ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের লালনছোঁয়া

২৫তম পর্ব

লেখক: অনামিকা তাহসিন রোজা

#প্রেমের_লালনছোঁয়া

#পর্ব_২৫ ( সারপ্রাইজ পর্ব)

#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

" আর কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে নিশান ভাই?"

বেলুনের ন্যায় চুপশে যাওয়া অসহায় মুখখানা কাতরতাপূর্ণ করে মিনমিন করে উঠলো শৈলী। টানা আধঘন্টা ধরে সে কান ধরে বারান্দায় এই কড়া রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। সামনেই চেয়ার টেনে আয়েশ করে বসে আপেল চিবোতে ব্যাস্ত নিশান। তার কোনো কিছুতেই আপাতত ভ্রুক্ষেপ নেই। সে পায়ের উপর পা তুলে আপেল খাচ্ছে আর তীর্যক দৃষ্টি ফেলে তার বউ শৈলীকে পাহারা দিচ্ছে। অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে শাস্তিস্বরূপই শৈলী কড়া রোদে দাঁড়িয়ে আছে, তাও আবার কান ধরে।

মূলত আজ শৈলী নিজের নিরামিষ স্বামীর কাছ থেকে দন্ডপ্রাপ্ত হয়েছে, শাস্তিস্বরূপই তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে বারান্দায় এই গা পোড়ানো রোদে। কোনো কারন ছাড়াই শৈলীকে শাস্তি দেয়ার মত মানুষ নিশান নয়। নিশান বিয়ের সপ্তাহখানেক পরই শৈলীকে কাটকাট করে জানিয়ে দিয়েছে ভাই ভাই বলে ভাঙা রেডিওর মতো প্যানপ্যান না করতে। অথচ বোকা শৈলী রিমি আর আকাশের এঙ্গেজমেন্টের দিনই সকল আত্মীয় দের সামনে নিশানকে ভাই ভাই বলে ডেকেছে বারংবার। সেই সময় রেগে বোম হয়ে যাওয়া নিশান কোনোমতে পরিস্থিতি সামলালেও পরবর্তীতে শৈলীর বাটনা বাটার সিদ্ধান্ত নেয় নিশান। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই আজ দুপুরের কড়া রোদে সে শৈলী কান ধরিয়ে বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রেখেছে।

শৈলী ঘেমে একাকার হয়ে গেছে। কাতর কন্ঠস্বর আরো বেশি জোরালো হলো,

" আর কতক্ষণ নিশান ভাই? "

নিশান চোয়াল শক্ত করে বলল,

" যতক্ষণ এভাবে ভাই ভাই করবি ততক্ষণ! ভাবা যায়, তোকে পানিশমেন্ট দেয়া হয়েছে। আর তুই এখনো ভাই ভাই করছিস?গুড! আজ সারাদিন-সারারাত এভাবে দাঁড়িয়ে থাক। আমারো দেখতে ভালো লাগছে। "

শৈলী ঠোঁট উল্টালো। চোখে পৃথিবীর সমস্ত মায়া এনে বলে উঠলো,

" আপনি অফিস যাচ্ছেন না কেনো?"

" আজ বাবাকে বলেছি যাব না। ছুটি নিয়েছি।"

বলেই নিশান ফোন বের করে স্ক্রোল করা শুরু করল।

শৈলী এবার কানে রাখা দুহাত কিছুটা আলগা করে বলল,

" এটা কি আমার দোষ বলুন? মানুষ তো অভ্যাসের দাস। আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন কী করব? আর তাছাড়া, আমি আপনাকে নাম ধরে ডাকতে পারব না। উহু! পারবই না! "

নিশান ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে,

" কোন দুঃখে? "

" লজ্জা লাগে! "

বলেই ঠোঁট ভিজিয়ে চোখ বুঁজলো শৈলী। আসলেই তার খুব লজ্জা লাগে। এভাবে কি নাম ধরে ডাকা যায় নাকি?

শৈলী একটু ভ্রু কুঁচকে নিশানের দিকে তাকাল। সে কি সত্যি সত্যি আজ সারাদিন-সারারাত এই কড়া রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকবে? ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। মুখ ছোট করে মিনমিন করল,

"আচ্ছা, আমি যদি ভাই না বলি, তাহলে কি এখনি ছেড়ে দেবেন?"

নিশান এক হাত দিয়ে চিবানো আপেলের শেষ অংশটুকু মুখে পুরে নিয়ে অন্য হাত দিয়ে ঠান্ডা পানির গ্লাসটা তুলে এক ঢোকে খেয়ে ফেলল। তারপর হেলান দিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে বলল,

"হুম, ছাড়ব। তবে শর্ত আছে।"

শৈলীর চোখ চকচক করে উঠল,

"কী শর্ত? বলুন!"

নিশান এবার তার ফোনটা টেবিলে রেখে শৈলীর দিকে সরাসরি তাকাল,

" আজ থেকে আমাকে তুমি নাম ধরে ডাকবি। আর যদি ভুলে আবার ভাই বলিস, তাহলে পরেরবার পানিশমেন্ট দ্বিগুণ হবে। ইউ নো হোয়াট, আছাড় মেরে হাড্ডি-গুড্ডির রফাদফা করে দেবো!"

শৈলী ভীষণ চমকে গেল। সে ভাবছিল, নিশান হয়তো সহজ কিছু বলবে, যেমন 'সরি বল' বা 'আমার জন্য কফি বানিয়ে আন', কিন্তু আবার সেই নাম ধরে ডাকতে হবে? তাও আবার তুমি করে? এটা তো অসম্ভব! সে লজ্জায় কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বলল,

"আমি পারব না!"

নিশান গম্ভীর মুখে তাকাল,

"তাহলে দাঁড়িয়ে থাক! কাকতাড়ুয়ার মতো সুন্দর লাগছে তোকে!"

শৈলী হঠাৎ করেই প্রতিবাদী হয়ে উঠলো,

" আপনি তো আমাকে তুই তুই করে ডাকেন! এটার কী হবে? আমি পারবনা আপনার কথা শুনতে। আপনি আমায় সবার সামনে তুই তুই করেন। ওইদিন আকাশ ভাইয়ার বড় বোন আমাকে বলছিল যে আপনি নাকি আমায় পছন্দ করেন না, তাই তুই তুই করেন।

নিশান ভ্রু কুঁচকালো। একদম শান্তভাবে ধীরস্থির গলায় বলল,

"এই কথাটা তুই বিশ্বাস করেছিস?"

শৈলী রাগে গজগজ করতে করতে বলল,

" অবশ্যই! আপনি তো তুই তুই করেন! আপুটা তো মিথ্যা বলেনি, আপনি আমাকে সত্যিই পছন্দ করেন না! পুরোনো হয়ে গেছি এত তাড়াতাড়ি? "

নিশান এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর একটু নরম গলায় বলল,

"শৈলী, শুনে রাখ, আমি তোকে তুই বলি কারণ তোর সঙ্গে আমার দূরত্ব নেই। আমার আপনজনদের সঙ্গেই আমি এমন করে কথা বলি। আমি যদি তোকে তুই বলে ডাকি, তার মানে তুই আমার খুব কাছের, খুব আপন। আর কে কী বলল, সেগুলো শুনে মন খারাপ করবি না। বুঝলি? সবচেয়ে বড় কথা, আমি তোকে আদর করেই তুই ডাকি!"

শৈলী কিছুটা অবাক হয়ে গেল। তার বড় বড় চোখদুটো বিস্ময়ে ঝলমল করে উঠল। সে একটু চুপ করে থেকে মিনমিন করে বলল,

"তাহলে আপনি আমাকে পছন্দ করেন?"

নিশান একদম গম্ভীর মুখে, চোখ সরু করে তাকিয়ে বলল,

"না, একদমই না। আমি শুধু রোদে দাঁড় করিয়ে রাখার শাস্তিটুকুই দিতে চাই, ভালোবাসার শাস্তি নয়!"

শৈলী হতভম্ব হয়ে গেল।

"মানে?"

নিশান এবার উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে এক পা এগিয়ে এল, শৈলীর কানের কাছে মুখ এনে খুব আস্তে করে ফিসফিস করে বলল,

"মানে, আমি তোকে পছন্দ করি না, আমি তোকে...!"

কথা অসম্পূর্ণ রাখলো নিশান। চোখ নামালো মেঝেতে। সে এরকম সরাসরি কখনোই শৈলীকে ভালোবাসার কথা বলেনি। বলবেও না! কখনো বলতে পারেনি। তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারো চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল। শৈলী ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এক মুহূর্ত থমকে গেল। তারপর হঠাৎ করেই তার কানের ওপর রাখা হাত সরিয়ে মুখ লাল করে বলল,

" জীবনে বলতে পারবেন না। ভীতু একটা। দরকারও নেই। আপনার এসব কথা শুনতে চাই না! আপনি খারাপ!"

নিশান হেসে বলল,

"আর তুই বোকা!"

শৈলী মুখ ফুলিয়ে বলল,

"আমি এখন আপনাকে আর কিছুই বলব না! আপনি খারাপ! একদম খারাপ!"

নিশান হেসে বলল,

"আর তুই আমার সবচেয়ে মিষ্টি বউ! তাড়াতাড়ি যেটা বলছি সেটা কর, নইলে শিলপাটা দিয়ে থেতলে তিতা বানাবো তোকে!"

শৈলী হতাশ হয়ে একবার উপরে আলোকিত রৌদ্রভরা আকাশের দিকে তাকাল, একবার নিশানের দিকে। মনে মনে ভাবল, 'নিশান কি সত্যিই এত নিষ্ঠুর?' একটু ভাবার পর সে মুখে ভীষণ দুষ্টু হাসি নিয়ে নিশানের দিকে তাকিয়ে বলল,

"ঠিক আছে, আমি ডাকছি।"

নিশান ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি চাপল, অপেক্ষা করছে শৈলী কীভাবে ডাকে। শৈলী একটু গলা খাঁকারি দিয়ে, গলা নামিয়ে, একদম মাটির দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলল,

"নি..নি...নি...নিশা...নিশান!"

নিশান ভ্রু কুঁচকে তাকাল,

"এটা কী হলো? নেটওয়ার্কের প্রবলেম হয়েছে ? নাম ধরে ডাকতে বলেছি, গর্ত খুঁড়তে বলিনি! আরেকবার ঠিকভাবে ডাক!"

শৈলী এবার চোখ বন্ধ করল, গভীর নিঃশ্বাস নিল, তারপর একদম স্পষ্ট স্বরে বলল,

"নিশান!"

এই প্রথমবার সে তার স্বামীকে এভাবে ডাকল। বলেই সে চোখ শক্ত করে বুঁজে ফেলল, যেন কোনো ভয়ঙ্কর অপরাধ করে ফেলেছে! কিন্তু যখন কিছুই হলো না, সে এক চোখ খুলে দেখল নিশানের মুখে একটা প্রশান্তির হাসি।

নিশান চেয়ার ছেড়ে উঠে এল, এক হাতে শৈলীর কানের ওপর রাখা হাত সরিয়ে দিল, অন্য হাতে তার ঘামে ভেজা গাল ছুঁয়ে মৃদু স্বরে বলল,

"দেখলি তো, কষ্টটা খুব কঠিন ছিল না! শুধু একটু সাহস লাগত।"

শৈলী লজ্জায় মাটিতে মুখ গুঁজে ফেলল। নিশান তার হাতটা ধরে বলল,

"চল, এবার তোর কফি বানিয়ে দে। আজ কিন্তু ছুটি নিয়েছি, আর আমি চাই আমার দিনটা সুন্দর কাটুক?"

শৈলী হাসল,

" আপনার দিন সুন্দর কাটানোর জন্য আমাকে শাস্তি দিতে হলো?"

নিশান কাঁধ উঁচিয়ে বলল,

"এটাকে শাস্তি বলো না, এটাকে প্রেমের নতুন পাঠ বল!"

শৈলী এবার আর কিছু বলল না, শুধু মুখ ঘুরিয়ে লজ্জায় মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। নিশান তৃপ্তির হাসি নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল,

"চল, দ্রুত এখন কফি বানিয়ে দে!"

শৈলী চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,

"উঁহু! আপনি অসহ্য!"

নিশান হাসতে হাসতে বলল,

"আর তুই আমার প্রশান্তি!"

ঘরে ঢোকার সাথে সাথে নিশান শার্ট পাল্টে নিয়ে নিচে নামার জন্য উদ্যত হতেই শৈলী মিষ্টি সুরে বলল,

" ব্ল্যাক কফি খাবেন নিশান ভাই? "

নিশান থামলো। দরজার বাইরে রাখা পা'টা ফিরিয়ে এনে মুখ কুঁচকে তাকালো। এমনভাবে নিজের স্ত্রীর দিকে তাকালো যেন সে কোনো ভয়ঙ্কর অপরাধের সাক্ষী হয়ে গেছে! সে এতক্ষণ কার জন্য কী করল? এ তো যেই লাউ, সেই কদু! কোনো লাভ হলো না।

নিশান শৈলীর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, চোখে অভিমানের মিশেলে হতাশা। তারপর দুই হাত বুকে বাঁধলো আর নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়ে বলল,

"আশ্চর্য! তুই তো একটুও শিখলি না! এই এত কিছু হলো, এত নাটক করলি, আমি এত কষ্ট করে তোকে বোঝালাম, আর তুই আবার..!"

শৈলী ফিক করে হেসে ফেলল,

"ঠিক আছে ঠিক আছে! ভুল হয়ে গেছে! রাগ করবেন না নিশান.....ভাই!"

নিশান এবার সত্যিই আঁতকে উঠল,

"এই শৈলী! আমার ধৈর্যের একটা সীমা আছে! একদম শেষবার বলছি....!"

শৈলী চটপট পেছন ফিরে দৌড় দিল রান্নাঘরের দিকে, মুখে চাপা হাসি,

"আচ্ছা, আচ্ছা! কফি বানিয়ে আনছি, হুবহু আপনার পছন্দের মতো! ঠিক আছে? নিশান..... ভাই!"

নিশান কপাল চাপড়ে বসে থাকল। তারপর আপন মনে বিড়বিড় করল,

" নাহ, এই মেয়ে আমার জীবন ছোট করে দেবে! আয়ু কমে যাচ্ছে আমার। গতরাতে মা বলছিল বাচ্চা নিতে। নাহ! এখন তো কোনভাবেই বাচ্চা নেবো না। নইলে বাপ হবো নাকি মামা হবো, সেই কনফিউশনে নিজেই মূর্ছা যাব আমি! "

ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে শৈলীর খিলখিল হাসির শব্দ এলো, যেন সে নিশানের বিড়বিড় করা শুনেই হাসছে! নিশান হতভম্ব হয়ে গেল। নিজের মাথা ধরে ফিসফিস করে বলল,

" এই মেয়ে কি টেলিপ্যাথি শিখে ফেলল নাকি?"

তারপর গম্ভীর মুখে রান্নাঘরের দিকে এগোতে লাগল। শৈলী তখনো হাসতে হাসতে কফির মগে দুধ ঢালছে। নিশান দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

"তোর হাসিটা একটু কমিয়ে আন শৈলী? আমি তো রীতিমতো ভয় পাচ্ছি এখন!"

শৈলী কফির কাপ এগিয়ে দিয়ে চোখ টিপে বলল,

"ভয় পাওয়ার কিছু নেই! আমি শুধু অনুমান করছিলাম, আপনি হয়তো ভাবছেন এখনই বড় মা'র কথা অনুযায়ী বাচ্চা নেওয়া উচিত হবে কি না।"

নিশান হাঁ হয়ে গেল।

"কীভাবে জানলি?"

শৈলী কাঁধ ঝাঁকালো,

"আপনার মুখে সব লেখা থাকে নিশান ভাই!"

নিশান ফুঁস করে উঠে বলল,

" শৈলী! আবার! আমি এইমাত্র ঠিক করলাম, আজকের পানিশমেন্ট ডাবল হবে! সিউর থাক!"

শৈলী হাতজোড় করে মিনতি করল,

"আহা, প্লিজ! আর না! আমি এবার সত্যিই শুধরে যাব!"

নিশান মুচকি হাসল,

"দেখা যাক, কতদিন টিকতে পারিস!"

শৈলী মুখ ভেংচি কাটল, আর নিশান কফিতে চুমুক দিতে দিতে মনে মনে ভাবল,"এই মেয়ের সাথে জীবন চালানো আসলেই কঠিন..কিন্তু, খুব মিষ্টি!"

~~~★

রিমি পার্কের এক কোণায় বসে আছে। চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। সে পড়েছে মহাবিপাকে। এঙ্গেজমেন্টের পর থেকেই কেনো যেন আকাশ তাকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছে না। কারন টা এখনো বুঝতে পারছে না সে। আকাশ কি তাকে ইগনোর করছে? কিন্তু কেনো? তাদের তো আর এক মাস পরই বিয়ে। এখন যদি এমন আচরন করে তাহলে কীভাবে হবে? তখনি দূর থেকে ভেসে এলো আকাশের অস্থির কন্ঠ,

" রিমি! জান আমার! আমি চলে এসেছি।"

আহ্লাদে আটখানা হয়ে যাওয়া আকাশের ঢঙ দেখে মুখ ভেঙচিয়ে জিহবা দেখালো রিমি। জান! ঢঙ দেখে বাঁচি না। হুহ! আকাশ দৌড়ে দৌড়ে এসে একদম রিমির সামনে এসে দাঁড়ালো। হাঁপাতে হাঁপাতে কোনোমতে চোখ উপরে তুলে বলল,

" খুব বেশি অপেক্ষা করিয়েছি?"

রিমি রাগ দেখাতে চাইলো। চাইলো একটু কথা শোনাতে। অপেক্ষা তো কম করেনি সে। কিন্তু আকাশের ঘর্মাক্ত মুখ আর ক্লান্ত অভিব্যক্তি দেখে মায়া হলো তার। দুদিকে মাথা নাড়িয়ে শান্ত ভঙ্গিতে বলে উঠলো,

" নাহ। বেশি দেরি করোনি।"

আকাশ খুশি হলো। সাথে সাথে নিজের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বসে পড়ল রিমির পাশে। পকেট থেকে বের করল একটা বেলী ফুলের মালা। রিমির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

" নাও। তোমার জন্য। সেদিন দেখছিলাম ওই হতচ্ছাড়া নিশান শৈলীর জন্য নিয়ে যাচ্ছিল। তাই ভাবলাম তোমারো হয়তো পছন্দ হতে পারে। এজন্য নিয়ে এলাম।"

রিমি মুঠো করে হাত বাড়িয়ে দিল,

" হাতে পড়িয়ে দাও।"

আকাশ খুশি হলো। একগাল হাসি নিয়ে মালাটা রিমির হাতে পরিয়ে দিল। তারপর গর্বিত ভঙ্গিতে বলল,

"এবার বলো, আমি তোমার কত ভালো ফিয়োন্সে?"

রিমি চোখ ঘুরিয়ে বলল,

"উঁহু, ভালো ফিয়োন্সে না, ঢংবাজ ফিয়োন্সে!"

আকাশ নাক সিঁটকালো,

" তাহলে বিয়ের পর ঢংবাজ স্বামী হবে! তখন তো আর পালানোর উপায় নেই!"

রিমি হেসে বলল,

"পালানোর দরকার নেই। বরং তুমি যদি ঠিক মতো আমার দিকে মন দাও, তাহলে আমিই পালাতে দেব না!"

আকাশ কপট গম্ভীর হয়ে বলল,

" তা তো দেখতেই পাচ্ছি! কিন্তু এই যে কয়েকদিন ধরে একটু ব্যস্ত ছিলাম, এতেই আমার উপর অভিমান?"

রিমি ভ্রু কুঁচকালো,

"ব্যস্ত ছিলে? কীসের ব্যস্ততা শুনি?"

আকাশ চোখ ছোট করে ফিসফিস করে বলল,

"তোমার জন্য বিয়ের সারপ্রাইজ প্ল্যান করছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে না করলেই ভালো হতো!"

রিমি সঙ্গে সঙ্গে উজ্জ্বল হয়ে উঠল,

" সত্যি? কী সারপ্রাইজ?"

আকাশ ঠোঁট উল্টে বলল,

"না, এখন বলব না! আগে একটা শর্ত দাও। যদি কথা দাও যে পরের সাতদিন কোনো রাগ-অভিমান করবে না, তাহলে হয়তো একটুখানি হিন্ট দিতে পারি!"

রিমি চোখ টিপে বলল,

"আচ্ছা, দেখি তোমার সারপ্রাইজের ওজন কত!"

আকাশ মুচকি হেসে রিমির হাতে মালার সুগন্ধ মাখা আঙুলগুলো ধরে বলল,

"ওজন মাপার দরকার নেই, শুধু ভালোবেসো,তাহলেই সব পাওয়া হয়ে যাবে!"

রিমি এবার সত্যিই আর কথা খুঁজে পেল না। শুধু আকাশের দিকে একরাশ মায়াভরা চোখে তাকিয়ে থাকল। তারপর সংবিৎ ফিরে পেয়ে বলল,

" এখন বলো না, কী সারপ্রাইজ? "

আকাশ গম্ভীর হয়ে বলল,

" ইন্দুরের নানির জন্য স্পেশাল, বিড়ালের কোরমা, চিকার জুস, তেলাপোকার চাটনি, কাঁকড়ার ডাল, পেঙ্গুইনের বিরিয়ানি, কয়লা স্পেশাল কালো ভাত, ঘাসের ভর্তা, ঝিঁঝিপোকার ফ্রাই, তেঁতুলের জিলাপি, চাইনিজ গোবরের রেসিপিসহ আরো অনেককিছু! এগুলো আমাদের বিয়েতে তোমার জন্য স্পেশাল ডিশ! জোস না?"

রিমি কিছুক্ষণ মুখ কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। আগে বিশ্বাস করতে চাইছে যে যা শুনলো তা সত্যি কিনা৷ রীতিমতো বমি আসছে তার, ভাবতেই গা গুলিয়ে আসছে। আকাশ চোখ পিটপিট করে তাকালো। রিমি তৎক্ষনাৎ রেগেমেগে একাকার হলো,

" ওয়াক থু। ছিঃ আকাশ! তোমার মতো অসহ্য আমি দুটো দেখিনি। ছিঃ। এগুলো কী ধরনের কথাবার্তা! রুচিটাই নষ্ট করলে। তোমাকে...তোমাকে তো আঁছাড় মেরে গুড়োগুড়ো করা দরকার। ইচ্ছে করছে এখনি আঁছাড় মেরে নদীতে ভাসিয়ে দিই!"

আকাশ আরো বেশি গম্ভীর হলো,

" ভুল বললে হুব বউ৷ তুমি আমায় আছাড় মারতে মোটেই সক্ষম নও। কারন তার মূল সংজ্ঞা তুমি জানো না।"

রিমি মুখ শক্ত করে বলল,

" জানতেও চাই না। চুপ থাকো।"

আকাশ দুদিকে মাথা নেড়ে বলে উঠলো,

" উহু, আমি জানাতে চাই। শোনো তবে।"

রিমি মাথা নাড়ালো,

" আকাশ নো!"

আকাশ ঠোঁট টিপে হাসল, তারপর গম্ভীর মুখে বলল,

" শোনো রিমি, প্রথমত, আছাড় হলো এমন একটি ক্রিয়া, যা সাধারণত রাগের বশে করা হয়, কিন্তু পরে যার ফলাফল দেখে নিজেকেই কষ্ট পেতে হয়!"

রিমি চোখ কুঁচকে তাকাল,

"মানে?"

আকাশ গলা খাঁকারি দিয়ে আবার শুরু করল,

"মানে হলো, ধরো, যদি তুমি তোমার ফিয়োন্সে কে রাগের মাথায় আছাড় দাও, তবে পরে সে যদি উঠে দাঁড়িয়ে পাল্টা আছাড় দেয়, তাহলে সেটাকে বলে 'রিটার্ন গিফট'!"

রিমি এবার চোখ উল্টাল,

" আকাশ! থামবে?"

আকাশ পাত্তা না দিয়ে বলতে লাগল,

" শোনো না আগে, অন্যভাবে, আছাড় হলো একটি লাভিং মুভমেন্ট, যা প্রয়োগ করলে সামনে থাকা ব্যক্তি মাটির সঙ্গে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত হয়!"

রিমি রেগে গিয়ে একটা খোঁচা দিল আকাশের বাহুতে,

"তোমার এই সংজ্ঞাগুলো শুনতে শুনতে আমার কান পচে যাচ্ছে! সেই প্রপোজ করার দিন থেকে এসব শুনছি! "

আকাশ গা ঝাড়া দিয়ে বলল,

" যখন কোনো হবু স্ত্রী তার হবু স্বামীকে আছাড় মারতে চায়, কিন্তু প্রেমের কারণে সেটি করতে পারে না, তখন সেটাকে বলে 'কল্পিত আছাড়'!"

রিমি এবার সত্যিই দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

"তুমি থামবে, নাকি সত্যি করে আছাড় খাবে?"

আকাশ নির্দোষ মুখে বলল,

"তুমি তো আর পারবে না! কারণ, তোমার কল্পিত আছাড়েই আমি টিকে যাব!"

রিমি এবার সত্যিই কিছু বলার জন্য মুখ খুলল, কিন্তু আকাশ হুট করে উঠে পড়ল,

"আচ্ছা আচ্ছা, আর বলব না! এখন ফুচকা খেতে চলো!"

রিমি মাথা ঝাঁকাল,

"তোমার জন্য বিষ মিশিয়ে দিই?"

আকাশ হাসতে হাসতে বলল,

"তাহলে সেটা হবে 'বিষমাখা ভালোবাসার ফুচকা! আমি খেয়ে নিব! নো প্রবলেম! "

রিমি একদম থতমত খেয়ে গেল,

"আকাশ, তুমি একটা অসহ্য পাগল!"

আকাশ মিষ্টি করে বলল,

" আর তুমি আমার জীবন!"

~~~★

রাত গভীর হয়েছে। নিশান বিছানায় ল্যাপটপ নিয়ে বসে আছে। আজ সারাদিনেও সে নিজের বউকে শোধরাতে পারেনি। তাই সে এখন রেগেমেগে বসে আছে। প্রতিজ্ঞা করেছে শৈলীর সাথে কথাই বলবেনা। ঘরে ঢুকে পরিস্থিতি বুঝতে পারলো শৈলী। মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে নিশানের পাশে এসে বসলো। নিশান তখনো মুখ শক্ত করে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটদুটো আঁটসাঁট করে রাখা, যেন সে কোনোভাবেই শৈলীর দিকে তাকাবে না।

শৈলী একটু ঝুঁকে তার মুখের সামনে হাত নেড়ে বলল,

" শুনছেন?"

কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাল না নিশান। শৈলী আবারো বলল,

" এত রাগ করছেন কেন?"

নিশান ঠান্ডা গলায় বলল,

" ঘর থেকে বের হ!"

শৈলী মুখ চেপে হাসল,

" আরে, আমি তো মজা করে বলেছি!"

নিশান এবার চোখ সরিয়ে এক ঝলক তাকাল,

"তাহলে আমারও মজা করে রাগ করা উচিত, তাই না?"

শৈলী ঠোঁট উল্টে বলল,

"এত সিরিয়াস হওয়ার কিছু নেই। আচ্ছা, আর ডাকবো না ভাই, ঠিক আছে?"

নিশান গম্ভীর মুখে কীবোর্ডের উপর আঙুল চালাল,

"বিশ্বাস করব কিভাবে?"

শৈলী একটু থেমে কাতুকুতু দেওয়ার মতো করে নিশানের বাহুতে আঙুল চালাল,

"এইভাবে?"

নিশান একদম নড়ল না। শৈলী এবার সরাসরি নিশানের কোলের ওপর রাখা ল্যাপটপ বন্ধ করে রেখে দিল,

" কথা বলুন না, প্লিজ!"

নিশান চোখ ছোট করে তাকাল,

"তোর তো ভাই ডাকতে কোনো সমস্যা হয় না, তাহলে এখন এত পীড়াপীড়ি কেন?"

শৈলী একদম বিনয়ের সুরে বলল,

"এইজন্য যে, আপনি রেগে গেলে আমার কষ্ট হয়!"

নিশানের ঠোঁট কাঁপল একটু, কিন্তু সে সেটা চেপে রাখল। শৈলী এবার মিষ্টি সুরে বলল,

"আমার জন্য এত রাগ করে থাকবেন, তাহলে ভালোবাসা কখন দেখাবেন?"

নিশান চোখ সরিয়ে নিল, কিন্তু কপালের ভাঁজ একটু কমে এল।শৈলী আরও এগিয়ে এসে দুহাত এক করে বলল,

"ভালোবাসেন না আমায়?"

নিশান একদম ধীর কণ্ঠে বলল,

"তাই তো রাগ করেছি!"

শৈলী এবার হাসল, তারপর কপট গম্ভীর হয়ে বলল,

" আচ্ছা, ঠিক আছে! তাহলে এই ভাই ডাকাটাই চালিয়ে যাই, রাগ করলে তো বোঝা যায় ভালোবাসেন!"

নিশান তৎক্ষণাৎ তাকিয়ে বলল,

"শৈলী!"

শৈলী দ্রুত হাসি চেপে বলল,

" উফফ, সরি সরি! বললাম তো আর ডাকবো না!"

নিশান এবার সত্যিই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"তুই আমায় পাগল করে ছাড়বি! দেখবি একদিন আকাশও আমার থেকে সুস্থ আছে। আমিই পাগল হবো!"

শৈলী মিষ্টি করে বলল,

" আপনার জন্যই তো পাগল আমি! আপনিও না হয় পাগল হলেন।৷ তাতে কী?"

নিশান এবার সত্যিই হাল ছেড়ে দিল। ল্যাপটপ পাশে সরিয়ে শৈলীর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল,

"তুই জিতলি!"

শৈলী হাসতে হাসতে বলল,

" তাই তো! নিশান ভাই!"

নিশান চোখ বড় বড় করে বলল,

"শৈলী!!"

শৈলী দৌড়ে পালাল, আর নিশান ল্যাপটপ ছুঁড়ে তার পেছনে তেড়ে গেল! থাকুক না, এমন কিছু খুনসুটি!

সমাপ্ত ✨

★ প্রিয় পাঠকমহল, আগামী মে মাসে #প্রেমের_লালনছোঁয়া এর সিজন ২ আসবে❤️ আর আজ রাতে ছোট করে একটা লাইভ হবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন