে অটোমেটিক্যালি ফেবিকল লেগে যায়। এই আমি তার সবচেয়ে বড় সাক্ষী। নিজের চোখে দেখেছি। আরো যদি অপেক্ষা করতে বলো, তাহলে মনে করো, সাত জন্ম ধরে অপেক্ষা করেও তোমরা কিছু পাবে না!"

হতাশা মিশ্রিত আকাশের বলা প্রত্যেক টি কথা যৌক্তিক, যা বেশ ভালো করেই ধরতে পারল সমুদ্র আর সকিনা। সমুদ্র সকিনাদের বাড়িতে আকাশকে এনেছে মূলত নিশান এবং শৈলীর এই বড়সড় সমস্যাটা সমাধান করার জন্যে। সকিনার মতে তাদেরকে আরো সময় দেওয়া উচিত। হবু বউয়ের কথা শুনে সমুদ্রও তাই সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছে। কিন্তু আকাশের কথা শুনে এখন মনে হচ্ছে অপেক্ষা করাটা সবচেয়ে বড় বোকামি হবে।

সকিনা খুব চিন্তিত স্বরে বলল,

" তাহলে কী করা যায় ভাইজান? আমার মাথা তো চরকির মতো ঘুরতাছে!"

সমুদ্রও একই প্রশ্নের উত্তর পেতে মাথা নেড়ে তাকায় আকাশের দিকে। আকাশ এবার কলার ঝাঁকিয়ে বেশ ভাব নিয়ে বলে,

" করা তো অনেক কিছুই যায়। কিন্তু কাজ হওয়ার মতো কিছু করলে পরে আমি নিশানের কাছে কেলানিও খেতে পারি। যদিও আমি ওই গু-সন্ত্রসীকে ভয় পাই না। তবুও নিজের ভবিষ্যৎ বাঁচানো প্রয়োজন! "

সমুদ্র এবার দুহাত বুকে গুঁজে নেয়। সেও অভিজ্ঞদের মতো করে বলে,

" আপনার বাপ হওয়ার ভবিষ্যতের নিরাপত্তা না হয় আমিই দিলাম আকাশ। দরকার পড়লে আপনার প্যান্টের ওই মেইন জায়গায় লোহা বাইন্ধা রাখমু আমি। আপনি বরং আমার বোইনের ভবিষ্যত টা একটু গ্লু দিয়ে সেট করে দেন।"

সকিনাও তড়িঘড়ি করে মাথা নেড়ে সায় দিল। এমনিতেও তার আর তর সইছে না। যখন থেকে নিশানকে দেখেছে, তখন থেকেই মনে মনে নিশান এবং শৈলীকে একসাথে কল্পনা করে ফেলেছে। আহা! কি যে সুন্দর লাগে দুজনকে একসাথে।

আকাশ এবার থুতনি তে দু আঙুল বুলিয়ে বলল,

" উমমমম....কী করা যায়? কী যে করি? মাথায় একটা জোস প্লান আসলেই হয়। তবে হ্যাঁ, যা করার এখানেই করতে হবে। শহরে ফিরে কিছু করা সম্ভব না। ওখানে আবার ইঁন্দুরের নানির ডুপ্লিকেট মা/ল/টার ব্যবস্থা করতে হবে তো! বহুত কাজ!"

সমুদ্র এবার প্রায় অধৈর্য হয়ে বলল,

" তাড়াতাড়ি কিছু একটা ভাবুন তবে। আজ রাতের মধ্যে হলে তো আরো ভালো হয়!"

আকাশ চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর হঠাৎ করেই হাততালি দিয়ে উঠে দাঁড়াল।

"আসলেই! আমার মাথা যে এত দেরিতে কাজ করল, এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে! প্ল্যান একেবারে সোজা! ঝাক্কাস একটা প্লান! নিশান আর শৈলীর মুখ থেকে কথা বের করানোর দরকার নেই, বরং এমন কিছু করতে হবে যাতে নিজেরাই নিজেদের মনের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়!"

সকিনা এবং সমুদ্র একসঙ্গে বলল,

" মানে?"

আকাশ চওড়া হাসি দিয়ে বলল,

"মানে একটাই, আমরা এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করব যেখানে নিশান আর শৈলীর আর লুকোচুরি খেলার সুযোগই থাকবে না! মুখের ভেতর ফেবিকল লাগুক বা না লাগুক, মুখ তো ওদের খুলতেই হবে!"

সমুদ্র আগ্রহ নিয়ে বলল,

"ডিটেলস শুনি!"

আকাশ এবার খালি গলায় একটু কাশি দিয়ে বেশ রহস্যময় স্বরে বলল,

" আমাদেরকে একটা ছোট্ট নাটক করতে হবে। শৈলীকে এমন অবস্থায় ফেলব, যেখানে ও বাধ্য হবে নিজের অনুভূতি স্বীকার করতে, আর নিশান? তারও পালানোর পথ থাকবে না! ওকেও শৈলীর সামনে নিজের মনের কথা বলতে হবে! একবার যদি সত্যিটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, তারপর সব কাজ সহজ হয়ে যাবে।"

সকিনা কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,

"কিন্তু কীভাবে করব? প্ল্যান তো বললেন না!"

আকাশ দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল,

"ওটাই তো সারপ্রাইজ! বেশি জানার দরকার নেই আপাতত। আমার কথা মতো কাজ করলেই হবে। শুধু মনে রাখো, আজই কিছু একটা ঘটবে, আর সেটা হবে ইতিহাস! "

