#বিবাহ_সমাচার
#মিশকা_মুন {লেখনীতে}
ঈদ স্পেশাল পর্ব🤭
০১.
চারদিকে খুশির আমেজ। একটু পরপর মানুষজন হইহই করে উঠছে। পুরো পাড়া জুড়ে হৈ-হুল্লোড় চলছে। বাচ্চা কাচ্চারাও বাজি পুড়াচ্ছে। বড়োদের কথার আওয়াজ ভেসে আসছে। সবাই প্রাণ খুলে আসছে। একেকজন একেক আনন্দে মেতেছে। কিন্তু এই সব কিছুর মধ্যেও স্বাধীন দরজা জানালা লাগিয়ে দিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসে বসে কাজ করছে। তার এসবে মন নেই ঈদের আগেই একটা প্রজেক্ট কমপ্লিট করে দেওয়ার কথা থাকলেও কিছু কারণে কাজ শেষ করতে পারেনি। তাই ঠিক করেছে ঈদের ছুটির মধ্যে কাজটা শেষ করে রাখবে। এই উদ্দেশ্য চোখ কান বন্ধ রেখে একমনে কাজ করে যাচ্ছে বেচারা।
ইভা দৌড়াতে দৌড়াতে এলো। হুট করে ল্যাপটপের উপর থেকে হাত তুলে চেপে ধরে হাঁপানো কণ্ঠে বলল,
“চলুন চলুন চাঁদ উঠেছে চাঁদ দেখে আসি।”
স্বাধীন বিরক্ত হলো না। অসহায় কণ্ঠে বলল,
“অনেক কাজ আছে ইভু তুমি গিয়ে দেখে এসো। তাহলেই হবে আমার যেতে হবে না।”
ইভা নাক ফুলায় চোখ রাঙিয়ে বলে,
“না মানে না। যেতেই হবে আপনাকে চাঁদ দেখবেন না?”
“ফোনেই তো দেখা যায়।”
“যায় কিন্তু আমি ছাদে গিয়ে দেখব নিজের চোখে।”
“ফোনে কি অন্যর চোখে দেখো?”
“আপনি কি যাবেন?”
“না! চাঁদ দেখে কি হবে?”
“চাঁদের বিয়ে হবে।”
“হোয়াট?”
“আমি এসব কিছু জানিনা। আমি আপনার সঙ্গে গিয়েই চাঁদ দেখব।”
স্বাধীন বুঝলো এই মেয়ে নাছোড়বান্দা অন্য ভাবে মানাতে হবে নইলে মানবে না। তাকে কিছু ভাবতে দেখে ইভা মুখ ভেঙচি কাটলো। টোন মেরে বলল,
“শুনুন জামাই মশাই আজকে পড়তে বসার কথা বলে লাভ নেই। আজকের দিনে কেউ পড়তে বসে না। তাই আমিও বসব না আমার বাপও বসবে না।”
স্বাধীন থতমত খায়। থমথমে মুখ করে চায়। আসলে ইভা যখন পড়তে বসতে চায়না। তখন সে মাঝে মাঝে রাগ করে বলে তুমি পড়বে সাথে তোমার বাপও পড়বে। সেই কথায় আজ সে ঘুরিয়ে পেচিয়ে ফেরত দিলো। কথায় পারা যাবে না কিন্তু পড়াশোনায় এক নাম্বারের ফাঁকিবাজ। সে যাইহোক এখন একে তাড়ানোর একমাত্র বুদ্ধি অন্য কিছু। ল্যাপটপ-টা পাশে সরিয়ে রেখে ইভাকে টান মেরে কোলে বসালো। বেচারি হকচকিয়ে গেল।
“কি হলো?”
স্বাধীন হাসে। ভালো ভাবে কোলে বসিয়ে নিয়ে ঘাড়ে থুতনি রাখে। ইভার কানের কাছে ঠোঁট লাগিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“ আমার ঘরে চাঁদ থাকতে, ছাদে কেনো চাঁদ দেখতে যেতে হবে?”
ইভা লজ্জায় শেষ। দু হাত দিয়ে মুখ ঢাকলো। তাকে আরেকটু লজ্জা দিতে স্বাধীন তার ঘাড়ে চুমু খেলো। শেষ এবার তার সব জারিজুরি শেষ। লজ্জাবতী পাতার মত মিইয়ে গেল। অস্পষ্ট সুরে বলল,
“মা মনেহয় আমাকে ডাকছে।”
স্বাধীন মিটমিট করে হাসে। ছাড়েনা। হাতের বাঁধন আরেকটু শক্ত করে বলল,
“চাঁদ রাতে আরেক চাঁদকে ঘরে বসে দেখার সৌভাগ্য পেলাম আর একটুখানি ভালোবাসা দিব না তাই কখনো হয় বউ?”
ইভা এবার ছটফটিয়ে উঠল। না এখানে আর থাকা যাচ্ছে না। এমন ছটফটানো দেখে স্বাধীন পরপর আরও চারটে ভালোবাসা দিয়ে ছাড়লো। ইভা ছাড়া পেতেই এক দৌড়ে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ালো। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“ ভালো হয়ে যান।”
“তোমার ভালোবাসা পেলে ভালো হয়ে যাব এসো।”
ইভা বিড়বিড়িয়ে কিছু বলে ছুট লাগালো তাকে এভাবে পালাতে দেখে স্বাধীন ফিক করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে আওড়ালো,
“পাগলী বউ আমার।”
০২.
জয়নাল সাহেব গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে রুমে এলেন। তিথি বসে বসে ঝিমাচ্ছিলেন।
“কি গো গিন্নি ঘুমাচ্ছো?”
তিথি চোখ মেললেন। মাথা নাড়িয়ে বললেন,
“না একটু চোখ লেগে এসেছিল।”
জয়নাল সাহেব এসে স্ত্রীর হাত ধরে টেনে তুললেন। হাঁটতে হাঁটতে বললেন,
“চলো চলো টিভিতে গান হচ্ছে রমজানের ঔ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।”
“না গেলে হয় না?”
“না না তুমি না গেলে হয় নাকি?””
ড্রয়িং রুমে সবাই বসে ঈদের গান শুনছিল। জয়নাল সাহেব এসেই স্ত্রীকে নিয়ে একদম টিভির সামনে দাঁড়িয়ে পরলেন। সবাই আগ্রহ নিয়ে তাকালো। দাদাভাই মানেই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার স্যাপার। সংগ্রাম ছিটি বাজিয়ে বলল,
“ আরে রোমিও জুলিয়েট হাজির।”
তিথি নাতজামাই কে চোখ রাঙালো। কিন্তু এতে তার কি সে উল্টে চোখ মারলো। জয়নাল সাহেব এসবে পাত্তা দিলেন না স্ত্রীর থুতনিতে হাত রেখে বললেন,
“দেখো দেখো চাঁদ উঠেছে, চাঁদ উঠেছে।”
তিথি লজ্জা পেলেন শাড়ির আঁচলে মুখ লুকালেন। এই মাত্র লজ্জা পেয়ে আসা ইভাও তাল মেলালো। আয়হায়, আয়হায় বলে মজা
করা শুরু করল।
আরবী নিরব দর্শক। চুপচাপ এককোণে দাঁড়িয়ে দেখছিল এগুলো। সংগ্রাম হুট করে উঠে গেল। সবাই যে যার মতো ব্যস্ত। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে হুট করে আরবী গালে ঠোঁট ছুঁয়ালো। আরবী হতভম্ব হয়ে তাকালো। আশেপাশে দেখে নিলো কেউ দেখেছে কিনা কিন্তু না কেউ এদিকে তাকায়নি। হাফ ছেড়ে বাঁচল। ও আবার চোখ মারলো, বলল,
“চাঁদ মোবারক আমার চাঁদ।”
বলেই আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসলো। আরবী রাগ না দেখিয়ে মুচকি হাসলো।”
০৩.
মেহজাবিন মেহেদী নিয়ে আসিফের পিছু পিছু ঘুরছে। তার ভীষণ শখ হয়েছে তার জামাই তাকে মেহেদী দিয়ে দিবে আর সে তা ভিডিও করে পোস্ট দিব। কিন্তু আসিফ এতে রাজি নয়। সে মেহেদী দিতে পারে না। যাই বা দিয়ে দিতো পোস্ট দেওয়ার কথা শুনে আরও রাজি হয়নি। পাগল নাকি তার ওসব আউলা ঝাউলা মেহেদী দেওয়া নিয়ে নিশ্চয়ই সবাই মজা নিবে। আর সে তার সুযোগ করে দিবে নাকি? অসম্ভব।
"আপনি কি আমায় মেহেদী পড়িয়ে দিবেন?"
"না দিব না আমি এসব পারিনা।"
"কেনো পারেন না?"
"কারণ এসব মেয়েদের কাজ আর আমি ছেলে।"
মেহজাবিন মুখ ভেঙচি দেয়। ঝটপট ফোন বের করে একটা ছবি চোখে সামনে ধরে বলল,
"এটা দেখুন আমার বন্ধুর জামাই দিয়ে দিয়েছে কত সুন্দর দেখেছেন? উনি পারলে আপনি কেনো পারবেন না?"
আসিফ থমথমে মুখে উত্তর দেয়,
"কারণ আমি তোমার জামাই তাই পারিনা, তার জামাই হলে পারতাম।"
শেষ!!! মেহজাবিন রেগে আগুন। এগিয়ে এসে আসিফের শার্ট টেনে ধরল। নাকের পাতা ফুলাতে ফুলাতে বলল,
"আপনি এতো খারাপ কেনো?"
"কারণ তুমিও খারাপ। বাবা বলে রাজার রানী মিলে ভূতের ভূতনী। সেই অনুসারে খারাপের জামাই খারাপই হবে স্বাভাবিক।"
মেহজাবিন আর কিছু না বলে ছেড়ে দিলো। নাক টানতে টানতে গিয়ে বিছানায় বসলো। বিড়বিড় করে কয়েকটা গালিও দিলো। আসিফ এবার তার মুখে গম্ভীর ভাব সরিয়ে মুচকি হাসলো। না বউ বোধহয় অভিমান করে বসালো। চুপিচুপি গিয়ে মেহজাবিনের কাছে বসলো। সে আরেকটু সরে গেল। আসিফ তার গা ঘেঁষে বসলো। বলল,
"ঈদ মোবারক বউ। বাহিরে যাবে? আইসক্রিম খাবে? গান শুনবে?"
কোনো উত্তর এলো না। তাই আবার বলল,
"রাগ করেছ?"
আড়চোখে চেয়ে উত্তর করল,
"না খুশি হয়েছি।"
"আচ্ছা শোনো আমি ওভাবে বলতে চাইনি।"
মেহজাবিন আর কথা বলছে না। বেচারা আরও অনেক কিছু বলে বোঝানোর চেষ্টা করল কিন্তু কিছুতেই কোনো কাজ হলো না। শেষমেষ
আসিফ দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। উঠে গিয়ে মেহেদী হাতে নিলো। মেহজাবিন হাত ধরে বসলো, সে সরানোর চেষ্টা করল তবে পারল না। শক্ত করে ধরে রেখেছে। তাই আর নড়াচড়া করল না। শান্ত হয়ে বসলো।
আসিফ বেশ সুন্দর করে একটা চাঁদ আঁকানোর চেষ্টা চালালো তার উপরে ছোট ছোট করে লিখে দিলো,
"ঈদ মোবারক বউ।"
মেহজাবিন আর রেগে থাকতে পারল না। হেসে ফেলল। সেও মেহেদীটা নি আরেক হাত দিয়ে আসিফের হাত নিয়ে লিখে দিলো,
"ঈদ মোবারক সোয়ামী।"
আসিফ চোখ রাঙাতে গিয়ে হেসে ফেলল। দুজনেই তাল মিলিয়ে হাসলো।
**
" আসসালামু আলাইকুম সালামি দাও?"
ইমদাদ হাসান। চোখ তুললেন বললেন,
"ওয়া আলাইকুমস সালাম।
বলে একটু থামলেন অতঃপর পকেট থেকে পাঁচটা দশ টাকার নোট বের করে দিয়ে বললেন,
" এই নাও সালামি।"
ইশরাত জাহান রেগে গেলেন। না নিয়ে বললেন,
"তোমার সালামি তুমিই রাখো আমার লাগবে না।"
ইমদাদ হাসান হাসলেন বললেন,
"ঠিক আছে আমিও তাই বলি আমি থাকতে তোমার আবার কিসের সালামি লাগবে? আমিই তো তোমার সালামি।"
ইশরাত জাহান হতাশ, চরম হতাশ। কপাল চাপরে বিড়বিড় করতে বেরিয়ে গেলেন। পেছন থেকে কয়েকবার ডাকলেও আর ফিরলেন না।
**
মঞ্জিল চৌধুরী মিষ্টি কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। গেইটের কাজে আসতেই পাশের বাড়ির ভাবি ডাক দিলেন,
" ভাই ঈদ মোবারক।"
প্রতিত্তোরে তিনিও হেসে বললেন,
"ঈদ মোবারক।"
"কালকে আপনার দাওয়াত রইল আসবেন কিন্তু।"
"আচ্ছা ভাবি চেষ্টা করব।"
"আচ্ছা।"
"এখন যাই তবে।"
বলেই সদরদরজার দিকে তাকালেন। কথা চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখেই মনে মনে শুকনো ঢোক গিলল। শেষ আজ ঈদের দিনেও শেষ রক্ষা আর হলো না। কাছে এসে জোরপূর্বক হেসে মিষ্টির প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলল,
"ঈদ মোবারক।"
কথা চৌধুরী চোখ রাঙালেন কিছু না বলে মিষ্টি নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। পিছু পিছু ভদ্রলোকও গেলেন। কিন্তু তাকে আর পাত্তা দিলেন না কথা। নিজের মতো এটা ওটা করে যাচ্ছে। ডাক দিলোও কথা বলছে না। তাকাচ্ছেই না।
মঞ্জিল চৌধুরী মনে মনে কিছু একটা চিন্তা করে বললেন,
"সালামি নিবা না?"
কথা চৌধুরী তাকালেন। বললেন,
"হ্যাঁ নিব দাও।"
"কত?"
"পাঁচ হাজার।"
ভদ্রলোক ছোট ছোট করে চাইলেন। এতোক্ষণ পাত্তা দিলো না যে সালামির কথা বলল ওমনি কথা বলল। পকেট থেকে টাকা বের করে গুনে গুনে পাঁচ হাজার টাকা বের করে স্ত্রীর হাতে দিলেন।
কথা চৌধুরী টাকা পেয়ে মুচকি হাসলেন। এতোক্ষণ তিনি আসলে নাটক করছিলেন। বেশ কয়েকদিন ঝগড়া করা হয়নি মনটা কেমন আকুবাকু করছিল তাই আজ আর সুযোগটা ছাড়েনি। স্বামীর হাত ধরে পাশে বসিয়ে মুখ একটা মিষ্টি পুরে দিয়ে বললেন,
"ঈদ মোবারক।"
প্রতিত্তোরে মঞ্জিল চৌধুরীও মিষ্টি খেতে খেতে মুচকি বললেন,
" ঈদ মোবারক আমার ঝগড়ুটে বউ।"
তারপর দুজনেই হো হো করে হেসে উঠলেন.............!!!
সমাপ্ত!
#নোট: আসসালামু আলাইকুম সবাই কেমন আছেন? ছোট্টখাটো একটা সালামি। অনেক ক্লান্ত লাগছে নইলে সবার একটু করে কাহিনি দিতাম। সবাইকে ঈদে অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ঈদ মোবারক পাঠকমহল।"