ফন্ট সাইজ:
থিম:
চৈত্র শেষে শ্রাবণধারা

৩২তম পর্ব

লেখক: চিন্ময়ী নূর

৩২.( প্রথমাংশ)

পরের দিন দুপুর। সূর্যের প্রখর আলো জীর্ণ দালানের ফাটল দিয়ে ভেতরে এসে পড়েছে, কিন্তু আলোয় কোনো স্বস্তি নেই। দীর্ঘ সময় অচেতন থাকার পর যখন চৈতির জ্ঞান ফেরে, চোখের পাতা মেলতেই তার পুরো পৃথিবীটা দুলে ওঠে। ঝাপসা চোখে সে অনুভব করে, তার শরীরটা শক্ত কোনো মেঝের ওপর পড়ে আছে। সচেতনতা বাড়ার সাথে সাথে সে বুঝতে পারে, তার হাত এবং পা মোটা দড়ি দিয়ে বাঁধা। এমনকি মুখটাও এক টুকরো নোংরা কাপড় দিয়ে কষে আঁটা। শরীরের প্রতিটি জয়েন্টে হাজারো সূঁচ ফোটানোর মতো তীব্র যন্ত্রণা। সামান্য নড়ার চেষ্টা করতেই অসহ্য ব্যথায় পুরো শরীর কুঁকড়ে যায়। মনে হয় হাড়গুলো বুঝি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। চৈতি প্রাণপণ চেষ্টা করে চিৎকার করার। ভেতর থেকে এক বুক আর্তনাদ দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইলেও মুখ বাঁধা থাকার কারণে কেবল করুণ গোঙানি ছাড়া আর কিছুই বের হয় না। রুদ্ধ শব্দটা ঘরের গুমোট বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে আবার তার কানেই ফিরে আসে। অদূরেই শোনা যায় জুতার কর্কশ শব্দ। কেউ একজন ধীরস্থির পায়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। চৈতি আতঙ্কে চোখ বড় বড় করে ছায়ার দিকে তাকায়। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটা যখন আলোর বিপরীতে স্পষ্ট হয়, চৈতির হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। আলো বেগম!

হাতে এক বাটি গরম দুধ আর মুখে পরিচিত মায়াবী হাসি। কিন্তু হাসিতে আজ কোনো মাতৃত্ব নেই, আছে কেবল হিংস্রতা। তিনি চৈতির পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বিড়বিড় করে বলেন,

"খুব কষ্ট হচ্ছে মা? কী দরকার ছিল ঘর থেকে বেরিয়ে স্বামীকে খোঁজার? শান্তিতে ঘরে থাকলে তো আর এই দৃশ্য দেখতে হতো না।"

চৈতি ছটফট করে কিছু বলার চেষ্টা করে, কিন্তু মুখ বাঁধা থাকায় কেবল অস্ফুট গোঙানি ছাড়া আর কিছুই বের হয় না। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ছে। আলো বেগম একটু ঝুঁকে চৈতির কপালে হাত রেখে ঠাণ্ডা গলায় বলেন,

"যে স্বামীর জন্য এত দূর ছুটে আসলি, তার সাথে কথা বলবি না? শেষবারের মতো দেখা করবি না?"

চৈতি এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। তার মানে তুরাগ এখানেই আছে! কেমন আছে লোকটা? বেঁচে আছে তো? আলো বেগম দরজার দিকে তাকিয়ে ডাক দিলেন,

"জহির! ও জহির!"

ছুটে আসে জহির। লোকটাকে দেখেই চৈতি অবাক হয়ে যায়। এই জহিরকে সে বহুবার কিয়ামের সাথে দেখেছে। কিয়ামের মতো প্রভাবশালী মানুষের ডান হাত এই শয়তানের আস্তানায় কী করছে? আলো বেগম জহিরের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় আদেশ দেন,

"যা তো, একে ওর স্বামীর কাছে নিয়ে যা। একটু মেলামেশা করুক শেষবেলায়।"

জহির কোনো দয়ামায়া ছাড়াই চৈতির চুল মুঠো করে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ব্যথায় চৈতির প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। জহির যখন দেখে চুলে ধরে টেনে বেশিদূর নেওয়া যাচ্ছে না, তখন সে চৈতির হাত ধরে এমনভাবে টানতে শুরু করে মনে হচ্ছে শরীর থেকে হাতটা আজ আলাদাই হয়ে যাবে।জহির চৈতিকে হিড়হিড় করে পাশের একটা অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে নিয়ে যায়। চৈতির শরীর আর সায় দিচ্ছে না, চেতনার শেষ বিন্দুটুকুও নিভে আসছে। জ্ঞান হারানোর ঠিক আগে সে চোখের কোণ দিয়ে যা দেখে, তাতে তার আত্মা কেঁপে ওঠে। ঘরের মেঝের ওপর আধমরা হয়ে পড়ে আছে তুরাগ আর ইমতিয়াজ। তুরাগের শক্তিশালী শরীরটা আজ রক্তাক্ত, নিস্তেজ। জহির অবজ্ঞার সাথে চৈতিকে তুরাগের পায়ের কাছে ছুড়ে ফেলে দিয়ে কর্কশ গলায় বলে,

"এই নে, তোর স্বামী। শেষ যা কথা আছে কইয়া ল।"

বলেই জহির সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে বাইরে থেকে শিকল তুলে দেয়। দরজা বন্ধ হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তুরাগ আর ইমতিয়াজ নিজেদের চোখ মেলে তাকায়। তুরাগের নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা ছিল স্রেফ অভিনয়। ইমতিয়াজকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হলেও ভোরের দিকেই তার রেশ কেটে গিয়েছিল, কিন্তু পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে সে-ও লাশের মতো পড়ে থাকে। এতক্ষণ তারা কেবল চোখের ইশারায় একে অপরের সাথে কথা সেরে নিচ্ছিল।চৈতিকে ওভাবে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিতে দেখে তুরাগের বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। জহির বেরিয়ে যেতেই তুরাগ হামাগুড়ি দিয়ে চৈতির কাছে ছুটে আসে। অগোছালো, রক্তাক্ত শরীরে সে তার রাজকন্যাকে জড়িয়ে ধরে। তুরাগ নিজের কাঁপাকাঁপা হাতে চৈতির মুখের বাঁধনটা দ্রুত খুলে দেয়। তারপর দুই হাতের তালু দিয়ে চৈতির মুখটা আগলে ধরে বিষণ্ণ বলে,

"আপনার লগে আর সংসার করা হলো না রাজকন্যা..."

তুরাগের কণ্ঠস্বর কানে যেতেই চৈতির অবশ হয়ে আসা শরীরে যেন প্রাণের সঞ্চার। অর্ধাচ্ছন্ন চৈতন্যেই সে নিজেকে কিছুটা সামলে নেয়। তুরাগের রক্তাক্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে,

"আমি ভেবেছিলাম আপনাকে আর কোনোদিন দেখতে পারবো না।"

তুরাগ চৈতিকে বুকের সাথে আরও মিশিয়ে জড়িয়ে ধরে। নিজের শরীরের ক্ষত ছাপিয়ে এখন তার হৃদয়ে চৈতিকে হারানোর ভয় প্রবলভাবে বিরাজমান। সে ফিসফিস করে বলে,

"এইতো আমি, আপনার সামনেই আছি। কিন্তু আপনি এখানে এলেন কীভাবে রাজকন্যা? "

চৈতি ডুকরে কেঁদে উঠে তুরাগের রক্তমাখা শার্টে নিজের নাক মুছে নেয়। তার কণ্ঠস্বর তখনো কান্নায় বুজে আসছে।

"আপনাকে সকাল থেকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কেউ কোনো খবর দিতে পারছিল না। আলো বেগম বারবার ঘরে থাকতে বললেও মন মানছিল না। তাই আপনাকে খুঁজতে আসছিলাম। কিন্তু জঙ্গলের ভেতর ঢুকে যখন মেয়েদের কান্নার আওয়াজ শুনলাম, তখন এদিকে এসে সব দৃশ্য স্বচক্ষে দেখার পর আমার শরীর আর সায় দেয়নি, ওখানেই মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত আর কিছু মনে নেই আমার।"

ইমতিয়াজ গলা ঝাড়া দিয়ে একটু বিরক্ত মিশ্রিত স্বরে বলল,

"ভাই, এনে আমিও আছি! একটু দূরত্ব বজায় রেখে বস। মরার আগে সিঙ্গেল মানুষের সামনে রোমান্স করিস না।"

ইমতিয়াজের কথায় তুরাগ বিন্দুমাত্র লজ্জিত নয়, উল্টো চৈতিকে আরও শক্ত করে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে। তুরাগের মুখে তখন এক চিলতে বাঁকা হাসি। সে টিপ্পনী কেটে জিজ্ঞেস করে,

"তো পাগলের ডাক্তার, তুই এনে কী করিস? এই গুহায় মরতে আসলি কেন?"

ইমতিয়াজ লজ্জায় চোখ নিচু করে উত্তর দেয়,

"ওয়াশরুমে যাওয়ার সময় খালা আর খালুকে কেমন জানি চোরের মতো এদিকে আসতে দেখেছিলাম। সন্দেহ হওয়ায় পিছু নিয়েছিলাম। তারপর কী হইছে মনে নাই, সোজা এই ঘরে আবিষ্কার করলাম নিজেকে।"

তুরাগ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবজ্ঞার সুরে টিপ্পনী কাটে,

"মনে থাকবে কেমনে? সারাদিন পাগলের সঙ্গে থাকতে থাকতে তোর নিজেরও মতিভ্রম হয়েছে।"

ইমতিয়াজ চোখ গরম করে তুরাগকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কিছু বলতে চাইলেও চৈতির মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের কথা গিলে ফেলে। জীবনের এই শেষ মুহূর্তে এসে সে আর তুরাগের পুরনো পর্দা ফাঁস করতে নারাজ। নাহলে সে এখনই বলে দিত যে, এই তুরাগও টানা দুই বছর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পাগল হয়ে তারই কাছে চিকিৎসা নিয়েছে। ইমতিয়াজ কিছু বলতে যাওয়ার আগেই সশব্দে ঘরের দরজা খুলে যায়। আকস্মিক শব্দে ইমতিয়াজ আর তুরাগ চরমভাবে চমকে ওঠে। বিপদের এই মুহূর্তে শরীরের প্রতিটি স্নায়ু সতর্ক হলেও তুরাগ নড়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ পায় না। কারণ, চৈতি তুরাগের বুকের ওপর নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় মানসিক ধকল আর শারীরিক যন্ত্রণার পর তুরাগের বুকের উষ্ণতা তাকে অঘোষিত শান্তির রাজ্যে নিয়ে গেছে। দরজার চৌকাঠে একটা ছায়া দৃশ্যমান। জহির এক হাতে হারিকেন আর অন্য হাতে চকচকে ধারালো অস্ত্র নিয়ে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে। হারিকেনের কম্পমান আলোয় তার মুখটা কোনো নরপিশাচের মতো ভয়ংকর দেখাচ্ছে। সে ঘরের ভেতর এক পা বাড়াতেই ইমতিয়াজ নিজের শ্বাস বন্ধ করে ফেলে।

জহির কর্কশ গলায় বিড়বিড় করে ওঠে,

"মরার আগে দেখি মাহতাব উথলায় পড়তেছে।"

তুরাগের হাতের শিরাগুলো ফুলে ওঠে। বুকের ওপর ঘুমন্ত চৈতিকে একটুও নাড়া না দিয়ে সে কেবল চোখ দিয়ে জহিরকে ভস্ম করার মতো এক দৃষ্টিতে তাকায়।ইমতিয়াজ জহিরের অস্ত্রর দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে বলল,

"ভাই এটা দিয়ে মারবেন আমাদের?"

জহির চোখ লাল করে তাকায় ইমতিয়াজের দিকে। ইমতিয়াজ ভয়ে ঢোক গিলে আবারও বলে,

"না মানে, আমি বলছিলাম কি আমি তো খালার ছোট বোনের ছেলে, আমাকে কি একটু শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া যায় না? আর তুরাগ আমার বন্ধু হিসেবে ওকে, আর তুরাগের বউ হিসেবে তুরাগের বউকে...?"

জহির গর্জে ওঠে,

"আর একটা কথা বললে এখনই বলি দিয়ে দিবো!"

বলির কথা শুনে তুরাগ ভ্রু কুঁচকে বলে,

"সারাজীবন দেখছি ছাগল বলি দেয়। আমাদের কি ছাগলের মতো লাগে?"

জহির রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এক পা সামনে এগোয়। তার চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছিল সে এখনই তুরাগ বা ইমতিয়াজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু আরও এক পা এগোতে নিলেই বাইরে থেকে ধমকের সুরে আলো বেগম আর জাফর আলী চিৎকার করে ওঠেন,

"দাঁড়া...!"

জহির স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আলো বেগম হাতে একটা টকটকে লাল শাড়ি নিয়ে ধীর পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকলেন। তাঁর পেছনে জমের মতো গম্ভীর মুখে জাফর আলীও এসে দাঁড়ালেন। আলো বেগমের তীক্ষ্ণ আর কর্কশ কণ্ঠস্বরের ধাক্কায় চৈতির ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলেই সে যখন এই ভয়াবহ পরিবেশটা দেখে, আতঙ্কে সে আরও শক্ত করে তুরাগকে জড়িয়ে ধরে তার বুকের ভেতর মুখ লুকায়। আলো বেগম চৈতি আর তুরাগের এই অসহায় অবস্থার দিকে তাকিয়ে একটা শীতল হাসি দিলেন। চৈতির কাছে সব সময় এই মানুষটাকে খুব আপন মনে হতো, কিন্তু আজ এই মুহূর্তে আলো বেগমের হাসিটা তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বীভৎস আর বিকৃত মনে হলো। আলো বেগম আর জাফর আলী পাশাপাশি দুটো কাঠের চেয়ারে এসে বসলেন। আলো বেগম হাতের লাল শাড়িটা নিজের কোলের ওপর রেখে তুরাগ, চৈতি আর ইমতিয়াজের দিকে এক এক করে তাকালেন। তারপর খুব শান্ত গলায় বললেন,

"তোদের দুইজনকে কিছু করার পরিকল্পনা আমার ছিল না। আর ইমতিয়াজ, তুই তো বাড়ির ছেলে, তোকেও মারার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমাদের ছিল না। কিন্তু কী আর করার? আজ পূর্ণিমার এই মাহেন্দ্রক্ষণে তিনি স্বয়ং তোদের তিনজনের রক্ত চেয়েছেন। আর তিনি যখন আমার কাছে কিছু চান, তখন আমি না দিয়ে পারি না।"

জাফর আলী পাশ থেকে যান্ত্রিকভাবে মাথা নেড়ে সায় দিলেন। ইমতিয়াজ বরাবরই একটু বিচিত্র স্বভাবের, সে মনেপ্রাণে ভাগ্য বিশ্বাসী। তার মতে, কপালে যা আছে তা হবেই, তাই অহেতুক ভয় পেয়ে লাভ নেই। এই চরম পরিস্থিতিতে সে মনের কৌতূহল সামলাতে না পেরে প্রশ্নটা করে বসল,

"খালা, তিনিটা আসলে কে? আমরা কি মরার আগে একবার তাঁর দেখা পেতে পারি?"

আলো বেগম ঘর কাঁপিয়ে অট্টহাসি হাসলেন। হাসি থামিয়ে তিনি তীক্ষ্ণ গলায় বললেন,

"তিনি আমার পীড়! তিনি আমাকে ছাড়া আর কাউকে দেখা দেন না। তোদের মতো পাপীদের চোখের সামনে তিনি আসবেন না।"

ইমতিয়াজ মুখ গোমড়া করে বিড়বিড় করে বলল,

"এ আবার কেমন পীড় যে শুধু আপনার সাথেই দেখা করে? আমাদের সাথে দেখা করলে কি জাত যাবে?"

ইমতিয়াজের এই আলগা কথা আলো বেগমের সহ্য হচ্ছে না। তিনি চোখ গরম করে রাগী দৃষ্টিতে ইমতিয়াজের দিকে তাকালেন। চাহনি এতটাই ভয়ংকর ছিল যে ইমতিয়াজ সঙ্গে সঙ্গে মুখ টিপে চুপ হয়ে গেল। আলো বেগম এবার তাঁর দৃষ্টি ফেরালেন চৈতি আর তুরাগের দিকে।

"তুরাগ, তুই তো আমার নাতি। তোর দাদা আর আমি তোকে অনেক যত্ন করে বড় করেছি। শেষ সময়ে তুই কিছু জিজ্ঞেস করবি না?"

তুরাগ মেঝেতে চোখ নিবদ্ধ করে রাখল। আলো বেগমের দিকে তাকাতেও তার এখন তীব্র ঘৃণা হচ্ছে। এই মানুষ দুটির ভেতর যে এমন পৈশাচিক রূপ লুকিয়ে ছিল, তা সে কল্পনাও করেনি। অথচ একটা সময় এদেরই সে নিজের দাদা-দাদির আসনে বসিয়ে শ্রদ্ধা করত। তুরাগ দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,

"মারবেন তো রাতেই, তাই না? হাতে তো অনেক সময়। অন্তত ইতিহাসটা বলে যান। আমাদের রক্ত দিয়ে কার তৃষ্ণা মেটাচ্ছেন সেটা তো জানা দরকার।"

আলো বেগম আবারও শীতল হাসি হাসলেন।তারপর জাফর আলীর দিকে তাকিয়ে বললেন,

"তখন আমি ছিলাম নামকরা গায়িকা। গ্রামে গ্রামে ঘুরে গান করাই ছিল আমার নেশা আর পেশা। আমার সাথে ছায়ার মতো থাকতেন আমার আব্বা। কিন্তু সেদিন, যেদিন আমি প্রথম এই বাড়িতে পা রাখি, সেদিন আব্বা সাথে ছিলেন না। জাফরের বড় ভাইয়ের মেয়ে বিয়ে ছিল, টানা চার দিনের গান-বাজনার আসর। এই বিশাল রাজপ্রাসাদ সমতুল্য বাড়ি দেখে আমি তো থমকে গিয়েছিলাম। এত বড় ভিটে এর আগে কখনো দেখিনি। প্রথম দিনের গান শেষে খাবার টেবিলে এক সুদর্শন পুরুষ আমার গানের খুব প্রশংসা করলেন। নাম তার জাফর আলী। আমার বয়স তখন মোটে আঠারো। এত সুন্দর পুরুষ এর আগে কখনো দেখিনি,তার উপর আবার আমার এত প্রশংসা। প্রথম দেখাতেই আমি আমার মনটা ওনাকে দিয়ে বসলাম। চার দিনের সেই আসরে আমাদের বহুবার দেখা হলো, কথা হলো। মনের লেনদেন হতেও সময় লাগল না। আমাদের প্রেম তখন টইটম্বুর। জাফর মাঝে মাঝেই আমাদের গ্রামে চুপিচুপি দেখা করতে যেতো। আমাদের প্রেমের যখন তিন মাস, তখন বাড়ি থেকে আমার বিয়ের প্রস্তাব এল। আমি সোজাসুজি না করে দিলাম। আমার আব্বা আমার কোনো কথা ফেলতেন না, কারণ তখন পুরো সংসারটা চলত আমার গানের রোজগারে। আমার মুখ কাঁচুমাচু দেখে আব্বা কারণ জানতে চাইলেন। আমি ওনার কথা সব খুলে বললাম। আব্বা খুশি হয়েই বললেন, তিনি নিজে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এই বাড়িতে আসবেন। আব্বা এসেছিলেনও। কিন্তু আমার ভালোবাসাই আমার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়াল। আব্বা যখন জাফরের পরিবারের কাছে আমাদের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এই বাড়ির উঠোনে দাঁড়ালেন, তখন গ্রামে একটা মেলার উৎসব চলছিল। উনার পরিবার আর গ্রামের মাতব্বরেরা মিলে আমার আব্বাকে পুরো গ্রামের মানুষের সামনে অপমান করল। তারা আমার চরিত্র নিয়ে নোংরা কথা ছড়ালো। বলল, আমি নাকি গ্রামে গ্রামে ঘুরে পুরুষদের সাথে রাত কাটাই। এমনকি গ্রামের মহিলারাও আমার আব্বাকে উপহাস করে আমাকে পতিতার বাপ বলে গালি দিল। সম্মানী মানুষ ছিলেন আব্বা, সেই অপমান সইতে পারেননি। মেলা থেকে ফিরে ওই রাতেই আমাদের বাড়ির উঠোনের আমগাছে গলায় দড়ি দিলেন তিনি।"

কথাগুলো বলে একটু থামলেন আলো বেগম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন,

"আব্বা মারা যাওয়ার পরও আমার গান বন্ধ করার উপায় ছিল না। ঘরে তিন-তিনটে বোন, মাথার ওপর ছায়া দেওয়ার মতো পুরুষ বলতে কেউ নেই। তার ওপর আম্মা তখন দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই পেটের দায়ে আবার পথে নামতে হলো। জাফরের সাথে যোগাযোগ করার কোনো ইচ্ছা আর ছিলো নাঁ।চলতে থাকলাম নিজের মতো করে কিন্তু কদিন গভীর রাতে গানের আসর থেকে ফেরার পথে দেখলাম, ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পরা এক মুরুব্বি রাস্তার ধারে পড়ে আছেন। নির্জন পথে আমি একাই ফিরতাম। মায়া লাগল, ওনাকে পানি খাওয়ালাম। আমার ব্যাগে রাতের খাবার ছিল, সেটাও ওনাকে দিলাম। খাওয়ার পর মুরুব্বি জানালেন তিনি নাকি তিন দিন ধরে কিছু খাননি। খুব খুশি হয়ে আমাকে একটা ঠিকানা দিয়ে বললেন সেখানে যেতে। আমি প্রথমে না করলেও তিনি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, সেখানে গেলে আমি যা চাইব তাই পাব। এমনকি আমার আব্বার খুনিদের শাস্তি দিতেও তিনি সাহায্য করবেন, আর জাফরকেও আমার কাছে এনে দেবেন। আমি শিউরে উঠলাম। আমার মনের কথা তিনি জানলেন কী করে? কিন্তু কিছু বলার আগেই দেখলাম চোখের পলকে লোকটা কুয়াশার মতো গায়েব হয়ে গেছে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দোয়া পড়তে পড়তে বাড়ি ফিরলাম। এর কিছুদিন পর আবারও সেই মুরুব্বিকে একইভাবে রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে দেখলাম। এবারও তাকে খাবার-পানি দিলাম। কিন্তু সেবার তিনি আর আমাকে ফেলে গেলেন না, একরকম টেনে নিয়ে গেলেন তাঁর বাড়িতে। তাঁর বাড়ির ভেতরে ঢুকে যা দেখলাম, তা দেখে আমার কলিজা শুকিয়ে গেল! চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ছোট বাচ্চাদের কঙ্কাল, আর কাঁচের বয়ামে রাখা পাঁচ-ছয় মাসের বাচ্চাদের ভ্রূণ। দুর্গন্ধে আমার বমি চলে এল। তিনি আমাকে তাঁর ঘরে নিয়ে একটা কুচকুচে কালো পাথর দেখিয়ে বললেন, এই পাথরের কাছে যা চাইব তাই পাব। কিন্তু বিনিময়ে তাঁকে তিন থেকে পাঁচ মাসের ভ্রূণ দিতে হবে। আমি চিৎকার করে উঠলাম, রাজি হলাম না। জাফরকে পাওয়ার লোভও তখন তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। কিন্তু তিনি যখন বললেন আমাকে অমরত্ব দান করবেন এবং তার জন্য টানা চল্লিশ বছর প্রতি বছর একটা করে ভ্রূণ দিতে হবে আমি তখনো বিশ্বাস করিনি। চলে আসার সময় তিনি অভিশাপের মতো বললেন, আমার এবারও বোন হবে আর বোন হওয়ার সময় আমার মা মারা যাবে। বিশ্বাস করিনি তখনো। কিন্তু ঠিক আট মাস পর যখন আমার ছোট বোনটা হলো আর মা সত্যিই মারা গেলেন, তখন আমার সারা শরীর কেঁপে উঠল। আমার খোদার ওপর তখন বিশ্বাস জন্মাল। সে রাতেই এক অজানার টানে পাগলের মতো ছুটে গেলাম খোদার কাছে। আমি যখন ওনার কাছে ফিরে গেলাম, দেখলাম তিনি আমার অপেক্ষায় মতো বসে আছেন। এক বছর ধরে সে নির্জন ঘরে বসে আমি শিখলাম কালো জাদু আর মানুষকে বশ করার বিদ্যা। জগতটা আমার কাছে বদলে গেল। সবকিছু শেখার পর আমার প্রথম লক্ষ্য ছিল এই বড় বাড়ি। আমার সাথে তখন রক্তপিপাসু পালিত জিন। চোখের পলকে জাফরের পুরো পরিবারকে বশ করলাম। যারা একসময় আমার আব্বাকে পতিতার মেয়ে বলে তাড়িয়ে দিয়েছিল, তারাই ধুমধাম করে আমার আর জাফরের বিয়ে দিল। আমি প্রতিশোধ আর অমরত্বের নেশায় বুঁদ হয়ে গেলাম। পুরো গ্রামকে হাতের মুঠোয় আনলাম, কিন্তু বিপত্তি বাঁধল ওই শাহ বংশকে নিয়ে। তারা ছিল বড্ড ধার্মিক, তাদের ওপর আমার জাদু কাজ করত না। কিন্তু আমি দমে যাইনি। অমরত্বের প্রথম শর্ত ছিল নিজের ভ্রূণ দেওয়া। নয় বছরে সাতবার গর্ভবতী হলাম, আর সাতটা ভ্রূণ তুলে দিলাম আমার খোদার হাতে। কিন্তু তাতেও হচ্ছিল না। আমার খোদা চাইলেন এক রাতে একটা পুরো পরিবারের পোড়া মাংস। সুযোগ এল জাফরের বড় ভাইয়ের মেয়ের বিয়ের সময়। বাড়ির সবাই যখন উৎসবে মত্ত, তখনই আমি লাগিয়ে দিলাম আগুন। ঘরবাড়ি জ্বলছে, মানুষগুলো আর্তনাদ করছে আর লেলিহান শিখার মাঝে আমি লাশের শরীর থেকে মাংস কেটে আলাদা করছিলাম। পুরো গ্রাম তখন আমার বশে, তাই কেউ আগুন নেভাতে আসেনি। কিন্তু ভোরবেলায় সব ঘেঁটে দিল ওই তুরাগ!"

কথাটা বলে আলো বেগম তুরাগের দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন সুযোগ পেলে এখনই তাকে ছিঁড়ে ফেলবেন।

"তুরাগ ছিল জাফরের ভাতিজার বন্ধু। খুব ভোরে ও আমাদের বাড়িতে এসেই সব দেখে ফেলল। আমি বীভৎসভাবে লাশের মাংস কাটছি এই দৃশ্য দেখে ও চিৎকার করে উঠল। ভয়ে আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। তুরাগ যদি কাউকে কিছু বলে দিত, তবে আমার স্বপ্ন এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যেত। কিন্তু মাস্টার সাহেবের ছেলেকে সরাসরি মারলে গ্রামে হাঙ্গামা হতো। তাই আমি ওকে বেঁধে ফেললাম আর আমার কালো জাদুর জোরে ওকে চিরতরে বোবা করে দিলাম। ভয়ে আর জাদুর প্রভাবে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ছেলেটা পাগল হয়ে গেল। সবাই ভাবল বন্ধুকে হারিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। কিন্তু বছর কয়েক পরই ও সুস্থ হলো, ততদিনে ও সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছে। তুরাগ বড় হলো, আমাদের সাথে দাদা-দাদির পবিত্র সম্পর্ক পাতালো। আমরাও ভাবলাম ওকে বড় কোনো কাজে লাগানো যাবে। কিন্তু তুরাগের বাপ মাস্টার মানুষ, ও ঠিকই কিছু একটা টের পেয়ে ছেলেকে শহরে পাঠিয়ে দিল। তুরাগ চলে যাওয়ার পর আমি শাহ বাড়ির শেষ চিহ্নটুকুও মুছে ফেললাম। ততদিনে পুরো গ্রাম আমার দাসে পরিণত হয়েছে। গ্রামে কোনো গর্ভবতী হলে তারা নিজেরা এসে আমাকে তাদের ভ্রূণ দিয়ে যায়, নয়তো গ্রামের পুরুষরাই তাদের ধরে এনে আমার বেদিতে বলি দেয়। কিন্তু শুধু ভ্রূণে আমার কাজ হচ্ছিল না। শক্তির তৃষ্ণা আর অমরত্বের লোভ বেড়েই যাচ্ছিল। তাই ধীরে ধীরে পুরো ছাতিয়ানী গ্রামটাকে বাইরের দুনিয়া থেকে একদম আলাদা করে ফেললাম। এমন এক অদৃশ্য দেওয়াল তুললাম যে সরকারের খাতায় এই গ্রাম থাকলেও বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব রইল না। কেউ কাজ ছাড়া এখানে আসত না, আর যারা আসত তারা আর কোনোদিন ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেত না। শুরুতে বছরে একটা করে নারীর ভ্রূণ দিতাম। ভ্রূণ নেওয়ার পর মা এমনিতেই মরে যেত, তাদের লাশগুলো আবর্জনার মতো জঙ্গলে ফেলে দিতাম। কিন্তু আমার পীড় আরও ভ্রূণ চাইতে লাগলেন। পিয়াস বাড়ল, সাথে বাড়ল আমার খরচ। এই বিশাল সাম্রাজ্য চালাতে তো কাড়ি কাড়ি টাকার দরকার। গ্রামের মানুষকে বশ রাখা, পুলিশ-প্রশাসনকে অন্ধ করে রাখা টাকা ছাড়া কিছুই হয় না। তাই শুরু করলাম এক নতুন ব্যবসা। যাদের দেহ থেকে আমি ভ্রূণ নিতাম, তাদের শরীরের দামি দামি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে বের করে নিতাম। কিডনি, লিভার, চোখ সবকিছুরই তো বাজারে আগুন দাম! বাইরে আমার লোক ফিট করা ছিল। এই দুনিয়াটা বড় লোভী ! লোভের কাছে মানুষ তার বিবেক-ধর্ম সব পানির দরে বিক্রি করে দেয়। এমনকি বড় বড় সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার আর নার্সরাও আমার এই কারবারে হাত মেলাল। আমি তাদের তাজা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিতাম, আর বদলে তারা আমাকে টাকা আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিত। তারা ভালো অংকের ভাগ পেত, আর আমি নিতাম পুরো লাভের পঁচিশ শতাংশ।"

চৈতি আর সহ্য করতে পারল না। সে নিজের দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠল,

"চুপ করুন! দয়া করে আর একটা কথা বলবেন না! আর একটাও না!"

ভয়ে আর ঘৃণায় তার শরীর রি রি করে কাঁপছে। সে তুরাগকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ভাঙা গলায় বলল,

"উনাকে বলুন চুপ করতে! আমি আর শুনতে পারছি না... উনাকে যেতে বলুন এখান থেকে!"

চৈতির মানসিক বিপর্যয় দেখে আলো বেগমের মুখে এক পৈশাচিক তৃপ্তির হাসি ফুটে। তিনি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন, এই দৃশ্যটাই তিনি উপভোগ করতে চেয়েছিলেন। শাড়ির আঁচলটা কাঁধে তুলে নিয়ে তিনি শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় বললেন,

"ঠিক আছে মা, এখন তবে চুপ করলাম। রাতে যখন তিনি আসবেন, তখন এসে বাকি ইতিহাসটুকু বলব। তুরাগ, তোর বউকে বলিস নিজেকে তৈরি রাখতে। আজ রাতে তার ভূমিকাটা কিন্তু অনেক বড়।"

আলো বেগম আর জাফর আলী ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। জহির বাইরে থেকে আবারও দরজাটা আটকে শিকল তুলে দিল। আলো বেগমরা চলে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চৈতির দম বন্ধ হয়ে আসে। তার পাকস্থলী উল্টে আসছে। অসহ্য বমিভাব আর শারীরিক যন্ত্রণায় সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তুরাগের পায়ের কাছেই সে সজোরে বমি করে দিল। তার পুরো শরীর ঘামছে, চোখের মণিগুলো ঘোলাটে হয়ে আসছে।

চলবে….#চৈত্র_শেষে_শ্রাবণধারা

#চিন্ময়ী_নূর

৩২ (দ্বিতীয়ংশ)

সাল ২০১৮। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের প্রবেশদ্বার দিয়ে তেইশ বছরের এক তরুণী বেরিয়ে আসে, চোখেমুখে তার স্বর্গীয় আভা। গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে পিচঢালা পথ থেকে আগুনের হলকা বেরোলেও এই তরুণীর ঠোঁটের কোণে লেপ্টে থাকা অমলিন হাসিটা এক পশলা বৃষ্টির মতোই শীতল। একজন নারী যখন প্রথমবার নিজের ভেতরে অন্য এক প্রাণের স্পন্দনের অস্তিত্ব টের পায়, তখন জগতের সব দহন তুচ্ছ হয়ে যায়। সে আজ এক নতুন পরিচয়ে ভূষিত সে মা হতে চলেছে। এই সুখবরটা সবার আগে তাকে জানাতে হবে, যে মানুষটা তার পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু।হাসপাতালের গেট পেরিয়ে সে গাড়ির খোঁজে প্রধান সড়কের দিকে এগোয়। গরমে শরীর সামান্য দুর্বল ঠেকলেও মনের আনন্দ তাকে সামনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিয়তি হয়তো আড়ালে দাঁড়িয়ে নিষ্ঠুরতম চালটা চালছে। ভিড়ের মধ্যে দ্রুত হাঁটার সময় তার একজনের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। সাথে তীরের ফলার মতো তীক্ষ্ণ কিছু একটা হাতে বিঁধে যায়। মেয়েটা সামান্য চমকে উঠলেও বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয় না। ভাবল হয়তো ভিড়ের মধ্যে কারও ব্যাগ বা ছাতার ধাতব অংশ লেগেছে। আজ তার খুশির দিন, ছোটখাটো ব্যথায় মনোযোগ দেওয়ার সময় বা ইচ্ছা কোনোটিই নেই।কিন্তু মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মাথার ভেতরটা তীব্রভাবে চক্কর দিয়ে ওঠে। হাতের বিঁধে যাওয়া জায়গা থেকে শীতল স্রোত তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। চোখের সামনে ধুলোমাখা শহরটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে। পা দুটো আর ভার সইতে পারছে না। সে শুধু অনুভব করে, দুপাশ থেকে শক্ত দুটি হাত তাকে ধরেছে ।কিন্তু দেখলো না কে বা কারা তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

ঠিক দুই সপ্তাহ পর। লোকালয় থেকে যোজন যোজন দূরে, দুনিয়ার সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এক অজপাড়াগাঁ থেকে উদ্ধার হয় মেয়েটির পচা-গলা লাশ। নদীর এক কোণে পড়ে থাকা দেহটা চেনার উপায় নেই, বিকৃত হয়ে গেছে ততদিনে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সেদিন ইনভেস্টিগেশন অফিসার হিসেবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন মেয়েটির স্বামী আরিফ খান। দীর্ঘ চৌদ্দটা দিন পাগলপ্রায় হয়ে যে মানুষটা নিজের স্ত্রীকে খুঁজে বেরিয়েছেন, আজ তার সামনেই পড়ে আছে ভালোবাসার মানুষের নিথর, বীভৎস দেহ। এমন পরিস্থিতিতে যে কেউ হয়তো চিৎকার করে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ফেলত। কিন্তু আরিফ খান সেদিন একটি শব্দও তাঁর মুখ থেকে বের হয় না। নিজের হাতে পরম যত্নে স্ত্রীর দেহটা সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়ে দেন। এক সপ্তাহ পর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসে। রিপোর্টটা হাতে নিয়ে আরিফ খানের পায়ের নিচের মাটি সরে যায়। সেখানে লেখা ছিল তাঁর স্ত্রী তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। এই ধাক্কা সইতে না পেরে আরিফ খানের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। দীর্ঘ এক বছর তিনি চাকরি থেকে ছুটিতে ছিলেন। কিন্তু এই ছুটি ছিল শুধু লোকদেখানো। আড়ালে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও স্থির ছিলেন না। গোপনে চালিয়ে যাচ্ছিলেন নিজের ব্যক্তিগত তদন্ত। আর সে তদন্তে বেরিয়ে আসে এক হাড়হিম করা তথ্য। আরিফ জানতে পারেন, শুধু তাঁর স্ত্রী নন, গত পয়তিশ বছরের বেশি ধরে একইভাবে প্রায় হাজারের বেশি গর্ভবতী মহিলার লাশ পাওয়া গেছে ওই অভিশপ্ত ছাতিয়ানী গ্রামে। অবশেষে শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে আরিফ খান আবার কাজে ফিরে আসেন। নিজেই দায়িত্ব নিয়ে কেইসটা নিজের হাতে তুলে নেন। কিন্তু সত্যের পথ বড্ড পিচ্ছিল। অপরাধীরা এতটাই গভীরে শিকড় গেড়েছে যে, এরপরও কেটে যায় অনেকগুলো মাস। আরিফ খান এখন অপরাধীদের একদম নিশ্বাসের দূরত্বে দাঁড়িয়ে। এতোটা কাছে যে, চোখ বুজলেই তিনি খুনিদের অবয়ব দেখতে পান। কিন্তু অদ্ভুত এক বিড়ম্বনা! শিকার যতটা কাছে আসে, শিকারির মনে হয় গন্তব্য বুঝি ততটাই দূরে। যে কুয়াশাচ্ছন্ন রহস্যের জাল তিনি বছরের পর বছর ধরে ছিঁড়ে চলেছেন, তার শেষ সুতোটা আজ তার হাতের মুঠোয়। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। আকাশের নীল রংটুকু মুছে গিয়ে যখন গহীন অন্ধকার নামবে, তখনই শুরু হবে চূড়ান্ত অপারেশন। পুরো ছাতিয়ানী গ্রামকে নিশ্ছিদ্রভাবে ঘেরাও করা হবে।পুরো টিম খুব সচেতন কাউর একটা মাত্র ভুলেও চলে যেতে পারে হাজার হাজার অফিসারের প্রাণ।

অপারেশনের সময় ঘনিয়ে আসে, কিন্তু আরিফ খানের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ এখন আরও গভীর। কারণ, এই বিপজ্জনক অভিযানে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিয়াম। আইনের ধরাবাঁধা নিয়ম কিংবা প্রটোকল কোনো কিছুরই তোয়াক্কা সে করে না। উল্টো একপ্রকার ধূর্ততার সাথে আরিফ খানকে হুমকি দিয়ে বসেছে তাকে এই অভিযানে সাথে না নিলে পুরো কেইসটাই নাকি সে ওপরমহল থেকে বন্ধ করে দেবে। আরিফ খান পেশায় দক্ষ অফিসার হলেও ক্ষমতার এই মারপ্যাঁচে একপ্রকার নিরুপায় হয়েই কিয়ামকে সাথে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর মাথার ভেতর একটা প্রশ্ন বারবার হাতুড়ি পেটা করছে একজন প্রভাবশালী চেয়ারম্যানের এই মৃত্যুকূপের অভিযানে আসার রহস্য কী?

অন্ধকার যত ঘনীভূত হচ্ছে, ছাতিয়ানী গ্রামের চারপাশের বাতাস ততই গুমোট আর ভারী হয়ে উঠছে। ঘড়ির কাঁটা প্রতিটি মুহূর্ত অতিক্রমের সাথে সাথে আরিফ খানের হৃৎস্পন্দনের গতি তীব্রতর হচ্ছে। তাঁর নির্দেশ পাওয়া মাত্রই নিস্তব্ধ নিঝুম রাতের বুকে নিঃশব্দে অবস্থান নিয়েছে শত শত সশস্ত্র পুলিশ অফিসার। পুরো গ্রামটি এখন অদৃশ্য জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দি। প্রতিটি প্রবেশপথ আর প্রতিটি অলিগলি পুলিশের কড়া পাহারায় অবরুদ্ধ।আরিফ খান গত কয়েক মাস ধরে এই গ্রামের প্রতিটি ধূলিকণা নিয়ে নিবিড় গবেষণা চালিয়েছেন। কোন বাড়িতে কার বসবাস, কার পেশা কী সবই এখন তাঁর নখদর্পণে। কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে এসে বারবার একটি নামই তাঁর মস্তিষ্কে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আলী বাড়ি। পুরো গ্রামের মধ্যে এই বাড়িটিই সবচেয়ে রহস্যময়। সুউচ্চ দেয়াল আর প্রাচীন আমলের বিশাল ফটক দিয়ে ঘেরা এই অট্টালিকা গ্রামের সাধারণ মানুষ এই বাড়িতে আনাগোনা বেশি। আরিফ খানের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বারবার সতর্কবার্তা দিচ্ছে এই পাষাণ দেয়ালের ওপাশেই লুকিয়ে আছে সব রহস্য। এখানেই হয়তো সংঘটিত হতে যাচ্ছে শেষ মুহূর্তের চূড়ান্ত লড়াই।আরিফ খান জ্যাকেটের ভেতর থেকে ওয়াকিটকি বের করে অত্যন্ত নিচু স্বরে নির্দেশ প্রদান করলেন,

"পজিশন ওয়ান, রিপোর্ট।"

ওপাশ থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাপিয়ে যান্ত্রিক খসখসে শব্দে উত্তর ভেসে এল, "সব ক্লিয়ার স্যার।বাড়ির ভেতর একটা জঙ্গল আছে আর বাড়িতে দেখে মনে হচ্ছে কেউ নেই।"

আরিফ খান এক পলক কিয়ামের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন।তারপর গভীর মুখে বললেন,

"আপনি প্রস্তুত তো চেয়ারম্যান সাহেব?"

কিয়াম প‍্যান্টের পকেটে হাত ডুকিয়ে বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,

"আমি সর্বদা প্রস্তুত অফিসার।"

~

নিঝুম রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক চারপাশের পরিবেশকে আরও বেশি গা ছমছমে করে তুলেছে। জঙ্গলের ভেতরে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ যেন কোনো অতৃপ্ত আত্মার দীর্ঘশ্বাস। জঙ্গলের পেছনের অন্ধকার ঘরটিতে এখন কেবল মৃত্যুর হিমশীতল নীরবতা আর পৈশাচিকতার আবেশ।

ঘরের এক কোণে তুরাগ আর ইমতিয়াজকে পিঠমোড়া করে শক্ত দড়িতে একত্রে বেঁধে রাখা হয়েছে। তুরাগের সারা শরীর ব্যথায় অবশ, কিন্তু তার চেয়েও বড় যন্ত্রণা তার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দৃশ্যগুলোর তীব্রতা। আলো বেগমের লোকগুলো পশুর মতো আচরণ করছে। ইমতিয়াজ বারবার বন্ধনমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করলেও দড়ির বাঁধন কেবল তার চামড়া কেটে গভীরে বসে যাচ্ছে।ঘরের মাঝখানে চৈতিকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। আলো বেগম জোরপূর্বক তার অঙ্গে জড়িয়ে দিয়েছেন টকটকে লাল শাড়ি। চৈতির ফর্সা মুখটা আতঙ্কে নীল হয়ে গেছে। সে প্রাণপণে চিৎকার করছিল, সাহায্যের জন্য আর্তনাদ করছিল। কিন্তু তার আকুতি যাতে প্রকোষ্ঠের বাইরে না পৌঁছায়, সেজন্য জহির অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে একটা নোংরা কাপড় দিয়ে তার মুখ কষে বেঁধে দিয়েছে। চৈতির চোখের নোনা জল নোংরা কাপড় ভিজিয়ে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তার ডাগর চোখের করুণ চাহনি এখন তুরাগের দিকে স্থির। সে কথা বলতে পারছে না, কিন্তু তার চোখগুলো চিৎকার করে বলছে,

"আমাকে বাঁচান!"

তুরাগ দাঁতে দাঁত চেপে দৃশ্য অবলোকন করছে। তার হাতের শিরাগুলো ক্রোধে ফেটে যাওয়ার উপক্রম। মেঝের ওপর পড়ে থাকা ইমতিয়াজ পাশ থেকে ফিসফিস করে তুরাগকে বলল,

"ভাই আমার পকেটে মোবাইল আছে।"

তুরাগের তখন জান কবজ হওয়ার উপক্রম। ওর মন চাইছিল ইমতিয়াজকে মাথায় তুলে একটা আছাড় মারতে। কিন্তু হাত-পা শক্ত করে বাঁধা থাকায় কেবল চোখে আগুন ঝরিয়েই ক্ষান্ত হতে হলো। তুরাগ রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

"একবারে কবরে গিয়ে বলতি! এত তাড়াতাড়ি বলে ফেললি কেন? আজরাইল আসুক, তার সাথে হ্যান্ডশেক করে মোবাইলটা দিস।"

ইমতিয়াজ অনেকটা অভিমানী প্রেমিকার মতো মুখ ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে বলল,

"তুই তো তোর বউ নিয়ে ভালোই আছিস এখনে…।"

ইমতিয়াজ সম্পূর্ণ কথা শেষ করার আগেই তুরাগ গর্জে উঠল,

"ফালতু কথা বন্ধ কর! মোবাইল বের করে যেভাবে হোক আমার হাতের কাছে দে।"

ইমতিয়াজ এবার চরম বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল,

"জ্বি, আমার যে আরও দুইটা অদৃশ্য হাত আছে, ঐগুলো দিয়ে এখনই দিচ্ছি!"

তুরাগ এবার নিজের মেজাজ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে ইমতিয়াজের দিকে একটু ঝুঁকে এল। তাদের দুজনের পিঠ একে অপরের সাথে ঠেকানো, তাই হাতের তালু দিয়ে ইমতিয়াজের পকেট স্পর্শ করার একটা ক্ষীণ সুযোগ রয়েছে। তুরাগ ফিসফিস করে বলল,

"তুই একটু ডান দিকে কাত হ, আমি হাত দিয়ে তোর পকেট থেকে ফোনটা বের করার চেষ্টা করছি।"

ইমতিয়াজ যন্ত্রণায় মুখটা বাঁকিয়ে কোনোমতে নিজের শরীরটা একটু ধনুকের মতো বাঁকিয়ে দিল, যাতে তুরাগের হাত পকেট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তুরাগের হাতের আঙুলগুলো দড়ির ঘর্ষণে ছিলে গিয়ে রক্ত বের হচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। তার সমস্ত মনোযোগ এখন ওই যন্ত্রটার ওপর। অনেক কসরত আর ঘামের বিনিময়ে অবশেষে ইমতিয়াজের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে আনতে সক্ষম হলো সে। মোবাইলটা কোনোমতে নিজের পায়ের কাছে টেনে নিল তুরাগ। আঙুল দিয়ে কাজ করা অসম্ভব, তাই পায়ের বুড়ো আঙুলের সাহায্যে অতি সাবধানে একটা নাম্বার ডায়াল করল সে। প্রথম দুইবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে কেউ রিসিভ করল না। তুরাগের কপালে দুশ্চিন্তার ঘাম জমছে। তৃতীয়বার রিং হতেই ওপাশ থেকে কলটা কেটে দেওয়া হলো।ইমতিয়াজ রুদ্ধশ্বাসে সব দেখছিল। সে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,

"কাকে ফোন দিচ্ছিস?"

তুরাগ দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিল,

"বউয়ের ভাইকে।"

ইমতিয়াজ অবাক হয়ে বলল,

"শালা তো ফোন ধরে না!"

তুরাগ চরম বিরক্ত মেশানো স্বরে বলল, "পিনিক উঠছে শালার।"

"বেঁচে ফিরতে পারলে তোর শালাকে আচ্ছা মতো পিনিকের ঔষধ দিয়ে পিকনিকে পাঠাবো,"

ইমতিয়াজ বিড়বিড় করে বললেও তুরাগ তার কোনো উত্তর দিল না। তুরাগ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে চৈতির দিকে। লাল শাড়ি পরা মেয়েটার ফর্সা মুখটা কান্নায় ফুলে গেছে, চোখের জল নোংরা কাপড়ের বাঁধন ছাপিয়ে গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তুরাগ ইচ্ছে করেই ওর চোখের দিকে তাকাচ্ছে না, কোনো কথা বলছে না। চৈতির ওই আকুল চাহনি আর কান্নার আওয়াজ শুনলে তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাবে। যেটুকু সাহসের সঞ্চয় করে সে এখনো স্থির হয়ে আছে, চৈতির সাথে কথা বললে সেই বাঁধ হয়তো ভেঙে যাবে। নিজেকে শক্ত রাখার এটাই এখন তার একমাত্র উপায় চুপ করে থাকা।এমন সময় বাহিরে চার জোড়া পায়ের শব্দ ভেসে এলো।ঘরের তালা খোলার কর্কশ শব্দ হলো। একে একে ভেতরে ঢুকল চারজন। সবার আগে ঢুকল সাদা জুব্বা পরা এক লম্বাকৃতি বৃদ্ধ লোক। তার পেছনে আলো বেগম, পাশে জাফর আলী। আর সবার শেষে জহির। জহিরের হাতে জ্বলজ্বল করছে একটা দীর্ঘ আর ধারালো তলোয়ার। অন্য হাতে একটা কাঁচের বড় বোতল। মরনপণ এই পরিস্থিতিতেও ইমতিয়াজের স্বভাবজাত ফাজলামি গেল না। সে জহিরের হাতের সেকেলে তলোয়ারের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে অবাক হওয়ার ভান করে বলল,

"শরীরে কি কোনো রাজার সেনাপতির আত্মা ভর করেছে নাকি ভাইয়া আপনার? হাতে তলোয়ার নিয়ে তো মনে হচ্ছে ডাইরেক্ট পানিপথের যুদ্ধে নামবেন!"

জহির কথা বলল না,মনে হলো কথা বলা তার নিষেধ। সাদা জুব্বা পরা বৃদ্ধ তুরাগ আর ইমতিয়াজের দিকে একপলক তাকিয়ে নিচু গলায় জাফর আলীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

"সময় হয়েছে। লগ্ন শুরু করো।"

বৃদ্ধ লোকের লগ্নের কথা শুনে ইমতিয়াজ রীতিমতো আকাশ থেকে পড়ে । সে নিজের আতঙ্ক গোপন করতে আবারও চিরচেনা ঢংয়ে বলে উঠল,

"কিসের লগ্ন আবার...! আমরা কি এখানে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছি নাকি যে লগ্ন ধরে কাজ করতে হবে?"

সাদা জুব্বা পরিহিত বৃদ্ধ এবার স্থির দৃষ্টিতে ইমতিয়াজের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখের মণি দুটো কুচকুচে কালো পাথরের মতো নিশ্চল। তিনি অত্যন্ত গম্ভীর আর হাড়হিম করা গলায় বললেন,

"তোর জীবনের শেষ লগ্ন। আজ এই মাহেন্দ্রক্ষণে তোদের দুইজনের তাজা রক্ত দিয়ে আমি আমার খোদাকে গোসল করাব।"

ইমতিয়াজ এবার প্রচণ্ড ভয় পেলেও মুখ বন্ধ রাখতে পারল না। সে একটা শুকনো ঢোক গিলে অত্যন্ত করুণ স্বরে বলল,

"বলেন কি মুরুব্বি! খোদাকে গোসল করাবেন আমাদের রক্ত দিয়ে? আমাদের রক্তে তো এখন আর তেজ নেই। এই ভেজাল আর ফরমালিনযুক্ত খাবার খেতে খেতে আমাদের রক্ত একদম নষ্ট হয়ে গেছে। এই রক্ত দিয়ে গোসল করালে আপনার খোদাই তো অসুস্থ হয়ে পড়বে...!"

ইমতিয়াজ সম্পূর্ণ কথা শেষ করার আগেই বৃদ্ধ বাঘের মতো গর্জে উঠলেন,

"চুপ কর পাপিষ্ঠ!"

তাঁর ভয়াবহ ধমকে পুরো ঘরটা যেন কেঁপে উঠল। জহির তার হাতের তলোয়ারটা ইমতিয়াজের গ্রীবামূলে মাত্র এক চুল দূরত্বে এনে ধরল। বৃদ্ধের কপাল রাগে কুঁচকে গেছে, তিনি চিৎকার করে বললেন,

"তোর ওই অপবিত্র মুখ বন্ধ রাখ। তিনি কোনো খুঁত পছন্দ করেন না।"

চৈতি আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে, তার শরীর থরথর করে কাঁপছে।

চলবে…!

(তিনদিন ধরে রাতে এক মিনিটের জন্য ঘুমাতে পারছি না তাহলে বুঝোন কতটা ঝামেলায় আছি। গল্পের আর মাত্র দুই পর্ব আছে ভাবেছিলাম কাল শেষ করে দিবো কিন্তু ৩২ পর্বটা শেষ করতে পারিনি। আর তিনদিন গল্প দিতে না পারার জন্য আমি দুঃখিত।)#চৈত্র_শেষে_শ্রাবণধারা

#চিন্ময়ী_নূর

৩২. (তৃতীয়াংশ)

মানুষের বিবেক যখন অন্ধবিশ্বাসের বিষাক্ত অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়, তখন তার যুক্তি, বুদ্ধি এবং মনুষ্যত্ব সবই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এই বিভীষিকা কেবল ধর্মের মোড়কেই আবির্ভূত হয় না বরং অধিকাংশ সময় তা জন্ম নেয় অজেয় হওয়ার আদিম আকাঙ্ক্ষা, অতিপ্রাকৃত শক্তির লোভ আর অমরত্বের এক মরণনেশা থেকে। এই পৈশাচিক পথে যারা পা বাড়ায়, তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে নিষ্পাপ ভ্রূণের বলিদান কিংবা তাজা রক্তের স্রোতে অবগাহন করলেই কেবল লভ্য হয় অতিমানবিক ক্ষমতা, যা তাদের সাধারণ নশ্বর মানুষের ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে পৌঁছে দেবে। ক্ষমতার এই বিকৃত নেশা মানুষকে পশুর চেয়েও অধম করে তোলে। এই শ্রেণির মানুষগুলো বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের সৃষ্ট বীভৎস কাল্পনিক জগতে বসবাস করে। সেখানে তাদের আরাধ্য কোনো দয়ালু ঈশ্বর নয়, বরং বিরাজ করে তাদেরই মগজে গড়া রক্তপিপাসু খোদা। তাদের বিকৃত মস্তিষ্কের কোষে কোষে এই অমানবিক নিষ্ঠুরতা কোনো অপরাধ নয়, বরং পবিত্র সাধনা হিসেবে গণ্য হয়। যখন কেউ নিজেকে এই অন্ধকার জগতের নির্বাচিত প্রতিনিধি ভাবতে শুরু করে, তখন তার কাছে অন্যের জীবন ও রক্ত কেবল একটি বলির উপকরণ ছাড়া আর কিছুই থাকে না। আলো বেগম যেমন দীর্ঘকাল ধরে পৈশাচিকতার চারণভূমিতে বিচরণ করছেন, তাঁর সেই গুরু বখতিয়ার খিলখিল তো যুগের পর যুগ ধরে এই পৈশাচিক চর্চায় লিপ্ত। বছরের পর বছর অন্ধকারের আরাধনা বখতিয়ারের মস্তিষ্কের গঠনই বদলে দিয়েছে তাঁর হৃদয়ে এখন মায়া, মমতা বা সমবেদনার কোনো লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। অন্যের হাহাকার তাঁর কানে পৌঁছায় না, বরং তাজা রক্তের ঘ্রাণ তাঁর আত্মাকে পৈশাচিক তৃপ্তি প্রদান করে। তাঁর বিকৃত দর্শন অনুযায়ী, রক্ত দিয়ে দেবতাকে স্নান করানো কিংবা নিষ্পাপ ভ্রূণ উৎসর্গ করা হলো পরম পুণ্য। বখতিয়ার খিলখিল বিশ্বাস যত বেশি রক্ত ঝরবে, তাঁর ভেতরের পৈশাচিক আধ্যাত্মিক শক্তি ততই বৃদ্ধি পাবে। অতীতের পাতায় দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, যৌবনে বখতিয়ার খিলখিল ছিলেন সাধারণ এক হুজুর, যিনি শিশুদের দ্বীনি শিক্ষা প্রদান করতেন। কিন্তু নিরীহ অবয়বের আড়ালে লুকিয়ে ছিল আকাশচুম্বী এক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। সেই সময় তিনি এক সম্ভ্রান্ত জমিদার কন্যার প্রেমে পড়েছিলেন। কিন্তু দারিদ্র্য আর নিচু বংশ হওয়ার অপবাদ তাঁর গায়ে এমনভাবে সেঁটে দেওয়া হয়েছিল যে, তাঁকে চরম লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। জমিদারের পদাঘাত আর সমাজের তীব্র অপমান তাঁকে গ্রামছাড়া করেছিল। সেদিন রাতের গ্লানিই বখতিয়ার খিলখিলের অন্তরে বিষাক্ত জেদ জন্ম দেয় সে এমন এক শক্তিতে বলীয়ান হবে, যার সামনে এই পৃথিবী একদিন নতজানু হয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করবে।

আলো বেগম ধীর পদক্ষেপে নিজের স্থান ত্যাগ করে চৈতির একদম সন্নিকটে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর সুদীর্ঘ ছায়ার নিচে চৈতি আতঙ্কে আরও আড়ষ্ট হয়। চৈতির শরীরের প্রতিটি লোমকূপ তখন প্রবল ভয়ে কণ্টকিত, কিন্তু তার যে নিজের জীবনের চেয়েও তাঁর উদরে থাকা ছোট্ট অঙ্কুরিত প্রাণটির জন্য দুশ্চিন্তা প্রবল।তুরাগকে তো এখনো সংবাদটি প্রদান করাই হয়নি যে, সে পিতা হতে চলেছে। এই আনন্দের বার্তা শ্রবণ করলে মানুষটি যে কতটা পুলকিত হতো, তা চৈতি স্পষ্ট অনুভব করতে পারে। তুরাগ হয়তো কিয়ামের সামনে উল্লাসে মেতে উঠত, সমগ্র বিশ্বকে চিৎকার করে নিজের সুখের কথা জানাত। চৈতি মনে মনে বিধাতাকে প্রশ্ন করে আমাদের ভাগ্যে কি কিঞ্চিৎ সুখও বরাদ্দ ছিল না? আমাদের কপালে কি একটুও সুখ লেখা ছিল না? বিয়ের পর থেকে তো কেবল এক বিপদ থেকে অন্য বিপদে ছুটে বেড়ানো। একটা ছিমছাম ঘর, গোধূলি লগ্নে তার সাথে এক কাপ চা, আর রাতে শান্তিতে ঘুম এই সামান্য সংসারটুকু করার সুযোগও কি মিলবে না? যখনই তাকে আপন করে একটু ঘর বাঁধতে যায়, তখনই সব তছনছ হয়ে যায় কেন?

চৈতি যন্ত্রণাকাতর হয়ে নয়নপল্লব বন্ধ করে। হঠাৎ সে অনুভব করে, তার মুখের বাঁধাটি কেউ শিথিল করে দিচ্ছে।চোখ খুলে তাকাতেই দেখে, আলো বেগম তার মুখের বন্ধন উন্মোচন করছেন। দীর্ঘক্ষণ মুখ রুদ্ধ থাকায় চৈতি সজোরে শ্বাস গ্রহণ করতে শুরু করে। আলো বেগম চৈতির ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া চিবুকটি শক্ত করে ধরলেন। অতঃপর তার মুখমণ্ডল ঘুরিয়ে দিলেন বখতিয়ার খিলজির অভিমুখে। বখতিয়ার তখন তলোয়ারটি দিয়ে মেঝের ওপর অদ্ভুত নকশা অঙ্কন করছেন। আলো বেগম চৈতির কর্ণের নিকটে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন,

"তাকা মা, এই মহান সাধকের দিকে দৃষ্টিপাত কর। আজ তুই হবি সেই ধন্য নারী, যার রক্তে মহাকালের তৃষ্ণা মিটবে।"

চৈতি প্রচণ্ড ঘৃণা মিশ্রিত শক্তিতে নিজের মুখ থেকে আলো বেগমের হাতটা সরিয়ে দিল। কিন্তু মিনতি যে পাহাড়ের মতো ভারী। সে ভেঙে পড়া গলায় বলল,

"আমাকে মেরে ফেলুন দাদি, যা খুশি করুন, কিন্তু উনাকে ছেড়ে দিন দয়া করে। আমি তো আপনাদের কেউ না, কিন্তু উনাকে তো আপনারা খুব ভালোবাসতেন...!"

চৈতির আকুতি শুনে আলো বেগম যেন কোনো কৌতুক শুনলেন। তিনি উল্লাসে ফেটে পড়ে বললেন,

"ওরে বাবারে! স্বামীর জন্য কত দরদ! কত ভালোবাসা!"

আলো বেগমের সাথে সুর মেলালেন জাফর আলী আর জহিরও। তাদের বিদ্রূপাত্মক হাসি ঘরের দেয়ালগুলোতে আছড়ে পড়ছে। কিন্তু হাসির আসর দীর্ঘস্থায়ী হতে পারল না। বখতিয়ার খিলখিল হঠাৎ বজ্রকঠিন ধমক দিয়ে উঠলেন,

"বলেছিলাম না গর্ভবতী নারী লাগবে না! এই যজ্ঞের জন্য এ নারী অপবিত্র!"

বখতিয়ার খিলখিলের কথা শুনে আলো বেগম থমকে গেলেন। তাঁর কুটিল চোখমুখ কুঁচকে আসল। তিনি আমতা আমতা করে বললেন,

"ও তো গর্ভবতী না, আপনি ভুল করছেন বাবা।"

বখতিয়ার খিলখিল এবার রাগে ফুঁসতে শুরু করলেন। তাঁর রক্তিম চোখ দুটো কোটর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসবে। তিনি আরও উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে বললেন,

"এই মেয়ে গর্ভবতী! আমার অন্তর্দৃষ্টি কখনো ভ্রান্ত হতে পারে না। বিশ্বাস না হলে জিজ্ঞেস করে দেখ!"

কথাটি পুরো ঘরে একটি বোমার মতো ফাটল। তুরাগের কানে শব্দগুলো পৌঁছানোর সাথে সাথে সে প্রস্তরখণ্ডের মতো নিথর হয়ে গেল। তার হৃদপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। বিগত কয়েক দিন ধরে চৈতির শারীরিক পরিবর্তন, খাবারের প্রতি অনীহা সবকিছু এখন একটি বিন্দুতে এসে মিলে গেল। তুরাগের সন্দেহ আজ সত্যে পরিণত হলো। তার অন্তরে তখন কালবৈশাখীর তাণ্ডব চলছে। এক নিমেষের জন্য সে বিস্মৃত হলো তার বর্তমান অবস্থান, এমনকি তার সম্মুখে দণ্ডায়মান নিশ্চিত মৃত্যুও তাকে স্পর্শ করতে পারল না। তার মন ব্যাকুল হয়ে উঠল সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে চৈতিকে আলিঙ্গন করতে, তার ললাটে পরম আদরের স্পর্শ দিতে। অনাগত সন্তানের ভাবনায় তুরাগের চোখের কোণে অজান্তেই নোনা জল জমে উঠল। চৈতিও তুরাগের দিকে তাকালো। দেখল মানুষটির নেত্রদ্বয় ছলছল করছে। কিন্তু পাঁচ সেকেন্ডের বেশি সেই দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকার সাধ্য তার ছিল না। এক অজানা অপরাধবোধ আর বুক ফাটা যন্ত্রণায় সে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল।জহির আর জাফর আলী এবার কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। আলো বেগমও প্রবল আশঙ্কায় ঘামতে শুরু করেছেন। যজ্ঞের জন্য যে শুদ্ধ রক্তের প্রয়োজন ছিল, চৈতি গর্ভবতী হওয়ায় আয়োজন এখন ভেস্তে যাওয়ার পথে। বখতিয়ারের ক্রোধ তখন মধ্যগগনে। তিনি তলোয়ারটি মুষ্টিবদ্ধ করে হিসহিসিয়ে বললেন,

"জহির, এই মেয়ের পেটে লাথি মার! ভ্রূণে এখনো রুহ আসেনি, তাই এই মেয়ে এখনো অপবিত্র হয়নি। রক্ত ঝরলে যজ্ঞ পূর্ণ হবে!"

জহির বখতিয়ারের অনুগত, বিবেকহীন পালিত পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল চৈতির ওপর। ঘরের কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, জহির তার সর্বশক্তি সঞ্চয় করে চৈতির পেটে এক দানবীয় পদাঘাত করল। বীভৎস আর্তনাদে ফেটে পড়ল চৈতি। আকাশবিদারী হাহাকার জঙ্গল ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছে গেল। তীব্র যন্ত্রণায় চৈতির শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে গেল, তার ফর্সা মুখমণ্ডল যন্ত্রণায় নীল হয়ে আসল। তুরাগ স্থির দৃষ্টিতে দৃশ্য অবলোকন করল। মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে সে জানতে পেরেছিল তার অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ চৈতির উদরে বেড়ে উঠছে সে পিতা হতে চলেছে। আর ঠিক তার কয়েক সেকেন্ড পরেই তার চোখের সামনে এক নরপিশাচ তার অনাগত সন্তানের ওপর নিষ্ঠুর আঘাত হানল। তুরাগের চারপাশের পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গেছে। মহাকালের ঘড়ির কাঁটা থমকে দাঁড়িয়েছে।তার অন্তরে যে শূন্যতা আর হাহাকার অনুভব। একজন পুরুষ হিসেবে, একজন স্বামী হিসেবে এর চেয়ে বড় পরাজয় আর কী হতে পারে? তুরাগের চোখের সামনে চৈতির পড়া রক্তবর্ণ শাড়িটা সত্যিকারের রক্তসমুদ্রে পরিণত হচ্ছে। তার পৌরুষে চরম আঘাত লেগেছে, তার হৃদপিণ্ডটা কেউ জীবন্ত ছিঁড়ে ফেলছে। সে কি সত্যিই এতটা অসহায়? নিজের অর্ধাঙ্গিনী আর সন্তানকে রক্ষা করার কি বিন্দুমাত্র সামর্থ্য তার নেই? না! নেই সে খুব দূর্বল তার মতো দূর্বল আর অসহায় পুরুষ মানুষ এই খোদার দুনিয়াতে বুঝি আর নেই।

জহির যখন দ্বিতীয়বার পদাঘাত করার জন্য পা বাড়াল, তখন তুরাগআকাশবিদারী গর্জন দিয়ে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে, শিরা ফোলানো গলায় চিৎকার করে বলল,

"কসম আমার রবের! আমার স্ত্রীর দেহে যদি তোর কলুষিত পদচিহ্ন আর একবার স্পর্শ করে, তবে তোর ওই পা আমি তোরই নিয়ে আসা তলোয়ার দিয়ে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলব! তোর শরীরের কোনো অস্থি আমি আস্ত রাখব না জহির!"

জহির কোনো উত্তর দেওয়ার অবকাশ পাওয়ার আগেই বাইরে থেকে কয়েকজন লোকের আতঙ্কিত চিৎকার ভেসে আসলো,

"আম্মাজান! এদিকে কারা জানি আসছে! পুরো গ্রামের আনাচে-কানাচে কারা জানি ছড়িয়ে পড়েছে।"

খবরটা শুনে আলো বেগম আর জাফর আলী চমকে উঠলেন। তাঁদের চেহারায় অকালমৃত্যুর ছায়া স্পষ্ট। অথচ জহির অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। সে ইতিপূর্বে বহুবার আলো বেগমকে সতর্ক করেছিল, কিন্তু দম্ভের বশবর্তী হয়ে তিনি তা কর্ণপাত নথিভুক্ত করেননি। জহির হাসতে হাসতে চৈতির পাশ থেকে সরে গিয়ে আলো বেগমের সম্মুখে দাঁড়ায়। বিদ্রূপের সুরে জানালো,

"বলেছিলাম না পুলিশ আপনাদের পেছনে পড়ে গেছে? শোনেননি তো, এখন বুঝেন মজা! আমি গেলাম।"

কথাটা বলেই জহির দ্রুত দরজার দিকে এগোতে চাইল। কিন্তু দরজার কাছে যেতেই তার সামনে যমদূতের মতো এসে দাঁড়াল দুজন লোক। একজনকে দেখেই জহিরের বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। কিয়ামও ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে জহিরের দিকে। কিয়ামের শান্ত কিন্তু বিধ্বংসী রূপ দেখে জহির নিমেষেই নিজের রূপ বদলে ফেলল। সে কুকুরের মতো কিয়ামের পায়ে লুটিয়ে পড়ে বলতে লাগল,

"ভাই! আপনি আসছেন? আমাকে বাঁচাতে আসছেন তো?"

কিয়াম জহিরের দিকে একবারও তাকাল না। তার এক পলকের দৃষ্টি স্থির হলো মেঝের ওপর পড়ে থাকা চৈতির দিকে। চৈতির পায়ের কাছে লাল রক্ত জমাট বাঁধছে। যন্ত্রণায় মেয়েটা চিৎকার করছে। কিয়ামের বুকটা ধক করে উঠে। এত রক্ত কিসের? চৈতি কি কোথাও গুরুতর চোট পেয়েছে? আর সে এখানে এই অবস্থায় কেন? কিয়াম ব্যাকুল হয়ে তুরাগের খোঁজ করে। একটু চোখ ঘোরাতেই দেখল তুরাগ নিচে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। কিয়াম হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চৈতির দিকে এগিয়ে যেতে চাইল তাকে সাহায্য করতে। কিন্তু তার আগেই ঘরের ভেতর বাঘের মতো গর্জে উঠল তুরাগ,

"ছুঁবেন না আমার রাজকন্যা কে! খুন করে ফেলব আমার বউকে কষ্ট দিলে! বাঁচিয়ে রেখে জাহান্নামের সফর করিয়ে আনব!"

তুরাগের উন্মাদ কণ্ঠ শুনে কিয়াম দাড়ায়। সে কিছুই বুঝতে পারছে না তুরাগ কেন তাকে বাধা দিচ্ছে? কেন সে এমন পাগলের মতো আচরণ করছে? পরিস্থিতির ভয়াবহতা কিয়ামের মাথা জ্যাম করে দিয়েছে। সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে তুরাগের বাঁধন খুলতে এগোতে গেল। তখনই ঘরের এক কোণ থেকে বখতিয়ারের কণ্ঠ ভেসে এল,

"যেখান থেকে এসেছিস সেখানেই চলে যা সব...!"

কিয়াম চমকে পেছনে তাকায়। সাদা জুব্বা পরা বৃদ্ধ লোকটাকে দেখে তার ভেতরটা কেমন জানি করে । মুখটা খুব চেনা চেনা লাগছে, কোথায় যেন দেখেছে সে একে! কিন্তু স্মৃতি হাতড়ানোর সময়টুকু পেল না সে। বখতিয়ার তখন রাগে আর উত্তেজনায় কাঁপছেন। তিনি তাঁর হাতের দীর্ঘ তলোয়ারটি হঠাৎ করে কিয়ামের লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারলেন। তলোয়ারটি বাতাসের বুক চিরে কিয়ামের দিকে ধেয়ে আসে। কিন্তু বখতিয়ার অতি উত্তেজনায় লক্ষ্য স্থির রাখতে পারেননি। কিয়ামের শরীরে আঘাত করার আগেই সেটি ভুল নিশানায় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ঝনঝন শব্দে মাটির ওপর আছড়ে পড়ে।

আলো বেগম, জাফর আলী আর বখতিয়ারের পৈশাচিক সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো। পুলিশ কর্মকর্তারা ঝড়ের বেগে প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করে তাঁদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে করায়ত্ত করলেন। আরিফ খান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন এই মানুষগুলোর দিকে। তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে। এই জঘন্য অবয়বের মানুষগুলো, যারা কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা ছাড়াই স্রেফ বিকৃত লালসায় তাঁর স্ত্রী আর অনাগত সন্তানকে ছিঁড়ে খেয়েছিল। তাঁর অন্তরে তখন হাহাকার ধ্বনিত হচ্ছে কেন? কেন তারা এমন করলো? কিন্তু পেশাদারিত্বের আবরণ বজায় রেখে তিনি তুরাগ আর ইমতিয়াজের দিকে অগ্রসর হলেন। কোমর থেকে ধারালো ছুরি বের করে নিমিষেই তাদের হাতের বাঁধনগুলো ছিন্ন করলেন। মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথে তুরাগ চৈতির দিকে না গিয়ে বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো জহিরের ওপর। জহির কিছু বুঝে ওঠার আগেই তুরাগ তার সর্বশক্তি দিয়ে জহিরের স্পর্শকাতর অঙ্গে পদাঘাত করলো। জহিরের যন্ত্রণাকাতর চিৎকারে ঘরটা চৌচির হয়ে গেলো। আরিফ খান দ্রুত ছুটে এসে তুরাগকে পেছন থেকে জাপটে ধরলেন। তুরাগ নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করতে করতে আর্তনাদ করে উঠলো,

"ছাড়ুন আমাকে! আমাকে ছেড়ে দিন...!"

আরিফ খান অত্যন্ত ভারী গলায় জানালেন

, "শান্ত হোন তুরাগ! আপনি আইন নিজের হাতে নিতে পারেন না। সে যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তার বিচার আদালত করবে, আইন করবে।"

তুরাগ তখন কোনো যুক্তির ধার ধারছে না। তার দুচোখে তখন সন্তান হারানোর হাহাকার। সে চিৎকার করে জানালো,

"ছেড়ে দিন বলছি! আমার সন্তানের হত্যাকারীকে আজ আমি নিজের হাতে না মারতে পারলে, একজন পিতা হিসেবে সারাজীবন নিজেকে ব্যর্থ মনে হবে।"

পাশেই দণ্ডায়মান কিয়াম একটা শুকনো ঢোক গিললো। তার মানে চৈতি মা হতে চলেছিল? মেঝের এই জমাট বাঁধা রক্ত কি তবে তুরাগ আর চৈতির অনাগত প্রাণের শেষ চিহ্ন? কিয়ামের পা দুটো যেন কাঁপছে। সে ধীর পায়ে আরিফ খানের দিকে এগিয়ে এলো এবং তাঁর হাতটা ধরে স্থির কণ্ঠে বললো,

"আইন তো এতদিন কিছুই করতে পারেনি অফিসার। তাহলে আজ এত আইনি বাধা কোত্থেকে আসছে? আজও আইনকে একটু বিশ্রাম নিতে দিন।"

আরিফ খান তবুও নিজের পেশাগত দায়বদ্ধতা ত্যাগ করছিলেন না। জহির পিশাচের মতো অট্টহাসি দিয়ে বলে ,

"আমি যদি আজ মরি, তবে সবাইকে নিয়ে মরব! এই যে অফিসার সাহেব, আপনি জানতে চাচ্ছেন না আপনার বউকে কে মেরেছে? এই যে এই বুড়া আর বুড়ি মিলে আপনার স্ত্রীকে শেষ করেছে। এই ঘরেই তারা সেই পৈশাচিক যজ্ঞ করেছিল। আপনার সন্তানকে তার মায়ের গর্ভ থেকে ছিঁড়ে এনেছিল এই বখতিয়ার আর আলো বেগম!"

আরিফ খানের শরীর অবশ হয়ে গেলো। তাঁর হাত শিথিল হয়ে এলো, তুরাগের ওপর তাঁর শক্ত বাঁধন আলগা হয়ে পড়লো। তুরাগকে আর নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাঁর রইলো না। তুরাগ মুক্ত হতেই হিংস্র পশুর মতো জহিরের ওপর হামলে পড়লো। জহিরের চুলের গোছা খামচে ধরে সে অনেকটা চুল খুবলে নিয়ে আসলো।সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় কাতর একজন পিতার মন কোনো কিছুতেই শান্ত হলো না। সে জহিরকে ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে মেঝের ওপর পড়ে থাকা তলোয়ারটি তুলে নিলো। প্রকোষ্ঠের প্রতিটি মানুষ পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কিয়াম সবাই কেবল পাষাণ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলো। কেউ আইনের দোহাই দিলো না, কেউ তুরাগকে থামাতে এগিয়ে এলো না। তুরাগ আজ এক মহাপাপীর বিচার নিজের হাতে তুলে নিলো। যে পা দিয়ে জহির চৈতির গর্ভে আঘাত করেছিল, তুরাগ তলোয়ারের এক কোপে জহিরের পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলো। রক্তের ফোয়ারা মেঝের ওপর ছড়িয়ে পড়লো, আজ এক পিতার প্রতিশোধের আগুনে পাপের খাতায় নিজের নাম লিখেছে তুরাগ।

(অতি দুঃখে সাথে বলছি পর্ব আরো একটা বেড়ে গেছে।৩২ পর্বের শেষ অংশ কাল আসবে কিন্তু পর্বটা খুব ছোট হবে।আজই দিতাম পুরোটা তাহলে হয়তো তিন হাজারের

বেশি শব্দ হতো কিন্তু অনেক রাত হয়ে গেছে।কিন্তু কিন্তু কিন্তু কাল যদি চান তাহলে আজকে বেশি করে রেসপন্স করতে হবে।কমপক্ষে ৯০০ রিয়েক্ট করে দিবেন।আর যারা ending দিয়ে চিন্তা আছেন তাদের জন্য একটা কথা বলি? গল্পের নাম দেখলেই বুঝে যাওয়ার কথা ending কি হবে।এখনও কি বুঝতে পারেনি?)#চৈত্র_শেষে_শ্রাবণধারা

#চিন্ময়ী_নূর

৩২. (শেষাংশ)

ঘরের মেঝেতে তখন রক্তের নহর বয়ে যাচ্ছে। জহিরের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া অংশ দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে ঘরটাকে এক বীভৎস কসাইখানায় পরিণত করেছে। জহিরের সেই আকাশবিদারী চিৎকার ঘর ছাড়িয়ে চারপাশের নিস্তব্ধ জঙ্গলকে বিদীর্ণ করে দিচ্ছিল। সে যন্ত্রণায় মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।বহু বছর ধরে এই ঘরেই বহু মা তাদের সন্তানকে হারিয়ে এইভাবেই করেছে। জহিরের হাতেও অনেকের জীবন গেছে তখন সে হেসেছিলো হট্রহাসিতে ফেটে পড়তো সে।কিন্তু আজ পাশা পাল্টিয়ে আজ জহির ব‍্যখায় মরছে আর এক সন্তান হারানো পিতা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। জহিরে প্রতিটা চিৎকার যেনো তুরাগের কলিজার আগুনকে আরো একটু উসকে দিচ্ছে।কিন্তু এতকিছুর মাঝেও আলো বেগমের চোখে মুখে কোনো ভয় নেই তিনি ঠোঁটে বাঁকা হাসি নিয়ে আরিফ খানের দিকে তাকিয়ে আছে। আলো বেগম দাঁত বের করে এক বিদ্রূপের স্বরে আরিফ খানকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

"ওই পুলিশ অফিসার, হ, আমি আর আমার পীর মিলেই তোর বউকে মারেছি। এই ঘরেই তারে বলি দিছি। তোর সন্তানের রক্ত দিয়ে আমার এই মেঝের মাটি লাল করছি। কী করবি তুই আমার? পারলে কিছু করে দেখা!"

আরিফ খানের কানের পর্দায় কথাগুলো তিরের মতো বিঁধল। তিনি আইনের লোক, নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধা। কিন্তু আজ একজন স্বামী আর একজন পিতার সত্তা সব আগল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। আলো বেগম থামলেন না, তিনি আরও বিকৃত উল্লাসে বলতে চাইলেন,

"তোর বউয়ের পেট থিকা সেই ছোট সোনামণিরে যখন ছিঁড়া আনছি...!"

আর সহ্য করতে পারলেন না আরিফ খান। একজন স্বামী একজন পিতার কান এই বীভৎসতার কথা সইবে কী করে? তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পিস্তলটা আলো বেগমের কপাল বরাবর তাক করে ট্রিগার চেপে ধরলেন। পরপর পাঁচটি গুলির শব্দে পুরো ঘর প্রকম্পিত হলো। শব্দের সাথে মিশে গেল জাফর আলীর আতঙ্কিত চিৎকার আর চৈতির গগনবিদারী আর্তনাদ। গুলির ধোঁয়া মিলিয়ে যাওয়ার আগেই তুরাগ ছুটে গেল চৈতির কাছে। সে পাগলের মতো চৈতিকে জড়িয়ে ধরল। তার অগোছালো চুলে, মুখে চুমু খেতে খেতে তুরাগ বলে উঠল,

"দেখো না বউ, দেখো! আমাদের সন্তানের খুনিকে মেরে দিয়েছি। আমি ব্যর্থ বাবা না, আমি প্রতিশোধ নিয়েছি!"

তুরাগ চৈতিকে জাপটে ধরে তার মুখে পাগলের মতো চুমু খাচ্ছে। তার বুকের ভেতরে আজ যে পাথরচাপা কষ্ট, এমনটা শেষ হয়েছিল যখন জেনেছিলো তার বাবা-মা ভাই বোন কেউ আর নেই। আজ সে পিতা হয়েও পিতা হতে পারল না এই হাহাকার তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। তুরাগ নিচে তাকাল। চৈতি যেখানে বসে ছিল, সেখান থেকে রক্তের একটা গাঢ় স্রোত বয়ে যাচ্ছে। তুরাগের ঠোঁট ভেঙে কান্না এল। এত ব্যথা নিয়ে দুইজন মানুষ কীভাবে বাকি জীবনটা পার করবে? তুরাগ চৈতিকে আরও নিবিড়ভাবে বুকে টেনে নিতে চাইল, তখন চৈতি তাকে বাধা দিল। চৈতির দুহাত তখন রক্তে মাখামাখি। সে শান্ত, প্রায় ভাবলেশহীন চোখে নিজের হাতের রক্তের দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর খুব ধীর এবং ভেজা গলায় তুরাগকে বলল,

"দেখুন না মাঝি, আমাদের সন্তানের রক্ত! মাত্র পাঁচ সপ্তাহ বয়স ছিল ওর। আমি ওকে দশ মাস পেটে ধরতে পারলাম না কেন? আমি কি মা না? বলুন না, আমি তো আপনার সন্তানেরই মা। কিন্তু আমার সন্তান কই? এই রক্তগুলোই কি ও?"

ঘরের বাতাসে তখন কেবল রক্তের গন্ধ আর চৈতির বুকফাটা হাহাকার। চৈতি তার রক্তমাখা হাত দিয়ে তুরাগের কলারটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার চোখের নোনা জল আর হাতের রক্ত মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। সে উন্মাদিনীর মতো তুরাগের চোখের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠল,

"দিন না আমার সন্তানকে আমার কাছে এনে দিন, দয়া করে! আমি আপনার কাছে ঘর চেয়েছিলাম, লাগবে না আমার ঘর। আমার শুধু আপনাকে আর আমাদের সন্তানকে চাই, আর কিচ্ছু চাই না। আমার সন্তানকে এনে দিন তুরাগ... আমার কোল কেন খালি হয়ে গেল? আমি মা হয়েও হতে পারলাম না কেন?"

তুরাগ চুপ চৈতির প্রশ্ন উত্তর কি তার কাছে থাকার কথা? চৈতি বুক চাপড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল,

"কই আমার সন্তান? তাকে আমি আর অনুভব করতে পারছি না কেন আমার ভেতর? সবাই আমাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যায়, ও-ও চলে গেল? একবারও ভাবল না ওর মা-র কেউ নেই ওর আর ওর বাবা ছাড়া? ও কেন চলে গেল, বলুন না? কেন ও আমাকে একা করে দিল?"

কথাগুলো বলতে বলতে চৈতি চিৎকার দিয়ে উঠল সেই চিৎকারে ছিল এক অপূর্ণ সত্তার আজন্ম হাহাকার। তার শরীরটা প্রচণ্ড অবসাদে ভেঙে পড়ছে, শরীরের শেষ বিন্দু রক্তটুকু ঝরিয়ে সে রিক্ত হয়ে যাচ্ছে। তুরাগ সর্বশক্তি দিয়ে চৈতিকে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে ধরল। সে অনুভব করল, চৈতির তপ্ত শরীরটা ধীরে ধীরে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে।

তুরাগ আর সেখানে দাঁড়ায় না। দুনিয়া রসাতলে যাক কিংবা বানের জলে ভেসে যাক সেদিকে তাকানোর মতো মানসিক শক্তি বা ধৈর্য কোনোটিই তার অবশিষ্ট নেই। সে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকা চৈতিকে অতি সন্তর্পণে নিজের পাঁজাকোলা করে তুলে নিল।

তুরাগের নিজের শরীরের অবস্থা শোচনীয় চৈতির ভার নিতে গিয়ে ক্ষতগুলোতে টান পড়ল, যন্ত্রণায় তুরাগের চোয়াল শক্ত হয়ে এল, কপাল দিয়ে ঘাম চুঁইয়ে পড়ছে। কিন্তু সে চৈতিকে ছাড়ে না।ইমতিয়াজ বন্ধুর এই অবস্থা দেখে অস্থির হয়ে এগিয়ে আসে। সে যখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে চৈতিকে একটু ধরতে যায়, তখনই তুরাগ বন্য পশুর মতো হুংকার দিয়ে উঠল,

"খবরদার! ধরবি না আমার বউকে!"

ইমতিয়াজ চমকে গিয়ে হাত সরিয়ে নিল। তুরাগের অধিকারবোধ দেখে সে আর কিছু বলল না। সে তুরাগের বাহুটা শক্ত করে ধরে তাকে ভারসাম্য দিতে দিতে মুখ ভেঁচকে ম্লান স্বরে বলল,

"তোরে তো ধরতে পারি নাকি? না কি এটাও নিষেধ?"

তুরাগ কোনো উত্তর দিল না। সে টলটলে পায়ে, রক্তাক্ত শরীরে চৈতিকে নিয়ে অভিশপ্ত ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

কিয়াম এতক্ষণ এক কোণে দাঁড়িয়ে তুরাগ আর চৈতিকে দেখছিল। তার মনের গহিনে চৈতিকে পাওয়ার যে ক্ষীণতম আশাটুকু অবশিষ্ট ছিল, মেঝের ওই চাপ চাপ রক্ত আর তুরাগের এই উন্মাদ ভালোবাসা দেখে তা আজ চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। সে তুরাগের পিছু নিল না। তুরাগের হাত থেকে কি চৈতিকে ছিনিয়ে নেওয়া সম্ভব? তুরাগ তো চৈতির পাগল স্বামী, যে তার জন্য ঠান্ডা মাথায় খুন করতে পারে, যে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব বিলিয়ে দিতে পারে। কিয়াম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই জন্মটা সে নাহয় এক ব্যর্থ প্রেমিক হিসেবেই কাটিয়ে দেবে। তুরাগ বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর কিয়ামও ধুলোবালি আর রক্তের আস্তানা ছেড়ে বেরিয়ে এল। যার আকর্ষণে সে এই নরক পর্যন্ত ছুটে এসেছিল, তাকে তো পাওয়া হলো না তাহলে আর এই গ্রামে থেকে কী লাভ?কিয়াম বাড়ির উল্টো পথ। গন্তব্য তার জানা নেই, হারাবার ভয়ও আর নেই। সে কেবল হাঁটছে। অন্ধকার পিচঢালা পথ বেয়ে সে কোথায় হারিয়ে গেল, কেউ আর কোনোদিন জানতে পারল না। সবার মুখে মুখে কিয়াম থেকে গেল কেবল এক ব্যর্থ প্রেমিকের নাম হয়ে।

চলবে….

(ছোট পর্ব বলবেন না কেউ।আমি কিন্তু এমন সময় দেইনা গতকালই দিতাম এই পর্বটা কিন্তু আমার ঘুম এসে পড়েছিলো।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন