#আমি_তরুলতা (১০)
#সোফিয়া_সাফা
"এই যে মিস্টার, একটা লাইটার হবে? একচুয়েলি আমি লাইটারটা আনতে ভুলে…
আর কিছু বলার আগেই নীলাভ মেয়েটির দিকে তাকায়, আচমকা নীলাভকে দেখে সামনে থাকা মেয়েটির সাথে সাথে নীলাভ ও মেয়েটিকে দেখে চমকে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি হচ্ছে ত্রানা ওরফে তরু। তরু শান্ত চোখে নীলাভের দিকে তাকায়। এদিকে নীলাভ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তরুর দিকে তাকিয়ে আছে। নীলাভের এরকম চাহনি দেখে তরু নিজের হাতে থাকা সিগারেটের দিকে তাকিয়ে পুনরায় নীলাভের দিকে তাকায়, মুহুর্তেই তরুর মুখ থেকে আপনা আপনি বেরিয়ে আসে,
'শীট'
সাথে সাথেই তরু হাত ঝাড়া দিয়ে সিগারেট টা ফেলে দিয়ে নীলাভের দিকে তাকিয়ে বলে,
"আসলে এটা নিচে পড়ে ছিলো আমি এটা কুড়িয়ে পেয়েছিলাম আর ভাবলাম লাইটার দিয়ে পুড়িয়ে পানিতে ফেলে দেবো এই আরকি।"
তরু বুঝতে পেরেছে সে আজেবাজে কিছু বলে ফেলেছে। নীলাভ তরুর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে,
"ভেরি ইন্টারেস্টিং তো, আপনি তো দেখছি অনেক অনেক জিনিস কুড়িয়ে পান, প্রথমে মোবাইল তারপর আবার সিগ্রেট? বাহঃ তা মিস ত্রানা, কুড়িয়ে পাওয়া জিনিস তুলে নেওয়াটা কি আপনার জন্মগত স্বভাব; নাকি ইদানীং হয়েছে?"
কথাটা শুনে তরুর রাগ লাগার কথা থাকলেও সে রাগে না বরং স্বাভাবিক স্বরেই বলে,
"সে আপনি একটা ধরে নিতেই পারেন এএসপি সাহেব। কিন্তু বিনা প্রমাণে কাউকে ব্লেইম করাটা আপনার জন্মগত স্বভাব নিশ্চয়ই?"
তরুর কথা শুনে নীলাভ রেগে গিয়ে বলে,
"হাহ ব্লেইম করতে প্রমাণ লাগেনা understand? আর প্রমাণ নেই বলেই শুধু ব্লেইম করছি নয়তো এতোক্ষণে একজনকে খু'ন করার অপরাধে আপনাকে জেলে থাকতে হতো। হোক সেটা গুন্ডা কিন্তু আপনি খু'ন তো করেছেন তাইনা?"
তরু নীলাভের কথা শুনে অবাক হয়ে যায়, নীলাভ এখনো আগের মতোই আছে একটুও ম্যাচিউর হয়নি। আরে সে তো তাকে বাঁচাতে গিয়েই খু'নটা করেছিলো। কিন্তু এই ঘাড়ত্যাড়া লোক সেটা জেনেও বারবার একই কথা বলে যাচ্ছে। তরু নীলাভের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করে,
"হাহ আপনার মতো একজন পুলিশের মুখে এসব কথা মানায় না এএসপি নীলাভ জাহির খান। ধরুন আজকে একজন নির্দোষ লোককে বাঁচাতে আপনাকে একজন খারাপ লোককে মা'রতে হবে। তখন আপনি কি করবেন বলুন তো? খারাপ লোকের হাতে নির্দোষ লোকটিকে ম'রতে দেবেন নাকি খারাপ লোকটিকে মেরে নির্দোষ লোকটিকে বাঁচাবেন?"
নীলাভ তরুর দিকে গম্ভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কিন্তু মুখে কিছুই বলেনা।
"কি ভাবছেন মিস্টার নীলাভ? সেদিন তো খুব করে বলেছিলেন, পরেরবার দেখা হলে এই করবেন সেই করবেন, তো করুন না। আপনার মতো মানুষ না আমি আর একটাও দেখিনি, না মানে, আমি যে কি-না আপনাকে বাঁচাতে গিয়ে টানা ৮ টা দিন হসপিটালে ছিলাম। কই আপনি তো শুধু একবার নামের আমাকে দেখতে গিয়েছিলেন, আর সেই একদিন গিয়েও আমাকে উল্টা পাল্টা অনেক কথা বলেছিলেন। আচ্ছা আপনি এতটা অকৃতজ্ঞ কেনো বলুন তো, সত্যি করে বলুন না এই ১০ দিনে কি একটা বারের জন্যও আমার কথা আপনার মনে পড়ে নি?" (তরু একটু থেমে পুনরায় বলে) "আজকালকার দিনে অবশ্য মানুষ চোরকে খোঁজার চেষ্টা না করে যার ঘরে চুরি হয় তাকেই চোর বলে মনে করে, এতে আপনার দোষ নেই।"
নীলাভ ভ্রু কুচকে তরুর পানে তাকায়, মেয়েটাকে বোঝা মুশকিল তবে মেয়েটা ভুল কিছু বলেনি। সেদিন ওই রকম ঘটনা ঘটার পর মেয়েটাকে তার সন্দেহ হয়েছিলো তবে মেয়েটার পরিচয় সম্পর্কে জানার পর এখন সন্দেহ করার মতো কিছুই নেই। আর সে না মানলেও মেয়েটার জন্যই হয়তো এখনো সে বেঁচে আছে। নীলাভ ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে পুনরায় তরুর দিকে তাকিয়ে বলে,
"সেদিন ধন্যবাদ দিয়েছিলাম আপনাকে, আমি অকৃতজ্ঞ নই মিস ত্রানা। আমার মনে আছে আপনার করা উপকারের কথা। যদি আমি কখনো আপনার সাহায্য করার সুযোগ পাই তাহলে অবশ্যই করবো, এবার তাহলে আসি আল্লাহ হাফেজ,"
নীলাভ কথা শেষ করে গাড়িতে ওঠার জন্য রাস্তার দিকে তাকায়, ঠিক সেই সময়েই দূর থেকে খুব দ্রুত গতিতে একটি কালো গাড়ি চলে আসে, আর সেই গাড়ি থেকে একটি মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে আসে। মেয়েটি চিৎকার করে বলছিলো
'বাঁচাও আমাকে প্লিজ হেল্প মি'
আর কিছু বলার আগেই গাড়িটা চলে যায়। এসব দেখে নীলাভ নিজের গাড়ির দিকে ছুটে যায় যে করেই হোক মেয়েটিকে তাকে বাঁচাতেই হবে। বিষয় টা তরুও লক্ষ্য করে সেও নীলাভের পিছু পিছু নীলাভের গাড়িতে গিয়ে বসে। তাড়াহুড়োয় নীলাভ একবার তরুর দিকে তাকায়, এই মুহূর্তে তাকে কিছু বলার মতো সময় হাতে নেই। নীলাভ দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সামনের গাড়িটা ফলো করতে শুরু করে। কিছুদূর যাওয়ার পর হয়তো সামনের কারটিতে থাকা লোকেরা বুঝতে পারে যে কেউ তাদের ফলো করছে, তারা নীলাভদের চোখে ধুলো দেওয়ার অনেক চেষ্টা করে কিন্তু ব্যর্থ হয়। উপায়ান্তর না পেয়ে তাদের বন্দিকৃত মেয়েটিকে ফিসফিসিয়ে ধমকের স্বরে কিছু বলে দিয়ে এক ধাক্কায় মেয়েটিকে চলন্ত কার থেকে ঠেলে ফেলে দেয় বাম পাশে থাকা ঝোপঝাড়ের ভেতরে, ব্যাপার টা লক্ষ্য করতেই নীলাভ সেখানে এসে ব্রেক করে। তরু পুরোটা সময় শুধু নীলাভের দিকেই তাকিয়ে ছিলো, একটা বারের জন্যও চোখ ফেরায়নি। তখনই নীলাভ গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলে,
"আমাকে দেখা হয়ে গেলে নামুন কার থেকে, আর গিয়ে মেয়েটিকে বের করে আনতে আমাকে হেল্প করুন,"
তরু কিছুই বলে না, শুধু কার থেকে নেমে মেয়েটিকে ঝোপ ঝাড়ের ভেতর থেকে বের করে এনে নীলাভের সামনে দাঁড় করায়। মেয়েটির চোখে মুখে ছিলো বিষণ্নতা, ভয়। মেয়েটা কেঁদেই যাচ্ছিলো। নীলাভ গাড়ির ভেতর থেকে পানি বের করে এনে মেয়েটিকে খেতে দেয়। তরু এখনো শুধু নীলাভকেই দেখে যাচ্ছে। নীলাভ অবশ্য সামনে থাকা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছে, মেয়েটি কিছুটা শান্ত হলে নীলাভ তাকে আশ্বাস দিয়ে বলে,
"স্টপ ক্রায়িং, ইউ আর সেইফ নাও। আর আমি একজন সিআইডি অফিসার, সো আপনি ভয় না পেয়ে সত্যি করে বলুন তো লোকগুলো কারা ছিলো, আর আপনাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিলো। আপনার নাম পরিচয় কি?"
মেয়েটা একটা শুষ্ক ঢোক গিলে বলে,
"আমার নাম ন্যাঞ্চি, আমি সামনে থাকা সাভার সিটিতেই একটা হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছি, তার পাশাপাশি একটা ক্যাফেতে কাজ করি, সেখান থেকেই কাজ করে ফেরার পথে কয়েকজন মাস্ক পড়া লোক আমাকে জোর জবরদস্তি করে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাচ্ছিলো, আমি তাদেরকে চিনিনা।"
নীলাভ ভ্রু কুচকে মেয়েটির দিকে তাকায়, তার সামনে থাকা মেয়েটির শরীর রীতিমতো কাঁপছিলো। নীলাভ একটু ভেবে পকেট থেকে ফোনটা বের করে, তাদের এক লেডি অফিসারকে কল করে,
"হ্যালো মিস রহমান, আমার আপনার সাহায্যের প্রয়োজন, আপনার ফ্ল্যাটের ঠিকানাটা আমাকে দিন আমি এসে আপনাকে সব বলছি।"
কল কেটে দিয়ে নীলাভ তরুর দিকে তাকায়,
"আপনি এবার আসতে পারেন মিস ত্রানা।"
তরু নীলাভের কথা শুনে অবাক চোখে তাকিয়ে বলে,
"আপনি আমাকে এই জঙ্গলের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে যেতে বলছেন? তার ওপর ওই কিডন্যাপার রাও হয়তো আশেপাশেই আছে। একটা অপরিচিত মেয়েকে প্রোটেক্ট করতে তাকে সাথে করে নিয়ে যেতে পারছেন। আর আমাকে এখানে একা ফেলে চলে যাবেন?"
তরুর কথা শুনে নীলাভ বিরক্তির শ্বাস ফেলে বলে,
"লিসেন আমি তো আপনাকে আমার সাথে আসতে বলিনি, আর তাছাড়া আপনি রাত ১০ টায় ব্রিজের ওপরে যে কি করছিলেন আমি দেখেছিলাম তো। একজন ভালো মেয়ে কখনো এতো রাত অবধি বাইরে থাকেনা। আর কিডন্যাপার রা ভালো মেয়েদের ধরে বুঝলেন,"
"নো ইউ আর রং এএসপি নীলাভ, কিডন্যাপার রা সুন্দরী মেয়েদের ধরে, আর আমি অবশ্যই গুড লুকিং। তখন তো বলেছিলেন সুযোগ পেলে আপনিও আমাকে সাহায্য করবেন। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ভুলেও গেলেন। বাহঃ এএসপি সাহেব বাহঃ, গিরগিটি স্বয়ং আপনাকে দেখে লজ্জা পাবে।"
তরুর কথাতে নীলাভ তরুর দিকে গম্ভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, ন্যাঞ্চি নামের মেয়েটিকে গাড়ির ব্যাক সিটে বসিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে। তরু এখনো বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে নীলাভের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিলো। নীলাভ গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে কিছু একটা ভেবে তরুর উদ্দেশ্যে বলে,
"ভেতরে আসুন, মানুষকে কথার জালে কি করে ফাঁসাতে হয় ভালোই জানেন দেখছি। তবে আর যাই হোক কিডন্যাপাররা তো বুঝবেনা যে আপনি ভালো মেয়ে নন, আপনি যেহেতু আমার সাথে আছেন সেহেতু একজন দায়িত্ববান পুলিশ হওয়াতে আপনাকে প্রোটেক্ট করা আমার কর্তব্য।"
নীলাভের কথা শুনে তরু কিছু না বলেই পেছনে গিয়ে মেয়েটির পাশে বসে পড়ে। নীলাভ তরুকে উদ্দেশ্য করে বলে
"আপনার বাড়ির এড্রেস দিন আমি ড্রপ করে দিচ্ছি।"
তরু বাড়ির এড্রেস দিলে নীলাভ ভ্রু কুচকে তরুর দিকে তাকায় কারণ তরুর দেওয়া এড্রেস টা তার পরিচিত। তবুও মুখে সে সেই বিস্ময় টা প্রকাশ করলোনা, যদিও তরু জানে নীলাভ প্রচণ্ড অবাক হয়েছে। নীলাভ বললো,
"ওনাকে আমার সহকর্মীর বাড়িতে ড্রপ করে দিয়ে আপনাকে পৌঁছে দেবো কারণ আপনার বাড়ি এখান থেকে যথেষ্ট দূরে।"
তরু কিছু না বলে নিজের ফোন বের করে ফোনে মনোযোগ দেয়। নীলাভ গাড়ি ঘুরিয়ে সাভার সিটিতে ব্যাক করে। তরু এদিকে ফোনে একটা গ্রুপে ম্যাসেজ দিয়ে বলে,
"আমাদের কাজ হয়ে গেছে তোদেরকে আর আসতে হবেনা।"
নীলাভ কার ড্রাইভ করছিলো, তরু জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে, পাশে থাকা ন্যাঞ্চি নামের মেয়েটি গুটিসুটি মেরে বসে আছে। আকাশের অবস্থা খারাপ, বৃষ্টি নামবে নামবে ভাব, নীলাভের মাথাটা ব্যাথায় টনটন করছে। সারাদিন সে না খেয়েই আছে। মাহিরের বাড়িতে গিয়েছিলো সে, কিন্তু সেখানে এক কাপ কফি ছাড়া সে কিছুই খায়নি। ভেবেছিলো একেবারে বাড়িতে ফিরে ফ্রেশ হয়ে তবেই খাবে। আর এর মাঝেই এতো কিছু হয়ে গেলো। প্রায় ২০ মিনিট ড্রাইভ করার পর তারা মিস মোমো রহমানের বাড়িতে এসে পৌছায়—পেশায় সেও সিআইডি ইনস্পেকটর। সে নীলাভ আর মিস্টার মাহির শেখ সহ ৭ জন একই ডিপার্টমেন্টে কাজ করে আসছে। মিস রহমান দরজা খুলে দিতেই নীলাভ সহ তরু ও ন্যাঞ্চি ফ্ল্যাটে ঢোকে,
"স্যরি মিস রহমান এতো রাতে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য।"
"না স্যার, এটা তো আমার সৌভাগ্য যে আমি আপনার কাজে আসতে পেরেছি।"
তারপর নীলাভ ন্যাঞ্চিকে যেভাবে পেয়েছে সেই ব্যাপারটা মোমোকে খুলে বললো। মোমো সবটা শুনলো কিন্তু এরই মাঝে মোমো একটু বেশিই আন্তরিকতা দেখাতে লাগলো। যা দেখে তরুর বেশ বিরক্ত লাগছে।
"আমার লাভবার্ডটা এতো সুন্দর যে সব মেয়েগুলোই শুধু চান্স খোঁজে। কি যে করি? সহ্য হয় না আমার, ইচ্ছা তো করছে চোখ দুটো একদম গেঁলে দেই। কিন্তু লাভ থাকায় সেটাও পারছি না।"
"মিস রহমান, আপনি ওনার খেয়াল রাখবেন। আগামীকাল সকাল বেলাতেই ওনাকে নিয়ে ব্যুরোতে চলে যাবেন। আমি ওখানেই ওনার থেকে প্রয়োজনীয় ইনফরমেশন কালেক্ট করবো।"
"ওকে স্যার, আপনি বসুন আমি চা বানিয়ে আনছি।"
"না, আমার হাতে এখন টাইম নেই। অলরেডি এগারোটা বেজে গিয়েছে, ওনাকেও আবার বাড়িতে ড্রপ করে দিতে হবে। তার ওপর আবহাওয়ার যেই অবস্থা, যখন তখন বৃষ্টি নামতে পারে।"
মোমো একবার তরুর দিকে তাকায় –
"স্যার, উনি কে?"
নীলাভ একবার তরুর দিকে তাকায় তারপর মোমোর দিকে তাকিয়ে বলে –
"উনি ত্রানা চৌধুরী, রাস্তায় ওনার সাথে দেখা হয়েছিলো আর তখন ঘটনাক্রমে উনি আমাদের সাথে ফেঁসে গিয়েছেন।"
"এএসপি সাহেব, আমাদের এখন যাওয়া উচিত।"
"ওকে, লেটস মুভ।"
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা- ১৫০০+
(লাইক করে সাথেই থাকুন)