"আশ্রিতা হয়ে মালিকের সন্তান পেটে ধরেছিস? নিজের ভালো চাইলে অ্যাবরশন করিয়ে নে।তোর মঙ্গলের জন্যই বলছি।"
চৈতির সর্বাঙ্গ থরথর করে কাঁপছে। নিজের মামার বাড়িতে আশ্রয়ের আশায় মাথা গুঁজেছিল মেয়েটা,মামি যে তার চরিত্রে এত বড় কলঙ্ক লেপন করবে তা ছিল কল্পনাতীত। এত বড় অপবাদ পেয়ে কান্নায় মেয়েটার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম তবুও আর্তনাদভরা কণ্ঠে চিৎকার করে বলতে চাইল সে নির্দোষ,
"খোদার কসম, আপনি যা ভাবছেন তার একবিন্দুও সত্যি নয়। আমি কারো সন্তান পেটে ধরিনি! আমার চরিত্রের উপর এত বড় অপবাদ দিয়েন না মামি।"
লায়লা বেগম চৈতির মুখের অতি নিকটে নিজের মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন,
"তোর মায়েরে বিশ্বাস কইরা ঠকছি, আবার তোরে বিশ্বাস করমু? মা যেমন কুলটা, মাইয়াও হইবো তেমন চরিত্রহীন।"
চৈতি দুই হাতে লায়লা বেগমের হাত ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টায় মরিয়া। তপ্ত চোখের জল গড়িয়ে লায়লা বেগমের হাতে গিয়ে পড়ছে, কিন্তু পাষাণ হৃদয়ে বিন্দুমাত্র দয়া নেই। চৈতি ভাঙা গলায় কোনোমতে আর্তনাদ করে,
"মা কোনো অন্যায় করেনি , আমিও করি নাই। আপনি যা শুনেছেন সব মিথ্যা..."
কিন্তু লায়লা বেগমের হিতাহিত জ্ঞান শূন্য। তিনি চুলের মুঠি আরও জোরে টেনে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে ওঠেন,
"চুপ কর! একদম মুখ খুলবি না। তোর মায়েরেও দেখছি কত সাধু সাজতে, এই বয়সে ভেগে গেছে দেখস নাই? এখন তুইও সেই একই পথ ধরছস। আমার পোলার সাথে এক রুমে ছিলি কোন সাহসে "
মায়ের চরিত্রের ওপর এমন নোংরা অপবাদ সে আর সইতে পারল না। চুলের মুঠি ধরা অবস্থাতেই সে ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে আর্তনাদ করে উঠে,
"বিশ্বাস করেন মামি,আমি মাথা ব্যথায় বমি করেছি। কিয়াম ভাই নিজে আমার ঘরে এসেছিলো আমি ডাকিনি।"
চৈতির এই কথা শুনে লায়লা বেগমের চোখদুটো রাগে কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। তিনি চুলের মুঠি আরও এক পাক পেঁচিয়ে ধরলেন। ওষ্ঠাধরে এক কুৎসিত বিদ্রূপের হাসি ফুটিয়ে তোলেন তিনি,
"ওরে আমার সতী সাধ্বী রে! আমার পোলা তোর কাছে গেছে? কিয়াম তোর মতন একটা ভিখারিনির কাছে যাবে কোন দুঃখে? তুই তারে কোন যাদু করছস সেইটা বল! আমার সোনার পোলারে তুই ফান্দে ফালাইয়া এখন উল্টা তার নামেই বদনাম দিতাছস? তোর জিভটা কাইটা কুত্তা দিয়া খাওয়ানো উচিত!"
লায়লা বেগমের বাক্যগুলো তপ্ত সিসার মতো চৈতির শ্রবণে বিঁধতে থাকে। লায়লা বেগম আর এক মুহূর্তকালও সেখানে অবস্থান না করে, চৈতিকে এক ধাক্কায় মেঝেতে আছাড় দিলেন। পতনের শব্দে খাটের কোণে চৈতির কপাল সজোরে আঘাত পেলেও লায়লা বেগমের পাষাণ হৃদয়ে করুণার লেশমাত্র জাগে না। দরজা দিকে অগ্রসর হতে হতে পৈশাচিক স্বরে হুঙ্কার ছাড়লেন তিনি,
"এখানেই পড়ে থাক কলঙ্কিনী! তোর মামা আসুক আর কিয়াম আসুক ওরাই তোর শেষ ব্যবস্থা করবে।"
এক ঝটকায় কক্ষ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে বাহির থেকে দরজা রুদ্ধ করে দিলেন তিনি। মেঝের শীতল পরশ আর ললাটে চিনচিনে যন্ত্রণা নিয়ে চৈতি নিথর পড়ে থাকে। আঁখিপল্লব বেয়ে অশ্রুধারা নামছে তার আঠারোর গণ্ডি পেরিয়ে সবে উনিশে পদার্পণ করা মেয়েটার জীবন যেন খড়কুটোর মতো ঝঞ্ঝাবর্তে উড়ছে। বাবা মারা যাওয়ার পর সাজানো সংসারটা তাসের ঘরের মতো চুরমার হয়ে গেল। মাও তাকে এই নরককুণ্ডে একাকী ফেলে কোথায় যে গেলেন, তার হদিস মেলেনি। ক্ষণে ক্ষণে চৈতির মনে হয় এ ধরণী আর তার জন্য নয়। সে অতি কষ্টে উঠে,আঁখিজল মুছে টলমল চরণে আলমারির সম্মুখে গিয়ে স্থির হয়। আর এক মুহূর্ত এই বাড়িতে থাকবে না সে এখানে থাকা অর্থ নিজের আত্মসম্মানকে তিলে তিলে বিসর্জন দেওয়া। কম্পিত হাতে গুটিকতক সামান্য জামা ব্যাগে ডুকিয়ে নেয় চৈতি।যাওয়ার আগে মা তার হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন ত্রিশ হাজার টাকা আর কিছু স্বর্ণালঙ্কার। এতদিন সম্পদগুলোর কথা চৈতি ভুলেই গিয়েছিল, কারণ এই আশ্রিত জীবনে তার নিজের বলতে কিছুই প্রয়োজন ছিল না। আজ শেষ সম্বলটুকুই তার বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা।ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে চৈতি সাবধানে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। বারান্দার এই অংশটায় কোনো গ্রিল নেই, খোলা আকাশ। নিচের দৃষ্টিপাত করতেই হৃৎপিণ্ড কেঁপে ওঠে। দোতলা সমান উচ্চতা, একবার যদি পা ফসকে নিচে পড়ে তবে হাত-পা ভেঙে এই যমদূতদের হাতেই ধরা পড়তে হবে। ভয়ে দেহ হিমশীতল হয়ে আসে তার।সে আবার দ্রুত পায়ে ঘরে ফিরে। চোখের সামনে দেখতে পেল বিছানার চাদরটা। ক্ষিপ্র হাতে আলমারি থেকে কাঁচিটা বের করে চাদরটাকে চারভাগে চিরে ফেলল সে। তারপর শক্ত করে গিঁট দিয়ে চারটে ভাগকে একসঙ্গে জুড়ে এক দীর্ঘ রশি তৈরি করল। নিজের জীবনের সমস্ত শক্তি ওই গিঁটগুলোর ওপর ঢেলে দিল সে।আবার বারান্দায় গিয়ে জানালার গ্রিলের সঙ্গে চাদরের এক প্রান্ত শক্ত করে বাঁধল। অন্য প্রান্ত নিচে ঝুলিয়ে দিয়ে সে অতি সাবধানে নামতে শুরু করল। খানিকটা নিচে নামার পর যখন দেখল আর পারা যাচ্ছে না, তখন কাঁধের ব্যাগটা আলতো করে নিচে ফেলে দিল। কিন্তু এটাই ঘটল বিপত্তি। এক হাতে চাদর আর অন্য হাতে টাল সামলাতে না পেরে হুট করে তার হাত ফসকালো।
"উফ!" একটা চাপা আর্তনাদ করে চৈতি সরাসরি নিচে আছাড় খেয়ে পড়ে। ভাগ্য ভালো যে নিচে নরম ঘাস আর ঝোপ ছিল, তাই হাড়গোড় না ভাঙলেও ত্বক ছিলে গিয়ে রক্তিম আভা ফুটে ওঠে। ললাট আর কনুইয়ের তীব্র যন্ত্রণায় আঁখিপল্লব ভিজে ওঠে। তখনই ঘরের ভেতর থেকে লায়লা বেগমের তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে এল,
"কে রে? কে নিচে পড়ল? সোহেল... দেখ তো বাইরে কিসের শব্দ!"
লায়লা বেগমের কণ্ঠস্বর কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই চৈতি শারীরিক যাতনা ভুলে যায়ঁ।ধরা পড়ার আতঙ্ক তার ব্যথার চেয়েও অধিক প্রবল হয়ে দাঁড়ায়। সে টলমল পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে কোনোমতে নিচ থেকে ব্যাগটা কুড়িয়ে নিল। তারপর শরীরের সবটুকু শক্তি নিংড়ে দিয়ে দৌড়াতে শুরু করে বাড়ির প্রধান ফটকের দিকে।সে যখন ফটক পেরিয়ে রাস্তার অন্ধকারে গা ঢাকা দিচ্ছে, তখন লায়লা বেগম বাহিরে এসে দাঁড়ালেন। পেছন থেকে তার কর্কশ গলায় প্রতিধ্বনিত হয়,
"কই গেলি রে হিজলত? সোহেল... দেইখা যা ছুড়ি পলাইতাছে! ধর ওরে!"
লায়লা বেগম কয়েক কদম তার পিছু পিছু আসলেও গেটের কাছে এসে থমকে দাঁড়ালেন।
"যা! চইলা যা! এই মুখ নিয়া আর ফিরিস না।"
চৈতি আর পেছনে ফিরে তাকাল না। অশ্রুসজল নয়নে সামনের পিচঢালা কৃষ্ণবর্ণ পথটিই এখন তার ভবিতব্য। ঝিঁঝিঁ পোকার গুঞ্জন আর নিজের দীর্ঘশ্বাসের শব্দে সে বিলীন হয়ে যায় কালবৈশাখীর তমসাবৃত রজনীতে।
চলবে….?
#চৈত্র_শেষে_শ্রাবণধারা
#চিন্ময়ী_নূর
#সূচনা_পর্ব
(ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন)