#কয়েকটি_নক্ষত্র_নিঃশেষে
-তেজস্মিতা মুর্তজা
৩. (প্রথমাংশ)
অদ্রিজকে মাঝেমধ্যে দু'একদিন খুব স্বাভাবিক লাগে। মাঝেমধ্যেই তিনি নিজের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে মাঝরাতে হন্তদন্ত হয়ে বড়চাচার বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। সাত্তার সাহেব দরজা খুলে দেখেন অদ্রিজ দাঁড়িয়ে কেমন হাত-পা নেড়ে ছটফট করছে। বড়চাচাকে দেখামাত্র শান্ত হয়। নাফির কথা জিজ্ঞেস করে। তার ড্রাইভার জান হাতে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে সাত্তার সাহেবের সামনে এসে সালাম দিয়ে একগাদা খাবার হাতে ধরিয়ে দিয়ে আবারও সালাম দিয়ে চকচকে কালো গাড়িটি নিয়ে সুরসুর করে বেরিয়ে যায়।
গাড়িটি হলো মার্সিডিজ বেঞ্জ এস ক্লাস। তিন কোটি টাকার গাড়ি। গাড়ি কিনতে অদ্রিজ গেছিলেন জার্মানিতে। তিনি আসল মাল আসল জায়গা থেকে সংগ্রহ করতে পছন্দ করেন। কিন্তু প্রক্রিয়া কঠিন ও কেইস খাওয়ার ভয়ে কেবল কিছু কেমিক্যাল ও বিউটি প্রোডাক্ট হাতে কোরে ফিরে এসে গাড়ি কিনেছেন তেঁজগাও শোরুম থেকে। এ গাড়ি সাত্তার সাহেবের পুরোনো দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালে উনার গর্ব হবার কথা। কিন্তু হয় রাগ। মন চায় বন্দুক বের করে এনে ঠাস ঠাস করে করে কয়টা গুলি করে গ্লাসগুলো গুড়ো করে ফেলতে। তিনি একজন দেশসেবী হয়ে ভাতিজার এমন লাক্সারিয়াস ভাবসাব পছন্দ করতে পারেন না। যেখানে দেশের মানুষ কত ভোগান্তিতে আছে।
বড়চাচাকে পাশ কাটিয়ে বিরবির করে পা ফেলে অদ্রিজ গা চুলকাতে চুলকাতে ভেতরে গিয়ে স্থিরচিত্তে দাঁড়ান। বড়চাচা কড়া গলায় বলেন, “কী রে! এত রাতে আমার বাড়িতে এভাবে আততায়ীর মতো ঢুকিস। তোর সাহস কত, অদ্র? আবার এগুলো কী হ্যাঁ? ঘুষ এনেছিস, আমাকে ঘুষ দেয়া? কইরে বক্কার! আমার বন্দুকটা নিয়ে আয় তো।ʼʼ
অদ্রিজ কোনো প্রতিবাদ করেন না। স্বভাবমতো বড়চাচার মুখের দিকে স্থিরদৃষ্টে ক্ষণকাল চেয়ে থেকে দোতলায় উঠে যান। ও বাড়িতে দোতলায় তার জন্য একখানা কক্ষ বরাদ্দ। পরশু রাতেও এভাবেই সে এসে উঠেছেন বড়চাচার ঠিকানায়। এরপর এই দুটো দিন তাকে যথেষ্ট স্বাভাবিক লাগছিল। সবার সঙ্গে রসিকতা করেছেন, কথা বলেছেন, ঘুমিয়েছেন, সামান্য খেয়েছেনও দু'বেলা।
কিন্তু আজ রাত সাড়ে নয়টায় রুয়াদের ফ্ল্যাট থেকে বেরোনোর পর আবার ফিরলেন তার চিরচেনা রূপে। খুব দ্রুত মোড়ের ওপর থেকে একটা রিক্সা ধরে অ্যানিকে তুলে দিয়ে ভাড়া দিয়ে দিলেন রিক্সাওয়ালার হাতে।
অ্যানি শুধায়, “আপনি যাবেন না?ʼʼ
অদ্রিজ নিঃশব্দে মাথা নেড়ে কাউকে কল করেন। তাকে দেখতে লাগে নিম্নতাপমাত্রায় জমাটবদ্ধ বরফের মাফিক শীতল, স্থির। তখন অ্যানির ভেতরে এক ধরণের ভীতি কাজ করে। লাল হয়ে ওঠা চোখদুটো ল্যাম্পপোস্টের আলোয় অদ্ভূত ও ভৌতিক দেখায়। বলা হয়নি অদ্রিজের চোখের মণি সবুজাভ-নীল। ওই অনেকটা গ্রীকের এজিয়ান সাগরের জলের মাফিক। তার চোখের রঙের অফিসিয়াল নাম গ্রেয়িশ ব্লু-ও বলা যেতে পারে। চোখের লেন্স বড় স্বচ্ছ, আইরিশদের মতোন। রুয়াদের ধারণা অদ্রিজ একজন মিক্সড জেনেটিক্যাল হিউম্যান। তবে তার বেশিরভাগ ইউরোপীয়ান। সামান্য কিছু এশিয়ান থাকতে পারে। যেমন চুলগুলো বাদামী বা সোনালী না হয়ে কালো। কিন্তু নাকটা গ্রীকদের মতো খাঁড়া। এছাড়া উচ্চতা, শারীরিক গঠন সব আর্য বা আরিয়ানদের মতো নিখুঁত। তার কোনো পূর্বপুরুষ বা বহু আগের কোনো নারীর স্বামী হয়ত ডাচ বা পর্তুগীজ অথবা গ্রীকই হতে পারে। রুয়াদের খুব ইচ্ছে ছিল অদ্রিজকে নিয়ে একটা জেনেটিক রিসার্চ করার।
অ্যানি বুঝতে পারল অদ্রিজ আজ আর তাদের বাড়িতে ফিরবেন না। আবার কবে ফিরবেন কেউ জানে না। সে রিক্সা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ল কিছু কথা শোনানোর উদ্দেশে, “আপনি যাবেন না কেন? আর যদি যাবেন না আমার সঙ্গে, তাহলে রুয়াদের কথা মেনে নিয়ে চলে কেন এলেন? জবাব দিন। আপনার এই ভূতের মতো নীরবতা আমার সহ্য হয় না একদম। রুয়াদের কাছে তো আমি যাইনি। ওর আবদার আমি মানিনি। তাহলে এখন আমি কেন রুয়াদের ভাইয়ের কাছে যাব? আপনার মামার বাড়ি, আপনি যাবেন। চলুন আমার সঙ্গে...ʼʼ
অদ্রিজ মনোযোগ সহকারে শোনেন সবটা। তার একটা দোষ আছে। তিনি কারও কথা শোনার সময় অথবা নিজে বলার সময় একটানা সামনের মানুষটার চোখে চোখ স্থির রাখেন, প্রতিপক্ষ সেই চোখে চেয়ে আপনিই এক স্নায়ুবিক দূর্বলতায় হার মেনে যায়। কথা বলেন খুব ধীর-স্থির, নিচু গলায়। সেইমতো অদ্রিজের চোখে চোখ পড়তেই মূলত অ্যানি থেমে গেল। এত স্থির, গভীর সমুদ্রের মতো চোখে নজর মেলানো অসম্ভব লাগে।
অ্যানির অভিযোগ শেষ হতে হতে অদ্রিজের কালো গাড়িটি এসে দাঁড়ায়। নেমে দাঁড়ায় অদ্রিজের জীবন-মরণের সহায়ক সিধু। তার নাম সিদ্ধার্থ। অদ্রিজ ছোট করে ডাকেন সিধু। সিদ্ধার্থ তাই নিজেকে দুনিয়ার সামনেও পরিচয় দেয় সিধু বলে। সে আজ আগাগোড়া কেবল অদ্রিজের সিধু হয়ে গেছে। অদ্রিজের আলাদা ড্রাইভার আছে। কিন্তু সিধুর কাজ বহুমুখী। সে অদ্রিজের প্রয়োজনমতো সবকিছু। সে আকুল হয়ে ডেকে ওঠে, “স্যার!ʼʼ
অদ্রিজ বরাবরের মতো নিচু গলায় অ্যানিকে বলেন, “রিক্সায় উঠুন।ʼʼ
অ্যানি মুখ খুলতে উদ্যত হলে নিজের ঠোঁটে আঙুল চাপেন অদ্রিজ। ইশারা করেন রিক্সার দিকে। অদ্রিজের ঠান্ডা-সুস্থির অভিব্যক্তিকে এড়ানো যায় না। সেসময় সিদ্ধার্থ বলে, “স্যার, ম্যাডাম কোথায় যাবেন? আমারাই নামিয়ে দিতে পারতাম।ʼʼ
-“পারতাম না, সিধু। আমাদের কাজ আছে।ʼʼ
রিক্সা ছাড়লে অ্যানি পিছু ফিরে গলা বাড়িয়ে বলে, “আজ অন্তত চুল-দাড়ি কাটুন। নয়ত রাতের সফর, সবাই আপনাকে দেখে ডরাবে। ওদের বনমানুষ দেখার অভিজ্ঞতা নেই।ʼʼ
সিদ্ধার্থ হাসতে গিয়েও হাসে না। তার স্যারকে এসব বললে তার ভালো লাগে না। তার স্যার যেমনই হোক, সব ঠিকঠাক। সে স্যারকে জিজ্ঞেস করে, “আপনি ড্রাইভ করবেন, স্যার?ʼʼ
অদ্রিজ পেছনের সিটের ডোর খুলে বসতে বসতে বলেন, “তুমি করবে।ʼʼ
সিদ্ধার্থ বোঝে স্যারের শরীর ও মন বেজায় খারাপ। এখন দ্রুত স্যারকে অ্যাপার্টমেন্টে নিতে পারলে ভালো। কিন্তু স্যার কিছুই বলেননি। তাই অনেকটা পথ চলার পরেও সিধু জিজ্ঞেস করে না, স্যার আমরা কি অ্যাপার্টমেন্টে যাব? না কোথায়? স্যার নিজেই বলবেন। তাকে ততক্ষণ নাক বরাবর চলতে হবে।
অদ্রিজ কিছুক্ষণ পর আস্তে কোরে বলেন, “গাঙ্গিনাপাড় গাড়ি নাও।ʼʼ
সিদ্ধার্থ চমকে উঠে পেছন ফেরে, “স্যার!ʼʼ
অদ্রিজ কেবল ওপর-নিচ মাথা নাড়েন মৃদু। আর কিছু বলতে পারে না সিধু। নোংরা মেয়েলোকদের এলাকায় আবার যেতে হবে স্যারকে। বিশ্রী ব্যাপার। স্যার একবার বললেই সিধু একরাতে শখানেক মেয়ে এনে স্যারের অ্যাপার্টমেন্টে একত্র করতে পারে। তবু না সে স্যারের ছটফটানি সহ্য করতে পারে আর না পারে ওই ময়লা, ছোট মেয়েলোকদের এলাকায় স্যারের যাতায়াত।
অদ্রিজ সিটের সাথে গা মেলে দেন। সিধু দ্রুত একটা সিগারেট জ্বালিয়ে তার স্যারের হাতে ধরিয়ে দেয়। তা খুব ধীর-স্থিরভাবে টানতে টানতে তার স্যার মিশে যান সিটের মাঝে। মৃদু-মন্দ এসির হাওয়া, কড়া এয়ার ফ্রেশনার-ফ্রেগেন্স এর সাথে সিদ্ধার্থ ছাড়ে ক্লাসিক ইংরেজি গান–The sound of silence.
গা শিউরে ওঠা গানের সুর বলে ওঠে,
Hello darkness, my old friend
I've come to talk with you again.
Because a vision softly creeping
Ieft its seeds while i was sleeping....
—
তন্নি বেগম অবাক হলেন সাত্তার প্রধানের ছেলের বউকে দেখে। বিয়েতে শেষবার দেখেছিলেন। এরপর পাঁচ-সাত বছর কেটে গেছে। অ্যানিকে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে তিনি দশজনের সমপরিমাণ নাশতা আনলেন।
অ্যানি অবাক হয়ে বলল, “এত নাস্তা কেন, আন্টি? আমি এত খাব?ʼʼ
-“কথা না বলে খাও তো। প্রথমবার এলে আমাদের বাড়ি।ʼʼ
চারদিকে তাকাল অ্যানি, “আপনার মেয়েকে দেখছি না।ʼʼ
-“সে তার ছোট দাদির বাড়িতে। সেখানে তার দুই প্রাণপ্রিয় ফুঁপু আছে। আড্ডা দিচ্ছে। ডেকে আনি দাঁড়াও।ʼʼ
-“না না, থাক। ডাকতে হবে না। দেখা তো হবেই। ওর নাম যেন কী?ʼʼ কিছুটা চানাচুর তুলে নিলো অ্যানি।
-“নয়নতারা।ʼʼ
অ্যানির খুব পছন্দ হলো নাম। জিজ্ঞেস করল, “কে রেখেছিল নামটা?ʼʼ
তন্নি বেগমের মুখটা একটু ছোট হয়ে এলো। আস্তে কোরে শুধু বললেন, “আমার দেবর।ʼʼ
যাহোক, তন্নি বেগমের অ্যানিকে খুব পছন্দ হলো। চেহারাটা বড় মিষ্টি। কী সুন্দর করে শাড়ি পরেছে। শাড়ির রঙ খয়েরী সুতি-কাতান। দুহাতে দুটো স্বর্ণের রুলীবালা। চুলগুলো বেণী করা। বড়ই সুন্দর লাগছে দেখতে। কিন্তু গলার দিকে নজর গেলে উনার মাথায় আরেক চিন্তা এলো। ঠিক কন্ঠনালির ওপরে ছোট একখানা তিল অ্যানির। তন্নি বেগম ছোটবেলায় তাঁর দাদার কাছে শুনেছেন, যার গলার মাঝে তিল থাকে সে ফাঁসিতে মরে। অ্যানির হাস্যোজ্জ্বল সুন্দর মুখখানার দিকে তাকিয়ে অন্তর কেঁপে উঠল উনার। আচমকা এমন খেয়াল আসার মানে নেই। এসব কুসংস্কার, মিছে কথা।
তিনি বললেন, “তোমার ছেলে হয়েছে শুনেছিলাম। কতবড় হয়েছে?ʼʼ
-“পাঁচ বছর চলছে। এবার স্কুলে ভর্তি করেছি।ʼʼ
“ওমা, তাহলে আনলে না কেন ওকে?ʼʼ
-“আরেকদিন আনব। আজ একটু কাজে বেরিয়েছিলাম। আপনারা যাবেন। যান না যে!ʼʼ
ওয়াসিম সাহেব নামলেন। গৌরবর্ণ চেহারা। মুখের গড়নটা ঠিক রুয়াদের মতো। বয়স হলে রুয়াদ বড় ভাইয়ের মতো হবে দেখতে। ভীষণ অভিজাত চেহারার লম্বা, স্বাস্থবান গম্ভীর একজন মানুষ। বয়স পঁয়তাল্লিশের এপার-ওপার। সাদা ফতোয়া আর পাজামা পরে সিড়ি ভেঙে নেমে এলেন। অ্যানি উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিলো।
ওয়াসিম সাহেব মৃদু হেসে বসলেন সোফায়, “ভালো আছো, মা?ʼʼ
-“আলহামদুলিল্লাহ, আঙ্কেল।ʼʼ
হক সাহেবের ফুপাতো বোন অদ্রিজের মা। তার ভাসুরের ছেলের বউ অ্যানি। এছাড়া অদ্রিজের চাচা সাত্তার সাহেব উনার প্রাক্তন সিনিয়র। সাত্তার সাহেব ছিলেন সিনিয়র কর্নেল। তখন ওয়াসিম হক মেজর জোয়ান। অ্যানি যখন বিয়ে হয়ে আসে, ছয়-সাত বছর আগের কথা। তখন ছুটিতে এলে সাত্তার সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে মাঝেমধ্যে যেতেন ওয়াসিম হক। দেশ, রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা চলতো। তখন সাত্তার প্রধান সাহেব রিটায়ার করেছেন। অবশ্য তার কিছুদিন পরেই হক সাহেবও চাকরি ছাড়লেন।
অ্যানি এই ভারী মানুষটির সঙ্গে কীভাবে প্রসঙ্গ-কথা শুরু করবে বুঝতে পারছিল না। রুয়াদ বেশ ভালোভাবে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। কিছুক্ষণ উশখুশ করে বলল, “আঙ্কেল! একটা কথা রাখতে হবে আমার।ʼʼ
গম্ভীর মুখেও হাসলেন খানিকটা ওয়াসিম সাহেব, “কথা না শুনে প্রতিশ্রুতি দিলে বোকামি হবে না তো?ʼʼ
অ্যানি ভেতরে চুপসে গেল। তবু হেসে বলল, “খুব বেশি কিছু চাইব না। আপনি একটু সাহস করেই দেখুন না!ʼʼ
এবার হাসি প্রসারিত হলো তাঁর। অ্যানিকে পছন্দ হলো বেশ।
-“করলাম সাহস। কী কথা রাখতে হবে?ʼʼ
-“আপনি হয়ত জানেন, এলাকাভিত্তিক একটা আনন্দ ভ্রমণের আয়োজন করা হয়েছে। আমার দেবরেরা করেছে। সব ধরণের ইচ্ছুক মানুষ যাচ্ছে, কলেজের ছাত্ররাও আছে। কিন্তু সেখানেও নয়নতারাকে শামিল করা হয়নি, আপনার অনুমতি ছিল না তাই। আপনি অনুমতি দিলে নয়নতারাকে সঙ্গে নিয়ে যেতাম। একটু ঘুরে আসতো। মন ভালো হতো।ʼʼ
ওয়াসিম সাহেবের মনোভাব বোঝা গেল না। সোফার হাতলে হাত মেলে নীরব বসে আছেন। অ্যানির বড় অস্বস্তি হচ্ছিল।
ওয়াসিম সাহেব কিন্তু সরাসরি না বললেন না। বরং ভীষণ অভিজাত হাসি হেসে বললেন, “একা অতদূর ছাড়ি কী করে? ও তো রাস্তাটাও পার হতে জানে না একা। তারপর কোচিং, হোম টিউটর এসব রয়েছে।ʼʼ
অ্যানি এ পর্যায়ে একটু সাহস করল, “একা বলছেন কেন, আঙ্কেল? আমরা তো যাব সাথে, বিশেষ করে আমি যাব। ও গেলে ওর গোটা দায় আমার থাকবে।ʼʼ অ্যানির এক মুহুর্ত মনে হলো সে এই ভরিক্কি গোছের মানুষটার কাছে সে বেশি ভার নিয়ে নিচ্ছে। তবু বলল, “এছাড়া সব তো পাড়ার মানুষই। একটু ভরসা রাখুন। আমি তো আছিই।ʼʼ
খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন তিনি। অ্যানি বুঝল না উনার অভিব্যক্তি।
-“কবে যাচ্ছ তোমরা?ʼʼ
-“আগামীকাল রাতে, আঙ্কেল। পাড়ার সকলেই যাবে। নয়নতারা না গেলে একা খারাপ লাগবে নিশ্চয়ই!ʼʼ
অ্যানি তখনও দেখেনি মেয়েটাকে, তবু একটা টান অনুভব করছিল। হক সাহেবের প্রাক্তন সিনিয়র সাত্তার সাহেব, তার ওপর ফুঁপাতো বোনের ভাসুর। তাঁর ছেলের বউয়ের মুখের ওপর 'নাʼ বলা গেল না। হক সাহেব শুধু বললেন, “দেখি নয়নকে বলে। ও তো কিছু বলেনি আমাকে যাবার ব্যাপারে।ʼʼ
রাতে খাওয়া শেষে রুবিনা বেগম দুধ নিয়ে হাজির হলেন। নয়নতারার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। দাদুকে ইশারায় অনুরোধ করল, “প্লিজ দাদু, বাবার সামনে খেতে বোলো না। না বলতে পারব না।ʼʼ
সেই সুযোগটাই নিলেন রুবিনা বেগম। জোর করে দুধ গেলালেন নয়নতারাকে। নয়নতারার বমি পেতে লাগল। দুধ খেলে তার পেটে সমস্যা হয়। দাদুর দিকে কটমট করে তাকাল সে।
কথাটা তুললেন ওয়াসিম সাহেব। ভরা গলায় ডাকলেন, “নয়ন!ʼʼ
-“হু ,বাবা।ʼʼ
-“তুই জানিস, এলাকা থেকে সবাই আনন্দ ভ্রমণে যাচ্ছে?ʼʼ
নয়নতারা ভয় পেল। হঠাৎ-ই বাবা এ কথা কেন জিজ্ঞেস করবে? বাবার সামনে মিথ্যা বলার উপায় নেই। সে আস্তে কোরে বলল, “হ্যাঁ, আব... জানি।ʼʼ
-“যেতে চাস?ʼʼ
কথা জড়িয়ে এলো নয়নতারার, দ্রুত বলে উঠল, “না বাবা। নাঃ, না তো। আমার তো প্রাইভেট...ʼʼ
পুরো পরিবেশটাকে অবাক করে ওয়াসিম সাহেব একটু হেসে ফেললেন, “এত ভয় পেয়ে কী বোঝাতে চাস? আমি তোকে খুব চাপে মানুষ করছি, নয়ন? মনের কথা জানতে চাইছি আমি। মন চায় যেতে?ʼʼ
নয়নতারা বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে।
-“আজ কর্নেল সাহেবের ছেলের বউ এসেছিল। তার হঠাৎ-ই তোকে নিয়ে যাবার কথা মনে হলো কেন? তোর সঙ্গে পরিচয় আছে?ʼʼ
-“না। না তো। দেখাই হয়নি বোধহয় কখনও। কে?ʼʼ
ওয়াসিম সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “যেতে চাস?ʼʼ
নয়নতারা মাথা দুলালো দু'পাশে। মাথা নত হলো তার। চোখে পানি জমেছে, চোখ তুলে তাকানোর উপায় নেই। ওয়াসিম সাহেবের চোখদুটো গভীরভাবে ওকেই দেখছে।
ওয়াসিম সাহেব আবার বললেন, “যেতে চাস না?ʼʼ
নয়নতারা আবারও ডানে-বামে মাথা নেড়ে 'নাʼ বলল। ওয়াসিম সাহবে ক্ষণকাল চুপচাপ নয়নতারার দিকে তাকিয়ে থেকে রবিকে ডাকলেন। রবি হন্তদন্ত এসে উপস্থিত হলো, “জি, ভাইজান।ʼʼ
ওয়াসিম সাহেব চেয়ার ঠেলে উঠতে উঠতে বললেন, “কাল সকালে গিয়ে সাত্তার ভাইয়ের বাসায় চাঁদা দিয়ে আসবি। চাঁদা কত নয়নের মা?ʼʼ
তন্নি বেগম খুশি ও বিস্ময়ে কথা বলতে পারছিলেন না। ওয়াসিম সাহেব সিঁড়ি বেয়ে ওঠার পথে নয়নতারাকে বললেন, “কাল রাতে তৈরি থাকিস। বাসে তুলে দিয়ে আসব।ʼʼ
বাবা উঠে গেছে সিঁড়ি বেয়ে। নয়নতারার তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না। তার মনে হচ্ছিল, সে নিশ্চয়ই যাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ঘুমিয়ে গেছে এবং ঘুমের মাঝে এমন সুখের স্বপ্ন দেখছে!
তন্নি বেগম কপট রাগ্বত স্বরে বললেন, “বাপ-মেয়ে নাটক ভালোই জানিস তোরা। তোদের বংশই নাটকীয়।ʼʼ
রুবিনা বেগম কড়া স্বরে ধমক মারলেন, “তুমি চুপ করো তিন্নি। নয়ন!ʼʼ
-“কী? এখন আবার আবদার কোরো না তুমি যাবে। বুড়ি-টুড়ি নট এলাউড।ʼʼ নয়নতারা চোখ তুলে তাকিয়ে ভেজা চোখেই হেসে ফেলল।
তা দেখে রুবিনা বেগম নাক কুঁচকে আবার হেসে ফেললেন।
তিনি সকালে ছেলেকে বলেছেন, “কন্নেলের ছেলের বউ তো যাবেই। তার ওপর আবার আমার ননদের মেয়ের ভাসুর। কুটুমদের কথা ফেলতে নেই। এই, তোর মেয়ে কি প্রতিবন্ধী? আটকে রেখে মেয়ে মানুষ করে কি পাগল বানাতে চাস? যাক ও। ঘুরে আসুকগে। মানা করবি না।ʼʼ
—
মোহর বারান্দায় দইয়ের ভাড়ে কয়েকটি পাতাবাহার গাছ লাগিয়েছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে তার পাশে বসে রুয়াদ গভীর চোখে গাছগুলো দেখছিল। সকাল আটটার নরম রোদ রুয়াদের খোলা বুকের পশমে পড়ে জ্বলজ্বল করছে। এসব সময় রুয়াদকে মোহরের কাছে অপার্থিব মহাপুরুষ লাগে। ফর্সা চেহারায় জোড়ভ্রুর নিচে গভীর দুটো চোখে কীসের এক নিরাসক্তি! আর কেমনতরো এলোমেলো যুক্তি ও চিন্তাধারা যেন লোকটার! চেহারার দিকে তাকালে মনে হয় এত সুদর্শন পুরুষ সে আগে কখনোই দেখেনি। এবং এই পুরুষের পৌরুষ দর্শন করার পর তার চোখে আর কাউকে সুদর্শন লাগাও অসম্ভব। এখন এক হাঁটু উচু করে সেই হাঁটুতে হাত রেখে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুলিতে একাখানা রূপোর আংটি, পরনে কালো চেকের সাদা লুঙ্গি, কাঁধে তোয়ালে। ঘুম থেকে ওঠা তেলতেলে চেহারার সাথে এলোমেলো চুলে বসে পুরুষটির সম্ভ্রান্ত কণ্ঠস্বর শোনার লোভ সংবরণ করতে পারল না মোহর।
চোখে-মুখে বিরক্তি এনে বলে উঠল, “ওগুলো শুধু সাধারণ গাছ। ওদেরকে রেহাই দিন। সবকিছুর ভেতরে আপনার এই গভীর কিছু খোঁজার ব্যাপারটা আমার একদম ভালো লাগে না। ʼʼ
রুয়াদ সম্বিত ফিরে পেয়ে স্বভাবজাত হাসি হেসে মোহরকে মনে করিয়ে দিলো, “আমার কোনোকিছুই তোমার ভালো লাগে না।ʼʼ
মোহর ধন্য হলো। রুয়াদের সুদর্শন হাসি ও প্রশান্ত-গভীর পৌরুষ গলার স্বরটুকু যত্নে গিলে খিটখিটে গলায় বলল, “হ্যাঁ, ঠিক।ʼʼ তারপর একটু ভেবে বলল, “না। একটা বিষয় আছে বোধহয়।ʼʼ
রুয়াদ ঠোঁটের দুই কোণা উল্টে বাহবা দেবার ভঙ্গিতে বলল, “যেটা ভালো লাগে?ʼʼ
মোহর চোখ উল্টে বলল, “হ্যাঁ, আপনি অন্তত সিগারেট খান না।ʼʼ
রুয়াদ হাসল, “সিগারেট আমার একটুও সহ্য হয় না। এইদিক দিয়ে আমার আর তোমার খুব মিল, মোহ। আমরা দুজনই কট্টর সিগারেট হেটার্স।ʼʼ
মোহর স্বগোতক্তি করল, “যেমন গতকাল একজন...ছিঃ! যাইহোক, আমার সিগারেট খাওয়া লোককে মানুষ মনে হয় না।ʼʼ
-“তবে সিগারেট এই জগতে একমাত্র মানুষই খায়। আর কোনো প্রাণীর সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস নেই।ʼʼ
মোহরের কিছু মনে পড়েছে এমনভাবে ছিটকে উঠল সে, “আমি আপনার সাথে কথাই কেন বলছি?ʼʼ
রুয়াদ হাসল, “মানুষ সামাজিক জীব। একসঙ্গে থাকলে এমন টুকটাক কথা হয়। ও মনে নিও না।ʼʼ
মোহর ঝাড়া মেরে উঠে দাঁড়িয়েও একবার পিছু ফিরে তাকিয়ে মলিন হাসল। মনে মনে বলল, 'মনে নিয়ে ফেলব এই ভয়ে একটু বেশি সময় আপনাকে দিতে নারাজ। আপনি আমার পথিক, পথেই থাকুন। ভেতর ঘরে আপনাকে তোলার সাংঘাতিক ভুল আমি করব না। সত্যি করব না।ʼ
রুয়াদ ডেকে বলল, “তোমার প্রস্তুতি সেরে নাও। রাত এগারোটার টাইম দিয়েছে অদ্র। মেয়ে মানুষ হলো কচ্ছপের বিবর্তিত প্রজাতি।ʼʼ
মোহর কাঁথা ভাজ করতে করতে জানিয়ে দিলো, “জনাব খরগোশের বিবর্তিত প্রজাতি, আমরা কোথাও যাচ্ছি না।ʼʼ
রুয়াদ হেসে ফেলল, “আমার সঙ্গে বেড়াতে যেতে আপত্তি আছে?ʼʼ
-“হ্যাঁ, আপত্তি আছে। যদি খুব শখ থাকে তো বড়জোর আপনি আমাকে ব্রহ্মপুত্রের তীর অফার করতে পারেন। হয়ত কিছু সময় দিলাম আপনাকে। সেখানে সূর্যাস্ত দেখব, জলে হাঁটব, পা ভেজাবো। মাঝি কাকা বিনে পয়সায় নিলে নৌকায়ও চড়ব। আর আপনি ঝালমুড়ি খাওয়ালেই চলবে। ব্রহ্মপুত্র ছেড়ে সিলেট কোন দুঃখে?ʼʼ
রুয়াদ এবার হো হো করে হাসল।
আচমকা একটা আপত্তিকর কথা বলল মোহর, “এত হাসছেন কেন, কমরেড সাহেব?ʼʼ
কিন্তু রুয়াদ তা এড়িয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, “এই যে আমার কষ্ট হবে বলে এত আত্মত্যাগ করছো–যা এনে দিচ্ছি খাচ্ছ, মলিন কাপড় পরছো, বিলাসিতা নেই কোনো, আবার তাতে কোনোই অভিযোগ নেই। তোমার সরলতায় হাসি আসছে। বিদ্রোহ করো, বিদ্রোহ। আমি আছি পেছনে।ʼʼ
মোহর পেছন থেকে একবার রুয়াদকে দেখে নিয়ে নিজেও হাসল। কানের পেছনে চুল গুঁজে নিয়ে বলল, “আমি জন্মগত আশ্রিতা, রুয়াদ ইবতেহাজ সাহেব! জীবনে কখনও ভালো খাইনি, ভালো পরিনি, বিলাসিতার প্রশ্নও ওঠে না। ওটাই আমার অভ্যেস। বরং এখন বেশি পেলেই বদহজম হয়ে যেত। কিন্তু আপনি কি জানেন, আমি আপনার কাছে প্রথমবার এবং এমন একটি কিছু পেয়েছি যা আগে কখনোই পাইনি?ʼʼ
-“তাই নাকি? সেটা কী?ʼʼ
মোহর চট করে বলল, “তা ছাড়ুন। শুধু বলি, আপনি জানেন অনেকদিনের অনাহারীকে হুট করে অনেক খাবার দিলে তার পেটে সহ্য হয় না?ʼʼ
-“জানলাম।ʼʼ
-“বেশ। এবার গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে আসুন। আমার খিদে পেয়েছে। খাব।ʼʼ
রুয়াদ বাঁকা হেসে মাথা দোলায়, “এত সন্তুষ্টি ভালো না। ঠকে যাবে, ঠকে যাবে। তুমি জানো আমি কে? বড়ঘরের ছেলে। ধোঁকা খাবে।ʼʼ
মোহর বলল, “তাহলে সেবার নাহয় আমি কম্যুনিজমের ঝণ্ডা হাতে বেরোবো গরীব-বড়লোক শ্রেণীর বৈষম্যের আন্দোলনে। আপনি তখন বড়লোক জমিদারপুত্র, আমি হবো গরীব ভূমিদাসী।ʼʼ
রুয়াদ এবার ভ্রু কুঁচকে আচমকা একচোট পিছু ফিরে দেখে নিলো মোহরকে। কড়া ও গম্ভীর হয়ে তার স্বর, ধমকে উঠল, “তোমাকে এসব কে শিখিয়েছে? আমি কম্যুনিস্ট এটাই বা কে বলেছে? ছোট মানুষ বেশি কথা শিখেছ? কম্যুনিজম, কমরেড বোঝো?ʼʼ
মোহর হ্যাঁ-না কিছু না বলে শুধু হাসল। রুয়াদ একই সুরে বলল, “আমার রেজার আর তোমার বড় আয়নাটা এনে দাও। দাড়ি বেড়েছে।ʼʼ
মোহর বলে উঠল, “দাড়িছাড়া ব্যাটাছেলেকে আমার কাছে পশম ছিলা সাদা-হনুমানের মতো লাগে।ʼʼ
রুয়াদ নিজেই গিয়ে সরঞ্জাম আনার পথে মোহরকে একবার পেছন থেকে দেখে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে কানে কানে ফিসফিস করে বলল, “লাগতেই পারে। হনুমান মানুষেরই অরিজিন। আমার ওসব আবোল-তাবোল বই পড়ে বাজে বকা না শিখে ডারউইনের 'অরিজিন অফ স্পেসিসʼ পড়ো। কাজে দেবে।ʼʼ
এই পথে কখন টোকা মেরে মোহরের চুলের খোপাটা খুলে দিয়ে গেল, মোহর দৌড়েও ধরতে পারল না। একদৌড়ে বাথরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো রুয়াদ। বাইরে দরজায় দুটো দুম দুম করে লাত্থি মারল মোহর, “আপনি যা পড়েন, আমিও তাই তাই পড়ব। আমি জানতে চাই কীসব আজব কিসিমের বই পড়ে এমন মাথা খারাপ করেছেন।ʼʼ
রুয়াদ এতক্ষণে শান্ত হয়ে বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লুঙ্গির গিটে গোঁজা সিগারেটটা খুলে এনে আগুন জ্বালালো। পিপাসার্তের মতো প্রাণভরে ধোঁয়া গিলল। আয়নাতে একটা রুয়াদ ইবতেহাজকে দেখা যাচ্ছে। তার কি কিছুও পরিবর্তন হয়নি? কী পরিবর্তন? আরও বিগড়েছে না খানিক শুধরেছে? মাপকাঠি কে দায়ের করবে? তাকে আগে দেখা মানুষদের মাঝে তাকে আজ কে চেনে? আয়নাতে ধোঁয়াগুলো আঁছড়ে পড়ে কেমন ঝাপসা করে তুলছিল তার প্রতিচ্ছবিটাকে। একটাতে তৃষ্ণা মিটল না, আরেকটা জ্বালালো। সেটা টানতে টানতে ব্রাশে টুথপেস্ট মাখল। বাথরুমে থাকা এয়ার ফ্রেশনার মেরে সিগারেটের গন্ধ সরালো। সিগারেটের অবশিষ্টাংশ দুটো ফ্ল্যাশ করে ঘষে ঘষে দাঁত ব্রাশ করে শাওয়ারের নিচে দাঁড়াল।
চলবে...
[এর পরের অংশ লেখা আছে, এডিটিংয়ের কাজ শেষ হলে দিয়ে দেব। ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন। আচ্ছা, এটা আপনাদের ভালো লাগছে তো? আমি আসলে আমার ওপরে কোনো এক্সপেক্টেশন রাখছি না আপাতত। জানি না কেমন লিখছি কেমন হবে। আমার ধারণা আমি লিখতে ভুলে গেছি। বেশ ভয়ে আছি, কতটা কেমন লিখতে পারব এ নিয়ে। রাইটিং ব্লক না এসে যায়। অবশ্য মূলগল্পে ঢুকতে এখনও কিছুদূর বাকি। সবে ভূমিকা চলছে ও চরিত্র-পরিচিতি।
#কয়েকটি_নক্ষত্র_নিঃশেষে
-তেজস্মিতা মুর্তজা
৩. (বর্ধিতাংশ)
ময়মনসিংহ সিটির নতুন বাজারের আশপাশজুড়ে যতদূর দেখা যায়, সারিধরা হাইরাইজ বিল্ডিং দাঁড়িয়ে। অদ্রিজ প্রধানের অ্যাপার্টমেন্ট নয়নতলায়। তার বেলকনিতে দাঁড়ালে শহরের এধার-ওধার চোখে পড়ে।
এছাড়া শহরের কোল দিয়ে সরু বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র, আরেকদিকে মাসকান্দা বাসস্ট্যান্ডে থেমে থাকা সারি সারি বাস, অন্যদিকে সাপের মতো স্থির রেলপথ।
অদ্রিজের অ্যাপার্টমেন্টের বেডরুমের বেলকনি থেকে দূরে ঝাপসা ব্রহ্মপুত্র দেখা যায়। বেলকনি বলা ঠিক না। অদৃশ্য বিভাজনের মাধ্যমে তিনটা কাজ চলে, কিন্তু দেয়াল নেই। এক টুকরো বেডরুমের বেলকনি হিসেবে, আরেক বিভাজন ব্যায়ামাগার আর বাকিটুকু পাঠাগার বা গবেষণাগার– ইংরেজি বইয়ে ঠাসা তিনটা শেল্ফ, তার এককোণে একটি কাঁচের দরজা; ফ্রস্টেড গ্লাস-ডোর। ভেতরের কিছু দেখা যায় না। ঝাপসা।
সামনের তাকে এলোমেলো ঠেসে রাখা ইংরেজ লেখকদের গবেষণামূলক বই—
The science and practice of pharmacy
The pharmacological basis and therapeutics
The complete drug reference
Strategic Applications of Named Reactions in Organic Synthesis
The Chemistry of Mind-Altering Drugs
Vogel's Textbook of Practical Organic Chemistry
Clark's Analysis of Drugs and Poisons
The Anarchist Cookbook
শেল্ফগুলোর মাঝখানে মাঝারি একটা কাচের টেবিল ও দুটো চেয়ার। বইগুলোর কিছু একাডেমিক, কিছু বিদেশ থেকে সংগ্রহ করা, কিছু বা অনৈতিক–কালোবাজার থেকে বহুদামে কেনা।
সকালবেলা অদ্রিজের ব্যায়ামে সাহায্য করার সঙ্গী হিসেবে আসে রুশো। কিন্তু আজ এলো না। অদ্রিজের মাংসপেশী কামড়াতে লাগল। সকাল নয়টার দিকে মোবাইলে কল এলো। মোট ছয়বার। অদ্রিজ উপুর হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে শুনলেন সেই আওয়াজ। শরীরটা চঞ্চল লাগছে, কোনো ভারী খাটুনি করা দরকার। চোখ খুলে সে দেখতে পেলেন তিনি এখন একটি কারাগারের মেঝেতে পড়ে আছেন। সামনে লোহার শিক। নোংরা, বদ্ধ জায়গা, ভ্যাপসা গন্ধ। আশ্চর্য ঘটনা হলো কারাগারের ভেতরে কল বাজছে। কোন কয়েদী মোবাইল নিয়ে কারাবাসে এসেছে?
খানিক পর কারাগারের শিক মিলিয়ে ওটা অফ-হোয়াইট রঙের ডিস্টেম্পার দেয়াল-রঙ হয়ে গেল। তিনি টের পেলেন বুকের নিচের নোংরা মেঝেটা নরম হয়ে উঠেছে, একদম বিছানার মতো। মোবাইলের রিংটোনটা বালিশের কোণায় বাজছে। শব্দ তার কাছে অসহনীয়। ফোনটা তুলে আঁছাড় মারতে গিয়ে টের পেলেন কাফনের মতো সাদা বেডশিটের ওপর লাল লাল ঘন তরলের দাগ। সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসে ছাদের দিকে মুখ তুলে ধরলেন। নাকে আঙুল ছোঁয়ালে আঙুলের ডগা ভরে আসল রক্তে। বেলকনি আর রুমের মাঝে দাঁড়ানো কাচের দেয়ালের পর্দাটা বাতাসে উড়ছে, সূর্যরশ্মি এসে মুখে পড়ছে। মুখের চামড়া জ্বলছে, চোখ ঝলসে যাবার মতো যন্ত্রণা হচ্ছে। চোখ বুজে চোখের ওপর হাতের তালু চেপে ধরে অন্য হাতে বেডসাইড টেবিল থেকে টিস্যু ছিঁড়ে নিতে গেলে কিছু পড়ে গেল–মেঝেতে পড়ে কাচের শিশি ঝনঝন করে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি নাকে টিস্যু ঠেসে ধরে বসে রইলেন ছাদের দিকে মুখ তুলে। ব্লাড প্রেশার অনিয়ন্ত্রণে, এটা রাতেই টের পাওয়া যাচ্ছিল।
তার বালিশের পাশে উল্টো হয়ে পড়ে থাকা ল্যাপটপ, দুটো নোটবুক, কয়েকটা রঙ-বেরঙের কলম ও হাইলাইটার, নোটবুকে হিজিবিজি লেখা। কীসব হিসেব, কিছু ফর্মূলা ইত্যাদি। এসির বাতাসে এখন গা চিরবির করতে লাগল। রিমোট তুলে এসি বন্ধ করলেন। আবার ফোন বাজছে। সিধুর কল। তিনি ফোনটা বালিশের নিচে চাপা দিলেন। রুমজুড়ে ঝাঁজাল এক গন্ধ গমগম করছে। হাতঘড়িটা এখনও হাতেই রয়েছে, আবার ডানহাতের কব্জিতে অ্যালার্জি-ড্রাগের অ্যান্টিহিস্টামিন স্ট্রিপ। শরীরে আজকাল খুব বেশি র্যাশ উঠতে দেখা যাচ্ছে। এটা না নিয়ে শুলে শরীর ছিঁড়ে যায়।
আবার কল বেজে কেটে গেল। মিসকল। এই ধরণের কল তার কাছে একমাত্র একজনেরই আসতে পারে। সেই একজনের নাম খয়রাতি জনাব রুয়াদ ইবতেহাজ হক। আল্লাহর ভোরে উঠে মোরগর মতো কক ক কর ক করার অভ্যাস তার পুরোনো। ভোর সকালে ঘুম থেকে উঠে গাছের ভেতরটার রুহ্, মগজ, বৃক্ক, পাকস্থলি খুঁজে বেড়ানো রুয়াদ ইবতেহাজের স্বভাব। ভোরে উঠে কোন বনে-বাদাড়ে গিয়ে শিশিরভেজা ঘাসের দিকে ঘণ্টাখানেক চেয়ে থেকে ঘাসের আন্তর্জাতিক, ভূতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ইতিহাস উদ্ধার করা পাতি-বিজ্ঞানী সে।
অদ্রিজ কল ব্যাক করলেন, রুয়াদ ঘোষনা করল, “বাজারে আসবি একটু পর। কাজ আছে।ʼʼ
অদ্রিজ সাফ সাফ মানা করে দিলেন, “প্রশ্নই ওঠে না।ʼʼ
রুয়াদ বললেন, “হ্যাঁ তাহলে এই কথাই রইল বেলা এগারোটার দিকে বাজারে দেখা হচ্ছে। হাজার পাঁচেক টাকা আনিস, মার্কেট করব।ʼʼ
অদ্রিজ বলে উঠলেন, “সর বাঁড়া!ʼʼ
“ভালো বলেছিস। শোন মনে মনে জানতে চাস মার্কেট করব আমি তো তুই টাকা দিবি কেন, তো আমার উত্তর–সফরে যাচ্ছি তোর উদ্যোগে, মার্কেট সেই উপলক্ষে। তো টাকা কে দেবে? নিশ্চয় তুই!ʼʼ
কথা শেষ করেই কল কেটে দিয়েছে রুয়াদ। অদ্রিজ মাথা চেপে বসে রইলেন। এই ছেলেটা ছোটবেলা থেকে জ্বালিয়ে মারছে। কোনো একদিন খানিকটা সালফিউরিক এসিড জড়ো করে দুধে রুটি চুবানোর মতো এটাকে চুবিয়ে মেরে ফেললে কেমন হয়?
ঘড়িতে সাড়ে ন'টা। স্ট্রিপ ছিঁড়ে, ঘড়ি খুলে বিছানায় রেখে সে যায় ওয়াশরুমে। বেসিনে হাত দিয়ে শরীরের ভর ঠেকিয়ে আয়নাতে চেয়ে থাকেন। নালি কাটলে যেমন পানি বয়ে যায় তিরতির করে, নাক দিয়ে রক্ত আসছে ওভাবে। ধীরে ধীরে রক্ত ঠোঁট, এরপর থুতনি পেরিয়ে গলা ছেড়ে বুকের সাদা গেঞ্জিতে ঠেকছে। গেঞ্জিটা খুলে ফেললেন তিনি। চোখ টকটকে লাল, এত ওষুধ, ব্যায়াম ও ব্যবস্থা গ্রহণের পরেও শরীর শেষ হয়ে যাচ্ছে, মুখের গড়ন ভাঙা ভাঙা। চুল-দাড়ি অস্বাভাবিক বেড়েছে, ত্বকের রঙ কালো হয়ে গেছে।
তিনি রুমে ফিরে সিধুকে কল করে বললেন, “আসার সময় জেন্টস পার্লার থেকে কাউকে ধরে এনো। রাত আটটায়।ʼʼ
সিধু বলল, “অদ্র স্যার, আটটায়? আমাদের গাড়িই তো এগারোটায়। দেরি হয়ে যাবে না, স্যার?ʼʼ
“হবে না। ওদিকে সব রেডি? সবাইকে যার যার জায়গামতো ফিট করে দিও। কোথাও সামান্য ভুল হওয়া যাবে না।ʼʼ
কল কেটে তিনি কিচেনে গিয়ে কফি বানান। কফি তার পছন্দ না। এমনিতেই জীবনটা ঘুমহীন, কফি খেলে আরও ঘুম হয় না। কফি বানিয়ে তাতে সে কিছুটা গুড়ো পাউডার মেশান। এটা ছাড়া মনঃসংযোগ আসছে না বাস্তবতার ওপর। বারবার সব গুলিয়ে যাচ্ছে, হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। বেলকনির সোফাতে বসে কফির ধোঁয়া উঠতে দিয়ে প্রেশারের টেবলেট মুখে ফেলে সামান্য পানি গিলে অ্যানিকে কল করেন।
অ্যানি নওফেলকে বের করে দিয়ে নাফিকে খাওয়াতে বসেছিল। তাকে সেলুনে নিয়ে যাওয়া হবে। অ্যানি ছাড়া কেউ পারবে না চুল কাটাতে, সবাইকে নাস্তানাবুদ করার ডিগ্রি আছে নাফির, ভয় শুধু অ্যানিকে। অ্যানি কল রিসিভ করে বলল, “আপনি তো বাদুরের মতো দিনভর ঘুমান। আজ কী ব্যাপার?ʼʼ
“রুয়াদের ভাতিজির কোনো খবর?ʼʼ
“ইশ রে! আপনাকে কল করার কথা মনে নেই। সেই কোন সকালে ওদের বাড়ির লোক এসে চাঁদা দিয়ে গেছে। ভালো একটা সিট রাখতে বলেছে।ʼʼ
অদ্রিজ কল কেটে শাওয়ারে যান। ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে থাকে শাওয়ারের নিচে। মাথায় ঠান্ডা পানি পড়লে প্রেশার নামতে পারে।
এগারোটার দিকে চূড়ান্তভাবে মাংসপেশীতে অসহ্য কামড়ানি শুরু হলো। একটা টি-শার্ট ও থ্রি কোয়ার্টার প্যান্টের সাথে সে পরলেন হাইবুট। কানে হেডফোন ও বিশাল এক সানগ্লাস চোখে বাঁধিয়ে বেরিয়ে পড়লেন অ্যাপার্টমেন্ট থেকে। রাস্তায় কেউ কেউ বলতে পারে টিশার্ট ও টাউজারের সাথে লেদার-হাইবুট বেমানান। তাতে অদ্রিজের যায়-আসে না। বেমানান শব্দটাই মূলত বেমানান এই জগতে। তাপমাত্রা আফ্রিকা মহাদেশের সাথে টক্কর দিচ্ছে। তিনি একটু হেঁটে, একটু দৌড়ে দৌড়ে বাজারের মধ্যে আসে।
একটু ফাঁকা জায়গা পেয়ে দাঁড়িয়ে হাপ ছাড়েন। দৌঁড়ানোর পরিশ্রমের ফলে শরীরটা ভালো লাগছে। কিন্তু রোদে তার শরীরে সেনসেশন হয়। তার যেহেতু শরীর ঘামে না, বরং শরীর রোদের সবটুকু তাপ শোষন করে শরীরটাকে তাপোৎপদী সিস্টেমের মতো করে তোলে। হিটারের মতো জ্বলতে থাকে চামড়া, হিটস্ট্রোক টাইপ ব্যাপার। এখন বমি হবে। এখন তার মনে হতে লাগল চারপাশে অনেককিছু ঘটছে। খুব মারাত্মক কিছু। ভয়াবহ একটা পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে সে। ভয় করতে লাগল তার। পাগলের মতো এদিক-ওদিক চাইল। সবকিছু ঝাপসা, শুধু মনে হতে লাগল সে কোনো নরকে দাঁড়িয়ে আছে। তার চারপাশটা খুব দ্রুত ভয়াবহ ঘটনায় জড়িয়ে যেতে লাগল। গা তিরতির করে কাঁপতে লাগল। খচখচ করে গা চুলকাতে লাগলেন তিনি। তিনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন তা মনে করতে পারলেন না কিছুক্ষণ। এরপর আচমকা শরীরটা ঝাঁকি মেরে উঠে গলগল করে বমি করে ফেললেন।
সঙ্গে সঙ্গে এক নারীকণ্ঠ চেঁচিয়ে উঠল, “ছিঃ! এই কেরে শয়তান? আজব লোক তো! বাচ্চা নাকি রাস্তার মধ্যে বমি করতেছে! সরে আয় নয়ন। ছিঃ ছিঃ! দেখি কী হাল হলো তোর?ʼʼ
অদ্রিজ চোখ ঝাপটালেন বারবার দেখার জন্য। তার মাথার ভেতরে এখন ভোঁতা শব্দ শোনা যাচ্ছে। কারের ভেতরে এসি চললে যেমন গা গুলিয়ে আসে ওমন। হেডফোন খুলে ফেলে দিলেন রাস্তার ওপর। ওটা ভেঙে গেল।
আরেকটা মেয়ে বলল, “থামো ফুপি! লোকটা অসুস্থ মনে হচ্ছে। দেখি দাঁড়াও। এই যে, আপনি ঠিক আছেন? কেমন লাগছে আপনার? দেখুন আমার স্কার্টটার কী অবস্থা করেছেন! মাথা ঘুরছে আপনার? অসুস্থ আপনি?ʼʼ
এই কণ্ঠস্বর ও বাক্যগুলো ওষুধের মতো সুখদায়ক লাগল অদ্রিজের কাছে। মেয়েটা কেন রেগে গিয়ে দু'চার কথা ঝারল না? বরং নরম পা ফেলে কাছে এলো। সাথে সাথে অদ্রিজের নাকে ফ্লোরাল পারফিউমের সুঘ্রাণ ঢুকল। কিন্তু অ্যালার্জির কারণে মেয়েটা কাছে আসতেই সে দুম করে এক হাঁচি দিলেন তিনি। এমনিতেই তার কণ্ঠস্বর বড় ভারী, তার ওপর ছেলে মানুষের বোমব্লাস্টিক হাঁচি, মেয়েটা কেঁপে উঠে পিছিয়ে গেল। সামান্য একটু সংকুচিত হলো, কিন্তু সরে গেল না। তার হালকা নীল স্কার্টের নিচের ভাগ দুর্গন্ধ বমিতে ভরে গেছে। সাদা কুর্তি হাটুর সামান্য উপর অবধি, তাতেও ছিটা লেগেছে। বড় বিশ্রী লাগছে দেখতে। অদ্রিজ কেমন অদ্ভুত কণ্ঠে ক্ষমা চেয়ে উঠল, “আমি দুঃখিত, মিস! আমি সরি, আই, আই...আ এক্সট্রিমলি সরি। আমি দেখিনি, হঠাৎ-ই পেট গুলিয়ে এলো...ʼʼ
কণ্ঠস্বর ভারী, মোটা, পৌরুষ। মেয়েটি স্বভাবতই সচকিত হলো। তখনই পেছন থেকে আগের মেয়েটা সরু গলায় চেঁচাল, “এই নয়ন! চলে আয় তো! গা ভরে বমি করে আবার মহানুভবতা দেখানো হচ্ছে! মাতাল হবে কোথাকার কোন। আয়, বাড়ি গিয়ে সাবান মেখে গোসল করবি আয়।ʼʼ
অদ্রিজ নিঃশব্দে আড়চোখে মেয়েটিকে দেখলেন। তার মনে হলো রনচন্ডি মেয়েটাকে সে চেনে। মনে পড়ল এটা তার নানুর ছোট ভাইয়ের মেয়ে ঋতু। এখনও মুখরা ও ঝগড়ুটেই রয়ে গেছে। কিন্তু যে মেয়েটা তার খুব কাছে এগিয়ে এসে স্নেহভরে তাকে দেখছে এই অপরূপা কিশোরী কে?
কিশোরীর কণ্ঠস্বর এত সুন্দর, চেহারা, চুল, পোশাক! অদ্রিজ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলেন না। তার শরীরের ত্বক খচখচ করছে, গলা শুকিয়ে গেছে। দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে রাস্তার কিনারে বসে পড়লেন। নোংরা ড্রেনের এক ফাঁকে মুখ নিচু করে আবার ভকভক করে বমি করে ফেললেন। শরীর টলমল করে উঠল তার।
ঋতু চিনল না লোকটাকে। আনোয়ারা ফুপুর নাতি যে! আনোয়ারা ফুপুর মেয়ে মাসুরা মারা যাবার পর আনোয়ারা ফুপু ভুলেই গেছেন তার মেয়ের একটা ছেলে-সন্তান ছিল, রুয়াদ ভাইয়ার দোসর, অনাথ ছেলেটা–অদ্রিজ প্রধান। এই অদ্রিজের কাছ থেকে তার নানুর জন্য এখনও প্রতিমাসে একগাদা করে টাকা আসে শুধু ওষুধ খাওয়ার নাম করে। ফুপু আয়েস করে খরচা করে তা, সেই ফাঁকে নাতির খোঁজ করার খেয়াল থাকে না। সেতু এসব স্বার্থপরতার কারণেই বড়ফুপুকে একটুও পছন্দ করে না। কিন্তু ঋতুও আজ মাসুরা আপার ছেলেটাকে চিনতে পারল না। তাদের বংশের বয়সের গোলমালে বোনের ছেলেরা তার চেয়ে বয়সে বড়। সে নাক কুঁচকে দাঁড়িয়ে রইল দূরে।
ওদিকে নয়নতারা দৌঁড়ে গিয়ে লোকটার কাঁধ চেপে ধরল, “কী করছেন? ড্রেনে পড়ে যাবেন তো! সরে আসুন, আপনার শরীর টলছে। প্লিজ সরে আসুন। আমি ধরছি আপনাকে। রাস্তার ওপর বমি করুন। এই অসুস্থ অবস্থায় এভাবে কেউ রাস্তায় বেরোয়? উঠতে পারবেন? কোথায় থাকেন আপনি?ʼʼ
অদ্রিজের নাকে আবারও ঠেকল সেই পারফিউমের গন্ধ। মেয়েটা বুঝতে পারছে না কেন, অদ্রিজকে এভাবে ছোঁয়া ঠিক না। মেয়েটার কি ক্ষতির ভয় নেই? অদ্রিজ নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পকেট থেকে এক টুকরো টিস্যু বের করে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “স্কার্ট মুছে নাও! নোংরা হয়ে গেছে।ʼʼ
“সে চিন্তা আপনার না করলেও হচ্ছে আপাতত। ও তেমন কিছু না। আপনার অবস্থা দেখুন। একা চলতে পারবেন?ʼʼ
নয়নতারা অবাক হলো। এরকম অবস্থায় এত স্বাভাবিকভাবে উল্টো তার সেবায় মনোযোগী লোকটা! অদ্ভূত সুন্দর চেহারা, কিন্তু চুল-দাড়ির জঞ্জালে অস্বাভাবিক দেখতে লাগছে। লোকটা কোনো প্রশ্নের জবাব দেন না, প্রতিবাদ করেন না। রোদে শরীরের ত্বক লাল হয়ে উঠেছে। নয়নতারা দৌঁড়ে গিয়ে ঋতুর কাছ থেকে পানির বোতল আনল। তন্নি বেগম সবসময় নয়নতারার সঙ্গে বোতল ভরে পানি দেন।
নয়নতারা যখন অদ্রিজের সামনে থেকে স্কার্ট উচিয়ে ধরে দৌড়ে গেল, মনে হলো কোনো শুভ্রপরী ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। পায়ে ফ্ল্যাট অলংকারের মতো সাজোয়া জুতো, তার ওপর ফর্সা পায়ের গোঁড়ালি ছোঁয়া রূপালি নূপুর ঝনঝন আওয়াজ তুলে বাজতে বাজতে এগিয়ে গেল। অদ্রিজ চোখ বুজলেন। নীল জর্জেয়াটের ওড়নাটা পেছনে পরীর ডানার মতো উড়ে উড়ে সঙ্গ দিচ্ছে মেয়েটিকে, চুলের আধখোলা বেণীতে ফুলের মতো ক্লিপ, সাদা টপ-কুর্তা, ফর্সা নরম হাতে বাচ্চাদের মতোন স্বর্ণালি চিকন চূড়। এত অভিজাত সাজ! নক্ষত্রের মতোন উজ্জল! অদ্রিজের কেমন হিংসে হলো। এ তো ডিজনির পরীদের রাজকন্যার মতোন সাজ-চেহারা! তিনি অনীহায় চোখ সরালেন।
পরীদের রাজকন্যা ফিরে এসে বোতল এগিয়ে দিয়ে বলল, “নিন, পানি। একটু পানি খান। ভালো লাগবে আপনার। বমি করলে গলা শুকিয়ে যায়। মুখটাও ধুয়ে নিন। মাথায় একটু পানি বসিয়ে দেব? রোদে মাথা গরম হলে বমি হতে পারে। এভাবে একা বাড়ি ফিরতে পারবেন?ʼʼ
অদ্রিজ চুপচাপ বোতলটা হাতে নিলেন। চুলগুলো হাতের আঙুল দ্বারা ব্যাকব্রাশ করতে করতে একটু ভালো করে দেখলেন সুন্দরীকে। এত নমনীয়তা, মানবিকতা! কে শিখিয়েছে? এ তো ওয়াসিম মামার মেয়ে মনে হচ্ছে, তা হক সাহেব মেয়েকে এত ভালো করে মানুষ করছেন? সামান্য ঠোঁট ত্যাড়া করে হাসলেন তিনি। চিৎকার করে গাইল তার ভেতরসত্ত্বা—
কবিতা......
তুমি স্বপ্নচারিণী হয়ে খবর নিও না
কবিতা, এই নিশাচর আমায় ভেবো না সুখের মোহনা...
গানটা মনে মনে গাইবার পর অদ্রিজ উজ্জ্বল নক্ষত্রকন্যার একটি নাম পেলেন—স্বপ্নচারিণী। টিস্যু নিয়ে বসে পড়লেন নয়নতারার পায়ের কাছে। নয়নতারা অপ্রস্তুত হয়ে পিছু হাঁটতে গেলে তার ডান হাত ধরে ফেললেন অদ্রিজ, “চুপচাপ দাঁড়াও।ʼʼ
এত শান্ত, ঠান্ডা ও ভারী কণ্ঠস্বর নয়নতারা আগে কখনো শোনেনি। লোকটাকে তার কি চেনা চেনা লাগল! সে বুঝতে পারছিল না। সে ইতস্তত করে বলে উঠল, “আপনি এভাবে আমার পায়ের কাছে বসেছেন...ʼʼ
জুতো কিনতে গেলে দোকানিরা চট করে পা ধরে জুতো পরাতে নেয়। তন্নি বেগম শিখিয়েছেন এটা কখনোই করতে দেয়া যাবে না। এটা অসম্মান। তারা বিক্রেতা, তাদের কাছে জুতো পরিয়ে নেবার এখতেয়ার কারও নেই, তারা দিতে চাইলেও না। নয়নতারা অস্বস্তিতে বুদ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে আর বাঁধা দেবে না, তবু লোকটা হাত ধরেই রাখলেন। পরে ছাড়লেন, যখন স্কার্টটা আরেকহাত দিয়ে ধরতে হলো। এত শীতল, একরোখা-চুপচাপ মানুষকে কিছু বলারও পেল না নয়নতারা। অদ্রিজ টিস্যু দিয়ে নয়নতারার স্কার্টের নিম্নভাগ যথাসম্ভব পরিষ্কার করলেন। রাস্তার মধ্যে একটি কিশোরীর পায়ের কাছে বসা এক বিশালাকায় পুরুষ, দৃশ্যটা অদ্ভুত ও বিরল।
অদ্রিজের যখন মনে হলো বমি পরিষ্কার হয়েছে সে উঠে দাঁড়ালেন। নয়নতারা অস্বস্তি কাটিয়ে চঞ্চল কণ্ঠে বলল, “আপনি বাড়ি ফিরে রেস্ট করবেন। এখন আর বাইরে থাকবেন না। নয়ত আমি বলছি আপনি আজকেই একটা কঠিন অসুখে পড়বেন, মিলিয়ে নেবেন।ʼʼ
অদ্রিজ আস্তে কোরে বললেন, “তাই?ʼʼ
“অবশ্যই তাই! নিজের অবস্থা বোঝেন না?ʼʼ
“কিছু হবে না।ʼʼ
“বললাম তো মিলিয়ে নেবেন।ʼʼ
“তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে, তুমি মিলিয়ে নিও।ʼʼ
লোকটা চলে গেলেন। নয়নতারা বিস্মিত চোখে লোকটাকে চলে যেতে দেখল।
দেখা হবে?
কেনই বা আর কবে?
ঋতুর কাছে গিয়ে বলল, “তুমি একটাবার এগিয়ে গেলে না! লোকটা পড়ে গেলে কী হতো?ʼʼ
ঋতু গোমরা মুখে বলল, “আমি তোর মতো মাদার তেরেসা নই যে রোডে-ঘাটে যার-তার সেবায় লেগে পড়ব। শোন নয়ন, তোর স্বভাব-চরিত্র সুন্দর। কিন্তু এই সুন্দর স্বভাবের জন্য তুই একদিন মারা পড়বি দেখিস। দেখি এদিকে আয়। কী বাল মুছে দিয়ে গেল সেই তালগাছ, তান্ত্রিকবাবা দেখি। তার পবিত্র বমি এখনও যে ঝকমক করছে স্কার্টে।ʼʼ
নয়নতারা মুখে হাত দিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল, “তান্ত্রিকবাবা?ʼʼ
“হাসবি না, নয়ন। গা জ্বলছে আমার। এগিয়ে আয় দেখি।ʼʼ
“আরে ওটা স্টাইল ফুঁপি আজকালকার। উলফ কাটিং না কী যেন বলে।ʼʼ
ঋতু মুখ ভেঙচে বলল, “উলফ কাটিং! বেশি পেকেছিস?তোর মায়ের পায়ে ধরা খালি বাকি রেখে তোকে মার্কেটে এনেছি। ওয়াসিম ভাই জানলে আমায় কবর দেবে। সেই মার্কেটে নাই ঢুকতে কোথাকার কোন দামড়া-দরবেশ এসে পোশাক নষ্ট করে গেল। তুই তার উকালতি করলে এক চড়ে দাঁত ফেলে দেব।ʼʼ
ঋতু বসে পড়ল নয়নতারার সামনে। ব্যাগ থেকে এক মুঠো টিস্যু বের করে স্কার্টটা মুছল। তার মনে হলো কাজ হচ্ছে না।
“নয়ন! পানির বোতল দে তো। কোন দোকানের চাল খেয়ে বমি করেছে কে জানে!ʼʼ
নয়নতারার তখন মনে পড়ল, “যাহ্, ফুপি! বোতল তো তোমার তান্ত্রিকবাবা নিয়ে গেছে।ʼʼ
ঋতু কটমট করে উঠে দাঁড়িয়ে এক গাট্টা মারল কপালে, “এত গর্দভ তুই! শুধু বোতল কেন দিলি, টাকা-পয়সার পার্সটাও সঙ্গে দিয়ে দিতি আল্লাহর নামে! তান্ত্রিক খেয়ে ফুঁ মেরে দোয়া করতো।ʼʼ
নয়নতারা হাসতে হাসতে গলা জড়িয়ে ধরল ঋতুর, “কই তুমি তখন তো বাঁধা দাওনি! তুমিও কিন্তু মনে মনে চাইছিলে অসুস্থ লোকটাকে সাহায্য করা হোক।ʼʼ
ঋতু গলে যাবার পাত্রী নয়। সে বলল, “তুই এত সুন্দর হয়ে রাস্তায় বেরোবি না, নয়ন। মানুষের নজর লাগে। আজ দেখ কেমন পোশাক নষ্ট হলো! কবে জানি তোর কী ক্ষতি হয়ে যায়।ʼʼ
নয়নতারার হাত ভালোমতো চেপে ধরে গম্ভীর মুখে রাস্তা পার হয়ে অন্যপথে হাঁটা ধরল ঋতু। নয়নতারা বলল, “আমরা বাজারে যাব না?ʼʼ
“যাব। তার আগে যাব তোদের আনন্দমোহনের সামনে।ʼʼ
“কেন?ʼʼ
“ইজটিজিং করতে।ʼʼ
নয়নতারা হেসে উঠল, “ছেলেদেরকে না মেয়েদেরকে? শোনো আমাদের কলেজের ছেলেরা দেখতে খুব বিশ্রী।ʼʼ
“চুপ!পারাপারের সেতুটাকে তুলে আনি, চল। ও একা একা বাড়ি থাকবে সেটা হচ্ছে না। ওকে বেঁধে হলেও সঙ্গে নেব আমি।ʼʼ
দুজন রিক্সা নিলো আনন্দমোহন কলেজের উদ্দেশ্যে। সেতুকে তুলে আনতে। সেতু কেনাকাটায় পটু।
—
রুয়াদ ও অদ্রিজ ময়মনসিংহ জিলা ইস্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। এরপর দুজন ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হলো আনন্দমোহন কলেজে। রুয়াদরা আবার বংশগতভাবে আনন্দমোহনের শিক্ষার্থী। ওদিকে রুয়াদের দাদার দাদা অবধি, এদিকে রুয়াদের বাপ-চাচা, ভাই, সে নিজে, সেতু নয়নতারা সব আনন্দমোহনে।
অদ্রিজের বাপের বাড়ি ত্রিশাল, আরেক উপজেলা। বড়চাচা পড়ালেখার সুবাদে ময়মনসিংহ শহরে বসবাস করতে করতে এখানেই স্থায়ী হয়েছিলেন। ছোট থেকে অদ্রিজও পড়লেখার খাতিরে চাচার বাড়িতেই স্থায়ী হয়ে গেল একরকম। কলেজও এখানেই। ময়মনসিংহ ছাড়তে হলো কলেজ শেষে। ব্রাইট স্টুডেন্ট হিসেবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োলজি-বেসড টপ সাবজেক্ট ফার্মেসি নিয়ে পড়ার সুযোগ পেল। ঘাড়ত্যাড়া রুয়াদ জেলা ছেড়ে কোত্থাও গেল না। তার যা মেধা অনায়াসে বুয়েটে পড়তে পারতো। সে ভর্তি হলো বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে, বায়োটেকনোলজি বিভাগে। রয়ে গেল নিজের শহরেই।
কিছুদিন আগে সে নিজের প্রাক্তন স্কুলে অস্থায়ী শিক্ষকের চাকরি পেয়েছে। জিলা স্কুলের নাইন-টেনের ছেলেরা তার পাগলা ভক্ত। পারলে তারা সব শিক্ষক বাদ দিয়ে সারাদিন রুয়াদের ক্লাস করে। রুয়াদের পড়ানোর ধরণ অন্যজাতের। সে যেদিন আবৃতবীজী উদ্ভিদের গঠন পড়াবে, সেদিন সে কোত্থেকে একটা আবৃতবীজী উদ্ভিদ জোগাড় করে নিয়ে ক্লাসে আসে। যেদিন পেঁয়াজের লম্বচ্ছেদ, প্রস্থচ্ছেদ পড়াতে হবে সে সেদিন পেঁয়াজ কাটা স্লাইস নিয়ে উপস্থিত। একবার সে গাছের জিন ও ডিএনএ-কে মানুষে ইমপ্ল্যান্ট করার গবেষণায়ও হাত দিয়েছিল। যাতে গাছের যেমন ডালপালা ভেঙে গেলে বা কেটে ফেললে সেখান থেকে মুকূল অঙ্কুরিত হয়, মানুষেরও তেমন হতে পারে। মানুষের একটা হাত কেটে গেলে সেখান থেকে ধীরে ধীরে একটা হাত গজাবে।
কিন্তু আরেকদিকে বিষয়টা ক্যান্সার পর্যায়ে চলে যায়। মানুষের শরীরে নতুন হাত গজাতে গেলে মাংসপেশীর অস্বাভাবিক কোষ বিভাজন দরকার, যা ক্যান্সার। এছাড়া গাছের জিন মানুষে স্থাপন করা সম্ভব নয়। তার এক্সপেরিমেন্ট সেখানেই থামাতে হলো।
তার এইসব কথাবার্তা ও যুক্তি-চিন্তাধারা মন্ত্রের মতো শোনে ছাত্ররা।
শুধু জিলা স্কুলই না, আশপাশের স্কুল, কলেজের ইন্টার পড়ুয়া কিশোরগুলোর ওপরও রুয়াদের কালাজাদুর প্রভাব পড়েছে–এ নিয়ে স্কুলে গুঞ্জন চলছে। রুয়াদ ওদেরকে উল্টো-পাল্টা মতাদর্শ শেখাচ্ছে। চঞ্চল বয়সের ছেলেরা এভাবে রুয়াদের মতো বামপন্থীর অনুসারী হলে এ ভারী চিন্তার কথা। সারাদিন সবগুলো 'রুয়াদ রুয়াদʼ জিকির টানে। মাজারে যেমন দয়াল বাবার জিকির চলে ওরকম।
রুয়াদ এই জীবনে কোনোদিন সঠিক সময়ে স্কুলে যায়নি। তার শিক্ষকেরা অতিষ্ট ছিলেন। সে তিন পিরিয়ড পর স্কুলে গিয়ে দারোয়ানের সাথে ঝামেলা বাঁধাতো। এখন যারা সিনিয়র শিক্ষক, তাঁরা ছিলেন রুয়াদের তৎকালীন শিক্ষক। এখন সে শিক্ষক হবার পরেও স্কুলে যায় অসময়ে। তার পিরিয়ডের সময় হলে ছাত্ররা তার অপেক্ষায় বসে থাকে। রুয়াদ স্যার কখন আসবে ক্লাস নেবে। সিনিয়র শিক্ষকেরা এসে ছাত্রদেরকে সান্ত্বণা দিয়ে যায়–'আমরা জীবনে ওকে ক্লাসে পাইনি, তোরা পেলে আমাদের সাথে অবিচার হতো। বসে থাক, বেক্কল চলে আসবে কোনো এক সময়।ʼ
কখন যেন স্কুল থেকে তাকে লাত্থি মেরে বের করে দেয়া হবে। ছাত্ররা এ নিয়ে চিন্তায় আছে। তারা ঠিক করেছে রুয়াদ স্যারের গলা জড়িয়ে ধরে অনুরোধ করবে 'রুয়াদ স্যার, আপনি একটু নিয়মিত হোন অথবা চাকরিটা পারমানেন্ট করুন, নয়ত আপনাকে কিক মারা হবে। আমরা আপনাকে হারাতে চাই না।ʼ
ভার্সিটি লাইফে সে একটা ভাইরাল কোচিং সেন্টার চালাতো। কোচিং সেন্টারের নাম ছিল—'আয়ুর্বেদীক কোচিং সেন্টার।ʼ অভিভাবকেরা কেউ কেউ ভাবতেন রুয়াদ যেহেতু গাছের বিজ্ঞানী, সে বোধহয় কোনো গাছ-গাছরা দিয়ে কোনো আশ্চর্যরকমের আয়ুর্বেদীক ওষুধ বানিয়ে ছাত্রদেরকে খাইয়ে পড়ায় মনোযোগী করে। কিন্তু রুয়াদ নামটা দিয়েছিল গভীর উদ্দেশ্যে। আয়ুর্বেদ সংস্কৃত শব্দ। অর্থ হলো জীবনবিদ্যা। সে একজন খাঁটি জীববিজ্ঞানী, ভবিষ্যতে সে গাছ আর মানুষকে এক গ্লাসে গুলিয়ে শরবত বানানোর মতো দুনিয়া উল্টানো কোনো আবিষ্কার করবে, এমন সম্ভাবনা আছে। কোচিং সেন্টারের নাম সেই অনুসারে।
তার নামের এত জোর ছিল যে ছাত্রদের জায়গা দেয়া মুশকিল হতো। ছাত্ররা তাকে পছন্দ করে, এমনকি সে যে শিক্ষকদেরকে জ্বালিয়ে মেরেছে, তারাও তাকে অপছন্দ করতে পারে না। এই অপছন্দ না করতে পারা নিয়ে শিক্ষকেরা প্রায়ই ডিপ্রেশনে থাকেন। এসব কারণে তাকে কিক মারা হচ্ছে না।
তার অনিয়মও অজাতের। তার পিরিয়ড ছিল চতুর্থ পিরিয়ড, সে হেলেদুলে দুপুরবেলা স্কুলে গিয়ে দেখছে ষষ্ঠ পিরিয়ড চলছে। অবিবাহিতা সুন্দরী ম্যাডাম বাংলা ব্যাকরণের সমাস পড়াচ্ছেন। সমাসের মধ্যে তিনি তার জানা সংস্কৃত ভাষা ছাত্রদেরকে বলে শোনাচ্ছেন–'তাম্ অহম্ অনুরক্ষামি, তাম্ বিনা ন জীবিষ্যামি। কৃপয়া মাম্ ত্যজ মা। যদ গচ্ছসি, অহম্ বিষং পিবেয়ম্।ʼ
অর্থ হলো–'আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না। দয়া করে আমায় ছেড়ে যেও না। যদি এমন করো, আমি বিষ খাব।ʼ
ছাত্ররা ধরে নিলো ম্যাডাম বয়সকালে প্রেমে দিওয়ানী হয়ে কাউকে এই কথা বলেছিলেন। তারা হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। কিন্তু দরজার সামনে রুয়াদকে দেখে সব হিপনোটাইজ রোগীর মতো হলো, তাদের চোখের মণি গোল গোল ঘুরতে লাগল। সাদা ধবধবে পাঞ্জাবী-পাজামা পরা আর্মিদের মতো উচ্চতাওয়ালা রুয়াদ চোখে রিমলেস চিকন সাদা চশমা পরে দাঁড়িয়ে আছে হাসিমুখে। তার বাঁ হাতের তর্জনী আঙুলিতে একটা আংটি আছে। সেটার দুটো স্তর, উপরের স্তরটা নিচের স্তরের ওপর ঘোরে। রুয়াদের কাজ হলো সারাদিন সেটাকে বৃদ্ধি আঙুলি দিয়ে ঘুরানো। এখনও তা করছে।
তাকে দেখে ম্যাডাম পড়ানো থামাল। রুয়াদ দাঁত বের করে হেসে বলল, “আপনাকে আজকে অত্যাধিক সুন্দর লাগছে, ম্যাডাম মণসা কৈরালা জি।
ম্যাডাম কঠিন গলায় বলল, “আপনি রোজ এই কথা বলেন। তাও আবার ভুলভাল নামে ডেকে। আমার নাম মোনালিসা। মণিসা কৈরালা না। কৈরালা সঞ্জয় দত্তের বউয়ের পদবী আর মণসা হলো সাপের দেবী।ʼʼ
“তাহলে তো ঠিকই বলেছি।ʼʼ
ম্যাডাম সরু গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “কী বললেন আপনি?ʼʼ
রুয়াদ হাসল, “ভুল বুঝবেন না। সুন্দরীরা ভুল বুঝলে দুঃখটা বেশি লাগে। ঘটনা হলো মোনালিসাও তো আর আপনার সঠিক নাম না। বানানো নাম। আমিও দিলাম একটা বানানো নাম। এভাবে যে কেউ-ই আপনাকে নিজের মতো বানিয়ে যা তা ডাকতে পারে। ঠিক না?ʼʼ
ম্যাডাম রেগে কটমট করে বললেন, “কে বলেছে আপনাকে এটা আমার বানানো নাম?ʼʼ
রুয়াদ হেসে বলল, “জি আমি বলছি। মোনালিসা খুব চর্চার বস্তু হওয়ায় মেয়েরা তার নামে নিজের নাম রাখতে খুবই পছন্দ করে। কিন্তু বাপ-মা তো এসব বোঝে না। তাই নিজেরাই কাস্টমাইজ করে নেয়। ঠিক বলেছি না?ʼʼ
“আদবের সঙ্গে কথা বলুন।ʼʼ
“আদব কে? তার সাথে আমি কেন কথা বলতে যাব? তার সাথে আমার চেনা-জানা, লেনা-দেনাটা কীসের? অপরিচিত কারও সঙ্গে আমি কথা বলতে পারব না।ʼʼ
ম্যাডাম রাগে কাঁপতে লাগল। রুয়াদ তা দেখে চমৎকার করে হেসে হাত নেড়ে নেড়ে মন্ত্র পাঠ করবার ভঙ্গিতে সংস্কৃত ভাষায় আওড়াল, “রাগবেন না ম্যাডাম। কেননা ভগবদ্গীতায় বলা আছে—ক্রোধাৎ ভবতি সম্মোহঃ। সম্মোহাৎ স্মৃতিভ্রংশঃ। স্মৃতিভ্রংশাত্ বুদ্ধিনাশঃ। বুদ্ধিনাশাত্ প্র্যণশ্যতি।ʼʼ
ম্যাডাম ঝারা মেরে নিজের ব্যাগ নিয়ে চলে গেলেন শ্রেণীকক্ষ থেকে। রুয়াদ হেসে ভিতরে ঢুকে সবাইকে বলল, “গুড মর্ণিং কমরেডস!ʼʼ
রুয়াদ স্যার তাদেরকে কখনও ছাত্র নয়, ডাকে কমরেডস! লোকে শেখায় কমরেডস মানে খারাপ কিছু। বামপন্থী রাজনৈতিক দলের কর্মীরা একে-অপরকে ডাকে। রুয়াদ স্যার বলে কমরেড মানে সঙ্গী, বন্ধু। যারা এক পথে, এক উদ্দেশ্যে উৎসর্গপ্রাণ হয়ে হাঁটছে। ওরা এই ডাকে পাগল হয়ে যায়। গোটা দুনিয়া কমরেড ডাকের বিরুদ্ধে গেলেও ওরা রুয়াদ স্যারের কমরেড হতে জান-পরাণ দিয়ে প্রস্তুত! স্যার যখন কমরেডস ডাকে, ওদের মন চায় একটাবার স্যারকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরতে। এমন অদ্ভুত শোনাতে পারে একটা ডাক?
সবাই বলল, “স্যার গুড মর্ণিং? এখন বাজে বেলা দুটো স্যার।
“যতক্ষণ আকাশে সূর্য থাকবে, ততক্ষণ সকাল। সূর্য ডুবলে রাত। দুনিয়াতে বেলা মোট দুটো, বুঝলে?ʼʼ
সবাই রুয়াদ স্যারের যুক্তিতে ঘাঁড় কাত করে। রুয়াদ স্যার যুক্তি ছাড়া কথা বলে না। সে ভুল কথা বলতেই পারে না।
রুয়াদের ডাই-হার্ট ভক্ত ছাত্র নগেন দাঁড়িয়ে বলল, “স্যার আপনি এখন ক্লাস নেবেন? এখন তো মণসা থুক্কু মোনালিসা ম্যাডামের ক্লাস, স্যার।ʼʼ
“ম্যাডাম তো চলে গেল। তো খগেন তুই কি চাইছিস ক্লাসটা খালি যাক। না। এটা ঠিক না। তিনি চলে গেলেন, সময়টা আমি কাজে লাগাই।ʼʼ
“স্যার আমার নাম নগেন। আপনি সবসময় খগেন বলেন। সবাই আমাকে 'খগেন মালʼ বলে রাগায়।ʼʼ
“ঠিক আছে খগেন, আর ভুল হবে না। আমি তোর নাম মনে রাখব।ʼʼ
নগেন দুঃখে হতবিহল হয়ে পড়ল। রুয়াদ স্যার ক্লাসের অনেককের এমন চমৎকার নাম দিয়েছে। যেমন ক্লাসের ক্যাপ্টেনের নাম রক্তিম। স্যার তাকে ডাকে 'লাল্টুʼ। এটা একটা নাম হলো?
রুয়াদ স্যারকে জিজ্ঞেস করা হলো, “স্যার ওকে লাল্টু কেন ডাকেন?ʼʼ
রুয়াদ স্যার বলল, “রক্ত লাল। তাই ডাকি লাল্টু।ʼʼ
“তো স্যার রক্ত লাল তো 'লালʼ নামে ডাকতেন। লাল্টু কেন?ʼʼ
“ওর নাম কি রক্ত? ওর নাম রক্তিম। ওর নামে রক্তের শেষে যেমন ম আছে, আমার লালের শেষে টু। কিলিয়ার?ʼʼ
সবাই রুয়াদ স্যারের যুক্তিতে মুগ্ধ। তারা ১২০ ডিগ্রি কোণে মাথা কাত করে সম্মতি জানাল।
আজকের ঘটনার ক্ষেত্রেও তারা জানে রুয়াদ স্যার ইচ্ছা করে মোনালিসা ম্যাডামকে ক্ষেপিয়ে ক্লাসছাড়া করল, যাতে সে ক্লাস নিতে পারে। এরকম কাজ সে প্রায়ই করে। নিজের সময়ে ক্লাসে না এসে অন্য টিচারদের ক্লাসের সময় এসে এ ধরণের কাণ্ড বাঁধায়। এখন কোনো বড় স্যার ব্যাপারটা জানতে আসলে উল্টো ম্যাডামের দোষ হবে। কারণ রুয়াদ স্যার বলবে, ম্যাডাম ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে গেছে। আমি সুহৃদয় টিচার বলে সেই সময়টুকুও পড়ালেখা করিয়ে পুষিয়ে দিচ্ছি ছাত্রদেরকে। ম্যাডাম বড় স্যারের কাছে কট খাবেন উল্টো। কারণ রুয়াদের যুক্তির কাছে দুনিয়া পানি।
রুয়াদ লম্বা দেহটা নিয়ে বোর্ডের সামনে দাঁড়াল। সবাই উৎসুক হয়ে চেয়ে আছে রুয়াদ স্যার কী বলবে। রুয়াদ স্যার কখনও চেয়ারে বসে না। তার নাকি অস্বস্তি হয়। সে যখন এই ক্লাসের ছাত্র ছিল তার শিক্ষকেরা এসে ওই চেয়ারে বসতেন, চেয়ারটাকে অসামান্য কিছু মনে হতো। কেউ ওখানে বসা অসম্ভব একটা ব্যাপার। সেই বদ্ধ ধারণা ও অস্বস্তিটা এখনও রয়ে গেছে। টিচারদের চেয়ারে বসে না। সে চেয়ারের হেলান দেবার পিঠ-বোর্ডের ওপর কনুই ঠেকিয়ে ঝুঁকে দাঁড়ায়, এটা তার স্বভাব।
আজও পাঞ্জাবীর হাতা গুটিয়ে চশমাটা খুলে টেবিলে রেখে ওভাবে দাঁড়িয়ে বলল, “তোদেরকে যদি আমি এখন বলি আজ স্কুলের ছুটির পর সোজা বাড়ি গিয়ে ব্যাগ-প্যাক গুছিয়ে নিতে, আমরা রাত এগারোটায় সফরে বেরোবো...ʼʼ
ব্যাস রুয়াদ এটুকুই উচ্চারণ করতে পারল, ততক্ষণে গোটা ক্লাস এমনভাবে চেঁচিয়ে উঠল যেমন ফুটবল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসা দর্শকেরা লাফিয়ে ওঠে পছন্দের দল গোল করলে।
সবাই আনন্দে মনেমনে কেঁদে ফেলে, মনের রুমাল দিয়ে চোখ মুছে নিয়ে সমস্বরে জিজ্ঞেস করল, “কোথায়, স্যার? আমরা কোথায় যাচ্ছি?ʼʼ
“সিলেট। ধর কমবেশি পাঁচদিনের সফর। ক্লাস টেন পাঁচদিন স্কুল থেকে গায়েব থাকবে।ʼʼ
বেশি আনন্দে ক্লাসরুম বাকহারা প্রতিবন্ধী হয়ে গেল। কিন্তু এই যে এই রুয়াদ স্যারের দোষ! রাত এগারোটায় গাড়ি আর এখন এসে কেউ এই খবর দেয়? আগে দেয়া যেত না? বাড়িতে ম্যানেজ করবারও তো একটা ব্যাপার আছে নাকি? রুয়াদ স্যারকে কে বোঝাবে?
তবু ওরা সবাই মনে মনে কাঁদো কাঁদো গলায় গেয়ে উঠল–
এভাবেই দিন-রাত চলে যাক
মন আমাদের বারবার বলে যাক
রুয়াদ স্যারকে ভালোবেসে
কোনো ভুল করিনি আমরা...
রুয়াদ স্যার ডেকে বলল, “বাড়িতে কী বলবি?ʼʼ ভ্রু নাচিয়ে হাসল রুয়াদ স্যার, “তোরা জানিস কী বলবি।ʼʼ সাথে স্যার চট করে চোখ মারল ওদের উদ্দেশ্যে, সাথে ঠোঁটের স্মিত হাসি ফ্রি।
ছাত্রদের হাসি উপচে পড়ে রুয়াদ হাসলে। ওদের ধারণা জিলা স্কুলে মেয়েরা না থেকে ভালোই হয়েছে। নয়ত এই যে রুয়াদ স্যার হাসলে, ক্লাসে ফটাফট মেয়েদের লাশ পড়ে যেত। এত সুদর্শন আর চমৎকার লোকটাকে ছেড়ে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে কলেজে যেতেই মন সায় দেয় না তাদের। তাদের সবার এখন একটাই স্বপ্ন স্কুল ফাইনাল শেষে আনন্দমোহনে ভর্তি হবার। কারণ ওখানে রুয়াদ স্যার পড়তো।
কেউ কেউ চিন্তিত হয়ে বলল, “স্যার চাঁদা....ʼʼ
“কিচ্ছু না। কেউ চাইলে পকেটে কানাকড়ি না নিলেও চলবে। একটা মালদার পার্টি আছে। তোরা খালি বাইর হয়ে চলে আসবি রাত এগারোটায়। বাসে সিট নাকি খালি যাচ্ছে, এও হয়? যাহ্ বাড়ি গিয়ে গুডবয় সাবান মেখে গোসল করে বের হয়ে আয় সময়মতো।ʼʼ
নগেন বলল, “স্যার ওটা লাইফবয় সাবান।ʼʼ
“চুপ থাকো খগেন। লাইফবয় যুক্তিহীন ও অর্থহীন নাম। জীবনছেলে? এটা আবার কী নাম? গুডবয় সাবান মানে ভালো ছেলে সাবান। ভালো ছেলেরা গুডবয় সাবান দিয়ে গোসল করবে অথবা কেউ গুডবয় সাবান দিয়ে গোসল করলে ভালো ছেলে হয়ে যাবে। এই নামে যুক্তি ও অর্থ দুটোই আছে, বুঝলে?ʼʼ
তারা আবার মুগ্ধ হলো রুয়াদ স্যারের চিন্তা-ধারার ওপর।
সবার মনে মনে পরিকল্পনা আঁটা শেষ, এখন তারা বাড়িতে গিয়ে বলবে, “রুয়াদ স্যারের সাথে আমরা একটা প্র্যাকটিক্যাল বায়োলজি সফরে যাচ্ছি। পড়ালেখায় খুবই সহকারী সফর এটা। এসএসসিতে বায়োলজী নম্বর ৯৮ কনফার্ম।ʼʼ
রুয়াদ বেরিয়ে এলো স্কুল থেকে। অদ্রিজ সফরের আয়োজন করেছে, আর কিনা সিট খালি? আবার সে যাবে পয়সা দিয়ে?এই সফরবাবদ ওয়াশরুমের টিস্যুর খরচাটাও অদ্রিজ দেবে।টাকা খসবে হেমন্ত-ঋতুর গাছের পাতার মতো।
স্কুলের ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে তার মনে পড়ল অদ্রিজকে সে বারোটায় বাজারে আসতে বলেছে। এখন দুটো বাজছে। ব্যাপার না। মাত্র দুইঘণ্টা লেইট। অদ্রিজের উচিত একটু ধৈর্যশীল হয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা। পকেট হাতরে দেখল পাঞ্জাবীর কলার থেকে খসে যাওয়া একটা বোতাম ছাড়া পকেটে আল্লাহর ওয়াস্তে আর কিছু নেই। সে রিক্সায় উঠল বাজারের উদ্দেশ্যে।
পৌঁছাতে দুটো বিশ মতো বাজল। অদ্রিজ বাজারের মধ্যে একটা দোকানের সামনের ব্যানারের নিচে একটু ছায়ায় দাঁড়িয়ে গা-হাত-পা চুলকাচ্ছে। রুয়াদ হাত নেড়ে হাসল। অদ্রিজের সামান্য ভাবান্তর হলো না, মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ কিছুই না। রুয়াদ রিক্সা থেকে নামতে নামতে বলল, “ভাড়া দে।ʼʼ
চলবে...
[দুঃখিত দেরি করার জন্য। এটা লেখা ছিল সেই কবেকার। একটু ঠান্ডামাথায় দেখেশুনে নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে আপলোড করার ফুরসতটুকুই পাচ্ছিলাম না, কতদিন চলে গেল। ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।]
(বিশেষ নোট: গল্পের প্রতিটা চরিত্র, প্রতিটা ঘটনাপ্রবাহ ও সংলাপ সবটা কাল্পনিক এবং শুধুইমাত্র কাল্পনিক; আমার রচিত। যেহেতু স্থান ও কাল বাস্তবিক, তাই প্যাচ লাগতে পারে। কিন্তু অনুরোধ এদের কাউকে বাস্তব কোনো চরিত্রের সাথে মেলাবেন না। সামনে কোনো কোনো সালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি টুকটাক উঠে আসতে পারে, কিন্তু সেই সকল সময়ে বিচরণ করা এখানকার সব চরিত্র ও ঘটনা সবটা আমার তৈরি। উল্লেখিত স্থানগুলো কেবল বর্ণনার স্বার্থে আসবে। কোনো স্থানকে নির্দেশ করা আমার উদ্দেশ্য নয়।)