ফন্ট সাইজ:
থিম:
ভবঘুরে সমরাঙ্গন

৭০তম পর্ব

লেখক: তাজরীন ফাতিহা

#ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

#পর্ব_৭০.১

তাজরীন ফাতিহা

গতরাতে মারওয়ান একটা ভয়ংকর আজগুবি স্বপ্ন দেখেছে। স্বপ্নটা এতই অদ্ভুত যে ক্ষণে ক্ষণে তার গা শিউরে উঠছে। সে দেখেছে একেবারে ছোট বাচ্চা হয়ে গেছে সে। তোয়ালে দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে তাকে। সকলে এসে জড়ো হয়েছে তাকে দেখার জন্য। মারওয়ান শুয়ে শুয়ে কান্না বাদ দিয়ে মুখ কুঁচকে এদের রং ঢং দেখছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন টুপটাপ চুমু খেয়ে ফেলেছে। এজন্য সে বেজায় বিরক্ত। একজন মহিলা কোত্থেকে এসে তাকে কোলে নিয়ে টপাটপ চুমু বসিয়ে গালে লালা লাগিয়ে দিল। মারওয়ান 'ওয়াক ওয়াক' করতে করতে বলে উঠল,

"কিসব বিচ্ছিরি কাজকারবার শুরু করেছে! মেয়ে মানুষ হবে লজ্জাবতী। এর মধ্যে দেখি হায়া লজ্জার ছিটেফোঁটাও নেই। হুট করে একটা ব্যাটাছেলেকে চুমু টুমু খাওয়া শুরু করেছে। ছিঃ ছিঃ! পৃথিবীতে এসেই বিপদে পড়েছি। লোল টোল লাগিয়ে দিগদারি অবস্থা। দূর হ, দূর হ।"

এ পর্যায়ে মারওয়ান ঘুমের মধ্যেই বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিল। একটা কয়েকদিনের বাচ্চা কথা বলছে কিভাবে? সে আরও দেখল, আশেপাশের মানুষ বেশ কৌতূহল ও খুশি খুশি চেহারায় তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। যে মহিলাটি চুমু খেয়েছিল সে উৎসুক হয়ে বলল,

"এই সবাই দেখ আমার জানু, সোনা কথা বলছে। বড় হয়ে বেশ ব্রিলিয়ান্ট হবে মনে হচ্ছে।"

উপস্থিত সকলের মুখে 'মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ' রব উঠে গেল। যেন এইটুকু বাচ্চার কথা বলা খুবই স্বাভাবিক। বরং কথা না বলাটা অস্বাভাবিক। একজন লিকলিকে গড়নের লম্বা পুরুষ এগিয়ে এসে তার ফুলো ফুলো গাল দুটো দলাই মালাই করতে করতে বলল,

"কি বলছ তুমি রসগোল্লা?"

মারওয়ান এবার আরও বিরক্ত হলো। ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

"হাত সরা গাঁজাখোর। তোর হাত থেকে গাঁজার গন্ধ আসছে। ওয়াক!"

লোকটি মোটেও বিচলিত হলো না। আরও মনের মাধুরী মিশিয়ে মারওয়ানের গাল টিপে দিতে লাগল। তারপর ঠেসে চুমু খেতেই মারওয়ান রাগে চিৎকার করে বলল,

"একটু পরপর চুমা চাটি দিতেই আছে। ছোট বাচ্চা চুমু দিবি দে তবে মুখের লালা লাগাচ্ছিস কেন? চুমু দেয়ার ম্যানারসও শিখিসনি? ন্যূনতম ভদ্রতা নেই এদের। নাই কোনো কমনসেন্স, সবগুলো ননসেন্স।"

কথা শেষ করতে না করতেই দেখল দলে দলে মানুষ আরও তাকে চুমুতে শুরু করেছে। আর গাঁজাখোরের মতো মানুষটার চেহারা হঠাৎ করে ইহাবের মতো দেখাচ্ছে। লোকটা 'রসগোল্লা' বলে রীতিমত কামড় দেয়া শুরু করেছে। মারওয়ান বিরক্তিতে কপাল ভাঁজ করে বুকে হাত গুঁজে রগচটা ভঙ্গিতে চুমু খেয়ে চলছে। পরপরই স্বপ্ন ভেঙে গেল। সে ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে চেক করল। না সব ঠিকঠাক আছে। ভয়ে তার কলিজা লাফিয়ে তালগাছে উঠেছিল। বারংবার গাল ধুয়ে লাল করে ফেলেছিল। কি সাংঘাতিক দুঃস্বপ্ন!!

নিশাত বারান্দা থেকে মারওয়ানের শুকনো জামাকাপড় এনে ভাঁজ করছে। ইস্ত্রি করবে বিধায় সব নিয়ে খাটে বসল। মারওয়ান খাটের মাঝে শোয়া। নিশাত তা দেখে বলল,

"একটু চাপুন। দেখছেন না কাজ করছি এমন খাম্বার মতো পড়ে আছেন কেন? আপনার কমনসেন্স কই?"

মারওয়ান এতক্ষণ গভীর ভাবনায় মত্ত ছিল। গতরাতের স্বপ্নটা নিয়েই চিন্তা করছিল। নিশাতের মুখে কমনসেন্স শুনে চমকে উঠল। স্পষ্ট মনে আছে, স্বপ্নে এই শব্দটা সে বলেছিল। কিভাবে মিলে গেল? কাকতালীয় ব্যাপার স্যাপার। সে সরে নিশাতকে জায়গা দিল। নিশাত ইস্ত্রি দিয়ে মারওয়ানের একটা শার্ট আয়রন করতে করতে বলল,

"কি হলো কাজে যাবেন না? এত ব্যস্ত মানুষ আজকে ঘরে কেন?"

মারওয়ান গম্ভীর হয়ে ভাবছিল স্বপ্নটার কথা নিশাতকে জানাবে কিনা! এই ভয়ানক স্বপ্নটা দিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু বুঝিয়েছে কিনা সেটা একবার জিজ্ঞেস করে দেখবে? নিশাতের তো ধর্মীয় জ্ঞান আছে। জানতেও তো পারে। সে নিশাতকে নিবিড়ভাবে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। মারওয়ান আর ভাবলো না। তৎক্ষণাৎ শোয়া থেকে উঠে বসে চিন্তিত গলায় বলল,

"লিলিপুট শোনো।"

নিশাত মারওয়ানের শার্টের বোতাম মনোযোগ দিয়ে লাগাচ্ছিল। লিলিপুট ডাকায় মারওয়ানের দিকে চাইল। মারওয়ান ভুলটা সংশোধন করে বলল,

"আচ্ছা নিশাত শোনো।"

"আপনাকে কিছু বলেছি?"

"কোন বিষয়ে?"

"এইযে নাম ডাকা নিয়ে?"

"না, তুমি বিরক্ত হও তাই ঠিকঠাক বললাম।"

নিশাত অবাক হয়ে বলল,

"আমার বিরক্তি নিয়েও আপনি ভাবেন!"

"কথা প্যাঁচিয়ো নাতো। এখানে ভাবা না ভাবার কি হলো? তাছাড়া একটা মানুষ বিরক্ত হচ্ছে সেটা না করাই অনুচিত। আর কেউ আমার উপর বিরক্তি দেখালে তার সাথে দ্বিতীয়বার কথা বলিনা আমি।"

"তবে যে আমার সঙ্গে বলেন? আমার সব বিরক্তের কাজগুলো বেশি বেশি করেন?"

"তুমি আর সবাই তো এক না। তুমি হলে ফৌজিয়া সবাই কি ফৌজিয়া?"

"দুনিয়ায় কি ফৌজিয়া নামের মেয়ের অভাব আছে নাকি? তারমানে সব ফৌজিয়ার কাছে আপনি এমন?"

"মহিলা মানুষের বেশি বোঝা স্বভাব খুবই বিরক্তিকর। আমি তো দুনিয়ার সব ফৌজিয়ার কোলে উঠে বসেনি তোমার কোলেই যেহেতু উঠেছি সেহেতু তোমাকেই বুঝিয়েছি। এইটুকু তো বোঝার কথা। কমনসেন্স খাটাও।"

"আচ্ছা খাটালাম। এবার বলুন আপনি আমার কোলে কবে উঠেছেন?"

মারওয়ানের ধৈর্যের বাঁধ শীগ্রই ভাঙবে ভাঙবে অবস্থা। এজন্যই ঠিক এজন্যই মহিলাদের পাত্তা দেয়না সে। একবার মাথায় উঠে নাচানাচি শুরু করলে থামানো বেজায় মুশকিল এদের। হোয়াট ইজ দ্যা কোশ্চেন কোলে কবে উঠেছেন? তার রাগে কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে রীতিমত। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বলল,

"তুমি কি উপমা বোঝো না? স্কুলে বাচ্চাদের পড়াতে কী? ঘোড়ার ডিম? একজন প্রাক্তন শিক্ষিকার মুখে প্রশ্নটা বড্ড বেমানান লাগল। কোলে ওঠা বলতে বিয়েকে বুঝিয়েছি। তুমি যে এতটা নির্বোধ সেটা তো বুঝিনি। বুঝলে বিয়েই বলতাম। আমার বড় অন্যায় হয়েছে।"

"কি যে বলেন আর কি যে যুক্তি দেন আল্লাহ মাবুদ ছাড়া এই যুক্তি খণ্ডানোর সাধ্য আমার মতো সাধারণ মানুষের নেই। থাক বাপু আমার অত বোধ টোধের দরকার নেই, আমি নির্বোধই সই।"

মারওয়ান খিটমিট করতে করতে বলল,

"দিলে তো মেজাজের বারোটা বাজিয়ে।"

নিশাত একমনে ইস্ত্রি করতে করতে হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,

"একটু ভুল বললেন। বারোটা না সোয়া বারোটা বাজিয়েছি।"

মারওয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

"তুমি আমার সাথে মশকরা করছ?"

"না রিয়েলিটি বললাম।"

মারওয়ান রাগ করে আর একটা কথাও বলল না। বোম্বাই মরিচটার স্পর্ধা দিনদিন বাড়ছে। দেখতে ছোটখাটো হলে কি হবে যেখানে যায় জ্বালিয়ে পুড়িয়ে অঙ্গার বানিয়ে তারপর থামে। তার দশাও ইদানিং এমন হয়েছে। তাকে কথার মারপ্যাঁচে ফেলে, মশকরা করে। পূর্বের নিশাত আর এই নিশাতের মাঝে বিস্তর পার্থক্য চোখের সামনে সহজে ধরা দেয়।

নিশাত ইস্ত্রি উল্টো করে রেখে মারওয়ানের মুখোমুখি পা ভাঁজ করে আসন করে বসল। তারপর বলল,

"আচ্ছা, বলুন আর কথা বলব না।"

"না এখন আর বলার মুড নেই।"

"বলুন বলছি।"

"তুমি আমাকে চোখ রাঙাচ্ছ? তোমার স্পর্ধা দেখছি শুধু।"

নিশাত থুতনির নিচে হাত ঠেকিয়ে মারওয়ানের চোখের দিকে চেয়ে বলল,

"স্পর্ধা দেখতে কেমন? স্পর্ধায় কী কী দেখেছেন?"

খরখরে গলায় প্রত্যুত্তর এল,

"একদম তোমার মতো দেখতে। দেখেছি তোমার নাক, মুখ, মাথা, কপাল, গাল, হাত, ঠ্যাং।"

"দেখতে কেমন লেগেছে সেগুলো?"

"অত্যন্ত বিচ্ছিরি।"

মারওয়ানের বিশ্রী বলার ধরনে নিশাত এ পর্যায়ে ফিক করে হেসে দিল। মারওয়ান কঠোর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। নিশাত হাসি বন্ধ করতে চাইল কিন্তু পারল না তাই মুখে হাত চেপে আড়াল করল। মারওয়ান হুড়মুড়িয়ে বিছানা থেকে উঠে যেতে নিলে নিশাত চট করে মারওয়ানের হাত ধরে থামিয়ে দিল। মারওয়ান কঠিন চেহারায় চাইল। নিশাত তার দাড়িযুক্ত থুতনি ধরল। এরপর মোলায়েম ভাবে হাত বুলিয়ে মিটমিট করে হেসে বলল,

"আপনি না গোয়েন্দা? গোয়েন্দা মানুষের ধৈর্য এত কম তা তো জানতাম না। আমি তাদের ভীষণ সাহসী ভাবতাম। কথায় কথায় গাল ফুলিয়ে ফেলা গোয়েন্দা এই প্রথম দেখলাম।"

মারওয়ান তবুও কথা বলল না। নিশাত ঠোঁট চেপে বলল,

"বাবু কি বেশি রাগ করেছে?"

মারওয়ানের টনক নড়ল। বাবু বলায় রাতের স্বপ্ন আবারও চোখের সামনে ভেসে উঠল। সে সবকিছু ভুলে বলল,

"শোনো নিশাত, মজা টজা বাদ দিয়ে আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো। কাল রাতে আমি ভয়ানক একটা স্বপ্ন দেখছি। দেখলাম আমি একদম ছোট বাচ্চা হয়ে গেছি। আমাকে তোয়ালে দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো আমি পুরো হুবহু আমার কণ্ঠে কথা বলছি। এরপর দলদলে মানুষ চুমু দেয়া শুরু করেছে। কি বিভৎস ভাবতে পারছ!"

মারওয়ান মাঝখানের সংলাপ গুলো আর বলল না। বললে আবার হাসাহাসি করলে তার প্রেস্টিজে লাগবে। তাই যত কম কথায় বর্ণনা করা যায় ততটুকুই বলল। নিশাত হাসি আর থামিয়ে রাখতে না পেরে বলল,

"ওয়াও এত সুন্দর বিভৎস স্বপ্ন আমি কখনো শুনিনি।"

"মজা করছ?"

"না।"

"আচ্ছা এটার কি কোনো ব্যাখ্যা আছে?"

নিশাত চোখে চোখ রেখে বলল,

"আছে তো।"

মারওয়ান উৎসুক হয়ে বলল,

"কী?"

নিশাত ঠোঁট টিপে বলল,

"আপনি বোধহয় আবার বাবা হবেন।"

মারওয়ান হতবাক হয়ে বলল,

"সত্যি!!"

"হ্যাঁ।"

"সিরিয়াসলি? কবে জেনেছ?"

"কি কবে জেনেছি? আমি তো আমার কথা বলিনি। আপনার কথা বলেছি। মানে আপনি বাবা হবেন কিন্তু আমি মা হবো না।"

"তুমি কি আমার সাথে ফাইজলামি করো? আমি বাবা হলে তুমি মা হবে না?"

"না।"

"তাহলে আমি বাবা কিভাবে হবো?"

"আমি যেভাবে মা হয়েছি।"

"মানে?"

"মানে সিম্পল। আপনি শীগ্রই বাচ্চা জন্ম দিতে যাচ্ছেন। দশ মাস পর বাকি কথা হবে।"

বলে মারওয়ানের পেটে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,

"পেট তো বাড়ছে মনে হচ্ছে। প্রেগন্যান্সির লক্ষ্মণ।"

মারওয়ান হতবাক হয়ে বলল,

"কি বললে তুমি? প্রেগন্যান্সির লক্ষ্মণ মানে? আমার পেট বাড়ছে! পুরুষরা প্রেগনেন্ট হয়?"

"নারীরা হতে পারলে পুরুষরাও হয়। তাছাড়া আপনার পেট বাড়ছে কেন? আপনিই বলুন।"

মারওয়ান নিজের উদরে হাত বুলিয়ে বলল,

"কোথায় বাড়ছে? সামান্য মেদ জমেছে। বয়স হলে ওরকম একটু আকটু হয়।"

নিশাত ভ্রু নাচিয়ে বলল,

"সামান্য মেদ? ভুঁড়ি বলতে কষ্ট হয়? প্রেস্টিজে লাগে?"

মারওয়ান নাকের ডগা ফুলিয়ে নিশাতের দিকে কড়া চোখে চাইল। নিশাত পাত্তা না দিয়ে বলল,

"প্রেগনেন্ট শুনতে না চাইলে অতিসত্তর ভুঁড়ি কমান। নাহলে দশমাস পর সত্যি সত্যি আপনার সিজার করিয়ে দেব। আমার পাশে কোনো ভুঁড়ি ম্যান অ্যালাউ না।"

মারওয়ান ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

"তুমি আমার বডি শেমিং করছ?"

"না ভুঁড়ি শেমিং করছি।"

রাতে নিশাত মারওয়ানকে খেতে ডাকলেও মারওয়ান খেল না। মটকা মেরে পড়ে থাকল। নাহওয়ান কয়েকবার এসে বাবার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করল কিন্তু আজকে মারওয়ানের মেজাজ চড়া। কারো ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। নিশাত অনেকক্ষণ সাধার পরে বলল,

"তুমি আমার একটা অঙ্গকে অপমান করেছ? এর পরেও আশা করো আমি খাবো?"

"ভুঁড়ি বুঝি একটা অঙ্গ?"

মারওয়ান রাগ রাগ গলায় বলল,

"ভুঁড়ি ভুঁড়ি করবে না। এটাকে মেদ বলে।"

"আচ্ছা ঠিক আছে বললাম না। এবার বলুন মেদ অঙ্গ?"

"অবশ্যই। শরীরের সাথে কানেক্টেড সবকিছুই অঙ্গ।"

"আপনি না বললে আসলে জানতাম না। বড় উপকার হলো জেনে। এত চমৎকার জ্ঞানমূলক কথা শুনে মনে চাচ্ছে আপনাকে গরুর পাঁচকেজি অঙ্গ গিফট করতে।"

মারওয়ান নিশাতের দিকে কটমট দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।

____

নাহওয়ান ইদানিং মাকে কাজে হেল্প করে, পাশের বাসায় খেলতে যায়। পাশের বাসার ছেলেটাকে তার খেলার সঙ্গী বানিয়ে ফেলেছে। বাচ্চাটার নাম রোহান। দুজন বাসার মধ্যে খেলাধুলা করে। নিশাত রোহানের মায়ের কাছ থেকে হাতের কাজ শিখছে। তিনি এমব্রয়ডারি কাজে ভালোই পারদর্শী। নিশাত আজকেও কাজ শিখতে এসেছে। রোহানের বাবা এই সময় বাসায় থাকেনা। তাই এই সুযোগে নিশাত কাজটুকু শিখে নেয়। মারওয়ান তাকে কখনো কোনো কাজে বাঁধা দেয়না। তবুও সে মারওয়ানের অনুমতি নিয়েই কাজ শিখছে। আজকে হঠাৎ কাজের মধ্যে হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ পাওয়া গেল। নাহওয়ান আর রোহান খেলা থামিয়ে সেদিকে চাইল। রোহানের মা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,

"কে?"

জবাব এল,

"ফাইয়াজ আছে?"

রোহানের মা বুঝলেন অপরপাশের লোকটি মারওয়ান। তিনি নিশাতকে এসে বললেন সে কথা। নিশাত ঝট করে উঠে এসে দরজা খুলল। মারওয়ানকে দেখে বলল,

"কিছু লাগবে?"

"একটু আসো তো।"

নিশাত বলল,

"আচ্ছা ঠিকআছে দাঁড়ান ছেলেকে নিয়ে আসি।"

"না শুধু তুমি আসো। ছেলেকে একটু পরে আনো।"

নিশাত মাথা নাড়িয়ে স্বামীর পিছু পিছু এল। মারওয়ান দরজা আটকে অস্থির গলায় বলল,

"তোমাকে কখনো জড়িয়ে ধরিনি না?"

নিশাত ভ্রু কুঁচকে বলল,

"মানে?"

মারওয়ান প্রত্যুত্তর না করে নিশাতের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

"কিছু না। ছেলের খেয়াল রেখো, একটু কাজে যাচ্ছি।"

নিশাত সায় জানিয়ে বলল,

"আপনাকে অস্থির লাগছে কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে?"

"না, ঠিক আছে সব। যাই।"

"শুনুন আপনাকে আজকে কেমন যেন লাগছে।"

"কেমন লাগছে?"

"অদ্ভুত লাগছে। আপনি তো এমন না।"

"আমি কেমন?"

"আপনি মারওয়ান আজাদের মতো। আজকে কেমন স্বামী স্বামী লাগছে।"

মারওয়ান হাসল। দরজা খুলে বাইরে যেতে যেতে বলল,

"যাক স্বামী তাহলে হতে পেরেছি।"

বলে ছেলেকে ডেকে আনল। তারপর নাহওয়ানের সামনে বসে বলল,

"এই পান্ডা, খেয়েছিস গোল গোল আন্ডা?"

নাহওয়ান ফিচফিচ করে হেসে বলল,

"ইননা খাইনি।"

"কেন খাসনি আন্ডা, তুই কি খেতে চাস সান্ডা?"

"ইননা।"

মারওয়ান গম্ভীর গলায় বলল,

"ডিম খেয়ে বাঘের বাচ্চা হবি।"

নাহওয়ান মাথা দোলাতে দোলাতে বলল,

"ডিম খেলে মুগ্গির বাচ্চা হবো।"

"কে বলেছে?"

"মুগ্গি ডিম পাড়ে আমি জানি।"

"তো? মুরগির ডিম পাড়ার সাথে বাচ্চা হওয়ার সম্পর্ক কী?"

"ডিম থেকে বাচ্চা হয়।"

"কোথা থেকে জানলি।"

"মা বলেছে।"

"যাইহোক খেলে তো আর হয়না।"

"হয়।"

"সেটাও কি তোর মা বলেছে?"

"না বইয়ে দেখেছি।"

"কী দেখেছিস?"

"মুগ্গির ডিমে বাচ্চা হয়।"

মারওয়ান ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। বলল,

"তোর কথাই ঠিক। বড় হলে মুরগির সাথে তোকে বিবাহ দেব।"

তারপর বাপ, ছেলের আরও কিছুক্ষণ কথা চলল। পাশে এসে নাহওয়ানের বিল্লু ছানা বসে বসে লেজ নাড়াতে লাগল। সে ঘরের মনোযোগী শ্রোতা। বিল্লু ছানাটা বড় হয়ে গেছে। নাহওয়ানের সাথে সাথেই থাকে এখন। মারওয়ান ছেলেকে আদর করে দরজা খুলে সু জুতার ফিতা লাগালো। এরপর বিদায় জানিয়ে চলে যেতে নিলে নিশাত দরজা ধরে বলল,

"শুনুন কখন আসবেন?"

মারওয়ান থমকে দাঁড়িয়ে বলল,

"কেন কোনো দরকার।"

"না কখন আসবেন সেটাই জানতে চাচ্ছি। এই ভরদুপুরে যাচ্ছেন আসবেন কখন?"

"শীগ্রই আসব।"

নিশাত বলল,

"একটু দাঁড়ান দোয়া পড়ে দেই।"

_____

মানহার প্রেগন্যান্সির সময় ঘনিয়ে এসেছে। শরীর একদম ভেঙে পড়েছে। হাত, পায়ে পানি এসেছে। ইহাব তিনদিন ধরে কল ধরছে না দেখে আজকে সকালে বড় ভাইকে কল দিয়ে সব জানিয়েছে। মারওয়ান চিন্তা করতে নিষেধ করেছে। কাজের ব্যস্ততার জন্য ফোন বন্ধ হয়তবা। মানহা ভাইয়ের কথায় মোটেও আশ্বস্ত হয়নি। হুহু করে শুধু কেঁদেছে। মারওয়ান বুঝিয়ে শুঝিয়ে কল কেটেছে।

এই সময়টায় বহু কষ্টে নামাজ আদায় করে মানহা। আজকেও ইশারায় নামাজ পড়ে বসতে না বসতেই পেটে হালকা ব্যথা শুরু হলো। ইহাবের টেনশনে এমনিতেই অস্থির তার উপর পেটে ব্যথায় আরও কষ্ট ও কাহিল লাগছে। ডেলিভারি ডেট সামনের মাসে। আর অল্প কয়দিন বাকি। দোয়া দুরুদ, কুরআন তেলাওয়াত করে একটু শুয়েছে। এরমধ্যে কল বেজে উঠল। সে ইহাব ভেবে তৎক্ষণাৎ কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কে যেন বলে উঠল,

"একজন পুরুষ গুরতর আহত হয়েছেন। অবস্থা সংকটাপন্ন। অনুগ্রহ করে দ্রুত স্কয়ার হাসপাতালে চলে আসুন।"

কল কেটে যেতেই মানহা চিৎকার করে বলল,

"কে? কে আহত হয়েছে?"

মানহার চিৎকারে সকলে জড়ো হলো। মাহাবুব আলম উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

"কি হয়েছে?"

মানহা অস্থির ভাবে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল,

"কে জানি আহত হয়েছে মাত্র ফোন দিয়ে বলল। আমার মনে হচ্ছে উনি। আমি আমি..."

মানহার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। মায়মুনা বেগম মেয়েকে ধরে আছেন। মাহদী বোনের মাথায় ম্যাসেজ করতে লাগল। সকলের চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া। মাহাবুব আলম সেই নাম্বারে আবারও কল দিলেন।

চলবে.....#ভবঘুরে_সমরাঙ্গন

#পর্ব_৭০.২

তাজরীন ফাতিহা

আসমান আজ লাল শামিয়ানা টেনেছে। রক্তিম গোধূলি কোলাহলপূর্ণ মৃদুমন্দ বাতাসে মিশে গেছে। নিশাতের কাছে মনে হচ্ছে চারিপাশ অদ্ভুত নিস্তব্ধে থম মেরে আছে। এমনটা মনে হওয়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই তবে তার কেন এমন মনে হচ্ছে? আকাশ এমন টকটকে রঙে সেজেছে কেন? মনে হচ্ছে রক্ত সব শুষে নিয়েছে অদূরের আকাশটা। মাগরিবের আজান পড়তেই ওযু করে নামাজ আদায় করল সে। নাহওয়ানও এখন তার সঙ্গে নামাজ পড়ে। সূরা ফাতিহা অর্ধেক পারে। ওটুকুই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়তে থাকে। নিশাতের ইচ্ছে ছেলেকে আরবী শিখাতে শিক্ষক রাখবে। মারওয়ানকে বলে দেখতে হবে। নিশাত জানে লোকটা না করবে না। উপরে উপরে কঠিন হয়ে থাকলেও ভেতরটা একদম তুলোর মতো নরম। কদিন যাবত তার সাথে মোলায়েমভাবে কথা বলেছে। বিষয়টা নিশাতকে আনন্দ দিলেও খটকা লেগেছে প্রচুর। হঠাৎ এমন আচরণের কারণ খুঁজে পায়নি সে। হয়তবা সংসারে মনোযোগী হচ্ছে।

নিশাত রাতের রান্না করার জন্য সবজি কাটতে বসল। পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে হুট করে আঙুলের মাথা কেটে গেল। রক্ত টপটপ করে ফ্লোরে পড়তে লাগল। নিশাত ব্যথায় মুখ কুঁচকে আঙুল চেপে ধরে আছে। নিশাতের আঙুল থেকে রক্ত পড়তে দেখে নাহওয়ান এগিয়ে এসে বলল,

"মা রক্ত?"

নিশাত জবাব না দিয়ে রক্ত বন্ধ করতে চাইল। যখন দেখল রক্ত পড়া কোনোভাবেই থামছে না তখন ছেলেকে বলল,

"বাবা আলনার নিচে একটা পুরাতন ওড়না আছে। নিয়ে আসো তো।"

নাহওয়ান মাথা দুলিয়ে দৌড়ে গিয়ে নিয়ে আসল। নিশাত ঝটপট একটু চা পাতি, সরিষার তেল দিয়ে বাম হাতের বুড়ো আঙুলে ওড়নার কিছু অংশ ছিঁড়ে পেঁচিয়ে বাঁধল। ব্যথায় জ্বলছে জায়গাটা। আজকে হাত, পাও অস্বাভাবিক রকম কাঁপছে। কি যে হয়েছে তার কিছুই বুঝতে পারছে না। বুকটা কেমন যেন করছে। হঠাৎ এমন অদ্ভুত লাগার কারণ কি? সে দুশ্চিন্তা বাদ দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করল সব যেন ঠিকঠাক থাকে। দোয়া, দুরুদ শেষে আবার কাজে মনোযোগী হলো।

______

জরুরী ভিত্তিতে মাহাবুব আলমের পরিবার স্কয়ার হাসপাতালে উপস্থিত হয়েছে। চাঁদপুর থেকে ঢাকায় আসতে ঘণ্টা চার লেগেছে। সেই বিকেল নাগাদ খবর পেয়েছিল এখন বাজে রাত সাড়ে নয়টা। তখন মাহাবুব আলম ফোন করে জেনেছেন, আহত ব্যক্তির ফোন থেকে এই নাম্বার পেয়ে কল দেয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই কাছের কেউ হবে দেখেই ফোনে নাম্বার ছিল। মাহবুব আলম আর একমুহুর্ত না দাঁড়িয়ে রওনা হয়েছেন। তবে মানহাকে আনার কোনো ইচ্ছে তাদের ছিল না। মেয়েটা এত অস্থির আর অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিল না এনে উপায় ছিল না। এই অবস্থায় বেশি চাপে রাখাও উচিত না। না নিয়ে গেলে চিল্লাচিল্লি করছিল। উত্তেজিত হয়ে প্রেশার বাড়িয়ে ফেলছিল। তাই নিরুপায় হয়ে সঙ্গে আনতে হয়েছে।

মাহাবুব আলম হাসপাতালে এসে ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তাদেরকে একটা কেবিনে নিয়ে আসা হলো। কেবিনে ঢুকে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। ইহাবের মুখে অক্সিজেন মাস্ক দেয়া। হাত, পায়ে ব্যান্ডেজ। মানহা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। শরীর ভেঙে আসতে চাইছে তার। পা বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়া শুরু করেছে। মানহার সেদিকে খেয়াল নেই ইহাবের কাছে আসতে নিলে মায়মুনা বেগম বাধা দিয়ে মাহাবুব আলমকে আতঙ্কিত গলায় বললেন,

"শুনছেন, রক্ত পড়ছে দেখুন।"

একজন নার্স চিৎকার করে বললেন,

"আশ্চর্য আপনারা প্রেগনেন্ট মাকে কেন এখানে এনেছেন?"

মাহদী রাগারাগি করা শুরু করল। দ্রুত ডাক্তার ডেকে আনতে বলল। নার্স ইমিডিয়েটলি মা ও শিশু স্বাস্থ্য ইউনিটে যোগাযোগ করলেন। মানহা ইহাবের দিকে চেয়েই রইল। নিজের ব্যথা থেকে ওই বেডে শুয়ে থাকা পাষণ্ড পুরুষটির অবস্থা তাকে সবচেয়ে বেশি ব্যথিত করছে। তাকে কিছু না বলে কিভাবে শুয়ে আছে দেখ? একটুও মায়া দয়া লাগেনি স্ত্রী আর অনাগত সন্তানের প্রতি? কিভাবে পারল তিন তিনটা দিন ফোন বন্ধ করে দূরে থাকতে? মানুষ এতটা স্বার্থপর কি করে হতে পারে? এখন কিভাবে পাষণ্ডের মতো শুয়ে আছে দেখ? মানহাকে দুজন নার্স ধরে স্ট্রেচারে শুইয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় মানহা ডেলিভারি পেইনের অসহ্য যন্ত্রণায় নাকি মনের তীব্র বেদনায় চিৎকার করে বলে উঠল,

"বাবা ঐ লোককে বইলো আমি মরে গেলে যেন আমার কবরের ত্রিসীমানায় না আসে। আমি কোনো পাষণ্ডের মুখ দেখতে চাইনা। আমার সন্তানকে যেন সে না ছোঁয়। স্বার্থপর, পাষণ্ড, অভদ্র লোক! তাকে জিজ্ঞেস কইরো কেন আমার মনে আঘাত দিয়েছে? কে পারমিশন দিয়েছে তাকে? তাকে বলিনি আমার কাছে সহিসালামতে ফিরে আসতে? কেন আসেনি জিজ্ঞেস কইরো।"

নার্সরা তাকে থামতে বললেও মানহাকে থামানো গেল না। সে উন্মাদ হয়ে গেছে। ছটফট করতে করতে পেট চেপে ধরল। দ্রুত মানহাকে ডেলিভারি রুমে শিফট করলেন। মানহা কেবিনে ঢোকার আগে বাবার হাত শক্ত করে চেপে ধরে অশ্রু ফেলতে ফেলতে বলল,

"আব্বা, উনি ফিরবে তো?"

মাহাবুব আলমের চোখ ছলছল করছে। একটু আগে কত কথা বলল এখন আবার স্বামীর খোঁজ করছে। তিনি নিজেকে শক্ত করে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

"ফিরবে। তুমি তোমার সন্তান নিয়ে সুস্থভাবে ফিরলেই সে ফিরবে। চিন্তা করে না আম্মা, আল্লাহকে ডাকো।"

মানহা সীমাহীন ব্যথায় ছটফট করতে করতে আর্তনাদ করা শুরু করেছে। গাইনী ডাক্তার এসে দ্রুত ডেলিভারি রুমে ঢুকলেন। মাহাবুব আলম, মায়মুনা বেগম, মাহদী সকলে চিন্তায় দম আটকে রেখেছে। মাহাবুব আলম হঠাৎ মনে করার ভঙ্গিতে ইমতিয়াজ ভুঁইয়াকে ইহাবের কথা জানালেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া পুত্র ও পুত্রবধূর অবস্থা শুনে আর এক মুহুর্ত দেরি না করে রওনা হয়েছেন।

______

----

নিশাত নাহওয়ানকে ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিচ্ছে। নাহওয়ান মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে খাচ্ছে। নিশাত ছেলেকে খাবার খাওয়ার আদব, দোয়া সব শিখাচ্ছে। নাহওয়ান মনোযোগী হয়ে মায়ের কথা শুনছে। নিশাত মুখে এক লোকমা দিয়ে বলল,

"খাবার খেতে হয় দস্তরখানা বিছিয়ে আদবের সহিত। বিসমিল্লাহ বলে খাবার মুখে তুলতে হয় এরপর আলহামদুলিল্লাহ বলে খাবার শেষ করতে হয়।"

নাহওয়ান মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। সেও এখন বিসমিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বলে খাবারের আদব রক্ষা করে। আজকে বাচ্চাটা প্রথমে খেতে চাচ্ছিল না মারওয়ানের সাথে খাবে বলে। কিন্তু রাত বেশি হবে বলে ছেলেকে আগে ভাগেই খাইয়ে দিচ্ছে নিশাত। সে মারওয়ানের পছন্দের গরুর গোশত কষা করেছে। লোকটা গরুর গোশত কষা খেতে চাচ্ছিল অনেকদিন থেকে। ছেলের মুখে লোকমা তুলে দেয়ার সময় ফোন বেজে উঠল তার। নিশাত উঠে দেখল মাহাবুব আলম ফোন করেছেন। নিশাত ফোন রিসিভ করে সালাম দিতে না দিতেই ওপাশ হতে মাহাবুব আলম উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,

"মা, আজাদ কি বাসায়?"

নিশাত বলল,

"নাতো আব্বা, কেন?"

"ফোন দিচ্ছি ধরছে না। বিকেলে ফোন দিলাম বেজেছে ঠিকই কিন্তু ধরেনি। সন্ধ্যার সময় দিয়ে দেখি ফোন বন্ধ। এখনো দিলাম ফোন বন্ধই বলছে।"

নিশাত অবাক হলো। মারওয়ান আগে ফোন বন্ধ রাখলেও ইদানিং রাখেনা। ফোন দিলেই পাওয়া যায় তাহলে ফোন বন্ধ বলছে কেন? সে বলল,

"আচ্ছা আব্বা আমি ফোন দিয়ে দেখি। টেনশন করবেন না।"

"শোন, আমরা ঢাকায়। জামাই এক্সিডেন্ট করেছে এজন্য এসেছি। আবার মানহার পেইনও শুরু হয়েছে। একটু আগে ডেলিভারি রুমে নেওয়া হয়েছে ওকে।"

"কি বলেন! আমাদের জানাননি কেন?"

"সেটাই তো জানাতে চাচ্ছিলাম, আজাদ ফোন ধরেনা তো।"

"আমি দেখছি আব্বা।"

নিশাত কল কেটে দ্রুত মারওয়ানের নাম্বারে ফোন দিল। ওপাশ থেকে সুরেলা গলায় কেউ একজন বলল,

"আপনার নাম্বারটি এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, অনুগ্রহ করে আবার চেষ্টা করুন।"

নিশাত ফোন কেটে আবারও ডায়াল করল। একই রেজাল্ট। তার বেশ চিন্তা হচ্ছে। ঘড়ির কাটা দশটা বেজে চল্লিশ মিনিটে। প্রায় এগারোটার পথে ঘড়ির কাটা। এখনো লোকটা বাসায়ও আসছে না আবার ফোনও বন্ধ বলছে। তার কেমন যেন অস্থির লাগছে। চিন্তিত হয়ে ছেলেকে ভাত খাইয়ে আবারও ফোনে ট্রাই করল কিন্তু ফলাফল শূন্যই। কি করবে বুঝতে না পেরে আবার জায়নামাজ বিছাতে লাগল। এশার নামাজ আগেই পড়েছে এখন আল্লাহর কাছে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে দোয়া করবে মানহা, ইহাব আর মারওয়ানের জন্য। কারো যেন খারাপ সংবাদ শুনতে না হয়। প্রত্যেকেই যেন সহিসালামতে থাকে।

_______

------

ওদিকে ঠিক রাত এগারোটার সময় ধরণীর বুকে আগমণ ঘটলো চেয়ারম্যান বাড়ির উত্তরসূরির। আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে জানান দিল তার আগমন ঘটেছে। সদ্য জন্মানো শিশুটি জানতেও পারল না তার পিতা, মাতা উভয়ই জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে প্রহর গুনছে। মানহার অতিরিক্ত ব্লিডিংয়ের কারণে তাকে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ তে ভর্তি করা হয়েছে। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া পুত্রবধূকে আইসিইউতে ভর্তি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। টাকা পয়সা নিয়ে চিন্তা না করলেও চলবে। তিনি ছেলে ও ছেলের বউয়ের হাসপাতালে ভর্তির সমস্ত খরচসহ যাবতীয় সবকিছু বহন করছেন।

মায়ের কিছু জটিলতার জন্য সন্তানকেও NICU তে শিফট করেছেন গাইনি ডাক্তার। শিশুটিকেও এক্সট্রা কেয়ারে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেহেতু ডেলিভারি ডেটের আগেই বাচ্চা পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হয়ে গেছে তাই কিছু এক্সট্রা কেয়ারে বেবিকে রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বাচ্চার শ্বাস প্রশ্বাস নিতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।

একজন নার্স এসে জানালেন পুত্র সন্তান হওয়ার সুসংবাদ। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া, উর্মি ভুঁইয়া, মাহাবুব আলম, মায়মুনা বেগম, মাহদী সকল একযোগে আলহামদুলিল্লাহ পড়লেন। নার্স এও বললেন বাচ্চাকে দুইদিন অবজারবেশনে রাখার জন্য NICU তে রাখা হয়েছে। মাহাবুব আলম উদ্বিগ্ন গলায় মেয়ের কথা জানতে চাইতেই নার্স জানালো মায়ের কন্ডিশন ভালো নয়। অতিরিক্ত রক্তপাত (Postpartum hemorrhage, PPH) এর কারণে তাকে ICU তে নেয়া হয়েছে। প্রার্থনা করতে বলে সে চলে গেল। মায়মুনা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়লেন। মাহদী মাকে আগলে নিল। বোনটার জন্য বুকটা তার ছিঁড়ে যাচ্ছে। ভগ্নি, ভগ্নিপতি উভয়ের অবস্থাই শোচনীয়।

দিনটা ১৭ই আগস্ট, ২০২৩ অর্থাৎ ২ ভাদ্র, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ। দীর্ঘ সাড়ে নয়মাসের তীব্র অপেক্ষার পর ইহাব ভুঁইয়া ও মানহা আফরিন দম্পত্তির কোল আলো করে ছোট্ট ভুঁইয়ার আগমন ঘটলেও কেউ তার আগমনে খুশি হতে পারল না। সন্তানের আগমনের প্রহর গোনা সেই হতভাগ্য পিতা, মাতা তাকে একবার ছুঁয়েও দেখতে পারল না।

________

--------

নিশাত আজকে অনেকক্ষণ মোনাজাত করল। কোনো খারাপ সংবাদ যেন না আসে এজন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে কায়মনোবাক্যে ফরিয়াদ জানালো। মোনাজাত শেষ হতে না হতেই ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরতেই মাহবুব আলম মানহার পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলেন কিন্তু মানহার অবস্থা শোচনীয় জানালেন। নিশাত কোনোদিন মাহাবুব আলমকে এতটা ভেঙে পড়তে দেখেনি। মেয়ে ও মেয়ে জামাইয়ের এই অবস্থায় তিনি বেশ ভেঙে পড়েছেন। কন্ঠনালী কাঁপছে তার। নিশাতেরও কান্না এসে গেল। আজকের দিনটা কেমন যেন শোকের লাগছে তার কাছে। চারপাশ থেকে শুধু খারাপ সংবাদই আসছে। তার উপর মারওয়ান ফোন ধরছে না। কতগুলো টেনশনে নিশাত অস্থির হয়ে আছে।

ফোন রাখতে না রাখতেই হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। নিশাত মারওয়ান ভেবে তড়িঘড়ি করে এল দরজা খুলতে। পিপহোলে চোখ রাখতেই মুখ চুপসে গেল তার। অচেনা দুজন লোক দাঁড়িয়ে। আবারও দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হতে নিশাত পুরোদস্তর খিমারে আবৃত হয়ে জিজ্ঞেস করল,

"কে?"

"জি এটা সাইফার সাহেবের বাসা না?"

"আপনি কে?"

"আমি সাইফার সাহেবের কলিগ। এজেন্ট নেওয়াজ শাবীর আর আমার সাথে আছেন এজেন্ট জিনান আদহাম। দয়া করে দরজাটা একটু খুলুন।"

নিশাত চিন্তিত হয়ে বলল,

"উনি তো বাসায় নেই।"

"জি আমরা তার বিষয়ে কথা বলার জন্যই এসেছিলাম।"

নিশাত দুরুদুরু বুকে খিমার দিয়ে মুখ ঢেকে দরজা খুলতেই দুজন লোক ঢুকে দরজা আটকে দিল। নিশাত যথাসম্ভব দুরত্বে দাঁড়িয়ে রইল তার বেশ ভয় করছে। এই বারোটার সময় এরা এখানে কেন এসেছে? দুজনের মধ্যে একজন বলল,

"ম্যাম আপনি ভয় পাবেন না। প্লিজ রিল্যাক্স থাকুন। আমি নেওয়াজ। সাইফার সাহেবকে কিছু লোক ধরে নিয়ে গেছেন। যতদূর আমরা খবর পেয়েছি তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর লোক।"

নিশাত উত্তেজিত হয়ে বলল,

"কি বলছেন এসব? তাকে কেন ধরে নিয়ে গেছে?"

"সে আর মুনতাজির সাহেব উভয়ই অনেকদিন ধরে সেই মন্ত্রীর গোপন তথ্য জোগাড় করেছিল। সেদিন ঐ মন্ত্রীর সকল অনৈতিকতা সংবাদপত্রে ছাপানো হলে সাইফার এবং মুনতাজির সাহেবকে তারা টার্গেট করে। আমাদের ধারণা মুনতাজির সাহেবকে এক্সিডেন্ট করানোর পেছনে সেই মন্ত্রীর হাত আছে। সাইফার সাহেবকে আজকে অফিসে সিভিল ড্রেসে এসে ইমারজেন্সি কথা বলে তুলে নিয়ে যায়। তাকে এত সহজে তারা ছাড়বে না। বারংবার সরকার পক্ষ থেকে নিষেধ করার পরেও সাইফার সাহেব সীমালংঘন করে তাদেরকে পাগলা কুকুর বানিয়ে দিয়েছে। নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে জনগণের পক্ষে ছিল আজারাক সাইফার। সরকারি লোক হয়েও তার স্পর্ধায় উপর মহল ক্ষিপ্ত ছিল। এতদিন ধরে এই দিনটার অপেক্ষাই তারা করছিল।"

নিশাত আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। দাঁড়ানো থেকে বসে গেল। মুখ দিয়ে কোনো টুশব্দ বের হচ্ছে না তার। কথায় আছে, 'অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর'। নিশাতের দশাও ঠিক তাই হয়েছে। জিনান এপর্যায়ে মুখ খুলল,

"প্লিজ ম্যাম শান্ত হন। আমরা দেখছি।"

দরজায় আবারও কড়া নাড়ার শব্দে জিনান গেট খুলে দিতেই দুজন মহিলা প্রবেশ করল। একজন ইনাবা আরেকজন ইরা। নিশাতকে এভাবে বসে থাকতে দেখে দুজন দ্রুত এসে তাকে ধরল। জিনান বলল,

"ইরা, রুবানা ম্যামকে দেখো। "

তারা মাথা নাড়াতেই জিনান এবং নেওয়াজ দ্রুত বেরিয়ে গেল। নিশাত একটা পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। আশেপাশের কোনো শব্দ তার শ্রবণেন্দ্রিয়ে ঢুকছে না। বুকের পাঁজর ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তবে কি সেদিনের স্বপ্ন সত্যি হওয়ার পথে? ইস্তেখারা সত্য হওয়ার দিন এসে পড়েছে? আচমকা নিশাত বাঁধনহারা কান্নায় ভেঙে পড়ল। ইরা তো তার এমন দশা দেখে কেঁদেই দিল। ইনাবা যতই শক্ত থাকতে চাইছে পারছে না। শুধুমাত্র প্রফেশনের জন্য নিজেকে শক্ত রাখছে। ভাই, ভাবির শোচনীয় অবস্থার কথাও জেনেছে। কিন্তু কাজ ফেলে যেতে পারেনি একবারও দেখতে। তার উপর সাইফার স্যারও নিখোঁজ। তারও বুক ভেঙে কান্নারা বেরিয়ে আসতে চাইছে। হঠাৎ নিশাত গগনবিদারী এক চিৎকার দিয়ে 'আল্লাহ' বলে ডেকে উঠল। যেন সেই আওয়াজ আরশে আজিম পর্যন্ত পৌঁছে গেল।

চলবে....

(আসসালামু আলাইকুম।)

(আসসালামু আলাইকুম।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন