বোনাস পর্ব
সবাই যখন চাঁদ রাতের উল্লাস আর মেহেদি রাঙানোয় মত্ত, চৈতির তখন দম ফেলার বিন্দুমাত্র ফুরসত নেই তার হাত অবিরত ব্যস্ত শিলপাটায় মসলা পেষণ করতে। সামান্য আদা বাটতেই ঘেমে উঠল তার সমগ্র শরীর। তিন সন্তানের মা হওয়ার পর শরীরের ওজনটা বেশ বেড়েছে, এখন সামান্য নড়াচড়াতেই বড্ড ক্লান্ত বোধ হয়। আর বাচ্চা গুলোও হয়েছে হুবহু বাপের অবিকল প্রতিচ্ছবি এক একখানা চরম অবাধ্য ও দুষ্টের শিরোমণি! সারাদিন চৈতিকে অতিষ্ঠ করে তোলাই ওদের প্রধান কাজ মাকে বিরক্ত না করলে ওদের পেটে ভাত হজম হতে চায় না। রাত পোহালেই পবিত্র ঈদুল আজহা, ঘরে কাজের পাহাড় জমে আছে। তুরাগ বাচ্চাদের নিয়ে কিছুটা সময়ের জন্য গরু দেখতে বের হওয়াতেই যা রক্ষা! এই সুযোগে চৈতি একমনে নিজের হাতের কাজগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে।
ঠিক সন্ধ্যা নামার মুখে মুখেই বাচ্চাদের নিয়ে ঘরে ফিরল তুরাগ। তূর্বীর জন্মের ঠিক তেইশ মাস পরেই চৈতি আর তুরাগের কোল আলো করে এসেছে দুই রাজপুত্র। যমজ দুই ভাই তূর্য আর তীব্রর বয়স এখন বিশ মাস। কিন্তু এইটুকু বয়সেই ওরা চরম চঞ্চল! এখনও স্পষ্ট করে কথা বলতে পারে না, অথচ আধো-ভাঙা কথা দিয়েই তিন ভাই-বোন মিলে এমন ঝগড়া বাধায় যে সারা ঘর ম ম করে।
ছেলে-মেয়েদের চিৎকার কানে আসতেই চৈতি হাতের সব কাজ ফেলে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ছুটে আসে। আর ঘরে ঢুকেই তার মাথায় হাত! তিন ভাই-বোন মিলে চৈতির সাধের কসমেটিকস বক্সটা আবিষ্কার করেছে। শুধু কি তাই? লিপস্টিক দিয়ে বিছানার চাদর থেকে শুরু করে ঘরের মেঝে পর্যন্ত একদম মাখামাখি করে একাকার করে ফেলেছে! চৈতি এবার চরম রেগেমেগে ওদের গায়ে হাত তুলতে যাবে, তখনই কোত্থেকে যেন তুরাগ এসে উদয় হলো! সে চট করে চৈতির সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
"এই অবলা বাচ্চাদের দয়া করে মারবেন না।"
চৈতির রাগ এবার সপ্তম আকাশে। সে চোখ বড় বড় করে তুরাগের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠে,
"এখন কিন্তু মারগুলো সব আপনার পিঠে পড়বে! সরুন সামনে থেকে।"
তুরাগ একচুলও নড়ল না, আগের মতোই চৈতির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রাগে আর দুঃখে চৈতির এবার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। সারাদিনে নিজের জন্য দুটো মিনিট সময় মেলে না তার; তার ওপর সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একের পর এক কাজ লেগেই আছে। চৈতির মাঝে মাঝে মনে হয়, বাচ্চাদের এই সীমাহীন অত্যাচারে সে দিন দিন নির্ঘাত পাগল হয়ে যাচ্ছে! সে তুরাগকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে তুরাগ আবার ফোড়ন কাটে,
"নিষ্পাপ বাচ্চাদের মারবে তুমি? ডাইনি মহিলা!"
চৈতি এবার আরও ক্ষেপে যায়। তার শরীরে যদি জোর থাকত, তবে এই মুহূর্তে তুরাগকে আছাড় মেরে সোজা করে দিত! কিন্তু তার শরীরের সেই শক্তিটুকু নেই। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
"তাহলে বাচ্চাদের বাপকে মারি? তিনি তো আর নিষ্পাপ নন!"
বউয়ের কথা শুনে তুরাগ নিজের সবগুলো দাঁত বের করে এক গাল হাসে। চৈতি দিন দিন কেমন ঝগড়ুটে হয়ে যাচ্ছে! অবশ্য তুরাগের তা মন্দ লাগে না। কিন্তু কেউ তার সন্তানদের গায়ে হাত দিলে সে বড্ড চটে যায়। এই তো মাসখানেক আগের কথা তিন ভাই-বোন মিলে তাদের সবজি বাগানের সব সবজি টেনে হিঁচড়ে নষ্ট করে ফেলেছিল। সেবার হাতের কাছে যা পেয়েছিল, তা দিয়েই চৈতি আচ্ছামতো ধোলাই দিয়েছিল তিনজনকে। তুরাগ তখন বাড়িতে ছিল না। কিন্তু বাড়ি ফেরার পর এই নিয়ে চৈতির সাথে তার কী ভীষণ ঝগড়াটাই না হয়েছিল! অভিমানে চৈতি টানা পাঁচটা দিন তুরাগের সাথে কোনো কথাই বলেনি। তখন নিজের ঘরেই নিজেকে বড্ড অপরিচিত আর একা লেগেছিল তুরাগের। সাধারণত চৈতির সাথে তার সারাদিন কিছু না কিছু নিয়ে খুনসুটি লেগেই থাকে, তবে তা দশ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় না। কিন্তু সেবারই প্রথম এমন হয়েছিল যে, চৈতি একটানা পাঁচ দিন তুরাগের সাথে কথা না বলে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল।
তুরাগ চট করে চৈতির গাল চেপে ধরে আদুরে কণ্ঠে বলতে চাইল,
"আমি সব ঠিক করে দিচ্ছি…!"
কিন্তু চৈতিকে কি আর এখন এই সব মিষ্টি কথায় ভোলানো যাবে? সে তুরাগের হাত থেকে নিজেকে ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিয়ে বলল,
"আদেখলেপনা দেখাবেন না তো, বিরক্ত লাগে!"
তুরাগ তার কথা শুনল না। সে জোর করেই চৈতিকে টেনে ঘরের বাইরে বারান্দায় নিয়ে এল। চৈতি নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ছটফট করতে করতে চেঁচিয়ে উঠল,
"ছাড়ুন আমাকে…!"
তুরাগ ছাড়ল না, বরং চৈতিকে পেছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,
"আজকাল এমন করো কেন, রাজকন্যা?"
চৈতি ভীষণ বিরক্ত হয়ে শুধাল,
"কী করি?"
"আমার সাথে আর আগের মতো করে কথা বলো না। সারাদিন খালি মুখ ভার করে রাখো। তুমি কি আমার সাথে সুখী নও?"
তুরাগের এই কথায় চৈতি চমকে উঠে। তূর্য আর তীব্র হওয়ার পর থেকে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সে বড়জোর তিন-চার ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পায়। তারপর সারাদিন সংসারের পাহাড়সম কাজ, তিন তিনটা বাচ্চা সামলানো সব মিলিয়ে তার নিজের মনের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। মেজাজ সবসময় তিরিক্ষি হয়ে থাকে আর দিনশেষে ক্ষোভের পুরোটা গিয়ে পড়ে বেচারা তুরাগের ওপর। চৈতি নিজেকে কতবার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পেরে ওঠেনি। কোনো না কোনোভাবে সে তুরাগের সাথে খারাপ আচরণ করেই ফেলে।চৈতি এবার তুরাগের দিকে তাকাল। আকাশে আজ চাঁদ উঠেছে। রূপালি চাঁদের আলোয় এই দুজন মানব-মানবীকে অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে। চৈতি আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারল না সে তুরাগকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল,
"মাফ করে দিন আমাকে! আমি সত্যি চাই না আপনার সাথে খারাপ আচরণ করতে, কিন্তু কোনো না কোনোভাবে করেই ফেলি। আপনি দয়া করে কষ্ট পাবেন না, আমি ইচ্ছে করে এমন করি না।"
তুরাগ মৃদু হাসল। চৈতির এই হঠাৎ হঠাৎ বদলে যাওয়া আর খিটখিটে মেজাজের আসল কারণটা সে খুব ভালো করেই বোঝে। কিন্তু সমস্যা হলো, চৈতি প্রায় সময়ই বাচ্চাদের সামনেও তুরাগের সাথে ঝগড়া জুড়ে দেয়। এই বয়সে বাচ্চারা যা দেখবে, সেটাই তো শিখবে। তুরাগ চায় না তার সন্তানেরা এসব দেখে বড় হোক। তাই নিজের ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও আজ তাকে কথাটা বলতেই হচ্ছে।
তুরাগ চৈতির চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
"পরপর বাচ্চা হওয়ার পর এই পরিবর্তনগুলো খুব স্বাভাবিক,। টানা ঠিকমতো ঘুম না হলে যে কারও মেজাজ বিগড়ে থাকে, আমি তোমাকে বুঝি। কিন্তু আমি শুধু চাই না তুমি তূর্বী, তূর্য আর তীব্রর সামনে এমন আচরণ করো। ওরাও তো এসব দেখে এটাই শিখবে, তাই না?"
চৈতি অপরাধী চোখে তুরাগের দিকে তাকাল। তুরাগ আবার আদর করে বলল,
"আমার ওপর তোমার যতই অভিমান কিংবা অভিযোগ থাকুক না কেন, সেগুলো তুমি আমাকে একা আলাদা করে বলবে, কেমন?"
চৈতি আলতো করে মাথা নাড়ে। তুরাগ চৈতির কপালে ভালোবাসার এক দীর্ঘ পরশ ছুঁয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"ঈদ মোবারক, বউ।"
চৈতি তখনও ভেজা চোখে একটু নাক টেনে জবাব দিল,
"আপনাকেও, ঈদ মোবারক।"
সমাপ্ত
(তুর্বী তূর্য আর তীব্র কে তো দেখানোই হয়নি তাদের নিয়েও কোনো একদিন একটা ছোট করে পর্ব দিবো। আর সবাইকে ঈদ মোবারক।)