ফন্ট সাইজ:
থিম:
চৈত্র শেষে শ্রাবণধারা

১৬তম পর্ব

লেখক: চিন্ময়ী নূর

গ্রামের রূপের কোনো শেষ নেই। কখনো তা শরতের কাশফুলে শুভ্র, কখনো বসন্তের পলাশে রক্তবর্ণ। কিন্তু বর্ষার সিক্ত রূপ সব সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে যায়। ঝমঝমিয়ে নামা বৃষ্টির শব্দে যখন চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখন তুরাগের মাটির ঘরটি হয়ে ওঠে পরম নিশ্চিন্তের আশ্রয়। রাত তখন তিনটে কি চারটা হবে। বাইরে অবিরাম বৃষ্টির একটানা সুর বেজেই চলেছে। ঘরের ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, কেবল জানালার ফাঁক দিয়ে আসা মেঘলা আকাশের আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে তুরাগ আর চৈতিকে। আজকাল তুরাগের অদ্ভুত অভ্যাস হয়ে গেছে। দিনভর তার যতই বুনো মেজাজ থাকুক না কেন, রাতে চৈতিকে বুকের মাঝে শক্ত করে না জড়ালে তার দুচোখের পাতা এক হয় না। চৈতি তার শরীরের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাকে ছাড়া তুরাগের ঘুম এখন এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। চৈতি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার নিশ্বাসের ছন্দ বলে দিচ্ছে সে এখন কোনো সুন্দর স্বপ্নের দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তুরাগের চোখে আজ আবারও ঘুম নেই। মাঝরাতে তার প্রায়ই ঘুম ভেঙে যায়। আর একবার ঘুম ভাঙলে সে শুধু একদৃষ্টে চৈতির শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকে।বৃষ্টির শব্দের মাঝে চৈতির শান্ত হয়ে শুয়ে থাকা দেখার মধ্যে তুরাগ এক অজানিত নেশা খুঁজে পায়। তার মনে হয়, সারা পৃথিবীর সব ক্লান্তি আর লড়াই এই এক মুখের শান্তিতে এসে থমকে গেছে। চৈতিকে দেখতে দেখতে তুরাগের রাতের প্রহরগুলো অনায়াসেই কেটে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও তার চোখে কোনো ক্লান্তি আসে না। তার এই বুনো জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন কেবল এই রাজকন্যাটিই। চৈতির কপালে লেপ্টে থাকা এক গোছা চুল সরিয়ে দিয়ে তুরাগ মনে মনে বলে,

" আমার হাজারো অপূর্ণতার মাঝে একমাত্র প্রাপ্তি আপনি

যাকে আমি না চাইতেই পেয়ে গেছি।"

তুরাগ চৈতিকে নিজের বুকের সাথে আরও লেপ্টে ধরে। বাইরে তখন শ্রাবণের অঝোর ধারা। বিকট এক বজ্রপাত হতেই ঘুমের ঘোরে প্রচণ্ড কেঁপে ওঠে চৈতি। অবচেতন মনেই সে তুরাগের শক্তপোক্ত বুকটার আরও ভেতরে সেঁধিয়ে যেতে চায়। তুরাগ তার বাহুডোর আরও নিশ্ছিদ্র করে।কিন্তু এত প্রবল বৃষ্টির শব্দের ভেতরেও তুরাগের কান অন্য কিছু একটা ধরতে পারে। তীক্ষ্ণ শিকারি কান তার। সে স্থির হয়ে শোনার চেষ্টা করে। বৃষ্টির শব্দের আড়ালে খুব মিহি, ফিসফিসানি এক গলার স্বর ভেসে আসছে। তুরাগ শ্বাস বন্ধ করে মনোযোগ দিতেই তার মেরুদণ্ড দিয়ে হিমশীতল স্রোত বয়ে যায়। কেউ একজন খুব শান্ত গলায় ডাকছে,

"চৈতি... ও চৈতি..."

তুরাগ একবার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন চৈতির শান্ত মুখের দিকে তাকায়। এই মাঝরাতে কে তার বাড়িতে এসে তার বউকে ডাকছে? তুরাগ খুব সন্তর্পণে চৈতির মাথাটা কোল থেকে সরিয়ে বালিশে রাখে। তারপর নিঃশব্দে উঠে বসে মাটির দেয়ালে কান ঠেকিয়ে বাইরের আওয়াজটা বোঝার চেষ্টা করে। প্রথম কয়েক সেকেন্ড তার মনে হয় হয়তো ঝোড়ো বাতাসের আওয়াজ বা মনের ভুল। কিন্তু না! আওয়াজটা আবার আসে একইভাবে,

"চৈতি..."

তুরাগ আর দেরি করে না। বিছানার পাশ থেকে টর্চলাইটটা হাতে নিয়ে সে অতি সাবধানে দরজার খিল খোলে। কোনো শব্দ হতে দেয় না সে। বিড়ালের মতো পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সে বড়ঘরের পেছনে যায়। ঠিক যেখান থেকে আওয়াজটা আসছিল বলে তার মনে হয়েছিল।আশ্চর্যজনকভাবে তুরাগ বাইরে পা রাখতেই মুষলধারে পড়তে থাকা বৃষ্টিটা হঠাৎ থেমে যায়। চারপাশটা একদম নিঝুম, কেবল গাছ থেকে টুপটাপ জল পড়ার শব্দ। তুরাগ টর্চের জোরালো আলোটা জ্বালিয়ে চারপাশটা দেখে। এই চরের বাড়িতে কোনো বড় ঝোপঝাড় নেই, চারদিকে শুধু থৈ থৈ পানি। কেউ যদি এখানে থাকত, তবে আলোয় তার ধরা পড়ার কথা। তুরাগ টর্চ হাতে নিয়ে পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খোঁজে। নৌকাগুলোর দিকটা দেখে, দাওয়ার নিচে আলো ফেলে কিন্তু কোথাও কেউ নেই। বৃষ্টির জমা জলে কেবল নিজের ছায়াটা ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নেই সেখানে। তুরাগের কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হয়। সে দ্রুত পায়ে ঘরে ফিরে আসে, কিন্তু ভেতরে পা রাখতেই তার কলিজা শুকিয়ে যায়। বিছানায় চৈতি নেই! তুরাগ পাগলের মতো টর্চ উঁচিয়ে সারা ঘরে আলো ফেলে। চৈতির ওড়নাটা নিচে পড়ে আছে, আর ওর জুতো জোড়াও খাটের নিচে রাখা। তুরাগের বুক ধক করে ওঠে। মেয়েটা গেল কই? তুরাগের হাত-পা বরফ হয়ে আসে। চৈতি অন্ধকারকে বাঘের মতো ভয় পায়, রাতে ঘর থেকে বের হতে হলে তুরাগকে হাজারবার ডাক দিয়ে জাগিয়ে তোলে। আর জুতো ছাড়া তো চৈতি এক পা-ও মাটিতে ফেলতে চায় না, বড্ড খুঁতখুঁতে মেয়ে ও।তুরাগ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ঘর থেকে আবার বেরিয়ে আসে। পুরো বাড়ি সে চিল চিৎকার করে খোঁজে, উঠোন থেকে শুরু করে রান্নাঘরের পেছন পর্যন্ত তন্নতন্ন করে দেখে কিন্তু কোথাও চৈতি নেই। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে রক্ত-মাংসের মানুষ কি স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে? তুরাগ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, সে হাঁপাতে হাঁপাতে দাওয়ার ওপর ধপ করে বসে পড়ে। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। বুকের ভেতরটা যেন কেউ নিংড়ে ধরছে। সে কোনো দিশা না পেয়ে দাওয়ার ওপর মাথা নিচু করে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে থাকে। তার মাথায় তখন হাজারটা দুশ্চিন্তাশকিয়াম কি তবে কোনোভাবে ওকে তুলে নিয়ে গেল?কিন্তু এটা তো কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। তাহলে গেলো কই?ঠিক দুই মিনিট পার হওয়ার পর, তুরাগ অনুভব করে তার একদম সামনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। মাটির ওপর কারো ছায়া পড়তেই তুরাগ বিদ্যুৎবেগে মাথা তোলে। সামনে সাদা অবয়বটা দেখেই তুরাগের স্তব্ধ হৃৎপিণ্ডটা আবার সচল হয়ে ওঠে। সে নিজের প্রাণ ফিরে পায়। চৈতি দাঁড়িয়ে আছে! ওর চুলগুলো এলোমেলো,চোখমুখ কেমন মলিন হয়ে আছে। তুরাগ হাঁপ ছেড়ে এক পা এগিয়ে যায়। তার ঠোঁট কাঁপছে, অনেকগুলো প্রশ্ন একসাথে করতে চায়।কিন্তু কোনো কথা মুখ দিয়ে বের হওয়ার আগেই চৈতি তাকে পাশ কাটিয়ে হনহন করে ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। সে সোজা খাটে গিয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে। তুরাগ হতভম্ব হয়ে পেছন পেছন ঘরে ঢোকে। তার মনের ভেতর তখন একদিকে স্বস্তি, অন্যদিকে একরাশ বিস্ময়। সে খাটের পাশে গিয়ে বসে। খুব নরম স্বরে ডাকে,

"ও রাজকন্যা, কথা কন না কেরে? কই গেছিলেন এই মাঝরাইতে?"

চৈতি কোনো সাড়া দেয় না। সে স্থির হয়ে শুয়ে থাকে। তুরাগ আরও কয়েকবার ওর গায়ে হাত দিয়ে ডাকে, কপালে হাত দিয়ে দেখার চেষ্টা করে ওর জ্বর আসল কি না কিন্তু চৈতি সম্পূর্ণ নির্বিকার। তুরাগের বাকি রাতটুকু কাটে চৈতির পায়ের কাছে বসে থেকেই। সে একবারের জন্যও চোখের পাতা এক করতে পারল না। মাঝে একবার ভেবেছিল চৈতিকে জোর করে জাগিয়ে জিজ্ঞাসা করবে সে কোথায় গিয়েছিল, কিন্তু মন সায় দিল না। প্রতিদিনের মতো আজও রোদেলা সকালের অনেক পরে চৈতির ঘুম ভাঙে। চোখেমুখে ঘুমের রেশ নিয়ে আড়মোড়া ভেঙে সে উঠে বসতেই থতমত খেয়ে যায়। সামনে তাকাতেই দেখে তুরাগ তার পায়ের কাছে বসে আছে। চৈতির জানা মতে, তুরাগ তো ফজরের আযান হতে না হতেই বিলে চলে যায়। আজ বেলা প্রায় নয়টা কি দশটা বাজে, আকাশের মেঘ নেই ঝকঝকে রোদ উঠেছে, অথচ তুরাগ ঠায় বসে আছে কেন? চৈতি একটু অবাক হয়ে তুরাগের কাঁধে হাত রাখে। তুরাগ চমকে ফিরে তাকায়। তুরাগের লাল হয়ে থাকা চোখের দিকে তাকিয়ে চৈতি কপালে ভাঁজ করে জিজ্ঞেস করে,

"কী হলো? আপনি আজ কাজে যাননি যে? শরীর কি খারাপ লাগছে?"

তুরাগ কোনো জবাব দেয় না। সে চৈতির চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করে রাতের ঘটনার কথা কি ওর মনে নেই? মেয়েটা কি তবে ঘুমের ঘোরেই হেঁটেছিল? কিন্তু চৈতির মধ্যে তো এমন আজব কিছু দেখেনি সে। তুরাগ কোনো প্রশ্ন করে চৈতিকে ভয় দেখাতে চায় না। সে চৈতির দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর কোমরের লুঙ্গিটা হাঁটুর ওপর তুলে শক্ত করে মালকোঁচা মেরে কেবল এটুকুই বলল,

"অন‍্য একটা কাম আছে যাই।"

~

শ্রাবণের আকাশে মেঘের লেশমাত্র নেই, চরাচরজুড়ে আজ আগুনের বৃষ্টি হচ্ছে। বর্ষার এই দুপুরের রোদ বড় অদ্ভুত এর তেজ যেমন প্রখর, তেমনি বাতাসে ভ্যাপসা এক গুমোট গরম। মাঠের জল থেকে বাষ্প হয়ে ওঠা তপ্ত আভা চারপাশকে ঝাপসা করে দিয়েছে। কৃষ্ণচূড়া গাছের পাতাগুলো আগুনের হল্কায় কুঁকড়ে যেতে চায়। বিলের স্থির পানি আয়নার মতো রোদের তীব্রতাকে প্রতিফলিত করে চোখের পলক জ্বালিয়ে দিচ্ছে। প্রকৃতি এই অকাল দাবদাহে একদম নিঝুম হয়ে আছে। তুরাগ ঘাটলায় নৌকা ভেড়াতেই দেখে তার নৌকা রাখার জায়গায় অন্য একটা নৌকা বাঁধা। কপালে ভাঁজ নিয়ে সে নৌকা থেকে নামল। দ্রুতপায়ে বাড়ির উঠানে পা রাখতেই তার চোখ আটকে যায়। কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়াময় জায়গাটুকুতে একটা চেয়ার পেতে আয়েশ করে বসে আছে কিয়াম।চোখে কালো চশমা, পরনে ফিটফাট সাদা পাঞ্জাবি পায়েজামা।এই চরের রুক্ষ পরিবেশে তাকে বড্ড বেমানান লাগছে।তুরাগ একদম কিয়ামের সামনাসামনি গিয়ে কয়েক মুহূর্ত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।কিন্তু কিয়াম এমনভাবে বসে আছে, যেন সে তুরাগ নামের কাউকে চেনেও না, দেখেওনি।কিয়ামের এমন ভাব দেখে তুরাগ গভীর মুখে প্রশ্ন করে,

"আপনার কি গুড়া কৃমি হইছে?"

তুরাগের এমন অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে কিয়াম চশমার আড়াল থেকেই চরম বিরক্ত হয়। শান্তিতে বসে থাকার মুহূর্তটা এই ত্যাড়াবাঁকা মানুষটা নিমিষেই তিতা করে দিল। সে কড়া গলায় বলে,

"আপনার কাছে কি কাজের কোনো প্রশ্ন থাকে না?"

তুরাগ কোনো কথা না বাড়িয়ে পাশে থাকা দোলনাটাতে গিয়ে আয়েশ করে বসে। দোলনার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দটার সাথে তাল মিলিয়ে সে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে,

"চেয়ারম্যান হইয়া যদি আপনার কোনো কাম না থাহে, আমি তো আপনার বোন জামাই আমার কেমনে কাম থাকব?"

কিয়াম এবার রাগে ফেটে পড়ে। সে দাঁতে দাঁত চেপে হুংকার দিয়ে ওঠে,

"আর একবার বোন জামাই বললে জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব!"

তুরাগ নিজের জিব বের করে চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করল। না, তার জিব অনেক ছোট কিয়াম পারবে না ওটা ধরে টেনে ছিঁড়তে।

তাই এইবার দোলনাটা আরও জোরে দুলিয়ে দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,

"আমি বা আমার বউ তো আপনারে ভোট দেই নাই, তাইলে কিয়ের সেবা দিতে দুদিন পরপর আইয়েন?"

কিয়াম তুরাগের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলে,

"বলদ।"

তুরাগ দেরি না করে পাল্টা জবাব দেয়,

"তাইলে আপনে মহিষ। কালা মহিষ না, আপনে সুন্দর মানুষ আপনি সুন্দর মহিষ। বিদেশি মহিষ নাকি চাইনিজ মহিষ?"

কিয়াম হতভম্ব হয়ে তুরাগের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে ভেবেছিল তুরাগ বোধহয় গাম্ভীর্য এক মানুষ, কিন্তু লোকটা যে আস্ত এক বজ্জাত আর ত্যাড়াবাঁকা তা সে আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। কিয়ামকে নিজের দিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে তুরাগ এবার মজা করা ছেড়ে দেয়। সে দোলনায় একটু হেলান দিয়ে ভাব নিয়ে বলে,

"আবার আসছেন কেরে?"

কিয়াম এবার তুরাগের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে রান্নাঘরের দরজার দিকে, অর্থাৎ চৈতির দিকে তাকিয়ে বলে,

"চৈতিকে নিতে।"

তুরাগ দেখে কিয়াম একদৃষ্টে চৈতির দিকে তাকিয়ে আছে। তুরাগ এতক্ষণ সব শান্তভাবে দেখলেও এবার তার ভেতরকার স্বামী সত্তাটা জেগে ওঠে। এতদিন চৈতি যেভাবে তুরাগকে মুখ ভ্যাংচি দিত, আজ তুরাগ একই ভঙ্গিতে কিয়ামের চোখের দিকে তাকিয়ে এক বিশাল মুখ ভ্যাংচি কাটে।কিয়াম চৈতির দিকে তাকিয়ে থাকায় খেয়াল করেননি। তুরাগ সাধারণত চৈতিকে আপনি বলে সম্বোধন করে, কিন্তু আজ প্রথমবার তুমি বলে,

"বউ! তোমার বড় ভাই তোমারে নিতে আইছে। যাইবা নাকি উনার লগে?"

চৈতি তুরাগের দিকে ফিরেও তাকায় না।সে তখন রান্না করতে মহা ব্যস্ত। তুরাগের কথা গ্রাহ্যই করছে না। চৈতি কড়াইয়ের গরম তেলে মাছ ছাড়ে ছ্যাঁৎ করে একটা শব্দ হয়। আর সেই শব্দের তালে তাল মিলিয়েই তুরাগের গানের গলা ভেসে আসে,

"সোনা বউ শুনছো নিগো

সোনা বউ শুনছো নি

নিতে আইলে নাইয়র যাইবা নি

ও বউ গো বউ……

সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরে

বাসরটা দিবে সাজিয়ে

যে ঘরে থাকবা দিন রজনী

ও বউ গো বউ……"

কিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে তুরাগের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,

"আপনার মতো পাগলের সঙ্গে কীভাবে চৈতি থাকে?"

তুরাগ দোলনা থেকে আলতো করে নেমে খুব নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দেয়,

"স্বামী তো স্বামীই। পাগল হোক আর ছাগল হোক তারই তো।"

কিয়াম আর কোনো কথা বলে না, একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। তুরাগ এবার বেশ বিরক্ত হয়ে বলে,

"আমার বাড়িতে আসা বন্ধ করেন।"

"যদি না করি?"

"তাইলে আর কী! বউ লইয়া অন্য জায়গায় চলে যামু।"

কিয়াম চৈতির দিকে তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে বলে,

"সে আমার ভালোবাসা। তাকে নিয়ে প্রতি রাতে হাজারো কল্পনা করে আমার রাত কাটে।"

কিয়ামের কথা ফুরোতেই তুরাগ ঠাস করে বলে,

"আর তারে বুকে জরাইয়া ধইরা আমার সারারাত কাটে। আমি কেমনে সহ্য করমু যে তার ওপর অন্য কেউ নজর দিতাছে?"

কিয়াম একটা দীর্ঘ ঢোক গিলে। তুরাগের কথাগুলো তার বুকের ভেতর প্রচণ্ড ব্যথার সৃষ্টি করছে, কিন্তু বাইরে সে নিজেকে একদম স্থির রাখে। তুরাগ তাকে আরও ঘা দিয়ে বলে,

"আপনার নাম ডাক আছে, ভালা চেয়ারম্যান আপনে। তাও কেরে পরস্ত্রীর আশায় এনে ছুটে আইয়েন?"

কিয়াম কিছু বলে না। তুরাগ আবার বলে,

"উনি আপনারে পছন্দ করেন না, বিরক্ত হন। আপনে আইলে আমার লগে অযথা কাইজ্জা করে।"

কিয়ামের বিশ্বাস হয় না তুরাগের কথা। সে তুরাগের দিকে চোখ গরম করে তাকায়। তুরাগ এবার গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করে,

"সত্যিই উনাকে ভালোবাসেন?"

কিয়াম শক্ত গলায় উত্তর দেয়,

"হুম।"

"উনারে কেউ মারতে চায়। বাঁচাইতে পারবেন? আমার ক্ষমতা নাই উনারে বাঁচানোর মতো।"

চলবে….

(কেউ রাগ কইরেন না দেরি করে গল্প দিয়েছি মাত্রই লিখে পোস্ট করালম।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন