সকালের নাস্তার টেবিলে কিয়াম বসে আছে। প্রতিদিন সে নাস্তা সেরেই বেরিয়ে যায়, আর ফেরে গভীর রাতে। মা-ছেলের মাঝে কথা হওয়ার সুযোগটুকুও এখন বিলীন হয়ে গেছে। আজ লায়লা বেগম যখন প্লেটে রুটি আর ভাজি বেড়ে চলে যাচ্ছিলেন, তখন কিয়াম হঠাৎ ডেকে ওঠে,
"মা।"
ডাক শোনা মাত্রই লায়লা বেগমের বুকের ভেতরটা ছাৎ করে ওঠে। কতদিন পর ছেলেটা তাকে এই নামে সম্বোধন করল! নিজের একমাত্র আদরের সন্তান সে, কত তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে চেয়ে এনেছিলেন। অথচ নিজের সামান্য জেদের কারণে কলিজার টুকরো ছেলেটা আজ তার থেকে যোজন যোজন দূরে। লায়লা বেগম প্রায় দৌড়ে কিয়ামের পাশে এসে দাঁড়ান। মাথায় মমতায় হাত বুলাতে বুলাতে সুধায়,
"বলো বাবা, কিছু লাগবে তোমার?"
কিয়াম মুখে রুটির টুকরো পুরে নির্লিপ্ত গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
"ফুপি যে পালিয়ে গেছে, এটা তোমাকে কে বলেছে?"
হঠাৎ চৈতির মায়ের প্রসঙ্গে লায়লা বেগম কিছুটা ভড়কে যান। তিনি বেশ ভালো করেই জানতেন চৈতির মা অন্য কারো হাত ধরে নয়, বরং নিজের আগের পক্ষের সন্তানের কাছেই আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু চৈতিকে তিনি কোনোদিনই মন থেকে স্বীকৃতি দিতে পারেননি কারণ কিয়াম কুহুকে অবহেলা করে ওই মেয়েটার পেছনেই উন্মাদ ছিল। তিনি সবসময় চাইতেন কুহুই এই বাড়ির লক্ষ্মী বউ হয়ে আসে। তার ওপর চৈতির বাবা মারা যাওয়ার পর যখন তার মা তাকে একা ফেলে নিরুদ্দেশ হলেন, তখন পুঞ্জীভূত রাগটা পাহাড়ে রূপ নিল। একটা কানা কড়িও তো মেয়েটার জন্য রেখে যাননি! সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি চৈতিকে মানসিক নিগ্রহ করতেন, বিষাক্ত কথার তীরের ফলা দিয়ে সারাক্ষণ বিদ্ধ রাখতেন। লায়লা বেগমকে নীরব থাকতে দেখে কিয়াম আবারও বলে ওঠে,
"ফুপি শহরে রাহাতের সঙ্গে আছে।"
লায়লা বেগম এবার নিপুণ অভিনয় করার প্রয়াস করেন। অজ্ঞতার ভান করে জিজ্ঞেস করেন,
"কে বলল তোমাকে এসব?"
কিয়াম এক ঢোক পানি খেয়ে যন্ত্রণার ভারটা গিলে ফেলে। গলার কাছে একটা অব্যক্ত কষ্টের দলা পাকিয়ে আসছে। সে শান্ত স্বরে জানায়,
"চৈতির স্বামী বলেছে।"
চৈতির স্বামী! শব্দটা লায়লা বেগমের কানে বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ে। কিয়াম বা কুহু কেউ তো কোনোদিন তাঁকে এ খবর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। তাঁর ওষ্ঠাধর শুকিয়ে আসে, অস্ফুট স্বরে প্রশ্ন করেন,
"চৈতি বিয়ে করে ফেলেছে?"
কিয়ামের বুকের গহীন থেকে আগুনের মতো তপ্ত এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। গলার ভেতর খাবারগুলো একেকটা ধারালো পাথর হয়ে বিঁধে আছে। সে আর খাওয়ার রুচি পায় না। হাত ধুতে ধুতে ম্লান গলায় বলে,
"এখান থেকে চলে যাওয়ার পরের দিনই ও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে।"
কিয়াম উঠে চলে যেতে উদ্যত হলে লায়লা বেগম নিজেকে সামলে নিয়ে বলা শুরু করেন,
"দেখেছ বাবা? ওই মেয়ের আগে থেকেই কারো সাথে চক্কর ছিল। তার মানে তুমি..."
কিয়াম আর ধৈর্যের বাঁধ ধরে রাখতে পারে না। সে আগুনঝরা চোখে লায়লা বেগমের দিকে ফিরে তাকায়। তার রুক্ষ আর শাসানো চাউনি দেখে লায়লা বেগম মুহূর্তেই জড়সড় হয়ে যান। কিয়াম দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় সতর্ক করে দেয়,
"নিজের অপরাধ ঢাকার জন্য আমার ভালোবাসার মানুষের চরিত্রে দাগ লাগবে না।"
কিয়াম আর দাড়ায় না।নিজের গন্তব্যে চলে যায়।মনে মনে সিদ্ধান্তও নিয়ে যায় এই বাড়িতে আর ফিরবে না।
~
সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চলল, কিন্তু তুরাগের ঘুম ভাঙার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সে এখনো বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে গভীর মগ্নতায় নিদ্রাচ্ছন্ন। তুরাগ মানুষটা সাধারণত এমন নয় সূর্য ওঠার আগেই তার দিনের চাকা সচল হয়। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে চৈতি লক্ষ করছে, তুরাগ অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটায়। এদিকে চৈতির চোখের পাতা এক করার জো নেই। অমাবস্যার বিভীষিকাময় রাতের পর থেকে তার রাতের ঘুম চিরতরে উধাও হয়ে গেছে। পরদিন সকালে যখন গ্রামের সাত-সাতটা মেয়ের নিথর দেহ উদ্ধার হলো, চৈতিও তুরাগের সঙ্গে গিয়েছিল বীভৎস দৃশ্য চাক্ষুষ করতে।বুক থেকে নাভি পর্যন্ত খুবলানো প্রাণহীন শরীরগুলো দেখে চৈতির জ্ঞান হারানোর উপক্রম হয়েছিল। সেই থেকে এক অজানা আতঙ্ক চৈতিকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। রাত বাড়লে যখন চারদিক নিঝুম হয়ে আসে, তখন সামান্য বাতাসের শব্দ কিংবা জানালার কপাটের খটখটানিতেও সে তড়িৎবেগে চমকে ওঠে। চৈতি মাঝে মাঝে তুরাগের নিশ্চিন্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয় কেমন করে একটা মানুষ এত রক্ত আর কান্নার মাঝখানেও এভাবে শান্ত হয়ে ঘুমাতে পারে? তুরাগের এই অতিরিক্ত নির্লিপ্ততা চৈতির মনের ভেতর আশঙ্কার এক নতুন ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরের রোদেলা দুপুরেও গ্রামটাকে আজ কেন জানি বড্ড মৃত মনে হচ্ছে। ধুলো ওড়া রাস্তার বাঁকে তাকালেই চৈতির মনে হয়, ওই বুঝি সাদা কাপড় পরা কেউ একজন তাকে ডাকছে। চৈতি দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে তুরাগের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে। তার হাতের বাঁধন এতটাই প্রবল ছিল যে গভীর ঘুমে মগ্ন তুরাগের তন্দ্রা নিমেষেই ছুটে যায়। সে নিবু নিবু চোখে চৈতির দিকে তাকাতেই দেখে, মেয়েটা ভয়ে নীল হয়ে আষ্টেপৃষ্টে তুরাগকে জড়িয়ে কুঁকড়ে বসে আছে। ওর চোখের পাতা দুটো আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছে। তুরাগ কালক্ষেপণ না করে চট করে উঠে বসে এবং চৈতিকে নিজের বুকের নিরাপদ আশ্রয়ে টেনে নেয়। চৈতির পুরো শরীর তখনো জ্বরে আক্রান্ত রোগীর মতো কাঁপছে। দীর্ঘক্ষণ সে চৈতিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আগলে রাখে। কিছুক্ষণ পর চৈতির শরীরের কম্পন একটু থিতু হলে তুরাগ ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু খায়। তারপর ওর মনের জমাটবদ্ধ ভয় ভাঙাতে মুখে চিরাচরিত হাসিটা ফুটিয়ে কৌতুক করে বলে ওঠে,
"মাছের ডিম, টিকটিকির ডিম মিলেমিশে আমার বউয়ের কলিজার ডিম!"
তুরাগের রসিকতা চৈতি একদমই সহ্য করতে পারে না। রাগে আর বিরক্তিতে ওর হাত নিশপিশ করছে, উত্তেজনায় ও তুরাগের বুকে সজোরে একটা ঘুষি বসিয়ে দেয়। হঠাৎ এই অতর্কিত আক্রমণে তুরাগ কিছুটা থতমত খেয়ে যায়, কিন্তু ততক্ষণে চৈতি নিজেকে তুরাগের বাহুবন্ধন থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছে। নিজের অবিন্যস্ত শাড়িটা ঠিক করতে করতে এক মুহূর্তও দেরি না করে চৈতি গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ওর চলে যাওয়ার ঋজু ভঙ্গিতে স্পষ্ট অভিমান ঝরে পড়ছে। তুরাগ বিছানা থেকে একটু ঝুঁকে পড়ে পেছন থেকে বেশ কয়েকবার ডাকে,
"আরে শোনেন, রাজকন্যা!বউ আই লাভ ইউ।ছেড়ে যেও না কো আমার প্রিয়া।"
চৈতি ফিরে তাকানোর প্রয়োজনও বোধ করে না। তুরাগ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের চুলে হাত চালায়।তারপর বিরবির করে বলে,
"শয়তান মহিলা গেছেগা মুড়ে ছাইরা গো ও মা গো।"
ঘর থেকে বেরিয়ে চৈতি হনহন করে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। বুকটা এখনো রাগে ধকধক করছে। সেখানে আলো বেগম তখন উনুনের ধারে রান্নায় ব্যস্ত। এই কয়েকদিনে এই প্রবীণ মানুষটার সঙ্গে চৈতির বেশ একটা সখ্যতা গড়ে উঠেছে মাঝেসাঝে দুজনে মিলে বেশ ঠাট্টা-মশকরাও চলে। চৈতিকে দেখা মাত্রই আলো বেগম ঠোঁটে একটু চওড়া হাসি ফোটে। কৌতুক করে জিজ্ঞেস করেন,
"কিরে, তোর স্বামীর ঘুম ভেঙেছে?"
তুরাগের নামটা শুনতেই চৈতির মেজাজ আবার সপ্তমে চড়ে যায়। একরাশ বিরক্তি নিয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে সে বলে ওঠে,
"উনার কথা একদম জিজ্ঞেস করবে না দাদি! আস্ত একটা বদলোক ও।"
আলো বেগম হাতা নাড়তে নাড়তেই মৃদু হাসেন। কৌতুক মেশানো স্বরে সুধায়,
"কেন রে? আবার কী করল?"
চৈতি এবার মন খারাপ করে বিমর্ষ গলায় জানায়,
"কী আর করবে! ওইদিন যা যা ঘটেছে, সেসব মনে পড়লে আজও আমার আত্মা কেঁপে ওঠে। আর উনি সেই সব ভয়াবহ ব্যাপার নিয়ে আমার সাথে অকাতরে ইয়ারকি মারেন!"
চৈতির বিরক্তি দেখেও আলো বেগমের মুখে প্রশান্তির হাসি। তিনি খুব স্বাভাবিক গলায় বলেন,
"আরে ও তো ছোটবেলা থেকেই এইসব দেখে অভ্যস্ত, তাই হয়তো ওর কাছে এইগুলা কোনো ব্যাপার না।"
আলো বেগমের কথা শুনে চৈতি একদম স্তব্ধ হয়ে যায়। মুহূর্তেই তার ভাবনার জগৎ ওলটপালট হয়ে আসে। ছোটবেলা থেকে অভ্যস্ত মানে? এসব খুনাখুনি আর রক্তারক্তি কেউ ছোট থেকে দেখে অভ্যস্ত হয় কী করে? এক অজানা আশঙ্কায় চৈতির কণ্ঠস্বর নড়বড়ে হয়ে ওঠে। সে ভয়ে ভয়ে ফিসফিস করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
"এই খুনগুলো কত বছর ধরে চলছে দাদি?"
আলো বেগম কিছুক্ষণ নিথর হয়ে থাকেন। স্মৃতিপটে ভেসে ওঠা পুরনো কোনো এক আলাপ হাতড়ে মনে করার প্রয়াস করেন। জাফর আলী একবার তাকে বলেছিলেন এই জমাটবদ্ধ অন্ধকারের ইতিহাসের কথা। সেই স্মৃতি মন্থন করে তিনি নির্লিপ্তভাবে উত্তর দ্যান,
"পঁয়ত্রিশ বছরেরও বেশি হবে রে দাদুভাই।"
পঁয়ত্রিশ বছর! সংখ্যাটা শুনেই চৈতির মনে হয় পায়ের নিচের মাটিটা সরে যাচ্ছে। এই জনপদে মৃত্যুর মিছিল তবে আজ নতুন নয়! যে বিভীষিকা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, তা এই জনপদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে কয়েক দশক ধরে। আলো বেগম আড়চোখে একবার চৈতির দিকে তাকান। চৈতির ফ্যাকাশে মুখটা দেখেই তিনি অভিজ্ঞ মানুষের মতো বুঝে নেন যে, তুরাগ এইসব অন্ধকার ইতিহাস সম্পর্কে তাকে বিন্দুমাত্র আভাস দেয়নি। আলো বেগম চান না মেয়েটা আর নতুন করে ভয় পাক। তুরাগের ওপর চৈতির রাগটা ভাঙানো দরকার, তাই তিনি সুর নরম করে বলেন,
"যা তো দাদুভাই, তুরাগকে গিয়ে নিয়ে আয়। এখন আর এইসব নিয়ে ভাবিস না।"
চৈতি ঘোরের মধ্যে তলিয়ে আছে। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা কোনো এক যন্ত্রমানবীর মতো সে আলো বেগমের কথায় উঠে দাঁড়ায়। মাথাটা তার অনবরত ভোঁ ভোঁ করছে। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে সে যেই না শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াবে, অমনি বাড়ির প্রবেশ পথ থেকে একটা অপরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,
"এই মিস...!"
চলবে….
(আগের মতো আর আগ্রহ পাইনা লিখতে।কেউ রাগ করবেন না দয়া করে আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিয়মিত হওয়ার চেষ্টা করবো।)