সমুদ্র একবার আকাশের দিকে তাকাল, তারপর সকিনার দিকে। দুজনের চোখেই কৌতূহল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আশার আলো! নিশান আর শৈলীর এই দোটানার খেলা এবার শেষ হতে চলেছে!

~~~★

নিশান নিজের ফোন নিয়ে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। চোখেমুখে তার অজস্র বিরক্তি ঝরে ঝরে পড়ছে। বিরক্ত হবেই বা না কেনো? নেটওয়ার্কের যে বেহাল দশা! অনেকক্ষন চেষ্টা করেও কোনো লাভ না হলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় ধপ করে বসল নিশান। কিছুক্ষণ নীরব থেকে হঠাৎ তার মনে পড়ল যে শৈলী এখনো আসেনি। বিষয়টা মাথায় আসতেই ঘর থেকে বের হলো নিশান। শুধু জোর গলায় রাহেলাকে ডাকতে যাচ্ছিল, সে, তখুনি চোখ পড়ল উঠোনে কেবল পা রাখা শৈলীর দিকে। অনেকক্ষণ পুকুরপাড়ে থেকে শৈলী মনে করেছিল এতক্ষণে হয়তো নিশান ঘুমিয়ে পড়েছে। অথচ সে ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি যে যার সামনে পড়ার ভয়ে এতক্ষণ বাইরে থাকলো, লুকিয়ে বাড়িতে ঢোকার সময় তার সামনেই পড়তে হবে তাকে।

শৈলী একটা শুকনো ঢোক গিলে এক পা, দুই পা করে নিঃশব্দে উঠোনে পা রাখল। এতক্ষণ বাইরে থেকে, পুকুরপাড়ের ঠাণ্ডা বাতাস গায়ে মেখে, নিজেকে একটু সামলে নিয়েছে। সে সত্যিই ভেবেছিল নিশান এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু কপাল! পা রাখতেই মনে হলো যেন কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা নিশানের চোখে চোখ পড়তেই শৈলী যেন থমকে গেল। নিশানের কপালে গভীর ভাঁজ, চোখে সন্দেহের ছায়া। এক হাত পকেটে রাখা, অন্য হাতে ফোন। স্পষ্টতই সে বিরক্ত, কিন্তু তার থেকেও বেশি অবাক।

"এখন এতো রাতে কোথা থেকে আসছিস? এতক্ষন কোথায় ছিলি?"

ভরাট কণ্ঠে প্রশ্ন করল নিশান, ঠাণ্ডা গলা তার।

শৈলীর হৃৎপিণ্ড যেন ধড়ফড় করে উঠল। নিশান ঠিক এই ভঙ্গিতে কথা বললেই, ওর বুক কাঁপে। ভয় করে। গলায় যেন কাঁটা আটকে গেল শৈলীর। সে জানে রাত হয়েছে।

"ওই..মানে...আমি..আমি তো বাইরে ছিলাম না নিশান ভাই, বসে ছিলাম পুকুরপাড়ে....!"

নিশানের ভ্রু আরও একটু কুঁচকে গেল, সন্দিহান কন্ঠে শুধালো,

" একা?"

শৈলী নিচের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল। নিশান এবার ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে এল। তার কণ্ঠে চাপা রাগ ঝরে পড়ল,

" তোর কি একটুও সময়জ্ঞান নেই? এখন রাত বাজে কত? শহরে থাকলে কি এভাবে রাত-বিরেতে একা বাইরে থাকতে পারতি?"

শৈলী চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, একবারও নিশানের চোখে চোখ রাখল না। নিশানের রাগ কিছুতেই সহ্য হয় না তার, অথচ বারবার সে এমন কাজ করেই ফেলে যেন নিশান বিরক্ত হয়! সে যদি জানত যে নবাব এখনো ঘুমোয়নি, তাহলে এখনো বাইরেই থাকত।

নিশান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে, যেন শৈলীর চুপ থাকা আরও বেশি রাগিয়ে তুলছে ওকে। তারপর একদম কাছে এসে নিচু স্বরে বলল,

"তোর কি আদৌ কোনো ভয়-ডর নেই?"

শৈলী এবার আস্তে করে ফিসফিসিয়ে বলল,

" আছে তো....!"

নিশান ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

" কীসের ভয়?"

শৈলী নিশানের দিকে তাকানোর সাহস পেল না। খুব আস্তে বলল,

" আপনার রাগের...!"

নিশানের কুঁচকানো ভ্রু জোড়া শিথিল হয়ে গেলো। হয়তো শৈলীর মনে থাকা ভয়টা বুঝতে পেরে একটু শীতল হলো। বেশ নরম কন্ঠে শুধালো,

" খেয়েছিস? "

শৈলী ধীরে মাথা নাড়ল, কিন্তু হ্যাঁ না কিছুই বলল না। নিশান গভীর দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। শৈলীর গালদুটো একটু ফ্যাকাশে লাগছে, চোখেও যেন ক্লান্তির ছাপ। আশ্চর্য! তার কেনো মনে হচ্ছে যে শৈলী কেঁদেছে। নিশান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর গলা আরও নরম করে বলল,

"কিছু খাবি?"

শৈলী এবার মাথা উঁচু করল, এক মুহূর্তের জন্য নিশানের চোখে চোখ পড়ল তার। সেই চিরচেনা দৃষ্টি, যেখানে রাগের আবরণ থাকলেও ভেতরে লুকানো থাকে একরাশ মমতা! শৈলীর ঠোঁটটা কাঁপল, একটু ইতস্তত করে বলল,

"না...আপনি খেয়ে নিয়েছেন?"

নিশান একপাশে তাকিয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর গম্ভীর গলায় বলল,

" হুঁ!"

শৈলীও ছোট করে বলল,

" আচ্ছা!"

নিশান এবার চোখ সরু করে বলল,

" বললিনা তো! খেয়েছিস তুই?"

আবারো ছোট করে জবাব দেয় শৈলী,

" জ্বি...!"

নিশান চোখে গাঢ় কৌতূহল এনে বলল,

" কই? আমি তো দেখলাম না!"

শৈলী এবার চোখ তুলে তাকাল, মিষ্টি হেসে বলল,

" সকিনার বাড়িতে গিয়েছিলাম যে, আন্টি ওখানে জোর করে খাইয়েছে। না খেলে মন খারাপ করত, তাই অল্প খেয়েছি।"

ডাহা এক মিথ্যা কথা বলল শৈলী। ওখানে গিয়ে সকিনার বাড়িতেই বসে নি সে। নিশান শৈলীর কথার গভীরে চোখ রাখল । শৈলীর ঠোঁটের কোণে সামান্য কাঁপন, কণ্ঠের ভেতর লুকানো একটা চেষ্টা, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার। কিন্তু নিশান কি এত সহজে বিশ্বাস করবে? সে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে শৈলীর ঠিক সামনে দাঁড়াল, তারপর খুব নিচু গলায় বলল,

"সত্যি?"

শৈলী চোখ সরিয়ে নিল। নিশান তার এই অভ্যাসটা খুব ভালো করেই জানে..শৈলী যখন মিথ্যে বলে, তখন চোখের দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে চায়।

"সকিনার মা খাইয়েছে, তাই না?"

শৈলী আস্তে মাথা নেড়ে বলল,

" জ্বি..!"

নিশান এবার একটু ঝুঁকে এল, স্বরে হালকা রাগ মেশানো,

" তাহলে মুখ নিচু করছিস কেন?"

শৈলী এবার চুপ। কিছু বলার নেই তার। নিশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়াল, তারপর একপাশে তাকিয়ে বলল,

" উঠোনে বোস! "

নিশান এরপর কোনো সুযোগ না দিয়েই বাড়ির ভেতরে চলে গেল। শৈলী বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল, এরপর ধীর পায়ে উঠোনের থাকা মোড়াতে বসল। নিশান আবার ফিরে এলো মিনিট পাঁচেক পর, হাতে একটা ছোট থালা। সেখানে কয়েকটা রুটি আর তরকারি রাখা। শৈলী হতবাক হয়ে গেল। নিশান একদম কাছে এসে থালাটা এগিয়ে দিল, গম্ভীর স্বরে বলল,

" মামি পাতিল ধুতে কলপাড়ে গেছে। আমিই গুছিয়ে আনলাম। খেয়ে নে।"

শৈলী দ্বিধায় পড়ে গেল, একটু ইতস্তত করে বলল,

" আমার তো এখন খিদে নেই নিশান ভাই, খিদে পেলে পরে খেয়ে নেবো...!"

"নাটক করিস না শৈলী। তুই জানিস, খাওয়া নিয়ে এসব ঢং আমার পছন্দ না। খেয়ে নে।"

নিশানের কণ্ঠে হালকা ধমকের সুর ছিল, কিন্তু চোখে ছিল গভীর যত্ন। শৈলী চুপচাপ হাত বাড়িয়ে থালাটা নিল। নিশান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে উঠল,

"এভাবে রাত-বিরেতে না খেয়ে থাকলে, শরীর খারাপ করবে। এটা তোর মামা বাড়ি বলে মামা বাড়ির আবদার করিসনা। শরীর খারাপ করলে আমি তোর দেখাশোনা করতে পারব না বুঝলি? চলে যাব কাল!"

শৈলী কিছু বলল না। কিন্তু নিশানের কথা শুনে বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক শিহরণ খেলে গেল। পরোক্ষভাবে লোকটা আবারো কাল নিজের চলে যাওয়াটা মনে করিয়ে দিল। কি নিষ্ঠুর! খাবারের থালার দিকে তাকিয়ে মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল শৈলীর। মিষ্টি হেসে খেতে শুরু করল। নিশানও মোড়া এনে শৈলীর পাশেই বসে আবারো ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা শুরু করল। শৈলী এবার আগের থেকেও ধীর গতিতে খাবার চিবোতে শুরু করল, কারন তার মস্তিষ্ক ধরে ফেলেছে যে সে খাবার শেষ না করা পর্যন্ত নিশান এখানে তার পাশেই বসে থাকবে। একবার আড়চোখে নিশানের দিকে তাকিয়ে শৈলী মিনমিন করে বলে উঠলো,

" আকাশ ভাইয়া কোথায়?"

নিশান শৈলীর দিকে তাকালো না, ফোনের দিকেই মনোযোগী নজর রেখে বলল,

" সমুদ্রের সাথে ঘুরতে গেছে! "

শৈলী অবাক হলো, কিন্তু কিছু না বলেই চুপ রইলো। আসলে সে মোটেও সমুদ্রের আকাশ বা সমুদ্র কারো খোঁজই জানতে খুব একটা আগ্রহী নয়। মূলত নিশানের সাথে একটু কথা বলার জন্য মনে মনে টপিক খুঁজছে শৈলী। এভাবে পাশে বসে চুপচাপ থাকাটা কেমন যেন উদ্ভট দেখায়। সে কি আর বলতে পারে, তার মনের কথাটা কি কেও বুঝতে পারবে যে নিশানের সাথে একসাথে বসে কিছু কথা বলার কথা ইচ্ছা তার। মুচকি হেসে রুটি ছিঁড়ে মুখে ঢোকাল সে। মনোযোগী চক্ষুজোড়া নিশানের মুখশ্রীতে থাকার কারনে শৈলী বুঝতেও পারল না যে সে তরকারিতে থাকা মরিচের বড় একটা অংশও রুটির সাথে মুখে নিয়েছে।

মরিচটা মুখে ঢুকতেই শৈলীর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। প্রথমে বুঝতেই পারেনি, কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঝালের তীব্রতা টের পেল। এক মুহূর্তের জন্য নিশানের সামনে কিছু বোঝাতে চাইলো না সে। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে চুপচাপ থাকার ভান করল যেন কিছু হয়নি। ঠোঁট দুটো আঁটসাঁট করে মুখ বন্ধ করে রাখলো, কিন্তু গাল দুটো আগুনের মতো জ্বলে উঠতে শুরু করল, শ্বাস ভারী হয়ে এল, আর ঠোঁট কাঁপতে লাগল। কিছুক্ষন পরই চোখ দিয়ে পানি এসে গেল।

নিশান ফোনে স্ক্রল করছিল বেশ মনোযোগ দিয়েই।কিন্তু পাশে থাকা মানুষটা যে এতক্ষণ ধরে ধীরস্থির খাচ্ছিল, তার অস্বাভাবিক মুখভঙ্গি খেয়াল করল সে। ভ্রু কুঁচকে মাথা তুলে তাকাতেই দেখল, শৈলীর মুখ লাল হয়ে গেছে, টলমল করা চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।

"শৈলী!" নিশানের কণ্ঠে উদ্বেগ ঝরে পড়ল।

শৈলী জলদি মাথা নাড়িয়ে বোঝানোর চেষ্টা করল যে কিছু হয়নি, কিন্তু নিশান এত সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। মোবাইল পাশে রেখেই একদম তার দিকেই চোখ রাখল। নিশানের চোখ ফাঁকি দেওয়ার মতো অবস্থাও শৈলীর নেই।

"তুই ঠিক আছিস?"

নিশান এবার পুরোপুরি তার দিকে ঘুরে বসল, চোখ সরু করে খেয়াল করল শৈলীর হাতের থালা। থালার তরকারির দিকে তাকিয়ে তার কপালে ভাঁজ পড়ল।

বেশ হতবাক হয়ে নিশান জিজ্ঞেস করে,

" তুই মরিচ খেয়েছিস না?"

শৈলী এবার বাধ্য হয়ে মুখ খুলল, কিন্তু গলাটা এতটাই জ্বলছিল যে স্পষ্টভাবে কিছু বলতে পারল না। নিশান মুখ কঠোর করে একদম সামনে এগিয়ে এলো।

"পানি খাবি?"

শৈলী আবারো ছোট্ট করে মাথা নাড়ল, কারণ মুখ এতটাই ঝলসে উঠেছে যে কিছু বলা সম্ভব না। এমনিতেও রাহেলা রান্নায় অনেক বেশি ঝাল দেয়।

নিশান এবার আর দেরি করল না। হাত বাড়িয়ে শৈলীর গালের কাছে এসে থেমে গেল, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে যে স্পর্শ করাটা ঠিক হবে কিনা। তারপর হালকা ভ্রু কুঁচকে বলল,

"বোকা মেয়ে! এসব মুখে ঢোকানোর আগে দেখে শুনে খাবি না? ইডিয়ট!"

তারপর শৈলীর কোনো অনুমতি না নিয়েই তার হাত থেকে থালাটা সরিয়ে টেবিলে রেখে দিল। দ্রুত এক গ্লাস পানি এনে মুখের সামনে ধরল,

" ধর, পানিটা খা, তাড়াতাড়ি!"

শৈলী প্রথমে লজ্জায় কিছু বলল না, কিন্তু নিশানের কণ্ঠের দৃঢ়তায় গ্লাস হাতে নিলো। এক চুমুক নিতেই নিশান ভ্রু কুঁচকে বলল,

"শুধু পানি খেলে হবে না, দাঁড়া!"

শৈলী মুখ কুঁচকে রেখেই ভ্রু উঁচালো, নিশান তখনই উঠে গিয়ে রান্নাঘর থেকে দ্রুত চিনির বয়াম খুঁজে এনে তার সামনে ধরল। একটু চিনি হাতে নিয়ে বাড়িয়ে দিল,

"এটা মুখে নে, তাড়াতাড়ি। চিনি মরিচের ঝাল কমাবে! মুখ খোল!"

শৈলী প্রথমে ইতস্তত করল, কিন্তু নিশান একদম সামনে বসে কড়া চোখে তাকিয়ে থাকায় আর না করতে পারল না। ছোট্ট এক চিমটি চিনি মুখে দিলো সে। এতক্ষণে শৈলীর চোখের পানি কিছুটা কমেছে, কিন্তু নিশান তখনো চোখে গভীর মনোযোগ নিয়ে তার মুখের পরিবর্তন লক্ষ করছে। নিশানের দৃষ্টি এতটাই নিবিষ্ট ছিল যে শৈলীর বুকের মধ্যে ধুকপুকানি আরও বেড়ে গেল। সে না চাইতেও গালে হাত রাখল। নিশানের দৃষ্টির গভীরতা থেকে নিজেকে আড়াল করতে পারাটা খুব জরুরি।

নিশান এবার আস্তে করে বলে উঠল,

" তোর মতো আহাম্মক আমি জীবনে দুটো দেখিনি। আল্লাহ তো দুটো চোখ দিয়েছে। এই চোখ কোন দিকে ছিল তোর?"

শৈলী এবার আসলেই বিষম খেলো। লজ্জা বলতে কিছু না থাকলে হয়তো নির্দ্বিধায় বলেই দিত,

"চোখ তো আপনার দিকে ছিল নিশান ভাই! এতে আমার কী দোষ?"

কিন্তু মুখে কি আর এ ভয়ানক সত্য বলা যায়?

শৈলী ভেজা চোখে তাকিয়ে হাসল,

"আপনিই তো বলেছিলেন খেয়ে নিতে!"

নিশান এক মুহূর্ত চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়ে হাসল,

" তোর মতো গাধির সাথে কথা বলাই ভুল! খেয়ে নিতে বলেছি আমি, মরিচ চিবোতে বলেছি একবারও?"

শৈলী এবার সত্যিই মুচকি হেসে ফেলল, ঝালের তীব্রতা ভুলে গিয়ে নিশানের এই যত্ন তার হৃদয়ের মধ্যে একরকম অদ্ভুত উষ্ণতা এনে দিলো। সে বুঝতে পারল, নিশান রাগ দেখালেও এই রাগের পেছনে যত্ন লুকিয়ে থাকে। আর সেই যত্নই হয়তো ধীরে ধীরে শৈলীর মন জুড়ে জায়গা করে নিয়েছে বারংবার। ভেবেই আবার একটু লজ্জায় মুখ নিচু করল শৈলী। নিশান তখনো বিরক্ত মুখে তাকিয়ে আছে, কিন্তু শৈলীর লুকোনো হাসিটা যেন তার চোখ এড়ায়নি।

~~~★

" তুমি তাহলে নিজের সিদ্ধান্তে অটল? সীমার সাথে নিশানের বিয়ে দেবে না?"

খাদিজার কথায় এক পলক তাকালেন নাসিরুল তালুকদার। সোফায় বসে মনোযোগ দিয়ে সকালের পেপারটা পড়ছেন তিনি, চোখে ইয়া বড় একটা চশমা। এইতো একটু আগেই খাওয়াদাওয়ার পর্ব চুকিয়ে এসেছেন। অথচ রাতের এই সময় টাতে নিজের স্ত্রীর মুখে আবারো সেই উদ্ভট প্রশ্ন শুনে বিরক্ত হলেন তিনি। পেপারের পাতা উল্টিয়ে গম্ভীর হয়ে বললেন,

" আমি আগেই বলেছি তোমায় খাদিজা। তোমার সব সিদ্ধান্তে আমি দ্বিমত না করলেও এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্তে আমি সহমত হতে পারছি না। সীমার চরিত্র সম্পর্কেও তোমার ভালো করে জানা আছে।"

খাদিজা এবার বাঁকা হেসে বললেন,

" মানে বিষয়টা তাহলে কী দাঁড়ালো? তুমি তোমার নিজের বোনের আবদার রাখতে মিমিকে বাড়ির বউ হিসেবে মেনে নিতে পারো, আর আমার ভাগ্নিকে মেনে নিতে কষ্ট হয়! নিজের বোনের বেলায় ষোল আনা?"

নাসিরুল তালুকদার এবার পেপারটা নামিয়ে খাদিজার দিকে তাকালেন। চোখের চশমাটা খানিকটা নামিয়ে এনে স্ত্রীকে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলেন। খাদিজার ঠোঁটে ব্যঙ্গাত্মক হাসি, কিন্তু চোখে খচখচে বিরক্তি। তিনি ধীর স্বরে বললেন,

"একটা ব্যাপার তুমি স্পষ্টভাবে বুঝে নাও খাদিজা, আমি কখনো পক্ষপাত করি না। আমি কখনো নিজের সিদ্ধান্ত অন্যায়ের উপর ভিত্তি করে নিইনি। সীমার চরিত্র আমি যেটুকু জানি, তাতে ওকে আমি আমার পরিবারের অংশ করতে চাই না।"

খাদিজা এবার ঠোঁট কাঁমড়ালেন, স্বামীকে বোঝানো এত সহজ হবে না জানতেন, কিন্তু তিনিও কম জেদি নন।

" বাহ! আর মিমির কী খুব ভালো চরিত্র? ওর অতীত সম্পর্কে তুমি জানো? খোঁজ নিয়েছো?"

নাসিরুল তালুকদার এবার গভীর শ্বাস ফেললেন।

" মিমি কেমন মেয়ে, সেটা জানার দায়িত্ব আমার আর আমার ছেলের। আমার ছেলে যদি ওকে যোগ্য মনে করে, তবে আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু সীমার ব্যাপারে আমি জানি, আমার ছেলের জন্য সে যোগ্য নয়।"

খাদিজার মুখ আরও শক্ত হয়ে গেল।

"তোমার ছেলে কি রাজপুত্র? যার জন্য আকাশ থেকে অপ্সরা এনে দিতে হবে? আমার ভাগ্নি কি এতটাই অযোগ্য? "

নাসিরুল তালুকদার এবার সরাসরি স্ত্রীর চোখে চোখ রাখলেন।

"সীমাকে তুমি ভালো করে চেনো খাদিজা। তবুও ওর পক্ষ নিচ্ছো কেন?"

খাদিজা এবার মুখ ফিরিয়ে নিলেন, যেন কথাটা শুনতেই চান না। কিন্তু তার চেহারায় একটা কঠিন অস্থিরতা ভেসে উঠল।

"আমি চাই নিশান আমার ভাগ্নিকে বিয়ে করুক, ব্যস! এর বেশি কিছু আমি শুনতে চাই না।"

নাসিরুল তালুকদার এবার দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,

" আমি তো চাই যে আমার ছেলে সুখী হোক। সে যদি সীমার সঙ্গে সুখী না হয়, তবে আমি কোনোভাবেই এই বিয়ে হতে দেব না।"

খাদিজা এবার গভীর দৃষ্টি নিয়ে স্বামীর দিকে তাকালেন। একদম নিশ্চুপ। যেন বুঝতে পারছিলেন, এ নিয়ে তর্ক করে লাভ নেই। কিন্তু তার দৃষ্টিতে যে সহজে হার মানার ইঙ্গিত ছিল না, তা নাসিরুল তালুকদার স্পষ্টই বুঝতে পারলেন...খাদিজা আবারো বললেন,

" তাহলে তুমি মিমির সাথেই বিয়ে দেবে?"

নাসিরুল তালুকদার ছোট করে জবাব দিলেন,

" আমার ছেলের মত থাকলে দেব!"

খাদিজা এবার বিছানা থেকে ধপ করে উঠে দাঁড়ালেন। তর্জনী তুলে বললেন,

" তবে তুমিও শুনে রাখো নিশানের বাবা। তোমার বোনের মেয়ে যদি আমার ছেলের বউ হয়ে আসে, তবে তার নাকে দঁড়ি দিয়ে ঘুরাবো আমি। বিয়ে করার শখ একদম মিটিয়ে দেবো তার। আমায় এখনো চেনো নি তুমি। তোমার বোনের মেয়েকে যদি আমি এ বাড়ির কাজের মেয়ে হিসেবে রাখতে না পেরেছি, তবে এই সংসার আমি ছেড়ে দেব।"

নাসিরুল তালুকদার এবার সত্যিই বিরক্ত হয়ে গেলেন। পেপারটা ভাঁজ করে টেবিলের উপর রাখলেন, তারপর ধীর কিন্তু শক্ত স্বরে বললেন,

" তোমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে খাদিজা? তুমি যা বললে, সেটা তুমি নিজেই বুঝেছ তো? এ রকম কথা বলার আগে একবারও ভাবলে না?"

খাদিজার চোখ দুটো রাগে জ্বলছে, কিন্তু কণ্ঠে স্পষ্ট দৃঢ়তা,

" হ্যাঁ, আমি বুঝেই বলেছি। তুমি বরাবর তোমার বোনের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নাও, আমি আমার ভাগ্নির ভালো-মন্দ ভাবলেই সেটা অন্যায় হয়ে যায়? আমি চুপ করে বসে থাকব না।"

নাসিরুল তালুকদার এবার ঠান্ডা গলায় বললেন,

" তোমার এই জেদের কারণ কী? সীমার জন্য তুমি এত মরিয়া কেন? সে কি সত্যিই যোগ্য?"

খাদিজা এবার থমকে গেলেন। এক মুহূর্ত চুপ থেকে, কঠিন গলায় বললেন,

"সীমা আমার আপন রক্ত। আমি চাই আমার ভাগ্নির সুখের ব্যবস্থা হোক।"

নাসিরুল তালুকদার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,

" তুমি কি নিশ্চিত, নিশানের সাথে সীমার বিয়ে হলে সে সুখী হবে?"

খাদিজা এক মুহূর্ত চুপ থাকলেন, তারপর দৃঢ় গলায় বললেন,

"সুখ এনে দিতে হয়, খুঁজে নিতে হয় না। আমি সীমাকে সুখী করব। আর আমি যা বলেছি, সেটাই শেষ কথা!"

নাসিরুল তালুকদার এবার স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, এ নিয়ে তর্ক করা অর্থহীন। তবে একটুকু জানতেন, তার স্ত্রী যতই জেদ করুক, এই বিয়ে যে সহজ হবে না, সেটা তিনিও জানেন। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

"দেখি, শেষ পর্যন্ত কী হয়! নিশান আসলেই সব মিটবে। অফিসের ম্যানেজারের সাথে কথা হয়েছে, তোমার ছেলে কাল বিকেলের মধ্যেই বাড়ি ফিরবে।"

খাদিজা এবার চোখ সরু করে স্বামীর দিকে তাকালেন। তিনি এত সহজে হার মানার লোক নন, এটা তিনিও জানতেন। তবে তিনিও যে এত সহজে নিজের সিদ্ধান্ত ছাড়বেন না, সেটা বোঝাতে মুখ শক্ত করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। নাসিরুল বুক ভরে শ্বাস নিলেন। জীবনে তিনি কখনোই শান্তি পেলেন না। দিন দিন খাদিজার মন মানসিকতা কেনো এত খারাপ হচ্ছে তাও তিনি খুঁজে পেলেন না!

~~~★

শৈলী আয়নার সামনে বসে ধীরে ধীরে চুল আঁচড়াচ্ছে। খড়খড়ে কাঠের চিরুনিটা চুলের গভীরে চালিয়ে দিতে গিয়ে মাঝেমাঝে সামান্য টান লাগছে, কিন্তু তার মন তো অন্য কোথাও...আয়নার কাচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে নিঃশব্দে নিশানের মুখটা মনে করার চেষ্টা করল। সেই গম্ভীর চাহনি, ঠোঁটের কোনায় লুকোনো চাপা অভিব্যক্তি, আর চোখের গভীরতা, যেখানে কঠিন রাগের আড়ালে থাকে এক অদ্ভুত শীতলতা, কখনো বা আশ্চর্য রকমের মমতা।

শৈলী মৃদু হাসল। অল্প কিছুক্ষন আগে নিশানের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো একে একে ভেসে উঠছে মনে। লোকটা মুখে রাগ দেখায়, কিন্তু তার খুঁতখুঁতে যত্ন থেকে বাঁচার উপায় নেই! রাতের খাবার খাওয়ানোর জন্য যেভাবে বসে ছিল পাশে, সেই দৃশ্যটা মনে পড়তেই শৈলী আয়নার দিকে তাকিয়ে একটু লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে আয়নার সামনে একটু ঝুঁকে নিজের কপালের উপর উড়ে যাওয়া ছোট ছোট চুলগুলো সরিয়ে দিল, তারপর একপাশে চুল গুঁজতে গুঁজতে বিড়বিড় করে বলল,

❝ ওহে, কী করিলে বলো পাইব তোমারে

রাখিব আঁখিতে আঁখিতে!❞

কিন্তু সাথে সাথেই নিজেই নিজের কথায় হেসে ফেলল। আয়নায় দেখা প্রতিবিম্বের চোখের তারায় সত্যিটা এত স্পষ্ট যে তা এড়ানো সম্ভব নয়। নিশান চলে গেলে যে কেমন লাগবে, সেটা ভাবতেই বুকের মাঝে এক অদ্ভুত শূন্যতা টের পেল শৈলী।

চিরুনি হাতে নিয়েই আনমনে চুলের আগা ঘুরাতে লাগল সে, আর মনে মনে বিড়বিড় করল,

"যাবার সময় অন্তত একবার...একবার কি বলবে না! হিমরূপা বলে কি আমায় ডাকবে না!"

শৈলী যখন নিজের সেই ভাবনায় ব্যস্ত, তখনই হঠাৎ সমুদ্র খোলা দরজায় পর্দা সরিয়ে টোকা দিল,

" আসতে পারি?"

শৈলী সৎবিৎ ফিরে পেয়ে তৎক্ষনাৎ ঘুরে তাকালো, চিরুনিটা রেখে মিষ্টি হেসে বলল,

" হ্যাঁ হ্যাঁ ভাইয়া এসো। "

সমুদ্র দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শৈলীর দিকে তাকাল। ঘরের হালকা মৃদু আলোয় শৈলীর উজ্জ্বল মুখটা আরও কোমল দেখাচ্ছে। চুলের কয়েকটা গোছা এখনো কাঁধের ওপর এলোমেলো পড়ে আছে, আয়নার সামনে বসে থাকায় চোখেমুখে একটা স্বপ্নালু ভাব। সমুদ্র ভেতরে এসে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

" কি রে, আয়নার সামনে এতক্ষণ ধরে কী ভাবছিলি?"

শৈলী একটু হকচকিয়ে গেল, কিন্তু চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে হাসল। দুষ্টুমি করে বলল,

"ভাবছি...আমার এত সুন্দর মুখটাকে কেউ কখনো ভালোবেসে ফেলবে কিনা!"

সমুদ্র হেসে ফেলল,

"হ্যাঁ, সেটা তো তোর ভাবনার বিষয় নয়, বরং সে ব্যক্তির জন্য চিন্তার ব্যাপার! কারণ যেই ভালোবাসবে, সে সহজে মুক্তি পাবে না!"

শৈলী ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

" ভাইয়া!"

সমুদ্র এবার একটু গম্ভীর হলো,

" শৈলী, নিশান কাল চলে যাবে...!"

এই একটা বাক্য যেন পুরো ঘরের বাতাসটাকে থমকে দিল। শৈলীর হৃদয়ের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল, কিন্তু মুখে হাসিই রাখল সে। আয়নার সামনে পড়ে থাকা চিরুনিটা তুলে নিয়ে চুলে চালাতে চালাতে বলল,

"তা তো জানিই ভাইয়া! উনি তো অতিথি। অতিথির তো ফিরতে হয়, তাই না?"

সমুদ্র শৈলীর গলার সেই কৃত্রিম হালকাপনা ঠিকই ধরে ফেলল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,

"তুই কি চাস না যে ও না যাক?"

শৈলী চমকে তাকাল সমুদ্রের দিকে। প্রশ্নটা এত সরাসরি ছিল যে সে কিছুক্ষণ থতমত খেয়ে গেল। হালকা হেসে বলল,

"যেতে চাইলে আটকে কী লাভ?"

সমুদ্র দীর্ঘশ্বাস ফেলল,

" চাইলে থাকা যায় শৈলী, যদি তাকে আটকে রাখার সাহস থাকে!"

শৈলী এবার সত্যিই চুপ হয়ে গেল। তার হাতের চিরুনিটা চুলে অযথাই আটকে রইল, মনে হলো যেন নিশানের যাওয়াটা একেবারে নিশ্চিত করে দেওয়া এই কথাগুলো তাকে আরও ব্যথিত করল। সমুদ্র কাঁধে হাত রেখে বলল,

" একটু ভাবিস...বেশি সময় নেই কিন্তু! "

শৈলী কোনো উত্তর দিল না। দরজার পর্দা সরিয়ে সমুদ্র বেরিয়ে গেল, আর শৈলী একাই বসে রইল আয়নার সামনে। বাইরে কোথাও হালকা বাতাস বইছে, জানালার কপাট খানিক নড়ে উঠল। শৈলী আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের চোখের গভীরে খুঁজে দেখল,সত্যিই কি সে চায় নিশান চলে যাক? নাকি..সে হালকা কেঁপে উঠল। নাকি নিশানের পায়ের ছায়াটা আজীবন তার উঠোনে থাকুক?

হঠাৎ পর্দা দিয়ে আবারো উঁকি দিল সমুদ্র,

" শৈলী শোন!"

শৈলী আবারো চমক৷ তাকালো,

" জ্বি ভাইয়া!"

সমুদ্র বেশ হতাশ হয়ে বলল,

" আসল কথাটাই তো বলতে ভুলে গেলাম। ঐ নিশান না তোকে পুকুরপাড়ে ডেকেছে। "

অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায় শৈলী,

" নিশান ভাই? আমাকে ডেকেছে? এখন? "

সমুদ্র মাথা নেড়ে বলল, " জ্বি!"

শৈলী ভ্রু কুঁচকে বলল,

" কিন্তু কেনো?"

সমুদ্র ঘাড় উঁচিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

" তা আমি কীভাবে জানব? তুই নিজেই গিয়ে দেখ। আমি আসছি। বউয়ের কাছে যাব। টাটা!"

বলেই ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যে উধাও হলো সমুদ্র। শৈলী আর প্রশ্ন করার সুযোগ টাও পেল না। তবে এত রাতে কেনো নিশান ভাই পুকুর পাড়ে ডাকল তা নিয়ে একটু চিন্তিত হলো শৈলী। পরক্ষণে ভাবল, হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা আছে। শৈলী এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। এত রাতে নিশান তাকে পুকুরপাড়ে ডেকেছে? কেনো? কী বলবে? শৈলীর বুকের ভেতর ধকধক শব্দ বাড়তে লাগল। সে ধীরে ধীরে আয়নার সামনে ঝুঁকল। চোখের নিচের হালকা ক্লান্তির ছাপ আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। হালকা করে হাসল নিজেই। কে জানে, নিশানের সামনে গিয়ে এই রাতের অন্ধকারে তার চোখ দুটো কেমন দেখাবে?

বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত স্রোত বইতে লাগল। নিজের মনের সুপ্ত আশা মেটাতে শৈলী চুপচাপ ব্যাগ থেকে একটা কাঠের ছোট বাক্স হাতে নিয়ে খুলল। এক কোণে রাখা ছোট কাজলদানি থেকে আঙুলে সামান্য কাজল তুলল। আয়নার সামনে বসে চোখের নিচে এক টান দিয়ে দিল। তারপর একটু ভাবল..

"হয়তো শুধু একপাশে দিলে ভালো লাগবে না..!"

শৈলী নিঃশ্বাস চেপে অন্য পাশেও কাজলের হালকা রেখা টেনে দিল। চোখের তারাগুলো আরও গভীর হয়ে উঠল। এতক্ষণ চুল খোলা ছিল। হাত দিয়ে একটু এলোমেলো করে দিল চুলগুলো। আজ আর কেনো যেন চুল বাঁধতে মন চাইলো না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে আরেকবার দেখে নিল।

"এভাবে কি যাওয়া ঠিক হবে?"

এক মুহূর্ত ভাবল, তারপর আয়নার সামনে থেকে সরে এসে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগোল। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। শৈলীর বুকের ভেতর সাঁতার কাটা এক অনুভূতি নিয়ে সে ঘর থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে নিল।

~~★

নিশান ইতিমধ্যে বিছানা গোছাতে শুরু করেছে। মূলত ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। আগামীকাল সকাল সকাল বের হয়ে যাবে বলে এখন ঘুমটা প্রচন্ড প্রয়োজন। কিন্তু যখনই নিশান আরাম করে বিছানায় শুতে যাবে, তখনই কোথা থেকে যেন তড়িঘড়ি করে ঝিঁঝি পোকার মতো উড়ে আসলো আকাশ। এসেই নিশানের পিঠে হাত দিয়ে বলল,

' দোস্ত, শুয়ে পড়িস না যেন। বিছানায় চামচিকা আছে!"

নিশান ভ্রু কুঁচকে তাকালো,

" হোয়াট?"

আকাশ নিশানকে এক ধাক্কা দিয়ে বিছানা থেকে উঠিয়ে দিয়ে বলল,

" সত্যি বলছি, তোর হবু ভাবীর কসম. নিজের চোখে চামচিকা দেখেছি. সর দেখি সর। দেখতে দে আমাকে।"

নিশান বিরক্তিতে চোখ ছোট করে তাকাল আকাশের দিকে,

"তুই আবার কী শুরু করলি?"

আকাশ একেবারে নাটকীয়ভাবে বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, যেন সত্যিই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান চালাচ্ছে। তারপর তাকিয়ে বলল,

"দোস্ত, তুই বুঝিস না! এটা সিরিয়াস ব্যাপার। তুই ছোট মানুষ, বুঝবিনা। আমি নিজে চামচিকাটাকে উড়তে দেখেছি।"

নিশান হতাশ হয়ে কপালে হাত দিল,

"আকাশ, আমি কি বাচ্চা নাকি? ঘুমাতে দে আমাকে! নাটক করিস না!!"

আকাশ মুচকি হাসল, কিন্তু সাথে সাথে ভান করল যেন খুব চিন্তিত,

"দোস্ত, তুই ভাব! চামচিকা যদি রাতে তোর কানের কাছে এসে ডানা ঝাপটায়? যদি চুলে জড়িয়ে যায়? যদি তোরে চুম্মা দেয়? যদি..!"

"চোপ!"

নিশান একদম ধমকের সুরে বলল। কিন্তু আকাশকে কে থামায়!

"আরেকটা ভয়ানক কথা শুনবি? চামচিকা নাকি নিশান নামের ছেলেদের বেশি পছন্দ করে!"

নিশান এবার সত্যিই ধৈর্যের বাঁধ ভাঙার কাছাকাছি পৌঁছে গেল। কিন্তু কিছু বলার আগেই আকাশ গম্ভীর মুখে বলল,

"আসলে, আমি তোর উপকারই করছি দোস্ত!"

"মানে?"

নিশান এবার বিরক্তির সুরে বলল।

আকাশ কনুই দিয়ে নিশানকে গুতো দিয়ে হাসিমুখে বলল,

" হয়েছে কি জানিস? শৈলী তোকে পুকুরপাড়ে ডাকছে! তুই যদি এখন ঘুমিয়ে পড়িস, তাহলে আমার হবু ভাবি আই মিন শৈলীর মন খারাপ হবে না?"

নিশান চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। তারপর তৎক্ষনাৎ চমকে গিয়ে বলল,

" শৈলী?"

আকাশ এবার বিছানো ঝাড়তে ঝাড়তে বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতে বল,

" হ্যাঁ রে শৈলী, ও তোকে ডাকছে। আরে ভাই,ও নিজে আমাকে বলল। কীভাবে বলল জানিস। আমাকে বলল, আকাশ ভাইয়া কষ্ট করে নিশান ভাইকে ডেকে দিন তো। উনাকে বলবেন পুকুর পাড়ে আমি ওনার জন্য অপেক্ষা করছি। তাড়াতাড়ি আসতে বলবেন। আমি আবার ভূতে ভয় পাই।"

নিশান এবার ভ্রু কুঁচকালো। আকাশ গলায় চিমটি কেটে বলল,

" বিশ্বাস কর ভাই। শৈলী সত্যি এটা বলেছে। ও তোকে ডেকেছে। এখন তুই যদি চাস যে শৈলী তোর জন্য মশার কাঁমড় খেয়ে পুকুর পাড়ে অপেক্ষা করুক, আর তুই ঘুমোবি, তাহলে আমার কোনো সমস্যা নেই। তুই ঘুমা। শৈলী ডেকেছে, তুই নাই যেতে পারিস, এটা তোর ব্যাপার। আমার কোনো প্রবলেম নেই। আমি ঘুমালাম। শুভ রাত্রি।"

নিশান দুহাত কোমড়ে রেখে কপাল কুঁচকালো। এত রাতে শৈলী কেনো ডেকেছে সেটাই ভেবে পেল না সে। হয়তো কোনো কারণেই ডেকেছে। নিশান কিছুক্ষণ গম্ভীর মুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। আকাশও চোখ বড় বড় করে এমন একটা ভাব করল, যেন একদম নির্দোষ।

"তুই বেশি নাটক করছিস!"

আকাশ মুচকি হেসে বলল,

"আমি কী করলাম? ডাকটা তো শৈলী দিয়েছে।"

নিশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শৈলী এত রাতে তাকে ডেকেছে কেন? কোনো সমস্যায় পড়েছে নাকি? কিন্তু আকাশের কথাগুলো শুনে মনে হলো ব্যাপারটা খুব গুরুতর কিছু নয়। নিশান বুঝতে পারছিল না, এটা শৈলীর আসলেই দরকার ছিল, নাকি আকাশ মজা করছে! কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর, সে যেন নিজের মনের দ্বিধা দূর করতেই বলল,

" তোর কথা যদি ভুল হয়, তাহলে খবর আছে!"

আকাশ তৎক্ষণাৎ একেবারে নিরীহ মুখ করে হাত উঁচিয়ে বলল,

" তোর ভাবির কসম! আমি কিছু যোগ-বিয়োগ করিনি। তোর বিশ্বাস না হলে গিয়ে দেখ।"

নিশান বিরক্ত মুখে শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে দরজার দিকে পা বাড়াল। যাওয়ার সময় আকাশের কানের কাছে মুখ এনে নিচু গলায় বলল,

"তুই যদি আমাকে ফাঁসিয়ে থাকিস, তাহলে তোর জীবনও ফাঁসাব!"

আকাশ একদম গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল,

"ভাই, ভালোবাসা কোনো ফাঁসানোর জিনিস না, এটা অনুভবের বিষয়। যা, ভাবির আই মিন শৈলী আপুর কাছে যা! মেয়ে কেনো যে ডাকল!"

নিশান একদম নিরুত্তর। দরজা খুলে বেরিয়ে গেল. আকাশ এবার সত্যিকারের খিলখিলিয়ে হাসল, তারপর নিজের বিছানায় লাফিয়ে উঠে বলল,

"মিশন সাকসেসফুল!"

চলবে.......

🍁 সবার জন্য ভালোবাসা ❤️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন