চাঁদের ম্লান আলোয় মাটির বাড়িটা কোনো এক প্রাচীন কঙ্কালের ন্যায় দণ্ডায়মান। দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে, আর পাশের ছোট রান্নাঘরটা তালি দেওয়া বাঁশ আর পলিথিন দিয়ে কোনোমতে খাড়া করে রাখা। জরাজীর্ণ এই ঘরটা দেখলেই প্রতীয়মান হয়, বহু বছর ধরে এখানে কোনো মমতার ছোঁয়া লাগেনি। কোনো নারীর হাতের নিপুণ স্পর্শ না থাকলে ঘর যে কতটা শ্রীহীন হতে পারে, এই বাড়িটা তার জীবন্ত প্রমাণ। চৈতি আড়চোখে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে তাকায়। লোকটা তার দিকে মোটেও খেয়াল দিচ্ছে না। সে উদাসীন চোখে আকাশের রুপালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। চারপাশের এই সুনসান নীরবতা চৈতিকে খুব অস্বস্তিতে ফেলে। সে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করে,
"আপনার বাড়িতে কি আর কেউ নেই?"
লোকটা চাঁদের দিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল,
"না, সব মইরা গেছে।"
কথাটা শুনে চৈতির বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। আসার পথে সে খেয়াল করেছিল এই বাড়িটা একদম বিলের মাঝখানে বিচ্ছিন্নভাবে দাঁড়িয়ে। আশেপাশে আর কোনো বসতবাড়ির চিহ্ন নেই। এই জনমানবহীন পরিবেশ চৈতির মনে কুডাক দেয়। নিজের মনেই সে তীব্রভাবে আফসোস করে, ‘হায় আল্লাহ! আমি কোন সাহসে এই অচেনা মানুষের পিছু নিলাম? এখন যদি লোকটা আমার সাথে খারাপ কিছু করার চেষ্টা করে, তবে তো কেউ জানতেও পারবে না!’চৈতির ভাবনার জালে ছেদ ঘটে লোকটার কথায়। সে খসখসে গলায় শুধায়,
"আফনে ঘরে গিয়া বহেন। আমি খাবার নিয়া আইতাছি।"
খাবারের কথা কানে আসতেই চৈতির মস্তিষ্কে বিপদের সংকেত বেজে ওঠে। তার মনে এক ভয়াবহ আশঙ্কার মেঘ জমে যদি খাবারের ভেতর বিষাক্ত কিছু মেশানো থাকে? যদি তাকে অচেতন করে কোনো সর্বনাশ ঘটিয়ে ফেলে? কল্পনায় এমন বিভীষিকা দেখে চৈতি নিজের অজান্তেই আতঙ্কিত স্বরে চিৎকার করে ওঠে,
"না না! আমি খাবো না! আমি কিচ্ছু খাবো না!"
অকস্মাৎ এই চিৎকারে নিশিরাতের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকগুলোও যেন থমকে যায়। লোকটা থমকে দাঁড়িয়ে বিরক্তিকর দৃষ্টিতে চৈতির দিকে তাকায়। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে গজগজ করতে করতে শুধায়,
"এই কথাটা তো আস্তেও কয়ন যায়!"
লোকটার মেজাজ দেখে চৈতি কিছুটা দমে যায়। সে অবনত মাথায় নিজের ওড়নার খুঁট ছিঁড়তে থাকে। লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্তিমাখা স্বরে আবারও বলে ওঠে,
"আফনার লগে কিছু করার হইলে পাটক্ষেতেই করতাম। আর এতোই যেহেতু ডরান এই রাইতের বেলা বাইরে বাইরে ঘুরেন কেন?"
চৈতির মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ে গেল। এমনিতেই অপমানে কষ্টে শরীর-মন ভেঙে আসছে, তার ওপর এই লোকটা তাকে উদ্ধার করে এনে এখন উল্টো খোঁটা দিচ্ছে! চৈতি তো সেচে তার বাড়ি আসতে চায়নি, লোকটাই তো এক প্রকার জোর করে বা ভয় দেখিয়ে নিয়ে এল। আত্মসম্মানে আঘাত লাগতেই চৈতি ঠিক করল, এই জরাজীর্ণ ভিটায় সে আর এক মুহূর্তও নষ্ট করবে না।
লোকটার দিকে আর না তাকিয়েই সে গটগট করে অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু দুপা এগোতেই পেছন থেকে লোকটার সেই গম্ভীর, কিছুটা রহস্যময় কণ্ঠস্বর ধেয়ে এল,
"ঐদিকে যাইয়েন না! ঐখানে হাপ আছে, হাপ। এক ছোবলেই একদম শ্যাষ!"
চৈতি ভয় পেতে রাজি নয়। সে এখন এতটাই মরিয়া যে সাপের চেয়েও এই লোকটার বিরক্তিমাখা কথাগুলো তাকে বেশি দংশন করছে। সে পেছনে না ফিরেই তেজ দেখিয়ে চেঁচিয়ে বলল,
"সাপ কেন, ওইখানে অ্যানাকোন্ডা থাকলেও আমি যাচ্ছি! আপনার এখানে থাকার চেয়ে সাপের কামড় খেয়ে মরা অনেক ভালো!"
চৈতি হনহন করে কিছুটা এগিয়ে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঝোপঝাড়ের শব্দে নিজের অজান্তেই তার বুক কাঁপছে, কিন্তু জেদ ধরে সে পেছন ফিরে তাকাল না। তবে কানে এল লোকটার হতাশামাখা স্বগতোক্তি।
"আইজকালের দুনিয়ায় এই লাইগাই কারোর ভালা করতে নাই। মানুষরে বাঘের মুখ থেইকা বাঁচাইলে সে বাঘের কাছেই ফিরা যাইতে চায়। আজব কপাল!"
অন্ধকারে কিসের যেনো একটা সরসর শব্দ আর খসখসানি শুনে চৈতির কলিজা শুকিয়ে গেল। সাপের ভয়ে হোক বা অজানা কোনো আতঙ্কে, তার সমস্ত তেজ মুহূর্তেই জল হয়ে যায়। পেছন ফিরে না তাকিয়ে সে এক দৌড়ে আবার বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়াল। উঠানে এখন লোকটাকে দেখা যাচ্ছে না। তবে ঘরের ভেতর থেকে কেরোসিনের কুপির হালকা আগুনের একটা মিটমিটে আভা বেরিয়ে আসছে। চৈতি চোরের মতো পা টিপে টিপে আলোর দিকে এগোতেই লোকটার টিটকারিমাখা কণ্ঠস্বর কানে এল,
"কী হইলো? গেলেন না ক্যান? খুব তো সাহস দেখাইয়া লাফাইতে লাফাইতে গেছিলেন, এখন আবার ফিরা আসলেন ক্যান? অ্যানাকোন্ডায় কি ডরাইছে নাকি?"
চৈতি কোনো উত্তর দিল না, অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের ওপরই তার রাগ হচ্ছে সে তো এমন ভিতু ছিল না কোনোদিন! কিন্তু এই নিশুতি রাতে এই বিলের মাঝখানে একা থাকার চেয়ে এই বিটকেল লোকটার কথা শোনাও এখন অনেক বেশি নিরাপদ মনে হচ্ছে। লোকটা ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে হাই তুলে বলল,
"আইচ্ছা শুনেন, ঘরে গিয়া ঘুমান। আমি বাইরে থাহুম, পাহারা দিমু। আপনে ভেতর দিয়া দরজা বন্ধ কইরা দিয়েন।"
চৈতি যেই না ঘরের চৌকাঠে পা দিতে যাবে, অমনি দূর থেকে কয়েকটা পুরুষালি কর্কশ কণ্ঠের চিৎকার আর পায়ের শব্দ ভেসে আসে। শব্দগুলো বাতাসের বেগে তাদের এই নির্জন ভিটার দিকেই ধেয়ে আসছে। চৈতির বুকের ধকপকানি এক লাফে বেড়ে যায়।তুরাগ মুহূর্তেই সতর্ক হয়ে পড়ে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। সে চট করে চৈতির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে হুকুম দেয়,
"আপনে জলদি বাড়ির পেছনে গিয়া লুকান।"
চৈতি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল পাঁচ-ছয়জন যণ্ডামার্কা লোক হাতে হারিকেন আর লাঠিসোঁটা নিয়ে উঠানে ঢুকে পড়েছে। হারিকেনের কাঁপা আলোয় তাদের মুখগুলো বীভৎস লাগছে। লোকগুলো কর্কশ গলায় চিৎকার করতে করতে তাদের একদম সামনে এসে দাঁড়ায়,
"তুরাগ! ওই তুরাগ! কই গেলি তুই? ঘর থেইকা বাইর হ!"
তুরাগ বারবার চোখের ইশারায় আর ফিসফিসানি স্বরে চৈতিকে পেছনের অন্ধকারে সরে যেতে বলছিল, কিন্তু চৈতি পাথরের মূর্তির মতো এক জায়গায় জমে গেছে। তার চারপাশের পৃথিবীটা দুলছে, কানে একটা ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে শব্দের মতো আওয়াজ হচ্ছে। হারিকেনের হলদেটে আলোয় ছয়জন লোক তাদের ঘিরে ধরে। তাদের চোখেমুখে পৈশাচিক আনন্দ, যেন তারা শিকার খুঁজে পেয়েছে। দলের মাঝখান থেকে একজন লোক, যার নাম তৌফিক, কুৎসিত এক হাসি দিয়ে জানায়,
"আমি কইছিলাম না? মাস্টারের পোলা রাত্তির বেলা মাইয়া লইয়া কুকর্ম করতে বাড়িতে ঢুকছে! আমাগো চোখ ফাঁকি দেওয়া অত সোজা না।"
তুরাগ নিজের বিরক্তি আর রাগ চেপে শান্ত গলায় বলতে চায়,
"চাচা, শোনেন... এই মাইয়াডা বিপদে পইড়া..."
কিন্তু তুরাগকে কথা শেষ করতে দিল না তৌফিক। সে হাত উঁচিয়ে গর্জে উঠে,
"থাম! তোরে আমি নিজের চোখে দেখছি পাটখেত থাইক্কা এই মাইয়ারে লইয়া বাইর হইতে। আমরা যা বোঝার সব বুইঝা গেছি। এই গ্রামে তোর এই সমস্ত নোংরামি চলত না!"
তুরাগ এবার কিছুটা মরিয়া হয়ে পড়ে। সে জানে গ্রামের মানুষের কালো জেদ একবার চেপে বসলে আর রক্ষে নেই। সে মিনতি করে আবার বলল,
"আরে কাকা, আপনে ভুল বুঝতাছেন..."
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা করিম নামের বৃদ্ধ লোকটা ঘৃণাভরে থুতু ফেলে মাটিতে। সে তুরাগের দিকে তাকিয়ে ধিক্কার দিয়ে জানায়,
"মাস্টারমশাই কত ভালা মানুষ আছিল, কিন্তু জন্ম দিছে একটা আস্ত বেজন্মা! ছি ছি... বাপের সম্মানটা এভাবে মাটিতে মিশাইলি?"
বাপের নামের কলঙ্ক সইতে পারল না তুরাগ। তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সে চিৎকার করে বলে ওঠে,
"এই মাইয়ারে আমি চিনিই না! কসম আল্লাহর, আমি জানিও না এ কে!"
তারপর তুরাগ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চৈতির দিকে ফিরে চিৎকার করে বলে,
"এই বেডি! ক এদেরে... ক যে আমি তোরে চিনি না! সত্যটা ক!"
চৈতি তখন আর কিছু শোনার অবস্থায় নেই। ছোটবেলা থেকেই তার সিনকোপের সমস্যা অতিরিক্ত ভয় আর মানসিক চাপ পেলে তার স্নায়ু কাজ করা বন্ধ করে দেয়, সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। চোখের সামনে হারিকেনের আলোগুলো একসাথে মিশে যাচ্ছে, তুরাগের চিৎকারগুলো তার কানে কেবল অস্পষ্ট গুঞ্জন হয়ে বাজছে। পরের মুহূর্তেই চৈতির শরীরটা নিথর হয়ে মাটির ওপর ধপ করে পড়ে যায়। তুরাগ নিজের অসহায়ত্ব আর রাগে পাগলের মতো হয়ে পড়ে। সে নিচু হয়ে চৈতির নিথর শরীরের দিকে তাকিয়ে প্রায় চেঁচিয়ে বলে,
"এই বেডি! এই... এখন মইরা পইড়া থাকিস না! আগে এই মানুষগুলার সামনে আমার ফুলের মতোন চরিত্রের সার্টিফিকেট দিয়া যা! ক যে আমি নির্দোষ!"
কিন্তু চৈতি তখন অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। সে আর জানতে পারল না, যে চরিত্রের ওপর তিল পরিমাণ দাগ লাগতে দেবে না বলে সে ঘর-সংসার সব ছেড়ে অনিশ্চিত পথে পা বাড়িয়েছিল ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, আজ সেই চরিত্রেই কলঙ্কের এক গাঢ় প্রলেপ লেপে দিচ্ছে এই সমাজ। শত শত মানুষের বিচার আর কুৎসিত আলোচনার কেন্দ্রে এখন সে আর তুরাগ।
চৈতির চোখের পাতা লোহার মতো ভারী হয়ে আছে। অনেক কষ্টে আধো-খোলা চোখে সে তাকিয়ে দেখল, ভোরের ম্লান আলোয় পুরো উঠান লোকে লোকারণ্য। শত শত উৎসুক আর ঘৃণাভরা চোখ তার ওপর নিবদ্ধ। মাথাটা প্রচণ্ড ঝিমঝিম করছে, কাল রাতের ভয়াবহ স্মৃতিগুলো কুয়াশার মতো ঝাপসা হয়ে ধরা দেয়। একপাশে তুরাগ খুব শান্ত ভঙ্গিতে বসে একটার পর একটা সিগারেট ফুঁকছে। চৈতি একটু নড়ে উঠতেই দেখল সামনে মোড়া পেতে হুজুরের মতো দেখতে গাম্ভীর্যপূর্ণ দুজন প্রৌঢ় লোক বসে আছেন নিশ্চয়ই গ্রামের মাতব্বর। চৈতিকে তাকাতে দেখেই ভিড়ের ভেতর থেকে একজন লোক শ্লেষ মেশানো কণ্ঠে বলে ওঠে,
"দেখতে তো পরীর মতন, কিন্তু চরিত্রটা তো এক্কেবারে ড্রেনের পানির মতো!"
ভিড়ের ভেতর থেকে গুঞ্জন আরও জোরালো হয়। নারীদের কণ্ঠস্বরও শোনা যাচ্ছে,
"আরে, এইগুলা তো কায়দা কইরাই আসে! কোনো কুলমান নাই, হুট কইরা আইসা গেরামের ইজ্জত মারতে বসছে। এইগুলারে তো ঝাটা দিয়া বিদায় করা দরকার!"
চৈতি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তার কানে একেকটা কথা তপ্ত সিসার মতো বিঁধছে। সে কাল রাতে লায়লা বেগমের বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিল এই কলঙ্কিনী তকমা থেকে বাঁচতে, অথচ আজ এক অজানা গ্রামে, এক অচেনা মানুষের পাশে বসে তাকে একই বিষাক্ত অপবাদ সইতে হচ্ছে। তুরাগ একটা লম্বা টান দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ে। সে চৈতির দিকে একবারও তাকাল না, কিন্তু হুজুরদের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় শুধায়,
"শেষ হইছে? না আরও কিছুক্ষণ বিষ উগরাইবেন আপনেরা?"
মাঝখান থেকে হুজুর টাইপ এক মুরুব্বি দাঁতে দাঁত চেপে বলেন,
"তোর কোনো কথা আমরা বিশ্বাস করুম না তুরাগ! এই মাইয়ারে অহনই বিয়া করতে হইবো। নাইলে তোগো দুইটার কপালে খারাবি আছে।"
তুরাগ নিভে যাওয়া বিড়িটা পায়ের নিচে পিষে ধীরে ধীরে মাথা তোলে। তার শান্ত চাউনি এবার চৈতির ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া মুখের ওপর স্থির হয়। খুব স্বাভাবিক গলায় সে মাতব্বরের দিকে তাকিয়ে বলল,
"আমি রাজি আছি। আমার কোনো আপত্তি নাই। তবে এরে জিগান, এ কী কয়?"
মাতব্বর চৈতির দিকে ফিরে গর্জে উঠলেন,
"কী রে মাইয়া? কবুল কইবি, না জুতার বাড়ি খাইবি?"
চৈতি আর্তনাদ করে ওঠে,
"না! আমি বিয়ে করবো না! আমি কোনো অন্যায় করি নাই, আমি কেন বিয়ে করবো?"
ভিড়ের ভেতর থেকে শোরগোল উঠল। করিম চাচা চিৎকার করে জানান,
"ছিনালগিরি করার সময় মনে আছিল না? অহন সাধু সাজছস? তোর বাপ-মায়ের নাম্বার দে, তাগো ডাইকা আনি।"
চৈতির দুচোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে। সে ধরা গলায় কোনোমতে জানায়,
"আমার বাবা নেই। আর মা... মা কই আছে আমি জানি না।"
ব্যাস! এই কথাটাই আগুনে ঘি ঢালল। তৌফিক কুৎসিত এক হাসি দিয়ে ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
"দেখছেন কারবার? বাপ নাই, মা'র হদিস নাই এই মাইয়া যে আস্ত একটা নষ্ট, হেইডা আর বুঝার বাকি আছে? ভাগলবা মাইয়া এই গেরামে আইসা ফষ্টিনষ্টি করতাছে!"
চৈতি এবার পাগলের মতো চিৎকার করে ওঠে,
"চুপ করেন আপনারা! আমি নষ্ট না! আমি কিছু করি নাই! আপনারা মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন!"
তার চিৎকারের তীব্রতায় তুরাগ কান চেপে ধরে। বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছে সে নিচু স্বরে গজগজ করতে করতে শুধায়,
"আরে থামেন তো! গলার রগ তো ছিঁড়া যাইবো! একটু আস্তে কয়ন যায় না?"
চৈতি আগুনের মতো দৃষ্টিতে তুরাগের দিকে তাকায়। যে লোকটা তাকে বাঁচানোর কথা, সে কিনা এখন রসিকতা করছে! চৈতির অগ্নিচক্ষু দেখে তুরাগ এবার একটু সোজা হয়ে দাঁড়ায়। মুরব্বির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
"বেচারিরে আর ফাঁসায়েন না কাকা।"
কিন্তু মুরব্বি লাঠিটা সজোরে মাটিতে ঠুকে চূড়ান্ত রায় দিলেন,
"সোজা কথা হয় বিয়া করবি, নাইলে তোরে আর এই কুলাঙ্গার মাইয়ারে জুতা পিটা কইরা উল্টা গাধার পিঠে চড়াইয়া গেরাম ছাড়া করুম।"
গ্রামের শত শত মানুষের উৎসুক চাউনি আর ঘৃণামিশ্রিত ফিসফাসানির মাঝে চৈতি অনুভব করল তার পায়ের তলার মাটিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। পালানোর সব পথ বন্ধ, আজন্মের লালিত আত্মসম্মানটুকু এখন কেবল এক টুকরো কাগজের ওপর ঝুলে আছে। চৈতি ধীরে ধীরে মাথা তোলে। তার দুই চোখ লোনা জলে ভিজে একাকার। সে একবার তুরাগের দিকে তাকায় অগোছালো চুল, নির্বিকার ভঙ্গি আর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা অবজ্ঞার হাসি। এই মানুষটার সাথেই কি তার জীবনের পরবর্তী অধ্যায় লেখা ছিল?চৈতি ভাবল নিজের জীবনে সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিতে সে খুব ভাবলো তারপর নিচে তাকিয়ে খুব আস্তে করে বলল,
"আমি রাজি।"
মুহূর্তেই পুরো উঠান নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সবাই চুন হয়ে গেল, কারণ তারা হয়তো চেয়েছিল আরও কিছুটা তামাশা দেখতে। কাজি বিড়বিড় করে বলেন,
"নাম কি তোমার?"
চৈতি ধীরস্থির কণ্ঠে জবাব দেয়, "চৈতি সিদ্দিকী।"
বাবার নামটা উচ্চারণ করতেই চৈতির বুকটা একবার কেঁপে ওঠে। আজ যদি বাবা বেঁচে থাকতেন, তবে কি তাকে এভাবে এক কাপড়ে, এক অচেনা লোকের সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রহসনের শিকার হতে হতো? তার ভাবনার মাঝেই কাজী সাহেব তুরাগের দিকে ফিরে মোহরানার প্রশ্নটা তুললেন। তুরাগ তখন আরেকটি সিগারেট ধরিয়েছে। ধোঁয়াটা অবলীলায় আকাশের দিকে ছেড়ে সে নির্লিপ্ত গলায় জানায়,
"আমার কাছে দেওয়ার মতো সিগারেট আর এই পোড়া মনটা ছাড়া আর কিছু নাই।"
কাজী সাহেব বিরক্ত হয়ে বলেন,
"আরে মিয়া, মোহরানা তো দিতেই হয়। নিয়ম আছে না?"
তুরাগ যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে অবজ্ঞার স্বরে জিজ্ঞেস করল,
"কত?"
"তোমার যা সামর্থ্য, তুমি যত দাও।"
কাজী সাহেব কলম উঁচিয়ে উত্তরের অপেক্ষায় রইলেন। তুরাগ পকেট থেকে একটা দুমড়ানো-মুচড়ানো পাঁচশ টাকার নোট বের করে সামনে ছুড়ে দেয়। কর্কশ গলায় বলল,
"এর বেশি মোহরানা দেওয়ার মতো বিলাসিতা আমার নাই।"
কাজী সাহেব টাকার অঙ্কটা দেখে কিছুটা আমতা-আমতা করে মুড়ব্বির দিকে তাকালেন। হয়তো মোহরানাটা বড্ড কম হয়ে যাচ্ছে বলে তিনি কিছু বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মুড়ব্বি হাত নেড়ে তাকে থামিয়ে দিলেন। তার দরকার এই কলঙ্ক থেকে গ্রামকে মুক্ত করা, টাকার অঙ্ক নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় তার নেই। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো। কাজী সাহেব যখন চৈতিকে লক্ষ্য করে কবুল বলতে বললেন, তার বুক কেঁপে উঠে। চৈতি একবার আকাশের দিকে তাকায়, একবার তুরাগের উদাসীন মুখের দিকে। দীর্ঘ এক নীরবতার পর, নিজের সমস্ত কষ্ট চেপে ধরে সে অতি কষ্টে অস্ফুট স্বরে জানায়,
"কবুল।"
এবার তুরাগের পালা। কাজী সাহেব প্রশ্ন করতেই তুরাগ সিগারেটে এক লম্বা টান দেয়। ধোঁয়াটা ছাড়ার সাথে সাথে সে অবলীলায় একবার কবুল বলল। কাজী সাহেব তিনবার বলার নিয়ম মনে করিয়ে দিতেই সে তাচ্ছিল্যের সাথে পর পর আরও দুবার বলে তিন তুড়ি বাজিয়ে বিয়েটা সম্পন্ন করল। ভিড়ের ভেতর থেকে মানুষেরা এবার একে একে সরতে শুরু করে। সবার চোখেমুখে বিজয়ের হাসি যেন তারা বড় কোনো পুণ্য করে ফেলেছে। কিন্তু জরাজীর্ণ উঠানে দাঁড়িয়ে থাকা দুই প্রাণ জানল না, ভাগ্যের এই নিষ্ঠুর পরিহাস তাদের জীবনকে কোন অনিশ্চিত গন্তব্যে নিয়ে যাবে।