ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের লালনছোঁয়া

১৯তম পর্ব

লেখক: অনামিকা তাহসিন রোজা

#প্রেমের_লালনছোঁয়া

#পর্ব_১৯

#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

হালকা কুয়াশার চাদর ভেদ করে রোদের নরম আলো গ্রামটাকে সোনালি রঙে রাঙিয়ে তুলেছে। চারপাশে শিশিরভেজা ঘাসের সতেজ সুবাস, বাতাসে ধানের ক্ষেতে দোল খাওয়া নরম গন্ধ, আর পাখির কূজন, সব মিলিয়ে এক মোহময় পরিবেশ।

নদীর ধারে লাল-নীল শাড়ি পরে কিছু গৃহবধূ কলস হাতে জল আনতে এসেছে, তাদের হাসির শব্দে সকাল আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে। মেঠোপথ ধরে কিছু রাখাল গরু-ছাগল নিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছে, হাতে লাঠি ঘোরাচ্ছে ছন্দের তালে। দূরে, এক কৃষক লাঙ্গল কাঁধে ধানক্ষেতে নামছে, সোনালি রোদের নিচে তার পরিশ্রমী মুখখানা শান্ত আর তৃপ্ত। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য, সহজ-সরল জীবনের মায়াবী ছোঁয়া -সব মিলিয়ে গ্রামের সকাল মানেই এক শান্তির পরশ।

নীল রাঙা কুর্তি পরিহিত শৈলী দুরন্ত হাতে চুল বাঁধতে ব্যাস্ত। আজ মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে তার। গত রাতে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু পেয়ে, নিশানের এমন অপরিচিত অভিব্যক্তি দেখে সে এতটাই মোহে ছিল যে কখন যে রাত পেরিয়ে গেল, বুঝতেই পারেনি। এখনো সেই রাতের কথা মনে পড়লে লজ্জায় নুইয়ে পড়ছে সে। নিশান তার কপালে চুমু খেয়েছে কথাটা মনে পড়তেই পুরো দেহ কাঁপছে। আর এসব চিন্তা ভাবনাতেই শৈলী ঘুম থেকে উঠতেও করে ফেলেছে অনেক দেরি। আর নিশান তো আগেই হুমকি দিয়েছে, ঠিক সময়ে উঠতে না পারলে নিয়েই যাবেনা। তাই দেরি করে উঠে আলুর ভর্তা আর ভাত গোগ্রাসে গিলেছে শৈলী। ব্যাগ থেকে দৈবচয়নে কুর্তি উঠিয়ে নিয়ে দৌড়ে কলপাড়ে গিয়েছে, গোসল সেরেই ভেজা চুলগুলো কোনোমতে আঁচড়াচ্ছে এখন। চুল ভেজা থাকায় বাঁধার ইচ্ছে টা দমিয়েই রাখলো সে। সেই চুল কাঁধে ছড়িয়ে দিয়ে ঠোঁটে দিল বর্নহীন ভ্যাসলিন। এরপর এলোমেলো কাপড় গুলো লাগাতারে রীতিমতো ঠেসে ঠেসে ঢোকাতে লাগলো ব্যাগে।

ওদিকে সিএনজির ভেতরে বসে বসে কলা খাচ্ছে আকাশ, বেশ আরামসে কলার খোসা ছাড়িয়ে খেয়েই চলেছে সে। রাহেলা বানু বেশ জোর করেই কয়েক হালি কলা তার হাতে গুজে দিয়ে বলেছে পথে যেতে যেতে খেতে। কিন্তু গ্রামের এই সার- কীটনাশক বিহীন কলার স্বাদে আপ্লুত হয়ে আকাশ একটার পর একটা খেয়েই চলেছে। মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকিয়ে সিএনজির বাইরে ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে থাকা নিশানের দিকেও সতর্কতার দৃষ্টি ফেলছে। যেকোনো সময় হুংকার দিতে পারে এই ব্যাডা! কিন্তু নিশান তো আর আকাশের দিয়ে খেয়ালই করছে না, সে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, আর অপেক্ষা করছে শৈলীর জন্য। মেয়েটা কি এমন করছে যে এত দেরি হচ্ছে। বেশি দেরি করা যাবেনা। ওদিকে বাসও মিস যেতে পারে।

নিশানের অস্থির চোখজোড়া দেখে আকাশ এবার মুখে থাকা কলার টুকরো কোনোমতে গিলল। আসলে প্রস্তুতি নিল নিশানকে একটু জ্বালানোর। তাকে না জ্বালিয়ে তো আকাশের দিনটা শুরুই হয় না। এমনিতেও সকাল বেলা উঠে যখন গত রাতের কথা নিশান কে জিজ্ঞেস করেছে তখনই একরাম ধমক খেয়েছে সে। কিন্তু সে তো মোটেই হারবার পাত্র নয়। গতরাত নিয়ে অবশ্যই যেকোনো ভাবেই আকাশ নিশানকে খেপাবে, নইলে পেটের ভাত হজম হবে না। উহু, মোটেই হবেনা।

নিশান এবার ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেলল, মনে মনে ভেবেই নিল শৈলী বোধহয় সাজগোজ করতে দেরি করছে। আকাশ এবার দুষ্টু চোখে চেয়ে টেনে টেনে ডেকে উঠলো,

" বন্ধুউউউউ!"

ফটাফট তার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো নিশান। আকাশের এরকম ডাক মোটেই পছন্দ নয় তার। কারণ যখনই আকাশ এরকম করে তাকে সম্বোধন করে তখনই উল্টোপাল্টা কিছু মুখ থেকে বের হয়। এবারেও নিশ্চয়ই ভালো কিছু বলবে বলে ডাকেনি সে। নিশান চোখ দিয়ে ইশারা করে আকাশকে চুপ থাকতে বলল। কিন্তু আকাশ ডান হাত উঠিয়ে বাচ্চাদের মতো করে বলে উঠলো,

" একটা কথা বলব প্লিজ!"

নিশান এবার চোখ সরু করে সিএনজির ড্রাইভারের দিকে তাকালো, যে কিা পান মুখে নিয়ে চিবোচ্ছে। নিশানের দৃষ্টি দেখে বেচারা ড্রাইভার মেকি হাসলো, লাল হয়ে যাওয়া দাঁত বের করে হেসে আবারো সামনে তাকালো সে। নিশান এবার আকাশের দিকে মুখ নামিয়ে বলল,

" যদি পাবলিক প্লেসে কোনো ফালতু মার্কা কথা বলেছিস, ট্রাস্ট মি, এই অটোর নিচে তোকে পিষে মুখ থেঁ'ত'লে দেব।”

বলেই আবারো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সে।

কাতর চোখে তাকায় আকাশ। নিজের পছন্দের উপর তার ধিক্কার জানাতে ইচ্ছে করছে। এ কাকে সে বেস্ট ফ্রেন্ড এর সিংহাসনে সম্মানের সাথে বসিয়ে রেখেছে। সামান্য মায়া টুকু নেই! কত সহজেই এরকম ভয়ানক একটা কথা বলে ফেলল। অথচ ভাবলো না, তার মুখ থেতলে দিলে সে খাবার খাবে কি করে? এই যে রাহেলা আন্টি এতগুলো কলা দিয়েছে! এগুলো তো পেটে নিয়ে যেতে হবে নাকি? ছেলেটা এসব উপলব্ধি করতেই পারল না! ছিঃ! আকাশ বেশ কাতর মন নিয়ে মনে মনেই সৃষ্টিকর্তার কাছে ঘোর আবেদন জানালো।

কিন্তু এখন তাকে যে করেই হোক, গত রাত নিয়ে নিশান কে একটু কথা শোনাতেই হবে। তাই নিজের আত্মসম্মানবোধকে মাটির চুলায় লা'থি মেরে ফেলে দিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসল আকাশ। নিশান এবার চোখ সরু করল। আকাশের মুখের ওই হাসিটা দেখে নিশান বুঝে গেল, সামনে নিশ্চিত কোনো বিপদ আসছে। আকাশ যখনই এমন গোপন দুষ্টুমি লুকিয়ে হাসে, তখনই কিছু একটা ঘটবে,এটা নিশান হাড়ে হাড়ে হাড়ে জানে।

আকাশ মুখ টিপে হাসতে হাসতে মাথা একটু কাত করল, তারপর এমন স্বরে বলল যেন নিরীহ গলায় শুধু একটা কথা বলবে,

“শোনো না বন্ধু! কাল রাতে অত দেরিতে ঘরে ফিরলে কেনো?"

নিশান আড়চোখে তাকিয়ে এক পলক দেখল, কিছু না বলেই আবারো সামনে তাকালো। নীরব অপমান! তবুও গায়ে লাগলো না আকাশের,

" তাও ভালো যে ফিরে এসেছো, আমি তো ভেবেছিলাম গত রাতে তুমি আর ফিরবেই না।"

নিশান ভ্রু কুঁচকালো, কিন্তু ভাবলেশহীন ভাবেই শ্বাস ফেলল। আকাশ এবার নিরীহ কন্ঠে বলল,

" জানো তোমার গত রাতে অত দেরি করে ঘরে আসাটা মামি দেখে ফেলেছে।"

নিশান এবার ফট করে তাকালো আকাশের দিকে, চোখ দেখেই বোঝা গেল বেশ চিন্তিত সে। কিন্তু আকাশ এবার তড়িঘড়ি করে বলল,

" আরে আরে, টেনশন নাও কেনো বন্ধু। শুধু তোমাকেই দেখেছে। তাকে দেখেনি তো।"

নিশান এবার সস্থি পেয়ে সামনে তাকালে আকাশ আবার বলল,

" মামি তোমাকে দেখে সকালে আমায় কী বলেছে জানো?"

নিশান ধৈর্য ধরে বলল,

" কী বলেছে?"

আকাশের ঠোঁটের কোণে হাসিটা আরও গভীর হলো। সে নাটকীয়ভাবে নিশানের দিকে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,

" উনি বলছিলেন, 'নিশান বেশ বদলে গেছে! এত রাগ, এত গম্ভীর ভাব। ছেলেটা বোধহয় প্রেমে পড়েছে! কথা কি সত্যি বন্ধু?"

বলে সাথে সাথেই ভ্রু নাচালো সে।

নিশানের মুখ যেন সঙ্গে সঙ্গে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল! এক মুহূর্ত চুপ, তারপর সজোরে বলে উঠল,

" আকাশ! তোর জান কবচ করতে এক মিনিটও লাগবে না!"

সিএনজির ভেতরে বসে থাকা ড্রাইভার পান ফেলে দিল এক মুহূর্তেই। আকাশের কথা সেও শুনতে পেরেছে। তাই সেও মুচকি হাসলো। আর আকাশ? সে তো হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ার মতো অবস্থা! নিশানের মুখের সেই অদ্ভুত অভিব্যক্তিটা দেখে তার হাসি থামছেই না! কিন্তু ঠিক তখনই একটা ঠাস করে একটা শব্দ হলো। আকাশ প্রথমে বুঝলো না শব্দ টা কিসের। কিন্তু পিঠে হঠাৎ জ্বলতে শুরু করায় বুঝলো যে নিশান তার পিঠে বেশ জোরেই ঘুষি মেরেছে। অবাক হলো আকাশ, নিশান তাকে এই সময় মারবে ভাবেইনি সে। সিএনজির ড্রাইভার টাও ভয় পেল। অভিমানে মনটা খারাপ হয়ে গেল আকাশের। তাই সে এবার মনে মনে পন করলো, আর কোনো কথাই বলবে না। চুপচাপ সামনে তাকিয়ে মুখে হাত দিয়ে রইল আকাশ। নিশান বরাবরের মতো নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সামনে তাকালো। আকাশ মুখ ভেঙচালো।

মিনিট খানেক পেরিয়ে গেলে ধুপধাপ আওয়াজ পেয়ে সামনে চোখ তুলে তাকালো নিশান। এই তো! আসছে সে! নীল রঙের কুর্তি পড়ে শৈলী যেন এক তীব্র হাওয়া হয়ে দৌড়ে আসছে। কিন্তু নিশানের ভাবনা ভুল প্রমানিত হলো। সাজগোজের ছিঁটেফোঁটাও নেই শৈলীর। কোনোরকম জাকজমক কিছু চোখে না লাগলেও নীল রং টা বেশ প্রজ্জ্বলিত। তার কুর্তির প্রান্ত বাতাসে উড়ছে, ভেজা চুল কাঁধে এলোমেলো ভাবে বিছিয়ে আছে, আর ছোটাছুটির তাড়াহুড়োয় গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে। ব্যাগটা এক হাতে ধরে, অন্য হাতে ওড়নাটা ঠিক করতে করতে ছুটে আসছে সে, মুখে তাড়া লাগার ব্যস্ততা, আর চোখে অদ্ভুত এক উজ্জ্বলতা।

নিশান থমকে তাকিয়ে রইল। যেন সময়ের এক ক্ষণিক স্থবিরতা এসে দাঁড়ালো তার সামনে। শৈলীকে সে এমন প্রাণবন্তভাবে কখনো দেখেনি। এ যেন হাওয়ার মতো মুক্ত, উচ্ছল, আর নিজের মধ্যেই আলো ছড়ানো একটা রঙিন দৃশ্য।

গত রাতে যে নিশান একদম স্বাভাবিক ছিল, তা ভাবা নিতান্তই ভুল! বাইরে থেকে নির্লিপ্ততার মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেও বুকের ভেতর যে বৈশাখ মাসের কি তীব্র ঝড় উঠেছিল তা সে ছাড়া আর কেওই জানেনা। প্রতিরাতে গভীর ঘুমে আরক্ত নিশানের চোখজোড়া গতকাল কোনো ভাবেই বন্ধ হয়নি। সহস্রবার মনে পড়েছে শৈলীর সরল নিষ্পাপ স্বীকারোক্তি। কি সুন্দর কোনো দ্বিধা ছাড়াই সব বলে দিল নিশানকে। ছিল না একটুও ভয়, দ্বিধা, অসস্তি, আতঙ্ক! শুধুই ছিল আশা, বিশ্বাস, ভরসা আর রাশি রাশি ভালোবাসা, যা প্রত্যক্ষ প্রকাশ না পেলেও অনুভব করতে পেরেছে দুজনেই।

দৌঁড়ে আসতে থাকা মেয়েটা কোনোমতে ওড়না সামলে সোজা এসে নিশানের সামনে দাঁড়াল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

" দেরি হয়ে গেল, নিশান ভাই। তাই না? সরি। ব্যাগ গোছাতে দেরি হয়ে গেছে।"

বেশ হাঁপিয়ে গেছে শৈলী। দৌঁড়ে আসার কারনে জোরে জোরে শ্বাস টানছে। নিশান একদম নির্বিকার ভাবে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর চোখ নামিয়ে ঠোঁটের কোণে একপাশে হালকা হাসি টেনে বলল,

" দেরি হয়নি। তবে...! "

অস্থির হলো শৈলী,

" তবে কী?"

নিশান এবার একটু এগিয়ে এলো, মুখে সেই চিরচেনা নির্লিপ্ত ভাব। কিন্তু চোখে? সেখানে যেন এক অদ্ভুত কিছু খেলা করছে, গভীর, ধীর কোনো অনুভূতি, যা সে মুখে বলবে না, তবে বুঝিয়ে দেবে ঠিকই। একটু ঝুঁকে এসে শান্ত স্বরে বলল,

" তবে তোর উচিত ছিল একটু তাড়াতাড়ি আসা। একটু তাড়াতাড়ি বলা, আরেকটু তাড়াতাড়ি অনুভব করা।"

শৈলী তার কথার মানেটা বোঝেনি,

" মানে? "

নিশান তৎক্ষনাৎ অভিজ্ঞের ন্যায় প্রসঙ্গ পাল্টালো,

" মানে তুই এত হাঁপাচ্ছিস কেনো? এত দৌড়াতে হলো কেনো তোকে?"

শৈলী এবার সত্যিই অস্থির হয়ে পড়ল। একে তো নিশানের এই শান্ত গলা, তার ওপর নিশানের এই চোখের চাহনি, এগুলো তার সাথে ঠিক মানানসই লাগছে না! নিশান কি সত্যিই কিছু বোঝার চেষ্টা করছে? নাকি...সে তাড়াতাড়ি মুখ গম্ভীর করে নিয়ে বলল,

"আর কী করতাম? সময় বেশি হয়ে যাচ্ছিল। আপনি অপেক্ষা করছিলেন আর....

শৈলীর কথা শেষ হওয়ার আগেই আকাশ কপট রাগ দেখিয়ে জোর গলায় বলল,

" হ্যাঁ হ্যাঁ! শুধু নিশানই তো অপেক্ষা করছিলো। আমিতো এখানে বাদাম বিক্রি করতে এসেছি, তাই না? আসো,তোমার বাদাম খেয়ে যাও!"

বলেই দুহাত বুকে গুঁজে অন্যদিকে ফিরল আকাশ, বুঝিয়ে দিল সে বেশ অভিমান করেছে। আজ মিয়া বিবি দু'জনেই তাকে এভাবে অবজ্ঞা করলো!

আকাশের এমন অদ্ভুত আচরনের কারন বুঝলো না শৈলী। তাই বিভ্রান্তিকর দৃষ্টি ফেলে নিশানের দিকে তাকালো। নিশান এবার একপাশে মাথা কাত করল, ঠোঁটে একটা ক্ষীণ হাসি,

" ওর মাথার সবকটা তার ছিঁড়ে গেছে। ওসব কথায় কান দিস না। ওঠ তাড়াতাড়ি। "

শৈলীর এক গাল হেসে দ্রুত বলল,

" ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি চলুন নিশান ভাই। দেরি হয়ে যাবে।"

নিশান আর কিছু বলল না।শৈলীর প্রতিটি অভিব্যক্তি তার চোখ এড়িয়ে যায় না, গেল না আজও। ওদিকে আকাশ? সে তো এই পুরো দৃশ্য দেখে রীতিমতো হতভম্ব! চুপ করে শৈলী আর নিশানের কথোপকথন শুনছিল, কিন্তু একদমই আশা করেনি যে নিশান এমন অপমানজনক কথা বলবে। আর শৈলীও সায় দিল? হায়! দিন শেষে সবাই তাকে ধোঁকা দিল।

নিশান এবার আকাশকে সামনে বসতে দিয়ে নিজে শৈলীর সাথে পেছনের সিটে বসল। আকাশ সামনে বসার আগে একটু এগিয়ে এসে নিশানের কানে কানে বলল,

"বন্ধু, কাজটা ঠিক করলি না। অভিশাপ দিলাম, ঘরের ভেতর বাসর করতে পারবা না!"

নিশান এক মুহূর্তের জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠান্ডা স্বরে বলল,

" আজকাল বাপ হওয়ার ইচ্ছে টা কি হারিয়ে ফেলছিস?"

আকাশ দ্রুত দু'হাত তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গি করল,

" না, অবশ্যই না। ওকে, ওকে! কিছু বললাম না! চল, চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে!"

~~~-★

দিন গড়িয়ে সূর্য এখন আকাশের ঠিক মধ্যখানে।ভরদুপুর। রোদ এতটাই তীব্র যে কংক্রিটের রাস্তা থেকে উত্তপ্ত বাতাস উঠে ঝাপসা করে দিচ্ছে চারপাশ। বহুতল ভবনগুলোর কাচের জানালায় সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে চোখ ঝলসে দিচ্ছে। ফুটপাতের ওপর জমে থাকা ধুলো রোদের তাপে যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, বাতাসে হালকা ধুলোর ঝাপটা ছড়িয়ে পড়ছে। রাস্তায় গাড়ির লাইন দীর্ঘ, যানবাহনের ধাতব শরীর গনগনে আগুনের মতো গরম হয়ে উঠেছে। বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার,সব কিছুতেই যেন এক ধরনের অবসন্নতা নেমে এসেছে। হঠাৎ হর্নের বিকট শব্দ, রাগান্বিত চালকদের তাড়া, আর রাস্তায় মানুষের ক্লান্ত হাঁটা,সব মিলিয়ে শহরের দুপুর এক অদ্ভুত গরম এবং বিরক্তির মিশেলে জ্বলতে থাকে।

-------

বাস শহরে ঢুকে পড়েছে। চারপাশে কংক্রিটের দালান-কোঠা, গিজগিজে যানজট, আর বিকট শব্দের এক অস্থির মিশ্রণ। দিন গড়িয়ে সূর্য এখন ঠিক মাথার ওপরে, রোদ এতটাই চড়া যে জানালার কাচ গরম হয়ে উঠেছে। নিশান পাশের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে, চোখের সামনে শহরের চিরচেনা দৃশ্য। দীর্ঘ লম্বা ফ্লাইওভার, নিচে অসংখ্য গাড়ির জট, ফুটপাতে ক্লান্ত পথচারীদের ধীর পদক্ষেপ। দূরের এক চায়ের দোকানে কেউ গামছা দিয়ে ঘাম মুছে ধোঁয়া ওঠা কাপ হাতে নিয়ে বসে আছে।

বাসের মধ্যে এসির ঠান্ডা বাতাস বইলেও বাইরের উত্তাপ যেন জানালার কাচের ওপাশ থেকে অনুভব করা যাচ্ছে। নিশান সজাগ। তার চোখ সতর্ক, কিছুটা চিন্তামগ্ন। ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা টের পাচ্ছে সে, তবে মুখে কিছু নেই। শুধু হাতের আঙুলগুলো অন্যমনস্কভাবে একটা ছন্দে নাড়াচ্ছে।

তার পাশেই শৈলী। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে মেয়েটা। হয়তো ক্লান্তি, কিংবা গত রাতের কথা ভেবে এতটা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে। নিশান এক ঝলক তাকিয়ে দেখল, শৈলীর মাথাটা জানালার কাঁচের গায়ে হেলান দিয়ে আছে, নিঃশ্বাস প্রশান্ত, ঠোঁটের কোণে যেন একটা অদ্ভুত কোমলতা। হালকা দুলতে থাকা বাসের ছন্দের সাথে মেয়েটার ঘুম আরও গভীর হচ্ছে। সময় নিল নিশান। এক হাতে মেয়েটার মাথা এনে নিজের কাঁধের উপর রাখলো, নিভৃতে যতনে আগলে নিল গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন দেহখানা। এরপর নিজেও একটু প্রশান্তির শ্বাস ফেলে চোখ বুঁজলো। ঘুমোবে না, শুধু শান্তিটা অনুভব করবে।

তবে এদিকে পেছনের সিটে থাকা আকাশ দাঁত কিড়মিড় করছে। রাগে দুঃখে তার বাস থেকেই ঝাঁপ দিতে মন চাইছে। চাইবেই বা না কেনো? এই যে নিশান তাকে অবহেলায় পিছনে সিটে বসিয়ে দিয়ে নিজে শৈলীর সাথে বসে আছে এটা কি একটা ঘোর অন্যায় নয়? আজ তার কেউ নেই বলে সে এভাবে একটা মুটকি আন্টির সাথে চেপে বসে রয়েছে। যতবারই বাস টার্ন নিচ্ছে ততবারই মুটকি আন্টি তার উপরে চেপে এসে পড়ছে আর বেচারা আকাশ চেপ্টে যাচ্ছে বারংবার। উপায় না পেয়ে বেচারা আকাশ জানালার ওপাশে একবার তাকায়, আবার মোবাইলে স্ক্রল করে। কখনো চোখ কুঁচকে কিছু দেখে, কখনো বিড়বিড় করে কি যেন বলে। হঠাৎ আকাশ একটু ঝুঁকে নিশানের দিকে, ধীর কন্ঠে বলে উঠে,

" তুই আমারে যেই কষ্টটা দিচ্ছোস হা/রা/মি? তোর জীবনে বিয়া হবে না। শা/লা দেখিস, শৈলী তোরে রিজেক্ট করবে! হাহ!"

নিশান আকাশের কথা শুনলেও কোনো উত্তর দিল না। শুধু এক দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকল। বাসটা তখন একটা সিগন্যালে দাঁড়িয়ে পড়েছে। জানালার বাইরে শহরের দুপুর আগুনের মতো জ্বলছে, আর ভেতরে শৈলীর শান্ত নিঃশ্বাসের শব্দ যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তির আভাস দিয়ে যাচ্ছে। নিশান কাল রাত থেকে অনেক ভেবেছে। গতরাতে শৈলীর বলা প্রত্যেকটা কথার ঠিকঠাক জবাব না দিলেও সেগুলোর প্রতিক্রিয়া না দেখালেও সে উপলব্ধি করতে পারছে, শৈলীর অবস্থাটা। মা মা/রা গিয়েছে, বাবা থেকেও নেই। এরকম একটা অবস্থায় শৈলী যে কতটা অসহায় সেটা নিশানের থেকে কেউ জানে না এবং শৈলীও যে নিশানকে খুব বেশি ভালোবেসে ফেলেছে, তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, সেটা অবশ্য ঠিক জানে সে। আর এটা নিয়েই ভয় হয় নিশানের। সে খুব ভালো করেই জানে সে ছাড়া শৈলীর আর কেউ নেই। অন্তত নিঃস্বার্থভাবে সে ছাড়া কেউই আর শৈলীর ভালো চাইবে না। নিশানও মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শৈলীকে নিজের সবটা দিয়ে ভালোবাসবে। পৃথিবীর সব সুখ যদি এনে দেওয়া যেতো শৈলীকে, তাহলে হয়তো সবচেয়ে বেশি খুশি হতো নিশান। তবে তার হিমরূপার জন্য চাঁদ তারা এনে দিতে না পারলেও, নিজের জীবনটা দিয়ে তাকে আগলে রাখতে পারবে সে। আর সেটাই করার কঠোর পণ নিয়েছে নিশান তালুকদার। কিন্তু ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে তাদের জন্য? কী হবে যখন সবাই সবটা জানতে পারবে?

~~~★

তালুকদার নীড় এ এখন বেশ নীরবতা বিরাজ করছে। নাসিরুল তালুকদার সোফায় বসে আছেন, হাতে আজকের পেপার। সকালে অফিসের কাজে ব্যাস্ত থাকায় পেপার টা পড়া হয়নি। তাই ভরদুপুরেই পড়তে হচ্ছে, তার সামনে টেবিলে রাখা কয়েকটি ম্যাগাজিন। চোখে একটা গ্লাসের চশমা। এক এক লাইনে মনোযোগ দিয়ে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছের তিনি। বাড়ির বাকি সদস্য রা প্রতিদিনের মতোই দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিতে ঘরে আছে। আজ নিশানের ফিরে আসার কথা। কিন্তু কখন আসবে এ বিষয়ে অবগত নন তিনি।

এরকম শান্ত একটা পরিবেশে তিনি যখন খেলাধুলার পাতাটা পড়তে ব্যস্ত হলো, ঠিক তখনই হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ পেলেন নাসিরুল। তালুকদার নীড়ের শান্ত দুপুর যেন মুহূর্তেই কেঁপে উঠল। উপরের ঘর থেকে হঠাৎ করেই চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ আসতে শুরু করল। প্রথমে একটু অস্পষ্ট, তারপর ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠল রাশিদা তালুকদারের কঠোর কণ্ঠস্বর, তীব্র, ধমকের মতো!

নাসিরুল তালুকদার চমকে গেলেন। এতক্ষণ পেপারের পাতায় নিমগ্ন থাকলেও এখন আর তা ধরে রাখা সম্ভব নয়। দ্রুত চশমাটা ঠিকঠাক করে ভ্রু কুঁচকে উপরের দিকে তাকালেন। কপালের মাঝখানে গভীর ভাঁজ পড়ে গেল, বাড়িতে এমন নীরব দুপুরে এত হৈচৈ কেনো?

ঠিক তখনই উপরের সিঁড়ির দিকে চোখ পড়তেই দৃশ্যটা স্পষ্ট হলো। রাশিদা তালুকদার মিমির বাহু শক্ত করে চেপে ধরে টেনে টেনে নিচে নামিয়ে আনছেন, মুখটা কঠিন, চোখে রাগের ঝলক। মিমি প্রথমে প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও রাশিদা তালুকদারের দৃঢ়তার সামনে সেটা কোনো কাজেই আসেনি। তার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ।

পেছন থেকে রিমি দৌড়ে আসছে, মুখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ। গায়ের ওড়না সামলে দ্রুত নেমে আসছে সে, যেন কিছু বলতে চায়, কিন্তু শব্দগুলো আটকে যাচ্ছে কণ্ঠে। আটকাতে চাইছে নিজের মা ও বোনকে! কিন্তু সে অক্ষম!

নাসিরুল তালুকদার পুরো ব্যাপারটা বোঝার আগেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। মুখ শক্ত হয়ে গেল তার। এক হাত দিয়ে চশমা নামিয়ে হাতে নিয়ে স্পষ্ট গলায় বললেন,

"এটা কী হচ্ছে রাশিদা?"

কিন্তু রাশিদা তালুকদার যেন কোনো কিছু শোনার জন্য একদমই প্রস্তুত নন। মুখে দমকা ঝড়ের মতো রাগ আর হাতের দৃঢ়তা এক মুহূর্তের জন্যও শিথিল হলো না। মিমির চোখের কোণে পানি চিকচিক করছে, কিন্তু মুখ শক্ত করে সে কিছু বলার চেষ্টা করল। নাসিরুল তালুকদার এবার এক পা এগিয়ে এলেন। তালুকদার নীড়ের নীরব দুপুর এখন যেন তীব্র উত্তেজনায় গুমরে উঠছে।

রাশিদা মিমিকে নিয়ে একদম নাসিরুলের সামনে এসেই দাঁড়ালেন। রাগে হাঁসফাঁস করছেন তিনি। নাসিরুল এবার ভ্রু কুঁচকে একবার কান্নারত মিমির দিকে তাকিয়ে বললেন,

" কী হয়েছে রাশিদা? মেয়ে দুটো কাঁদছে কেনো?"

রিমি এবার চাইলো কিছু বলতে, কিন্তু তার মুখ খোলার আগেই রাশিদা জগতের সব ক্ষোভ নিয়ে বলে উঠলো,

"তুমিই ওকে জিজ্ঞেস করো ভাইজান? ও কী বলতে চাইছে, পরিষ্কার করে বলতে বলো তো।"

নাসিরুল স্নেহের চোখে তাকিয়ে এক হাত আলতো করে রাখলেন মিমির মাথায়,

" কী হয়েছে মা?"

রিমি দুদিকে মাথা নেড়ে 'না' বোঝাতে চাইল, তাকে অগ্রাহ্য করেই মিমি হেঁচকি তুলে ঢোক গিলে বলল,

" আমি এ বিয়ে করতে পারব না বড় আব্বু!"

ভ্রু কুঁচকালেন নাসিরুল,

" মানে?"

ভাঙা গলায় আবারো বলল মিমি,

" নিশান ভাই কে আমি বিয়ে করতে পারবনা বড় আব্বু!"

তৎক্ষনাৎ দ্বিতীয় বারের মতো গালে একটা চড় পড়ল মিমির। রাশিদা রাগে ক্ষোভে আবারো গায়ে হাতে তুলতে চাইলে নাসিরুল বাঁধা দেয়,

" আহ! থাম রাশিদা। এসব কী হচ্ছে? এত বড় মেয়ের গায়ে কেও হাত তোলে? ওকে বলতে দাও। "

চেঁচামেচি শুনে ইতিমধ্যে খাদিজা তালুকদারও হাজির হয়েছে। এই ভরদুপুরে কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় বেশ অসন্তুষ্ট তিনি। খাদিজা তালুকদার ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন, চোখে বিরক্তির ছাপ। কাঁচা ঘুম ভাঙায় মুখটা একটু ফোলা ফোলা লাগছে। এসে সোজা রাশিদার দিকে তাকিয়ে বললেন,

" দুপুরবেলায় এ কী নাটক হচ্ছে? এত হইচই কেন?"

রাশিদা তালুকদার এবার হাত কোমরে দিয়ে দাঁড়িয়ে রাগ চেপে বললেন,

" ভাবি, আপনি নিজেই শুনুন! শুনুন আপনার এই মেয়ে কী বলছে! বলে কিনা সে নিশানকে বিয়ে করবে না!"

খাদিজা এবার বিস্ময়ের দৃষ্টিতে মিমির দিকে তাকালেন। মিমির চোখে কান্নার দাগ স্পষ্ট, সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যেন মাটির নিচে ঢুকে যেতে চায়। তবে নিশানকে কাছে পাওয়ার জন্য পাগল মেয়েটার হঠাৎ এমন উল্টো অভিব্যক্তি দেখে ভ্রু কুঁচকালেন তিনি। এই বিয়ে তার অমতে হলেও তিনিও মনে মনে চাইছিলেন নিশানের সাথে মিমির বিয়েটা হতে। কারণ একবার নিশানের সাথে মিমির বিয়ে হয়ে গেলে, তিনি তখন মিমিকে খেলার গুটি বানিয়ে অনেক কাজ করতে পারবেন। নিজের স্বার্থের জন্যই তিনি একটু দমে গিয়েছিলেন।

নাসিরুল তালুকদার এবার ধীর কণ্ঠে বললেন,

" মিমি, ভনিতা করিস না মা। খোলা মনে বল, তোর কী সমস্যা? তুই কেনো বিয়েতে রাজি নস?"

মিমি কাঁপা কণ্ঠে বলল,

" বড় আব্বু, আমি নিশান ভাইকে বিয়ে করতে পারবনা। উনি আমায় পছন্দ করে না। উনি কখনো আমায়.....

কথা সম্পূর্ন হওয়ার আগেই পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রাশিদা তালুকদার যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। খাদিজার ভ্রু কুঁচকে গেল, আর নাসিরুল তালুকদার চোখ বন্ধ করে এক দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন।

রাশিদা এবার গর্জে উঠলেন,

" নাটক করছিস তুই? তাহলে এতদিন চুপ ছিলি কেন? এখন কেনো মুখ খুললি?"

মিমি মুখ তুলে তাকাল, গলায় জড়তা, তবুও স্পষ্ট বলল,

"আমি ভয় পেয়েছিলাম,মা! কিন্তু আমি সত্যি পারবো না! নিশান ভাই আমাকে ভালোবাসেই না।"

নাসিরুল এবার একটু খাঁকারি দিয়ে বলল,

" তাতে সমস্যা কী? বিয়ের পরেও তো ভালোবাসা যাবে। একবার বিয়েটা হয়ে গেলে তখন মায়া জন্ম নেবে। এতে এত কষ্ট পাওয়ার তো কিছু হয়নি মিমি। আর তুই তো নিজেও জানিস, নিশান ছোট থেকেই এরকম একঘেঁয়ে, অনুভূতিহীন। ওর একটু সময় লাগবে। কিন্তু একসময় অবশ্যই তোকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে, ভালোওবাসবে।"

মিমি তড়িঘড়ি করে দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,

" উহু, ভালোবাসবে না বড় আব্বু। কখনোই বাসবেনা। আমি জোর করে উনাকে পেতে চাই না। তোমাদের কে বলেছে ওনার মধ্যে অনুভূতি নেই? উনি ভালোবাসে, তবে আমাকে নয়!"

খাদিজা এ পর্যায়ে তড়িৎ গতিতে বলল,

" মানে? কী বলতে চাইছো তুমি?"

মিমি একটা বড় শ্বাস ফেলে আধো আধো স্বরে বলল,

" হয়তো নিশান ভাই অন্য কাউকে...! "

এবারো তালুকদার নীড়ের নীরব দুপুর যেন মুহূর্তেই এক ঝড়ো বাতাসে নড়ে উঠল। রাশিদা তালুকদারের মুখ পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেল, খাদিজা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন, আর নাসিরুল তালুকদার ধীরে ধীরে তার চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন। ঘরজুড়ে এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। রিমি মনে মনে আয়তাল কুরসি পাঠ করতে থাকলো।

রাশিদা রাগে কাঁপলেও এত বড় একটা কথা শুনে একটু দমে যায়ো কারণ সে চায় না এমন কিছু হোক, যাতে মিমির বিয়ে ভেস্তে যায়। খাদিজা তালুকদার এবার এক পা এগিয়ে এসে ঠান্ডা অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন,

" তুই কী বললি মিমি? নিশান অন্য কাউকে ভালোবাসে? এ কথা তোকে কে বলল?"

মিমি চুপ করে রইল। ওর ভয় হচ্ছে, যদি সত্যি কথাটা বলে, তাহলে আরও বড় ঝড় আসবে। রিমি চোখ বুঁজে রইলো। খাদিজা এবার আরও কঠিন স্বরে বললেন,

" নিশান আমার ছেলে! আমি ওকে চিনি! ও কোনো মেয়ে-টেয়েকে ভালোবাসে না। এসব মিথ্যা কথা বলা বন্ধ কর!"

নাসিরুল তালুকদার এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন,

" এই একটা কথা আমি বিশ্বাস করতে পারলাম না মিমি। আমার ছেলে মোটেই এমন নয়। এমন হলে আমি খুশিই হতাম।"

মিমি এবার কিছুটা জেদি গলায় বলল,

" তোমরা কিছুই জানোনা!"

খাদিজা এবার পুরোপুরি রেগে গেলেন। নাসিরুলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

" দেখেছো? তোমার বোনের মেয়ের কথা শোনো! তুমিও কি আমাদের ছেলেকে সন্দেহ করছো? আমার নিশান? যে কখনো কোনো বাজে পথ মাড়ায়নি! যে পড়াশোনা, ব্যবসা আর পরিবারের বাইরে কিছু বোঝে না? সে নাকি কাউকে ভালোবাসে? হাস্যকর কথা!"

রাশিদা এবার ধীরে ধীরে একটু সামলে নিলেন নিজেকে। তিনি এবার শান্ত স্বরে বললেন,

"শোন মিমি, এসব আবোল-তাবোল বকা বন্ধ করো। নিশান যদি কারও প্রতি একটু মায়াও দেখিয়ে থাকে, তাতে তুই এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিবি? তুই কি জানিস না, পুরুষ মানুষ বিয়ের পর স্ত্রীর প্রতি বাধ্য হয়ে যায়? তোর কোনো ভয় নেই, তুই এই বিয়েটা করছিস!"

মিমি এবার শক্ত গলায় বলল,

"না মা, আমি জোর করে এই বিয়ে করতে পারব না!"

এবার রাশিদা তালুকদার ও খাদিজা তালুকদার দুজনেই রাগে ফেটে পড়লেন। খাদিজা নিজের ছেলেকে নিজের বাধ্য প্রমান করতে চোখ কটমট করে বললেন,

"আমি দেখতে চাই, কে আমার ছেলের বিয়েতে বাঁধা দেয়! আর সবচেয়ে বড় কথা, আমার ছেলে কখনোই আমার অবাধ্য হয় না। আমি যদি একবার আমার ছেলেকে বলি যে, তুই এই বিয়েটা কর। সে এক বাক্য ব্যয় না করে এই বিয়েতে রাজি হয়ে যাবে।"

ঘরজুড়ে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। এমন সময় দরজার সামনে এক ছায়ামূর্তি দেখা গেল, নিশান! সে কখন এসেছিল, কেউ জানে না। কিন্তু এখন সে দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছে, মুখ গম্ভীর, চোখ জ্বলছে অদ্ভুত এক অনুভূতিতে...এতক্ষণ ধরে সব কথা শুনেছে সে। আকাশ গাড়ি থেকে নেমেই বাড়ি চলে গেছে, শৈলীও উপস্থিত। বাড়ির সদর দরজায় পা রাখতে এরকম একটা পরিবেশ দেখে থমকে গিয়েছিল শৈলী। কিন্তু নিশান চুপচাপ নীরব অভিব্যক্তিতে এতক্ষণ ধরে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে চলেছিল। নিশান যে সদর দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, এটা শুধুমাত্র রিমিই দেখতে পায়। সে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,

" নিশান ভাই..! "

রিমির কথা শুনে উপস্থিত সবাই চট করে দরজার দিকে তাকায়। ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। সবাই দরজার দিকে তাকাতেই নিশানের উপস্থিতি এক মুহূর্তের জন্য তাদের বাকরুদ্ধ করে দিল। তার চোখ দুটো স্থির, মুখ গম্ভীর। এই বাড়ির সব মানুষ তাকে বরাবরই কঠোর, নির্লিপ্ত ও নিয়ন্ত্রণাধীন বলেই চিনে এসেছে। অথচ এখন তার চোখের গভীরে এমন কিছু আছে, যা তারা আগে কখনো দেখেনি।

সবাই প্রথম দফায় অবাক হয়ে গেলেও খাদিজা তালুকদার যেন প্রমাণ করার সুযোগ পেয়ে গেলেন। তিনি দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেলেন, নিশানের বাহু চেপে ধরে বলতে থাকলেন,

" এইতো আমার ছেলে এসে গেছে। এখন ওই আসল কথা বলবে। এই এদিকে তাকা নিশান! ঠিকঠাক বল তো, এই মেয়ে কী বলছে এসব? তুই কি এই বিয়ে করবিনা?"

নিশান সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,

" কোন বিয়ে, মা? কার বিয়ের কথা বলছো তুমি?"

খাদিজা এবার শ্বাস ফেললেন। তিনি তো ভুলেই গিয়েছিলেন যে নিশান কে এখনো কিছু বলা হয়নি। খাদিজা এবার চোখের ইশারায় নাসিরুলকে বললেন যাতে ছেলেকে সবকিছু বুঝিয়ে দেয়। নাসিরুল এবার নিজের ছেলের দিকে গম্ভীর অভিব্যক্তি নিয়ে এগিয়ে এলেন। খাদিজা চুপচাপ সরে গিয়ে সোফায় বসে পড়লেন ভীষণ ক্লান্ত লাগছে তার রাশিদা কৌতহলী দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকলো সামনের দিকে। রিমি ভয়ে জুবুথুবু হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। মিমি ঢোকের পর ঢোক গিলছে। সামনে কী হবে, কিছুই বুঝতে পারছে না।

নাসিরুল এবার নিশানের সামনে গিয়ে বলতে শুরু করলো,,

" দেখ, নিশান। তোর বয়স হয়েছে, আর বাড়াবাড়ি করিস না। এভাবে বখাটে, বাউণ্ডুলে ছেলেদের মত তুই বাড়িতে বসে বসে থাকতে পারিস না। অনেক হয়েছে বাবা। এবার বিয়েটা করা তোর দরকার।তোকেও তো সংসার করতে হবে তাই না! ভেবে দেখ, তোর মা বাড়িতে একা থাকে। তার কি একটা সাথীর প্রয়োজন নেই বল। এজন্য আমি, তোর মামনি আর তোর মা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মিমির সাথে তোর বিয়ে দেব। তুই তো জানিস, তোর মামনির কি অবস্থা। এ অবস্থায় দুই মেয়েকেই যদি আমরা বিয়ে দিয়ে বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে দিই, তাহলে তোর মামনি কি নিয়ে বেঁচে থাকবে বল। এই কারণে মিমির সাথে আমরা তোর বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি আশা করব তোর কোনো আপত্তি নেই। তোর মায়ের ভাষ্যমতে তুই যেহেতু আমাদের বাধ্য সন্তান।"

রিমি ভেবেছিল নিশান মনে হয় এখুনি হুংকার দিবে।কিন্তু কিছুই বলল না নিশান। শৈলী ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছিল, সে পুরোপুরি ভাবে মাথা নিচু করে নিশানের পেছনে নিজেকে আড়াল করে রাখল, যাতে রাশিদা তালুকদার তাকে দেখতে না পায়। এমনিতেও এই পরিস্থিতিতে কেউ তার দিকে নজর দিচ্ছে না। নিশান এবার হাতে থাকা ব্যাগটা নিচে নামিয়ে রেখে বরাবরের মতো নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিল,

" তোমাকে কে বলল বাবা যে আমি সংসার করব না? আমি মোটেই হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসের হিমু চরিত্র নই যে, আমার সংসার করার ইচ্ছে থাকবে না। আমি অবশ্যই সংসার করবো।"

খুশিতে আপ্লুত হলেন খাদিজা। রাশিদার মুখেও হাসি ফুটে উঠলো তৎক্ষনাৎ। কিন্তু রিমি এবং মিমি অবাক নেত্রে চেয়ে রইলো। শৈলীর কোনো অনুভূতি নেই, সে চোখ বুঁজে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরন করছে। নাসিরুল সন্তুষ্ট দৃষ্টিতে মাথা নেড়ে বলেন,

" তাহলে তো আর কোনো সমস্যাই থাকলো না। দেখেছিস রাশিদা তুই শুধু শুধু এমন অশান্তি করছিলি। মিমিও কোনো কারন ছাড়াই....

নাসিরুলের কথা শেষ হওয়ার আগেই নিশান আবারো বলল,

" কিন্তু বাবা, আমি খুব দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে মিমির সাথে সংসার করা আমার পক্ষে সম্ভব না!"

এ পর্যায়ে রিমি, মিমি আর শৈলী বাদে বাজ পড়ল সবার মাথায়। নাসিরুল ভ্রু কুঁচকে তাকালেন,

" মানেহ?"

খাদিজা এবার সোফা থেকে ধুম করে উঠে দাঁড়িয়ে তড়িঘড়ি করে বলে উঠলেন,

" দোহাই লাগে তোর নিশান। খবরদার তুই বলিস না যে মিমির বলা কথাটাই সত্যি। তুই কাউকে পছন্দ করিস, এটা মোটেই বলিস না কিন্তু।"

রাশিদাও তাল মেলালেন,

" খবরদার, নিশান! তুই....!"

নিশান বিরক্তির সুরে বলে উঠলো,

" আশ্চর্য! এখানে হচ্ছে টা কী? বাবা, মা! তোমরা কী শুরু করেছো? ছোট থেকেই তোমরা আমাকে কোনো কাজে কখনো বাঁধা দাওনি। আমার উপর ভরসা রেখেছো সব সময়। তোমরা খুব ভালো করেই জানো, আমি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিই না যেখানে আমার নিজের ক্ষতি হয়, পরিবারের ক্ষতি হয়। সেখানে তোমরা আমাকে না জানিয়ে এরকম করে একটা বিয়ের সিদ্ধান্ত কীভাবে নিতে পারলে? আমার মতামত নেওয়ার প্রয়োজনবোধ তোমাদের মনে হলো না কেনো?'

এই প্রথম খাদিজা তালুকদার নিজের ছেলের চোখে এমন এক কঠোরতা দেখলেন, যা তাকে থমকে দিল। নিশান চুপ থাকার মানুষ, তা তিনি জানেন, কিন্তু এই নীরবতা যে এতটা শক্তিশালী হতে পারে, তা কখনো ভাবেননি। শৈলীে চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। সে জানে, নিশান যা করছে, সেটা তার জন্যই। কিন্তু সে এটাও জানে, এই কথাগুলোই আগামীতে আরও বড় ঝড় ডেকে আনবে।

" তোর কী সত্যিই কারও প্রতি কোনো দুর্বলতা আছে? তুই কাওকে পছন্দ করিস?"

রাশিদা হতভম্ব হয়ে বলে উঠলেন।

নিশান কিছু বলল না। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঘরময় ঘুরে বেড়াল, তারপর স্থির হলো মিমির দিকে। মিমির হাত দুটো কাঁপছে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। নাসিরুল তালুকদার এবার গম্ভীর স্বরে বললেন,

"নিশান, চুপ করে থাকবি না। সত্যি কি মিমি যা বলছে, তা সত্য?"

নিশান এবারও চুপ। তার চোখে অদ্ভুত এক শীতলতা। যেন এই কথাগুলোর কোনো মূল্যই নেই তার কাছে. খাদিজা এবার একধাপ এগিয়ে এলেন, কণ্ঠস্বর কঠিন, নির্দেশনামূলক,

" নিশান, আমি তোর মা। আমি তোকে প্রশ্ন করছি, উত্তর দে নিশান! তোর জীবনে অন্য কেউ আছে কি না? সত্যি বলতে আমি তোর মতামতকেই বেশি গুরুত্ব দেব বাবা। তুই বল, কাকে তোর পছন্দ।"

নিশান এবার ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল, গভীর শ্বাস নিল, তারপর ঠান্ডা স্বরে বলল,

"আমি এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে চাই না।"

তার এই নির্লিপ্ত উত্তর যেন পুরো ঘরকে আরও অস্বস্তিকর নীরবতায় ডুবিয়ে দিল। শৈলী এতক্ষণ চুপ ছিল, কিন্তু নিশানের এমন আচরণ দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে জানে, এই নীরবতা সবকিছুর থেকেও বেশি কিছু বলে দিচ্ছে। রাশিদা এবার মুখে হাত চাপা দিলেন, যেন তার কল্পনার বাইরের কিছু ঘটে গেছে।

খাদিজার দৃষ্টি এবার আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। নিশান এবার চোখ তুলে তাকাল মায়ের দিকে, তার গলায় কোনো আবেগ নেই। নাসিরুল তালুকদার এবার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেন,

" তাহলে তুমি এই বিয়ে করবে না?"

" না! " শক্ত কন্ঠে জবাব দেয় নিশান। তার জবাবের অভিব্যক্তি দেখে পেছন থেকে কেঁপে উঠছে শৈলী।

নাসিরুল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

" তাহলে বলো, কাওকে পছন্দ করো তুমি?"

নিশান এবার খানিক মাথা ঘুরিয়ে পেছনে মাথা নিচু করে নিজেকে আড়াল করে রাখা শৈলীর দিকে তাকালো। তার টলমল করা ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে কাটকাট কণ্ঠে জবাব দিল,

" হ্যাঁ! একজনকে..... নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দেয়ার খুব ইচ্ছে! "

শৈলী মায়াময় দৃষ্টি ফেলল। ততক্ষণে নিশান সামনে তাকিয়েছে। নিজের গম্ভীর ছেলেকে হঠাৎ করে এমন কাট কাট কন্ঠে কথা বলা দেখে স্তব্ধ হলেন খাদিজা তালুকদার, রাশিদাও বেশ অবাক হলেন।

নাসিরুল মাথা নেড়ে জানতে চাইলো,

" কে সে? বলো।"

নিশান এবার মুচকি হাসলো, চোখের মধ্যে কি যেন এক অদ্ভুত দৃষ্টি দেখা গেল তার। হঠাৎ করেই খুব বিষাদ গলায় বলতে শুরু করল,

" জীবনে প্রথম কোনো নারীর একফোঁটা অশ্রু বুকের ঠিক বাঁ পাজরে এসে লেগেছে। প্রথমবার অনুভব করেছিলাম আমার বুকের বাঁ দিকটা শূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে, যা এতদিন টের পাইনি। সহসা অস্থির হলাম, খুঁজতে শুরু করলাম সেই পূর্নতা। হঠাৎ করেই উপলব্ধি করে ফেললাম, সে আর কেও নয়! সেই পূর্নতার নাম শৈলী। বাঁ পাজরের পূর্নতা দেয়ার জন্যই সে জন্মেছে, শুধু আমার জন্য! দেরি করলাম না। সাথে সাথে তার নাম দিয়ে দিলাম আমার হিমরূপা!"

সাথে সাথে যেন তালুকদার নীড় কেঁপে উঠলো। এতক্ষণ ধরে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সব কিছু সামাল দেওয়া নাসিরুল তালুকদারও যেন স্তব্ধ হয়ে তাকালেন নিজের ছেলের দিকে। খাদিজা শরীর ভেঙে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিলেন। রাশিদাও অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে নিজের মেয়ে দুটোর দিকে তাকালেন। তৎক্ষনাত বুঝতে পারলেন যে আর কেউ না জানলেও এরা দুজন ঠিকই জানতো। খাদিজা বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে বলে উঠলেন,

" এ তুই কী বলছিস নিশান? "

নিশন মাথা নেড়ে জবাব দিল,

" হ্যাঁ! শৈলীকে বিয়ে করতে চাই আমি। "

নিশানের বলতে দেরি হলো, নাসিরুল তালুকদারের সাথে সাথে তেড়ে এসে নিশানের গালে একটা চড় লাগাতে দেরি হলো না। নিশানের গালে শক্তপোক্ত হাতের চড় পড়তেই সবাই চমকে উঠল। নিশানের পেছনে থাকা শৈলী আঁতকে উঠল, ঠোঁট ভেঙে কান্না চলে আসলো তার। সে তড়িঘড়ি করে পেছন থেকেই নিশানের শার্টের একটা অংশ খামচে ধরল। ভয় হাত-পা কাঁপছে রীতিমত।

নিশানের গায়ে হাত তুলেও ক্ষান্ত হনননি নাসিরুল। রেগে মেগে বেহাল অবস্থা তার। এতদিন ধরে তালুকদার পরিবারের কর্তা নীরব থেকে সবকিছু সামলে দিয়ে গেলেও আজ যেন নিজের রূপটা বের করলেন তিনি,গর্জন তুললেন, বাঘের ন্যায় হুংকার দিয়ে বলতে থাকেন,

" পাগল হয়ে গিয়েছো তুমি? কী বলছো এসব? মাথাটা গিয়েছে তোমার? যা বলছো ভেবে বলছো তুমি? শেষমেশ ওকে পছন্দ করলে? আর কেও ছিল না? এই এতিম মেয়েটা কে তুমি? ছিঃ! তোমার পছন্দ দেখে অবাক হচ্ছি আমি!"

নিজের বড় আব্বুর হঠাৎ এমন পরিবর্তন দেখে শৈলী ভেজা চোখে অবাক হয়ে তাকালো। ইনি কি সেই নাসিরুল তালুকদার, যে কিনা শৈলীকে এতটা আদর করতো, ভালোবাসতো, সবার আড়ালে স্নেহ করত, তিনিই আজ তাকে এতিম বলে সম্বোধন করছে! হঠাৎ করেই শৈলীর মনে হলো পৃথিবীতে আসলে কেউই কারো জন্য নয়, সবই মায়া, সবই অভিনয়।

এদিকে প্রথমবারের মতো নিজের বাবার হাতে চড় খেয়েও কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেখালো না নিশান। খুব নীরব থাকলো সে। এক হাত দিয়ে নিজের ঠোঁটের কোনায় লেগে থাকা রক্তটা মুছে নিল। ঠোঁটটা ফেটে গেছে বোধহয়। তবুও কিছু বলল না। স্থির দৃষ্টি ফেলে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

" আমি জানিনা আমি ভুল করেছি কিনা। কিন্তু যা করেছি তাতে আমার কোনো আফসোস নেই। এখন তুমি বলো, তুমি কি চাও বাবা? মিমিকে বিয়ে করলে আমি কখনো সুখী হতে পারব না, আর না ওকে সুখী করতে পারব। তাই ওকে বিয়ে করার কথা বলো না। এতে অশান্তি বাড়বে বৈ কমবে না!"

খাদিজা মুখে আঁচল চেপে কাঁদতে শুরু করলেন। রাশিদা প্রতিক্রিয়াহীন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন, অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন শৈলীর দিকে। আজ যেন সব কিছু উল্টে গেল। প্রকৃতি যেন অন্য প্রতিক্রিয়া দেখানো শুরু করল। এতদিন ধরে সবকিছু অনুকুলে রাখার মূল হোতা নাসিরুল তালুকদার হঠাৎ করেই তর্জনী আঙ্গুল তুলে দরজার দিকে দেখিয়ে দিলেন নিশানকে। কাট কাট কণ্ঠে বলে উঠলেন,

" তুমি যদি তোমার সিদ্ধান্তে অটল থাকো, তাহলে এই মুহূর্তে ওই মেয়েটাকে নিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যাও। এই বাড়িতে তোমার বা অন্য কারো কোনো অধিকার নেই। "

সবাই আরেক দফা চমক খেলো। এবার রিমি আর মিমিও আঁতকে উঠলো। আঁতকে উঠলো শৈলী। শুধু অনুভূতিহীন নিশান শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকলো। নাসিরুল গম্ভীর কন্ঠে আবারো বলে উঠলেন,

" সবাই শুনে রাখো, আজ আমি নাসিরুল তালুকদার বলে দিচ্ছি, আজ থেকে এ বাড়িতে নিশান তালুকদার বা শৈলী তালুকদার কারো কোনো অধিকার নেই। সবাই ভুলে যাও যে এ বাড়িতে দুজন ছেলে মেয়ে ছিল।"

একটু থেকে তিনি এবার নিশানের দিকে তাকিয়ে বললেন,

" আর তোমরা দয়া করে এই মুহূর্তে এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও। সদর দরজাটা ওদিকে।"

চলবে............

🍁🤲আমি নির্দোষ!🥹 রিচেইক দিইনি, বানান বা অন্য কোন ভুল হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন❤️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন